সংসদ-আদালত মুখোমুখি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সংসদ-আদালত মুখোমুখি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৭ জুন, ২০১২

সুপ্রিমকোর্ট ও জাতীয় সংসদের দ্বন্দ্ব গভীর শাসন সঙ্কটের প্রতিফলন

ব দ রু দ্দী ন উ ম র
বাংলাদেশে এখন সমস্ত শাসন ব্যবস্থারই বেহাল অবস্থা। প্রথমত, এখানে মন্ত্রিসভা বলতে কার্যত যা বোঝায় তা নেই। মাঝে মাঝে এর বৈঠক হয় এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী তার ‘জ্ঞানগর্ভ’ ও ‘দেশপ্রেমমূলক’ নানা বক্তব্য প্রদান করে ভাষণ দেন। এটা-ওটা নির্দেশও তিনি তার পারিষদতুল্য মন্ত্রীদের দিয়ে থাকেন। কখনও সখনও তিনি তাদের কাউকে কাউকে ধমক-ধামক এবং হুমকিও দেন। এসবই হলো মন্ত্রিসভার রুটিন ব্যাপার। এসব থেকে বোঝা যায়, এই মন্ত্রিসভাটি মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের দ্বারা গঠিত কোনো প্রকৃত মন্ত্রিসভা নয়। এই মন্ত্রিসভা হলো শেখ এবং হাসিনার মন্ত্রিসভা! মন্ত্রিসভার জন্য একাধিক মন্ত্রীর প্রয়োজন। কিন্তু যেহেতু সেরকম কোনো মন্ত্রী নেই, এ কারণে মন্ত্রিসভাকে এভাবেই আখ্যায়িত করা ছাড়া আর কী করা যেতে পারে?
মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর একক ভূমিকা থাকার জন্য মন্ত্রীদের মধ্যে চিন্তার যে ঐক্য বিভিন্ন নীতি-বিষয়ে থাকা দরকার সেটা নেই। প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, সেটাই নীতি। আবার তিনি যে সব সময় একইভাবে কথা বলেন তা নয়। একই বিষয়ে তিনি সুযোগ বুঝে নানা রকম পরস্পরবিরোধী কথাও বলে থাকেন। তার এই ধরনের স্ববিরোধিতা এবং অসংলগ্ন কথাবার্তায় মন্ত্রিসভার কোনো অসুবিধা হয় না। উপরন্তু তারা এসবের ব্যাখ্যা দিতে ব্যস্ত থাকেন! দেশে-বিদেশে অবস্থিত আওয়ামী লীগের চামচা বুদ্ধিজীবীরাও গায়ে পড়ে একই কাজ করেন। এর পরিণামে দেখা যায়, মন্ত্রীরা নিজেরাও বিভিন্ন ইস্যুতে একে অপরের বিপরীত মতামত সংবাদ মাধ্যমে দিতে অসুবিধা বোধ করেন না। মনে হয়, মন্ত্রিপরিষদে তাদের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়ে কোনো আলোচনাও হয় না। হলেও তার কোনো গুরুত্ব থাকে না।
মন্ত্রিসভার মধ্যে এমন কয়েকজন আছেন যারা সংবাদ মাধ্যমের সামনে ও সভা-সমিতিতে প্রায়ই নানা বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী একজন। কোনো অর্থমন্ত্রী যে এত অর্থহীন কথা মুখ থেকে নিয়মিত উদগিরণ করতে পারেন এটা সংবাদপত্রে এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত না হলে বিশ্বাস করা কঠিন। শেয়ারবাজার, বিভিন্ন প্রকল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে তার আবোল-তাবোল কথাবার্তায় হদিস পাওয়া মুশকিল। তবে এই আবোল-তাবোল বকার সময় তিনি আবার মুখ ফসকে অনেক সময় এমন কথাও বলে থাকেন, যা সরকারের পক্ষে ক্ষতিকর। উদাহরণস্বরূপ কয়েকদিন আগে তিনি বললেন, পুলিশই হচ্ছে দেশের সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা এবং তাদের জন্যই উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পুলিশ সব সময়ই সরকারের পেয়ারের সংস্থা। কারণ পুলিশ দিয়েই তারা নিজেদের দুর্নীতি এবং অকর্মণ্যতার মোকাবিলা করে থাকেন। কাজেই অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পাল্টা বক্তব্য দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, পুলিশের কার্যকলাপ এবং অবস্থা এখন আগের যে কোনো সময়ের থেকেই ভালো! দেশে যখন পুলিশের হাজার রকম দুর্নীতি, অপহরণ, গুম-খুন, নির্যাতন নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুধু যে অসত্য তাই নয়, হাস্যকরও