ভারতের স্বার্থেরই প্রাধান্য বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষিত
বাংলাদেশের অন্তত ৪টি সেচ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে
পূর্বাঞ্চলের বিশাল অংশ ভূ-তাত্বিক প্রতিকূলতায় পড়বে
ফারাক্কা বাঁধের পর সর্বাধিক আলোচিত-সমালোচিত বরাক নদীতে বহুমুখি প্রকল্প ‘টিপাইমুখ বাঁধ’ নির্মাণের কাজ শেষ পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছে ভারত। এযাবৎ প্রচার মাধ্যমে এ বিষয়ে নানান লুকোচুরি চললেও ভেতরে ভেতরে তারা এর নির্মাণ কাজ চালিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের প্রবল আপত্তিকে কোনো রকম আমলেই নেয়ার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। এই প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য বড়রকম ক্ষতির কারণ হবে বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি ওয়েবসাইটের ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০০ কিলোমিটার উজানে ভারতের বরাক নদীর ওপর এই টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। ‘টিপাইমুখ’ নামক স্থানটি বরাক এবং টুইভাই নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। এই মিলনস্থলের ১ হাজার ৬০০ ফুট দূরে বরাক নদীতে ৫০০ ফুট উঁচু ও ১ হাজার ৬০০ ফুট দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সেচের জন্য পানি সংরক্ষণাগার (রিজার্ভার) নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। অভিন্ন নদীর উজানে এই বাঁধ ভাটির বাংলাদেশের পরিবেশ আর অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করেন বিশেষজ্ঞরা। এই বাঁধ নির্মাণে ভারতের মনিপুরের নাগরিকরাও প্রবল আপত্তি জানিয়ে আসছেন। তারা এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও করছেন।
ভারতের বহুমুখি লক্ষ্য : বরাক নদীর উপর ড্যাম নির্মাণের প্রথম প্রস্তাব উঠে ১৯৫৫ সালের দিকে। নির্মাণকাজ শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৯৩ সালের দিকে। কিন্তু ভারতের কিছু অঞ্চলসহ বাংলাদেশের নদী-প্রবাহের উপর বিরূপ প্রভাবের কথা ব্যাপক আলোচিত হওয়ার প্রেক্ষিতে এর গতি কিছুটা থমকে যায়। বর্তমানে এই বাঁধের নির্মাণ কাজ অব্যাহত রয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, পুরো প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ২শ’ কোটি ভারতীয় রূপি। বহুমুখি এই প্রকল্পটির প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মূলত বরাক উপত্যকায় পানি ধারণের মাধ্যমে ২ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ। পরবর্তীকালে এই ড্যামের মাধ্যমে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও করা হয়। এর সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১৫০০ মেগাওয়াট। টিপাইমুখ ড্যামের মাধ্যমে বরাকের পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে কাছাঢ় সমতলে সেচ প্রদানের ব্যবস্থা করাও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও টিপাইমুখ ড্যামে যে জলাধার নির্মাণ করা হচ্ছে তার মোট পানি ধারণ ক্ষমতা হবে প্রায় ১৬ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। এই জলাধারে পানি জমিয়ে রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ অংশ পানি বঞ্চিত হবে এবং পূর্বাঞ্চলের বিশাল ভূ-ভাগ ভূ-তাত্বিক প্রতিকূলতার শিকার হবে। এদিকে, মনিপুর রাজ্যের টিপাইমুখে ভারতের বৃহত্তর প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ ছাড়াও বারাক ও তার শাখা এবং উপনদীগুলোকে কেন্দ্র করে আরো ২৯টি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাঁচাই কাজ চলছে বলে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে।
বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষতি : উল্লেখ করা যেতে পারে, বরাক নদীর উৎপত্তি ভারতের মণিপুর রাজ্যের কাছাঢ় পর্বতে। অতঃপর তা মণিপুর, আসাম ও মিজোরামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অমলসিধের কাছে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বরাক নদীর ভারতে প্রবাহিত অংশের দৈর্ঘ ৪৯৯ কিলোমিটার। অন্যদিকে কুশিয়ারা, কালনী এবং মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া পর্যন্ত এর দৈর্ঘ ৪০৩ কি.মি.। বরাক বাংলাদেশের প্রধানতম নদী মেঘনার সাথে সরাসরি যুক্ত বলে বরাকের গুরুত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশে উজান থেকে আসা পানির মোট ৭ থেকে ৮ ভাগ প্রবাহ আসে ভারতের বরাক নদী থেকে। মৎস্য সম্পদ আহরণ ও চাষাবাদের জন্য বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ বরাক নদীর পানি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, এই বাঁধ নির্মাণের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি, প্রাণবৈচিত্র্যসহ সার্বিক পরিবেশের উপর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কুফল দেখা দেবে। টিপাইমুখ ড্যাম সক্রিয় করা হলে এর রিজার্ভারে পানি সংরক্ষণের কারণে স্বাভাবিকভাবে এর ভাটিতে পানিপ্রবাহ বিঘিœত হবে, যা ঐ অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করবে। মৎস্য প্রজননে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় প্লাবনভূমির পরিমাণ শতকরা ৬০ ভাগ এবং ভরা মওসুমে অন্তত ২২ ভাগ হ্রাস পাবার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও সুরমা- কুশিয়ারায় বন্যার পরিমাণ কমে যাবে ফলে পলল সমভূমিগুলো পলিমাটি বঞ্চিত হবে এবং নদী অববাহিকার মধ্যবর্তী সমভূমিগুলো নদীর সাথে সংযোগহীন হয়ে পড়বে। এছাড়া বাংলাদেশের অন্তত ৪টি প্রকল্প টিপাইমুখ বাঁধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে, আপার সুরমা-কুশিয়ারা রিভার প্রজেক্ট, সুরমা রাইট ব্যাংক প্রজেক্ট, সুরমা-কুশিয়ারা-বাউলাই বেসিন প্রজেক্ট এবং কুশিয়ারা বিঝনা ইন্টারবেসিন প্রজেক্ট। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী মেঘনা বরাক তথা সুরমা-কুশিয়ারার সাথে সরাসরি যুক্ত বলে মেঘনার প্রবাহ হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। মেঘনার প্রবাহ হ্রাস পেলে এই অঞ্চলের কৃষি ও মৎস্যসহ মানুষের নদীকেন্দ্রিক জীবনধারায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসবে। এমনকি উজানের পানিপ্রবাহ হ্রাসের কারণে সাগর থেকে লবণাক্ততা উঠে আসার মত পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। পাহাড়ি নদী হবার কারণে বিপুল খরস্রোতা বারাক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ছাড়াও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস হিসেবে অবদান রেখে চলেছে। ভারতের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়ে ভারত প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও সেচের সুবিধা পেলেও বাংলাদেশ হবে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার। সম্প্রতি ভারতের মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানিয়েছেন, এ বাঁধ নির্মিত হলে রিখটার স্কেলের ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে এর পার্শ্ববর্তী ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে পারে।
ক্ষমতাসীনদের ‘উদারতা’য় প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোন দেশ অভিন্ন নদীর উজানে কোন কাঠামো নির্মাণ করতে হলে অবশ্যই এর ভাটিতে বসবাসকারী জনপদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবতে বাধ্য। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন মহলের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের প্রতি একপ্রকার সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। এনিয়ে উদারতা প্রদর্শণ করা হয়। কোন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এই প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করিয়ে এতে ‘বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হবে না’ বলে সনদপত্র প্রদান করা হয়। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় থাকাকালে তৎকালীন পানি সম্পদমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল টিপাইমুখে পাঠানো হয়। তারা হেলিকপ্টারে চড়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন এবং ফিরে এসে প্রকল্পের পক্ষে অভিমত জ্ঞাপন করেন। পরের দফায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান ও ড. গওহর রিজভী ২০১১-র অক্টোবরে দিল্লী যান তাদের অভিমত জানাতে। ওদিকে তখন মনিপুরে টিপাইমুখ প্রকল্প নির্মাণে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হচ্ছিলো। পরে ডিসেম্বরে ড. রিজভী বাংলাদেশের একটি ইরেজি দৈনিকে এ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লেখেন। কিন্তু এতে টিপাইমুখের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে কোন ভাষ্য না থাকায় সচেতন জনমনে হতাশা দেখা দেয়। ভারতের সঙ্গে ‘উচ্চ সম্পর্ক’ রক্ষার অজুহাতে বাংলাদেশের বড়রকম ক্ষতিকেও হজম করে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি টিপাইমুখ প্রকল্পের যৌক্তিকতা ও এর স্বপক্ষে বাংলাদেশের
অবস্থান নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ডঃ গওহর
রিজভীর “টিপাইমুখঃ যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক আলোচনার অনুরোধ”[১, ২] এবং
মহিউদ্দিন আহমদের লেখা “টিপাইমুখ বাঁধ তৈরি করা কেন জরুরি”[৩] শিরোনামের
নিবন্ধদুটি সংবাদ মাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ডঃ রিজভী
তার নিবন্ধে টিপাইমুখ প্রকল্পের ব্যাখ্যায় পানিসম্পদ কৌশলগত দিক থেকে কিছু
ভুল তথ্য দিয়েছেন, সেই সাথে জনাব আহমদের নিবন্ধটি তথ্যগত ও ভাষাগত বিচারে
অত্যন্ত একপেশে মনে হয়েছে, এছাড়া তাদের উভয়ের বক্তব্যের অনেক অংশেই আমার
দ্বিমত রয়েছে যা এই নিবন্ধে তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে।
ডঃ রিজভী তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, টিপাইমুখ প্রকল্প একটি ‘রান অফ দি
রিভার’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে টিপাইমুখ প্রকল্প ‘রান অফ দি
রিভার’ জলপ্রবাহ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নয় বরং তা একটি ‘গতানুগতিক জলবিদ্যুৎ
প্রকল্প’।
রান অফ দি রিভার ও গতানুগতিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
হচ্ছেঃ প্রথমটিতে বাঁধের উজানে বড় আকারের কোন জলাধার নির্মান করা হয়না এবং
বাঁধ দেবার পর নদীর প্রায় সম্পূর্ন প্রবাহকে ঢালু টানেলে করে ভিন্ন পথে
বাঁধের ভাটিতে মূল নদীতে নিয়ে যাওয়া হয়, অন্যদিকে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বাঁধের
উজানে বিশাল জলাধারে পানি সঞ্চয় করা হয়ে থাকে। ‘রান অফ দি রিভার’ প্রকল্পে
উজানে পানি ধরে রাখার দরকার হয়না বলে ভাটিতে নদীর প্রবাহের উল্লেখযোগ্য
কোন পরিবর্তন হয়না এবং এর পরিবেশগত ও বাস্তুতান্ত্রিক প্রভাব গতানুগতিক
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চেয়ে অনেকাংশেই কম। প্রাপ্ত তথ্যমতে টিপাইমুখ
প্রকল্পে বাঁধের কারনে সৃষ্ট জলাধারের ফলে প্লাবিত এলাকা প্রায় ৩০০
বর্গকিলোমিটার ফলে তা আদতে একটি ‘গতানুগতিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প’।
ডঃ রিজভীর মতে, টিপাইমুখ প্রকল্প শুধুমাত্র তখনই ভাটি অঞ্চলে
ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে যখন সেখান থেকে সেচ ও অন্যান্য প্রয়োজনে পানি
প্রত্যাহার করা হবে এবং যেহেতু ভারত সরকার বলছে যে তারা এই প্রকল্পে কোন
ব্যারেজ নির্মান করবে না সেক্ষত্রে বাংলাদেশে বরাক নদের দুটি শাখা সুরমা ও
কুশিয়ারার পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নয় বরং শুষ্ক মৌসুমে নদীর
প্রবাহ বাড়বে আর বর্ষায় বন্যা নিয়ন্ত্রিত হবে। একই রকম যুক্তি পাওয়া যায়
