/ Bangladesh bank hakes লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
/ Bangladesh bank hakes লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২১ মার্চ, ২০১৬

ফিলিপাইন গোপনে সমঝোতা চেয়েছিল, দেড় মাস আগেই আতিউর জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনাকে

নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা গোপনে সমঝোতা করতে চেয়েছিল ফিলিপাইন। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঘটনাটির সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করা হলে তদন্তসাপেক্ষে খোয়া যাওয়া অর্থের পুরোটাই ফেরত পাবে বাংলাদেশ। কেননা এ ধরনের কেলেঙ্কারির কারণে দোষী দেশ আন্তর্জাতিকভাবে কালো তালিকায় পড়ার বিধান রয়েছে। এ জন্য দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে একটি লিখিত প্রস্তাবও পাঠিয়েছিলেন ১৭ ফেব্রুয়ারি। সে লিখিত প্রস্তাবের একটি অনুলিপি বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে এসেছে। তবে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়ার আগে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই ফিলিপাইন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আমান্দো তাতাঙ্কো ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম ও রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) বরাত দিয়ে একাধিকবার তা গোপন রাখার অনুরোধ করেন। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সে সময়ের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে তাতাঙ্কো এবং ফেডারেল রিজার্ভের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টেলিকনফারেন্সও করেন। পরবর্তীতে তারা এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অ্যান্টি মানি লন্ডারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাউন্সিল (এএমএলসি) ও আন্তর্জাতিক লেনদেন নিষ্পত্তিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্থার সঙ্গেও টেলিকনফারেন্স করেন। ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম ও ফিলিপাইন এ ধরনের ঘটনাকে নন-পাবলিক ও হাই-কনফিডেন্সিয়াল বলে আখ্যায়িত করে তা সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ করে। 

সূত্র জানায়, ফিলিপাইনের গভর্নর চিঠিতে লেখেন, যেহেতু ৬ ফেব্রুয়ারির পরই ঘটনাটি সে দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জেনে যায়। ফলে পুরো ঘটনার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং সে অনুযায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানানো হয়। এক্ষেত্রে ১৭ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা থেকে তাতাঙ্কোর লেখা ওই চিঠিতে একটি উদাহরণও দেওয়া হয়, সর্বশেষ কয়েক বছর আগে পেন্টাগনে বড় অঙ্কের অর্থ চুরির ঘটনা ঘটে। যা ওই দেশের অর্থমন্ত্রীকে জানানো হয় ঘটনার তিন মাস পর এবং তদন্ত ও সমস্যা সমাধানের কাছাকাছি যাওয়ার আরও তিন মাস পর তা সে দেশের প্রেসিডেন্ট ও সংসদকে অবহিত করা হয়। এ আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা না করলে আর্থিক খাতে মানুষের আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়। যা সে দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমন কি ভুক্তভোগী দেশ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে যায়। সূত্র জানায়, ফিলিপাইন ও ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের এ ধরনের প্রস্তাব ও যুক্তি তাত্ক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন সদ্য পদত্যাগী গভর্নর ড. আতিউর রহমান। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর একাধিক উপদেষ্টাকেও জানানো হয়। 

তবে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করা হয় ৬ ফেব্রুয়ারির পরই। যার পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে এবং গোপনীয়তা রক্ষায় সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককেও নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) এবং অ্যাগমন্ট গ্রুপের আইন ও চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের খোয়া যাওয়া অর্থের পুরোটাই আরসিবিসির কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে বাংলাদেশকে ফেরতও দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছিল ফিলিপাইন ও ফেডারেল রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করে, এই অর্থ দীর্ঘ সময় পর হলেও ফেরত পাবে বাংলাদেশ। কেননা আন্তর্জাতিক অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি, দেশ বা প্রতিষ্ঠান ফেডারেল রিজার্ভকে ব্যবহার করে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান এক ডলার মানি লন্ডারিং করলে তার কাছ থেকে দ্বিগুণ হারে জরিমানা আদায় করা হবে। তবে সেটা তদন্ত এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সূত্র জানায়, ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন থাকায় রবিবার সকালেই প্রধানমন্ত্রীকে রিজার্ভ চুরির ঘটনা অবহিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর নির্দেশনা অনুযায়ী ৮ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সে দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তা চায় বাংলাদেশ। এ জন্য ঘটনার আদ্যোপান্ত ও আরসিবিসির লেনদেনের বিবরণসহ যাবতীয় তথ্যের অনুলিপি এএমএলসিতে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, আইন অনুযায়ী এ ঘটনার সমাধান যাই হোক, বাংলাদেশ তার খোয়া যাওয়া অর্থ ফেরত পাক আর না পাক, ফিলিপাইন মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় কালো তালিকায় পড়বেই।

