Mowlana Bhasani লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Mowlana Bhasani লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২২ মে, ২০১২

নজরুলের ধর্মচিন্তা এবং মওলানা ভাসানীর ইঙ্গিত

 
বাংলাদেশের অন্য সব মানুষের মতো কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাকেও ছোটবেলা থেকেই গভীরভাবে আকর্ষণ করেছেন। ১৯৬০-এর দশকে ছাত্র রাজনীতি এবং আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছিলাম বলে নজরুলের কবিতা ও সংগীত আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। সত্যি বলতে কী, ঘটনাক্রমে কবিতা আবৃত্তির বাইরে নজরুলের সাহিত্য খুব বেশি পড়া হয়নি। কিন্তু নজরুলকে নিয়ে, তাঁর জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে বহু আলোচনা শুনেছি। কিছু কিছু পড়েছিও। তাঁর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, গ্রেফতার ও কারাবাস থেকে দারিদ্র্য, বিয়ে ও পারিবারিক জীবন পর্যন্ত সব বিষয়েই আমাদের আগ্রহ ছিল তুমুল রকমের। কেন ও কীভাবে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং চিরদিনের জন্য অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তা নিয়েও কৌতূহলের অন্ত ছিল না। এ সম্পর্কে নানা কাহিনী শোনা যেত। এসবের মধ্যে আবার চমত্কার কৌশলে সাম্প্রদায়িক উপাদানও মিশিয়ে দেয়া হতো। বিভ্রান্ত হই সত্য, তবে আমরাও জল্পনা-কল্পনা কম করতাম না। এখনও বিশেষ করে নজরুলের ধর্মীয় চিন্তার বিষয়টি আমাকে ভাবায়। যেহেতু বিস্তারিত পড়িনি এবং গবেষণা করিনি, সেহেতু জোর দিয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়। উচিত তো নয়ই।
তাই বলে একেবারে থেমেই বা যাওয়া কেন? দু-একটি বিষয়ের উল্লেখ তো করাই যেতে পারে। যেমন মুসলমান হলেও কবি বিয়ে করেছিলেন আশালতা সেনগুপ্তাকে, পরবর্তীকালে যিনি প্রমীলা নজরুল নামে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁরা কেউই ধর্মান্তরিত হননি, যার যার ধর্ম পালন করেছেন। শ্বাশুড়ি গিরিবালা দেবী তো বহু বছর নজরুলের সঙ্গেই থেকেছেন। কবির বাসায় তার জন্য সব সময় আলাদা পূজার ঘর থাকত। সেখানে তিনি পূজা-অর্চনা করতেন। নজরুল ও প্রমীলা ধর্ম পরিবর্তন না করার কারণে তাদের কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চাইত না। রক্ষণশীল হিন্দুরা এমনকি এ প্রচারও করত, যাতে কোনো হিন্দু মালিক তাদের বাড়ি ভাড়া না দেয়। সে কারণে নজরুলকে হুগলী ও কৃষ্ণনগরের মতো বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। কলকাতায়ও তিনি এক বাড়িতে বেশি দিন বসবাস করতে পারেননি। অভাব ও দারিদ্র্যের পাশাপাশি ধর্মের বিষয়টি তাঁকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়াত। এভাবে অবশ্য কুপোকাত করা যায়নি নজরুলকে। কারণ, প্রমীলা ছিলেন তার স্বপ্নের ‘রানী’—যার কাছে তিনি ‘হার’ মেনেছিলেন ‘আজ শেষে’।
নজরুল তাঁর প্রথম ছেলের নাম রেখেছিলেন ‘কৃষ্ণ মোহাম্মদ’। আজাদ কামালও তারই নাম ছিল, কিন্তু বেশি আলোচিত ও পরিচিত হয়েছে ওই কৃষ্ণযুক্ত নামটিই। নামের দ্বিতীয় অংশের তাত্পর্য নিয়ে সম্ভবত কথা বাড়ানোর দরকার পড়ে না। এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, ধর্মের ব্যাপারে নজরুলকে এক বিচিত্র ভাবনায় ও ইচ্ছায় পেয়ে বসেছিল। কবির দ্বিতীয় ছেলের নাম ছিল অরিন্দম। অন্য দুই ছেলে কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ নাম দুটিও কালের পরিপ্রেক্ষিতে ঠিক মুসলমানসুলভ ছিল না।
বিয়ে বা সন্তানদের নাম সম্পর্কেই শুধু বলা কেন, লেখালেখিতেও তো কম দেখাননি তিনি। হিন্দুদের পুরাণ ও মহাভারতের কাহিনীনির্ভর ‘শকুনিবধ’, ‘রাজা যুধিষ্ঠিরের সং’ ও ‘দাতা কর্ণ’সহ অসংখ্য নাটক ও রচনা রয়েছে তাঁর। হিন্দুদের মতো শক্তিরও পূজারী ছিলেন তিনি। শিব, লক্ষ্মী, সরস্বতী এবং রাধা ও কৃষ্ণসহ হিন্দুদের দেব-দেবীদের নিয়ে শ্যামা সংগীত, ভজন, আগমনী ও কীর্তনও তিনি অনেকই রচনা করেছেন। একই নজরুল আবার প্রধানত ফার্সি ও উর্দুতে রচিত গজলের অনুকরণে বাংলায় গজল লিখেছেন। গোলাপের কাছে জানতে চেয়েছেন, এই ফুল নবীর তথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পায়ে চুমু খেয়েছিল বলেই তাঁর খুশবু আজও গোলাপের তৈরি আতরে পাওয়া যায় কি-না? বুলবুলিকে জিজ্ঞেস করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম জপেছিল বলেই তার কণ্ঠও এত মধুর কি-না? পবিত্র আল কোরআন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.), নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতও এসেছে নজরুলের প্রধান বিষয় হিসেবে। হজরত ওমর (রা.), হজরত আলী (রা.) প্রমুখকেও নজরুলই ইতিহাসের আলোকে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি তাই বলে ধর্মান্ধতার শিকার হননি বরং পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ‘টিকি’ রাখলেই হিন্দু পণ্ডিত হওয়া যায় না, মুসলমান মোল্লা হওয়া যায় না ‘দাড়ি’ রাখলেই। নজরুল একই সঙ্গে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে ‘মানুষ’ হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের প্রতি।
কে জানে, এভাবেই নজরুলের ভেতরে নতুন ধরনের কোনো ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক চিন্তা দৃঢ়মূল হয়েছিল বা হচ্ছিল কি-না।
এখানে নজরুল সম্পর্কে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর খুবই তাত্পর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য স্মরণ করা যায়। মওলানা ভাসানী শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, পীর বা কামেল দরবেশ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পাশাপাশি আসামসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর মুরিদের সংখ্যা কয়েক লাখ। নজরুল প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানীকে হঠাত্ টেনে আনার বিশেষ কারণ রয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কাজী নজরুল ও মওলানা ভাসানীর শৈশব ও কৈশোরের অনেক মিল রয়েছে। অভিভাবকহীন অবস্থায় নজরুল তথা ‘দুখু মিয়া’ ওই বয়সে এক খুঁটি থেকে অন্য খুঁটিতে গেছেন। ‘চ্যাকা মিয়া’ নামে পরিচিত মওলানা ভাসানীর অবস্থাও ছিল নজরুলের মতোই। কৈশোরে ‘দুখু মিয়া’ ঘেটু দলে অর্থাত্ যাত্রা দলে যোগ দিয়েছিলেন। ‘চ্যাকা মিয়া’ নামের মওলানা ভাসানীকেও কৈশোরে ঘেটু দলের সঙ্গেই একটা সময় কাটাতে হয়েছিল। নজরুল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন, মওলানা ভাসানীও সারা জীবন শুধু আন্দোলনই করেছেন। তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন ‘প্রোফেট অব ভায়োলেন্স’ নামে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ‘টাইম’ ম্যাগাজিন এই ‘প্রোফেট অব ভায়োলেন্স’ ভাসানীকে নিয়েই প্রচ্ছদ কাহিনী প্রকাশ করেছিল।
১৯২৮ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত সময়কালে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে কবি নজরুলের বহুবার দেখা ও কথা হয়েছে। আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী সে সময় অবিভক্ত বাংলা ও আসামের বিভিন্ন এলাকায় কৃষক-প্রজা সম্মেলন করেছেন। কিন্তু অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মূলত ভবঘুরে ধরনের স্বভাবের কারণে নজরুলকে কোনো সম্মেলনে অতিথি করে আনতে পারেননি। এই দুঃখের কথা তিনি নিকটজনদের কাছে বলেছেন। নজরুল সম্পর্কে মওলানা ভাসানীর চিন্তা ঠিক সাধারণ মানুষের মতো ছিল না। যেমন তিনি মনে করতেন, ১৯৩৭ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে নজরুল আধ্যাত্মিক সাধনায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম পীর বা সুফিদের তরিকার সঙ্গে বৈদিক তন্ত্র-মন্ত্রের অনুশীলন ও মিশ্রণ করতে গিয়ে নজরুল সম্ভবত ভারসাম্য রাখতে পারেননি। দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এটাই স্বাভাবিক। কারণ মুসলমানদের ক্ষেত্রে পীর-দরবেশের এবং হিন্দুদের ক্ষেত্রে গুরুর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান তথা নির্দেশনা ও পরিচালনা ছাড়া কোনো ব্যক্তির পক্ষে আধ্যাত্মিক সাধনায় সফল হওয়া সম্ভব নয়। তাকে দিকভ্রান্ত হতেই হবে। এজন্যই বহু মানুষকে এখনও পাগল হয়ে যেতে দেখা যায়। ভাসানী অনুসারী অনেকের ধারণা, মওলানা ভাসানী সম্ভবত বোঝাতে চাইতেন, দেহ ও মনোজগতে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক বিভিন্ন বিষয়ের প্রচণ্ড সংঘর্ষের পরিণতিতেই নজরুল বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। মওলানা ভাসানী তাঁর এক কৌতূহলী ভক্তকে বলেছিলেন, নজরুল ‘যে দেখা দেখতে গিয়ে’ নিজেই অন্যের ‘দেখার বিষয়ে’ পরিণত হয়েছেন, তার ‘খোঁজ’ করো না কেন? নজরুলের উপলব্ধি সম্পর্কে বুঝতে হলে প্রথমে সেই জগতে পৌঁছাতে হবে, যে জগতে তাঁর বিচরণ ছিল। মওলানা ভাসানীর এই কথাটা কিন্তু কথার কথা ছিল না।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হলে মওলানা ভাসানী একবার ধানমন্ডির বাসভবনে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। এটা ১৯৭২ সালের মে মাসের শেষ বা জুন মাসের প্রথম দিকের ঘটনা। ‘হক-কথা’ সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারী লিখেছেন, ‘নজরুল নিচের তলায় একটি লম্বা সোফায় ছেলেমানুষের মতো জড়সড় হইয়া চোখ বুজিয়া শুইয়া ছিলেন। মেঝেতে কার্পেট বিছানো ছিল। হুজুর (মওলানা ভাসানী) সরাসরি নজরুলের সম্মুখে গিয়ে (যেভাবে নামাজে বসিতে হয়) বসিলেন। কবি ভবনের আঙ্গিনায়, বারান্দায় ও ভিতরে মানুষ গমগম করিতেছিল। কবির মুখাবয়বের দিকে হুজুর এক দৃষ্টিতে কতক্ষণ তাকাইয়া রহিলেন। এর মধ্যে কবি দুইবার কি তিনবার চোখ মেলিয়া তাকাইলেন। অতঃপর বুজিয়া যেভাবে শুইয়াছিলেন সেইভাবেই শুইয়া রহিলেন। হুজুর মিনিট তিনেক চোখ বুজিয়া বসিয়া রহিলেন। অতঃপর কাগজ কলম চাহিয়া লইলেন এবং তাহাতে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়া এবং তাঁহাকে দোয়া করিয়া ৭/৮টি বাক্য লিখিলেন।’ (সৈয়দ ইরফানুল বারী, ‘আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী’, ২০০৪; পৃষ্ঠা : ৬৩-৬৬)।
মাত্র কয়েক মিনিটের হলেও এই ঘটনার মধ্যে চিন্তার যথেষ্ট খোরাক রয়েছে। তাছাড়া কবি নজরুলের অধ্যাত্মিক সাধনা প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানীর কথাগুলো নিয়েও বিশেষভাবে চিন্তা করা দরকার। এর মধ্য দিয়ে নজরুল সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত বা উপসংহারও বেরিয়ে আসতে পারে। হ

মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল ও বর্তমানের করণীয়


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়েকটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ও দিক-নির্ধারণী হিসেবে উল্লেখযোগ্য হয়ে রয়েছে, মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে অনুষ্ঠিত ফারাক্কা মিছিল সে সময়ে জাতীয় স্বার্থে খুবই ফলপ্রসূ অবদান রেখেছিল। এখনও ফারাক্কা মিছিলের তাত্পর্য বিশেষভাবে অনুধাবন করা দরকার। কারণ, ভারতের যে পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী মিছিলটির আয়োজন করেছিলেন, সে পানি আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। দেশটি একইসঙ্গে পানি আগ্রাসনকে আরও ব্যাপক ও ভয়ঙ্কর করে চলেছে। ভারত আমাদের শুধু পানির ন্যায্য হিস্যা থেকেই বঞ্চিত করছে না, বাংলাদেশকে পানি-প্রতিবন্ধী রাষ্ট্রেও পরিণত করতে চাচ্ছে। সুতরাং ফারাক্কা মিছিলের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দরকার ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা।
প্রথমে ফারাক্কা মিছিলের কথা সেরে নেয়া যাক। মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগে, ৯৬ বছর বয়সে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এ ঐতিহাসিক মহামিছিলের আহ্বান জানিয়েছিলেন। নেতৃত্বও তিনি নিজেই দিয়েছিলেন। লাখ লাখ নারী-পুরুষ সে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন (১৬ মে, ১৯৭৬)। রাজশাহীর মাদরাসা ময়দানে মওলানা ভাসানীর দেয়া মাত্র ১০ মিনিটের এক ভাষণের মধ্য দিয়ে মিছিলের শুরু হয়েছিল। রাজশাহী, প্রেমতলী, নবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জ হয়ে কানসাটে গিয়ে ১৭ মে মিছিলের সমাপ্তি টেনেছিলেন মওলানা ভাসানী। পায়ে হেঁটে দু’দিনে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন মিছিলকারীরা। কানসাট হাই স্কুল ময়দানে ফারাক্কা মিছিলের সমাপ্তি ঘোষণার সময় মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিতে ভারত সরকারকে বাধ্য করার জন্য আমাদের আন্দোলনের এখানেই শেষ নয়।’ ফারাক্কা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে মওলানা ভাসানী আরও বলেছিলেন, ‘ভারত সরকারের জানা উচিত, বাংলাদেশীরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না, কারও হুমকিকে পরোয়া করে না।...’
ফারাক্কা মিছিল মওলানা ভাসানীর দিক থেকে কোনো বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন দেয়াকে পুঁজি বানিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রাথমিক দিনগুলোতেই ভারতের আধিপত্যবাদী সরকার ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশকে অবাধ লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতা ও সহযোগিতার সুযোগে হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ও অন্যান্য সম্পদ পাচার হয়েছে ভারতে। সমগ্র দেশ ছেয়ে গেছে ভারতীয় পণ্যে, চোরাচালান হয়েছে সর্বব্যাপী। গোপন ও প্রকাশ্য বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমেও বাংলাদেশকে রাতারাতি ভারতের ইচ্ছার অধীনস্থ করা হয়েছিল। এই কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী নতুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। ‘মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বেরুবাড়ী ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বিনিময়ে তিনবিঘা করিডোরসহ বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো আদায় করতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার।
একইসঙ্গে ভারত পেয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালু করার সম্মতি। এই সম্মতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য মরণ বাঁধ হিসেবে চিহ্নিত ফারাক্কা বাঁধ চালু করার ব্যাপারে ভারত নিয়েছিল চাতুরিপূর্ণ কৌশল। মুজিব-ইন্দিরা যুক্ত ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ফারাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষ যাতে সমঝোতায় আসতে পারে সেজন্য ভারত প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ফিডার ক্যানেল চালু করবে। যুক্ত ইশতেহারের এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। কিন্তু ৪১ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি নিয়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। ভারতের এই একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সর্বনাশ সূচিত হয়েছিল। দেশ ও জাতির সেই দুঃসময়ে অভয় ও আশ্বাসের বাণী মুখে এগিয়ে এসেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ভারতের শাসকগোষ্ঠীবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি প্রথম থেকেই ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করে এসেছেন। ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির বিরুদ্ধেও তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন এবং ভারতকে বেরুবাড়ী না দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরদিন, ১৯৭৪ সালের ১৭ মে এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে ফারাক্কা বাঁধের পানি বণ্টনের মীমাংসা বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য হায়াত ও মউতের প্রশ্ন ছিল। কিন্তু ইহার কোনো মীমাংসা করা হয়নি।’
ভারত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের দেয়া সম্মতির আড়াল নেয়ায় ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল। একদিকে ভারতের পক্ষ থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট সঙ্কট এবং অন্যদিকে সীমান্তে সশস্ত্র আক্রমণ ও সামরিক তত্পরতার ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছিল। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত অভ্যুত্থানে বাকশাল সরকারের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর থেকে সীমান্তে সশস্ত্র হামলা শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশের মুজিব অনুসারীদের নাম প্রচার করা হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামলা আসলে ভারতের সেনাবাহিনী এবং বিএসএফ চালাচ্ছিল। ভারতের এই যুদ্ধবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এ উদ্দেশ্যে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ব্যাপকভাবে সীমান্ত এলাকা সফর করেন। সন্তোষে ফিরে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আক্রমণের কলাকৌশল ও ধ্বংসলীলার ব্যাপকতা দেখিলে যে কোনো পর্যবেক্ষকই স্বীকার করিবেন যে, সাধারণ দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা এই কাজ সম্ভব নহে; বরং ইহা অভিজ্ঞ ও দক্ষ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারাই সংঘটিত হইয়াছে।’ (৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬)
মওলানা ভাসানী এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে নিজের চোখে সীমান্ত পরিস্থিতি দেখে যাওয়ার জন্য তার প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি ১৯৭৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক ‘খোলা চিঠি’তে ইন্দিরা গান্ধীকে নিজের কন্যা হিসেবে সম্বোধন করে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম মহাপুরুষ মহাত্মা গান্ধীকে আপনার দেশের বিশ্বাসঘাতক নথুরাম গডসে হত্যা করিয়া যে মহাপাপ করিয়াছে তাহার চেয়েও জঘন্য পাপ আপনার দেশের দস্যুরা করিতেছে।’ সীমান্তের গোলযোগ ও জনগণের ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দিয়ে মওলানা ভাসানী তার ‘খোলা চিঠি’তে লেখেন, ‘আমার আন্তরিক আশা, আপনি স্বচক্ষে দেখিলেই ইহার আশু প্রতিকার হইবে এবং বাংলাদেশ ও হিন্দুস্থানের মধ্যে ঝগড়া-কলহের নিষ্পত্তি হইয়া পুনরায় বন্ধুত্ব কায়েম হইবে। ফারাক্কা বাঁধের দরুন উত্তরবঙ্গের উর্বর ভূমি কিভাবে শ্মশানে পরিণত হইতেছে তাহাও স্বচক্ষে দেখিতে পাইবেন।’
উদাত্ত আহ্বান জানানো সত্ত্বেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ার পরই মওলানা ভাসানী ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। আরও একবার ফারাক্কা কবলিত উত্তরবঙ্গ সফর শেষে ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক সমাবেশে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘গঙ্গা আন্তর্জাতিক নদী। ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিধান অনুযায়ী ভারত এককভাবে এই নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে না।’ প্রতিবাদী কর্মসূচি হিসেবে ফারাক্কা মিছিলের জন্য ১৬ মে-কে বেছে নেয়ার পেছনেও মওলানা ভাসানীর স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। কারণ ১৯৭৪ সালের ওই দিনটিতেই স্বাক্ষরিত হয়েছিল মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি। ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করতে গিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘ভারত সরকার পানি প্রত্যাহারের মাধ্যমে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের ন্যায্য অধিকারের উপর হামলা চালালে বাংলাদেশের আট কোটি মানুষ তা জীবন দিয়ে প্রতিরোধ করবে।’
ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণার পাশাপাশি মওলানা ভাসানী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। এই চিঠিতেও তিনি ফারাক্কা সমস্যার সমাধান এবং বাংলাদেশকে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেছিলেন, ‘ভারত সরকার যদি কিছু না করে তাহলে আমরা ভারতের ষাট কোটি জনতার কাছে বিচার চাইব।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন ১৯৭৬ সালের ৪ মে। মওলানা ভাসানীর চিঠিতে তিনি ‘ব্যথিত ও বিস্মিত’ হয়েছেন জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধী লিখেছিলেন, ‘এ কথা কল্পনাও করা যায় না যে, যিনি আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের নিজের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে দুঃখ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে শরিক হয়েছেন, সেই তিনি এখন কীভাবে এতটা মারাত্মকরূপে আমাদের ভুল বুঝেছেন, এমনকি প্রশ্ন তুলেছেন আমাদের উদ্দেশ্যের সততা সম্পর্কে।’ ১৫৬ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ ভারতের পক্ষে ‘পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়’ জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধী সবশেষে লিখেছেন, ‘আমি আশ্বাস দিয়ে আপনাকে বলতে চাই, যে কোনো যুক্তিসঙ্গত আলোচনার জন্য আমাদের দরজা খোলা থাকবে। কিন্তু কারও এ কথা মনে করা উচিত নয় যে, ভারত কোনো হুমকি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অযৌক্তিক দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করবে।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে মওলানা ভাসানীর অনুরোধ উপেক্ষিত হয়েছিল। তাছাড়া বিশেষ করে শেষের বাক্যে ছিল প্রচ্ছন্ন হুমকি। জবাবে ফারাক্কার কারণে ক্ষয়ক্ষতি নিজের চোখে দেখে যাওয়ার জন্য আরও একবার আহ্বান জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে মওলানা ভাসানী লিখেছিলেন, ‘পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে আমি আপনার মনোভাবের প্রশংসা করি। কিন্তু সে সমাধান হতে হবে স্থায়ী এবং ব্যাপকভিত্তিক। এই সমাধান শুধু শুষ্ক মৌসুমের জন্য হলে চলবে না, সারা বছর ধরে পানির প্রবাহ একই পরিমাণ হতে হবে।’ সংঘাত ও শত্রুতা এড়িয়ে এবং আমলাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান অর্জন করার আহ্বানের পুনরুল্লেখ করে চিঠির শেষ দিকে মওলানা ভাসানী লিখেছিলেন, ‘আপনি যদি আমার এই অনুরোধ রক্ষা না করেন, তাহলে সমস্যার সমাধান অর্জনের জন্য আমি নির্যাতিত জনগণের নেতৃবৃন্দ তথা আপনার পূর্বপুরুষ ও মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার ভিত্তিতে আমার ভবিষ্যত্ সংগ্রামের কর্মসূচি নির্ধারণ করতে বাধ্য হবো।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আর কোনো সাড়া না পাওয়ায় মওলানা ভাসানী ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি পরিবর্তন করেননি। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে অনুষ্ঠিত ফারাক্কা মিছিল ছিল মওলানা ভাসানীর সমগ্র কর্মসূচির অংশ। সে বছরের ১৮ এপ্রিল কর্মসূচি ঘোষিত হওয়ার পর স্বল্প সংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এবং ভারতপন্থী কয়েকটি দল ছাড়া সব দল সমবেত হয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। ‘চলো চলো—ফারাক্কা চলো’ স্লোগান মুখে সারাদেশ থেকে লাখ লাখ নারী-পুরুষ গিয়েছিল রাজশাহী—ফারাক্কা মিছিলের সূচনাস্থলে। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ বিশাল মিছিল গিয়েছিল ফারাক্কা অভিমুখে। পরদিন ১৭ মে মিছিল শেষ হয়েছিল কানসাটে গিয়ে, বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে। এই মিছিলের আতঙ্কে ভারত সরকার রীতিমত যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানী তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের দরিদ্র নিরস্ত্র মানুষের ভয়ে ভারতকে যখন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করতে হয়েছে, তখন তার অবিলম্বে ফারাক্কা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত।’
একথা সত্য যে, ভারতের সম্প্রসারণবাদী ও অবন্ধুসুলভ মনোভাবের কারণে মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু একথাও স্বীকার করতে হবে যে, মূলত এই মিছিলের জনপ্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর ব্যাপক প্রচারণার ফলেই ভারতকে বহুদিন পর বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছিল। জনগণের ঐক্য সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানকেও সাহস জুগিয়েছিল। ১৯৭৬ সালেই তিনি জাতিসংঘে ফারাক্কা বাঁধের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক কমিটির ২৪ নভেম্বরের সর্বসম্মত বিবৃতির ভিত্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছিল এবং এই প্রক্রিয়ায় ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘ফারাক্কা চুক্তি’। বাংলাদেশের অনুকূলে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল চুক্তিটির উল্লেখযোগ্য বিষয়। ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ থাকায় ভারত কখনও যথেচ্ছভাবে পানি প্রত্যাহার করতে কিংবা বাংলাদেশকে কম হিস্যা দিতে পারেনি। অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আগত আরেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরপর, ১৯৯৭ সালের মার্চেই ভারত চুক্তি লঙ্ঘন করেছিল। সর্বনিম্ন পরিমাণ পানি পাওয়ার রেকর্ডও স্থাপিত হয়েছিল সে বছরই। যুক্তি দেখাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির ওপর তো কারও হাত নেই!’ অন্যদিকে অনুসন্ধানে জানা গিয়েছিল, ভারত ৬৫ শতাংশেরও বেশি পানি আগেই উজানে উঠিয়ে নিয়েছে। অথচ ভারতবিরোধী হিসেবে পরিচিত পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের সময় ১৯৯৫ সালের ২৭ মার্চও বাংলাদেশ পেয়েছিল ১৬ হাজার ৮৮১ কিউসেক পানি। ১৯৭৭ সালের চুক্তির ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল এর কারণ। এটাই ছিল মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিলের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। ফারাক্কা মিছিলের মাধ্যমে আংশিকভাবে হলেও গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত দাবি ও অধিকার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ফারাক্কা মিছিলের কারণে শুধু নয়, মওলানা ভাসানী স্মরণীয় হয়ে আছেন জাতির সঙ্কটকালে দুর্দান্ত সাহসে এগিয়ে আসার এবং বলিষ্ঠভাবে নেতৃত্ব দেয়ার কারণেও। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি দেশপ্রেমিক প্রধান জাতীয় নেতার অবস্থানে থেকেছেন এবং ভারতের শোষণমূলক সম্প্রসারণবাদী নীতি ও বাংলাদেশকে ইচ্ছাধীন করার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৯৬ বছর বয়সেও তিনি ফারাক্কা মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন, সে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতীয়রা হুমকি দিয়ে এবং সীমান্তে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েও মওলানা ভাসানীকে এক চুল পরিমাণ টলাতে পারেনি। সম্পূর্ণ সাফল্য অর্জন করতে না পারলেও ফারাক্কা মিছিলের মাধ্যমে মওলানা ভাসানী গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের দাবি ও অধিকার আদায় করার পথ দেখিয়ে গেছেন। বর্তমান পর্যায়ে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিকদের উচিত মওলানা ভাসানীর দেখিয়ে যাওয়া পথে পা বাড়ানো এবং ফারাক্কা মিছিলের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক
shahahmadreza@yahoo.com

বুধবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১১

ভাসানীর ‘খামোশ’ ধ্বনিত হোক নতুন কণ্ঠে


বাংলাদেশের কিংবদন্তি রাজনৈতিক নেতা এবং মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী মাতৃভূমির যেকোনো সঙ্কটে রাজপথে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করতেন। ভাসানীর ক্ষোভ, ক্রোধ, প্রতিবাদ একটি গুরুগম্ভীর শব্দে উচ্চারিত হতো- ‘খামোশ’। তার এই গুরুগম্ভীর প্রতিবাদী শব্দের সাথে দলের নেতাকর্মীরা ও দেশবাসী পরিচিত ছিলেন। ভাসানী সমাবেশে ‘খামোশ’ উচ্চারণ করলেই জনতা উপলব্ধি করত গণ-আন্দোলনের ডাক আসছে, জনগণকে প্রস'ত হতে হবে, অপশক্তিকে মোকাবেলা করতে হবে। একজন বামপন'ী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এই মহান নেতার অনুপসি'তি এ মুহূর্তে মর্মে মর্মে আমি উপলব্ধি করছি। দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিতে মানুষ দিশেহারা, মৌলিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত, জ্বালানি তেল, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে জনগণের জীবনে নাভিশ্বাস, বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে, ভারত তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দেবে না, বরং ফারাক্কার মতো আমাদের মেরে ফেলার জন্য টিপাইমুখ বাঁধ করতে উদ্যত। শেয়ারবাজারে ধস, রিজার্ভে বৈদেশিক মুদ্রা কমে গেছে, এক কঠিন অবস'ায় আমরা জাতি হিসেবে দিনাতিপাত করছি। সমাজ বিপ্লবের নিয়ামক শক্তি তথা বামপন'ীরা বিভক্ত, কেউ কেউ ধনিক শ্রেণীর রাজনৈতিক ধারার সাথে যুক্ত, দৃশ্যমান কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছেন না। কিন' মুক্তির অন্বেষায় দেশবাসী উন্মুখ। সেই সময় বিকল্প রাজনৈতিক আন্দোলনের নতুন ধারা তৈরি করছেন রোডমার্চের নামে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। ২৭ নভেম্বর খুলনায় লাখ লাখ মানুষের সামনে কথা বললেন তিনি। দেশবাসী তথা রাজনৈতিক মহল প্রত্যাশা করে, জনদুর্ভোগের এই চরমতম মুহূর্তে ভাসানীর মতো খালেদা জিয়া দেশী-বিদেশী সব অপশক্তির বিরুদ্ধে স্বদম্ভে উচ্চারণ করবেন ‘খামোশ’।
মনে পড়ে ১৯৭০ সালে বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বেশির ভাগ মানুষ যখন ভোট যুদ্ধে ব্যস্ত, যে নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ বেশির ভাগ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছিলেন। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়ন করি, কমিউনিস্ট পার্টি তখন বেআইনি, আমাদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল তখন মোজাফফর ন্যাপ প্রতীক হচ্ছে কুঁড়েঘর, তখন দাকোপ-বটিয়াঘাটা নির্বাচনী এলাকায় কুঁড়েঘরের প্রার্থী ছিলেন প্রয়াত ডা: নারায়ণ গোলদার। স্বাভাবিকভাবেই সক্রিয় কর্মী হিসেবে আমি সেই নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত। ভোলায় ১২ নভেম্বরের ঝড়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ গেল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এতই অমানবিক যে, হেলিকপ্টারে করেও দেখতে এলেন না এই লাখ লাখ মানুষের লাশ। মওলানা ভাসানী নির্বাচন বর্জন ঘোষণা করলেন, পশ্চিম পাকিস্তানকে জানিয়ে দিলেন ‘আসসালামু আলাইকুম’ এবং ঢাকায় বিশাল সমাবেশে ক্রোধে উচ্চারণ করলেন ‘খামোশ’। তার পরের ইতিহাস দেশবাসীর জানা। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর অভূতপূর্ব বিজয়ে, ইয়াহিয়ার নির্বাচনী ফলাফলকে না মানা, জনতার সংগ্রাম, আলোচনার নামে গোলটেবিলে কালক্ষেপণ, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, ঘরে ঘরে বাঙালির প্রস'তি, ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউন, বাঙালির সশস্ত্র ৯ মাসের স্বাধীনতার লড়াই ও স্বাধীনতা অর্জন। কিন' ইতিহাসের এই ধারায়- প্রক্রিয়ায় মওলানা ভাসানীর ক্রোধ প্রকাশ ‘খামোশ’ গুরুত্বপূর্ণ।
এ মুহূর্তে মনে পড়ছে স্বাধীন বাংলাদেশে মওলানা ভাসানী যখন খুলনায় এসেছেন, তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। দেশে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত, রক্ষী বাহিনীর ভূমিকায় মানুষ অতিষ্ঠ, চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ, ভারত এই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সঙ্কটের সুযোগে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণে উদ্যত। আমরা তখন আওয়ামী লীগের সাথে। ত্রিদলীয় ঐক্যজোটে। ঐক্য ও সংগ্রাম আমাদের তখন রাজনৈতিক কৌশল। বিরোধী দল হিসেবে রাজপথে মূলত জাসদ ও ভাসানী ন্যাপ। জাফর, মেনন, রনোদের ইউপিপি তখন গঠন প্রক্রিয়ায়। সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি ইপিসিপি (এমএল)- এসব মাওবাদী দল তখন গোপনে তৎপর। এরফানুল বারী সম্পাদিত হক কথা তখন ভাসানী ন্যাপের মুখপত্র। মাঠে শক্তিশালী রাজনৈতিক আন্দোলন অনুপসি'ত। ভাসানী সেই কঠিন মুহূর্তে ফারাক্কা প্রশ্নে ভারত এবং তৎকালীন সরকারের ব্যর্থতায় ক্রোধে হুঙ্কার দিলেন ‘খামোশ’। গাজী শহিদুল্লাহ, নুরুল ইসলাম দাদু ভাই, মালিক আতাহার উদ্দিন, শান্তি ঘোষ- তারা সব ভাসানী ন্যাপের খুলনার নেতা। সেই সময়ে সৈয়দ ঈসা, কাজী ওয়াহিদুজ্জামান, সরদার মঈন উদ্দিন- তারা সব তরুণ নেতৃত্ব। বাহিরদিয়ার মোশাররফ, গিয়াস মোড়ল, ডুমুরিয়ার ফরহাদ, খেজের আহমেদরা তরুণ কর্মী (কোনো নাম বাদ পড়লে ক্ষমাপ্রার্থী)। সেই ‘খামোশ’ উচ্চারণ পরবর্তীকালে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চে পর্যবসিত হয়েছিল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ সারা দেশের মানুষের মতোই খালেদাকেই হাসিনার বিকল্প ভাবেন। শিক্ষায়, ত্যাগে, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় আওয়ামী লীগের বাইরে বহু দল, নেতা বা নেত্রী থাকলেও অন্য কাউকে নয়। সে কারণে অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার এ অঞ্চলের মানুষ খালেদা জিয়ার কণ্ঠে প্রত্যাশার কথা শুনতে চায়। এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপন্নতা, কল-কারখানা খঁঁুঁড়িয়ে চলা, নদীগুলোর অপমৃত্যু, সুন্দরবনের বিপর্যস-তা, মংলা বন্দরের অসহায়ত্ব, স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের দীর্ঘসূত্রতা- সব কিছু মিলিয়ে মানুষ আশ্বস্ততার কথা শুনতে চায় খালেদা জিয়ার মুখে। খালেদা জিয়া তার দলকে, জোটকে শক্তিশালী করার জন্য এবং তৃণমূল মানুষের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে এই রোডমার্চ করেছেন। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলছেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তার কারণেই ভারত এ দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছিল। এটিও সত্য, বঙ্গবন্ধু ফারাক্কার পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থে যেটুকু পানির হিস্যা আদায় করেছিলেন, এত বছর পর কোনো সরকার এক কিউসেক পানি বেশি আদায় করতে পারেনি। কিন' এটিই নির্মম বাস্তবতা যে, ভারতের সর্বশেষ টিপাইমুখ বাঁধ কিংবা তিস্তা নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে আমরা দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি। মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুরও নেতা ছিলেন। ইতিহাসের নির্মমতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ মওলানা ভাসানীর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে অনীহা প্রকাশ করছে। ভাসানীর অনুসারীরাই বিএনপি গঠনে মূল ভূমিকা পালন করছে। ঐতিহাসিক বিবেচনায় ভাসানী আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয় দলেরই নেতা। বঙ্গবন্ধু ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে তিনিও অবশ্য শ্রদ্ধাবনত থাকতেন। মওলানা ভাসানী এখন নেই, ১৭ নভেম্বর তার মৃত্যুবার্ষিকী চলে গেছে; কিন' ঐতিহাসিকভাবে তাকে এখন জাতির প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে, মওলানা ভাসানীর মতো খালেদা জিয়া দেশী-বিদেশী সব অপশক্তির বিরুদ্ধে উচ্চারণ করতে পারবেন কি না ‘খামোশ’। ইতিহাস প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু রেডকোর্সের ভাষণে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলতে ভুল করেননি, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি, খালেদা ‘খামোশ’ উচ্চারণ করতে পারলে ইতিহাস তাকে স্যালুট করবে।
লেখক : ফিরোজ আহমেদ আইনজীবী, খুলনা

বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১১

জনসমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মওলানা ভাসানী

মুক্তিআন্দোলন আয়োজিত আজকের এ জনগুরুত্বপূর্ণ আলোচনাসভার শ্রদ্ধেয় সভাপতি, মান্যবর প্রধানঅতিথি, বিশেষঅতিথি এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দ,

মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী আজকের এ নিরাশা ও আশার মহাসংকটকালে খুবই প্রাসঙ্গিক এবং জরুরী। আমরা তাঁর জীবনেতিহাস পাঠ করছি, তাঁকে স্মরণ করছি এবং তাঁর মাঝে আমাদের মুক্তিরপথ খুজঁছি। কারণ, তিনি মানুষের পথপ্রদর্শক এবং মানবতার মুক্তিদূত। পৃথিবীতে যতদিন অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনার লেশমাত্র অবশিষ্ট থাকবে, ততদিন তাঁর প্রয়োজন ফুরাবে না। সবধরণের অনাচারের বিরুদ্ধে তাঁর মতো নির্লোভ, নিরংহকারী সিংহপুরুষের গর্জন আমাদের সাহস যোগাবে।

আমরা হতাশ, নিরাশ, উদ্বিগ্ন এবং উৎকন্ঠিত। কারণ, একে একে আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পূঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে চলতি শতকের আপোষহীন লড়াকু সব আইকন। আমরা মানবতাবিধংসী পূঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বুকে কাঁপন ধরানো অসীম সাহসী এসব বীর হারিয়ে এতিম ও অসহায়। সবশেষে লিবীয় নেতা মুয়াম্মার আল্ গাদ্দাফি ইতিহাসের জঘন্যতম নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক হত্যাকান্ডের শিকার হলেন। বিচারবহির্ভূত মানবতাবিরোধী এ হত্যাকান্ডে  বিশ্ববিবেক নিশ্চুপ। আমরা এর কঠোর নিন্দা করি এবং ধিক্কার জানাই। আসলকথা, পুঁজিবাদের আগ্রাসন রুখেদাঁড়ানো সাহসী কন্ঠস্বর এভাবেই ক্রসফায়ারের নামে অথবা বন্ধুকযুদ্ধের অজুহাতে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে।

তবে আশার দিক হলো- বিশ্বের দেশে দেশে পূঁজিবাদবিরোধী ক্ষোভ-বিক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সচেতন মানুষের যৌথ নেতৃত্ব ও সম্মিলিত গণআন্দোলনের প্রবল ধাক্কায় পূঁজিবাদের সূতিকাগার ইউরোপ, আমেরিকায় সুনামীর লক্ষণ এখন সুস্পষ্ট। সাম্রাজ্যবাদের অহংকার পূঁিজবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙ্গে খান খান হওয়ার উপক্রম। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে একের পর এক সরকার পতন তারই প্রাথমিক ধাপ। একক নেতৃত্বের বিপরীতে যৌথ নেতৃত্ব  ও সম্মিলিত সফল গণআন্দোলনের ফলে পূঁজিবাদের পতন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু তাপরর কী?

