বদরুদ্দীন উমর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বদরুদ্দীন উমর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

কিসের সমুদ্র জয়?


২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকারের উদ্যোগে শেখ হাসিনার ‘বঙ্গোপসাগর জয়’ উপলক্ষে তাকে এক জৌলুসপূর্ণ সংবর্ধনা দেয়া হয়। বঙ্গোপসাগরে জলসীমা নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটা মতপার্থক্য বা বিবাদ বেশ কিছুদিন ধরেই ছিল। মাছ ধরা ও সাগরের তলদেশে তেল-গ্যাসসহ খনিজ সম্পদের ওপর অধিকার নিয়ে এই বিবাদের মীমাংসার জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে মামলা দায়ের করেছিল। যে কোনো সরকারকেই বর্তমান অবস্থায় এই মামলা বাধ্য হয়েই দায়ের করতে হতো। কারণ এই বিবাদ নিষ্পত্তি ছাড়া কোনো ব্লকই আইনসিদ্ধভাবে বরাদ্দ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই মামলার রায়টি এমন যাতে বাংলাদেশ ও মিয়মানমার উভয় সরকারই সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ একে আখ্যায়িত করেছে সমুদ্র জয় হিসেবে। উপকূলবর্তী দেশগুলোর সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন আছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দাবির যথার্থতা বিচার করে এই আইন অনুযায়ীই ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন। কাজেই এই রায় দ্বারা কোনো দেশের জয় হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। এ প্রশ্ন যে ওঠে না এটা মিয়ানমার সরকার কর্তৃক এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করা থেকেও বোঝা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা এরকম হওয়া সত্ত্বেও এই রায়কে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব বিজয় আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকার এক হুলুস্থুল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
বঙ্গোপসাগরের সীমা নির্ধারণ নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি এইভাবে হওয়ায় মিয়ানমার সন্তোষ প্রকাশ করলেও তারা এ নিয়ে কোনো হুলুস্থুল করছে না। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা হচ্ছে। এর থেকে অন্য যাই হোক, দুই দেশের শাসক শ্রেণীর ও তাদের সরকারি নেতৃত্বের সাংস্কৃতিক মানের একটা পরিচয় পাওয়া যায়। মিয়ানমারের নেতৃত্বের সাংস্কৃতিক মান বাংলাদেশের নেতৃত্বের সাংস্কৃতিক মান থেকে অনেক উঁচু হওয়ায় রায় নিয়ে লাফালাফির কোনো মানসিকতা তাদের নেই। বিষয়টিকে তারা সহজভাবেই নিয়েছে, যেমনভাবে তা নেয়া দরকার। মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে কোনো দুর্বল দেশ নয়। আকারে এবং খনিজ সম্পদসহ নানা সম্পদে তারা বাংলাদেশের থেকে অনেক বড় ও সমৃদ্ধ। দীর্ঘদিন সেখানে সামরিক শাসন বলবত্ থাকলেও সাধারণ সাংস্কৃতিক মানের উচ্চতার কারণে লাফালাফি ও দম্ভ প্রকাশের প্রবণতা তাদের সামরিক বাহিনীরও নেই। এর জন্য কোনো বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী প্রতিপালনের প্রয়োজনও তাদের হয় না।
এদিক দিয়ে বাংলাদেশ এক বিচিত্র দেশ। শুধু ‘সমুদ্র জয়’ নিয়ে নয়, বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সব ক্ষেত্রেই আজ যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তার মূলে আছে সাংস্কৃতিক মানের এই ভয়াবহ নিম্নতা। দৃষ্টিকে একটু গভীর করলে দেখা যাবে লুটতরাজ, চুরি, দুর্নীতি, প্রতারণা, সন্ত্রাস এবং বর্তমানে সৃষ্ট অরাজকতা—সবকিছুই এই সাংস্কৃতিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এদিক দিয়ে উনিশ ও বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সংস্কৃতির আকাশপাতাল পার্থক্য। কীভাবে এই পার্থক্য তৈরি হলো তার সুনির্দিষ্ট কারণ আছে, যা নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই।
