মাসুদ মজুমদার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মাসুদ মজুমদার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১২

গলদটা গোড়াতেই

গণপ্রজাতন্ত্রের সংবিধানখানা কারো আমলে নেই। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে দলের ইচ্ছামতো সাজানো হয়েছে। সংবিধানসম্মতরা নন, আজ্ঞাবহরা ক্ষমতার বরপুত্র। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দলীয় ক্যাডার সেজে গেছেন। মন্ত্রীরা শপথ ভুলে গেছেন। বিচার-আচার সরকারের ইচ্ছাপত্রে রূপান্তরিত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ কারা মুসাবিদা করেন, আর কাদের সুপারিশে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা ক্ষমা পেয়ে যায়, কিছুই বোঝা যায় না। মওলানা ভাসানী যাকে আন্দোলন-সংগ্রামের কাণ্ডারি হিসেবে বলা হয় ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স,’ যাকে কদমবুচি করে বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের পথ পাড়ি দিতেন, তাকেও ইতিহাস বিকৃতির জটাজালে জড়িয়ে দিলেন খোদ রাষ্ট্রপতি। কাউকে বড় করার জন্য মওলানার মতো বটবৃক্ষকে ছোট করা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ইতিহাস বিকৃতি তার চেয়েও দুঃখজনক। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশন সদস্য ও সরকারদলীয় নেতারা সবাই আইন-আদালত ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। সম্ভবত সংবিধানকে শুধুই একখানা পুস্তিকা ভাবার কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের সংবিধানের প্রতি কারো সমীহবোধ নেই বলেই হয়তো এক ধরনের প্রহসন ও আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারছি না। এ ব্যাপারে জনগণের দায় কম, কেন ক্ষেপে উঠছে নাÑ এমন অভিযোগ তোলা ছাড়া জনগণের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছোড়া সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক দলগুলো কোনোভাবেই অভিযোগমুক্ত হতে পারে না। বর্তমান শাসক দল পূর্বাপর স্ববিরোধী রাজনীতিচর্চায় অভ্যস্ত। তারা পথ রচনা করেন না, পথ তাদের টেনে নিয়ে যায়। অনেকটা কুকুর লেজ নাড়ে না, লেজ কুকুরকে নাড়িয়ে দেয়। এ ধরনের একটা অবস্থা তাড়া করে বলেই বৈপরীত্য তাদের ঘিরে ধরে আছে। গোঁজামিল দিয়ে সময় পার করা ছাড়া তাদের যেন আর কোনো গত্যন্তর নেই। মুসলিম লীগের উদর থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মই হয়েছিল গোঁজামিল দিয়ে। তার পরও মুসলিম লীগের অপশাসন, আইয়ুব-ইয়াহিয়ার সীমাহীন ঔদ্ধত্যের মোকাবেলায় লাহোর প্রস্তাবের বরাতে ছয় দফা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান পূর্ব বাংলার গণমানুষকে প্রভাবিত করেছে। তার পরও আওয়ামী লীগ সত্তর সালে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েও গোঁজামিলের ঊর্ধ্বে উঠে একটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে পারেনি। পদে পদে রহস্যঘেরা আচরণ করেছে। এখনো স্বাধীনতার ঘোষণা বিতর্ক থেকে পাক সেনাদের ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ পর্যন্ত অনেক তথ্যই গোঁজামিল দিয়ে বর্ণনা করা হয়। তা ছাড়া ভারত এগিয়ে না এলে মুক্তিযুদ্ধে এককভাবে নেতৃত্ব দেয়ার দাবি কখনো করা সম্ভব হতো না। এ দেশ অবশ্যই স্বাধীন হতো সেটা কোনো এক দলের নেতৃত্বে একক কৃতিত্ব দাবিতে নয়, সেটা হতো গণযুদ্ধের অনিবার্য পরিণতিতে, সেটাও ছিল শুধুই সময়ের ব্যাপার।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ পেয়েও আওয়ামী লীগ প্রথম সুযোগে গণ-আকাক্সার অনুকূলে একটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য সংবিধান জাতিকে উপহার দিতে পারেনি। যে সংবিধান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে জাতিকে উপহার দেয়ার দাবি করা হয়, সেটা দিয়েই আনুষ্ঠানিক ও আইনি গোঁজামিলের পথে পা বাড়িয়েছে আওয়ামী লীগ। একটি নতুন উদ্যমে জাগ্রত জাতির জন্য সংবিধান রচনার যে প্রক্রিয়া, আওয়ামী লীগ সে পথে হাঁটেনি। ম্যান্ডেট নিয়ে গ্রহণযোগ্য সংবিধান রচনা করার দায়ও বোধ করেনি। মুক্তিযুদ্ধ শেষে একটি জাতীয় সরকার গঠনের আকুতিও গলাটিপে হত্যা করা হলো। ভারতীয় পঞ্চশিলার আদলে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মূলনীতি ঘোষণা করা হলো এবং সেটাই জাতির ওপর চাপিয়ে দিলো। বলা হলো এ সবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই যে গোঁজামিল দেয়া হলো, তারই খেসারত জাতি এখনো দিয়ে যাচ্ছে। সেই গোঁজামিলের বরাতেই কোন দল নিষিদ্ধ হবে, কারা চেতনাপন্থী, কারা নয় তা পরিমাপ করা শুরু হলো।
সংবিধান রচনা করা হলো ভারতীয় অবয়ব মাথায় রেখে বিলেতি কায়দায়। সংসদীয় গণতন্ত্রকে করা হলো প্রাণভোমরা। তাহলে সমাজতন্ত্র কেন রাখা হলো। এখন আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারক-বাহক। সমাজতন্ত্র জাদুঘরে। রাষ্ট্র চলছে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে নিখাত দলতন্ত্রের ফরমায়েশি ফর্মুলায়। সাম্যবাদের বা কমিউনিজমের যে তত্ত্বকে প্রায়োগিক সমাজতন্ত্র ধারণ করে, তার লেশমাত্র আমাদের সরকার কাঠামো ও অর্থনীতিতে নেই। তাহলে সমাজতন্ত্রের এই গলিত লাশ আমরা বহন করছি কাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য। শুধুই বামপন্থীদের রাজনৈতিক ভাষায় ক্ষমতার কোলবালিশ বানানোর জন্য। এবং সেই কোলবালিশ ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহারের জন্য। যৌবনে মার্কসবাদ-মাওবাদের সবক নিয়েছিলাম, চেয়ারম্যান মাওয়ের পাঁচটি উদ্ধৃতি ও শ্রেণী সংগ্রামের তাত্ত্বিক নামতা এখনো মুখস্থ। কখনো এর প্রয়োগ দেখিনি। এক ধরনের আবেগ ও রোমান্টিক ভাবনা ছাড়া সমাজতন্ত্র এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনার তত্ত্বীয় ধারণায় রূপান্তরিত হয়েছে। এমনটি হয়েছে বলেই ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় মতিয়া, নাহিদ, দিলীপ বাবু, মান্নান খানরা মুক্তবাজার নামে শ্রেণী বৈষম্যের অর্থনীতির গলিত লাশ পাহারা দিচ্ছেন। মাঝে মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সুড়সুড়ি দেয়া চটকদার বক্তৃতা দিচ্ছেন। মুণ্ডুপাত করছেন পুঁজিবাদের। অথচ পুঁজিবাদের কাচের দেয়াল দেয়া ঘরে বসে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের ভূত তাড়াচ্ছেন, একই সাথে প্রগতিবাদের ডুগডুগিও বাজাচ্ছেন।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আরেক ধরনের ভণ্ডামি, নয়তো ভড়ং। পৃথিবীর কোথাও এর কোনো তত্ত্বীয় প্রয়োগ নেই। আরো দু-চার জায়গায় যা চলছে তা আমাদের পড়া ব্যাকরণসিদ্ধ রাজনীতি নয়, মেকিয়াভ্যালির ভাষায় বুঝতে চাইলে ধূর্তামির নামান্তর। নয়তো ধর্ম নিয়ে ব্যবসার বেসাতি মাত্র। এই জনপদ কখনো ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না। পাল আমলে রাষ্ট্রাচার বৌদ্ধ ধর্মের অনুসরণে হতো। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারা শুধু পুষ্টই ছিল না, জাত-পাতে পিষ্ট জাতি ছিল অচ্যুত ও চ্যুতের বিভাজনে বিভক্ত। সুলতানি ও নবাবী আমলে রাষ্ট্র কোনো ধর্ম মানতে বাধ্য করেনি, না মানলে কোনো কৈফিয়তের মুখোমুখিও দাঁড় করায়নি। ইংরেজ আমলে ছিল শোষণ-বঞ্চনা, নির্যাতন-নিপীড়ন আর পাশ্চাত্যকরণের উৎসবমুখর। শাসকের ইচ্ছামতো ধর্ম মানা যেত, ইচ্ছামতো মানা যেত না। এ দেশেই দাড়ি ও পাগড়ির ওপর কর দিতে হতো। সেই ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। তা ছাড়া ভাগ কর শাসন কর নীতির কারণে বেনিয়া শাসক হিন্দুদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি ছিল শাসন-শোষণের কৌশল। তারপর দ্বিজাতিতত্ত্বের উত্থান ও দেশ বিভাগ। সেই সন্ধিকালে নীতিনির্ধারকদের মাধ্যমে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। কিন্তু সাধারণ জনগণ ভেবেছে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের জাগৃতি ঘটছে। অথচ রাজনীতিতে ধর্মের প্রতিফলন ঘটানো ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠায় শাসকদের ইচ্ছা, সততা কিংবা যোগ্যতা কোনোটাই ছিল না। স্বপ্নভঙ্গের নানা উপসর্গের সাথে আইয়ুব-ইয়াহিয়ার ক্ষমতার জোয়াল ভাঙার তাড়না থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই বলা যায়, এই জনপদে কখনো ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের বসতি ছিল না। এই জনপদ ছিল ধার্মিক মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালনের অভয়ারণ্য। এ পরিচয় আবহমানকাল থেকেই। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রচারণা এক ধরনের প্রতারণা। পৃথিবীর কোথাও ধর্ম কোনোভাবেই নিরপেক্ষ নয়, কোনো কোনো রাষ্ট্র কাগুজে মুদ্রায়ও ধর্মের ছাপ ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামে ধর্মের প্রকাশ ঘটিয়েছে। শপথবাক্যেও ধর্মের উপস্থিতি প্রণিধানযোগ্য। হিন্দি, হিন্দুত্ববাদ ও মহাভারতের স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার স্বপ্নে ধর্মাশ্রয়ী ভারত বিভোর।
যদিও ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের হিতোপদেশ ছাড়া স্পেশাল ল বলতে কিছুই নেই। অবশ্য ইহুদিদের ধর্মাচারে কিছু বিধিবিধান সমাজ ও রাষ্ট্রকে স্পর্শ করে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ভড়ং এক ধরনের শাসন কৌশল ছাড়া কিছুই নয়। তাই সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্মের গোঁজামিল দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কোরাস গাইতে হচ্ছে। তাহলে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূলনীতি শোভা পাবে কেন। কাকে খুশি করার জন্য এই ভড়ং। বাংলাদেশের মানুষ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান নির্বিশেষে কেউ ধর্মহীন নয়। সবাই ধর্মপ্রাণ কিংবা ধর্মভীরু। কিন্তু আগাগোড়া অসাম্প্রদায়িক। এখানে দেশ বিভাগের প্রেক্ষাপট নেই। সাম্প্রদায়িক উসকানি দেয়ার মতো কোনো বিশেষ পন্থী নেই। বামপন্থীদের মধ্যে যারা ধর্মের ব্যাপারে অসহিষ্ণু তারা সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার নামে কখনো কখনো গরিষ্ঠ মানুষ ও বিশ্বাসীদের নিয়ে বাড়াবাড়িমূলক বক্তব্য দিলেও ধর্মহীনতাকে জোর করে সরাসরি চাপাতে চায় না বা সাহস পায় না। তারা তাদের তত্ত্বীয় ধারণা ফেরি করতে গিয়ে নাস্তিক হওয়ার ভান করে। এ ভান ও ভাব আরেক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। তা ছাড়া গণতান্ত্রিক চেতনাও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মবিশ্বাসকে আনুকূল্য দিতে বলে। সর্বত্র গণতন্ত্র মাথা গুনলেও এখানে কথিত গণতন্ত্রপন্থীরা বড়ই অনুদার।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সংবিধানে এভাবে উপস্থাপনে কিছু প্রশ্ন আছে। আমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নিয়ে কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তবে নাগরিক পরিচয়ে আমরা বাংলাদেশী, হালে যা ব্যাখ্যাসহ আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। আমাদের দেশে অনেক অবাঙালি নৃগোষ্ঠী আছে, তারা বাঙালি নয়, বাংলাদেশী। এখানেও সংবিধান শুরুতেই গোঁজামিল দিয়ে শুরু হয়েছিল, বিলম্বে বোধোদয় অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও আবেগাশ্রয়ী রাজনীতির জন্য শাসকেরা অবুঝ থাকতে চান।
গণতন্ত্র নিয়ে কোনো মন্তব্য করা অর্থহীন। বঙ্গবন্ধু ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে বাকশালের পথ ধরে তার আজীবনের গণতন্ত্রপ্রেমকে প্রশ্নবোধক করে গেছেন। তারপর জাতি নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। এখন সংবিধান অভিজ্ঞতার ভারে নয়, জোড়াতালির তোড়ে ভাসছে; যা এক ধরনের গোঁজামিল ছাড়া আর কিছুই নয়। এই আমলে এসে সরকার গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারকে জ্যান্ত কবর দিয়েছে। সংবিধানকে পোস্টমর্টেম টেবিলে নিয়ে গেছে। এখন গণতন্ত্র আছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞায়, সংবিধানের নতুন-পুরাতন সংস্করণের পাতায় এবং প্রেস কাবের সামনে মানববন্ধনের ব্যানার-ফেস্টুনে। গণতন্ত্রের বোবাকান্না ও আর্তনাদে বিরোধী দল কঁকিয়ে উঠছে। অন্যায় আস্ফালন ও অন্যায্য ক্ষমতাচর্চার বিপরীতে হরতাল-অবরোধ ধেয়ে আসছে।
তত্ত্বাবধায়ক বিতর্ক এখন তুঙ্গে। জাতি সম্ভবত সরকারকে সঠিক মেসেজটি দিয়েই দিয়েছে। তারা কী চায় আর কী চায় না, এ বার্তা এখন এতটা লাউড অ্যান্ড কিয়ার যে, কারো কানে না ঢোকার কথা নয়। তা ছাড়া দ্বিধারার রাজনীতির বাইরে যে দাবিটি সর্বত্র অনুরণিত হচ্ছে, তাতে একটি গণমুখী সংবিধানের দাবি আবার সামনে আসছে। বর্তমান সংবিধান সময় ও জাতির মন-মননকে যেন আর আত্মস্থ কিংবা ধারণ করতে পারছে না।
সম্ভবত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উসকানি ও সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ কিংবা বাড়াবাড়ির জের ধরে যে হরতাল হয়ে গেল তাতেও জনগণের হৃদস্পন্দন স্পষ্ট। অন্যের যাত্রা ভঙ্গের জন্য সরকার নিজের কানই শুধু কাটেনি, নাকও ভেঙেছে। এরপর আর কোনো প্রতারণা ও ছেলেভুলানো গল্প সম্ভবত জনগণ শুনতে চাইবে না। গণতন্ত্রের গল্প শোনাবেন আবার নাগরিক অধিকার কেড়ে নেবেন, সেই সময় পার হয়ে গেছে। এখন ইট ছুড়লে পাটকেল খেতে হবে। ওপরের দিকে থুথু ছিটালে নিজের গায় মাখতে হবে। শিশুও অসহায়বোধ করলে শিথিল মুষ্টির আঘাত হানে। বিরোধী দল তো আর শিশু নেইÑ তারাও দেখে ও ঠেকে লায়েক হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১২

