Farhad Mazhar লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Farhad Mazhar লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২১ মার্চ, ২০১৭

বিজেপির বিজয় : আগামী তুফানের পূর্বাভাস

উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুলভাবে জিতেছে। বিজয়ের এই বৈপুল্য ছোটখাটো ব্যাপার নয়, বেশ বড়সড় ঘটনা। বিজেপির এই বিজয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব আরও মজবুত হল, এটা সহজেই বোঝা যায়। ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের অর্থ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি একটা পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তার হিসাবে ২০১৪-তে লোকসভায় বিজেপির পক্ষে ভোটারদের সমর্থন ছিল ৪০ ভাগ, এবার সে হার প্রায় ৮০ ভাগ। এই বিজয় যদি ভারতীয় রাজনীতির মেরুকরণ এবং ভারতীয় গণমানসের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত হয় তাহলে এটা স্পষ্ট যে, সর্বভারতীয় প্রকল্প হিসেবে হিন্দুত্ববাদ স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। বাংলাদেশের জনগণ কীভাবে তা মোকাবেলা করবে এ নিয়ে অবিলম্বে ভাবনা-চিন্তা দরকার।

উত্তর প্রদেশে বিজেপির সাম্প্র্রতিক বিজয় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নতুন মেরুকরণ নয়, সেটা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। এখন মেরুকরণের ভারসাম্য সুস্পষ্টভাবেই হিন্দুত্ববাদের দিকেই ঝুঁকে পড়েছে; অপরাপর তাৎপর্য ছাড়াও এই বিজয় প্রমাণ করছে যে, কংগ্রেসের পক্ষে আবার সর্বভারতীয় দল হিসেবে হাজির হওয়া এখন রীতিমতো অসম্ভব। সেটা খারাপ কিছু নয়। সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে জাতিবাদী হিন্দুর চেহারা আড়াল করে রাখার চেয়ে সরাসরি নিজের হিন্দু পরিচয় সামনে আনা অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন, সৎ ও সত্য। ভারতীয় গণমানস তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে এটা বুঝেছে। কেন তাদের এই উপলব্ধি ঘটল তা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক গবেষণা হতেই পারে। কিন্তু এটাই ভারতীয় রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা।

এই বিজয়ে এটাই স্পষ্ট যে, নির্বাচনপন্থী বামপন্থাও ভারতীয় জাতীয় রাজনীতিতে পরাজিত শক্তি। রাজনীতির এই উত্থান-পতনের মর্ম বোঝা আমাদের জন্য এখন খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই লক্ষ্যেই এখানে কিছু পর্যবেক্ষণ পেশ করব।

তবে তার আগে যারা ভারতের নির্বাচন ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করেননি তারা নিচের পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে অনেক কিছুই আন্দাজ করতে পারবেন।

রাজনৈতিক দল নির্বাচন ২০১৭ নির্বাচন ২০১২

সমাজবাদী পার্টি ৪৭ ২২৪

ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ৭ ২৮

বহুজন সমাজ পার্টি ১৯ ৮০

ভারতীয় জনতা পার্টি ৩১২ ৪৭

রাষ্ট্রীয় লোক দল ১ ৯

অন্যান্য ২৯ ১৫

মোট ৪০৩ ৪০৩

সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেস ২০১২ সালে আসন পেয়েছিল ২৮টি, এবার পেল মাত্র ৭টি। বহুজন সমাজ পার্টির আসন সংখ্যা ৮০ থেকে ১৯-এ নেমে এসেছে। সমাজবাদী পার্টি এতকাল ক্ষমতায় ছিল। ২০১২-তে তাদের আসন সংখ্যা ছিল ২২৪। এবার অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বে তাদের ২২৪ আসন কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭-এ। প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতিতে জাতীয় দলের চেয়েও নির্ধারক ভূমিকা রাখবে আঞ্চলিক দল, তারা সমাজবাদী পার্টির ভরাডুবি থেকে ভিন্ন ইঙ্গিতই পাবেন। ভারতীয় গণমানস রাজ্যকেন্দ্রিক চিন্তার চেয়ে জাতিবাদী হিন্দুত্ববাদ বা ভারতীয়তাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। রাজ্য ও কেন্দ্রের দ্বন্দ্ব এতে কমবে না। তাতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি দুর্বল হবে সেটা ভাবার কোনো কারণ নেই। নির্বাচন রাজ্য আর কেন্দ্রের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক বনাম জাতীয় রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব নতুন করে মূল্যায়ন করবে। এসব বিষয়েই নতুন করে ভাবতে হবে।

নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো জোট বাঁধে। তো জোটের হিসাব ধরলে উত্তর প্রদেশের ৪০৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জোট পেয়েছে ৩২৫টি। ক্ষমতাসীন সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস জোট পেয়েছে ৫৬টি আসন। বহুজন সমাজবাদী পার্টি পেয়েছে ১৯টি আর বাকিরা পেয়েছে ৩টি আসন।

অন্য যেসব রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে উত্তরাখণ্ড রাজ্যেও বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। পাঞ্জাবে জয়ী হয়েছে কংগ্রেস। গোয়া ও মনিপুর রাজ্যের নির্বাচনে বেশি আসন পেয়েছে কংগ্রেস, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তারা। সরকার গঠন করতে চাইলে তাদের জোট বাঁধতে হবে।

এটা আমরা জানি, নরেন্দ্র মোদি গত বছর নভেম্বর মাসে চালু নোটের ৮৬ শতাংশ বাতিল করেছিলেন, ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট বাতিল হয়ে গিয়েছিল। তার নোট বাতিল করার সিদ্ধান্ত খুব জনপ্রিয় হয়নি। সাধারণ মানুষকে বিস্তর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই নোট বাতিল করাকে কেন্দ্র করে বিস্তর প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে। মোদি নোট বাতিল করে কালো টাকা নস্যাৎ করার যে দাবি করছিলেন তার পক্ষেও বিশেষ যুক্তি তিনি দিতে পারেননি। প্রচুর কালো টাকা বিকল করা গেছে সেটাও বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি। অনেকে ধারণা করেছিলেন, নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নির্বাচনে বড়সড় প্রভাব ফেলবে। কিন্তু দেখা গেল সেটা ঘটেনি। বোঝা যাচ্ছে, গণমানসে তিনি এমন একটা ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পেরেছেন যা নোট বাতিলের সৃষ্ট দুর্দশা ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি। ভারতের রাজনীতি বোঝার জন্য এসব খুবই গুরুত্বপূর্ণ সিম্পটম।

সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিজেপি এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নয়। তাই মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার সব বিল পাস করতে পারে না। সেই পরিস্থিতি রাজ্য বিধানসভাগুলোতে নবনির্বাচিত বিজেপি সদস্যদের ভোটের ফলে আগামীতে বদলাবে, এটা অনুমান করা যায়। যতজন সংসদ সদস্য রাজ্যসভায় বিজেপি পাঠাতে পারবে, সেই অনুপাতে উচ্চকক্ষের সংখ্যার ভারসাম্যেও বদল ঘটবে। বিজেপির পক্ষে একটি অনুকূল হাওয়া বইছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। ফল অনুযায়ী উত্তর প্রদেশের ৪০৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জোট পেয়েছে ৩২৫টি আসন। ক্ষমতাসীন সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস জোট পেয়েছে ৫৬টি আসন। বহুজন সমাজবাদী পার্টি পেয়েছে ১৯টি, আর বাকিরা পেয়েছে ৩টি আসন। সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে কংগ্রেস জোট বেঁধে ভোটে নেমেছিল। উভয়েই পরাজিত। জোটের প্রচারে প্রধান ছিলেন দুই দলের দুই যুবনেতা বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব আর কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। নিজেদের সীমিত চিন্তা ও ব্যর্থতার কোনো পর্যালোচনা না করে এবং ভারতের নতুন বাস্তবতাকে আমলে না নিয়ে তারুণ্য দিয়ে তারা নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকাতে পারবেন ভেবেছিলেন। বিজেপির পক্ষে প্রচারে ছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি। ব্যাপক প্রচারাভিযান। তার প্রচারে উন্নয়ন আর মেড ইন ইন্ডিয়ার আবেগ ছিল। আর, বলা বাহুল্য, সরবে ছিল রাজ্য সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা। ওতে কাজ হয়েছে।

উত্তরাখণ্ডেও কংগ্রেস দাবড় খেয়েছে। নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিজেপি। এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলা হয়েছিল। কিন্তু হয়নি। কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী হরিশ রাওয়াত নিজে দুটি কেন্দ্রেই পরাজিত হয়েছেন। ৭০ আসনের উত্তরাখণ্ড বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৩৬টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ৫৭টি আসন। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পেয়েছে ১১টি। আর অন্যরা পেয়েছে ২টি আসন। ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি অল্প ব্যবধানে কংগ্রেসের কাছে হেরেছিল, রাজ্যের দখল নিয়েছিল কংগ্রেস। এবার ইতিহাস ভিন্ন।

তবে পাঞ্জাবে জয়ী হয়েছে কংগ্রেস। পরপর দু’বার পাঞ্জাবের সরকারে এসেছে আকালি-বিজেপি জোট। পাঞ্জাবে সাধারণত পাঁচ বছর অন্তর অন্তর ক্ষমতা বদল হয়। কিন্তু গত ২০১২ সালে আকালি দল ও বিজেপি জোট ক্ষমতায় আসে। পাঞ্জাবের ড্রাগ সমস্যা নিয়ে জোরদার প্রচার চালিয়ে বড় মুখ হিসেবে উঠে আসেন আম আদমি পার্টির নেতা ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অবশেষে জিতল কংগ্রেস। ১১৭ আসনের পাঞ্জাব বিধানসভায় কংগ্রেস পেয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ৭৭টি আসন। আম আদমি পার্টির জোট পেয়েছে ২২টি, ক্ষমতাসীন আকালি দল ও বিজেপি জোট পেয়েছে ১৮টি আসন। গোয়া ও মনিপুরেও এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস।

এই ভোটাভুটি থেকে ভারতীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট আন্দাজ করতে পারি বলেই আমার ধারণা। বুঝতে পারি, ১. কংগ্রেস জাতীয় দল হিসেবে তার গণভিত্তি আসলেই হারিয়েছে, ক্রমশ তার ভূমিকা আঞ্চলিক দলগুলোর অধিক কিছু হবে না। আগামীতে এ দলটির পক্ষে কেন্দ্রে শক্তিশালী জাতীয় দল হিসেবে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা খুবই কম; ২. হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিরুদ্ধে আদর্শিক অবস্থান থেকে প্রতিরোধ করার সাংগঠনিক শক্তি কোনো দলেরই নেই, বামপন্থীদেরও নেই; ৩. ভারতে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবেদন সাধারণ মানুষের কাছে বাড়ছে; ৪. সংখ্যালঘুকে ভোটব্যাংক ভেবে যারা রাজনীতি করছে, তারা এক হিসাবে খাদে পড়ছে, বিজেপি তার হিন্দুত্বের শক্তি মুসলমানদের ভোট ছাড়াই কায়েম করতে পারছে। ভারতীয় রাজনীতির এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

দুই

ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আদতে হিন্দুত্ববাদেরই নামান্তর, এ কথা অনেকে এর আগে নানাভাবে অনেকবারই বলেছেন। এই দিকটা বুঝতে পারলে ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থান এবং ভারতীয় রাজনীতিতে তার গেড়ে বসার মধ্যে বিস্ময়কর কিছু নেই। এটা খুবই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত ঘটনাই বটে। হিন্দুত্ববাদ যখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সেকুলার পোশাক পরিধান করে থাকে, তখন সেটা নিতান্তই তার লজ্জাস্থান আচ্ছাদিত করে রাখার দরকারে। এটা এতকাল কংগ্রেস ও বিভিন্ন ফেরকার সমাজতন্ত্রী ও বামপন্থী ধারা সেকুলারিজমের নামে করে এসেছে। নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাড়তি আচ্ছাদন অপ্রয়োজনীয় করে তোলা। সেদিক থেকে তার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞই থাকা উচিত। যা সব সময় তত্ত্ব দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়, তিনি তা করে দেখিয়েছেন।

তবে বিখ্যাত দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকায় শিব বিশ্বনাথন একটি নিবন্ধে বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন, যা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি শুরুই করেছেন ভবিষ্যতে ভারতে একটা বিশাল সুনামি বা লণ্ডভণ্ড করে দেয়া তুফানের ইঙ্গিত দিয়ে। উত্তর প্রদেশে বিজেপির বিজয় তার কাছে সেই প্রলয়ংকরী তুফানেরই ইঙ্গিত : ‘এমন এক তুফান যার পূর্বাভাস কেউই দেয়নি’ (দেখুন, Reflection on the election of our time, 15 March 2017)। নির্বাচনে বিজেপি উত্তর প্রদেশে জিতবে এটা অবশ্য অনেকে বলেছেন; কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক ভোটে জিতবে সেটা কেউই আন্দাজ করেননি। তবে বিশ্বনাথন সেই পূর্বাভাসের কথা বলছেন না। মাইক্রো বা খণ্ড খণ্ডভাবে বিচ্ছিন্ন নজরে দেখলে ভারতের গণমানসে কী রূপান্তর ঘটেছে, আমরা ধরতে পারব না। একে নিছকই একটা নির্বাচনী ফলাফল আকারে বুঝব। কিন্তু বিশ্বনাথনের দাবি, সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, ‘it is like watching the arrival of a juggernaut, whose presence nwo looks inevitable.’ পুরিতে জগন্নাথের রথযাত্রা থেকে ইংরেজিতে juggernaut কথাটার উৎপত্তি। এখন ইংরেজিতে এর মানে ‘a literal or metaphorical force regarded as mercilessly destructive and unstoppable.’ অর্থাৎ আক্ষরিক কিংবা প্রতীকী মহাক্ষমতাধর শক্তি, যা নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে সবকিছু ছারখার করে ফেলে এবং যাকে কিছুতেই রুখে দেয়া যায় না।’

বিশ্বনাথন দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিধর ও ধ্বংসাত্মক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আবির্ভাব সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করতে চাইছেন। এ মুহূর্তে তা বিশাল বিপদ বা চ্যালেঞ্জ হয়ে হানা দিয়েছে তা নয়, কিন্তু এটা বিপদের ‘আবির্ভাব’। সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু আমাদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। শিবনাথন বলেছেন, বোঝা দরকার কীভাবে আমরা এই অবস্থায় এসে হাজির হলাম। তবে তিনি পাশাপাশি আরেকটি কথা বলেছেন, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হচ্ছে তুফানের এই আগাম আবির্ভাব একই সঙ্গে ভারতীয় মনের, কিংবা যা কিছু এতকাল ভারতীয় বলে ধরে নেয়া হয়েছিল তারও পরিসমাপ্তি। বিশ্বনাথনের ভাষায় ‘Closure of Indian Mind’। ভারত যে বদ্ধ চিন্তার চোরাবালিতে আটকা পড়ে গিয়েছে বিশ্বনাথন সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ভারতের গণমানসের যেসব বিচিত্র ও বহুমুখী অনুসন্ধিৎসা, জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান, সেখানেও ছেদ ঘটল।

নিজের কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্বনাথন দেখিয়েছেন কীভাবে নরেন্দ্র মোদি নিজেই একটি ফেনোমেনা হয়ে উঠেছেন, যার মধ্যে ভারতের জনগণ, বিশেষত নিন্মবর্গের জনগণও পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালে নরেন্দ্র মোদির মধ্যেই তাদের বাসনা চরিতার্থের উপায় দেখে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ এই দুইয়ের স্বপ্ন ফেরি করে এতকাল ভারতের রাজনীতি চলছিল; কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সেই রাজনীতির গায়ে কাফন পরিয়ে দিলেন। যেসব আদর্শ বা পরিভাষাকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক পরিসর নেহেরু-গান্ধীর হাতে তৈরি হয়েছিল সেটা কাচের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। তার কথা মানলে এটাও বিশ্বাস করতে হয় যে, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের দিন শেষ। অর্থাৎ যে অর্থে এই পরিভাষাগুলোর ব্যবহার হয়েছে তার উপযোগিতা ফুরিয়ে গিয়েছে। যদি এসব পরিভাষার আদৌ কোনো উপযোগিতা থাকে তাহলে দরকার ভারতে এই ধারণাগুলোর উৎপত্তি ও ব্যবহারের ইতিহাস পর্যালোচনা করা এবং নতুন করে ভাবতে শেখা। গণতন্ত্রও ডুবুডুবু। কারণ একজন ব্যক্তি যখন গণমানসের বাসনা ও আশা-ভরসার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, সেখানে বিরোধী মতের কিংবা চিন্তার কোনো ভূমিকা থাকে না। সবকিছুই ক্রমে এক ব্যক্তির অধীনে একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতায় কুক্ষিগত হয়। নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্রের এই পরিণতিই হওয়ার কথা। ভারতেরও সেই দশা ঘটছে। তাহলে গণতন্ত্র, অর্থাৎ বহু মত ও কাজের কৌশলের মধ্য থেকে জনগণের একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মত ও পথ নির্ণয়ের সামষ্টিকতারও দিন শেষ। নরেন্দ্র মোদির সিদ্ধান্তই সবার সিদ্ধান্ত হবে। তাহলে ‘গণতন্ত্র’ বলতে আমরা কী বুঝেছি, কীভাবে তার চর্চা হয়েছে, সেসব নিয়েও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

যদি প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র আর গণতন্ত্র শুকিয়ে যায়, এসবের কোনো উপযোগী মর্মার্থ যখন গণমানসের চিন্তা ও ইচ্ছার জগতে দানা বাঁধে না, দানা বাঁধে হিন্দুত্ববাদ, তখন জনগণকে দোষারোপ করে লাভ হবে না। যেসব পরিভাষা আদর্শের নামে আমরা ব্যবহার করি, আর তা কাজ করছে না বলে বিশ্বনাথনের মতো আক্ষেপ করি- উচিত হচ্ছে তাদের পর্যালোচনা করে। পরিভাষা ও আদর্শ যদি বাস্তবের সঙ্গে না মেলে কিংবা জনগণের কাছে আবেদন রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে উচিত বাস্তবকে দোষারোপ নয়, নিজেদের চিন্তার পর্যালোচনা করা। এখন বাকি রইল জাতিবাদ বা জাতীয়তাবাদী হিন্দুত্বের গর্ব। ভারত তাকেই মুকুট হিসেবে পরছে, সেখানেই তার আনন্দ ও গৌরব। জনগণের ওপর দোষারোপ না করে বাস্তবকে বোঝা দরকার। বোঝা দরকার একে মোকাবেলার পথ কী হতে পারে। তুফান আসছে বলে ঘরে বসে থাকা যাবে না।

শিব বিশ্বনাথনের আক্ষেপ হচ্ছে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সংকীর্ণ চিন্তার মানুষদের জগতে পরিণত হয়েছে, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের যুগে যাদের কাছে যে কোনো মূল্যে ভারতের ‘উন্নয়ন’ই প্রধান অগ্রাধিকার। তার সারকথা হচ্ছে, ‘Mr. Modi's victory signals the victory of the parochial and affordably mediocre over aû vision of the cosmopolitan or plural. Deep down it is the future whic
h we have lost today. This is Indian democracy's most ironic gift.’

একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের মধ্য দিয়ে বিচিত্র ও বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, জাতিকে উচ্চ বর্ণের হিন্দু এতদিন আচ্ছাদিত রেখে শাসন করছিল। তা খসে যাওয়ার পর বিশ্বনাথনের এই আক্ষেপ আমরা বুঝতে পারি। একে ‘মিডিওকার’দের উত্থান হিসেবে তিনি নিন্দা করছেন। সেটা ঠিক নয়, কারণ ওই নিন্দার মধ্য দিয়ে নিজের অভিজাত চিন্তার গর্বে তিনি খামাখা গর্বিত হতে চাইছেন, আমরা এই আভিজাত্যের সঙ্গে একমত নই। বর্ণ ও শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই ভারতে কেন এ উপমহাদেশেও শেষ হয়নি, এমনকি বিশ্বেও নয়। যেসব পরিভাষা বর্ণহিন্দু নিজের জাত ও শ্রেণীর স্বার্থে এতকাল ব্যবহার করেছে, তার উপযোগিতা বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এটা খুবই ভালো কাজ হয়েছে বা হচ্ছে। একটা তুফান আসছে অবশ্যই, কিন্তু প্রাচীন, বাজে, অকার্যকর চিন্তা ও চিন্তার আবর্জনা জমিয়ে রেখে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ এগিয়ে যাবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। অনেক আবর্জনাই সাফ করতে হবে। কোনো কিছুই আপসেআপ হবে না। নতুন রূপান্তরের রাজনীতি গণমানস নিন্দা করে নয়, নিজেদের প্রাচীন পরিভাষা, বদ্ধ মতাদর্শ ও আভিজাত্যের পর্যালোচনা দরকার। সেটাই প্রথম কাজ।

পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালে আমাদের নতুন করে ভাবতে-শিখতে হবে, দক্ষিণ এশিয়ার জনগণকেও শেখাতে হবে। শর্টকাট আছে বলে আমি মনে করি না।

১৭ মার্চ ২০১৭, ৩ চৈত্র ১৪২৩, শ্যামলী

বৃহস্পতিবার, ৫ মে, ২০১৬

নজরদারি ও বায়োমেট্রিক নিবন্ধন : ১ বিদেশী মোবাইল কম্পানি কেন বায়োমেট্রিক ডাটাবেইজ বানাচ্ছে?