মুক্তিআন্দোলন সামাজিক মালিকানায় বিশ্বাসী। আমরা নর-নারী বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের সমাজ প্রত্যাশী। আমরা চাই মানুষের সমাজ। যেখানে মানুষ রবের খলিফা, আশরাফুল মাখলুকাত এবং তারা পারস্পারিক সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়। তাই প্রকৃতির সব জীব-অণুজীবের পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা। এজন্য চাই নিরস্ত্র মানুষের উত্তাল গণবিস্ফোরণ।

আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা কর্পোরেট ব্যবস্থার বাণিজ্যিক যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বিলীন হওয়ার পথে। ধোঁকাবাজ কর্পোরেট ব্যবস্থার অস্তিত্বও পূঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনের তোড়ে সংকটাপন্ন। এর সবকিছু তছনছ হয়ে স্রোতে নিঃশ্বেষ হতে চলছে। কিন্তু মানুষের সমাজ স্থায়ী ও টেকসই। তাই মানুষের সমাজই মানুষের শেষঠিকানা।

    আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন, আমরা বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতনভাবেই ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’, ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ , ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বা ‘হুকুমাতে রব্বানী’ প্রভৃতি পরিভাষা এড়িয়ে গেছি। মুক্তিআন্দোলন বাংলাদেশ ‘জনসমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মওলানা ভাসানী’ শীর্ষক আলোচনাসভার আয়োজন করেছে। যা বিশাল তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা সবধরনের বিতর্কমুক্ত থেকে গণমানুষের চাহিদা পূরণে সচেষ্ট থাকতে চাই। বিভেদ নয়, ঐক্য চাই। যেকোন ন্যূনতম ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা আমাদের উদ্দেশ্য।

    তাছাড়া মওলানা ভাসানীর প্রতিভা বহুমুখী। বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে তাঁকে মূল্যয়ন করে। কিন্তু তিনি সর্বোতভাবেই আপাদমস্তক একজন রাজনীতিক। তার রাজনীতি বাঁচার লড়াই। মানুষ প্রকৃতির সব জীব-অণুজীবসহ বাঁচার যে নিরন্তর সংগ্রাম করছে মওলানা ভাসানীর রাজনীতি তা ধারণ করে একে আরো বেগবান করা। এজন্য তিনি সবার প্রিয়, আত্মার আত্মীয়। দল-মত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার হ্নদয়ের মণিকোঠায় তাঁর অবস্থান।

মওলানা ভাসানী সমগ্র বাংলার সকলের মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। এজন্য তিনি জনমত গঠন করে ফারাক্কামার্চসহ সব আন্দোলন-সংগ্রামেই ছিলেন আমৃত অবিচল।

মওলানা ভাসানী জীবিত নেই। তাঁর লড়াকু শিক্ষা আমাদের মাঝে চির জাগরুক। এ শিক্ষাই আমাদেরকে আরেকটি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হুইসেল বাজাচ্ছে। তাহলো টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী একাট্টা গণজাগরণ। বাংলাদেশসহ মণিপুর, মিজোরাম, আসাম অঞ্চলের মানুষ এবং প্রাণীকুলের বাচাঁ-মরার এ সংগ্রাম এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কর্পোরেট বাণিজ্য ও বহুজাতিক কোম্পানীর পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় দিল্লী যে মরণখেলায় মেতেছে, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ এবং বিরোধী দল বিএনপিও তার অংশ। বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দুটো যৌথ সমীক্ষার অভিন্ন দাবী তুলে কার্যতঃ ড্যাম নির্মাণের পক্ষেই তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছে। অন্যান্য পূঁজিবাদী ও সাম্প্রদায়িক দলেরও নিজস্ব এজেন্ডা আছে। অতএব আমাদের প্রাণ, পানি ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদেরকেই সোচ্চার হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কারও মুখের দিক তাকিয়ে নিশ্চুপ থাকা আত্মহত্যারই সামিল। সবাই বেঁচে থাকার সংগ্রামে সামিল হোন।

ধন্যবাদ সবাইকে-
রু“হুল আমিন

মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১১

মওলানা ভাসানী ও অবহেলিত নেতৃবৃন্দ

হুজুর মওলানা ভাসানী সত্যিই একজন বিস্ময়কর ব্যক্তি। দরিদ্রের ভাঙা কুটির থেকে রাজার প্রাসাদ—সবই ছিল তার কাছে এক সমান। হুজুর মওলানা ভাসানীকে নিয়ে নানাজন নানা কথা বলে, নানাভাবে মূল্যায়ন, অবমূল্যায়ন করে। অবহেলা আর অনাদর এ যেন তার জন্মগত প্রাপ্য। জন্মেছিলেন এক দরিদ্র ঘরে। মা-বাবা হারা হয়ে ছেলেবেলায়ই হয়েছিলেন অসহায়। চেগা মিয়া নামে ছেলেবেলায় পরিচিত ছিলেন। হঠাত্ই অলি-এ-কামেল হজরত নাসির উদ্দিন বোগদাদীর সঙ্গে দেখা না হলে তিনি আর দশটি অজানা মানুষের মতোই হারিয়ে যেতেন। হজরত নাসির উদ্দিন বোগদাদী তাকে পুত্রসম স্নেহ করতেন। ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে দেওবন্দে পাঠিয়েছিলেন। নিয়মিত বাঁধনের মধ্যে থেকে কোনোকিছু করা তার কোনোদিনই ভালো লাগেনি। তাই দেওবন্দ তাকে ধরে রাখতে পারেনি, চলে এসেছিলেন। গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে পরিণাম কী হবে কোনোদিন ভাবেননি। জীবনে কত কী করেছেন তা লেখাজোখা নেই। সাধারণ ক্ষেতমজুর যেমন ক্ষেত-খামারে কাজ করে, তিনিও করেছেন। বগুড়ার পাঁচবিবির জমিদার বাড়িতে সর্দারি করেছেন। জমিদারের পুত্র-কন্যাদের গৃহশিক্ষকের কাজ করেছেন। সেই জমিদারেরই কন্যা আলেমাকে বিয়ে করেছেন। শ্বশুরের বিশাল সম্পত্তি, পাঁচবিবি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাকে দান করে নিঃস্ব-রিক্ত হয়েছেন। যে সন্তোষ জমিদারদের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করে জনগণের অধিকার রক্ষার চেষ্টা করেছেন, যে জমিদাররা তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে, এমনকি ব্রিটিশ সরকারকে দিয়ে ময়মনসিংহ জেলা থেকে বহিষ্কার করে আসামে পাঠিয়েছে—সেই সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করার তার বহুদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। সেখানে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। যে বিশ্ববিদ্যালয় শেরে বাংলার মৃত্যুদিনে, ইদানীং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মৃত্যুদিনে ও অন্যান্য জাতীয় ছুটির দিনে বন্ধ থাকে, কিন্তু তাঁর নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর মৃত্যুদিনে বন্ধ হয় না বা থাকে না। এবারও ১৭ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে কোনো সরকারি অনুষ্ঠান হয়নি। কোনো মন্ত্রী যাননি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা কেউ শ্রদ্ধা নিবেদন করেননি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্মানজনক কোনো অনুষ্ঠান করেনি। এক সময় যারা হুজুর মওলানা ভাসানীর পোঁটলা-পুঁটলী, জুতা-খড়ম বয়ে নিজেদের ধন্য মনে করত তারা অনেকেই আজ বিশাল বিশাল নেতা বা ব্যক্তি। হুজুর এক দিনের জন্যও তাঁর পরিবারের প্রতি দৃষ্টি দেননি। তিনি পুরো জাতিকে জাগাতে চেয়েছিলেন। দেশকে বঞ্চনামুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাই তার ছেলে-মেয়েরা শিক্ষা-দীক্ষায় তেমন উপযুক্ত হয়নি। আর্থিকভাবে অনেকটা পিছিয়ে। এ যেন নিয়ম হয়ে গেছে, রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা পাবে, জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের পরিবার পাবে, ক্ষমতায় থাকলে বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর কোনো বংশধর নেই তবুও তার নামে অনেকেই পাবে। সেনাবাহিনী বা অন্য বাহিনীর লোকজনেরা আহত-নিহত হলে তারা সুযোগ-সুবিধা পাবে। হুজুর মওলানা ভাসানীর পরিবার-পরিজন না খেয়ে মরে গেলেও তারা পাবে কেন? এ যেন এক বিধিলিপি। তাই যখনই হুজুর মওলানা ভাসানীর বংশের কাউকে আশপাশে দেখি নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। হুজুর জীবনে পো ধরেননি, নিজেও পো ধরতে শিখলাম না। আখেরাতে যে কী হবে আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিনই জানেন। তাই ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যত্ নিয়ে সব সময়ই শঙ্কিত থাকি। কারণ হুজুর মওলানা ভাসানীর ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতকুরদের অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। যারা দু’চারজন লেখাপড়া শিখেছে তারা চলে এক রকম, আর যারা শিখেনি তারা বড় লোকদের দয়া-দাক্ষিণ্যের জন্য সব সময় কাতর হয়ে থাকে। এমনকি তার নাতি-নাতকুররা মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিয়ন, চাপরাশি, চকিদারের চাকরির জন্য ভাইস চ্যান্সেলর ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের পিছে পিছে ঘুরে। হয়তো এসব দেখে তাদের অনেকেরই গর্ব হয়। আর কিছু না হোক মওলানা ভাসানীর নাতি-নাতকুররা তাদের দয়ার জন্য পিছে ঘুরছে। কবি নজরুল তার ‘গোকুল নাগ’ কবিতায় লিখেছিলেন—
‘আজ’টাই সত্য নয়, ক’টা দিন তাহা?
ইতিহাস আছে, আছে ভবিষ্যত্, যাহা
অনন্ত কালের তরে রচে সিংহাসন,
সেখানে বসাবে তোমা বিশ্বজনগণ।
আজ তাহা নয় বন্ধু, হবে সে তখন—
পূজা নয়—আজ শুধু করিনু স্মরণ।’