জনাব আহমদের নিবন্ধে। কিন্তু এই তথাকথিত বন্যামুক্ত হওয়া কতটা ইতিবাচক।
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখানে রয়েছে বিশাল
জলাভুমি ও অসংখ্য হাওড়। এর একটি নিজস্ব বাস্তুসংস্থান রয়েছে।
প্রাকৃতিকভাবে এখানে বর্ষার সময় পানি বাড়বে, বন্যা হবে ও শুষ্ক মৌসুমে
অনেক এলাকা শুকিয়ে যাবে, এর উপর ভিত্তি করেই সেখানকার বাস্তুসংস্থান গড়ে
উঠেছে। ‘ইন্সটিটিউট অফ ওয়াটার মডেলিং’ এর ‘হাইড্রোলজিকাল ইম্প্যাক্ট
স্টাডি অফ টিপাইমুখ ড্যাম প্রজেক্ট অফ ইন্ডিয়া অন বাংলাদেশ’ শীর্ষক
গবেষণার আলোকে[৪, ৫] টিপাইমুখ বাঁধের কারণে সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার
জলাভূমি ও হাওড় আগের থেকে গড়ে যথাক্রমে ২৬% ও ১১% কমে যাবে, কুশিয়ারা নদী
তীরে অবস্থিত কুশিয়ারা-বর্দাল হাওড় গড় বর্ষার সময় পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে
এবং কাওয়ারদিঘী হাওড়-এর ২৬% প্লাবন এলাকা হারাবে, বাঁধের ভাটিতে ১০০ থেকে
১৫০ কিমি দীর্ঘায়িত অংশে বিপুল নদীক্ষয়ের ফলে ক্ষয়িত পলি বাংলাদেশে বাহিত
হবে যা কিনা বরাক নদীর নিচের অংশে যেখানে থেকে তা সুরমা আর কুশিয়ারা এই
দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে সেখানে জমা হবে যা কুশিয়ারা নদীর বেশ কিছু শাখানদীর
মুখ বন্ধ করে দিতে পারে।
জনাব আহমেদ উল্লেখ করেছেন যে তার নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য কানাডীয়
উন্নয়ন সংস্থার (সিডা) অর্থায়নে বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে
নব্বইয়ের দশকে সম্পাদিত একটি বিশেষ সমীক্ষার অংশবিশেষ। যদিও তিনি ঐ
সমীক্ষার নাম উল্লেখ করেন নি তবে ধারণা করা যায় উল্লেখ্য গবেষনাটি
বাংলাদেশের ‘উত্তর-পূর্ব আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাঃ ফ্লাড একশন
প্ল্যান-৬ (NERP-FAP 6)’ এর অধীনে ‘ইনিশিয়াল এনভায়রন্মেন্টাল
ইভ্যাল্যুয়েশন’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় [৬]। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সরকারের
পক্ষ থেকে টিপাইমুখ প্রকল্পে এটিই একমাত্র উল্লেখ্যযোগ্য গবেষণা যা মূলত
কিছু ধারণা বা এসাম্পশনের উপর ভিত্তি করে সংগঠিত হয়েছিল। তিনি উল্লেখ
করেছেন যে এর চেয়ে মানসম্মত তথ্য ও উপাত্ত যদি আর কারও কাছে থেকে থাকে, তা
নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অথচ ঐ রিপোর্টেই উল্লেখ আছে যে, ‘যৌথ নদী কমিশনের
মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে এই প্রকল্পের একটি ন্যূনতম ধারণা পাওয়া যায় যা কিনা
ঐ প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রাথমিক প্রভাব যাচাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে।…ভারত কতটুকু
পানি এই প্রকল্প থেকে প্রত্যাহার করবে সে সম্পর্কে কোন তথ্য জানা নেই। এই
গবেষণার জন্য ধরে নেয়া হয়েছে যে সেচের জন্য ১ মিটার সমপরিমাণ পানি অপসারন
করা হবে পানি অপসারন ক্রমাগতভাবে শুষ্ক মৌসুম (নভেম্বর থেকে
এপ্রিল)পর্যন্ত চলবে।।’
এছাড়া ঐ রিপোর্টেই মন্তব্য করা হয়েছে যে জলাধার পূরণের সময়কালে
অনেক সময় প্রকল্পের সুবিধা তাড়াতাড়ি পাবার জন্য অতিদ্রুত জলাধার পূর্ণ করা
হয় যা বাংলাদেশের মত ভাটির অঞ্চলে ভয়াবহ পরিবেশ, বিশেষ করে বাস্তুসংস্থান
বিপর্যয় ঘটাবে।
হাওড় এলাকার কথা উল্লেখ করে জনাব আহমদ বলেছেন যে, বর্ষাকালে
হাওড়গুলি জলে টইটুম্বর থাকে- কোন ফসল হয় না, কিন্তু তিনি বিস্তীর্ন এই
হাওড় এলাকার মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্রের কথা এড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি উল্লেখ
করেছেন যে, হাওড় অঞ্চলের সমস্যা দু’টিঃ এক, আগাম বন্যা, যার ফলে
ফেব্রুয়ারি-মার্চে উঠতি ফসল মাঠেই তলিয়ে যায়, এবং দুই, দেরিতে পানি
নিষ্কাশন, যার ফলে বোরো ধান রোপণ করতে দেরি হয়ে যায় এবং তা আগাম বন্যার
ঝুঁকিতে পড়ে। তিনি মন্তব্য করেছেন যে বর্ষাকালে বরাক দিয়ে পানিপ্রবাহ
হ্রাস পেলে এই দুটো সমস্যাই কমে যাবে। কিন্তু এখানে লক্ষ্যনীয় যে টিপাইমুখ
বাঁধ নির্মানের পর বর্ষার শুরুতে রিজার্ভারে পানি ধরে রাখার প্রয়োজন পড়বে
আবার বর্ষার শেষের দিকে পানি ছেড়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। এর ফলে বর্ষার
শুরুতে বন্যা কমে আসতে পারে আবার বর্ষার শেষে বন্যার প্রকোপ বাড়তে পারে।এর
প্রভাব এই অঞ্চলের বোরো ধান আবাদের উপর পড়তে পারে। এছাড়া হাওড়গুলি শুষ্ক
মৌসুমে যখন শুকিয়ে যায় তখন কৃষকরা সেখানে বোরো ধান বপন করে যা এই অঞ্চলের
একমাত্র ফসল। এই ধান বর্ষা আসার আগেই ঘরে ওঠে যা এই লোকগুলির বছরের
একমাত্র শর্করার যোগান দেয়। শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং তার ফলে
সেচের জন্য সুফল বয়ে আনা প্রসংগে জনাব আহমদের মন্তব্যের প্রতি উত্তরে বলতে
চাই, প্রাথমিক গবেষণা অনুযায়ী টিপাইমুখ প্রকল্পের কারণে শুষ্ক মৌসুমে
অমলসিদের আরো ভাটিতে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় নদী তীরবর্তী অঞ্চলে প্রবাহ
শতকরা ৮০ ভাগ বৃদ্ধি পাবে যা কিনা পানির উচ্চতা ২ মিটার পর্যন্ত বাড়িয়ে
দেবে। সেক্ষেত্রে সেচের সুবিধা নয় বরং এই বিস্তীর্ন অঞ্চলের ফসল পানিতেই
নিমজ্জিত হবে।
টিপাইমুখ প্রকল্পের ভূমিকম্পের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ডঃ রিজভী
মন্তব্য করেছেন যে যেহেতু বাংলাদেশ টিপাইমুখ প্রকল্প থেকে অনেক দূরে
সেক্ষেত্রে আমাদের ঝুঁকি অনেক কম। অন্যদিকে জনাব আহমদ এটাকে নিছক ‘জুজুর
ভয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ভারতীয় ও বার্মা প্লেটের মিথস্ক্রিয়ার ফলে
ভারত ও বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা
হিসেবে বিবেচিত। ভূতাত্ত্বিকভাবে টিপাইমুখ বাঁধ এলাকা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল
আসলে অসংখ্য ‘ফোল্ড ও ফল্ট’ বিশিষ্ট এবং এই অঞ্চলে গত ১৫০ বছরে রিক্টার
স্কেলে ৭ এর অধিক মাত্রার দু’টি ভূমিকম্প হয়েছে যার মধ্যে শেষটি ছিল ১৯৫৭
সালে যা কিনা টিপাইমুখ প্রকল্প থেকে পূর্ব-উত্তরপূর্ব দিকে মাত্র ৭৫ কিমি
দূরে। FAP 6 রিপোর্ট (১৯৯৫) মতে ভূমিকম্পের কারণে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে ৩০০
বর্গকিলোমিটার এলাকার জলাধারের পানি ঢেউ আকারে ঘন্টায় ১০ থেকে ৩০
কিলোমিটার বেগে ভাটির দিকে ধাবিত হবে এবং তা ২৪ ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশে
প্রবেশ করবে। বাংলাদেশে প্রবেশের সময় এই ঢেউয়ের উচ্চতা হবে ৫ মিটার [৬]।
এই বিপুল প্রবাহ ১০ দিন ধরে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং সমস্ত বন্যার্ত
এলাকা থেকে পানি সরে যেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। সুতরাং টিপাইমুখ
প্রকল্পে বাঁধ ভাঙ্গার ঝুঁকিকে ‘জুজুর ভয়’ উল্লেখ করা বা বাঁধ ভেঙ্গে গেলে
বাংলাদেশের কম ক্ষতিগ্রস্থ হবার যুক্তি অসাড়।
টিপাইমুখ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভাটির রাজ্য আসাম ও নাগাল্যান্ড এর
আপত্তি না থাকার কথা উল্লেখ করে এই প্রকল্পে বাংলাদেশেরও আপত্তি থাকা উচিৎ
নয় এরকম একটি ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করেছেন ডঃ রিজভী। এখানে উল্লেখ্য যে
বারাক নদী থেকে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণা আসে মূলত আসামের কাছাড়
উপত্যকায় বন্যা নিয়ন্ত্রনের চাহিদা থেকেই। সুতরাং এই প্রকল্পে আসামের
আপত্তি থাকার কোন কারন নেই। কিন্তু টিপাইমুখ বাঁধ হলে বাংলাদেশের সিলেট
অঞ্চলের যে বিস্তীর্ন হাওড় অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র আছে সেটি
পরিপূর্নভাবে বিনষ্ট হবে। ফলে আসামের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই
বাঁধের ইতিবাচকতা টেনে আনা অযৌক্তিক।
জনাব আহমদ অতীতে গঙ্গা নদীর উজানে বাঁধ তৈরি ও জলাধার নির্মাণ করে
শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবের
কথা উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেছেন যে ‘এ ধরনের জলাধার নেপাল কিংবা
ভুটানে হলে আপত্তি নেই কিন্তু ভারতে হলেই অনেকের আপত্তি।’ এখানে বলে রাখা
ভাল যে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের সেই প্রস্তাব ভারত সমর্থন করলে হয়ত
গঙ্গাচুক্তি ১৯৭৪/৭৫ সালেই সংগঠিত হতো। গঙ্গা চুক্তির আপস আলোচনার
দ্বিতীয় পর্যায়ে (১৯৭৪-১৯৭৬) যেহেতু শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বন্টন
নিয়ে সমস্যার উৎপত্তি হয় তাই এই পর্যায়ে ‘গঙ্গায় পানি বৃদ্ধির’ বিষয়টি
সামনে আনা হয় [৭]। বাংলাদেশ প্রস্তাব করে যে ভারত বর্ষা মৌসুমের বিপুল
পরিমাণ পানিকে উজানের জলাধারে (ভারতে না নেপালে) সঞ্চিত করে তা শুস্ক
মৌসুমে ব্যাবহার করতে পারে, অন্যদিকে ভারত একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে
ব্রহ্মপুত্র থেকে বিপুল পরিমান পানি গঙ্গায় নিয়ে আসার প্রস্তাব
করে।বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা উজানে বাঁধ করতে প্রস্তাব করেছিল কারন তারা
চেয়েছিল যেন তাতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গায় পানি বৃদ্ধি পায় এবং সেই বর্ধিত
পানি ভারত প্রত্যাহার করতে পারে ফলে বাংলাদেশকে আর পানিবিহীন থাকতে হয়না
শীতকালে।
ডঃ রিজভী উল্লেখ করেছেন যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী টিপাইমুখ
প্রকল্পের সমতাভিত্তিক অংশীদার হওয়া এবং সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুতের ভাগ
নেওয়ার আমন্ত্রণ পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন যে, এর ফলে
প্রকল্পটির সকল পর্যায়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ থাকবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার
প্রক্রিয়ায় স্থান করে নেওয়া নিশ্চিত হবে। একই কথায় প্রতিফলন আমরা দেখতে
পাই জনাব আহমদের নিবন্ধে। তিনি বরং আরো জোরালো ভাবে মন্তব্য করেছেন ‘এ
বাঁধ শুধু ভারতের তৈরি করাই উচিত নয়, বাংলাদেশের উচিত ভারতকে চাপ দেওয়া,
যাতে বাঁধটি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়।’ এখানে বলে রাখা ভাল যে, ভারতের এই
আমন্ত্রন মেনে নেয়া মানে হচ্ছে টিপাইমুখ প্রকল্পে বাংলাদেশের স্বার্থ
বিঘ্নিত হচ্ছে সেটিকে অস্বীকার করা। ডঃ রিজভী উল্লেখ করেছেন যে সংগৃহীত
তথ্য এবং ভারতের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া আশ্বাসের ভিত্তিতে
আমাদের উচিত টিপাইমুখ প্রকল্পকে আবেগ ও রাজনীতির ক্ষেত্র থেকে বিযুক্ত করে
বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিশীলতার আলোকে বিবেচনা করা। তার এই মন্তব্যের সাথে আমি
একমত তবে শুধুমাত্র ভারত সরকারের মৌখিক আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে নিশ্চয়তার
ঢেকুর তোলার পক্ষপাতি নই। বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ আগে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে
যৌথ সমীক্ষা ও গবেষণার উদ্যোগ নিয়ে জেনে নেয়া বাংলাদেশের কতটুকু ক্ষতি
হচ্ছে। যদি বাঁধের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য এর ডিজাইনে কোন
পরিবর্তন-পরিবর্ধন সম্ভব থাকে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।আর যদি এই ক্ষতি
সহনীয় মাত্রায় আনা সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে
আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার প্রস্তাব ভারতের কাছে
উত্থাপন করতে হবে এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সেটাই হবে আমাদের
প্রত্যাশা। তথ্যসুত্র:
[১] গওহর রিজভী(২০১১) “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কঃ টিপাইমুখ: যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক আলোচনার অনুরোধ” , দৈনিক প্রথম আলো, ১৩ ডিসেম্বর ২০১১।
[২] Gowher Rizvi(2011) “Tipaimukh: A plea for rational and scientific discussion”, The Daily Star, 13 December 2011.
