masum khalili লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
masum khalili লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের লড়াই ও বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এশিয়ায় বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্কবাণী উচ্চারিত হচ্ছিল বেশ কিছু দিন ধরে। এর মধ্যে এই অঞ্চলের আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কে যেমন নানা ধরনের উত্থান-পতন ও উত্তেজনা লক্ষ করা যায়, তেমনিভাবে আইএস বা আলকায়েদার মতো সংবেদনশীল আঞ্চলিক জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়েও নানা কথা বলা হয়। অন্তরালে দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তান থেকে শুরু করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার পর্যন্ত সব দেশে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যায়। এই অস্থিরতা কোনো ক্ষেত্রে জাতিতাত্ত্বিক উত্তেজনাও তৈরি করছে। 
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের এই লড়াইয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে সব দেশের স্বার্থ একই সমান্তরালে অগ্রসর হয়নি। তবে মোটা দাগের দু’টি ধারার একটির শীর্ষে রয়েছে চীন আর অন্যটির পুরোধা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সাথে প্রভাব বিস্তারের এই সমীকরণে রাশিয়াকে দেখা যায় এক কাতারে। অন্য দিকে, আমেরিকা ও ভারতকে প্রভাব বিস্তারের এ লড়াইয়ে অভিন্ন সমীকরণে অগ্রসর হতে দেখা যায়। তবে এর পরও প্রতিটি দেশকেই পরস্পরের সাথে কমপার্টমেন্টাল বা নিজস্ব স্বার্থকেন্দ্রিক সম্পর্ক বজায় রাখতে দেখা যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক ক্ষুদ্র দেশগুলোর কোনো কোনোটিকে বৃহৎ শক্তির ক্ষমতার আড়ালে নিজস্ব নিরাপত্তা অন্বেষণ করতে দেখা যায়। আবার দু-একটি দেশ একক দিকে ঝুঁকে না পড়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণকে তাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল মনে করে। এ সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে নেতৃত্বের দক্ষতা ও দূরদৃষ্টির ওপর নির্ভর করে কতটা ভারসাম্য তাদের পক্ষে রক্ষা সম্ভব হচ্ছে ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোতে গত দুই দশক ধরে সবচেয়ে প্রভাব ও দাপটের সাথে আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। এ ক্ষেত্রে মনমোহন সিংয়ের খানিকটা দুর্বলচিত্ত শাসনের দশকের পর নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ক্ষমতায় এসে নীতিকৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করে। ঐতিহ্যগতভাবে ভারত বিভাগের পর থেকে কংগ্রেসের নমনীয় সমাজতান্ত্রিক নীতি জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠী তৈরিতে দেশটিকে অগ্রণী ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করলেও আন্তর্জাতিক বলয় অনুসরণে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছাকাছি থাকে ভারত। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বের দেশে দেশে নীতিকৌশলের পরিবর্তনের এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ সময় ভারত প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ব্যাপারে রুশনির্ভরতা একেবারেই শেষ না করে সোভিয়েত প্রযুক্তি নিয়ে নিজেরা বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির প্রচেষ্টা নেয়। একই সাথে পাশ্চাত্যের কাছ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্র কেনার উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে ইসরাইলের সাথে ভারতের বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠায় এই ইহুদি দেশটির কাছ থেকে গোয়েন্দা সামগ্রীসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমরাস্ত্র কেনে নয়া দিল্লি। এটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে।

স্নায়ুযুদ্ধকালে দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৈরী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথমটি সোভিয়েত ও শেষোক্তটি আমেরিকান বলয়ে ছিল। স্নায়ুযুদ্ধের পর আমেরিকা ও ভারত উভয়েই একে অপরের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ইউপিএ শাসনের এক দশকে এ ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়। মার্কিন-ভারত পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মোড়ল হিসেবে আমেরিকা স্বীকৃতি দেয় ভারতকে। এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র দেশগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে নিবৃত্ত হয়।

আমেরিকান নীতিপ্রণেতারা মনে করতে থাকেন, এশিয়ায় চীনা উত্থান ও প্রভাব বিস্তারকে ঠেকাতে হলে ভারত-চীন বিরোধকে চাঙ্গা রাখতে হবে। একই সাথে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে ভারতকে সহযোগিতা এবং সাহায্য দিতে হবে। ভারতের নিজস্ব স্বার্থে ছাড় না দেয়ার এক ধরনের মানসিকতার কারণে ইউপিএ জমানায় ভারত-মার্কিন কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণ প্রচেষ্টা আশানুরূপ আগায়নি। আমেরিকা বিজেপিকে ক্ষমতায় আসতে সহযোগিতা করে আশা করে যে দেশটির লক্ষ অর্জনে বিজেপি সরকার সাহায্য করতে পারবে। বিজেপি শাসনের এক বছরের বেশি সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ওবামা-মোদি একাধিক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ অঙ্গীকারের বিষয় প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু চুক্তিও সম্পাদিত হয়।

ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এশিয়ায় ভারত-মার্কিন বলয় সৃষ্টির ব্যাপারে যতটা আগ্রহী, ততটা সমর্থন ক্ষমতাসীনেরা সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পাচ্ছে বলে মনে হয় না। এর মধ্যেও দুই দেশের সম্পর্কে বেশ অগ্রগতি হচ্ছে। মোদি ক্ষমতায় আসার পর কিছুটা সময় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদের আমলা পরিবর্তন করেছেন। মোদিকে অবশ্য পররাষ্ট্র সম্পর্কের কৌশলগত মিত্র পরিবর্তন করতে গিয়ে প্রতিরক্ষার বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। আমেরিকার সাথে বড় রকমের প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদনের পর রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এর পর রাশিয়া ভারতের প্রধান প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে এমন অত্যাধুনিক অস্ত্র সম্ভার দেয়, যা আগে কোনো মিত্র দেশও পায়নি। মোদি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক অধিক ঘনিষ্ঠ করেও এ কারণে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছেন। যেটি অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে সম্ভব হয়ে উঠছে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত কখনো পাকিস্তানের রাজনীতি পরিবর্তন করার পর্যায়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেনি। দুটি দেশের মধ্যে জন্মকাল থেকে দুই দফা বড় যুদ্ধ এবং মাঝে মধ্যে সঙ্ঘাত লেগে থাকায় ভারত আস্থা অর্জনের সম্পর্ক কখনো তৈরি করতে পারেনি বৈরী প্রতিবেশী দেশটির সাথে। পাকিস্তানের সবচেয়ে উদার রাজনীতিবিদও ভারতের প্রসঙ্গ এলে ব্যতিক্রম ছাড়া কৌশলগত স্বার্থের বাইরে কথা বলতে চান না। এর একটি বড় কারণ হলো কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরে গোপন বা গোয়েন্দা তৎপরতার ওপর দুই দেশ বেশি মাত্রায় নির্ভর করেছে। পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের ধারণা, ভারত উপমহাদেশে নেহরু ডকট্রিনের অখণ্ড প্রভাববলয় সৃষ্টির নীতি থেকে সরে আসতে পারছে না। ইসলামাবাদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ভারতের সমর্থনদানে মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তান ভেঙে দেয়া। বেলুচিস্তান ও খায়বার পাখতুনখোয়ায় যে অস্থিরতা ও সহিংসতা চলছে, তার পেছনে গোপন ইন্ধন রয়েছে ভারতের। ভারতও মনে করে কাশ্মির, উত্তর-পূর্ব ভারত ও পাঞ্জাবে অস্থিরতার পেছনে পাকিস্তানের বিশেষভাবে আইএসআইর ইন্ধন সক্রিয়ভাবে কাজ করে থাকে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এই অবিশ্বাসের কারণে পাকিস্তান কৌশলগত সম্পর্ক নির্ধারণের ব্যাপারে থাকে অতিমাত্রায় সতর্ক। আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে ওঠানামা থাকলেও চীনের সাথে সবসময় আস্থার সম্পর্ক বজায় রেখেছে ইসলামাবাদ। আমেরিকা ভারতের প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ায় রাশিয়ার সাথেও সম্পর্ক উত্তোরণে মনোযোগী হয়েছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভারত উল্লেখযোগ্য কোনো কিছু করতে না পারলেও দেশকে বিভক্ত করে শক্তিহীন করার প্রচেষ্টাকে নিজস্ব কৌশলের অংশ করে নিয়েছে। বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাকামীদের সাথে গোপন যোগসূত্র তৈরি করেছে নয়া দিল্লি। এমনকি পাকিস্তানি তালেবানদের সাথেও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক থাকার বিষয়ে পাকিস্তান বিশ্ব ফোরামে বারবার প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছে। এর পাল্টা হিসেবে পাকিস্তানও চেয়েছে কাশ্মির, উত্তর-পূর্ব ভারত ও পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে এবং তাদের তৎপরতায় ইন্ধন দিতে। এই পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থায় উভয় দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যদিও এজন্য পাকিস্তানকে মূল্য দিতে হয়েছে তুলনামূলক বেশি।

