Bay Of Bangal লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Bay Of Bangal লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১২ এপ্রিল, ২০১২

সমদূরত্ব নীতিতে ন্যায়সঙ্গত সমাধান সম্ভব নয় : আমি কৌণিক দ্বিখণ্ডক পদ্ধতির পক্ষে


ট্রাইবুনালের সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ের খসড়া মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করে আমার পক্ষে এর সবগুলো বিষয় মেনে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আমি রায়ের মূল কার্যকরী অনুচ্ছেদের ব্যাপারে নেতিবাচক ভোট দেয়ার প্রয়োজন মনে করছি। প্রক্রিয়াগত ইতিহাস এবং তথ্যভিত্তিক পটভূমি রায়ের সূচনাতে বর্ণিত হওয়ায় আমি আর তার পুনরাবৃত্তি করব না।
সঠিকভাবেই মামলাটিকে অধিকতর জটিল ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আমাদের বিবেচনার জন্য অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে যেসব প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতেই তা স্পষ্ট হয়েছে। আমিও আইনের প্রযোজ্য ধারা এবং মূল নিয়ন্ত্রক ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দৃঢ়ভাবে ব্যবহার করেছি। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রমাণসংক্রান্ত আমার মূল্যায়ন সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে ভিন্ন হয়েছে।
এ রকম একটি রায়ে এক বা একাধিক বিষয়ে ভিন্নমত থাকায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। এতে অস্বস্তিরও কিছু নেই। আমার মতে, আমি যে ভিন্নমত দিয়েছি, তা এই বিশেষায়িত আদালতের ব্যবহারশাস্ত্রের উন্নয়ন করে আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ মাত্রার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে কাজে লাগবে। রায়ের, বিশেষ করে ৯৮, ১১৫, ১৮, ১২৫, ৪৯০ এবং ৪৭৫ অনুচ্ছেদ বিষয়ে আমি নিম্নবর্ণিত কারণে দ্বিমত পোষণ করছি।
রায়ের ৮০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অনুমোদিত মাইনুটসের (পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা) আইনগত ভিত্তি নেই—আমি এর সঙ্গে একমত নই। ১১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এফিডেভিটে বাধ্যকারী কোনো প্রমাণ নেই—আমি এর সঙ্গেও ভিন্নমত পোষণ করছি। আমার কাছে মনে হয়নি, মৌখিক সম্মতির অস্তিত্ব সঠিকভাবে প্রমাণ করতে বাংলাদেশ কোনো ঘাটতি রেখেছিল (অনুচ্ছেদ ১১৮)। সমদূরত্ব দ্বারা বিচ্ছিন্ন করার (ইক্যুইডিসট্যান্স) নীতির ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত সমাধান সম্ভব নয়। এই মামলায় আমি কৌণিক দ্বিখণ্ডক (অ্যাঙ্গেল বাইস্টের) পদ্ধতির পক্ষে। আমি উপকূলরেখার পরিমাপের ব্যাপারে একমত নই (অনুচ্ছেদ ২০৬)। সীমানা নির্ধারণের জন্য মিয়ানমারের উপকূল হওয়া উচিত ভিফ অন্তরীপ পর্যন্ত। আমি বলেছিলাম, রায়ে ২১৫ ডিগ্রি দিগ্বলয় পর্যন্ত রেখা পৌঁছেছে। তা সত্ত্বেও ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য সাময়িকভাবে সমদূরত্ব রেখা নির্ধারণের পদ্ধতির সঙ্গে আমি একমত নই।
উপস্থাপতি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রায়ে যা বলা হয়েছে, আমার অবস্থান তা থেকে অনেক ভিন্ন। কনভেনশনের ৭৬ নম্বর অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা এবং মহীসোপাানের সীমার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের যে কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে আমি একমত নই। রায়ে ‘প্রাকৃতিক প্রসারে’র (ন্যাচারাল প্রলংগেশন) যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ৭৬ অনুচ্ছেদের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, আমি তার সঙ্গেও একমত নই। আমার মতে, ‘ধূসর এলাকা (গ্রে এরিয়া)’ নিয়ে যে উপসংহার টানা হয়েছে, তা পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। আমার উপসংহার অন্য রকমের।
পটভূমি : বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের সীমান্তবর্তী দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সাগরের সম্পদরাজি নিয়ে উভয় দেশেরই গভীর আগ্রহ রয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের মজুত। সমুদ্রসীমা নির্ধারিত না থাকায় কোনো দেশই এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। এর কারণ বাংলাদেশ মিয়ানমারের তেলখনি সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানে তেল অনুসন্ধানের জন্য চুক্তিতে পৌঁছতে চেষ্টা করে আসছিল। নাফ নদীও এর অন্তর্ভুক্ত।
বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমার ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছানের জন্য দুটি দেশই নিবিড় আলোচনা চালিয়েছে। ১৯৭৪ সালে দেশদুটি যেসব সিদ্ধান্ত নেয় তা-ও লিপিবদ্ধ আছে। ১৯৭৪ সালের ২৩ নভেম্বরর বৈঠকের সিদ্ধান্ত মাইনুটসে (পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা) লেখা আছে। ওই মাইনুটসে উভয় দেশের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করেন।
বাংলাদেশ অভিযোগ করছে, ৩৪ বছর ধরে অনুমোদিত মাইনুট উভয় দেশই মেনে চলেছে। এতে এটি কার্যত একটি চুক্তিতে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমার জানিয়েছে, এ রকম কোনো চুক্তি নেই। কারণ অনুমোদিত মাইনুটগুলো তাদের সরকারের অনুমোদনের এবং উভয় দেশের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক চুক্তির প্রয়োজন ছিল।
এরপর উভয় পক্ষ এ নিয়ে আলোচনা করলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি। এর ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০১০ সালের ৪ নভেম্বর এক ঘোষণার মাধ্যমে মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইবুনালের এখতিয়ার মেনে নেয়। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশও ২০০৯ সালের ১২ ডিসেম্বর এক ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের এ সংক্রান্ত এখতিয়ার মেনে নেয়।
বিরোধ : মামলার আরজি, প্রমাণ এবং বিজ্ঞ পরামর্শকদের বক্তব্য থেকে দেখা যাচ্ছে, এই জটিল বিষয় নিয়ে দেশদুটোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা, একান্ত অর্থনৈনিতক এলাকা (ইইজেড) এবং মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া কনভেনশনের ১৫, ৭৪, ৭৬, ৮৩ এবং ১২১নং ধারার ব্যাখ্যা, নির্মাণ ও ব্যবহার নিয়েও বিরোধ রয়েছে। তবে দুটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক তথ্য নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। বাংলাদেশের উপকূল বদ্বীপের মতো। আমার মতে, বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য ভূতাত্ত্বিক উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যেমন দুটো দেশের মধ্যে নিজ নিজ সীমানা নির্ধারণে ডকট্রিন অব নেসেসিটি (প্রয়োজনীয়তার মতবাদ) কাজ করতে পারে।

সমদূরত্ব পদ্ধতিতে সীমা নির্ধারিত হলে আবদ্ধ হয়ে পড়বে বাংলাদেশ

মিয়ানমার দাবি করছে, এ সংক্রান্ত মামলার জন্য (জেনেভা) কনভেনশন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইন উপযোগী নয়। কনভেশনের পূর্ববর্তী সময়ে যে নিয়মকানুন প্রচলিত ছিল, তার আলোকে কনভেনশনের বিধানগুলো ব্যাখ্যা করতে হবে। শুধু ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত। ট্রাইব্যুনাল ২০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণ করতে পারে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মিয়ানমার।
বাংলাদেশ যুক্তি দেখিয়েছে, মহীসোপান শব্দটিকে যেন ব্যাপক, উদার এবং ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ— সবদিক থেকে বিবেচনা করা হয়। মিয়ানমার চেয়েছে মহীসোপান শব্দটিকে শুধু ৭৬ অনুচ্ছেদের আলোকে বিবেচনা করতে। মিয়ানমার দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছে, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে বাংলাদেশের কোনো মহীসোপান নেই। সীমানা নির্ধারণে বাংলাদেশ কৌণিক বিভাজক/দ্বিখণ্ডক (অ্যাঙ্গল বাইসেক্টর) পদ্ধতির পক্ষে এবং মনে করে যে, এর মাধ্যমে ন্যায়সঙ্গত সমাধান সম্ভব। মিয়ানমারের দাবি হচ্ছে, সমদূরত্বের ভিত্তিতে এর সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ মনে করে, সমদূরত্ব ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ করা হলে তাতে বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে তার সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। বাংলাদেশ মনে করে, তার অসুবিধাজনক উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সমদূরত্ব রেখার দ্বারা দেশটি আবদ্ধ হয়ে (সেলফ লকড) পড়বে। বাংলাদেশ বলছে, ন্যায়সঙ্গত সমাধান করার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ যুক্তি দেখিয়েছে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ শুক্তি (অয়স্টার) দ্বীপের মতো কোনো দ্বীপ নয়। শুক্তি দ্বীপে কোনো জনবসতি নেই। নেই কোনো বিশুদ্ধ পানি ও অর্থনৈতিক জীবন। অন্যকথায় বাংলাদেশের মতে, ১২১ ধারা অনুসারে শুক্তি দ্বীপ আদতে কোনো দ্বীপ নয়। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ একটি ‘বিশেষ পরিস্থিতি’।
আমার মনে হয়, দ্বীপগুলোর ভৌগোলিক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ সার্পেন্ট দ্বীপের মতো কোনো দ্বীপ নয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, দ্বীপগুলোরও উপকূলবর্তী অঞ্চল থাকতে পারে তবে এগুলো পরিপূর্ণ অঞ্চল নয়। (যেমন নর্থ সি কন্টিনেন্টাল সেলফ মামলা (তিউনিশিয়া বনাম লিবিয়া), গিনি ও গিনি বিসাউয়ের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ এবং কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় সীমানা নির্ধারণ (রোমানিয়া বনাম ইউক্রেন)।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অবস্থান জটিল। এটা কি বিশেষ পরিস্থিতি? এটা কি মিয়ানমার উপকূলের কাছে কিংবা বিপরীতে অবস্থিত? এই দ্বীপটি কি ১২ নটিক্যাল মাইলের সমুদ্রের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে? সেন্ট মার্টিনের জন্য কৌণিক দ্বিখণ্ডক পদ্ধতিতে সীমানা নির্ধারণ উপযুক্ত। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কোনো বিশেষ অবস্থা বা পরিস্থিতি নয়। এক্ষেত্রে এফিডেভিটে প্রদত্ত সাক্ষ্য বিবেচ্য। দু’দেশের মহীসোপানের সংজ্ঞা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনও প্রাসঙ্গিক এবং অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
উপসংহারে পৌঁছানোর জন্য আমি নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব : ১. ১৯৭৪ এবং ২০০৮ সালে অনুমোদিত মাইনুট (পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা); ২. ভৌগোলিক পরিস্থিতি; ৩. সীমানারেখা নির্মাণ; ৪. সেন্ট মার্টিন দ্বীপের তাত্পর্য; ৫. কনভেনশনের ৭৬ ধারার ব্যাখ্যা এবং ৬. এ ট্রাইব্যুনাল এখতিয়ারের বাইরে যাচ্ছে কি-না।
আমার মতে, ট্রাইব্যুনালকে প্রতিবেদনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি বিবেচনায় নিতে হবে এবং মিয়ানমার যেসব বিষয় চ্যালেঞ্জ করেনি, তাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। বঙ্গোপসাগরের মহীসোপান নিয়ে উপসংহারে পৌঁছানোর জন্য আমি তা-ই করেছি এবং প্রয়োজনে প্রমাণকে প্রয়োগ করেছি।
১৯৭৪ সালে অনুমোদিত মাইনুট : সমুদ্রসীমা নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি রয়েছে কি-না, তা নিয়ে তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ বলছে, উভয় দেশের মধ্যে অনুমোদিত মাইনুট কার্যকর রয়েছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে ১৯৭৪ সালে দেশ দুটির মধ্যে আলোচনা হয়। এতে ৭ দফার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে উভয় দেশের প্রতিনিধিদের প্রধানরা তাতে স্বাক্ষর করেন। ২০০৮ সালে আাাবার এর সংশোধন করা হয়। এতে আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপান নিয়ে উভয় দেশ একটি ব্যাপকভিত্তিক চুক্তিতে পৌঁছানের জন্য আলোচনা অব্যাহত রাখবে।
জবাবে মিয়ানমার বলেছে, অনুমোদিত মাইনুট কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয় এবং ব্যাপকভিত্তিক সমুদ্র চুক্তির জন্য উপসংহারে পৌঁছানোর প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ বলেছে, এসব কথা মাইনুটে ছিল না এবং অনুমোদিত মাইনুট গত ৩৪ বছর ধরে বহাল ছিল। এসব মাইনুট নিয়ে পরে আর আলোচনার কথা ছিল না।
প্রশ্ন হচ্ছে, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে ১৯৭৪ সালের চুক্তির যে অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তা চূড়ান্ত কি-না। আমার মতে, উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ সূচক। প্রথমত মাইনুটের শব্দগুলো স্পষ্ট এবং তা দ্ব্যর্থবোধক নয়। এর সাধারণ অর্থ হচ্ছে, একটি সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে দেখা যাচ্ছে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও মিয়ানমারের উপকূলের মধ্যে একটি সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।