এফবিআইয়ের সঙ্গে সিআইডির বৈঠক : যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনার তদন্তে থাকা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) প্রতিনিধিরা। গতকাল দুপুরে মালিবাগ সিআইডি কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় পারস্পরিক তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা প্রসঙ্গে বৈঠকে কথা হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে শিগগিরই ফিলিপাইন যাচ্ছে সিআইডির তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি দল। তবে এ বিষয়ে আদালত ও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর ২টার দিকে সিআইডি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে অবস্থানরত এফবিআই প্রতিনিধি। সিআইডি কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে চলে এ বৈঠক। বৈঠক শেষে এফবিআই প্রতিনিধি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা না বললেও সিআইডির অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (এডিশনাল ডিআইজি) শাহ আলম বলেন, বেসিক্যালি দুটো বিষয় নিয়ে এফবিআইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। একটি হলো মানিটা যেখানে গিয়েছে সেই মানিটা ব্যাক করে আনা। এটা আমাদের একটা স্বার্থ। আর তাদের স্বার্থ হলো এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা। তিনি আরও বলেন, আলোচনায় টেকনিক্যাল ইস্যু নিয়েই বেশি কথা হয়েছে। এটা সম্ভব যে, আইটি ফরেনসিক এক্সপার্টদের স্কিল ব্যবহার করে, আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হ্যাকারের উৎসটাকে খুঁজে বের করা। আরেকটা হচ্ছে মানি যেখানে পৌঁছেছে মানিটাকে রিভার্সলি ব্যাক করে আল্টিমেট বেনিফিসিয়ারি যারা আছে তাদের চিহ্নিত করা।

সিআইডির কর্মকর্তাদের ধারণা, হ্যাকার চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ না কেউ জড়িত রয়েছে। কিন্তু সে এমন সূক্ষ্মভাবে হ্যাকারদের সহযোগিতা করেছে যা সাধারণ উপায়ে বের করে আনা সময়ের ব্যাপার। সিআইডি সূত্র জানায়, ফিলিপাইনে টাকা যাওয়া, সেখানকার রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার স্ট্রিট শাখার মাধ্যমে টাকা লুটকারীদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা— এসবই পরিষ্কার হয়ে গেছে। এ কারণে ফিলিপাইনের বেনিফিসিয়ারি চক্রটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে পুরো হ্যাকার চক্রটিকে শনাক্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ তাদের সহায়তা করেছে কিনা তা জানা যাবে। মূলত এ কারণেই সিআইডির একটি তদন্ত দল যত দ্রুত সম্ভব ফিলিপাইনে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শাহ আলম বলেন, এই ক্রাইমটা একাধিক দেশের লোকজনের মাধ্যমে হয়েছে। এ জন্য একাধিক দেশের ল-এনফোর্সারদের পারস্পরিক সহায়তাটা আমাদের লাগছে। আমরা ইন্টারপোলকে নিয়ে যেমন কাজ করছি তেমনি এফবিআইকে নিয়েও কাজ করছি। আমাদের প্রথম টার্গেট হলো যত দ্রুত সম্ভব ফিলিপাইনে গিয়ে আল্টিমেট বেনিফিসিয়ারিদের সঙ্গে কথা বলা বা জিজ্ঞাসাবাদ করা। এ জন্য সে দেশের আদালতেরও অনুমতি লাগবে। ঠিক তেমনি আমাদের দেশেরও সরকার ও আদালতের অনুমতি লাগবে। বিষয়টি অন প্রসেসিং রয়েছে।