শ্রীলঙ্কা হলো ভারতের এমন এক প্রতিবেশী, যে দেশটির জনসংখ্যা কম হলেও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে অপরিসীম। শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু তামিলদের সাথে রয়েছে ভারতের তামিল রাজ্যের মূল জনগোষ্ঠীর জাতিতাত্ত্বিক সম্পর্ক। উভয় গোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাসও অভিন্ন। তামিলদের সাথে এই বিশেষ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে শ্রীলঙ্কায় তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে নয়া দিল্লি। কিন্তু রাজিব গান্ধীর সময়ে এসে নয়াদিল্লি তামিলদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করতে চাইলে পরিস্থিতি ভারতের প্রতিকূলে চলে যায়। রাজিব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস ও তাদের শাসনকালে নয়াদিল্লি সরকারের সাথে তামিল আন্দোলনের স্থায়ী বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এটাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের সরকার শক্তি প্রয়োগ করে তামিল বিদ্রোহের অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়।
ভারতের সাথে এ নিয়ে শ্রীলঙ্কার সম্পর্কের টানাপড়েনে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে চীন ও পাকিস্তান বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। তামিল বিদ্রোহ দমন এবং দেশটির অবকাঠামো বিনির্মাণে এ দুই দেশের বিশেষ সহযোগিতার কারণে একান্ত নিকট প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কার রাজনীতি ও শাসন পরিচালনা ভারতের প্রভাব কমে আসে। মৈত্রিপালা সিরিসেনার কাছে রাজাপাকসের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এই বিন্যাস পাল্টে যাবে বলে ধারণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সিরিসেনা সরকার একধরনের ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। এ নীতির ফলে পাশ্চাত্য ও ভারতের সাথে কলম্বোর সম্পর্ক বেশ খানিকটা ঘনিষ্ঠ হলেও চীন-পাকিস্তানের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের অবসান ঘটেনি। খুব দ্রত এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে বলেও মনে হয় না।

দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ নেপালে প্রভূত প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত গুরুত্বের অধিকারী হলেও স্থলবেষ্টিত অবস্থা এই হিমালয়ান দেশটিকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। এই নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে নেপালের রাজা বীরেন্দ্র বিক্রম শাহ এর আগে চীনের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এ প্রচেষ্টা ফলবতী হয়নি নয়াদিল্লির প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য বাধার কারণে। রাজা বীরেন্দ্রের সপরিবারে নিহত হওয়ার পেছনে চীনের সাথে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগকে দায়ী মনে করা হয় নেপালে। এর ধারাবাহিকতায় নেপালে রাজতন্ত্রেরই অবসান হয়। কিন্তু রাজতন্ত্র বিলোপের পর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নতুন সংবিধান প্রণয়নের কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। এই প্রতিবন্ধকতার জন্য নেপালের অনেক রাজনীতিবিদ নয়া দিল্লিকে দায়ী করেন।

রাজতন্ত্রের পতনের পর দীর্ঘ সময় পার করে সম্প্রতি নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস, নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি ও মাওবাদীরা একমত হয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও অনুমোদন করে। এতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাধেসিদের স্বায়ত্তশাসন, প্রদেশ বিভাজন ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত দাবি পুরো মেনে নেয়া হয়নি। ভারত চেয়েছিল তাদের দাবি মেনেই সংবিধান গ্রহণ করা হোক। সংবিধান সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদিত হলে নেপালের ওপর অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে নয়া দিল্লি। এর ফলে সৃষ্ট দুর্দশা নেপালি রাজনীতিবিদদের মধ্যে এক ধরনের জাতীয়তাবাদী ঐক্য সৃষ্টি করে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কে পি শর্মা ওলি ভারতের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা সত্ত্বেও নতুন প্রধানমন্ত্রী হন। ভারতের অবরোধের মুখে নেপাল চীনের সাথে বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়। এভারেস্টের নিচ দিয়ে টানেল তৈরি করে চীন-নেপাল স্থল যোগযোগ প্রতিষ্ঠার চুক্তি হয়। নতুন পরিস্থিতিতে নেপালের ওপর ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসছে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ।

সর্বশেষ সার্কের সদস্য হওয়া আফগানিস্তান কৌশলগত অবস্থানের কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। দেশটির সাথে পাকিস্তান, চীন, ইরান ও মধ্য এশিয়ার সীমান্ত রয়েছে। পশতুন, উজবেক ও তাজিক এই তিন প্রধান জাতিতাত্ত্বিক ধারায় বিভক্ত আফগানিস্তান। পশতুন জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পাকিস্তানে, আরেকটি অংশ বসবাস করে আফগানিস্তানে। এটি দুই দেশের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক যেমন তৈরি করেছে তেমনিভাবে বৈরিতার কারণও হয়ে আছে। দুই দেশের সীমান্তরেখা ডুরান্ট লাইনকে অনেক পশতুনই সীমান্ত হিসেবে স্বীকার করেন না। এ সীমান্তের দুই পারের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐতিহাসিক কাল থেকে ছিল সহজ সামাজিক ও যোগাযোগের ব্যবস্থা। তালেবানদের আমেরিকা সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন এই যোগাযোগকে কঠিন করে তুলেছে। এর পরও পাকিস্তান যেখানে আফগানিস্তানের তালেবানদের সাথে গোপনে সমর্থন দেয়, সেখানে আফগানিস্তানের সরকারের সাথে তালেবান পতনের পর থেকে বিশেষ সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে নয়াদিল্লি। এমনকি পাকিস্তানের সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্রভাবে লড়াইরত পাক তালেবানদেরও গোপনে ইন্ধন দিচ্ছে ভারত। আফগানিস্তানে পাক-ভারত দুই দেশের এই স্বার্থসম্পৃক্ততা সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে দুরূহ করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের পরিস্থিতি কী অবয়ব নেয়, তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার ওপর বিশেষভাবে পড়তে পারে। সেখানে চীন-পাকিস্তান ও ভারত-আমেরিকা মোটা দাগে একই লাইনে কাজ করছে। যদিও পাক-মার্কিন একধরনের সম্পর্ক পরস্পরের স্বার্থে সবসময় বজায় থাকতে দেখা গেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ছোট দেশ হলেও ভূ-কৌশলগত কারণে মালদ্বীপের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। দেশটির ১০০ ভাগ জনসংখ্যা মুসলিম। কিন্তু পরিবেশগত কারণে ভঙ্গুর এ দেশটির কয়েক লাখ জনগোষ্ঠী জাতীয়ভাবে বড় কোনো অবকাঠামো তৈরি করতে পারেনি। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তার ওপর নির্ভর করে। মালদ্বীপের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুম একধরনের ভারসাম্য রক্ষা করতেন পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে। মোহাম্মদ নাশিদ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত দেশটির নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে বলে মনে করা হয়। একপর্যায়ে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে একাধিকবার নির্বাচন করেও নাশিদ ক্ষমতায় যেতে পারেননি। এজন্য অবশ্য তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করার জন্য ভারতকে অভিযুক্ত করেন।
মালদ্বীপে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আমিন গাইয়ুম মামুন আবদুল গাইয়ুমের জ্ঞাতি ভাই। নেপথ্যে থেকে মামুনের পরামর্শে দেশ চলছে বলে মনে করা হয়। এখানে দৃশ্যমান পরিস্থিতিতে কোনো সঙ্কট দেখা যায় না। কিন্তু নেপথ্যে রয়েছে ভারত-চীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই। অর্থনৈতিক ক্ষমতার কারণে চীন প্রভাব বিস্তারে যতটা এগিয়ে যেতে পারে, ততটা পারে না ভারত। এর পরও মালদ্বীপে ক্ষমতার উত্থান-পতন যেকোনো সময় ঘটতে পারে।

