alamgir alam লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
alamgir alam লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ২০১৭

আন্তর্জাতিক আইনে সই করুন, গঙ্গা ব্যারাজ বাতিল নয়

গত এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের সফরে নয়াদিল্লি যান। সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে যেসব সমঝোতা ও চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, দেশে ফিরে গণভবনে এর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তিনি এক সংবাদ সম্মেলন করেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আন্তসীমান্ত নদীগুলোর পানি ভাগাভাগির কথাও বলেছেন। বিশেষ করে তিস্তার পানি চুক্তি না হওয়ায় বাংলাদেশে যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে, সে কথাও সংবাদ সম্মেলনে উঠে এসেছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। তারপরও বিষয়টি নিয়ে অনেক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে তিস্তা ব্যারাজের একজন ভূতপূর্ব প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে এ বিষয়ে আমার যে অভিজ্ঞতা এবং দেশের একজন পানি প্রকৌশলী হিসেবে আমার যে উপলব্ধি, তা এখানে উল্লেখ করতে চাই।

তবে আমার উপলব্ধি প্রকাশের আগে গত ১৮ মে প্রথম আলো তিস্তা সম্বন্ধে চার পৃষ্ঠার অত্যন্ত সময়োপযোগী ও চমৎকার যে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে, তা নিয়ে দু-একটা কথা বলি। তিস্তার পানি যে প্রত্যাহার করে মহানন্দায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং ভারত যে তা করতে পারে না—এমন তথ্য আমি সেখানে প্রত্যাশা করেছিলাম। এমনও হতে পারে, আমাদের দেশের পানি বিশেষজ্ঞরাও হয়তো এ বিষয়ে খবর রাখেন না।

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এই নদী হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে ২৪৯ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার দহগ্রামে প্রবেশ করে ১১৭ কিলোমিটার পথ প্রবাহিত হয়ে তিস্তামুখ ঘাটের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদে পড়েছে। জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের ‘কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য নন-নেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কোর্সেস’ (Convention on the law of the non-navigational uses of International Water Courses) ২০১৪ সালে ৪০টি দেশের অনুস্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছে। সেই আইনে এ ধরনের আন্তর্জাতিক নদীর অববাহিকায় যেসব দেশ রয়েছে, তাদের মধ্যে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে ওই সব নদীর পানি ব্যবহারের একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং ভারতের অংশে তিস্তা অববাহিকায় যে সেচব্যবস্থায় জমি রয়েছে, এর জন্য যে পানির প্রয়োজন, তার দাবি ভারত করতে পারবে। মোটকথা, ভারত অংশে তিস্তা অববাহিকায় যে সেচ অবকাঠামো আছে, তার জন্য পানি চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এযাবৎকাল বিভিন্ন আলোচনায় ভারত পানির যে দাবি করছে, আমাদের জানামতে, এর মাত্র চার হাজার কিউসেক পানি গজলডোবা ব্যারাজের বাঁ ক্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে, যাকে ভারতের প্রকৃত তিস্তা অববাহিকা বলা যায়। এই পানির পরিমাণ অতি সামান্য। সুতরাং প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে ভারত যে তিস্তা প্রকল্পে প্রায় ২০ হাজার কিউসেক পানি দাবি করছে, তা কোথায় যাচ্ছে?

গুগলের ম্যাপে দেখা যায় যে গজলডোবা ব্যারাজের ভাটিতে নয়, কিছুটা উজানে এবং দক্ষিণে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি লিংক ক্যানেলের মাধ্যমে পানি অপর একটি আন্তর্জাতিক নদী মহানন্দায় নির্মিত ব্যারাজে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ভারতের ওই মহানন্দা ব্যারাজের যে সেচ এলাকা, তাকেই ভারত তাদের তিস্তার সেচ প্রকল্প বলে চালিয়ে দিচ্ছে, এটা আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ বরখেলাপ।

মনে রাখা দরকার, আন্তর্জাতিক নদীর এক অববাহিকার পানি অন্য অববাহিকায় নেওয়ার কারণে বহু দেশে আন্তর্জাতিক বিরোধের অবতারণা হয়েছে। সে জন্য এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ ‘কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য নন-নেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কোর্সেস’-এর মাধ্যমে অববাহিকাভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক আইনের খসড়া প্রস্তুত করে। বহু বছরের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার পর তা প্রয়োজনীয় ৪০টি দেশের অনুস্বাক্ষরের পর ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছে। ফলে এখন আর একতরফাভাবে তিস্তার পানি অন্য নদীর অববাহিকায়, অর্থাৎ তিস্তার পানি মহানন্দায় প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। ফলে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে হলে আন্তর্জাতিক নদীর অভিন্ন অববাহিকাভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক আইনের ওপর নির্ভর করা বাংলাদেশের স্বার্থের বিশেষ অনুকূল হবে। অথচ এই আইন বলবৎ হলে বাংলাদেশ এখনো তাতে অনুস্বাক্ষর করেনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তঁাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তঁার এই মেয়াদেই, অর্থাৎ ২০১৮ সালের মধ্যেই তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি হয়ে যাবে। এই বণ্টন কিসের ভিত্তিতে হবে, তা কিছুটা অস্পষ্ট। তবে কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের পত্রপত্রিকায় এ বিষয়ে যেসব খবরাখবর প্রকাশিত হয়েছে তাতে বোঝা যায়, ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরের সময় চূড়ান্ত পর্যায়ে চুক্তি না হলেও যে সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি হতে যাচ্ছিল, সে সমঝোতাই হয়তো চূড়ান্ত হয়ে রয়েছে। ওই সমঝোতায় পানি কোন হিসাবে বণ্টন করা আছে, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানা না গেলেও পত্রিকান্তরের খবরে বোঝা যায়, বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ পানি কম পাবে। কোন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এ ধরনের খসড়ায় সম্মত হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই। তবে মনে রাখতে হবে, সেটা ছিল ২০১১ সাল। তখন অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টনে ন্যায়নীতিভিত্তিক কোনো আন্তর্জাতিক আইন বলবৎ ছিল না। এখন আন্তর্জাতিক নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানি ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে বণ্টনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটা আইন অন্তত আছে। সুতরাং ২০১১ সালে যদি একটি খসড়া সমঝোতায় বাংলাদেশ সম্মত হয়েও থাকে, তাহলে বর্তমান বাস্তবতায় তাতে আমাদের রাজি হওয়া উচিত হবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশকে তার স্বার্থের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তিস্তার অববাহিকাভিত্তিক যেটুকু পানি বাংলাদেশের প্রাপ্য, তা কঠিনভাবে দাবি করতে হবে। এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে ২০১১ সালের সমঝোতার সময় আন্তর্জাতিক আইনের অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশের পক্ষে পানির দাবিটি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তিস্তা ভারত অংশে প্রায় সম্পূর্ণ একটি পাহাড়ি নদী। সেখানে সেচযোগ্য জমির পরিমাণ খুবই নগণ্য। ফলে অববাহিকাভিত্তিক পানিবণ্টনে ভারতের ভাগে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পানি প্রাপ্য হতেই পারে না। গজলডোবা ব্যারাজের ভাটিতে ভারতে তিস্তা অববাহিকায় যে চাষযোগ্য সামান্য জমি রয়েছে, তার জন্য ভারত পানি দাবি করতে পারে। গজলডোবা ব্যারাজের বাঁ ক্যানেলে চার হাজার কিউসেক পানি দাবি করা হয়েছে। আমাদের জানামতে, এই এলাকা সম্পূরক সেচ প্রকল্প। অর্থাৎ ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত পানির দরকার। তখন তিস্তায় প্রয়োজনীয় পানি থাকে। এর জন্য পানি ভাগাভাগির প্রয়োজন নেই। যখন শুষ্ক মৌসুমে গজলডোবায় পানিপ্রবাহ প্রায় পাঁচ হাজার কিউসেকে নেমে আসে, তখনই সে পানি থেকে কোন দেশ কতটুকু নেবে, তা নিয়ে পানি ভাগাভাগি চুক্তির দরকার।

বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পের আকার প্রায় ৫ লাখ হেক্টর এবং পানির প্রয়োজন প্রায় ১০ হাজার কিউসেক। এই বিবেচনায় বাংলাদেশের তিস্তা অববাহিকার যে বিশাল আকার, তাতে বাংলাদেশ অন্তত তিস্তার ৭০ শতাংশ পানির প্রাপ্যতা দাবি করতে পারে। আগেই বর্ণনা করা হয়েছে, গজলডোবা থেকে একটি লিংক ক্যানেলের মাধ্যমে ২৫ কিলোমিটার দূরে মহানন্দা ব্যারাজে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ভারতের তিস্তা প্রকল্প নামে যে প্রকল্প, যাতে ভারতে তিস্তার ডান ক্যানেলে যে প্রায় ১৬ হাজার কিউসেক পানির দাবি করা হচ্ছে, তা তিস্তা অববাহিকাই নয়। তা অন্য একটি আন্তর্জাতিক নদী, মহানন্দা নদীর অববাহিকা। ফলে তিস্তা আলোচনায় ওই মহানন্দা অববাহিকা এলাকা বাদ দিতে হবে। এই দাবি নতুন করে উপস্থাপন করলেই কেবল তিস্তার পানির ওপর বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতা জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। সব বিবেচনায় এর জন্য মহানন্দা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা জোরালোভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে উত্থাপন করতে হবে। মনে রাখা দরকার, মহানন্দা নদীর ন্যায্য পানির অভাবে প্রায় সারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাই সেচের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সুতরাং মহানন্দার পানির দাবি কতটা জোরালোভাবে করা যাবে, তার ওপর হয়তো বাংলাদেশের তিস্তার পানিপ্রাপ্তি বহুলাংশে নির্ভর করবে।

এই দাবি কার্যকরভাবে আদায় করতে হলে ২০১৪ সালে আইনে পরিণত হওয়া আন্তর্জাতিক আইনের ওপর বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হবে। ভাটি দেশের জন্য প্রণীত ওই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অবিলম্বে বাংলাদেশকে অনুস্বাক্ষর করতে হবে। এ জন্য জনমত গড়ে তোলা সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব বলে মনে করছি।

এবার আসি গঙ্গা ব্যারাজ প্রসঙ্গে। ভারত থেকে ফিরে আসার পর প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে গঙ্গা ব্যারাজ প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। কিন্তু তাতে একটু হতাশাব্যঞ্জক চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশের আমলে গঙ্গা ব্যারাজের যেটুকু অগ্রগতি, তার প্রায় সবটুকু এই সরকারের গত আট বছরে অর্জিত হয়েছে। এ সময়ে ব্যারাজের সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডিটেইল ডিজাইন সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি এখন বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র আহ্বানের পর্যায়ে রয়েছে। অথচ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এসবই নাকি ভুলের কারণে হয়েছে। পাংশায় গঙ্গা ব্যারাজে যে প্রস্তাবিত অবস্থান, তা নাকি ভুল জায়গা, বাংলাদেশের কোনো উপকারে আসবে না। ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের যাতে উপকারে আসে, তেমন জায়গায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের পক্ষে তিনি মত দিয়েছেন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা দরকার।

ব্যারাজ সমতল এলাকার নদীতে নির্মাণ করা হয়, যাতে নদীর পানির উচ্চতা পার্শ্ববর্তী কৃষিজমি থেকে উঁচু করে গ্রাভিটিতে অববাহিকার জমিতে সেচ দেওয়া যায়। ফলে উপকারভোগী এলাকা প্রধানত ব্যারাজের ভাটিতেই হয়। আন্তর্জাতিক সীমান্তের মাত্র ছয় কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ। সুতরাং ভারতের জন্য গ্রাভিটি সেচকাজে ব্যবহৃত হতে তেমন আরেকটি ব্যারাজ গঙ্গায় নির্মাণের জন্য কোনো জায়গাই আর ভারতে নেই। এর জন্য কোনো সময়সাপেক্ষ সমীক্ষার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া গঙ্গায় যত সেচ অবকাঠামো, তার সবই ভারতের। ফারাক্কার উজানে ভারতে প্রায় ২০০ সেচ প্রকল্প রয়েছে। সেখানেই গঙ্গার প্রায় সব পানি ভারত একতরফাভাবে সেচের জন্য ব্যবহার করে আসছে। ফারাক্কায় ব্যারাজ নির্মাণের আগে পানির প্রবাহ ৮০ হাজার কিউসেক থাকত। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গায় যে ৮০ হাজার কিউসেক পানি ছিল, তার ৪০ হাজার কিউসেক ভারত ফারাক্কায় একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যে ২০-২৫ কিউসেক পানি হয়তো অবশিষ্ট থাকে, তার থেকে ভারতকে দেওয়ার তো কিছু নেই। দিলেও ভারত সে পানি অন্তত সেচের জন্য তো নিতে পারবে না। কারণ, ভারতে গঙ্গায় আরেকটি ব্যারাজ নির্মাণের জায়গা নেই।

এখন বাংলাদেশের কোথায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করা যায়, সে বিষয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। বাংলাদেশে গঙ্গার যে ভৌগোলিক অবস্থান, তাতে হয়তো হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভাটিতে ব্যারাজ নির্মাণ করা যায়, তাতে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, বৃহত্তর যশোর ও বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া যেতে পারে। সেই বিবেচনায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভাটিতে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের অবস্থান নির্ধারণ করা হয় বহু বছরের প্রচেষ্টায়, বহু অর্থ ব্যয়ে প্রায় ২ দশমিক ৫ লাখ একরে সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মিত হলে এই সেচ অবকাঠামোকেই যাতে গঙ্গা ব্যারাজের প্রথম পর্যায় হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সে লক্ষ্যেই সবকিছু করা হয়েছে।

কিন্তু সেখানে ব্যারাজ নির্মাণ করলে এবং পানির উচ্চতা বাড়ালে যে ‘ব্যাক ওয়াটার কার্ব’ হবে, তা ফারাক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকায় বানানো ফারাক্কা ব্যারাজকে অকেজো করে দিতে পারে। এটা ভারতের মেনে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। সে জন্য পাকিস্তান আমলেই ব্যারাজের এই অবস্থান পরিত্যক্ত হয়। এরপর গড়াইমুখে তালবাড়িয়ায় নতুন অবস্থানে ব্যারাজের সমীক্ষা চালানো হয়। সেখানেও দেখা যায় যে ‘ব্যাক ওয়াটার কার্ব’ ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে যায়। তা ছাড়া প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের অন্তত অর্ধেক সুবিধাভোগী এলাকা বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা। এই জেলায় গঙ্গার পানি ব্যবহার করতে হলে কারিগরি কারণে গড়াই নদী পার হয়ে আরও ভাটিতে ব্যারাজের অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়। সে জন্যই বহু সমীক্ষার পর পাংশায় ব্যারাজের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এতে ব্যারাজের ‘ব্যাক ওয়াটার কার্ব’ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের মধ্যেই থাকবে। ফলে ভারতের এ বিষয়ে আপত্তি দেওয়ার সুযোগ কম থাকবে। এই পাংশা ছাড়া বাংলাদেশ অংশে আর উজানে তো কোনো ব্যারাজের অবস্থান নেই। ফলে এখন এই ৫০ বছর সমীক্ষার পর ব্যারাজের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কোনো সুযোগ মনে হয় আর নেই। তবু এই অবস্থানেও ব্যারাজ নির্মাণ করলে গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের কার্যকারিতা সমানভাবে কার্যকর থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী মৌখিকভাবে এ প্রকল্পকে বাতিল করে দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এটা বাতিল করার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এবং বিশ্বের উষ্ণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধির যে বিরূপ প্রভাব সারা বিশ্বের ওপর পড়েছে, তাতে বাংলাদেশও হুমকির মুখে। উষ্ণতার কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। লবণাক্ততা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে গ্রাস করেছে। ইতিমধ্যে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল ছাড়িয়ে যশোরে লবণাক্ততা প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে যে প্রধান ফসল আউশ মৌসুম, তার যখন ফ্লাওয়ারিং সময়, অর্থাৎ তখন যদি ফসলের সম্পূরক সেচ না দেওয়া যায়, তবে প্রায় সব ধানই চিটা হয়ে যায়। এ বিপর্যয় রোধে গরিব কৃষক টিউবওয়েল বসিয়ে ফসল রক্ষার চেষ্টা করতে বাধ্য হন। ফলে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির উচ্চতা উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের হয়তো পঁাচ কোটি জনগোষ্ঠী আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত হয়েছে। বিশ্ব জলবায়ুর এ বিরূপ প্রভাবে অক্টোবর-নভেম্বর মাসের বৃষ্টি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এ বিপর্যয় রোধে নদীর পানি ব্যবহারে সম্পূরক সেচব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গঙ্গা ব্যারাজ নির্মিত হলে যে পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে, তাতে সম্পূরক সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাব হবে না।

১৯৭৫ সালে যেদিন ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়েছে, সেদিন ফারাক্কার লিংক ক্যানেলের মাধ্যমে ফারাক্কায় গঙ্গার যে ৮০ হাজার কিউসেক পানি ছিল, তার ৪০ হাজার কিউসেক পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথীতে একতরফাভাবে ভারত প্রত্যাহার করেছে। ওই এক সপ্তাহেই গড়াইমুখে গঙ্গার পানির উচ্চতা হঠাৎ পাঁচ মিটার পর্যন্ত পড়ে যায়। ফলে হঠাৎ গড়াইতে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। সেই থেকে বিগত ৪২ বছর শুকনো মৌসুমে পাঁচ মাস গড়াইতে পানিপ্রবাহ কম থাকে। গড়াইয়ের পানিপ্রবাহই শুষ্ক মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে মিষ্টি পানির একমাত্র উৎস। এর অভাবে শুষ্ক মৌসুমে সমুদ্রের লোনাপানি খুলনা ও যশোরে চাষের জমি অনাবাদি করে দিচ্ছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব এই পরিস্থিতিকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বাংলাদেশের তিন কোটি প্রান্তিক মানুষ হুমকির মুখে পড়েছে। তারা উদ্বাস্তু হচ্ছে।

এই বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হলে গড়াইতে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। গঙ্গায় শুষ্ক মৌসুমে তো পানি নেই। ফলে সেচের জন্য না হলেও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এবং এর একমাত্র উপায় হলো গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি করে গঙ্গায় শুষ্ক মৌসুমে যে ২০-২৫ হাজার কিউসেক পানি আছে, তা গড়াইতে প্রবাহিত করা। তাতে লবণাক্ততা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যাবে। সুন্দরবন নিয়ে যে এত মাতামাতি, আপনাদের হয়তো জানা আছে যে মিষ্টি পানির অভাবে গত ৪২ বছরে সুন্দরবন চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুন্দরবনে আর সুন্দরীগাছ নেই বললেই চলে। এই বিশ্বঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হলে সুন্দরবন অঞ্চলে পশ্চিম থেকে বেতনা, কপোতাক্ষ, শিবসা ও পশুর নদে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করতে হবে। এর জন্য গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করে গড়াই ও মাথাভাঙ্গায় মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরই সময়ে বিগত আট বছরে নেওয়া গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প নাকি ভুল এবং সে কারণে তিনি তা বাতিল করেছেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য নিজেদের উদ্যোগে হলেও গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করা দরকার। একে বাতিল করে দেওয়া কোনোভাবেই কাজের কাজ হবে না।

আবদুল আজিজ: প্রকৌশলী, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।

রবিবার, ৪ জুন, ২০১৭

পার্বত্য চট্টগ্রামকে আমরা কোথায় নিয়ে চলেছি?


এক. 
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এখন বাঙ্গালিরা সেই ভুল করছে কি না-- যা পাঞ্জাবিরা করেছিল পূর্ব-পাকিস্তানে; কাশ্মীরে করছে ভারত, বালুচিস্তানে করছে পাকিস্তান, চীন করছে কাশগরে, বর্মা করছে আরাকানে, সিংহলিরা করেছে তামিলদের সঙ্গে?
দক্ষিণ এশিয়ায় এইরূপ ভুলের প্রথম ফল ছিল পূর্ব-পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে যাওয়া। কিন্তু বাংলাদেশ নিজের সংগ্রামের ঐতিহাসিক শিক্ষাটুকুই ভুলতে বসেছে। 
এটা আত্মঘাতি। 

দুই.
আমার যেসব বন্ধু ফিলিস্তিনী, রোহিংগা, কাশ্মীরী বা উইঘুরদের ন্যায়বিচারের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সেখানে ন্যায্যতা দেখেন-- লংঘদু’র ঘটনায় তাদের ‘বাঙ্গালি হয়ে যাওয়া’য় দুঃখ পেলেও বিস্মিত হইনি। মাঠের খবরও এরকম যে, সারা দেশে তিক্ততা থাকলেও লংঘদুসহ পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামেই আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাহাড়িদের মোকাবেলায় শামিল। কিন্তু গভীর আত্মজিজ্ঞাসা প্রয়োজন, পার্বত্য লীগ-বিএনপি-জামায়াত ঐক্যের কাফেলা সেই ভুলের জন্ম দিতে যাচ্ছে কি না-- যা উর্দুভাষীদের একাংশ পূর্ববাংলায় করেছিল একাত্তর সালে?
কথিত যুবলীগ নেতাকে কে হত্যা করেছে সে বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অসংখ্য গ্রামের শত শত পাহাড়ি নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে বিচার বহির্ভূত পন্থায় শাস্তি দেয়ার দায় কার? আন্তর্জাতিক পরিসরে এই প্রশ্ন উঠলে আশা করি, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত মিলে সদুত্তর দেবেন।

তিন.
বর্তমান বিশ্ব একটা গ্রামের মতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালি-মুসলমানদের এটা ভুলে যাওয়ার অবকাশ নাই যে, লংঘদুর ঘটনার সরাসরি প্রতিক্রিয়া ঘটবে শ্রী লঙ্কার বাত্তিকালোয়া-ত্রিংকোমালেতে, বর্মার আরাকানে, চীনের উইঘুরদের জনপদে এবং ভারতের লাদাখে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালি মুসলমানরা লংঘদুর মতো ঘটনা যত ঘটাবেন--দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য স্থানে ‘প্রবল সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে মুসলমানদের স্বাধীকারের ন্যায্য সংগ্রামগুলো তত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 
বস্তুত জাতিগত ফ্যাসিবাদই আজ দক্ষিণ এশিয়ার মূল ব্যাধি। সামাজিক ন্যায় বিচারের সংগ্রামে জাতিতে-জাতিতে মৈত্রীর সম্ভাবনাটুকু এখানে এসেই থমকে যাচ্ছে। উল্টো ব্যাপক বিস্তৃত এক হানাহানির যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে পুরো অঞ্চল। বাংলাদেশকে প্রায় জোর করেই যেন সেই পরিসরে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। 

চার.
মূলত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতির আকাল এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিসমূহের দুর্বলতা-দ্বিধাবিভক্তি-আদর্শিক দেউলিয়াত্ব পাহাড় ও সমতল সব জায়গার জাতিগত ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের জন্য পরিস্থিতি বিপর্যকর করে তুলেছে। বলা যায়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক সংকটের সবচেয়ে খারাপ অভিঘাতটি পড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। 
ত্রিধারায় বিভক্ত পাহাড়িদের মাঝে ভাতৃঘাতি বৈরিতাও তাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। অনুমান করা যায়, এসবের মিলিত ফল হিসেবে সেখানে অবাঙ্গালিদের আসন্ন দিনগুলোতে আরো বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়তে হতে পারে। তৃতীয় বিশ্বে এটা প্রায় পরীক্ষিত এক অভিজ্ঞতা, কর্তৃত্ববাদী কেন্দ্রীভূত শাসন চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতিগত উম্মাদনা উস্কে দেয়।
চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা নেতৃবৃন্দের জন্য সামনের দিনগুলো চালেঞ্জিং। তরুণদের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের ধারায় আটকে রাখা এবং এনজিও মানবাধিকার ব্যবসায়ীদের দুষ্টছায়া এড়িয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির (যা প্রায় অবলুপ্ত হতে চলেছে) সঙ্গে মৈত্রীর পরিসর বাড়ানো দুরূহ এক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
বিশেষত যখন লংঘদুর মতো উস্কানিমূলক ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকবে।

পাঁচ.
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশে সামরিকায়নের জন্য শাসক শ্রেণীর এক দারুণ উপলক্ষ্য। এবারের বাজেটেও রাষ্ট্রীয় ২,৯৩,৪৯৪ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে সম্মিলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৪৫,০০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশে জাতীয় আয়ের প্রায় পাঁচভাগের এক ভাগই এখন নিরাপত্তা আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনে যাচ্ছে। এইরূপ বরাদ্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুধরনের কেনাকাটা--যা শাসকএলিটদের অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়। কর্তৃত্ববাদী শাসন সংস্কৃতিতে এইরূপ ব্যয়ভারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকলেও যেকোন জবাবদিহিমূলক শাসনামলে তা উঠবে বৈ কি। পার্বত্য চট্টগ্রাম এইরূপ ব্যয়ভারের অন্যতম যৌক্তিক পাটাতন হিসেবে কাজ করে। বস্তুত এভাবেই বর্মায়, শ্রী লঙ্কায়, ভারতে এবং পাকিস্তানে বিশেষ বিশেষ অঞ্চলকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সামরিকায়ন ঘটেছে এবং ঘটছে। এরূপ সামরিকায়নের লাগাম টেনে না ধরতে পারলে এক সময় তা আত্মবিনাশী রূপ নেয়। ফলস্বরূপ বর্মা, শ্রী লঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এখন মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অভিযোগের মুখোমুখি প্রতিনিয়ত। ভূ-রাজনীতির যেকোন ওলোটপালটে এসব অভিযোগ কীভাবে ভিন্নরূপ নেয় তার নজির পূর্ব-তিমুর, তার নজির দক্ষিণ সুদানসহ আরও বহু অঞ্চল।
জাতীয়তাবাদী উগ্রতা বাংলাদেশকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়া বিচিত্র নয়। 
ছয়.
১৯৪৭-৪৮ এ ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি যখন দক্ষিণ এশিয়া ছেড়ে যায় তখন এ অঞ্চলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ ছিল শ্রী লঙ্কা। সম্প্রতি বাংলাদেশের লংঘদুতে যা ঘটেছে ১৯৮৩ সালে জাফনায় এইরূপ এক ঘটনা থেকেই শ্রী লঙ্কা প্রায় ২৬ বছরের জন্য সিংহলি-তামিল রক্তক্ষয়ি বিবাদে জড়িয়ে ধ্বংসের কিনারে উপনীত হয়। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বর্মার বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের একগুঁয়েমি পুরো দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে চড়ায় আটকে রেখেছে। কাশ্মীরে মাত্র ৬০ লাখ মানুষকে ১০ লাখ সৈন্য দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না দিল্লি। বালুচিস্তান পাকিস্তানকে আরেকবার খন্ডিত হওয়ার সম্ভবনা জিইয়ে রেখেছে।