‘সমুদ্র জয়’-এর কথা যখন উঠেছে তখন এ নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। সমুদ্রযুদ্ধে বাংলাদেশের জয় অর্থাত্ তার সীমানা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়ায় আসল লাভ হয়েছে সাম্রাজ্যবাদীদের, আমেরিকানদের। তেল কোম্পানি তাল্লো এবং কনোকো ফিলিপসকে বাংলাদেশ গ্যাস উত্তোলনের ইজারা দিয়েছে। কিন্তু জলসীমা নিয়ে বিবাদ থাকায় বাংলাদেশের এ কাজ আইনসিদ্ধ ছিল না। এখন সীমানা চিহ্নিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে ইজারাপ্রাপ্ত তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো পরম নিশ্চিন্তে গ্যাস উত্তোলনের কাজ এগিয়ে নিতে পারবে।
আমেরিকানদের সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের সুবিধা যে দেয়া হবে এটা আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বিগত নির্বাচনের আগেই জানিয়েছেন। সেই অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে তাল্লো এবং কনোকো ফিলিপস ইজারা পেয়েছে। শুধু এই একটি ব্লকই নয়, অন্য ব্লকগুলোর ইজারাও এভাবেই একাধিক আমেরিকান কোম্পানিকে যে দেয়া হবে—এটা প্রায় নিশ্চিত ব্যাপার। কাজেই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে যদি কারও জয় হয়ে থাকে তাহলে সে জয় আমেরিকার, তাদের তেল কোম্পানিগুলোর। একই সঙ্গে তাদের মত্স্য ব্যবসায়ী ইত্যাদির। তারাই প্রকৃতপক্ষে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমার ওপর নিজেদের আধিপত্য কায়েম রেখে পাহাড়প্রমাণ মুনাফা অর্জন করবে, বাংলাদেশের হাতে কিছু গুঁজে দিয়ে। অর্থাত্ বঙ্গোপসাগরে তারা বাংলাদেশের হাতে তামাক খাবে।
বঙ্গোপসাগরে ব্লক ইজারা দেয়া সত্ত্বেও তার কোনো আইনগত ভিত্তি আগে ছিল না। এখন তা তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে বিবাদ নিষ্পত্তির কাজটি করেছে বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের সমুদ্র ডেস্ক। এ কাজ করতে গিয়ে কারও ওকালতির কোনো প্রয়োজন হয়নি। সুনির্দিষ্ট আইন অনুযায়ীই এটা হয়েছে। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কোনো কৃতিত্ব নেই। সমুদ্রে গ্যাস কোম্পানিগুলোর ইজারা কার্যকর করার তাগিদই এক্ষেত্রে কাজ করেছে। বাংলাদেশের যে কোনো সরকারকেই এই পরিস্থিতিতে এটা করতে হতো। এখন এর ফলে ইজারা থেকে শত শত কোটি আইনি-বেআইনি ডলার লেনদেন হবে। আওয়ামী লীগের আগামী নির্বাচনের খরচও এর থেকে তোলার ব্যবস্থা হবে। আওয়ামী লীগের সমুদ্র বিজয় উত্সবের এটাই হলো মূল কারণ।
সমুদ্র বিজয় উপলক্ষে আওয়ামী লীগ তাদের দল ও সরকারের নেত্রীকে সংবর্ধনা দেয়ার মাধ্যমে যে কৃতিত্ব তাকে দেয়ার চেষ্টা করেছে, সে কৃতিত্বের কানাকড়িও তার পাওনা নয়। যারা এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল তারা জানেন যে, এ ধরনের সীমানা নির্ধারণ এই প্রথম নয়। এটা এক প্রচলিত ব্যাপার। কিন্তু এর আগে কোনো দেশকেই একে সমুদ্র জয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বিজয় উত্সব পালন করতে দেখা যায়নি। যা অন্য কোনো দেশে এই অবস্থায় দেখা যায়নি, এই বিচিত্র বাংলাদেশে সেটাই কাড়া নাকাড়া বাজিয়ে জনগণকে দেখানো হলো!!