[৩] মহিউদ্দীন আহমদ(২০১১) “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কঃ টিপাইমুখ বাঁধ তৈরি করা কেন জরুরি”, দৈনিক প্রথম আলো, ২৯ ডিসেম্বর ২০১১।
[৪] Institute of Water Modeling (2005) “Hydrological Impact Study of Tipaimukh Dam Project of India on Bangladesh”, April 2005.
[৫]Kibria, M. G. (2005). Gaining Public Acceptance for Large Dams on
International Rivers: The Case of Tipaimukh Dam in India and Concerns
in Lower Riparian Bangladesh. Gaining Public Acceptance Issue-Based
Workshop Proceedings,Page:89-91.
[৬]Initial Environmental Evaluation, Appendix to the Northeast Regional
Water Management Plan, Bangladesh Flood Action Plan 6 (IEE NERP FAP 6)
[৭] আইনুন নিশাত (১৯৯৬)“Impact of Ganges Water Dispute on Bangladesh”,
Asian International Waters, From Ganges-Brahmaputra to Mekong,
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। জাহিদুল ইসলাম: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টা, কানাডা।
প্রাক্তন শিক্ষক, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, বুয়েট
zahidripon@gmail.com
টিপাইমূখ বাঁধ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, সেই আলোকে গত ২৯.১২.২০১১ তারিখে প্রথমআলো পত্রিকায় জনাব মহিউদ্দিন আহম্মদ একটি কলাম লেখেন, সেই লেখা কতটা যুক্তিযুক্ত তার বিচার বাংলাদেশের জনগনের। এই লেখার সমালোচনা করেছেন মুক্তিআন্দোলনের আহবায়ক জনাব রইসউদ্দিন আরিফ Ges Aa¨vcK Rvdi BKevj| পাঠকদের সুবিদার্থে সমালোচনার সাথে নিচে মূল লেখাটিও দেয়া হলো।
মাঝেমধ্যে শোনা যায় পেঙ্গুইনরা দলবদ্ধভাবে আত্মহত্যা করে। কেন করে, জানি
না। জাতি হিসেবে বাঙালিও আত্মহত্যাপ্রবণ। আত্মঘাতী বাঙালি নামে আমার প্রিয়
লেখক নীরদ চৌধুরীর একটি বই আছে। শিরোনামটির সঙ্গে আমি একমত। ইতিহাসের
বিভিন্ন পর্বে আমরা বুঝে না-বুঝে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিই, যা আত্মহত্যার
শামিল। তেমনি একটি বিষয় নিয়ে আজ লিখব। আমরা জানি, রাজনীতিবিদেরা অনেক
সময় অনেক কিছু বলে থাকেন, যার পেছনে যুক্তি থাকে না। কী বললে মানুষ খুশি
হবে, হাততালি দেবে, তা তাঁরা বুঝে নিতে কসুর করেন না। আর কিছু কিছু মানুষ
আছে, যারা ওই সব কথা শুনতে পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ‘জনতা’ শব্দটির একটি
ইতিবাচক তাৎপর্য থাকলেও এ ধরনের ঝাঁপিয়ে পড়া মানুষকে ‘ক্রাউড’ হিসেবে দেখা
হয়। এই ক্রাউড কখনো-সখনো দাঙ্গা বাধাতে পারে, কিন্তু ইতিহাস তৈরি করতে
পারে না। আমরা এখন এই ক্রাউড কালচারে আক্রান্ত। আজকের লেখার বিষয় হলো
টিপাইমুখ বাঁধ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রাউড মনস্তত্ত্ব। বছর তিনেক
আগে অঙ্গীকার বাংলদেশ নামে একটি এনজিও এবং আসামের রিভার বেসিন ফ্রেন্ডস
নামের অনুরূপ আরেকটি এনজিও যৌথভাবে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে ঢাকায় একটি
সেমিনারের আয়োজন করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল এই বাঁধ বাস্তবায়িত হলে
বাংলাদেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। দুটো এনজিওর কর্তাব্যক্তিদের ব্যক্তিগতভাবে
আমি চিনি। তাঁরা ভালো মানুষ, এককালে বাম রাজনীতি করতেন। ওই সেমিনারে আমি
বলেছিলাম, এই বাঁধ তৈরি হলে মণিপুরের অনেক পরিবার উদ্বাস্তু হবে, তাদের
জীবনযাত্রা তছনছ হয়ে যাবে, পরিবেশের প্রচণ্ড ক্ষতি হবে। কিন্তু বাংলাদেশের
ক্ষতি হবে, এ কথাটা বেঠিক। বরং বাংলাদেশ লাভবান হবে। মণিপুরের মানুষ এই
বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে, প্রতিরোধ গড়ে তুললে তার প্রতি আমি সংহতি
জানাব। কিন্তু তাদের পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে যদি এই বাঁধ তৈরি
করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের উচিত হবে তার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা। আমি এও
বলেছিলাম, আপনারা এই ইস্যুটি তুলে এ দেশের ধর্মান্ধ রাজনৈতিক অপশক্তির
হাতে একটি মারাত্মক অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন। আজ আমার আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত
হয়েছে। এই রাজনৈতিক অপশক্তির সঙ্গে জোট বেঁধেছে কিছু নির্বোধ অথবা চতুর
‘সুশীল’, যাঁরা একসঙ্গে রা তুলছেন, টিপাইমুখ বাঁধ তৈরি হলে বাংলাদেশ
মরুভূমি হয়ে যাবে, বাংলাদেশ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি। আমি যেহেতু এই
বাঁধের পক্ষে, তাই এই বিষয়ে দু-একটা কথা বলতে চাই। যেহেতু টিপাইমুখ
বাঁধবিরোধী একটা মনস্তত্ত্ব ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে আমাদের জাতীয় পর্যায়ে,
আমাকে এ জন্য বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত হাজির করতে হবে। আমাদের জানা আছে,
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে
যায় তার শতকরা ৮৭ ভাগ আসে সীমান্তের বাইরে থেকে। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের
অংশ ৫৫ শতাংশ, গঙ্গার অংশ ৩৬ শতাংশ, আর মেঘনার ভাগ ৯ শতাংশ, মেঘনার পানির
প্রবাহ তুলনামূলকভাবে কম হলেও বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য এটা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে যে পরিমাণ পানি উজান থেকে এসে মেঘনায় ‘লীন
হয়ে যায়’, তার ৩১ শতাংশ আসে মেঘালয় থেকে, ৫ শতাংশ আসে ত্রিপুরা থেকে এবং
১৬ শতাংশ আসে মণিপুর, মিজোরাম ও আসামে বিস্তৃত বরাক অববাহিকা থেকে। নাগাল্যান্ড-মণিপুর
সীমান্তে জাভো পর্বতের চূড়া থেকে নেমে আসা বরাক নদীর প্রবাহ ২৫০ কিলোমিটার
পেরিয়ে টিপাইমুখ নামের একটা গভীর উপত্যকায় এসে পৌঁছে। তারপর উত্তরে ৯০
কিলোমিটার অতিক্রম করে ফুলেরতল নামক স্থানে এসে আবার বাঁক নিয়ে পশ্চিম
দিকে কাছার জেলার ভেতর দিয়ে আরও দূরে অমলশিদে পৌঁছে। অমলশিদ হলো
আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম। এখানে বরাক দুই ভাগ হয়ে
বাংলাদেশের মধ্যে প্রবেশ করে। একটি কুশিয়ারা এবং অন্যটি সুরমা। এই দুটো
নদী আবার দিলালপুর নামক গ্রামে এসে একত্র হয়ে মেঘনা নামে দক্ষিণ দিকে
যাত্রা শুরু করে। টিপাইমুখ উপত্যকার গভীর খাদ এবং চারদিকের খাড়া
পাহাড়ের জন্য এটা জলাধারের পক্ষে একটা আদর্শ স্থান। প্রথম দিকে ভারত
সরকারের চিন্তা ছিল, কাছারের সমতলে সেচ সুবিধা দেওয়া এবং শিলচর শহরে পানীয়
জল সরবরাহের জন্য টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে বরাক থেকে পানি নিয়ে আসা। এর ফলে
টিপাইমুখের আশপাশে বন্যা সমস্যারও একটা সুরাহা হবে। কিন্তু দেখা গেল, এটা
হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল কাঠামো। শুরু হলো নতুন করে চিন্তাভাবনা।
প্রাক-সমীক্ষায় দেখা গেল এর চেয়ে কম উচ্চতায় বাঁধ তৈরি করে যদি জলবিদ্যুৎ
তৈরি করা যায়, তাহলে আর্থিক দিক থেকে তা লাভজনক হবে। ১৯৯২ সালের যৌথ
নদী কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী টিপাইমুখ বাঁধের উচ্চতা হবে ১৬১ মিটার এবং
দৈর্ঘ্য হবে ৩৯০ মিটার। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১৫০০ মেগাওয়াট।
জলাধারের ধারণক্ষমতা হবে ৯ ঘনকিলোমিটার। এখন দেখা যাক, এই বাঁধ তৈরি হলে
এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে এর ২২৫ কিলোমিটার ভাটিতে বাংলাদেশ
সীমান্তবর্তী অমলশিদ গ্রামে বরাকের পানিপ্রবাহে কী অভিঘাত হবে। টিপাইমুখে শুধু যদি জলবিদ্যুৎ তৈরি হয় এবং সেচের জন্য যদি পানি সরিয়ে না নেওয়া হয়, তাহলে অমলশিদে আমরা যে চিত্রটি পাব তা হলো: জুলাই মাসে সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহ ৪০ শতাংশ কমে যাবে। জুলাই মাসে নদীতে পানির উচ্চতা হ্রাস পাবে ২.৬ মিটার। বর্ষা মৌসুমে বন্যার প্রকোপ কমে যাবে ৩১ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন পানির প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়, তখন তা ৭১৩ কিউসেক (ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ডে) বেড়ে যাবে। ফেব্রুয়ারি মাসে নদীতে পানির উচ্চতা বাড়বে ৩ দশমিক ৫ মিটার। শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়বে ৯ ঘনকিলোমিটার। যদি
জলবিদ্যুৎ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে পানি প্রত্যাহার করে কাছার সেচ প্রকল্প চালু
করা হয়, সেজন্য ফুলেরতল গ্রামে একটা ব্যারাজ তৈরি করতে হবে। খনন করতে হবে
দুটো খাল, একটি ৮৯ কিলোমিটার ও অন্যটি ১১০ কিলোমিটার লম্বা। এই দুটো খাল
দিয়ে বরাকের পানি নিয়ে যাওয়া হবে এবং এর ফলে ১৬৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়
সেচ সুবিধা দেওয়া যাবে। বিদ্যুৎ এবং সেচ এই উভয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন হলে
অমলশিদে বরাকের পানিপ্রবাহে তার যে প্রতিক্রিয়া হবে তা হলো: জুলাই মাসে আগের মতোই ৪০ শতাংশ প্রবাহ হ্রাস পাবে। তবে ফেব্রুয়ারিতে যেখানে ৭১৩ কিউসেক পানিপ্রবাহ বাড়ার কথা ছিল, তা হ্রাস পেয়ে ৪০৫ কিউসেক বাড়বে। নদীতে পানির উচ্চতা বাড়বে ২ দশমিক ১ মিটার। শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়বে ৪ দশমিক ৯১ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ
বর্ষা মৌসুমে উভয় ক্ষেত্রে পানিপ্রবাহের মাত্রা একই রকম হ্রাস পাবে। সেচ
সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারটি যেহেতু শুকনো মৌসুমের, ওই সময় পানিপ্রবাহ যেটুকু
বাড়ার কথা তার চেয়ে কম বাড়বে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই শুকনো মৌসুমে অমলশিদ
হয়ে বাংলাদেশে বরাক নদী দিয়ে সুরমা ও কুশিয়ারায় পানিপ্রবাহ বাড়বে। এখন
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিবেশ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এখানে
বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে শতাধিক হাওর। বর্ষাকালে হাওরগুলো জলে টইটুম্বর
থাকে, কোনো ফসল হয় না। শীতকালে হাওরের পানি শুকিয়ে যায়, কৃষকেরা বোরো ধান
চাষ করেন। হাওর অঞ্চলের এখনকার প্রধান সমস্যা দুটো। আগাম বন্যা, যার ফলে
ফেব্রুয়ারি-মার্চে উঠতি ফসল মাঠেই তলিয়ে যায়। আর আছে দেরিতে পানি
নিষ্কাশন, যার ফলে বোরো ধান রোপণ করতে দেরি হয়ে যায় এবং তা আগাম বন্যার
ঝুঁকিতে পড়ে। বর্ষাকালে বরাক দিয়ে পানিপ্রবাহ হ্রাস পেলে এই দুটো সমস্যার
কারণে কৃষকেরা যে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, তা অনেকটা কমে যাবে। পক্ষান্তরে
শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়লে তা সেচের জন্য সুফল বয়ে আনবে। অর্থাৎ উভয়
মৌসুমেই বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের মানুষ লাভবান হবে। হাওর প্রতিবেশ যাঁরা
জানেন, তাঁরা এ বিষয়টি বুঝবেন। না বুঝলে বলতে হবে তাঁরা আসলে যা করছেন, তা
হলো ‘ভাবের ঘরে চুরি’। নদীর উজানে বাঁধ তৈরি ও জলাধার নির্মাণ করে
শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর প্রস্তাব আমাদের পানি বিশেষজ্ঞরা অনেক
বছর যাবৎ দিয়ে আসছেন। এ ধরনের জলাধার নেপাল কিংবা ভুটানে হলে আপত্তি নেই
কিন্তু ভারতে হলেই অনেকের আপত্তি। কারণ, ‘ভারত শত্রু রাষ্ট্র এবং তারা সব
সময় আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে।’ সুতরাং দাবি উঠেছে, টিপাইমুখ বাঁধ
তৈরি করা যাবে না। এটা হলো ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ’ করার মতো। আমার
প্রস্তাব অত্যন্ত স্পষ্ট। এ বাঁধ শুধু ভারতের তৈরি করাই উচিত নয়,
বাংলাদেশের উচিত ভারতকে চাপ দেওয়া, যাতে বাঁধটি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়। আর
বাংলাদেশ সরকারের উচিত ভারত সরকারের কাছে কো-ফাইনান্সিংয়ের সুনির্দিষ্ট
প্রস্তাব দেওয়া, যাতে আমরা ওখান থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ আনতে পারি। আমাদের
দেশের একশ্রেণীর রাজনীতিক, আমলা এবং বুদ্ধিজীবী ভারতের সঙ্গে শত্রু-শত্রু
খেলার ফলে প্রতারিত হচ্ছে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ। এখন মানুষকে সত্যটা
জানাতে হবে। কেউ কেউ আছেন সরাসরি বাঁধের বিরুদ্ধে বলেন না, কিন্তু
ভূমিকম্পের জুজুর ভয় দেখান। মানুষ এদের চালাকিটা ধরে ফেলছে। ভারতকেন্দ্রিক
আমাদের যে অপরাজনীতি, পারস্পরিক লেনদেন এবং সহযোগিতা বাড়লে এদের রাজনীতির
পুঁজি নিঃশেষিত হয়ে যাবে। তাই তাঁরা নানা রকম খোঁড়া যুক্তি তুলে এসব
প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন সচেতনভাবেই। আমাদের দেশে অনেকেই ড্যাম আর
ব্যারাজের পার্থক্য বোঝেন না। কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে মরুভূমিটা কোথায়
তৈরি হয়েছে, সেটা তাদের খুঁজে দেখার অনুরোধ করছি। আমি এই লেখায় যেসব
তথ্য উপস্থাপন করেছি, তা আমি কোথায় পেলাম এই প্রশ্ন উঠতে পারে। কানাডীয়
উন্নয়ন সংস্থার (সিডা) সাহায্যে বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে
একটি বিশেষ সমীক্ষা চালানো হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। প্রতিবেদনটি পানি উন্নয়ন
বোর্ডের অধীনে ফ্লাড প্ল্যান কো-অর্ডিনেশন অর্গানাইজেশন প্রকাশ করে ১৯৯৫
সালের জুন মাসে। ওই সময় এই অর্গানাইজেশনের প্রধান ছিলেন প্রকৌশলী এম এইচ
সিদ্দিকি বীর উত্তম। ওই সমীক্ষা ও প্রতিবেদন তৈরির কাজে যে কয়েকজন যুক্ত
ছিলেন, আমি ছিলাম তাদের একজন। এর চেয়ে মানসম্মত তথ্য ও উপাত্ত যদি আর কারও
কাছে থেকে থাকে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে আমাদের উচিত হবে, দ্রুত
একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। ইতিমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভারত এই বাঁধ
তৈরি করবেই। আমাদের কৌশল হওয়া উচিত এ থেকে আমরা কী সুবিধা নিতে পারব, সেই
চেষ্টা করা। বিরোধিতা করে এই বাঁধ তৈরি আমরা ঠেকাতে পারব না। আর বিরোধিতা
করবই বা কেন?
এ বিষয়ে ভিন্নমত এলে তাও প্রকাশ করা হবে। বি.স. মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক। mohi2005@gmail.com
সাদাসিধে কথা
টিপাইমুখ: একটি প্রতিক্রিয়া
মুহম্মদ জাফর ইকবাল | তারিখ: ০৫-০১-২০১২
১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদের জন্য নির্বাচনে
প্রার্থী হয়েছিলেন ক্লেটন উইলিয়ামস নামে এক ব্যক্তি। ভদ্রলোক নির্বাচনে
জিততে পারেননি, কিন্তু পৃথিবীর অনেক মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে তাঁর একটি
উক্তির জন্য। তিনি বলেছিলেন, ধর্ষণ থেকে যদি রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় না
থাকে, তাহলে চেষ্টা করা উচিত সেটা উপভোগ করা। (আমি যা-ই লিখি, ছোট
বাচ্চারা নাকি সেটা পড়ে ফেলে—তাই ওপরের কথাগুলো লিখতে খুব খারাপ লাগছে।)
ক্লেটন উইলিয়ামসের কথার মতো হুবহু একটা কথা ২৯ ডিসেম্বর ২০১১-এর প্রথম
আলোয় পড়েছি। টিপাইমুখ সম্পর্কে মহিউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, ‘ভারত এই বাঁধ
তৈরি করবেই, আমাদের কৌশল হওয়া উচিত এ থেকে আমরা কী সুবিধা নিতে পারব সেই
চেষ্টা করা।’ এর কিছুদিন আগে গওহর রিজভী পত্রিকায় একটা লেখা লিখেছিলেন।
সেই লেখাটিতে নানা রকম ভণিতা ছিল, দেশ, দেশের স্বার্থ—এই সব বড় বড় কথা ছিল
এবং পুরো লেখাটিতে পাঠকদের উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা যেন আবেগের বশবর্তী
হয়ে হঠকারী কাজকর্ম শুরু করে না দেয়। গওহর রিজভী সরকারের মানুষ, তাঁর
লেখাটি পড়ে আমরা সবাই সরকারের ভূমিকাটা কী হবে, তা আঁচ করতে পেরেছিলাম। আমি
নদী বিশেষজ্ঞ নই, পানি বিশেষজ্ঞ নই, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু আমার গত
৫৯ বছরের অভিজ্ঞতায় একটা জিনিস শিখেছি, সেটা হচ্ছে পৃথিবীর জটিল থেকে
জটিলতম বিষয়টিও কমন সেন্স দিয়ে প্রায় ৯০ ভাগ বুঝে ফেলা যায়। কাজেই
বাংলাদেশের মানুষ টিপাইমুখের বিষয়টি শতকরা ৯০ ভাগ শুধু কমন সেন্স দিয়ে
কিন্তু বুঝে ফেলেছে। বড় বড় বিশেষজ্ঞ কিউসেকের হিসাব, বর্ষা মৌসুম, শুষ্ক
মৌসুম, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে থাকুন,
আমরা সাধারণ মানুষ কিছু সাধারণ প্রশ্ন করি: আমরা কি প্রকৃতিকে
নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করব? একেবারে ছোট শিশুটিও
জানে পৃথিবীতে প্রযুক্তি এখনো প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জায়গায় পৌঁছায়নি,
কোনো ভূমিকম্প থামানো যায় না, কোনো ঘূর্ণিঝড় বন্ধ করা যায় না, পাহাড় থেকে
নেমে আসা পানির ঢল আটকানো যায় না। ঠিক সে রকম একটা নদীকে বন্ধ করা যায় না,
গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া যায় না। নির্বোধ মানুষ যে চেষ্টা করে না তা নয়,
পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই করা হয়েছে; কিন্তু সেটা মানুষের ওপর অভিশাপ হয়ে
নেমে এসেছে। ভবদহের কথা আমরা ভুলিনি, ফারাক্কা আমাদের চোখের সামনেই আছে।
কাজেই গওহর রিজভী কিংবা মহিউদ্দিন আহমেদের মতো বিশেষজ্ঞরা যতই বলুন ‘যত
তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাঁধ তৈরি করে’ বাংলাদেশকে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা
করে ফেলতে হবে আমি সেই কথা বিশ্বাস করি না। আমাদের দেশে কাপ্তাই বাঁধ দিয়ে
বিশাল এলাকা পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অসংখ্য অসহায় আদিবাসী মানুষকে
রাতারাতি গৃহহারা করা হয়েছিল। এখন সেই চেষ্টা করা হলে বাংলাদেশের মানুষ
কোনো দিন সেটা হতে দিত না, কোনো সরকারের সেই দুঃসাহস দেখানোর সাহস হতো না। কাজেই
বিশেষজ্ঞরা যতই বলতে থাকুন টিপাইমুখ বাঁধ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত শুভ
উদ্যোগ, আমি সেটা বিশ্বাস করি না। যারা প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, আসলে
তারা পৃথিবীর ভালো চায় না। তারা বাংলাদেশের মানুষ হোক, ভারত বা চীন যে
দেশেরই হোক, তাদের ধিক্কার দিতে হবে। তারা হচ্ছে পৃথিবীর দুর্বৃত্ত। গওহর
রিজভী এবং মহিউদ্দিন আহমেদ দুজনই টিপাইমুখ বাঁধের সুফল নিয়ে ভালো ভালো কথা
বলেছেন, তার বেশির ভাগ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা তর্ক-বিতর্ক করতে থাকুন। আমি শুধু
একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই, সেটা হচ্ছে বন্যা। তাঁরা দুজনেই দাবি করেছেন
এই বাঁধ দিয়ে বন্যার প্রকোপ কমানো যাবে। আমি সিলেটে থাকি, আমার
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুরমা নদীর দূরত্ব এক কিলোমিটারও নয়। আমি এখানে ১৭ বছর
ধরে আছি, শুধু একবার (২০০৪ সালে) সুরমা নদীর পানি উপচে এসেছিল, আমি তো আর