চৌত্রিশ বছর ধরেই বহাল ছিল চুয়াত্তর সালের চুক্তি : ২০০৮ সাল থেকে বেঁকে বসে মিয়ানমার

আলোচনা শেষে বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) প্রতিনিধি দলের প্রধান কমডোর চিট হেলেং এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান রাষ্ট্রদূত কেএম কায়সার ১৯৭৪ সালের ২৩ নভেম্বর চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন। চুক্তিটি নিম্নরূপ :
বাংলাদেশ ও বার্মার প্রতিনিধিদের মধ্যে দু’দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে অনুমোদিত মাইনুটগুলো (পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা)।
১.বাংলাদেশ ও বার্মার প্রতিনিধি দল দু’দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ প্রশ্নে রেঙ্গুনে (৪-৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪) এবং ঢাকায় (২০-২৫ নভেম্বর) আলোচনা করেছে। অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
২.বাংলাদেশ ও বার্মার মধ্যে সমুদ্রসীমার প্রথম ছেদক (ফার্স্ট সেক্টর) অর্থাত্ স্থানিক জলরাশির সীমানা (টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস বাউন্ডারি) নির্ধারণের জন্য দু’দেশের প্রতিনিধি দল নিম্নোক্ত বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
১.একটি রেখা দ্বারা নাফ নদীর ১ নম্বর বাউন্ডারি পয়েন্ট থেকে সমুদ্র অভিমুখী সীমা গঠন করা হবে, যা সেন্টমার্টিন দ্বীপের সর্ব দক্ষিণের অগ্রভাগের ১২ নটিক্যাল মাইলের ছেদের বক্ররেখা এবং বার্মার মূল ভূখণ্ডের উপকূলের নিকটতম পয়েন্ট থেকে যা সেন্টমার্টিন দ্বীপের নিকটতম পয়েন্ট
এবং বার্মার মূল ভূখণ্ডের মাঝামাঝি।
২.জলসীমা নির্ধারণের জন্য ওপরে বাঁক পয়েন্টের (টার্নিং পয়েন্ট) যে চূড়ান্ত স্থানাঙ্কের ব্যাপারে সম্মতি হয়েছে তা একটি যৌথ সমীক্ষায় সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
৩.ঢাকায় আলোচনায় বার্মা প্রতিনিধি দল বলেছে, স্থানিক জলরাশির সীমানা নির্ধারণের জন্য তাদের সরকারের চুক্তি ২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নিশ্চয়তা প্রদান করবে যে, বার্মার জাহাজগুলো সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাংলাদেশের জলরাশিতে এবং নাফ নদীর বার্মিজ ছেদকের যে কোনো দিক থেকে অবাধ ও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে।
৪.বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল ২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত স্থানিক জলরাশির সীমানার ব্যাপারে তাদের সরকারের অনুমোদনের কথা জানিয়েছে। ওপরে ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত বার্মার জলযানের অবাধ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের নিশ্চয়তার কথা বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল উল্লেখ করেছে।
৫.বার্মা সরকারের মতামত দেয়ার জন্য ২০ নভেম্বর বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল স্থানিক জলরাশির সীমানা নির্ধারণের খসড়া চুক্তি বার্মিজ প্রতিনিধি দলকে দিয়েছে।
৬.বাংলাদেশ ও বার্মার সমুদ্রসীমার দ্বিতীয় ছেদকের অর্থাত্ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণের জন্য দুটি দেশের প্রতিনিধি দল এ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় ও নীতি নিয়ে আলোচনা করেছে। তারা উভয়পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।
আমি মনে করি, কোনো রাষ্ট্রের নিয়োগ করা প্রতিনিধিদের দিয়ে চুক্তি লেখা ও স্বাক্ষর হতে পারে। এখানে ঘটনাটি এরকমই। মাইনুটগুলোতে প্রতিনিধি দলের প্রধানরা স্বাক্ষর করেছেন। তারা অবশ্যই তাদের সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। ভিয়েনা কনভেনশনের চুক্তি সংক্রান্ত আইনের ৭ ধারায় এখানে সম্মতি দেয়া হয়েছে। ব্যবহারশাস্ত্রে এটা স্বীকৃত।
মিয়ানমার যুক্তি দেখিয়েছে, মাইনুটের সূচনাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল আলোচনা করেছে। সরকারের কথা বলা হয়নি। কিন্তু তারা তো সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে, যৌথ সমীক্ষার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হবে। তবে সেই সমীক্ষা আর কখনোই পরিচালিত হয়নি।
অনুমোদিত মাইনুট চুক্তিতে পরিণত নাও হতে পারে। তবে এগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। মাইনুটগুলোকে প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এ কারণে যে, গত ৩৪ বছর ধরে এই চুক্তি ছিল এবং তারা তা মেনে চলেছে। আমার মনে হয়, এসব প্রমাণাদি এটাই প্রমাণ করে, অনুমোদিত মাইনুটের আলোকে ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়া যেত।
চুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন সুস্পষ্ট। আমার মত হচ্ছে, অনুমোদিত মাইনুট একটি মৌন চুক্তি যাতে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালে সাত দফার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। দুটি দফায় সামান্য সংশোধন করে ২০০৮ সালে এটি আবারও নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মিয়ানমার আগে নির্ধারিত সীমা মেনে চলতে অস্বীকৃতি জানায়। বাংলাদেশ বলছে, গত ৩৪ বছর ধরে যে সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে মেনে চলা হয়েছে সে ব্যাপারে একপক্ষীয়ভাবে মিয়ানমার মত পরিবর্তন করতে পারে না।
অন্য সব পক্ষের মৌন সম্মতি থাকা সত্ত্বেও এক পক্ষকে একটি এলাকার দাবি অবশ্যই করতে হবে এবং এটা করতে হবে স্পষ্টভাবেই। বাংলাদেশ গত ৩৪ বছর ধরে ঠিক তা-ই করে আসছে এবং মিয়ানমার তাতে আপত্তি জানায়নি। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানের সীমা নির্ধারণ নিয়ে একটি ব্যাপকভিত্তিক চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য মিয়ানমার আলোচনা অব্যাহত রেখেছিল। এটা লক্ষণীয় যে, এ আলোচনায় সমুদ্রসীমার সীমানা নির্ধারণ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। উপরন্তু ২০০৮ সালেও চূড়ান্ত দফার ৭ থেকে ৮/এ দফায় পরিবর্তন চেয়েছিল মিয়ানমার।

বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানের অধিকার হারাবে বাংলাদেশ

 ঙ্গোপসাগর পৃথিবীর বৃহত্তম উপসাগর। এটা একটা বিশাল আকৃতির পানির আধার। পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রশস্ততম স্থানে এর প্রস্থ ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের উপকূল থেকে শুরু করে দক্ষিণে এর বিস্তৃতি ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এর আয়তন প্রায় ২০ লাখ বর্গকিলোমিটার।
আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থার মতে, বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণে বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূল, পশ্চিমে ভারতীয় এবং শ্রীলঙ্কার উপদ্বীপ, পূর্বে মিয়ানমারের নেগরায়েস অন্তরীপ হয়ে ভারতের আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জ। এর পশ্চিমে ভারত ও শ্রীলঙ্কার পূর্ব উপকূল অবস্থিত। উত্তরে ভারত ও বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্বে এবং পূর্বদিকে মিয়ানমার।
বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর বৃহত্তম ডিপোজিটরি সিস্টেম। বাংলাদেশের উপকূল ব-দ্বীপ আকৃতির এবং এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। আমার মতে, বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ে দেশগুলোর উপকূলের রূপরেখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে নিজ নিজ উপকূলের দৈর্ঘ্য, বাংলাদেশের ব-দ্বীপ আকৃতির উপকূল, ডিপোজিটরি সিস্টেম এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রাসঙ্গিকতা।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ : সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি জনঅধ্যুষিত। এখানে ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। বহু বিদেশি পর্যটক দ্বীপটিতে বেড়াতে আসেন। দ্বীপটিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও উপকূল রক্ষীবাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে। কাজেই কনভেনশনের ১২১ ধারা মোতাবেক সেন্ট মার্টিন একটি দ্বীপ এবং এ কারণেই সীমানা নির্ধারণে দ্বীপটি সমুদ্রের ১২ নটিক্যাল মাইল পাওয়ার পূর্ণ অধিকার
রাখে। কনভেনশনের ১২১ ধারা অনুসারে বাংলাদেশের দাবি অনুযায়ী সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে।
আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের (আইসিজে) সিদ্ধান্ত অনুসারে কৃষ্ণসাগরের সীমানা নির্ধারণ (রোমানিয়া বনাম ইউক্রেন) মামলার রায় এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। প্রশ্ন হলো, সমুদ্রসীমা নির্ধারণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি কোনো বিশেষ অবস্থার কিনা।
একেক দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থা একেক রকম। সেন্ট মার্টিন দ্বীপটিও সার্পেন্ট দ্বীপের মতো নয়। আইন অনুযায়ী, দ্বীপটি কোনো বিশেষ অবস্থার দ্বীপ নয়। কাজেই এই মামলার রায়ে দ্বিখণ্ডক রেখার সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেন্ট মার্টিন দিয়ে শুরু করতে হবে (স্টার্টিং পয়েন্ট)।
আইসিজে দ্বীপের কোনো সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা দেয়নি। আদালত বলেছে, সার্পেন্ট দ্বীপে জনবসতি নেই বলে সমুদ্রসীমা হবে ১২ নটিক্যাল মাইল। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দু’দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে কোনো প্রভাব থাকা উচিত নয়।
একেক দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থা একেক রকম। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এবং সার্পেন্ট দ্বীপ একই অবস্থার নয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, দ্বীপগুলোর নিজস্ব উপকূলবর্তী অঞ্চল থাকতে পারে তবে এগুলো মহাদেশীয় ভূমির বিপরীতে বা সন্নিকটে থাকলে তারা পূর্ণ অঞ্চল হতে পারে না। অতএব, সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি বাংলাদেশের অংশ হিসেবে একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানের অন্তর্ভুক্ত এলাকা।
কৌণিক দ্বিখণ্ডক পদ্ধতি : এই মামলার ভৌগোলিক উপাদান অতুলনীয়। এদের মধ্যে রয়েছে দুটি অবতলতা (কনকাভিটি), উপকূলের সম্মুখভাগ, বাইরের মহীসোপান এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। দুই পক্ষ একমত না জেনেও আমার কাছে মনে হচ্ছে, এক্ষেত্রে সীমানা নির্ধারণে সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি হলো কৌণিক দ্বিখণ্ডক (অ্যাংগল বাইসেক্টর) পদ্ধতি।
পক্ষগুলো একমত হয়েছে যে, সমুদ্রসীমা নির্ধারণে প্রথম কাজ হচ্ছে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ। এ কাজ করতে হলে ট্রাইব্যুনালকে ন্যায়সঙ্গত সমাধানের কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। আমি সমদূরত্ব নীতির ব্যাপারে একমত নই। কার্যত কৌণিক দ্বিখণ্ডক পদ্ধতি হলো সমদূরত্ব পদ্ধতির সংশোধিত রূপ। আমি একমত যে, বাংলাদেশ অনুপম উপকূল রেখা (কোস্টলাইন) একটি প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতি। এই উপকূল রেখা পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ এবং সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর অবতলতা (কনকাভিটি) অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। আমি উল্লেখ করেছি, সীমানা নির্ধারণে চূড়ান্ত ফল হলো ন্যায়সঙ্গত সমাধান অর্জন করা।
মিয়ানমারের পরামর্শকরা আইসিজের রায়ে সমদূরত্ব নীতিতে সীমানা নির্ধারণের উদাহরণ টেনে বলেছেন, তাতে ন্যায়সঙ্গত সমাধান হবে। আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কেস বাই কেস ভিত্তিতে। কোনো কোনো মামলায় এটা সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি হতে পারে, তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে তা নয়। তিউনিশিয়া বনাম লিবিয়া মামলায় আইসিজে বলেছে, শুধু ন্যায়সঙ্গত হলেই সমদূরত্ব পদ্ধতির প্রয়োগ হতে পারে। তবে সমদূরত্ব পদ্ধতি ন্যায়সঙ্গত না হলে অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
আমি মনে করি, শেষোক্ত বিবৃতিটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য। স্থানিক ও সমুদ্রসীমা বিরোধ নিয়ে নিকারাগুয়া এবং হন্ডুরাসের মধ্যে মামলায় আইসিজে বলেছে, সীমানা নির্ধারণে সমদূরত্ব পদ্ধতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যান্য পদ্ধতির ওপর প্রাধান্য পেতে পারে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে সমদূরত্ব পদ্ধতি অনুপযুক্ত হতে পারে। নিকারাগুয়া ও হন্ডুরাস এবং গিনি ও গিনি বিসাউয়ের মধ্যে সীমানা নির্ধারণে কৌণিক দ্বিখণ্ডক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
এই মামলায় সমুদ্রসীমা নির্ধারণে ভৌগোলিক পরিস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উভয়পক্ষ যেসব মানচিত্র ও নকশা উপস্থাপন করেছে, তা থেকেই এর প্রতিফলন ঘটেছে। তদুপরি বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনেও বিশেষ পরিস্থতির কথা বলা হয়েছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই মামলায় নিম্নোক্ত ভৌগোলিক কারণে সমদূরত্ব পদ্ধতি উপযুক্ত হবে না :
১. বাংলাদেশের পুরো উপকূল রেখার অবতলতা; ২. বেঙ্গল ডিপোজিটরি সিস্টেমের নিবিড়তা; ৩. বাংলাদেশের উপকূল রেখার ভূগঠনের বিবর্তনের প্রসার, বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে যা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে; ৪. সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অবস্থান। দ্বীপটি বাংলাদেশের উপকূল রেখা থেকে ৪.৫ কিলোমিটার এবং মিয়ানমার উপকূল রেখা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সীমানা নির্ধারণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে পরিপূর্ণভাবে বিবেচনায় নিতে হবে; এবং ৫. বাংলাদেশের উপকূল রেখার অবতলতা তাত্পর্যপূর্ণ। কারণ সমদূরত্ব নীতি প্রয়োগ করা হলে বাংলাদেশের সমুদ্রাভিমুখী অভিক্ষেপ বা প্রজেকশন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অন্যকথায় বঙ্গোসাগরের মহীসোপানে একটি পয়েন্টে এর অভিক্ষেপ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে, যার ফলে বঙ্গোপসারের মহীসোপানে প্রবেশাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বাংলাদেশ।
আমি উল্লেখ করেছি, সমদূরত্ব পদ্ধতির প্রয়োগ হলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। আমার কাছে মনে হয় না, সমদূরত্ব দ্বারা বিচ্ছিন্ন করার নীতি উপযুক্ত। কারণ এর ফলে বাংলাদেশ মহীসোপানের বহিস্থ সীমার অধিকার হারাবে। অতএব সীমানা নির্ধারণে বাংলাদেশ যদি মহীসোপানের অধিকার হারায়, তাহলে তা ন্যায়সঙ্গত সমাধান হতে পারে না। বরং এটি কনভেনশনের ৭৪ ধারার লঙ্ঘন।