ভুটান হলো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ক্ষুদ্র দেশ। স্থলবেষ্টিত এই দেশটি নেপালের মতোই বিশেষভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। যদিও এর অন্যতম প্রতিবেশী দেশ হলো চীন। নেপালি বংশো™ভূত জনগোষ্ঠী রয়েছে এখানে অনেক। নেপালের মতোই ভুটানের সাথে শক্তিমান সম্পর্ক সৃষ্টির উদ্যোগ রয়েছে বেইজিংয়ের। এ জন্য বিশেষভাবে সতর্ক নয়া দিল্লি। ক্ষমতায় আসার পর বিদেশ সফরের জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম থিম্পুকে বেছে নেয়ার মধ্যেই ভারতের কাছে ভুটানের বিশেষ গুরুত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবে ভুটানে ভারতের প্রভাব আরো অনেক দিন থাকলে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পরিস্থিতি বেশি দিন নাও থাকতে পারে। ভুটানের উন্নয়নে চীনের প্যাকেজ প্রস্তাবের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে দেশটির। ফলে ভুটানে পররাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন বিন্যাস আসার সম্ভাবনা রয়েছে অদূরভবিষ্যতে।

মিয়ানমার দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সন্ধিস্থলের দেশ। এটি আশিয়ানের সদস্য, আবার সার্কের সদস্য করার ব্যাপারেও প্রস্তাব রয়েছে মিয়ানমারের সামনে। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কয়েক বছর ছাড়া সামরিক সরকারের অধীনে চলে এসেছে বহু জাতিগোষ্ঠী সমৃদ্ধ এ দেশটি। ২০১০ সাল থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়া চলছে মিয়ানমারে। এর গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে আগামী ৮ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হতে পারে দীর্ঘকাল পর প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার। যদিও সাংবিধানিক বিধিনিষেধের কারণে বিরোধী নেত্রী অং সান সু কির দল নির্বাচনে জয়ী হলেও তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। ২৫ শতাংশ সংসদ সদস্য পদ আইন সভার উভয় কক্ষে সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকায় রাষ্ট্রশাসনে সামরিক বাহিনীর শক্তিমান ভূমিকা থেকে যাবে।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পাশ্চাত্য চাইছে মিয়ানমারে পশ্চিমের অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াতে। সামরিক জান্তার আমলে এ ক্ষেত্রে চীনা প্রভাব ছিল অনেকটাই একচ্ছত্র। পাশ্চাত্য সমর্থনপুষ্ট অং সান সু কির দল এনএলডি জয়ী হলেও তার পক্ষে একতরফা কোনো পাশ্চাত্যাশ্রয়ী ব্যবস্থা কায়েম করা দেশটিতে সম্ভব হবে না। সু কি নিজে এটি উপলব্ধি করতে পারেন বলে নির্বাচনের আগেই চীন সফর করে সেখানকার শীর্ষ স্থানীয় নীতিনির্ধারকদের সাথে কথা বলে এসেছেন।

গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথ ধরে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা মিয়ানমারে প্রবেশের আগেই ভারত সামরিক সরকারের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। এর মাধ্যমে দিল্লি সেখানকার তেল-গ্যাস ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে বিদ্রোহ দমনে সহযোগিতার জন্য মিয়ানমারের সাথে সমঝোতায় পৌঁছেছে। মিয়ানমারে প্রভাববলয় সৃষ্টির যে প্রতিযোগিতা পাশ্চাত্য, চীন, রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে চলছে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবয়ব পেতে পারে নভেম্বরের নির্বাচনের পর।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এখন একক গুরুত্বপূর্ণ দেশ যেখানে ভারতের প্রভাব অনেকটাই একতরফা। নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার এখানে ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু সে সময়ে পররাষ্ট্র সম্পর্কে এক ধরনের ভারসাম্য ছিল। এটি ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর সেভাবে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশে ভারতের একতরফা প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক হয় আমেরিকার এই অঞ্চলে অনুসৃত নীতি। এশিয়ায় প্রভাববলয় সৃষ্টির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের হয় বিশেষ সমঝোতা। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামা নির্বিশেষে সব মার্কিন নেতা এশিয়ায় চীন-রাশিয়া অক্ষের বিপরীতে প্রভাব বলয় বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারতকে মিত্র হিসেবে পাওয়ার কৌশল অনুমোদন করেছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান ছাড়া অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যাপারে নয়াদিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিশ্রতি দেয় ভারতকে। এমনকি দুই প্রেসিডেন্টই ভারত সফরকালে এশিয়ার নেতা হিসেবে উল্লেখ করে ভারতকে।

যত দূর জানা যায়, বাংলাদেশ নিয়ে এ ব্যাপারে ২০০৬ সালে ভারত-আমেরিকা একটি গোপন সমঝোতা তৈরি হয়। এর অংশ হিসেবে জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের একতরফা সরকারের শাসন শুরু হয় ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে। ক্ষমতায় আসার আগেই ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কী কী এজেন্ডা ঢাকার সরকার বাস্তবায়ন করবে তারও একটি সম্মত সিদ্ধান্ত হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহ দমনে একসাথে কাজ করা, ভারতকে ট্রানজিট বা করিডোর দেয়া, বিশেষ বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সুবিধা দেয়া, ভারতবিরোধী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ইসলামপন্থীদের দমন ও যুদ্ধাপরাধের বিচার আয়োজন করা সম্মত সিদ্ধান্তের অংশ বলে জানা যায়। 
গত ৭ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এসব এজেন্ডা বাস্তবায়নে বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য দেখা দেয়নি। যদিও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিআই সরকারের বিদায়ের পর নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় এলে অনেকেই দিল্লির নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেছিলেন। তবে এটাই বাস্তব যে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে শেখ হাসিনা সরকারের আন্তঃসরকার সম্পর্কের বাইরে কংগ্রেস-আওয়ামী লীগ আন্তঃদল সম্পর্কের যে বন্ধন ছিল, সেটা এখন বিজেপির সাথে নেই।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে যে একতরফা ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সে নির্বাচনের ব্যাপারে এর বিরোধিতাকারী যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের অন্য দেশগুলোকে জানানো হয়েছিল এটি হলো নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। শিগগিরই আরেকটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ সময়সীমা সর্বোচ্চ দুই বছর হবে বলে ধারণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জানুয়ারির নির্বাচনের পর ক্ষমতা সংহত করতে অনেকখানি সফল হয় হাসিনা সরকার। এরপর ২০১৯ সালের আগে শাসক দল আর কোনো নির্বাচন না দেয়ার নতুন ঘোষণা দেয়। সরকারের সাথে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বিরোধিতাকারী পাশ্চাত্যের সব দেশ কাজ করলেও তারা কখনো এ নির্বাচনের বৈধতা দেয়নি। বরং তাদের অবস্থান পরিবর্তন না হওয়ার ঘোষণা বারবার দিয়েছে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দুই বছর পূর্তি ঘনিয়ে আসার পর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের চাপ নানা দিক থেকে বাড়ছে। এই চাপ আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ থেকে যে আসছে, এ ব্যাপারে সংশয় নেই। কিন্তু ভারত থেকেও কি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য চাপ আসছে? এ প্রশ্নের জবাবে যতটুকু জানা যায়, নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরকালে এ ধরনের নির্বাচনের ব্যাপারে হাসিনা-খালেদা দু’জনের সাথেই কথা বলেছেন।

