আলফাজ আনাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আলফাজ আনাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৭

বেল্ট ওয়ান রোড - দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ফ্যাক্টর

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের তাৎপর্য ও প্রভাব নিয়ে এখন নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক এবং ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগে বাংলাদেশের সমর্থন নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমে যেসব বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে এক ধরনের উদ্বেগ লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হয় ভারতের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা তা নিয়ে ভারতের যে গভীর দৃষ্টি ও নানামুখী চাপ আছে তা অনুমান করা কঠিন নয়। ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগে সার্কভুক্ত মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার পর বাংলাদেশের সমর্থন পেল চীন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে চীনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির এখন প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে পাকিস্তানকে চাপে রাখা বা একঘরে করে ফেলা। মূলত উত্তর প্রদেশের নির্বাচনকে সামনে রেখে উগ্রজাতীয়তাবাদী উত্তেজনা সৃষ্টি করে ভোটের রাজনীতিতে এগিয়ে থাকতে চান মোদি। এ কারণে বহুল ব্যবহৃত ‘পাকিস্তান কার্ড’ খেলছেন তিনি। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের প্রচারণা ভারতের জনমতকে সাময়িকভাবে তার পক্ষে এনেছে। অন্য দিকে, সার্ক সম্মেলন বর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানকে চাপে ফেলার ক্ষেত্রেও কিছুটা সফল হয়েছেন মোদি। কিন্তু এর বিপরীতমুখী নানা ধরনের প্রভাবও লক্ষ করা যাচ্ছে। সার্কের বদলে (বে অব বেঙ্গল ইনেশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) বিমসটেকের ব্যাপারে ভারত অধিক আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এবার ভারতের গোয়ায় ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয় (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভুটান ও নেপাল)। এর মাধ্যমে ভারতের পক্ষ থেকে বার্তা দেয়া হয়েছে, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে ভারত এগিয়ে যেতে চায়। সার্ক নয় ভারতের নেতৃত্বে বিমসটেক হবে এ অঞ্চলের প্রধান জোট এমন আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটছে। কিন্তু ভারতের এই আকাক্সক্ষা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তাবিশ্লেষক এম কে ভদ্রকুমার চীনের প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরকে নিয়ে এক নিবন্ধে বিমসটেক নিয়ে ভারত অলীক কল্পনার মধ্যে আছে বলে উল্লেখ করেছেন। 
পাকিস্তানকে একঘরে করতে বিমসটেক নিয়ে এগিয়ে যেতে ভারতের এই উদ্যোগে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন। ভারতের এ ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় চীন কোনো পক্ষ হচ্ছে না বটে। কিন্তু চীনের অবস্থান ভারতের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। যেমন গোয়ায় ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক জোট) সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর বলে উল্লেখ করেন। তিনি পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় বেছে বেছে এগোনোর কোনো সুযোগ নেই এমন যুক্তিও দেখান। কিন্তু মোদির সন্ত্রাসবিষয়ক এই অবস্থানের তেমন কোনো প্রতিফলন পাওয়া যায়নি ব্রিকস সম্মেলনের যৌথ ঘোষণায়। আউটরিচ সম্মেলনে শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন।

ব্রিকস সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা হিসেবে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা কতখানি প্রয়োজন, চীন ও রাশিয়াসহ ব্রিকসের অন্য সদস্যদের তা বোঝানোর জন্যও ভারত সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়েছে। তাতে খুব একটা ফল আসেনি। সন্ত্রাস প্রশ্নে ভারতের অবস্থানের সাথে চীন ও রাশিয়া যে একমত নয়, তা অনেক আগে থেকে স্পষ্ট ছিল। সম্প্রতি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের উরিতে ভারতের একটি সেনাঘাঁটিতে হামলার পর পাকিস্তান প্রশ্নে ভারতের সাথে চীন ও রাশিয়ার মতবিরোধের বিষয়টি সামনে চলে এসেছিল। উরির হামলার জন্য ভারত সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ী করলেও বেইজিং তাদের পুরনো মিত্র ইসলামাবাদের পাশেই দাঁড়ায়। এমনকি জইশ-ই-মোহাম্মদের নেতা মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতিসঙ্ঘে ভারতের একটি উদ্যোগের বারবার বিরোধিতা করছে চীন। অন্য দিকে উরিতে হামলার পরও রাশিয়া পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথে তাদের নির্ধারিত যৌথ সামরিক মহড়া বাতিল করেনি। ভারতের পক্ষ থেকে এই মহড়া বাতিলের জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। সর্বশেষ, ব্রিকস সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার অবস্থানের যেকোনো পরিবর্তন হয়নি, তা আবারো স্পষ্ট হলো। ব্রিকস সম্মেলন শেষে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুং পাকিস্তান সন্ত্রাসের আঁতুরঘর মোদির এমন মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, আমরা কোনো বিশেষ দেশ, জাতি বা ধর্মের সাথে সন্ত্রাসের সম্পর্ক নাকচ করছি। এটাই চীনের অবস্থান। তিনি বলেন, সন্ত্রাস দমনে পাকিস্তান যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করছে। অন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তাতে সম্মান জানানো উচিত। কার্যত চীন এই স্পষ্ট অবস্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানের পক্ষেই দাঁড়ালো। এমনকি সন্ত্রাস প্রশ্নে ভারতের ব্যাখ্যা চীন বা রাশিয়ার মতো ব্রিকসের অন্য সদস্য দেশগুলোও গ্রহণ করতে পারেনি; এমন প্রশ্ন ভারতেই উঠতে শুরু করেছে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয়েছে কি হয়নি এ নিয়ে এখন যেমন নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে মোদি সরকারকে, তেমনি পাকিস্তানকে একঘরে করার ক্ষেত্রে কতটা সাফল্য আসছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অন্য দিকে ভারত যখন বিমসটেক নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, তখন পাকিস্তানও নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। পাকিস্তানের গণমাধ্যমকে দেশটির প্রভাবশালী সিনেটর মুশাহিদ হোসেন সৈয়দ জানান চীন, ইরান ও মধ্যএশিয়ার দেশগুলো নিয়ে পাকিস্তান বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের জোট গঠনের প্রচেষ্টা বিমসটেকের মাধ্যমে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে ভারতের উদ্যোগের বিপরীতে ভারতকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানের একটি নতুন উদ্যোগ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পাকিস্তানের এই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ দেয়া খুব সহজ না হলেও এমন জোট গঠন করা সম্ভব হলে বিমসটেকের চেয়ে শক্তিশালী হতেও পারে। কারণ চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরকে কেন্দ্র করে ইরান, চীন ও মধ্যএশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা দীর্ঘ দিন কাজ করছে। এ ছাড়া বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে ভারতের সমর্থনে ভারতের পুরনো বন্ধু ইরান ক্ষুব্ধ। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে এখন ইরান ও পাকিস্তান ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। কারণ বেলুচিস্তানে অস্থিরতা দুই দেশের জন্যই হুমকি। এরই মধ্যে ইরানের সাথে পাকিস্তান সামরিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। দুই দেশের নৌবাহিনীর যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্প্রতি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সার্ককে অকার্যকর রেখে ভারতের নেতৃত্বে বিমসটেক কতটা সফল হবে? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ভদ্রকুমারের বিশ্লেষণ থেকে। ওয়েক আপ ইন্ডিয়া, বিমসটেক ইজ অ্যা রিভেরি (Wake up, India! BIMSTEC is a reverie.) শিরোনামে তিনি লিখেছেন,