চলছে তথ্য সংগ্রহ : সিআইডি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিআইডির কর্মকর্তারা প্রত্যেক দিনই তথ্য সংগ্রহ করছে। বেশির ভাগ তথ্যই ডিজিটাল। যেহেতু ঘটনাটি পুরো ডিজিটাল চুরি বা হ্যাকিংয়ের ঘটনা হয়েছে এ জন্য সব তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিশ্লেষণের কাজও চলছে। সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, তারা অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ব্যাক অফিস অব দি ডিলিং রুম, ফরেন এক্সচেঞ্জ ও সিকিউরিটি সার্ভিলেন্স শাখা থেকে গতকাল পর্যন্ত কয়েক ট্যারাবাইট ডাটা সংগ্রহ করেছেন। এখন পর্যন্ত ডাটা সংগ্রহ শেষ হয়নি। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন কম্পিউটারগুলো জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব কম্পিউটার থেকে কোনো ডাটা মুছে ফেলা হয়েছে কিনা বা অন্য কোথাও ট্রান্সফার হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

শতাধিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ : তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তারা এই কয়েক দিনে শতাধিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। যদিও সিআইডির তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এটিকে জিজ্ঞাসাবাদ না বলে মিটিং বা তথ্য সংগ্রহের জন্য আলোচনা বলে দাবি করছেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজ ক্রাইম) মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী বলেন, আমরা সন্দেহের পুরো বিষয়টি ধীরে ধীরে ছোট করে আনার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট করে কোন কম্পিউটারটি হ্যাকিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল তা জানার চেষ্টা করছি।
উৎসঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

সোমবার, ১৪ মার্চ, ২০১৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তায় আসছে ভারতীয় সফটওয়্যার!

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা হ্যাকড হওয়ার পর এবার ব্যাংকটির নিরাপত্তায় আসছে ভারতীয় সফটওয়্যার! বিশ্বব্যাংকের সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি পরিচালক রাকেশ আস্তানার প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিকস’ এ সফটওয়্যার সরবরাহ করবে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা হ্যাকড হওয়ার পর এবার ব্যাংকটির নিরাপত্তায় আসছে ভারতীয় সফটওয়্যার! বিশ্বব্যাংকের সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি পরিচালক রাকেশ আস্তানার প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিকস’ এ সফটওয়্যার সরবরাহ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখা অফিসের সকল পিসিতে নতুন সফটওয়্যার সংযোজনে গত ৭ মার্চ অফিস আদেশে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। গভর্নরের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়েছে, ‘রাকেশ আস্তানার মৌখিক পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সকল বিভাগ, ইউনিটে ও সার্ভারসমূহে তার সরবরাহকৃত সফটওয়্যার (সিকিউরিটি প্যাচ) ইনস্টল করা হোক।’সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারবে তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 

রাকেশ আস্তানার পরামর্শে এবং তারই সরবরাহকৃত নতুন সফটওয়্যার ইনস্টলের আদেশে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তারা নিরাপত্তার পরিবর্তে দেশের আর্থিক খাতে নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন ওনার (রাকেশ আস্তানা) মৌখিক পরামর্শে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সকল পিসিতে ও সার্ভারে সফটওয়্যার বসানো হচ্ছে। ভিনদেশি একজন নাগরিকের কাছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দেশের আর্থিক খাতের সকল নিরাপত্তা তুলে দেওয়া হচ্ছে। এটা দেশের আর্থিক খাতের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।’

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সন্দেহভাজন দুটি কম্পিউটার পরীক্ষারও কাজ পেয়েছে রাকেশ আস্তানা মালিকানাধীন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিকস’। এ ব্যাপারে দৈনিক যুগান্তর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত দুটি কম্পিউটারের হার্ডডিস্কের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ওই হার্ডডিস্ক ইমেজ ফরেনসিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরীক্ষা করার কথা রয়েছে। আর এতে করে জানা যাবে ম্যালওয়ার আক্রমণ কীভাবে করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার ব্যবহারকারী তথ্য সংযোজন বা তথ্য মুছে ফেললে সেটাও স্পষ্ট হবে। তবে এ পরীক্ষার কাজটি করছে ‘ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিকস’ নামে ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠান। তিন দিন আগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকেশ আস্তানা আসেন। এ প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে। আর এর মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট সার্ভার পরীক্ষার জন্য ডাটা পাঠানো হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে।