গ্রে এরিয়া মিয়ানমার পেলে বাংলাদেশের বিরাট ক্ষতি হবে

গ্রে এরিয়া (ধূসর এলাকা) হলো কোনো দেশের উপকূলের ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে, তবে অন্য কোনো দেশের সমুদ্রসীমার বাইরে অবস্থিত এলাকা। তথাকথিত ধূসর এলাকার একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণে এই ইস্যুটির কথা তোলা হয়েছিল। এই মামলায় ধূসর এলাকা বাংলাদেশের মহীসোপানের আওতায় পড়েছে এবং তা আবার মিয়ানমারের ২০০ নটিক্যাল মাইলের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলেরও অন্তর্ভুক্ত।
আমার মতে, মিয়ানমারের পরামর্শক এই বিষয়টির পরিপূর্ণ সমাধানের পথ বাতলে দেননি। তার যুক্তি হলো, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি সীমানা নির্ধারণের এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের নেই। বাংলাদেশের যুক্তি হলো, মহীসোপানের ওপর একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলকে প্রাধান্য দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়, বরং একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর মহীসোপানকে প্রাধান্য দিতে হবে। এটা কোনো বিরোধের বিষয় নয়, বাংলাদেশ এই অঞ্চলের মহীসোপানের অধিকারী। কিন্তু মিয়ানমার ২০০ নটিক্যাল মাইল পেলে বাংলাদেশের মহীসোপানের অধিকার লঙ্ঘিত হবে।
পরামর্শ দেয়া হয়েছে, ধূসর এলাকাকে অমীমাংসিত এলাকা হিসেবে রেখে দেয়া হউক। অথবা সমস্যার সমাধানের জন্য উভয়পক্ষ আলোচনা করবে এবং সহযোগিতা করবে। মাছ ধরা এবং সমুদ্রের তলদেশ অথবা অন্তমৃত্তিকার (ভূপৃষ্ঠের অব্যবহিত নিম্নবর্তী ভূস্থর) সম্পদরাজি আহরণ ও উত্তোলনের জন্য নির্ধারিত এলাকার জন্য উভয়পক্ষ লাইসেন্স প্রদান করবে। আমার মনে হয়, এটা করা হলে সমস্যা আরও বাড়বে এবং এটা করা হলে তা বিষয়টি নির্ধারণে ট্রাইব্যুনালের ব্যর্থতা হিসবে পরিগণিত হবে। স্মরণ রাখতে হবে যে, একটি রেখা দ্বারা সমুদ্র সীমা, একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানের সীমা নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য উভয়পক্ষই ট্রাইব্যুনালকে অনুরোধ করেছে। আপাতদৃষ্টিতে কনভেনশনে এমন কোনো বিধান নেই যে, একটি রাষ্ট্রের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপান অপর রাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে পারে না। তবে আমি মনে করি, ৩ অনুচ্ছেদের ৫৬ ধারার বিস্তৃত ও উদার ব্যাখ্যার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান সম্ভব।
বিপরীত অথবা সন্নিকটের উপকূলের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে ৭৫ ধারায়। ৮৩ ধারায় সংলগ্ন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণ পদ্ধতি বলা আছে। উভয় ধারাতে বলা হয়েছে, অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত সমাধান করতে হবে। আমার মনে হয়, এই মামলায় এই স্বাতন্ত্র্যসূচক উপাত্তসমূহকে বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে বিচারককে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হবে।
এলাকাটির অবস্থান, এলাকাটি কার্যত একই রকম, কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়াই পক্ষগুলো গত ৩৪ বছর ধরে আলোচনা চালিয়ে আসছে। বিবেচনায় নিতে হবে ডকট্রিন অব নেসেসিটি এবং বঙ্গোপসাগরের অনুপম ভৌগোলিক পরিস্থিতি। মহীসোপান ও একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার জন্মগত এবং তা কেড়ে নেয়া যায় না।
মিয়ানমারকে যদি গ্রে এরিয়া দিয়ে দেয়া হয়, তবে বহিঃস্থ মহীসোপানে (আউটার কন্টিনেন্টাল শেল্ফ) প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। এই এলাকাটি যদি বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া হয়, তাহলে বহিঃস্থ মহীসোপানে বাংলাদেশের অধিকার লঙ্ঘিত হবে না। এটা অবধারিত যে, যদি প্রথমটা গ্রহণ করা হয় (মিয়ানমারকে যদি গ্রে এরিয়া দিয়ে দেয়া হয়) তবে বাংলাদেশের বিরাট ক্ষতি হবে। তাহলে কনভেনশনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ন্যায়সঙ্গত সমাধানের যে কথা বলা হয়েছে, তা আর হবে না। পক্ষগুলো বিরোধের সমাধান চেয়েছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই মামলার বিশেষ পরিস্থিতিতে একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর মহীসোপানের অধিকারকে প্রাধান্য দিতে হবে। এর ফলে আমি গ্রে এরিয়া বাংলাদেশকে দিয়ে দেব।
গ্রে এরিয়া পাবে বাংলাদেশ : আদালত ও ট্রাইব্যুনালের সামনে যেসব বিষয় উপস্থাপন করা হয় তার সমাধানে শক্ত অবস্থান নেয়া উচিত। বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করার সময়ই আমি উল্লেখ করেছি যে, বঙ্গোপসাগর নিয়ে কোনো কিছু করার সময় মনে রাখতে হবে যে, এটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। উপকূলরেখার সর্পিলতা, ব-দ্বীপ আকৃতির গঠন, দ্বৈত অবতলতা (ডাবল কনকাভিটিস) এ অঞ্চলকে অনুপম বৈশিষ্ট্য দান করেছে।
গ্রে এরিয়ার ক্ষেত্রে আদালত ও ট্রাইব্যুনাল কোনো কোনো সুনির্দিষ্ট মত প্রদানে অনিচ্ছুক এবং বিষয়টিতে মনোযোগ দেয়নি। ট্রাইব্যুনাল অন্য জটিল বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছে এবং এ বিষয়টি পরবর্তীতে নিষ্পত্তির জন্য ফেলে রেখেছে। অন্য কথায় কোনো মন্তব্য না করে বিষয়টি স্থগিতাবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে এবং পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে, পক্ষগুলো যেন সমাধানে পৌঁছানের জন্য আরও আলোচনা করে এবং সহযোগিতা করে।
কনভেনশনে এ সংকান্ত যে আইন আছে তা সংক্ষিপ্ত নয়। কিভাবে বিরোধপূর্ণ এলাকার সীমানা নির্ধারণ করতে হবে তা কনভেনশনে বলা আছে। তবে যেখানে গ্রে এরিয়া নিয়ে পক্ষগুলো ওভারল্যাপ (উপরে চেপে পড়ে) করে সেরকম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার কোনো বিধান নেই।
যেখানে আইন স্পষ্ট নয় এবং কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই, সেখানে বিচারককে উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হতে হবে। যেখানে ব্যাখ্যায় দ্ব্যর্থবোধকতা এবং গোলমাল দেখা যায় সেখানে বিচারককে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে নিতে হয়। যদি আইনে সমাধানের পথ না থাকে তবে বিচারককে আইন প্রয়োগ করেই সমাধান পেতে হবে।
কনভেনশন অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র মহীসোপানের অধিকার রাখে। একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের আগেও মহীসোপানের অস্তিত্ব ছিল এবং আমার মতে, এটা অবশ্যই অগ্রগণ্য। সাগরতল এবং অন্তমৃত্তিকা মহীসোপানের অন্তর্ভুক্ত এবং এটা একান্ত অর্থনৈনিতক অঞ্চলকে রহিত করে দেয়। এরকম পরিস্থিতিতে যদি কোনো শূন্যস্থান থাকে তবে তা পূরণে একজন বিচারককে অবশ্যই উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল হতে হবে। এখানে এরকম একটি বিষয় রয়েছে। এখানে ডকট্রিন অব নেসেসিটির মতো একটি মতবাদ প্রাসঙ্গিক। কাজেই আমি গ্রে এরিয়া বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ করছি।
আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, সব পক্ষের জন্য মহীসোপান নির্ধারণের জন্য ট্রাইব্যুনালের সামনে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। কাজেই ট্রাইব্যুনাল মহীসোপানের বহিঃস্থ সীমা (আউটার লিমিট) নির্ধারণ করার অধিকার রাখে।
বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানের ২০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি সীমানা নির্ধারণ করার এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের নেই বলে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তার মধ্যে আমি কোনো সারবত্তা খুঁজে পাইনি। পক্ষগুলো ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার এবং বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনের বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি প্রমাণ মেনে নিয়েছে।
কাজেই আমার মত হচ্ছে, বাংলাদেশ মহীসোপানের অধিকারী (মহীসোপানের বহিঃস্থ সীমা পর্যন্ত)। আমি আরও একবার পুনরাবৃত্তি করতে চাই যে, ডক্টর কুদরাস ও ডক্টর কুরের যে বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন, তা চূড়ান্ত। বস্তুত ট্রাইব্যুনালের সামনে যেসব প্রতিবেদন ও সংযুক্ত প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে এটা প্রমাণিত যে, ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের বহিঃস্থ মহীসোপান পর্যন্ত (২৫০০ মিটার আইসোবাথ) মহীসোপান নির্ধারণ করতে পারে।
উপসংহার : সমুদ্রসীমা নিয়ে ১৯৭৪ সালের অনুমোদিত মাইনুট, যা ২০০৮ সালে সংশোধন করা হয়, তাকে আমি মৌনচুক্তি বলে মনে করি। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সমুদ্র সীমার ১২ নটিক্যাল মাইল পাবার পূর্ণ অধিকারী। সমদূরত্ব দ্বারা বিচ্ছিন্ন করার বিশেষ অবস্থার নীতি অথবা বিধান একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই এলাকার সীমা নির্ধারণে বাংলাদেশের অবতলতা (কনকাভিটি) গুরুত্বপূর্ণ এবং এই মামলায় এটি একটি বিশেষ অবস্থা। ১৯৭৪ সালের অনুমোদিত মাইনুট, যা ২০০৮ সালে সংশোধন করা হয় সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমুদ্রসীমার প্রথম অনুমোদিত রেখা।
বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন এই মামলার প্রমাণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুটি দেশের মহীসোপান বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। আমি দেখেছি যে, বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মিয়ানমার ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরেও মহীসোপানের অধিকারী এবং সেটা সে বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। অতএব, কথিত এলাকাটি আমি কৌণিক দ্বিখণ্ডক পদ্ধতি অনুযায়ী দুটি দেশের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছি। কনভেনশনের ৭৬ ধারার প্রাকৃতিক প্রসার (ন্যাচারাল প্রলংগেশন) এর অর্থ উদ্ধারে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ গ্রহণযোগ্য এবং চূড়ান্ত।
বাংলাদেশের মহীসোপান হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত ল্যান্ডমাস (একটি ভৌগোলিক এলাকার সমগ্র উপরিভাগ)-এর প্রাকৃতিক প্রসার। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণ করবে কৌণিক দ্বিখণ্ডক (অ্যাঙ্গল বাইসেক্টর)। কৌণিক দ্বিখণ্ডক প্রয়োগ করে সমতা নিশ্চিত করতে হবে। আমি যে মত দিয়েছি সেই অনুযায়ী গ্রে এরিয়া (ধূসর এলাকা) অবশ্যই ভাগ করে দিতে হবে। আমি গ্রে এরিয়া বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ করছি। তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের অধিকার লঙ্ঘিত না হলে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে সীমানা নির্ধারণ হচ্ছে বিবদমান দেশগুলোর মধ্যে একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা (ইইজেড) এবং মহীসোপানের সীমারেখা ভাগের ধারাবাহিকতা।