ওরা ‘ভেড়ার পোশাকে নেকড়ে’!

‘সব কিছুকে নিষেধ করার অর্থ হলো অন্ধ করে দেয়া, আর সব কিছু করতে দেয়ার অর্থ হলো কাউকে হারিয়ে ফেলা।’ এই সহজ-সরল উক্তিটি বিশ্বজোড়া খ্যাতিমান আরব বংশোদ্ভূত ইউরোপীয় পণ্ডিত তারিক রামাদানের। তার ভাষায়, ইউরোপীয় মুসলমানদের এখন ‘ভেড়ার পোশাকে নেকড়ে’ ভাবা হয়। নয়তো ভাবা হয় ‘ট্রোজানের ঘোড়া’। এমন প্রেক্ষাপটে তারিক রামাদান মুসলমানদের ইউরোপীয় ধারায় লাগসই এবং আনুগত্যবাদী হতে পরামর্শ দিয়েছেন। এ লাগসই ও আনুগত্যবাদী হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তি একটাই, অভিবাসী হোক আর ভূমিপুত্রই হোক প্রত্যেকে নাগরিকত্ব ও সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে রাষ্ট্রের আনুগত্য করতে বাধ্য। এটা চুক্তি মানার মতো যুক্তির দায়।
বাংলাদেশ ইউরোপও নয়, মধ্যপ্রাচ্যও নয়। তার পরও কিছু মিল-অমিল অবশ্যই আছে। তা ছাড়া সরকার ও আদর্শের বিরোধীদের স্বরূপ বিশ্বজোড়া প্রায় অভিন্ন। শ্রেণিচরিত্রও কাছাকাছি। বাংলাদেশেও মেরুকরণটাকে ইসলামের ও ইসলামপন্থীদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে একই সমতলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার ওপর বাংলাদেশে আছে ইগো ও দলবাজ রাজনীতির নানা নোকতা। একাত্তর প্রসঙ্গ তো আছেই। তা ছাড়া ক্ষমার রাজনীতিতে বাংলাদেশের ডান-বাম আদর্শবাদীরা বড়ই অনুদার ও কৃপণ। বাম ও ইসলামপন্থীরা অতীত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে, কিন্তু জনগণের কাছে স্বচ্ছ ও জবাবদিহির ভাষায় ক্ষমা চায় না। অথচ বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়ার নজির অসংখ্য। অবশ্য বাংলাদেশে তওবার রাজনীতির কথা বলে হাফেজ্জী হুজুর প্রকারান্তরে আলেম-ওলামা ও শাসকদের যুগপৎ ভুলের ক্ষমাই চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনা অতীত ভুলভ্রান্তি ভুলে গিয়ে আরেকবার সুযোগ দেয়ার আবেদনের ভেতর অতীত ভুলের স্বীকৃতিও ছিল, ক্ষমা চাওয়ার মতো মিনতিও ছিল। ইন্দিরা গান্ধী, রাজিব গান্ধী, ভুট্টো, জিয়াউল হক, বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক ভুলের মাশুল গুনেছিলেন বলে অনেকের মূল্যায়ন। যদিও ইন্দিরা গান্ধী জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য জোরজবরদস্তি ও জরুরি অবস্থা জারির জন্য একবার জনগণের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন। জনগণ তাকে ক্ষমাও করেছিল। আবার ক্ষমতায় বসিয়েছিল। খালেদা জিয়া অতীত রাজনৈতিক ভুলের জন্য দু’বার জনগণের কাছে কৈফিয়ত দিয়ে ক্ষমাই চেয়েছেন। আরেকবার সুযোগ দেয়ার মিনতির ভেতর সেই ক্ষমা চাওয়ার সুর অনুরণিত হয়েছে। রাজনৈতিক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেনি কিংবা জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি এমন নজির রাজনীতির ইতিহাসে কম, যারা খোদার কাছে তওবা করতে কিংবা জনগণের কাছে রাজনৈতিক ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে কাপর্ণ্য প্রদর্শন করে, তাদেরকে ট্রোজানোর ঘোড়া কিংবা ভেড়ার পোশাকে নেকড়ে ভাবলে কিংবা ভাবার সুযোগ করে দিলে সংশ্লিষ্ট কারো দায়দায়িত্ব কম হওয়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।
আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের শাহওয়ালিউল্লাহ দেহলবি পরামর্শ দিয়েছিলেন ঠিক উল্টো। তিনি আগ্রাসী ইংরেজ বেনিয়া সরকারকে বয়কট করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ইংরেজদের ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক ও শাসন প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই আহ্বান ছিল সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি। এই পরামর্শের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলেও উপমহাদেশের আজাদির জন্য এই মূলমন্ত্রের বিকল্প ছিল না। গান্ধীর অসহযোগ, বয়কট আন্দোলন এবং বর্জননীতি সেই সত্য বিলম্বে হলেও প্রমাণ করেছে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদেরও যেমনি ভেড়ার পোশাকে নেকড়ে বানানো হয়েছে, তেমনি নেকড়ের পোশাকে ভেড়াও ভাবা হচ্ছে। কারো কারো কাছে এরা মানুষ নয়, ভয়ঙ্কর প্রাণী। কারো কারো কাছে তার চেয়েও বিপজ্জনক কিছু। তাই দমন-পীড়ন ও উৎখাতের হুঙ্কার প্রতিনিয়ত শোনা যাচ্ছে। তাদেরকে চিমটি কেটে অনেকেই সুখ পাচ্ছে। কাজটা করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে, যা শুধু দুর্বোধ্যই নয়, অযৌক্তিকও।
ইসলাম বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ মানুষের ধর্মবিশ্বাসের নাম। বলা হচ্ছে, এখানে ইসলামের নামে রাজনীতি করা যাবে না। তবে ধর্ম নিয়ে ব্যবসায় কারো কোনো আপত্তি নেই। রাজনৈতিক ইসলামকে এতই ভীতি যে বলা হচ্ছে, ইসলামি ধারণা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু কমিউনিজম ও সেকুলার ইজমকে সাংঘর্ষিক ভাবা হচ্ছে না। এ জন্যও দোহাই দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। অথচ অভিযুক্তকে সরকার রাষ্ট্রের পক্ষে স্বচ্ছ বিচারের মুখোমুখি করতে পারে কিন্তু গণতান্ত্রিক মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার হরণ করে রাষ্ট্র কিভাবে তার সন্তানতুল্য নাগরিকদের ন্যায়বিচারের আশ্রয় নেয়ার সুযোগবঞ্চিত করে তা বোধগম্য নয়। ইউরোপের সাথে এই মৌলিক পার্থক্য বিবেচনায় রাখার মতো।
দোষটা কোনোভাবেই ইসলামের নয়, ইসলামপন্থীদের। এ দেশের ইসলামপন্থীরা ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে নিশ্চয় ভুল করেছেন। নয়তো রাজনৈতিক ইসলামকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। এটা ঠিক কমিউনিজম অবৈধ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে, ইসলাম ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দুটোকেই চ্যালেঞ্জ করে। এখানে বিতর্কটা ইসলামপন্থী ও সরকারের, আমার নয়। আমাদের কাছে প্রায়ই মনে হয় এ দেশে ইসলামকে আরবীয় কিংবা পারসীয় করার একটা মনোস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ আছে। অথচ ইসলাম এই তল্লাটে এসেছে একেবারে লোকজ ঐতিহ্যের সাথে লেপ্টে থেকে। যারা আরবীয়করণের পক্ষে তারা বুঝতে চান নাÑ আল্লাহ-রাসূল ও পরিশীলিত আরবীয় সংস্কৃতি ইসলাম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যেমনি বিবেচিত হয়েছে আল্লাহ রাসূল ও পরিশীলিত পারস্য লোকজ সংস্কৃতি। এই মেলবন্ধন ঐতিহাসিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ। আরবেরা গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে ইসলামের সাথে লাগসই হয়েছে। পারস্যবাসীও গ্রহণ-বর্জনের পথ ধরে আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্য ও ইসলাম আত্মস্থ করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। গাঙ্গেয় বদ্বীপে ইসলাম লোকজ ধর্ম। গণমানুষের ধর্ম। ধর্মকে বাদ দিয়ে কোনো শাসক ক্ষমতায় আসতে পারে না। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ক্ষমতায় টিকেও থাকতে পারে না। অথচ যত ভয় এর আদর্শিক ও রাজনৈতিক দর্শনকে। খানকা কিংবা দরবারি ইসলামকে নয়। একাত্তর এখানকার অনিবার্য বাস্তবতা, যা মুসলিম বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সাথে তুলনীয় নয়। এ বিষয়টি অনেকে মাথায় রাখতে চান না। কোনো জাতি তার স্বাধীনতার প্রতিপক্ষকে আত্মস্থ করতে চায় না। ইসলাম কখনো স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ ছিল না। এখনো নেই। ইসলামপন্থীদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষে পেয়েছিল বলেই এর আদর্শিক প্রতিপক্ষ ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের এক পাল্লায় তুলে ঠেঙানোর সুযোগ পেয়েছে। এটা আড়ালে রাখার কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের অদূরদর্শিতা অনেকের মতো আমাকেও ভাবায়। যদিও বারবার যৌবনের বামপন্থী চিন্তার প্রভাব প্রায় আচ্ছন্ন করে। ভাবতে চেষ্টা করি যে মিসর ফেরাউনের দেশ হিসেবে পরিচিত, যে দেশের সেকুলার শাসকেরা এ জন্য গর্বও করত, সেই দেশে ইসলামের কথা বলে, মুসা নবীর উত্তরাধিকার বলে শাসকদের কাছে যারা নিন্দিত হলো, প্রহসনের বিচারে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হলো, তাদের উত্তর-পুরুষেরা মাত্র পাঁচ দশকের মাথায় বাঁক ঘুরে দাঁড়াল কিভাবে? এর সরল ব্যাখ্যা হতে পারে শাসকদের কাছে নিন্দিতরা জনগণের চোখে নন্দিত হলে ‘সময়’ তাদের বিজয় মালা পরিয়ে দেয়। সম্ভবত এ কারণেই ব্রাদারহুড এখন ভিন্ন নামে ক্ষমতায়। ড. মুরসি এখনো মুসলিমপ্রধান সেকুলার মিসরের প্রেসিডেন্ট। যেমনটি ঘটেছে তুরস্কে। আরবাকান-এরদোগান সেকুলার তুরস্কের নন্দিত নেতা হলেন। নিজ নিজ দলের নাম পাল্টানোর ব্যাপারে সামান্যতমও হোঁচট খেলেন না। শুধু দলের গঠনতন্ত্র নয়, নাম পর্যন্ত পাল্টিয়ে সামনে বাড়ানোর পথ রচনা করলেন। তিউনিসিয়াও এ ক্ষেত্রে আরেক ব্যতিক্রমধর্মী উপমা। এ উপমা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই প্রযোজ্য, যদিও ওসব জায়গায় স্বাধীনতা আন্দোলনে বিতর্কিত অবস্থানের মতো বিব্রতকর ইস্যু নেই। তবে আদর্শ হিসেবে ইসলাম একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
