সৈয়দ আবুল মকসুদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সৈয়দ আবুল মকসুদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৬

রোহিঙ্গারা মানুষ ও মিয়ানমারের নাগরিক

উপমহাদেশের সবচেয়ে ঘটনাবহুল সময় ছিল ১৯৪৬-৪৭। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের নেতাদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দেয়। উপমহাদেশের বহু জাতির মধ্যে স্বশাসনের আকাঙ্ক্ষা জাগে। বহু শতাব্দীজুড়ে আরাকান স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্য ছিল। তার শাসক ছিলেন মুসলমান সুলতান। ১৮৮৬-তে আরাকানসহ সমগ্র বার্মা, তখন বলা হতো ব্রহ্মদেশ, বর্তমান মিয়ানমার ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। তখন থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত আমাদের মতোই আরাকান ও বার্মার সব মানুষই ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রজা।

এই উপমহাদেশের ইতিহাসের বহু বৃত্তান্ত ইতিহাস বইয়ের পাতায় এখনো লিপিবদ্ধ হয়নি। ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানের একটি প্রতিনিধিদল করাচি গিয়ে মুসলিম লীগ নেতাদের সঙ্গে দেখা করে আরাকানকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে রাখার দাবি জানায়। লীগ নেতারা তখন বেজায় ব্যস্ত। তাঁরা আরাকানের মুসলমান নেতাদের বলেন, আমরা নতুন ঝামেলার মধ্যে যেতে পারব না, ব্রিটিশ সরকারের নেতাদের গিয়ে বলুন। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা রাখাইন মুসলমান নেতাদের দাবিকে গুরুত্ব দেননি।


এর মধ্যে আরাকানকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির আন্দোলন দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ নেয়। বার্মার জাতীয়তাবাদী নেতা বর্তমান সময়ের অত্যন্ত শান্তিবাদী নেত্রী অং সান সু চির বাবা অং সান চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং আরাকান প্রশ্নে তাঁর মতামত প্রার্থনা করেন। ১৯৪৭-এর প্রথম দিকে জিন্নাহ অং সানকে আশ্বস্ত করেন আরাকানকে পাকিস্তানে নেওয়ার কোনো আগ্রহ তাঁর নেই। পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের এক বছরের মধ্যেই অং সানের নেতৃত্বে বার্মাও স্বাধীন হয়। এবং মাস দুই পরেই আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হন।
সু চির পিতৃদেব মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে অঙ্গীকার করেন বার্মায় তিনি ‘ট্রু ডেমোক্রেসি’ বা সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সুযোগ তিনি পাননি। তাঁর বিখ্যাত ভাষণে অং সান বলেছিলেন: ‘একমাত্র সত্যিকারের গণতন্ত্রই জনগণের প্রকৃত মঙ্গল করতে পারে, যা শ্রেণি, গোত্র অথবা ধর্ম কিংবা লিঙ্গনির্বিশেষে সবাইকে সমান মর্যাদা ও সমান সুযোগ দেয়। জনগণই প্রকৃত সার্বভৌম। যদি জনগণের স্বার্থকেই প্রাথমিক বিবেচনায় নিয়ে আমাদের শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারি তাহলেই সত্যিকারের গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হবে।’ [‘দ্য পলিটিক্যাল লিগাসি অব অং সান’]
স্বাধীনতা লাভের পর প্রকৃত গণতন্ত্রের পরিবর্তে ব্রহ্মদেশ বা মিয়ানমার অবিচার ও বৈষম্যের লীলাভূমিতে পরিণত হয়। দেশটিতে বর্মন গোত্রীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ৮৯ শতাংশ এবং খ্রিষ্টান, মুসলমান ও হিন্দু এবং এনিমিস্ট ও সর্বপ্রাণবাদীদের সংখ্যা ১১ ভাগ। বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে বৌদ্ধ মৌলবাদ মাথাচাড়া দেয়। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো হয় অবিশ্বাস্য ধরনের নিপীড়ন। তার ফলে কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি (কিয়া), কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন (কিও) রেস্টোরেশন কাউন্সিল অব শান স্টেট, শান স্টেট ন্যাশনাল আর্মি, কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন, ডেমোক্রেটিক কারেন বুড্ডিস্ট আর্মি, ডেমোক্রেটিক কারেন বেনেভোলেস্ট আর্মি, নিউ মন স্টেট পার্টি, আরাকান লিবারেশন পার্টি, আরাকান ন্যাশনাল কাউন্সিল, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন, আরাকান চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট, ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট আর্মি, কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড খাপলাঙ প্রভৃতি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও চরমপন্থী সংগঠন গড়ে ওঠে। এগুলোর মধ্যে কাচিন এবং কারেন স্বাধীনতাসংগ্রামীরাই মিয়ানমার সরকারকে সবচেয়ে নাজেহাল করে।
আমরা বাংলাদেশে মনে করছি মিয়ানমার সরকার শুধু মুসলমানদের ওপরই অত্যাচার করে, তা নয়। খ্রিষ্টান ও হিন্দুরাও তাদের নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিন্দুদের বলে ‘কালা’ আর মুসলমান রোহিঙ্গাদের বলে ‘চাটগাইয়্যা’। আগে ষাটের দশকে জেনারেল নে উইনের সরকার এক লাখ হিন্দুকে ‘ভারতীয়’ আখ্যা দিয়ে বিতাড়িত করে। একই সঙ্গে ‘১২,০০০ বাংলাভাষী মুসলমানকে ‘পাকিস্তানি’ বলে চট্টগ্রামে ঠেলে দেয়। তখন বিষয়টি নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য হয়নি। কারণ, এক লাখ হিন্দুকে আশ্রয় দেওয়া ভারতের মতো রাষ্ট্রের জন্য কোনো সমস্যা নয়। তেমনি তখন ১২,০০০ বাংলাভাষী আরাকানি মুসলমানকেও পূর্ব পাকিস্তানে ঠাঁই দেওয়া তেমন কঠিন ব্যাপার ছিল না। তখন বার্মায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন প্রভাত মুকুল চৌধুরী, পাকিস্তান সরকারের একমাত্র হিন্দু কূটনীতিক এবং আইয়ুব খানের আস্থাভাজন। তখন রেঙ্গুনের দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন এস এ করিম, যিনি বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রসচিব হন। এস এ করিমের কাছেই আমি তখনকার হিন্দু ও মুসলমান নির্যাতনের বিষয়টি অবগত হই। ওই সময় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি মাওলানা ভাসানী কয়েক দিনের জন্য রেঙ্গুন গিয়েছিলেন। সে আরেক কাহিনি। আরাকানের বাংলাভাষীদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর বার্মায় চৈনিক রাষ্ট্রদূত ও পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত পি এস চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা হয়।
ব্রিটিশ আমলে আরাকান ন্যাশনাল কংগ্রেস ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয়। তাতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও আদিবাসী আরাকানিরা অংশগ্রহণ করে। মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ বসুসহ ভারতের নেতাদের সঙ্গে বার্মার নেতাদের যোগাযোগ ছিল। তাঁরা ব্রহ্মদেশ সফর করেছেন। আরাকান প্রশ্নে অং সানের সঙ্গে জিন্নাহর যোগাযোগের কথা আগেই বলা হয়েছে।
প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার দেশ বার্মা বা মিয়ানমার। কোনো আধুনিক রাষ্ট্রই এক ভাষাভাষী ও এক ধর্মাবলম্বীদের দিয়ে হয় না। সব দেশেই জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু থাকবেই। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতোই নাগরিক। রাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকার খর্ব করতে পারে না। কিন্তু মিয়ানমার শুরু থেকেই অ-বার্মিজ ও অ-বৌদ্ধ নাগরিকদের অধিকার অগ্রাহ্য করে আসছে। রাখাইনদের মধ্যেও বিভক্তি রয়েছে। রাখাইন বৌদ্ধ ও রাখাইন বা রোহিঙ্গা মুসলমান। রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে দুই রকম আচরণ করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপান যখন বার্মাকে দখল করে তখন আরাকান রাজ্যকে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। আরাকানের রাজধানী ছিল আকিয়াব। ১৯৮৯ সালে আরাকানের নাম বদলে রাখা হয় রাখাইন।
রোহিঙ্গা মুসলমানদের অপরাধ দুটি: তাদের ধর্ম ইসলাম এবং তাদের ভাষা বাংলা। যেহেতু তারা বাংলাভাষী মুসলমান, তাই তারা ‘চাটগাইয়্যা’ বা বাংলাদেশি না হয়েই পারে না। অতএব তাদের খেদাও। এবং তারা তাদের পূর্বপুরুষের ভিটামাটি ছেড়ে যদি না আসতে চায়, তাহলে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দাও এবং অত্যাচার করে তাড়াও।
শুধু ধর্ম ও ভাষার কারণে রোহিঙ্গারা বর্তমানে পৃথিবী নামক গ্রহের সবচেয়ে অত্যাচারিত প্রাণী। যারা হাজার বছরের বাসিন্দা তাদের নাগরিকত্ব হরণ করা হয়েছে। রাখাইন প্রদেশের বাইরে মিয়ানমারের আর কোথাও তাদের যাতায়াতে বিধিনিষেধ 
রয়েছে। তারা সরকারের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারে না। দুই সন্তানের বেশি তারা নিতে পারে না। উগ্রপন্থী বার্মিজ বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের দাবি, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব দেওয়াই যাবে না। মধ্যপন্থী বৌদ্ধ মৌলবাদীদের প্রস্তাব, তাদের কাউকে কাউকে অস্থায়ী নাগরিকত্ব দেওয়া যায় (কেস-বাই-কেস বেসিস)। এত শর্ত পূরণ করে কোনো রাষ্ট্রে মানুষ বাস করতে পারে না।

গত তিন দশক যাবৎ বৌদ্ধ মৌলবাদ চরম আকার ধারণ করেছে। মিয়ানমার শাসন করছেন সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতারা। রাইফেল কামান ছাড়া মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর আরেক প্রধান অস্ত্র ধর্ষণ। থাইল্যান্ডভিত্তিক উইমেন লিগ অব বার্মা এক প্রতিবেদনে বলে, ২০১০ থেকে অসংখ্য নারী ধর্ষিত হয়েছে। তারা যে শুধু মুসলমান নারী তা নয়, খ্রিষ্টান ও হিন্দুধর্মের নারীরাও রয়েছে। কাচিন উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন ও শান উইমেন্স অ্যাকশন নেটওয়ার্ক ৯৪ নারী ও বালিকার নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছে, যাদের সেনাবাহিনীর লোক বর্বরোচিতভাবে যৌন নির্যাতন করেছে।
গত কয়েক সপ্তাহে রোহিঙ্গাদের শত শত বাড়িঘর, স্কুল, মসজিদ জ্বালিয়ে দিয়ে, হত্যা করে তাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী। কয়েক দিন যাবৎ বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রধান খবরই রোহিঙ্গা নির্যাতন। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের স্রোত ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। মানবিকতার খাতিরে তাদের অনেককে আশ্রয় দিতেও হচ্ছে। আজ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চরম মানবিক-সংকট বিরাজ করছে।
বাংলাদেশ আকারে ছোট, মানুষ বেশি। বসবাসযোগ্য ফাঁকা জায়গার খুবই অভাব। এখানে চার-পাঁচ লাখ বিদেশি শরণার্থীকে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। বর্তমানে লাখ পাঁচেকের মতো রোহিঙ্গা আছেই। তাদের সন্তানসন্ততি হচ্ছে। এর মধ্যে যদি নতুন আরও আসে, তাতে অর্থনীতির ওপর বিরাট চাপ পড়বে।
পূর্বপুরুষের বাড়িঘর ছেড়ে অত্যাচারিত হয়ে যারা অন্য দেশে আশ্রয় নেয়, তারা প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় এক কাপড়ে আসে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরাও অতি গরিব। অভাবী মানুষেরা সমাজবিরোধীদের দ্বারা নানা অপকর্মে ও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকেই চোরাচালান, নারী পাচার ও সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা রোহিঙ্গাদের ইসলামি মৌলবাদী সন্ত্রাসী তৎপরতায় ব্যবহার করে থাকে।
রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের নিজস্ব সমস্যা। কিন্তু তা এখন একটি কঠিন আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। আঞ্চলিক সমস্যা আন্তর্জাতিক সমস্যাও বটে। বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই সমস্যা একা মোকাবিলা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। চীনের প্রিয় প্রতিবেশী মিয়ানমার ও পাকিস্তান। বর্তমান সরকার চীনের সঙ্গে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের উচিত চীনকে এ ব্যাপারে মধ্যস্থতার জন্য অনুরোধ করা। ওআইসি বলে এক জিনিস রয়েছে। তা যে আছে তা বোঝা যায় ওই সংস্থার মহাসচিব বছরে একবার বাংলাদেশ সফরে এলে। এখন মুসলমানদের দলাদলিতে এই ইসলামি দেশগুলোর ক্লাবটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবু রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশের উচিত জাতিসংঘ, ওআইসি প্রভৃতি সংস্থার সঙ্গে মিলে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়। বার্মিজ বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী ও প্রচণ্ড শান্তিবাদী ও মানবতাবাদী সু চি এখন সেখানকার নেতা। তিনি নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধের মরাল, স্পিরিচুয়াল অ্যান্ড ইন্টেলেকচুয়াল ভ্যালুজ-এর কথা বলে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অবশ্য এখন কেউ কেউ এই পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলেছেন। তাঁর কাছে আমাদের অনুরোধ, নোবেল পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষা করে তিনি রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের উদ্যোগ নেবেন।
সৈয়দ আবুল মকসুদলেখক  গবেষক

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৫

গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

আমেরিকার ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি রবার্ট এইচ জ্যাকসন অভিমত দিয়েছেন, ‘নাগরিকদের ভুল করা থেকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব নয়; বরং নাগরিকদের দায়িত্ব হলো সরকারকে ভুল করা থেকে রক্ষা করা।’ একটি রাষ্ট্রে একই পদে বহু ব্যক্তি বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের কেউ কেউ তাঁদের কাজের স্থায়ী ছাপ রেখে যান, অনেকে দায়িত্ব পালন শেষে বিস্মৃত হন বা হারিয়ে যান। বিচারপতি জ্যাকসন আমেরিকার বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নক্ষত্র।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো বিচারপতি জ্যাকসনের আইনের কোনো স্নাতক ডিগ্রি ছিল না। ছাত্রজীবনে কিছুদিন তিনি আইন পড়েছিলেন মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বিচার বিভাগের সবগুলো প্রধান পদ অলংকৃত করেন। ফেডারেল কোর্টের শীর্ষ বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সলিসিটর জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। নুরেমবার্গ আদালতে তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের চিফ প্রসিকিউটর।

বিচারপতি জ্যাকসন এমন কিছু কিছু দুঃসাহসী রায় দিয়েছেন, যা শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে গেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা একটি রায়ের কথা উল্লেখ করতে পারি। বিখ্যাত মামলাটি হলো ‘ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া স্টেট বোর্ড অব এডুকেশন বনাম বার্নেট।’ ওই রাজ্যের স্কুলগুলোতে বিধিবদ্ধ নিয়ম ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকাকে শিক্ষার্থীরা কপালে হাত তুলে অভিবাদন জানানোর। জেহোভা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এক শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়।

সে মামলা শেষ পর্যন্ত ফেডারেল কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে যায়। বিচারপতি জ্যাকসন শিক্ষার্থীর পক্ষে রায় দেন। রায়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তৈরি আইনের চেয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতা বা ইনডিভিজুয়্যাল লিবার্টি বড়। ওই সম্প্রদায়ের মানুষ কোনো কিছুকেই সালাম করে না, সুতরাং তাকে দিয়ে জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন জানাতে বাধ্য করা যাবে না। ওই রায় দেওয়ার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর ‘ফ্রি স্পিচ ক্লজ’ বা বাক্স্বাধীনতার ধারাটির দোহাই দেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেও ঘোষণা করা হয়েছে: ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ [৭(২) ধারা] বাংলাদেশের সংবিধান জনগণকে ‘সকল ক্ষমতার মালিক’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তবে মালিকানাটি জনগণের কাছে আছে কি না, সে প্রশ্ন করার অধিকার জনগণের কতটা আছে, তা তারা জানে না। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় হেভিয়াস কর্পাস মামলায় প্রশ্ন উঠেছে। আমাদের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞদের এ সম্পর্কে মতামতও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সংবিধান হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য সব আইনগুলো সংবিধানের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে হয়। সংবিধান সর্বোচ্চ আইন কারণ সে বিদ্যমান, সে বিদ্যমান কারণ তাতে জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত।’ (২৫ ঢাকা ল রিপোর্টস, পৃ. ৩৩৫)

চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা আমাদের সংবিধান খুব স্পষ্টভাবেই প্রত্যেক নাগরিককে দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে ‘...জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ-সাপেক্ষে’র কথাও লেখা আছে [৩৯(২) ধারা]। চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার কথা যে বলা হয়েছে তা দুটি আলাদা শব্দ হলেও তার মর্মার্থ এক। অবাধ অর্থাৎ যা খুশি তা-ই চিন্তা করে তা প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, বিবেকসম্মত চিন্তার স্বাধীনতার কথাই বলা হয়েছে। বিবেকসম্মত চিন্তা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। বিবেকসম্মত চিন্তার সংজ্ঞা হচ্ছে সর্বসম্মতভাবে মানুষ যে কাজটি ‘ভালো’ এবং যে কাজটি ‘মন্দ’ বলে মনে করে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো সেখানে মত প্রকাশের অধিকার থাকবে এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের অধিকার সুনিশ্চিত। কোনো মতামতে কারও ব্যক্তিগত অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। তিনি সংক্ষুব্ধ হতে পারেন। কিন্তু কারও মনে আঘাত লাগবে বলেই সে সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে বা লিখতে পারবে না, তা আমাদের বা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানই বলে না। বাংলাদেশে প্রায়ই কোনো নেতা বা ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে কটাক্ষ বা সমালোচনা করার দায়ে মানহানির মামলা হয়ে থাকে। তাতে অভিযুক্তের হয়রানির শেষ নেই। দিনের পর দিন আদালতে ঘুরতে হয়। একপর্যায়ে গিয়ে একটা মীমাংসা হয় বটে, কিন্তু বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষেরই অর্থ ও শ্রমের অপচয় হয়।

পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশে ব্যক্তির স্বাধীনতা বিষয়টি খুবই সুরক্ষিত। বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও সর্বোচ্চ। কিন্তু উপমহাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পক্ষেই অসহিষ্ণুতা অতি বেশি, যা আদালতে মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়ায়। ষাটের দশকে মুম্বাইয়ের একজন খ্যাতিমান কলাম লেখিকা ছিলেন প্যাট শার্প। বেঙ্গলি-তে প্রকাশিত তাঁর একটি কলামে তিনি একটি আপত্তিকর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেন। তাঁর সেই মন্তব্য যেকোনো বাঙালির গায়ে না লেগে পারে না। তিনি লিখেছিলেন: ‘...[বাঙালিদের] আর মাত্র একজন বীর (?) সুভাষচন্দ্র বসু, একজন দেশদ্রোহী, যিনি জাপানের পক্ষে একজন মীরজাফর ছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁকে শহীদের সম্মান দেওয়া হয় প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুদিবসে।’

নেতাজির পরিবার এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। শরৎচন্দ্র বসুর ছেলে শিশির বসু কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে প্যাট শার্পের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করেন। প্যাটের সাজা হয়। তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ আপিলটি খারিজ করে দিয়ে রায়ে মন্তব্য করেন: ‘আইনের দৃষ্টিতে সুভাষচন্দ্রের ভাইপো একজন বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি এবং মামলাটি মৃত ব্যক্তির সম্মানহানির জন্য দায়ের করা হলেও তা আইনে অচল নয়। দেশবাসী সুভাষচন্দ্রকে স্মরণ করে কারণ তিনি তাদের একজন অতি প্রিয় নেতা। তাঁকে দেশদ্রোহী বা মীরজাফর আখ্যায়িত করে আপিল আবেদনকারী নিজেকেই অপমানিত করেছেন।’

ওই আপিল মামলার রায়ে যা বলা হয়েছিল তার মর্মার্থ হলো, ভাব ও মতামত প্রকাশেও সংযম দরকার। কিন্তু তাই বলে মত প্রকাশে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতায় রাষ্ট্র বাধা দিতে পারে না।

গত জানুয়ারিতে আমি ভারতে গিয়েছিলাম গান্ধী পিস মিশনের আমন্ত্রণে এক আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে। সেখানে ভারত ও বিভিন্ন দেশের গান্ধীবাদী ও একাডেমিশিয়ানরা আলোচনায় অংশ নেন ও প্রবন্ধ পড়েন। তাঁদের একজন ছিলেন সিকিম হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি, যিনি আগে কলকাতা হাইকোর্টেরও বিচারপতি ছিলেন, বিচারপতি মলয় সেনগুপ্ত। তিনি একজন গান্ধীবাদী। সম্মেলনের ফাঁকে কী এক প্রসঙ্গে আদালত অবমাননা নিয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘প্রথম যেদিন বেঞ্চে যোগ দিলাম, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আমাকে কনটেম্পট্স অব কোর্টস অ্যাক্ট-এর বইটি দেখিয়ে বললেন, এটি ড্রয়ারেই রেখে দিয়ো, প্রয়োগ করতে যেয়ো না। কনটেম্পট্স মামলার কোর্টে আমিও বিচারক ছিলাম। লম্বা বিচারক জীবনে কাউকে আদালত অবমাননার মামলায় শাস্তি দিইনি।’

১৯২৬ সালের কনটেম্পট্স অব কোর্টস অ্যাক্টের ১২ ধারায় আদালত অবমাননার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে শতাব্দীব্যাপী বহু আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তিও হয়েছে কারও কারও। তবে ভারতের আদালত বিষয়টিকে যথাসম্ভব নমনীয়ভাবেই দেখেন। আদালত অবমাননার মামলাগুলোর রায়ের ভিত্তিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। তার বাংলা অনুবাদ মোটের ওপর এ রকম: ‘বিচারিক কাজে অতি মাত্রায় সংবেদনশীল হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। একজন বিচারককে তাঁর নিজের পদটিই এমন প্রশিক্ষণ দেয়, যার কল্যাণে তিনি সেনসিটিভ বা অল্পতেই ক্ষুব্ধ হওয়ার পরিবর্তে সহানুভূতিশীল হন। অন্যদের চেয়ে একজন বিচারক মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অহংবোধ, হতাশা, অনুভূতি ও মানসিক চাপ বেশি অনুভব করতে সক্ষম। তবু তার একটা সীমা থাকা বিশেষ প্রয়োজন। একজন বিচারকের প্রতি এমন অপবাদ রটনা করা যায় না, যার ফলে বিচারব্যবস্থা হুমকি কিংবা বিনষ্টের সম্মুখীন হয়। তার অর্থ এই নয় যে বিচারকগণকে রক্ষা করা আবশ্যক। কারণ, বিচারকগণ নিজেদেরকে রক্ষা করতে অসমর্থ নন। তার অর্থ হলো, জনগণের স্বার্থ ও অধিকারের উদ্দেশ্যেই বিচারব্যবস্থাকে ওই অপবাদ রটনা থেকে রক্ষা করতে হবে।’ (দ্রষ্টব্য অল ইন্ডিয়া রিপোর্টস, ১৯৮৩, পৃ. ১১৫১)

রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটি বিচার বিভাগ। অন্য দুটি হলো নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা বা সংসদ। একটি ভালো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তা-ই, যেখানে তিনটি বিভাগই সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে এবং থাকবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। নির্বাহী বিভাগ, সংসদ ও বিচার বিভাগের বাইরে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ রয়েছে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অস্বীকার করে না কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

আমাদের দেশে সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ বিভিন্ন দিক থেকে আসে। কোনো সংবাদ, তা যতই জনস্বার্থের পক্ষে হোক, কারও স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই সাংবাদিকদের আসামি করা হয়। সংবাদ বা প্রতিবেদন ভুল বা মিথ্যা হলে তা সংশোধনযোগ্য। প্রতিবাদের ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু আজকাল সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। অভিযোগ নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত না করিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে থাকে। সম্পাদক ও সাংবাদিকদের নাকে দড়ি দিয়ে দেশব্যাপী ঘোরানো হয়। অর্থাৎ অভিযোগ প্রমাণের আগেই শাস্তি।

কথায় কথায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের কারণে মামলা, মানহানির মামলা বা আদালত অবমাননার মামলা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাউকে অসম্মান বা অমর্যাদা করাকে সমর্থন করতে পারে না। আদালতের মর্যাদা সমুন্নত রাখা নাগরিকদের কর্তব্য। নির্বাহী ও আইনপ্রণেতাদেরও দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের ও নাগরিক সমাজের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে না দেওয়া। স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার যেখানে স্বীকৃত, সেখানে তার অপব্যবহার হতেও পারে। তবু সেই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের কথা স্মরণ করতে পারি: ‘জনগণের ইচ্ছাই যেকোনো সরকারের একমাত্র বৈধ ভিত্তি; আর আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