সমুদ্রসীমার রায়ের একটি ভৌগলিক বিশ্লেষণ


সম্ভবত রায়ের ৫৪ এবং ৫৭ নং পৃষ্ঠায় সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের এনভেলাপ অংশের মীমাংসার মানচিত্র দুটি আমাদের মিডিয়াগুলিকে সমুদ্রজয়ের শিরোনাম করতে অনুপ্রাণিত করে থাকবে। তবে প্রকৃত অর্থে এখানে সমুদ্র বিজয়ের মতো কোনও ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা প্রায় সমকৌণিক। আনক্লসের নীতিমালা মেনে নিজেদের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে গেলে একের সীমানা অন্যের সীমানায় পড়বেÑ এটাই স্বাভাবিক। ফলে এই বিষয়ে মীমাংসার রায়কে ‘সমুদ্র বিজয়’ বলে দাবি করা বাড়াবাড়ি। আর যদি জয়-পরাজয়ের কথাই আনতে হয় তাহলে রায়ের ৪৯৯ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পরিবর্তিত মীমাংসা রেখা অনুসারে ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার মিয়ানমার পাবে।

আনুপাতিকভাবে এটা প্রায় ১ : ১.৫৪ হারে মিয়ানমারের অনুকূলে। এলাকা বণ্টনের পরিমাণ ও অনুপাতে পরাজয়টা তাহলে কার হল?



এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান :

বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে বিরাজমান ত্রিদেশীয় সমুদ্রসীমা বিরোধের বাংলাদেশ-মিয়ানমার অংশের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তির রায় পাওয়া গেছে গত ১৪ মার্চ ২০১২। রায়ের কপি ইন্টারনেটে আসার আগেই মিডিয়া এটাকে ‘বাংলাদেশের সমুদ্র জয়’ শিরোনামে ফলাও করে প্রচার করায় সাধারণের মধ্যে এমন একটা ধারণা হয়েছে যে, ওই সমুদ্র আগে আমাদের ছিল না, মিয়ানমারের সঙ্গে মামলায় জিতে আমরা ওই সমুদ্র জয় করেছি। সমুদ্রসীমা বিষয়ক জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের (আইটিএলওএস) রায়ে কি আসলেই বাংলাদেশ সমুদ্র জয় করেছে? বিষয়টা সম্পর্কে জানতে হলে এই সমুদ্রসীমা বিষয়ক রায়টি এবং এর পূর্বাপর কিছু ঘটনা অবশ্যই আমলে নিতে হবে।

পৃথিবীর ১০ ভাগের ৭ ভাগ হচ্ছে জল, তথা সমুদ্র। অগাধ সম্পদের অধিকারী সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ আহরনের জন্য আন্তঃদেশীয় সমুদ্রসীমা বিরোধ থাকলেও তা নিয়ে আইন করার প্রয়োজন খুব তীব্র ছিল না। বিগত শতকের শেষার্ধে বহুজাতিক পেট্রোলিয়াম কোম্পানিগুলো সমুদ্রে পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান শুরু করলে মূলত আন্তর্জাতিক সমুদ্রে অর্থনৈতিক এলাকা নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৮২ সালে জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশন আইন (আনক্লস) প্রণীত হয়। ১৯৯৫ সালে ভারত এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করে, মিয়ানমার স্বাক্ষর করে ১৯৯৬ সালে এবং বাংলাদেশ ২০০১ সালে।

এই আইন অনুযায়ী একটি দেশ তার বেজলাইন হতে ১২ নটিক্যাল মাইল (১ নটিক্যাল মাইল = ১ দশমিক ৮৫২ কিলোমিটার) রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা এবং আরো ১৮৮ নটিক্যাল মাইলসহ মোট ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে। মহীসোপানের আরো ১৫০ নটিক্যাল মাইল যোগ করে (২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মহীসোপান) সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা সর্বোচ্চ ৩৫০ নটিক্যাল মাইলের বেশি হবে না। বাংলাদেশের মহীসোপান এলাকা অনেক দীর্ঘ হওয়ায় এই সুবিধাটি বাংলাদেশের পাওয়ার কথা। কনভেনশনের নিয়ম অনুসারে স্বাক্ষরের ১০ বছরের মধ্যে একটি দেশকে তার ঘোষিত সমুদ্রসীমার দাবি উত্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে আবেদন করে এই সময় আরো ৫ বছর বৃদ্ধি করার সুযোগও রয়েছে। ভারত এবং মিয়ানমার ২০০৮ সালে তাদের সমুদ্রসীমা আনক্লসে উপস্থাপন করে।


বাংলাদেশেরও উচিত ছিল প্রয়োজনীয় জরিপ শেষে নিজেদের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে তা আনক্লসে উপস্থাপন করা। তা না করে পেট্রোবাংলা ২০০৮ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি সমুদ্র অঞ্চলকে ২৮টি ব্লকে (৮টি অগভীর ও ২০টি গভীর) ভাগ করে বাংলাদেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রে গ্যাস ব্লকের মানচিত্র প্রকাশ করে তৃতীয় দফা বিডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ১৫ ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করে। ভারত এবং মিয়ানমার এই ঘোষিত ব্লকগুলো তাদের অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমায় পড়েছে দাবি করলে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার আনক্লসের পরিশিষ্ট ৭ ধারা অনুসারে ভারত ও মিয়ানমার ঘোষিত সমুদ্রসীমার বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করে।

২০০৯ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মিয়ানমার সরকার আইটিএলওএসে আবেদন করে। বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে ২০০৯ সালের ১২ ডিসেম্বর অবহিত করা হয়। ২০১০ সালে ১ জুলাই বাংলাদেশ তার দাবি আদালতে উপস্থাপন করে। রায়ের ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দাবি এবং আনক্লসে উপস্থাপিত ভারতের দাবি (হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মুখ থেকে আন্দামান-নিকোবর পর্যন্ত সরল রেখা) ডব্লিউজিএস-১৯৮৪ ডেটাম অনুযায়ী মানচিত্রে উপস্থাপনের পর সেখানে পেট্রোবাংলা কর্তৃক ঘোষিত পেট্রোলিয়াম ব্লকগুলো জিও রেফারেন্স করলে দেখা যায় যে, আনক্লসের ধারা মেনে ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মহীসোপান বিবেচনায় এনে পরবর্তী ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত পেট্রোবাংলা ব্লক নির্ধারণ করেছে, যা যুক্তিসঙ্গত।

[চিত্র-১: ইধু ড়ভ ইবহমধষ.লঢ়ম ]

ভারতের দাবির মধ্যে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ৫টি (৯, ১৪, ১৯, ২৪, ২৫) ব্লক পুরোপুরি এবং ৫টি ব্লক (১০, ১৫, ২০, ২১, ২৬) আংশিকভাবে পড়েছে। এ ছাড়াও অগভীর সমুদ্র ব্লকের ৩টি (১, ৫, ৬) ব্লক আংশিকভাবে ভারতীয় দাবির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।


আইটিএলওএসের রায়ে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ায় এর পরের মানচিত্রে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র স্কেলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দাবির সঙ্গে আদালতের রায়ের ঘোষণা অনুযায়ী হাতছাড়া হওয়া ব্লকগুলোর পরিমাণ দেখানো হয়েছে। এখানে দেখা যাচ্ছে যে, মিয়ানমারের সমদূরত্বরেখা দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশের অগভীর সমুদ্রের ১৮ নং ব্লকের অংশবিশেষসহ গভীর সমুদ্র ব্লকের ৭টি পূর্ণব্লক (১৮, ২১, ২২, ২৩, ২৬, ২৭, ২৮) এবং ৭টি ব্লকের (১২, ১৩, ১৬, ১৭, ২০, ২৪, ২৫) অংশবিশেষ মিলে মোট ৩৪ হাজার ৯৩ দশমিক ৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পড়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ তার দাবি পেট্রোবাংলার মতো ভূ-প্রাকৃতিকভাবে না করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে করেছে এবং এই দাবিরেখা অনুযায়ী ২০০৮ সালে নিজেদের ঘোষিত তিনটি পূর্ণব্লক (২৩, ২৭, ২৮) এবং ৫টি ব্লকের (১৩, ১৭, ১৮, ২২, ২৬) অংশবিশেষ মিলে মোট ১৪ হাজার ৭৪৪ দশমিক ১৪২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের দাবি হতে বাদ দিয়েছে!

[চিত্র-২: ইধু ড়ভ ইবহমধষ১.লঢ়ম]

আইটিএলওএসের রায়ের ৫০০ হতে ৫০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে মীমাংসা রেখা বর্ণনা করা হয়েছে সে অনুযায়ী বাংলাদেশ তার অগভীর সমুদ্রের ১৮ নং ব্লকের অংশবিশেষসহ গভীর সমুদ্র ব্লকের ৫টি পূর্ণব্লক (১৮,২২, ২৩, ২৭, ২৮) এবং ৬টি ব্লকের (১২, ১৩, ১৭, ২১, ২৫, ২৬) অংশবিশেষ মিলে মোট ২২ হাজার ৪৯ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা হারিয়েছে।

মিয়ানমার তার আবেদনে বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনস দ্বীপকে তার দেশের নাফ নদীর পলিপাতন অংশ বিবেচনা করে একে সীমানা নির্ধারণের জন্য বিবেচনা না করে পৃথকভাবে দেখার জন্য দাবি করে (অনুচ্ছেদ ১৩১ ও ১৩২)। অথচ সেন্ট মার্টিনস একটি প্রবাল দ্বীপ, যার সঙ্গে নদী বা পলিপাতনের কোনও সম্পর্কই নেই। বাংলাদেশ এই বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারায় মিয়ানমারের দাবি মেনে নিয়ে ট্রাইবুনাল কর্তৃপক্ষ সমদূরত্ব নীতির শুরুর বিন্দু নাফ নদীর মুখে নির্ধারণ করে। ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা এখন আগের চেয়ে উত্তরে সরে টেকনাফে চলে এসেছে। তবে সেন্ট মার্টিনসকে এনভেলাপ দেবার সময় মিয়ানমারের দাবি করা স্থানাংক অনুসরণ না করে ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের দাবি করা ৭ নং স্থানাংক পর্যন্ত গিয়ে এরপর মিয়ানমারের ‘ই’ স্থানাংককে মীমাংসা রেখার সঞ্চার বিন্দু নির্ধারণ করেছে। এর ফলে ১৮ নং ব্লকের ১০০ দশমিক ৮৪৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা হাতছাড়া হলেও সেন্ট মার্টিনসের জন্য অপেক্ষাকৃত বড় এনভেলাপ পাওয়া গেছে।

[চিত্র-২: ইধু ড়ভ ইবহমধষ২.লঢ়ম]

বাংলাদেশ তার আবেদনে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমাকে ১৭ ডিগ্রি ২৫ মিনিট ২৫ দশমিক ৭ সেকেণ্ড উত্তর, ৯০ ডিগ্রি ১৫ মিনিট ৪৯ সেকেন্ড পূর্ব বিন্দু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখার জন্য দাবি করেছিল। সেই দাবি বাতিল করে দিয়ে ট্রাইব্যুনাল ৫০৫ অনুচ্ছেদে বিভক্তি রেখাকে তৃতীয় দেশের (ভারত) অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত প্রলম্বিত করে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এখন অন্য দেশের অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করতে হবে।

সম্ভবত রায়ের ৫৪ এবং ৫৭ নং পৃষ্ঠায় সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের এনভেলাপ অংশের মীমাংসার মানচিত্র দুটি আমাদের মিডিয়াগুলিকে সমুদ্রজয়ের শিরোনাম করতে অনুপ্রাণিত করে থাকবে। তবে প্রকৃত অর্থে এখানে সমুদ্র বিজয়ের মতো কোনও ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা প্রায় সমকৌণিক। আনক্লসের নীতিমালা মেনে নিজেদের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে গেলে একের সীমানা অন্যের সীমানায় পড়বেÑ এটাই স্বাভাবিক। ফলে এই বিষয়ে মীমাংসার রায়কে ‘সমুদ্র বিজয়’ বলে দাবি করা বাড়াবাড়ি। আর যদি জয়-পরাজয়ের কথাই আনতে হয় তাহলে রায়ের ৪৯৯ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পরিবর্তিত মীমাংসা রেখা অনুসারে ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার মিয়ানমার পাবে। আনুপাতিকভাবে এটা প্রায় ১ : ১.৫৪ হারে মিয়ানমারের অনুকূলে। এলাকা বণ্টনের পরিমাণ ও অনুপাতে পরাজয়টা তাহলে কার হল?

সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত এই রায়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করে আমাদের উচিত হবে ভারতের সঙ্গে ২০১৪ সালে ট্রাইব্যুনালের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করা এবং সেই মামলায় নিজেদের জরিপ ও ভূ-প্রাকৃতিক যুক্তিকে শক্তভাবে উপস্থাপনের পদক্ষেপ নেয়া। ভারতের সঙ্গে মীমাংসারেখা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা পাচ্ছি না। তাই এই বিষয়ে এখনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সমুদ্রজয়ের পাঠ অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।

সমুদ্র আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। এই সম্পদকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে না দিয়ে দেশি কোম্পানি বাপেক্সকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। আইটিএলওএসের রায়ে বাংলাদেশের পলিপাতনকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রতিবছর আমাদের দেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বিলিয়ন টন পলিকে তাহলে কেন আমরা অন্যের সমুদ্রসীমায় চলে যেতে দেব? মেঘনা মোহনায় পলি সংগ্রহ করে সমুদ্র হতে আমরা ভূমি পুনরুদ্ধার করার ব্যবস্থা নিতে পারি। এক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে। উল্লেখ্য, নেদারল্যান্ডসের মোট আয়তনের এক-পঞ্চমাংশ (৭,০০০ বর্গকিলোমিটার) সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা। সমুদ্রে মৎস্য শিকারের জন্য সুষ্ঠু নীতামালা এবং মৎস্য শিকারের সঙ্গে জড়িতদের জন্য উন্নত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে এই খাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। সমুদ্রসীমা নিয়ে রাজনীতি না করে এসব বিষয়ে মনযোগী হওয়াটাই দেশ ও দেশের জনগণের জন্য উত্তম।

তথ্যসূত্র :

১। আইটিএলওএসের রায়
২। পেট্রোবাংলা প্রণীত বাংলাদেশের পেট্রোলিয়াম ব্লকসমূহের মানচিত্র
৩। জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশন আইন
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও পরিবেশের শিক্ষক।

বুধবার, ১১ এপ্রিল, ২০১২

সমুদ্রসীমা রায়: স্বস্তি ও উদ্বেগ


সমুদ্র সাধারণভাবে বিশ্বের সকল মানুষের সম্পদ। কিন্তু এই বিশ্বের সকল মানুষের এই সাধারণ সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী কিছু রাষ্ট্র আর বহুজাতিক সংস্থার মুনাফা আর দখল তৎপরতায় ক্ষতবিক্ষত, দূষিত, বিপর্যস্ত। যে সমুদ্র অপরিমেয় সম্পদের ক্ষেত্র তা বর্তমান আগ্রাসী দখলদার বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধ, ভয়ংকর গবেষণা এবং মুনাফামুখি নানা তৎপরতায় মানুষের কর্তৃত্বের বাইরে। সবল কতিপয় রাষ্ট্র ও সবল ক্ষুদ্র মুনাফাভোগী শ্রেণীর আধিপত্য এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই আগ্রাসী পরিস্থিতির মধ্যে দুর্বল দেশগুলোর জনগণকে সতর্ক থাকতে হয়, অবস্থান নিশ্চিত রাখবার জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইনের আশ্রয় নেবার জন্য দক্ষ প্রস্তুতি রাখতে হয়। আর এসব দেশের সরকার যদি জনগণের স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব না করে তাহলে জনগণের দিক থেকে সতর্কতা বাড়াতে হয় আরও বহুগুণ।
১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশন আইন অনুযায়ী, যেকোন দেশ সমুদ্রের ভেতর ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নিজ সীমা হিসেবে দাবী করতে পারে। এর মধ্যে ১২ মাইল সার্বভৌম সীমার অন্তর্ভূক্ত এবং পরবর্তী ১৮৮ মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। সম্প্রসারিত হিসেবে সমুদ্র ভূমিতে একটি দেশ ৩৫০ মাইল পর্যন্ত নিজেদের কর্তৃত্বাধীন বিবেচনা করতে পারে।
কিন্তু ২০০৮ সালে এসে আমরা জানতে পারি যে, সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মায়ানমার তাদের দাবি জাতিসংঘে উপস্থিত করেছে এবং তাতে বঙ্গোপসাগরে প্রাপ্য সমুদ্রসীমার দুইতৃতীয়াংশ বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্থলভাগের প্রায় দুইগুণ সমপরিমাণ সামুদ্রিক অঞ্চল চলে যাচ্ছে মায়ানমার ও ভারতের হাতে।
২০০১ সালে জাতিসংঘ কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এর ১০ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১১ সালের মধ্যে সমুদ্রসীমায় আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সব প্রমাণাদি ও কাগজপত্র জমা দেবার কথা। ২০০৪ সালে পেট্রোবাংলা, জিএসবি, নেভি, স্পারসো, আইডব্লিউটিএ, সার্ভেয়ার অব বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে আমরা জেনেছি, কিন্তু সেটি কোন কাজ করেনি। এরকম অবস্থাতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সমুদ্র অঞ্চলকে ২৮টি ব্লকে (৮টি অগভীর ও ২০টি গভীর সমুদ্রে) ভাগ করে তৃতীয় দফা বিডিংএর সিদ্ধান্ত নেয় এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করে। বহুজাতিক কোম্পানির সাথে উৎপাদন অংশীদারী চুক্তি (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি) করবার ব্যাপারে সরকারের বিপুল আগ্রহ দেখা গেলেও সমুদ্রসীমা নিয়ে এই বিপদ সম্পকে এই সরকারের কোনো সক্রিয়তা দেখা যায়নি।
পরিস্থিতি তখন এমন যে, মায়ানমার ও ভারতের দাবি আন্তর্জাতিক ফোরামে স্বীকৃত হলে বাংলাদেশ শুধু বিশাল অঞ্চল হারাবে তাই নয়, জানা অজানা সম্পদের এমন ভান্ডার তার হাতছাড়া হবে যা বহুকালের বহু প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশকে পাল্টে দিতে সক্ষম। তাছাড়া সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি তো আছেই। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের আরও কারণ ছিল এটাই যে, ভারত ও মায়ানমার তাদের নথিপত্র জমা দিলেও বাংলাদেশের সেসময় পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। শেষ সময়সীমা ২০১১ সাল, কিন্তু সমুদ্রসীমা নিয়ে দাবি উত্থাপন করতে গেলে সমুদ্রে জরীপসহ অনেক কাজ বাকি, কিছুই হয়নি তখনো।
তখন থেকেই আমরা ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র পক্ষ থেকে সমুদ্রসীমা ও সমুদ্রসম্পদ বিষয়ে কথা বলা শুরু করি। একইবছর বিশেষজ্ঞ ও উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের নিয়ে ‘সমুদ্র অঞ্চল ও সীমানা রক্ষা জাতীয় কমিটি’গঠিত হয়।গবেষক নূর মোহাম্মদ আহবায়ক ও রিয়ার এডমিরাল (অব:) খুর্শেদ আলম এর সদস্য সচিব ছিলেন। এই কমিটি বিভিন্ন সেমিনার প্রকাশনার মধ্য দিয়ে দেশের জনগণের মধ্যে সমুদ্রসীমা ও সমুদ্রসম্পদ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। খুর্শেদ আলম এই বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন।বস্তুত তিনিসহ আরও সীমিত কয়েকজন ব্যক্তির গবেষণা লেখালেখি বিশ্লেষণ থেকেই আমরা এই বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা পাই এবং তা জনগণের মধ্যে নিয়ে যেতে চেষ্টা করি। ২০০৯ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবার পর খুর্শেদ আলমকে অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সমুদ্র ডেস্কের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।এটা ছিল সরকারের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত।সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মানুষ যে কাজ করতে পারেন তা এখানে প্রমাণিত হয়েছে।

২০০৮ সালে ক্ষমতার নানা কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের পক্ষে সমুদ্র জরিপ করা সম্ভব নয়। এর জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ লাগবে, বিশ্বব্যাংকের ঋণ লাগবে, বিপুল অর্থ দরকার, বিদেশি কোম্পানিকে দায়িত্ব দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ খুর্শেদ আলমের নেতৃত্বে মাত্র ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রয়োজনীয় জরীপ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, যা মায়ানমারের সাথে মোকাবিলায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আন্তর্জাতিক আদালতে মায়ানমারকে মোকাবিলা করতে গিয়ে সমুদ্রসীমা নিয়ে বাংলাদেশ যে দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তার স্থায়ী গুরুত্ব আছে। নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়াও সামনে ভারতের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও এগুলো কাজে লাগবে। ভারতের সাথে এখনও আমাদের সমস্যার নিষ্পত্তি হয়নি। ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার কথা বলছেন কেউ কেউ। সেটা খুবই বিপজ্জনক প্রস্তাব। কারণ, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অভিজ্ঞতা আমাদের মোটেই ভালো নয়। ভারত সবসময়ই আন্তর্জাতিক বিষয় দ্বিপক্ষীয়ভাবে সারতে চায়। কিন্তু তাতে কোনোক্ষেত্রেই বাংলাদেশের লাভ হয়নি, বরং ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরাম ও আইনি ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনোভাবে ভারতের সঙ্গে সমাধান হবে না। মামলার রায়ের মধ্য দিয়েই উভয় পক্ষ নিজ অঞ্চল ও সীমানা নির্ধারন করতে পারবে। তবে এর জন্য আরও সতর্ক ও দক্ষ প্রস্তুতি লাগবে। বাংলাদেশের সরকার তার ভূমিকা পালনে আন্তরিক হলে, শৈথিল্য না দেখালে বা ভারতের প্রতি বিশেষ ছাড় দেবার কোন প্রবণতা না থাকলে ভারতের সাথে আমাদের বিজয় অর্জন খুবই সম্ভব।
ভারতসহ আরও বেশকিছু বিষয় এখনও মীমাংসা বাকি থাকলেও ১৪ মার্চের রায়ের মাধ্যমে সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপর আমাদের আইনি অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এটা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই আইনী অধিকার কার্যকর অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা হবে কিনা সেটা নিয়েই এখন সংশয় তৈরি হয়েছে।