বাংলাদেশে যেমন মরমিবাদ, সুফিবাদ, পীরবাদ চ্যালেঞ্জ হয় না, হয় ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন। তেমনি ঘটেছে ইরান, তুরস্ক, মিসর, তিউনিসিয়াসহ অন্য অনেক স্থানে। ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করা হবে অথচ সেকুলারিজম ও কমিউনিজম ক্ষেপে উঠবে না, তেড়ে আসবে নাÑ এমনটি শুধু আহাম্মকই ভাবতে পারে। কারণ ইসলাম কমিউনিজম সেকুলারিজম শুধু সাংঘর্ষিকই নয়, পরস্পর বিশ্বাস ও বস্তুবাদী দর্শনের কারণে প্রতিপক্ষও। এই ঋজু মন্তব্য বোঝার জন্য বোধকরি অনেক বড় পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন হয় না। তা ছাড়া আধুনিক যুগে ‘ন্যাশন স্টেট’ কনসেপ্ট উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। তাই বিশ্বজোড়া খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিটি জামালউদ্দিন আফগানি কিংবা তকিউদ্দিন নাবানি, মুহাম্মদ আলী-শওকত আলীর মতো করে বলা সম্ভব নয়। তবে সময়ের দাবিতে সেই সঙ্গত দাবি যে অন্য ধারায় ভিন্ন অবয়বে উঠবে তা নিশ্চিত। তখন সেই দাবিকে অসঙ্গত বলা সম্ভব হবে না। ঠেকানোও কঠিন হবে। সেটা সময়ের অপেক্ষার ব্যাপার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবি কিংবা জেদের কারণে চরমপন্থী সেজে যাওয়া কোনোটিই সমর্থনযোগ্য নয়। বরং যৌক্তিক ও প্রায়োগিক আদর্শিক কারণে লাগসই হওয়ার দাবিটি মুখ্য। এ জন্য যেকোনো ইসলামপন্থীর উচিত মৌলিক প্রশ্নে ছাড় না দিয়ে লাগসই হতে চেষ্টা করা। এখানে প্রশ্ন দাঁড়ায় কোনটি মৌলিক বিষয় কোনটি নয় সেই প্রশ্ন গৌণ নয়। তবে এতটুকু চিন্তা নেতৃত্বের মগজে ঠাঁই পাওয়া উচিত। এ যুগে সার্বভৌমত্ব কনসেপ্টটিকে ‘ন্যাশন স্টেট’ ধারণায় একটি রাষ্ট্রিক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যা আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও কূটনৈতিকভাবেও স্বীকৃত ও অনুশীলিত। জনগণের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রাচারের সাথে সম্পৃক্ত। এর সাথে খোদায়ি উলুহিয়াত ও রুবুবিয়াত কনসেপ্টকে গুলিয়ে অথবা মিশিয়ে ফেলা হয় না। যেমন সিটি করপোরেশনের আইন, দেশের প্রচলিত অনেক আইনই নির্দোষ। কয়েকটি ছাড়া এর সাথে আদর্শ হিসেবে ইসলামের তেমন কোনো মৌলিক সঙ্ঘাত থাকার কথা নয়। যা পরিবর্তন করার দাবি আদর্শবাদীরা তোলেন, সেটি আন্দোলন প্রক্রিয়ারই অংশ। সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্র যা অনুমোদন করে, আইনের শাসন উপেক্ষা না করে ন্যায়-ইনসাফ না এড়িয়ে সরকার যা বাস্তবায়ন করতে চায় তার সাথে আদর্শিক আশা-আকাক্সার দূরত্ব নেই বললেই চলে। যতটুকু দূরত্ব সেটা কমানোর জন্যই তো রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণের দায় নেয়ার প্রশ্ন ওঠে। এখানেই দলীয় প্রচেষ্টার যুক্তি দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে একটা উপমা দেয়া যায়, ইসি একটি ইসলামপন্থী দলকে তার গঠনতন্ত্র পরিবর্তন না করলে নিবন্ধন বাতিলের কথা বলেছে। প্রচলিত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলেই ইসি এ ধরনের দায়বোধ করছে বলে তাদের দাবি। তবে ইসি দলটির সাথে বিতর্কিত ও একচোখা রাজনৈতিক আচরণ করছে কি না সেটাও দেখার আছে। ইসির বক্তব্যে আইনি ভিত্তি থাকলে দলটির উচিত গঠনতন্ত্র পাল্টিয়ে নেয়া। এটি কোনো আপস নয়, সময়ের সাথে লাগসই হওয়া মাত্র। ইসি যদি একচোখা কিংবা বৈরী আচরণ করেও তার পরও কোনো রাজনৈতিক দলেরই উচিত নয় মিথ্যা প্রচারের সুযোগ দেয়া। জনশক্তিকেও নিয়মতান্ত্রিক পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার সুযোগ নেয়াও উচিত নয়। রাজনৈতিক দলমাত্রই তার আদর্শের জন্য লড়াই করে। তার আদর্শের সাথে অসঙ্গতিগুলো দূর করার দাবি জানায়। এ জন্যই আন্দোলন ও সংগ্রাম। তা হবে কখনো নিয়মতান্ত্রিক, কখনো ভিন্ন কায়দায় আবেদন-নিবেদনের ভাষায়। এরই চূড়ান্তপর্যায়ে কঠোর অবস্থানের সুযোগ আসে। একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত আছে। আছে একটি সংবিধান। সব কিছু যদি দলের কিংবা দলবিশেষের আদর্শের অনুকূলেই তবে শুধু শাসন করার জন্য একটি আদর্শিক দলের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
ক’দিন আগে নিজের নামে কলাম না লিখে একটি ভিন্ন ধারার লেখা লিখেছিলাম, শিরোনাম ছিল ‘ভালো কাজ খারাপ পদ্ধতিতে হয় না’। প্রচুর পাঠক ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন, দেশ-বিদেশে লেখাটি ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। ইন্টারনেটে অনেক মন্তব্য পেয়েছি। একজন পাঠক মন্তব্য করেছেন ‘লেখক যুক্তিবাদী কিন্তু আপসকামী’। হ্যাঁ, এ ক্ষেত্রে লেখক আপসকামী তো বটেই, একই সাথে সময় বিবেচনায় দূরদর্শী হওয়ার দায়ও বোধ করেন। কারণ কোনো দল নিষিদ্ধের দাবি যেমন উসকানিমূলক ও হঠকারিতা, তেমনি চরমপন্থী ও রাষ্ট্রশান্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাও হঠকারিতা। কোনো দল প্রচলিত আইন পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করতে পারে। সংবিধান পরিবর্তনের দাবিও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত কোনো কিছুকে উপড়ে ফেলে দিতে হলে, একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য জনগণকে প্রস্তুত করতে হয়। যেমনটি ঘটেছে তিউনিসিয়া ও মিসরে। অংশত নেবাননে। নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারপ্রক্রিয়ায় যেমনটি তুরস্কে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, জনগণকে বাদ দিয়ে তেমনটি বাংলাদেশে কেন কোথাও কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ নেই?
একটি আদর্শবাদী দল সরকারি জুলুম-নিপীড়ন ও নির্যাতন-নিষ্পেষণে কোনো দিন নিঃশেষ হয়ে যায় না। নিষিদ্ধ করেও কোনো আদর্শ ঠেকানো যায় না। বরং কোনো দল নিঃশেষ হয়ে যায় নিজস্ব আদর্শের প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেললে। নেতা ও কর্মীরা নীতিভ্রষ্ট হলে অথবা কায়েমি স্বার্থবাদী বড় হয়ে গেলে। দলবিশেষকে নিষিদ্ধ করার হুঙ্কার মানুষকে বরং সেই দলের দিকে প্রলুব্ধ করে। সম্ভবত সরকার তেমন কোনো হঠকারিতা কিংবা ক্ষমতার জোরে বাড়াবাড়ি করতে যাবে না। পাকিস্তান আমলে বামপন্থী রাজনীতিকে শাসকেরা শুধু আড়চোখে দেখেনি, উসকানিও দিয়েছিল। সেই ফলাফল সবার জানা। অন্য দিকে সরকার ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক ভোট ব্যাংকের কারণেই বনসাইয়ের মতো করে রাখতে আগ্রহী। এতে তারা ভাবছে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে। কার্যত এতে শাপে বর হবে বিরোধী দলের। কারণ ইতিহাস যুক্তি এবং তথ্য কোনোটিই সরকারি হঠকারী ভাবনার পক্ষে সমর্থন জোগায় না। সরকারের জন্য এ লাভ সাময়িক ও তাৎক্ষণিক। অপর দিকে একটি গণবিচ্ছিন্ন দলও এমন পরিস্থিতিতে জনগণের সিমপ্যাথি পেয়ে যায়। কিংবা সহমর্মিতা আদায় করে নেয়ার মতো সুযোগ পেয়ে যায়। যেসব দল কর্মিবহুল  সেগুলোর কথা তো আলাদা। একজন তাত্ত্বিক বামপন্থী মনে করেন, বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ‘নাইদার ইসলামিস্ট, নর পলিটিক্যাল পার্টি’; আরেকজন মনে করেন ইসলামপন্থীরা আনপ্রেডিক্টেবলÑ বিষয়টি উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার মতো বিষয়। বাম চিন্তা পড়ে বুঝেছি প্রতিকূল পরিবেশে আদর্শের চারা দ্রুত গজায়। হাল আমলের আন্তর্জাতিক বলয়ের ইসলামপন্থী প্রজ্ঞাবানদের দর্শন ঘেঁটেও এটাই সবক পেয়েছি। মনে হয় একটি আদর্শবাদী দল নিজেকে স্বচ্ছতার সাথে যুক্তিগ্রাহ্য ভাষায় তুলে ধরতে বা মেলে ধরতে না পারলেই দলটি আবেদন হারায়। প্রতিপক্ষের সামান্য উসকানি ও আঘাতে হোঁচট খায়। একটু ঝড়ে উপড়ে পড়ে, খানিটা উসকানিতে অদূরদর্শী হয়ে যায়। অধিকন্তু সংযম হারায়। আদর্শকে রাজনৈতিক অনাচারের সাথে গুলিয়ে ফেলে।
বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে বাঙালি মুসলমানের মন-মনন বুঝতে হবে। যেমনটি বলেছেন মরহুম আহমদ ছফা। মরহুম আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের আত্মা আবিষ্কার করেছেন তার বাংলাদেশের সংস্কৃতি গ্রন্থে। কেন যেন মনে হয় যারা আদর্শের কথা বেশি বলেন, তারা লোকজ ভাবনা থেকে দূরে সরে যান; অথচ আরব-পারস্য আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়Ñ সেটাকে ঠুনকো জাতীয়তাবাদী চিন্তা বলে অবজ্ঞা করার মধ্যে কোনো গভীরতা নেই। যারা বাংলাদেশে রাজনীতি করবেন তারা বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝবেন না কিংবা লোকজ ঐতিহ্যকে গ্রহণ-বর্জনের বড় ক্যানভাসে রেখে আত্মস্থ করবেন না তাদের শিক্ষা ইতিহাসের কাছে, জনগণের কাছে নয়।
আজকের প্রেক্ষাপটে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে কারা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। সিমপ্যাথি পেতে মার খেতে হবে। কারণ, ‘ওরা মরে ও মারে’Ñ এই তত্ত্ব এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় নয়। অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করে কারা জনগণের সিমপ্যাথি আদায় করে নেবেন, সেটাই আগামী দিনের রাজনীতির জন্য পুঁজি হবে। খলের যেমন ছলের অভাব হয় না, তেমনি সরকার, মতান্ধ ও দলান্ধরা নিজেদের দুর্বল অবস্থানকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকে। যদিও ক্ষমতার জোরের চেয়ে বিশ্বাসের জোর সব সময় বিজয় পায়।