চারপাশের এসব অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শেখা দরকার।

ALTAF PARVEZ·SUNDAY, JUNE 4, 2017

সোমবার, ২৯ মে, ২০১৭

ট্রাম্পের সৌদি সফর ও ইরান প্রসঙ্গ

চলতি মে মাসের ২০-২১ তারিখে আমরা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখতে পেলাম এক রাজকীয় সফরে সৌদি আরবে। সেই একই ট্রাম্প, যিনি গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েই তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘মুসলিম ব্যান’ বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করবেন। সেটা মুরোদে না কুলালেও অন্তত সাত মুসলমান দেশ থেকে রওনা দিয়ে এসে আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি। তবে তিনি তার এই আদেশ টিকাতে পারেননি। আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে এটা রদ হয়ে যায়, পরপর দু’বার। সেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরব সফরে গেছেন। সবই ভাগ্যের পরিহাস! কারণ প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার প্রথম বিদেশ সফর এই সৌদি আরবেই। কেন এই সফর?
মাত্র ২৫ বছর ব্যবধানের দুই বিশ্বযুদ্ধ দুনিয়ার ইতিহাস ভুগোলের আগা-পাশ-তলা বহু কিছুই উল্টেপাল্টে দিয়েছিল। বিশেষ করে ইসলামি জনগোষ্ঠীর সর্বশেষ খলিফার শাসনাধীন অটোম্যান সাম্রাজ্যকে প্রথমে ভেঙে দুই বড় টুকরোয় ভাগ করে নিয়েছিল ব্রিটিশ আর ফরাসি সরকার। এরপর দুই অংশেরই তস্য টুকরো টুকরা করা শুরু করেছিল। ব্রিটিশ অংশ থেকে এক বড় টুকরা ভাগ নিয়ে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা (আবদুল-আজিজ আল-সৌদ) ইবনে সৌদের হাতে এর শুরু হয়েছিল ১৯৩২ সালে। অবশ্য আমেরিকার সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষে, ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মিসর সফরে এসে কিছু আরব নেতার সাথে দেখা করেছিলেন। সে সময় বাদশাহ ইবনে সৌদ আর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে প্রথম শীর্ষ বৈঠক হয়েছিল সুয়েজ খালে নোঙর করা আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কুইনসে বসে। সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক অনেক পুরনা, সৌদি আরবের জন্মের মাত্র ১৩ বছর পর থেকে যা এখনও বর্তমান। সিঙ্গাপুরের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘এশিয়ান টাইমস’ গত ১৮ মে সংখ্যায় এসব পুরনো ইতিহাস স্মরণ করেছে। 
এক রাজকীয় রেওয়াজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, সৌদি বাদশাহ এক কাপ কড়া সৌদি কফি পান করতে দিয়েছিলেন তার বিশেষ অতিথি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে। প্রেসিডেন্ট শান্তভাবে সে কফি পান করার পরে রাজা ওই কাপ মেঝেতে আছড়ে ভেঙে ফেলে বলেছিলেন, ‘আপনি আমার কাছে খুবই বিশেষ একজন। তাই এই কাপ আপনার পর আর কেউ যেন ব্যবহার করতে না পারে তাই ভেঙে ফেললাম।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই নায়ক রুজভেল্ট দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে ওই সফরের দু’মাসের মাথায় সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ই মারা যান; তবু বলা যায়, এই রিচুয়াল দিয়ে সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ভালোভাবেই কার্যকর হতে পেরেছিল। এশিয়ান টাইমস লিখছে, ‘ইবনে সৌদের সাথে রুজভেল্টের চুক্তি হয়েছিল যে, সৌদি তেলের বিনিময়ে আমেরিকা ইবনে সৌদ ও তার উত্তরাধিকারীদের সৌদি সরকারগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে।’ পরে এই সম্পর্ক আরেক উঁচুপর্যায়ে পৌঁছেছিল প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে ১৯৭৪ সালে। বলা ভালো, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর শেষ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবদের হার হয়েছিল আর এর প্রতিক্রিয়ায় পরের ছয় মাস ধরে তেল অবরোধ চলেছিল।
ইসরায়েল সমর্থক আমেরিকা ও তাদের বন্ধু অন্য রাষ্ট্রগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল এই তেল অবরোধে। এই অবরোধের সমাপ্তিতে নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে সৌদি-আমেরিকা পরস্পরের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হিসেবে অনুভব করেছিল। নিক্সন ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি সফরে গিয়ে তাদের সেই সম্পর্ক আরো পাকা করেছিলেন। ফলে সৌদি আরবের মনে হয়েছিল আমেরিকান প্রটেকশনের প্রতিশ্রুতিতে রাজশাসন ব্যবস্থার আয়ু আরো দীর্ঘ হয়েছে এবং তা যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে থিতু অবস্থায়। কিন্তু সৌদি আরবের সেই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব আবার এক অনিশ্চয়তা হিসেবে ছায়া ফেলেছিল। ইরানের বিপ্লব রাজতান্ত্রিক শাসনের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন তুলে নড়বড়ে করে দেয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছিল। আরেক দিক থেকে দেখলে ইরানের এই বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত আমেরিকাও। কারণ সে শাহের ইরান হারিয়েছিল এবং নতুন বিপ্লবের ইরানের সাথে আমেরিকার আবার সহসাই কোনো ধরনের সম্পর্ক তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ইরান-সৌদি কূটনৈতিক সম্পর্ক সেই থেকে খারাপ থেকে আরো খারাপ হয়ে যায়। উল্টা দিকে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের প্রায় স্থায়ী হয়ে যাওয়া খারাপ সম্পর্ক সৌদি আরবকে স্বস্তি দিয়েছিল। সৌদিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময়ই এবং এই সঙ্ঘাতের দীর্ঘস্থায়িত্বের মধ্যেই সৌদি আরব রাজতন্ত্রের ভাগ্য নিহিত। পরের ৩৫ বছর ধরে ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময় থেকেছে। তদুপরি, ইরানের ওপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে যথেষ্ট ভুগিয়েছে। 
সবশেষে ২০১৫ সালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসনের আমলে এক ‘নিউক্লিয়ার ডিল’-এর বিনিময়ে, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেয়া শুরু হয়েছিল। আর সেই থেকে সৌদি আরবের অস্বস্তি আর অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। রাজপরিবার সৌদি আরবে রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম চিন্তিত হয়ে পড়ে।
ওবামা প্রশাসন ইরানের সাথে ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ কেন করতে গিয়েছিল এর প্রধান কারণ ছিল আইএস মোকাবেলায় ইরানকে পাশে পাওয়া এবং অনেক দায় ও খরচ ইরানের ওপর দেয়ার সুযোগ নেয়া। কারণ ইরাকের ওপর আইএসের আক্রমণ ও তৎপরতার চাপ বাড়ছিল। ওবামা প্রথম টার্মে তো বটেই, দ্বিতীয় টার্মেও সামগ্রিকভাবে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে ‘আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহার’ আর বিশেষ করে ‘মাঠের সৈন্য প্রত্যাহার’ এই নীতিতে পরিচালিত হচ্ছিলেন। এর মূল কারণ ছিল, আমেরিকান অর্থনীতির যুদ্ধের খরচ হলে অপারগতা। দ্বিতীয় কারণ এটাও ছিল যে, জড়িয়ে যাওয়া অন্তহীন যুদ্ধে থেকে দেশকে বের করে আনা। অথচ আইএসের তৎপরতা সেখানে মাঠের সৈন্য বাড়াবার তাগিদ হাজির করছিল। এই অপারগ পরিস্থিতিতে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ জোট তৎপরতায় ওবামা ইরানকেও অন্তর্ভুক্ত করে পেতে চাইলেন। বিশেষ করে আমেরিকার ইরাক দখলের পরের ইরাক ইরান প্রভাবিত মালেকী সরকারের হাতেই চলছিল। ফলে ওবামার হিসাব হলো, ইরাক সরকারের সাথে ইরান এসে যোগ দিয়ে তারাই ইরাকে আইএস তৎপরতা রোধের বাড়তি দায়িত্বে নিক। তাতে খরচের ও সামরিক দায়ের এক বড় অংশ ইরান সরকারই বহন করবে।
আর ওবামার এই নতুন নীতিকে সৌদি সরকার ঘোরতরভাবে নিজ স্বার্থবিরোধী এবং বিশেষ করে নিজ রাজতন্ত্রের জন্য বড় বিপদ হিসেবে দেখেছিল। তা থেকে আমেরিকার ওপর সৌদি ক্ষোভ আর হতাশা কত তীব্র হয়েছিল তা বুঝার একটা উপায় হলো সৌদি আরব রাশিয়ার পুতিনের সাথে নিজের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলেছিল। আমেরিকার বদলে নিজের সুরক্ষার কাজ রাশিয়ার সাথে করা যায় কিনা, রাশিয়াকে দেয়া যায় কিনা সে আলোচনায় বসেছিল। তখন রাশিয়া থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের অস্ত্র সৌদি আরব ক্রয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কিন্তু শর্ত ছিল, সিরিয়াসহ পুরা ইরানি ব্লক থেকে রাশিয়াকে দূরে সরে আসতে হবে। কিন্তু রাশিয়ার কাছে স্থায়ী ও কৌশলগত সম্পর্কের দিক থেকে ইরান-সিরিয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। ফলে সেই প্রস্তাবিত রাশিয়া ডিল কোনো ইতি পরিণতি পায়নি। ইতোমধ্যে আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রার্থিতার মধ্যে আশার আলো দেখেছিল সৌদি আরব। কারণ, যেটা বুঝা গিয়েছিল, ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ফিরে এলে ইরান নিউক্লিয়ার ডিল উল্টে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। রিপাবলিকান হলে কিছু হলেও সম্ভাবনা আছে, যদি সবটা নেই। কারণ এটা শুধু ইরান-আমেরিকান সমঝোতা নয় বরং এটা জার্মানিসহ জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের (৫+১) সাথে একযোগে ইরানের ডিল।
এক কথায় বললে, ট্রাম্পের এই সৌদি সফর ছিল এক পুরোপুরি আই ওয়াশ। দেখানো হয়েছে, সৌদি উদ্যোগে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিলের নেতৃত্বে এক ‘আরব ন্যাটো’ গঠন করা হয়েছে। তা অপ্রকাশ্যে ইরানবিরোধী সুন্নি রাষ্ট্র জোট। ওই সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্রগুলোর জনগণ না হোক অন্তত সরকারগুলোকে রাজতন্ত্রের পক্ষে বুক করে রাখা হলো। কিন্তু তামাশার দিকটা হলো এই ‘আরব ন্যাটো’ এটা করা হলো ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি রাষ্ট্রজোট’ বলে। আর এই জোটের উদ্বোধন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে দিয়ে করিয়ে তার মুখ দিয়ে ইরানবিরোধী বুলি হাজির করা হলো। 
তাই এমন কোনো মিডিয়া দেখা যায়নি, আমেরিকান বা বাইরের, যে এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে অথবা ফেসভ্যালুতেই সম্মেলন যা বলেছে তা বিশ্বাস করে। এর মূল কারণ, ট্রাম্প যতই হম্বিতম্বি করুন, আসলে তো ওবামার ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ থেকে ট্রাম্প একচুলও সরেননি।
মিডলইস্টের মনিটর পত্রিকা জানাচ্ছে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের টিলারসন বলেছেন ‘১৮ এপ্রিল কংগ্রেসকে চিঠি দিয়ে তিনি সার্টিফাই করে জানিয়েছেন, ইরানি ডিলে ইরান সঠিকভাবে তার করণীয় শর্তাবলি মেনে চলছে’। আরেক কর্মকর্তা বলছেন, তারা যদিও এখনো পর্যন্ত ইরানি ডিল পুরোটাই পর্যালোচনা করে দেখছে। কিন্তু ওইদিন পর্যন্ত সবকিছুই ইরান ঠিকঠাক পালন করেছে ফলে তারা চুক্তি বজায় রাখার পক্ষে থাকবে। 
তাহলে পাগলা ট্রাম্প উল্টা হাওয়া গেছে সৌদি আরবে গেল কেন? কারণ ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি হলে ক্রেতার সন্তুষ্টিতে কিছু তো করা দরকার!
লেখক :  গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭

মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিয়ে দাবা খেলা

গত মাসে সিরিয়ার যুদ্ধ ছয় বছরে পদার্পণ করেছে। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ক্রমে জটিল আকার ধারণ করে এক প্রলম্বিত যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে। সিরীয় যুদ্ধে বাইরের বহু খেলোয়াড় এবং ভাড়াটে সৈন্য প্রবেশ করার কারণে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এই যুদ্ধক্ষেত্রে ২০১২ সালে ইরানি সৈন্য এবং হিজবুল্লাহর অনুপ্রবেশ ঘটে। এরপর ২০১৪ সালে কথিত ইসলামিক স্টেট, পরবর্তীকালে ২০১৫ সালের শেষের দিকে রাশিয়া এবং অতিসম্প্রতি আমেরিকার স্থলসৈন্য প্রবেশ করেছে। আমেরিকার স্থলসৈন্যরা তাদের সামরিক যান নিয়ে ২০১৭ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ক্রমবর্ধমানভাবে সিরিয়া-ইরাক সীমান্ত অতিক্রম করে সিরিয়ায় প্রবেশ করায় এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ নতুন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ার যুদ্ধ যখন শুরু হয়েছিল তখন তা ছিল সিরীয় সরকার ও তার বিরোধীদের মধ্যকার নিছক একটি ক্ষমতার লড়াই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সিরিয়ার দৃশ্যপটে এখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়রা মধ্যপ্রাচ্যের একটি নতুন মানচিত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে দাবার ঘুঁটি হিসেবে বিশাল দাবা প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত। যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা হচ্ছে কনভেনশনাল। ২০০ মেরিন এবং ৭৫তম রেজিমেন্ট আর্মি রেঞ্জারস। আগে কাবুল, বাগদাদ এবং মসুলে হিট অ্যান্ড রান স্পেশাল অপারেশনের জন্য একটি এলিট ফোর্স ব্যবহার করা হয়েছে। 
মার্কিন সৈন্যদেরকে সাময়িকভাবে ইউফ্রেটিস নদীর ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে কৌশলগত শহর মানবিজে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা বহুমুখী এজেন্ডা নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) স্বঘোষিত রাজধানী আল রাক্কা শহরে একটি বড় ধরনের হামলা পরিচালনা করা এবং মানবিজ শহরকে আইএস আর তুর্কিদের থেকে মুক্ত করার বিষয় নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) নামে পরিচিত মার্কিন সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরোধিতা না করা।
দুই বছর আগে বারাক ওবামার অধীনে গঠিত এসডিএফের যোদ্ধারা এখনো আমেরিকান পে-রোলে পরিচালিত হচ্ছে। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলভিত্তিক সিআইএ কর্মকর্তারা বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপকে তীব্র হুমকি দেয়া সত্ত্বেও তারা অর্থাৎ এসডিএফ যোদ্ধারা আমেরিকান পে-রোলে রয়েছে। বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর প্রতি মাসের শেষে একটি সামরিক কমান্ডের অধীনে ঐক্যবদ্ধ না হলে মার্কিন সহায়তা বন্ধ করে দেয়া এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে স্থান ত্যাগ করে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে। বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা এখন খুব কঠিন কাজ। কারণ বিদ্রোহীদের মধ্যে একপক্ষকে ‘উদারপন্থী’ এবং অপরপক্ষকে সিরিয়ার আলকায়েদার শাখা জাবহাত আল নুসরা হিসেবে আগে পরিচিত, এখন জাবহাত ফাতাহ আল শাম-এর সাথে সংশ্লিষ্ট বলে চিহ্নিত করে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করা খুব কঠিন। কয়েক বছর ধরে আমেরিকা সিরিয়ার বিদ্রোহীদেরকে জাবহাত আল ফাতাহ আল শাম থেকে দূরে রাখার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। এটা হচ্ছে অত্যন্ত কার্যকর অল সিরিয়ান ফাইটিং ফোর্স। তারা সিরিয়ার সরকারি বাহিনীকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই বিদ্রোহীদেরকে জাবহাত ফাতাহ থেকে দূরে সরানো বাস্তবে অসম্ভব। অপর দিকে আইএস বিদেশী যোদ্ধাদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কালো তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। এই চূড়ান্ত শর্ত বা প্রস্তাবের একমাত্র ব্যতিক্রম হলো এসডিএফ।
এসডিএফের সৈন্যরা গত আগস্ট মাসে মানবিজে গুড় গুড় করে মাঝে মধ্যে ঝাঁকানি দিতো। তারা শহরটিকে সম্পূর্ণরূপে আইএসমুক্ত করে কেবল শহরটিকে গত মার্চ মাসে সরকারি সৈন্যদের কাছে হস্তান্তর শুরু করেছে। কুর্দি কমান্ড এবং রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর মধ্যে যে চুক্তি হয়েছেÑ তাকে ধন্যবাদ জানাই। 
বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার 
সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতির অর্থ সিরীয় যুদ্ধে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের কাছে বিভিন্ন বিষয় বোঝায়। তারা ভিন্ন ভিন্নভাবে এটাকে উপলব্ধি করে। সিরিয়া সরকারের জন্য এতে বলা হয়, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে রাশিয়ান ও আমেরিকানদের কাছ থেকে সিরীয় সরকার যৌথভাবে অনুমোদন পেতে শুরু করেছে। মানবিজ বাহিনী বা সৈন্যদের ক্ষতি হলো- প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে তার বাফার জোনের ধারণাকে ছোট করতে হয়েছে। এরদোগান এবং পুতিন গত গ্রীষ্মে একটি বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, কেবল সীমান্ত শহর জারাব্লুস ও আজাজকে এবং আল বারের একটি মধ্যাঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করে একটি বাফার স্টেট গড়ে তোলা যাবে। এই এলাকাগুলোর সবই বর্তমানে তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এরদোগান সেখানে থামবেন না। মানবিজের দিকে অগ্রসর হয়ে এবং আল রাক্কাকে একীভূত করার মাধ্যমে এরদোগান যুগপৎভাবে রাশিয়ান ও আমেরিকান উভয়কে ক্ষুব্ধ করে তুলেছেন। উভয় দেশ আইএস থেকে মুক্ত করে আল রাক্কাকে স্বাধীনতা দিতে চায় না। তারা এরদোগানের নিয়ন্ত্রণেও রাক্কাকে দিতে চায় না। এরদোগান পাঁচ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের একটি জোন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সচেতন ও বেপরোয়া। তার সীমান্তে কুর্দিদের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উচ্চাভিলাষকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ২০ লাখেরও বেশি সিরীয় শরণার্থীর তত্ত্বাবধান ও আশ্রয়দানের লক্ষ্যে একটি পরিচ্ছন্ন ভূমি দিতে চান এরদোগান। উল্লেখ্য, ২০১১ সাল থেকে এসব সিরীয় শরণার্থী তুরস্কে অবস্থান করছেন।
ওই ফর্মুলা আলোর মুখ দেখলে, ইরান সিরিয়ায় দামেস্ক-বৈরুত মহাসড়ক নামক ‘পকেট’ ছাড়া আর বেশি কিছু পাবে না। দামেস্কে শিয়াদের পবিত্র স্থান বরাবর চলে যাওয়া এই মহাসড়কটি হচ্ছে হিজবুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন, দামেস্কের পশ্চিমের কালামুন জেলার সাথেও মহাসড়কটির সংযুক্তি রয়েছে। কালামুন জেলাটি লেবানন সংলগ্ন। পাঁচ বছর ধরে সড়কটির ওপর হিজবুল্লাহর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। 
সিরিয়ান কেক বা খাদ্যে এটাই হলো তাদের ভাগের সীমা। তারা এর চেয়ে বেশি ভূখণ্ডে কামড় বসাতে পারবে না। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা লেবানন ও ইরাকে যেভাবে অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করে জীবন দিতে চায়- সিরিয়ায় তারা সেভাবে মরতে চায় না। 
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, আমেরিকা মানবিজে এসডিএফকে অব্যাহতভাবে সমর্থন জানাতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক ‘মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে তুরস্ক হচ্ছে আমেরিকার অত্যন্ত নির্ভরশীল ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার। এ পর্যন্ত এই সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো ইচ্ছা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কিছু সামরিক প্রয়োজন পূরণ করেছে এবং আল রাক্কাকে মুক্ত করতে আমেরিকা তুরস্কের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করবে। তুরস্ক রাক্কায় কখনো কুর্দিদের শাসন করতে দেবে না। ট্রাম্প প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সিরিয়ায় নতুন প্রেসিডেন্টের তিনটি অগ্রাধিকার রয়েছে। সেগুলো হলো : ইউফ্রেটিসের পূর্বে কুর্দিদের ক্ষমতায়ন। ট্রাম্প প্রশাসন আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এবং তাদের নির্মূল করতে কুর্দিদের গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। এই প্রশাসনের অগ্রাধিকারে আরো রয়েছেÑ সিরিয়া থেকে ইরান ও হিজবুল্লাহকে বের করে দেয়া। ২০১২ সাল থেকে তাদের অর্থাৎ ইরান ও হিজবুল্লাহর ওপর সিরিয়া সরকারের আস্থার কারণে এই কথা বলা সহজ হলেও করা কঠিন।
‘ইউফ্রেটিসের পূর্বে’ এই কথার মাধ্যমে সাধারণভাবে সিরিয়ার কুর্দি অঞ্চলকে উল্লেখ করা হলেও একসময় যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থনের কারণে সেখানে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। আবার মার্কিন সমর্থন বাদ দিয়ে পরে প্রধানত, ‘ইউফ্রেটিসের পশ্চিমে’ এবং সিরিয়ার অন্যান্য প্রধান শহর হোম, হামা, আলেপ্পো ও দামেস্কে রাশিয়া নিজের প্রভাব বিস্তার করে বসে।
ইউফ্রেটিসের পূর্বে সব ভূখণ্ড কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশেষভাবে আল রাক্কা- যেটা ইউফ্রেটিসের পূর্বাঞ্চলীয় তীরে অবস্থিত অথবা অপর শহর তেলসমৃদ্ধ দেইর ইজ জোর যেটাকে ট্রাম্প দ্রুত আইএসমুক্ত করতে চান- সেটি কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আল মালিকিহ, আল হাসাকিহ এবং আল কামিশির মতো শহরের মধ্যেই কুর্দি অঞ্চল সীমাবদ্ধ।
দাবা খেলার ছক কাটা ফলের সশস্ত্র বিরোধিতা করা কিভাবে শোভন বা মানানসই হয় সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে বললে তাহরির ইনস্টিটিউট ফর মিডলইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হাসান হাসান গালফ নিউজকে বলেন, আক্ষরিকভাবে বিদ্রোহীরা অত্যন্ত টাইট স্পটে রয়েছে। গত অর্ধবছরে তুরস্কের অগ্রাধিকার পরিবর্তন হয়ে গেছে। সিরিয়া রাশিয়ার সাথে সমঝোতার ফলে কাতারের হাত বাঁধা রয়েছে। কাতারিরা আগে যেভাবে সমর্থন দিয়েছিল সেভাবে আর সমর্থন দিতে পারবে না। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ক্রমবর্ধমানভাবে খেলার আইনকানুনের দিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। এর আরো অর্থ হচ্ছে, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোকে মস্কোর সাথে চুক্তি করতে হবে। দামেস্ক আইএস এবং আলকায়েদার উত্থান থেকে ফায়দা হাসিল করার ফন্দি আঁটে।
পেন্টাগনের কর্মকর্তারা আসন্ন যুদ্ধের যাবতীয় বিষয় পরিচালনায় যখন ব্যস্ত তখন এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনসহ পররাষ্ট্র দফতর একেবারেই নীরব। অবশ্য রেক্স টিলারসন গত সপ্তাহে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় জেনেভায় অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দেন। ২০১৪ সালের পর এই প্রথম এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
রেক্স টিলারসনের পূর্বসূরি জন কেরি আগ বাড়িয়ে বিষয়টি জানালেও গত এপ্রিলে সেই উদ্যোগ থেমে যায়। মস্কো অথবা তেহরান কেউই প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী না হওয়ায় বিষয়টি অমীমাংসিত থাকে। কিন্তু সৌদি আরব, ফ্রান্স ও আমেরিকা এখন পর্যন্ত বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে। 
বৈশিষ্ট্যহীন নীরবতা
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং দেশটির রাজনৈতিক পরিবর্তনের ব্যাপারে টিলারসন এবং তার সরকারের অবস্থান সম্পর্কে তিনি একেবারেই নীরব। এ ব্যাপারে ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউজও নীরব। মস্কোয় তেহরান এবং দামেস্ক এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিগ্রাহ্য পশ্চাৎপসারণ এবং ‘সিরিয়া ফাইলের’ আউট সোর্সিং হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র অন্ততপক্ষে এটাকে পুতিনের কাছে তাদের রাজনৈতিক উপাদান হিসেবে দেখছে।
রুশরা এখনো আলোচনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা চলতি মাসে সুইজারল্যান্ডে দুই দফা আলোচনায় মিলিত হয়। এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নি¤œপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এবং ডেপুটি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেন্নাদি গাতিলোভ উপস্থিত ছিলেন। তারা দ্রুত রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল প্রক্রিয়া শেষ করার ওপর জোর দেন। তারা সরকারি শাসন থেকে বিরোধীদলীয় শাসন নয়Ñ বরং ক্ষমতা ভাগাভাগির ফর্মুলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এই ফর্মুলায় একটি নতুন সংবিধান, নতুন পার্লামেন্ট, নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করা- যাতে বাশার আল আসাদ আরো দুই মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন- ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সম্প্রতি নতুন করে প্রণীত সংবিধানে রাশিয়া প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হ্রাস করার এবং বাশারকে আগামী নির্বাচনসহ দুই মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেয়ার পরামর্শ দেয়। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। তারা মস্কো সমর্থিত সিরীয় বিরোধী দলকে ৩০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ১০টি মন্ত্রণালয় দিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু তারা সৌদি অর্থ সহায়তায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচক কমিটি (এইচএনসি) সাথে ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে এবং বেসামরিক রাজনীতিকদের সাথে কথা বলেনি। সব পক্ষ ২৩ মার্চ প্রস্তাবিত শর্তাবলি নিয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়ার কথা। তারা বছরের অবশিষ্ট সময়ে এই প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্তি করেছেন। তারা ২০১৭ সাল শেষ হওয়ার আগে আলোর মুখ দেখতে পাবেন বলে আশা করছেন। 
লেখক :  
সামি মোবাইদ সিরীয় ইতিহাসবিদ। আন্ডার দ্য ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ : অ্যাট দ্য ফ্রন্টিয়ার অব দি নিউ জিহাদ গ্রন্থের লেখক। 
গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

সোমবার, ১ মে, ২০১৭

রবীন্দ্রনাথ শ্যাষ, এহন কাসেম্মার যুগ

ভদ্দরলোক ভাই ও বোনেরা, আপনাগো বই কেউ পড়ে না। আপনারা নিজেরাও পড়েন না, কেনা তো দূরের কথা। আপনারা পয়সা দিয়া সমালোচনা লেখান। উপসচিবরে তেল মাইরা পুরস্কার নেওয়ার চেষ্টা করেন। রেস্টুরেন্টে বইয়া আড্ডা দেন, মদ খান, প্রেম আর পরকীয়া করেন। আর শেখ হাসিনারে প্রশংসা কইরা ভাবেন যে উনিই আপনাগো রক্ষা করব। সেই শেখ হাসিনা চইলা গেছে আপনাগো ফালায় দিয়া। তাঁর বেস্ট ফ্রেন্ড এখন হেফাজত।

সেই হেফাজত আর কওমি মাদ্রাসারে তাই সমানে গালি দিতাছেন। অবশ্য রইয়া-সইয়া। কারণ আপা যদি চেইত্যা যায়, সেই ভয়ও আছে। আপনাগো কেউ পাত্তা দেয় না, যহন নিজেদের লোক নিজেগো পাত্তা দেয় না, তহন শেখ হাসিনার কি ঠ্যাহা পড়ছে আপনাগো পাত্তা দেওয়ার? আপা ঠিকই বুঝছে আপনাগো দিয়া কাম হইব না।

২. চাকরি, সুবিধা, ফ্ল্যাট, অনুষ্ঠানে দাওয়াত, সফর, বিভিন্ন পুরস্কারের পেছনে দৌড়াইতে দৌড়াইতে ভুইল্লাই গেছিলেন যে আপনাগো পায়ের নিচে কোনো মাটি নাই। যেইডা ভাসে পানিতে, হেইডারে কচুরিপানা কয়। কাসেম বিন আবুবাকাররে এত যে গালি দিতাছেন দরজা-জানালা খুইলা, একবার কি ভাবছেন, আপনারা হগলে মিল্লা যত বই লিখছেন তার বিক্রি কাসেম্মার একখান বইয়ের থন কম বিক্রি। পালান ভাইসাবরা। আপনাগো দিন শ্যাষ। মাইন্না লন, বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হইতাছে কাসেম বিন আবুবাকার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে সাধারণ মানুষগো কাছে তাঁর দাম বেশি। হুঁশ কইরা হিসাব কইরেন।

৩. এই কাসেম্মা বুইড়া নাকি চটি লেহে, বোরকা পইরা যৌনকর্ম করে! আবার ধর্মের কথা কয়। এইডা দেইখা আপনাগো বুক জ্বইলা যাইতাছে। কারণ আপনারা করেন এই সব কু-কাম, লেখেনও মাঝে-মধ্যে। কিন্তু তাও কেউ পাত্তা দেয় না। যতক্ষণ না শাহাবুদ্দীন নাগরী কিসিমের পাবলিক ধরা পইড়া যায়। তা ভাই ভদ্দর লোকগণ, একটা কাসেম বিন আবুবাকারের লাহান বই লিখা দ্যাখেন তো, একশ বই বিক্রি করতে পারবেন কি না। আপনারা তো পুলিশের পাহারা না হইলে সাংস্কৃতিক বিপ্লব করতে পারেন না। আপনারা বুড়া কাসেমের সাথে লইড়া একবার দেহান পাবলিকরে।

৪. আসল কথা হইল, আপনারা হইতাছেন শহরের মধ্যবিত্ত ভদ্দরনোক। রবীন্দ্র-জীবনানন্দ শ্রেণির পার্টি। আপনাগো লেহায় যেই সব উহ! আহ! আহে হেগুলা গাও-গ্রামের মুরখ্য মানুষ পড়তে চায় না। যেহানে আপনারা নিজেরাই পড়তে চান না, হেরা পড়ব ক্যান? কাসেম্মা হেই মানুষগো জন্য লিখতাছে, হেগো ভাষায়, হেগো চিন্তায়, হেগো সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা লইয়া। হেরা পড়ছে, খুশি হইছে। আপনাগো এত লাগে ক্যান?

কাসেম্মা কইছে কখনো, আমারে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেন? আপনারা কন, আপনারা চান, হেয় চায় না। হের পাবলিক আছে, আপনাগো নাই। এই জন্য এত কষ্ট হইতাছে? এককাঠি মাইরা তারে কেউ কেউ জামাতি বানাইছেন, হেফাজতি বানাইছেন। ফেসবুকে সুবহানাল্লা প্রচুর কিছু লিখছেন গালি দিয়া। হেয় লিখছে? ফেসবুকের বাইরেও যে দুনিয়া, যেমন ধরেন গার্মেন্টসের আপারা। যারা তার বই পড়ে, তাগো কিছু আসে-যায় না আপনার পোস্টে। আপনারা তো ফ্রেন্ড-আনফ্রেন্ড লইয়াই আছেন। যতজন আপনাগো লাইক দেয় একটা পোস্টে, তার চেয়ে বেশি লোক আপনাগো বই পড়ে?

৫. এই দেশের অর্থনীতিতে গাও-গ্রামের মানুষের উন্নতি হইছে। বিশেষ কইরা ১৯৯০ সালের পরে। বর্তমান সরকারের টাইমে হেইডা আরো বাড়ছে। হেরা হাতে কিছু পয়সা পাইছে, লেহাপড়া শিখছে, বই পড়ে আপনাগো চেয়ে বেশি। এতে তো খুশি হওনের কথা আপনাগো। অসুবিধা হইল, আপনারা আপনাগো লাইগাই লেখেন, পাবলিকের জন্য না। পাবলিক বইলা যে কিছু আছে, এটাই মানতে চান না। আপনাগোর সিলসিলা কলকাতার ভদ্দরনোকের সিলসিলা, সুনীল-হুমায়ূনের সিলসিলা, শহরের মানুষগো সিলসিলা। ওই সিলসিলার এহন জানাজা হইতাছে। শুনতে পাইতাছেন? আর যেই মানুষটা ওই জানাজায় ইমামতি করতাছে, হের নাম কাসেম বিন আবুবাকার।

শেষ কথা চটি লইয়া। আমগো দেশের বেশির ভাগ মানুষ বিশেষ কইরা ভদ্দর লোকেরা ইন্টারনেটে গিয়া কী দ্যাখেন হেইডা জানেন না? হের নাম পর্নো, আপনারা কাসেম্মার একটা কিস সহ্য করতে পারেন না। আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্নো দ্যাহেন, তাতে কোনো অসুবিধা নাই? আপনাগো কী নামে ডাকুম। রবীন্দ্রনাথের যুগের শেষ হইছে। এহন কাসেম্মার যুগ। সালাম দেন।

লেখক : গবেষক ও সাংবাদিক

শনিবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৭

তিস্তা নদীর পানি ও রাজনীতি !

eZ©gv‡b cÖavbgš¿x w`jøx †M‡Qb, Av‡jvwPZ n‡”Q Pzw³, `vex wel‡q| me‡P‡q †ewk Av‡jvwPZ n‡”Q wZ¯Ív b`xi cvwbi wnm¨v wb‡q| evsjv‡`‡ki `vex wZ¯Ívi cvwb cÖevn hv‡Z wVK _v‡K, ﯋ †gŠmy‡g cvwb hv‡Z Av‡m †mB wb‡q †`b `ievi n‡”Q `xN© w`b hveZ, bvbvb mgxÿv, bvbvb DcvË wb‡q `y c‡ÿi g‡a¨ A‡bK `iKlKwl †k‡l fviZ †kl ch©šÍ Pzw³ n‡”Q bv e‡jB †NvwlZ n‡q‡Q|

GB wb‡q bvbvb gn‡j †ek Av‡jvwPZ n‡”Q, cÖkœ  DV‡Q †Kb evsjv‡`k‡K cvwb †`Iqv n‡e bv, fviZ ïay †b‡eB Avgv‡`i wKQz †`‡e bv| Ggb bvbvb Mig Kiv Lei| g~jZ ivRbxwZi Kvi‡Y wZ¯Ív Pzw³ n‡”Q bv Ggb aviYvB eySv‡Z mÿg n‡q‡Q w`jøx| ggZv e¨vbvwR©i Kvi‡Y Ggb n‡”Q e‡jB w`jøx Zv‡`i mZZv cÖKv‡ki †Póv Ki‡Qb| ev¯ÍweK w`KUv wK GgbB ? Avmyb †`wL wZ¯Ív wK GLb evsjv‡`k cvwb e‡q Avb‡Z mÿg |

ÒcÖK…Z c‡ÿi b`xwUi evsjv bvg wZ¯Ív hv Ôw·¯ªvZÕ ev wZb cÖevn †_‡K G‡m‡Q| wn›`y cyivY Avbymv‡i GwU †`ex cve©Zxi ¯Íb †_‡K Drcvbœ n‡q‡Q| wmwKg wngvj‡qi 7200 wgUvi D”PZvq wPZvgy n«` †_‡KB wZ¯Ívi DrcwË| `vwR©wjs G wkfK †Mvjv †_‡K wMwim¼U Gi ga¨ w`‡q cÖevwnZ n‡q evsjv‡`‡ki wbjdvgvwi †Rjvi KvjxMÄ mxgvšÍ GjvKv w`‡q evsjv‡`‡k cÖ‡ek K‡i‡Q|

wmwKg †_‡K Drcvbœ GB b`x 414 wK‡jvwgUvi ˆ`N©¨ wb‡q wZ¯Ívi we¯Í…wZ Gi g‡a¨ wmwKg 151 cwðge½ 142 I 121 wK‡jv wgUvi evsjv‡`‡ki Dˇi †Rjv MvBevÜv, KzwouMÖvg, jvjgwbinvU, bxjdvgvix I iscy‡ii wfZi w`‡q cÖevwnZ, 35wU Dc‡Rjv 5427 wU MÖvg Avi mv‡o cvuP †KvwU gvby‡li emvev‡mi ¯’‡j K…wli mivmwi f~wgKv i‡q‡Q i‡q‡Q GB wZ¯Ív b`xi| 

1983 mv‡j evsjv‡`k I fvi‡Zi g‡¨a wZ¯Ív b`xi cvwb e›U‡bi e¨cv‡i wm×všÍ nq †h, evsjv‡`k 36 kZvsk fviZ 39 kZvsk cvwb cv‡e evKx cvwb msiwÿZ wn‡m‡e ivLv n‡e| wKš‘ mwVK †Kvb w`K wb‡`©kbv bv _vKvq gš¿x ch©vq †_‡K Avi †ewk `yi Movqwb| 2007 mv‡j wZ¯Ívi cvwb wb‡q GK †hŠ_‰eVK nq, Zv‡Z `y‡`k mgvb mgvb wfwˇZ 80 kZvsk cvwb wnm¨v Avi evwK 20 kZvsk msiwÿZ †i‡L Pzw³i KvQvKvwQ wM‡q †kl ch©šÍ Avi Pzw³Uv nqwb fvi‡Zi we‡ivaxZvi Kvi‡Y| 

fviZ wZ¯Ívi 300 wK‡jv cÖev‡ni g‡a¨B 10 wU evua w`‡q‡Q, me©‡kl fvi‡Zi RjcvuB¸woi ÔMRj‡WvevÕ bvgK ¯’v‡b evau w`‡q evsjv‡`‡k cvwb cÖevn G‡Kev‡iB eÜ Kivi Dcµg n‡q‡Q| Avgv‡`i Wvwjqv c‡q‡›U †h cvwb Av‡m Zv‡Z b`xi c_ wn‡m‡e Avi ejv hvq bv| GB Z_¨ `yB c‡ÿi Kv‡QB Av‡Q A_P ivR‰bwZK †Ljv wn‡m‡e wZ¯Ív GKwU wekvj e¨cvi n‡q †M‡Q|

fviZ †h‡nZz 10 wU evua w`‡q wZ¯Ívi cvwb‡K AvUwK‡q w`‡q‡Q, †m‡nZz GLb evua †f‡½ †dj‡jI wZ¯Ívi Avi †hŠeb wd‡i Avm‡e bv, cÖhyw³ Avi mf¨Zvi K_v e‡j wZ¯Ív‡K †g‡i †djv n‡q‡Q, cwðge‡½i gvbylB ﯋ †gŠmy‡g cvwb cvq bv, †mLv‡b Avgiv wK K‡i cvwb cv‡ev ? 10 wU evua wbg©v‡b wmwKg GLb e„nZ we`y¨r Drcv`K ivR¨ A_P Rxe, Rxe‡bi cÖvPzh© fiv GB AÂj cvwb k~Y¨Zvi Kvi‡Y Rxeb RxweKv AvR ûgwKi g~‡L|
A_P ivR‰bwZK dq`v †bIqvi Rb¨ GB giv b`x wb‡q bvbvb fv‡e gvbyl‡K weåvšÍ Kiv n‡”Q| GB †_‡K gvbyl‡K eySv DwPr wZ¯Ívi cÖK…Z wPÎ, cwðge½ I B”Qv Ki‡j Zvi ¯^vfvweK engv‡bi cvwb cv‡e bv, †mUv wmwgB AvUwK‡q †i‡L‡Q ZvB Avgv‡`i cvIqvi cÖkœB D‡V bv| GB mZ¨Uv‡K Avgv‡`i miKvi Avgv‡`i Rvbv‡”Q bv, fviZ Zvi ivR‰bwZK `iKlvKwl‡Z wZ¯Ív‡K GLb evuwP‡q †i‡L‡Q wb‡R‡`i ¯^v‡_©|

AvjgMxi Avjg
01611010011


রবিবার, ২ এপ্রিল, ২০১৭

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফর: যা থাকছে প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দু’দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই নিয়ে এখন সর্বত্র চলছে আলোচনা। ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার বেশি আগ্রহ দেখালেও বাংলাদেশ এমওইউ সইয়ে সম্মতি দিয়েছে। 
পাঁচ বছর মেয়াদি এই এমওইউ খসড়ায় প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার পাশাপাশি এই শিল্পের বিকাশে যৌথ উদ্যোগ, মহাকাশ প্রযুক্তি, কারিগরি সহায়তা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে এক দেশ অন্য দেশকে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমারেখায় সমন্বিত টহলসহ যৌথ ও সমন্বিত অনুশীলন করবে দু’দেশ। এছাড়া উভয়পক্ষ আন্তর্জাতিক আইন, নিজ নিজ জাতীয় আইন, শর্তগুলো, নীতি এবং প্রথা মেনে নিজস্ব স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে সক্রিয়ভাবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে কাজ করবে। 
আগামী ৭-১০ এপ্রিল চার দিনের সফরে ভারত যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সফরে কোনো চুক্তি সই না হলেও প্রায় ৩৯টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে কাজ করছে দু’দেশ। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারকের খসড়ার কপি সকালের খবরের কাছে রয়েছে। 

তা থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো তুলে ধরা হল : 

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা : এমওইউর অনুচ্ছেদ-২-এ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে সামরিক সদস্যদের সফর বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, তথ্যবিনিময়, কর্মশালা আয়োজন, প্রশিক্ষণ, আলোচনা সভা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে অনুষ্ঠান এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক শিক্ষা সফরের কথা বলা হয়েছে। এসব সফরের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর সংশ্লিষ্ট অসামরিক ব্যক্তিরাও সফরের জন্য মনোনীত হতে পারবেন। প্রকৃত যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী/নকশাকারী প্রতিষ্ঠানের যথাযথ অনুমতিসাপেক্ষে প্রয়োজনে সামরিক সরঞ্জামাদি রক্ষণাবেক্ষণে পরস্পর সহযোগিতা প্রদান করবে। সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দুর্যোগ ও ত্রাণবিষয়ক সহযোগিতা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে দু’দেশ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কর্মকাণ্ড নিয়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে বলা হয়েছে-প্রশিক্ষণ, মতামত, সক্ষমতা বিনিময়, একে অন্যের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ গ্রহণ, প্রশিক্ষক বিনিময়, আলোচনা সভা, কর্মশালা এবং যৌথ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। দ্বিপক্ষীয় মতামতের ভিত্তিতে নিয়মিত ক্রীড়া এবং দুঃসাহসিক অভিযান কার্যক্রম আয়োজনের পাশাপাশি চিকিত্সা সহযোগিতার বিষয়টিও রাখা হয়েছে খসড়ায়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে জাহাজ ও উড়োজাহাজের সফর বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমারেখায় সমন্বিত টহলসহ যৌথ ও সমন্বিত অনুশীলন করবে। 

প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা : উভয়পক্ষ জাতীয় আইন অনুযায়ী যৌথ উদ্যোগ, মহাকাশ প্রযুক্তি সহযোগিতা, কারিগরি সহায়তা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা করবে। প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতাগুলো প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান এবং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে তাদের বাণিজ্যিক কার্যকারিতা, প্রতিযোগিতামূলক দর, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং পারস্পরিক সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে সংঘটিত হবে। এক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে কোনো একটি পক্ষ তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা কোম্পানির মধ্যে স্বাক্ষরিত কোনো চুক্তিসীমা লঙ্ঘন করবে না। উভয়পক্ষ সরকারি নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পে উন্নয়নে সহযোগিতার ধরন এবং প্রতিরক্ষা পণ্য উত্পাদনে সহযোগিতা করবে। এই সহযোগিতা উভয়পক্ষ নিজস্ব জাতীয় প্রয়োজনীয়তা এবং পারস্পরিক সম্মত শর্তাবলি অনুযায়ী করবে। 

প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা সহযোগিতা : বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারকের খসড়া অনুযায়ী উভয়পক্ষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিষয়ক সহযোগিতা করবে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলীদের সফর বিনিময় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে তথ্যবিনিময় করবে। সহযোগিতার ব্যবস্থাপনা : প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এমওইউর ৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকটি পর্যবেক্ষণ, পরিচালনা এবং বাস্তবায়নে প্রতিরক্ষা সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার পর্যায়ে বার্ষিক সংলাপ হবে। এই আলোচনা প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ এবং ভারতে অনুষ্ঠিত হবে। 

তথ্য নিরাপত্তা : খসড়ার ৭নং অনুচ্ছেদে বিনিময়কৃত তথ্যের নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় যেসব গোপন তথ্য বিনিময় হবে, সেগুলো যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়, তা দু’পক্ষ নিশ্চিত করবে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রক্রিয়ার সময় দু’পক্ষ গোপনীয়তা মেনে চলবে। তৃতীয় কোনো পক্ষের স্বার্থ লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো পক্ষ নিজ সরকার কর্তৃক নিরাপত্তা ছাড়পত্র প্রদানকৃত সদস্য ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় প্রাপ্ত গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এই অনুচ্ছেদের শর্তগুলো সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ সম্পন্ন হওয়ার পরও কার্যকর থাকবে। 

সংশোধন ও সম্পূরক : উভয়পক্ষের লিখিত সম্মতিতে এই সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক সংশোধন করা যাবে। এই সংশোধন বা সম্পূরক উভয়পক্ষের সম্মতির দিন থেকে প্রযোজ্য হবে। এক্ষেত্রে সংশোধন বা সম্পূরক কার্যকর হওয়ার দিন বা আগের সময়ে এই সমঝোতা স্মারককে কোনো পক্ষ প্রভাবিত করবে না। 

বিরোধ নিষ্পত্তি : এই সমঝোতা স্মারকের কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলে উভয়পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা হবে। 

বৈধতা মেয়াদ এবং পরিসমাপ্তি : সমঝোতা স্মারকের ১১নং অনুচ্ছেদে মেয়াদ ও পরিসমাপ্তির কথা বলা হয়েছে। ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারকটি সইয়ের পর থেকে মেয়াদপূর্তির পর দিন নবায়ন হবে। যদি এটিতে কোনো পরিবর্তন আনতে হয়, মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগে যেকোনো পক্ষকে নোটিস দিয়ে তা জানাতে হবে। সমঝোতা স্মারকের ৫ বছরের মধ্যবর্তী সময়ে কোনো পক্ষ পরিসমাপ্তি করতে চাইলে অন্যপক্ষকে ৬ মাস আগে কূটনৈতিক মাধ্যমে লিখিত নোটিস দিতে হবে।

শনিবার, ২৫ মার্চ, ২০১৭

নেলির গণহত্যা: ফিরে দেখা

উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য আসামে গত ২৪শে এপ্রিল যে সব এলাকায় ভোটগ্রহণ হলো, তার মধ্যে রয়েছে নগাঁও কেন্দ্রটিও। এই কেন্দ্রেরই একটা অঞ্চল নেলি। আশির দশকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যখন অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের আন্দোলন চরমে, সেই সময়েই নেলিতে সংঘটিত হয়েছিল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যা। এক বেলাতেই হত্যা করা হয়েছিল তিনহাজারেরও বেশী বাঙালী মুসলমানকে। একত্রিশ বছর ধরে সেখানে নিয়মিতই ভোট নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মৃতদের স্মৃতিসৌধ থেকে নলকূপ বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিছুই পায় নি গণহত্যার কবলে পড়া বসনতোরি, বুকডোবা হাবি বা বরবরি গ্রামগুলো।
বাসনতরি গ্রামের জোহরা খাতুন। ৫/৬ দিন ধরে মৃত মায়ের দেহের ওপর পড়ে ছিল ছয় মাসের জোহরা।

বাসনতরি গ্রামের জোহরা খাতুন। ৫/৬ দিন ধরে মৃত মায়ের দেহের ওপর পড়ে ছিল ছয় মাসের জোহরা।
বসনতোরিতে দেখা হয়েছিল যুবতী জোহরা খাতুনের সঙ্গে। ১৯৮৩ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারিতে তার বয়স ছিল মাত্র ছয়মাস। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ''বড় হয়ে শুনেছি বাবা-র কাছে যে ছয়মাসের আমাকে কোলে নিয়ে পালাতে গিয়ে মা গুলি খেয়ে মাঠে পড়ে গিয়েছিল। আমি নাকি পাঁচ-ছয় দিন মরা মায়ের গায়ের ওপরেই পড়ে ছিলাম। পরে পুলিশ আমাকে নিয়ে গিয়ে বাবাকে খুঁজে বার করে।”
১৮ই ফেব্রুয়ারি সকালে যখন অসমীয়া জাতীয়তাবাদী শক্তির সমর্থক কয়েক হাজার দুষ্কৃতকারী বসনতোরির একের পর এক বাড়ী জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, তখন গ্রামের পুরুষ-মহিলা- শিশুরা বৃদ্ধ মুহাম্মদ আব্দুল হকের বাড়ীর ঠিক পেছনেই চাষের ক্ষেতে জড়ো হয়েছিলেন। মি. হক বলছিলেন, “সকাল সাতটা নাগাদ বাড়ি-ঘর জ্বালানো শুরু হয়েছিল। গ্রামের দুই প্রান্ত থেকেই ঘর জ্বালাতে জ্বালাতে এগচ্ছিল ওরা। সব মানুষ আমার বাড়ির ঠিক পেছনের ক্ষেতে জমা হয়েছিল। হঠাৎ দেখলাম অনেকগুলো গাড়ি থেকে অস্ত্র হাতে লোকজন নামছে। মুখে গামছা বাঁধা। তারপরেই শুরু হয়েছিল গুলি আর তীর ছোঁড়া।“
প্রাণে বাঁচার জন্য দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে দৌড়িয়েছিলেন পশ্চিমদিকের নদীর দিকে। সাঁতরে নদী পার হতে যাঁরা পেরেছিলেন, তাঁরাই এখনও জীবিত রয়েছেন সেই বিভৎসতার বর্ণনা দেওয়ার জন্য।
বসনতোরি গ্রামের গণকবর। এখানে ২৬০০ মানুষের লাশ রয়েছে।

বসনতোরি গ্রামের গণকবর। এখানে ২৬০০ মানুষের লাশ রয়েছে।
আব্দুল হক নিজেও স্ত্রী, পুত্র, মেয়েকে হারিয়েছেন ওই পাইকারি হত্যাকান্ডে। ওই দুটো গ্রামেই মারা গিয়েছিলেন ২০০০ ছ’শোরও বেশী মানুষ।
পাশের গ্রাম বুকডোবা হাবির বাসিন্দা মোসলেমুদ্দিনেরও ৫ বছরের মেয়ে, স্ত্রী সহ প্রায় পুরো পরিবারই সেদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।
“আমরা তো সব হারালাম, কিন্তু এতদিন পরেও তার কোনও বিচার পেলাম না। মৃতদেহ পিছু ৫০০০ করে টাকা আর কিছু ঢেউ-টিন দিয়েছে,” বলছিলেন মি. মোসলেমুদ্দিন।
বসনতোরি-বুকডোবা হাবি থেকে বেশ অনেক কিলোমিটার দূরে – পাহাড়ের কোলে চা বাগান ঘেঁষা গ্রাম বরবরি। একই দিনে সেখানেও হামলা হয়েছিল। সাড়ে পাঁচশো মহিলা-পুরুষ-শিশুকে সেদিন মেরে ফেলা হয়েছিল।
পরিকল্পনাটা ছিল একই রকম। চারদিক থেকে হাজার হাজার সশস্ত্র মানুষ দিয়ে প্রথমে বাড়ী-ঘর জ্বালিয়ে দাও। তারপরে প্রাণভয়ে মানুষ যখন পালাবে, তখন গুলি বা তীর ছুঁড়ে মেরে ফেল। যদিও দু'দিন আগেই থানায় ডেকে নিয়ে গিয়ে শান্তি কমিটি তৈরী করে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু ঘটনার দিন বেশ কয়েক ঘন্টা কোনও পুলিশ আসে নি।
মোসলেমুদ্দিন, বুকডোবা হাবি গ্রামের বাসিন্দা

মোসলেমুদ্দিন, বুকডোবা হাবি গ্রামের বাসিন্দা
বসনতোরির মুহাম্মদ আব্দুল হক বলছিলেন, “কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা রক্ষীরা গন্ডগোল আঁচ করতে পেরেছিল, গুলির শব্দও হয়তো শুনেছিল। কিন্তু স্থানীয় থানার অফিসারেরা বাহিনীকে গ্রামে নিয়ে না এসে অন্যান্য দিকে টহল দেওয়াচ্ছিল। পরে কয়েকজন মহিলা কেন্দ্রীয় বাহিনীর গাড়ীগুলির পথ আটকালে তারা বুঝতে পারে কী ঘটছে ভেতরের গ্রামগুলোতে। দুষ্কৃতিরা তখনই পালাতে শুরু করে।“
বরবরির কয়েকজন নিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামের কবরস্থানে, যেখানে গণকবর দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৫০০ মৃতদেহ। সেখানেই একটা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ৩০ বছরেও গড়ে তোলার জন্য কেউ সাহায্য করে নি। শুধু কয়েকটা লোহার রড মাটিতে পোঁতা হয়েছে।
আর বসনতোরি গ্রামের বাইরে যেখানে কয়েকহাজার মানুষকে গণকবর দিয়েছিল নিরাপত্তা বাহিনী, প্রাণে বেঁচে গ্রামে ফিরে সেই জায়গাটার কী অবস্থা দেখেছিলেন, সেটাই বলছিলেন আব্দুল সোবহান।

তাঁর কথায়, “দিন তিনেক পরে যখন গ্রামে আসতে পারলাম, দেখি যাকে যেভাবে পেরেছে, কবর দিয়েছে। কারও হাত বেরিয়ে আছে, কারও পা। রাত্রিবেলা নিরাপত্তাবাহিনীই কবর দিয়েছে। পরে আমরা সেগুলোর ব্যবস্থা করে মৃতদের শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করি।“
একত্রিশ বছর ধরে প্রতিবারই ভোট দেন বসনতোরি বা বরবরির মানুষ। '৮৩-র গণহত্যা ঘটে যাওয়া গ্রামগুলোতে এবারের নির্বাচনের প্রচার চালিয়েছে কংগ্রেস, আসামের মুসলমানদের রাজনৈতিক দল এআইইউডিএফ, এমনকি যে অসমীয়া জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে গণহত্যা হয়েছিল, তাদেরই উত্তরসূরী অসম গণ পরিষদও। কিন্তু গত তিন দশকে তাঁদের অবস্থাটা পাল্টায় নি। কোনও সরকারই ফিরে তাকায় নি সব-হারা এই বাঙালী মুসলমান গ্রামগুলোর দিকে, যদিও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গিয়ানি জৈল সিং থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী- প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন সকলেই।
বসনতোরি, বরবরি, বুকডোবা হাবির রাস্তা তিন দশক পরেও পাকা হয় নি, গ্রামের ১৮০০ মানুষের জন্য একটাই নলকূপ, কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, নেই কোনও কাজের সুযোগ। গ্রামের ছেলেদের কাজের খোঁজে যেতে হয়েছে দক্ষিণ ভারতের কেরালায়।
অথচ চোখে পড়ল বরবরির কয়েক কিলোমিটার দূরেই, জাতীয় সড়কের ওপরে ধরমতুলকে গড়ে তোলা হচ্ছে আদর্শ গ্রাম হিসাবে।

মঙ্গলবার, ২১ মার্চ, ২০১৭

প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধমে যে দেশকে পরাধীন করেছিল ভারত


লেন্দুপ দর্জি আলোচিত নাম। আলোচিত চরিত্র। বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। ভারতীয় আধিপত্যবাদের সেবাদাস। ২০০২ সালে ভূষিত হন ভারতের ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবে। এক সময়ের জনপ্রিয় এই নেতাকে দেশের মানুষ সম্মানের সাথে ডাকত কাজীসাব বলে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লিতে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতেন। কিন্তু শেষ জীবনে ভারতের দ্বিতীয় সারির নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেও তাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছে। বেঁচে ছিলেন ১০২ বছর। দীর্ঘ দিন লিভারের জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিঃসঙ্গ, নিন্দিত ও ভীতসন্ত্রস্ত জীবনযাপন শেষে লেন্দুপ দর্জি মৃত্যুবরণ করেন। তার পুরো নাম কাজী লেন্দুপ দর্জি খাং শেরপা। জন্মেছিলেন ১৯০৪ সালের ১১ অক্টোবর পূর্ব সিকিমের পাকিয়ং এলাকায়। মারা যান ২০০৭ সালের ২৮ জুলাই। ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী স্বাধীন সিকিম এখন ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। আয়তন সাত হাজার ৯৬ বর্গকিলোমিটার।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী লোকসংখ্যা ছয় লাখ সাত হাজার। সিকিমের ভূ-কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যের উত্তরে চীন, পশ্চিমে নেপাল, পূর্বে ভুটান ও দক্ষিণে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং। সিকিম-তিব্বত (চীন) বাণিজ্যপথ ‘না থুলা পাস’ আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহন করে। সামরিক গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর সিকিমের কাছেই। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম দিকে সিকিমের অবস্থান। ঢাকা থেকে সড়কপথে রাজধানী গ্যাংটকের দূরত্ব ৬৫৪ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায়ের পর মনিপুর, ত্রিপুরা, কুচবিহারসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদান করে অথবা যোগদানে বাধ্য করা হয়। ব্রিটেনের কাছে সিকিম স্বাধীনতার নিশ্চয়তা লাভ করেছিল সিকিমের স্বাধীন রাজাদের বলা হতো চগওয়াল। ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরুর আগে সিকিম তার পার্শ্ববর্তী নেপাল আর ভুটানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। ব্রিটিশরা আসার পর তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নেপালের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সিকিম। এ সময় রাজা ছিলেন নামগয়াল। কিন্তু ব্রিটিশরা তিব্বতে যাওয়ার জন্য এক সময় সিকিম দখল করে নেয়, ১৮৮৮ সালে রাজা নামগয়াল আলোচনার জন্য কলকাতা গেলে তাকে বন্দী করা হয়। ১৮৯২ সালে তাকে মুক্তি দিয়ে সিকিমের স্বাধীনতাকে মেনে নেয়া হয়। প্রিন্স চার্লস ১৯০৫ সালে ভারত সফরে এলে চগওয়ালকে রাজার সম্মান দেয়া হয়। চোগওয়ালপুত্র সিডকং টুলকুকে অক্সফোর্ডে লেখাপড়া করতে পাঠানো হয়। টুলকু নামগয়াল ক্ষমতায় বসে সিকিমের ব্যাপক উন্নতি করেন। ব্রিটিশের কাছে সিকিম তার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা লাভ করেছিল। গণভোটে সিকিমের মানুষ ভারতের বিরুদ্ধে রায় দেয় ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ছেড়ে যাওয়ার সময় গণভোটে সিকিমের মানুষ ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিরুদ্ধে রায় দেয়। ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু সিকিমকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর সিকিমের গুরুত্ব বেড়ে যায়।

১৯৬৩ সালে থাসি নামগয়াল এবং ১৯৬৪ সালে নেহরু মারা গেলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। চগওয়াল হন পাল্ডেন থন্ডুপ নামগয়াল। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সিকিম দখল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি কাজে লাগান লেন্দুপ দর্জিকে। সিকিম ছিল ব্রিটেনের আশ্রিত রাষ্ট্র হিমালয়ের পাদদেশে ছোট্ট স্বাধীন দেশ সিকিমকে ভারতীয় ইউনিয়নের অঙ্গীভূত করার বিল ভারতীয় পার্লামেন্টে আনা হয় ১৯৭৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। ওই বিল পাস হয় ৩১০-৭ ভোটে। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই-এম) বিপক্ষে ভোট দেয়। এবং সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের মে মাসে সিকিমকে পাকাপোক্তভাবে একটি অঙ্গরাজ্য করা হয়। এর আগে ব্রিটিশ ভারতে সিকিম ছিল একটি আশ্রিত রাষ্ট্র। স্বভূমিজাত লেপচা উপজাতীয়রা সিকিমের জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশ। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও পোশাক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তিব্বত থেকে ভুটিয়ারা ও নেপাল থেকে নেপালিরা এসে বসতি স্থাপন করে। সিকিমের তিনটি ভাষা এখন প্রধান-লেপচা, ভুটানি ও নেপালি। চতুর্দশ শতক থেকে নামগিয়াল বংশ সিকিমে রাজত্ব করে আসছিল। প্রথম শাসক পুনটমং নামগিয়াল। ১৬৪২ সালে তাকে চগিয়াল উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যার অর্থ ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ করে যিনি রাজকার্য পরিচালনা করেন। সর্বশেষ চগিয়ালকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথমে ভারত প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নেয় ৭২৯৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই ছোট্ট দেশটির রাজধানী গ্যাংটক। ১৮৮৬ সালে এক চুক্তির অধীনে সিকিম আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যোগ দেয়।

১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে চলে গেলে ওই চুক্তি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ১৯৫০ সালে ভারতের সাথে সিকিমের চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে সিকিমকে ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়। চুক্তির অধীনে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপনা দেখাশোনার পুরো কর্তৃত্ব ভারত নিয়ে নেয়। চগিয়াল ২৪ সদস্যের কাউন্সিলের মাধ্যমে দেশের শাসনকাজ পরিচালনা করতেন। এর মধ্যে ১৮ জন নির্বাচিত এবং ছয়জন চগিয়াল মনোনীত। কাউন্সিলে তিনটি দলের প্রতিনিধি ছিল ন্যাশনাল পার্টি, সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস ও সিকিম জনতা কংগ্রেস। ভারতীয় পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দিতে বাধ্য হন চগিয়াল ১৯৭৩ সালের মার্চ-এপ্রিলে ন্যাশনাল কংগ্রেস ও জনতা কংগ্রেস রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি তোলে। এই দাবিতে আন্দোলন দিনে দিনে তুমুল হতে থাকায় চগিয়ালের অনুরোধে ভারতীয় পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ওই ১৯৭৩ সালের ১৩ এপ্রিল ঘোষণা করা হয় যে, চগিয়াল রাজনৈতিক সংস্কার মেনে নিতে রাজি আছেন। এ ছাড়া তার আর কোনো উপায়ও ছিল না। কারণ তিনি স্পষ্টই অনুধাবন করেন এই আন্দোলনের পেছনের শক্তি কে? পরে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা স্বীকার করেছে যে, আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিল। সংস্কারে রাজি না হলে সিংহাসন থেকে উৎখাত করা হবে, এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন নিশ্চিত। তাই সিকিমের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার চেষ্টায় রাজনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকার করেন। অঙ্গীকার মোতাবেক ১৯৭৪ সালের জুন সিকিম রাষ্ট্র আইনে পরিবর্তন আনা হয়। ওই আইনের অধীনে চগিয়ালের সার্বভৌম ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তিনি হন নিয়মতান্ত্রিক প্রধান। অবশ্য আইন পরিষদে পাস হওয়া আইন অনুমোদনে ক্ষমতা তাকে দেয়া হয়। এতেও শেষ রক্ষা হয়নি। তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। সিকিম হত্যার উদ্যোগ নেন লেন্দুপ দর্জি রাজনৈতিক সংস্কার অধীন ১৯৭৪ সালের ১ জুলাই সিকিমে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। দলটি আইন পরিষদের ৩২টি আসনের মধ্যে ৩১টি আসন পায়। দলের প্রধান কাজী লেন্দুপ দর্জি হন প্রধানমন্ত্রী। ভারত এটাই চেয়েছিল। কারণ কাজী লেন্দুপ দর্জি তো তাদেরই লোক। এই নির্বাচনের পর সিকিমকে ভারতকে অঙ্গীভূত করার প্রস্তুতি নেয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এর জন্য একটা বৈধতার প্রলেপ দরকার। সেটা করে দেন কাজী লেন্দুপ দর্জি। ১৯৭৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বললেন, ভারতের দুই পরিষদ লোকসভা ও রাজ্যসভায় সিকিমের প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করেও সিকিমকে আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদায় রাখা যেতে পারে।

কাজী লেন্দুপ দর্জি লেন্দুপ দর্জি যেহেতু ৩২টি আসনের ৩১টি আসনের নেতা, তার মতামতই তো সিকিম জনগণের মতামত। সুযোগটা হাতছাড়া করল না ভারত। কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫০ সালের চুক্তি, যাতে সিকিমকে ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়, তা বাতিল করল। সিকিমকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করার বিল আনা হলো পার্লামেন্টে। এই বিল সম্পর্কে চগিয়াল এক বিবৃতিতে বললেন, ‘সিকিমের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, যার নিশ্চয়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল ১৯৫০ সালের চুক্তিতে, তা সিকিম জনগণের সম্মতি ছাড়াই এবং অজ্ঞাতে ভারতের পার্লামেন্টে সিকিমের প্রতিনিধি নেয়ার ত্বরিত পদক্ষেপে অস্বীকার করা হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় চগিয়াল বলেছেন, বর্তমান পদক্ষেপ, যা হবে ‘১৯৫০ সালের চুক্তির একপার্শিক বাতিলের শামিল এবং ভারতের সাথে সিকিমের একীকরণ।’ তিনি বলেন, ‘ভারত-সিকিম সম্পর্কের সর্বোচ্চ আশ্বাস দেয়া হয় ভারত প্রদত্ত সিকিমের অস্তিত্ব বজায় রাখার রক্ষাকবচের মাধ্যমে।’ তার এই বিবৃতিটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত ইংরেজি দৈনিক আমৃতবাজার পত্রিকা ১৯৭৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর, সোমবার প্রকাশ করে। চগিয়ালের বার্তা ছিল অরণ্যে রোদন চগিয়ালের এই বার্তা অরণ্যে রোদনের শামিল। অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে ফেলে সিকিমকে ভারতের অংশ করে নেয়া হলো। এ ঘটনায় ভারত তখন সারা বিশ্বে নিন্দাবাদ কুড়ায়। প্রতিবাদ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। প্রতিবাদে সিকিম দখল করে নেয়ার অভিযোগ করা হয়। কিন্তু চীন ছাড়া জাতিসঙ্ঘের বেশির ভাগ সদস্যরাষ্ট্র সিকিমের এ পরিবর্তনকে দ্রুত অনুমোদন করে। রাজতন্ত্র বিলোপ হয় বিনা বিরোধিতায় নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেটের ওপর ভর করে লেন্দুপ দর্জি নতুন গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতা পান। চগিয়াল আর লেন্দুপ দর্জির সাপে নেউলে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভারত পৃথিবীর মানচিত্র থেকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানচিত্র মুছে ফেলার মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগাতে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। কাউন্সিল অব মিনিস্টারের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জির ইচ্ছায় পার্লামেন্টে বিনা বিরোধিতায় রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক অবসান করা হয়। সিকিমের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লেন্দুপ দর্জি ভারতীয় পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করার এবং স্টেটহুড স্ট্যাটাস পরিবর্তন করার আবেদন জানান।

১৪ এপ্রিল ১৯৭৫ সিকিমে ভারতীয় সেনাদের ছত্রছায়ায় এক গণভোট হয়। লেন্দুপের ইচ্ছার প্রতিফলন দেখানো হয় সাজানো গণভোটের ফলাফলে। ২৬ এপ্রিল ১৯৭৫ সিকিম ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। মৃত্যু হয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। ১৬ মে ১৯৭৫ সরকারিভাবে ভারত ইউনিয়নভুক্ত হয় এবং লেন্দুপ দর্জিকে করা হয় সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী। রাজতন্ত্রের পতনের ফলে ‘চগিয়াল’ পদের অবসান ঘটে। একটি স্বাধীন দেশ হত্যা করে লেন্দুপ দর্জি প্রধানমন্ত্রী থেকে হলেন মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত লেন্দুপ দর্জি সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আর ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার সাথে সাথে তার দলও ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস দলে বিলীন হয়ে যায়। পুরো নিয়ন্ত্রণের জন্য নেয়া হয় সামরিক অভিযান সিকিমে ভারত সামরিক অভিযান শুরু করার আগে দেশটিতে অরাজক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। ইন্দিরা সরকার ভারতীয় বাহিনী পাঠানোর অজুহাত হিসেবে রাজার নিরাপত্তার কথা জানিয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজপ্রাসাদের সামনে দাঙ্গা ছড়িয়ে দেয়া হয়। এ কাজে তারা ব্যবহার করে লেন্দুপ দর্জিকে। রাজতন্ত্র অবসানের পর সিকিম দখলে ভারতীয় সেনারা মুহুর্মুহু গুলি চালায়। প্রকাশ্য দিবালোকে সামরিক ট্রাকের গর্জন শুনে সিকিমের চগিয়াল দৌড়ে এসে দাঁড়ান জানালার পাশে। তিনি দেখেন, ভারতীয় সৈন্যরা রাজপ্রাসাদ ঘিরে ফেলেছে। মেশিনগানের মুহুর্মুহু গুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাজপ্রাসাদের ১৯ বছর বয়সী প্রহরী বসন্ত কুমার ছেত্রি ভারতীয় সেনাদের গুলিতে নিহত হন।

আধা ঘণ্টার অপারেশনেই ২৪৩ প্রহরী আত্মসমর্পণ করে। বেলা পৌনে ১টার মধ্যেই ‘অপারেশন সিকিম’ শেষ হয়। প্রহরীদের কাছে যে অস্ত্র ছিল তা দিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সময় লড়াই করা যেত। কিন্তু রাজা ভুগছিলেন সিদ্ধান্তহীনতায়। তিনি আরেকটি সুযোগ হারালেন। বেইজিং ও ইসলামাবাদের কাছে জরুরি সাহায্য চাওয়ার জন্য রাজপ্রাসাদে ট্রান্সমিটারও বসানো ছিল। তিনি সাহায্য কামনা করে বার্তা পাঠালে চীনা সৈন্যরা প্রয়োজনে সিকিমে ঢুকে চগিয়াল লামডেনকে উদ্ধার করতে পারত। কিন্তু রাজা সেটাও করতে ব্যর্থ হন। আত্মসমর্পণকারী রাজপ্রহরীদের ভারতীয় সেনাদের ট্রাকে তোলা হয়। প্রহরীরা তখনো গাইছিল ‘ডেলা সিল লাই গি, গ্যাং চাংকা সিবো’ (আমার প্রিয় মাতৃভূমি ফুলের মতো ফুটে থাকুক)। কিন্তু ততক্ষণে সিকিমের রাজপ্রাসাদে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে ভারতীয় জাতীয় পতাকা। নামগিয়াল সাম্রাজ্যের ১২তম রাজা চগিয়াল লামডেন তখন প্রাসাদে বন্দী। বহির্বিশ্বের সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, বি এস দাশকে ভারত সরকার সিকিমের প্রধান প্রশাসক নিয়োগ করে। সিকিমের ঘটনা বিশ্বকে জানান এক মার্কিন পর্বতারোহী ভারতীয় আমেরিকান এক পর্বতারোহী গোপনে সিকিম প্রবেশ করে দেশটির স্বাধীনতা হরণের খবর বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্বাধীনতা হারানোর সময় সিকিম জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদভুক্তিরও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ১৯৭১ সালেই সিকিম দখলের সিদ্ধান্ত ছিল ভারতের চমকপ্রদ একটি বিষয় হলো সিকিম সেনাবাহিনীকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ভারতীয় সাংবাদিক সুধীর শর্মা ‘পেইন অব লুজিং এ নেশন’ (একটি জাতির হারিয়ে যাওয়ার বেদনা) নামে একটি প্রতিবেদনে জানান, ভারত ব্রিটিশদের কাছ থেকে তার স্বাধীনতা লাভের গোড়া থেকেই সিকিম দখলের পরিকল্পনা করেছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু অনেকের সাথে কথোপকথনে তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক পরিচালক অশোক রায়না তার বই ‘ইনসাইড স্টোরি অব ইন্ডিয়াস সিক্রেট সার্ভিস’-এ সিকিম সম্পর্কে লিখেন, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭১ সালেই সিকিম দখল করবে। সে লক্ষ্যে সিকিমে প্রয়োজনীয় অবস্থা সৃষ্টির জন্য আন্দোলন, হত্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়।

তারা ছোট ছোট ইস্যুকে বড় করার চেষ্টা করে এবং সফল হয়। তার মধ্যে হিন্দু-নেপালি ইস্যু অন্যতম। সাংবাদিক সুধীর শর্মা লিখেন, লেন্দুপ দর্জি নিজেই শর্মাকে বলেছেন, ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর লোকেরা বছরে দু-তিনবার তার সাথে দেখা করে পরামর্শ দিতেন কিভাবে আন্দোলন পরিচালনা করা যাবে। তাদের এক এজেন্ট তেজপাল সেন এ আন্দোলন পরিচালনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে তাকে অর্থ দিয়ে যেতেন। এ অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক সন্ত্রাস পরিচালিত হতো। শর্মা আরো লিখেছেন, এই ‘সিকিম মিশনের’ প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ‘র’। দ্বৈত খেলা খেলেছে ভারত ভারত সিকিমের ক্ষেত্রে দ্বৈত খেলা খেলেছে। চূড়ান্ত মুহূর্ত আসার আগে পর্যন্ত চগিয়াল লামডেনকে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা বুঝতে দেয়নি। তারা তাকে বলেছে, সিকিমে রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হবে। চগিয়ালকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনারারি মেজর জেনারেল পদবিও প্রদান করা হয়েছিল। অপর দিকে লেন্দুপ দর্জিকে বলেছে, যেকোনো মূল্যে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করতে হবে। চীন, নেপাল ও পাকিস্তানের পরামর্শে কান দেননি চগিয়াল ভারত অন্তর্ভুক্তির সময় সিকিমে কর্মরত তৎকালীন ভারতীয় দূত (পলিটিক্যাল অফিসার) বি এস দাস তার গ্রন্থ ‘ঞযব ঝরশশরস ঝধমধ’-এ লিখেছেন, ভারতের জাতীয় স্বার্থেই সিকিমের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন ছিল। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করেছি। চগিয়াল যদি বিচক্ষণ হতেন এবং তার কার্ডগুলো ভালোভাবে খেলতে পারতেন, তাহলে ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তা না হয়ে ভিন্ন কিছু হতে পারত। চীন, নেপাল ও পাকিস্তানের পরামর্শে কান দেননি সিকিমের চগিয়াল। তিনি ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে করম চাঁদ গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর প্রতি ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল। ১৯৭৪ সালে সিকিমের তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই চগিয়াল কাঠমান্ডু গিয়েছিলেন নেপালের রাজা বীরেন্দ্রর অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাজা বীরেন্দ্র, সফররত চীনা উপপ্রধানমন্ত্রী চেন লাই ইয়ান এবং পাকিস্তানি দূত চগিয়ালকে সিকিমে না ফিরতে পরামর্শ দেন। ক্যাপ্টেন সোনাম এ প্রসঙ্গে বলেন, এই তিন দেশের নেতৃবৃন্দ সিকিমকে ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে একটি মাস্টার প্ল্যান উপস্থাপন করেন। কিন্তু চগিয়াল লামদেন তাতে সম্মতি দেননি। এর কারণ তিনি নাকি স্বপ্নেও ভাবেননি, ভারত সিকিম দখল করে নিতে পারে। চীন সীমান্তে ৩ স্বাধীন রাষ্ট্র নয়াদিল্লির জন্য অস্বস্তিকর ছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক বোমার সফল বিস্ফোরণ ইন্দিরা গান্ধীর আত্মবিশ্বাস বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়। কংগ্রেস নেত্রী নয়াদিল্লিতে তার ক্ষমতাকে সুসংহত করেন। নয়াদিল্লি উদ্বিগ্ন ছিল সিকিমের স্বাধীন সত্তার বিকাশ নিয়ে। ভুটানের পথ ধরে সিকিম যদি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করে ফেলত, তাহলে তা হতো নয়াদিল্লির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় রকম বাধা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চীন সীমান্তে তিন হিমালয়ান স্বাধীন রাজ্য নেপাল, সিকিম ও ভুটান গায়ে গা লাগিয়ে অবস্থান করুক এটাও কৌশলগত কারণে দিল্লি নিরাপদ মনে করেনি। লেন্দুপ দর্জির শেষ জীবন ছিল অভিশপ্তের ভারতে যোগদানের পর লেন্দুপ দর্জি হন সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন। তবে স্বর্গসুখের যে খোয়াব তিনি দেখেছিলেন, সেটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। তার দলের প্রতি জনগণের আস্থা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে লেন্দুপ দর্জির এসএনসি একটি আসনও পায়নি। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে লেন্দুপ দর্জি দেখেন ভোটার তালিকায় তার নামটিও নেই।

নেপথ্য শক্তি তার রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি টেনে দেয়। সমকালীন ইতিহাসে সমালোচকদের কাছে লেন্দুপ দর্জি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত। তার সমর্থকেরাও পরবর্তী সময়ে তাকে ত্যাগ করেন। ১৯৯৬ সালে কালিমপংয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবন লেন্দুপ দর্জি দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘সবাই আমার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলছে, আমি নাকি নিজের মাতৃভূমি সিকিমকে বিক্রি করে দিয়েছি। তা যদি সত্যও হয় সে জন্য কি আমি একাই দায়ী?’ কিন্তু এই অভিযোগ এতই গুরুতর ছিল যে, লেন্দুপ দর্জি আর কখনোই সিকিমে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারেননি। চাকুং হাউজে আমৃত্যু তাকে নিঃসঙ্গ দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয়। তার মৃত্যু সিকিমবাসীর মনেও কোনো সহানুভূতি বা বেদনার উদ্রেক করতে পারেনি। লেন্দুপ দর্জি মনে করতেন, কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর দিল্লি তাকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তার আক্ষেপভরা মন্তব্য, ‘সিকিমকে ভারতের হাতে তুলে দিতে হেন চেষ্টা নেই যা আমি করিনি। কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর নয়াদিল্লি আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।’ সাপ্তাহিক জন আস্থা পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে লেন্দুপ দর্জি বলেন, ‘আগে নয়াদিল্লিতে আমাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করা হতো। এখন ভারতের দ্বিতীয় সারির নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেও আমাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়।

ভারতে অন্তর্ভুক্তি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত ভারতের সিকিম দখলের বিরুদ্ধে চীন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সিকিমের রাজপথে কোনো গণপ্রতিরোধ দেখা যায়নি। তাই বেইজিংয়ের ভূমিকা সীমিত ছিল জাতিসঙ্ঘে প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যেই। ১৯৭৭ সালে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর টানা ১১ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৭৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই সিকিম সম্পর্কে মুখ খোলেন। তার মতে, সিকিমের ভারতে অন্তর্ভুক্তি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। এমনকি সিকিমের যেসব রাজনৈতিক নেতা ভারতে যোগদানের পক্ষে কাজ করেছিলেন, তারাও বলেছেন, এটা ছিল ঐতিহাসিক ভুল। কিন্তু তত দিনে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। ভারতের রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি সিকিমের বড় অর্জন ভারতের এ কাজকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সমর্থন না দিলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভুলটা এ ব্যাপারেই করলেন তাজউদ্দিন আহমদ। ব্যক্তিগতভাবে মন্তব্য করলেন সিকিম সম্পর্কে এবং অজুহাত এসে গেল শেখ মুজিবের হাতে। সিকিম সম্পর্কে তাজউদ্দিন আহমদের বক্তব্যটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালের ১৪ অক্টোবর সোমবার দ্য অমৃতবাজার পত্রিকায়। বাংলাদেশের কোনো পত্রিকায় সংবাদটি আসেনি। ইংরেজি দৈনিক দ্য অমৃতবাজার পত্রিকার সেই খবর : ‘‘বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী মি. তাজউদ্দিন আহমদ গত রোববার ‘ভারত-বাংলা বন্ধুত্ব বিনাশে বৃহৎ শক্তিবর্গের পাকানো’ আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকার জন্য ভারতীয় জনগণের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। ওয়াশিংটন থেকে ঢাকা ফেরার পথে কলকাতা বিমানবন্দরে স্বল্প বিরতিকালে মি. আহমদ রিপোর্টারদের বলেন যে, সিকিম ইস্যু নিয়ে টোকিও, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে ভারতের বিরুদ্ধে প্রচার চলছে।

এসব জায়গায় কিছু সংবাদপত্র মন্তব্য করেছে যে, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ব্যক্তিগতভাবে মি. আহমদ মনে করেন যে, ভারতের একটি সহযোগী রাজ্য হিসেবে সিকিমের স্বীকৃতি ‘সিকিম জনগণের একটি অর্জন’।” এই ঘটনার কিছুদিন পর অবশ্য তাজউদ্দিন আহমদকে পদত্যাগ করতে হয়। ভারতের নেতৃবৃন্দ বরাবরই অখণ্ড ভারত গড়ার স্বপ্নে বিভোর ভারতের নেতৃবৃন্দ বরাবরই অখণ্ড ভারত গড়ার স্বপ্নে বিভোর। আর সে লক্ষ্যে ভারত চায় এর প্রতিবেশী দেশগুলোকে নানাভাবে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে সেখানে লেন্দুপ দর্জির মতো তাঁবেদার সরকার বসিয়ে দেশটিকে ভারতের সাথে একীভূত করে নিতে। সিকিম তার বড় প্রমাণ। ভারতের প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের মানুষকে এ অন্তর্নিহিত সত্যটি উপলব্ধিতে রেখে দেশ পরিচালনা করতে হবে। নইলে বিপর্যয় অবধারিত। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ‘সিকিমফোবিয়া’ সিকিমের ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের প্রতিরক্ষা ভারত দিনের পর দিন জোরদার করায় এই আশঙ্কা আরো জোরালো হচ্ছে। এই কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশের সাথে যুক্ত সীমান্ত আউট পোস্টগুলোর (বিওপি) একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৪-৫ কিলোমিটারে নিয়ে আসা হচ্ছে। এগুলোতে বিএসএফের শক্তিও বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

বিএসএফ এই সীমান্তে থারমাল নাইটভিশন ডিভাইস, টেলিস্কোপিক বন্দুকসহ উচ্চমানের হাতিয়ার মোতায়েন রেখেছে। সেই সাথে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার এলাকাকে কাঁটাতারের বেড়াসহ ফ্লাডলাইটের আওতায় আনার এবং প্রশিক্ষিত কুকুর মোতায়েন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনেকটা এগিয়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তের বেশির ভাগ এলাকা ফ্লাডলাইটের আওতায় আনা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ১৯৭৪ সালের ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও ভারত মানছে না। বলাবাহুল্য, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও সড়ক তৈরি প্রতিরক্ষা কাজের মধ্যেই পড়ে। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত দুই দেশের বৈঠকে বিষয়টি আলোচিত হলেও তা কোনো ফল দেয়নি। ভারতের বর্তমান প্রস্তুতি অনুযায়ী সীমান্ত সড়ক দিয়ে অনায়াসে সামরিক যান চলাচল করতে পারবে। এর ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও জোরদার করতে পারবে। এ কারণেই বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে ‘সিকিমফোবিয়া’ কাজ করছে প্রবলভাবে। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অবিশ্বাসের অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশও সিকিমের পরিণতি বরণ করে কি না।