বটে। তিনি অবশ্য এরই মধ্যে অনেক লোক হাসানো বক্তব্য দিয়ে প্রসিদ্ধ হয়েছেন। এলজিআরডি মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য মন্ত্রীদের এই ধরনের বাগাড়ম্বরের বর্ণনা দেয়ার কোনো প্রয়োজন এখানে নেই। যারা নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন তারা আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও দলনেতাদের ক্ষমতামদমত্ত কথাবার্তার সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত। এসব দেখে মনে হয় না যে, বাংলাদেশে কোনো সুস্থ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নিয়মকানুনের শাসন আছে।
এ তো গেল সরকার ও সরকারি প্রশাসনের কথা। কিন্তু রাষ্ট্র ব্যবস্থার খবর কী? সেখানে সংকট কতখানি ঘনীভূত হয়েছে এটা এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ আদালত ও জাতীয় সংসদের মধ্যে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তার দিকে তাকালে বোঝা যাবে। একে বিতর্ক না বলে প্রকৃতপক্ষে গালাগালি বলাই সঙ্গত। সুপ্রিমকোর্ট ও জাতীয় সংসদ উভয়েই দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক সংস্থা। কাজেই এ দুইয়ের মধ্যে এ ধরনের দ্বন্দ্ব সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত কোনো শাসনব্যবস্থার লক্ষণ নয়।
লক্ষণীয় ব্যাপার, এই দ্বন্দ্ব এমন কোনো নীতিগত দ্বন্দ্ব নয়, যা সম্মানজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৪৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সময় মার্কিন কংগ্রেস ইস্পাত শিল্প জাতীয়করণ করেছিল। সেখানকার সুপ্রিমকোর্ট কংগ্রেসের সেই সিদ্ধান্ত নাকচ করেছিল, সেটা সংবিধানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিষয়ক অধিকার লঙ্ঘনের কারণ দেখিয়ে। কিন্তু এ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেস ও সুপ্রিমকোর্টের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ও গালাগালির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সুপ্রিমকোর্টের সংবিধানসম্মত রায় মার্কিন কংগ্রেস স্বীকার করে নিয়েছিল। সুষ্ঠু বুর্জোয়া শাসনব্যবস্থায় এটাই হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এখন সুপ্রিমকোর্ট ও জাতীয় সংসদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে সেটা একটা জমিকে কেন্দ্র করে। সুপ্রিমকোর্ট সংলগ্ন একটি জায়গায় সরকারের রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ ডিপার্টমেন্ট নিজেদের হেড কোয়ার্টার বিল্ডিং তৈরি করেছিল। এটা প্রায় ৫০ বছর আগের কথা। তার আগে ওই জায়গাটিতে ছিল একটি বড় সরকারি নার্সারি। নার্সারিটিকে উচ্ছেদ করে সেখানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ তাদের বিল্ডিং তৈরি করেছিল। যখন তারা এ কাজ করে তখন সুপ্রিমকোর্ট থেকে সেটা বন্ধের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এখন কোর্ট থেকে বলা হচ্ছে যে, যেহেতু সুপ্রিমকোর্টের কাজের পরিধি বেড়েছে সে কারণে বর্তমান সুপ্রিমকোর্ট বিল্ডিংয়ে তাদের স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। কাজেই ওই জায়গা এখন তাদের দরকার হয়েছে।
এটা হতেই পারে। কিন্তু এ নিয়ে যে দ্বন্দ্ব ও সাংবিধানিক সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে এটা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হতে পারে না। এর মীমাংসা সুপ্রিমকোর্ট এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই হতে পারত। কিন্তু তার পরিবর্তে এখন দেখা যাচ্ছে, সড়ক ও জনপথ বিভাগ নয়, জাতীয় সংসদ এ নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে এক কুিসত বিবাদ ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। আমাদের জানা নেই যে, বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি-না এবং সে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে কি-না। তবে এ পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমে যা জানা গেছে, তাতে মনে হয় না এ ধরনের কোনো আলোচনা ও মীমাংসার চেষ্টা এর আগে হয়েছে। সঙ্কট এখানেই। অন্যভাবে বলা চলে, দেশব্যাপী যে সাধারণ সঙ্কট দেখা যাচ্ছে তার প্রতিফলনই এর মধ্যে ঘটছে। সেটা না হলে, আগেই যা বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্ট সড়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই এ ব্যাপারে একটা মীমাংসা করতে পারতেন। এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের স্পিকার ২৯ মে জাতীয় সংসদে বিতর্কের সময় বলেন, ‘আদালত নিরপেক্ষ ও স্বাধীন। কিন্তু দেশের মানুষের বিচারের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর লেগে যাবে আর নিজেদের বিষয় বলে বিচার বিভাগ ঝটপট সিদ্ধান্ত নেবেন, এটি ভালো দেখায় না। উচ্চ আদালতের প্রতি ইঙ্গিত করে স্পিকার বলেন, কেবল নিজেদের বিষয়টি দেখলে সরকার কীভাবে চলবে? সরকারকেও সহযোগিতা করতে হবে।’ এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে আলোচনার পরামর্শ দেন তিনি। (সমকাল ৬.৬.১২)।
সুপ্রিমকোর্টের সংশ্লিষ্ট বিচারপতি বলেন, স্পিকার তাদের উদ্দেশে বলেছেন, তারা নিজেদের মনে করেন ‘আমরা কি হনু রে!’ (Daily Star 6.6.12)। এই ভাষা সম্পূর্ণ অসংসদীয় বা আন-পার্লামেন্টারি। তিনি বলেন, সংসদের কোনো সদস্য কোনো বিষয় আলোচনার জন্য উপস্থাপন করলে স্পিকারের দায়িত্ব হচ্ছে তা বিধিমোতাবেক পরিচালনা করা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে স্পিকার নিজেই বিতর্কে অংশগ্রহণ করে নিজের পদমর্যাদার অবমাননা করে প্রচলিত সাংবিধানিক রীতিনীতির বিরোধী কাজ করেছেন।
গত মঙ্গলবার ৫.৬.২০১২ তারিখে জাতীয় সংসদের এই বিতর্কে শুধু আওয়ামী লীগ সদস্যরাই নন, তাদের জোট সরকারের অন্য শরিকরাও অংশগ্রহণ করে স্পিকারকে সমর্থন করে সুপ্রিমকোর্টের সমালোচনা করেন। এই সমালোচনা কোন পর্যায়ে পৌঁছায় এটা বোঝা যাবে যখন আমরা লক্ষ্য করব একজন আওয়ামী লীগ এবং একজন জাতীয় পার্টির সদস্যের বক্তব্য। তারা দু’জনই বলেন, ‘বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক খুব ভাগ্যবান ব্যক্তি। আওয়ামী লীগের পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তাকে কোনো মৌখিক বা লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই হাইকোর্টের একজন অতিরিক্ত জজ করা হয়েছিল। পূর্ববর্তী বিএনপি সরকার তার এই নিয়োগ অনুমোদন না করলেও বর্তমান সরকার তা করেছে।’ বলাই বাহুল্য, এ কাজ আওয়ামী লীগ সরকারের বাহাদুরি হিসেবে তারা দেখাতে চাইলেও এটাকে একটা দুর্নীতি হিসেবেও চিহ্নিত করা যেতে পারে। থাক সে কথা। বিচারপতি মানিককে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সদস্য বলেন যে, তিনি রাস্তায় যাওয়ার সময় একবার এক ট্রাফিক পুলিশ অফিসার তাকে স্যালুট না করায় তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন! তিনি অন্যের ওপর জুলুম করে মজা পান!! জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বলেন, একবার বিমানের যাত্রী হিসেবে সাধারণ টিকিট কিনে বিজনেস ক্লাসে তাকে আসন করে দিতে বিমান কর্তৃপক্ষকে তিনি বাধ্য করেন!!! তিনি আসলে একজন উন্মাদ!!!! (Daily Star 6.6.2012).
যাই হোক, এটা অবশ্যই বলা যেতে পারে যে, আদালত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে বিষয়টি নিয়ে একটা মীমাংসায় অনায়াসেই আসতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে যেভাবে সুপ্রিমকোর্ট এবং জাতীয় সংসদ পরস্পরের বিরুদ্ধে কুিসতভাবে বিতর্ক ও গালাগালিতে নিযুক্ত হয়েছেন—এটা লঘুভাবে নেয়ার কোনো ব্যাপার নয়। এটা শুধু একজন সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সদস্যদের বাকবিতণ্ডা নয়। বর্তমান রাষ্ট্রের গভীর দেশে যে দ্বন্দ্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার প্রতিফলনই এসবের মাধ্যমে ঘটছে। দুই পক্ষই যেভাবে নিজেদের অবস্থান যুক্তিযুক্ত করার জন্য সংবিধানের আশ্রয় গ্রহণ করে বিতর্ক করেছে তার থেকে এটা বোঝারও অসুবিধা নেই যে, বাংলাদেশের সংবিধানও এখন বাস্তবতার কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। আদালত ও জাতীয় সংসদের দ্বন্দ্ব ও সাংঘর্ষিক সম্পর্ক অবসানের ক্ষেত্রে সংবিধান শেষ পর্যন্ত কীভাবে ব্যবহৃত হয় সেটাও দেখার বিষয়। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও শাসন ব্যবস্থা যে এক সমাধান অযোগ্য সঙ্কটের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে, সরকার ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অনৈক্য এবং দ্বন্দ্বের মধ্যেই এর পরিচয় স্পষ্টভাবে পাওয়া যাচ্ছে।
৬.৬.২০১২

সংসদ-আদালত মুখোমুখি

বিচারপতি মানিকের অপসারণ চাইলেন সাংসদরা
উত্তপ্ত সংসদ :তিন দিনের আলটিমেটাম

উত্তপ্ত সংসদে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের অপসারণ দাবি করেছেন সাংসদরা। এ জন্য তিনদিনের আলটিমেটাম দেওয়ার কথাও বলেছেন তারা। তা না হলে সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা পুনরায় সংসদেই ফিরিয়ে আনা হবে বলে উত্তপ্ত সংসদে জানিয়েছেন দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এ সময় সংসদের অধিবেশন কক্ষে থাকা সব সাংসদকে উল্লসিত হতে দেখা গেছে। সংসদ থেকে বলা হয়, বিচার বিভাগ স্বাধীন হতে পারে; কিন্তু তারা সংবিধান ও সংসদের ঊধর্ে্ব নয়। সংসদ থেকে বেশ
ক'জন সিনিয়র সাংসদ পয়েন্ট অব অর্ডারে এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং জাহাঙ্গীর হোসেনকে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করা বা সংসদ থেকে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের কথা বলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনদিনের মধ্যে অপসারণের প্রস্তাব করা হয়। তবে অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার বলেন, এই সিদ্ধান্ত হলো যে, স্পিকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি তার সিদ্ধান্ত জানাবেন।
আদালতের আদেশ প্রসঙ্গে স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেটের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ সময় তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়ে এখনও তিনি কিছু জানেন না। সাংবাদিকদের মাধ্যমেই শুনলাম। ফলে প্রতিক্রিয়া জানানোর কিছু নেই। তবে সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, পরে কখনও সংসদ অধিবেশনে স্পিকার এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন।
এর আগে বিকেলে অধিবেশন বসার পর থেকে গোটা সংসদ যেন ফুঁসছিল। এ বিষয়ে সংসদে কথা বলা হবে বলেও মাগরিবের বিরতিতে বেশ ক'জন সিনিয়র সাংসদ জানান। এর আগেই এ বিষয়ে জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল পয়েন্ট অব অর্ডার চাইলেও ডেপুটি স্পিকার তাকে সুযোগ দেননি। পরে মাগরিবের বিরতির পর তিনি আবার সুযোগ চাইলেও স্পিকার তাকে বুধবার পয়েন্ট অব অর্ডার দেবেন বলে জানান। এরপরই বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি তোলার জন্য দাঁড়ান। কিন্তু ডেপুটি স্পিকার তাকেও বুধবার সুযোগ দেবেন বলে জানান। এ সময় সব সাংসদ একযোগে শোরগোল শুরু করেন। সংসদে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে ডেপুটি স্পিকার রাশেদ খান মেননকে ফ্লোর দেন।
এরপরই একে একে সরকারি দলের সিনিয়র নেতারাও বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিকের নাম উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। একে একে বক্তব্য রাখেন তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মইনউদ্দিন খান বাদল এবং মুজিবুল হক চুন্নু। তবে আইনজীবী পেশায় নিয়োজিত আছেন এমন কোনো সাংসদ কোনো কথা বলেননি। এ সময় সংসদ নেতা শেখ হাসিনা অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন না।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, যে ঘটনা আজ ঘটেছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা তার নেই। '৭২ সালের সংবিধানে যেভাবে বিচারপতিদের অভিশংসনের সুযোগ রাখা ছিল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন করে সেটি ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, একজন স্যাডিস্ট বিচারককে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ বিচারক মানুষকে কষ্ট দিয়ে মজা পান। সালাম না দেওয়ায় পুলিশকে রাস্তায় কান ধরে ওঠবস করানো ছাড়াও তিনি বিমানে তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট কিনে কীভাবে সামনের সারিতে আসন চান সেটি আমরা দেখেছি। তিনি হয়তো কোনো একদিন সাংসদদেরও একইভাবে দাঁড় করিয়ে রাখতে চাইবেন।
এ পর্যায়ে তিনি বলেন, সাংসদদের এক হওয়া ছাড়া আর কোনো সুযোগ নেই। বিচার বিভাগ সর্বোচ্চ জেলে পাঠাতে পারবে। এটি নিয়ে ভেবে কোনো লাভ নেই। তিনি বলেন, অনেক আন্দোলনের মাধ্যমে এগিয়েছি। বিচারপতিদেরও বুঝতে হবে, বিচারপতিদের বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা। এটি আমাদের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, অবাক হয়ে গেলাম কীভাবে একজন বিচারক সংবিধান লঙ্ঘন করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে কি বিচার বিভাগ সংসদের ঊধর্ে্ব উঠে গেল? তিনি বলেন, এই বিচারপতিকে আগেরবার আওয়ামী লীগ চাকরি দিয়েছিল; কিন্তু জোট সরকার তার চাকরি স্থায়ী করেনি। এবার আবার আওয়ামী লীগ এসে তার চাকরি কনফার্ম করেছে। আর তিনিই কি-না একজন মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে এমন কথা বলেন!
আদালতের রায়কে সংবিধানের ওপর বিচার বিভাগের নগ্ন হস্তক্ষেপ মন্তব্য করে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, বিচার বিভাগ সংসদের ওপর সার্বভৌম হতে পারে না। বিচারপতিরা সংসদের ঊধর্ে্ব নন। এ ধরনের আদেশকে আমরা সংসদের ওপর বিচার বিভাগের নগ্ন হস্তক্ষেপ মনে করি।
তিনি বলেন, বিচারপতি স্পিকারকে অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী বলে অভিহিত করেছেন। সংসদের কোনো বিষয় নিয়ে আদালতে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের হাত লম্বা। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তাদের হাত সংসদের চেয়েও লম্বা। বিচার বিভাগ কীভাবে স্পিকারকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, স্পিকারকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলা মানে সংসদ, সাড়ে তিনশ' সাংসদ, সরকার_ সবাইকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল করা। সংসদের ওপর বিচার বিভগের হাত নেই। স্পিকারকে অপমান করার ক্ষমতা বিচার বিভাগের নেই। এই বিচার বিভাগের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আদালতে বসে যা কিছু করবেন, সংবিধান লঙ্ঘন করবেন, এটা হতে পারে না। সবকিছুর এটা সীমা আছে।
তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, সংসদের ওপর বিচার বিভাগের এ নগ্ন হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার জন্য সংসদে প্রস্তাব চাই। সংসদের ওপর হস্তক্ষেপকারী ওই বিচারপতিকে বিচার বিভাগ থেকে প্রত্যাহার করে সংসদের সার্বভৌম রক্ষা করতে চাই।
রাশেদ খান মেনন একটি অনলাইন বার্তা সংস্থার সংবাদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সংসদে আলোচনার বিষয় নিয়ে আদালত কোনো কার্যধারা গ্রহণ করতে পারেন না। বিচারপতি বিষয়টি কার্যধারায় নিয়েছেন শুধু তাই নয়, বলেছেন, স্পিকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল অপরাধ করছেন। স্পিকারের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিচারপতি সংসদের আলোচনার কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে পারেন না। সংসদের বিষয় নিয়ে কথা বলা সঙ্গত মনে করি না। বিচারপতি এটা করে এই হাউসের সার্বভৌমত্ব ও অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করেছেন। সংবিধান, সংসদকে অবহেলা করেছেন। এটা সংবিধানের ৭৩ ধারার লঙ্ঘন। এ ব্যাপারে সংসদকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, বিচারপতি স্পিকারের অ্যাডভোকেটশিপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, যা তিনি করতে পারেন না।
মেনন এবং সেলিমের পর ডেপুটি স্পিকার আর কোনো সাংসদকে সুযোগ দিতে না চাইলে আবার সাংসদরা হৈ-হৈ করে ওঠেন। তা ছাড়া বিভিন্নজনের বক্তব্যের মাঝে সাংসদরা 'শেম শেম' বলে মন্তব্য করতে থাকেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, '৭২ সালের সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদকে দেওয়া হয়েছিল। ওই ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে আনতে পাঁচ মিনিটের বেশি লাগবে না। এ সময় তিনি প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আপনারাই সংবিধানে দেওয়া আপনাদের ক্ষমতার প্রয়োগ করেন। অবিলম্বে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন করুন। তিনি বলেন, সংবিধান লঙ্ঘন করে ইতিমধ্যেই তিনি (এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী) বিচারপতির পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তিনদিনের মধ্যে অভিশংসন করুন। না হলে সংসদ থেকেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই আহ্বান সুরঞ্জিত রাষ্ট্রপতির কাছেও রাখেন।
তিনি বলেন, সংবিধানের হেফাজত করার ক্ষমতা সংসদ ও সাংসদদের হাতে। কেউ যাতে সংবিধানের লঙ্ঘন করতে না পারে সেটি সাংসদরাই দেখবেন। যিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেন তাকে আর ওই পদে রাখা কোনো অবস্থাতেই সমীচীন হবে না।
জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, সামান্য কারণে ওই বিচারপতি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের দাঁড় করিয়ে রাখেন। সবকিছু দেখে মনে হয়েছে, তিনি মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃপ্রবর্তন করে তার অভিশংসন হওয়া প্রয়োজন।