কখনো সুরমা নদীর পানিকে তীর ভেঙে আসতে দেখিনি! হাওর অঞ্চল তো প্রতিবছর
পানিতে ডুবে যায়, ডুবে যাওয়ারই কথা, সেটাই হচ্ছে এর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।
সেটা তো বন্যা নয়। তাহলে তাঁরা কোন বন্যাকে ঠেকানোর কথা বলছেন? যে বন্যার
অস্তিত্ব নেই, সেই বন্যার প্রকোপ থামানোর কথা বললে আমরা যদি বিশেষজ্ঞদের
দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাই কেউ আমাকে দোষ দিতে পারবে? এই বন্যা নিয়ে তাঁদের
বিশেষজ্ঞ মতামত আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়—ঠিক সে রকম তাঁদের অন্যান্য
বিশেষজ্ঞ মতামতও যে অর্থহীন নয়, সেই গ্যারান্টি আমাকে কে দেবে? মহিউদ্দিন
আহমেদ বলেছেন, ‘ভারত এই বাঁধ তৈরি করবেই’, তিনি তার বিরোধিতা করতেও রাজি
নন। কোনো রকম চেষ্টা না করে পরাজয় স্বীকার করার মধ্যে কোনো গৌরব নেই।
টিপাইমুখ বাঁধ বন্ধ করার চেষ্টাকে এ মুহূর্তে তাঁর কাছে এবং সম্ভবত আরও
অনেকের কাছে খুব কঠিন কাজ মনে হচ্ছে। সারা দেশে টিপাইমুখের বিরুদ্ধে একটা
আন্দোলন গড়ে তোলা এই মানুষগুলোর কাছে একটা অযৌক্তিক এবং অসম্ভব কাজ বলে
মনে হচ্ছে। কাজেই তাঁরা এর জন্য চেষ্টা করতেও রাজি নন। তাঁদের সবাইকে
মনে করিয়ে দেওয়া যায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন এই
দেশে গণহত্যা শুরু করেছিল তখন কোনো মানুষ যদি যুক্তিতর্ক দিয়ে বিবেচনা করত
তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা একটা
পুরোপুরি অবাস্তব বিষয়। মার্চ মাসে শুরু করে মে মাসের মাঝামাঝি পুরো দেশটা
পাকিস্তান সেনাবাহিনী দখল করে নিয়েছিল। এখন যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে
বিচার করা হচ্ছে তারা সেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদলেহী অনুচর। মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো দেশ পাকিস্তানের পক্ষে, পৃথিবীর মুসলমান
দেশগুলোও পাকিস্তানের পক্ষে, এক কোটি মানুষ দেশছাড়া, যারা দেশে আছে তাদের
বাড়িঘর পুড়িয়ে, খুন করে সারা দেশে হাহাকার। দেশের কিছু কম বয়সী ছেলেমেয়ে
মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়েছে, তাদের হাতে অস্ত্র নেই, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই,
পেশাদার বাহিনী বিশৃঙ্খল, যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন তাঁদের মধ্যেও কোন্দল—এ রকম
একটা পরিবেশ দিয়ে শুরু করে আমরা স্বাধীন একটা দেশ ছিনিয়ে আনতে পারব সেটা
কি কেউ কল্পনা করেছিল? করেনি। কিন্তু তার পরও এই দেশের মানুষ দেশপ্রেমের
যুক্তিহীন আবেগকে মূলধন করে এই দেশকে স্বাধীন করে ছেড়েছিল। কাজেই যাঁরা
এই দেশের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাঁরা এই দেশের মানুষের ‘যুক্তিহীন’ আবেগকে
খাটো করে দেখবেন না। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না, তার সঙ্গে সহাবস্থান
করতে হয়। টিপাইমুখের বেলায়ও হুবহু একই কথা বলা যায়—দেশের মানুষের আবেগকে
নিয়ন্ত্রণ করার বৃথা চেষ্টা করবেন না, তাদের সঙ্গে সহাবস্থান করুন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রতিক্রিয়া
‘জরুরি টিপাইমুখে কীটপতঙ্গের দাঙ্গা’
নাহরীন আই খান | তারিখ: ০৭-০১-২০১২
বাঙালি আত্মঘাতী জাতি কি না জানি না, তবে তার রসবোধ প্রবল, তার প্রমাণ
পেলাম ২৯ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে জনাব মহিউদ্দিন আহমদ সাহেবের লেখা পড়ে।
ওনার রসবোধসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক (!) লেখাটির একটা উত্তর দিতে চাই। আপনি
বলেছেন, এই বাঁধ ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু জানেন কি, এই
বাঁধের লোড ফ্যাক্টর ২৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। যার অর্থ হলো সারা বছর বাঁধের
সর্বোচ্চ ক্ষমতার (১৫০০ মেগাওয়াট) মাত্র ২৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ বা ৪০১ দশমিক
২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। সারা বছর ১২ শতাংশ বিনা মূল্যের বিদ্যুৎ
যদি উত্তরাঞ্চলের অস্থিতিশীল জনগোষ্ঠীকে শান্ত অথবা সমগ্র
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামরিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়, তবে সেটাই
কি ভারতের জন্য লাভজনক হবে না? আর যেখানে নিজেদের চাহিদাই পূরণ করতে পারবে
না, ভারত সেখানে আমাদের ‘সমতাভিত্তিক অংশীদারি’ প্রসঙ্গটাই কি হাস্যকর নয়? ৩.
আপনার রিভার-মরফোলজিক্যাল বর্ণনায় বুঝতে পারলাম না, নদীর গতিপথের বর্ণনা
দিয়ে কী বোঝাতে চাইছেন। না বুঝে যা বুঝলাম তা হলো, যেটুকু পানি এই বরাক
অববাহিকা দিয়ে আসে তা আমাদের পানি, আর আমাদের পানির এই প্রাকৃতিক প্রবাহের
ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, তাই না? আপনার সূত্রহীন উপাত্তের উৎস
হচ্ছে ফ্লাড অ্যাকশন প্লানের (FAP) রিপোর্ট। নব্বইয়ের দশকের এই ফ্যাপ
রিপোর্টগুলো ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ড. আইনুন নিশাত, যিনি সরাসরি এই
প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তিনি স্বীকার করেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই এই
রিপোর্টের তথ্য/ফলাফল ধারণাপ্রসূত; যা কিনা জনাব মহিউদ্দিন ব্যতীত সবারই
জানা। এ রকম একটা বিতর্কিত রিপোর্টকে ভিত্তি করে সব গবেষক, সুশীল সমাজ বা
আপামর জাতিকে পঙ্গপাল বলাটা কতটা যৌক্তিক, তা বুঝলাম না। আর এই রিপোর্টকে
যদি বিবেচনায় আনিও, তাহলে ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান ৬ (FAP6)-এর ১৯৯২-৯৪
সালের গবেষণায় এই বাঁধ ভেঙে গেলে কীভাবে/কী পরিমাণ বা কতটা সময়ের মধ্যে
পানি আমাদের এখানে প্রবেশ করবে, তার একটি হিসাব দেখানো হয়; যা আমি পাঠকদের
জন্য তুলে দিলাম। সাধারণত বন্যার পানি ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার গতিবেগে
প্রবাহিত হয়, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগেও প্রবাহিত
হতে দেখা যায়। গবেষণায় ১০ কিলোমিটার গতিবেগের হিসাবে বাঁধ থেকে ৮০
কিলোমিটার দূরের পার্বত্য উপত্যকা, ১৪০ কিলোমিটার দূরের শিলচর এবং ২০০
কিলোমিটার দূরের অমলশিদ এলাকায় (অমলশিদ হলো আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী
একটি গ্রাম। এখানে বরাক দুই ভাগ হয়ে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবেশ করে) পানি
পৌঁছার সময়ের একটা হিসাব কষা হয়। দেখা যায়, বাঁধ থেকে পানি অমলশিদ পৌঁছাতে
পৌঁছাতে স্রোতের বেগ কমে এলেও ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বাঁধের পানি
মোটামুটি পাঁচ মিটার উচ্চতা নিয়ে হাজির হবে এবং ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পানি
তার সর্বোচ্চ উচ্চতা ২৫ মিটারের পৌঁছাবে, যা প্লাবনভূমির উচ্চতার চেয়ে আট
মিটার বেশি উঁচু। ফলে প্লাবনভূমিকে আট মিটার পানির নিচে তলিয়ে রাখবে ১০
দিন বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে! এখন আপনার উল্লিখিত গবেষণার এই দিকটি কেন
এড়িয়ে গেলেন? আপনি বলেছেন ‘ভূমিকম্পের জুজুর ভয়’। বাঁধের কারণে সংঘটিত
সবচেয়ে তীব্র ভূমিকম্পটি ১৯৬৭ সালে কোথায় হয়েছিল? বরাক অববাহিকায় ২০০ বছরে
৫ মাত্রা কয়টি বা গত ১৫০ বছরের টিপাইমুখের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের
মধ্যে ৭+ মাত্রার কয়টি ভূমিকম্প হয়েছে, দয়া করে জেনে নেবেন। ৪. আপনি
নিশ্চয়ই বোঝেন ইকো সিস্টেমের স্বতন্ত্রতা। হাওর এলাকার ভূমিরূপ, ফসল
ফলানোর সময়-অসময় সম্পূর্ণভাবে এই প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল।
প্রতিটি ইকো সিস্টেমের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, যা অন্যটি থেকে ভিন্ন। আপনি
যে পানি বাড়া-কমার হিসাব দেখাচ্ছেন, তা ওই বিতর্কিত ফ্যাপ রিপোর্টের, যা
কিনা এক যুগের বেশি সময়ের পুরোনো। আপনি জানেন আশা করি, টিপাইমুখের পুরো
জলাধার ভরাট হতে লাগবে ১৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি, যার আট বিলিয়ন কিউবিক
মিটার পানি থাকবে pondage বা dead storage-এ, যা বাঁধের পেছনে জমা রাখা হয়
(টারবাইনের ঘূর্ণন সচল রাখার জন্য)। জলাধার পুরো ভরে গেলে ভারত অবশ্যই
পানি ছাড়বে। কিন্তু বাংলাদেশ এমনকি ভারতের কেউ কি জানেন, কী পরিমাণ পানি
প্রতিদিন ছাড়া হবে? ভারত কি এই water release schedule বাংলাদেশের সঙ্গে
মিলেমিশে করবে? ৫. কো-ফাইন্যান্সিংয়ের কথা বলছেন? যারা কিনা ২২ অক্টোবর
২০১১ আমাদের না জানিয়ে একটি আন্তর্জাতিক নদীর বাঁধের চুক্তি করল, তাদের
সঙ্গে! এ কেমন ‘যৌথ’তা? গঙ্গা চুক্তির অনুচ্ছেদ ৯-এর এই চরম লঙ্ঘন দেখে
আমরা পতঙ্গরা আতঙ্কিত হই। কীভাবে এত বলিষ্ঠভাবে বলছেন বাংলাদেশের লাভের
কথা? ডিসেম্বর ৩, ২০১১এ ভারত সরকার তার পরিবেশছাড়পত্র জারি করেছে। কিন্তু
বাংলাদেশে তো কোনো পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (EPA) হয়নি। সম্পূর্ণ
অবৈজ্ঞানিকভাবে ‘বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না’—এই আশ্বাস দিয়ে ভারত ৪০
মিলিয়ন হাওরবাসীর জীবনকে যে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন, তাকে কেন যে আপনি বা
আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবৈজ্ঞানিক ভাবছেন না, তা বুঝলাম না! ৬.