আমারও মাঝে মাঝে অমনটা বলতে ইচ্ছে করে। আয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না। সব রাজনৈতিক নেতাকে জেলে পুরে বড় বেশি অস্বস্তিতে ছিলেন। ’৫৮ থেকে ’৬২ প্রায় চার বছর এক শ্বাসরুদ্ধকর বন্ধ অবস্থা। এরপর ঘরোয়া রাজনীতির দ্বার উন্মোচন। রাষ্ট্র চালাতে গিয়ে ততদিনে বুঝেছিলেন রাজনৈতিক সহযোগিতা ছাড়া তার কোনো গত্যন্তর নেই। খান সাহেব ছিলেন ঝানু লোক। তিনি প্রথমই বেছে নিয়েছিলেন হুজুর মওলানা ভাসানীকে। হুজুর মওলানা ভাসানীও যে-সে কেউ ছিলেন না। আয়ুব খানকে দশ ঘাটের পানি খাওয়াতে তার তেমন ভাবতে হয়নি। রাজবন্দিদের মুক্তি ও পাকিস্তানের নানা সমস্যা সমাধানে হুজুর মওলানা ভাসানীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মজলুম জননেতা যখন ইসলামাবাদ রাষ্ট্রপতি ভবনে যান, তাকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রেসিডেন্ট হাউজের বারান্দায় জেনারেল আয়ুব খানকে না দেখে তিনি খুব বিরক্ত হন, বৈঠকের নির্দিষ্ট ঘরে গিয়েও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা না হওয়ায় যারা অভ্যর্থনা করে নিয়ে গিয়েছিল তাদের বলেন, ‘বাবারা, তোমাদের এখানে জায়নামাজ আছে?’ পাকিস্তানের ইসলামাবাদে রাষ্ট্রপতি ভবন, আর সেখানে জায়নামাজ থাকবে না? মুহূর্তের মধ্যেই হুজুরের সামনে জায়নামাজ পেতে দেয়া হয়। তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যান। এক, দু’রাকাত শেষ হতেই পাশের ঘর থেকে আয়ুব খান এসে দেখেন হুজুর নামাজ আদায় করছেন। হুজুরকে নামাজ পড়তে দেখে চুপচাপ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন। নামাজ পড়ে সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত শেষে দাঁড়াতেই তাকে আয়ুব খান স্বাগত জানান। এরপর লম্বা আলোচনা। সব রাজবন্দিকে মুক্তি, ’৪৭ এর পর ভারত থেকে পাকিস্তানে আসা মোহাজেরদের পুনর্বাসন, পাটের ন্যায্য দাম এবং ক্রুক কমিশনের সুপারিশমত পূর্ব বাংলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ঘণ্টা দুই আলোচনা করে প্রেসিডেন্ট হাউজ থেকে বেরিয়ে এলে সাংবাদিকরা তাকে জেকে ধরে। সাংবাদিকদের প্রশ্ন, ‘বিরোধী পক্ষের রাজনীতিক হয়েও একজন স্বৈরশাসকের সঙ্গে আপনি কেন আলোচনা করছেন? কি আলোচনা করলেন?’ হুজুর মওলানা ভাসানী খুবই দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘সব রাজবন্দির মুক্তি, মোহাজেরদের পুনর্বাসন, পাটের ন্যায্য দাম, পূর্ববঙ্গের বন্যা নিয়ন্ত্রণ—এসব দাবি মেনে নিলে আয়ুব খান কেন, আমি শয়তানের সঙ্গেও আলোচনায় বসতে রাজি আছি।’ সেদিন তার মন্তব্যে সারা পাকিস্তানে সাড়া জেগেছিল এবং পরবর্তী সময়ে মহাচীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার নায়কই ছিলেন হুজুর মওলানা ভাসানী। দেখতেও মাওসেতুংয়ের মতো ছিলেন, আর মাওসেতুং তাকে খুব ভালোবাসতেন, কথাও শুনতেন। উপহার হিসেবে মাওসেতুং সরকার হুজুরকে সেচ কাজের জন্য এক বিশাল পানির পাম্প ও ট্রাক্টর দিয়েছিল। যে পাম্প চালাতে কম করে তিন-চারশ’ হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিনের দরকার ছিল। আর চার-পাঁচশ’ হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিনে ঘণ্টায় ৬০-৭০ লিটার তেলের প্রয়োজন হতো। সে তেল তার গাঁটের পয়সা খরচ করে কোনোদিনই কিনতেন না। তার প্রমাণ সেই ষাটের দশকে দেয়া ট্রাক্টর পাঁচবিবিতে ’৭০ সাল পর্যন্ত পড়েছিল। খুব একটা চালানো হয়নি। সে যাক। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সেদিনের সেই ঐতিহাসিক বৈঠকে রংপুরের জনাব মশিহুর রহমান সঙ্গী ছিলেন। আসরের পর সময় নির্ধারিত ছিল। তাই বেরুবার আগেই নামাজ আদায় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হাউজে আবার নামাজ আদায় করায় জনাব মশিহুর রহমান যাদু মিয়া খুবই বিস্মিত হয়েছিলেন; প্রেসিডেন্ট হাউজ থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেই বিস্ময়ভরা চোখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হুজুর, আপনি তো আসরের নামাজ আদায় করেই গিয়েছিলেন, ওখানে আবার নামাজ পড়লেন কেন?’ প্রশ্ন শুনে বলেছিলেন, ‘এই সোজা ব্যাপারটা বুঝলা না? আমরা তো আর আমাদের ইচ্ছায় যাইনি। প্রেসিডেন্ট তার দরকারে দাওয়াত করেছেন। দাওয়াতের একটা তাহিজব-তামাদ্দুন আছে না? আমাদের দাওয়াত করলেন, তার বাড়িতে রিসিভ করলেন না—এটা কেমন করে হয়? আমাদেরকে প্রেসিডেন্ট রিসিভ করবেন না, আমরা প্রেসিডেন্টকে রিসিভ করব—সেও কি কখনও হয়? আক্কেল থাকলে গাড়ি বারান্দাতেই তো আমাকে তার রিসিভ করার কথা ছিল। যাক, বারান্দায় করেন নাই, যে ঘরে আলাপ হবে সেই ঘরের দরজায় রিসিভ করতে পারতেন, তাও করলেন না। ঘরে গিয়ে দেখি তিনি বাইরে। তিনি বাইরে থেকে এলে আমারই তো তাকে রিসিভ করতে হয়। রিসিভ হতে গিয়ে তাকে রিসিভ করে আসলে অমন ঠকা ঠকি কী করে? তাই আবার নামাজ পড়লাম। অতিরিক্ত নামাজ পড়ায় কোনো দোষ নেই। বরং সওয়াবই আছে। দেখলা নামাজ শেষ কইরা দাঁড়াইতেই কীভাবে রিসিভ করল?’ এই ছিলেন মওলানা ভাসানী। তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ ছিল বড় চনমনে। সারা জীবনে এ ধরনের হাজারও ঘটনা আছে; তাঁর ব্যক্তিগত সান্নিধ্যের কারণে কত কিছু শুনেছি, জেনেছি। তারই বংশ বুনিয়াদ প্রতি ঘাটে ঘাটে অমর্যাদার শিকার হয়। তা হয়তো তারা বুঝতেও পারে না। তেমন মর্যাদা বোধ তাদের মাঝে জাগেনি। হুজুরের তৃতীয় পক্ষের ছেলে আবু বকর খুবই অসুস্থ। মনোয়ারা মাঝে সাঝে আমার বাসায় আসে। যখন যেভাবে পারি সম্মান করার চেষ্টা করি। আরেক বোন আনোয়ারাকে গত বছর চরের ভাঙা বাড়িতে হজরত নাসির উদ্দিন বোগদাদীর ওরসে দেখেছিলাম। অন্যদিকে আলেমা ভাসানীর গর্ভজাত আবু নাসের ভাসানী এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন, নামেই মন্ত্রী। তার ছোট ভাই কিবরিয়া টালমাটাল ঘুরে বেড়ায়। এত বড় একজন নেতার সয়-সন্তানের প্রতি আমরা কোনো দায়িত্ব পালন করলাম না। অথচ ভারতে মহাত্মা গান্ধী যেখানে নাথুরাম গডেসর গুলিতে মারা গেছেন সেই বাড়ি সংরক্ষিত আছে। ৩০ জানুয়ারি মার্গ নামে রাস্তা করা হয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যে পিঁড়িতে বসতেন রবীন্দ্র ভারতী সে পিঁড়ি সংরক্ষণ করছে। মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মওলানা মোহাম্মদ আলী, শওকত আলী এমনকি বোম্বেতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বাড়ি-ঘর সংরক্ষিত আছে। তাদের বংশ-বুনিয়াদ সসম্মানে সেখানে বাস করেন। আমার দেশেও পাবনায় সুচিত্রা সেনের বাড়ি সংরক্ষিত রাখতে নাগরিক আন্দোলন হচ্ছে; কিন্তু জীবন নাট্যের মহানায়ক মওলানা ভাসানীর স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তার পরিবার-পরিজনের কোনো মর্যাদা নেই। এ যে আমাদের জন্য কত বড় কলঙ্ক, কত বড় লজ্জা—এ উপলদ্ধি যে কবে হবে সেই শুভদিনের আশায় আছি।
কেন যেন সবক্ষেত্রে সব দলে জাতীয় নেতৃবৃন্দ অবহেলিত, লাঞ্ছিত হচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সবচেয়ে পুরনো দল। বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে জন্ম নিয়েছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। সেই সময় দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে যোগ দিয়েছিল। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা কলাকৌশল ও ষড়যন্ত্রে দলটি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেনি। নানা দ্বন্দ্বে খণ্ড-বিখণ্ড হয়েছে। তবু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তারা আছে। অনেকের সেই চেতনাও আছে। এরপর মিলিটারি শাসক বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র জন্ম। সৌভাগ্যক্রমে দলটি এখন দাঁড়িয়ে গেছে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের বিএনপি’র চেয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের বিএনপি অনেক বিশাল এবং বিরাট। এরপরে ওই একই পদ্ধতিতে জন্ম নেয় জাতীয় পার্টি। একটানা ৯ বছর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ দেশ শাসন করেন। এরপর ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু এটা খুবই ব্যতিক্রমী যে একজন সেনানায়ক গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েও পরে বার বার ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছেন। এসব দলে ত্যাগী মানুষের মূল্যায়ন হয়নি। বিএনপি ভীষণ খারাপভাবে তার প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে দল থেকে বের করে দিয়ে নিষ্ঠুর দুর্ব্যবহার করেছে। আব্দুস সালাম তালুকদার ও আব্দুল মান্নান ভূইয়া দীর্ঘদিন দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করলেও মতের অমিল হওয়ায় তাদের প্রতি ভীষণ অবহেলা দেখানো হয়েছে। আর আওয়ামী লীগের ব্যাপারে তো কথাই নেই। এ দলটি সব সময় বর্তমানের পূজারি। বর্তমানের জন্য অতীতকে কবর দিতে তাদের এক মুহূর্তও লাগে না। অবলীলায় কাফন-দাফন করে মুহূর্তে বর-কনে সাজতে পারে। যারা বঙ্গবন্ধুর লাশ কবর দিতে ঘৃণা প্রকাশ করেছে তারা আজ সরকারকে চতুর্দিকে মুড়ে রেখেছে। আর যারা বঙ্গবন্ধুর জন্য জীবন-যৌবন ঝরিয়েছে, খেয়ে না খেয়ে আওয়ামী লীগকে দাঁড় করিয়েছে—তারা আওয়ামী লীগের দ্বারাই নিগৃহীত। এক সময় আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সিলেটের দেওয়ান ফরিদ গাজী, ময়মনসিংহের রফিক উদ্দিন ভূইয়া ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম, টাঙ্গাইলে জনাব আব্দুল মান্নান, হাতেম আলী তালুকদার, শামসুর রহমান খান শাহজাহান, বদিউজ্জামান খান, পাবনা সিরাজগঞ্জের ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, বগা মিয়া, মোতাহার হোসেন, দিনাজপুরের অধ্যাপক ইউসুফ আলী, জনাব আব্দুর রহিম, অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, রংপুরের মতিউর রহমান, বগুড়ার মজিবর রহমান, মাগুরার আসাদুজ্জামান যশোরের মশিউর রহমান ও রওশন আলী, খুলনায় শেখ আব্দুল আজিজ, সালাহ উদ্দিন ইউসুফ, রাজশাহীর আবু হেনা কামরুজ্জামান, ফরিদপুরের ফণী ভূষণ মজুমদার, কুমিল্লার জহিরুল কাইয়ুম, নারায়ণগঞ্জের সামসুজ্জোহা, ঢাকায় তাজউদ্দিন আহমেদ ও গাজী গোলাম মোস্তফা, চট্টগ্রামে জহুর আহমেদ চৌধুরী ও শেখ আব্দুল আজিজ—এরাই ছিলেন তখন সারা দেশে আওয়ামী লীগের প্রাণ। আজকের নেতৃত্ব এদের কারও কথা ভাবে না। সেদিন হঠাত্ সুদূর আমেরিকা থেকে এক টেলিফোন পাই। বললেন, ‘মাহমুদুর রহমান মান্নার কাছ থেকে নাম্বার নিয়েছি। আমি বগুড়ার মজিবুর রহমানের ছেলে। ’৭৫-এ বগুড়ার গভর্নর ছিলেন। তার আগে অনেকদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছে। প্রবীণ নেতা মজিবুর রহমানের নাম শুনতেই বুকের ভেতরটা নাড়া দিয়েছিল। কতবার কতভাবে তাকে দেখেছি। ’৭২-এ মকসুদের দিনাজপুর ছাত্রলীগের সম্মেলনে যাওয়ার পথে মজিবর ভাইর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সম্মেলন শেষে ফেরার পথে বগুড়ার সাত মাথায় এক বিশাল সভার পর তিনি তার বাড়িতে নিয়ে সে যে কী যত্ন করে খাইয়েছিলেন, তার তুলনা হয় না। ’৭৫-এ জেলা গভর্নর হয়েছিলেন, বঙ্গভবনে গভর্নরদের প্রশিক্ষণ ক্লাসে কত পাশাপাশি বসেছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ‘মুজিব’ থাকতে যেমন বগুড়ায় গেলে মজিবর রহমানের বাড়িতে উঠতেন, থাকতেন, খেতেন, বঙ্গবন্ধু হয়েও তিনি বগুড়ায় মজিবর রহমানের বাড়ি গিয়েছেন, খেয়েছেন। কারণ দু’জনের একই নাম হওয়ায় খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মজিবর ভাইর ছেলে সুদূর আমেরিকা থেকে যখন এসব বলে খেদ ব্যক্ত করছিলেন তখন খুব খারাপ লাগছিল। ভদ্রলোক আমেরিকায় থাকে, তাই অনেককিছু আশা করে। কিন্তু এখন কারও কাছে কিছু আশা করা অরণ্যে রোদন মাত্র। এখন মনে রাখা নয়, ভুলে যাওয়া, ভুলিয়ে দেয়ার দিন। তা না হলে সব দলের জীবিত-মৃত জাতীয় নেতারা অবহেলিত হবেন কেন? আজ ক’টা মাস জনাব আব্দুর রাজ্জাক লন্ডনে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। একজন সংসদ সদস্য থাকার পরও সরকার তার দায়িত্ব নেয়নি। প্রয়োজনে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় যেতে পারেন, যারা বঙ্গবন্ধুর পিঠের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজিয়েছে তাদের মন্ত্রিসভায় নিতে পারেন, খন্দকার মোস্তাকের ছায়া এইচটি ইমামকে উপদেষ্টা করতে পারেন, চরম নির্যাতনের শিকার আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, আব্দুল জলিল, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শ্রী সুরঞ্জিত্ সেনগুপ্ত, মোহাম্মদ নাসিম, ওবায়দুল কাদের... রাষ্ট্র চালাতে এদের মতো নেতার পরামর্শও নিতে পারেন না। জিদের ভাত কুত্তা দিয়ে খাওয়াবেন, তবু সতীনের পেট ভরতে দেবেন না। আজ লাগামহীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, একেবারে দিশেহারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সর্বৈব ব্যর্থ অর্থ মন্ত্রণালয়। একেবারে নির্জীব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তো কথাই নেই। অথচ নির্যাতনের সময় কেউ কারও চেয়ে কম হন না। জনাব পোস্টার নুরুল ইসলাম আজকে কোথায় কেউ তার খোঁজ-খবর রাখে না। অথচ এদের অবদান কারও চেয়ে কম নয়। ইদানীং দেশটা চলছে একটি জয়েন স্টক কোম্পানির মতো। কারও কোথাও কোনো মর্যাদা নেই। প্রবীণদের তো নেই-ই, নবীনদেরও নেই। যখন যাকে প্রয়োজন তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবহার শেষে বিড়ি-সিগারেটের শেষাংশের মতো ফেলে দিচ্ছে। এ করে আর যাই হোক ভাবিকালে কোনো দেশপ্রেমিকের জন্ম হবে না। দেশপ্রেম এমনি এমনি আসে না। কাউকে না কাউকে অবলম্বন করে মানব হৃদয়ে দেশপ্রেম জাগে। আমার এক বন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লাহ বীর প্রতীক। একটুও লেখাপড়া জানে না। আজ ৪০ বছর সঙ্গে আছে। আর যে ক’বছর আমি বাঁচব বা সে বাঁচবে মনে হয় সঙ্গেই থাকবে। সে মুক্তিযুদ্ধের সময় খুব একটা মাটিতে গড়াগড়ি করে যুদ্ধ করেনি। শুয়ে গুলি চালাতে গিয়ে দু’একবার ঘুমিয়ে পড়েছে বলে সে অনেক জায়গায় গুলি চালাতে দাঁড়িয়ে যেত। আমার দেখা সাধারণ যোদ্ধা হিসেবে আব্দুল্লাহ বীর প্রতীকের চেয়ে কোনো নির্ভয় সাহসী যোদ্ধা দ্বিতীয়টি দেখিনি। অমন নির্লোভ সরল মানুষ হয় না। সেই আব্দুল্লাহও যেদিন ভর্তি হয়েছিল, যদি সেদিন মুক্তি বাহিনীতে ভর্তি হতে না পারত সে রাজাকার হতো। এটা আমার কথা নয়, এটা বীর প্রতীক আব্দুল্লাহরই এক সাক্ষাত্কারের কথা। যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন সে ১৫-১৬ বছরের কিশোর। মানুষের বাড়ি কাজ করে খেত। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতে পাহাড় অঞ্চলে গিয়েছিল। মুক্তি বাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ালে তার স্বাস্থ্য-গতর ভালো ছিল না বলে আনফিট করা হয় মানে বাদ দেয়া হয়। সে খুব দুঃখ নিয়ে কর্মস্থলে ফিরে। কিছুদিন পর চারদিকে যখন শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ তখন তার মনে হয় তারও যুদ্ধে যাওয়া উচিত। তাই সে স্থির করে আবার মুক্তি বাহিনীতে যাওয়ার চেষ্টা করবে। যদি তাকে নেয়া না হয় তাহলে সে প্রয়োজনে রাজাকারেই ভর্তি হবে। কারণ দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। ওই বয়সে যুদ্ধ না করে তার ঘরে বসে থাকা ভালো লাগেনি। মোট কথা নাই কাজ তাই খই ভাজ। বলতে গেলে প্রায় সে রকমভাবেই আব্দুল্লাহ বীর প্রতীক মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিল। তখনও তার তেমন চেতনা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে কর্মকাণ্ড দেখে সে দেশপ্রেমিক হয়েছে। গাছ বুনলে যেমন পরিচর্যা করতে হয় তেমনি একটা সময় পর্যন্ত দেশপ্রেমের জন্যও কিছুটা পরিচর্যা করতে হয়। তাই বগুড়ার মজিবর রহমানের ছেলে জনাব মনজুর মোরশেদের বেদনা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। বিপ্লবী নেতা সিরাজুল আলম খান, যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ, জননেতা আব্দুর রাজ্জাক, জননেতা আমির হোসেন আমু, নওগার আব্দুল জলিল, পঞ্চগড়ের সিরাজুল ইসলাম, দিনাজপুরের অ্যাডভোকেট আব্দুর রহিম, জামালপুরের আব্দুল হাকিম, ময়মনসিংহের রফিক উদ্দিন ভূইয়া... এদের মধ্যে যারা জীবিত তাদের কথাও মনে করে না, যারা মরে গেছেন তাদেরও স্মরণ করা হয় না। আর যাই হোক এভাবে একটি জাতি সভ্য সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।