মইনউদ্দিন খান বাদল বলেন, এ দেশেও পাকিস্তানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে যিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন তাকে অজ্ঞ বলা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। সংবিধানের কথা নিয়ে আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের একটি অঙ্গকে অপর একটি অঙ্গের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হচ্ছে। এটিও মেনে নেওয়া যায় না।

সংসদ-আদালত মুখোমুখি

স্পিকারের বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল :হাইকোর্ট
সংবিধান অনুসারে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে

রাজধানীতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের দখলে থাকা সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি উচ্চ আদালতের রায়ে পুনরুদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে স্পিকার আবদুুল হামিদ অ্যাডভোকেটের বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল ও আদালত অবমাননাকর বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সংবিধান ও বিচার বিভাগ সম্পর্কে স্পিকারের নূ্যনতম জ্ঞান নেই মন্তব্য করে আদালত বলেছেন, 'সংসদের অভিভাবক হলেন স্পিকার। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুসারে তিনি রাষ্ট্রের তিন নম্বর ব্যক্তি। অথচ তার (স্পিকার) সংবিধান, সংসদ ও আদালত
সম্পর্কে নূ্যনতম জ্ঞান নেই। তাই ওই পদে থাকার যোগ্যতাও তার নেই।'
আদালত বলেছেন, সংবিধান অনুসারে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগের কাজে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো চাপ নেই। অথচ স্পিকার সংসদে বলেছেন, আইনমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে সড়ক ভবনের সম্পত্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তাকে বলা যেত। আদালত বলেন, তাহলে কি স্পিকার মনে করেন আইনমন্ত্রীর নির্দেশে বিচার বিভাগ চলে। বিচারাধীন বিষয়ে স্পিকারের এ বক্তব্য আদালত অবমাননাকর। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনগণকে উসকে দিয়ে স্পিকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধও করেছেন।
বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার জনস্বার্থে করা একটি আবেদনে এসব মন্তব্য করেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গতকাল দুপুরে ২৯ মে সংসদে উচ্চ আদালতের সমালোচনা করে স্পিকারের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়টি নিয়ে পরদিন তিনটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ আদালতের নজরে আনেন।
২৯ মে জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে সাংসদ শাহরিয়ার আলমের করা প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেছিলেন, 'আমি যদি মনে করি সংসদই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, সরকার যদি মনে করে তারাই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, আবার আদালত যদি মনে করেন যা ইচ্ছা তা করবেন_ এটা ঠিক নয়। কোর্টের বিচারে (রায়ে) জনগণ যদি ক্ষুব্ধ হয় তাহলে বিচারকের বিরুদ্ধে এক সময় রুখে দাঁড়াতে পারে। এমনিভাবে সরকারও যদি জনগণের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী মনোভাব পোষণ করে, জনগণ একদিন সরকারের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াবে। এ ধরনের ইতিহাস আছে।' স্পিকার আরও বলেন, 'আমি কী হনুরে' ভাবসাব ঠিক নয়। কোনো ভাব না দেখিয়ে সবারই উচিত দায়িত্ব পালনের মনোভাব রাখা।
দিনভর শুনানির পর বিকেলে আদালতের আদেশে বলা হয়, দুই সাংসদ আবদুল মতিন খসরু ও নুরুল ইসলাম সুজন আশ্বস্ত করেছেন বিচার বিভাগের ওপর সরকারের কোনো ব্যক্তি বা বিভাগের চাপ নেই। স্পিকার ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সংসদে উচ্চ আদালতের সমালোচনা করেছেন, যা অপ্রত্যাশিত। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে দেশ ও জনগণের মঙ্গলের জন্য অবশ্যই স্পিকার এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করবেন। আদেশে আরও বলা হয়, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদের কার্যপ্রণালি নিয়ে কোনো সাংসদকে আদালতে তলব করা যায় না। এ ধরনের দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে বিচারাধীন কোনো বিষয়ে সংসদে সমালোচনা করা এবং জনগণকে উসকে দেওয়াটা দুঃখজনক। এর আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আইনজীবী আনিসুল হক হাইকোর্টের নির্দেশে তাদের (সড়ক ও জনপথ) দখলে থাকা কয়েকটি ভবন ও কক্ষ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে হস্তান্তর করেন। এর ভিত্তিতে আদালত এ বিষয়ে আগামী ১০ জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