নয়াদিল্লি মনে করছে, ভারতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশে তাদের প্রথম, দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয় পছন্দের দল হবে নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ। কিন্তু একক সমর্থন দিয়ে শক্তির জোরে এ সরকারকে কতটা ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা যাবে তা নিয়ে সন্দিহান দিল্লির অনেকে। এ জন্য তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য নতুন নির্বাচনের পরামর্শ দিচ্ছে ঢাকাকে। একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে বিএনপিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে দিল্লি। আওয়ামী লীগের একটি অংশ মনে করে, এ ধরনের নির্বাচনের অনুষ্ঠান করেও দলকে আবারো ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির অংশগ্রহণমূলক যেকোনো নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাফল্যের ব্যাপারে সন্দিহান। বিশেষত তিনি ক্ষমতার বাইরে থেকে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথেই প্রশাসনে নিরপেক্ষ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাবে বলে মনে করেন। তার ধারণা এতে নির্বাচনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যাবে না এবং দলের বিপর্যয় ঘটবে। এ নিয়ে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম মতভেদ রয়েছে বলে মনে করা হয় যদিও এখনো পর্যন্ত দুই দেশের সরকারের মধ্যে সহযোগিতা ও নির্ভরতার সম্পর্কে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

ধারণা করা হয় শেখ হাসিনা নির্বাচন ছাড়া ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে যেতে একটি বিকল্প ভাবনাও ভাবছেন। সেটি হলো নির্বাচনের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি দিল্লি থেকে চাপ আসতে থাকলে বেইজিং-মস্কোর সমর্থন দিয়ে তিনি বাকি মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করবেন। এ ধরনের একটি বিকল্প ব্যবস্থার জন্য এ দু’টি দেশের সাথে বিশেষ সম্পর্ক তৈরির প্রচেষ্টা বেশ এগিয়েও গেছে। এ ধরনের আয়োজন দেখে নির্বাচনের জন্য চাপ দিয়ে দিল্লি ঢাকার সাথে বিশেষ সম্পর্ক নষ্টের ঝুঁকি না-ও নিতে পারে বলে শেখ হাসিনা ধারণা করছেন। আর বলয় পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টার ক্ষেত্রে বড় রকমের ঝুঁকি যে থাকে, সেটি তার অজানা নয়। তবে ঝুঁকি গ্রহণের শক্তি সাহস ও প্রবণতা শেখ হাসিনার রক্তের মধ্যেই রয়েছে বলে তার ঘনিষ্ঠজনেরা বলে থাকেন।

শনিবার, ৬ জুন, ২০১৫

মোদির সফরের পর বাংলাদেশ


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে বলে উল্লেখ করছেন দুই দেশের অনেক বিশ্লেষক। মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নরেন্দ্রজীর দ্বিতীয় ঘর হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে ঢাকা সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণ বাস্তবে রূপ পেতে বছরকাল সময় নিলো। শুরুতে কংগ্রেস মিত্র হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রধানের সাথে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব যে মোদির ছিল, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। হয়তো বা এ কারণে মোদির শপথ অনুষ্ঠানে সার্ক নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর পর জাপান সফরের পূর্বসূচির কথা বলে শেখ হাসিনা দিল্লি যাননি। সে সময় তিনি হয়তো বা মোদির মুখোমুখি হতে চাননি। এর পর ঢাকা ও দিল্লির বাইরে নরেন্দ্র মোদির সাথে শেখ হাসিনার একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে; কিন্তু বিজেপি আমলে দুই নেতার প্রতিপক্ষ দেশে রাষ্ট্রীয় সফর এই প্রথম। যদিও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সার্ক দেশ সফরের যে কর্মসূচি আগেই নিয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় ভুটান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পর বাংলাদেশে সফর করছেন।

নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি বাংলাদেশে এ সফর এমন এক সময়ে করছেন, যখন বিজেপির এই নেতা ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি ও প্রশাসনের ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি বাংলাদেশ নিয়ে যেসব এজেন্ডাকে এগিয়ে নেবেন, তা হবে একটি দীর্ঘ বা মধ্যমেয়াদি কৌশলেরই অংশ। এই কৌশল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সময় নেয়া হলেও সেটাকে নিজের অনুসরণীয় বলে মনে করতে পারেন নরেন্দ্র মোদিও। আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টার পাশাপাশি ভারতের আমলা ও গোয়েন্দা স্টাবলিশমেন্টের চেষ্টা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। 

সাক্ষাৎ হচ্ছে, কৌশলগত আলোচনা নয়
কংগ্রেসের সাথে আওয়ামী লীগের যে দলগত বা আদর্শিক মৈত্রী রয়েছে তা যে বিজেপির সাথে নেই, এ কথা সত্যি; কিন্তু সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগ বা হাসিনা প্রশাসন কী দিচ্ছে সেটি মোদির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই লেনদেনের হিসাব-নিকাশে এসে অনেক কিছু পাল্টে গেছে সাম্প্রতিক সময়ে। এক সময় ভারতের এনডিএ সরকার চাইছিল, বাংলাদেশের পুরো রাজনীতিকে ভারতকেন্দ্রিক করতে সব দলের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে। এর অংশ হিসেবে মোদির এই সফরে এ দেশের সরকার এবং কার্যকর বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র তৈরি করে দেয়ার চিন্তাভাবনা হয়েছিল; কিন্তু সরকারের সর্বাত্মক বিরোধিতায় সেটি আর হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিরোধী জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথে নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ হচ্ছে; কিন্তু স্বল্প সময়ের সেই সাক্ষাতে কৌশলগত আলোচনা কিছু হবে কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে। প্রটোকলের বাইরে আরো কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাতের জন্য সফরের দ্বিতীয় দিন যে সময় ঠিক করা হয়েছে, তার মধ্যে মোদিজী বাংলাদেশের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন বলে জানা যাচ্ছে। 
বেগম জিয়ার এই সাক্ষাৎকারের প্রতীকী গুরুত্ব নিশ্চয়ই রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছা ছিল ভারতকে তাদের চাওয়া-পাওয়ার সবটাই তারা দেবে, তবে কোনোভাবেই যেন ২০ দল বা বিএনপি নেত্রীকে সাক্ষাৎকার না দেন নরেন্দ্র মোদি। এ ব্যাপারে ভারতীয় রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের পক্ষে আনতে ব্যাপক তৎপরতা চালানো হয়। এক মাসের বেশি সময় ধরে সেখানে একজন না একজন উপদেষ্টাকে রাখা হয়েছে এ ব্যাপারে মোদি প্রশাসনকে প্রভাবিত করতে। একাধিক মন্ত্রী প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বারবার সফর করেছেন দিল্লিতে। ভারতের সাবেক হাইকমিশনারদের মধ্যে অনেককে নানাভাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজ করতে নিয়োগ করা হয়েছে। নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত সাবেক কোনো কোনো হাইকমিশনারকে সেখানে নানা কাজের নামে রেখে দেয়া হয়েছে। এসব প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারকে মোদি প্রশাসনের সমর্থন জোগানো। বিরোধী জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথে মোদির বাংলাদেশ সফরকালে যে আলোচনার পরিকল্পনা ছিল তা শেষ পর্যন্ত সীমিত করার মধ্যে দিল্লির এক ধরনের ভারসাম্য আনার চেষ্টাই হয়তো রয়েছে। এতে বিএনপির সাথে যোগাযোগের সূত্রটিও থাকল আর কানেক্টিভিটিসহ যেসব চুক্তি-সমঝোতা সরকারের সাথে হবে, তার প্রতি এক ধরনের সমর্থনও এতে বিরোধী পক্ষের পাওয়া যেতে পারে।