ভারত শুধু টিপাইমুখেই নয়, বরাকের ওপর আরও চারটি, ব্রহ্মপুত্রের ওপর ১২টি
ড্যাম নির্মাণ করবে এবং আমাদের ন্যায্য পানি বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই
বাইপাস করে গঙ্গা, মহানদী হয়ে ভারতের অন্যান্য জায়গায় প্রবাহিত করার মেগা
প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। তখন শুধু মেঘনাই নয়, ব্রহ্মপুত্রও অবরুদ্ধ হয়ে
পড়বে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের water management-এর অধ্যাপক বিজয়
পারাঞ্জেপি এই মেগা প্রজেক্ট পর্যালোচনা করে বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনারা
ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, কারণ আপনারা উচ্ছেদ হবেন না। আপনারা বন্যায় ভেসেও
যাবেন না, সত্যি। কিন্তু আপনারা শুকিয়ে যাবেন। কারণ, ব্রহ্মপুত্রের বাড়তি
সব পানি বাংলাদেশকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে।’ (পাঠক, সময় পেলে লিংকটি দেখুন):
http://www.facebook.com/photo.php?v=2166037388845)। মহিউদ্দিন সাহেব,
বিজয় পারাঞ্জেপি কি পতঙ্গ, তিনি কি আমাদের মতো দাঙ্গাপ্রিয় জনতা, বলবেন কি? সংযুক্তি:
১৯৬৭ ভারতের মহারাষ্ট্রে কোয়েনা বাঁধের কারণে (৬ দশমিক ৩ মাত্রার)
ভূমিকম্প তার কেন্দ্র থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরেও তীব্র আঘাত হেনেছিল। বরাক
অববাহিকার অসংখ্য fault line-এর জন্য সমগ্র এলাকায় গত ২০০ বছরে ৫ মাত্রা
বা তারও বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ১০০টিরও বেশি। গত ১৫০ বছরের
টিপাইমুখের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ২টি ৭+ মাত্রার ভূমিকম্প
হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৫৭ সালের ভূমিকম্পটি ছিল প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ
থেকে মাত্র ৭৫ কিলোমিটার দূরে। নাহরীন আই খান: জার্মানিতে অধ্যয়নরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
মাঝেমধ্যে শোনা যায় পেঙ্গুইনরা দলবদ্ধভাবে আত্মহত্যা করে। কেন করে, জানি
না। জাতি হিসেবে বাঙালিও আত্মহত্যাপ্রবণ। আত্মঘাতী বাঙালি নামে আমার প্রিয়
লেখক নীরদ চৌধুরীর একটি বই আছে। শিরোনামটির সঙ্গে আমি একমত। ইতিহাসের
বিভিন্ন পর্বে আমরা বুঝে না-বুঝে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিই, যা আত্মহত্যার
শামিল। তেমনি একটি বিষয় নিয়ে আজ লিখব।
আমরা জানি, রাজনীতিবিদেরা অনেক
সময় অনেক কিছু বলে থাকেন, যার পেছনে যুক্তি থাকে না। কী বললে মানুষ খুশি
হবে, হাততালি দেবে, তা তাঁরা বুঝে নিতে কসুর করেন না। আর কিছু কিছু মানুষ
আছে, যারা ওই সব কথা শুনতে পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ‘জনতা’ শব্দটির একটি
ইতিবাচক তাৎপর্য থাকলেও এ ধরনের ঝাঁপিয়ে পড়া মানুষকে ‘ক্রাউড’ হিসেবে দেখা
হয়। এই ক্রাউড কখনো-সখনো দাঙ্গা বাধাতে পারে, কিন্তু ইতিহাস তৈরি করতে
পারে না। আমরা এখন এই ক্রাউড কালচারে আক্রান্ত। আজকের লেখার বিষয় হলো
টিপাইমুখ বাঁধ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রাউড মনস্তত্ত্ব।
বছর তিনেক
আগে অঙ্গীকার বাংলদেশ নামে একটি এনজিও এবং আসামের রিভার বেসিন ফ্রেন্ডস
নামের অনুরূপ আরেকটি এনজিও যৌথভাবে টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে ঢাকায় একটি
সেমিনারের আয়োজন করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল এই বাঁধ বাস্তবায়িত হলে
বাংলাদেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। দুটো এনজিওর কর্তাব্যক্তিদের ব্যক্তিগতভাবে
আমি চিনি। তাঁরা ভালো মানুষ, এককালে বাম রাজনীতি করতেন। ওই সেমিনারে আমি
বলেছিলাম, এই বাঁধ তৈরি হলে মণিপুরের অনেক পরিবার উদ্বাস্তু হবে, তাদের
জীবনযাত্রা তছনছ হয়ে যাবে, পরিবেশের প্রচণ্ড ক্ষতি হবে। কিন্তু বাংলাদেশের
ক্ষতি হবে, এ কথাটা বেঠিক। বরং বাংলাদেশ লাভবান হবে। মণিপুরের মানুষ এই
বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে, প্রতিরোধ গড়ে তুললে তার প্রতি আমি সংহতি
জানাব। কিন্তু তাদের পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে যদি এই বাঁধ তৈরি
করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের উচিত হবে তার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা। আমি এও
বলেছিলাম, আপনারা এই ইস্যুটি তুলে এ দেশের ধর্মান্ধ রাজনৈতিক অপশক্তির
হাতে একটি মারাত্মক অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন। আজ আমার আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত
হয়েছে। এই রাজনৈতিক অপশক্তির সঙ্গে জোট বেঁধেছে কিছু নির্বোধ অথবা চতুর
‘সুশীল’, যাঁরা একসঙ্গে রা তুলছেন, টিপাইমুখ বাঁধ তৈরি হলে বাংলাদেশ
মরুভূমি হয়ে যাবে, বাংলাদেশ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি। আমি যেহেতু এই
বাঁধের পক্ষে, তাই এই বিষয়ে দু-একটা কথা বলতে চাই। যেহেতু টিপাইমুখ
বাঁধবিরোধী একটা মনস্তত্ত্ব ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে আমাদের জাতীয় পর্যায়ে,
আমাকে এ জন্য বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত হাজির করতে হবে।
আমাদের জানা আছে,
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে
যায় তার শতকরা ৮৭ ভাগ আসে সীমান্তের বাইরে থেকে। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের
অংশ ৫৫ শতাংশ, গঙ্গার অংশ ৩৬ শতাংশ, আর মেঘনার ভাগ ৯ শতাংশ, মেঘনার পানির
প্রবাহ তুলনামূলকভাবে কম হলেও বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য এটা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে যে পরিমাণ পানি উজান থেকে এসে মেঘনায় ‘লীন
হয়ে যায়’, তার ৩১ শতাংশ আসে মেঘালয় থেকে, ৫ শতাংশ আসে ত্রিপুরা থেকে এবং
১৬ শতাংশ আসে মণিপুর, মিজোরাম ও আসামে বিস্তৃত বরাক অববাহিকা থেকে।
নাগাল্যান্ড-মণিপুর
সীমান্তে জাভো পর্বতের চূড়া থেকে নেমে আসা বরাক নদীর প্রবাহ ২৫০ কিলোমিটার
পেরিয়ে টিপাইমুখ নামের একটা গভীর উপত্যকায় এসে পৌঁছে। তারপর উত্তরে ৯০
কিলোমিটার অতিক্রম করে ফুলেরতল নামক স্থানে এসে আবার বাঁক নিয়ে পশ্চিম
দিকে কাছার জেলার ভেতর দিয়ে আরও দূরে অমলশিদে পৌঁছে। অমলশিদ হলো
আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম। এখানে বরাক দুই ভাগ হয়ে
বাংলাদেশের মধ্যে প্রবেশ করে। একটি কুশিয়ারা এবং অন্যটি সুরমা। এই দুটো
নদী আবার দিলালপুর নামক গ্রামে এসে একত্র হয়ে মেঘনা নামে দক্ষিণ দিকে
যাত্রা শুরু করে।
টিপাইমুখ উপত্যকার গভীর খাদ এবং চারদিকের খাড়া
পাহাড়ের জন্য এটা জলাধারের পক্ষে একটা আদর্শ স্থান। প্রথম দিকে ভারত
সরকারের চিন্তা ছিল, কাছারের সমতলে সেচ সুবিধা দেওয়া এবং শিলচর শহরে পানীয়
জল সরবরাহের জন্য টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে বরাক থেকে পানি নিয়ে আসা। এর ফলে
টিপাইমুখের আশপাশে বন্যা সমস্যারও একটা সুরাহা হবে। কিন্তু দেখা গেল, এটা
হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল কাঠামো। শুরু হলো নতুন করে চিন্তাভাবনা।
প্রাক-সমীক্ষায় দেখা গেল এর চেয়ে কম উচ্চতায় বাঁধ তৈরি করে যদি জলবিদ্যুৎ
তৈরি করা যায়, তাহলে আর্থিক দিক থেকে তা লাভজনক হবে।
১৯৯২ সালের যৌথ
নদী কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী টিপাইমুখ বাঁধের উচ্চতা হবে ১৬১ মিটার এবং
দৈর্ঘ্য হবে ৩৯০ মিটার। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১৫০০ মেগাওয়াট।
জলাধারের ধারণক্ষমতা হবে ৯ ঘনকিলোমিটার। এখন দেখা যাক, এই বাঁধ তৈরি হলে
এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে এর ২২৫ কিলোমিটার ভাটিতে বাংলাদেশ
সীমান্তবর্তী অমলশিদ গ্রামে বরাকের পানিপ্রবাহে কী অভিঘাত হবে।
টিপাইমুখে শুধু যদি জলবিদ্যুৎ তৈরি হয় এবং সেচের জন্য যদি পানি সরিয়ে না নেওয়া হয়, তাহলে অমলশিদে আমরা যে চিত্রটি পাব তা হলো:
জুলাই মাসে সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহ ৪০ শতাংশ কমে যাবে।
জুলাই মাসে নদীতে পানির উচ্চতা হ্রাস পাবে ২.৬ মিটার।
বর্ষা মৌসুমে বন্যার প্রকোপ কমে যাবে ৩১ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন পানির প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়, তখন তা ৭১৩ কিউসেক (ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ডে) বেড়ে যাবে।
ফেব্রুয়ারি মাসে নদীতে পানির উচ্চতা বাড়বে ৩ দশমিক ৫ মিটার।
শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়বে ৯ ঘনকিলোমিটার।
যদি
জলবিদ্যুৎ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে পানি প্রত্যাহার করে কাছার সেচ প্রকল্প চালু
করা হয়, সেজন্য ফুলেরতল গ্রামে একটা ব্যারাজ তৈরি করতে হবে। খনন করতে হবে
দুটো খাল, একটি ৮৯ কিলোমিটার ও অন্যটি ১১০ কিলোমিটার লম্বা। এই দুটো খাল
দিয়ে বরাকের পানি নিয়ে যাওয়া হবে এবং এর ফলে ১৬৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়
সেচ সুবিধা দেওয়া যাবে। বিদ্যুৎ এবং সেচ এই উভয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন হলে
অমলশিদে বরাকের পানিপ্রবাহে তার যে প্রতিক্রিয়া হবে তা হলো:
জুলাই মাসে আগের মতোই ৪০ শতাংশ প্রবাহ হ্রাস পাবে।
তবে ফেব্রুয়ারিতে যেখানে ৭১৩ কিউসেক পানিপ্রবাহ বাড়ার কথা ছিল, তা হ্রাস পেয়ে ৪০৫ কিউসেক বাড়বে।
নদীতে পানির উচ্চতা বাড়বে ২ দশমিক ১ মিটার।
শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়বে ৪ দশমিক ৯১ বর্গকিলোমিটার।
অর্থাৎ
বর্ষা মৌসুমে উভয় ক্ষেত্রে পানিপ্রবাহের মাত্রা একই রকম হ্রাস পাবে। সেচ
সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারটি যেহেতু শুকনো মৌসুমের, ওই সময় পানিপ্রবাহ যেটুকু
বাড়ার কথা তার চেয়ে কম বাড়বে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই শুকনো মৌসুমে অমলশিদ
হয়ে বাংলাদেশে বরাক নদী দিয়ে সুরমা ও কুশিয়ারায় পানিপ্রবাহ বাড়বে।
এখন
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিবেশ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এখানে
বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে শতাধিক হাওর। বর্ষাকালে হাওরগুলো জলে টইটুম্বর
থাকে, কোনো ফসল হয় না। শীতকালে হাওরের পানি শুকিয়ে যায়, কৃষকেরা বোরো ধান
চাষ করেন। হাওর অঞ্চলের এখনকার প্রধান সমস্যা দুটো। আগাম বন্যা, যার ফলে
ফেব্রুয়ারি-মার্চে উঠতি ফসল মাঠেই তলিয়ে যায়। আর আছে দেরিতে পানি
নিষ্কাশন, যার ফলে বোরো ধান রোপণ করতে দেরি হয়ে যায় এবং তা আগাম বন্যার
ঝুঁকিতে পড়ে। বর্ষাকালে বরাক দিয়ে পানিপ্রবাহ হ্রাস পেলে এই দুটো সমস্যার
কারণে কৃষকেরা যে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, তা অনেকটা কমে যাবে। পক্ষান্তরে
শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়লে তা সেচের জন্য সুফল বয়ে আনবে। অর্থাৎ উভয়
মৌসুমেই বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের মানুষ লাভবান হবে। হাওর প্রতিবেশ যাঁরা
জানেন, তাঁরা এ বিষয়টি বুঝবেন। না বুঝলে বলতে হবে তাঁরা আসলে যা করছেন, তা
হলো ‘ভাবের ঘরে চুরি’।
নদীর উজানে বাঁধ তৈরি ও জলাধার নির্মাণ করে
শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর প্রস্তাব আমাদের পানি বিশেষজ্ঞরা অনেক
বছর যাবৎ দিয়ে আসছেন। এ ধরনের জলাধার নেপাল কিংবা ভুটানে হলে আপত্তি নেই
কিন্তু ভারতে হলেই অনেকের আপত্তি। কারণ, ‘ভারত শত্রু রাষ্ট্র এবং তারা সব
সময় আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে।’ সুতরাং দাবি উঠেছে, টিপাইমুখ বাঁধ
তৈরি করা যাবে না। এটা হলো ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ’ করার মতো।
আমার
প্রস্তাব অত্যন্ত স্পষ্ট। এ বাঁধ শুধু ভারতের তৈরি করাই উচিত নয়,
বাংলাদেশের উচিত ভারতকে চাপ দেওয়া, যাতে বাঁধটি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়। আর
বাংলাদেশ সরকারের উচিত ভারত সরকারের কাছে কো-ফাইনান্সিংয়ের সুনির্দিষ্ট
প্রস্তাব দেওয়া, যাতে আমরা ওখান থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ আনতে পারি।
আমাদের
দেশের একশ্রেণীর রাজনীতিক, আমলা এবং বুদ্ধিজীবী ভারতের সঙ্গে শত্রু-শত্রু
খেলার ফলে প্রতারিত হচ্ছে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ। এখন মানুষকে সত্যটা
জানাতে হবে। কেউ কেউ আছেন সরাসরি বাঁধের বিরুদ্ধে বলেন না, কিন্তু
ভূমিকম্পের জুজুর ভয় দেখান। মানুষ এদের চালাকিটা ধরে ফেলছে। ভারতকেন্দ্রিক
