অরুন্ধতী রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অরুন্ধতী রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

আফজাল গুরুর ফাঁসি ভারতীয় গণতন্ত্রের কলঙ্ক


কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী নেতা আফজাল গুরুকে ২০০১ সালে ভারতে সংসদ ভবনে হামলার অভিযোগে ফাঁসি গত শনিবার, (০৬ ফেব্রুয়ারি) দেয়া হয়েছে । প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ানে এ বিষয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ হয় বুকার পুরস্কারজয়ী ভারতের ভিন্ন মতাবলম্বী খ্যাতিমান লেখিকা ও মানবাধিকার কর্মী অরুন্ধতী রায়ের একটি নিবন্ধ।

ওই নিবন্ধে তিনি আফজাল গুরুর সঙ্গে ভারতের গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগ কী আচরণ করেছে তা খোলাসা করেছেন। অনলাইন থেকে এটির অনুবাদ সংগ্রহ করে এখানে শেয়ার করলাম। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র কিভাবে একজন স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের নেতাকে প্রমাণ ছাড়া ফাঁসি দেয় তার বাস্তব চিত্র জানতে লেখাটি সাহায্য করবে।

আফজাল গুরুর ফাঁসি ভারতীয় গণতন্ত্রের কলঙ্ক
শনিবার ভারতে বসন্ত এসেছে। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরই আইন তার নিজস্ব পথ ধরেছে। এদিন প্রাতঃরাশের কিছুক্ষণ আগেই ভারত সরকার আফজাল গুরুকে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে ফাঁসি দেয়। ২০০১ সালে সংসদ ভবনে হামলার জন্য প্রধান অভিযুক্ত তিনি। ফাঁসির পর তাকে তিহার জেলে সমাধিত করা হয়েছে। এখানে ১২টি বছর তিনি নিঃসঙ্গ বন্দীজীবন কাটিয়েছেন।

ফাঁসির কথা আফজালের স্ত্রী ও সন্তানদের অবহিত করা হয়নি। তবে ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব দাবি করেছেন যে, দ্রুত ও রেজিস্ট্রি ডাকের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ তার পরিবারকে অবহিত করে। জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশের মহাপরিচালককে বলা হয়েছে তারা চিঠিটি পেয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখতে। এ নিয়ে এত মাথা ঘামানোর কী আছে! তারা তো একজন কাশ্মীরি সন্ত্রাসবাদীর পরিবারমাত্র।

আফজালের ফাঁসির পর পুরো ভারতে এক নজিরবিহীন ঐক্য দেখা যায়। বিশেষ করে প্রধান রাজনৈতিক দল, যেমন কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) ডঙ্কা পিটিয়ে আইনের শাসনের উত্সব পালন করেছে। টিভি চ্যানেলগুলো ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে একে চিত্রিত করে আফজালের নানা ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করেছে। উগ্র হিন্দুবাদীরা ফাঁসির উত্সব উদযাপনের জন্য মিষ্টি বিতরণ করেছে এবং যেসব ছেলেমেয়ে দিল্লিতে প্রতিবাদ জানাতে সমবেত হয়েছিল, তাদের পিটিয়েছে। এমনকি আফজালের ফাঁসি কার্যকর করার পর টিভির ভাষ্যকার ও রাস্তার জনতা কাপুরুষের মতো উল্লাস করেছে। তারা সম্ভবত ভেতরে ভেতরে বুঝতে পেরেছিল যে, তারা ভয়ঙ্কর কোনো ভুল করছে।

ঘটনাটি কী? ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভারতের সংসদ ভবনের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি গাড়িবোমা হামলা চালায়। তাদের চ্যালেঞ্জ করা হলে গাড়ি থেকে বের হয়ে তারা গুলিবর্ষণ করে আট নিরাপত্তাকর্মী ও এক মালীকে হত্যা করে। পরে বন্দুকযুদ্ধে হামলাকারী ৫ জনই নিহত হয়।

এরপর আফজাল গুরুকে দিয়ে হামলাকারীদের নাম বলাতে বাধ্য করে পুলিশ। তাদের নাম আমাদের সবারই জানা ছিল। তত্কালীন বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এলকে আদভানি বলেছিলেন, তারা পাকিস্তানিদের মতো দেখতে। সিন্ধুতে জন্ম নেয়া আদভানি তো জানবেনই পাকিস্তানিরা দেখতে কেমন।

শুধু পুলিশি হেফাজতে আফজালের স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করেই (প্রক্রিয়াগত বিষয় লঙ্ঘনের দায়ে যাকে সুপ্রিমকোর্ট পরে বাতিল বলে ঘোষণা করেছিল) বিজেপি সরকার পাকিস্তান থেকে ভারতের হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং পাকিস্তান সীমান্তে ৫ লাখের মতো সৈন্য সমাবেশ করে। এ সময় পারমাণবিক যুদ্ধের হুঙ্কার দেয়া হয়। বিদেশী দূতাবাসগুলো এ সময় ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে এবং দিল্লী থেকে তাদের অনেক কর্মী প্রত্যাহার করে নেয়। এই অচলাবস্থা কয়েক মাস কার্যকর ছিল এবং এতে ভারতের হাজার হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে।

ওই ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এনকাউন্টার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল দাবি করে যে, তারা ঘটনার আসল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে পেয়েছে। এ ঘটনার মূল পলিকল্পনাকারী হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর দিল্লি থেকে অধ্যাপক এসএআর গিলানি, কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে শওকত গুরু ও তার চাচাতো ভাই আফজাল গুরুকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর গ্রেফতার করা হয় শওকতের স্ত্রী আফসান গুরুকে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে সোত্সাহে পুলিশের ভাষ্যই প্রচার করা হয়। যেমন কয়েকটি শিরোনাম ছিল, ‘দিল্লি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকের বাসায় বোমা হামলার পরিকল্পনা’, ‘ভার্সিটির ডন ফিদাইনদের পরিচালক’, ‘অবসর সময়ে সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে ফ্রি লেকচার দিতেন ডন’ প্রভৃতি। জিটিভি ১৩ ডিসেম্বরের ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে। এতে দাবি করা হয়, এটি পুলিশের চার্জশিটের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সত্য কাহিনী। প্রশ্ন ওঠে, পুলিশি ভাষ্যই যদি সত্য হবে, তবে আদালত কেন?

তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ও আদভানি প্রকাশ্যে ওই তথ্যচিত্রটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেটি প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে অস্বীকৃতি জানায় সুপ্রিমকোর্ট। কোর্টের মন্তব্য, গণমাধ্যম বিচারকদের প্রভাবিত করতে পারবে না। গিলানি, শওকত ও আফজালকে একটি দ্রুত আদালতে ফাঁসি দেয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে তথ্যচিত্রটি প্রচার করা হয়। তবে হাইকোর্টে খালাস পান গিলানি ও আফসান গুরু। সুপ্রিমকোর্টও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। তবে ২০০৫ সালের ৫ আগস্ট রায়ে সুপ্রিমকোর্ট আফজাল গুরুকে তিনবার যাবজ্জীবন ও দুইবার মৃত্যুদণ্ড দেয়।

বিজেপি অবিলম্বে ফাঁসি কার্যকর করার দাবি জানায়। দলটির অন্যতম নির্বাচনী স্লোগান ছিল- দেশ আবি শরমিন্দা হ্যায়, আফজাল আভিভি জিন্দা হ্যায় (বিদ্রূপাত্মক ছন্দে)। এর অর্থ হলো, আফজাল এখনও বেঁচে থাকা আমাদের জাতির জন্য লজ্জা। এই স্লোগানকে বাস্তবায়িত করার জন্য শুরু হয় মিডিয়া প্রচারণা।

বর্তমানে বিজেপির এমপি ও সেই সময়ে পাইয়োনিয়ার সংবাদপত্রের সম্পাদক চন্দন মিত্র লেখেন, ‘২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর সংসদ ভবনে হামলার অন্যতম সন্ত্রাসী ছিলেন আফজাল গুরু। তিনিই প্রথমে নিরাপত্তা রক্ষীদের ওপর গুলিবর্ষণ করেন। নিহত ছয়জনের মধ্যে তিনজনকেই হত্যা করেন আফজাল।’ যদিও পুলিশের চার্জশিটে আফজাল গুরু সম্পর্কে এমন কথা বলা হয়নি। সুপ্রিমকোর্টও তার রায়ে বলে যে, আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দুঃখজনকভাবে এরপরই বলা হয়, ‘ওই ঘটনায় বিপুল সংখ্যক হতাহত এবং এতে গোটা জাতি আলোড়িত হয়েছে। সমাজের সম্মিলিত বিবেক সন্তুষ্ট হবে যদি অভিযুক্তকে ফাঁসি দেয়া হয়।’

সংসদ ভবনে হামলার ঘটনায় আমাদের সম্মিলিত বিবেককে কে চিত্রিত করেছে? সংবাদপত্রের তথ্য? টিভির তথ্যচিত্র? আইনের শাসনের গুণকীর্তন করার আগে চলুন জেনে নিই, আসলে কী ঘটেছিল।

যেসব লোক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে উত্সবে মাতোয়ারা, তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, ভারতের আদালত গিলানিকে খালাস ও আফজালকে শাস্তি দেয়ায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বিচার স্বচ্ছ হয়েছে।

২০০২ সালের মে মাসে দ্রুত আদালতে বিচার শুরু হয়। তখন বিশ্ব ওয়ান-ইলেভেনের উন্মত্ততায় কাঁপছে। অসময়েই আফগানিস্তানে বিজয় হয়েছে দাবি করে উল্লাস করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই বছরেরই ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে গুজরাট রাজ্যে পুলিশ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় মুসলিম নিধন শুরু হয়ে তখনও বিক্ষিপ্তভাবে চলছিল। বাতাসে ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। এ অবস্থায় সংসদ ভবনে হামলার বিচার শুরু হয়। ফৌজদারি মামলার বিচারের ঠিক চরম মুহূর্তে যখন হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্টে বিচার চলে, সাক্ষীদের জেরা করা হয়, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়, আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়, কিন্তু তখন তো আর নতুন কোনো প্রমাণ হাজির করা যায় না।

আফজাল গুরুকে এ সময় হাই সিকিউরিটি সেলে নিঃসঙ্গ অবস্থায় বন্দী করে রাখা হয়। তার কোনো আইনজীবী ছিল না। আদালত এক জুনিয়র আইনজীবীকে নিয়োগ দিলেও তিনি একটিবারের জন্যও আফজাল গুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। আফজালের সমর্থনে কোনো সাক্ষীকেও হাজির করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জেরা করেননি তিনি। ওই পরিস্থিতিতে কোনো কিছু করার সামর্থ্য নেই বলে মন্তব্য করেন বিচারক।

তারপরও কিছু তথ্য বের হয়ে আসে। কয়েকটি উদাহরণ হলো, গ্রেফতারের সময় জব্দ করা একটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। তবে আইন অনুযায়ী সেগুলো সিলগালা করা হয়নি। বিচারের সময় ফাঁস হয়ে যায় যে, ল্যাপটপের হার্ডডিস্কে গ্রেফতারের পরও হাত দেয়া হয়েছে। তাতে দেখা যায়, সংসদ ভবনে প্রবেশের ভুয়া অনুমতিপত্রের একটা কপি আছে এবং জিটিভির একটি ভিডিও আছে যাতে সংসদের ভেতর-বাহির দেখানো হচ্ছে। পুলিশ অভিযোগ করেছে যে, আফজাল গুরু সব তথ্য মুছে ফেলেছেন, তাও কেবল এরকম মারাত্মক কয়েকটি নমুনা রেখে দিয়ে!