পত্রিকাটি আরও জানিয়েছে,  বাংলাদেশ ব্যাংকে যে মানের অত্যাধুনিক এন্টিভাইরাস আছে সেখানে ম্যালওয়ার আক্রমণ করার কথা না। তাই এখন তদন্তের বিষয়- কীভাবে ম্যালওয়ার আক্রমণ করল। একই সঙ্গে এ ধরনের ভাইরাস আক্রমণ করলে এন্টিভাইরাস তা সহজে প্রতিরোধের ক্ষমতা রাখে। এজন্য আসলে কী হয়েছিল, সেই জায়গা আগে স্পষ্ট করতে হবে। তারা বলছেন, বাংলাদেশে কয়েকজন উচ্চপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ আছেন। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারের সব লগ পর্যালোচনা করে তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু দেশীয় লোকবল থাকা সত্ত্বেও বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে ডেকে আনার বিষয়টি কেউ কেউ ভালোভাবে নেননি। তারা যুগান্তরকে বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমনকি বাংলাদেশের অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভাইরাস মোকাবেলার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন সিস্টেম চালু করে ভাইরাস বা হ্যাকারদের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে এন্টিভাইরাস ছিল বা আছে, তা দিয়েও প্রতিরোধ করা যেত। কিন্তু প্রতিরোধ করতে না পারায় নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। শর্ষের মধ্যে ভূত আছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলের লোক ছাড়া এটা শুধু বাইরের কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ বিষয়ে প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন কয়েকজন বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে যুগান্তর জানিয়েছে, প্রযুক্তির যুগে এখন নেটওয়ার্ক সিকিউরিটির বিভিন্ন সিস্টেম চালু হয়েছে। এর মধ্যে কোথাও কোথাও ফায়ারওয়াল ব্যবহার করা হয়। যে পিসিতে ইন্টারনেট সংযোগ আছে কিন্তু ফায়ারওয়াল নেই সেই পিসি যে কোনো সময় হ্যাকড হতে পারে। তারা বলেন, তাই ফায়ারওয়াল হল এমন একটা সফটওয়্যার বা ডিভাইস যা অন্য কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিচালিত নেটওয়ার্ক ট্রাফিকগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারে। এ সিস্টেম নিরাপত্তা রক্ষাকারী কিছু বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত। যে কোনো নেটওয়ার্ক কম্পিউটার সিস্টেমে অনুমোদনহীন ইলেকট্রনিক এক্সেসকেও প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রবেশ ও বের হয়ে যাওয়া মেসেজ ফায়ারওয়াল পর্যবেক্ষণ করে। পাশাপাশি প্রতিটি মেসেজ সিকিউরিটির নিয়ম-কানুনগুলো মেনে চলছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে। ফায়ারওয়াল সিস্টেম সব ধরনের প্রবেশ ও বের হওয়া থ্রেট ব্লক করতে পারে। পাশাপাশি ইউটিএম সিস্টেমও কঠোর নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে ব্যাংকের এত কঠোর নিরাপত্তার ভিড়ে সংশ্লিষ্ট কম্পিউটারগুলোয় এ ধরনের সিস্টেম ছিলই না। আর সত্যিই যদি না থাকে তাহলে কেন তা ছিল না সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে।
[ভারতীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিকস’-এর প্রতিষ্ঠাতা রাকেশ আস্তানা। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রকল্পের অধীনে সাইবার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে রাকেশ আস্তানাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে একটি দল এই অর্থ চুরির ঘটনাটি তদন্ত করছে। সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো।]

এদিকে ভারতীয় সফটওয়্যার বিষয়ে দৈনিক আমারদেশ জানিয়েছে, এই সফটওয়্যার সংযোজন করা গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব ডাটা ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সব ধরনের তথ্য দেখতে পারবে সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেশি একটি রাষ্ট্র থেকে এ ধরনের ডাটা আমদানি করা নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। কেন্দ্রেীয় ব্যাংকে অর্থিক সব তথ্য তুলে দেয়া কতটুকু নিরাপদ হবে তা বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশেষজ্ঞরা। পত্রিকাটি আরও লিখেছে, লেনদেনের মাধ্যমেই হউক বা হ্যাকড হয়েই টাকা চুরি করা হোক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে তাকে প্রবেশ করতেই হবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের কোর ব্যাংকিংয়ের একটি জায়গা হল ফরেক্স রিজার্ভ বিভাগ। তাদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এই কা- ঘটানো সম্ভব নয়। পুরো ঘটনার তদন্ত না করে এবং এ ঘটনার জন্য আমাদের সফটওয়্যার দুর্বলতা দায়ী কিনা তা জেনেই ভারতীয় এক ব্যক্তির সফটওয়্যার ব্যবহার করা কতটুকু নিরাপদ হবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল চিন্তিত। তদন্ত শেষ না হতেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নতুন করে নিরাপত্তার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

দৈনিক নায়াদিগন্ত ঘটনার আরও বিস্তর বিবরণ দিয়ে লিখেছে, গত বছরের ২৯ অক্টোবর দেশের অভ্যন্তরে ব্যাংক লেনদেন দ্রুত করতে আরটিজিস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) চালু করা হয়। এটি দেশের অভ্যন্তরেই লেনদেন হওয়ার কথা। এর জন্য সব ব্যাংকে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল সংযোগ দেয়া হয়; কিন্তু কোনো কোনো ব্যাংকের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ ক্যাবল সুইফটে সংযোগ দেয়া হয়। এটিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার নিরাপত্তায়। এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র। ওই সূত্র মতে, এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নরসহ সংশ্লিষ্টরা বিরোধিতাও করেছিলেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আরটিজিএস সিস্টেম হ্যাক করা যেতে পারে, যা সুইফটে সম্ভব নয়। 

ব্যাংকারদের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত সুইফট অধিক নিরাপদ। এখন পর্যন্ত এটি কোথাও হ্যাক হয়নি। এমনকি কোনো ধরনের জালিয়াতিও হয়নি। আর এর পদ্ধতি নানা ধাপে নিরাপত্তার জালে আবদ্ধ। সুইফটে যে বার্তা যায়, এটিও অনেক নিরাপদ। বার্তাটি যায় গার্বেজ আকারে। এটি যেখান থেকে পাঠানো হচ্ছে এবং যেখানে যাচ্ছে দুই স্থানেই একই সফটওয়্যার থাকতে হবে। তা না হলে বার্তাটির ভাষা উদ্ধার করা যাবে না। ফলে ডলার চুরির নেপথ্যে ওই দুই স্থানের যেকোনো এক স্থানের পদ্ধতি সম্পর্কে হ্যাকারকে জানতে হবে। যেটি হ্যাক করে জানা সম্ভব নয়। এ ছাড়া সব কম্পিউটার থেকে সুইফট বার্তাও পাঠানো সম্ভব নয়। একমাত্র ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানই সুইফটের সদস্য। কিন্তু আরটিজিএস হ্যাক করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে নতুন নতুন দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। যদিও এ দাবি মানতে নারাজ বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নীতিনির্ধারকেরা। কিন্তু দুর্ঘটনা একের পর এক ঘটছে এটাই বাস্তবতা। এটিএম কার্ড জালিয়াতি, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি এবং সর্বশেষ রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির ঘটনা ঘটেছে।