শুনানি : গতকাল দুপুর ১২টায় সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি বিষয়টি নিয়ে শুনানি শুরু হয়। এ পর্যায়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আইনজীবী আনিসুল হক আদালতে বলেন, গতকাল (সোমবার) রাতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে হাইকোর্টের আদেশ অনুসারে সড়ক ভবনের কিছু অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশও শিগগিরই আদালতের নির্দেশ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এর পর সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি রক্ষার বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আদালতে তিনটি জাতীয় দৈনিক সমকাল, কালের কণ্ঠ ও আমাদের অর্থনীতিতে প্রকাশিত সংবাদ উপস্থাপন করেন। পত্রিকাগুলোতে উচ্চ আদালতের সমালোচনা করে স্পিকারের বক্তব্য ছাপা হয়েছে জানিয়ে মনজিল মোরসেদ আদালতে তা পড়ে শোনান।
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, 'আমি কী হনুরে'_ এটা কোনো সংসদীয় ভাষা হতে পারে না। স্পিকার একজন আইনজীবী। তিনি কি জানেন না বিচারাধীন বিষয়ে উচ্চ আদালতের সমালোচনা করা যায় না। তখন 'কোর্টের বিচারে (রায়ে) জনগণ যদি ক্ষুব্ধ হয়, তাহলে বিচারকের বিরুদ্ধে এক সময় রুখে দাঁড়াতে পারে।' _স্পিকারের এ মন্তব্যের সমালোচনা করে আদালত বলেন, 'এটা পুরোপুরি আদালত অবমাননাকর। জনগণকে তিনি উসকে দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল অপরাধ করেছেন। সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে আদালত বলেন, সাংসদরা বিচার বিভাগের রায়সহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। আইন প্রণয়নের জন্য সাংসদরা এটা করতে পারেন। স্পিকার বিচারাধীন বিষয়ে কোনোভাবেই সাংসদদের উসকে দিতে পারেন না। আইনজীবী হিসেবে স্পিকারের বার কাউন্সিলের সনদ থাকা উচিত কি-না তা নিয়েও এখন ভাবতে হবে। এ সময় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের একটি অংশ উল্লেখ করে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আদালতকে বলেন, 'স্পিকার বলেছেন, আইনমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে তাকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা যেত।' তখন আদালত বলেন, আইনমন্ত্রী কি বিচার বিভাগ চালায়। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সরকারের কোনো সংস্থা বিচার বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলার কে? এ সময় বিচারকক্ষে উপস্থিত সাংসদ নুরুল ইসলাম সুজনের কাছে বিষয়টি জানতে চান। জবাবে সুজন বলেন, সেদিন আমি সংসদে ছিলাম। পত্রিকায় যেভাবে ছাপা হয়েছে এতটা আক্রমণাত্মক স্পিকার ছিলেন না। এ পর্র্যায়ে আদালত বলেন, টিভিতে সরাসরি সংসদের কার্যপ্রণালি দেখানো হয়। তা ছাড়া আদালতে উত্থাপিত তিনটি পত্রিকার বক্তব্য প্রায় একই ধরনের। এর পর ৪৫ মিনিট মধ্যাহ্ন বিরতির পর দুপুর পৌনে ৩টায় শুনানি শুরু হলে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সাংসদ সুজন আদালতে নিয়মিত প্র্যাকটিস করছেন। ওইদিন সংসদে তার উপস্থিতিতে স্পিকার কীভাবে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বিষয়ের সমালোচনা করলেন। জবাবে কনিষ্ঠ বিচারপতি বলেন, এটা কোনো কথা হতে পারে না। তাহলে তো সাংসদ হতে হলে সবাইকে আইনজীবী হতে হবে। এ সময় সাংসদের কার্যপ্রণালি ও স্পিকারের ভূমিকা বিষয়ক যুক্তরাজ্যের আর্থার কিন মে এবং ভারতের একজন প্রখ্যাত লেখকের দুটি বইয়ের কিছু অংশ উদৃব্দত করে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, বিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ স্বাধীন। ব্রিটেনের একটি আদালত বিংশ শতাব্দীতে একটি ঘটনায় স্পিকার, পরে প্রধানমন্ত্রীকে তলব করেন। এ নিয়ে পরে রাজা মধ্যস্থতা করে বিচার বিভাগের পক্ষে মত দেন। আদালত বলেন, স্পিকার কোনোদিন এ বই পড়েছেন