Regional groupings built on such zero-sum mindset in the era of globalization have limited future. Regional groupings thrive only if they are willing to be inclusive. The so-called ‘Bay of Bengal regionalism’ can never mean that Sri Lanka or Bangladesh or Myanmar or Thailand would be willing to forgo their cooperation with China for the sake of bonhomie with India in a seaside resort facing the Indian Ocean. Simply put, China happens to be much more meaningful and tangible as partner country from their point of view than what BIMSTEC can ever hope to offer them even with the best Indian ingenuity. That is the geopolitical reality. How long can India pretend to beat its ineffectual wings in the void in vain?

“বিশ্বায়নের যুগে এমন ‘জিরো সাম’ মানসিকতার ভিত্তিতে আঞ্চলিক গ্রুপিংয়ের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল নয়। এ ধরনের গ্রুপিং ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠে যদি তাদের ইচ্ছা থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার জন্য। কথিত বঙ্গোপসাগর আঞ্চলিকতাবাদ কখনো এটি বোঝায় না যে, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, মিয়ানমার কিংবা থাইল্যান্ড ভারত মহাসাগর তীরবর্তী কোনো অবকাশযাপন কেন্দ্রে ভারতের সাথে দহরম-মহরমের স্বার্থে চীনের সাথে সহযোগিতা ত্যাগ করতে ইচ্ছুক হবে। প্রাসঙ্গিক সমস্যা সমাধানে ভারতের সর্বাধিক পারদর্শিতা যদি থাকেও, বিমসটেক এসব দেশকে তা দিতে পারার আশাও করতে পারে না, যা অনেক বেশি দিতে পারবে চীন। এটিই ভূ-রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা। ভারত কত দিন শূন্যের মাঝে বৃথাই তার অকেজো ডানাগুলো ঝাপটানোর ভান করে যেতে পারবে।”

ভদ্রকুমারের এই বিশ্লেষণের প্রতিফলন ঘটেছে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের মধ্যে। চীনের সাথে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে এ দেশে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নয় ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকেরা চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর তাগিদ অনুভব করছিলেন। ভারতের সাথে বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও বাস্তব কারণে চীনের সাথে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে। চীনও তাতে আগ্রহী। এম কে ভদ্রকুমার তার বিশ্লেষণে বিষয়টি তুলে ধরেছেন এভাবে

our pundits may look somewhat foolish in their assumption that Bangladesh is desperate for India’s leadership to scuttle the SAARC and lead a purposive sub-regional grouping with Nepal, Bhutan and Bangladesh. Get real, folks. The geopolitical reality is that in the field of economy and defense, China is firmly ensconced as Bangladesh’s irreplaceable partner. Again, with or without Indian participation, Bangladesh is bent on developing connectivity with Yunnan.

‘আমাদের পণ্ডিতদের বোকা মনে হতে পারে এ কারণে যে তাদের ধারণা ছিল বাংলাদেশ সার্ককে ব্যর্থ প্রতিপন্ন করার জন্য ভারতীয় নেতৃত্বের দিকে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছে এবং নেপাল ভুটান বাংলাদেশ মিলে একটি উদ্দেশ্যমূলক উপ-আঞ্চলিক গ্রুপের নেতৃত্ব দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবপরিবর্তনীয় অংশীদার হিসেবে চীন খুবই নিরাপদ। ভারত অংশ নিক বা না নিক চীনের ইউনান প্রদেশের সাথে কানেকটিভিটির জন্য বাংলাদেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রুটে সংযোগ জরুরি। এ ধরনের অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে চীন অনেক আগে থেকে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে, বিশেষ করে অবকাঠামো নির্মাণে চীন ২৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তার প্রস্তাব করেছে। এই অবকাঠামো কোথায় কিভাবে হবে, তার বিশদ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক বেশ কিছু প্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণ এর অন্তর্ভুক্ত, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এর মধ্যে কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ, আনোয়ারায় চীনের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গঠন, বাঁশখালীতে বেসরকারি উদ্যোগে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, সীতাকুণ্ড থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ ওয়ে নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের মতো প্রকল্পগুলোতে চীনের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। চীনের দক্ষিণাংশের সাথে বাংলাদেশের কক্সবাজারের মধ্যে একটি সংযোগ সড়ক স্থাপন চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রুট উদ্যোগের অংশ হতে পারে। এখন বাংলাদেশের উচিত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগী হওয়া। মনে রাখতে হবে, ভূ-রাজনৈতিক কারণে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা থেকে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারত নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছে। এ কারণে চীনের আগ্রহ ও বাংলাদেশের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করা যাচ্ছে না। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে এমন প্রতিবন্ধকতা যাতে না আসে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশকে এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