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

যে সত্য ভুলে থাকা যায় না


আজকাল বাংলাদেশ নিয়ে একটি বিশেষ মহল বেশ উৎসাহী। তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে নিজেদেরকে বাংলাদেশীদের চেয়েও বেশি দরদি হিসেবে উপস'াপন করতে চায়। তারা আমাদেরকে ‘বন্ধু’ ভাবে। আবার বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাও তারা নিরূপণ করতে চায়।

আসলে এ জনপদে কে কার বন্ধু কে কার শত্রু তার একটা ইতিহাস আছে। এ সময়ের রাজনৈতিক ভাবনাকে সামনে রেখে আমরা সেই ইতিহাস একটু চর্চা করতে চাই। এ প্রসঙ্গে একটি কার্টুনের বরাত দেয়া যেতে পারে।
১৯৪৭ সালের মে মাসে অমৃতবাজার পত্রিকায় এ কার্টুনটি ছাপা হয়। এর মাধ্যমে জনমনের প্রশ্নটি তুলে ধরা হয়- ‘কে সঠিক?’ কার্টুনটিতে চারজন রাজনীতিবিদের প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়। তাদের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডে তাদের নিজ নিজ অবস'ান প্রকাশ করা হয়েছে এ কার্টুনে। সোহরাওয়ার্দীর অবস'ান : ‘বিভক্ত ভারতে ঐক্যবদ্ধ বাংলা’। হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবস'ান : ‘অবিভক্ত ভারতে বিভক্ত বাংলা’। জিন্নাহর অবস'ান : ‘বিভক্ত ভারতে বিভক্ত বাংলা’ এবং গান্ধীর অবস'ান : ‘অবিভক্ত ভারতে অবিভক্ত বাংলা’। প্রশ্ন হচ্ছে- কে সঠিক? সূত্র : হিন্দুস'ান স্ট্যান্ডার্ডের কার্টুন, ১৭ মে, ১৯৪৭।
এ কার্টুন শত্রু বন্ধু চিহ্নিত করে না, তবে পূর্ববাংলা নিয়ে তাদের মানসটা উপলব্ধি করা যায়। এ প্রসঙ্গে আমরা বঙ্গভঙ্গের গোড়ায় যেতে চাই।

১৯০৫ থেকে ২০১২ এক শ’ ছয় বছর। ইতিহাস গবেষকদের কাছে এক শ’ বছর অনেক বড় কিছু নয়। ইতিহাসচর্চার বিরাট ক্যানভাসে প্রতিটি শতাব্দীকে জাতি, রাষ্ট্র ও সমাজসভ্যতার জন্য একটি একক হিসেবে মূল্যায়নের রীতি আছে। আমাদের জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিনির্মাণে বিগত এক শতাব্দী শুধু ঘটনাবহুল ও বর্ণাঢ্যই নয়; গৌরবদীপ্ত ইতিহাস সৃষ্টির অসাধারণ ব্যাপকতায় সমৃদ্ধ।

এ সময়ে আমাদের স্বাধীনতার দাবি উচ্চকিত হয়েছে বারবার। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সঙ্ঘাতের ইতিহাসও নিরবচ্ছিন্ন। এ সময় এতটা বাঙ্ময় আমরা বারবার ঐতিহ্যের কাছে হাত পেতেছি। অতীতের সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছি। প্রতিটি ত্যাগকে মেপেছি অর্জনের পাল্লায় তুলে। ইতিহাসের বাঁক খুঁজতে গিয়ে আমরা প্রতিটি লাল তারিখকে স্পর্শ করেছি একটি স্বাধীন জাতিসত্তার স্বপ্নমাখা আবেগ ও উপলব্ধিকে আত্মস' করে।
’৭১ যেমন আমাদের রক্তক্ষরণ ও অর্জনের সোনালি দিন, তেমনি ’৪৭ ছিল এ পথে অসাধারণ প্রাপ্তি। এর পেছনে ছিল ঘটনাবহুল জীবনের নানা অধ্যায়। এর কোনোটি ছিল ট্র্যাজেডি, কোনোটি ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর, সাধারণ বিবেচনায় বিয়োগান্তক ঘটনা কিন' সময়ের ব্যবধানে সেটিই ধরা দিয়েছে স্বাধীনতার মাইলফলক ও হিরণ্ময় দিন হিসেবে। এ লেখায় আমরা ইতিহাসের গোড়ায় যাবো না, বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি নাতিদীর্ঘ সময়কে আলোচনায় টানব, যা কিনা আমাদের নিজস্ব ইতিহাস। সময় ভাবনায় একেবারে টাটকা এবং বাস্তবতার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ।

বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ। আরো পেছনে তাকালে পলাশী থেকে ’৪৭-এর ব্রিটিশমুক্ত ভারতবিভক্তি। ইতিহাসের বাঁক ঘোরানো অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী। এই ইতিহাসকে আরো পেছনে ঠেলে নিলে বখতিয়ারের গৌড়বঙ্গ বিজয়, টানা ঘটনা একই সুতোয় গাঁথা। ঘটনাপরম্পরায় একটি অপরটিকে অনুসরণ করছে। অথবা একটি আরেকটির অনিবার্য পরিণতি কিংবা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির সোপান।

যে পলাশী মুসলমানদের ভাগ্যবিপর্যয়; সেই পলাশীই ভারতীয় হিন্দু জাতিসত্তার কাছে আশীর্বাদ। মুসলমান ভেবেছে সব কুল গেল; আর সাধারণ হিন্দুরা ভেবেছে ‘রাজা যায় রাজা আসে’। কিন' যারা জমিদার, ব্রাহ্মণ, বাবু, রাজনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী- তারা মুসলিম শাসনের ‘ক্ষয়িষ্ণু ধারার নিপাত’ চেয়েছে। আর ইংরেজদের ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার প্রতিক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানে তারা উদ্বেলিত হয়েছে।

বঙ্গ বিভাগ কোনো মহলবিশেষের দাবির ফসল ছিল না। ১৮৬৮ সাল থেকে বঙ্গ বিভাগ নিয়ে ইংরেজ শাসকেরা ভাবছিলেন। ১৮৫৪ সালের আগে ইংরেজেরা ভারতের প্রশাসনিক বিভাজন-বিভক্তি নিয়ে তেমন একটা ভাবেনি। ১৭৭২ সাল থেকে টানা ৭৯ বছর বাংলার প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব ছিল ইংরেজ অধিকৃত ভারতের গভর্নর জেনারেলের ওপর। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিং বাংলার গভর্নর হন। বঙ্গের সীমারেখা তখন পর্যন্ত মোগল আমলে যা ছিল তা-ই সি'র ছিল। ১৮৫৪ সালে প্রথম বাংলাদেশের জন্য একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিয়োগ করা হয়। এই সময় এবং এর আগেও আসাম ছিল বঙ্গদেশের অংশ। এর ২০ বছর পর প্রশাসনিক সুবিধার কারণে আসামকে বঙ্গদেশ থেকে আলাদা করে সেখানে একজন চিফ কমিশনার নিযুক্ত করা হয়। এরপর আট বছরের মাথায় ১৮৮২ সালে লুসাই পার্বত্য অঞ্চলকে আসামের সাথে জুড়ে দেয়া হয়। তবুও বঙ্গদেশের আয়তন বিশালই থেকে যায়। তখন এর লোকসংখ্যা ছিল আট কোটি। আয়তন ছিল দেড় লাখ বর্গমাইল। ১৮৬৮ সালে লর্ড অ্যালগিন পৃথক বঙ্গ বিভাগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। লর্ড কার্জন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। অবশ্য এর আগে ১৮৯৬ সালে চট্টগ্রাম বিভাগকে আলাদা করার কথা উঠেছিল, কিন' প্রস্তাবাকারে সেটি কোনো মহলে বিবেচিত হয়নি।

১৯০৩ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ জেলাদ্বয় ও চট্টগ্রাম বিভাগকে নিয়ে আসামকে যুক্ত করে একটি নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব ইংরেজ সরকারের বিবেচনাধীন ছিল। কোনো সমপ্রদায়ই এই বিভাজনে উৎসাহ প্রদর্শন করেনি। ১৯০৪ সালের ১১ জানুয়ারি ঢাকায় উল্লিখিত প্রস্তাবটি নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে একটি বিকল্প প্রস্তাব আসে এভাবে- সমগ্র আসাম, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কুচবিহার ব্যতীত রাজশাহী বিভাগ এবং প্রেসিডেন্সি বিভাগের যশোর ও খুলনা জেলাদ্বয় নিয়ে ঢাকাকে রাজধানী করে ব্যবস'াপক সভাবিশিষ্ট একটি গভর্নর-শাসিত প্রদেশ গঠন করা যেতে পারে। ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লর্ড কার্জন তার পরিকল্পিত বঙ্গ বিভাগ সম্পর্কে জনমত যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেন। পূর্ববঙ্গ সফরে তিনি ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম, ১৮ ও ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ও ময়মনসিংহে জনসভা করেন।

এই প্রস্তাব ১৯০৫ সালের ১০ জুলাই ভারতসচিব ব্রডারিক অনুমোদন করেন। ঢাকাকেন্দ্রিক রাজধানী এবং বঙ্গীয় মুসলিম সমাজ কর্তৃক ইতিবাচক ভূমিকায় হিন্দু সমপ্রদায় এর ভেতর মুসলিম স্বার্থের গন্ধ খুঁজে পায় এবং কার্জনের প্রশাসনিক বিভাজনের চেয়ে রাজনৈতিক ইচ্ছাকে অধিকতর দুরভিসন্ধিমূলক আখ্যায়িত করে বিরোধিতা শুরু করে। কংগ্রেস দেশব্যাপী ‘শোক দিবস’ পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। হিন্দু নেতারা প্রবল আপত্তি তুলে এর সাথে ধর্মীয় আবেগ যুক্ত করতে গিয়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

বঙ্গ বিভাগ পরিকল্পনার ভেতর ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ববাংলার মুসলমানদের উত্থানের স্বপ্ন জাগে। মুসলমানেরা একে স্বাগত জানান। মুসলমানদের উৎসাহ আর হিন্দুদের প্রবল আপত্তির মুখে ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ সালে বঙ্গ বিভাগ পরিকল্পনা কার্যকর হয়। নতুন প্রদেশের নাম হলো ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’। রাজধানী ঢাকা। প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। আয়তন এক লাখ ছয় হাজার ৫৪০ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখ মুসলমান ও এক কোটি ২০ লাখ হিন্দু। আর স্যার ব্যামা ফিল্ডফুলার নবগঠিত প্রদেশের প্রথম ছোট লাট নিযুক্ত হন।

১৮৬৬ সালে উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষের কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেল, বিরাট প্রদেশ শাসনের অসুবিধাই দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ। তখন বাংলার ছোট লাট ছিলেন স্যার উইলিয়াম গ্রে। ১৮৭২ সালে স্যার জন ক্যাম্পবেল অভিযোগ করেন- এত বড় প্রদেশে একজনের পক্ষে শাসনকাজ পরিচালনা করা অসম্ভব। ভারতসচিব লর্ড হ্যামিলটনের সাথে লর্ড কার্জনের পত্র বিনিময়ের সূত্র ধরেও বলা চলে, বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণ প্রশাসনিক। একটি রাজনৈতিক কারণ যে ছিল সেই সত্যও ধরা পড়ে এনড্রো ফ্রেজারের একটি সুপারিশে। সেই সুপারিশে তিনি মন্তব্য করেছিলেন- বঙ্গ বিভাগে ঢাকা ও ময়মনসিংহের সাথে আসাম যুক্ত হলে অশান্তি কমবে এবং যে গুরুতর শাসন সমস্যার উদ্ভব হয়, সেটাও দূর হবে। ১৯০৪ সালে রিজলি অন্যভাবে রাজনৈতিক সুবিধা তুলে ধরেন। তার মতে, ‘কংগ্রেস মনে করে, বাংলাদেশ যুক্ত থাকলে খুব শক্তিশালী হয়, বিভক্ত হলে শক্তি বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্নমুখী হয়ে পড়বে। এ কথা সত্য, এটাই হবে আমাদের পরিকল্পনার অন্যতম সুফল।’

এ ছাড়া যেকোনো কারণেই হোক, লর্ড কার্জনের সাথে কংগ্রেসের তৎকালীন কোনো কোনো নেতার হয়তো ভালো সম্পর্ক ছিল না। তিনি ভারতে থাকাকালীন কংগ্রেসের শান্তিপূর্ণ মৃত্যুতে সাহায্য করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। ফ্রেজার সাহেব মন্তব্য করেছিলেন : ‘ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হলে নেতৃস'ানীয় মুসলমানদের ওপর হিন্দু নেতাদের প্রভাব লোপ পাবে।’