আমি বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন নিয়ে উদ্বিগ্ন। সেটা রাষ্ট্র করুক, কিম্বা কোন কম্পানি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান- নিজের বায়োমেট্রিক ডাটা রাষ্ট্র কিম্বা বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার বিপদ রয়েছে। দুইয়ের মধ্যে ফারাক আছে বটে, কিন্তু অবস্থাভেদে যে কোন প্রকার ডিজিটাল নজরদারি নাগরিকদের জন্য ভয়ঙ্কর হতে পারে। মোবাইল কম্পানি বিশেষত বিদেশী যদি সিম নিবন্ধনের নামে বাংলাদেশের নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেইজ তৈরি করে, তাহলে তা জাতীয় প্রতিরক্ষার দিক থেকে বিপজ্জনক। মেনে নেওয়া যায় না। 
বাংলাদেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈয়ার করে রাষ্ট্র নাগরিকদের ওপর নজরদারির যে ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রচলন করে তার বিরোধিতা কেন করা উচিত সেটা ব্যক্তির নিজের ‘প্রাইভেসি’ বা অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব বা নজরদারি থেকে মুক্ত থাকার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। সে কারণে রাষ্ট্র যখন সেটা করে তখন যুক্তিসঙ্গত আইনের অধীনে গণতান্ত্রিক বিধান অনুযায়ী করছে বলে দাবি করে বটে, কিন্তু ব্যক্তির ওপর রাষ্ট্রের খবরদারি, নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ে বৈ কমে না। বিষয়টি ডিজিটাল যুগে আধুনিক রাষ্ট্রের চরিত্র এবং একালে টেকনোলজির বিবর্তনের পর্যালোচনা করে বুঝতে হবে। সারা দুনিয়ার মানুষের ওপর অল্প কিছু ক্ষমতাবান মানুষ ও কর্পোরেশানের কৃৎকৌশলগত নিয়ন্ত্রণের সমূহ সুযোগ ডিজিটাল বিপ্লব এনে দিয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের বিশেষ হুঁশ নাই। তবুও তর্ক আছে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনি সুরক্ষার কিছু সুযোগ থাকে। অন্য দেশের ভিসা নেবার সময় বা ভিনদেশে প্রবেশের মুখে সীমান্তে বা এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশানের কাছে আমরা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে বাধ্য থাকি। রাষ্ট্রের আদৌ ডিজিটাল নজরদারির এখতিয়ার আছে কি না তা নিয়ে বিস্তর তর্ক আছে। ইতালির দার্শনিক আগামবেন একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেবেন না এবং নিজেকে ডিজিটাল নজরদারির অধীন করার ঘোরবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। শেষমেশ তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাননি, এবং নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির কোর্স বাতিল করেছেন। তাহলে বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী তাত্ত্বিক কিম্বা দার্শনিক যুক্তি রয়েছে। এ বিষয়ে আগামবেনের যুক্তি আমাদের শোনা দরকার। তেমনি আরেকজন ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোকে নিয়েও আমরা কথা বলব। ‘জনগণ’কে নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র কিভাবে ‘শৃংখলাধীন’ (বা শৃংখলিত) করে সেই দিক নিয়েও খানিক আলোচনা করব। আধুনিক রাষ্ট্রের চরিত্র পর্যালোচনা এবং এ কালের রাজনৈতিক কর্তব্যগুলো সুনির্দিষ্ট ভাবে বোঝার জন্য বায়োমেট্রিক নিবন্ধন পর্যালোচনা খুবই জরুরি। এই লেখাটির উদ্দেশ্য এটাই।
তাহলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া কিম্বা নিজেকে অন্য কোন বায়োমেট্রিক পদ্ধতির নজরদারির অধীনস্থ করাকে স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত মনে করা মারাত্মক ভুল। এতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার কিম্বা তথাকথিত অপরাধ দমনের সম্পর্ক অতি ক্ষীণ। সমাজব্যবস্থাই যদি অপরাধ সংঘটনের কারণ হয়, তাহলে সমাজের সংস্কার বা রূপান্তরের কথা না বলে অপরাধকে টেকনোলজি দিয়ে দমন অবাস্তব। বর্তমান বিশ্ব অসম; পরদেশ লুণ্ঠনসহ যুদ্ধবিগ্রহ সহিংসতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিত্যদিনের কারবার; প্যালেস্টাইন, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে সাধারণ মানুষকে উৎখাত করা হয়েছে, তাদের দেশান্তরী ও অভিবাসী জীবনে বাধ্য করা হয়েছে; অন্যায় মোচনের পরিবর্তে ক্রমাগত অন্যায় ও অবিচারকে প্রশয় দেয়া হচ্ছে। তাহলে সন্ত্রাস দমনের নামে আরো অধিক সন্ত্রাস, যুদ্ধ ও সহিংসতার বিস্তার ও বিশ্বব্যাপী যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসাবেই বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ক্ষমতাসীনদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। সমাজে যখন ধনি গরিবের ব্যবধান বাড়ে, বিশ্বে যখন অল্প কিছু লোক অধিকাংশের সম্পদ কুক্ষিগত করে, রাষ্ট্র যখন বাজারব্যবস্থার মহিমার নামে মানুষের জীবন ও জীবিকার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রগুলো সঙ্কুচিত করে সেখানে রাষ্ট্র ও বহুজাতিক কম্পানির বিরুদ্ধে নানান প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ ঘটবেই। ডিজিটাল নজরদারি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অব্যবস্থা ও কুব্যবস্থার সমাধান নয়। তাহলে সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন নিয়ে তর্ক করলে ডিজিটাল যুগে নানাবিধ গোয়েন্দাগিরি ও নজরদারির ব্যাখ্যা করা যাবে না। সে কারণে এখানে আমরা সাধারণ ভাবে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ও আধুনিক রাষ্ট্রের নজরদারি নিয়েই কিছু প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে চাইছি, কিন্তু সেটাও দুই এক কিস্তিতে শেষ করা সম্ভব না। বাংলাদেশে এই তর্কটা মোবাইল কম্পানির সিম নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে, ফলে সেই বিষয়ে শুরুতে কিছু প্রাথমিক আলোচনা করে নেওয়া যাক।

বিদেশী মোবাইল কম্পানির সিম নিবন্ধন বিপজ্জনক
মোবাইল কম্পানি যাদের অধিকাংশই বিদেশী তাদের কাছে আমাদের ব্যক্তিগত বায়োমেট্রিক তথ্য তুলে দেবার কোনই যুক্তি নাই। সে কারণে যারা এর বিরোধিতা করছেন আমি তাঁদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছি অনেক আগেই। এপ্রিলে সিম নিবন্ধনের সময়সীমা অতিক্রম হয়ে যাবার আগে ফেইসবুকে সেটা প্রকাশও করেছি। নিবন্ধনের সময় সীমা মে মাসের জন্য আবার বাড়ানো হয়েছে। অনেকেই সিম হারাবার ভয়ে এবং মোবাইল কম্পানির প্রচারণার চাপে নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু তারা নিদেনপক্ষে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এ ধরনের কোন যুক্তিসঙ্গত আইন না থাকার পরেও মোবাইল কম্পানির কাছে তাঁদের আঙুলের ছাপ দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছেন। 
সিমের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের জন্য কোন আইন নাই। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ব্যক্তির নিজের ‘প্রাইভেসি’ বা অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব বা নজরদারি থেকে মুক্ত থাকার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। বিদেশী মোবাইল কম্পানিগুলোর কাছে সিম ব্যবহারকারী বাংলাদেশের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কেন জরুরি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটাই বিশাল একটি প্রশ্ন। নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেইজ তৈয়ারি ও সংরক্ষণ সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাহলে মোবাইল কম্পানির বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই বিপজ্জনক। 
মোবাইল কম্পানিগুলো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, তদুপরি অধিকাংশই বিদেশী। তারা নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য কিভাবে ব্যবহার করবে, কাকে দেবে, কিম্বা এই ডাটাবেইজের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা কিভাবে কাজে লাগাবে এ ব্যাপারে কোন আইন নাই। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার কোন আইন না থাকা একটি অতিশয় দুর্বল এবং পরাধীন রাষ্ট্রের লক্ষণ। নাগরিকদের ডাটাবেইজ সংবেদনশীল কিন্তু সেই ক্ষেত্রে জাতীয় প্রতিরক্ষার কোন ব্যবস্থা নাই। তুমুল অরক্ষিত অবস্থায় নাগরিকদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের নামে বিদেশী মোবাইল কম্পানিগুলো মূলত বাংলাদেশের নাগরিকদের ওপর অতিশয় সংবেদনশীল ডাটাবেইজ তৈরি করছে। যা অবশ্যই অবিলম্বে প্রতিরোধ করা উচিত। 
শুধু সিম নিবন্ধন নয়, সাধারণভাবে রাষ্ট্রের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের সঙ্গে নিরাপত্তা, নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্র ও সরকারের নজরদারি বৃদ্ধির বিপদ, ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর হুমকি এবং সর্বোপরি আধুনিক কৃৎকৌশলের সুবিধা নিয়ে অল্প কিছু ব্যক্তির পুরা সমাজকে নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি ইত্যাদি নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু জড়িত। এই ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক কায়দায় সিম নিবন্ধন সাধারণভাবে যে কোন প্রকার বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের অন্তর্গত বটে, তবে তাদের মধ্যে পার্থক্য আছে। পাসপোর্ট করতে, ভিসা পেতে এমনকি বিদেশী কোন রাষ্ট্রের সীমান্ত অতিক্রম করবার সময় আমরা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে বাধ্য থাকি। রাষ্ট্র দাবি করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য এটা তাদের এখতিয়ার। আধুনিক রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতা বলে ব্যক্তিকে এই টেকনোলজিকাল নজরদারির অধীনস্থ করে। এই দিক থেকে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন আধুনিক রাষ্ট্রের বিশেষ চরিত্রের লক্ষণ যা আমাদের আরো ঘনিষ্ঠ ভাবে পর্যালোচনা করে দেখা ও বোঝা উচিত। 
নয়-এগারোর পর বিশ্বব্যাপী ‘নিরাপত্তা’র ধারণা আমূল বদলে গিয়েছে। রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন সরকার কিম্বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার চোখে আমরা সকলেই রাতারাতি সম্ভাব্য সন্ত্রাসী বা অপরাধী হয়ে গিয়েছি। এগুলো খুবই মৌলিক ও গুণগত পরিবর্তন। বায়োমেট্রিক নিবন্ধনকে এই নতুন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখবার কোন উপায় নাই। 
অন্য দিকে ডিজিটাল যুগে একটা নতুন ভূগোলের আবির্ভাব ঘটেছে আর অপরাধ ও সন্ত্রাস দমনের জন্য সেই ডিজিটাল জগৎকে নিয়ন্ত্রিত ও শৃংখলিত করবার জন্য রাষ্ট্রও সমানতালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমরা সামাজিক পরিচয় হারিয়ে টেকনোলজির সংকেত সংখ্যায় রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছি। খবর রাখছি না। এই সকল দিকে আমাদের নজর দ্রুত ফেরানো জরুরি হয়ে উঠেছে। 
বাংলাদেশে রাষ্ট্রের নজরদারির বিরুদ্ধে নয়, মোবাইল কম্পানির বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের বিরুরেূ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। আগেই বলেছি, মোবাইল কম্পানির বায়োমেট্রিক নিবন্ধন দরকার হোল কেন সেটা খুবই সন্দেহের বিষয়। ক্ষমতাসীনরা তার অনুমতি দিয়েছে কি? সিম নিবন্ধনের জন্য যে কোন পরিচয়পত্রই যথেষ্ট। বড় জোর তারা জাতীয় পরিচয়পত্রের দাবি করতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের অর্থ হচ্ছে তারা রাষ্ট্রের এখতিয়ারের বাইরে আলাদা ডাটাবেইজ তৈরি করতে চায় এবং বাংলাদেশে ডাটাবেইজের নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনের অভাবের সুযোগ নিয়ে এই ডাটাবেইজ দিয়ে আলাদা ব্যবসা করতে চায়। যে ডাটাবেইজ তারা তৈরি করছে তার স্বত্ব কার? সেই ডাটাবেইজের নিরাপত্তা কে দেবে?- এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। 
অধিকাংশ মানুষ ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে নিবন্ধনের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে হুঁশিয়ার নন। এর মাধ্যমে তৈরি ডাটাবেইজ মুনাফাকারী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী রাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের কাছেও হস্তান্তর করতে পারে। কিম্বা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে যে সকল শক্তি জড়িত তাদের হাতেও স্বেচ্ছায় কিম্বা অনিচ্ছায় কিম্বা টাকার বিনিময়ে তুলে দিতে পারে। এগুলো খুবই সম্ভব। কথা হোল, তারা কি পারে আর কি পারে না সে সম্পর্কে কোন আইন নাই। নাগরিকদের পক্ষে কোন রক্ষা কবচ নাই। বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের যারা বিরোধিতা করছেন, তাঁরা ঠিকই বিপদ অনুধাবন করতে পেরেছেন। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে ব্যাপারটিকে তথ্য ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আরো স্পষ্ট করে তোলা। 
তাহলে শুরুতেই এই দিকটা আমরা মনে রাখব যে মোবাইল কম্পানি, বিশেষত বিদেশী ও বহুজাতিক কর্পোরেশানের ডিজিটাল বায়োমেট্রিক নিবন্ধন আর রাষ্ট্রের নাগরিক নিবন্ধন এক কথা নয়। রাষ্ট্রের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন প্রবল বিতর্কের বিষয় হলেও বহুজাতিক ব্যবসায়ী কম্পানির বায়োমেট্রিক নিবন্ধন খুবই সন্দেহের। এ কারণে যারা বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের বিরোধিতা করছেন আমাদের সামষ্টিক নিরাপত্তার জন্য তাঁদের প্রতিবাদকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেছি এবং অকুণ্ঠচিত্তে সমর্থন করেছি।
বায়োমেট্রিক নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে অনেক কথা অনেকে বলছেন। অনেকের দাবি, এতে মোবাইল ফোন কেন্দ্রিক অপরাধ দমন করা যাবে, কিম্বা সহজ হবে। মোবাইল ফোনগুলো অপরাধ দমনের প্রতিষ্ঠান নয়। তারা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তারা মুনাফার জন্য বায়োমেট্রিক ডাটাবেইজ নিজেরা ব্যবহার করে নিজেরাই ক্রাইম করবে না তার গ্যারান্টি কী? বায়োমেট্রিক ডাটাবেইজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার। এই তথ্যভাণ্ডার গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও মুনাফা কামানোর ক্ষেত্র। বিপজ্জনক হচ্ছে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ডাটাবেইজ কে কিভাবে ব্যবহার করবে সেই বিষয়েও আমাদের দেশে কোন আইন নাই। মোবাইল কম্পানিগুলো তাদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেইজ কোথায় কিভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করবে তার ওপর রাষ্ট্রের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, নীতিমালাও নাই। এই অবস্থায় নাগরিকদের হাতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট মোবাইল কম্পানির হাতে তুলে দেওয়া ভয়ানক বিপজ্জনক।
সিমের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন অপরাধ দমন করবে বা অপরাধ দমনে সহায়ক হবে এর চেয়ে হাস্যকর অনুমান আর কিছুই হতে পারে না। অপরাধ দমনের জন্য সবার আগে দরকার সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও পুলিশ, পুলিশি ব্যবস্থাকে দলীয়করণ থেকে মুক্তি, ইত্যাদি। অর্থাৎ একটি দক্ষ ও স্বচ্ছ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা। এখানেই শেষ নয়। দরকার স্বচ্ছ ও বলবৎযোগ্য আইন ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ। নিদেনপক্ষে এই ব্যবস্থাকে আইনানুগ হতে হবে। তো তার কোন খবর নাই কিন্তু মোবাইল কম্পানির সিম নিবন্ধন দিয়ে অপরাধ দমন খুবই হাস্যকর অনুমান। 
আমি ফেইস বুকে সিম নিবন্ধনের বিরোধিতা করায় অনেকে খুব বীর হয়ে গিয়েছেন। লিখেছেন, আমি তো সন্ত্রাসী বা চোর নই তবে কেন ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে সিম নিবন্ধন করতে ভয়? এটা ভীতু বা বীরত্ব প্রদর্শনের তর্ক নয়। অনেকের দাবি এতে ভুয়া আইডি বন্ধ হবে। এটাও হাস্যকর যুক্তি। এতে বরং বিপদ বাড়বে। ঠিক যে এখন অপরাধীরা ভুয়া আইডি ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু কোথা থেকে কল করছে নতুন প্রযুক্তিতে তা ট্রেইস করা সম্ভব এবং ধরা মোটেও কঠিন নয়। ফোন কল অনুসরণ করে অপরাধী ধরা পড়েছে তার বিস্তর নজির আছে। কিন্তু এখন ভুয়া আইডি ব্যবহার না করে অপরাধীরা অন্যের নামে, ধরুন আপনার নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করবে। অপরাধী হবেন আপনি। মোবাইল কম্পানিগুলো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, তারা ব্যবসার জন্য ডাটাবেইজ থেকে অন্যের তথ্য ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে অপরাধীদের কাছে সিম বিক্রি করতে পারে। এটা রোধ করার কোন আইনী ব্যবস্থা নাই। তারা যে সেটা করবে না তার গ্যারান্টি কী? নিরপরাধ নাগরিক অপরাধী হিসাবে শাস্তি পেয়ে যেতে পারেন। সাধু সাজার জন্য বা আমি অপরাধী না তাহলে সিম নিবন্ধনে ভয় কী বলে অনেকে সিম নিবন্ধনের যে যুক্তি দিচ্ছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন বা অনায়াসেই অনুমান করতে পারেন চোর, ডাকাত, খুনিসহ নানান কিসিমের ছোট-বড় অপরাধীও বায়োমেট্রিক কায়দায় সিম নিবন্ধন করেছে। তো আপনি সিম নিবন্ধন করে একই কাতারেই যোগ দিয়েছেন, সাধু হননি। সিম নিবন্ধনের মধ্যে নিজেকে অপরাধী না ভাবা, নিজেকে সাধু জ্ঞান করা, অন্যে করছে না বলে ভীতু বা অপরাধী ভাবার মতো আহাম্মকি আর কিছুই হতে পারে না। আশা করি তাঁরা বুঝবেন বিষয়টি আরো অনেক বড়।

‘সমাজ নিরপরাধ ও অপরাধীতে বিভক্ত’: সমাজ বোধের মারাত্মক বিকৃতি
অপরাধ দমন তত্ত্বের জায়গায় দাঁড়িয়ে সিম নিবন্ধনের পক্ষে অবস্থানের বিপদ অনেক অনেক গভীরে। এখানে অনুমান হচ্ছে সমাজ অপরাধী ও সাধু এই দুই ভাগে বিভক্ত। অপরাধের আর্থসামাজিক বিচার এখানে অনুপস্থিত। বাজার ব্যবস্থার চোটে ভেঙে পড়া সমাজে সামাজিক সম্পর্ক ও নৈতিক ভিত্তিগুলো কিভাবে দুর্বল হয়ে গিয়েছে সেটা বোঝার কারো অবসর নাই। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি আছে, কিন্তু সমাজ নাই, অতএব এই অনুমানই বদ্ধমূল হয় যে নীতিহীনতা ও অপরাধের মোকাবিলা করবে সমাজ থেকে আলাদা ও সমাজের ঊর্ধ্বে থাকা ফৌজদারি আইন ও পুলিশ। তদারকি করবে রাষ্ট্র। সমাজ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির নিরাপত্তার অধিক কোন সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তার ধারণা করবার সামর্থ্য ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজ হারিয়ে ফেলে। এই ধারণার প্রাবল্যের ওপর পুলিশি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে ও শক্তিশালী হয়। যারা নিজেদের অপরাধী মনে করে না তাদের তাই উচিত সিম নিবন্ধন করা- এই ধারণা এই সমাজে গড়ে ওঠার সঙ্গত কারণ রয়েছে। এমনকি নিজের অধিকার ক্ষুণ্ন করে হলেও নিজেকে রাষ্ট্রীয় নজরদারির হাতে সমর্পণ করবার জন্য বায়োমেট্রিক নিবন্ধনকে স্বাগত জানাতে সমাজ গররাজি হয় না। সিম নিবন্ধনের জন্য মানুষের ভিড় দেখে আমরা তা আন্দাজ করতে পারি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের বিরোধিতা নিয়ে কিছু বলার আগে আমাদের এইসব নানান অনুমান নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। অথচ বিষয়টি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা দরকার। 
রাষ্ট্র নাগরিকদের নাম সাকিন পরিচয় নিবন্ধিত করে, এটা নতুন কিছু নয়। নাগরিকদের শাসন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আধুনিক রাষ্ট্র কেন এখন আরো বিস্তৃত ও নিখুঁত টেকনোলজিকাল নজরদারির ক্ষমতা আয়ত্ত করতে চাইছে সেটা একালে ক্ষমতা, আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রতত্ত্বের প্রধান আলোচ্য বিষয়। যাঁরা ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো কিম্বা ইতালির দার্শনিক আগামবেনের লেখালেখির খোঁজখবর রাখেন তারা নিশ্চয়ই জনগণকে শৃংখলিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখবার জন্য আধুনিক রাষ্ট্রের নানাবিধ কারিগরি সম্পর্কে অবহিত। এই কারিগরির বিচার নাগরিকত্ব, কোন প্রকার উপদ্রব ও বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়া ব্যক্তির শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা দেবার প্রতিশ্রুতি- যা ব্যক্তিস্বাধীনতা বা ‘প্রাইভেসি’র অধিকার হিসাবে পরিচিত- ইত্যাদি নানান প্রসঙ্গের সঙ্গে জড়িত। তাহলে আধুনিক রাষ্ট্রের নজরদারির শক্তি ও বিস্তৃতি ভয়ানক ভাবে বৃদ্ধির সঙ্গে এ কালে আধুনিক রাষ্ট্রের রূপান্তর জড়িত। কী সেই রূপান্তর সেটা আমাদের বোঝা দরকার। এই দিকটি না বুঝলে একালে কোন প্রকার অর্থপূর্ণ গণমানুষের রাজনীতির বিকাশ ও পুনর্গঠন অসম্ভব।


সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৫

ধর্মের পর্যালোচনা ও বাংলাদেশে ইসলাম-১০

ফয়েরবাখের সঙ্গে তরুণ মার্কস তার হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিতে গিয়ে ১৮৪৫ সালের বসন্তকালে ব্রাসেলসে তাঁর নিজের বোঝাবুঝির জন্য নোটখাতায় বেশ কিছু খসড়া মন্তব্যমূলক বাক্য টুকটাক লিখে রেখেছিলেন। লুদভিগ ফয়েরবাখ সম্পর্কে অ্যাঙ্গেলস তাঁর নিজের বই ১৮৮৮ সালে প্রকাশের সময় মার্কসের টোকা মন্তব্যগুলোর শিরোনাম দেন ‘ফয়েরবাখ সংক্রান্ত থিসিস’। এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে। আগের লেখায় ফয়েরবাখ কিভাবে খ্রিস্টধর্মের পর্যালোচনা করেছেন, আমরা সে সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়েছি। আমরা সেই থিসিসগুলোর আলোকে মার্কস কিভাবে ফয়েরবাখের পর্যালোচনা করেছেন তা নিয়ে আলোচনা করব। এতে বোঝা যাবে, মার্কস কেন ধর্ম বা দর্শন নিয়ে কোন তত্ত্ব চর্চা করেননি। কেন এইসকল বিষয়ে তিনি কোনো বই লেখেননি। সর্বোপরি, ফয়েরবাখের চিন্তার পর্যালোচনা করেই তত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি কোথায় এবং কিভাবে হুঁশিয়ার হয়ে গিয়েছিলেন।
আমরা যখন কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা বা ধ্যান করি, তখন জগৎ আমাদের বাইরে চিন্তা বা ধ্যানের বিষয় হিসাবে হাজির থাকে। চিন্তাপ্রক্রিয়ার দিক থেকে এই দিকটা বিষয়গত বা অবজেক্টিভ দিক। চিন্তা বা চিন্তাপ্রক্রিয়ার বাইরে চিন্তার, জ্ঞানের বা ধ্যানের বিষয়ের উপস্থিতি সম্পর্কে আমরা যতটা সজ্ঞান ও সচেতন থাকি, চিন্তার কর্তা বা সাবজেক্টিভ দিক সম্পর্কে ততটা সচেতন থাকি না। চিন্তা করা, কোনো বিষয় নিয়ে ধ্যান করা, কিম্বা কোনো কিছু জানার নিশ্চয়ই একজন কর্তা থাকেন। চিন্তাপ্রক্রিয়ার এটা হচ্ছে বিষয়ীর দিক বা বিষয়ী পক্ষ। কিভাবে বিষয়ী বা চিন্তার কর্তা কোন্ বিষয় উপলব্ধি করছেন এবং তার উপলব্ধি জ্ঞানে রূপান্তর ঘটাচ্ছেন, সেটা একটা প্রক্রিয়া। যদি সেই প্রক্রিয়াকেও চিন্তার বিষয় হিসাবে গণ্য করি, তাহলে সেটাও চিন্তার বাইরে ঘটা প্রক্রিয়া হিসাবেই হাজির হয়। সেটা তখন নৈর্ব্যক্তিক বা চিন্তার অবজেক্টিভ দিক হয়ে ওঠে। চিন্তা করা এক জিনিস, আর কি করে আমরা চিন্তা করি, সেই বিষয় নিয়ে ভাবনা ভিন্ন ব্যাপার। ভাত খাওয়া ও হজম করা একটি শারীরিক ব্যাপার, সেটা আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে ঘটতে থাকে। কিন্তু যখন আমরা কিভাবে হজম করি তা নিয়ে ভাবি, তখন তা শরীরের অভ্যন্তরীণ বিষয় আর থাকে না। সেটা তখন গবেষণা ও চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে, যাকে শাস্ত্র বা বিজ্ঞান হিসাবে আমরা অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ইত্যাদি নানা নামে চর্চা করি। তেমনি আমরা যখন চিন্তা করি তখন সেটা চিন্তার অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু যখন কিভাবে চিন্তা করি সেই প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবি, তখন এ প্রক্রিয়া চিন্তার বিষয়ে পরিণত হয়। চিন্তাপ্রক্রিয়াকে চিন্তার বিষয় হিসাবে ভাবার অর্থ হচ্ছে, তাকে অবজেক্টিভ বা নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া হিসাবে ভাবা। একেই আমরা তখন যুক্তিশাস্ত্র, লজিক, ব্যাকরণ বা সাম্প্রতিককালে বিষয়বিদ্যা ইত্যাদি শাস্ত্র হিসাবে চর্চা করি।
বাইরের জগতের সঙ্গে আমাদের সংবেদনার দরজা হচ্ছে, আমাদের ইন্দ্রিয়। ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে বাইরের জগৎ সম্পর্কে আমরা যে সংবেদনা লাভ করি, তাকে বিশেষ কালে ও বিশেষ দেশে ‘বস্তু’ বা ‘বাস্তব সত্তা’ হিসাবে হাজির বলে আমরা উপলব্ধি করি। বস্তু বা বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা হচ্ছে, যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ, সেটাই বস্তু। ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষের সংবেদনাকে উপলব্ধিতে এবং উপলব্ধিকে বুদ্ধির স্তরে বিচার-বিশ্লেষণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা জ্ঞানের স্তরে উপনীত হই। অর্থাৎ, বস্তু সম্পর্কিত ইন্দ্রিয় সংবেদনাকে জ্ঞানে পরিণত করি। এখন এ রকম একটা জ্ঞানচর্চার ধারা গড়ে উঠতে পারে, যেখানে দাবি করা হয়, কোনো কিছু ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ বস্তু বা বস্তুজাতীয় না হলে তা সত্য নয়; অবজেক্টিভ বা নৈর্ব্যক্তিক নয়- সেই দিক থেকে চিন্তা বা চিন্তাপ্রক্রিয়া হচ্ছে বস্তুর বিপরীত জিনিস। সেটা ভাব। বস্তু ও ভাবের এই ফারাক বজায় রেখে জ্ঞানচর্চার ধারা সাধারণত বস্তুবাদ নামে পরিচিত। এর বিপরীত হচ্ছে ভাববাদ। 
বস্তুবাদ অনুসারে, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ নয় তা বস্তু নয়। আর যদি তা বস্তু না হয় তাহলে তার কোনো সত্যতা নাই। সেটা ভাব মাত্র। বস্তুবাদ এই প্রকার অনুমান বা আগাম ধারণার ভিত্তিতে জগতের সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করে থাকে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, চিন্তা বা চিন্তাপ্রক্রিয়া কি বস্তু? নাকি ভাব? যদি ভাব হয় তাহলে তার নিজের কোনো সত্যতা থাকতে পারে না। কারণ এই সত্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। যদি আমরা আমাদের আলোচনাকে বাংলাদেশের জন্য সরাসরি আরো প্রাসঙ্গিক করতে চাই, তাহলে প্রশ্ন তুলতে পারি- ‘আল্লাহ’ কি বস্তু, নাকি ভাব? আল্লাহ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় নন। এতে অসুবিধা নাই। কিন্তু যদি দাবি করি যেহেতু ‘আল্লাহ’ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় নন, ভাব মাত্র, অতএব, আল্লাহ সত্য নন, নিছকই চিন্তার একটি ধারণা মাত্র, তখন বস্তুবাদ নাস্তিকতা হয়ে ওঠে; আল্লাহকে নাকচ করে নাস্তিকতার পক্ষ নেয়। 
সাধারণত ধর্মপ্রাণ মানুষ এতে আপত্তি জানান। সেই আপত্তি মাঝে মধ্যে ঘোরতর সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। কিন্তু আপত্তি জানাতে গিয়ে ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসী মানুষ বস্তুবাদী যুক্তির ফাঁদে পড়ে যান, নিজেকে বিশ্বাসী প্রমাণ করতে গিয়ে বস্তুবাদীর যুক্তি ও অনুমান মেনে আল্লাহকেও বস্তুর মতোই ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ সত্তা হিসাবে প্রমাণ করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু আল্লাহ তো আসলে বস্তু নন, এবং বস্তুগুণসম্পন্ন হওয়ার মধ্যে কোনো বিষয়ের সত্য-মিথ্যা নির্ণীত হয় না; বিষয়ের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতাই শুধু প্রমাণিত হয়। আল্লাহকেও বস্তুর মতোই ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ সত্তা হিসাবে প্রমাণ করতে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে বস্তুর তুলনা তখন শিরক-এর পর্যায়ে চলে যায়। অতএব কেউ বিশ্বাসী বা নিজেকে ঈমানদার ভাবলেই তিনি বস্তুবাদী নন, সেটা বলা যাবে না। কারণ বস্তুবাদীর মতো তিনিও ভাবতে অক্ষম যে, আল্লাহর সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের তর্ক বস্তুবাদ বনাম ভাববাদের তর্ক নয়। অর্থাৎ অত্যন্ত সৎ ও ঈমানদার মানুষও বুঝতে পারেন না, আল্লাহ দেশকালের অধীন ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ বিষয় নন। বুঝতে পারেন না, দেশকালের অতীত ‘আল্লাহ’ মানুষের চিন্তা বা প্রজ্ঞার বিষয় হয়ে বিরাজ করেন বলে তিনি মিথ্যা হয়ে যান না। সত্য হতে হলে তাঁকে বস্তুর গুণ ধারণ করার প্রয়োজন পড়ে না।
এর আগে কয়েকবারই উল্লেখ করেছি, ইসলাম যখন ‘আল্লাহ’কে নিরন্তর ‘গায়েব’ কিম্বা বিশুদ্ধ অনুপস্থিতি হিসাবে দাবি করে, তখন মানবেতিহাসে চিন্তার পর্যায় আরেকটি স্তরে গিয়ে পৌঁছায়; বহুদূর সামনে এগিয়ে যায় এবং দর্শনের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধরণের প্রশ্ন ও নতুন ধরণের চিন্তার পদ্ধতি বা ব্যাকরণ দাবি করে। খেয়াল করতে হবে, দাবি করা হচ্ছে আল্লাহকে স্রেফ বুদ্ধির বা জ্ঞানের বিষয়ে পরিণত করাও শিরক। আগের লেখায় এ দিকটির প্রতি বিশেষভাবে নজর ফেরানোর চেষ্টা করেছি। 
বলাবাহুল্য, এ দিকটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা করা দরকার। কিন্তু চিন্তার প্রাথমিক সিঁড়িগুলো না পেরিয়ে আমরা শূন্যে লাফ দিতে পারি না। সেই দরকারেই আলোচনার বর্তমান পর্যায় আমাদের নিষ্ঠার সঙ্গে অতিক্রম করতে হবে। বুঝতে হবে, আমরা এখনও প্রাক-ইসলামি যুগে পড়ে আছি। ইসলামের ভাষায় যা জাহেলিয়াত বা অজ্ঞানতার যুগ। অতি প্রাথমিক স্তরে বস্তুবাদ ও ভাববাদ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, বস্তুবাদী এবং একজন পরম বিশ্বাসী বা ঈমানদারের চিন্তার ব্যাকরণ এখনও একই রয়ে গিয়েছে। বিশ্বাস বা সিদ্ধান্তের দিক থেকে ভিন্ন মনে হলেও চিন্তার ব্যাকরণের দিক থেকে তাদের ফারাক নাই। এই অতি প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করা না গেলে দর্শনের দিক থেকে ইসলামের বৈপ্লবিক প্রস্তাবনা ধরতে পারা দূরের কথা, শুরু করাও কঠিন। এবার মার্কস কিভাবে ফয়েরবাখকে পর্যালোচনা করেছেন, সেই প্রসঙ্গের গভীরে যাওয়া যাক। 
ফয়েরবাখ সম্পর্কে ‘এগারো থিসিস’ নামে তরুণ মার্কসের বিখ্যাত উক্তিগুলোর এক নম্বর থিসিসে মার্কস বলছেন, তাঁর সময়কাল অবধি যে ধরনের বস্তুবাদের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ঘটেছিল, তারা সকলেই বস্তু, বাস্তবতা, ইন্দ্রিয়পরায়ণতাকে ধারণা করেছে কেবল চিন্তার বাইরে হাজির ‘বিষয়’ হিসাবে। এর মধ্যে ফয়েরবাখ অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের সংবেদনা তো একই সঙ্গে তৎপরতা, ক্রিয়া বা চর্চা। চিন্তার কর্তা হিসাবে মানুষের এই সক্রিয়তা ঘটে চিন্তার অন্তর্গত প্রক্রিয়া হিসাবে। ‘আল্লাহ’ যদি ভাবই হয়ে থাকেন, তাহলেও সেটা চিন্তার বা চিন্তাপ্রক্রিয়ারই একটি পরিণতি। কিন্তু বস্তুবাদ এই ক্রিয়াকে বুঝতে পারে না। অথচ এটাও নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া, কিন্তু সেটা ঘটছে চিন্তার বাইরের ঘটনা হিসাবে নয়, চিন্তার নিজেরই তৎপরতা হিসাবে। এর ফলে চিন্তার নিজের অন্তর্গত নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়ার দিকটি ভাববাদের মধ্যেই বিকশিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ বস্তুবাদ যাকে নিন্দা করে মার্কস তাকেই সামনে নিয়ে আসছেন, তাকেই গুরুত্বপূর্ণ বলছেন। তাঁর প্রথম থিসিসেই এর উল্লেখ করেছেন। 
তবে মার্কসের আপত্তিও আছে। আপত্তি হচ্ছে, সেই বিকাশ এমন ভাবে ঘটে যাতে মনে হয়, চিন্তার প্রক্রিয়া কোনো কংক্রিট বা মূর্ত ব্যাপার নয়; নিছকই একটা বিমূর্ত প্রক্রিয়া। দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছে, এই ভাববাদ আবার ইন্দ্রিয়শীলতা কি জিনিস, সেটা জানে না। এখানে ইঙ্গিত হচ্ছে, চিন্তাপ্রক্রিয়াও একটি ইন্দ্রিয়তৎপর বা ইন্দ্রিয়শীল নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া, ভাববাদ সেটা বোঝে না। হেগেল তাঁর ‘লজিক’ বইতে সেটাই দেখাতে চেষ্টা করেছেন। রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে আমরা কোন্ বিষয়কে কিভাবে উপলব্ধি করি, সেটাও ইন্দ্রিয়শীল তৎপরতারই অংশ। মার্কস স্বীকার করেন যে, ফয়েরবাখ চিন্তার বিষয় আর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ের মধ্যে ফারাক করেন এবং ভাবগত চিন্তার বিপরীতে রক্তমাংসের মানুষের ইন্দ্রিয়োপলব্ধির পার্থক্যের প্রতি মনোযোগী। কিন্তু মানুষের কর্মতৎপরতাকে নৈর্ব্যক্তিক তৎপরতা হিসাবে বুঝতে পারেন না। 
এর ফলে কী হয়েছে? মার্কস বলছেন, “খ্রিস্টীয় তত্ত্বের সারকথা (Essence of Christianity) বইতে তিনি তত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গিকেই মানুষের একমাত্র সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বলে মেনেছেন, অথচ চর্চাকে বুঝেছেন ও নির্ণয় করেছেন নোংরা ইহুদি-ধর্মাচারের অভিব্যক্তি হিসাবে। ফলে তিনি ‘বিপ্লবী’, ‘ব্যবহারিক-পর্যালোচনা’র কারবারের তাৎপর্য বোঝেন নাই।’
ফয়েরবাখ সম্পর্কে পর্যালোচনামূলক যে সকল মন্তব্য মার্কস করছেন, তার শুরুটাই তাই আমাদের আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ খোরাক হয়ে রয়েছে। ফয়েরবাখ ধরে নিয়েছেন, তত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গিই হচ্ছে মানুষের একমাত্র সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু মানুষ বাস্তবে যা চর্চা করে, এমনকি মানুষের ইন্দ্রিয়তৎপরতা ও চিন্তার চর্চাও যে নৈর্ব্যক্তিক ও বাস্তব, সেটা ফয়েরবাখ বোঝেন না। এটা ফয়েরবাখসহ সকল বস্তুবাদেরই সমস্যা। একই কারণে বাস্তব অবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তর কিম্বা দৈনন্দিনের পর্যালোচনামূলক ব্যবহারিক কাজকারবারের মধ্য দিয়ে বাস্তবের রূপান্তর কিভাবে ঘটে, ফয়েরবাখ সেটা বুঝতে পারেন না। কারণ তিনি জীবন্ত তৎপরতা বা চর্চার দিকটার প্রতি মনোযোগী নন। তিনি খ্রিস্টধর্মের সারকথায় বুঝিয়েছেন, খ্রিস্টীয় ঈশ্বর ও সংশ্লিষ্ট ধারণা সম্পর্কে মানুষের তত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গি আসলে তার নিজ চরিত্র সম্পর্কে তার নিজের তত্ত্বীয় ধারণার প্রক্ষেপণ মাত্র। এই প্রক্ষেপণ একটা বিভ্রান্তি, ইলিউশন কিম্বা বিচ্যুতি। ফয়েরবাখ ধরে নিয়েছিলেন, তত্ত্বগতভাবে এটাকে শুধরে দিলেই মানুষ নিজেকে নিজে খুঁজে পাবে, নিজের অর্থ নিজে বুঝবে। ধর্মের জগৎ ত্যাগ করে মানুষ বাস্তব মানুষের জগতে ফিরে আসবে। এটা স্পষ্ট যে, মার্কস তা মনে করতেন না। এটা শুধু ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে সত্য নয়, দর্শন কিম্বা যে কোন তত্ত্ব সম্পর্কেই সত্য। ফয়েরবাখের চিন্তার পর্যালোচনার সূত্র ধরেই তাই মার্কস বলেছিলেন, ‘দার্শনিকেরা কেবল দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন বিভিন্নভাবে; কাজের কাজ আসলে একে বদলে দেওয়া।’ ফয়েরবাখের ধর্মের প্রতি তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তাই মার্কসকে টানতে পারেনি, বরং দৈনন্দিন জীবনের বৈষয়িক তৎপরতা ও চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের চিন্তা ও বাস্তব জগৎ কিভাবে বদলায়, মার্কস সেই দিকেই আগ্রহী হয়েছিলেন। 
আমাদের আলোচনার জন্য মার্কসের পর্যালোচনার প্রাসঙ্গিকতা এরকম যে, মানুষ কেন ধর্ম পালন করে, মানুষ কেন আল্লাহতে বিশ্বাস করে এর একটা তত্ত্বগত ব্যাখ্যা দিতে পারলেই বুঝি ধর্মের সার পদার্থ বোঝা যায়; তখন ধর্মের তাত্ত্বিক পরিমণ্ডল ত্যাগ করে মানুষ বস্তুবাদী হয়ে ওঠে। ফয়েরবাখের সঙ্গে মার্কস এখানে একমত হননি। বিদ্যমান বাস্তবতাই যদি ধর্ম ও ধর্মচর্চা অপরিহার্য করে তোলে, তাহলে প্রথম কাজ হচ্ছে, বাস্তবকে বদলানো। তত্ত্বের পরিমণ্ডলে হেগেলের ভাববাদ পর্যালোচনা করতে গিয়ে ফয়েরবাখ মানুষের ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ জগতের গুরুত্ব ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন, মার্কস ফয়েরবাখের এই অর্জন অকুণ্ঠচিত্তে মানেন ও স্বীকার করেন। তবে তার সীমাবদ্ধতা ধরিয়ে দিয়েছেন এভাবে যে, ফয়েরবাখ বিমূর্ত চিন্তায় সন্তুষ্ট নন বলে ইন্দ্রিয়মগ্নতা চান; কিন্তু তিনি ইন্দ্রিয়পরায়ণতাকে ব্যবহারিক নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া হিসাবে, অর্থাৎ মানুষেরই ইন্দ্রিয়পরায়ণ তৎপরতা হিসাবে ধরতে পারেন না।
ব্যাপকার্থে ইন্দ্রিয় তৎপরতা কিম্বা চিন্তা বা চিন্তাপ্রক্রিয়াও যে বাস্তব মানুষের বাস্তব তৎপরতা, ফয়েরবাখ সেটা ধরতে পারেননি। এই দিক থেকে আগের সকল বস্তুবাদের যে ত্রুটি, সেই ত্রুটি ফয়েরবাখেও থেকে গেছে। চিন্তা, চিন্তাপ্রক্রিয়া, ভাবচর্চা বা ভাববাদের বিপরীতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু জগৎকে একমাত্র সত্য বললে সমস্যা মেটে না। মানুষের চিন্তা, চিন্তাপ্রক্রিয়া বা ভাব বাস্তবতারই অংশ। বস্তুবাদ ও ভাববাদের এই বিভাজন অতিক্রম করে মার্কস নতুনভাবে চিন্তা করবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সেই ইঙ্গিতে মানুষের বৈষয়িক জীবনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যুগপৎ দৃশ্যমান জগৎ ও চিন্তার জগৎ বোঝার প্রতি অভিমুখ তৈরি হয়েছিল মার্কসের হাতেই। এখানেই মার্কস বস্তুবাদের পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে গেলেন। বস্তুবাদ আর ভাববাদের খাপে ফেলে তাঁকে আর বিচার করা যায় না।
ফয়েরবাখের ত্রুটি ধরে মার্কস ধর্ম নিয়ে কোন তত্ত্বীয় আলোচনায় আগ্রহ বোধ করেননি, বরং মানুষের বাস্তব জীবন ব্যাখ্যা করবার জন্যই তিনি সারা জীবন ব্যয় করেছেন, যেখানে ধর্ম অন্তর্ভুক্ত, বিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপার নয়। মানুষকে তার বৈষয়িক বা আর্থসামাজিক তৎপরতার জায়গা থেকে দেখলে তত্ত্বীয় জ্ঞান হিসাবে ধর্ম কী রূপ পরিগ্রহণ করছে কিম্বা বাস্তবে কি ভূমিকা রাখছে, সেটা বোঝা যাবে। বাস্তবের জীবন ও জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ধর্ম পর্যালোচনার পথ বা পদ্ধতি মার্কস গ্রহণ করেননি। মার্কসের বড় অবদান এখানে। 
মার্কস বলছেন, ফয়েরবাখ ধর্মীয় আত্মবিচ্যুতির বাস্তবতা থেকে শুরু করেন। ধর্ম হচ্ছে মানুষের আত্মবিচ্যুতি, নিজেকে নিজে হারিয়ে ফেলা, নিজের স্বভাবকে ঈশ্বরের স্বভাবের মধ্যে আবিষ্কার করা ইত্যাদি। দুনিয়া একটাই, কিন্তু তাকে ফয়েরবাখ দুইটা বানিয়ে ফেলেন। একটা ধর্মীয় বা নিজের স্বভাব প্রক্ষিপ্ত করা ধর্মীয় কল্পনার জগৎ আর অন্যটা প্রকৃত, বাস্তবের দুনিয়া। ফয়েরবাখ ধর্মীয় দুনিয়াকে ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তির মধ্যে বা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা দিয়ে মীমাংসা করতে চান। কিন্তু এতে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়। তিনি খেয়াল করেন না, এই কাজ শেষ করার পরও ধর্ম ও মানুষের বাস্তব জীবনের সম্পর্ক বিচারের আসল কাজ বাকি থেকে যায়। 
ঘটনা হলো, ধর্মকে ধর্মনিরপেক্ষতার পাটাতনে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফয়েরবাখ খোদ ধর্মনিরপেক্ষতার স্ববিরোধিতার মধ্যে খাবি খেতে থাকেন। খ্রিস্টীয় ট্রিনিটির ধারণা পরিবারের ধারণা থেকে উদ্ভূত, ফয়েরবাখ তা মনে করেন। তাহলে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ট্রিনিটির ধারণায় রূপান্তর ঘটাতে হলে বাস্তব জগতের পরিবারের মধ্যে রূপান্তর আনতে হবে। পার্থিব পরিবারই যদি খ্রিস্টীয় পবিত্র পরিবারের গোপন রহস্য বলে উন্মোচিত হয়ে থাকে তাহলে পার্থিব পরিবারের লয় বা রূপান্তর ঘটাতে না পারলে খ্রিস্টীয় পবিত্র পরিবারের ধারণা লয় পাবে কিভাবে? বাস্তবের এই রূপান্তরের কাজটি বাস্তবেরই কাজ, তত্ত্বের নয়। এখানেই ফয়েরবাখীয় বস্তুবাদ ও নাস্তিকতার সীমাবদ্ধতা। মার্কসের দাবি, বাস্তব জীবনের ব্যবহারিক-বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বাস্তবের রূপান্তর ঘটাতে হবে, কিম্বা ঘটবে। তাত্ত্বিকভাবে খ্রিস্টীয় পরিবারতত্ত্ব ভুয়া, খ্রিস্টধর্ম ভুয়া, কিম্বা তার একটু সেকুলার ব্যাখ্যা খাড়া করার ক্ষেত্রে মার্কস আগ্রহী ছিলেন না। এই ধরণের ধর্মবিরোধী তৎপরতাতেও মার্কস আগ্রহী ছিলেন না। ধর্ম নিয়ে তিনি লেখালিখি করাও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেননি, বরং বৈষয়িক জীবনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নয়, মানুষের সকল প্রকার বৈষয়িক সম্পর্কের রূপান্তর কিভাবে ঘটছে, মানবেতিহাসের রূপান্তরের সেই সকল গতিপ্রকৃতি ও ইতিহাস বুঝতেই তিনি জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। 
ধর্মে বা ধর্মতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে মানুষের যে সারাৎসার বা তাৎপর্য, ফয়েরবাখ তাকে মানবিক করে তোলেন, তাকে অ্যানথ্রপলজি বা মানববিদ্যার অন্তর্ভুক্ত করে মানুষসংক্রান্ত ধর্মীয় সারাৎসারকে মানুষের মানবিক সারসত্তায় নিরসন করেন। ধর্মের মানবিক দিকটি ফয়েরবাখ দেখান। কিন্তু মানুষের সারসত্তা সম্পর্কে যে তত্ত্ব তিনি বের করে আনেন তা এমন কোন বিমূর্ত ব্যাপার নয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যেই তা সহজাত। আমরা বলতে পারি না, মানুষ মানেই ফয়েরবাখ খ্রিস্টধর্মের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে মানুষের সারসত্তা বের করে এনেছেন কিম্বা যে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন, মানুষ ঠিক সে রকম। 
মানুষ তাহলে কী? তরুণ মার্কস উত্তর দিচ্ছেন, ‘বাস্তবে মানুষ সামাজিক সম্পর্কের সম্মিলন।’ সমাজে বিভিন্ন বৈষয়িক ও বাস্তবিক সম্পর্কে জড়িত মানুষ হচ্ছে সেই সকল সম্পর্কেরই সামগ্রিক ফল। ফয়েরবাখের এই পর্যালোচনা মার্কসের হাত ধরে পরে ‘সামাজিক উৎপাদন’ বা উৎপাদন সম্পর্কের ধারণায় গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু ফয়েরবাখ মানুষের এই ‘প্রকৃত সারসত্তা’র পর্যালোচনা করতে সক্ষম হননি। ফলে ফয়েরবাখ দুটো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। 
১. মানুষকে তার বাস্তবিক বা বৈষয়িক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘বিমূর্ত’ সত্তা গণ্য করা। ইতিহাসবিচ্ছিন্ন এই বিমূর্ত মানুষের ধর্মীয় আবেগকে এমন ভাবে অনুমান করা বুঝি সেই আবেগ আপনাতেই আপনি হাজির হয় বা হাজির থাকে। অর্থাৎ ধর্মকে একজন বিচ্ছিন্ন ও বিমূর্ত মানুষের সেন্টিমেন্ট বা আবেগ হিসাবে ফয়েরবাখ বিচার করেছেন। তিনি ধর্মের সামাজিক কিম্বা ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। ‘ধর্মীয় আবেগ’ নিজেই যে একটা সামাজিক ঐতিহাসিক ব্যাপার এবং দেশকাল পাত্রভেদে সেই আবেগেরও যে রকমফের আছে, ফয়েরবাখ তা বোঝেননি। যে কারণে ফয়েরবাখ যে বিমূর্ত মানুষকে ব্যাখ্যা করেছেন, বাস্তবে সেই মানুষটি যে বিশেষ ধরণের সমাজের অন্তর্গত, সেটা ফয়েরবাখের চোখে পড়ে না।
২. মানুষের সারসত্তাকে অতএব, ফয়েরবাখ কেবল ‘প্রজাতি’র স্বভাব হিসাবেই নির্ণয় করেছেন; যেন এই সারসত্তা মানুষের অন্তর্গত এক ধরণের নির্বোধ সামান্য বৈশিষ্ট্য। এই প্রজাতিগত নির্বোধ বৈশিষ্ট্যের অনুমান দিয়ে বিভিন্ন ও বিচিত্র মানুষকে ফয়েরবাখ প্রকৃতিগতভাবে এক বা অভিন্ন ভেবেছেন। 
আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা (১) ফয়েরবাখের খ্রিস্টধর্মের পর্যালোচনা এবং (২) কার্ল মার্কসের খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে ফয়েরবাখের পর্যালোচনার পর্যালোচনা সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরলাম। ধর্ম পর্যালোচনার ইতিহাস কিভাবে সমাজ ও ইতিহাস পর্যালোচনার ধারা হিসাবে গড়ে উঠল, আশা করি সে সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা আমরা এখানে দিতে পেরেছি। 
১১ অক্টোবর ২০১৫, ২৬ আশ্বিন ১৪২২, শ্যামলী 

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৫

ইসলামে কোরবানি, ‘মনের পশু’ তত্ত্ব ও খ্রিষ্টধর্ম

‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’
যাঁরা ঈদ এলে প্রায়ই নিজেকে মহান পশুদরদি প্রমাণ করবার জন্য পশু কোরবানি না দিয়ে ‘মনের পশু’ কোরবানির তত্ত্ব দিয়ে থাকেন, তাঁদের কিছু বিষয় বিবেচনার জন্য পেশ করছি। আশা করি তাঁরা ভেবে দেখবেন। 

১. সব ধর্মেই নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী পরমের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য ‘কোরবানি’র বিধান আছে। বলা বাহুল্য, তাকে কোরবানি বলা হয় না। বলা হয় ‘বলী’, ‘ঈশ্বরের জন্য রক্তোৎসর্গ ইত্যাদি। আরবিতে ‘উদিয়া’ শব্দের অর্থ ‘রক্তোৎসর্গ’। তবে উর্দু ও ফারসি ভাষায় আরেকটি আরবি শব্দ ‘কোরবান’ থেকে ‘কোরবানি’ কথাটার চল হয়েছে। অনেকে মুসলমান হিসাবে নিজের সম্প্রদায়গত পরিচয়কে প্রধান করে তুলতে চান বলে ‘পরমের সন্তুষ্টি লাভ’ কথাটার সঙ্গে একাত্মবোধ না-ও করতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ তো অবশ্যই ইসলামের দিক থেকে পরম সত্য, সেই দিক থেকে একাত্মবোধ না করার সমস্যাও আছে। তবে ইসলামের ইতিহাসে যাঁরা সাম্প্রদায়িকতা ও চিন্তার সঙ্কীর্ণতাকে প্রশ্রয় দেন নি, তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান ছাড়াও কোরবানির মধ্য দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের কথা বলেন। মুমিনের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রত্যাশা আর নাই। আল্লাহর নৈকট্য একই সঙ্গে সকল প্রকার সঙ্কীর্ণতা, স্বার্থপরতা ও সাম্প্রদায়িকতাকে কোরবানিও বটে। 

২. ইসলামবিরোধী প্রপাগান্ডার অংশ হিসাবে কোরবানিকে নিছকই পশুহত্যা হিসাবে চিহ্নিত করবার চেষ্টা নতুন নয়। তবে সেকুলারিজম, নাস্তিকতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেবার জন্য ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে নিন্দিত করে তোলার চেষ্টা সাম্প্রতিক। একে প্রকট করে তোলার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের হিংসা, হিংস্রতা এবং প্রাণীর প্রতি নির্দয়তা সহজেই প্রমাণ করা যায়। যেহেতু কোরবানি শব্দটি বিশেষ ভাবে মুসলমানদের ধর্মচর্চার সঙ্গে যুক্ত, সেই ভাবেই তার বিশেষ প্রচার চলে। তাই আমরা বুঝতে পারি না ধারণাগত ভাবে যাকে মানুষ ‘পরম’ জ্ঞান করে তাকে সন্তুষ্ট করবার বিভিন্ন ধর্মীয় চর্চা তেমন নতুন নয়। ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষ তাদের সামাজিক ঐক্য দৃঢ় করবার দরকারেই তা উদ্ভাবন করেছে। এখানে মুসলমানদের কোন একচেটিয়া নাই। তবে কোরবানির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও ব্যাখ্যায় অবশ্যই স্বাতন্ত্র্য আছে। সেই দিকটা গুরুত্বপূর্ণ।

৩. ধর্মের ইতিহাসের দিক থেকে বিচার করলে প্রথমেই বোঝা দরকার পরমের সন্তুষ্টির জন্য প্রাণী উৎসর্গ করার বিধানের বিরোধিতা করা একান্তই একটি খ্রিষ্টীয় চিন্তা। তাই এর বিরোধিতা করতে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রাণী-প্রেম, অহিংসবাদ, নৈতিকতার বাগাড়ম্বর প্রদর্শন খুবই বিরক্তিকর। খ্রিষ্টধর্ম একটি মহান ধর্ম। ফলে খ্রিষ্টীয় চিন্তার বশবর্তী হয়ে কেউ ধর্মচর্চার অংশ হিসাবে প্রাণী উৎসর্গ করবার বিরোধিতা করতেই পারেন। কারণ খ্রিষ্টধর্মের চোখে এটা ‘পাগানিজম’- বর্বরদের চর্চা। বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠি, জাতি বা জনগোষ্ঠি অসভ্য ও পশ্চাৎপদ। তারা ধর্ম কী জানে না। দাবি করা হয়, খ্রিষ্টধর্মই একমাত্র সত্যিকারের ধর্ম। যিশু নিজেকে নিজে ক্রসে ‘কোরবানি’ দিয়েছেন। এর চেয়ে বড় কোরবানি আর কিছুই হতে পারে না। এটাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ কোরবানি। কোরবানির চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তিনি। এরপর অন্য সব কোরবানি নিরর্থক। কারণ সত্যিকারের ধর্ম হাজির হয়েছে। এখন কর্তব্য হচ্ছে ক্রুসেড পরিচালনা ও সব জনগোষ্ঠিকে ধর্মান্তরিত করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য পশু কোরবানি বন্ধ করা। পাগান বা বর্বরদের বিপরীতে খ্রিষ্টধর্মের মাহাত্ম্য প্রমাণের জন্যই পশু কোরবানি খ্রিষ্টধর্ম নিষিদ্ধ করেছে। যারা কোরবানির বিরোধিতা করেন, তারা খ্রিষ্টান না হতে পারেন, কিন্তু সাধারণত তারা যে যুক্তি দিয়ে থাকেন, সেটা একান্তই খ্রিষ্টধর্মেরই যুক্তি।

৪. এই দিক থেকে খ্রিষ্টধর্ম সৎ। ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রাণী-প্রেম, নৈতিকতার বাগাড়ম্বর এখানে নাই। এই বিরোধিতা খ্রিষ্টধর্মের দিক থেকে একই সঙ্গে ‘কোরবানি’র ন্যায্যতা প্রমাণও বটে। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন বা নৈকট্য অর্জনই আমাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে মানুষের মুক্তির জন্য নিজেকে কোরবানির দেবার চেয়ে বড় উৎসর্গ আর কী হতে পারে? কিন্তু ‘মনের পশু’ কোরবানির তত্ত্ব যারা দিয়ে থাকেন, তাঁরা নিজেদের সেকুলার প্রমাণ করবার জন্য এই সৎ অবস্থান গ্রহণ করেন না। তাঁরা যিশুর মতো মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে রাজি না। তাই তাঁরা ‘মনের পশু’ বধ করবার কথা বলে সস্তায় হাততালি পেতে চান। 

৫. খ্রিষ্টধর্মের যুক্তি হচ্ছে চূড়ান্ত কোরবানির উদাহরণ প্রদর্শিত হয়েছে। আর কোন কোরবানির দরকার নাই। যাঁরা মহান যিশুর উদাহরণ দেখে উজ্জীবিত তাদের উচিত প্রভুর প্রেমের জগতে আশ্রয় লাভ করা। কিন্তু এই সততা একই সঙ্গে বর্ণবাদ, ঔপনিবেশিকতা ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ঘৃণারও ভিত্তি। এর দ্বারা কারা সভ্য আর কারা অসভ্য, অপরিষ্কার ও হননযোগ্য তা-ও নির্ধারিত হয়। সাদারাই একমাত্র সভ্য এবং তারা খ্রিষ্টান। বর্ণবাদী হোয়াইট সুপ্রিমেসির মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় খ্রিষ্টধর্ম। যারা পশু কোরবানিকে বর্বর মনে করেন এবং ভাবেন যে এটা ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক অবস্থান- আসলে ব্যাপারটা অত সিম্পল নয়। আপনি আসলে আপনার অজান্তে হোয়াইট সুপ্রিমেসি ও বর্ণবাদের জয়গানই গাইছেন। কিন্তু নিজের চেহারা লুকিয়ে। আপনি যদি খ্রিষ্টান না হয়ে থাকেন, আপনি নিজেই বলুন আপনাকে কী বলা যায়!

৬. ইসলাম হজরত ঈসা আলাইহে ওয়া সাল্লামের এই কোরবানিকে মান্য করে। তিনি আল্লাহর রাসুল এবং তাঁকে রসুল হিসাবে মানা ইসলামে মুমিন হিসাবে বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর নিজেকে নিজে আল্লাহর পথে কোরবানি দেওয়া ইসলামের চূড়ান্ত একটি আদর্শ যার সঙ্গে ‘জিহাদ’-এর ধারণা যুক্ত। অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে কোরবানি দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকা। তাঁর মধ্যে এই বিশুদ্ধ জিহাদি ও প্রেম মূর্তির সম্মিলন ঘটেছে বলে তিনি ‘রুহুল্লাহ’। তাঁর মধ্য দিয়ে নাফসানিয়াতের বিরুদ্ধে রুহানিয়াতের বিজয় ঘটেছে, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের পথে মানুষ রুহানিয়তের পরম যে রূপ প্রদর্শন করতে পারে তার নজির। আল্লাহ তাকে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন। আখেরি নবী ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভের চূড়ান্ত রূপ হজরত ঈসার (আ:) মধ্যেই আমরা দেখি। মানুষের পক্ষে এই হাল বা স্বভাব অর্জন সম্ভব, কারণ দুনিয়ায় আল্লাহ মানুষকে আল্লাহর খলিফা হিসাবেই- রুহানিয়াতের শক্তি সম্পন্ন করেই- পাঠিয়েছেন। ফলে শুধু মৃত্যুর পর বেহেশতের লোভে, কিম্বা ব্যক্তিগত স্বার্থের বশবর্তী হয়ে নয় বরং জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের মুক্তি এবং আল্লাহর সৃষ্টি প্রতিটি প্রাণের হেফাজত ও সুরক্ষার জন্য ইসলাম জিহাদের কথা বলে। হজরত মোহাম্মদ (সা:) শুধু মুসলমানদের মুক্তির জন্য আসেন নি। তিনি সকল মানুষের জন্যই এসেছেন। শুধু মানুষও নয়- পশু পাখি কীট পতঙ্গসহ আল্লাহর সকল সৃষ্টির রহমত হিসাবেই তাঁর আবির্ভাব ঘটেছে। খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে হজরত ঈসাকে (আ:) নিয়ে কোন ঝগড়া নাই। 

৭. তবে বিরোধ তো অন্য ক্ষেত্রে আছেই। খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে ইসলামের বিরোধের প্রথম ক্ষেত্র হচ্ছে খ্রিষ্টধর্ম হজরত ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে প্রতিটি মানুষের মধ্যে রুহানিয়াতের বিকাশের সম্ভাবনা কার্যত অস্বীকার করে। এতে দাবি করা হয় আল্লাহর পুত্র না হলে ইহলৌকিক মানুষের পক্ষে এই প্রকার রুহানিয়াতের শক্তি অর্জন অসম্ভব। অন্য দিকে আল্লাহর কোন ছেলে-মেয়ে নাই সেই ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একত্ববাদের আদি রসুল হজরত ইব্রাহিম বা আব্রাহামেরও বিরোধিতা করে। যিশুকে আল্লাহর পুত্র বলার মধ্য দিয়ে ইসলামের প্রধান আপত্তি হোল এটা শেরেকি। খ্রিষ্টধর্ম হজরত ইব্রাহিমের একত্ববাদের শিক্ষা থেকে সরে গিয়েছে। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে খ্রিষ্টধর্ম সভ্য/বর্বর, সাদা/কালোসহ মানুষের মধ্যে মানুষের বিভাজন তৈরি করে। আমরা ইসলামের আপত্তি নিয়ে তর্ক করতে পারি, কিন্তু দুটো ধর্ম যিশুকে মেনেও তাঁর তাৎপর্য বিচার করতে গিয়ে কোথায় পরস্পর পৃথক হয়ে যায় সেই দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

৮. এবার আসা যাক আখেরি নবী কেন হজরত ঈসার (আ:) নজির থাকা সত্ত্বেও কোরবানির প্রচলন করলেন। এর কারণ হচ্ছেন হজরত ইব্রাহিম (আ:)। আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান যদি রুহানিয়াতের পথ হয়ে থাকে তাহলে হজরত ইব্রাহিম আল্লাহর আদেশ পালন করতে গিয়ে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকে কোরবানি করতে চেয়েছিলেন। কোরবানির এই নজির যেন আমরা ভুলে না যাই। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়’- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- এই সত্য তিনিই সবচেয়ে স্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করেছিলেন। ইসলামপন্থিরা রসুলের উম্মত, কিন্তু একই সঙ্গে তারা ‘মিল্লাতে ইব্রাহিম’-এর অন্তর্ভুক্ত। শেরেকির বিরুদ্ধে লড়তে হলে হজরত ইব্রাহিমের শিক্ষা কোন ভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না। হজরত মুসা (আ:) ও হজরত ঈসা (আ:)-এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যারা হজরত ইব্রাহিম (আ:)-এর একত্ববাদ থেকে সরে গিয়েছে- অথচ বড় গলায় হজরত ইব্রাহিম (আ:)কে তাদের পূর্বপুরুষ হিসাবে যারা স্বীকার করে- তাদের সুপথে আনবার জন্যই হজরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহকে স্মরণ ইসলামে বিশ্বাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক। আল্লাহর আদেশ পালন করতে গিয়ে হজরত ইব্রাহিম নিজের পুত্রসন্তানকে কোরবানি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ঘটনার স্মরণে কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব।

৯. হজরত ইব্রাহিম যখন হজরত ইসমাইলের গলায় ছুরি চালাতে যাচ্ছিলেন, গলা কাটছিল না। তিনি পাথরে ছুরি শান দিলেন। দিয়ে পাথরে ছুরির ধার পরীক্ষা করলেন, পাথর দুই ভাগ হয়ে গেল। এরপর তিনি আবার সন্তানের গলায় ছুরি চালাতে গেলেন- কিন্তু কোন কাজ হোল না। কিন্তু তাতেও গলা কাটল না। ইসলামের গল্প হচ্ছে এই যে হজরত ইব্রাহিম বললেন, হে ধারালো ছুরি, তুমি পাথর দ্বিখণ্ডিত করতে পারো, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমার কাজে বাধা হয়ে উঠছ কেন? আল্লাহ ছুরিকে কথা বলার ক্ষমতা দিলেন। ছুরি বলল, আপনি একবার আমাকে হজরত ইসমাইলকে কোরবানির আদেশ দিচ্ছেন, আর আল্লাহ সোবহানুতায়ালা আমাকে হাজারবার নিষেধ করছেন। আমি তাঁর অধীন। এ সময় আল্লাহর নির্দেশে জিব্রাইল হজরত ইসমাইলের পরিবর্তে দুম্বা কোরবানির জন্য হাজির। পুরা ঘটনার মধ্যে তিনি আল্লাহর মহিমা আল্লাহ কিভাবে প্রকাশ করেন তার নজির দেখে বলে উঠলেন আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর। হজরত ইব্রাহিম এই ঘোষণা শুনে পিছে ফিরে দেখলেন জিব্রাইল দাঁড়ানো। তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তর দিলেন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। ছুরির নিচে স্বেচ্ছায় নিজের গলা পেতে রাখা হজরত ইসমাইল যোগ করলেন ‘আল্লাহু আকবর, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’- আল্লাহ মহান, সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহর জন্যই। এই গল্পের নানা বয়ান থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিটি মুসলমানের জন্য এই মূহূর্তটি চরম আবেগের বিষয়।

১০. অন্য যেকোন ধর্মের ইতিহাসের মতো ইসলামের ইতিহাসও সরল পথে এগোয় নি। তার অনেক মোড়, বাঁক, স্ববিরোধিতা, দ্বন্দ্ব আছে, আছে নানান মত ও মাজহাব। দুনিয়ার সকল মানুষকে একদিন একত্র করতে হবে- রক্ত, গোত্র, আভিজাত্য, গোষ্ঠি, ভূখণ্ড, নৃতাত্ত্বিক কিম্বা ভাষা বা সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ অতিক্রম করে মানুষ একদিন ঐক্যবদ্ধ হবে- ইসলাম এই স্বপ্ন দেখেছিল বলে তার আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটেছিল দ্রুত। হজরত ইব্রাহিম সেই স্বপ্নের দ্রষ্টা। যে কারণে জেরুসালেমের দিক থেকে রুকু ইব্রাহিম খলিলুল্লাহর স্মৃতি মক্কার দিকে ফিরে যায়- রুকু বদলের এই ইতিহাসের তাৎপর্য বুঝতে হবে। আখেরি নবী ভেবেছিলেন ইব্রাহিমের মধ্য দিয়ে তিনি সেই সময়ের সকল একত্ববাদী ধর্মকে ঐক্যবদ্ধ করবেন। হজরত ইব্রাহিম সেই দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর সম্মানেই তাই কোরবানির ঈদ পালন ওয়াজিব করা হয়েছে।

১১. কিছু কথা বলে রাখলাম আপাতত এটা বোঝাবার জন্য যে কোন বিষয়কে আংশিক বা একদেশদর্শী ভাবে বিচার করা মোটেও ঠিক নয়। অর্থাৎ কোরবানি দেবার দরকার কী? ‘মনের পশু’কে কোরবানি দিলেই তো হয়- যাঁরা এইসব পপুলিস্ট কথাবার্তা বলেন তাঁরা আসলে নীতিগত ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই মারাত্মক ভুল করেন। প্রথমত বোঝা যায় ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁদের কোন ধারণাই নাই। দ্বিতীয়ত তাঁরা আসলে যে খ্রিষ্টীয় তত্ত্বই ধোপদুরস্ত ধর্মনিরপেক্ষতার ভান ধরে প্রচার করছেন- তাঁরা নিজেরাই তা জানেন কি না সন্দেহ। যার অর্থ একালে দাঁড়ায় তাদের মনের পশুর তত্ত্ব না মানলে অন্যেরা ধর্মচর্চার দিক থেকে বর্বর ও অসভ্য। ইসলামের সমালোচনা বা পর্যালোচনা করুন, কিন্তু না বুঝে বা না জেনে নয়। প্রপাগান্ডার শিকার হবেন না। 

স্যরি, ‘মনের পশু’ তত্ত্ব মেনে নেবো না।

১২. তবে যাঁরা সত্যি সত্যিই যেভাবে এখন ‘উৎসব’ করে কোরবানি দেওয়া হয় তার বিরোধিতা করেন, তাঁদের অনেক যুক্তি আছে। আমি তা সমর্থন করি। তাঁরা ‘মনের পশু’র ধারণার মধ্য দিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলতে চান, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ন্যায্য। কিন্তু বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা সম্পর্কে অসচেতন থেকে তুলবার ধরন এবং ধর্মের ইতিহাস ঘনিষ্ঠ ভাবে পাঠ না করায় এতে ভুল বোঝার সম্ভাবনাই বেশি। এটা তো সত্যি যে আমাদের কিছু বৃত্তি, চরিত্র ও আচরণ রয়েছে যা বিপজ্জনক। পশুর প্রতি নির্দয় হওয়া, অতিরিক্ত ধর্মোৎসাহ পশুহত্যা বাড়িয়ে দেওয়া, ইত্যাদি। প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি দরদ ইসলামের নীতি, কিন্তু সেই দরদের অভাব আমাদের কাতর করছে না। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ। এসব নিয়ে সুযোগ পেলে অন্যত্র আলোচনা করব। তবে পশুকে জীব হিসাবে ইসলাম মানুষের চেয়ে হীন মনে করে না। মনের পশুকে হত্যা যদি সিদ্ধ বলে গণ্য হয় তাহলে বাস্তবে পশু কোরবানি দেওয়া অগ্রহণযোগ্য কেন তার কোন যুক্তি নাই। এই জন্যই ইসলাম কথাটাকে ‘পশু’ প্রতীক দিয়ে বলতে নারাজ। এ ক্ষেত্রে সঠিক শব্দ হচ্ছে ‘নাফসানিয়াত’- মানুষের নিজের নফস থেকে মুক্ত হতে না পারা। মুক্ত হবার পথ হচ্ছে ‘জিহাদ’। অর্থাৎ নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ। কিন্তু ‘জিহাদ’ শুনলে অনেকের গা হাত পা কাঁপতে থাকে- সমস্যা এইখানে।

১৩. শুধু বলে রাখি, কোরবানির ঈদ মোটেও উৎসব নয়, এটা পরীক্ষার দিন। মানুষের রুহানিয়াত অর্জনের সম্ভাবনা স্বীকার করে নিজেকে আল্লাহর পথে যেকোন সময় কোরবানি দেবার শপথ নেবার দিন, মুমিন সেভাবেই এই দিনটি পালন করেন। সেই ক্ষেত্রে তাঁদের অবশ্যই কিছু বিষয় পালন জরুরি বলে ছেলেবেলা থেকে আলেম ওলামা মুফতিদের কাছ থেকে জেনেছি। সেটা হোল- ১. কোরবানির গোশত একবেলার বেশি যেন ঘরে না আসে সেই দিকে খেয়াল রাখা; ২. বাকি গোশত গরিবদের মধ্যে অবশ্যই বিলিয়ে দিতে হবে। কোরবানির গোশতের তারাই হকদার। এই দিনে গরিবকে তার হক থেকে বঞ্চিত করার চেয়ে বড় কোন গুনাহ আর হতে পারে না। তিন ভাগ করে এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেওয়ার বিধান আছে। কোন ছহি হাদিসের ওপর ভিত্তি করে কোন প্রামাণ্য নিয়ম হিসাবে না, ঐতিহ্য হিসাবে গড়ে উঠেছে। তাই গরিবের কথা বলার মধ্যে আত্মীয়স্বজনও অন্তর্ভুক্ত যারা গরিব। 

১৪. কোরবানির গোশত জমিয়ে রেখে খাওয়ার মধ্যে যে ভোগবাদিতা ও ভোগী আচরণ গড়ে উঠেছে, কোন ভাবেই তা মেনে নেওয়া যায় না। দুঃখিত। যারা মাংস খেতে চান তো খান। তবে দয়া করে মিল্লাতে ইব্রাহিমের অপমান করে ঈদের দোহাই দিয়ে এই ভোগবাদিতার পক্ষে যুক্তি দেবেন না। ভোগবাদিতার সঙ্গে কোরবানির কোন সম্পর্ক নাই। এর সঙ্গে সম্পর্ক পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ ও ব্যক্তিতন্ত্রের। ইসলামকে অবশ্যই এই পুঁজিতন্ত্র ও ভোগবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাবে দাঁড়াতে হবে। না দাঁড়ালে ভোগবাদীদের চরিত্রই ইসলামের চরিত্র বলে সবাই মারাত্মক ভুল করবে। আলেম ওলামা মওলানা মুফতিদের এই ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। এখন ঈদের যে রূপ তা ভোগবাদিতারই প্রতিযোগিতা। দয়া করে এর সঙ্গে কেউ ইসলামকে জড়াবেন না। সবার কাছে আবেদন, ভোগবাদিতার বিরোধিতা করুন। মাংস খাওয়া আর গরু জবাইয়ের উৎসবের সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক আছে বলে অন্তত আমার সীমিত পড়াশুনায় মনে হয় নি। যারা জ্ঞানী, প্রাজ্ঞ ও মুফতি- মতামত দেবার অধিকারী- তাঁরাই ভালো জানবেন। 
২৫ সেপ্টেম্বর। ২০১৫। 

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

মানুষের নিজের কাছ থেকে নিজের বিযুক্তি ধর্মের পর্যালোচনা ও বাংলাদেশে ইসলাম-৯


‘ধর্মের পর্যালোচনা’ সকল পর্যালোচনার পূর্বশর্ত, ভিত্তি বা আরম্ভ- তরুণ মার্কসের তরফ থেকে আসা এই প্রকার বহুল প্রচারিত ভাবনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা লিখছি। এরপর মার্কস বলেছিলেন, জার্মানিতে ধর্মের পর্যালোচনা মোটামুটি শেষ হয়েছে। তাই তিনি ধর্ম ও দর্শনের বিষয় থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে মনোযোগ দিলেন অর্থশাস্ত্রে। তথাকথিত ‘আধুনিকতা’ ও ‘প্রগতিশীলতা’র যুগে এটা রীতিমতো বিশ্বাস হিসাবেই বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে ধর্মের যুগ শেষ। গড ইজ ডেড। রিলিজিয়ন বা ধর্মের জগৎ আমরা পশ্চাতে ফেলে এসেছি। রিলিজিয়ন বা ধর্ম আর ফিরে আসবে না। আধুনিকতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে রিলিজিয়ন বা ধর্মেরও অবলুপ্তি ঘটবে। 
কিন্তু ইতিহাস বড়ই মনোরম। সেটা হয় নি। ধর্ম লুপ্ত হওয়া দূরে থাক বরং প্রত্যাবর্তন করেছে প্রবল বেগে। কিন্তু কী আসলে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং কেন এই প্রত্যাবর্তন অনিবার্য ছিল সে সম্পর্কে দুনিয়াব্যাপী তর্কবিতর্কের শেষ নাই। আমরা ধর্মের প্রত্যাবর্তনের অর্থ বোঝার জন্যই ধর্মের পর্যালোচনা কথাটা জার্মান দার্শনিকেরা কিভাবে বুঝেছিলেন সেটা বোঝার চেষ্টা করছি। সেটা করছি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামকে আমাদের মুখ্য আগ্রহের বিষয় হিসাবে নজরে রেখে। ইসলাম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা যেন প্রাক-ইসলামি চিন্তা বা দর্শনের মধ্যে ফিরে না যাই তার প্রস্তুতি হিসাবে। আমরা দাবি করেছি। ইসলামের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বদল ও তার রাজনৈতিক-দার্শনিক প্রস্তাবনা সঠিকভাবে উপলব্ধি ও বোঝার ওপর বাংলাদেশের জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। 
ধর্মের পর্যালোচনা শেষ হয়েছে কথাটা জার্মান দর্শন- বিশেষত হেগেল, ফয়েরবাখ ও ইয়ং হেগেলিয়ানদের লেখালিখির পরিপ্রেক্ষিতেই কার্ল মার্কস বলেছিলেন। আলোচনার এই সুনির্দিষ্ট সীমার কথা আমরা যেন আবার ভুলে না যাই। মনে রাখা দরকার মার্কস, এঙ্গেলস, ফয়েরবাখ এমনকি হেগেলেরও ইসলাম সম্পর্কে কোন সম্যক ধারণা ছিল না। তবে ইসলামের দার্শনিক প্রস্তাবনার বৈপ্লবিক সম্ভাবনা হেগেলের নজর এড়ায় নি, সেটা তাঁর ইতিহাসসংক্রান্ত দর্শনে আমরা দেখি। তবে ‘ধর্ম’ বলতে তাঁরা সকলেই মূলত খ্রিষ্টধর্মই বুঝেছেন এবং খ্রিষ্টধর্মের আলোকেই অন্যান্য ধর্মকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আমাদের আগ্রহ হচ্ছে খ্রিষ্টধর্মের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যে ধারা পাশ্চাত্যে গড়ে উঠেছে তা আমাদের জন্য কোথায় এবং কেন প্রাসঙ্গিক এবং কোন দিকগুলো একদমই অপ্রাসঙ্গিক সেই ফারাক যথাসম্ভব স্পষ্ট করা। 
জার্মান দর্শন ধর্মের প্রশ্ন মীমাংসা করতে পারে নি, কিন্তু ধর্মের তাৎপর্য বিচারের জটিল গিঁট ও সেই গিঁট খুলবার সম্ভাব্য পদ্ধতি যারপরনাই স্পষ্ট করেছে। ধর্ম নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা ও পর্যালোচনা শুরুর জন্য সেটা জরুরি। তারা কী ধরনের তর্কবিতর্ক করেছেন যদি তার খোঁজ আমরা না রাখি কিংবা তাদের বিশ্বাস বা দর্শন আমাদের চেয়ে ভিন্ন বলে এড়িয়ে যাই তাহলে পুরা তর্কই আমাদের আবার নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। করে ভাবব, আমরা বুঝি আসলেই নতুন কিছু আবিষ্কার করেছি। হেগেল, ফয়েরবাখ ও মার্কসের ওপর আমাদের আগ্রহ বিশেষত এ কারণেই। তাদের মধ্য দিয়ে চিন্তার প্রান্তসীমা কোথায় এসে থেমেছে, সেটা নতুন করে চিহ্নিত করা দরকার, যাতে আমরা আবার চলতে শুরু করতে পারি। আমরা পুরানা চাকা নতুন করে বানাতে চাই না, সেটা মোটরগাড়ির চাকা হলেও- কারণ চিন্তা, ডিজাইন ও ব্যবহারের দিক থেকে গরুর গাড়ির চাকা আর মোটরগাড়ির চাকার মধ্যে কোনো ফারাক নাই। উভয়ে গোল এবং মাটিতে গড়ায়। এমনকি মাটিতে যখন চলে তখন এরোপ্লেনের চাকার ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। ডানাটা অবশ্য উড়োজাহাজে নতুন। অতএব মিল ও ফারাক চিহ্নিত করা দর্শনের দরকারি কাজ। এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু আশা করি আমাদের আছে। 
ফয়েরবাখের ‘খ্রিষ্টধর্মের সারকথা’ বইটির শুরুর প্রথম বাক্যটি হচ্ছে : ‘ধর্ম হচ্ছে মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের বিচ্ছেদ’। ধর্ম ভুয়া, প্রতারকদের কাণ্ড, ধর্মগুরুরা ব্যক্তি হিসাবে খুব খারাপ প্রাণী, আমি আল্লাহ বা ধর্মে বিশ্বাস করি না- এই ধরনের বালখিল্য, নাস্তিক্যবাদী বিরক্তিকর অহং কিংবা উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য দিয়ে ফয়েরবাখ আলোচনা শুরু করেননি। অথচ তিনি ‘ফাদার অব মডার্ন এথেইজম’ বা ‘আধুনিক নাস্তিক্যবাদের পিতা’ হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এই খ্যাতি এখনো বহাল। আধুনিক নাস্তিক্যবাদের বাবার সঙ্গেই তাই আমরা আমাদের হিসাবনিকাশ চুকিয়ে নিতে চাই। 
হেগেল থেকে শুরু করে ফয়েরবাখ ও মার্কস অবধি পাশ্চাত্যে নাস্তিক্যবাদের যে ধারাকে আমরা চিনি তার গোড়ায় রয়েছে ধর্ম ব্যাপারটা আসলে কী, সেটা ব্যক্তিমানুষের উপলব্ধি বা তার জানার আকুতির দিক থেকে বোঝার আন্তরিক চেষ্টা। তার ফল হচ্ছে ধর্মের মানবিকীকরণ। অর্থাৎ ধর্মের মানবিক মর্মের দিকটা বোঝার ওপর গুরুত্বারোপ। নাস্তিক্যবাদ বলতে খেয়ে-না-খেয়ে ধর্ম বিরোধিতা বলতে বাংলাদেশে আমরা যা বুঝি, এই আকুতির মধ্যে তার ছিটেফোঁটাও নাই। মানুষই ধর্ম করে। মানুষেরই ধর্ম আছে। অতএব মানুষকে বোঝা গেলে ধর্মকেও বোঝা যাবে। হেগেল থেকে ফয়েরবাখ আর ফয়েরবাখ থেকে মার্কস অবধি অনুসরণ করলে আমরা দেখব ধর্মের পর্যালোচনা বলতে মানুষ ধর্মের মধ্য দিয়ে কী বলতে চায়, কিভাবে বলতে চায়, জ্ঞানতত্ত্বের পরিমণ্ডলে সেই সত্যটাই সকলে বুঝতে চাইছেন। তাঁদের দর্শনের ভারকেন্দ্র মানুষ। আর এই মানুষ এমন এক বিচিত্র সত্তা যে ইহলোকে বসেই যুগপৎ ‘ইহ’ ও ‘পর’- অর্থাৎ ইহকাল ও পরকাল নিয়ে ভাবে। পরকালের কথা বললে মানুষের কথাই আসে, কারণ পরকাল নিয়ে মানুষই তো ভাবে। ভাবতে সক্ষম। ভাবাটা তার স্বভাব। মানুষ এমনই এক সত্তা যে নিজেই ‘ইহ’ বা ‘এই’- সে এখানেই- বিশেষ দেশকালেই আছে। কিন্তু আছে পরকালকে সঙ্গী করে। 
এটা বলছি বাংলাদেশের তরুণদের জন্য। একই প্রকার আকুতি যাদের অনেকের মধ্যেই প্রবল। এটা শুভলক্ষণ। একদিন তারা বড় চিন্তাবিদ হিসাবে নিজের চিন্তাশীলতার ক্ষমতা প্রদর্শন করবেন, এই বিশ্বাস অমূলক বা অতি প্রত্যাশা নয়। তাই ‘নাস্তিক্যবাদ’ নামে যে সকল কুৎসিত প্রচার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে বাংলাদেশে জারি রয়েছে, তার সঙ্গে দার্শনিক নাস্তিকতার কোনো সম্পর্ক নাই সে সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকা জরুরি। জার্মান দর্শনে ‘এথেইজম’-এর চরিত্রে ইহলৌকিক ও মানবিক সংবেদনার ছাপ স্পষ্ট। যে কারণে জার্মান দর্শনে ধর্মের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে ধর্মের ‘মানবিকীকরণ’-প্রক্রিয়া কিভাবে অনায়াসে রূপ লাভ করে সেটাই অনায়াসে আমরা প্রত্যক্ষ করি। ইসলামের দিক থেকে যেকোনো মানবিক সংবেদনা গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। কিন্তু ধর্ম বা দীনের ধারণা ধর্মকে ‘মানবতাবাদ’-এ পর্যবসিত করা নয়। 
ফয়েরবাখ এই অর্থে নাস্তিক যে তিনি ধর্মকে স্রেফ ইমান আকিদা বিশ্বাস বা আচার হিসাবে দেখেছেন। দেখেছেন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মানুষের তত্ত্ব হিসাবে। ঠিক একইভাবে হেগেলের দর্শনকেও না। দুটোই তাঁর কাছে মানুষের আত্মবিচ্যুতির লক্ষণ। ধর্ম হচ্ছে মানুষ যখন নিজের মধ্যে নিজে বিভক্ত হয়ে যায়, নিজেকে নিজেই হারিয়ে ফেলে। ধর্ম সেই বিভক্তির চিহ্ন। ধর্ম ফয়েরবাখের কাছে মানুষের নিজের কাছ থেকে নিজের হারিয়ে যাবার কেচ্ছা। মানুষ নিজের কাছে নিজে আবার কিভাবে ফিরে আসতে পারবে সেই পথটাই ফয়েরবাখ আমাদের বাতলাতে চান। সেই পথ বাতলাতে গিয়ে তিনি বুদ্ধি আর হৃদয়ের মধ্যে পার্থক্যের প্রসঙ্গ তোলেন। বুদ্ধিসর্বস্বতার সমালোচনা করেন। বুদ্ধি দিয়ে সব কিছু নির্ণয় করা আর ইন্দ্রিয়পরায়ণতার পার্থক্যের প্রসঙ্গ আনেন। বাস্তব জীবনের দুঃখকষ্টের দিকে দর্শনের নজর ফেরাতে চান। দেখান যে মানুষ শুধু চিন্তা করে না। খ্রিষ্টীয় অর্থে ইহলৌকিক জগতে যাতনাও বোধ করে। খ্রিষ্টীয় অর্থেই মানুষের ‘সাফারিং’ আছে। কষ্ট আছে মানুষের। মানুষ ভোগে। বুদ্ধি মানুষ সম্পর্কে শেষ কথা নয়। মানুষ শরীরসম্পন্ন; রক্তমাংসে মানুষ। কিন্তু দর্শন সেটা মনে রাখে না। ফয়েরবাখের ধর্ম পর্যালোচনা ছিল একই সঙ্গে জার্মান ভাবাদর্শের পর্যালোচনা, কিংবা আরো সরলভাবে চিন্তা বা দর্শনের সেই বিকৃতির পর্যালোচনা যেখানে ইন্দ্রিয়পরায়ণ বাস্তব জগৎ নয়, মানুষকে বুদ্ধিসর্বস্ব প্রাণী হিসাবে অনুমান করা হয়। যেন সঠিক চিন্তাই মানুষের ভবলীলার সকল সঙ্কট ও সমস্যার সমাধান করতে সম্ভব। ফয়েরবাখ বলছেন, “ধর্ম হচ্ছে মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের বিচ্ছেদ; সে তার নিজের বিপরীতে আল্লাহকে বসায়। মানুষ যা আল্লাহ তা নন, আর আল্লাহ যা মানুষ সেটাও নয়। আল্লাহ অসীম, মানুষ সসীম; আল্লাহর কোনো খুঁত নাই, কিন্তু মানুষে খুঁত আছে; আল্লাহ কালাতীত কিন্তু মানুষ কালের অধীন; আল্লাহ সর্বশক্তিমান, মানুষ দুর্বল; আল্লাহ পবিত্র, মানুষ পাপী। আল্লাহ আর মানুষে চরম ফারাক : আল্লাহ একদমই যথার্থ, সকল ইহলৌকিক বাস্তবতার যোগফল; মানুষ একদমই নিরর্থক, নিজের অর্থহীনতা নিয়েই তার চিন্তা। কিন্তু ধর্মে মানুষ তার সুপ্ত স্বভাবেরই ধ্যান করে”। 
ধর্ম মানুষের নিজের স্বভাব থেকে মানুষের নিজের বিচ্ছেদের লক্ষণ। মানুষের স্বভাবের মধ্যেই মানুষের দিব্য চরিত্র নিহিত, সেই স্বভাব নিয়ে ধ্যান করতে গিয়ে মানুষ নিজেকে তার নিজেরই স্বভাব থেকে আলাদা করে ভাবে। নিজের স্বভাব মানুষের কাছ থেকে বিচ্যুত হয়ে তার কাছ থেকে ভিন্ন হয়ে আলাদা সত্তা হয়ে ওঠে। তাহলে ধর্ম পর্যালোচনার কর্তব্য কী? ফয়েরবাখ বলছেন, ‘তাহলে দেখাতে হবে মানুষের বিপরীতে আল্লাহর উপস্থিতি, আল্লাহ আর মানুষের মধ্যে এই ফারাক ঘটার কাণ্ডটা- যে পার্থক্য থেকে ধর্মের আরম্ভ- মানুষের নিজের স্বভাবের সঙ্গে নিজের দূরত্ব রচনা মাত্র।’ কিন্তু আমরা কী করে বুঝব আমরা ঠিক বলছি? আর মানুষের এই বিভক্ত অস্তিত্বযাপনের প্রয়োজনীয়তাই বা কী? 
ফয়েরবাখের উত্তর হচ্ছে, ‘এর আন্তরিক প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ ধরা পড়ে যখন বুঝি যেখান থেকে ধর্মের শুরু যদি মানুষের সেই দিব্য স্বভাব ধর্মের বিষয় না হোত- তাহলে এই বিযুক্তি এই বিভাজন ঘটা কখনোই সম্ভব হোত না। আল্লাহ যদি আমার স্বভাব থেকে আসলেই আলাদা কোনো সত্তা হোত, তাহলে তাঁর নিখুঁত পূর্ণতা আমার অস্বস্তির কারণ হবে কেন?’। অর্থাৎ আল্লাহ নিয়ে আমাদের এত ভাবনাচিন্তার দরকার কী? আমরা তো এই চিন্তা বাদ দিয়ে অনায়াসেই ইহলৌকিক জীবন হেসেখেলে কাটিয়ে দিতে পারি। ফয়েরবাখের যুক্তি অনুসারে সেটা সম্ভব নয়। যদি মানুষের দিব্যস্বভাব তার নিজের কাছ থেকে অপর বা আলাদা হয়ে থাকবার কারণে ধর্মের উৎপত্তি ঘটে, তাহলে সেই বিযুক্তির মীমাংসা না করে মানুষের পক্ষে হেসেখেলে জীবন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। মানুষ তার নিজের স্বভাবের কারণেই তার দিব্যস্বভাবকে তার চিন্তার বা বুদ্ধির বিচারের বিষয় করবেই। ধর্ম ও দর্শন উভয়ের উৎপত্তিকাণ্ড এখানে।
“কোনো কিছুর মধ্যে বিযুক্তি তখনই ঘটে যখন দুইয়ের এক হওয়া উচিত হলেও তারা আলাদা, উভয়েই এক হবার কথা থাকলেও, এক হতে পারার কথা থাকলেও, তারা পৃথক, আর আসলে তাদের স্বভাব বা সত্যই হচ্ছে এই যে তারা এক। এই সাধারণ ভিত্তি থেকেই বোঝা যায় যে- স্বভাবের কারণে মানুষের মধ্যে এই বিযুক্তির উপলব্ধি ঘটে সেটা তার জন্মগত, তার অন্তর্গত প্রকৃতি, কিন্তু একই সঙ্গে যে শক্তি এই উপলব্ধি প্রদান করে, উভয়ের মিলন ঘটাবার সংবেদনা জাগ্রত করে, আল্লাহর সঙ্গে ঐক্যের তাগিদ দেয়- যা আসলে তার নিজের সঙ্গের নিজের একীভূত হবারই আকাঙ্ক্ষা- সেই শক্তির চরিত্র আলাদা।” 
এখানে দুটো প্রসঙ্গ আমরা পাচ্ছি। মানুষ নিজের দিব্যস্বভাব থেকে বিযুক্ত হয়ে যায়, এটা জন্মগত। অন্য দিকে নিজের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া সেই দিব্যসত্তার সঙ্গে একীভূত হবার আকাক্সক্ষার শক্তির চরিত্র আর বিযুক্তির চরিত্র আলাদা। এই শক্তিটা তাহলে কী?
ফয়েরবাখ বলছেন, সেটা হচ্ছে মানুষের বুদ্ধি, মানুষের যুক্তি কিংবা সাধারণভাবে মানুষের চিন্তা। ফয়েরবাখ বলছেন, ‘এই চরিত্র আর কিছুই নয় মানুষের বুদ্ধি, মানুষের যুক্তি, যাতে মানুষ বুঝতে পারে আল্লাহ হচ্ছেন মানুষের অ্যান্টিথিসিস মাত্র যিনি মানুষ নন; অর্থাৎ যিনি নিজে মানুষ নন, কিন্তু বুদ্ধিরই নৈর্ব্যক্তিক রূপ। বিশুদ্ধ, নিখুঁত দিব্যস্বভাব হচ্ছে বুদ্ধিরই আত্মসচেতনতা, সেই চৈতন্য যার দ্বারা বুদ্ধি নিজের খুঁত (perfection) সম্পর্কে ধারণা করতে পারে।’ 
আল্লাহকে বুদ্ধি বা আত্মসচেতন চিন্তারই নৈর্ব্যক্তিক রূপ বলার মধ্যে আমরা এখানে হেগেলের নৈর্ব্যক্তিক স্পিরিট বা পরমের ধারণাকেই আসলে পাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে ফয়েরবাখ হেগেলকে অতিক্রম করে যেতে পারেন নি। মানুষের চিন্তার স্বভব সম্পর্কে দার্শনিক নয়, একটা নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তিনি খাড়া করছেন। সারকথা দাঁড়ায় এ রকম যে আল্লাহ আর কিছুই নন মানুষ নিজের সম্পর্কে যা ভাবে নিজেকে নিয়ে যেভাবে ভাবতে চায় তারই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্ষেপণ মাত্র। এটা ফয়েরবাখের ‘প্রক্ষেপণ তত্ত্ব’ হিসাবে দর্শনে পরিচিত। তবে এর গুরুত্ব দর্শনের চেয়েও নৃতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্বেই অধিক। নৃতত্ত্ব এ কারণে যে ফয়েরবাখের আলোচনার বিষয় মানুষের জন্মগত স্বভাব। কিন্তু লক্ষ করবার বিষয় যে তার নাস্তিকতায় আল্লাহকে অস্বীকার নাই, আল্লাহর ধারণার উৎপত্তির অনিবার্য নৃতাত্ত্বিক শর্ত তিনি আলোচনা করছেন। দ্বিতীয়ত তিনি দর্শনের উৎপত্তি কারণকেও নৃতত্ত্বের জায়গা থেকেই বিচার করছেন। আল্লাহ হচ্ছে মানুষের কাছ থেকে বিযুক্ত হয়ে যাওয়া একটি নৈর্ব্যক্তিক ধারণা, বুদ্ধি যার সঙ্গে আবার বুদ্ধির পরিমণ্ডলে একীভূত হবার সাধনা করে। বুদ্ধি বা দর্শনের এই চেষ্টার বিরুদ্ধে ফয়েরবাখের বিরাগ স্পষ্ট। তিনি বলছেন, “হৃদয়ের কষ্টের কথা বুদ্ধি কিচ্ছু জানে না; বুদ্ধির কোনো আকাক্সক্ষা নাই, কোনো আবেগ নাই, কোনো অভাব নাই, সে কারণে কোনো অপূর্ণতা বা দুর্বলতাও নাই। যে মানুষের মধ্যে এই বুদ্ধিসর্বস্বতাই অধিপতি তিনি একদেশদর্শী অথচ যেন তিনি নিশ্চিত সেইভাবে আমাদের বুদ্ধিকে রূপে ও কর্তাগুণে হাজির করে আমাদের দেখাতে চান যে বুদ্ধির চরিত্র হৃদয়ের যন্ত্রণা, সংবেদনা, মানুষের আবেগের আতিশয্য থেকে মুক্ত; বুদ্ধি কোনো দেশকালে সীমিত অর্থাৎ কোনো বিশেষ বস্তু বা বিষয়ের বিষয়ের প্রতি সংবেদনা বোধ করে না। কোনো কিছুতেই বুদ্ধির অঙ্গীকার নাই, বুদ্ধি মাত্রই স্বাধীন- কিছুই আকাক্সক্ষা না করা এবং সকল প্রকার অভাব থেকে মুক্ত বুদ্ধি নিজেকে অমর দেবতায় পরিণত করতে চায়।”
এটা হেগেলের দর্শনের সমালোচনা। চিন্তা স্বাধীন ও সার্বভৌম- এই ধারণাকে সমালোচনা করছেন ফয়েরবাখ। অর্থাৎ হেগেলের দর্শনকে ফয়েরবাখ যেভাবে বুঝেছেন তার সমালোচনা। যদিও হেগেলের পরমের ধারণা বুদ্ধিসর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়েছে গণ্য করা দর্শনে বিতর্কিত। আমাদের জন্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই যে দর্শন যখন বুদ্ধিকেই সত্য নির্ণয়ের পরাকাষ্ঠা গণ্য করে এবং হৃদয়ের কথা বা রক্তমাংসের মানুষের কথা ভুলে যায়- ফয়েরবাখ তার বিরোধিতা করছেন। দর্শন যখন মানুষের ইতিহাসকে নির্বিশেষ বা বিমূর্ত ইতিহাস করে তোলে ফয়েরবাখ তা মানছেন না। সবিশেষ বা সুনির্দিষ্ট মানুষকে দর্শনের মনে না রাখার বিরোধিতা করছেন তিনি। এই ফয়েরবাখ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমরা বুঝতে পারি জার্মান দর্শনকে বুদ্ধিসর্বস্ব দর্শনের সীমাবদ্ধতা ধরিয়ে না দিলে কার্ল মার্কসের জন্ম হোত না। অর্থাৎ সত্যিকারের রক্তমাংসের মানুষ ও রক্তমাংসের মানুষের ইতিহাস দর্শনের বিষয় হয়ে উঠত না- যে দর্শনকে আমরা মার্কসের অর্থশাস্ত্র হিসাবে এখন বুঝি। 
তবে ইসলামের দিক থেকে ওপরের আলোচনা থেকে শিক্ষণীয় কী? আমরা বুঝতে পারি কেন ইসলাম আল্লাহকে দর্শন, নৃতত্ত্ব বা কোনো প্রকার তত্ত্বের বিষয়ে পরিণত করার ঘোরবিরোধী। যে কারণে আমি এর আগে উল্লেখ করেছি আল্লাহকে শুধু বস্তু বা দেশকালের অধীন সত্তার সঙ্গে তুলনা করা ইসলামের চোখে শেরেকি- একইভাবে কোনো দার্শনিক, নৃতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক সত্তার সঙ্গে তুলনাও শেরেকি। ‘শিরক’ বা ‘শেরেকি’ ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করবার নির্ধারক চাবিকাঠি। শেরেকির প্রশ্ন বাদ দিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে কোনো আলোচনা ইসলামের জন্য আদৌ সরাসরি প্রাসঙ্গিক নয়। জার্মান দর্শনকে নজির হিসাবে রেখে আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে খ্রিষ্টীয় চিন্তার মধ্যে খ্রিষ্টীয় আল্লাহর ব্যাখ্যা মানবেতিহাসে চিন্তার বিকাশে কোথায় কিভাবে ভূমিকা রেখেছে সেটা বোঝা। এটাও উপলব্ধি করা তারপরও সেটা ঘটছে ইসলামের দিক থেকে একান্তই প্রাক-ইসলামি চিন্তার পরিমণ্ডলে। খ্রিষ্টীয় বা ইহুদি ধর্মের মধ্যে আল্লাহর ধারণা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে কিন্তু ইসলাম যে গায়েবকে উপাস্য মনে করে সেই গায়েবের আলোচনা এটা নয়। কিন্তু ইসলামি দর্শন নিয়ে আমরা যা আলোচনা করি তা অধিকাংশ সময়ই ইহুদি বা খ্রিষ্টীয় চিন্তারই নামান্তর। চিন্তার বিষয় হিসাবে পর্যবসিত ‘আল্লাহ’-সংক্রান্ত আলোচনার সীমা স্পষ্ট না হলে মানুষের জন্য একমাত্র গায়েবই উপাস্য- ইসলামের এ ঘোষণার দার্শনিক তাৎপর্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে না। কারণ এই ‘গায়েব’ কথাটার অর্থ শুধু অদৃশ্য নয়, মানুষের বুদ্ধি বা চিন্তার পরিমণ্ডলেও যাকে দৃশ্যমান করা যায় না। দৃশ্যমান করা সম্ভব এই অনুমান যারা করেন তারা ইসলামের ‘গায়েব’ নিয়ে আলোচনা করেন না। আসলে করেন প্রাক-ইসলামি চিন্তার বিষয় হিসাবে ‘আল্লাহ’ নামক নামচিহ্ন নিয়ে। 
এই দিকটা আমরা মনে রাখব। যাতে আগামী আলোচনার সূত্র বুঝতে পারি। শেষে মনে করিয়ে দিচ্ছি ইসলাম মানুষকে জন্মসূত্রে পাপী- এ ধরনের কোনো অনুমান করে না। খ্রিষ্টীয় চিন্তার পরিমণ্ডলে মানুষের দিব্যসত্তার নৃতাত্ত্বিক বিচার ইসলামের দিক থেকে ভিন্ন হবে, বলাই বাহুল্য। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ মাত্রই দিব্যগুণসম্পন্ন, কারণ মানুষ আল্লাহর খলিফা। তার দিব্যগুণের নিশ্চয়তা সে খোদ আল্লাহর কাছ থেকেই পেয়ে এসেছে। ফলে ইসলামে নিজের দিব্যসত্তাকে নিজের কাছ থেকে বিযুক্তির তর্ক ইন্টারেস্টিং কিন্তু সরাসরি প্রাসঙ্গিক ততটুকুও যতটুকু পাশ্চাত্য দর্শন বুঝতে আমাদের সুবিধা হয়। 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ৫ আশ্বিন ১৪২২। শ্যামলী। 

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

দ্বান্দ্বিক চিন্তার পর্যালোচনা ধর্মের পর্যালোচনা ও বাংলাদেশে ইসলাম-৮

ফয়েরবাখ সম্পর্কে তরুণ কার্ল মার্কসের মূল্যায়নের মূল ভারকেন্দ্র হচ্ছে ফয়েরবাখের হেগেল পর্যালোচনা। বিশেষত ফয়েরবাখ যেভাবে হেগেলের ডায়ালেক্টিস বা তথাকথিত দ্বান্দ্বিক চিন্তার পর্যালোচনা করেছেন। তরুণ মার্কস ফয়েরবাখের এই দিকটাকেই সবচেয়ে দুর্দান্ত গণ্য করেছিলেন। ফয়েরবাখের বিশেষ প্রশংসাও এই জন্যই। মার্কস বলছেন, “ফয়েরবাখই একমাত্র মানুষ হেগেলের দ্বান্দ্বিক চিন্তার পদ্ধতির (ডায়ালেকটিকস) প্রতি যাঁর খুব সিরিয়াস আর পর্যালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গী ছিল এবং যিনি এই ক্ষেত্রে মৌলিক আবিষ্কার করেছেন। তিনিই আসলে পুরা দর্শনের দিক থেকে সত্যিকারের বিজয়ী বীর। অন্যদের (হেগেল) বিরোধিতার তুলনায় দর্শনে তাঁর অর্জনের পরিধি এবং নিজের বক্তব্য কোন ভান ছাড়া পেশ করবার ক্ষমতার রীতি এতোই বিপরীত যে রীতিমতো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়”। 

মার্কসের আমলে ইয়ং হেগেলিয়ানরা হেগেলের পর্যালোচনার নামে বাগাড়ম্বর কম করে নি। কিন্তু যতোই বাগাড়ম্বর করুক হেগেলের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একমাত্র ফয়েরবাখই সত্যিকার অর্থে চিন্তার জগতে নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করেছেন। ফয়েরবাখের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে তিনি যা কিছু লিখেছেন সেখানে কোন বাড়তি বা বিরক্তিকর দার্শনিক ভান ছিল না। তিনি সহজে তাঁর কথা হাজির করেছেন। ফয়েরবাখ সম্পর্কে তরুণ মার্কসের এই মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের যাঁরা মার্কসের অনুরাগী আশা করব তাঁরা অবশ্যই ফয়েরবাখ সম্পর্কে মার্কসের এই মূল্যায়নের প্রতি মনোযোগী হবেন। 

যারা মার্কসের অনুসারী কিম্বা অনুরাগী এবং নিজেদের মার্কসের চিন্তার ধারাবাহিকতা মেনে কমিউনিস্ট মনে করেন তাঁরা সাধারণত শিখেছেন যে মার্কস হেগেলের কাছ থেকে দ্বান্দ্বিক চিন্তা পদ্ধতি শিখেছেন আর ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ আর ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ নামে এঙ্গেলস যা শিখিয়েছেন সেটা হেগেলের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে মার্কসের বের করে আনা দার্শনিক সারপদার্থ। মার্কসের অনুমোদিত সারকথাই তারা এইসব পরিভাষার মধ্য দিয়ে তারা শিখছেন। আসলে এই অনুমান বা দাবি ঠিক নয়। মার্কস এ ধরনের কোন পরিভাষা ব্যবহার করেন নি। এই পরিভাষাগুলোর উৎপত্তি ঘটেছে জোসেফ দিয়েৎসন, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, জর্জ প্রেখানভ ও জোসেফ স্টালিনের পরম্পরায়। মার্কস যাকে ‘ইতিহাসের বৈষয়িক ব্যাখ্যা’ বলতেন সেটাই তাঁর মৃত্যুর পরে তার নামে ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ নাম ধারণ করল। তাতে অসুবিধা নাই। কিন্তু এই নামের আড়ালে এমন এক পরিভাষাসর্বস্ব এমন সব ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠল যার ধারে কাছেও মার্কস নাই। মার্কসের ধারণার সঙ্গে যা মেলে না। মুশকিলটা শুধু অমিলের জন্য নয়। হেগেলের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে ফয়েরবাখ হেগেলের লজিক ও ইতিহাস ধারণার যে পর্যালোচনা করেছিলেন এবং সেই পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে চিন্তার পরিম লের যে আবিষ্কার ঘটেছিল তা একদমই আড়াল হয়ে গেল। মার্কসের বৈপ্লবিক চিন্তার বিপর্যয়টা ঘটে গিয়েছিল এখানেই। কিন্তু সেটা ধরা পড়তে পড়তে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, এবং চিন পুঁজিতন্ত্রের পথ ধরেই শুধু ক্ষান্ত হোল না, গত কয়েক দশকের মধ্যে চিনীখন বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম নেতা। কথাটির ওপর জোর দিচ্ছি এ কারণে যে চিন্তার আবিষ্কার, বিচ্যুতি, বিপর্যয় এবং তার সীমা ও সম্ভাবনার সঙ্গে ইতিহাসের যোগ নিবিড়। চিন্তার অক্ষমতা কিম্বা তার আবিষ্কারের ক্ষেত্রগুলো চিনবার ব্যর্থতা উপেক্ষা করার সুযোগ নাই। 

হেগেলের যে পর্যালোচনা ফয়েরবাখ করেছেন তরুণ মার্কস তার তাৎপর্য বুঝে গিয়েছিলেন। তার মানে ফয়েরবাখের পর্যালোচনার প্রতি তার সম্মতি ছিল পুরা মাত্রায়। কিন্তু মার্কস ফয়েরবাখে থেমে থাকেন নি। তিনি পালটা আবার ফয়েরবাখের সমালোচনা করেই নিজের পথ নির্ণয় করেছিলেন। তাহলে মার্কসকে বুঝতে হলে পর্যালোচনার দুটো ধাপ আমাদের পেরিয়ে আসতে হবে। এক. ফয়েরবাখের হেগেল পর্যালোচনা আর দুই. মার্কসের ফয়েরবাখ পর্যালোচনা। যেহেতু ফয়েরবাখ খুব বেশি উপেক্ষিত সে কারণে আমরা ফয়েরবাখের ওপর বিশেষ ভাবে জোর দিচ্ছি। আমরা এখন মার্কসের চোখ দিয়ে ফয়েরবাখ পড়ার কিছু সূত্র চিহ্নিত করবো।ফয়েরবাখের মহান অর্জনগুলো কি? মার্কসের ভাষ্যেই শোনা যাক। মার্কস বলছেন, 

“ফয়েরবাখের মহান অর্জনগুলো হচ্ছে :

১. এটা প্রমাণ করা যে দর্শন আর কিছুই না, ধর্মকে চিন্তায় পর্যবসিত করা এবং চিন্তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা; অর্থাৎ অন্য রূপে বা অন্য আরেক ধরণে নিজের কাছ থেকে নিজে অপর হয়ে গিয়ে মানুষের (বংঃৎধহমবসবহঃ) অস্তিত্ব যাপন, অতএব এও নিন্দনীয়;

২. ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের’ সামাজিক সম্পর্ককে প্রধান তাত্ত্বিক ভিত্তি ধরে ‘সত্যিকারের বস্তুবাদ’ এবং ‘আসল বিজ্ঞান’ প্রতিষ্ঠা করা

৩. নেতির নেতিকরণের বিরোধিতা, যে বিরোধিতার মধ্য দিয়ে চিন্তার নির্ণয়কে পরম গণ্য করা হয়, যে পরম নিজেই নিজের নির্ণায়ক, যার ইতিবাচকতা সে নিজে”। .
ফয়েরবাখ সম্পর্কে ওপরে মার্কসের প্রথম দুই মূল্যায়ন তৃতীয় পয়েন্টের তুলনায় সহজ। তৃতীয়টি হেগেলের ‘পরম’ বা তার ‘এবসলিউট স্পিরিট’-এর পর্যালোচনা। ফয়েরবাখ যে ধারণাকে নাকচ করেছেন। ফয়েরবাখের নাস্তিকতাটা এখানে ধর্মের ঈশ্বর আর দর্শনের পরম উভয়কেই ফয়েরবাখ নাকচ করে দিয়েছেন। ফয়েরবাখীয় নাস্তিকতা যে কারণে বিশ্বাসীদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধরণের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। যে চ্যালেঞ্জের যথাযথ উত্তর আমাদের হাজির করতে হবে। যারা মনে করেন স্রেফ ধর্মীয় বিশ্বাসের তাকত বা শুধি ইমান বা বিশ্বাসের জোরে তারা তা মোকাবিলা করবেন, দর্শনে সেই সংকল্পের প্রতি বিনয় ও শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু দার্শনিক লড়াইয়ের জগতে তার মূল্য সামান্য। 

হেগেলের লজিক ও এবসলিউট স্পিরিট নিয়ে আলোচনার আগে এই বিষয়ে ফয়েরবাখ-হেগেল-মার্কসের তর্ক বোঝা যাবে না। দৈনিক পত্রিকার পাঠকের সুবিধার জন্য আমরা যথা সম্ভব আলোচনার লখুবই প্রাথমিক স্তরে থাকতে চাইছি, যাতে বিষয়ের গুরুত্ব নিদেন পক্ষে তাঁরা উপলব্ধি করতে পারেন। আমরা ফয়েরবাখ সম্পর্কে মার্কসের ওপরের এই মূল্যায়নকে আমাদের পরবর্তী লেখার অভিমুখ হিসাবে সামনে রাখছি। এতে গুছিয়ে চিন্তা করার ও আলোচনার সুবিধা। প্রথম পয়েন্ট আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ আমরা একথা বলেই শুরু করেছি ধর্মের বিষয় আর দর্শনের বিষয় একই, পার্থক্য শুধু রূপে আমরা হেগেলীয় দাবির প্রতি সায় জানিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু করেছি। কিন্তু মার্কস যখন বলেন দর্শন আসলে ধর্মকে চিন্তার বিষয়ে পর্যবসিত করে মাত্র, আর তিনি ফয়েরবাখের এই পর্যালোচনাকে ফয়েরবাখের অর্জন মনে করছেন তখন কী অর্থে মার্কস কথাটা বলছেন সেটা ব্যাখ্যর দাবি রাখে। আশা করি আগামি আলোচনাগুলোতে আমরা তা পরিষ্কার করতে পারব। 

দ্বিতীয় পয়েন্ট তুলনামূলক ভাবে সহজ আর স্পষ্ট। ফয়েরবাখ ‘সত্যিকারের বস্তুবাদ’ আর ‘আসল বিজ্ঞান’ কায়েম করেছেন। দুটো শব্দের ওপর গুরুত্বারোপ মার্কসের। এই মন্তব্যে আমরা বুঝতে পারি ‘বস্তুবাদ’ মাত্রই সত্য মার্কস তা মনে করেন না। তার মধ্যে ফারাক আছে। সত্যিকারের বস্তুবাদের বাইরে ‘মিথ্যা বস্তুবাদ’ তাহলে আছে। শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে নিজেকে বস্তুবাদী বললেই কেউ নিজেকে মার্কসবাদী বা মার্কসের অনুসারী বলতে পারে না। ফয়েরবাখ যে অর্থে বস্তুবাদ বুঝছেন সেই ‘আসল’ অর্থে স্বঘোষিত বস্তুবাদী বস্তুকে বুঝেছে কিনা সেটাই হচ্ছে মূল তর্কের বিষয়। ফয়েরবাখের বস্তুবাদী অর্জন বুঝতে হলে তাঁকে পাঠের কোন বিকল্প নাই। এই ক্ষেত্রে মার্কসের মুখে ঝাল খাবার বিশেষ সার্থকতা নাই। তবে মার্কসের মূল্যায়ন ফয়েরবাখের প্রতি আমাদের আগ্রহকে শাণিত করে। সন্দেহ নাই। 

‘আসল বিজ্ঞান’ বা রিয়েল সায়েন্স কথাটা এখানে এসেছে হেগেলের ‘বিজ্ঞান’ ধারণার বিপরীতে। অর্থাৎ সায়েন্স অফ লজিকে হেগেল চিন্তার যে বিজ্ঞান পেশ করেছেন বুদ্ধির পরিম লে সীমিত ও সংকীর্ণ পরিম লের বাইরে সেই বিজ্ঞানকে কিভাবে বাস্তবের ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনার পদ্ধতি হিসাবে হাজির করা যায় মার্কসের ইঙ্গিত সেই দিকে। বিজ্ঞান বলতে 
আমরা যা বুঝি সেই প্রকৃতি বিজ্ঞান নিয়ে কথা হচ্ছে না। হেগেল দর্শনকে যেভাবে ‘বিজ্ঞানের বিজ্ঞান’ হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন তার বিপরীতে হেগেলের পরে ফয়েরবাখের ‘আসল বিজ্ঞান’কে মার্কস দর্শনের সত্যিকারের অর্জন বলেছেন। অর্থাৎ হেগেলের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে হেগেলের চিন্তার পদ্ধতি ও চরিত্রে ফয়েরবাখ যে রূপান্তর ঘটিয়ে দিয়েছেন মার্কস সেই বিজ্ঞানের দিকেই ইঙ্গিত করছেন। 

দুই নম্বর পয়েন্ট নিয়ে এটা হোল মার্কসের মূল্যায়নের বাইরের দিক। এখানে নির্ধারক এবং মৌলিক ধারণা অন্যত্র। সেটা সতর্ক ভাবে লক্ষ্য করা দরকার। সেটা হচ্ছে এই যে ফয়েরবাখ ‘সত্যিকারের বস্তুবাদ’ বা ‘আসল বিজ্ঞান’ আবিষ্কার করেছেন ঠিকই কিন্তু তার ভিত্তি হচ্ছে ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক’। মার্কসের এই কথার গভীর তাৎপর্য হঠাৎ ধরা যাবে না। কিন্তু তারপরও যারা বস্তুবাদ সম্পর্কে নিজ নিজ মনগড়া ধারণার জায়গা থেকে ভাবতে অভ্যস্ত তাদের একটু চমকাবার কথা। মার্কস যে বস্তুবাদের জন্য ফয়েরবাখকে তারিফ করছেন তার ভিত্তি তথাকথিত ‘বস্তু’ না। ঠিক, ‘বস্তু’ নামক কোন পরাবিদ্যামূলক ধারণা না। বরং ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের’ সামাজিক সম্পর্ক। এটা নতুন কথা। বস্তুবাদ নামক যে প্রভাবশালী ধারণা বাংলাদেশে মার্কসের নামে চালু আছে সেখানে দাবি করা হয় জগত ‘বস্তু’ দিয়ে তৈরি। চেতনার উৎপত্তি ঘটেছে বস্তুর বিকাশের ফলে। বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বস্তু জটিল হয়ে উঠলে কোন এক মিস্টেরিয়াস কারণে বস্তুর মধ্যে প্রাণের উদ্ভব ঘটে। প্রাণ বা চেতনা হোল বস্তুরই বিকশিত রূপ। ফয়েরবাখ বা মার্কসের মধ্যে বস্তু সম্পর্কে এরকম কোন মিস্টিকাল কিম্বা মিস্টিরিয়াস ধারণা পাওয়া যাবে না। এটা সহজেই বুঝব যদি মার্ক্সের কথাটা বুঝি। বস্তুবাদের ভিত্তি হচ্ছে থেকে মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক। মানুষের বাইরে ‘বস্তু’ নামক কোন পরাবিদ্যামূলক ধারণা নয়। ফয়েরবাখের কাছ থেকে মার্কস বস্তুবাদের এই ধারণা পেয়েছেন। ফয়েরবাখ সম্পর্কে মার্কস যে মূল্যায়ন করেছেন তার কিছু ব্যাখ্যা মার্কস করেছেন। আমরা তরুণ মার্কসের কাছ থেকে ফয়েরবাখের পর্যালোচনা আরো একটু গভীরে গিয়ে ভালো করে বুঝতে চাই। কিন্তু সেটা পরের কোন একটি কিস্তিতে। এখানে হেগেলের তথাকথিত ‘দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি’র প্রতি তরুণ মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে কিছু কথা বলে রাখা দরকার, নইলে দার্শনিক তর্কের কোন? সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মার্কস ফয়েরবাখ সম্পর্কে এই মূল্যায়ন করছেন আমরা ধরতে পারব না। হেগেল জর্মন দর্শনের এক মস্তো মহীরূহের মতো। তাঁর আবির্ভাবের পর চিন্তার যে মানচিত্র তৈরি হয়েছিল তার পুনর্লিখন ছিল কঠিন ব্যাপার। দার্শনিক পর্যালোচনার যে ধারা তৈরি করেছিলেন তরুণ জার্মান দার্শনিকরা তাঁর পদ্ধতি ধার নিয়েই তাঁর চিন্তার পর্যালোচনা শুরু করে। এই ধারা থেকেই ইয়ং হেগেলিয়ানদের আবির্ভাব। মার্কসের নিজের উদ্ভবও হেগেলের চিন্তার পরিম লে। কিন্তু হেগেলের চিন্তার পর্যালোচনা যেসকল জার্মান দার্শনিক করছিলেন তাদের প্রতি মার্কসের প্রধান সমালোচনা ছিল এই যে তারা জর্মন দর্শনের ধারাবাহিক অতীত নিয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার একটা বিশেষ চরিত্র ছিল, মার্কসের আপত্তি ছিল সেখানে। জর্মন দার্শনিকরা তাদের অতীত চিন্তার ধারাবাহিকতা নিয়ে এতোই ব্যস্ত ছিলেন যে তারা মগ্ন হয়ে থাকতেন দর্শনের বিষয়ে, দর্শনের পদ্ধতিতে নয়। ধর্ম বলি, দর্শন বলি কি চিন্তা বলি পর্যালোচনা মানে শুধু বিষয়ের পর্যালোচনা না। একই সঙ্গে পদ্ধতিরও পর্যালোচনা। আমরা যখন চিন্তা করি ও চিন্তার ভিত্তিতে কোন না কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাই তখন চিন্তার শক্তি বা দুর্বলতা বুঝতে চাইলে যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি শুধু তার ওপর নিবিষ্ট থাকলে চলে না। কিভাবে বা কি পদ্ধতিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছি তার বিচার জরুরি হয়ে পড়ে। জর্মন দার্শনিকরা ধর্ম ও দর্শনের বিষয় নিয়ে মগ্ন ছিলেন, কিন্তু পদ্ধতির বিচারে অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন। ফয়েরবাখ বিষয় নিয়ে নয়, আঘাত করলেন চিন্তার পদ্ধতির জায়গায়। মার্কস ফয়েরবাখের এই দিকটার প্রতি বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মার্কস বুঝে গিয়েছিলেন হেগেলের ডায়ালেক্টিক্সের যে পর্যালোচনা হেগেল করেছেন তা হেগেলের চিন্তার গোড়াতেই মস্তো এক ঝাঁকুনি দিয়েছে। অন্যান্য জার্মান দার্শনিকদের তুলনায় এখানেই হেগেলের অর্জন সুস্পষ্ট। 

এই দিকটা আরো একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ বয়সে হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির সমালোচনা ক্ষেত্রে ফয়েরবাখ যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, মার্কস তার প্রতি দারুণ ভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর সেসময়ের লেখালেখি, দার্শনিক পর্যালোচনা এমনকি অর্থশাস্ত্র বিষয়ক রচনাগুলোতে ফয়েরবাখীয় পদ্ধতির ছাপ স্পষ্ট। ফলে এটা বোঝা দরকার এখানে 
একটা পদ্ধতির বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল। এটা বিশেষ ভাবে বলা দরকার এ কারণে যে থিসিস-এন্টিথিসিস-সিনথেসিস মার্কা যে চিন্তার ফর্মুলা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী পদ্ধতি বলে প্রচার রয়েছে তার সঙ্গে মার্কসের সম্পর্ক অতিশয় ক্ষীণ। মার্কসের পদ্ধতি বুঝতে হলে হেগেলের চিন্তার পদ্ধতি যেমন বোঝা দরকার, একই সঙ্গে ফয়েরবাখ কিভাবে সেই পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন সেই দিকটাও সতর্ক ও সনিষ্ঠ ভাবে বোঝা দরকার। ফয়েরবাখের চিন্তার পর্যালোচনা করতে গিয়ে মার্কসের প্রস্তাবনা হচ্ছে দর্শনকে শুধু চিন্তার বিষয়ের প্রতি মনোযোগী কিম্বা পর্যালোচনামূলক হলে চলবে না। একই সঙ্গে পদ্ধতির প্রতিও কট্টর পর্যালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গী থাকতে হবে। তার সমসাময়িক জর্মন দার্শনিকদের সীমাবদ্ধতা এখানেই ধরা পড়ত। মার্কস বলছেন, পদ্ধতিকে আপাত দৃষ্টিতে ফর্মাল বা নিছকই প্রাকরণিক মনে হলেও, পদ্ধতির তর্ক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ তর্ক। দর্শনের প্রাণকেন্দ্র এখানে। তাহলে তাঁর সময়কালে দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে : ‘হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির সঙ্গে আমরা এখন ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?’ আধুনিক পর্যালোচনার ধারার সঙ্গে হেগেলের দর্শনের সম্পর্ক বিচারের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে ‘সম্পূর্ণ অসচেতনতা’ সম্পর্কে মার্কস ছিলেন সোচ্চার। এই অসচেতনতার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি সেই সময়ের দুই দার্শনিক ডেভিড স্ট্রাউস ও ব্রুনো বাউয়েরের দার্শনিক সীমাবদ্ধতার আলোচনা করেছিলেন। ফয়েরবাখ ছিলেন ব্যতিক্রম। আর সেই ব্যাতিক্রমটা দ্বান্দ্বিক চিন্তার পদ্ধতির সমালোচনায়, দর্শনের বিষয়ে শুধু নয়, দর্শনের পদ্ধতি বিচারের প্রতিভায়। 

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫। ২৯ ভাদ্র ১৪২২। শ্যামলী। 

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

হজরত সোলায়মান ও ফয়েরবাখ ধর্মের পর্যালোচনা ও বাংলাদেশে ইসলাম-৭


হেগেলের দর্শনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে লুদভিগ ফয়েরবাখ তাঁর একটি লেখা জার্মান ভাবাদর্শের সঙ্গে প্রাচ্য চিন্তার ফারাক বা বৈপরীত্যের উল্লেখ করে শুরু করেছেন (দেখুন Towards A Critique of Hegel’s Philosoph)। ফয়েরবাখ শুরু করছেন এভাবে যে, জার্মান ভাবাদর্শীরা হজরত সোলায়মানের প্রজ্ঞার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন। কোন অর্থে?

হজরত সোলায়মান আ:-এর প্রজ্ঞার গল্প কমবেশি আমাদের সকলেরই জানা। দুই মহিলা একই সন্তানের মা হিসাবে নিজেদের দাবি করছে। কেউই তার মীমাংসা করতে পারছেন না। এই বিরোধের মীমাংসার জন্য তারা হজরত সোলায়মানের দরবারে হাজির। তারা তাদের নিজ নিজ দাবির পক্ষে জোরালো দাবি হাজির করল। খুব গোলমেলে মামলা। সাক্ষীসাবুদ কিম্বা আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার দ্বারা এই মামলার নিষ্পত্তি অসম্ভব। তথ্য, প্রমাণ ও যুক্তি সবকিছুই যেখানে ব্যর্থ, সেখানেই প্রজ্ঞার সার্বভৌম প্রতিভা প্রদর্শন করবার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এই প্রতিভাকে আমরা সাধারণত ‘উপস্থিত বুদ্ধি’ বলে থাকি। অর্থাৎ উপস্থিত পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য বুদ্ধির প্রচলিত নিয়ম বা অভ্যাসের বাইরে এসে সিদ্ধান্ত দেওয়া। এই অর্থেই সার্বভৌম। বুদ্ধি যখন প্রজ্ঞার চরিত্র ধারণ করে তখন তার কারবার তথ্য, প্রমাণ, সাক্ষীসাবুদ, যুক্তিতর্ক ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল নয়। তার উৎপত্তি পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের তাৎক্ষণিক কিন্তু সামগ্রিক উপলব্ধির মধ্যে। দুইজন মহিলা নিজেদের একই সন্তানের মা বলে দাবি করছে; তাদের উভয়ের পক্ষের প্রমাণ, যুক্তি, সাক্ষী সবই আছে। এটা বিশেষ এক পরিস্থিতি। দুইজন মহিলা তো একসঙ্গে মা হতে পারে না। সেটা যুক্তির কথা। কিন্তু যুক্তিটি বিশেষ পরিস্থিতিতে খাটছে না। কিভাবে তাহলে পয়গম্বর সোলায়মান তার মীমাংসা করলেন?
হজরত সোলায়মান নির্বিকার এক রায় দিলেন। যেহেতু সাক্ষীসাবুদে যুক্তিতর্কে বোঝা যাচ্ছে, দুজনেই ‘সঠিক’, তাহলে কী আর করা, শিশুটিকে ভাগ করে দুইজনকে দিয়ে দেওয়া হোক। যিনি সন্তানটির আসল মা নন, এই রায়ে তাঁকে বিশেষ বিচলিত দেখা গেল না। কিন্তু আসল মা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, আমার সন্তানের দরকার নাই। ঐ মহিলাকেই শিশুটি দিয়ে দেওয়া হোক। বলাবাহুল্য, মা কোনো ভাবেই তাঁর সন্তানকে দুই টুকরা করা হোক, তা চাইতে পারেন না। হজরত সোলায়মান নিজেও শিশুটিকে দুই টুকরা করা হোক, তা চাননি। কিন্তু ইনসাফ নিশ্চিত করার জন্য মাতৃত্বের প্রমাণ তাঁর দরকার। শিশুর জন্ম দেবার প্রমাণ কিম্বা সাক্ষীসাবুদের ওপর নির্ভর করবার উপায় এখানে অনুপস্থিত। আগাম অনুমান করলেন, যিনি আসলেই মা, তিনি কোনোভাবেই নিজের সন্তানকে দুই টুকরা হতে দেবেন না। দুই মহিলার মধ্যে কে আসল মা, তা নির্ধারণের জন্য তিনি তৎক্ষণাৎ যে কৌশল খাটালেন, সেই প্রয়োগের সাফল্যই প্রজ্ঞার রূপ বুঝতে আমাদের সাহায্য করে। হজরত সোলায়মান উপস্থিত বুদ্ধি দিয়েই নির্ধারণ করলেন, শিশুটির মা আসলে কে। এটাই ‘সোলায়মানি প্রজ্ঞা’ নামে পরিচিত। প্রাচ্যে যেমন, পাশ্চাত্যেও। এই সোলায়মানি প্রজ্ঞা সত্য নির্ণয়ের প্রচলিত পদ্ধতি যুক্তি, সাক্ষী কিম্বা তথাকথিত প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল নয়। সোলায়মানি প্রজ্ঞা আসলে প্রত্যক্ষবাদ ও যুক্তিবাদ, উভয়েরই পর্যালোচনা বটে। উভয়ের সীমা নির্ধারক। ফয়েরবাখ বলছেন, ‘জার্মান ভাবাদর্শ সোলায়মানি প্রজ্ঞার সরাসরি বিপরীত।’ অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বুঝতে ও তা বিচার করতে অক্ষম। বিভিন্ন বস্তু, বিষয় বা ঘটনার সাধারণ চরিত্র বুঝতে গিয়ে আমরা যদি তাদের বিশেষত্ব বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলি বা ভুলে যাই, তাহলে এ কারণে যে বিমূর্ত চিন্তার অভ্যাস গড়ে ওঠে, তা থেকে নিস্তার পাওয়া সহজ নয়। এই বিমূর্ত চিন্তার অভ্যাস সোলায়মানি প্রজ্ঞার সঙ্গে মেলে না। হজরত সোলায়মান জমির মালিকানার দাবি মীমাংসা করছেন না, করছেন সন্তানের মালিকানার দাবি। দুটিই মালিকানার দাবি, এটা তাদের সাধারণ দিক। কিন্তু জমি আর সন্তান এক নয়। জার্মান ভাবাদর্শীরা দর্শনকে বিমূর্ত চিন্তাচর্চার এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখানে তাদের পক্ষে বিশেষ আর সামান্যের ফারাক বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। 

সোলায়মানি প্রজ্ঞা বলতে ফয়েরবাখ আরো কিছু বুঝিয়েছেন। হজরত সোলায়মান ফয়েরবাখের কাছে প্রাচ্য চিন্তার প্রতিনিধি। এর বিপরীতে রয়েছে পাশ্চাত্যের ভাবাদর্শ, বিশেষভাবে হেগেল। এই ক্ষেত্রে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের চিন্তাপদ্ধতির পার্থক্য কী? প্রাচ্য চিন্তার দৃষ্টিতে সূর্যের নিচে বা এই দুনিয়ায় এমন কিছুই দেখা যায় না যা নতুন; বিপরীতে, পাশ্চাত্য মনে করে সূর্যের নিচে এমন কিছুই দেখবার নাই যা নতুন নয়। প্রাচ্যের মানুষ (Oriental Man) সবকিছুর মধ্যে ঐক্য আবিষ্কার করতে গিয়ে তাদের পার্থক্য বা বিভিন্নতার কথা ভুলে যায়, সবকিছুর মধ্যেই নির্বিশেষ পরম বিরাজ করেন- এই ব্রহ্মচিন্তায় নিমগ্ন থাকতে গিয়ে বিশেষকে প্রাচ্য ভুলে যায়; পরমের চিন্তায় প্রাচ্য সদাই চিন্তিত। বিপরীত দিকে, পাশ্চাত্যের মানুষ (Occidental Man) পার্থক্যের প্রতি মনোযোগী হতে গিয়ে নির্বিশেষ বা ঐক্যের ক্ষেত্রটির কথা ভুলে যায়। তাদের মধ্যে মিলের জায়গাগুলো আর ঠাহর করতে পারে না। 

ফয়েরবাখ মনে করেন, জার্মান দর্শনে শেলিং (Friedrich Wilhelm Joseph Schelling ১৭৭৬-১৮৫৪) প্রাচ্যের চিন্তার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তার ঝোঁক ছিল প্রাচ্যের দিকে। এটা জার্মান দর্শনের দিক থেকে বেশ ভিনদেশীয় প্রবণতা। জার্মান জমিতে অন্য জিনিস। কিন্তু হেগেল তার বিপরীত। তিনি পাশ্চাত্যের, কিন্তু শেলিংয়ের বিপরীতে বিচার করলে তাঁর দর্শনের মধ্যে প্রাচ্যকে হেয় করবার উপাদানও আছে। হেগেলের বিরুদ্ধে ফয়েরবাখের এই অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ধর্মবিরোধিতা কিম্বা নাস্তিকতা সত্ত্বেও সবকিছু ছাপিয়ে ফয়েরবাখ আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক হয়ে ওঠেন। জার্মান ভাবাদর্শের দিক থেকে ফয়েরবাখের হেগেল পর্যালোচনার তাৎপর্য আর প্রাচ্যের পরিমণ্ডলে, বাংলাদেশ যার বাইরে নয়, ফয়েরবাখ, ঠিক একইভাবে বিচার্য নয়। 

প্রাচ্যের পারমার্থিক ঐক্যের চিন্তার তুলনায় হেগেলের দর্শনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পার্থক্য। অর্থাৎ হেগেলের পার্থক্যের বিচার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন- প্রকৃতির বৈচিত্র্য, বিভিন্নতা ও বিভিন্ন প্রত্যক্ষ সত্তার পারস্পরিক ফারাক। কিন্তু তারপরও হেগেল তাঁর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর প্রকৃতিসংক্রান্ত দর্শন মেরুদণ্ডহীন প্রাণী আর শামুকজাতীয় জীবের পার্থক্য নির্ণয়ের অধিক অগ্রসর হতে পারেনি। এই স্তর থেকে হেগেল কীটপতঙ্গের স্তরে আমাদের নিতে পেরেছেন বটে, কিন্তু অত দূরই। হেগেল যে স্পিরিটের কথা বলেন তা অবশ্যই লজিক্যাল আর নির্ণায়ক, কিন্তু ফয়েরবাখ ঠাট্টা করে বলছেন ‘পতঙ্গসুলভও বটে’। পতঙ্গের যেমন শরীর বাঁধাছাদা না, শরীরের নানান দিক নানানভাবে ফোলা, যেন মূল শরীর থেকে কিছু কিছু অংশ বেরিয়ে আসতে চাইছে। হেগেলের দর্শনও এইরকম।

হেগেলের দর্শনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে ফয়েরবাখ এভাবেই আরম্ভ করেছেন। ফয়েরবাখের আপত্তিটা হেগেলের ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে। ফয়েরবাখ বলছেন, ‘হেগেল হচ্ছেন এমন এক স্পিরিট, যে তার বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছে এমন এক শরীর, যার মধ্যে এ দিক সে দিক বের হয়ে থাকা বিস্তর অঙ্গপ্রতঙ্গ রয়েছে, আর রয়েছে গভীর সব গর্ত আর কাটাদাগ। হেগেল যখন ইতিহাস বিবেচনা করেন, তখনই তার স্পিরিটের এই চেহারাটা ধরা পড়ে। বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন, সময় ও মানুষের মধ্যে প্রকট পার্থক্য পর্যায়ে পর্যায়ে হেগেল বিচার করেন, কিন্তু তাদের মধ্যে যা কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যা কিছু এক- তাকে তিনি উপেক্ষা করেন।’ 

ইতিহাস সম্পর্কে হেগেলের ধারণার সমালোচনা করতে গিয়ে ফয়েরবাখ বলছেন, ‘হেগেলের ধারণা ও পদ্ধতির ধরনের মধ্যে মুশকিল হচ্ছে এটা একান্তই সময়কেন্দ্রিক, সহনশীল দৈশিকতা এখানে অনুপস্থিত : তাঁর পদ্ধতি শুধু অধীনস্থকরণ ও ধারাবাহিকতা নির্ণয় করা জানে, সমন্বয় ও পাশাপাশি বসবাস জানে না। আর এটা তো নিশ্চিত যে, হেগেলের ইতিহাসের শেষ পর্যায় হচ্ছে, একটি সামগ্রিক বিকাশ, যার মধ্যে ইতিহাসের সকল পর্যায়ই অন্তর্গত। কিন্তু এই শেষ পর্যায়ের অস্তিত্বও যেহেতু কালের দ্বারা নির্ণীত, অতএব তা বিশেষের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এই পর্যায়ের মধ্যে অন্যান্য অস্তিত্বকে তাদের স্বাধীন সত্তার মজ্জা শুষে না নিয়ে এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন থেকে নিজেদের যে অর্থ তারা জ্ঞাপন করে, তা ডাকাতি করে শূন্য না করে দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না।’

হেগেলের বিরুদ্ধে ফয়েরবাখের এই পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। সারমর্মে হেগেলের ইতিহাস-ধারণা সম্পর্কে ফয়েরবাখের নিরীক্ষণ অসাধারণ। হেগেলের ইতিহাস-ধারণা সময়কেন্দ্রিক, ওর মধ্যে স্থানিকতার বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য নেই। সেই ইতিহাসে দেশ বা দৈশিকতার কোনো স্থান নেই। দেশ মানে জায়গা বা স্থান। একই জায়গায় বিচিত্র ও বিভিন্ন জিনিস একসঙ্গে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে পাশাপাশি থাকতে পারে। কিন্তু হেগেলের ইতিহাস যেহেতু সময়সর্বস্ব, অন্য দিকে সবকিছুই তিনি তার ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করেন, পর্যায়মূলক সেই অন্তর্ভুক্তির মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম বা বিষয়ের পাশাপাশি থাকবার কোনো জায়গা হেগেল রাখেননি। অতএব হেগেলের মধ্যে স্থানিক সহনশীলতা নেই। তিনি স্থানের প্রতি সংবেদনশীল বা সহনশীল নন। 

হেগেল যখন ধর্মের ইতিহাস লেখেন, তখন তিনি ধর্মের ঐতিহাসিক বিবর্তন কিভাবে ঘটেছে, তা হাজির করেন। সেটা দেখাতে গিয়ে তিনি একটি পর্যায়ের ধর্মচিন্তা কী করে তার পরবর্তী পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে তার আগের পর্যায়কে নাকচ করছে, তা দেখান। এভাবেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ধর্মকে হেগেল ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। একপর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ের বিবর্তন হিসাবে দেখালেন। তিনি দেখাতে চান মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও ভারতের বিভিন্ন ধর্ম, যেমন- জৈন, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলাম ইত্যাদি খ্রিস্ট ধর্মের তুলনায় চিন্তার ইতিহাসে আগের পর্যায়ের ধর্ম। সেটা দেখাতে গিয়ে, ধর্মগুলোকে খ্রিস্ট ধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করবার দিক থেকেই ব্যাখ্যা করেন। হেগেলীয় ইতিহাসের সিঁড়ির নিচের সিঁড়িতে তাদের স্থান। তাদের হাড়মজ্জা সেই উদ্দেশ্যেই হেগেল বের করে এনে তাকে খ্রিস্ট ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য সাজালেন। এর ফলে প্রতিটি ধর্মের যে স্বাধীন ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সত্তা ও তার তাৎপর্য রয়েছে, তা নিরর্থক হয়ে যায়। ফয়েরবাখের বক্তব্য হচ্ছে, যদি হেগেল স্থানিকতার গুরুত্ব দিতেন তাহলে তারা কিভাবে বিশেষ কালে বিশেষ অর্থ নিয়ে বিশেষ স্থানে হাজির রয়েছে তার পূর্ণ মর্ম বোঝা যেত। এখন হেগেলের সর্বগ্রাসী ইতিহাসের মধ্যে তারা খ্রিস্ট ধর্মের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের কজে ব্যবহৃত হয়েছে। 

ধর্মের ইতিহাসকে চিন্তার বিবর্তন হিসাবে বোঝার ক্ষেত্রে ফয়েরবাখের আপত্তি নাই। কিন্তু আপত্তি হচ্ছে, বিবর্তন বা বিকাশের উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হতে গিয়ে তাদের নিজের নিজের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলাকে ফয়েরবাখ মেনে নেননি। 

হেগেল দাবি করেন, প্রকৃতি যেভাবে পুরাতনকে নাকচ করে নতুনের আবির্ভাব ঘটায়, তিনি তাঁর ইতিহাসের দর্শনে সেটাই দেখিয়েছেন। হেগেল প্রকৃতির অনুকরণ করছেন। এই অনুকরণে ফয়েরবাখের আপত্তি নাই। হয়তো হেগেল তাই করছেন। কিন্তু ফয়েরবাখের নালিশ হোল, এটা করতে গিয়ে হেগেল সপ্রাণতা বিসর্জন দিচ্ছেন। জীবন তাঁর কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। মেনে নেওয়া যাক, প্রকৃতি মানুষকে জন্তুর ওপর আধিপত্য খাটানোর ক্ষমতা দিয়েছে। মানুষের হাতে জন্তু পোষ মানে। কিন্তু প্রকৃতি শুধু জন্তুকে পোষ মানাবার জন্য মানুষকে হাত দেয়নি; একই সঙ্গে চোখ আর কানও দিয়েছে যাতে জন্তুর মহিমা মানুষ উপলব্ধি করতে পারে। মানুষ যদি জন্তুর এই মহিমার দিক পর্যবেক্ষণ করতে শেখে তাহলে জীবজগতের চেয়ে মানুষ শ্রেষ্ঠ, এই দাবি মানুষ করবে না। কিন্তু হেগেলের ইতিহাসের দর্শন অনুযায়ী বিবর্তন বা ইতিহাসের সিঁড়ির শেষ বা ‘পরম’ প্রান্তে আছে মানুষ। অতএব মানুষের আগের সিঁড়ির সকল প্রাণীর জীবন চরিতার্থ হয়েছে একমাত্র মানুষের মধ্যে। হেগেলের অ্যাবসলিউট বা পরমের ধারণাও এই প্রকার ঐতিহাসিক ধারণা। চিন্তার সর্বোচ্চ বিকাশের পর্যায় হচ্ছে, চিন্তার এই পারমার্থিক পর্যায়। চিন্তার অন্যান্য মুহূর্তকে পরমের বেদিতে বলি দিয়ে হেগেল এই বিভিন্ন চিন্তার নিজস্ব বা স্বাধীন বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করেছেন, এমনকি হেয় করেছেন। অন্য সকল ধর্মচিন্তা খ্রিস্ট ধর্মের আবির্ভাবের পরে নিম্ন পর্যায়ে পরিণত হয়েছে, এই দাবি অন্য ধর্মকে হেয় করা অবশ্যই। 

ফয়েরবাখ বলছেন, শিল্পকলার প্রতি মানুষের আকর্ষণ আরেকটি উদাহরণ। আমরা জন্তুকে মাল টানাটানিতে কিম্বা অন্য কোনো পরিশ্রমের কাজে খাটাই। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের ছবিও আঁকি; ঘোড়া, খরগোশ, সিংহ, ইত্যাদি। শিল্পের চোখ দিয়ে আমরা যখন জীবজগৎকে দেখি, তখন তার সংবেদনা গরুকে গাড়ি টানবার কাজে ব্যবহার করার চেয়ে আলাদা। ফয়েরবাখ প্রশ্ন তুলেছেন ঈশপের গল্পে প্রাণীগুলো শিশুদের সঙ্গে কথা বলে, তাতেই বোঝা যায় প্রাণীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ধরণ স্রেফ বিবর্তনের ইতিহাসে পর্যবসিত করা যাবে না। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি, কিন্তু নিজেদের পোষা প্রাণীর ওপর আস্থা তো কমে না। 

তাহলে জীবজগৎকে বিবর্তনের সিঁড়ির নিচের সিঁড়িতে রাখবার যে বিবর্তনমূলক, ঐতিহাসিক কিম্বা সময়কেন্দ্রিক চিন্তা, তার বাইরেও প্রকৃতি মানুষকে ভিন্ন সংবেদনা চর্চার ক্ষমতা দিয়েছে। হেগেল ‘পরম’কে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বুদ্ধি বা বিশুদ্ধ চিন্তাশীলতার বাইরে মানুষের অপরাপর সংবেদনাকে যেভাবে উপেক্ষা করেছেন বা এড়িয়ে গিয়েছেন, ফয়েরবাখ তা মানতে রাজি নন। হেগেল প্রকৃতির প্রাকৃতিকতারই অনুকরণ করছেন, হেগেলের এই দাবিও ফয়েরবাখ নাকচ করে দিয়েছেন। কারণ, তিনি প্রকৃতিকে, অর্থাৎ প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতাকে একপেশেভাবে বুঝেছেন। ‘প্রকৃতি’, ফয়েরবাখ বলছেন, ‘সততই সময়ের রাজতান্ত্রিক প্রবণতার সঙ্গে দৈশিকতার ঔদার্যকে মেশায়।’ 

‘প্রকৃতি সততই সময়ের রাজতান্ত্রিক প্রবণতার সঙ্গে দৈশিকতার ঔদার্যকে মেশায়।’ ফয়েরবাখের এই মন্তব্যটি দারুণ। প্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা তো আসলেই দেখি, ফুল পাতাকে নাকচ করছে। অর্থাৎ পাতার যদি কোনো সত্য থাকে তাহলে তার পরমার্থ ফুলে, ফুল ফোটানোর আনন্দে, এটাই হেগেল বলেছেন। ফয়েরবাখ তা অস্বীকার করছেন না। সেটা সময়ের দিক থেকে বিবেচনা। অর্থাৎ সময়মতো ফুলগাছে ফুল না ফুটলে গাছেরই বা সার্থকতা কোথায়? যদি আমরা সময় বা ইতিহাসকেই বিচারের মানদণ্ড ধরি, তাহলে সময়কেন্দ্রিক চিন্তা আমাদের এই সিদ্ধান্তেই নেবে। কিন্তু ফয়েরবাখ বলছেন, সেই বিচার অসম্পূর্ণ। কারণ, আমরা পর্যালোচনার মানদণ্ড থেকে দেশ, জায়গা বা স্থানকে বাদ দিচ্ছি। যেখানে একই সময় কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন বস্তু বা বিষয় বিরাজ করতে পারে। ফুলের উদাহরণই দেয়া যাক। যদি গাছে শুধু ‘ফুল’ থাকত আর পাতা সব পড়ে যেত, সেই ন্যাংটা গাছকে কি আমরা আর গাছ বলতাম? গাছ তো ফুলের পাশাপাশি পাতাকে ধারণ করেই গাছ হয়েছে। কিম্বা ফুল ফোটার পর আর কিছু নাই, মাটিতে পড়ে আছে এক বিশাল ফুল। আমরা গাছ, ফুল, পাতাকে এভাবে দেখি বা উপলব্ধি করি। একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা দখল করে গাছ, ফুল, পাতা, কাণ্ড ইত্যাদি অবশ্যই বিরাজ করতে পারে। দেশ, স্থান বা জায়গার উদারতা বিশাল; সময়ের মতো দেশ বা দৈশিকতার আচরণ রাজতান্ত্রিক বা রাজসিক নয়। তাহলে এটা ঠিক নয় যে, পাতার পরমার্থ কিম্বা গাছের পরমার্থ শুধু ফুল। হেগেলের দার্শনিক চিন্তা ও ইতিহাস সময়-কেন্দ্রিক ধারণার দ্বারা প্রকটভাবে প্রভাবিত বলে ফুলের স্থানে পাতা বা গাছের কথা তিনি আর মনে রাখেন না। হেগেলের চিন্তা প্রকৃতির অনুকরণ করে, অর্থাৎ প্রকৃতি তার একটি রূপ নাকচ করে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়; প্রকৃতির এই দ্বান্দ্বিকতা ফয়েরবাখের মেনে নিতে অসুবিধা নাই। মেনে নিয়েও ফয়েরবাখ স্পষ্টভাবে বলছেন, প্রকৃতির এই দ্বান্দ্বিকতার ধারণা দেশ বা দৈশিকতার কথা বেমালুম ভুলে যায়। এই ভুলে যাওয়া সময়সর্বস্ব ধারণার কুফল। অতএব, তা অসম্পূর্ণ। প্রকৃতি বা ইতিহাস বিচারের ক্ষেত্রে দেশ বা দৈশিকতার গুরুত্বের ওপর জোর দিতে হবে। আমরা শুধু সময়ে বা ইতিহাসে বাস করি না। একই সময়ে নানান বাস্তবতা, নানান জীবন ও নানান ধরণের চিন্তা নিয়েও বাস করি। হেগেলের ‘অ্যাবসলিউট’ বা পরমের ধারণা হেগেলের সময় সংক্রান্ত ধারণার সঙ্গে যুক্ত। চিন্তাপদার্থই ইতিহাসের কর্তা হয়ে নিজের স্ববিরোধ বা দ্বন্দ্ব নিজে মীমাংসা করতে করতে একদিন পরমের রূপ পরিগ্রহণ করবে, পরম বা অ্যাবসলিউট হয়ে উঠবে; যার আগে বা পরে আর কোনো সত্য থাকবে না। সেটাই হবে জগৎ ও ইতিহাসের পরমার্থ। সময়কেন্দ্রিক ইতিহাস-চিন্তার বিরুদ্ধে ফয়েরবাখের এই পর্যালোচনা তাঁর সময়ে রীতিমতো কামান দাগিয়ে দিয়েছিল। 

এখানে বলে রাখি, হেগেলের ইতিহাস কিম্বা প্রকৃতির বিবর্তনের এই সমালোচনা একই সঙ্গে অ্যাঙ্গেলসের ‘প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা’ (Dialectics of Nature) সংক্রান্ত চিন্তাপদ্ধতিরও সমালোচনা। ইতোমধ্যে দর্শনে সময়সর্বস্ব চিন্তা ও চিন্তার অভ্যাসের বিস্তর সমালোচনা ও পর্যালোচনা দর্শনে হয়েছে। কিন্তু আমরা ফয়েরবাখের ওপর বিশেষভাবে জোর দিচ্ছি এ কারণে যে, মার্কস ফয়েরবাখের কাছ থেকে চিন্তার যে সূত্রগুলো ধারণ করেছেন এবং যার মধ্য দিয়ে তাঁর নিজের চিন্তার বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটিয়েছেন, তার ভূমিকা ফয়েরবাখীয় নাস্তিকতার মধ্যে একদমই নয়, বরং ফয়েরবাখ সমাজ (দেশ), ইতিহাস (সময়) ও ইতিহাসের কর্তাশক্তি (পাত্র) নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মার্কসের চিন্তাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছিলেন এবং মার্কসের চিন্তার অভিমুখ নির্দিষ্ট করবার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছিলেন, আমরা তা বুঝতে চাই। মার্কস ‘পুঁজি’র ধারণা নির্মাণ ও পুঁজির চরিত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কিভাবে দেশ, কাল ও পাত্র নিয়ে ভেবেছেন এবং তাঁর পর্যালোচনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন, দর্শনের দিক থেকে তা বোঝা, উপলব্ধি ও পর্যালোচনা আগামি দিনের বৈপ্লবিক রাজনৈতিক কর্তব্য নির্ধারণের জন্য জরুরি। 

একই সঙ্গে আমরা দার্শনিক নাস্তিকতার গৌরব ও মহিমার দিকটির সঙ্গে বাংলাদেশে পরিচিত হতে চাই; যাতে নাস্তিকতা, মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তার নামে বাংলাদেশে ধর্ম, বিশেষত ইসলামের বিরুদ্ধে যে সঙ্ঘবদ্ধ রাজনৈতিক তৎপরতা চলছে, আমরা তা নির্দ্বিধায় মোকাবিলা করতে পারি। 



৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫। ২২ ভাদ্র ১৪২২। আরশিনগর।
www.facebook.com/farhadmazhar2009