বুধবার, ১২ মার্চ, ২০১৪

কানেকটিভিটি ও বাংলাদেশের প্রাপ্তি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সাথে সর্বশেষ বৈঠক করেছেন মিয়ানমারের নেপিতোতে বিমসটেক সম্মেলনে। এটাই দুই প্রধানমন্ত্রীর শেষ বৈঠক। আগামী এপ্রিল মাসে ভারতে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের ক্ষমতাসীন হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। ভারতের কংগ্রেস সরকার শেখ হাসিনার সরকারকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার সরকারকে সব ধরনের সমর্থনের কথা ভারতের পক্ষ থেকে বলা হলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে খুব কমই অগ্রগতি হয়েছে। বিমসটেক সম্মেলনে শেখ হাসিনা মনমোহন সিংয়ের সাথে বৈঠকে সঙ্গত কারণেই তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুটি তুলে ধরেছেন। এবার আর আশ্বাস নয়, মনমোহন স্পষ্ট করে বলেছেন তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুটি অত্যন্ত জটিল। এর সমাধানের কোনো সম্ভাবনা আর নেই। অন্তত কংগ্রেস সরকারের দুই মাসের কম সময়ের মেয়াদে তো সম্ভব নয়। নির্বাচনের পর ভারতে ক্ষমতাসীন হতে যাচ্ছে বিজেপি, জনমত জরিপে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিজেপি না হলে দিল্লিতে আঞ্চলিক দলগুলোর একটি কোয়ালিশন সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও প্রবল। এ ধরনের সরকার গঠিত হলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির থাকবে অপরিসীম প্রভাব। তাকে বাদ দিয়ে আগামী দিনে তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আবার বিজেপি এ ব্যাপারে কতখানি আগ্রহী হবে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। আমরা ধরেই নিতে পারি তিস্তার পানি বণ্টন অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে গেল। এখন প্রশ্ন হলো কংগ্রেসের এই শাসনামলে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কী পেলো।

প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার থেকে ফেরার আগেই বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার ব্যাপারে নতুন তৎপরতার কথা জানিয়েছেন। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ভারতের সাথে কানেকটিভিটির মাধ্যমে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতের সাথে রেল, নৌ ও স্থল ট্রানজিট সুবিধা চালু করতে যে উন্নয়ন কাজ চলছে, তার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড.গওহর রিজভী ও ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক এ করিম উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বিশ্বায়নের যুগে আমাদের আরো উদার হতে হবে। মনের দরজা খুলে দিতে হবে। সত্যি কথা, বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। বাংলাদেশও প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষ করে ব্যবসায় বাণিজ্য সম্প্রসারিত করতে পারে। কিন্তু এই যোগাযোগের ভিত্তি হতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থ। বাংলাদেশের কাছে ভারত বিভিন্ন সময় ট্রানজিট সুবিধা চেয়ে আসছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। যদিও সরাসরি ট্রানজিটের কথা না বলে এর নাম দেয়া হয়েছে কানেকটিভিটি। 

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে ভারতের সাথে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিস্তার পানি বণ্টনসংক্রান্ত বিষয়ে জটিলতার কারণে তা বেশি দূর এগোয়নি। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে অনেক সংবাদপত্রে খবর প্রকাশ হয়েছিল তিস্তা চুক্তির অগ্রগতি না হলে ট্রানজিট নিয়ে এগোবে না বাংলাদেশ। যা হোক মনমোহন সিংয়ের সফরের পর এ নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। এখন তিস্তা চুক্তি না হলেও বাণিজ্যমন্ত্রী ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন। 
কিন্তু এই ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য আসছে না। এ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যে পর্যালোচনা বা সমীক্ষা হয়নি তা নয়। এমনকি ট্রানজিটের মাশুল নির্ধারণের জন্য সরকারিভাবে একটি কোর কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটি তাদের রিপোর্ট দিয়েছে। এসব সমীক্ষা ও রিপোর্টে ট্রানজিটের রুট ও লাভক্ষতির দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত তা প্রকাশ করেনি। কংগ্রেস সরকারের বিদায়লগ্নে হঠাৎ করে ট্রানজিট সুবিধা চালু করার এই তোড়জোড় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করছে। ট্রানজিট নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে শেষ মুহূর্তে কোনো চাপ আছে কি না তা-ও ভেবে দেখার বিষয়। যাই হোক না কেন ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার আগে এর সামগ্রিক দিক নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। 

ট্রানজিট নিয়ে সমীক্ষা 
প্রতিবেশী ভারতসহ নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা দেয়ার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করতে অতীতে দু’টি সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। বহুল আলোচিত সমীক্ষার একটি হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আওতায়। ইউএন-এসকাপের সাবেক পরিচালক রহমতউল্লাহ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক মুহাম্মদ ইউনুস যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। দ্বিতীয় সমীক্ষাটি হয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) পলিসি রিসোর্স প্রোগ্রামের (পিআরপি) আওতায় পরিচালিত ‘ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ অ্যান্ড দ্য নর্থইস্ট : ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রানশিপমেন্ট স্ট্র্যাটেজিক কনসিডারেশন’ শীর্ষক গবেষণা। বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক কে এ এস মুরশিদ এই গবেষণাটি করেছেন। 
২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মুজিবর রহমানকে প্রধান করে ট্রানজিট-সংক্রান্ত কোর কমিটি গঠন করা হয়। ট্রানজিট দেয়ার ক্ষেত্রে এই কমিটিও বেশ কিছু সুপারিশ করে। ট্রানজিট নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে সমীক্ষাগুলোর ওপর সংক্ষেপে আলোকপাত করা দরকার। 

রহমত উল্লাহর সমীক্ষা 
এডিবির আওতায় ২০১০ সালে রহমত উল্লাহ ও ইউনুস যে সমীক্ষা চালিয়েছিলেন আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার বা এডিবি তা প্রকাশ করেনি। তবে রহমত উল্লাহর সাক্ষাৎকারসহ বিভিন্নভাবে এই সমীক্ষার বেশ কিছু বিষয় প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়েছে ভারতের অন্য অংশ ও উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর মধ্যে বছরে তিন কোটি ৮৫ লাখ টন পণ্যবাহী যান চলাচল করে। এর মধ্যে শুধু আসামের সাথেই চলাচল হয় তিন কোটি ৪৩ লাখ টন। ট্রানজিট চালু হলে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে এক কোটি ৫৬ লাখ টন পণ্য যাতায়াত হবে, যার মধ্যে আবার এক কোটি ২০ লাখ টনই হবে আসাম থেকে। এ ছাড়া নেপাল ও ভুটানসহ আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন হবে সাড়ে ১৭ লাখ টন। তবে শুধু আসাম থেকেই প্রায় সাড়ে চার লাখ টন পণ্য চলাচল হবে। অর্থাৎ এই উপ-অঞ্চলে বর্তমানে চার কোটি ১৮ লাখ টন পণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ ট্রানজিট বাণিজ্যে স্থানান্তরিত হবে।
এই সমীক্ষায় ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার জন্য অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের কথা বলা হয়। সড়কপথের জন্য পাঁচ কোটি ৩৭ লাখ ডলার, রেলের জন্য ৭৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার, চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য সাত কোটি ৯০ লাখ ডলার ও মংলা বন্দরের জন্য ১২ কোটি ৯০ ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। ফলে বাংলাদেশের মূলধনী বিনিয়োগ দাঁড়াবে ১০৭ কোটি ডলার বা প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। এর সাথে ৩০ বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় এক কোটি ডলার ব্যয় করতে হবে।