আমাদের যে অপরাজনীতি, পারস্পরিক লেনদেন এবং সহযোগিতা বাড়লে এদের রাজনীতির
পুঁজি নিঃশেষিত হয়ে যাবে। তাই তাঁরা নানা রকম খোঁড়া যুক্তি তুলে এসব
প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন সচেতনভাবেই।
আমাদের দেশে অনেকেই ড্যাম আর
ব্যারাজের পার্থক্য বোঝেন না। কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে মরুভূমিটা কোথায়
তৈরি হয়েছে, সেটা তাদের খুঁজে দেখার অনুরোধ করছি।
আমি এই লেখায় যেসব
তথ্য উপস্থাপন করেছি, তা আমি কোথায় পেলাম এই প্রশ্ন উঠতে পারে। কানাডীয়
উন্নয়ন সংস্থার (সিডা) সাহায্যে বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে
একটি বিশেষ সমীক্ষা চালানো হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। প্রতিবেদনটি পানি উন্নয়ন
বোর্ডের অধীনে ফ্লাড প্ল্যান কো-অর্ডিনেশন অর্গানাইজেশন প্রকাশ করে ১৯৯৫
সালের জুন মাসে। ওই সময় এই অর্গানাইজেশনের প্রধান ছিলেন প্রকৌশলী এম এইচ
সিদ্দিকি বীর উত্তম। ওই সমীক্ষা ও প্রতিবেদন তৈরির কাজে যে কয়েকজন যুক্ত
ছিলেন, আমি ছিলাম তাদের একজন। এর চেয়ে মানসম্মত তথ্য ও উপাত্ত যদি আর কারও
কাছে থেকে থাকে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে আমাদের উচিত হবে, দ্রুত
একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। ইতিমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ভারত এই বাঁধ
তৈরি করবেই। আমাদের কৌশল হওয়া উচিত এ থেকে আমরা কী সুবিধা নিতে পারব, সেই
চেষ্টা করা। বিরোধিতা করে এই বাঁধ তৈরি আমরা ঠেকাতে পারব না। আর বিরোধিতা
করবই বা কেন?
এ বিষয়ে ভিন্নমত এলে তাও প্রকাশ করা হবে। বি.স.
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com
‘ফারাক্কা থেকে টিপাইমুখ : বাংলাদেশের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিলে আলোচকরা
বলেছেন, টিপাইমুখ, ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা ব্যারেজ, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ
প্রকল্প—সবই বাংলাদেশের স্বার্থপরিপন্থী। ফলে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে
পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একমাত্র ঐক্যবদ্ধ
জাতিই এই বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে।
মুক্তি আন্দোলন নামে একটি পাঠচক্র গতকাল প্রেস ক্লাব যশোর মিলনায়তনে এই
গোলটেবিলের আয়োজন করে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মুক্তি আন্দোলনের
মুখপাত্র লেখক, গবেষক বেনজীন খান। আলোচনায় অংশ নেন যশোর সরকারি সিটি
কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক নার্গিস বেগম, নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের
সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ আবদুস সবুর, যশোর জেলা বিএনপির সেক্রেটারি
অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, যশোর পৌরসভার মেয়র মারুফুল ইসলাম,
ন্যাপের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক, সরকারি মাইকেল
মধুসূদন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল হোসেন, দৈনিক প্রভাতফেরী
সম্পাদক ফকির শওকত, জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সহিদুল আলম সদু, যশোর
ইনস্টিটিউটের সহকারী সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ তোতা, লেখক মুস্তাফিজুর
রহমান কাবুল, প্রেস ক্লাব সম্পাদক আহসান কবীর, পাকশিয়া আইডিয়াল কলেজের
সহকারী অধ্যাপক শেখ মফিদুল ইসলাম, মহিলা কলেজের শিক্ষক এরফানুল হক শোয়েব,
ডা. আবদুর রাজ্জাক কলেজের শিক্ষক জুলফিকার আলী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে
সভাপতিত্ব করেন মুক্তি আন্দোলনের সদস্য ফজলে রাব্বী মোপাসা। সঞ্চালক ছিলেন
একই সংগঠনের সদস্য মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু।
গোলটেবিলে অধ্যাপক নার্গিস বেগম বলেন, ছোট রাষ্ট্র হলেও আমরা মর্যাদা নিয়ে
বেঁচে থাকতে চাই। বন্ধুত্বের ছদ্মাবরণে ভারত আমাদের মর্যাদা, স্বার্থ
লুণ্ঠন করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে আমাদের জাতীয় নেতৃত্বের
বিচক্ষণতার অভাব অথবা ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ অথবা অন্য কোনো দেশের প্রতি
আনুগত্যের কারণে ফারাক্কাসৃষ্ট দুর্দশা ভোগ করছি। তিনি বলেন,
ব্রহ্মপুত্রের উত্সমুখে চীন বাঁধ নির্মাণ করতে চাইছে। চীনের কাছ থেকে ভারত
যে আচরণ আশা করে আমরাও ভারতের কাছ থেকে একই আচরণ আশা করি।
অ্যাডভোকেট শেখ আবদুস সবুর বলেন, ফারাক্কা-টিপাইমুখ সমস্যা সমাধানে জাতীয়
ঐকমত্য দরকার। তিনি বলেন, অভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারত যে স্বস্তিতে থাকবে
এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এখানকার মানুষ কাজের
জন্য ভারতের শহরগুলোতেই ভিড় জমাবে। কোনো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে, গুলি করে
জনস্রোত ঠেকানো যাবে না। তিনি ভারতের সমপ্রসারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা
করে বলেন, জুজুর ভয়ে ঘরে বসে না থেকে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী তত্পরতার
বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে।
অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ফারাক্কায় পরীক্ষামূলক বাঁধ চালুর
সময়ও ভারত একই রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ফারাক্কার কারণে দেশের
একাংশ মরুভূমি হতে চলেছে। সে কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের
বক্তব্যে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। টিপাইমুখ ইস্যুতে বিরোধীদলীয় নেত্রীর
উদ্যোগের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের তীব্র সমালোচনা করে
বলেন, সরকার টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি বলেই
বিরোধী নেত্রী উদ্যোগী হয়েছেন। সরকারের উচিত বরং তাকে সহযোগিতা করা।
মারুফুল ইসলাম বলেন, আমাদের রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগে ভারত একের পর এক
অভিন্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে চলেছে। সামাজিক আন্দোলন বেগবান করে
প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। না হলে ভারত টিপাইমুখ বাঁধ করেই ছাড়বে।
প্রফেসর আবুল হোসেন বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মণিপুর রাজ্য সরকারের
সঙ্গে টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে কথা বলে। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের
সঙ্গে কোনো কথা বলে না। এটি কীভাবে সম্ভব? আমাদের পররাষ্ট্র নীতির
দুর্বলতার কারণে ভারত এমন একতরফা কাজ করতে পারছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ফকির শওকত বলেন, টিপাইমুখে বাঁধ হলে যশোরবাসীর প্রত্যক্ষ কোনো ক্ষতি হবে
না। কিন্তু ফারাক্কার ক্ষতির ধরন কী, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলবাসী তা
হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। সে কারণে ভারত আরেকটি ফারাক্কা যাতে গড়তে না পারে
সে ব্যাপারে দক্ষিণ-পশ্চিমের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থেকে লড়াই-সংগ্রাম করবে।
সহিদুল আলম সদু বলেন, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নদী নিয়ে আলোচনা
হয়। তাহলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে পানি নিয়ে আলোচনা হবে না কেন? তিনি বলেন,
বাংলাদেশ সরকারের দিল্লিপ্রীতি বেড়েছে—যা জাতির জন্য সুখকর নয়। জাতীয়
ইস্যুতে বিভেদের সুযোগ নেই। জাতীয় স্বার্থে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে
হবে।
আবু সালেহ তোতা বলেন, পরিবেশের ওপর মানুষ হস্তক্ষেপ করলে তার নেতিবাচক
প্রতিক্রিয়া হবেই। ভারত যা করছে, তা নিজের স্বার্থেই। কিন্তু আমরা কী
করছি? আমরা দেশটাকে বিকিয়ে দিয়েছি। ব্যক্তি স্বার্থে জাতীয় স্বার্থ
বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করছি না।
মুস্তাফিজুর রহমান কাবুল বলেন, উজানে বাঁধ দেয়া হলে ভাটিতে কী হয়, তা আমরা
জানি। তিনি টিপাইমুখসহ ভারতের সব প্রকৃতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে
ভারত-বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি
বলেন, আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানে দ্বিপক্ষীয় নয়,
বহুপক্ষীয় আলোচনা দরকার। বাংলাদেশ-ভারত পানি সমস্যা সমাধানে প্রতিবেশী
চীন, নেপাল প্রভৃতি রাষ্ট্রকে যুক্ত করতে হবে।
আহসান কবীর বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে যে বাংলাদেশের একাংশ মরুভূমিতে
পরিণত হবে মওলানা ভাসানী তা ৩৫-৪০ বছর আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। আমাদের
রাষ্ট্রনায়করা তা এখনও বুঝতে পারেন না বা বুঝতে চান না। তিনি বলেন, ভারত
যে টিপাইমুখে বাঁধ করবেই—এ কথা বাংলাদেশ সরকার অনেক আগেই জানত। কিন্তু
জাতিকে তা জানতে দেয়নি। তাদের ভারত-তোষণ নীতির ফল ভোগ করছে বাংলাদেশের
সাধারণ মানুষ। তিনি তিস্তা সেচ প্রকল্প, জিকে প্রজেক্ট, সুন্দরবন,
দক্ষিণ-পশ্চিমে মরুকরণসহ নানা ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ
চালু হলে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিণতিও হবে এমনই।
এরফানুল হক শোয়েব বলেন, আমাদের সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক। এই নদীগুলোকে একের পর
এক মেরে ফেলছে ভারত। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুখের
কথার কোনো মূল্য নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মুখে মুখে যে আশ্বাস দিয়েছেন
তার কোনো দাম নেই।
মূল প্রবন্ধে বেনজীন খান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত হিমালয় অঞ্চলে
৭৪টি বাঁধ নির্মাণ করেছে। নির্মাণ করছে আরও ৩৭টি। এ পর্যন্ত দেশটি ৪ হাজার
৩০০টি বৃহত্ ড্যাম নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। নির্মাণাধীন রয়েছে অনেকগুলো।
ভারত এরই মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ বাঁধ নির্মাণকারী দেশে পরিণত হয়েছে।
এর মাধ্যমে তারা শুধু নিজ দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপরই আঘাত করছে না,
সর্বনাশ করছে ভাটির দেশ বাংলাদেশের। তিনি দল-মত নির্বিশেষে আগ্রাসী ভারতের
এই তত্পরতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
কল্লোল মোস্তফা •
দিল্লির আশ্বাস, ঢাকার আশ্বস্ত হওয়া আর বরাক নদীর ভাটির ভারতের
মণিপুর-মিজোরাম এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের মধ্যেই
টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে ধারাবাহিকভাবে। সর্বশেষ ২২ অক্টোবর
টিপাইমুখ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের ন্যাশনাল
হাইড্রোইলেক্ট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (এনএইচপিসি), সাটলুজ জলবিদ্যুৎ নিগম
লিমিটেড (এসজেভিএন) এবং মণিপুর সরকারের মধ্যে বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর
হওয়ার খবর বাংলাদেশের মিডিয়ায় এসেছে ১৯ নভেম্বর। এনএইচপিসি’র ওয়েবসাইট
থেকে দেখা যায় পরিকল্পনা অনুসারে ভারত সরকার অর্থ ছাড় করতে শুরু করলে
মণিপুর রাজ্যের চারুচাঁদপুর জেলার বরাক নদীর ওপর টিপাইমুখ নামক স্থানে
১৫০০ মেগাওয়াটের এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণ করতে সময় লাগবে ৮৭ মাস।
গণমাধ্যমে এখন এই খবরটিকে ‘হঠাৎ চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে পরিবেশন করা
হলেও এর আগে গত ১৩ মে, ২০১০ সালে সাপ্তাহিক বুধবারে ‘টিপাইমুখ বাঁধ
নির্মাণে আরো একধাপ অগ্রগতি : সরকার নীরব’ শীর্ষক লেখায় এই তিনটি
কোম্পানির মধ্যে ২৮ এপ্রিল, ২০১০ সালে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশের
গণমাধ্যমগুলো ক্ষমতাসীন সরকার ও শাসকশ্রেণীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ২০১০ সালের
১২ জানুয়ারির বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ইস্তেহারে মনমোহন সিংয়ের দেওয়া
‘বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু করা হবে না’ জাতীয় ফাঁপা আশ্বাসের প্রচার
চালাচ্ছিল, দেশের মানুষকে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ধারবাহিক অগ্রগতির
বিষয়টি জানতে দেয়নি- পাছে টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুটি ভারত-বাংলাদেশের
‘বন্ধুত্বের জোয়ার’-এ বাধা হয়ে দাঁড়ায়!