২৮ এপ্রিল সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক বিরাট মঞ্চ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার আয়োজন হলো। আওয়ামী লীগের দ্বারা আয়োজিত এই সংবর্ধনা উপলক্ষে মঞ্চে বেশ কয়েকজন অদ্ভুত বুদ্ধিজীবীর উপস্থিতি দেখা গেল। এদের মধ্যে আয়ামী লীগের খুঁটিতে বাঁধা কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে নবাগত কয়েকজনও মঞ্চ আলোকিত করেছিলেন। দেশে সুবিধাবাদ এবং বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রহীনতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে—এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর মতোই ব্যাপার।
খুঁটিতে বাঁধা আওয়ামী বুদ্ধিজীবী সৈয়দ শামসুল হক (যিনি অনেক আগে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে হাসিনাকে ‘দেশরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এবং যিনি নিজের উদ্যোগেই নিজের নামের আগে ‘সব্যসাচী’ লেখার প্রচলন করেছেন) অভিজ্ঞানপত্র নামে একটি চতুর্থ শ্রেণীর রচনা পাঠ করার মধ্য দিয়েই সংবর্ধনা সভার কাজ শুরু হয়। তার পরই শুরু হয় অন্য বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা হাসিনার প্রশস্তি কীর্তন। নাগরিক সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, তারা হাসিনার মতো নেতা পেয়ে নিজেদের ধন্য মনে করেন। তিনি আরও অনেকদিন দেশে ক্ষমতার হাল ধরে রেখে জনগণের ও দেশের জন্য কাজ করতে পারবেন, এই আশা তিনি ব্যক্ত করেন। চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলী ও জনগণের কাছে আকুল আবেদন জানান যাতে তারা শেখ হাসিনার মতো দেশনেত্রীকে আরও অন্তত দুই টার্ম ক্ষমতায় রেখে বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ভোট দেন!!! অন্য চামচাদের কথাবার্তাও ছিল একই রকম যার বিস্তারিত উল্লেখের প্রয়োজন নেই। এই সংবর্ধনা থেকে স্পষ্টই বোঝা গেল যে, বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য যে সঙ্কটজনক পরিস্থিতি তৈরি তারা নিজেরাই করেছে, সে সঙ্কট থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেয়া এবং নির্বাচনে ভোটের বাক্স ভর্তি করাই ছিল এই সংবর্ধনার মূল উদ্দেশ্য।
এই সংবর্ধনার আয়োজন যে শেখ হাসিনার নিজের উদ্যোগেই এবং চামচাদের উত্সাহে হয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী যে কতখানি নির্লজ্জ এবং আত্মসম্মানহীন আচরণ করতে পারেন, এটা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সংবর্ধনার মাধ্যমে শুধু দেশের লোককেই নয়, দুনিয়ার লোককেও দেখিয়ে দিয়েছেন। এই সঙ্গে নিজেকে বর্ণনাতীতভাবে হাস্যস্পদ করেছেন।

মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

সামরিক খাতে ব্যয় ও জনগণের স্বার্থ


বাংলাদেশে সমস্যার কি শেষ আছে? মানুষের জন্য করণীয় কাজ কি কিছু কম আছে? এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য এসব খাতে ব্যয় বরাদ্দ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজন কি কেউ অস্বীকার করতে পারেন? এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কর্তৃক লাখ লাখ কোটি টাকার অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করা কি জনস্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? এর দ্বারা রাষ্ট্র ও সরকারের কোন মহল উপকৃত হচ্ছে এবং নিজেদের পকেট ভর্তি করছে এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশের দাবি কি যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত নয়?


বাংলাদেশ সরকার রাশিয়া থেকে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে (আমার দেশ, ১৩.২.২০১২)। বাংলাদেশ শুধু রাশিয়া থেকেই যে অস্ত্র কিনছে তাই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেন ইত্যাদি দেশ থেকেও বাংলাদেশ হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কিনে থাকে। একটি দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য অস্ত্র কেনা দরকার হয়। কাজেই বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর জন্য অস্ত্র কেনা হচ্ছে, শুধু এটাই কোনো অস্বাভাবিক বা অসাধারণ ব্যাপার নয়। এ নিয়ে সমালোচনারও কিছু নেই। কিন্তু যখন দেখা যায়, প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরকার ক্রয় করছে, তখন এ বিষয়ে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং প্রতিবাদ না করে উপায় নেই।
প্রথমত, এ বিষয়টির দিকে লক্ষ্য করা দরকার যে, বাংলাদেশ তার স্থলভাগের তিন দিকই ভারত দ্বারা বেষ্টিত এবং দক্ষিণে সমুদ্রসীমাও ভারতীয় সমুদ্রসীমার সংলগ্ন। এ ছাড়া আছে উত্তরে নেপাল ও ভুটান এবং পূর্ব দিকে মিয়ানমার। ভারত হচ্ছে বাংলাদেশের সব থেকে বড় বন্ধুদেশ। কাজেই তার বিরুদ্ধে বিশাল আকারের সমরসজ্জার কোনো প্রয়োজন আছে এটা মনে করার কারণ নেই। তাছাড়া ভারত সামরিকভাবে এতই শক্তিশালী যে, দৈবাৎ ভারতের সঙ্গে যদি বাংলাদেশের কোনো যুদ্ধ হয়, তাহলে বাংলাদেশকে সামরিকভাবে পরাজিত ও দমন করা ভারতের জন্য মাত্র কয়েকদিনের ব্যাপার। নিজেকে সামরিকভাবে এমনভাবে শক্তিশালী করার কোনো সাফাই বাংলাদেশের নেই, যাতে এর কোনো অন্যথা হতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সব থেকে বিবেচনার বিষয় হলো, ভারত বাংলাদেশ আক্রমণ করে দখল করবে এ সম্ভাবনা সম্পূর্ণ শূন্য। ১৯৭১ সালের বিশেষ পরিস্থিতিতে যা ঘটেছিল এখন সেটা ঘটতে পারে এটা মনে করা বাস্তব জ্ঞান ও বুদ্ধির অপরিপকস্ফতা ছাড়া আর কী?
নেপাল, ভুটান এমনকি মিয়ানমারও বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে এমনটি মনে করারও কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। সমুদ্রসীমা, তেলক্ষেত্রের দখল ইত্যাদি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের দ্বন্দ্ব থাকলেও এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হতে পারে এ চিন্তা কোনো বুদ্ধিমান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ওয়াকিবহাল কোনো ব্যক্তিই করতে পারেন না।
তাহলে বাংলাদেশের এমন শত্রু কে, যার মোকাবেলা করা ও যার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বাংলাদেশকে তার প্রয়োজনের থেকে বিশাল আকারে সামরিক বাহিনী রাখতে হবে, সামরিক বাহিনীর সংখ্যা সম্প্রসারণ করতে হবে এবং তাকে লাখ লাখ কোটি টাকার সমরসজ্জায় সজ্জিত করতে হবে? এসব প্রশ্ন কি বাংলাদেশের নাগরিকরা যথার্থভাবে উত্থাপন করতে পারেন না? এর জন্য কি তারা সরকারের কাছে এই বিপুল বিশাল পরিমাণ অর্থ অপচয়ের লৌকিকতা দাবি করতে পারেন না?
ভারত বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র। ভারত রাষ্ট্র বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কী ধরনের বন্ধু তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু ভারতের জনগণ যে বাংলাদেশের জনগণের বন্ধু, এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সাধারণ জনগণকে গুলিয়ে ফেলার মধ্যে জ্ঞানবুদ্ধির কোনো পরিচয় নেই। কিন্তু যুদ্ধের প্রশ্ন যখন আসে, তখন রাষ্ট্র পর্যায়ের সম্পর্কের কথাই বিশেষভাবে বিবেচনা করার কথা। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধের প্রশ্ন এখন একেবারেই নেই। তাছাড়া যে দেশ নিজের সীমান্তে নিজের নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতেও অক্ষম, সে দেশ ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করবে এটা তো ভাবাই যায় না। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়মিত ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করছে। এ নিয়ে সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে, সরকারিভাবে কিছু প্রতিবাদও হচ্ছে, কিন্তু এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। পরিস্থিতির মধ্যে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। উপরন্তু ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, সীমান্তে এইভাবে বাংলাদেশি নাগরিক নিধন চলবে!