সমুদ্রসীমা নিয়ে এই রায়ের পরপরই সরকার ও সরকার বহির্ভূত কোম্পানিমুখি বিভিন্ন লোকজন যেভাবে বিদেশি কোম্পানিকে ব্লক ইজারা দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ও উচ্ছাস দেখাচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে এই বিজয় বহুজাতিক কোম্পানির, বাংলাদেশের জনগণের নয়। কিন্তু সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের মালিকানা মানে এখানকার জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা। সম্পদের শতভাগ নিজেদের কাজে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত না হলে এই বিজয় অর্থহীন।
সমুদ্রসীমা নিয়ে মায়ানমারের সাথে নিষ্পত্তি হবার পর কনোকোফিলিপসকে সমুদ্রের আরও ছয়টি ব্লক দেবার ব্যাপারে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। গত বছরের ১৬ জুন সরকার এই মার্কিন কোম্পানির সাথে যে চুক্তি করে, তা বাংলাদেশের জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি বরং বাংলাদেশকে বিভিন্ন দিক থেকে বড় বিপদের মুখে নিক্ষেপ করেছে। দক্ষতার যুক্তি দিয়ে দুর্ঘটনার রাজা কনোকোফিলিপসকে ১০ ও ১১ ব্লক তুলে দিলেও এই কোম্পানি এখন চীনা একটি কোম্পানিকে সাবকন্ট্রাক্ট দিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্রব্লকে কাজ করাচ্ছে। যে রফতানিমুখি চুক্তির ভিত্তিতে এই কোম্পানি আমাদের সমুদ্রের ব্লকগুলো ইজারা নিয়েছে, এরকম শর্তে আরও ব্লক ইজারা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি শকুনের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। কোম্পানিমুখি প্রচারকেরা এই চুক্তির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে সবসময় বাংলাদেশের অক্ষমতার কথাই বলেন, হীনম্মন্যতাই তাদের প্রধান অবলম্বন। অথচ সমুদ্রের জানা অজানা সম্পদের ওপর যাতে জাতীয় মালিকানা ও জনগণের যথাযথ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় জাতীয় সক্ষমতার বিকাশের কোন উদ্যোগ নেবার কথা তাদের মুখে কখনো শোনা যায়না। তাদের কথা অনুযায়ী চললে বাংলাদেশের হীনদশা কখনো কাটবে না।
আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, বঙ্গোপসাগরের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বহুদিনের মনোযোগ আরও বেড়েছে । তারা আমাদেরকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করতে চায়, আমাদের নিরাপত্তা দিতে চায়! কিন্তু আমরা জানি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর যেখানেই গেছে, সেখানে হত্যা, লুটপাট, অশান্তি, নিরাপত্তাহীনতা ও ধ্বংস ছাড়া আর কিছু আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র যদি বলে নিরাপত্তা তাহলে আসে সহিংসতা, যদি বলে শান্তি আসে ধ্বংস, যদি বলে গণতন্ত্র আসে স্বৈরতন্ত্র।বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তার নামে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা কিংবা এই কর্তৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীন ভারত ঐক্য কিংবা সংঘাত সবগুলোই বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।আমরা জানি যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ‘অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুভাবেই দক্ষিণ এশিয়া এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠেছে। ২০০৮ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর ইরাক থেকে সরে দক্ষিণ এশিয়ায় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। এই অঞ্চলে ভারত, চীন, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নানা মাত্রায় ঐক্য ও সমঝোতার প্রধান বিষয় হল, জ্বালানী খনিজ সম্পদ, ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আর সেইসঙ্গে এগুলোর আমদানি রফতানির জন্য তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, বন্দরের উপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা’। (The Militarization of India, http://www.counterpunch.org/2011/05/27/the-militarization-of-india/)
সমুদ্র সীমায় যদি বিদেশি সৈন্য মোতায়েন হয় কিংবা যদি সমুদ্রের বিশাল সম্পদের মালিকানা বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হয়, যদি এই সম্পদ রফতানিমুখি চুক্তির আড়ালে বিদেশে পাচার হয় তাহলে অর্জিত এই সার্বভৌম অধিকার প্রহসন ছাড়া আর কী হবে? কারণ, বাংলাদেশে তো বটেই বহুদেশে এরকম অভিজ্ঞতা আছে যে, সম্পদ পেলেই জনগণ সেই সম্পদের ব্যবহার করতে পারবে তা নয়, সম্পদ পেলেই তার ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে তা নয়। সরকার যদি জনগণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ না করে তাহলে সম্পদ বরং পরিণত হতে পারে অভিশাপে। আমরা জানি সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা কিন্তু এদেশের বিভিন্ন সরকার সাম্রাজ্যবাদের কিংবা কমিশনভোগী দেশি লুটেরাদের স্বার্থরক্ষার্থেই তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। ভয়টা সেখানেই।
আগে জাতীয় মনোযোগে না থাকলেও এটা এখন সবাই স্বীকার করবেন যে, বাংলাদেশ শুধু নদীমাতৃক দেশ নয়, সমুদ্রমাতৃকও। অতএব সমুদ্রের ওপর কর্তৃত্ব এবং এর সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবার জন্য এর সাথে অসঙ্গতিপূণ চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে বিস্তৃত পরিকল্পনা নেয়াই এখন প্রধান করণীয়। এই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা দরকার। বড় দায়িত্ব নেবার মতো করে পেট্রোবাংলাকে সাজানো দরকার। প্রয়োজনে প্রবাসী বাংলাদেশীদের এই কাজে যুক্ত করা খুবই সম্ভব। সরকার যদি এর উল্টো পথে চলে, তাহলে জনগণকেই তার নিজের সম্পদ বুঝে নিতে ও সার্বভৌম অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
আনু মুহাম্মদ: শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব ।

বুধবার, ৪ এপ্রিল, ২০১২

মোস্তাফা কামালের সমুদ্র রিপোর্ট এবং বিএনপির বিলাপ


বাংলাদেশের সমুদ্রজয়কে কাল্পনিক ব্লক হাতছাড়া হওয়া না-হওয়ার সঙ্গে তুলনা করে বিএনপি ও কিছু বিশেষজ্ঞ চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন। বিরোধী দলের নেতা সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানোর পর বিএনপিরই কিছু নেতার যেন গাত্রদাহ শুরু হয়েছে।
ড. মোশাররফ হোসেন প্রেসক্লাবে মিয়ানমারের কাছে ‘ঠকে আসার’ অভিনব তত্ত্ব হাজির করেন। এর পরই মির্জা ফখরুল ইসলাম, যিনি এর আগে ‘সরকারকে বাদ দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে’ সাধুবাদ জানিয়েছিলেন, তিনি এখন ‘শুভংকরের ফাঁকি’ আবিষ্কার ও ‘বিসর্জনের’ তালিকা প্রকাশের দাবি করেছেন। রায় প্রকাশের মতো হাস্যকর দাবিও তুলছেন। কারণ, ইটলস ওয়েবসাইটে মূল রায়, এমনকি উভয় পক্ষের শুনানি, কে কী দাবি করেছে, তার সবকিছু দেওয়া আছে।
তবে বিশেষজ্ঞ মহলের অযাচিত আক্রমণ দুঃখজনক। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা রায় না পড়ার কথা স্বীকার করেও ‘মিথ্যাচার’ ও ‘জাতিকে লজ্জা’ দেওয়ার কথা বলতে দ্বিধাহীন। প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক জয়-পরাজয় নিয়ে প্রথম আলোয় গত ৩০ মার্চ যা লিখেছেন, তা অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর, অসত্য এবং উদ্ভট বটে। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ড. শাহ আলম তাঁর রচনার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দিগ্ধ। এই লেখকের সঙ্গে আলোচনায় লেখাটি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। তাঁর মন্তব্য, ‘ইনামুল সাহেব নদী নিয়ে কাজ করেন। লেখা পড়ে মনে হয়, সাগরের অথৈ জলে পড়ে তিনি খেই হারিয়ে ফেলেছেন।’
২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ড. মোশাররফ ২০০১ সালে জাতিসংঘে কী দাখিল করেছেন, সেটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজানা। তিনি ইয়াঙ্গুনে বিজয়োল্লাসের তথ্য দেন। কিন্তু সেখানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
খালেদা জিয়ার উচিত তাঁর কাছে একটি কৈফিয়ত চাওয়া। বিএনপির নেত্রীর সভাপতিত্বে ৯ ডিসেম্বর ২০০২ অনুষ্ঠিত বৈঠকে মহীসোপানের দাবি ২০০৪ সালের মধ্যে জাতিসংঘে পেশ করার (যা ২০১১ সালে আওয়ামী লীগকে করতে হয়েছে) সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। নইলে স্থলভাগের দুই-তৃতীয়াংশের সমান সমুদ্রসীমা ‘হাতছাড়া’ হতে পারে—এ কথা সাফ বলে দিয়ে ড. মোশাররফকে আহ্বায়ক করে তিনি ১৫ সদস্যের কমিটি করে দিয়েছিলেন। আজ যদি মির্জা ফখরুলের দাবি অনুযায়ী ‘শুভংকরের ফাঁকি’ ঘটে, তাহলে তার দায় কে নেবে? সাগরে ‘দুই-তৃতীয়াংশ’ জলভাগ হাতছাড়া হওয়ার জন্য তো খালেদা জিয়ার শর্তেই ড. মোশাররফকেই আগে কাঠগড়ায় তুলতে হবে। বিএনপিকে মায়াকান্না করতে হলে মরিচের গুঁড়া সরবরাহের খরচটা তাঁর কাছ থেকেই উসুল করতে হবে।
নৌবাহিনী ও সরকারের অন্য সংস্থা যে দুটি জরিপ ২০১০ সালে ঝঞ্ঝার বেগে করল, সেই জরিপ ২০০৪ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার দায়িত্বও ওই কমিটির কার্যপরিধিতে ছিল। কিন্তু ব্যর্থ ড. মোশাররফ ও তাঁর কমিটি সম্ভবত এরপর কোনো বৈঠকেই বসেনি।
আজকের লেখায় আমি অবশ্য সেই সব বন্ধুদেশকে ধন্যবাদ জানাব, যাঁরা ৩৫ বছর আগে বাংলাদেশের সমুদ্রনীতির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিল।
সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামাল জিয়া-জমানায় অ্যাডভোকেট (অ্যাটর্নি) জেনারেল ছিলেন। ১৯৮২ সালের যে আইনটির অধীনে আমরা রায় পেলাম, সেটি তৈরির পর্বে বাংলাদেশ তাতে ন্যায়পরায়ণতা নীতি সংযোজনে ব্রতী হয়। কারণ, সমদূরত্ব পদ্ধতিতে বাংলাদেশ সাগরে ‘তালাবদ্ধ’ হয়ে পড়ে। তাই জিয়াউর রহমান সরকার সমুদ্রে তালা খোলার কূটনীতিতে যথার্থই মনোনিবেশ করেছিল।
১৯৭৭ সালের ২৩ মে থেকে ১৫ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক একটি সম্মেলন শেষ হয়েছিল। ব্যারিস্টার মোস্তাফা কামাল এর সঙ্গে গোড়া থেকেই যুক্ত হন। এ বিষয়ে তাঁর একটি রিপোর্ট অন্তত ১২ বছর আগে তাঁর কাছ থেকেই সংগ্রহ করেছিলাম। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশ তখনই ন্যায়পরায়ণতার সংশোধনী আনে এবং এর সপক্ষে লবি শুরু করে। ওই সম্মেলনে ২৩ জুন ১৯৭৭ আমাদের প্রস্তাবের ওপর ২৮টি দেশ আলোচনায় অংশ নেয়। প্রথম বক্তা সৌদি আরব বলেছিল, বাংলাদেশের উপকূলের যে অনন্য বৈশিষ্ট্য, সেটা বিশ্বের বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তার প্রস্তাব ন্যায্য ও যুক্তিসংগত। ইরান, বাহরাইন, তুরস্ক, সিরিয়া, বেলজিয়াম, রোমানিয়া, সোমালিয়া, মরক্কো, কাতার, সেনেগাল, আলজেরিয়া, ইয়েমেন, যুগোস্লাভিয়া ও ফিলিপাইন সমর্থন দেয়।
পাকিস্তান বলেছিল, বাংলাদেশের প্রস্তাব সুষ্ঠু ও ন্যায্য। ৫০টি দেশ তা সমর্থন করেছে, তাই সমুদ্র আইনে এর ঠাঁই পাওয়া উচিত। মিসর বলেছিল, এটা আইনানুগ ও ন্যায্য। গাদ্দাফির লিবিয়া ‘উষ্ণ সমর্থন’ দেয়। আফগানিস্তান বলেছিল, বাংলাদেশের সমস্যা ব্যতিক্রমী। তাদের সংশোধনী প্রস্তাব আইনে অন্তর্ভুক্ত হোক।
১৪তম বক্তা ছিল ভারত। ভারতীয় প্রতিনিধি বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তাদের প্রস্তাব পরীক্ষা করে দেখব। তবে ভারতের এ মুহূর্তে দুটি আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের শর্তে বেজলাইন স্থির করা হলে তা সমুদ্রসীমা ও ইইজেড নির্ধারণে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু মিয়ানমার নীরব থাকে।
এই সম্মেলনে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো বেশি সরব ছিল। বার্বাডোজ বলেছিল, বাংলাদেশ অবিরাম পাললিক ক্ষয়সাধন সমস্যায় ভুগছে। তাদের প্রস্তাব আইনকে আরও উন্নত করবে। মালটা, বাহামা ও সেনেগাল শুধু সমর্থনই নয়, তারা আমাদের পক্ষে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছিল। ইন্দোনেশীয় প্রতিনিধি হাস্যরস সঞ্চার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মাননীয় চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের সংশোধনী বিশাল সমর্থন লাভ করেছে। আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিন। তাদের প্রস্তাব ইতিমধ্যে মতৈক্য সৃষ্টি করেছে।’ এর পরই হাসির রোল। আমাদের রাষ্ট্রদূত কে এম কায়সার সম্মেলনে বলেছিলেন, অন্যের স্বার্থ ক্ষতি করে নয়, বাংলাদেশের চাওয়া হলো, তাকে যেন প্রকৃতির কারণে খেসারত দিতে না হয়। ‘তালাবদ্ধ’ হতে না হয়।
সেদিন সম্মেলনকক্ষে কেউ প্রত্যক্ষভাবে আমাদের বিরোধিতা করেনি। কিন্তু আমরা লক্ষ করি, জাতিসংঘের দ্বিতীয় কমিটির ওই অধিবেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন ভেনেজুয়েলীয় আইনবিদ ও কূটনীতিক আন্দ্রেজ আগিয়্যার। পরে তিনি আন্তর্জাতিক কোর্ট অব জাস্টিস আইসিজের বিচারক হন। তিনি যেন আমাদের প্রতি নারাজ ছিলেন। রাষ্ট্রদূত কায়সারকে পরে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য সমুদ্ররাষ্ট্রও বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি।’ তখন তাঁকে বলা হয়, কেউ কিন্তু বিরোধিতাও করেনি। এ সময় আগিয়্যার বলেন, বৈঠক শেষে ফ্রান্সের প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং একান্তভাবে বাংলাদেশের অবস্থানের বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, ফরাসি প্রতিনিধি তাঁকে বলেছেন, প্রকাশ্যে তাঁরা আপত্তি তোলেননি। কারণ, বাংলাদেশকে তাঁরা বিব্রত করতে চান না। বাংলাদেশ এমন দাবি করেছে, যা মেনে নেওয়া হলে বহু দেশ তাদের অনন্য উপকূলীয় বৈশিষ্ট্যের কথা বলে সমুদ্র গলাধঃকরণের মওকা পাবে।
আগিয়্যার আরও বলেছিলেন, সমর্থক দেশগুলোর ১৬টিই ইসলামি। আর তাদের সমর্থন অনেকটা রাজনৈতিক ধাঁচের। তিনি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে এমনও বলেছিলেন, স্পেন যখন প্রস্তাব নিয়ে এল, তখন লাতিন আমেরিকান দেশগুলো সমর্থন দিতে দ্বিধা করল না।
আগিয়্যার বলেছিলেন, ‘ভারতীয় আপত্তি অগ্রাহ্য করা যায় না। সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রিয়া যদিও বলেছে তারা প্রস্তাব সমর্থন করবে, কিন্তু একই সঙ্গে তারা বলেছে যে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থ সুরক্ষা বিবেচনায় নিতে হবে। সুতরাং, তারা শর্তযুক্ত সমর্থন দিয়েছে। উপরন্তু চীন তার “নীতিগত সমর্থন” বলতে কী বুঝিয়েছে, তা তারা ব্যাখ্যা করেনি। একইভাবে বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো তাদের সমর্থনের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ দেখায়নি।’
মোস্তাফা কামাল লিখেছিলেন, ‘মনে হচ্ছে আগিয়্যার বাংলাদেশের জন্য ঝামেলা পাকাতে পণ করেছেন।’ আগিয়্যার অবশ্য দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর একটি হচ্ছে, শীর্ষ সমুদ্ররাষ্ট্র ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাংলাদেশকে বৈঠকে বসা। দ্বিতীয়ত, খসড়া আইনে ভারতীয় আপত্তিসহ বাংলাদেশের সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করা। এর একটিতেও বাংলাদেশ রাজি হয়নি। এরপর যখন খসড়া প্রকাশ পেল, তখন দেখা গেল, সেখানে বাংলাদেশের সংশোধনী অনুপস্থিত। মোস্তাফা কামাল লিখেছিলেন, ‘এটা দেখে আমরা বেদনাহত হয়েছিলাম, কিন্তু বিস্মিত ছিলাম না।’
তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ১৯৮২ সালের আইনে ন্যায়পরায়ণতার বিধান টিকে যায় এবং আজ আমরা তার ফল পাই। স্পেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সমদূরত্ব নীতির বিরোধিতা করেছিল। মোস্তাফা কামাল লিখেছেন, ‘আমরা ব্যাপক অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিলাম, যাতে সমদূরত্ব নীতি সমালোচিত হয়েছিল এবং কেবল ন্যায়পরায়ণতার নীতি সবচেয়ে নিরাপদ বিবেচিত হয়েছিল।’ তাই ২০১২ সালে বড় জয়টা হলো ’৭৭ সালের আমাদের উল্লিখিত নীতিগত অবস্থান নাকচ করা হয়নি, সমর্থিত হয়েছে। রায়ের ৩২৫ অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘ট্রাইব্যুনাল তাই বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা যেখানে তার অবতলতার জন্য কাটা পড়ছে (আগে উল্লিখিত ‘তালাবদ্ধ’ অবস্থা) তা এড়াতে সমদূরত্ব নীতি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিল। আদালত স্থির করলেন, একটি ন্যায়সংগত সমাধান দরকার।’
ইটলস রায় ও মিয়ানমারের সংসদে দেওয়া বিবৃতিতেও আমরা তার স্বীকৃতি পাই। ইটলসে মিয়ানমারের এজেন্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ড. তুন শিন গত ২২ মার্চ মিয়ানমারের সংসদে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, ‘আদালত বাংলাদেশের উপকূলের ভৌগোলিক অবতলতা বিবেচনায় নিয়েছেন। তাঁরা মিয়ানমার বা বাংলাদেশের দাবি করা সমুদ্রসীমারেখার কোনোটিই গ্রহণ করেননি।’
তবে লক্ষণীয়, দুই দেশের উপকূলের আয়তনের অনুপাতে জলসীমার বণ্টন সমন্বয়কে উভয়ের জন্য ‘ন্যায্য ও সুবিচারপূর্ণ’ উল্লেখ করেও ড. শিন তথ্য দেন যে বাংলাদেশ বেশি সমুদ্র এলাকা পেয়েছে। তাঁর কথায়, ‘বাংলাদেশ ৬৯ হাজার ৭১৭ বর্গ কিলোমিটার দাবি করেছিল। ইটলসের সিদ্ধান্তের সীমারেখা অনুযায়ী তারা পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গ কিলোমিটার, যা ৪১ হাজার ৯১৪ বর্গ কিলোমিটার বেশি।’ (সূত্র: নিউ লাইট অব মিয়ানমার, ২৩ মার্চ, ২০১২)। আমাদের উক্ত দাবি ছিল মূলত পদ্ধতিগত কারণে। বর্মী ভাষায় প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক সাময়িকী ১৬ মার্চ সংখ্যায় আমাদের লাভবান হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য, সমদূরত্বের নীতি টিকে গেলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারও ছাড়াত না।
ম. ইনামুল হকের ওই নিবন্ধ বেশ জীবাণু ছড়িয়েছে। তিনি রায়ের ৪৭১ অনুচ্ছেদের ভুল অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেন। ট্রাইব্যুনাল বলেননি যে ‘বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানের (সিএস) যে দাবি করেছে, তা মিয়ানমারের ২০০ নটিক্যাল মাইল ইইজেড।’ সেন্ট মার্টিনে ১২ নটিক্যাল মাইল পাওয়ার পরও তাকে পরাজয় বলা তাঁর ধারণাগত ভুল।
আসলে আমরা আদালতের বদান্যতা কিংবা প্রজ্ঞায় সাগরে ‘তিনবিঘা করিডর’-এর কবলে পড়া থেকে বেঁচে গেছি। বাংলাদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইল মানে যেখানে শেষ, সেখান থেকে আমাদের আউটার মহীসোপান অর্থাৎ গভীর সমুদ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ, মিয়ানমারের ২০০ নটিক্যাল মাইলের সমুদ্রসীমা পথ আগলায়। এতে দ্বৈত অবতলগত সংকট সৃষ্টি হয়। সে কারণে গভীর সমুদ্রেও আমরা দ্বিতীয়বার ‘তালাবদ্ধ’ অবস্থায় পড়ি। আদালত তাই একধরনের করিডর সৃষ্টি করেন, নামকরণ করেন ‘ধূসর এলাকা’। এর মাছ খাবে মিয়ানমার, তলদেশের খনিজ তুলবে বাংলাদেশ।
মিয়ানমারের আপত্তি সত্ত্বেও ২০০ নটিক্যাল মাইলের পরে বাংলাদেশের আউটার মহীসোপানের সূচনা তিরচিহ্ন দিয়ে ইটলস নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। জগৎশীর্ষ সমুদ্র আইনবিশারদ কেমব্র্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস ক্রফর্ড (এ মুহূর্তে হেগের আদালতে কাশ্মীরের কিষাণগঙ্গা নদী মামলায় ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের মুখ্য কৌঁসুলি) আমাকে নিশ্চিত করেন যে বাংলাদেশের অনুকূলে আদালতের এ সিদ্ধান্তের কোনো তুলনা নেই। ওই ‘ধূসর এলাকা’ পেরিয়ে আমরা অবাধে আউটার মহীসোপানে যাতায়াত করতে পারব। উল্লেখ্য, চূড়ান্ত আউটার মহীসোপান-সীমা ঠিক করবে জাতিসংঘের কমিশন। মিয়ানমারের অ্যাটর্নি জেনারেল এর সুরাহা ২০৩৬ সালের আগে মিলবে না বলে সংসদকে জানান। তাই মহীসোপানের বিশাল এলাকা বিসর্জনের দাবি উদ্ভট।
আর কাল্পনিক ও আইনত এখতিয়ারবহির্ভূত ‘ব্লক হারানোর’ ঘটনায় পরাজয়ের প্রশ্ন বালখিল্যতা। বিএনপি ভাগ্যিস অ্যান্টার্কটিকায় ব্লক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাহলে অবশ্য আজ তারা বলতে পারত, আওয়ামী লীগ অ্যান্টার্কটিকা বিসর্জন দিয়েছে!
বড় কথা হলো, ইটলস আমাদের সেই রায় দিয়েছে, যাতে উল্লিখিত আগিয়্যার কুলের ন্যায়বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি পরাস্ত হয়েছে।
ভুলত্রুটির সমালোচনা কাম্য, কিন্তু তা যেন আদালত অবমাননার শামিল না হয়। সুপ্রতিষ্ঠিত সমদূরত্ব নীতির বিচ্যুতি বিরল। বিচারক নেলসন, চন্দ্রশেখর ও কট ন্যায়পরায়ণতার নীতি মেনেও তাঁদের খুঁতখুঁতানি চাপা রাখেননি। এক যৌথ ঘোষণায় তাঁরা বলেন, ‘এটা একটা বিষয়কেন্দ্রিক রায় হলো। উপকূলীয় বৈশিষ্ট্য যতই অনন্য হোক, তা বিবেচনায় এক দেশের জন্য ভিন্ন রকম রায় প্রদানের বিপদ কম নয়।’ তাই জয়-পরাজয় মাপতে পানিতে নামার আগে সমুদ্র আইন এবং তার বিচার-আচারের ভেতরকার এসব সূক্ষ্ম বিষয় বুঝতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