পুলিশ দাবি করেছে, মোবাইল নম্বর দিয়ে হামলাকারীদের সঙ্গে ২০০১ সালে ৪ ডিসেম্বর যোগাযোগ করেছেন আফজাল। তবে রাষ্ট্রপক্ষের কল রেকর্ডে দেখা যায়, সিমটি ২০০১ সালের ৬ নভেম্বরের পর আর চালু ছিল না। পুলিশ কীভাবে আফজালকে গ্রেফতার করেছিল? পুলিশ বলেছিল, গিলানির সহায়তায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে পুলিশি রেকর্ডে দেখা যায়, গিলানিকে গ্রেফতারের আগেই আফজালকে গ্রেফতার করা হয়। হাইকোর্ট একে স্ববিরোধী বললেও এ নিয়ে আর সামনে আগায়নি। এভাবে মিথ্যা আর সাজানো তথ্যের পাহাড়ের ওপর ভিত্তি করে প্রমাণ হাজির করা হয়। আদালত এসব বিষয় স্বীকার করলেও পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।

কেউ যদি রহস্যাবৃত সেই সংসদ ভবনে হামলার ঘটনা সম্পর্কে জানতে চান, তাকে এসব প্রমাণ অনুসরণ করে আগাতে হবে। কেউই এটা করেনি। ফলে ষড়যন্ত্রের আসল হোতাদের চিহ্নিত করা যায়নি।

আফজাল গুরুর সত্যিকার কাহিনী ও ট্র্যাজেডি শুধু আদালতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, প্রকৃত ঘটনা জানতে হলে কাশ্মীর উপত্যকার ঘটনাবলি জানতে হবে। এটি একটি পরমাণু যুদ্ধক্ষেত্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিকীকরণকৃত এলাকা। এখানে রয়েছে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক। প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্য! আবু গারিবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প ও টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মীরিদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের বার্তাবাহক। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিতে সংগ্রামরত কাশ্মীরিদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে এখন পর্যন্ত ৬৮ হাজার কাশ্মীরিকে (মুসলামানকে) হত্যা করা হয়েছে এবং ১০ হাজারকে গুম করা হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে আরও অন্তত এক লাখ লোক।

আফজালের হত্যাকাণ্ডটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জেলে যে হাজার হাজার কাশ্মীরিকে হত্যা করা হয়েছে, আফজালের জীবন ও মৃত্যু নিয়েও সে রকম অন্ধখেলা চলেছে। ভারতীয় গণতন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠানই আফজাল গুরুকে হত্যায় ভূমিকা রেখেছে। এখন তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। আমি আশা করি, আমাদের সম্মিলিত বিবেক এখন সন্তুষ্ট হয়েছে। নাকি এখনও আমাদের রক্তের কাপের অর্ধেকটা খালি?