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কোন প্রয়োজনে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো থেকে লাখ লাখ কোটি টাকার অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নিয়মিতভাবে কিনে চলেছে? এর দ্বারা কার স্বার্থ রক্ষিত ও পরিপুষ্ট হচ্ছে? জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে এই বিপুল ব্যয় কার কাজে লাগছে? সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনে এই ব্যয় রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্বে থাকা কোনো না কোনো মহলের স্বার্থ নিশ্চয় হাসিল করছে। সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব যখন এই কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তখন এর সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করার কোনো উপায় তো নেই।
লক্ষ্য ও বিবেচনা করার বিষয় যে, এই লাখ লাখ কোটি টাকা যখন সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম কেনার জন্য ব্যয় হচ্ছে তখন এ দেশের জনগণের বিপুল অধিকাংশের, গরিবদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। যেটুকু সামান্য ব্যবস্থা আছে সেটাও এখন প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে গরিবদেরও ইউজার ফি দিতে হচ্ছে, সমগ্র পরীক্ষার খরচও ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হচ্ছে। এ কারণে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (পূর্ববর্তী পিজি হাসপাতাল) এখন বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবার পরিবর্তে বিকেলে ২০০ টাকা ফি নিয়ে ডাক্তারদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে সামান্য যে সুযোগ-সুবিধা এখন গরিবদের জন্য আছে, সেটাও হরণ করার ব্যবস্থা হচ্ছে। এ তো গেল রাজধানী শহর ঢাকার অবস্থা। গ্রামাঞ্চলের অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, সেখানে সামান্যতম চিকিৎসারও কোনো ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসার নামে যা আছে তার সঙ্গে দোয়া-দরুদ ও জরি-বুটি দিয়ে চিকিৎসার কোনো পার্থক্য নেই।
দেশে এখন বেকারের সংখ্যা অগুনতি। যারা কাজ করে তাদের মজুরি ও বেতন প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। তারা প্রাণে বেঁচে থাকলেও তাদের দেহে পুষ্টি নেই এবং অপুষ্টিজনিত রোগে তারা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে। শিক্ষার অবস্থা শোচনীয়। প্রত্যেক বছরই গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোর পরীক্ষার ফলাফলের যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয় তার থেকেও শিক্ষার অবস্থা বোঝা যায়। কোনো রকম বিনিয়োগের অভাবে এসব স্কুলে প্রায়ই পরীক্ষা দেওয়া সব ছাত্রই ফেল করে থাকে। যারা কোনোমতে পাস করে তাদের শিক্ষার মানও শোচনীয়। শহরের ব্যক্তিমালিকানাধীন বেসরকারি স্কুলগুলোতে বড় আকারের ভর্তি ফি ও বেতন নিয়ে যে শিক্ষা দেওয়া হয় তার বাইরে অন্য স্কুলগুলোতে শিক্ষার মান অতি নিম্ন।
বাংলাদেশে সমস্যার কি শেষ আছে? মানুষের জন্য করণীয় কাজ কি কিছু কম আছে? এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য এসব খাতে ব্যয় বরাদ্দ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজন কি কেউ অস্বীকার করতে পারেন? এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কর্তৃক লাখ লাখ কোটি টাকার অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করা কি জনস্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? এর দ্বারা রাষ্ট্র ও সরকারের কোন মহল উপকৃত হচ্ছে এবং নিজেদের পকেট ভর্তি করছে এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশের দাবি কি যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত নয়?
বদরুদ্দীন উমর