হ্যাকিং করার সময় সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল এবং ঘটনা পরবর্তী অনেক তথ্য গায়েব করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক। ইত্তেফাক জানাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ হ্যাকের সময় বন্ধ ছিল দুটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। ঘটনার সময়কালে সংঘটিত লেনদেনের লগ তথ্যও গায়েব। কারা কম্পিউটার ও সার্ভারে প্রবেশ করেছে কিংবা ব্যবহার করেছে সে সংক্রান্ত তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি আইডি শনাক্ত করা গেলেও পুরো লগ তথ্য উদ্ধার করা যায়নি। ঘটনার আগে থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহূত ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ডিলিং রুমের দুটি ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বন্ধ ছিল। ফলে ডিলিং রুমে কারা ছিল, সুইফট কোড ব্যবহার করে কারা কাজ করছিল সেসব তথ্য বের করা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ৪ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ফেডারেল রিজার্ভে ডলার পেমেন্টের বার্তাগুলো পাঠানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং রুমে সুইফটের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে বার্তাগুলো পাঠিয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা অথবা হ্যাকার। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে সিস্টেমে ঢুকতে পৃথক ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড রয়েছে। এই পদ্ধতিতে সিস্টেমে কারা প্রবেশ করল এবং কারা বের হলো সেসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সার্ভারে ও কম্পিউটারে থাকার কথা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনটি আইডিকে শনাক্ত করা গেছে বলে সূত্র জানায়। কিন্তু কোন কর্মকর্তা এই আইডি ব্যবহার করেছেন, কিংবা তাদের আইডি অন্য কেউ ব্যবহার করেছেন কি না সে বিষয়ে তথ্য নিশ্চিত নয়। ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের এই কক্ষে বিশেষ কার্ডের সাহায্যে প্রবেশ করতে হয়। এখানে দুটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির ঘটনার কিছু দিন আগে থেকেই ডিলিং রুমের দুটি ক্যামেরা অকেজো ছিল বলে সূত্রে জানা যায়।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানিয়েছে দৈনিক মানবজমিন। পত্রিকাটি লিখেছে, গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং রুমে সুইফটের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালন ব্যবস্থায় কাজ করেন কয়েকজন কর্মকর্তা। এক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে সিস্টেমে ঢুকতে আলাদা ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব বার্তা পাঠায় সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন বা সুইফটের মাধ্যমে। এ পদ্ধতিতে ঢুকতেও রয়েছে আলাদা পাসওয়ার্ড ও ইউজার নেম। এছাড়া, এটিএম কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের মতো এখানেও একটি কার্ড রয়েছে। নিয়মানুযায়ী এই সিস্টেমে ঢুকে লেনদেন করেই বের হতে হবে। কিন্তু ওই কর্মকর্তারা কাজ শেষে সিস্টেমটি বন্ধ করেননি। আর রাত ৮টা পর্যন্ত সুইফট মেশিনে বিশেষ কার্ডও লাগানো ছিল। ফলে ওই সময়েই লেনদেনের ঘটনাগুলো ঘটে। এখানে যে বার্তাগুলো পাঠানো হয় সেগুলো অতিগোপনে স্থানান্তরিত হয়। প্রতিটি বার্তা সুইফটের মাধ্যমে যাওয়ার সময় এগুলো এনক্রিপ্ট বা সাংকেতিক আকারে যায়। মাঝপথে এগুলো হ্যাক করে ওই ভাষা উদ্ধার করা অসম্ভব। 

রবিবার, ১৩ মার্চ, ২০১৬

রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির মূলে কে বা কারা? চলছে দায় এড়ানোর ‘পিংপং’ খেলা

বহুল আলোচিত রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির হোতাদের এখনও চিহ্নিত করতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি)। বরং ঘটনাটিকে দিন দিন ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা চলছে। এদিকে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে (ফেড) বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট থেকে খোয়া গেছে মোট ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার। এই অর্থ খোয়া যাওয়ার কথা শুরু থেকে অস্বীকার করে আসছে ফেড। তারা বলছেন,বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েই তারা অর্থ ছাড় করেছে। তাদের এই বক্তব্যে প্রমাণ করে ঘটনার সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোক জড়িত। বিশেষজ্ঞরাও বলে আসছে বিতরের কেউ জড়িত। তা না হলে হ্যাকড করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঘটনার সাথে দায়ীদের আড়াল করতে ফেড এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পিংপং খেলা খেলছে।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এসব কথার গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো অর্থমন্ত্রী ফেডারেল রিজার্ভের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের রিজার্ভ (টাকা) যদি ফেডারেল রিজার্ভ থেকে চুরি বা হ্যাকড হয় তাহলে এর জন্য দায়ী হবে ফেড। আর যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনে তা উত্তেলন হয়ে থাকে তাহলে এর দায়ভার কোনভাবেই ফেড নিতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ফেডকে দায়ী না করে নিজেই খোয়া যাওয়া রিজার্ভ (টাকা) ফেরৎ পেলে ফায়ার আইকে নিযোগ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ফিলিপাইন এবং শ্রীলংকার সাথে যোগাযোগ করছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন,ফেড থেকে টাকা চুরি বা হ্যাকড হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এত চিন্তা কেন। এতে বুঝা যায় এই ঘটনায় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জড়িত। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনেই ফেড টাকা ছাড় করেছে এমন দলিল থাকার কারণেই তারা বলছেন,রিজার্ভ থেকে কোন টাকা হ্যাকড হয়নি। এধরনের কোন তথ্য তাদের জানা নেই।