 অরুন্ধতী রা

মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৪

আফজাল গুরুর ফাঁসি॥ ভারতীয় গণতন্ত্রের আসল চেহারা উন্মোচিত

সম্প্রতি ভারত সরকার আফজাল গুরু নামে এক কাশ্মীরি মুসলমানের ফাঁসি কার্যকর করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নাকি ২০০১ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে সন্ত্রাসী হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সত্যি কি তিনি সন্ত্রাসী, নাকি তার একমাত্র অপরাধ তিনি মুসলমান? ভারতের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ অরুন্ধতী রায়ের লেখায় বিষয়টির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে তা তুলে ধরা হলো। লেখাটি ব্রিটেনের প্রভাবশালী গার্ডিয়ান পত্রিকায় ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল। মামলায় অসংখ্য ফাঁকফোকর ছিল এবং সবাই তা জানত। কিন্তু তবুও ভারতের সব প্রতিষ্ঠান কাশ্মীরী এই ‘সন্ত্রাসী’কে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে ভূমিকা রেখেছে। দিল্লিতে শনিবার বসন্তের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটেছিল। সূর্য বের হয়ে এসেছিল, এবং আইন তার নিজের পথে চলেছিল। ব্রেকফাস্টের সামান্য আগে ভারত সরকার সংগোপনে আফজাল গুরুর ফাঁসি কার্যকর করল। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে পার্লামেন্ট ভবনে হামলার প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিটি ১২ বছর ধরে দিল্লির তিহার কারাগারে নিঃসঙ্গ অবস্থায় ছিলেন। ফাঁসির পর মৃতদেহটি ওই কারাগারেই সমাহিত করা হয়। গুরুর স্ত্রী ও ছেলেকেও বিষয়টি জানানো হয়নি। ‘কর্তৃপ জরুরি ডাক ও রেজিস্ট্রি করা চিঠির মাধ্যমে পরিবারকে অভিহিত করেছে,’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘তারা চিঠিটি পেল কি না তা জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের মহাপরিচালককে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।’ বড় কোনো ব্যাপার নয়, তারা আরেক কাশ্মীরী সন্ত্রাসীর পরিবার মাত্র। ভারত জাতির এই বিরল ঐক্যের মুহূর্তটিতে কিংবা অন্তত এর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো- কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী)- আইনের শাসনের মহাবিজয় উদযাপন করতে ঐক্যবদ্ধ (অবশ্য ‘বিলম্ব’ ও ‘সময়’ নিয়ে কিছুটা বাদানুবাদ ছিল) হয়। টিভি স্টুডিওগুলোতে এ সংক্রান্ত অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। তাতে ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে বাস্তবতার কচকচানি গুলিয়ে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ নিয়ে চেচামেচি চলে। ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ফাঁসিতে উল্লসিত হয়ে মিষ্টি বিতরণ করে, প্রতিবাদ করতে জড়ো হওয়া কাশ্মীরিদের (বালিকাদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল) পিটুনি দেয়। এমনকি গুরু মৃত এবং দৃশপটে না থাকলেও স্টুডিওর ভাষ্যকার এবং রাজপথে দুর্বৃত্তদের একে অন্যকে সাহস জোগানোর দরকার হয়েছে। এর কারণ খুব সম্ভবত মনের গহীনে তারা জানত, ভয়ঙ্কর একটা ভুল কাজে তারা পরস্পর ষড়যন্ত্র করছে। আসল ঘটনা কি? ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাঁচ সশস্ত্র ব্যক্তি একটি বোমা-গাড়ি নিয়ে ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করা হলে তারা লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে বের হয়, গুলিবর্ষণ করে। এতে আট নিরাপত্তা কর্মী ও এক মালী নিহত হয়। গুলি বিনিময়ের একপর্যায়ে হামলাকারী পাঁচজন নিহত হয়। পুলিশ হেফাজতে আফজাল গুরু অনেকগুলো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এগুলোর একটি অনুযায়ী, তিনি ওই লোকগুলোকে মোহাম্মদ, রানা, রাজা, হামজা ও হায়দার নামে শনাক্ত করেছিলেন। তাদের সম্পর্কে আমরা ওইটুকুই জানি। এমনকি তাদের নামের দ্বিতীয় অংশও ছিল না। তখনকার বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এল কে আদভানি বলেছিলেন, তারা ‘পাকিস্তানিদের মতো দেখতে।’ (তিনি কি জানেন, পাকিস্তানিদের মতো দেখতে ঠিক কেমন? তিনি নিজে সিন্ধি।) নিরাপত্তা হেফাজতে গুরুর দেওয়া স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে (পরে সুপ্রিম কোর্ট যেটাকে ‘ত্র“টিপূর্ণ’ ও ‘প্রক্রিয়াগত সুরার লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করে আমলে নেয়নি) সরকার পাকিস্তান থেকে তার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আনে, পাকিস্তান সীমান্তে পাঁচ লাখ সৈন্য মোতায়েন করে। পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হতে পারে বলেও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল। বিদেশি দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের ভারত সফর না করার অনুরোধ করে, দিল্লি থেকে তাদের স্টাফদের সরিয়ে নেয়। কয়েক মাস ধরে এই অচলাবস্থা চলে, ভারতের কয়েক হাজার কোটি রুপি ব্যয় হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিল্লি পুলিশের বিশেষ সেল (ভুয়া ‘এনকাউন্টার’ হত্যাকাণ্ডের জন্য এই সেল কুখ্যাত, তারা সন্দেহজনক সন্ত্রাসীদের বিচারবহির্ভূত আক্রমণের ল্যবস্তু করে থাকে) মামলাটির সুরাহা করার দাবি করে। দিল্লিতে ১৫ ডিসেম্বর তারা ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ অধ্যাপক এস এ আর গিলানি এবং কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে শওকত গুরু ও তার কাজিন আফজাল গুরুকে গ্রেফতার করে। এর পরপরই তারা শওকতের স্ত্রী আফসান গুরুকে গ্রেফতার করে। ভারতীয় মিডিয়া উৎসাহভরে পুলিশের ভাষ্য প্রচার করতে থাকে। এসব খবরের কোনো কোনোটির শিরোনাম ছিল : ‘দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ছিলেন সন্ত্রাসী পরিকল্পনার হোতা,’ ‘ভার্সিটি ডন ফিদাইনদের গুরু,’ ‘ডন অবসর সময়ে সন্ত্রাসের দীা দিতেন।’ জাতীয় নেটওয়ার্ক জি টিভি ডিসেম্বর ১৩ নামের একটি ‘ডকুড্রামা’ প্রচার করে। এতে দাবি করা হয়, এটা ‘পুলিশের চার্জশিটের ভিত্তিতে তৈরি সত্য কাহিনী।’ (পুলিশের বক্তব্যই যদি সত্য হয়, তবে আদালত আছে কিসের জন্য?) তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি ও আদভানি প্রকাশ্যে ডকুড্রামাটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। সুপ্রিম কোর্ট এটি প্রচার স্থগিত করার আবেদন খারিজ করে দিয়ে জানায়, মিডিয়া বিচারকদের প্রভাবিত করবে না। এটি প্রচারের কয়েক দিনের মধ্যেই দ্রুত বিচার আদালত গিলানি এবং আফজাল ও শওকত গুরুকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল। পরে হাইকোর্ট গিলানি ও আফসান গুরুকে নির্দোষ হিসেবে খালাস দেয়। সুপ্রিম কোর্ট এই আদেশ বহাল রাখে। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত ২০০৫ সালের ৫ আগস্ট আফজাল গুরুকে তিনটি যাবজ্জীবন এবং দুটি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। বিজেপি সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসি কার্যকর করার আহ্বান জানায়। দলটির একটি নির্বাচনী স্লোগান ছিল ‘দেশ আভি শরমিন্দা হ্যায়, আফজাল আভিবি জিন্দা হ্যায়।’ এর অর্থ হলো (উত্তেজনা ছড়ানো ছন্দে) ‘আফজাল গুরু জীবিত থাকায় আমাদের জাতি লজ্জিত।’ ফিসফিসানি আরো জোরালো করতে নতুন করে মিডিয়ার প্রচারণা শুরু হলো। চন্দন মিত্র, বর্তমানে বিজেপি এমপি, তখন তিনি পাইওনিয়ার পত্রিকার সম্পাদক, লিখলেন : ‘২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর যে কয়েকজন সন্ত্রাসী পার্লামেন্টে ঢুকেছিল, আফজাল গুরু তাদের একজন। সে-ই নিরাপত্তা কর্মীদের উপর প্রথমে গুলি ছুড়েছিল, নিহত ছয়জনের তিনজন সম্ভবত তার গুলিতে প্রাণ হারায়।’ খোদ পুলিশের চার্জশিটেও আফজালকে ওই অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারেও স্বীকার করা হয়, অভিযোগের প্রমাণ সুস্পষ্ট নয় : ‘যে ধরনের ভয়াবহ ষড়যন্ত্রমূলক মামলা এটি, সে ধরনের অপরাধময় প্রমাণ এতে দৃশ্যমান নয়।’ কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারপর বলা হলো, ‘ঘটনাটি, যাতে অনেক প্রাণহানি ঘটে, পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছে, এবং সমাজের সম্মিলিত বিবেক স্বস্তি পাবে, যদি অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।’ পার্লামেন্টে হামলা মামলায় আমাদের সম্মিলিত বিবেককে বিনির্মাণ করেছে? পত্রপত্রিকার প্রকাশিত খবর থেকে এটা তৈরি হয়েছে? টিভিতে যেসব ভাষ্য প্রচার করা হয়েছে, তা থেকে? আইনের শাসন নিয়ে উল্লাস প্রকাশের আগে আসুন আমরা দেখি সত্যি কী ঘটেছিল। যে সব লোক আইনের শাসনের জয় হয়েছে বলে দাবি করে উল্লাস প্রকাশ করছে, তারা যুক্তি দেখায়, এটা তো সত্যি, ভারতীয় আদালত গিলানিকে খালাস দিয়েছে এবং আফজালকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। এতে কি অবাধ ও নিরপে বিচার প্রমাণিত হয় না? দ্রুত বিচার আদালতে মামলাটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০০২ সালের মে মাসে। বিশ্ব তখনো ৯/১১-পরবর্তী উন্মাদনায় আচ্ছন্ন। মার্কিন সরকার আফগানিস্তানে তার ‘জয়’ নিয়ে আগাম উল্লাসে মত্ত। ভারতের গুজরাট রাজ্যে ওই বছরের ফেব্র“য়ারি মাসের শেষ দিক থেকে পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনের সহায়তায় হিন্দু ভাড়াটে গুন্ডারা মুসলিম নিধনযজ্ঞে মেতেছে, যা এখনো বিপ্তিভাবে চলছে। বাতাস সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ভারী। এমন এক পরিস্থিতিতে পার্লামেন্টে হামলা মামলাটি নিজস্ব পথে ছুটল। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে ফৌজদারি মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে যখন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়, যখন সাীদের জেরা করা হয়, যখন যুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করা হয়, তখন আপনি কেবল আইনের দৃষ্টিতে কথা বলতে পারেন, নতুন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন না। আর আফজাল গুরু তখন অত্যন্ত সুরতি সেলে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রয়েছেন, তার কোনো আইনজীবী ছিল না। আদালত নিযুক্ত জুনিয়র আইনজীবী একবারের জন্যও কারাগারে তার মক্কেলের কাছে যাননি, তিনি গুরুর পে কথা বলার জন্য একজন সাীকেও তলব করেননি এবং প্রসিকিউশনের সাীদের জেরাও করেননি। এমন পরিস্থিতি পরিবর্তনে কোনো কিছু করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন বিচারক। কিন্তু তবুও শুরুতেই মামলাটি খারিজ হওয়ার কথা। মাত্র কয়েকটি উদাহরণ এখানে তুলে ধরা হলো : গুরুর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সবচেয়ে শক্ত দুটি প্রমাণ ছিল গ্রেফতারের সময় জব্ধ করা একটি সেলফোন ও একটি ল্যাপটপ। সেগুলো সিলগালা করা হয়নি, অথচ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে তা করা দরকার ছিল। বিচারের সময় প্রকাশ পায়, গ্রেফতারের পর ল্যাপটপটির হার্ডডিস্কে প্রবেশ করা হয়েছিল। এতে কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাল পাস এবং জাল আইডেনটিটি কার্ড ছিল যা পার্লামেন্টে ঢোকার সময় ‘সন্ত্রাসীরা’ ব্যবহার করেছিল- আর ছিল পার্লামেন্ট ভবন নিয়ে জি টিভির একটি ভিডিও কিপ। অর্থাৎ পুলিশের ভাষ্যমতে, গুরু তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার হতে পারে, এমন কিছু ছাড়া আর বাকি সব মুছে ফেলেছিলেন। পুলিশের সাী জানান, যে গুরুত্বপূর্ণ সিম কার্ডটি ব্যবহার করে এই মামলার আসামিরা গুরুর সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, সেটি তিনি বিক্রি করেছিলেন ২০০১ সালের ৪ ডিসেম্বর। কিন্তু প্রসিকিউশনের নিজস্ব সেল রেকর্ডে দেখা যায়, সিমটি আসলে কার্যকর ছিল ২০০১ সালের ৬ নভেম্বর থেকে। আফজালকে পুলিশ কিভাবে পাকড়াও করল? তারা বলে, গিলানিই তাদেরকে তার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আদালতের রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে, গিলানিকে গ্রেফতার করার আগেই আফজালকে গ্রেফতারের নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। হাইকোর্ট এটাকে ‘বিষয়গত বৈপরীত্য’ হিসেবে অভিহিত করলেও এর ওপর জোর দেয়নি। গ্রেফতারি মেমোতে সার করেছিলেন বিসমিল্লাহ, গিলানির ভাই, দিল্লিতে। জব্ধ তালিকায় সই করেছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশের দুই লোক, তাদের একজন আত্মসমর্পণকারী ‘জঙ্গি’ হিসেবে অতীতে আফজালের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এমন ধারাই চলতে থাকে, পুলিশ মিথ্যা আর বানোয়াট প্রমাণের ¯তূপ দাঁড় করায়। আদালত এগুলো লক্ষ্য করে, কিন্তু কেবল সীমার মধ্যে থেকে পুলিশের আঙুল নাড়ানো অবলোকন করে। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। পার্লামেন্ট হামলার রহস্য উৎঘাটনে সত্যিকারভাবে আগ্রহী যেকোনো লোক উপস্থাপিত বিপুল প্রমাণ অনুসরণ করতে পারেন। কিন্তু কেউ করেননি। আর এর ফলে প্রকৃত চক্রান্তকারী অচিহ্নিত রয়ে গেছে। এ নিয়ে তদন্তও হয়নি। গুরুর প্রকৃত কাহিনী এবং যে ট্রাজেডি তার জীবনে ঘটে গেছে, সেটা এত বিশাল যে তা আদালত কে জায়গা হওয়ার নয়। আসল কাহিনী আমাদেরকে কাশ্মীর উপত্যাকায় নিয়ে যাবে। যে স্থানটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়ন জোন, যেখানে পাঁচ লাখ ভারতীয় সৈনিক (প্রতি চারজন বেসামরিক লোকের একজন) এবং সেনাশিবির ও নির্যাতন চেম্বারের গোলকধাঁধা কাশ্মীরী জনগণকে সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক ভারতের আবু গ্রাইবের [ইরাকে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত কারাগার] কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৯০ সাল থেকে, যখন আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রাম জঙ্গিতে পরিণত হয়, ৬৮ হাজার লোক মারা গেছে, ১০ হাজার গুম হয়েছে, এবং অন্তত এক লাখ নির্যাতিত হয়েছে। কারাগারের কে মৃত লাখ লাখ লোকের কাহিনীর চেয়ে গুরুরটি ভিন্ন। তার জীবন ও মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে দিনের অন্ধ আলোতে, তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে ভারতীয় গণতন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ভূমিকা পালন করেছে। এখন তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়ে গেছে। আমি আশা করি আমাদের সম্মিলিত বিবেক তৃপ্ত হয়েছে। না কি আমাদের রক্তের পেয়ালা এখনো অর্ধেক মাত্র পূর্ণ হয়েছে? অনুবাদ : হাসান শরীফ

মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১১

ভারতে মৃতরা কথা বলতে শুরু করেছে

দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ৩টায়, যুক্তরাষ্ট্রের বেতার সাংবাদিক ডেভিড বার্সামিয়ানকে ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। বেসরকারি বেতারে বিনামূল্যে সম্প্রচারের জন্য স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠান নির্মাণকারী এই বিপজ্জনক লোকটি ৪০ বছর ধরে ভারতে আসা-যাওয়া করছেন এবং এখানে তিনি উর্দুভাষা ও সেতার বাজানো শেখার মতো বিপজ্জনক সব কাজ করে আসছেন।