কি-না সন্দেহ রয়েছে। এ বই দূরে থাক এখন মনে হচ্ছে, সংবিধান ও আদালত সম্পর্কে নূ্যনতম জ্ঞান স্পিকারের আছে কি-না। জবাবে সাংসদ সুজন বলেন, স্পিকারের কাছে সঠিক তথ্য ছিল না। তখন আদালত বলেন, সড়ক বিভাগ ও শিশু একাডেমী ১৯৮৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তির কিছু অংশ লিজ নিয়েছিল। এ নিয়ে দেড় বছর মামলা চলার পর হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট সড়ক বিভাগ ও শিশু একাডেমীর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। অর্থাৎ উচ্চ আদালত তাদের দখলে থাকা সম্পত্তি ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে সড়ক বিভাগও তাদের দখলে থাকা সম্পত্তির বেশ কিছু অংশ ফেরত দিয়েছেন। অহেতুক এ নিয়ে জনগণকে কেন বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যায়ে আদালতে উপস্থিত হন সাবেক আইনমন্ত্রী আইনজীবী আবদুল মতিন খসরু। তাকে উদ্দেশ করে হাইকোর্ট বলেন, মি. খসরু আপনিও তো আইনমন্ত্রী ছিলেন? আপনি কি সুপ্রিম কোর্টকে পরিচালনা করতেন? আপনি কি বিচারপতিদের ডাণ্ডাবেড়ি পরাতেন? এ সময় অ্যাডভোকেট খসরু বলেন, কখনও নয়। সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন। আদালত বলেন, স্পিকারের বক্তব্য শুধু অজ্ঞতাই নয়, তার বক্তব্য অমার্জনীয়। খসরু বলেন, এ বিষয়ে এখানে থেমে যাওয়াই আমাদের সবার জন্য মঙ্গলজনক। এ সময় আদালত বলেন, স্পিকারই বিষয়টি শুরু করেছেন। আমাদের তো জবাব দিতেই হবে। উনি জনগণকে বিদ্রোহ করার জন্য উসকানি দিচ্ছেন। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। খসরু বলেন, স্পিকার আবদুল হামিদ একজন আইনজীবী এবং অত্যন্ত সিনিয়র সংসদ সদস্য। তখন আদালত বলেন, উনি তো বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। আইন অনুযায়ী তিনি কোনো বিতর্কে অংশ নিতে পারেন না। আলোচনার সূত্রপাত তিনি করেছেন। আমরা তার বক্তব্যে হতবাক হয়েছি। দায়মুক্তির অপব্যবহার তিনি করতে পারেন না। তিনি জানেন, আমরা তাকে ডকে দাঁড় করাতে পারব না। তিনি ভীষণভাবে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। তার বক্তব্যে আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছি। এ সময় খসরু বলেন, স্পিকার সংসদের প্রতীক। আদালত বলেন, ওই প্রতীক হতে হলে যোগ্যতা থাকতে হয়। পড়ালেখা জানতে হয়। তিনি বিচারাধীন বিষয়ে আলোচনায় শরিক হয়েছেন। এ পর্যায়ে খসরু বলেন, কারও বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। স্পিকারকে সঠিক তথ্য তুলে ধরা হবে। নিশ্চয় তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বলেন, আদালত স্বাধীন। এটা বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বীকৃত। ভারতে প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত আদালতে তলব করা হয়েছিল। তখন আদালত বলেন, পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীকে কিছুদিন আগে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর পর আদালতের আদেশে স্পিকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গটি এলে আইনজীবী আনিসুল হক হাতজোড় করে দেশ ও জনগণের মঙ্গলের জন্য সংযত হতে অনুরোধ করেন। আনিসুল হক বলেন, আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আর আপনি মুক্তিযোদ্ধা। দেশ ও জনগণের মঙ্গলের জন্য একবার ভাবুন। তখন দুই সাংসদ মতিন খসরু ও নুরুল ইসলাম সুজনসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীও আদালতকে দেশ এবং জনগণের মঙ্গলের জন্য বিচার বিভাগ ও সংসদকে মুখোমুখি না করতে অনুরোধ জানান। আবদুল মতিন খসরু বলেন, কোনো পক্ষ বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছে। তাদের ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে। এ পর্যায়ে কনিষ্ঠ বিচারপতি সাউন্ড বক্সের সুইচ বন্ধ করে দেন। আদেশের বিষয়টি নিয়ে তারা সেখানে বসে প্রায় ১০ মিনিট আলোচনা করেন। এর পর খাসকামরায় গিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট আলোচনা করেন দুই বিচারপতি। এরপর আদেশ দেওয়া হয়। আদেশে আরও বলা হয়, আদালত কখনও সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের বিরুদ্ধে নয়। কারণ রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ জনগণের কল্যাণে কাজ করছে। তাদের কাজ ও জবাবদিহিতা সংবিধান অনুসারেই নির্ধারিত রয়েছে।