তবে অর্থ লেনদেনের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে টাকা আদান প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করে। এরপর তারা ভিন্ন একাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের জন্য নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে প্রায় ৩০টি অনুরোধ পাঠায়। এর মধ্যে চারটি অনুরোধে ৮১ কোটি ডলার ফিলিপাইনে এবং ২০ কোটি ডলার শ্রীলংকার একাউন্টে স্থানান্তরের অনুরোধ পাঠানো হয়।

পঞ্চম অনুরোধটি শ্রীলংকার একটি অলাভজনক এনজিও শালিকা ফাউন্ডেশনের একাউন্টে স্থানান্তর করতে বলা হয়। কিন্তু তারা ভুল করে শালিকা ফাউন্ডেশনের স্থলে লেখে শালিকা ফ্যান্ডেশন। ফলে অর্থ স্থানান্তরে যাচাইকারী অফিসার এর ক্ল্যারিফিকেশনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানায়। তখনেই ব্যাপারটা ধরা পড়ে, সাথে সাথে স্থানান্তরটি বন্ধ করা হয়। রয়টার্স খোঁজ নিয়ে জেনেছে, শ্রীলংকায় শালিকা ফাউন্ডেশন নামে কোনো নিবন্ধিত এনজিও নেই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো ঠিকানা বা ফোন/ইমেইলও পাওয়া যাচ্ছে না।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি এঘটনা ঘটলেও দীর্ঘ এক মাস পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়টি অর্থমন্ত্রীকে জানায় নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছেন তদন্তের স্বার্থে তারা অর্থমন্ত্রীকে বিষয়টি জানায়নি। তাহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অর্থমন্ত্রীকে তদন্তেকাজে প্রধান বাধা কিনা। তা না হলে কেন তাকে জানানো হল না। প্রকৃত বিষয় হলো ফিলিপাইনের সংবাদ মাধ্যম ‘ইনকোয়্যারার’র গত ৬ মার্চ সংখ্যায় এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তার পরে বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় চলে আসে। গত ৭ মার্চ সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, পত্রিকার মাধ্যমে আমি বিষয়টি জেনেছি। আমার জানা মতে, সরকারের কোন মহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, আমার ব্যাংক হিসাব থেকে যদি বড় অঙ্কের একটি চেক যায়, আমার স্বাক্ষর থাকলেও ব্যাংক কিন্তু আমার কাছে জানতে চাইবে যে আমি চেকটি দিয়েছি কি না। স্বাক্ষর মিললেও কিন্তু করে। একইভাবে আমাদের রিজার্ভের অর্থ যেসব ব্যাংকে রাখা আছে, সেখানে অস্বাভাবিক কোনো লেনদেন যদি হয় তাহলে তারা প্রথমে কোড পরীক্ষা করবে। কোড ঠিক থাকলে যদি টাকার পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে তারা জানতে চাইতে পারত। তিনি আরও বলেন,ভেতরের যুক্ততা ছাড়া হ্যাকিং সহজ নয়।