এই সমীক্ষায় বলা হয় ট্রানজিট পাওয়ায় বিদ্যমান পণ্য পরিবহন খরচ যতখানি হ্রাস পাবে, তার সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ট্রানজিট মাশুল হিসেবে বাংলাদেশকে আদায় করতে হবে। এর সাথে যুক্ত হবে বন্দর ব্যবহারের মাশুল, বাহন মাশুল ইত্যাদি। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটিয়ে ষষ্ঠ বছর থেকে পুরোদমে ট্রানজিট সুবিধা ব্যবহার করা যাবে। আর তাই প্রথম পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বার্ষিক আয় হবে পাঁচ কোটি ডলার। এরপর পূর্ণ অবকাঠামোয় এই বার্ষিক আয় ৫০ কোটি ডলার হবে। আর ২৭তম বছর থেকে বার্ষিক আয় ১০০ কোটি ডলার হবে। রহমত উল্লাহর এই সমীক্ষা নিয়ে দেশের ভেতরে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। কারণ এই অবকাঠামো খাতে বিপুল ব্যয়ের পর প্রকৃত অর্র্থে এই পরিমাণ পণ্য চলাচল হবে কি না সে প্রশ্ন রয়েছে। রহমত উল্লাহর এই সমীক্ষাকে অতি আশাবাদী হিসেবে মনে করা হয়। 

কে এস মুরশিদের সমীক্ষা 
বিআইডিএসের গবেষক কে এস মুরশিদের সমীক্ষায় বলা হয় সড়ক ও রেলপথ মিলিয়ে ভারতের প্রধান অংশের সাথে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর বছরে সাড়ে পাঁচ কোটি টন পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। এর মধ্যে সড়কপথে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে বছরে তিন কোটি ৯০ লাখ টনের পণ্য আনানেয়া হয়। বাকিটা রেলপথে। রেলপথে বছরে এই রাজ্যগুলোয় ভারতের প্রধান অংশ থেকে যে পরিমাণ পণ্য আসে (২০০৮ সালে ৬৮ লাখ ৪৭ হাজার টন) ও এখান থেকে যে পরিমাণ পণ্য যায় (২০০৮ সালে ৯০ লাখ ৮৬ হাজার টন), তার ৭৯.৭ ও ৯৭.৭ শতাংশই আনানেয়া হয় আসামের সাথে। অন্য রাজ্যগুলোতে সাধারণত আসামে পণ্য খালাস করার পর তা স্থানান্তর করা হয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশ যদি ট্রানজিট সুবিধা দেয় তাহলে ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুরের ক্ষেত্রে প্রায় পুরোটাই পণ্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে চলাচলের সম্ভাবনা রয়েছে। মেঘালয়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা পণ্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আনা-নেয়া হবে। এভাবে বছরে সমন্বিতভাবে ৩৩ লাখ টন (১০ লাখ টন রেলে ও ২৩ লাখ টন সড়কপথে) পণ্য ট্রানজিটে পরিবহন হতে পারে, যা বর্তমানের এই বাজারের অতি ুদ্র অংশ। সুতরাং আসামকেন্দ্রিক বাণিজ্যের কতখানি বাংলাদেশী ট্রানজিটে নিয়ে আসা যাবে, তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে ট্রানজিট দেয়া থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তির বিষয়টি। 

এই সমীক্ষায় বলা হয়, বাংলাদেশে রেলওয়ের মৌলিক অবকাঠামো থাকলেও একে ট্রানজিটের উপযোগী করতে হলে মান উন্নয়ন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে গোটা রেল খাতকেই পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার প্রয়োজন হবে। যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলে বাধা থাকায় বিরতিহীন যাত্রা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে যমুনার এ পার-ও পারে পণ্য ওঠানামা করা ও দুই পারের জন্য পণ্যবাহী ফেরি চালু করতে হবে, যা কার্যত ট্রানশিপমেন্টে রূপ নেবে আবার ব্যয়বহুল ও সময়ক্ষেপণকারী হবে। প্রাথমিকভাবে অবকাঠামো ও পরিচালনা উন্নয়নে অন্তত ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে হবে রেলওয়েকে যেন আখাউড়া-আগরতলা সংযোগ স্থাপন, বন্ধ থাকা কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন চালু ও টঙ্গী-শাহবাজপুর রুট ডুয়েলগেজ করা যায় এবং ট্রানশিপমেন্ট হাব (কেন্দ্র) তৈরি করা যায়।

কলকাতা-গুয়াহাটি রুটে রেল বা সড়কপথের বাণিজ্য ট্রানজিটের দিকে ধাবিত হবে না। কারণ, বর্তমানে এই পথে যা খরচ, বাংলাদেশ রেলওয়ে তা কমাতে পারবে না। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কলকাতা-আগরতলা রুটে বাংলাদেশ ট্রানজিট দিলে ভারতের এই দুই স্থানের মধ্যকার বর্তমানের এক হাজার ৬৮০ কিলোমিটারের দূরত্ব নেমে আসবে মাত্র ৪৯৬ কিলোমিটারে। মধ্য মেয়াদে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বছরে ৪০ লাখ টন পণ্য আনানেয়ার ফলে টনপ্রতি এক হাজার টাকা ট্রানজিট মাশুল নিলে বাংলাদেশ পাঁচ কোটি ৭০ লাখ ডলারের রাজস্ব পাবে। রেলওয়ের জন্য ভর্তুকি বাদ দিলে প্রকৃত রাজস্ব আয় প্রায় দেড় কোটি ডলার হবে। দরকষাকষি করে মাশুল দ্বিগুণ হলেও এই আয় তিন কোটি ডলারের বেশি হবে না। 