এডওয়ার্ড সাঈদ, নোয়াম চমস্কি, হাওয়ার্ড জিন, এজাজ আহমেদ ও তারিক আলী প্রমুখ সর্বলোকবিদিত বুদ্ধিজীবীদের বইয়ের মতো দীর্ঘ সব সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছেন বার্সামিয়ান (তিনি এমনকি চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যানের বই ‘ম্যানুফ্যাকচারি কনসেন্ট’-এর ওপর পিটার উইনটনিক নির্মিত ডকুমেন্টারি ফিল্মে এক বেলবটম পরা তরুণ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর ভূমিকায় অভিনয়ও করেছেন)।

ভারতে তার সাম্প্রতিক সফরগুলোতে সে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক ও লেখকদের (আমাকেসহ) বেতার সাক্ষাৎকারের একটি সিরিজ তৈরি করেছেন। কাজের জন্য বার্সামিয়ানকে তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া, লেবানন ও পাকিস্তানে যেতে হয়েছে। এসব দেশের কোনোটি কখনোই তাকে বিতাড়ন করেনি। তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রটি কেন এই একজন একাকি, সেতারবাদক, উর্দুভাষী, বামঘেঁষা বেতার প্রযোজকটিকে ভয় পায়? বার্সামিয়ান নিজে বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন :

‘এর পুরোটাই কাশ্মীর নিয়ে। আমি ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, পশ্চিমবঙ্গ, নর্মদা বাঁধ, কৃষকদের আত্মহত্যা, গুজরাটের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও বিনায়ক সেন মামলা নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু ভারত রাষ্ট্রের উদ্বেগের মর্মস্থান হচ্ছে কাশ্মীর। [এ সম্পর্কে] সরকারি ভাষ্যের কোনো বিরোধিতাই করা যাবে না।’

তার বিতাড়নের ওপর প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলো সরকারি ‘সূত্রদের’ এই ভাষ্য উদ্ধৃত করে যে, বার্সামিয়ান ‘তার ২০০৯-১০ সালের সফরকালে পর্যটন ভিসাধারী হয়েও পেশাদারি কাজে লিপ্ত হয়ে তার  ভিসার নিয়মাকানুন ভঙ্গ করেছিলেন।’ ভারতে ভিসার নিয়মকানুনগুলো এমন এক মজাদার গোপন ছিদ্র যার ভেতর দিয়ে সরকারের উদ্বেগ ও অনুরাগের বিষয়গুলো দেখে নেওয়া যায়। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’- এই টুটাফাঁটা পুরনো ব্যানারটি ব্যবহার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আদেশ জারি করেছে যে, বিভিন্ন কনফারেন্স ও সেমিনারে আমন্ত্রিত বিদ্বান ও শিক্ষাবিদদের ভিসা দেওয়ার আগে তাদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র পেতে হবে। করপোরেট সংস্থাগুলোর কার্যনির্বাহী ও ব্যবসায়ীদের তা প্রয়োজন হবে না।

কাজেই, এমন কেউ যে কোনো বাঁধে বিনিয়োগ করতে চায়, বা একটি ইস্পাত কারখানা তৈরি করতে চায় কিংবা একটা বক্সাইট খনি কিনতে চায় সে নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয় না, কিন্তু একজন পন্ডিত যে ধরা যাক বাস্ত্তচ্যুত বা সাম্প্রদায়িকতা বা বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান পুষ্টিহীনতার ওপর, কোনো সেমিনারে অংশ নিতে চায় সে নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়। মন্দ উদ্দেশ্য আছে এমন সন্ত্রাসবাদীরা সম্ভবত অনুমান করতে পেরেছে যে, তারা কোনো সেমিনারে যোগ দিতে চায় একথা বলার চেয়ে প্রাদা স্যুট পরে এসে যদি বলে যে তারা একটি খনি কিনতে ইচ্ছুক তবে তা হবে তাদের জন্য সব দিক দিয়েই মঙ্গলজনক।

ডেভিড বার্সামিয়ান কোনো খনি কিনতে বা কোনো কনফারেন্সে যোগ দিতে ভারত সফরে আসেননি। তিনি এসেছিলেন কেবল লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে। ‘সরকারি সূত্রসমূহের’ বক্তব্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, তার আগের সফরকালে সে জম্মু ও কাশ্মীরের ঘটনাবলী সম্পর্কে প্রতিবেদন করেছিল এবং এসব প্রতিবেদন ‘বাস্তব তথ্যভিত্তিক’ ছিল না। মনে রাখবেন, বার্সামিয়ানকে একজন প্রতিবেদক নয়; সে এমন এক লোক যে জনগণের সঙ্গে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভিন্নতামতাবলম্বীদের সঙ্গে, তারা যে সমাজে বাস করে সে সম্পর্কে আলাপ করে।

পর্যটকরা যেসব দেশে যায় সেখানকার লোকজনের সঙ্গে আলাপ করা কি তাদের জন্য অবৈধ? আমি যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ ভ্রমণে যাই এবং সেখানে যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাদের নিয়ে লিখি, এমনকি আমার লেখা যদি ‘বাস্তব তথ্যভিত্তিক’ নাও হয়, তবে কি তা আমার জন্য অবৈধ হবে। কোন ‘তথ্যগুলো’ ঠিক ও কোনগুলো ঠিক নয় তা কে নির্ধারণ করে।

বার্সামিয়ান যেসব আলাপচারিতা রেকর্ড করেছিলেন তার বিষয়বস্ত্ত বিশ্বের সবচেয়ে ঘন দখলদার সেনাঅধ্যুষিত রাজ্যটির (এক কোটি জনগণের জন্য আনুমানিক ছয় লাখ সক্রিয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য যেখানে নিয়োজিত) দৈনন্দিন জীবনের বদলে যদি কাশ্মীরের নির্বাচনে ভোটদানকারীদের যে বিপুল সংখ্যা তার প্রশংসাসূচক হতো তবে কি তাকে বিতাড়িত হতে হতো?

ডেভিড বার্সামিয়ানই কাশ্মীর বিষয়ে ভারত সরকারের সংবেদনশীলতার কারণে বিতাড়িত প্রথম ব্যক্তি নন। অধ্যাপক রিচার্ড শ্যাপিরো, স্যান ফ্র্যান্সিস্কো থেকে আসা এক নৃতত্ত্ববিদকে ২০১০ সালের নভেম্বরে কোনো কারণ না দর্শিয়ে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে বিতাড়ন করা হয়। এটা করা হয় সম্ভবত তার কাজের অংশীদার অঙ্গনা চ্যাটার্জিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। অঙ্গনা চ্যাটার্জি হচ্ছেন ইন্টারন্যাশনাল পিপলস ট্রাইব্যুনাল অন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড জাস্টিসের (মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার বিষয়ক আন্তর্জাতিক গণআদালত) যুগ্ম আহবায়ক। এ সংগঠনটি কাশ্মীরে চিহ্নহীন গণকবরগুলোর অস্তিত্ব প্রথম লিপিবদ্ধ করে।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ম্যানিলাভিত্তিক সংগঠন দ্য এশিয়ান ফেডারেশন এগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস (এফাদ) বা অনিচ্ছায় হারিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে এশীয় ফেডারেশন থেকে আসা মে অ্যাকুইনোকে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে বিতাড়ন করা হয়। চলতি বছরের প্রথম দিকে, ২৮ মে ভারতীয় স্পষ্টবাদী গণতান্ত্রিক অধিকার কর্মী গৌতম নবলাখকে শ্রীনগর বিমানবন্দর থেকে জোর করে দিল্লিতে ফেরত পাঠানো হয়। কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ এ বিতাড়নের সমর্থনে বলেন, নবলাখ ও আমার মতো লেখকদের কাশ্মীরে প্রবেশের কোনো প্রয়োজন নেই, কেননা ‘কাশ্মীর পোড়াবার জন্য নয়’।

দিল্লি ও সেই সঙ্গে শ্রীনগরে সীমান্ত প্রহরার দুটো সমকেন্দ্রিক বৃত্ত কাশ্মীরকে ক্রমশ বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে, যেন এটি ইতোমধ্যেই নিজস্ব ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন একটি স্বাধীন দেশে পরিণত হয়েছে। অবশ্য এর সীমান্তের অভ্যন্তরে সরকার ও সেনাবাহিনী যখন যা খুশি তাই করতে পারে। ঘুষ, ভীতি প্রদর্শন, ব্ল্যাকমেইল ও অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতার এক বিস্তৃত ধারার ভয়ঙ্কর এক মিশ্রন ব্যবহার করে কাশ্মিরী সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলটি ক্রমশ বিকশিত হয়ে এক বিকৃত শিল্প মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

সরকার যখন জীবিতদের চুপ রাখার চেষ্টায় রত, মৃতরা তখন কথা বলতে শুরু করেছে। ঠিক যখন রাজ্যটির মানবাধিকার কমিশন লজ্জায় শেষ পর্যন্ত এটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, কাশ্মীরের তিনটি জেলাতে ২ হাজার ৭০০টি চিহ্নহীন কবর রয়েছে, তখন বার্সামিয়ানের কাশ্মীর ভ্রমণের পরিকল্পনা করাটা ছিল সম্ভবত এক অসংবেদনশীল কাজ। অন্য জেলাগুলো থেকেও এমন হাজার হাজার কবরের খবর এসে উপচে পড়ছে। ঠিক যখন জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সামনে ভারতের রেকর্ড পর্যালোচনা হওয়ার কথা তখন চিহ্নহীন কবরগুলোর মাধ্যমে ভারত সরকারকে বিব্রত করাটা ছিল সম্ভবত এক অসংবেদনশীল কাজ।

বিপজ্জনক ডেভিড ছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রটি আর কাকে ভয় পায়? হ্যাঁ, লিঙ্গরাম কোডোপি নামে ছত্তিশগড় রাজ্যের দান্তেওয়াড়ার এক তরুণ আদিবাসী আছে, যাকে ৯ সেপ্টেম্বরে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ বলছে, এসার নামের এক লৌহ আকর খনি কোম্পানির তরফ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (মাওবাদী) কাছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তার জন্য চাঁদার টাকা দেওয়ার সময় তারা এক বাজার এলাকায় লিঙ্গরামকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। তার চাচী সোরি বলছে, সাদা পোশাক পরা পুলিশ পালনার গ্রামে তার দাদার বাড়ি থেকে তাকে একটি বোলোরো গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এমনকি তাদের নিজেদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ লিঙ্গরামকে গ্রেফতার করলেও মাওবাদীদের কিন্তু পালিয়ে যেতে দেয়। এটা হচ্ছে লিঙ্গরামের বিরুদ্ধে আনা ও পরে প্রত্যাহার করা একের পর এক নানা উদ্ভট, প্রায় দৃষ্টিভ্রমসম অভিযোগসমূহের সবশেষেরটি। তার আসল অপরাধ হচ্ছে, সে হচ্ছে একমাত্র সাংবাদিক যে স্থানীয় ভাষা গন্ডিতে কথা বলতে পারে এবং যে দান্তেওয়াড়ার গহীন পথগুলো চেনে, কেননা দান্তেওয়াড়া হচ্ছে ভারতের আরেক যুদ্ধক্ষেত্র যার কোনো খবর বাইরে যাওয়া চলবে না।

মধ্য ভারতের আদিবাসী উপজাতিদের আবাসভূমির বিশাল সব এলাকা কতগুলো গোপন চুক্তির অধীনে বহুজাতিক খনি ও অবকাঠামো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিয়ে, সরকার শত সহস্র নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করেছে ওই বনাঞ্চলগুলো আদিবাসীমুক্ত করতে। এর বিরুদ্ধে যত প্রতিরোধ সংগঠিত হয়েছে, সশস্ত্র ও নিরস্ত্র, সবই মাওবাদী আখ্যা দেওয়া হয়েছে (কাশ্মীরে এগুলো সব হচ্ছে ‘জিহাদি উপাদান’)।

গৃহযুদ্ধ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, শত শত গ্রাম আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। হাজার হাজার আদিবাসী পালিয়ে গিয়ে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। বনগুলোতে লুকিয়ে সন্ত্রস্ত জীবন কাটাচ্ছে শত সহস্র লোক। অরণ্য অবরোধ করে ঘাঁটি গেড়েছে আধাসামরিক বাহিনীগুলো। যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদী ও ওষুধপত্র কিনতে বাজারে যাওয়া গ্রামবাসীর জন্য হয়ে উঠেছে এক দুঃস্বপ্ন। কত লোক যে জেলে পচছে তার সংখ্যা জানা নেই। যাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিযোগ আনা হয়েছে কিন্তু তাদের পক্ষ সমর্থন করার জন্য কোনো উকিল নেই। ওই বনগুলো থেকে খুব কম খবরই বাইরে আসতে পারে এবং মৃতদেহের কোনো হিসাব রাখা হয় না।

অতএব, তরুণ লিঙ্গরাম কোডোপি কেন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা বোঝা আর শক্ত নয়। সাংবাদিক হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে সে দান্তেওয়াড়াতে গাড়ি চালাত। পুলিশ ২০০৯ সালে তাকে গ্রেফতার করে ও তারি জিপটি জব্দ করে নেয়। তাকে ৪০ দিন একটা ছোট টয়লেটে আটকে রেখে সালওয়া যুদুমের একজন বিশেষ পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। সালওয়া জুদুম হচ্ছে একটি সরকার গঠিত প্রহরী সেনাদল যাদের ওই সময়ে জোর করে লোকজনকে তাদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করার কাজে নিয়োগ করা হয়- পরবর্তীতে সুপ্রিমকোর্ট সালওয়া জুদুমকে সংবিধানবিরোধী বলে ঘোষণা করে।

গান্ধীবাদী কর্মী হিমাংশু কুমার আদালতে একটি হেবিয়াস কোর্পাস (কোনো ব্যক্তিকে অন্তরীণ রাখার বৈধতা যাচাই করার জন্য তাকে বিচারকের সামনে বা আদালতে হাজির করার নির্দেশ জারি করার) আবেদন দাখিল করার পর, পুলিশ লিঙ্গরামকে মুক্তি দেয়। কিন্তু, তারপর পুলিশ লিঙ্গরামের বৃদ্ধ পিতা ও তার পরিবারের আরো পাঁচজন সদস্যকে গ্রেফতার করে। পুলিশ তার গ্রামের ওপর আক্রমণ চালায় এবং গ্রামবাসী তাকে আশ্রয় দিলে, তাদের হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত লিঙ্গরাম দিল্লিতে পালিয়ে যায়, যেখানে বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীরা তাকে একটি সাংবাদিকতা বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়। ২০১০ সালের এপ্রিলে সে দান্তেওয়ারাতে গিয়ে গ্রামবাসীদের দিল্লি নিয়ে আসে সালওয়া যুদুম, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীগুলোর বর্বরতার ব্যাপারে স্বাধীন গণআদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। সে নিজে যে সাক্ষ্য দেয় তাতে লিঙ্গরাম মাওবাদীদেরও কড়া সমালোচনা করে।

কিন্তু ছত্তিশগড় পুলিশকে তা ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। ২০১০ সালের ২ জুলাই অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশ মাওবাদী পার্টির মুখপাত্র প্রবীণ মাওবাদী নেতা কমরেড আজাদকে গ্রেফতার ও হত্যা করে। ছত্তিশগড় পুলিশের উপ-মহাপরিচালক কাল্লুরি এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, মাওবাদী পার্টি কমরেড আজাদের ভূমিকা পালনের জন্য লিঙ্গরাম কোডোপিকে নির্বাচিত করেছে (এটা যেন ১৯৩৬ সালের ইয়ানানে কোনো তরুণ স্কুলছাত্রের বিরুদ্ধে ঝৌএনলাই হওয়ার অভিযোগ আনার মতো)। এই অভিযোগ এমন বিদ্রূপের মুখোমুখি হয় যে, পুলিশকে তা প্রত্যাহার করতে হয়। কিছুদিন পরেই ওরা দান্তেওয়াড়ায় কংগ্রেসের এক আইন প্রণেতার ওপর এক মাওবাদী আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে লিঙ্গরামকে অভিযুক্ত করে। কিন্তু, অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, ওরা তাকে গ্রেফতার করার জন্য কোনো উদ্যোগই নেয়নি।

লিঙ্গরাম দিলিলতে থেকে যায়, তার কোর্স শেষ করে ও সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা পায়। ২০১১ সালের মার্চে আধাসামরিক বাহিনীগুলো দান্তেওয়াড়ার তিনটি গ্রাম- তাদমেতলা, তিম্মাপুরম ও মোরাপল্লি জ্বালিয়ে দেয়। ছত্তিশগড় সরকার এর জন্য মাওবাদীদের দায়ী করে। সুপ্রিমকোর্ট সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা কেন্দ্রীয় অনুসন্ধান ব্যুরোকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়। লিঙ্গরাম একটি ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে দান্তেওয়াড়ায় ফিরে আসে এবং গ্রামে গ্রামে ঘুরে গ্রামবাসীর সাক্ষ্য সরাসরি রেকর্ড করে যারা এ ঘটনার জন্য পুলিশকে অভিযুক্ত করে। এ কাজটি করে সে হয়ে ওঠে দান্তেওয়াড়ার যে ক’জনকে পুলিশ সবচেয়ে হন্যে হয়ে খুঁজছিল তাদের একজন। অবশেষে ৯ সেপ্টেম্বরে পুলিশ তাকে ধরতে সক্ষম হয়।

লিঙ্গরাম ছত্তিশগড়ের জ্বালাতন সৃষ্টিকারী সংবাদ সংগ্রাহক ও সরবরাহকারীদের এক বেশ বড়সড় দলে যোগ দেয়। তাদের মধ্যে সবার আগে যার মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয় তিনি হচ্ছেন লোকমান্য চিকিৎসক বিনায়ক সেন, যিনি ২০০৫ সালেই সালওয়া জুদুমের নানা অপরাধ সম্পর্কে প্রথম সতর্ক করে দেন। তাকে মাওবাদী হওয়ার অভিযোগে ২০০৭ সালে গ্রেফতার করা হয় ও আজীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। বছরের পর বছর জেল খেটে, তিনি এখন জামিনে মুক্ত আছেন।

দান্তেওয়াড়ার অরণ্যের গ্রামগুলোয় যখন প্রথম যাই তখন আমার পথপ্রদর্শক ছিলেন কোপা কুনজম। সে সময় সে হিমাংশু কুমারের বানভাসী চেতনা আশ্রমের কাজে যুক্ত ছিল এবং লিঙ্গরাম বেশ পরে যা করার চেষ্টা চালায় সেও তা-ই করছিল- প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে যাওয়া, সংবাদ সংগ্রহ করে আনা এবং যে বিভীষিকা মূর্ত হয়ে উঠছিল সতর্কতার সঙ্গে তার তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করে রাখা। দান্তেওয়াড়ায় আসা সাংবাদিক, লেখক ও শিক্ষাবিদদের শেষ নিরপেক্ষ আশ্রয় ওই আশ্রমটিকে ছত্তিশগড় সরকার ২০০৯ সালের মে’তে ধ্বংস করে দেয়।

২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে মানবাধিকার দিবসে কোপাকে গ্রেফতার করা হয়। এক ব্যক্তিকে হত্যা ও অন্য একজনকে অপহরণ করার কাজে মাওবাদীদের সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। কিন্তু, কোপার বিরুদ্ধে মামলাটি ঝুলে যাচ্ছে, কেননা যাকে অপহরণ করা হয় সেই লোকসহ পুলিশের সাক্ষীরা পুলিশের কাছে আগে যে জবানবন্দি দিয়েছিল বলে দাবি করা হয় তা অস্বীকার করেছে। এতে আসলে কিছু আসে যায় না, কেননা ভারতে বিচার প্রক্রিয়াটাই শাস্তি।

নিজেকে নিরপরাধী প্রমাণ করতে কোপার হয় তো বহু বছর লাগবে। কোপার দেখাদেখি সাহস করে যারা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে তাদেরও অনেককে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে যেসব নারীও আছে যারা ধর্ষিত হওয়ার অপরাধ করেছিল। কোপার গ্রেফতারের কিছুদিনের মধ্যেই হিমাংশু কুমারকে দান্তেওয়াড়া থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

কালক্রমে এখানেও মৃতরা কথা বলতে শুরু করবে। আর শুধু মৃত মানুষই নয়, মৃত ভূমি, মৃত নদীগুলো, মৃত পর্বতগুলো এবং মৃত অরণ্যসমূহে মৃত প্রাণীকূলও তাদের কথা শোনার দাবি জানাবে।

নজরদারি, ইন্টারনেট প্রহরা ও ফোনে আড়িপাতার এই যুগে যারা স্পষ্ট কথা বলে তাদের ওপর চালানো দমন যখন দিনে দিনে আরো বেশি কঠোর হয়ে উঠেছে তখন ভারত যেভাবে সাহিত্য উৎসবের স্বপ্নভূমি হয়ে উঠছে তা সত্যি অদ্ভুত। এসব উৎসবের অনেককেই অর্থ যোগায় সেই সব করপোরেশন যাদের হয়ে পুলিশ তাদের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

শ্রীনগরের হারুদ সাহিত্য উৎসবটি এ মুহূর্তে যা স্থগিত রয়েছে ভারতের নবতম, সবচেয়ে উদ্দীপনাময় সাহিত্য উৎসব হওয়ার কথা ছিল- ‘হেমন্তে পাতারা যেভাবে বদলায়, কাশ্মীর উপত্যকাও তেমনি কবিতা, সাহিত্য সংলাপ, বিতর্ক ও আলোচনার শব্দে অনুরণিত হবে…’।

এর আগে আয়োজকরা এটাকে একটি ‘অরাজনৈতিক’ অনুষ্ঠান হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু তারা জানায়নি, যে পাশবিক সামরিক দখলদারিত্ব শত সহস্র জীবন কেড়ে নিয়েছে তার শাসকবৃন্দ অথবা প্রজাবর্গের পক্ষে কীভাবে ‘অরাজনৈতিক’ হওয়া সম্ভব। আমি মনে মনে প্রশ্ন করি- অতিথিরা কি ভ্রমণ ভিসা নিয়ে আসবে? শ্রীনগর ও দিল্লির জন্য কি তা হবে আলাদা আলাদা? তাদের কি নিরাপত্তা ছাড়পত্রের প্রয়োজন হবে?