২০১০
সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ
ইস্তেহারের দফা ৩০-এ বলা হয়েছিল : ‘‘ভারতীয় প্রধামন্ত্রী টিপাইমুখ
প্রকল্পে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার আশ্বাস
পুনর্ব্যক্ত করেছেন।’’ এরপর ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময়
ঘোষিত যৌথ ইস্তেহারে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া মনমোহনের বক্তৃতায় একই
‘আশ্বাস’ আবারো উচ্চারিত হয়। খেয়াল করার বিষয় এসব ঘোষণায় মনমোহন কিন্তু
কোথাও বলেননি যে, ভারত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করবে না, বলেছে ‘বাংলাদেশের
জন্য ক্ষতিকর হয়’ এমন কিছু করা হবে না। এটা তো নতুন কোনো কথা নয়, টিপাইমুখ
বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনার শুরু থেকেই ভারতের বক্তব্য হলো এটা ভাটি
অঞ্চলের আসাম-মণিপুর-মিজোরাম কিংবা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই বরং এই
বাঁধ নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে বাড়তি উপকার
করবে। বাংলাদেশ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টিপাইমুখ বাঁধবিরোধীদের
কাছে নদীর প্রবাহ, অববাহিকার কৃষি ও মৎস্যসহ গোটা পরিবেশের জন্য যে বাঁধ
ক্ষতিকর, ভারতের কাছে তা রীতিমত ‘উপকারি’। ফলে ধারাবাহিকভাবে ভারত বাঁধ
নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে আর বলছে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হয় এমন কিছু
টিপাইমুখে তারা করবে না। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীও ভারতের এই ফাঁপা আশ্বাস
জনগণের কাছে প্রচার করছে।
গত
২০০৯ সালে ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের তৎপরতার খবরে সারাদেশে তীব্র
গণ-অসন্তোষের চাপে বাংলাদেশ থেকে একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল হেলিকপ্টারে
করে টিপাইমুখ ঘুরে এসেও সেই একই আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছিল। শুধু তাই না,
সাম্প্রতিক বিনিয়োগ চুক্তির খবরের প্রতিক্রিয়ায় সেই প্রতিনিধি দলের অন্যতম
সদস্য সংসদ সদস্য আবদুর রহমান ১৯ নভেম্বর, ২০১১ বিবিসির কাছে বলেছেন :
‘‘প্রতিনিধি দলে আমাদের কারিগরি কমিটি ছিল, তারাও সে জিনিসটি তাদের কাছ
থেকে বুঝেছে যে ওখানে ড্যাম বা বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশ বরং উপকৃত
হবে। কারণ বর্ষা মৌসুমে যখন পানি থাকবে, তখন বাংলাদেশ প্লাবিত হওয়ার
সম্ভাবনা থেকে রক্ষা পাবে এবং যখন শুস্ক মৌসুমে পানি থাকবে না, তখন
বাংলাদেশ পানি সেখান থেকে পাবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ বরং
রক্ষিতই হবে।’’ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যারা
টিপাইমুখ বাঁধ বিষয়ে তদন্ত করতে ভারত গিয়েছিলেন তারা নিজেরাও ভারতের সুরে
সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাবের বদলে উল্টো ‘উপকার’ হওয়ার কথা বলছেন! যদিও তারা
স্বীকার করেছেন ভারত ‘আরও সম্ভাব্যতা যাচাই এবং যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার’
প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন যখন দেরিতে হলেও গণমাধ্যমে আসলো যে ভারত
টিপাইমুখ বাঁধের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখনো বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো
প্রতিবাদ করেনি, দল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনার তারিক ই করিম এখনো তথ্য জানতে
চাওয়ার পর্যায়ে রয়ে গেছেন। ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল
কায়েস সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘বাংলাদেশকে ভারত কোনো তথ্য দেয়নি। আমরা
ভারতের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার আশা করেছিলাম। কিন্তু তা পাইনি।’
অথচ
বাংলাদেশের বরাক নদীর ওপর এই টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে সময়মত প্রতিরোধ করা
না গেলে তা বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ, জীব-বৈচিত্র্য,
গাছপালা-বনভূমি, নদীর ওপর নির্ভরশীল দুপারের মানুষের জীবন-জীবিকা ইত্যাদির
ওপর ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। বরাক নদী সিলেটের অমলসিদ পয়েন্টের
কাছে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশের মোট জলপ্রবাহের উৎসের শতকরা ৯ ভাগ জল আসে এই নদী দিয়ে।
ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) গবেষণা অনুসারে টিপাইমুখ
বাঁধের মাধ্যমে এই জলপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে চলে গেলে বরাক নদী
থেকে অমলসিধ পয়েন্টে সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদীর দিকে পানি প্রবাহ জুন মাসে
১০%, জুলাই মাসে ২৩%, আগস্ট মাসে ১৬% এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১৫% কমে যাবে। এ
অঞ্চলের প্লাবনভূমির প্লাবনের ধরন, মৌসুম এবং প্লাবিত হওয়ার পরিমাণ
ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্ষা মৌসুমে সুরমা ও কুশিয়ারার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ
শুস্ক করার ফলে কমপক্ষে ৭টি জেলা- সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ,
ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার ধান উৎপাদন ব্যাহত হবে- যে
জেলাগুলোতে দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়। এর মধ্যে সিলেট ও
মৌলভীবাজার এলাকাতেই প্লাবনভূমির পরিমাণ কমে যাবে যথাক্রমে ৩০,১২৩ হেক্টর
(২৬%) এবং ৫,২২০ হেক্টর (১১%)। আবার
ভারতের কথা মতো শুকনো মৌসুমে অমলসিদ পয়েন্টে ১২১% পানি বাড়বে। আর তার ফলে
হাওর অঞ্চলের পরিবেশ ও জীবিকার ওপর ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। বছরে
বেশিরভাগ সময় পানির নিচে থাকা ২৫০০০ বর্গকিলোমিটারের হাওর অঞ্চলের ওপর
কিন্তু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি লোকের জীবিকা নির্ভরশীল। এ
অঞ্চলের লোকজন জীবিকার জন্য মূলত মাছ ধরে এবং শুকনো মৌসুমে কৃষিকাজ করে।
শুকনো মৌসুমে কৃষিকাজ বলতে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান চাষ। হাওর অঞ্চল ছাড়া এই
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় তেমন কোনো ধান চাষ করা যায় না। যে কারণে
আশুগঞ্জ, ভৈরব এবং অন্যান্য অঞ্চলের চাল-কলগুলো ধানের জন্য এ অঞ্চলের ওপর
নির্ভরশীল। শুকনো মৌসুমে যখন হাওরের পানি কমে যায় তখন তারা বোরো আবাদ করে
আর বর্ষা আসার আগেই সে ফসল ঘরে তোলে। বর্ষায় পলি জমে উর্বর হাওরের বুকে
তখন সহজেই বোরোর বাম্পার ফলন ঘটে। এখন টিপাইমুখ বাঁধের ফলে শুকনো মৌসুমেও
যদি ভারতের ‘বদান্যতায়’ হাওর অঞ্চল পানিতে পূর্ণ থাকে তাহলে কৃষক আগের মতো
আর বোরো ধান আবাদ করতে পারবে না।
প্রস্তাবিত
টিপাইমুখ বাঁধের একেবারে অক্ষ বা অ্যাক্সিসটিই অবস্থিত হলো বহুল পরিচিত
তাইথু ফল্টের ওপর অবস্থিত যা সম্ভাব্য ক্রিয়াশীল একটি ফল্ট এবং ভবিষ্যতের
যে কোনো ভূমিকম্পের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া ভারত এবং বার্মার
টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের জন্য এলাকাটি দুনিয়ার অন্যতম একটি ভূমিকম্প
প্রবণ এলাকা। কাজেই এরকম একটি এলাকায় ১৬৮.২ মিটার উচ্চতার একটি জলাধার
নির্মাণ করা মানে বাংলাদেশ ও ভারতের পুরো এলাকার জন্য সেধে ঘন ঘন ভূমিকম্প
এবং তার ফলে বাঁধ ভাঙার বিপদ ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু না। আর বাঁধ ভেঙে গেলে
২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বাঁধের সঞ্চিত পানি মোটামুটি ৫ মিটার উচ্চতা
নিয়ে বাংলাদেশে হাজির হবে এবং ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পানি তার সর্বোচ্চ
উচ্চতা ২৫ মিটারে পৌঁছবে যা প্লাবনভূমির উচ্চতার চেয়ে ৮ মিটার বেশি উঁচু,
ফলে প্লাবনভূমিকে ৮ মিটার পানির নিচে তলিয়ে রাখবে ১০ দিন বা তারচেয়েও বেশি
সময় ধরে!
কাজেই
এসব বিপদ বিবেচনা করে অনেক আগেই বাংলাদেশের উচিত ছিল ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও
ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে উল্লেখিত ‘উভয় দেশের
সীমানার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আন্তর্জাতিক নদ-নদীর পানির অংশীদ্বারিত্ব
পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে করা’র প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন
যেমন হেলসিংকি রুল (লন্ডন, আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা, ১৯৬৭) কিংবা জাতিসংঘের
আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহারের কনভেনশন (১৯৯৭) ইত্যাদির আওতায় টিপাইমুখ বাঁধের
ব্যাপারে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিবাদ করা এবং প্রয়োজনে
আন্তর্জাতিক আদালতের স্মরণাপন্ন হওয়া। অথচ বাংলাদেশের নতজানু শাসক শ্রেণীর
সেদিকে কোনো নজর তো নেই-ই বরং বাংলাদেশের বন্দর, স্থল ও নৌট্রানজিটের
চুক্তি থেকে শুরু করে একের পর এক বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক দাসত্বমূলক চুক্তিতে
আবদ্ধ হচ্ছে! এ অবস্থায় শক্তিশালী গণআন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসক
শ্রেণীকে বাধ্য করতে হবে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিষয়টি
উত্থাপন করে ভারতের এই টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প ঠেকানোর জন্য কার্যকর
ব্যবস্থা গ্রহণে।