masum khalili/ alamgir alam লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
masum khalili/ alamgir alam লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

হঠাৎ কেন বেলুচিস্তান?

হঠাৎ করে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে উপনীত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটির স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে লাল কেল্লা থেকে দেয়া ভাষণে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত গিলগিট, বাল্টিস্তান, আজাদ কাশ্মির আর বেলুচিস্তানের অধিবাসীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মোদি বলেছেন, তাদের (বিচ্ছিন্নতাবাদী) পক্ষে কথা বলার জন্য তারা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ এটাকে বেলুচিস্তানে অন্তর্ঘাতী কাজের পেছনে যে র’ জড়িত, তার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। 
ভারত বিষয়টিকে এখানেই শেষ করেনি, বরং দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর মোদির চেয়ে অরো এক ধাপ এগিয়ে বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সেখানকার পরিস্থিতিকে ১৯৭১ সালের তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করেছেন। এর মাধ্যমে কার্যত তিনি বেলুচিস্তানের কথিত স্বাধীনতা অর্জনের প্রচেষ্টার প্রতি পরোক্ষ সমর্থন জানিয়েছেন। এর পরপরই নয়াদিল্লি সফররত বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু নরেন্দ্র মোদির অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বেলুচিস্তানের ব্যাপারে বাংলাদেশ তার অবস্থান ব্যক্ত করে একটি নীতিগত বিবৃতি প্রকাশ করবে বলে দিল্লিতে বসেই ঘোষণা দিয়ে এসেছেন। আর এ সময়টাতে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই মোদির দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি কতটা গভীর। এ ব্যাপারে মার্কিন প্রতিক্রিয়াটিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। তবে সেখানে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। 
এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের বক্তব্য হলো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কাশ্মিরের উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে আড়াল করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরাতে এই নতুন ইস্যু নিয়ে এসেছেন। কাশ্মিরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। এ ব্যাপারে রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত প্রস্তাব। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ও আফগানিস্তানের কারজাইয়ের সমর্থনে ভারত যে বেলুচিস্তানকে আন্তর্জাতিক ইস্যু বানাতে চাইছে, সেটি পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। বেলুচিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরফরাজ বুগতিও এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি সরাসরি সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করছেন। সংলি ও খালিদ সামরিক ঘাঁটিতে সাম্প্রতিক হামলা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর উদ্যোগকে ব্যাহত করার জন্য বিভিন্ন সময়ে চালানো অন্তর্ঘাতী তৎপরতার জন্য তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র’কে দায়ী করেছেন। 
গত বছর অক্টোবরে পাকিস্তান বেলুচিস্তানে ভারতের অন্তর্ঘাতী তৎপরতার বিভিন্ন প্রমাণ জাতিসঙ্ঘে উপস্থাপন করেছে। গত মার্চে র-এ কর্মরত একজন নৌবাহিনী কর্মকর্তা কুলভূষণ যাদবকে আটক করে পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনী। তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও বেলুচিস্তানে ভারতের অন্তর্ঘাতী তৎপরতায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে ইসলামাবাদ। এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর রেকর্ডে করাচি, বেলুচিস্তান, গোয়াদর সমুদ্রবন্দর এলাকা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর-কেন্দ্রিক বিভিন্ন অন্তর্ঘাতী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়। ভারত অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কুলভূষণ এখন আর ভারতের নৌবাহিনীতে কর্মরত নেই। 
বেলুচিস্তান ইস্যুতে মানবাধিকার ও নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ্যে বলা হলেও সেখানে নির্মিত বৃহৎ সমুদ্রবন্দর গোয়াদর এবং ৪৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগপুষ্ট চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের বিষয়টি মূল ফোকাস হিসেবে উঠে এসেছে। ভারত শুরুতেই এ ব্যাপারে বিরোধিতা করে এসেছে এই বলে যে, এই করিডোর ‘বিতর্কিত’, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের ওপর দিয়ে গেছে। এটিই বেলুচিস্তান ইস্যুতে নতুন ঘটনাপরম্পরায় চীনকে সরাসরি সম্পৃক্ত করেছে। বেইজিং বেলুচিস্তানের ব্যাপারে মোদির মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। বেলুচিস্তানকে অস্থিতিশীল করে তোলা কাশ্মিরের উত্তপ্ত হওয়ার বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার প্রয়াস বলেও চীনের প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। বেইজিং সরকারিভাবে বলেছে, চীন ও পাকিস্তান দুই দেশের জনগণেরই এই প্রকল্পের ব্যাপারে ব্যাপকভিত্তিক সমর্থন রয়েছে। এর বাস্তবায়নের ব্যাপারে চীন সর্বতোভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুই দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের সংযোগ এবং বাস্তবমুখী সহযোগিতা জোরদার করতে এ ব্যাপারে ঐকমত্যের অনেক বড় তাৎপর্য রয়েছে। এখন চীন ও পাকিস্তান করিডোরের পূর্ণ বাস্তবায়নের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দুই দেশ অর্থনৈতিক করিডোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে এর সুবিধা ছড়িয়ে দিতে চায়। এর নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনীর পূর্ণ সামর্থ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে চীন। 
চীনের এ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে মনে হচ্ছে, বেলুচ ইস্যুটিকে ভারত সামনে নিয়ে আসতে চাইলে তা বহুমাত্রিক রূপ নিতে পারে। বেলুচিস্তানে অস্থিরতা সৃষ্টির অর্থ শুধু পাকিস্তানকে অস্থির করে তোলাই নয়, একই সাথে তা চীনের ওপর আঘাত হানারই শামিল হবে বলে মনে করছে বেইজিং। এটি চীন-ভারত সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে বলে বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক সুপ্ত বার্তা রয়েছে। এর অর্থ হলো ভারতে যে বিপুল চীনা বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে যৌথ অর্থনৈতিক উদ্যোগ রয়েছে, তা এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ-প্রবণ অঞ্চলগুলো হয়ে উঠতে পারে আবার অস্থির। এ কারণে চীনের এ প্রতিক্রিয়াকে দিল্লির বিশ্লেষকেরা অনেক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেকে মোদির নতুন অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে বলেও মন্তব্য করছেন।
মোদি এবার স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে যে কথা বলেছেন, সেটি আকস্মিক কোনো বক্তব্য ছিল বলে মনে হয়নি। তিনি নয়াদিল্লিতে এর আগে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সংসদীয় সভায়ও বলেছেন, এখন সময় এসেছে যখন বেলুচিস্তান গিলগিট-বাল্টিস্তান ও আজাদ কাশ্মিরের জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের চালানো দমন-নিষ্পেষণের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে। মোদির সামনে কাশ্মিরের ব্যাপারে এমন দু’টি তাৎক্ষণিক সঙ্কট রয়েছে, যেগুলো মোকাবেলা করা তার জন্য এখন বেশ জটিল। এর একটি হলো কাশ্মিরি তরুণ যোদ্ধা ওয়ানির হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে যে প্রচণ্ড উত্তপ্ত অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না। ভারতের নিরাপত্তাবাহিনী এ ব্যাপারে যে দমনমূলক পন্থা নিয়েছে, তাতে পরিস্থিতি অধিকতর অবনতির দিকেই যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কাশ্মিরের এই পরিস্থিতি এই ইস্যুটির সমাধানের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেয়ার দাবি জোরালো করার সুযোগ এনে দিয়েছে পাকিস্তানের সামনে। 
বেলুচিস্তান নিয়ে মোদির বক্তব্যের পর পাকিস্তানে ভারতবিরোধী জনমত অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়ে গেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বেলুচ পরিস্থিতিকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাথে তুলনা করার ফলে পাকিস্তানিদের মনে পুরনো ‘বিচ্ছিন্নতা’বাদের দৃশ্যপটই ভেসে উঠেছে। ফলে যারা বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কিছু জাতীয়তাবাদী দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তারাও এখন ভিন্ন অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক আইনসভা সর্বসম্মতিক্রমে মোদির মন্তব্যের নিন্দা করে প্রস্তাব পাস করেছে। 
বেলুচিস্তানকে কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বাছাই করা হচ্ছে, সেটি একটি প্রশ্ন। বেলুচিস্তানের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৯৪৭ সালের আগস্টে স্বাধীনতা লাভের পরপরই চিফ কমিশনারের অধীনে যে বেলুচিস্তান প্রদেশ ছিল, তা পাকিস্তানে যোগ দেয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে কালাত অঞ্চল শর্তসাপেক্ষে পাকিস্তানে যোগ দেয়। ১৯৫২ সালে চারটি অঞ্চল মিলে বেলুচিস্তান স্টেট ইউনিয়ন গঠন করা হয়। গোয়াদর ছিটমহল তখনো ওমানের একটি অংশ ছিল। পাকিস্তান সেটি ১৯৫৮ সালে ওমানের সুলতানের কাছ থেকে কিনে নিয়ে বেলুচিস্তানের অংশ করে নেয়। 
পাকিস্তানের ৪৪ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত এই প্রদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তান, দক্ষিণ-পশ্চিমে ইরান, উত্তর-পূর্বে পাকিস্তানের পাঞ্জাব এবং দক্ষিণ-পূর্বে খায়বার পাখতুন খোয়া ও ফেডারেল নিয়ন্ত্রিত এলাকা সিন্ধুর অবস্থান। এর দক্ষিণে রয়েছে আরব সাগর। বেলুচিস্তানের সাথে নৌসীমান্ত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার। বেলুচিস্তানের অবস্থান কৌশলগত পানিপথ, ইরানে হরমুজ প্রণালীর মুখে। এটি হলো মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার সংক্ষিপ্ততম পথ। তদুপরি, বেলুচিস্তান হলো উত্তোলনযোগ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসম্পদের সমৃদ্ধ মজুদ ক্ষেত্র। এখান থেকে পাকিস্তানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের বড় মজুদ এবং পরীক্ষাগার এখানে রয়েছে বলে মনে করা হয়। 
এক কোটি ৩১ লাখ জনসংখ্যা-অধ্যুষিত প্রদেশ বেলুচিস্তানে যখনই বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা চাঙ্গা হয়েছে, তখনই অর্থনৈতিক দুর্দশা নেমে এসেছে। ১৯৭০-এর দশকে অন্য এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হলেও পিছিয়ে পড়ে বেলুচিস্তান। এ সময়ে বেলুচিস্তানের আয় জিডিপির ৪.৯ শতাংশ থেকে ৩.৭ শতাংশে নেমে আসে। দারিদ্র্যের হারেরও এ সময় অবনতি লক্ষ করা যায়। ২০০১-০২ সালের ৪৮ শতাংশ দারিদ্র্য ২০০৫-০৬ সালে ৫০.৯ শতাংশে পৌঁছে যায়। এ অবস্থার উন্নয়নের জন্য যখনই বাজেট বরাদ্দ ও সম্পদপ্রবাহ বাড়ানো হয়েছে তখন বিচ্ছিন্নতাবাদী বা উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারণার মাধ্যমে এর গতি রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। গোয়াদর বন্দর নির্মাণ, অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং বিপুল বিনিয়োগে দু’টি হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি প্রজেক্ট নির্মাণের উদ্যোগের ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা বেলুচিস্তানে। কিন্তু এসবের ব্যাপারে নানাভাবে বিরূপ প্রচারণা চালানো হয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষ থেকে। 
একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে আপাত শান্ত বেলুচিস্তানকে পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক আলোচনার পাদপ্রদীপে নিয়ে আসা হয়ে থাকতে পারে। পাকিস্তানের খনিজসম্পদে সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ, বেলুচিস্তানের প্রতি ভারতের দৃষ্টি অনেক আগে থেকেই। তাদের সামনে পাকিস্তানকে বিভাজিত করার যে মহাপরিকল্পনা, তাতে দেশটির পূর্বাংশের পর ছিল এই বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশÑ যার এখন খায়বার পাখতুন খোয়া হিসেবে নতুন নামকরণ করা হয়েছে। 
ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা র-এর একজন সাবেক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বি. রমণ তার লেখা ‘কাউ বয়েজেস অব র’ শীর্ষক বইয়ে এটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালে আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে যে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল, তার মূল কারণ বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়াকে ঠেকানো ছিল না। এটি ছিল আসলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যাতে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের পর বেলুচিস্তান বা সীমান্ত প্রদেশের নতুন প্রকল্পের দিকে না আগান, তার জন্য হুঁশিয়ারি সঙ্কেত। ইন্দিরা গান্ধী এ ব্যাপারে ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করার পর সপ্তম নৌবহর কোনো ধরনের অপারেশন ছাড়াই বঙ্গোপসাগর ত্যাগ করে চলে যায়। 
র-এর এই শীর্ষ কর্মকর্তার ইঙ্গিত অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছে। কিন্তু সে সময় আমেরিকার বলয়ে থাকা পাকিস্তানের অধিকতর বিখণ্ড হওয়া কামনা করেনি। পাকিস্তান-সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধের আড়াই দশক পর আজ বিশ্বে সে অবস্থা আর নেই। নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারত অধিকতরভাবে আমেরিকান বলয়ের সাথে একাত্ম হয়েছে। অন্য দিকে, পাকিস্তান চীনের সাথে বন্ধন জোরালো করার সাথে সাথে রাশিয়ার সাথে সামরিক ও অন্যান্য সম্পর্ক গড়ার দিকে মনোযোগী হয়েছে। 
বেলুচ অঞ্চলের বড় অংশটি এখন পাকিস্তানে। এর কিছু অংশ রয়েছে ইরান ও আফগানিস্তানে। বেলুচিস্তানকে যারা স্বাধীন করতে চায়, তারা এই পুরো বেলুচ অঞ্চলকে একটি আলাদা রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। ২০০৬ সালে আমেরিকান ডিফেন্স জার্নালে এবং এর পরে আটলান্টিক সাময়িকীতে মধ্যপ্রাচ্যের যে পরিবর্তিত মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে পুরো বেলুচ অঞ্চলকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখানো হয়। 
পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সাথে স্থলসীমান্ত রয়েছে ইরান ও আফগানিস্তানের। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতায় সমর্থন দিতে হলে ভারত বা আমেরিকাকে অবশ্যই এই দুই দেশের কোনোটিকে ব্যবহার করতে হবে। ইরান কোনো সময়ই পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেয়নি। ইরানের বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে। কিন্তু পাকিস্তানের ব্যাপারে এই অভিযোগ নেই। ইরানের সাথে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অতীতকাল থেকেই ভালো। ইরান তার চাবাহার বন্দর উন্নয়নের কাজ ভারতকেই দিয়েছে। কিন্তু এই বন্দরকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ তেহরান দেবে বলে মনে হয় না। এর প্রতিক্রিয়া ইরানের ওপর কতটা কিভাবে পড়বে, সে হিসাব ইরান করবে। 
অন্য দিকে আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের অবসানের পর থেকে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট হয়ে নানা ক্ষেত্রে দিল্লি আফগানিস্তানে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করে এসেছে। এই প্রচেষ্টায় যতটুকু ফল এসেছে, তাতে আফগানিস্তানের ভূখণ্ড পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। 
তবে এ কথা ঠিক যে, বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটি শক্তিশালী গ্রুপ রয়েছে। ওদের গোত্রভিত্তিক কিছু সমর্থনও রয়েছে। কিন্তু এর সাথে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের আলাদা হওয়ার ব্যাপারে জনগণের ব্যাপকভিত্তিক যে সমর্থন ছিল, তার কোনো তুলনা করা যায় না। আর ভারত বাংলাদেশকে এই ইস্যুতে সম্পৃক্ত করে এর একটি আঞ্চলিক রূপ দিতে চাইছে। তথ্যমন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মূল শাসক দলের অংশ না হওয়ায় তার বক্তব্য কতটা সরকারের বক্তব্য, সেটি স্পষ্ট হচ্ছে না। এই ইস্যুতে ভারতের সাথে একাত্ম হলে বর্তমান সরকার রাজনৈতিকভাবে ভারতের অধিক পৃষ্ঠপোষকতা হয়তো পেতে পারে, যা সরকারের ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে কিছুটা সহায়কও হতে পারে। কিন্তু এর সাথে যেভাবে চীন যুক্ত হয়ে পড়েছে, তাতে বাংলাদেশ এর সাথে বেশি জড়াতে চাইলে নিজের ঘরে সঙ্কট অবস্থা ডেকে আনবে কি না সে সংশয়ও রয়ে গেছে। বর্তমান জটিল বিশ্বপরিস্থিতিতে চীন-রাশিয়া যে অক্ষ তৈরি হয়েছে, তাদের প্রতিপক্ষে ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হতে পারবে, তা নিয়ে নানামুখী সন্ত্রাস রাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে সরকারেরও সংশয় থাকাই স্বাভাবিক। 
ফলে শেষ পর্যন্ত বেলুচিস্তানের ইস্যুটি ইরান ইরাক তুরস্ক ও সিরিয়ার কুর্দ এলাকা নিয়ে আলাদা কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠার মতো একটি জটিল ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে প্যান্ডোরার বাক্স খোলার মতো বিষয়, যার জের ধরে একের পর এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে থাকবে এশিয়াজুড়ে। এই ইস্যুর বড় ঝুঁকি এখানেই। 

শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৫

‘নোংরা যুদ্ধের’ কৌশলে বেপরোয়া রক্তক্ষয়

স্নায়ুযুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরকে মোকাবেলা করার জন্য ডার্টি ওয়ার বা নোংরা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করত। এই কৌশল দুই পরাশক্তি প্রত্যক্ষভাবে যেমন গ্রহণ করত তেমনিভাবে তাদের সমর্থনপুষ্ট ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রো-এশিয়ার বিভিন্ন সরকারকে প্রতিপক্ষ দমন বা নির্মূল করতে মদদ দিতো। এ ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনয়নের চেয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল অনেকখানি এগিয়ে। তবে কমিউনিস্ট বলয়ের অতিনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে তাদের নোংরা যুদ্ধ কৌশলের খবর মুক্তবিশ্বে কমই আসত। আবার যা কিছু প্রকাশ পেতো তা পাওয়া যেত প্রোপাগান্ডার মোড়কে। ফলে প্রকৃত ঘটনা থেকে যেত অনেকটাই আড়ালে। এই নোংরা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ৫০, ৬০ ও ৭০-এর থেকে আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, চিলি, প্যারাগুয়ে, পেরু ও উরুগুয়েতে বেশি। আফ্রো-এশিয়াতেও কম বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে একই ধরনের। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাংস্কৃতিক বিপ্লব, প্রতিবিপ্লব দমন ইত্যাদি নাম দেয়া হয় এই অভিযানের। অন্যান্য দেশের মধ্যে ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন প্রসেস, অপারেশন কলম্বো, অপারেশন চার্লি, অপারেশন গ্লাডিয়ো, নাইট অব দ্য পেন্সিলস, অপারেশন ইন্ডিপেন্ডেন্স, এজেইজা ম্যাসাকার, মারগারিয়া বেলেন ম্যাসাকার, ডেথ ফ্লাইটস, ডিসাপারেসিডোস (গুম, অপহরণ) ইত্যাদি নামে এ ধরনের অভিযান চলেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে এখন চলছে সেই নোংরা খেলাই। মিসর, সিরিয়া, ইসরাইল, লিবিয়া, ইয়েমেন, ইরাক-- কোনো দেশই এই খেলার রক্তক্ষরণ থেকে মুক্ত নয়। বিস্ময়করভাবে এক দেশের ঘটনার সাথে আরেক দেশের ঘটনার অদ্ভুত মিল লক্ষ করা যায়। মিসরে সিসি শাসনে যা ঘটছে, তার সাথে মিল লক্ষ করা যায় বাংলাদেশের ঘটনা পরম্পরায়।

পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সবাই একই মাত্রায় নোংরা খেলার কৌশল গ্রহণ করেনি। সোভিয়েতবলয়ের দেশগুলো এটিকে ‘সাম্রাজ্যবাদের’ কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করে এর দায় চাপানোর চেষ্টা করত আমেরিকার ওপর। কিন্তু স্টালিন বা মাও সেতুংয়ের আমলে তারা নিজ দেশে ভিন্ন মতাবলম্বী অথবা নিজ দলের প্রতিপক্ষ দমনে যে নোংরা খেলার কৌশল অবলম্বন করেছে, তা মাত্রার দিক থেকে কোনো অংশে কম নয়। সোভিয়েত সমর্থনপুষ্ট পূর্ব ইউরোপ কিংবা হাফিজ আল আসাদের সিরিয়া এবং সাদ্দাম হোসেনের ইরাকে নির্মমভাবে নোংরা খেলার কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার উত্তর কোরিয়া এ ক্ষেত্রে এখনো পুরনো ঐতিহ্যের ধারাতেই চলছে। উত্তর কোরীয় নেতা কিম তার আপন ফুপাকে কুকুর দিয়ে কামড়িয়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করেছেন, যিনি ক’দিন আগ পর্যন্ত তার ও তার পিতার প্রশাসনের প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকায় ছিলেন। 

নোংরা যুদ্ধের কৌশলকে পরাশক্তি বা আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি যুদ্ধ হিসেবেও অনেক সময় চিহ্নিত করা হয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের পর পাকিস্তানের সহায়তায় আফগানদের প্রশিক্ষিত করে রুশ বাহিনীর বিতাড়নে মূল ভূমিকা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এ জন্যই ওসামা বিন লাদেনের ‘আলকায়েদা’ গঠিত হয়। পরে তাদের সমর্থনে আফগানিস্তানে তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো। নাইন-ইলেভেনের বোমা হামলার পর সেই আলকায়েদা ও তালেবানকে এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে মিত্রদের সাথে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়ে তালেবান শাসনের অবসান ঘটায়। এ ঘটনার পথ ধরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এক বিরাট অঞ্চলে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যাতে এখনো নির্বিচারে মৃত্যুবরণ করছে দু’দেশের নাগরিকেরা।

আলকায়েদার কথা এখন আর শোনা যায় না। এখন নতুন শক্তির অভ্যুদয় ঘটেছে আইএস বা আইসিস নামে। খোলা জিপ বা ভ্যানে চড়ে মেশিনগান উঁচিয়ে যেভাবে তারা ইরাক ও সিরিয়ার বিরাট অঞ্চল দখল করে একধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে তা অনেকটাই বিস্ময়কর। আন্তর্জাতিক শক্তি চাইলে তাদের অঙ্কুরেই যেখানে দমন করা সম্ভব ছিল, সেখানে নানাভাবে তাদের শক্তি সঞ্চয় করতে এবং প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করা হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার দেশে দেশে সন্ত্রাসী হামলাসহ যত অঘটন ঘটছে, সব কিছুর দায় শিকার করছে আইএস। আর সাথে সাথেই এসব দেশের মুসলমানদের ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের খড়গ ও নিপীড়ন। প্যারিসে হামলার পর ফ্রান্সের শত শত মসজিদ বা নামাজের ঘর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবার। একই ধরনের ঘটনা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও আমেরিকায় ঘটছে। এসবের সাথে সেই পুরনো নোংরা খেলার যোগসূত্র দেখতে পাচ্ছেন অনেক বিশ্লেষক।

ডার্টি ওয়ার কেন, কিভাবে?
ডার্টি ওয়ারের কৌশল মূলত ক্ষমতাধর দেশগুলো তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে গ্রহণ করে থাকে। সংশ্লিষ্ট দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এই খেলা চালানো হয়। আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের বৈধ যোগাযোগ পদ্ধতি হলো কূটনৈতিক সম্পর্ক। ভিয়েনা কনভেনশন ও জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন রীতি অনুসারে এই সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে থাকে। এর বাইরে প্রতিটি দেশই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য গোয়েন্দা সংস্থা সৃষ্টি করে থাকে। এ ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার আকার ও কাঠামো নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সামর্থ্যরে ওপর।

অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা কার্যক্রম স্ব স্ব দেশের আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। সরকারের ধরনের ওপর অবশ্য নির্ভর করে লক্ষ্য অর্জনের জন্য আইনবহির্ভূত পথ কতটা অনুসৃত হবে সে দেশে। একনায়কতান্ত্রিক শাসনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অপরিমেয় ক্ষমতা দেয়া হয়। এটি শুধু সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে দেখা যায়নি, যেকোনো একনায়ক বা রাজতন্ত্র শাসিত দেশেও তা লক্ষ করা যায়।

রাষ্ট্রের বাইরে কূটনৈতিক নিয়মবহির্ভূত গোয়েন্দা কার্যক্রম অন্য দেশে চালানো আইনের দ্বারা বৈধ নয়। এ কারণে বিভিন্ন কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক পরিচয়ের মোড়কে এ কার্যক্রম চালানো হয়। কোনো কোনো দেশে মানবাধিকার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অথবা মিশনারী প্রতিষ্ঠানের আদলেও গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম চলতে থাকে। প্রতিটি রাষ্ট্রই ভিন্ন পরিচয়ে গোয়েন্দাকার্যক্রম চালানোর ব্যাপারে অবহিত। অনেক সময় আবার এ ধরনের কার্যক্রমে অঘোষিতভাবে পাস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ও চালানো হয়।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের উদ্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক এমনকি কোনো কোনো সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতেও অনুপ্রবেশ করে। রাজনৈতিক দলে অনুপ্রবেশ বা দল গঠনের কাজ ব্যাপকভাবে লক্ষ করা গিয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধকালে। এ সময় বিভিন্ন দেশে মার্কসবাদী ভাবাদর্শে রাজনৈতিক দল গঠন ও আন্দোলন ব্যাপক আকার নেয়। এসব উদ্যোগে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে সারা বিশ্ব থেকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিরা অংশ নিতেন। এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন রাজনৈতিক বা আদর্শগতভাবে তার প্রভাব বিস্তার করে বিশ্বব্যাপী। সোভিয়েত আমলে কেজিবির গোয়েন্দা কার্যক্রমে এর ছিল বিরাট ভূমিকা। সীমিত পরিসরে ষাটের দশক থেকে চীনও বিদেশে তার প্রভাববলয় সৃষ্টির জন্য রাজনৈতিক মতবাদ ছড়িয়ে দেয়ার কৌশল নেয়। একপর্যায়ে আদর্শিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে সারা দুনিয়ায় চীন ও সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের বিপরীতে স্নায়ুযুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্রও রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে গণতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী দলগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল গঠন, নিয়ন্ত্রণ এবং দলকে প্রভাবিত করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে আমেরিকা। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর বাইরে আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের নিজ নিজ প্রভাবাধীন অঞ্চলে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থনৈতিক ও অন্যভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। এসব কার্যক্রমের বড় অংশই চালানো হয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক দিয়ে।

গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ভিন্ন রাষ্ট্রে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক অনুপ্রবেশের একটি বড় উপকরণ বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় বৃত্তি, প্রশিক্ষণ ও সফর কর্মসূচিকে। যে রাষ্ট্রের সামাজিক সাংস্কৃতিক বা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য থাকে, সেখানে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের নানা কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে তা পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দেশে লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজে লাগানো হয়।

বৃহৎ দেশগুলোর দূতাবাসেই কূটনৈতিক পরিচয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কাজ করেন। সংশ্লিষ্ট দেশ এ বিষয়ে অবহিত থাকলেও প্রতিপক্ষ দেশে একই ভূমিকার প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে অথবা শক্তি সামর্থ্যরে অপারগতা বা নির্ভরশীলতার কারণে বাদ প্রতিবাদ করা হয় না। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা বিদ্রোহ সৃষ্টি করে পতন ঘটানোর ব্যবস্থাও করা হয়ে থাকে।

সাধারণভাবে ডার্টি যুদ্ধের সব উপকরণকে ডার্টি বা নোংরা মনে হয় না। ইসরাইল ও আন্তর্জাতিক ইহুদি সংগঠনগুলোর পরিচালিত একটি আন্দোলনের নাম হলো ফ্রি ম্যাসন আন্দোলন। এ আন্দোলনের সাথে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব একসময় জড়িত ছিলেন। এই আন্দোলন মূলত বিশ্বব্যাপী ইহুদি স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করে। এর তত্ত্বাবধানে বিশ্বব্যাপী পরিচিত, অনেক সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্দোলন পরিচালিত হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় নোংরা যুদ্ধ
স্নায়ুযুদ্ধকালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরকে মোকাবেলার জন্য যে ডার্টি ওয়ার বা নোংরা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করত, সেটি দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রভাবশালী প্রতিপক্ষ ভারত ও পাকিস্তান গ্রহণ করছে ব্যাপকভাবে। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বানানো এই যুদ্ধ গতানুগতিক যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর বলে মনে করা হয়। গতানুগতিক যুদ্ধে যেখানে স্বপক্ষের লোকক্ষয় ও সম্পদহানি এড়ানো যায় না, সেখানে নোংরা যুদ্ধে আক্রান্ত ও আক্রমণকারী, দুটোই হয় মূলত প্রতিপক্ষের। এতে যুদ্ধ খরচও তুলনামূলকভাবে স্বল্প। এ ছাড়া নোংরা যুদ্ধের কৌশল হিসেবে প্রতিপক্ষকে খুন অপহরণ গুম করার কাজ স্থানীয় ভাড়াটিয়াদের দিয়েও করা সম্ভব। ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে এসব কাজ সরকার বা নিরাপত্তাবাহিনীকে ব্যবহার করে করাতে দেখা গেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম-অপহরণ ছাড়াও বিচারিক মোড়কেও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালাতে দেখা যায়। 

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগোত্তর সময়ে ভারত নেহরু ডকট্রিনের অংশ হিসেবে প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারে গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের বিস্তৃত করে। ষাটের দশকের শেষার্ধে আইবি ভেঙে বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র) গঠনের পর ভারতের ‘নোংরা যুদ্ধ’ চালানোর সক্ষমতা বেশ বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৫ সালে সিকিমকে ভারতের সাথে একীভূত করে নেয়ার মধ্য দিয়ে সংস্থাটি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে। এর আগে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল সংস্থাটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। ভারতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, পাকিস্তানের বেলুচ এবং খাইবার পাখতুনখোয়া ও ‘ফাটা’ এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করা। এ দুটো এলাকার সাথে ভারতের সীমান্ত সংযোগ না থাকায় ডার্টি ওয়ারে বেলুচ-পাখতুনখোয়ায় সাফল্য অতটা পাওয়া যায়নি। তবে আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের অবসানের পর সেখানে ভারতের বিশেষ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেতে থাকে নয়া দিল্লি। আফগান তালেবানের বিপরীতে পাকিস্তানি তালেবানের সাথে এক বিশেষ যোগসূত্র তৈরি করতে সক্ষম হয় ভারত। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সমঝোতা বিরাট সুযোগ এনে দেয় নয়া দিল্লির হাতে।

দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে ‘ডার্টি ওয়ার’-এর প্রতি ততটা কৌশলগত গুরুত্ব দেয়নি। ফলে ১৯৭১ সালে দেশটির পূর্বাংশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তারা এ ধরনের কোনো কৌশলের সার্থক প্রয়োগ ঘটাতে পারেনি। কিন্তু ’৭০-এর দশকের পর থেকে পাকিস্তানও ভারতের পাল্টা ডার্টি ওয়ারের প্রতি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যস্থল হয় কাশ্মির, উত্তরপূর্ব ভারতের সাত রাজ্য ও পাঞ্জাব। কাশ্মির ও পাঞ্জাবের সাথে পাকিস্তানের স্থলসীমান্ত থাকায় বিচ্ছিন্নতাকামীদের কৌশলগত নেটওয়ার্ক বিস্তার ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সাহায্য সহযোগিতা করা সহজ হয়। সে তুলনায় দূরবর্তী সাত রাজ্যে পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য কিছু করার অবকাশ থাকে না। বরং এ ক্ষেত্রে চীন ও বাংলাদেশ এ অঞ্চলের সাথে সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় সেসব দেশের নিজস্ব নেটওয়ার্ক এ ক্ষেত্রে কার্যকর হয়ে দাঁড়ায়।
ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাশ্মির একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। যে নীতির ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ ঘটেছে, তাতে এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্তানের অংশ হওয়ার কথা। আর বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো গণভোটের মাধ্যমে প্রদেশ বিভাজনের ঘটনা ঘটলে জম্মুর অংশবিশেষ ভারতের অঙ্গ হলেও কাশ্মির উপত্যকা পাকিস্তানের অংশ হওয়ার কথা। কিন্তু কাশ্মিরের রাজার ভারতে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা শেখ আব্দুল্লাহর দিল্লির প্রতি আনুকূল্য দেখানোর ফলে কাশ্মির ভারতের অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে। পরে এ নিয়ে পাকিস্তান সেনা অভিযান শুরু করলে বর্তমান আজাদ কাশ্মির পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আর অস্থির ও উত্তপ্ত থেকে যায় জম্মু-কাশ্মির। পাকিস্তান ডার্টি ওয়ারের পাল্টা কৌশল গ্রহণের আগ পর্যন্ত কাশ্মিরের স্বাধীনতার দাবিকে সশস্ত্র রূপ নিতে দেখা যায়নি। 

পাঞ্জাবে নোংরা যুদ্ধের প্রভাব লক্ষ করা যায় খালিস্তান আন্দোলনের সময়। এ সময় খালিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাকিস্তানে গোপন আশ্রয় ও প্রশ্রয় লাভ করে। কিন্তু ভারত পাঞ্জাবে সর্বাত্মক বিদ্রোহ নির্মূল অভিযানে নামলে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো তাতে সাহায্য করায় এই আন্দোলনের অকালমৃত্যু ঘটেছে বলে মনে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য পাঞ্জাবে নতুন করে অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

উপমহাদেশে আঞ্চলিক যে ডার্টি ওয়ার গেম চলছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে, প্রতিপক্ষের মানচিত্র পরিবর্তন বা কোনো অংশকে নিজ প্রভাবের অধীনে নিয়ে আসা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের সর্বাত্মক সমর্থন দেয়াকে অনেক পাকিস্তানি বিশ্লেষক ভারতের ডার্টি ওয়ার কৌশলের অংশ মনে করেন। এখন পাকিস্তানের করাচি, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া এবং ফেডারেল টেরিটরি অঞ্চলে যে অস্থিরতা চলছে, তাকেও ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টি ওয়ার গেমের অংশ মনে করেন ইসলামাবাদের বিশ্লেষকেরা। অন্য দিকে কাশ্মিরের উত্তপ্ত অবস্থা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যে অস্থিরতার পেছনে চীন-পাকিস্তানের ডার্টি ওয়ার গেম সক্রিয় বলে মনে করা হয়।

ডার্টি ওয়ার গেম যেখানেই সংঘটিত হোক না কেন, তার অনিবার্য পরিণতি ব্যাপক রক্তক্ষয় ও ধ্বংসযজ্ঞ। অনেক সময় নিজ হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের জন্য মিত্র শক্তির ওপর আঘাত হানাকে কৌশলের অংশ মনে করা হয় এ যুদ্ধে। এ জন্য এ যুদ্ধে শত্রু-মিত্র সবাই থাকে ঝুঁকির মধ্যে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের বিমান দুর্ঘটনায় আমেরিকান কর্মকর্তাদের মৃত্যুকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন অনেকে।

বিশ্বের শান্তি ও স্থিতির সাথে ডার্টি ওয়ারের সম্পর্ক বিপরীতধর্মী। কূটনীতিনির্ভর পররাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর যখনই গোয়েন্দানির্ভরতা প্রাধান্য লাভ করে, তখন বিশ্বের অনেক অঞ্চল হয়ে ওঠে অগ্নিগর্ভ। এ অবস্থা এখন দেখা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের একই অবস্থার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা অনেকের। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিরোধী পক্ষের আন্দোলন ও তা দমনে কত লোক ক্ষয় তথা খুন গুম অপহরণ ক্রসফায়ার ও অন্যান্য বিচারবহির্র্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে এসব তথ্য একসময় বিদেশী সূত্র থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে। এখন জানা যাচ্ছে আর্জেন্টিনায় বামপন্থী আন্দোলন দমনের নামে যে ডার্টি ওয়ার চলেছিল, তাতে ৩০ হাজার বাম অ্যাকটিভিস্ট ইউনিয়নিস্ট ছাত্র সাংবাদিক মার্কসিস্ট ও পেরোনিস্ট গেরিলাকে হত্যা করা হয়েছে। চিলির অবমুক্ত দলিল থেকে এখন জানা যাচ্ছে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত সময়ে ডার্টি ওয়ারে সেখানে ২২ হাজার লোক নিহত বা গুম হয়েছেন। অন্য দেশের ডার্টি ওয়ারেও বিপুলসংখ্যক লোক এভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। দুই দশক আগে আলজেরিয়ায় ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্টের বিজয়ের পর ইসলামিস্টদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে ১০ হাজারের বেশি নিহত হয়েছে। মিসরে ব্রাদারহুড-বিরোধী অভিযানে নিহতের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে বেসরকারি সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে। আফ-পাক এলাকায় নিহতের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে এ সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। সিরিয়ায় হাফিজ আল আসাদের সময় ৩০ হাজার লোক নিহত হয়েছেন। বাশার আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে পৌনে চার লাখ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক লোকক্ষয়ের পর ’৭৩-৭৪ সালে বিপুলসংখ্যায় রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। চলতি দশকে লক্ষ করা যাচ্ছে এর পুনরাবৃত্তি। আইএস ধুয়া বা হামলার যে দাবি উঠছে, সেটিও ব্যাপক লোকক্ষয়ের কারণ ঘটাতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কে কোন উদ্দেশ্যে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তার কোনো হদিস থাকে না।

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০১৫

নিম্ন মধ্য আয়ের রহস্যকোথায়?


হঠাৎ করেই যেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের শিখরে উঠতে শুরু করেছে! বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর সরকারি প্রচার প্রচারণায় এমন একটি আবহ দিতে চেষ্টা করা হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হবে এমন ভবিষ্যৎবাণীও সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ যেখানে নজীরবিহীন অর্থনৈতিক সঙ্কটে হাবুডুবু খাচ্ছে, ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দার কারণে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ায় দিনমজুররা কাজ পাচ্ছে না, ডেভলপারদের তৈরী বাড়িঘর বিক্রি না হওয়ায় জায়গার দাম বৃদ্ধির পরিবর্তে কমতে শুরু হয়েছে, তেমন এক সময়ে অর্থনীতির উন্নয়নের জোয়ার কিভাবে বইতে শুরু করল যে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নি¤œ মধ্য আয়ের দেশ হয়ে গেল?

বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবনিকাশ 
বিশ্ব ব্যাংক মাথা পিছু জাতীয় আয় হিসাব করে স্বল্প আয়, মধ্যম আয় এবং উচ্চ আয়ের অর্থনীতির শ্রেণী বিন্যাস করে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে আবার নিম্ন ও উচ্চ মধ্যম এই দু’ভাগে ভাগ করা হয়। এবার ২০১৬ সালের জন্য বিশ্ব ব্যাংক তাদের এটলাস পদ্ধতিতে তিন বছরের গড় মাথা পিছু আয় হিসাব করে দেখেছে যে, বাংলাদেশসহ তিনটি দেশ স্বল্প আয়ের শ্রেণী থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের শ্রেণীতে প্রবেশ করেছে। বিশ্ব ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে পর পর তিন বছরের বিনিময় হারভিত্তিক গড় মাথাপিছু জাতীয় আয় যদি ১ হাজার ৪৫ ডলারের বেশি হয় তাহলে সেই দেশটিকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এ আয় যদি ৪ হাজার ১২৫ ডলার অতিক্রম করে তাহলে সেই দেশটিকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। আর এই জাতীয় আয় যদি ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার পেরিয়ে যায় তাহলে সেটিকে চিহ্নিত করা হয় উচ্চ আয়ের দেশ হিসাবে। বিশ্ব ব্যাংকের এ হিসাবে বাংলাদেশের তিন বছরের মাথাপিছু জাতীয় আয়ের গড় ১ হাজার ৪৫ ডলার অতিক্রম করায় বাংলাদেশকে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশের শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

ভিত্তি বছর পরিবর্তনে বেড়েছে আয়
মাথাপিছু জাতীয় আয় দু’ কারণে বাড়তে পারে। প্রথম কারণ হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাবার কারণে। অর্থনীতির বিকাশ হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হলে আনুপাতিকভাবে মাথাপিছু জাতীয় আয় বাড়ে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় আয়ের হিসাবের যে বাস্কেট বা পণ্য তালিকা রয়েছে তাতে নতুন কোনো খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তাতেও মোট জাতীয় আয় এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় দুটোই বাড়ে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৫/৬ শতাংশ হারে বিকাশ লাভ করেছে। এ সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় মাথাপিছু জাতীয় আয় প্রতি বছর বেড়েছে। এ ছাড়া এ সময়টাতে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল হওয়ায় টাকার মান সংকোচনের হারের চেয়ে টাকার বিনিময় হার সংকোচন কম ছিল। এ কারণে স্থির টাকার হিসাবে মাথাপিছু জাতীয় আয় যা বেড়েছে ডলারের হিসাবে জাতীয় আয় বেড়েছে তারচেয়েও বেশি। 

এর বাইরে বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরো জাতীয় হিসাবের ভিত্তি বছর পরিবর্তন করার ফলে এক লাফে ১৫ শতাংশের মতো জাতীয় আয় বেড়ে গেছে। এ আয় আগেও ছিল কিন্তু তা ছিল হিসাবের বাইরে। ভিত্তি বছর পরিবর্তন করে পরিসংখ্যান ব্যুরো সে আয়কে হিসাবের মধ্যে নিয়ে এসেছে। ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশের স্থির জাতীয় আয় হিসাবে প্রথম ভিত্তি বছর ধরা হয়। এ সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি খুব বেশি বিস্তৃত ছিল না। বিশেষত শিল্প খাতের বিকাশ ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে । এ সময় ৩০ শতাংশের বেশি জাতীয় আয় আসত কৃষি খাত থেকে। শিল্পের আয় ছিল তার অর্ধেকের কাছাকাছি । সেবা খাতের আয়ও এখনকার চাইতে অনেক কম ছিল। 

১৯৮৪-৮৫ সালে জাতীয় আয়ের ভিত্তি বছর প্রথম পরিবর্তন করা হয়। এই ভিত্তি বছর পরিবর্তনের কারণে জাতীয় আয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য। এ সময় বাংলাদেশের শিল্প ও সেবা উভয় খাতের বিকাশের ফলে এই দুই খাতের অবদান জাতীয় আয়ে বৃদ্ধি পায়। জাতীয় আয়ে কৃষি ও শিল্প খাতের অবদান সম পর্যায়ে চলে আসে। সেবা খাতের আয়ও অনেক বেড়ে যায়্ । কৃষি খাতের কিছু নতুন খাত বিশেষত কিছু নতুন শস্যকে আয়ের আওতায় নিয়ে আসা হয়। শিল্প খাতের মধ্যে অনেক নতুন খাত সংযোজিত হয়। অন্য দিকে ব্যবসাবাণিজ্যসহ অনেক সেবা উপখাত প্রথম বারের মতো জাতীয় আয়ে সংযোজিত হয়। এ সময়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কারিগরি সহায়তায় জাতীয় আয় হিসাবের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেয়ার প্রচেষ্টা চলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোতে এ ব্যাপারে নেয়া হয় একটি বিশেষ প্রকল্প। এরপর জাতীয় আয়ের ভিত্তি বছর ঠিক করা হয় ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরকে। এ সময়ে আরো কিছু নতুন উপখাতকে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে সেবা খাতের এ ধরনের সংযোজন ছিল বেশি। এ সময় জাতীয় আয়ের ভিত্তি সম্প্রসারণের কারণে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায় ৩০ শতাংশ। 

সর্বশেষ ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জাতীয় আয়ের নতুন ভিত্তি বছর ঠিক করা হয়। কয়েক বছর দুই ভিত্তি বছরের হিসাব একসাথে প্রকাশ করা হলেও এখন সর্বশেষ ভিত্তি বছরকে জাতীয় আয়ের হিসাবের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহন করা হয়েছে। এবার নতুন ভিত্তি বছরে খাত সম্প্রসারণের কারণে জাতীয় আয় ১৫ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ অর্থবছরে পূরনো ভিত্তি বছর অনুসারে যেখানে দেশের জাতীয় আয় ছিল ১৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সেখানে নতুন ভিত্তি বছর অনুসারে জাতীয় আয় দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। এ সময়ে কৃষি খাতে নতুন ২৪টি শস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে এ খাতের আয় বাড়ে ৯ শতাংশ, আর শিল্প খাতে নতুন কিছু পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করায় আয় বাড়ে ৫ শতাংশ । সেবা খাতে ইন্টারনেট সার্ভিস রিক্রুটিং এজেন্সি, ডেকোরেশন সার্ভিসসহ বেশ কিছু খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে আয় বাড়ে ১৬ শতাংশ। এতে জাতীয় আয়ে সার্বিক কৃষি খাতের অবদান এসে দাঁড়িয়েছে ১৬ শতাংশের কোঠায়। শিল্প খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ২৯ শতাংশের কাছাকাছি। বাকি ৫৫ শতাংশ আয় আসছে সেবা খাত থেকে, যার মধ্যে সর্বাধিক ১৪ শতাংশ আয় আসে ব্যবসাবাণিজ্য থেকে। 

বর্তমানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১০-১১ বছরকে ভিত্তি ধরে জাতীয় আয়ের হিসাবের কাজ শুরু করছে। এতে আরো নতুন নতুন উপখাত সংযোজন হবে। আর একই সাথে জাতীয় আয়ও আরেক দফা বাড়বে। এভাবে ভিত্তি বছর পরিবর্তন বা উৎপাদন ভিত্তির হিসাব সম্প্রসারণের কারণে জাতীয় আয় বাড়লে একটি মানসিক তৃপ্তি ঘটার ব্যাপার থাকে কিন্তু তাতে জনগণের প্রকৃত আয়ের কোন কম বেশি হয় না। যেটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে ঘটে থাকে। 
পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুসারে নতুন ভিত্তি বছর ধরে বিদায়ী ২০১৫ অর্থবছরের মাথা পিছু জাতীয় আয় ছিল ১৩১৪ ডলার। পুরনো ভিত্তি বছর হিসাব করা হলে এ আয় ১১০০ ডলারের বেশি হতো না। এভাবে যত বার ভিত্তি বছর পরিবর্তন ও সম্প্রসারণ হবে ততবার জাতীয় আয় বাড়বে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একই সাথে বাড়লে মাথাপিছু জাতীয় আয় বছর আটেক পর ২ হাজার ডলার পেরিয়ে যেতে পারে। তখনও নিম্ন মধ্য আয়ের পর্যায় থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে থাকবে। উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার কথা নিছক অলীক স্বপ্ন দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়। 

এলডিসি থেকে বেরোনোর লাভ ক্ষতি
সরকারিভাবে স্বল্প আয়ের দেশের স্তর থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে যাবার কথা বলা হলেও জাতি সঙ্ঘের যে এলডিসি দেশের তালিকা রয়েছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান অক্ষুণœ আছে। বিশ্ব হিসাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে চলে গেলেও বাংলাদেশ জাতি সঙ্ঘের স্বল্পোন্নত দেশÑএলডিসি’র তালিকাতেই থাকবে। এ তালিকা থেকে বেরোতে হলে অর্থনীতির নাজুকতা, মানব উন্নয়ন ও মাথাপিছু আয়Ñ এই তিনটি সূচক অতিক্রম করতে হবে। পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাক্ষরতা ও স্বাস্থ্য সূচক দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন বিবেচনা করা হয়। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার জন্য বিবেচনায় নেয়া হয় কৃষি উৎপাদনে অস্থিরতা, অটেকসই রফতানি ও সেবা আয়, অনানুষ্ঠানিক তৎপরতার ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা, বাণিজ্যিক পণ্যে রফতানি কেন্দ্রীভূত থাকা, অর্থনৈতিক বিকাশে অবরুদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উদ্বাস্তু জনসংখ্যার আধিক্যের ওপর। এর মধ্যে বাংলাদেশ মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ১৯০ ডলার হবার প্রথম সূচকটি অতিক্রম করলেও অন্য দুই সূচক অতিক্রম করতে পারেনি। তবে শেষোক্ত সূচকটি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ অবশ্য তিনটির মধ্যে দু’টি সূচক অতিক্রম করতে পারলে এলডিসি দেশের তালিকা থেকে বের হবার আবেদন করতে পারে। 

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হবার মনস্তাত্বিক আনন্দ যাই থাক না কেন, এর জন্য মূল্যও রয়েছে অনেক। বিশ্ব ব্যাংক আইএমএফ এবং বিভিন্ন দাতা দেশ থেকে রেয়াতি শর্তে যে ঋণ বাংলাদেশ এখন পাচ্ছে তার অনেকখানি কমে যাবে এই উত্তরণের পর। ইউরোপীয় এবং অন্যান্য বাজারে বাংলাদেশ এখন যে জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে সেটি মূলত এলডিসি দেশ হিসাবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে রেয়াতি সুবিধা প্রাপ্তির অনেক কিছু আর থাকবে না। ফলে সরকার রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেবার প্রবণতা থেকে এলডিসি থেকে বের হবার উদ্যোগ নিলেও এতে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যে কতটা লাভ ক্ষতি হবে সেটি পাঁচ বার ভাবতে হবে। 

আয় বাড়ছে, বাড়ছে বৈষম্য
মাথা পিছু জাতীয় আয় বাড়লে সব মানুষের আয় বাড়ে এমন মনে করার কোন কারণ নেই। আয় বৃদ্ধিটা কোন শ্রেণীর হচ্ছে সেটিই মুখ্য বিবেচ্য থাকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের জাতীয় পর্যায়ের পরিবারভিত্তিক আয় বণ্টন চিত্রে দেখা যায় ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১০ সালে দরিদ্রতম ৫ শতাংশ এবং এর ওপরের ডিসাইল এক এবং ডিসাইল দুই অর্থাৎ দরিদ্রতম ২৫ শতাংশের আয় কমে গেছে। আয় বেড়েছে ধনী ৫০ শতাংশের । এতে দেখা যায় জাতীয় আয় বৃদ্ধির সুফল ধনীরা যেভাবে পাচ্ছে সেভাবে পাচ্ছে না গরীব মানুষ । এভাবে জাতীয় আয়ের অসম বণ্টন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের গরীব মানুষ আরো গরীব হতে থাকবে। ধনীরা ফুলেফেঁপে উঠবে। 

আয় বাড়ছে, তবু কেন হাহাকার 
সরকারের প্রকাশ করা হিসাবনিকাশে দেশ কেবলই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় আয় বাড়ছে। স্বল্প আয়ের দেশ থেকে নি¤œ মধ্যবিত্ত আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। তবু ৫/১০ বছর আগেও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে খরচ করার সামর্থ্য ছিল সেটি এখন দেখা যাচ্ছে না। এটি নি¤œ বিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি অপেক্ষাকৃত সচ্ছলদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। সাধারণত দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতা বোঝার জন্য ঈদবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণসূচক। আরেকটি সূচক হলো জমি বা প্লাট বিক্রি। ঢাকার ফুটপাথের অনেক হকারের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এর আগের বছরগুলোতে যে পরিমাণ ব্যবসা করেছে তার ধারেকাছেও এবার করতে পারছে না। অথচ এবার দেশে এক ধরনের শান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি রয়েছে। একই ধরনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে মৌচাক গাওছিয়া এবং এ পর্যায়ের বিপণিবিতানগুলো থেকে। বসুন্ধরা কর্ণফুলি বা ইস্টার্ন প্লাজার দোকানদারদের বক্তব্য অনুসারে তাদের ব্যবসার অবস্থা আরো খারাপ। 

কেন এ হাহাকার অবস্থা সর্বত্র? চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গ্রেফতারবাজি তথা অবৈধ উপার্জনের রমরমা অবস্থা গত কয়েক বছর ধরেই চলছে। এই শ্রেণীর হাতে উদ্বৃত্ত তহবিল থাকলেও বাজারে সে টাকা ব্যয়ের কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। বিদেশী ব্যাংকে বাংলাদেশীদের অর্থ আমানত বৃদ্ধি আর সিঙ্গাপুর, কুয়ালামপুর, ব্যাংকক, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশীদের বাড়িঘর কেনার প্রবণতা বৃদ্ধির মধ্যে এর জবাব রয়েছে। সরকার আনুকূল্যে যারা এখন অঢেল টাকার মালিক হচ্ছেন তারা সেই টাকা বিদেশে পাচার করছে। অন্য দিকে বিরোধী দলের সমর্থকদের ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোর পরিবেশ থাকছে না রাজনৈতিক কারণে। নির্বিচারে মামলা, হয়রানি ও পুলিশি অত্যাচারের কারণে দেশের বিপুল জনশক্তির আয় দুর্নীতিবাজদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এর ফলে ঈদবাজারে যেমন দুরবস্থা নেমেছে, তেমনিভাবে শহরে ডেভেলপাররা যে সব বাড়িঘর বানাচ্ছে তা বিক্রি হচ্ছে না। জায়গা জমির দাম গেছে কমে। তবে প্রাইভেট গাড়ি এবং এসি বিক্রির হার তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। সারকারি রাজনৈতিক আনুকূল্যপ্রাপ্তদের অধিক হারে বিলাসী জীবনযাপনের প্রবণতার কারণে এটি হয়ে থাকতে পারে।