এসব ভেজাল স্বাধীনতার আনন্দ কোলাহল বিতাড়িতদের যখন হাত পা ধরে ঝুলিয়ে প্রস্থানোদ্যত উড়োজাহাজে তুলে দেওয়া হয় তখন বিমানবন্দরের করিডোরে ওঠা পায়ের শব্দ স্তিমিত করতে সাহায্য করে, শক্ত, গরম কব্জির চারপাশে হাতকড়া আটকানোর যে ক্লিক শব্দ আর জেলখানার দরজাগুলো বন্ধ হওয়ার যে ঠান্ডা ধাতব ক্ল্যাং শব্দ তা ঢেকে দিতেও সাহায্যে আসে। আমাদের ফুসফুসের অক্সিজেন ক্রমশই কমে আসছে। এখনো আমাদের দেহে যে শ্বাস তা ব্যবহার করে হয়তো এখন আমাদের বলা উচিত : ‘হারামি দরোজাগুলো খুলে দাও’।

বুধবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১১

কোন বিপ্লব প্রাধান্য পাবে



সম্প্রতি বিবিসির হিন্দি সার্ভিসের রাজেশ যোশীর সঙ্গে এই সাক্ষাৎকার প্রদান করেন যাতে রয়েছে ভারতের বর্তমান দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে আরব অভ্যুত্থান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ সম্পর্কে তার খোলাখুলি বক্তব্য। আউটলুক ইন্ডিয়া অনলাইনে প্রকাশিত চিন্তার খোরাক যোগানো এই সাক্ষাৎকারটির ইংরেজি রূপান্তর থেকে নিবন্ধাকারে ভাষান্তর করেছেন নেয়ামুল হক
নিউইয়র্কেও টুইন টাওয়ারে হামলার দশ বছর পার হয়ে গেল ১১ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে বিশ্বজুড়ে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। যুদ্ধের বিস্তার ঘটেছে অনেক। মূলত সম্পদ দখল করার জন্যে শুরু করা যুদ্ধের নাম দিয়েছে তারা এখন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই’। এর একটি গ্রহণযোগ্যতা যেমন তৈরি করা হয়েছে, তেমনি আবার এই যুদ্ধের প্রকৃত চেহারাটাও বেরিয়ে পড়ছে।
তবে যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপজ্জনক দিকটি হলো এই, ক্রমশই এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, এ যুদ্ধে তারা জয়ী হতে পারবে না, এ জাতীয় যুদ্ধ শুরু করা যায় বটে, তবে শেষ পর্যন্ত জয়ী হওয়া যায় না। যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি। ইরাক যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি। আফগানিস্তান যুদ্ধেও জয় অধরাই থেকে গেছে। লিবিয়া যুদ্ধেও জয়ী হওয়া সম্ভব হবে না। শুরুর দিকে এসব যুদ্ধে বিজয়ের কিছুটা দাবি করা হয়। কিন্তু সময় যতই গড়ায় ততই দেখা যায় যে, দখলদার বাহিনী ধীরে ধীরে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পাকে আটকে যাচ্ছে এবং ক্রমশ হীনবল হয়ে পড়ছে। কিছুটা এ কারণেও বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমশ বিভাজনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আরেকটি বিপদের দিক হলো এই যে, যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নিক্ষেপসহ এসব যুদ্ধে প্রথাগত অস্ত্রের পরিবর্তে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ফলে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করছে তারাও ক্রমশ উপলব্ধি করতে পারছে যে, প্রথাগত কায়দায় যুদ্ধ চালিয়ে তারা জয়ী হতে পারবে না। এ জন্যই দেখা যায়, প্রথাগত অস্ত্রকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং প্রতিরোধের বেপরোয়া ধরনের হিংসাত্মক কৌশল বেছে নিচ্ছে তারা। মতাদর্শগত দিক থেকেও তারা ক্রমাগত বেশি করে হিংসাত্মক হয়ে উঠছে। কারণ মতাদর্শগতভাবে উজ্জীবিত না হলে একজন মানুষ আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দিতে পারে না। সুতরাং খুবই বিপজ্জনক একটি সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তালিবান যেনবা কোনো না কোনো লেবাসে আবারো আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসীন হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে সাদ্দাম হোসেনের মতো মানুষেরা তো প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্রই এদের ক্ষমতায় বসায়, সমর্থন দেয়, অর্থ এবং অস্ত্র যোগায়। ব্যাপারটি হলো এরকম যে, কোনো একটি দেশের ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমে সেখানে কিছু স্বৈরশাসক সৃষ্টি করতে হবে। তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের আবার একে একে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। এমনিভাবে দেশটি একসময় ক্ষমতার পালাবদলের নোংরা পাকে আটকে যাবে। এর পরই লোক দেখানো কিছু একটা ঘটনার আড়ালে আস্তে আস্তে দেশটির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
আফগানিস্তানেও ঠিক এ ব্যাপারটিই ঘটেছে। সুতরাং পৃথিবী স্বৈরশাসক, একনায়ক, কিংবা তালিবান মুক্ত হয়ে যাবে এমনটি আপনি আশা করতে পারেন না। তালিবানও তারাই সৃষ্টি করেছে। সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের সময় তারাই তালিবানের হাতে মতাদর্শিক এ অস্ত্রটি তুলে দিয়েছিল। ব্যাপারটি এখন কেউই আর উল্লেখ করছে না। পাকিস্তানে যে সন্ত্রাসীরা আস্তানা গেঁড়ে বসেছে সেসব নিয়ে তারা খুব কথা বলছে অথচ এসব সন্ত্রাসী আস্তানার পেছনে অর্থ ঢেলেছে খোদ সিআইএ এবং সৌদি আরব। এখান থেকে জন্ম নিয়েছে বড় ধরনের স্বৈরশাসক এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের মদদও দিয়ে যাচ্ছে।
আরব বিশ্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর অবশ্যই অত্যন্ত ইতিবাচক কিছু দিক রয়েছে। তবে মিশরের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বিপদ এখনো কাটেনি। হোসনি মুবারক ৪০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। আমরা জানি, তাহির স্কয়ারে সংঘটিত অভ্যুত্থান ঘটনার তিন মাস আগে থেকেই পত্রপত্রিকাগুলো প্রচার করে আসছিল যে, মুবারক মৃত্যুশয্যায়। এরপরই অভ্যুত্থানটি ঘটল এবং ঘটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলো এর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তারাই ঠিক করে, কোন বিপ্লবের খবর প্রচার করতে হবে আর কোনটি করতে হবে না। আর এখানেই রয়েছে আসল রাজনীতি। কাশ্মীরেও কিন্তু এ জাতীয় অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে চলেছে প্রচুর। কিন্তু এগুলো কমবেশি সবসময় প্রচারের আড়ালেই থেকে গেছে। মিসরের অভ্যুত্থানের ঘটনা যথেষ্ট প্রচার পেলেও শেষ দিকে দেখেছেন সংবাদ শিরোনামগুলো বলছিল, ‘মিসর মুক্ত’ সেনাবাহিনী দায়িত্বও নিয়েছে।’ এখন সেখানে ১০ হাজার মানুষ সামরিক  ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন। সম্ভবত সেখানে এখন মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থান ঘটতে এবং একটি বোঝাপড়ার মাধ্যমেই এটা হচ্ছে। আমি এটিকে একটি সফল অভ্যুত্থান এবং প্রকৃত গণতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করতাম যদি দেখতাম যে, গাজা অবরোধের ঘটনায় মিসরের ভূমিকা এতে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তেমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে কিনা তা আমি এখনো জানি না।
বহু ধরনের ঘটনাই এখন ঘটছে এবং ঘটানো হচ্ছে। ভারতে এবং এসব স্থানে জনগণের শক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। জনগণ ক্রুব্ধ ও ক্ষুব্ধ। জনগণ সত্যি সত্যি তেঁতে আছে। ক্ষোভের যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে। স্বৈরশাসনের অধীনে বসবাস করতে করতে তারা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ক্ষোভের বড় পাথরটিতে একটু নাড়া পড়তেই তারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে। কিন্তু সেই বিক্ষুব্ধতা কি প্রকৃত কোনো গণতন্ত্রের পরিণতি পাচ্ছে? নাকি তা অন্য কোনো পথে চালিত হচ্ছে? আমরা এখনো সেটা দেখার অপেক্ষায়ই আছি। স্বৈরশাসনের স্থলে যদি সামরিক শাসন প্রতিস্থাপিত না হয় তবেই আমি খুশি হব। আমি খুশি হতাম যদি দেখতাম, পরিকল্পনা করে কোনো কিছু ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে না কিংবা যা ঘটছে তাকে আবার ভিন্ন কোনো খাতে প্রবাহিত করা হচ্ছে না। কিন্তু এই মুহূর্তে মিসরে লোকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তাদের সামরিক ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি করা হচ্ছে। হোসনি মুবারক আমলেও এসবই ঘটত। হোসনি মোবারকের পতনে অবশ্যই আমি খুশি। তবে আপনি এমন সব ঘটনায় কেন উচ্ছ্বসিত হবেন যেসব ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মতো সঠিক কোনো উপাদান এষনও সৃষ্টি হয়নি?
আমি সব ধরনের গণআন্দোলনকে সমর্থন করি না। ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ গণআন্দোলন হওয়া সত্ত্বেও রামজন্মভূমি আন্দোলনকে আমি সমর্থন করিনি। সেটি ছিল বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণের আন্দোলন। আমি মনে করি, সবধরনের ফ্যাসিবাদই নিজেকে গণআন্দোলন হিসেবে জাহির করতে পারে। কিন্তু ফ্যাসিবাদকে আমি সমর্থন করি না। বাছবিচারবিহীনভাবে সবধরনের গণআন্দোলনকেই আমি সমর্থন করি না। বিশেষ করে আমি বলব, আন্না হাজারের নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলনটির মধ্য দিয়ে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছিল সেটি অনুধাবন করাটা খুবই জরুরি। যা ঘটছিল তা কিন্তু খুব সহজ এবং সরল ব্যাপার ছিল না। বর্তমান সময়ে খনি খনন করপোরেশন এবং টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানিগুলোর ব্যাপক দুর্নীতির খবর ফাঁস হয়ে পড়ছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে সরকারের কিছু মহল এবং গুমাধ্যমও। এসব দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি ডলার লুট হয়ে যাচ্ছে এবং এর জন্য কোনো রকম জবাবদিহিও করতে হচ্ছে না কাউকে। সরকারের পক্ষ থেকেও নয়, করপোরেশনগুলোর পক্ষ থেকেও নয়। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমনে প্রচন্ড রকমের ক্ষোভ জমা হয়ে আছে।
এ নিয়ে এখন যা ঘটছে তার ব্যাপারে আমি খুবই সন্ধিগ্ধ হয়ে পড়েছি। কারণ আমার ধারণা একেবারে ওপর থেকে শুরু করে নিচ পর্যন্ত যে ক্ষোভ জমে আছে তাকে একটি গণআন্দোলনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বহুমাত্রিক ও বহুবর্ণিল এই ক্ষোভকে ব্যবহার করা হচ্ছে সুনির্দিষ্ট একটি আইনকে কার্যকর করার বিষয় সামনে রেখে। আমার তো মনে হয় না কেউ এমনকি যারা এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখিত এই আইনটি তারা কেউ পড়ে দেখেছেন। আপনি যদি বিলটি পড়ে দেখেন তবে দেখবেন, আইনগত দিক থেকেই এটি কেবল হাস্যকর নয়, যারা নিজেদের টিম আন্না বলে পরিচয় দিচ্ছেন তারাও বলছেন জনগণ খেপে আছে, আর আমরা সেই ক্ষোভ প্রশমনে কিছুটা ওষুধ ঢালছি। টিম আন্নার লোকজনও বলছেন, জনগণ এই বিলটি পড়ে দেখেনি। কিন্তু তারা বলছে, ‘অসুস্থতার জন্য আমাদের কিছু ওষুধ দাও।’ তবে ওষুধের বোতলের গায়ে কী লেখা আছে সেটিও তারা পড়ে দেখছেন না। খুব, খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ এটা পড়েছে। আর যে ওষুধটি তাদের দেওয়া হয়েছে, সে ওষুধটি কিন্তু তাদের ওই রোগের চাইতেও অনেক বেশি বিপজ্জনক। আমার ভয়টা এখানেই। আর আমরা সবাই দেখলাম, নৈতিকতার এই আন্দোলন একটা পর্যায়ে এসে পুরনো ধর্মীয় ফ্যাসিবাদেও সাহায্য নিল এবং সংখ্যালঘুদের এ থেকে আলাদা করে দিল।
মেধাপাটেকর বা প্রশান্ত ভূষণের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয় এটি নয়। আমার সন্দেহ হচ্ছে, লোকপাল বিলের পুরো বিষয়টির ব্যাপারে তারা অবহিত আছেন কিনা। আমি তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। তারা কেউই তাদের কর্মজীবনে কখনো রাজনীতিতে জড়িত হননি। তারা এটিকে সবসময়ই দরজার বাইরে রেখে এসেছেন। আমি শুধু বলতে চাচ্ছি যারা ৩০ আগস্টের মধ্যে কোনো রকম আলাপ-আলোচনা ছাড়াই পার্লামেন্টে বিলটি পাস করাতে চাচ্ছিলেন তারা কেউ অন্তত বিলটির ওপর যথাযথ একটি আলোচনা উপস্থাপন করুন। আপনি যদি বিলটির দিকে তাকান তো দেখবেন এটি একটি ভীতিকর আইন। প্রথমত, এটি খুবই দুর্বলভাবে প্রণীত। এই বিলে বলা হয়েছে সঠিক শ্রেণী থেকে আগত ১০ জন সৎ ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গঠন করা হবে এবং সেখানে ৩০ হাজার অফিসার কর্মরত থাকবেন। এসব অফিসার কোথা থেকে আসবেন বা তারা কারা সে সম্পর্কে বিলটিতে কিছুই বলা নেই। আমাদের মতো একটি সমাজে দুর্নীতি বলতে কী বা কোনটাকে বোঝানো হয় সে সম্পর্কেও কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি এখানে। সর্বত্রই দুর্নীতি আছে। একজন গরিব মানুষকে সরকারি অফিসারের কাছ থেকে রেশনের বিলটি পেতে যেমন ঘুষ দিতে হয় তেমনি ঘুষ লেনদেন হয় করপোরেট পর্যায়ে বিনাপয়সায় নদীগুলো পেতে কিংবা পাহাড়গুলোতে খনি খননের কাজ চালাতে।
তবে দুর্নীতি হচ্ছে একটি মূল্যবোধগত বিষয়, যাকে একটি আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা দরকার। আমি সবসময়ই বলে আসছি যে, এমন বহুসংখ্যক কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিক আছেন যারা পরিচয়হীনভাবে বেঁচে আছেন, যারা কখনো এই আইনি কাঠামোর আওতায় আসেননি। ধরুন আপনি দিল্লিতে বসবাস করছেন এখানে অসংখ্য বস্তি রয়েছে, রয়েছে বেআইনি হকার এবং অননুমোদিত বসতি। হঠাৎ একজন মধ্যবিত্ত হয় তো বলে বসতে পারেন ‘আমি জোরবাগে থাকি এবং সেখানে একটি বেআইনি বস্তি রয়েছে। রাজনীতিবিদরা এই বস্তিটি রক্ষা করে কারণ তারা সেখান থেকে ভোট পান। মিউনিসিপ্যালটিও এ ব্যাপারে কিছু বলছে না, কারণ তারা এখান থেকে ঘুষ পায়। এই বস্তিবাসীদের এখান থেকে বের করে দেওয়া হোক। কারণ তারা বেআইনিভাবে এখানে থাকছে।’ দুর্নীতি বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে কিন্তু কোনো বিতর্কই হয়নি। অথচ তারা একটি আইনের দাবি জানাচ্ছেন। এ আইনের আওতায় একেবারে ওপরের দিকে থাকবেন ১০ জন লোক এবং তাদের অধীনে স্থাপিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোটিতে আরো ৩০ হাজার কর্মকর্তা কর্মরত থাকবেন। সরকারের কাছ থেকে তারা বড় ধরনের আর্থিক বরাদ্দ পাবেন। তারা প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিচার বিভাগের একেবারে নিম্নস্তর পর্যন্ত যে কোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে, শাস্তি দিতে পারবে, তাদের টেলিফোনে অাঁড়ি পাততে পারবে, তাদের চাকরিচ্যুত করতে পারবে, সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবে এবং তাদের দৈনন্দিন কর্মকান্ড তদন্ত করতে পারবে। আসলে তাদের দিয়ে নতুন একটি সমান্তরাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এসব কথা না হয় বাদই দিলাম। আসল বাস্তবতাটা কী? না, বেসরকারিকরণ এবং বিশ্বায়ন নীতির কারণে যেই মধ্যবিত্ত এক সময় লাভবান হয়েছিল তারা এখন এই গণতন্ত্রের ব্যাপারে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে।
আমার তো মনে হয় জনগণের অধিকার আদায়ের এখন একটি মাত্র রাস্তাই আছে। সেটি হলো আমাদের এমন একটি বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে যেখান থেকে আমরা সব ব্যাপারে কী করে জবাবদিহিতা দাবি করতে হয় তা শিখতে পারি। জনলোকপাল বিল তো আসলে কেবল নতুন আরেকটি উচ্চস্তরের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার কথাই বলে। আমার বক্তব্য হলো, বসবাসের উপযোগী যেই কাঙ্ক্ষিত সমাজটির দিকে আমরা এগিয়ে যেতে চাই সেটি পেতে হলে সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতে হবে এবং এটি তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা নিজেদের অধিকার ও দাবি আদায়ের জন্য লড়াই করতে থাকা মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারব। এমন লড়াই তো কেউ কেউ করছে। সুতরাং এটা বললে চলবে না যে, দান্তেওয়াড়ায় মানুষ খুন হচ্ছে তাতে আমার কী? সেটা তো আমার নিজের সমস্যা না। আমি একজন মধ্যবিত্ত মানুষ এবং আমি বিশ্বাস করি যে, আমি সুযোগ-সুবিধা পাব। আমরা যদি একটি গণতন্ত্রের মধ্যে বসবাস করে থাকি এবং আপনার মনে যদি এ বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, সব মানুষই ন্যূনতম পর্যায়ের হলেও কিছু না কিছু অধিকার ভোগ করবে- কেবল তখনই আপনি এ ব্যাপারে আপনার চোখটি খুলতে পারবেন। এ ব্যাপারটিই আমি সবসময় বলে আসছি এবং যেভাবে পেরেছি আমার এ বক্তব্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। আমি তাই তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছি যারা নিজেদের রক্ষা করার আন্দোলন গড়ে তুলেছে, যারা বড় বাঁধ থেকে শুরু করে সবধরনের খনি খনন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা তাদের ভূমির অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। তারা বড় বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সেটি সেনাবাহিনীও হতে পারে কিংবা হতে পারে বড় বড় করপোরেশন বা অন্য কিছু।