ভারতের প্রাপ্তি
মোদির এ সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের কী এজেন্ডা রয়েছে, তার অনেক কিছু নিয়েই এখন আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশে ভারতের সুবিস্তৃত কৌশলের কয়েকটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করার মতো কোনো তৎপরতা যাতে না থাকে সেটি নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে শুধু সরকারের প্রতিশ্রুতি প্রদান এবং সেটি প্রতিপালনের মধ্যে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না ভারত। প্রতিবেশী দেশটি চায় এ দেশের কোনো সরকার ক্ষমতায় আসার পর যাতে এ ধরনের কাজ করার সক্ষমতাই অবশিষ্ট না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে। এ কারণে বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনীগুলোর তৎপরতাকে এক ধরনের নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। এ ইস্যুতে ভারতের মোদি বা মনমোহন এ দুই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। 
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ভারতবিরোধী যে মনোভাব এবং দিল্লি বৈরী শক্তির সক্রিয়তা রয়েছে বলে মনে করা হয়, সেটিকে মূলোৎপাটন করা। ইউপিএ সরকারের সময় ভারতবিরোধিতার সূতিকাগার হিসেবে ইসলামিস্ট রাজনীতি এবং বিএনপি নেতৃত্বের একটি অংশকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ শক্তিকে নির্মূল করার জন্য সর্বাত্মক কার্যক্রমের শর্তটি প্রতিপালনের বাধ্যবাধকতা ঢাকার ক্ষমতাসীনদের ওপর ছিল। কংগ্রেস শাসনের পুরো সময়জুড়ে এখানকার রাজনৈতিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে এটি স্থান পেয়েছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম এবং ইসলামিস্ট দমনকে এর একটি অংশ বলে ধারণা করা হয়। বিজেপি সরকার আমলে এর ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত বড় রকমের কোনো ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে না। তবে মাত্রাগত ওঠানামা মাঝে মধ্যে দেখা যায়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে কংগ্রেস ও বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। 

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি পাওয়া। বাংলাদেশকে ভারতের অর্থনৈতিক বাজার হিসেবে পাওয়ার ওপর এক সময় বেশ গুরুত্ব দিয়েছিল নয়াদিল্লি; কিন্তু এখন মনে করা হয়, অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই এটি ঘটবে। এখানে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এ বাজার অব্যাহত থাকবে। এখন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা উভয় স্বার্থের ক্ষেত্রে শীর্ষে রাখা হয়েছে ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটিকে। ট্রানজিটের নিরাপত্তাগত একটি দিক থাকার কারণে চীন-আমেরিকার অনিচ্ছা থাকলে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। মনমোহনের সফরের সময় তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কারণে ট্রানজিটের বাস্তবায়নচুক্তি করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কার্যত তখন চুক্তি না হওয়ার পেছনে চীনের বড় রকমের আপত্তি ছিল বলেই সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এবার মোদির ঢাকা সফরের সময় ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি নিয়ে সব ধরনের চুক্তি ও সমঝোতা সম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারে বোঝাপড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মোদির চীন সফরের সময় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কানেক্টিভিটি দেয়ার ব্যাপারে চীনের অনাপত্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চায়না-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার) অর্থনৈতিক করিডোর-সংশ্লিষ্ট কানেক্টিভিটির ব্যাপারেও ভারতের আপত্তি থাকবে না। বস্তুত বিসিআইএম করিডোরের মাধ্যমে চীনের মেরিটাইম সিল্করোড ও ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ পরিকল্পনার সাথে কলকাতা-ঢাকা-ত্রিপুরা-মিয়ানমার হয়ে ইউনান পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখান থেকে এই মহাসড়ক চলে যাবে তুরস্কের ইস্তাম্বুল পর্যন্ত। মোদির সফরের পর চীনা প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় এটিও চূড়ান্ত হয়ে যেতে পারে। এই নেটওয়ার্কের সাথে গভীর সমুদ্রবন্দরের একটি যোগসূত্র রয়েছে। তবে এখনো নিশ্চিত হয়নি চীন, না ভারতীয় কনসোর্টিয়াম এটি করবে। ভারতীয় কনসোর্টিয়াম করলে এটি হতে পারে পায়রায়। এতে কলকাতা বন্দরের কাছাকাছি হবে গভীর সমুদ্রবন্দরটি। আর চীন এটি নির্মাণ করলে তা হতে পারে সোনাদিয়ায়। গভীর সমুদ্রবন্দরের ব্যাপারে ভারত-চীন সমঝোতা না হলে এটি নিয়ে বাংলাদেশ সিদ্ধান্তের পর্যায়ে নাও যেতে পারে। 

চতুর্থত, ভারত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ধরনটি নেপালের আদলে গড়ে তুলতে চায়। সার্কের কাঠামোয় যে অর্থনৈতিক ইউনিয়ন গড়ে তোলার প্রস্তাব এক সময় ছিল, সেটি উপ-আঞ্চলিক পর্যায়ে তৈরি করতে চায় দিল্লি। এ লক্ষ্যে এবার বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে এক দেশের যানবাহন অন্য দেশের ওপর দিয়ে চলার বিষয়টি। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যে এ ধরনের একটি সমঝোতার আভাসও দিয়েছেন। এটি দুই দেশের জন্য প্রযোজ্য হলেও বাংলাদেশের যানবাহন আসলে ভারতের ওপর দিয়ে ভুটান বা নেপালে যাওয়ার সুযোগ সেভাবে ভারতীয় শ্রমিক ইউনিয়ন বা অন্য প্রতিবন্ধকতার কারণে নাও পেতে পারে। তবে ট্রানজিটের মালামাল পরিবহনের ব্যাপারে এ সুযোগ ভারতীয় যানবাহনের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের বিষয়টি এবারের আলোচনা ও চুক্তির শীর্ষে থাকতে পারে। এ বিষয় চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী একবার দিল্লি সফর করে এসেছেন। এ ছাড়া আরেকটি সমঝোতা হতে পারে দুই দেশের ল্যাবরেটরির সার্টিফিকেট অন্য দেশ গ্রহণ করার ব্যাপারে। এতে বাংলাদেশের বিএসটিআইয়ের সনদ যেমন ভারতে চলবে, তেমনি সে দেশের সনদ বাংলাদেশ গ্রহণ করবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্থানীয় মুদ্রায় করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। আর একসময় এক দেশের মুদ্রা অন্য দেশে গ্রহণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে, যেটি এখন নেপালে রয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে দ্বিপক্ষীয় ও উপ-আঞ্চলিকপর্যায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সহযোগিতা তৈরি করার কথা বলা হচ্ছে। 

বাংলাদেশ সরকারের আসল চাওয়া
ভারতের কাছে বাংলাদেশের এজেন্ডার বিষয়টি এখন অনেকটাই তিস্তার পানিবণ্টনে এসে ঠেকেছে। যদিও এবার তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা বা চুক্তি যে হবে না, সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ৫৪টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এই আলোচনা অবশ্য কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো আয়োজন থাকবে না। বাংলাদেশের জনমতকে সামনে রেখে ট্রানজিটের মাশুল আদায়ের কথা থাকবে; কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো হারের কথা উল্লেখ থাকবে না, যাতে মোটের ওপর কিছু একটা দিয়ে ট্রানজিটের মালামাল পরিবহন করা সম্ভব হয়। ভারতের সীমান্ত চুক্তি অনুমোদনকে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখানো অব্যাহত থাকবে। যদিও এর মধ্যে বাংলাদেশের সে রকম একান্ত কোনো প্রাপ্তি নেই। এই চুক্তি করা হয়েছিল মূলত পাকিস্তান আমলে নেহরু ও ফিরোজ খান নুনের সময়, যেটি ইন্দিরা ও মুজিব ১৯৭৪ সালে নতুন করে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই চুক্তিটি তিনবিঘা করিডোরের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি ছাড়া অনুমোদন করা হয়েছে ভারতীয় সংসদে। 