সোমবার, ২ এপ্রিল, ২০১২

সমুদ্রসীমা বিষয়ক রায় : কিছু অর্জন, কিছু বিসর্জন



জার্মানির হামবুর্গ শহরে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অব দ্য সি (ITLOS) বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তির রায় প্রদান করে ১৪ মার্চ। ১৫১ পৃষ্ঠাব্যাপী ৫০৬টি অনুচ্ছেদের এই রায়ে বাংলাদেশের জয় হয়েছে বলে প্রচারণা চললেও সত্যতা এই যে, বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমা নিয়ে অনেক ব্যাপারে বাংলাদেশের নীতিগত ও অধিকারগত হার হয়েছে, আবার কিছু ব্যাপারে অর্জনও হয়েছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার নিজেদের মধ্যে বৈঠকে বসে নিজেদের দেশের কন্টিনেন্টাল শেলফ বা মহী সোপানের সমুদ্র সীমানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারেনি। তাই বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য সালিশী আদালতের কাছে বাংলাদেশের নিবেদন ছিল যে, সমুদ্রসীমা বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন UNCLOS III অনুযায়ী সমুদ্রতট থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে (১ নটিক্যাল মাইল=১.৮৫২ কিলোমিটার) মহী সোপানের সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের (ITLOS) এক্তিয়ারে পড়ে (অনুচ্ছেদ ৪১, ৪২, ৪৩)। মিয়ানমার সমুদ্র সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে ITLOS-এর এক্তিয়ার সম্পর্কে সম্মতি জানালেও বলে, বর্তমান ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা ঠিক হবে না (অনুচ্ছেদ ৪৪, ৪৫)। ট্রাইব্যুনাল উভয় দেশের কথা শুনে প্রথমে কন্টিনেন্টাল শেলফের ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে Exclusive Economic Zone (EEZ)-এর সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয় (অনুচ্ছেদ ৪৯, ৫০)।
সমুদ্র তটবর্তী দুটি পাশাপাশি দেশের রাষ্ট্রীয় সমুদ্র বা টেরিটরিয়াল সী বিষয়ে বাংলাদেশ বলে, সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের দক্ষিণে সাগরসীমা নিয়ে ১৯৭৪ ও ২০০৮ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা চুক্তি আছে (অনুচ্ছেদ ৫৭, ৫৮)। মিয়ানমার এতে আপত্তি করে বলে (অনুচ্ছেদ ৬৫) ঐ সমঝোতাগুলো ছিল জাহাজ চলাচল বিষয়ক, সীমানা নির্ধারণের চুক্তি নয়, বা ঐ কাজ যথাযথ কর্তৃপক্ষ দ্বারা হয়নি (অনুচ্ছেদ ৮৩)। ট্রাইব্যুনাল মিয়ানমারের যুক্তির প্রতি সমর্থন জানায় (অনুচ্ছেদ ৯২, ৯৩, ৯৮)। বাংলাদেশ ওই চুক্তির প্রয়োগ সম্পর্কে নানা প্রমাণ দেখালেও (অনুচ্ছেদ ১০১, ১০২, ১০৩) মিয়ানমার তা অগ্রাহ্য করে (অনুচ্ছেদ ১০৭, ১০৮, ১০৯)। ট্রাইব্যুনালও বাংলাদেশের দাবি গ্রহণযোগ্য মনে করেনি (অনুচ্ছেদ ১১৫, ১১৮, ১২৫)। মিয়ানমার বলে, সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ তার স্থলসীমানার (নাফ নদের মুখ) ভেতরে পড়ে, তাই একে পৃথকভাবে দেখা হোক (অনুচ্ছেদ ১৩১, ১৩২)। ট্রাইব্যুনাল মিয়ানমারের যুক্তিকে মেনে নিয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ধরে বাংলাদেশকে উত্তর ও পূর্ব প্রান্তে সমদূরত্ব রেখা এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে সর্বাধিক ১২ নটিক্যাল মাইল টেরিটরিয়াল সির অধিকারই প্রদান করে (অনুচ্ছেদ ৩৩৭)। ফলে বাংলাদেশ সমুদ্রতটের দক্ষিণ সীমানা সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের দক্ষিণ থেকে মূল ভূখন্ডে টেকনাফের কাছে সরে আসে।
বাংলাদেশ তার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন নির্ধারণের জন্য সমদূরত্ব নীতির বিরোধিতা করে প্রাকৃতিক সমুদ্রতল গঠনের বিবেচনায় নায্যতার নীতি গ্রহণের কথা বলে (অনুচ্ছেদ ২১৬)। মিয়ানমার সমদূরত্ব নীতি অবলম্বনের কথা বলে (অনুচ্ছেদ ২১৮, ২২৩)। বাংলাদেশ তার সমুদ্রতট অবতল হওয়ায় নায্যতার প্রয়োজনে EEZ বিভাজন রেখাটি ২১৫ Azimuth বরাবর নির্ধারণ করার দাবি জানায়। (Azimuth বলতে ভূ-পৃষ্ঠের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর উপরে ঘড়ির ঘূর্ণনে সরাসরি উত্তর ০, পূর্ব ৯০, দক্ষিণ ১৮০, পশ্চিম ২৭০, মোট ৩৬০ বৃত্ত বুঝায়)। ট্রাইব্যুনাল নাফ নদের মুখকে সমদূরত্ব রেখা শুরুর বিন্দু সাব্যস্ত করে (অনুচ্ছেদ ২৭২)। বাংলাদেশ UNCLOS III-এর ৭৬.১ ধারার পলিপাতন নীতি দাবি করলেও (অনুচ্ছেদ ২৭৬, ২৭৭) ট্রাইব্যুনাল সমদূরত্বের নীতিই গ্রহণ করে (অনুচ্ছেদ ২৯৩)। বাংলাদেশের দেওয়া বঙ্গীয় সমুদ্রে পলিপাতনের বিবরণ (অনুচ্ছেদ ৩২০) দিলে মিয়ানমার তার প্রতি আপত্তি জানায় (অনুচ্ছেদ ৩২১)। ট্রাইব্যুনাল মিয়ানমারের দেওয়া আপত্তিকে গ্রহণ করে বাংলাদেশের যুক্তি অগ্রাহ্য করে (অনুচ্ছেদ ৩২২)। মিয়ানমার নাফ নদের মুখকে ভিত্তি ধরে ২৩২ Azimuth বরাবর সমদূরত্ব রেখায় এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এলাকা ভাগ করার দাবি জানায় (অনুচ্ছেদ ২৬৮, ২৬৯)। অতঃপর ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের অবতল সমুদ্রতটের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় এনে (অনুচ্ছেদ ২৯৭) সমদূরত্ব রেখাটি ২১৫ Azimuth বরাবর ধরে (অনুচ্ছেদ ৩৩৪) উভয় দেশের ২০০ নটিক্যাল মাইল এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এলাকা ভাগ করে দেয়।
ট্রাইব্যুনাল কন্টিনেন্টাল শেলফ বা মহী সোপান নির্ধারণের ক্ষেত্রে উদ্যোগী হলে মিয়ানমার বলে ২০০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বেই উভয় দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হয়ে গেছে (অনুচ্ছেদ ৩৪৩)। বাংলাদেশ এর প্রতি আপত্তি জানায় (অনুচ্ছেদ ৩৫৪)। UNCLOS III-এর ৭৬ ধারার ৫ উপধারা অনুযায়ী কোনো দেশের মহীসোপানের সীমা ২৫০০ মিটার গভীরতা থেকে ১০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি হতে পারবে না। ৬ উপধারা অনুযায়ী মহীসোপানের সীমা তটরেখা থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত হতে পারবে, তবে পার্শ্ববর্তী দু’দেশের পলিপাতন বিভাজন রেখার খাঁড়ি অতিক্রম করবে না। বাংলাদেশ  UNCLOS III-এর ৭৬.৫ ধারা অনুযায়ী Natural Prolongation-এর যুক্তি দিলে ট্রাইব্যুনাল তা গ্রহণ করে না (অনুচ্ছেদ ৪৩৮, ৪৪১, ৪৪৮, ৪৬০)। ট্রাইব্যুনাল বলে, বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহী সোপানের যে দাবি করে তা মিয়ানমারের ২০০ নটিক্যাল মাইল এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক এলাকা। যেহেতু দুই দেশের ইইজেড এলাকা একে অপরের উপর পড়ছে না সেহেতু ইইজেড ভাগাভাগির প্রশ্নই ওঠে না (অনুচ্ছেদ ৪৭১)। অতঃপর ট্রাইব্যুনাল সমদূরত্ব রেখাটিই ২১৫ Azimuth বরাবর প্রলম্বিত করে উভয় দেশের কন্টিনেন্টাল শেলফ বা মহী সোপান চূড়ান্তভাবে ভাগ করে দেয় (অনুচ্ছেদ ৪৬২, ৫০৫)।
সমুদ্রসীমা বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর তার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এলাকা হারিয়েছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণে Natural Prolongation নীতির বদলে সমদূরত্ব নীতি প্রয়োগ হওয়ায় বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে ১৫০ নটিক্যাল মাইল মহী সোপানের বিস্তীর্ণ এলাকা হারিয়েছে। এই এলাকায় বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ২০টি গভীর সমুদ্র ব্লকের ডিএস-০৮-১৮, ডিএস-০৮-২২, ডিএস-০৮-২৩, ডিএস-০৮-২৬, ডিএস-০৮-২৭, ডিএস-০৮-২৮, ব্লক পুরোপুরি এবং ডিএস-০৮-১৩, ডিএস-০৮-১৭, ডিএস-০৮-২১, ডিএস-০৮-২৫ ব্লক আংশিক হাতছাড়া হয়েছে। তাছাড়া সেন্ট মার্টিন্স সংলগ্ন অগভীর ১৮নং ব্লকটির কিছু এলাকাও হাতছাড়া হচ্ছে।

সমুদ্রসীমা নির্ধারণই প্রাপ্তি : বাংলাদেশ হারিয়েছে বেশি : তেল-গ্যাসের ৬টি ব্লক পুরোপুরি ও ৪টি আংশিক হাতছাড়া

মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলার রায়ে বাংলাদেশ হারিয়েছে বেশি। সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়া ছাড়া সবক্ষেত্রেই হেরেছে দেশটি। মিয়ানমারের সব দাবিকেই প্রাধান্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক আদালত। এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের একটি বড় অংশ হারিয়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নির্মিত ছয়টি ব্লক পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে গেছে। আরও চারটি ব্লকের আংশিক পেয়ে গেছে মিয়ানমার। এতে সমুদ্রে সম্ভাব্য তেল-গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ হারাল বাংলাদেশ। ২০০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা
প্রাপ্তির মাঝেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। সেন্টমার্টিন ইউনিয়নকে দেশটির ভূখণ্ডের মূল সীমানার বাইরে ধরেই সমুদ্রসীমার হিসাব করা হয়েছে। টেকনাফকে সর্বশেষ সীমানা ধরে ২০০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশকে।
ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল’ অব দ্য সি (ইটলজ)-এর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তির রায় পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। নদী, সমুদ্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এ রায় পর্যালোচনায় বাংলাদেশের বিশাল হারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমা নিয়ে বেশিরভাগ বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিগত ও অধিকারগত হার হয়েছে। অর্জন কেবল বিরোধ নিষ্পত্তি ও সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়া। ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গ কি.মি. সমুদ্রসীমা প্রাপ্তির গল্পও সঠিক নয়। ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পরই এ পরিমাণ সমুদ্র বাংলাদেশের অধিকারে আসবে। আর ‘না বুঝে হৈ চৈ এবং আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যমে জাতিকে ধোঁকা দেয়ায় সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করে গত ১৪ মার্চ জার্মানির হামবুর্গ শহরে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ১৫১ পৃষ্ঠার রায় দেয়। ৫০৬টি অনুচ্ছেদের এ রায়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দাবি এবং আইনি লড়াইয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। তবে মামলার শুনানিতে উত্থাপিত দু’দেশের যুক্তির ক্ষেত্রে মিয়ানমারের যুক্তি ও দাবিগুলোই রায়ে প্রাধান্য পেয়েছে।
রায়ের ৪৯ ও ৫০ অনুচ্ছেদে দেখা যায়, উভয় দেশের যুক্তি শুনে আদালত প্রথমে মহীসোপানের ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়।
এক্ষেত্রে মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী সেন্টমার্টিন দ্বীপকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ধরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হয়। রায়ের ৩৩৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ সীমানা সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ থেকে সরিয়ে এনে টেকনাফ ধরা হয়। আর সে অনুযায়ী টেকনাফকে দক্ষিণ সীমানা ধরে বাংলাদেশকে উত্তর ও পূর্ব প্রান্তে সমদূরত্ব রেখা এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমদিকে সর্বাধিক ১২ নটিক্যাল মাইল টেরিটরিয়াল সমুদ্রের মালিকানা দেয়া হয়।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করে মিয়ানমারের সঙ্গে ১৯৭৪ ও ২০০৮ সালে সমঝোতা চুক্তি আছে বলে বাংলাদেশ পক্ষের কৌঁসুলিরা যুক্তি তুলে ধরলেও আদালতে তা পাত্তা পায়নি। বরং পাল্টা যুক্তিকে গ্রহণ করে আদালত মিয়ানমারের পক্ষে রায় দেয়।
পলিপাতন বিভাজন রেখার যুক্তিতে বাংলাদেশের মহীসোপানের দাবিটিও গ্রহণ করেনি আদালত। সমুদ্রসীমা আইনের ৫ ও ৬ নং উপধারা অনুযায়ী ‘মহীসোপানের সীমা ২৫০০ মিটার গভীরতা থেকে ১০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি হতে পারবে না। আবার মহীসোপানের সীমা তটরেখা থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত হতে পারবে; তবে পার্শ্ববর্তী দু’দেশের পলিপাতন বিভাজন রেখার খাঁড়ি অতিক্রম করবে না।’ এ যুক্তি তুলে ধরে বাংলাদেশ মহীসোপানের দাবি করলে মিয়ানমারের বিরোধিতায় আদালত তা গ্রহণ করেনি।
এতে বাংলাদেশ সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর তার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এলাকা হারিয়েছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণে ঘধঃঁত্ধষ চত্ড়ষড়হমধঃরড়হ নীতির বদলে সমদূরত্ব নীতি প্রয়োগ করায় বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে ১৫০ নটিক্যাল মাইল মহীসোপানের বিস্তীর্ণ এলাকা হারিয়েছে। এ এলাকায় বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ২০টি গভীর সমুদ্র ব্লকের ১৮, ২২, ২৩, ২৬, ২৭ ও ২৮ ব্লক পুরোপুরি এবং ১৩, ১৭, ২১ ও ২৫ নম্বর ব্লক আংশিক হাতছাড়া হয়ে গেছে।
মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলার রায়ের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, ‘ঘধঃঁত্ধষ চত্ড়ষড়হমধঃরড়হ নীতিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হলে বাংলাদেশের লাভের সুযোগ ছিল। মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী সমদূরত্ব নীতিতে সীমা নির্ধারণ করায় আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্লক হারিয়েছি। এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের ক্ষেত্রেও আমাদের হার বেশি।’ ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গ কি.মি. সমুদ্র প্রাপ্তির সরকারি প্রচারণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পরই উল্লিখিত পরিমাণ সমুদ্র বাংলাদেশের অধিকারে আসবে। আর এজন্য ২০১৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওই মামলায় বাংলাদেশকে জিততে হবে।’
পরিবেশ বিজ্ঞানী, ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রব বলেন, ‘রায়ের পর থেকে আমরা যা বলে এসেছি, তা-ই সঠিক হলো। সমুদ্র জয় তো দূরে থাক, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তিতে আমরা মোটেই লাভবান হইনি। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশের মূল দাবিকৃত বিপুল সমুদ্রাঞ্চল পেয়েছে মিয়ানমার। ফলে মিয়ানমার তার দাবিকৃত মহীসোপানের হাইড্রো-কার্বনসমৃদ্ধ (গ্যাস ও খনিজ তেল) বেশিরভাগ ব্লকের মালিকানা পেয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ দূরবর্তী গভীর সমুদ্রের তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাবনাময় অঞ্চলেই এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের মালিকানা পেয়েছে।’ ড. আবদুর রব বলেন, ‘আমরা যে হেরে এসেছি—এ বিষয়ে এরই মধ্যে তথ্যভিত্তিক লিখেছেন ড. ফেরদৌস কোরেশী, প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকসহ অনেকেই। আর না বুঝে হৈ চৈ এবং আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যমে সরকার জাতিকে ধোঁকা দিয়েছে। এটা ঠিক হয়নি।’
পানি, পরিবেশ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, ‘সমুদ্রসীমা নিয়ে সরকার যা বলছে, তা সঠিক নয়। কালাকানুনের ব্যাখ্যা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারলে এবং গোটা বিষয় বুঝে পদক্ষেপ নিলে আমরা আরও বেশি পেতে পারতাম। তাহলে হেরে এসে মিথ্যাচার করে জাতিকে লজ্জা দিতে হতো না। বিষয়টি নিয়ে আরও স্টাডি করছি। পরে বিস্তারিত বলা যাবে।’