বুকার পুরস্কার এবং এ জাতীয় অন্য সব কিছুই আমার কাছে অর্থহীন। জগতে এমন বহু মানুষ আছেন যারা জুতা কিংবা কোকাকোলা বিক্রি করার জন্য নিজেদের খ্যাতিকে ব্যবহার করছেন। কোনো মানুষই অকারণে নিজের খ্যাতিকে ব্যবহার করে না। আমার বিষয়টি হলো আমি একজন লেখক। আমি এই পৃথিবীটাকে ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যাচাই করি। আমি সবসময়ই বলে আসছি যে, ‘ভারতের উন্নয়ন’ নামে যে কথাগুলো চালু আছে এগুলো আসলে অর্থহীন কথাবার্তা। আমার প্রশ্ন হচ্ছে ভারত বলতে আমরা কী বুঝি? আপনি যখন ‘ভারত’ শব্দটি উচ্চারণ করেন তখন আপনি এটি দিয়ে কাকে বুঝাচ্ছেন? আপনি কি কয়েকশ’ কোটি কোটিপতিদের কথা বলছেন নাকি প্রায় ৮৩ কোটি মানুষের কথা বলছেন যারা দৈনিক ২০ রুপিরও কম আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করে থাকে? এটা ঠিক যে, ভারতে কিছুসংখ্যক মানুষ অতিদ্রুত নিজেদের কল্পনার চাইতেও বেশি পরিমাণে ভাগ্যের উন্নতি ঘটিয়েছে। তবে সেটি তারা করেছে অধিকাংশ ভারতীয়র কাঁধ এবং শরীরের ওপর পা রেখে।
দেখুন আমি সব সময়ই বলি, ধরুন একটি ঘরের মধ্যে ১০ জন মানুষ আছেন। তাদের মধ্যে একজন কোটি কোটিপতি হয়ে গেলেন এবং আরো দু’জন মোটামুটি সঙ্গতিসম্পন্ন হয়ে উঠলেন। কিন্তু বাকি সাতজন হয়ে রইলেন অনাহারক্লিষ্ট। তখন হয় তো কেউ একজন বলে উঠলেন, দেখুন এই ঘরটির মধ্যে সাতজন মানুষ না খেয়ে আছে। উত্তরে আপনি কি বলবেন? আপনি হয় তো বলবেন দেখুন, এতটা নেতিবাচক হচ্ছেন কেন? মানুষ তো উন্নতি করছে! আমি কে, আমি কী জয় করেছি কিংবা কী জয় করতে পারিনি সেটা বড় কথা নয়। আমি যদি এমন কিছু বলি যা যুক্তিসঙ্গত এবং যার প্রাসঙ্গিকতা আছে তবে সে কথাটার একটা মূল্য এই পৃথিবীতে থাকবে। কিন্তু আমি যদি নির্বোধ হই, যদি নেতিবাচক হই কিংবা হই অর্থহীন একজন মানুষ তবে এ পৃথিবী থেকে আমার নাম-নিশানা মুছে যাবে। সুতরাং কোনো ব্যাপারই ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার কিছু নেই এবং প্রকৃত কোনো কাজের কথাও নয় সেটি।
মাওবাদ অবশ্যই কোনো সমাধান নয়। আমি বারবারই বলে এসেছি যে, সমাধানের পথ হচ্ছে অস্তিত্ব রক্ষার বহুমাত্রিক লড়াই। এই লড়াইয়ের একটি পথ হয় তো মাওবাদীরা বেছে নিয়েছে এবং সেটি হচ্ছে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ। তারা যুদ্ধ করছে গহীন অরণ্যে, যে অরণ্য ছেয়ে আছে আধাসামরিক বাহিনীর সৈন্য আর পুলিশ বাহিনীর সদস্যতে। আমি নিশ্চিত আদিবাসী অধ্যুষিত যেসব গ্রামে কোনো দিন কোনো টেলিভিশন ক্যামেরা পৌঁছায় না, সেখানে গান্ধীবাদী কোনো অনশন আন্দোলনের সূচনা ঘটে না। সেখানে কেবল একটি লড়াইয়ের সুযোগই আছে। আর সেটি হলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন। গভীর সেই অরণ্যের বাইরে অন্য যে কোনো স্থানে এ জাতীয় সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেওয়া হতো। অরণ্যের বাইরে মাওবাদীদের তেমন কোনো সাফল্যই নেই। অন্য যেসব প্রতিরোধ আন্দোলন রয়েছে সেগুলোর দিকেও একবার তাকানো দরকার। এসব প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রয়োজনীয় কৌশলগত দিক ও মতাদর্শগত দিকের মধ্যেকার পার্থক্য নিয়ে আমরা প্রায়শই বিভ্রান্তিতে ভুগি। তা সত্ত্বেও আমার মতে, ভারতে চমৎকার একটি ব্যাপার বিদ্যমান রয়েছে। সেটি হলো- এখানে নিজ নিজ অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বহু ধরনের আন্দোলন-সংগ্রাম চলমান রয়েছে।
অধিকার রক্ষার এসব আন্দোলনে কেউ কেউ বা কোনো কোনো গোষ্ঠী আবার বিজয়ীও হচ্ছে। আপনি যদি আবারও দুর্নীতির প্রসঙ্গটি তোলেন তবে আমি বিভিন্ন সরকার এবং বেসরকারি করপোরেশনগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত শত শত গোপন সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করতে চাই। এসব সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ভারতের মধ্যাঞ্চলের বহু অরণ্য, পাহাড় এবং নদী বেসরকারি করপোরেশনগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ তাদের অধিকার রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়িয়ে দাবি জানাচ্ছে না যে, গোপন সমঝোতা স্মারকগুলোতে কী লেখা আছে তা প্রকাশ করা হোক।
রাষ্ট্রের কী করার আছে, রাষ্ট্র তো নিজেকে রক্ষা করবেই। এ জাতীয় একটি প্রশ্নের মধ্যেই রাষ্ট্র যে জনগণের শত্রুপক্ষ সে কথাটির ইঙ্গিত রয়েছে। আপনি যদি সারাবিশ্বের দিকে তাকান তা হলে দেখবেন সেই সত্যটিই ক্রমশ ধরা পড়ছে। আপনি দেখবেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্র ও তার সেনাবাহিনী নিজস্ব জনগণের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। যুদ্ধ যে সবসময়ই দুটি দেশের মধ্যে সংঘটিত হবে তা কিন্তু নয়। একটি রাষ্ট্র নিজে তার নিজস্ব জনগণের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করে। এটা হচ্ছে সমান্তরাল উপনিবেশবাদ ঠেকানোর নামে আনুভূমিক উপনিবেশবাদ কায়েম করা।
আমি বিশ্বাস করি ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রতিনিয়ত তাকে প্রশ্ন করা, প্রশ্নের সম্মুখীন করা। যে কোনোভাবেই হোক তার সঙ্গে সবসময়ই একটি বিরোধাত্মক সম্পর্ক জিইয়ে রাখা। আমি ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যোগ দেব কিনা এটি আমার কাছে তেমন গুরুতর কোনো প্রশ্ন নয়। আমি যা করি তা রাজনীতিই। আমি যা লিখি তাও রাজনীতি। ঐতিহ্যগতভাবেই লেখকরা এ কাজটি করে এসেছেন। সুতরাং মন্তব্যকে যদি লেখা থেকে, রাজনীতি থেকে আলাদা করতে হয় তবে সেখানে রাজনীতি কমাতে হবে এবং লেখাও কমাতে হবে। এমনকি একইভাবে কমাতে হবে মন্তব্যও। ঐতিহাসিকভাবে এই ছিল লেখকদের ভূমিকা। আমি খুব সহজেই একটি খাদি শাড়ি পরে জঙ্গলে গিয়ে আস্তানা গাড়তে পারি এবং শহীদও হতে পারি। কিন্তু তেমন কিছু করা আমার পরিকল্পনার মধ্যে নেই। আমি এখন যা বা যেমন আছি, কিংবা যা লিখছি তা নিয়ে আমার কোনো সমস্যাই নেই। কারণ আমি সন্ত সাজার চেষ্টা করছি না। জনপ্রিয়ও হতে চাই না আমি। নন্দিত কোনো জননেতা হিসেবে আমাকে বিবেচনা করতেও বলছি না। আমি একজন লেখক। আমার নিজস্ব কিছু ধ্যানধারণা বা চিন্তাভাবনা রয়েছে। যেটুকু দক্ষতাই আমার আছে আমি সেটুকুকেই কাজে লাগাই, সেটুকুকেই নিয়োজিত করি। যতটুকু সম্ভব আমি আমার চিন্তা-ভাবনাগুলোকে লেখার মাধ্যমেই প্রকাশ করি। সবসময়ই যে আমি এগুলো একেবারে নিজে থেকে করি তা নয়। প্রতিরোধের অন্তর্গত তাগিদ থেকেও আমি এসব করে থাকি।
রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে লেখাটা খুব উত্তেজনাকর কিছু বলেই যে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখি ব্যাপারটি তেমন নয়। এটা আসলে লেখারই একটি নতুন মাত্রা। আমি যদি একজন লেখক হয়ে থাকি এবং আমি যদি সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে লিখে থাকি তাহলে আপনার কাছে মনে হবে আমার ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ একটি রাজনৈতিক রচনা। তবে এর পর পরই আরো বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ববাহী রচনায় আমাকে হাত দিতে হয় এবং সেটি হচ্ছে উপন্যাস নয় এমন সব রাজনৈতিক রচনা। কিন্তু আমি তো মনে করি উপন্যাসের মধ্যেই রাজনীতি অনেক বেশি গভীরভাবে উঠে আসে। আর উপন্যাসে বিধৃত রাজনীতি অনেক বেশি শক্তিশালী। আপনি যদি ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ পড়ে থাকেন তবে দেখবেন সেখানে বর্ণ প্রথা নিয়ে কথা বলা হয়েছে। এটা সরকার কিংবা রাষ্ট্র বনাম জনগণ জাতীয় কোনো বিষয় নয়। এটি আমাদের সমাজের ভেতরকার অসুস্থতাকে তুলে ধরেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য উপন্যাসই হচ্ছে অনেক বেশি জোরালো মাধ্যম। আপনি সবসময় একই ধরনের কাজ করা, একই কায়দায় চিন্তা করা কিংবা লেখার ক্ষেত্রে একই কৌশল অবলম্বনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারবেন না। ব্যাপারটি সবসময়ই চ্যালেঞ্জের। সুতরাং একথাও আমি বলতে পারি না যে, নিজেকে আমি রাজনৈতিক ব্যক্তি হয়ে ওঠা থেকে বিরত রাখব। আমি অবশ্যই মনে করি যে, প্রতিটি ব্যক্তিই এমনকি একজন ফ্যাশন মডেলও রাজনৈতিক ব্যক্তি। আপনি কোন ধরনের রাজনীতি করতে চান তার ওপর নির্ভর করবে আপনি রাজনীতির কোন পথটি বেছে নেবেন। এখানে ফাঁকিঝুঁকির কোনো জায়গা নেই। রাজনীতি হচ্ছে শুধুমাত্র নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং জনসভায় বক্তৃতা দেওয়া – এ জাতীয় ধারণা একেবারেই ফাঁপা এবং ভাসা ভাসা একটি ব্যাপার।