আমি স্বীকার করি এটা একটা বড় সমস্যা, তবে সংকট নয়। জাতীয় বিপর্যয়ও নয়। এখানে দেখতে হবে যে অর্থ স্থানান্তরটি কীভাবে হয়। রিজার্ভ জনসাধারণের সম্পদ। এর মালিক জনগণের পক্ষে সরকার। আর বাংলাদেশ ব্যাংক এর ব্যবস্থাপক মাত্র। অর্থাৎ ম্যানেজার। এমনভাবে ম্যানেজ করে যাতে আয় বাড়ে বলে মতামত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গর্বনর। 

অর্থ চুরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রভাবশালী মহল ও একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত রয়েছে বলে মনে করে অর্থ মন্ত্রনালয়। এটা হ্যাকিংয়ের ঘটনা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন সুইফট কোড, কার্ড ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই পুরো লেনদেন হয়ে থাকার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে অর্থমন্ত্রণালয়।

বাইরের কারো কাছে এই তথ্য দিয়ে ঘটানো হয়েছে এই লেনদেন বলে মনে করছে অর্থমন্ত্রণলায়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এ বিষয়গুলোকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কাজ পরিচালনা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে বলা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলে সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের এক জরুরি বৈঠক হয়েছে বুধবার।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিব ড. এম আসলাম আলমসহ অন্যান্য পরিচালকরা যোগ দেন। অর্থ কিভাবে গেল, কারা কারা জড়িত, বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতা আছে কি না, সরকারের বিভিন্ন মহলে জানানো হয়নি কেন, সর্বশেষ অবস্থা কি ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্বনরকে জিজ্ঞাসা করেছে পরিচালকরা।

সূত্র জানায়, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে পৃথিবীর সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান লেনদেন করে সুইফট কোডের মাধ্যমে। কর্তৃপক্ষ এই সুইফট কোড লেনদেনের জন্য ঝুঁকিমুক্ত উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন নির্দিষ্ট সফটওয়্যার ব্যবহার করে। এই সফটওয়্যারটি হ্যাক হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে হয় নির্দিষ্ট কোড, কার্ড ও সংকেতের মাধ্যমে। এই কোড দিয়ে তথ্য প্রেরণ করার পরেই পুরো তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পরিবর্তন হয়ে নতুন সাংকেতিক চিহ্নে রুপান্তরিত হয়। এভাবেই বদলাতে বদলাতে সাংকেতিক চিহ্নের মাধ্যমে রিসিভার কম্পিউটারে পৌঁছে যায়। রিসিভার কম্পিউটার পুনরায় সিঙ্কক্রোনাইজ হওয়া তথ্য প্রেরণকারী সার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তথ্য উদ্ধার করে। পুরো প্রক্রিয়াটা নিরাপদ হওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে সুইফট প্রক্রিয়াটি অর্থ লেনেদেনে সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এর বাইরেও নতুন লেনদেনের জন্য সর্বশেষ লেনদেনের একটি সাংকেতিক চিহ্ন দিতে হয়। যা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তিন সেকশনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই জানেন।

জানা গেছে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের রক্ষিত অর্থ হ্যাক করার কয়েক সপ্তাহ আগে হ্যাকাররা ব্যাংকের কম্পিউটার ব্যবস্থায় ম্যালওয়্যার ইনস্টল করে রেখেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে নিউইয়র্কে তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলন করে, এই ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে তা নজরদারি করেছিল হ্যাকাররা। দুই ব্যাংক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, পুরো প্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে তা এখন খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা যাচাই-বাছাই করে দেখছে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে জানতে একাধিক বৈঠক করছেন দেশের সাইবার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সুইফট কোডের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করার সময় কিছু টার্ম এন্ড কন্ডিশন থাকে। কিছু লিগ্যাল বিষয় আছে। আমরা পুরো প্রক্রিয়াটা খতিয়ে দেখব। তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা তাও দেখা হচ্ছে। তা দেখেই পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

এ ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ জড়িত থাকতে পারে এমনটা ধরে নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকের ১০ কর্মকর্তার পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। তাদের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি পেলে তাদের জিজ্ঞেস করবেন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা।

উল্লেখ্য নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে বিশ্বের ২৫০টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক একাউন্ট আছে। ফেডের এ রিজার্ভে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগার ও বিভিন্ন এজেন্সি ঋণের অর্থ সঞ্চিত থাকে।