ভাসানীর পরে ফারাক্কা আর আমরা জাতীয় ইস্যু হিশাবে ধরে রাখতে পারি নাই


আলাপচারিতায় হক-কথা সম্পাদক
সৈয়দ ইরফানুল বারী বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তার শুরু স্বাধীনতার পরপরই, মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক সচিব হিশাবে। মওলানা প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক হক-কথার সম্পাদক ছিলেন তিনি। মজলুম জননেতার ঘনিষ্ঠ এক সহচর হিশাবে সৈয়দ বারী বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশের স্বাক্ষী। ঊনিশশো ছিয়াত্তরের ষোলই মে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ফারাক্কা লংমার্চেও তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা হিশাবে কাজ করেছেন। গতকাল পনেরোই মেতে আমাদের আমন্ত্রণে তিনি চিন্তা কার্যালয়ে এসেছিলেন। সৈয়দ ইরফানুল বারীর সাথে আলাপচারিতায় ছিলেন মুসতাইন জহির মোহাম্মদ আরজু
সৈয়দ বারী: তিরানব্বই থার্টিন নভেম্বরে তো আপনারা চিন্তা মওলানা ভাসানীকে নিয়ে একটা সংখ্যা করছিলেন। এরপর তো আমার আর রেগুলার পড়া হয় নাই। তারপর চিন্তায় আর মওলানা ভাসানীকে নিয়ে কোনো সংখ্যা করছিলেন কি না, বলতে পারবো না . . .
জহির: সেটা ঠিক মওলানা ভাসানীকে নিয়ে ছিল না। পুরো পানি সমস্যা নিয়ে, ফারাক্কা নিয়ে . . .
সৈয়দ বারী: সেটাতে অন্য বিষয় থাকলেও মওলানা ভাসানীর বিষয়টাই প্রাধান্য পেয়েছিল। এমনকি তাঁর আসাম জীবনের ওখানের জীবন যাত্রার বিস্তারিত কথা ছিল। এরপর আমার আর মনে পড়ে না যে, আর কোনো একক সংখ্যা দেখেছিলাম
জহির: না, সেটা ঠিক আছে। আলাদা করে হয়তো সংখ্যা ছিল না, কিন্তু সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ইস্যুতে ভাসানীর কথা আসছে, এটা তো আসতে বাধ্য। পানি সমস্যার ইস্যুতে, ফারাক্কা ইস্যুতে
সৈয়দ বারী: আমি বলবো এটা আমাদের জন্য একটা ট্রাজেডি, যখন মে মাস আসে তখনই এর আলোচনা শুরু হয়। মওলানা ভাসানী এখন থেকে প্রায় চৌত্রিশ বছর আগে এমন একটা বিষয়কে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছে দিয়েছিলেন, এর একটা গভীর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিলো, অথচ এরপর তেত্রিশ চৌত্রিশ বছরে আমাদের তেমন কোনো অর্জন নাই . . .
জহির: আপনার মতো করে আপনি বলে যান। আমরা ফারাক্কা আর লংমার্চকে কেন্দ্র করেই কথা বলবো
সৈয়দ বারী: ফারাক্কা লংমার্চে মওলানা ভাসানীর জীবন দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর জীবনদর্শন একটা শব্দ দিয়ে তিনি প্রকাশ করতেন--রবুবিয়াত। এটা আরবি শব্দ। এর মানে হলো আমাদের রব বা প্রতিপালক সমস্ত জগত-পৃথিবী যেভাবে মানুষকে দান করেছেন, সেটা ঠিক সেভাবে অবিকৃতভাবে-স্বাভাবিকভাবে মানুষের কাছে থাকবে। মানুষকে এর থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সে যেকোনো জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দেশের মানুষই হোক না কেন তার ওপর জুলুম চলবে না, তার স্বাভাবিক অধিকার কেড়ে নেয়া যাবে না। সে--স্রষ্টায় বিশ্বাস না করলেও না--স্রষ্টা এটা চান না। যেমন পানি, সারা বিশ্বের সুপেয় পানির ওপর সবমানুষের স্বাভাবিক অধিকার আছে। প্রবহমান পানির স্বাভাবিক প্রাপ্তির ওপরে যে আঘাত ইনডিয়া থেকে আসলো, সেই সত্তরের দশকে প্রথম ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে। মওলানা ভাসানী লংমার্চ করেছিলেন ঊনিশশো ছিয়াত্তরে, কিন্তু বিষয়ে আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তিনিই প্রথম কথা বলেছিলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠারও আগে। আমি যতদূর জানি, সেটা হলো ঊনিশশো ঊনসত্তর সালের বারোই মার্চ। তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানের তোবাতেক সিং-এর কৃষক সম্মেলনে তিনি প্রথম ফারাক্কা বাঁধের বিষয়ে সতর্ক করেন . . .
আরজু: আয়োজনটা ঠিক কারা করছিলো?
সৈয়দ বারী: ন্যাপ তো ছিলই, কৃষক সমিতিও ছিল। ওখানে পশ্চিমপাকিস্তানেও তখন কৃষক আন্দোলনের ভিত্তি মজবুত ছিল
জহির: পাঞ্জাবের তোবাতেক সিং-?
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। লাহোর থেকে দুই কিলোর চেয়েও বেশি দূরে হবে
জহির: ওই সম্মেলনে উনি নির্দিষ্টভাবে ঠিক কী বলেছিলেন?
সৈয়দ বারী: বলেছিলেন যে, ইনডিয়া যে বাঁধ তৈরি করছে ফারাক্কায় এতে উত্তরবঙ্গে মরুকরণ শুরু হবে। আমার বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও তখনো বাঁধ নির্মাণ শেষ হয় নাই, কিন্তু কারিগরী দিকগুলো এবং সম্ভাব্য বিরুপ প্রভাবের বিষয়ে ওনার ধারণা ছিল। বি.এম. আব্বাস এসব বিষয়ে হুজুরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। কারিগরী বিষয়গুলো জানাতেন। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর চুয়াত্তরে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পরে যখন একচল্লিশ দিন পরীক্ষামূলকভাবে বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার শুরু হয়, সেই প্রত্যাহার আর বন্ধ করা হলো না . . .
আরজু: এইটাতো চুয়াত্তরের চুক্তিতে ছিল না। ওই চুক্তিটায়তো গঙ্গা বা পানি সমস্যা বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসে নাই। কেবল বলা হইছিল যে, গঙ্গায় পানি প্রত্যাহার বাড়ানোর উপায় খোঁজার ব্যাপারে তারা একমত হইছেন। এরপরে পঁচাত্তরে বাংলাদেশকে তারা জানায় যে, ফিডার খাল দিয়া পরীক্ষামূলকভাবে পানি প্রত্যাহার করবে। বাংলাদেশ রাজি হয়। আর পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করে দেখার নাম করে বাঁধ চালু করে দিল . . .
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। কথা ছিল পরীক্ষামূলক প্রত্যাহারের পরে দুই দেশের হিস্যার পরিমাণ নির্ধারণ করে পরে বাঁধ চালু করার বিষয় দেখা হবে। কিন্তু সেটা হয় নাই। তারপর তো সেই বছরই মুজিবের জীবনের অবসান ঘটলো, তার রেজিমের অবসান ঘটলো। তারপর তো দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিষয়টি আর সামনে থাকলো না, বাঁধ চলতে থাকলো। তারপর ঊনিশশো ছিয়াত্তরে হুজুর আবার বিষয়টি সামনে আনলেন। ইসলামী ফাউন্ডেশনের মিলনায়তনে ছিয়াত্তরের আঠারোই এপ্রিল হুজুর ঘোষণা দিলেন--বাংলাদেশের মানুষ পানির স্বাভাবিক প্রবাহের দাবিতে ফারাক্কার দিকে লংমার্চ করবে। আঠারো এপ্রিলে তিনি ঘোষণা দিলেন, আর ডেটটা বললেন যে আগামী ষোলোই মে, ষোলোই মে থেকে শুরু হবে . . . ওখান থেকে তিনি পিজিতে ফিরে আসলেন, কাছের লোকজন, নেতারা বললেন যে, হুজুর এত কম সময়ে কিভাবে শুরু হবে! হুজুর বললেন মানুষ এটা চায়। তারা এটা করবে। প্রস্তুতি নিতে তোমাদের অনেক দিন লাগতে পারে কিন্তু লংমার্চে যারা হাঁটবে সেই মানুষের প্রস্তুতি নিতে সাতদিনও লাগে না। তোমরা না পারলে কোরো না, মানুষ ঠিকই মার্চ করবে। এসব বলে ধামকি দিলেন আরকি! যারা আরো সময় নেয়ার পক্ষে ছিল তাদের ধামকি টামকি দিলেন। আমার নিজেরও মনে ভয় ছিল, এত কম সময়ের প্রস্তুতিতে হবে কি না। মওলানার যারা ঘনিষ্ঠ ছিলাম আমরা, আমাদের অনেকের চিন্তার আরো কারণ ছিল, হুজুরের এই শেষবয়সে এসে যদি এমন একটা উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানের জন্য তো ভালো হবে না। কিন্তু বললাম না, বলার সাহস নাই। কারণ, এই ডেটটা রাখার পক্ষে হুজুর বেপরোয়া ছিলেন। শেষ পর্যন্ত এগারোই মেতে এসে বললাম, হুজুর! ডাক্তারদের তো নিষেধ আছে, আপনার অসুখ অনেক, বাইরে যাবেন কিভাবে? দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ডাক্তার নুরুল ইসলাম সাহেব তো এখনো বেঁচে আছেন। উনি তখন তো একেবারে হাতে পায়ে ধরছেন যে হুজুর! এই অবস্থায় আমরা আপনাকে যেতে দিতে পারি না। এটা দশ তারিখ বিকালের কথা। পরের দিন মানে এগারোই মেতে ডাক্তারের চোখ ফাঁকি দিয়ে, সোজা কথায় পালানো আরকি! পালায়ে চলে গেলেন রাজশাহী। রাজশাহী গিয়া আমাকে বললেন ...
আরজু: আপনি তখন কই ছিলেন?
সৈয়দ বারী: আমি তো হুজুরের সাথে সাথেই . . .
আরজু: রাজশাহী যাওয়ার সময় সাথে আছিলেন?
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। রাজশাহী যাওয়ার পরও আমি চিন্তা করছিলাম যে এত তড়িঘড়ি করা, তারিখ না পেছানোর পেছনে হুজুরের কী পলিসি থাকতে পারে। তখন দেখলাম যে, হুজুর রাজশাহী থেকে তুরস্কের তখনকার প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরেলকে টেলিগ্রাম করলেন। ষোলো তারিখেই তুরস্কের ইস্তাম্বুলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ সম্মেলন--ওআইসি শীর্ষ সম্মেলন শুরু হবে। ডেমিরেল সম্মেলনে প্রিসাইড করবেন। তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্টকে বললেন ফারাক্কা এবং বাংলাদেশের মানুষের এই লংমার্চের বিষয়টি সম্মেলনে আলোচনায় তুলতে। অর্থাহয়তো তারিখ ঠিক করার সময় তিনি এই সম্মেলনের কথা মাথায় রেখেছিলেন . . .
জহির: আর্ন্তজাতিক ফোরামে বিষয়টি তোলার সুযোগ . . .