মুরশিদ তার সমীক্ষায় দেখিয়েছেন ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ লাভ হবে আসলে সীমিত। পরে মুরশিদ খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমাদের সড়ক অবকাঠামো দুর্বল তাই সড়কপথে ট্রানজিট না দেয়াই ভালো। এ ক্ষেত্রে রেলপথের দিকে জোর দেয়া উচিত। রেলপথের ওপর জোর দিলেও আমরা তা এখন দিতে পারছি না। রেল খাত অনেক দিন ধরেই অবহেলিত। এখানে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন। তবে ট্রানজিট নিয়ে আমরা যেন বেশি ফানুস না ওড়াই। এ বিষয়ে অচিরেই যে বেশি লাভবান হবো তা নয়। 

কোর কমিটির প্রতিবেদন 
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত কোর গ্রুপ যে প্রতিবেদন প্রণয়ন করে, ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে তা সরকারের কাছে পেশ করা হয়। এরপর অবশ্য আরো কিছু সংযোজন-বিয়োজন করে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করার জন্য বলা হয়। কিন্তু এই প্রতিবেদন শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী কোর গ্রুপের প্রতিবেদনে অবকাঠামো বিনির্মাণ ও উন্নয়নসাপেক্ষে বছরে এক কোটি ৭৩ লাখ টন পণ্যবাহী কার্গো পরিবহন হবে। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ট্রানশিপমেন্ট দেয়া হলে ১৮ লাখ টন কার্গো পরিবহন হবে। সাতটি সড়ক, সাতটি রেল ও তিনটি নৌপথ দিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট দেয়া সম্ভব।
এই পথগুলোর মাধ্যমে ট্রানজিট সুবিধা দিতে হলে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা (৭০০ কোটি ডলার) বিনিয়োগ করা প্রয়োজন অবকাঠামো উন্নয়ন ও পথগুলো ট্রানজিটের উপযোগী করার জন্য। পরিবহন বাবদ ১৫ ধরনের মাশুল আদায় করা যাবে।
কোর কমিটির সুপারিশে বলা হয়, প্রক্রিয়া শুরু করার পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট দেয়া সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ট্রানশিপমেন্ট দেয়া যেতে পারে। পর্যায়ক্রমে ট্রানশিপমেন্টের পরিধি বাড়ানো ও অবকাঠামো উন্নয়ন করে পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিটে যাওয়া সম্ভব।

মাশুল কিভাবে নেয়া হবে
ট্রানজিট-সংক্রান্ত কোর গ্রুপ মাশুলের জন্য ন্যূনতম একটি হার সুপারিশ করে। এ ক্ষেত্রে কোর গ্রুপের বক্তব্য হলো, ন্যূনতম হারে মাশুল সুপারিশ করার অর্থ হলো, এই হারের চেয়ে কম মাশুল নেয়া হলে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগের অর্থ প্রিমিয়ামসহ তুলে আনতে পারবে না। এতে বলা হয়, টনপ্রতি প্রতি কিলোমিটারের জন্য সড়কপথে সাত সেন্ট, রেলপথে তিন সেন্ট ও নৌপথে আড়াই সেন্টের কম অর্থ নেয়া হলে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশ কার্যত লাভবান হবে না। অর্থাৎ এর চেয়ে বেশি হারে মাশুল আরোপ করা প্রয়োজন। আবার ভারতের জন্য যে হারে মাশুল আরোপ হবে, নেপাল ও ভুটানের জন্য সে হারে না-ও হতে পারে। কেননা, ভুটান ভূআবদ্ধ দেশ। নেপাল ভূআবদ্ধ তো বটেই, স্বল্পোন্নত দেশও। মাশুল নিয়ে দরকষাকষির নীতি ঠিক করা হয়েছিল কোর কমিটি। অনেকেই মনে করেন, মাশুল নিয়ে দরকষাকষির দিকে যাওয়া ঠিক হবে না। সাধারণত ট্রানজিট প্রদানকারী দেশ নিজস্ব বিবেচনায় একতরফা মাশুল আরোপ করে। ট্রানজিট নিতে ইচ্ছুক দেশ তাতে সম্মত হলে ট্রানজিট শুরু হয়। আমরা লক্ষ্য করছি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রানজিট রুটগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। তাতে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। মাশুল কী হবে তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেয়া হচ্ছে না। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ট্রানজিট করিডোর নিয়ে আমাদের এক ধরনের মাইন্ডসেট আছে এবং সময় এসেছে তা পরিত্যাগ করার। তিনি বলেন, আমরা যদি আমাদের দরজা বন্ধ করে দিই, অন্য দরজা দিয়ে কেউ জায়গা করে নেবে। কেউ কারো জন্য বসে থাকবে না। এর মানে এই নয় যে, বিনা স্বার্থে আমরা দরজা খুলে দেবো। এটা একান্তই স্বার্থসম্পর্কিত বিষয়। বাণিজ্যমন্ত্রী যে মাইন্ডসেট বদলানোর কথা বলেছেন তা তখনই বদলাবে, যখন মানুষের সামনে স্পষ্ট করা হবে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ এভাবে লাভবান হবে। উন্নয়নের ফানুস ওড়ানোর বক্তব্য দিয়ে নয়। এ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। 

ট্রানজিট ও রাজনীতি 
ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া নিয়ে বাংলাদেশে যথেষ্ট রাজনীতি হলেও গঠনমূলক আলোচনা খুব কমই হয়েছে। সুশীলসমাজের একটি অংশ ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ বিপুলভাবে লাভবান হবে বলে প্রচারণা চালিয়েছিল। ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি সমুন্নয় আয়োজিত একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেছিলেন, ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে। শুধু ভারত নয় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দিলে বাংলাদেশ, চীন, নেপাল, ভুটানসহ এ অঞ্চলের বড় ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হবে। সিঙ্গাপুর হওয়ার এই স্বপ্ন যে কতটা অলীক তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে। ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার পক্ষে সব সময় সরব থাকা রহমত উল্লাহ নৌপ্রটোকল সংশোধনের সময় মাশুল আরোপ না করার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ট্রানজিট-সংক্রান্ত কোর কমিটির সদস্য ছিলেন। নৌপ্রটোকল সংশোধনের পর তিনি বলেন, নৌপ্রটোকল সংশোধনের সময় মাশুল আরোপ না করা সরকারের একটি বিরাট ভুল। ফলে এখন বিনা পয়সায় ভারত ট্রানজিট নিচ্ছে। এতে আমাদের খারাপ লাগছে। অপর দিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেছিলেন, ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্টের জন্য ভারতের কাছ থেকে আমাদের ফি নেয়া উচিত নয়। আমরা যদি অসভ্য হতাম এবং আমাদের নেতৃবৃন্দ যদি অশিক্ষিত হতো তাহলে এ দাবি করা যেতো। কিন্তু তা তো নয়। 