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নেপথ্য মূল এজেন্ডাটি হলো এখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে ভারত সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা। মুক্ত গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে এটি সম্ভব না হওয়ায় নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র বা কার্যত এক দল ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে সরকারকে। এ ব্যাপারে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের সমর্থন ছিল। এখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার নিশ্চিত করলে, সেটিই হবে বর্তমান সরকারের বড় অর্জন। 

এ ব্যাপারে একটি রোডম্যাপও রয়েছে বর্তমান সরকারের সামনে। সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী মে-জুন নাগাদ একটি নির্বাচন করা হবে। তার আগে বিরোধী জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারার বিষয়টি মামলার রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। মূল ধারার বাইরে বিএনপির একটি ধারাকে নির্বাচনে নিয়ে গিয়ে সেটাকে গ্রহণযোগ্যতা দানের চেষ্টা করা হবে। এ ধরনের নির্বাচন যদি অন্তর্বর্তী কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়, তাতেও বড় কোনো ঝুঁকি দেখছে না ক্ষমতাসীনেরা। এর মাধ্যমে আগামীতেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। এ পরিকল্পনায় মোদির সম্মতি পাওয়া গেলে সেটি হবে সরকারের মূল অর্জন। এ ক্ষেত্রে ভারতকে তাদের চাওয়া সব সুবিধা দিতে রাজি থাকবে সরকার, তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেসব বাধা আসতে পারে তা দূর করতে ভূমিকা রাখতে হবে প্রতিবেশী দেশটিকে। ট্রানজিটের ক্ষেত্রে এটি পালন করেছে নয়াদিল্লি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ভারতের প্রভাব আওয়ামী লীগের ক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবে নিশ্চিত করবে বলে দলের নীতি-উপদেষ্টারা মনে করেন।

শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৩

কেন ব্যর্থরাষ্ট্র হতে যাবে বাংলাদেশ


বাংলাদেশ কেন অকার্যকর একটি দেশ হতে যাবেÑ এ প্রশ্ন এখন অনেকের মধ্যে। ব্যর্থরাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কা যেসব দেশের রয়েছে তার শীর্ষ বিশের মধ্যে বারবার বাংলাদেশের নাম এসে যাওয়ায় আলোচিত হচ্ছে এ প্রশ্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফান্ড ফর পিচ ও ফরেন পলিসি সাময়িকী যৌথভাবে প্রতি বছর বিভিন্ন সূচককে বিবেচনায় এনে রাষ্ট্রগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। সূচকে ব্যবহারের মতো তথ্য বিশ্বের যেসব দেশের পাওয়া যায় সেগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয় এ তালিকায়।
এ তালিকার শীর্ষ দেশগুলো হলো ব্যর্থরাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে রেড অ্যালার্টভুক্ত রাষ্ট্র। এর পরে রয়েছে সতর্কসঙ্কেতের দেশগুলোÑ যেসব রাষ্ট্র সাবধান না হলে লাল সঙ্কেত বেজে উঠতে পারে। এরপর রয়েছে মধ্য অবস্থানের দেশÑ যেগুলোর ঝুঁকি তেমন একটা নেই। তার পরের দেশগুলো হলো টেকসই রাষ্ট্র। এসব দেশের সব সূচকের অবস্থা সন্তোষজনক। অদূরভবিষ্যতে শঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো কারণ এসব দেশের নেই।
রেল অ্যালার্টে বাংলাদেশ
ফান্ড ফর পিচ ২০১২ সালে বিশ্বের ১৭৭টি দেশের একটি তালিকা প্রকাশ করে। এ তালিকার ৩৩টি দেশের জন্য রয়েছে রেড অ্যালার্ট। যথারীতি এসব দেশের শীর্ষে রয়েছে সোমালিয়া। তারপরে কঙ্গো, সুদান, ইথিওপিয়া, ভুরুন্ডির মতো দেশের অবস্থান। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২৯ নম্বরে। ২০১১ সালের তুলনায় বাংলাদেশের ক্রম অবস্থান চার ধাপ নিচে নেমেছে। আর ব্যর্থরাষ্ট্র হওয়ার ঝুঁকির যে নম্বর তা ২ দশমিক ১ কমে দাঁড়িয়েছে ৯২.২। তালিকার শীর্ষ দেশ সোমালিয়ার চেয়ে ১২.৭ পয়েন্ট কম আর সর্বনিম্নে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ফিনল্যান্ডের চেয়ে ৭২.২ পয়েন্ট বেশি বাংলাদেশের নম্বর। ব্যর্থ হওয়ার প্রশ্নটি আলোচনায় আসার আরেকটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের (এনআইসি) কয়েক দিন আগে প্রকাশ করা একটি প্রতিবেদন। ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেডস ২০৩০ : অলটারনেটিভ ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে যে সব দেশের ব্যর্থরাষ্ট্র হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে তার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০৩০ সালে ১৫ নম্বরে থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তালিকায় ২০০৮ সালে ব্যর্থরাষ্ট্রের ঝুঁকি তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দেখানো হয়েছিল ১১ নম্বরে।
কেন সৃষ্টি হয় ব্যর্থরাষ্ট্রের ঝুঁকি?
রাষ্ট্র হিসেবে একটি দেশ কেন ব্যর্থ চিহ্নিত হবে তা নির্ধারণ করা হয় কতগুলো সূচকের ভিত্তিতে। রাষ্ট্রকে ব্যর্থ বিবেচনা করা হতে পারে এমন একটি পর্যায়ে গেলে যখন দেশটির সার্বভৌম সরকার কতগুলো মৌলিক শর্ত ও দায়িত্ব পালন করতে আর সমর্থ হয় না। থিংকট্যাংক ফান্ড ফর পিচ ও ফরেন পলিসি  ১২টি সূচক ব্যবহার করে প্রতিটি সূচকের জন্য রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মাত্রা বিবেচনায় শূন্য থেকে ১০ পর্যন্ত নম্বর দিয়েছে। এতে মোট নম্বর দাঁড়ায় ১২০। জাতিসঙ্ঘের সদস্যদেশগুলোর অবস্থানই শুধু বিবেচনায় আনা হয়েছে এখানে। যেসব দেশ ৭৫ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পেয়েছে সেগুলোর প্রতি ব্যর্থরাষ্ট্রের লাল সঙ্কেত দেখানো হয়েছে। ২০১২ সালে এ ধরনের দেশ রয়েছে ৩৩টি। ৫০ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পেয়েছে এমন দেশকে দেখানো হয়েছে কমলা সঙ্কেত। এ ধরনের দেশ রয়েছে ৯২টি। তালিকায় হলুদ সঙ্কেতের দেশ রয়েছে ৩৯টি। ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে এমন দেশগুলো। ২৫ শতাংশের নিচে যেসব দেশের নম্বর তাদের প্রতি রয়েছে সবুজ সঙ্কেত।
ব্যর্থরাষ্ট্রের সর্বসম্মত সংজ্ঞা নিরূপণ না হলেও ঝুঁকি তালিকা যারা তৈরি করে সেই ফান্ড ফর পিচ ব্যর্থরাষ্ট্রের কতগুলো বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছে। এসব রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য এমন হবে সেসব দেশের সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে নিজস্ব ভূখণ্ডের ওপর অথবা আইনানুগ শক্তি প্রয়োগের একক ক্ষমতা সরকারের আর থাকবে না। রাষ্ট্রে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আইনানুগ যে কর্তৃপক্ষ তাতে ভাঙন সৃষ্টি হবে। জনগণকে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানে অসমর্থ হয়ে পড়বে রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে অন্য দেশের সাথে আদান-প্রদান বা আলোচনায় সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলব রাষ্ট্র। সার কথা হলো একটি ব্যর্থরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার এতটা দুর্বল ও অকার্যকর হয় যে দেশের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সরকারের থাকে না, জনগণকে সেবা দেয়া যায় না, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন হয় সর্বগ্রাসী। দেশের মানুষ ইচ্ছার বাইরে বাস্তুচ্যুত শরণার্থী হয়ে পড়ে অথবা স্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয় আর অর্থনৈতিক অবস্থার ঘটে দ্রুত অবনতি। কোনো দেশকে ‘ব্যর্থরাষ্ট্র’ ঘোষণা করাটা সাধারণভাবে হয় বিতর্কিত। আর একতরফাভাবে এটি করা হলে তার ভূ-রাজনৈতিক নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও দেখা দেয়।
ব্যর্থতার সামাজিক কারণ
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বিবেচনায় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তিন ধরনের সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে সামাজিক চার সূচকের প্রথমটি হলো জনসংখ্যাগত চাপ। খাদ্যপ্রাপ্তি এবং জীবনধারণের অন্যান্য সম্পদের তুলনায় অধিক জনসংখ্যাঘনত্ব বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে রাষ্ট্রে। এই চাপ আসে জনসংখ্যার বিন্যাসের ধরন, সীমান্তবিরোধ, জমির মালিকানা ও দখল, বাইরে যাওয়ার পরিবহন সুবিধা, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত বিপত্তির নৈকট্য থেকে।
ব্যর্থতা নিরূপণের দ্বিতীয় সামাজিক সূচক হলো ব্যাপক শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা। সাধারণ বা টার্গেট করা করা মানুষের ওপর সহিংসতা বা দমন-পীড়ন চলে এ ধরনের দেশে। খাদ্যসঙ্কট, রোগ-ব্যাধি, বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট, ভূমি নিয়ে প্রতিযোগিতা, অভাব ও অস্থিরতা ব্যাপক মানবিক ও নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি দেশের অভ্যন্তরে বা দু’টি দেশের মধ্যেও হতে পারে এ সমস্যা।
ব্যর্থরাষ্ট্রের তৃতীয় সামাজিক সূচকটি হলো প্রতিহিংসাপরায়ণদের প্রতিশোধ নেয়ার উত্তরাধিকার। সাম্প্রতিক বা অতীতের অবিচারের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবণতা চলতে থাকেÑ এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটি শতাব্দীর পুরনোও হতে পারে। বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রযন্ত্রকর্তৃক বঞ্চিত বা দমনের শিকার বিশেষ কোনো গ্রুপের প্রতিহিংসাপরায়ণতা বা ক্ষোভের প্রকাশ থেকেও ঘটে থাকতে পারে এটি।
দেশ থেকে অব্যাহত ও স্থায়ী বহির্গমন হলো ব্যর্থরাষ্ট্রের চতুর্থ সামাজিক সূচক। পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বী ও মধ্যবিত্তদের স্বেচ্ছা অভিবাসনের মাধ্যমে মেধা বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে এ ধরনের দেশে। কোনো দেশের প্রবাসী ও অভিবাসী সম্প্রদায় ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকাও সূচকের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা
ব্যর্থরাষ্ট্র নিরূপণে অর্থনৈতিক সূচকের গুরুত্বও অপরিসীম। এ ধরনের দু’টি সূচকের প্রথমটি হলো অসম অর্থনৈতিক উন্নয়ন। গোষ্ঠিভিত্তিক অসাম্য অথবা শিক্ষা, চাকরি ও অর্থনৈতিক মর্যাদার ক্ষেত্রে ধারণাগত বৈষম্য থাকে দেশে। গোষ্ঠিভিত্তিক দারিদ্র্য, শিশু মৃত্যুর হার, সাক্ষরতার হারও এ ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অতি দ্রুত ও মারাত্মক অবনতি হলো ব্যর্থরাষ্ট্রের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক সূচক। মাথাপিছু আয়, স্থূল জাতীয় আয়, ঋণ, শিশুমৃত্যুর হার, দারিদ্র্য হার, ব্যবসায় বিপর্যয় ইত্যাদি সূচক ব্যবহার করা হয় সমাজের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিমাপে। এ ক্ষেত্রে পণ্যমূল্য, কর, রাজস্ব, বিদেশী বিনিয়োগ, দায় শোধ ইত্যাদির হঠাৎ পতন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এ ছাড়া জাতীয় মুদ্রামানের বিপর্যয় বা বড় রকমের অবমূল্যায়ন আর কালো অর্থনীতির আকস্মিক স্ফীতি ও পুঁজির পলায়নও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মচারী, সেনাবাহিনী অথবা অন্য কোনো নাগরিকের বেতনভাতা পেনশন বা অন্য আর্থিক দায় পূরণে ব্যর্থতাও দেখা হয় এ প্রসঙ্গে।
বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সূচক
ব্যর্থরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সূচককে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা ছয়টি বিষয়ের প্রথমটি হলো রাষ্ট্রের দুর্বৃত্তায়ন এবং কর্তৃপক্ষের আইনগত বৈধতা না থাকা। শাসক শ্রেণীর ব্যাপক দুর্নীতি বা অর্থুধা আর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ধার না ধারা থেকে এর সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশ না থাকাও এ ক্ষেত্রে হয় গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যর্থরাষ্ট্রের দ্বিতীয় রাজনৈতিক সূচক হলো জনগণকে দেয়া সেবার ব্যাপক অবনতি। সন্ত্রাস ও সহিংসতা থেকে নাগরিকদের রক্ষা পাওয়া আর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পয়নিষ্কাশন, জনপরিবহনের মতো জনগণের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সেবা প্রদানে ব্যর্থতা থেকে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তা বাহিনী, প্রেসিডেন্সিয়াল স্টাফ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কূটনৈতিক সার্ভিস, রাজস্ব সংস্থার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শাসক শ্রেণীর জন্য ব্যবহার করার কারণে জনগণকে তার কাক্সিত সেবা দেয়া যায় না।