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। আবার দেখেন এই টেলিগ্রাম তিনি ঢাকা থেকেও করতে পারতেন, বরং আরো সহজ হইতো। কিন্তু আমি বুঝলাম তিনি তাদের এই চিত্র দিচ্ছেন যে, লংমার্চ যেখান থেকে শুরু হচ্ছে সেখানেই মানুষের নেতা আছেন। ফারাক্কা বাঁধের যথাসম্ভব কাছে, যেখানে মানুষ চুড়ান্ত বিক্ষোভের, লংমার্চের জন্য সারাদেশ থেকে জড়ো হচ্ছে। মওলানার বয়স তখন ৯৬, গুরুতরভাবে অসুস্থ, এরপরে আগস্ট মাসেই চরম অসুখে পড়লেন, দেশের বাইরে নিতে হলো; অথচ তখনো তাঁর রাজনৈতিক-কৌশলগত সক্রিয়তা টনটনে। যদিও অনেকের লেখায় দেখি ভিন্ন রকম; এমন লেখার ব্যাখ্যা হতে পারে যে, চুয়াত্তরে মুজিব-ইন্দিরার চুক্তিও হয়েছিল ষোলোই মেতে। তাঁর প্রতিবাদেও মওলানা এটা করতে পারেন, একই তারিখে। এটা মিলতে পারে, মিলে যেতে . . . কিন্তু সেটা মূল উদ্দেশ্য ছিল না
জহির: একটা হলো স্থানীয় ঘটনা আর একটা হলো আর্ন্তজাতিক পরিসরে বা কোনো ফোরামে বিষয়টি তোলার সুযোগ . . .
সৈয়দ বারী: যাই হোউক, তারপর ষোলোই মে প্রথম সমাবেশটা হলো ওই যে মাদ্রাসা ময়দান, ওখানে সমাবেশ হয় সকাল দশটায়। মওলানা ভাসানী সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন
আরজু: আপনারা পুরা আয়োজনটা ম্যানেজ করলেন কিভাবে? মানে জাতীয় পর্যায়ে কমুনিকেট করা বা তৃণমূলে সংগঠিত করা ইত্যাদি
সৈয়দ বারী: আয়োজনের ধরনটা . . . এর মধ্যে . . . যেমন মওলানা ভাসানী বারবার প্রেস কনফারেন্স করছেন, প্রেসে বিবৃতি দিচ্ছেন। ! যেমন আরো বিষয় আছে। আঠারো এপ্রিল ঘোষণা দেয়ার পর আঠাইশে এপ্রিল এইযে পুরান ঢাকার তখন বার লাইব্রেরী ছিল, অ্যাডভোকেটদের যে মিলনায়তন, সেইখানে একটা সভা, মানে ঢাকার বিশিষ্টজনদের সাথে একটা আলোচনা সভা করা হলো। এরকমভাবেই আরকি! সম্ভাব্য সব উপায়ে জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টাকে তোলা হলো
আরজু: লংমার্চে, লোকজন নিয়া আসা- সংগঠিত করা- যোগাযোগ ইত্যাদি . . .
সৈয়দ বারী: ন্যাপের লোকজন ছাড়াও হাজী দানেশের একটা পার্টি ছিল--জাতীয় গণতান্ত্রিক মুক্তি ইউনিয়ন মানেজাগমুই’, তাদের লোক কম থাকতে পারে কিন্তু খুব সক্রিয় ছিল। তারা কাজ করেছেন। আমি মিছিলে জাসদের একটা অংশকেও দেখেছি। কৃষক সমিতির কর্মীরা, নেতারা তারা তৃণমূলে সবচাইতে বেশি কাজ করেছে। তাদের কাছে মেসেজটা শুধু পৌঁছে গেলেই হতো। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো তখনো বাম ঘরানার অনেকেই জাতীয় ইস্যুতে আসতেন। যেমন তোহা ভাইরা, সবে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বেরিয়েছেন। আগে পরে প্রেস কনফারেন্স ইত্যাদি করেছিলেন। আবদুল হক সাহেবদেরও সমর্থন ছিল। কর্মীদের প্রতি তাদের নির্দেশ ছিল। পত্রিকায় খবর আসছিল নিয়মিত, কমবেশি। তাছাড়া সাংবাদিকদের মধ্যে এনায়েতউল্লাহ খান, সিরাজুল হোসেন খান ওনারা ব্যক্তিগতভাবেও ভূমিকা রেখেছেন
আরজু: সরকারের তরফে . . .
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। যেমন ধরেন বাংলাদেশ বেতার। বেতারে তো দুইদিন ব্যাপী ধারাবিবরণী দিয়েছিল। এটাতো সরকারের সমর্থন ছাড়া সম্ভব ছিল না। তখন বেতারের হয়ে ফিল্ডে যে কাজ করছিল--রফিকুল আমীন ফেরদৌস, সে আমার ক্লাসমেটও ছিল ইউনিভার্সিটি লাইফে
আরজু: উনি কি আপনাদের সাথে মিছিলে আছিলেন পুরা সময়?
................................
ছিয়াত্তরে ইনডিয়ার সরকারের কাছে, আর্ন্তজাতিক মহলে এটা উঠে এসেছিল যে, ফারাক্কা ইস্যু বাংলাদেশের জনগণের ইস্যু। এরপর তো ইনডিয়া দেখেছে যে, এটা আর জনগণের জায়গায়--জাতীয় পরিমণ্ডলের প্রধান ইস্যু হিশাবে বাংলাদেশের কোনো নেতৃত্ব সামনে আনতেছে না। একটা আমলাতান্ত্রিক ব্যাপার মাত্র
.................................
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। মিছিলের সাথেই ছিল
আরজু: বিবরণী কি সরাসরি দিতেছিল?
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। সরাসরি। মনে করেন, বলছিল যে এখন মিছিল এগারো মাইল আসছে, এখন মিছিল প্রেমতলী . . . এমন করে বলছিল আরকি! এইযে বলাটা, এটা কিন্তু তখন মানুষ যারা অংশগ্রহণ করি করি মনোভাবে ছিল তারা কিন্তু তখন যোগ দিয়া দিল। আগের দিন থেকেও বাংলাদেশ বেতার একটা ভালো ভূমিকা রেখেছিল। বলছিলো যে মওলানা ভাসানী লংমার্চে যাচ্ছেন, মওলানা ভাসানী রাজশাহী পৌঁছেছেন . . . এইসব তো বেতার জানাচ্ছিল
আরজু: এইসব ছাড়া সরকারের তরফে আর কোনো প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিলো প্রোগ্রামে?
সৈয়দ বারী: যেমন ধরেন ওখানকার সরকারি ডিসি অফিস তো কিছু সহযোগিতা করেছিল
জহির: এর বাইরে আপনার কি এমন কিছু মনেপড়ে যে, তখন লং মার্চের বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে কোনো মত ছিল? যে লংমার্চ করা ঠিক হচ্ছে না-- জাতীয় কোনো মত?
সৈয়দ বারী: না, আমার মনে পড়ে না। ছিল এটুকুই যে, এতো অল্পসময়ের প্রস্তুতিতে করা ঠিক হবে না। লংমার্চের মতো কর্মসূচী ঠিক হবে না--এরকম কোনো মত ছিল না। তবে ইনডিয়ার সব মহলই এটাকে খারাপভাবে নিয়েছিল। সরকার তো বটেই। ইন্দিরাও ভাসানীকে চিঠি লিখেছিলেন
জহির: আগে তো মওলানা ভাসানী চিঠি লিখেছিলেন
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। হুজুরের চিঠির জবাবে লিখেছিলেন ইন্দিরা। কিন্তু ইনডিয়া বরাবরই অন্যায্যভাবে আক্রমণ করে লিখেছিল। যেমন এই ইস্যুতে জাতিসংঘে যাওয়ার পরের ঘটনা; বি.এম আব্বাসের বইতে (ফারাক্কা ব্যারাজ বাংলাদেশ, ১৯৮৮ ঢাকা।) দেখবেন রেফারেন্স আছে--বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে ইন্দিরা একদম রেগেমেগে বলেছিলেন, হু! জাতিসংঘে গেলেই সব সমাধান হয়ে যাবে? বাংলাদেশের একজন মন্ত্রীর সাথে--রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খান তখন প্রতিনিধিদলে ছিলেন, তাঁর সাথে এটা হলো ইনডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কথা বলার ধরন। ধমকি ধামকি আরকি। ইন্দিরা বা কংগ্রেস বরাবরই এমন ভূমিকায় ছিলো। দেখবেন প্রথম পানি-বণ্টন চুক্তিটা যে হতে পারলো, তখন কিন্তু কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিলো না
আরজু: মোরারজি দেশাইয়ের সরকার ছিলো তখন। ইনডিয়ার ইতিহাসে ওই বছরই মাত্র দেশটা প্রতিবেশিদের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে ইতিবাচক ছিলো
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। দেশাইয়ের সরকারের কারণেই চুক্তিটা হতে পারলো। এই পাঁচবছর মেয়াদী চুক্তি যখন শেষ হলো তখন অলরেডি ইন্দিরার সরকার আবার ক্ষমতায় আসছে। বিরাশিতে। বাংলাদেশ চাইলো চুক্তি নবায়ন করতে। কিন্তু ইনডিয়া রাজি হলো না। চুক্তির চাইতে অনেক কম মর্যাদার মউ করলো, সমঝোতা স্মারক। তাও দুই বছরের জন্য। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো গ্যারান্টি ক্লজ বাদ দেয়া হলো। ছিয়ানব্বই পরের আওয়ামী লীগ আমলে যখন আবার পানি-বণ্টন চুক্তি হলো তখনো কিন্তু শেখ হাসিনা আর আইনুন নিশাত গ্যারান্টি ক্লজ ছাড়াই রাজি হলেন। গ্যারান্টি ক্লজের সুবিধা হলো- প্রাকৃতিক কারণ বা অন্য কোনো কারণে গঙ্গার ফারাক্কার ওপারে পানি প্রবাহ কম থাকলেও বাংলাদেশকে তার প্রাপ্য পরিমাণের কমপক্ষে আশি শতাংশ দিতে হবে। এখন তো আর সেটা নাই
আরজু: তাইলে এমনকি ইন্দিরার আমলেও কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের বক্তব্য গুরুত্বের সাথে নেয় নাই? না কি বাংলাদেশ ঠিকঠাক কইরা বলতে পারে নাই?
সৈয়দ বারী: গুরুত্ব দিবো কি? বলতে পারেন এটা একটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ইনডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে মনে হয় এমন ব্যাপারই তো। আর বাংলাদেশের জন্য আরো দুঃখজনক ব্যাপার, মওলানা ভাসানীর পরে আমরা এটাকে আর জাতীয় ইস্যু হিশাবে আনতে পারি নাই
জহির: বিরাশিতে যখন বাংলাদেশ নবায়ন করতে চাইলো, তখন সরকার ঠিক কতটুকু জোরালো অবস্থান নিয়েছিলো? বিষয়ে জনমত তৈরি করতে সমাজের নানা অংশ তখন কী অবস্থান নিয়েছিল বাংলাদেশে?
সৈয়দ বারী: আসলে কী ঘটেছিলো দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সে বিষয়ে এই প্রশ্ন আমিও করেছিলাম একজনকে--খুরশীদা বেগম। ওনাকে নাইন্টি ফোরে আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি বলছিলেন--কোথায় ভারতের একটা গণতান্ত্রিক সরকার আর কোথায় একটা মিলিটারি সরকার! মানে উনি বুঝাতে চাইছিলেন যে . . .
জহির: কিন্তু ছিয়াত্তর সালেও তো মিলিটারি সরকার ছিলো বাংলাদেশে। অথচ সেই সময়েও একটা জনআন্দোলন জাতীয় ইস্যু সফলভাবে হয়েছিল। সরকার সফলভাবে সেটাকে জায়গা দিতে পেরেছিলো ইনডিয়ার সাথে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেও
সৈয়দ বারী: ছিয়াত্তর সালে মিলিটারি গভর্নমেন্ট হলেও মওলানা ভাসানীর করা আন্দোলনে প্রস্তুত একটা জনমত কিন্তু তাঁর ছিলো
আরজু: মওলানার এই আন্দোলন কিন্তু ছিয়াত্তরের সরকারকে হেল্প করছে . . .
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। হেল্প করেছে। ছিয়াত্তরে ইনডিয়ার সরকারের কাছে, আর্ন্তজাতিক মহলে এটা উঠে এসেছিল যে, ফারাক্কা ইস্যু বাংলাদেশের জনগণের ইস্যু। এরপর তো ইনডিয়া দেখেছে যে, এটা আর জনগণের জায়গায়--জাতীয় পরিমণ্ডলের প্রধান ইস্যু হিশাবে বাংলাদেশের কোনো নেতৃত্ব সামনে আনতেছে না। একটা আমলাতান্ত্রিক ব্যাপার মাত্র
আরজু: আচ্ছা, রাজশাহী থেকে আপনারা লংমার্চ শুরু করার পর ইনডিয়া কি যোগাযোগ করেছিলো?
সৈয়দ বারী: না। চৌঠা মে পরে আর কোনো যোগাযোগ করে নাই। তখন ইন্দিরা বলছিলেন যে, আপনি যদি চান তবে ইনডিয়ার হাইকমিশনার আপনার সাথে যোগাযোগ করবে
আরজু: মওলানা তো রাজি হন নাই
সৈয়দ বারী: না। হুজুর রাজি হন নাই। তিনি তো নেতা, কর্মীরা আর জনগণ কিন্তু স্থির করে ফেলেছিলো বর্ডার ক্রস করার, কিন্তু হুজুর জানতেন কর্মীদের কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। আমরা সবাই চাপাইনবাবগঞ্জ গিয়েও জানি যে, আমরা মনাকষা যাচ্ছি। বর্ডারের কাছে। এতো কাছে যে, খুব সহজেই ওখান থেকে বর্ডার ক্রস করা যায়। ওখানে তখন ইনডিয়ার আর্মি একদম গানপয়েন্টে। কিন্তু হয়তো এসব চিন্তা করেই হুজুর সিদ্ধান্ত বদলালেন। চাপাই থেকে শিবগঞ্জ গিয়ে ওখানে দুই দিকে দুটা রাস্তা। একটা মনকষার দিকে আরেকটা কানসাটের দিকে। শিবগঞ্জে গিয়ে হুজুর বললেন যে আমরা কানসাট যাবো
জহির: তখন কেউ কিছু বলে নাই? দ্বিমত করে নাই?
সৈয়দ বারী: না, হুজুর বলছে তো এর বাইরে আর কথা কি! কানসাটে যেতে হয়েছে আমাদের একটা নদী পার হয়ে, নদীটার নাম হলো পাগলা। এতো খরস্রোতা ছিল নদীটা যে নাম হয়েছিলোপাগলা অথচ বাঁধ নির্মাণে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করায় তখনই ওই নদীতে পানি ছিলো না। তার পারেই একটা হাইস্কুল, স্কুলের মাঠ, নদীর পাড় মিলাইয়া মানুষ আর মানুষ . . .
জহির: কত মানুষ হতে পারে?
সৈয়দ বারী: লক্ষাধিক বলতে পারেন। তো, ওখানে তো স্টেজ নাই। সব তো ছিল মনাকষায়। তারপর স্কুলের ছাদের ওপর ওঠানো হলো মওলানা ভাসানীকে। দুইজনের কাঁধে ভর দিয়ে। মওলানার শারীরিক অসুস্থতা তখন খুব চরমে। শরীরের অবস্থা এত খারাপ যে, এমনকি তিনি প্রস্রাবের স্বাভাবিক বেগও ধরে রাখতে পারছিলেন না। তারপরও তিনি সমাপনী বক্তৃতা করলেন
জহির: কানসাটের ওদিকে বর্ডারে আর্মি ছিল?
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ, ইনডিয়ার প্রস্তুতি ছিল। বিএসএফকে তারা যথেষ্ঠ মনে করে নাই। আর্মির চলাচল ছিল
জহির: ফেরার সময় কেমন ছিলো? মানুষের মনোভাব . . .
সৈয়দ বারী: হুজুর তো বক্তৃতায় বলছেন ইনডিয়াকে উদ্দেশ্য করে যে, আমরা আর্ন্তজাতিক আইনের মধ্য থেকেই আমাদের কথা বলেছি। বর্ডারে যাই নাই। ইনডিয়ার মানুষের সাথে আমাদের কোনো শত্রুতা নাই। কিন্তু আমাদের পানির হক থেকে বঞ্চিত করার চিন্তা বাদ না দিলে আমরা সেটা হতে দেবো না। তো, আসা যাওয়ার পথে মানুষ আমাদের জন্য অনেক করেছে। খাবার নিয়ে পানি নিয়ে পথের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন আম ছিল গাছে, পাকে নাই, কাঁচা, মালিকেরা বলছে ইচ্ছামতো খাওয়ার জন্য। তবে ফিরবার সময় বৃষ্টিতে বেশ কষ্ট হয়েছিলো
জহির: ফিরে আসার পর জাতীয় পর্যায়ে মতামত বা প্রতিক্রিয়া কেমন ছিলো?
সৈয়দ বারী: সেটা এখনো পুরানো পত্র-পত্রিকা দেখলে বুঝতে পারবেন। ছিলো, মানুষের আলোচনায়, মতামতে ছিল চুক্তির আগে পর্যন্ত আমাদের জন্য সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিলো। মে মাসের সতেরো তারিখ গেলো, আঠারো তারিখ হুজুরকে নিয়া সন্তোষে ফিরে আসলাম। তারপর আঠারো তারিখের পর, একুশে মে তখন যিনি শিক্ষা উপদেষ্টা--তিনি হলেন প্রফেসর আবুল ফজল--ওইযে চিটাগাং ইউনিভার্সিটির, আবুল মোমেন সাহেবের ফাদার, এই আবুল ফজল গেলেন হুজুরের সাথে সাক্ষাত করতে টাঙ্গাইলে, মানে সন্তোষে, জিয়াউর রহমান মানে গভর্নমেন্টের পক্ষ থেকে। ফজল সাহেব হুজুরকে বললেন যে, হুজুর আপনি বলেন- কিভাবে এটাকে আরো আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়া যাওয়া যায়। আপনার বলাটাই আমি গভর্নমেন্টকে সাবমিট করবো। হুজুর তাকে বলেছিলেন, আমাদের যে অ্যাম্বাসিগুলা আছে বিভিন্ন দেশে--সেইসব অ্যাম্বাসেডরদের নির্দেশ দিতে-- সবাই যাতে নিজের দায়িত্বরত দেশে যেভাবে যেধরনের পারেন ফারাক্কা পানি সমস্যা বিষয়ে নানা ফোরাম তৈরি করেন। অক্টোবর মাসে হুজুর আমাকে নির্দেশ দিলেন, শুধু ফারাক্কা সমস্যা নিয়ে হক-কথা একটা বিশেষ সাপ্লিমেন্ট করতে। এবং ওই সাপ্লিমেন্টটার একটা ইংরেজি সংস্করণও করতে হবে, তখন তো হক-কথা বাংলাতেই বেরুতো। ট্যাবলয়েড সাইজে রেগুলার ষোলো পৃষ্ঠা বেরুতো। ওই সময় হুজুর বললেন যে সাপ্লিমেন্টটা হবে বত্রিশ পৃষ্ঠার, এবং সেটা বাংলাদেশের সব অ্যাম্বাসি দেশের বাইরে বাংলাদেশি অ্যাম্বাসিগুলাতে পাঠাতে হবে। এমনিতে তো আমাদের রেগুলার সংখ্যা ছাপা হইতো এক লক্ষের উপরে, কখনো কখনো এক লক্ষ বিশের মতো, কিন্তু দেড় লক্ষ কপি ছাপা হয়েছিল ওই সাপ্লিমেন্টটার। আবুল ফজল সাহেবের কাছে, মানে গভর্নমেন্টকেই বিশ হাজারের মতো কপি পাঠানো হইছিল, অ্যাম্বাসি বাইরের দেশে দেয়ার জন্য। তখনো বাংলাদেশ সরকারের তরফে এই নিয়া কোনো প্রকাশনা ছিলো না। তারপরে জাতিসংঘে যিনি তখন স্থায়ী প্রতিনিধি তাকেও হুজুর গভর্নমেন্টের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দিলেন যে কী করতে হবে
জহির: তখনকার সরকার প্রধানের সাথে . . .
সৈয়দ বারী : ! ! ভালো ব্যাপার মনে পড়ছে। একুশে মে লংমার্চ বিষয়ে গভর্নমেন্টের হয়ে ফজল সাহেব দেখা করলেন হুজুরের সাথে। তারপরই, আটাইশে মে হুজুর একটা প্রেস কনফারেন্স করলেন, প্রচুর বিদেশী সাংবাদিক উপস্থিত ছিল। বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যমের দিল্লী, সিংগাপুর আর হংকং বেসড সাংবাদিকরা। নিউজউইকের টোকিও ব্যুরো চীফ আসছিলো। দেশে আর দেশের বাইরে নানা পেশার বাংলাদেশিরা সাহায্য করেছিলো যথাসম্ভব বেশি করে যাতে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি ওঠে। যতটা না হুজুরের প্রতি ভালোবাসা সম্মান থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে। তারপর আগস্ট মাসের স্যাকেন্ড উইকে কলম্বোতে জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন ছিল। এর আগে জিয়াউর রহমান পিজিতে গিয়ে হুজুরের সাথে দেখা করলেন। হুজুর বললেন, সম্মেলনে সায়েম যাইতেছে না তো? তুমি যাইতেছো তো? জিয়া জানালেন, হ্যাঁ। (সেখান থেকে আমি বুঝলাম যে, রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলন হলেও ওটা হুজুরেরই পরামর্শেই জিয়া ওখানে যোগদান করতে যাচ্ছেন) হুজুর সেদিন বলছিলেন, আমি তো চলে যাচ্ছি--আমার তো সময় নাই, আমি তো থাকবো না--তোমরা যদি জাতীয় চেতনা ধরে রাখতে না পারো তাইলে কিন্তু টিকে থাকতে পারবা না। তোমাদেরই এখন দায়িত্ব নিতে হবে। এই সাক্ষাতটা আগস্টের সাত কি আট তারিখের কথা হবে। তেরই আগস্ট রাত্রিতে তো হুজুর চিকিসার জন্য লন্ডন গেলেন
জহির: লন্ডনে যাওয়ার পর ফারাক্কা ইস্যুতে আর কোনো ভূমিকা ছিল ওনার?
সৈয়দ বারী: তাতো থাকবেই। ওখানে হুজুরকে যে সংবর্ধনা দেয়া হয় সেখানেও উনি ফারাক্কার বিষয়ে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকারের কথা জোর দিয়ে বলেছিলেন। ফারাক্কা আমাদের জীবন মরণ সমস্যা। তাহলে দেখেন, হুজুর প্রথমত দেশের জনমত ফারাক্কা ইস্যুতে নিয়া আসলেন, লংমার্চ হইলো, আবার ইস্তাম্বুলের ওইআইসি সম্মেলন--কলম্বোর জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন এইসব কাজে লাগালেন বাংলাদেশের পক্ষে। তারপর তো জাতিসংঘে ফারাক্কা ইস্যু তোলা হলো। আন্তর্জাতিক চাপ ছিল ইনডিয়ার ওপর। পাশাপাশি ইতোমধ্যে ইনডিয়ায় কংগ্রেস সরকার বিদায় নিলো, মোররাজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় চুক্তিটা হলো, বাংলাদেশের জন্য উপকারী চুক্তি
জহির: সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর তো ইনডিয়া ইচ্ছামতো পানি প্রত্যাহার করেছে। গত আওয়ামী লীগ আমলে যে চুক্তি হয়--সেটাতে গ্যারান্টি ক্লজ না থাকার ফলে কোনো কাজে আসছে না। পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে তো গত বিশবছরেও মানুষের জীবনের সাথে অস্তিত্বের সাথে জড়িত এইসব ইস্যু প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে নাই। জাতীয় ঐক্যের মধ্যে তো আসে নাই
সৈয়দ বারী: জাতীয় রাজনীতিতে মনে হয় ফারাক্কার মতো ইস্যু বিএনপি ইস্যু, আওয়ামী লীগের না . . .
জহির: কোথায়? বিএনপি তো তার রাজনীতির মধ্যে এটাকে প্রাধান্য দেয় নাই . . .
সৈয়দ বারী: হ্যাঁ। বিএনপিও সেটা তার শুধু ভোটের রাজনীতির ইস্যু করে রাখছে
জহির: কিন্তু সেটাও কি গত অন্তত দুটো নির্বাচনে ছিল?
সৈয়দ বারী: তাতেও তার তেমন কিছু নাই যে তারা কিছু করবে বলে ধরা যায়। গত ইশতেহারেও তারা উল্লেখ করে নাই। একানব্বই-ছিয়ানব্বই আমলে তিরানব্বই-চুরানব্বই সনে শুধু কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছিল। ইনডিয়ার সাথে আলোচনা, জাতিসংঘে নিয়ে যাওয়ার কাজ হয়েছিল। তাদের লাস্ট গভর্নমেন্ট যেটা গেল, সর্বশেষ দুই হাজার একের নির্বাচনে জেতার পর তো নিয়া কিছুই করে নাই তারা। হাফিজ সাহেব বিএনপি করেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু কই? ওনারা যখন ক্ষমতায় যান তখন বলেন--বারী ভাই! ময়দানে এক রকম আর চেয়ারে বসলে আরেক রকম বিষয় . . .
জহির: মানে চেয়ারে বসলে আর রাষ্ট্রের চিন্তা করার সময় থাকে না!
সৈয়দ বারী: আমাদের জাতীয় ইস্যুতে, জাতীয় চেতনার বিকাশে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের অভাব। সংকীর্ণতা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে আটকা পড়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার আগেও তো হুজুর স্বাধীনতার ক্ষেত্র তৈরি করেছেন। আর শেষ দায়িত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিবকে। বলেছিলেন শেখ মুজিব আমার ছেলের মতো। মওলানা ভাসানী বেঁচে থাকলে হাসিনাকে বলতেন--দেখো তোমার সাথে ইনডিয়ার খাতির আছে, তুমি এটার একটা সমাধান করো