ট্রানজিটের বিনিময়ে আসলে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করেছেন সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা। কারণ এ পর্যন্ত ট্রানজিট-সংক্রান্ত যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাতে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার কোনো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেননি। আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ভারতকে এককালীন ট্রানজিট সুবিধা দেয়া হয়েছিল ভারতের পালাটানায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনের জন্য। এরপর ২০১৩ সালের মে মাসে আবারো খাদ্যশস্য নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। এসবের বিনিময়ে কোনো মাশুল আদায় করা হয়নি। ট্রানজিটের ব্যাপারে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থান প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর। তিনি এর আগে বলেছিলেন, নতুন কোনো চুক্তি ছাড়াই ভারতকে ট্রানজিট দেয়া যায়। তার মতে ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতেই ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কথা আছে। সর্বশেষ গত বছরের ২৮ জুন ঢাকায় এসকাপ ও বিস-এর উদ্যোগে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোয় যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ-সংক্রান্ত এক সংলাপে বলেন, ট্রানজিটের মাশুল আদায়ের বিষয়টি যাতে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে ভেস্তে না দেয় সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে। ট্রানজিট চালুর ব্যাপারে নানা বিতর্ক হলেও এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার পক্ষে। তা ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চালু রয়েছে। আর গণতান্ত্রিক সরকারগুলো যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। (প্রথম আলো, ২৮ জুন ২০১৩) এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান বলেন, ট্রানজিটের মাশুল মানে রাজস্ব আদায় নয়। ট্রানজিট সুবিধা পেতে অবকাঠামো ব্যবহারকারী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভূখন্ড  ব্যবহারের জন্য টাকা দেবে। এ অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী দেশকে ভর্তুকি সুবিধা দেয়া যাবে না। আবার ব্যবহারকারীর প্রদেয় অর্থের হার নির্ধারণে অবকাঠামো নির্মাণের খরচের সাথে নির্ধারিত মাত্রায় লাভের হার যুক্ত করা যাবে না। এই দুই উপদেষ্টার বক্তব্যে ট্রানজিট নিয়ে আমরা সরকারের মনোভাবের যে প্রতিফলন পাচ্ছি তা আর্থিকভাবে বাংলাদেশ কতটা লাভবান করবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। 

সর্বশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বিশ্বায়নের যুগে আমাদের আরো উদার হতে হবে। মনের দরজা খুলে দিতে হবে। খুবই সত্যি কথা। কিন্তু প্রশ্নটা ভারতকেও করতে হবে। ভারতের কাছ থেকে কতটা উদারতা পেয়েছে বাংলাদেশ? বাংলাদেশের নদী ভরাট করে ভারতের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনের জন্য আমরা ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছিলাম। ত্রিপুরার পালাটানার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এর বিনিময়ে আমাদের ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা ছিল। সেই বিদ্যুৎ কেনো ভারত এখন আর দিতে আগ্রহী নয়। ভারত মনের দরজা বন্ধ করল কেন? এখন আমরা আশুগঞ্জ বন্দর থেকে আখাউড়া হয়ে রেল যোগাযোগ চালু করতে চাইছি। কিন্তু এতে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হবে তার চিত্র আগে প্রকাশ করা উচিত। 

একইভাবে স্থলপথে ভারতের পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের লাভ-লোকসানের দিকটি তুলে ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়াকে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। সামগ্রিকভাবে ভারতের সাথে ঝুলে থাকা অন্য সমস্যাগুলো এর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি সুরাহা হচ্ছে না, তা স্পষ্ট করেই বলেছেন মনমোহন সিং। সীমান্ত চুক্তির বিষয়গুলো ঝুলে আছে। কিন্তু হঠাৎ করে সরকারের মন্ত্রীরা ট্রানজিট ও কানেকটিভিটির জন্য তৎপর হয়ে উঠেছেন। ভারতের স্বার্থ পূরণের জন্য মন্ত্রীদের এসব তৎপরতা জনগণের মধ্যে এখন হতাশার সৃষ্টি করছে।

শনিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১১

আশুগঞ্জ বন্দর : অবকাঠামো নেই, কিন' চালু হয়ে গেছে ট্রানজিট

ভারতের ট্রানজিটে বাংলাদেশের ভর্তুকি

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বাবুরাম ভট্টরাই ভারত সফরে যাওয়ার আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তাকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে ভারতের সাথে যেন দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি করা না হয়। বাবুরাম ভট্টরাই যে দলটি থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন, সেই মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ভারতের পছন্দের কোনো রাজনৈতিক দল নয়। কিন' এই বৈঠকে ভারতপন'ী রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসের প্রতিনিধিরাও উপসি'ত ছিলেন। তারাও বাবুরাম ভট্টরাইকে একই পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, নতুন করে কোনো চুক্তি না করে বরং আগের দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে। অর্থাৎ নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো একটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে ভারতের সাথে তারা আর কোনো নতুন চুক্তি করবে না। কারণ দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসা সমস্যাগুলোর সমাধান হচ্ছে না।
নেপালের সাথে ভারতের অনেকগুলো মৈত্রী চুক্তি রয়েছে। নেপালের অর্থনীতিও ভারতনির্ভর। দেশটিতে নেপালি মুদ্রার পাশাপাশি ভারতীয় মুদ্রা চালু রয়েছে। নেপালি মুদ্রার চেয়ে ভারতীয় মুদ্রার মূল্যমান বেশি হওয়ায় নেপালি মুদ্রার চেয়ে ভারতীয় মুদ্রা দেশটিতে কেনাকাটার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার হয়। ভারতের ব্যবসায়ীরাই নেপালের ব্যবসায়-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। ভারতের ব্যবসায়ীরা কাঠমাণ্ডু-পোখারা বা অন্য ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে দোকান খুলে ব্যবসায় করছেন। ফলে ভারতের বাণিজ্যিক আগ্রাসনের রূপটি নেপালের জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। ফলে নেপালের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
নেপালের মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি দুর্বল রাষ্ট্র ভারতের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে স্বাধীন নীতি অনুসরণ করতে পারছে, সেখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নীতিনির্ধারণী বিষয়ে কে সিদ্ধান্ত নেন, তা একটি গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক ধরনের অধীনতামূলক মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের মন্ত্রীরা যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সমপূর্ণ তার বিপরীত বক্তব্য রাখছেন এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কার্যকর হচ্ছে। পরে আবার ভারতের বক্তব্যকে ন্যায্যতা দেয়ার জন্য মন্ত্রীরা সেই সুরে কথা বলছেন।
সমপ্রতি আশুগঞ্জ বন্দর থেকে আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরা পর্যন্ত স'ায়ী ট্রানজিট চালু হয়েছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে ভারতের পণ্য পরিবহনের এই সুবিধা দেয়া হয়েছে বর্তমান সরকারের একক সিদ্ধান্তে এবং বিরোধী দলের প্রবল বিরোধিতার মধ্যে। এখন এই ট্রানজিট বা করিডোর সুবিধা নিয়ে সরকারের মন্ত্রী ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এত দিন পর্যন্ত সরকারের মন্ত্রীরা বলে আসছিলেন ভারতকে ট্রানজিট দিলে বিপুল পরিমাণ আয় হবে; কিন' বাস্তবতা হচ্ছে ট্রানজিট দেয়া হয়েছে বিনা মাশুলে এবং এ জন্য বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি গুনতে হবে বাংলাদেশকে। শুধু তা-ই নয়, ২৬ সেপ্টেম্বর আশুগঞ্জ বন্দর থেকে ভারতের প্রথম চালানটি ত্রিপুরায় যায়। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় পরীক্ষামূলকভাবে এই মালামাল যাচ্ছে। কিন' দুই সপ্তাহের মধ্যে ট্রানজিট ১৯ অক্টোবর স'ায়ী রূপ নেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়।
ভারতীয় হাইকমিশনারের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার রজিত মিত্তির স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আশুগঞ্জ থেকে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট চালু হয়ে গেছে। অর্থাৎ এটি পরীক্ষামূলক কিছু নয়। তিনি আরো জানান, ’৭২ সালের
নৌ-প্রটোকল অনুযায়ী এই ট্রানজিট চালু হয়েছে। আর এই নৌ-প্রটোকল অনুযায়ী নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে বছরে মাত্র সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা পেয়ে থাকে। ’৭২-এর নৌ-প্রটোকল অনুযায়ী ট্রানজিট চালু হওয়ার অর্থ শুধু বিনা পয়সায় নয়, বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে বাংলাদেশ এখন ভারতের ট্রানজিট কার্যকর করেছে। ’৭২ সালের নৌ-প্রটোকল অনুযায়ী যদি আশুগঞ্জ থেকে আগরতলা পর্যন্ত ট্রানজিট চালু করা যায় তাহলে এত দিন তা চালু হয়নি কেন?
১৯৭২ নয় ২০১০
আমরা জানি, ত্রিপুরার পালাটানায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনের জন্য ভারত দীর্ঘ দিন ধরে আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহারের দাবি করে আসছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলেও এই দাবি করা হয়েছিল। কিন' পালাটানায় এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনের অনুমতি দিলে তাকে উদাহরণ হিসেবে উত্থাপন করে স'ায়ী ট্রানজিটের দাবি জানাবে, আর এ কারণে সে সময় অনুমতি দেয়া হয়নি। কিন' বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই সুবিধা দেয়া হয় এবং আশুগঞ্জকে নৌবন্দর ঘোষণা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় এই ট্রানজিট দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। সে সময় প্রকাশিত যৌথ ইশতেহারের ২২ নম্বর দফায় উল্লেখ করা হয় “বৈঠকে বাংলাদেশের আশুগঞ্জ ও ভারতের শিলঘাটকে ‘পোর্ট অব কল’ ঘোষণার ব্যাপারে উভয় প্রধানমন্ত্রী একমত হন। নোট বিনিময়ের মাধ্যমে এ সম্পর্কিত আইডব্লিউটিটি প্রটোকল সংশোধন করা হবে। উভয়ে একমত হন যে, আশুগঞ্জ থেকে এককালীন বা দীর্ঘমেয়াদি ওডিসির (ওভার ডাইমেনশনাল কার্গো) পরিবহনব্যবস'া চালুর জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং এ ব্যাপারে সম্ভাব্য ব্যয় নিরূপণের জন্য একটি যৌথ টিম কাজ করবে। এ জন্য ভারত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করবে। উভয় দেশের ঠিকাদাররা কাজ পেতে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।”