ব্যর্থরাষ্ট্রের তৃতীয় রাজনৈতিক সূচক হলো মানবাধিকারের ব্যাপকভিত্তিক লঙ্ঘনপ্রবণতা। শাসনতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্থগিত বা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের মতো সর্বাত্মকবাদী, একনায়কতান্ত্রিক বা সামরিক শাসনের উদ্ভব হলে এটি দেখা যায়। নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আনুকূল্যেও সহিংসতা হয়। রাজনৈতিক বন্দী ও ভিন্ন মতাবলম্বীর সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে। তাদের সাথে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবহার করা হয় না। সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়। রাজনৈতিক কারণে সেনাবাহিনীকে অভ্যন্তরীণ কাজে ব্যবহার এবং রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষকে দলন ও নিপীড়ন থেকেও সৃষ্টি হয় সঙ্কটের।
চতুর্থ রাজনৈতিক সূচক হলো নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্রের’ অবস্থা সৃষ্টি আর এলিট বাহিনীগুলোকে দায়মুক্তি দিয়ে পরিচালিত করা। রাষ্ট্রের আনুকূল্যে বেসরকারি বাহিনী সৃষ্টি করা যারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সন্দেহভাজন শত্রু ও বিরোধীপক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল সাধারণ নাগরিকদের সন্ত্রস্ত করে রাখে। সেনাবাহিনীর মধ্যে সেনাবাহিনীর চক্র সৃষ্টি করে এই চক্রকে প্রতাপশালী সেনানায়ক বা রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ে ব্যবহার করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়া, গেরিলা বাহিনী বা প্রাইভেট সেনাবাহিনীর উত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংস প্রতিরোধের ঘটনাও ঘটে।
ব্যর্থতার পঞ্চম রাজনৈতিক সূচকটি হলো রাষ্ট্রে পরস্পর প্রতিপক্ষ এলিট শ্রেণীর সৃষ্টি হওয়া। শাসক শ্রেণীর আগ্রাসী জাতীয়তাবাদী বক্তব্য বিশেষত নৃতাত্ত্বিক নির্মূল বা বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়ার মতো বিষয় সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট করে। শাসক শ্রেণী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রুপভিত্তিক বিভাজন সৃষ্টি হয়।
ব্যর্থরাষ্ট্রের ষষ্ঠ রাজনৈতিক সূচক হলো বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সামরিক বা আধা সামরিক বাহিনীকে সম্পৃক্ত করলে বাইরের রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো গ্রুপের সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বিদেশী সাহায্য বা শান্তিরক্ষী মিশনের ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীলতাও বিদেশী দাতাগোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
আফ্রিকান সিনড্রম!
একটি রাষ্ট্র অকার্যকর বা ব্যর্থ দেশে পরিণত হওয়ার আলোচিত বৈশিষ্ট্যের বেশির ভাগই রেড অ্যালার্ট তালিকার শীর্ষ দেশগুলোতে রয়েছে। লাইবেরিয়া, সিওরালিওন আইভরি কোস্ট ও কঙ্গোর মতো আফ্রিকান দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অকার্যকর করে ফেলেছিল। সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী বাহিনীতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে রক্তপাত এমনপর্যায়ে পৌঁছে যে এসব দেশে জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী দীর্ঘ সময়ের জন্য মোতায়েন রাখতে হয়। ২০০৫ সালে আইভরি কোস্টের উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অংশ ভ্রমণের সময় একটি রাষ্ট্র গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে সশস্ত্রভাবে বিভাজিত হয়ে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়লে কী অবস্থার সৃষ্টি হয় তা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়। সেখানে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী কাজ করেছে। সেখানে কর্তৃত্বের ভিত্তিতে দুই অঞ্চলে বিভক্ত দেশে সশস্ত্র প্রাইভেট বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে। দশক কাল ধরে লাখ লাখ মানুষ দেশটিতে প্রাণ হারিয়েছে। এসব দেশের মধ্যে কঙ্গো ছাড়া বাকিগুলোতে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে নতুন করে এসব দেশের কাতারে যুক্ত হয়েছে মালে ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মতো দেশ। সোমালিয়ার অবস্থা অবনতির চরম স্তরে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। ধাক্কা সামলানোর অপরিসীম ক্ষমতার জন্য পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে এখনো জোরালোভাবে টিকে রয়েছে যদিও প্রতিদিনই দেশটি থেকে সঙ্ঘাত ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর আসছে।  ভারতের ৩০ ভাগ এলাকা এখন মাওবাদী বিদ্রোহী কবলিত। এ লেখার এক দিন আগেও সেখানে ৩০ জন পুলিশ ও মাওবাদীর মৃত্যুর খবর এসেছে। আরব বসন্তের জের ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজ করেছে অস্থিরতা। এখন আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত অবস্থা সিরিয়ায়। ৬০ হাজার লোক নিহত হয়েছে সেখানে। কিন্তু এ রকম কিছু ছাড়াই দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যর্থরাষ্ট্রের তালিকায় আসতে শুরু করেছে বাংলাদেশের নাম। স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪০ বছর সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক উন্নয়নের কাক্সিত পর্যায়ে হয়তো পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু যে অগ্রগতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে সে দৃষ্টান্ত অনেক দেশের জন্য অনুসরণীয়। সামাজিক সূচকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্যহার ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সাক্ষরতা, সুপেয় পানিপ্রাপ্তি, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার, প্রত্যাশিত গড় আয়ু, জন্ম ও মৃত্যুহার সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মাথাপিছু জাতীয় আয় বিনিময় হার বিবেচনায় ৮৪৮ ডলার এবং ক্রয়ক্ষমতার সমানুপাত বা পিপিপি হিসাবে দুই হাজার ২৩৩ ডলারে পৌঁছেছে। দুই দশক ধরে গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের ওপরে। রফতানি আয় আড়াই হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। রেমিট্যান্স পৌঁছেছে ১৩০০ কোটি ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ছাড়িয়ে গেছে ১৩০০ কোটি ডলার। এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি ব্যর্থরাষ্ট্রের যেসব অর্থনৈতিক সূচক ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে তার কিছু বৈশিষ্ট্যও বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও বিকাশ হার অব্যাহতভাবে বাড়লেও বর্ধিত সম্পদের অংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সেভাবে পৌঁছাচ্ছে না। রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা ধনী ৫ শতাংশের সম্পদ ও আয় ক্রমাগতভাবে বাড়ছে আর ৯৫ শতাংশ মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের আয় ও সম্পদ কমছে। সরকারি চাকরিতে সরকারের পক্ষ-বিপক্ষ রেখা তৈরি করে একটি গোষ্ঠীকে আনুকূল্য দেয়া হচ্ছে, অন্য শ্রেণীকে করা হচ্ছে বঞ্চিত। এর পাশাপাশি দুর্নীতি চাঁদাবাজি ইত্যাদি ক্রমাগতভাবে বেড়ে গিয়ে কালো অর্থনীতির আকারও স্ফীত হচ্ছে।
তবু কেন ঝুঁকির নম্বর ৭৭ ভাগ
এত কিছুর পরও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক বিবেচনায় বাংলাদেশের ব্যর্থরাষ্ট্র হওয়ার ঝুঁকির নম্বর ৭৭ শতাংশে পৌঁছার কথা নয়। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় শতকরা যত নম্বর পেয়ে সর্বোচ্চ গ্রেড এ প্লাস পায় আর মাত্র তিনটি নম্বর হলে তা আমরা পেয়ে যাবো ব্যর্থরাষ্ট্রের শর্ত পূরণে। ব্যর্থরাষ্ট্রের সূচকগুলোর আলোকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মূল জায়গা হিসেবে খুঁজে পাওয়া যায় রাজনীতি। ব্যর্থরাষ্ট্রের যে ছয়টি রাজনৈতিক সূচক রয়েছে তার প্রতিটাতেই বাংলাদেশের বিপজ্জনক অগ্রযাত্রা রয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্বৃত্তায়নের দাপট প্রতিদিনই যেন বাড়ছে। শাসক শ্রেণীর ব্যাপক দুর্নীতি আর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ধার না ধারার প্রবণতা উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ব্যাপক জনগোষ্ঠীর আস্থায় ধরা চিড় ক্রমেই বড় হচ্ছে। সন্ত্রাস, সহিংসতা ও মানবাধিকার হরণের ঘটনা বাড়ছে। আর আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার। গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার নামে নতুন কোনো বিভাগ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চালু করা হলে তার বাস্তব উদাহরণ হতে পারে বাংলাদেশ। কাউকে গ্রেফতার, হয়রানি, পুলিশ রিমান্ড বা নির্যাতনের জন্য তার একটি পরিচয়ই যথেষ্ট, সেটি হলো তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রতিপক্ষ শিবিরের ব্যক্তি। গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগকে রাজনীতিকীকরণ এখন সর্বোচ্চ এক স্তরে। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে গুম খুনে ব্যবহার আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য দায়মুক্তি সংস্কৃতিকে লালন করা হচ্ছে। জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রতিপক্ষ নিপীড়ক যন্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে ক্রমাগতভাবে। প্রশাসন, পেশাজীবী, সাধারণ মানুষÑ সব ক্ষেত্রে বিভাজনের আওয়াজ ও প্রচারাভিযান জোরদার হচ্ছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বাইরের কোনো কোনো শক্তিকে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট করা হচ্ছে যা অন্য পক্ষের বিদেশী হস্তক্ষেপের আশঙ্কাকে প্রবল করছে।
ব্লু হেলমেটের পদধ্বনি!
সার্বিক বিবেচনায় গত ৪০ বছরে যে অগ্রগতি অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অর্জন করেছেÑ এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার যে দৃষ্টান্ত দুই দশকে স্থাপিত হয়েছিল তাকে এগিয়ে নেয়া গেলে অকার্যকর বা ব্যর্থরাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কা কোনোভাবেই দেখা দিত না। এখন ব্যর্থরাষ্ট্রের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বিবেচনায় ৭৭ শতাংশ নম্বরই শুধু বাংলাদেশ পায়নি একই সাথে নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে জাতিসঙ্ঘের সহায়তার কথাও আলোচনা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে ব্লু হেলমেটের পদধ্বনি। শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক শুভবুদ্ধিই কেবল পারে সে ধরনের বিপর্যয় থেকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির রাজপথে বাংলাদেশ ট্রেনটির গতি ফেরাতে।