ভারতের রাজনীতি তখন কার্যত নিয়ন্ত্রিত হতো রাজধানী কলকাতা থেকে। শিক্ষিত হিন্দু, নব্য বাবু এবং উঠতি ধনতান্ত্রিক নব্য হিন্দু পরিবারগুলো সেই রাজনীতি যেমন নিয়ন্ত্রণ করত, তেমনি পূর্ব বাংলার কৃষিজীবী মুসলমান ও দলিতজনদের ওপর খবরদারিও করত। বঙ্গ বিভাগ কলকাতাকেন্দ্রিক বাবুদের এই সুবিধাভোগী পরিকল্পনার ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত হিসেবেই এসেছিল।

বঙ্গ বিভাগ তাৎক্ষণিক কয়েকটি ফলাফল নির্ণয় করে দিয়েছিল : ১. নতুন প্রদেশ উন্নতির সুযোগ পেল, ২. গরিষ্ঠ মুসলমানদের ভেতর নতুন চেতনা যেমন জাগল, তেমনি সংখ্যাধিক্যের সুবাদে লেখাপড়া ও চাকরির সুযোগ বাড়ল, ৩. বাবুদের দৌরাত্ম্য কমে যাওয়ার কারণে তারা নিজেদের একটু স্বাধীন ভাবার সুখ অনুভব করল, ৪. দুই সহোদর প্রদেশের ভেতর সমানুপাতিক প্রতিযোগিতার ভেতর উন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হলো, ৫. ঢাকা ও চট্টগ্রামের পুনর্জন্ম হলো, ৬. নদী-খাল উন্নত হলো, রেল যোগাযোগ সম্প্রসারিত হলো চট্টগ্রাম নাগাদ, ৭. নতুন প্রাদেশিক পরিষদের পূর্ব বাংলায় সম্প্রসারিত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি হলো, ৮. সুষ্ঠু শাসনব্যবস'ায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বাড়ল, ৯. অনুন্নত আসাম পূর্ব বাংলায় সম্পৃক্ত হয়ে উন্নয়ন ও শিক্ষার ছোঁয়া পেল, ১০. পূর্ব বাংলায় পৃথক পুলিশ বাহিনীর ব্যবস'া হলো, ১১. প্রদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক উন্নতির পরিকল্পনা তৈরি হলো, ১২. এক বছরের মাথায় প্রমাণিত হলো, পূর্ববাংলার নেতৃত্ব জনগণ শিগগিরই প্রদেশের কর্মকর্তার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাচ্ছিল, আগে যেটা প্রায় অসম্ভব ছিল।

কার্যত পূর্ববাংলা ছিল সম্পদশালী। জনশক্তি ছিল অফুরন্ত। কৃষিনির্ভর বুনিয়াদ ছিল শক্ত। আগে কলকাতা এই সুযোগ ও সুফল গ্রহণ করত। উপকৃত হতো বাবুরা। রাতারাতি এই স্রোত ঢাকাকেন্দ্রিক হতে লাগল। ঢাকা-চট্টগ্রামকেন্দ্রিকতা মানেই ছিল গরিষ্ঠ মুসলমানদের সমৃদ্ধি। অবশ্য পূর্ব বাংলার হিন্দুরাও এই সুবিধার সমান অংশীদার ছিল।

বঙ্গভঙ্গের প্রধান বিরোধী শক্তি ছিল হিন্দু জমিদার, সাংবাদিক, উকিল ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। জাতীয় সংহতির প্রতি আঘাত বলে চিৎকার করলেও তারা মুসলমান প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় ক্ষুব্ধ হলো। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতায় টাউন হলে কাশিমবাজারের জমিদার মহারাজা মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দীর সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভায় তিনি বললেন, ‘নতুন প্রদেশে মুসলমানদের প্রাধান্য স'াপিত হবে। বাঙালি হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ঠে পরিণত হবে। আমাদের নিজেদের দেশে আগন'কের মতো থাকতে হবে। আমাদের জাতির ভাগ্যে ভবিষ্যতে যে কী হবে তা চিন্তা করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি।’

আইনজীবীরা বৈধতার প্রশ্ন তোলেন মক্কেলের কথা বিবেচনা করে। বুদ্ধিজীবীরা বাংলা ভাষার ক্ষতির প্রশ্ন তুললেন। হিন্দু রাজনৈতিক নেতারা প্রচার করলেন, ব্রিটিশ সরকার বিভেদ নীতির বাস্তবায়ন করছে এবং ব্রিটিশ-মুসলমান মিত্রতার ফল বাংলা বিভক্তি।

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি তীব্র ভাষায় বঙ্গভঙ্গের নিন্দা করেন। কলকাতার হিন্দুরা ১৬ অক্টোবর জাতীয় শোক দিবস পালন করে এবং বঙ্গভঙ্গ রদের শপথ গ্রহণ করে। ১৯০৬ সালের ৭ আগস্ট ‘স্বদেশী আন্দোলন’ আরম্ভ হয়। বিলাতি দ্রব্য বয়কট করা হয়। সরকারি শিক্ষা বর্জন ও হিন্দু জাতীয় শিক্ষাকার্যক্রমের ঘোষণা দেয়া হয়। কংগ্রেসের মারাঠি নেতা বালগঙ্গাধর তিলক হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানে বঙ্গ বিভাগ কাজে লাগাতে শিবাজী উৎসব আয়োজনের ডাক দেন। এই প্রথম সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয়া হয়। হিন্দুত্ববাদের মোড়কে আন্দোলন পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জমিদার শ্রেণী শুরুতে কৃষক প্রজাদের জোর করে আন্দোলনে, বিদেশী পণ্য বর্জনে বাধ্য করতে চেয়েছে। এতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লেও গণভিত্তি পায়নি।

বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে হিন্দু মানস পরিমাপ করতে গিয়ে কলকাতার হিন্দুস'ান বুক সার্ভিস থেকে প্রকাশিত বিমলানন্দ শাসমল ‘স্বাধীনতার ফাঁকি’ গ্রনে'র ৫৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন :
‘এই হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রবলভাবে এবং সুপরিকল্পিত আকারে প্রকাশ পেল বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলনে ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতারা ইংরেজ রাজত্বের উচ্ছেদের পরিকল্পনা করেননি। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল সীমাবদ্ধ এবং বঙ্গ বিভাগ বন্ধ হওয়ায় তখনকার মতো ইংরেজ সরকারের অহমিকাতে আঘাত লাগা ছাড়া আর কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন' ক্ষতি হয়েছিল মুসলমানদের এবং সেই হেতু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন নিঃসন্দেহে মুসলমানবিরোধী ছিল।

...ভারতের নবজাগ্রত হিন্দু জাতীয়তাবাদের তাগিদে আমরা মুসলমানদের সুখ-সুবিধা লাভালাভের প্রশ্নে অন্ধ হয়ে উঠলাম। মুখে যতই হিন্দু-মুসলমান মিলনের কথা ঘোষণা করি না কেন, রাজনৈতিক দিক দিয়ে মুসলমানদের জন্য কিছু করা হচ্ছে দেখলেই আমরা হিন্দুরা তাতে বাধা দিয়েছি। পূর্ব বাংলা মুসলমান প্রদেশে রূপান্তরিত হলে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ইত্যাদিতে হিন্দুদের কোনো হাত থাকবে না। বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের বিরুদ্ধে এইটাই ছিল আমাদের আন্দোলনের প্রধান কারণ।’

‘পাকিস্তান অর পার্টিশন অব ইন্ডিয়া’ গ্রনে'র ১১০ পৃষ্ঠায় ড. আম্বেদকর মন্তব্য করেন : ‘বাঙালি হিন্দুদের বাংলা বিভাগের বিরোধিতার কারণ ছিল এই- তারা চাইতেন না মুসলমানরা পূর্ব বাংলায় তাদের যথাযোগ্য স'ান অধিকার করুক। বাঙালি হিন্দুরা কিন' স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে, বাংলা বিভাগের বিরোধিতা করে এবং সেই সাথে স্বরাজের দাবি করে তারা মুসলমানদের পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় বাংলার শাসক শ্রেণীতে পরিণত করে দিয়েছিলেন।’

বিমলানন্দ বাবু একই বইয়ের ৫৫ পৃষ্ঠায় মন্তব্য করেছেন : ‘সিন্ধু প্রদেশেও ঠিক এমনটিই হয়েছিল। ১৯১৫ সালে হিন্দুরা সিন্ধুকে বোম্বাই থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন, কারণ তখন সিন্ধু দেশে মুসলমান সংখ্যাধিক্যের সম্ভাবনা ছিল না, কিন' ১৯২৯ সালে যখন মুসলমান সংখ্যাধিক্য অবধারিত, তখন হিন্দুরা সিন্ধুকে বোম্বাই থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিল।’

১৯০৭ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন, ‘মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে এই কথাটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়। কে লাগাইলো সেটা তত গুরুত্বের বিষয় নহে।’
‘হিন্দু মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশে একটা পাপ আছে, এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিয়াছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোনো মতেই নিষ্কৃতি নাই।’
‘আর মিথ্যা কথা বলিবার প্রয়োজন নাই। এইবার আমাদিগকে স্বীকার করিতেই হইবে হিন্দু-মুসলমানের মাঝখানে একটা বিরোধ আছে। আমরা যে কেবল স্বতন্ত্র তাহা নহে। আমরা বিরুদ্ধ।’ রবীন্দ্র রচনাবলী, ১০ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৬২৩-৮।

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে সন্ত্রাস আশ্রয়ী হিন্দুত্ববাদের বিপজ্জনক পরিণতি এতটা প্রকট হয়ে উঠেছিল যে, সেটা সাধারণভাবে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের অবিমিশ্র মুসলমান বিরোধিতার ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করেছিল।
‘কমিউনিস্ট পার্টি ও আমার জীবন’ গ্রনে' কমরেড মুজাফফর আহমেদ উল্লেখ করেছেন- সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের আদি প্রতিষ্ঠান, অনুশীলন সমিতির মূল প্রচারপত্রে লেখা ছিল : ‘মুসলমানদের দাবিয়ে রাখতে হবে’। এরপর বাংলার মুসলমান চাষিরা বুঝেছিল কোনো দিন কংগ্রেস ও স্বরাজ্য দলের ওপর ভরসা করা যাবে না। পূর্বে উল্লিখিত বইয়ের ৭৮ পৃষ্ঠায় বিমলানন্দ আরো পেছনে গিয়ে হিন্দু মানস খুঁজতে চেষ্টা করেছেন এভাবে : ‘এ কথা ভুললে চলবে না, ভারতবর্ষে হিন্দুরা বহু দিন থেকেই মুসলমান রাজত্বের অবসান ঘটাবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন' নিজেদের পারস্পরিক অনৈক্য ও সামাজিক দুর্বলতার জন্য মুসলমান শাসনের বিরুদ্ধে তারা কার্যকর কিছু করে উঠতে পারেননি। কিন' ইংরেজ আগমনে ভারতের হিন্দুদের বহু দিনের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ হবার অবকাশ পেল। ভারত বর্ষের সিংহাসন থেকে মুসলমানদের সরিয়ে হিন্দুরাই বসিয়েছিল ইংরেজদের। পলাশী যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে বিখ্যাত মারাঠা নায়ক বালাজি বাজিরাও ক্লাইভকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, তিনি বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ইংরেজদের নিজের সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে প্রস'ত আছেন। পলাশী যুদ্ধে মীরজাফর শিখণ্ডি ছিলেন মাত্র। সিরাজের প্রায় সমস্ত হিন্দু সেনাপতি মীরজাফরকে সামনে খাড়া করে গোপনে ইংরেজ পক্ষের সুবিধা করে দিয়েছিলেন।... ইংরেজদের হাতে শাসনভার অর্পিত হলে হিন্দুরা যে রকম প্রীত হয়েছিলেন, মুসলমানরা তা হতে পারেননি।’

জাতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য গ্রনে' ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন : ‘অষ্টাদশ শতকের মধ্য ভাগে দুর্বল সিরাজউদ্দৌলার রাজত্বকালে বাংলাদেশে ইংরেজরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করিয়া লইল, অজ্ঞান, স্বার্থান্ধ, কুচক্রী, মনুষ্যত্বহীন জনকয়েক বাঙালি ও বঙ্গ প্রবাসী জমিদার, সমাজনেতা ও ধনী ব্যক্তি মিলিয়া স্বদেশকে ইংরেজদের হাতে তুলিয়া দিলো।’

বঙ্গভঙ্গ রদ ও এর প্রতিক্রিয়া পর্বে যাওয়ার আগে আমরা অল্প ক’টি তথ্য তুলে ধরেছি এই জন্য যে, বঙ্গ বিভাগ নিয়ে কংগ্রেস হিন্দু নেতৃত্ব বাংলা মায়ের অঙ্গ রক্ষার দাবিদার বর্ণ হিন্দুদের মানসটা কী ছিল তা খানিকটা অনুভব করা। এ বিষয়ে ইতিহাস এত বেশি প্রামাণ্য দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষণ করে রেখেছে যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের পরিধি ডিঙিয়ে ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত ছাড়াও যেকোনো মানুষ স্বাধীন বিবেকের ওপর নির্ভর করে বলতে পারবেন- পূর্ব বাংলার মানুষ আজ যে জাতিসত্তার পরিচয়বাহী অবয়বটি প্রত্যক্ষ করছে সেটা কত বেশি অর্জন এবং এই অর্জনে আমাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিকা কত বেশি এবং কত দূরদর্শী ছিল। এ প্রসঙ্গে আমরা আরো ক’টি তথ্যের দিকে ফিরে যেতে পারি।

আজ এ কথা জোর দিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ করে বলা সহজ- বঙ্গভঙ্গ ছিল বাংলাদেশের সূচনালগ্ন। ঢাকার উত্থান। বর্ণ হিন্দুরা এবং এর নেতৃত্ব কখনোই মুসলিম অস্তিত্ব মানতে চায়নি। যে বাংলাদেশ মানলে মুসলমান প্রাধান্য মানতে হয়, সেই বাংলা তারা অভিধানে রাখতেও নারাজ ছিল। বাংলা যদি ষোলো ভাগও হতো এবং তাতে যদি বর্ণ আর্য ও কুলিন হিন্দুদের প্রাধান্য থাকত সেটাকে কোনোভাবেই বঙ্গ ব্যবচ্ছেদ বলা হতো না। মুঘল আমলের আগেও গুপ্ত ও সেনশাসনকালে প্রশাসনিক বিভাজন হয়েছে, মুসলমান প্রাধান্যের প্রশ্ন ওঠেনি বলে হিন্দু জাতীয়তাবাদের নামে ভারতীয় আত্মার কোনো সমস্যা হয়নি।

যে বাংলা বিভক্তি নিয়ে, আসলে বিভক্তিও নয়, প্রশাসনিক বিন্যাস নিয়ে ১৯০৫ সালে হিন্দু বাবুরা তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে দিলো, তারাই ’৪৭ সালে জোর করে বাংলার বুকে আড়াআড়ি কুড়াল বসালো। সিন্ধু, পাঞ্জাব, কাশ্মীর ছাড়াও ভারতজুড়ে প্রশাসনিক ভাগবিন্যাসে বিভিন্ন অঞ্চল নানাভাবে ব্যবচ্ছেদ হয়েছে। আবার জোড়া লেগেছে, কিন' বিপত্তির প্রসঙ্গ ওঠেনি। বাংলার ব্যাপারে সত্যিই কি দেবতারা ভীষণ রুষ্ট ও নাখোশ হয়েছিল! নাকি এর ভেতর হীন, নীচ ও ঘৃণ্য সামপ্রদায়িক বিষয়টাই প্রধান ছিল, সেটাই এক শ’ ছয় বছর পর আমরা খুঁজতে বসেছি। কারণ কোনো জাতি সামনে এগোতে চাইলে পেছনটাও খতিয়ে দেখে। শিকড়টা খোঁজার এই তাগিদই জাতিকে ইতিহাসমুখী করে। যে জাতি ইতিহাসের উৎস সন্ধানে ব্যাপৃত হয়, তার মানবিক শক্তি বাড়ে, চিন্তার প্রসারতা আরো বিস-ৃত হয়, সামনের পথচলাটা হয় দৃঢ়, মজবুত ও পরিচ্ছন্ন। পূর্ব বাংলাকে শোষণ করে কলকাতা সমৃদ্ধ হয়েছিল, এই স্মৃতি আমরা জেনে রাখতে চাই, লালন করতে চাই না। আমাদের ওপর আধিপত্যবাদ চেপে বসতে চায়। অক্টোপাসের মতো অষ্ট হাতে বেঁধে আড়ষ্ট করে দিতে চায়- এটা জেনে রাখার গরজ বোধ করি। কিন' আমরা ভীতির দুঃস্বপ্ন পুষে রাখতে চাই না। (অসমাপ্ত)
মাসুদ মজুমদার
digantaeditorial@gmail.com