এরপর পালাটানায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি ত্রিপুরায় নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুই দেশের বন্ধুত্বের উদাহরণ হিসেবে এসব যন্ত্রপাতি পরিবহনে কোনো ধরনের ফি আদায় করা হবে না। বাংলাদেশের এই উদার মনোভাবের প্রশংসা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং। তার ঢাকা সফরে যে যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয় এর ৩৫ নম্বর দফায় বলা হয়, ‘ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ওডিসি কার্গো যাতায়াতের অনুমতি দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছেন।’ ৩৬ নম্বর দফায় বলা হয়, ‘দুই প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় অভ্যন্তরীণ নৌ-ট্রানজিট ও বাণিজ্য প্রটোকলের আওতায় অতিরিক্ত ডক বন্দর হিসেবে আশুগঞ্জ ও শিলঘাটকে অন্তর্ভুক্ত করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। আশুগঞ্জ বন্দরে বহুমাত্রিক স'াপনা ব্যবহার করে ত্রিপুরার জন্য বাল্ক কার্গোর সফল পরীক্ষামূলক পরিচালনার জন্য তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। আশুগঞ্জে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত ও ব্যবহারোপযোগী হওয়ামাত্র বাল্ক কার্গোর জন্য ব্যবহারেরর ব্যাপারে সমঝোতা হয়েছে।’
ভারতের ট্রানজিটে বাংলাদেশের ভর্তুকি
এই ট্রানজিট কার্যকর করার জন্য বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে। কারণ ’৭২-এর নৌপ্রটোকল অনুযায়ী ভারত যে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে থাকে তার চেয়েও অনেক বেশি টাকা খরচ হয় নৌপথ ও নৌবন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য। এখন ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ভারতীয় জাহাজ আশুগঞ্জ বন্দরে ভিড়বে এবং এই নৌবন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য বিপুল পরিমাণ খরচ হবে। এর বাইরে সড়ক ব্যবহারের জন্য ও বন্দর ব্যবস'াপনার জন্য ভারত কোনো ফি বা মাশুল দেবে না। এখন বাংলাদেশের জনগণের করের টাকায় যেসব রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো দিয়ে এখন ভারতীয় যানবাহন চলাচল করবে। আর এসব রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হবে। ইতোমধ্যে ভারতের কার্গো ও ভারী ট্রাক চলাচলের ফলে আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রাস্তাঘাট বেহাল অবস'ায় পড়েছে। এমনকি নদীর প্রবাহ বন্ধ করে বিকল্প রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশকে কিভাবে ভর্তুকি দিতে হবে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, ভারতীয় কার্গোর জন্য ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট ফি তো দূরের কথা এ সেবায় বাংলাদেশের যে ব্যয় হচ্ছে তাও পুষিয়ে নিচ্ছে না সরকার। তিনি বলেন, ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে গঠিত কমিটি যে ফি নেয়ার প্রস্তাব করেছিল, সরকার বিবেচনায় নিয়েছে বলে তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কার্গোর ওপর ফি নির্ধারণ না করে সরকার একটি খারাপ দৃষ্টান্ত স'াপন করেছে, যা ভবিষ্যতে ভারতের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ট্রানজিটের জন্য ফি নির্ধারণে আলোচনা হলে সেখানে বর্তমান অবস'াকে উদাহরণ হিসেবে উপস'াপন করা হতে পারে। দেবপ্রিয় বলেন, আসলে সরকার বারবার অবস'ান বদলে ইতোমধ্যে কিছু ক্ষতি করে ফেলেছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ একসময় ট্রানজিট দেয়ার জন্য জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। এখন তিনি বলেছেন, ট্রানজিটে লাভ তো দূরে থাক ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ সিপিডির মতো ভারতবান্ধব প্রতিষ্ঠানও বুঝতে পারছে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার নামে বাংলাদেশ শেষ দরকষাকষির সুযোগটি হারিয়েছে।
আগে তারা কী বলেছিলেন
ভারত ইতোমধ্যে আশুগঞ্জ বন্দর থেকে ট্রানজিট সুবিধা পেয়েছে। এত দিন ধরে সরকারের অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার বলে আসছিলেন যে বিনা মাশুলে ট্রানজিট চালু হবে না। অর্থমন্ত্রী এ কথাও বলেছিলেন, ফি হোক বা মাশুল হোক একটা কিছু নেয়া হবে। এমনকি ট্রানজিটের ফি নির্ধারণের ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সে কমিটির সুপারিশও মানা হচ্ছে না। গত মে মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমণি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ট্রানজিটের বিনিময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাশ্রয়ের অংশ বাংলাদেশের পাওয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, শুধু অবকাঠামো ব্যয় তুলে আনা অর্থহীন হবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে মাশুল বা ফি একটা কিছু আদায় করা হবে। অপর দিকে এপ্রিলে একটি বার্তা সংস'াকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী বলেন, ট্রানজিটের জন্য ফি চাওয়ার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। তিনি আরো বলেন, তবে এর পরিমাণটা হতে হবে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়িত অর্থের সমপরিমাণ। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান গত মার্চ মাসে বলেছিলেন, ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে ফি নেয়া উচিত হবে না। তিনি ট্রানজিট ফি চাওয়াকে অসভ্যতা বলেও উল্লেখ করেন। গত ১১ অক্টোবর তিনি বলেন, ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্টে বাংলাদেশের লাভ হবে, না ক্ষতি হবে তা আমাদের জানা নেই। এ ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা না হওয়া পর্যন্ত ভারতের কাছ থেকে কোনো ফি নেয়া হবে না। ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার জন্য বাংলাদেশে যে কয়েকজন ব্যক্তি খুবই সোচ্চার ছিলেন, তাদের একজন এসকাপের সাবেক কর্মকর্তা রহমত উল্লাহ। তিনি ট্রানজিট সংক্রান্ত সরকার গঠিত কোর কমিটির সদস্য। তিনি বলছেন, নৌ-প্রটোকল সংশোধনের সময় মাশুল আরোপ না করা সরকারের একটি বড় ভুল। ফলে এখন বিনা পয়সায় ভারত ট্রানজিট নিচ্ছে- এতে আমাদের খারাপ লাগছে। বিনা মাশুলে ট্রানজিট দেয়ার বিষয়টি আটকানো যেত। সরকার বলতে পারত এখনো পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। তাই এই মুহূর্তে ট্রানজিট পণ্য আনা-নেয়া সম্ভব নয়। (প্রথম আলো ২০ অক্টোবর ২০১১) দেখা যাচ্ছে ট্রানজিট নিয়ে সরকারের মন্ত্রী ও ট্রানজিটের পক্ষে যারা জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন তাদের আগের অবস'ানের সাথে এখনকার কোনো মিল নেই।
ব্যক্তিগত ঋণ এবং জাতীয় স্বার্থ
ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে সরকার ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে একটি কোর কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটি রুট চিহ্নিত করা, মাশুল আরোপ, অবকাঠামো নির্মাণে এবং কী পরিমাণ বিনিয়োগ হবে তার পরিমাণ উল্লেখ করে একটি রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিয়েছিল। এই রিপোর্টে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় আগামী তিন বছরের আগে ট্রানজিট না দেয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন' সরকার গঠিত এই কমিটির সুপারিশ সরকার না মেনে ট্রানজিট চালু করেছে। কিন' কেন? আমরা লক্ষ করছি, ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার ক্ষেত্রে ভারতের আকাঙ্ক্ষার বাইরে সরকার কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। অনেকে মনে করেন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত বা দলীয় ঋণের কারণে ভারতের দাবিকে তারা উপেক্ষা করতে পারছেন না। ভারত বিনা মাশুলে ট্রানজিট চাইছে সরকার সেটাই বাস্তবায়ন করছে। ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের কাছে আজ জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে।