মাসুম খলিলী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মাসুম খলিলী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৪

চীনের বাঁধ : দিল্লির মুখে ঢাকার যুক্তি!

ভাটির দেশ হওয়াটাই যেন বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যের কারণ। এই বদ্বীপ দেশের মধ্যে জালের মতো বিস্তৃত নদ-নদী; কিন্তু বেশির ভাগ বড় নদীর উৎস এ দেশের ভেতরে নয়। দেশটির তিন দিকে বেষ্টিত ভারত থেকে অথবা ভারতের ওপর দিয়ে এঁকে বেঁকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে অন্তত ৫৪টি নদী। একটি ব্যতিক্রমী নদী রয়েছে যেটি বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়ে ভারত হয়ে আবার বাংলাদেশের ফেনীর ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।
বাংলাদেশ যেমন অনেক নদীর ভাটি অঞ্চলের দেশ তেমনিভাবে উজানের ভারতও কয়েকটি বড় নদীর ভাটির দেশ। এসব নদী হয়তো বা চীন অথবা নেপাল-ভুটান থেকে ভারতে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি নদী ভারত হয়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশেও। এই উপমহাদেশে বেশির ভাগ বড় নদী মূলত হিমালয় পর্বতমালার বিভিন্ন হিমবাহ থেকে সৃষ্ট। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা। সুরমা কুশিয়ারাও ভারত থেকে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে।
এসব নদ-নদীর মধ্যে বাধাহীন প্রবাহের স্রোতবাহী নদ ছিল ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মপুত্র হিমালয়ের উত্তরাংশে কৈলাশ পর্বতের নিকটবর্তী আংসি হিমবাহ থেকে উৎপত্তি হয়। এরপর চীনের দক্ষিণ তিব্বতের মধ্য দিয়ে ১৭৯০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে নিমসা পর্বতের কাছাকাছি বড় আকারের ইউ বাঁক নিয়ে ভারতের অরুণাচলে প্রবেশ করে। এটি আসামের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নাম ধারণ করে। গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ হয়ে পদ্মার সাথে মিলিত হয় এটি এবং পরে মেঘনার সাথে মিলে বঙ্গোপসাগরে মিশে যায়। আরেকটি ধারা জামালপুর-ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকার অদূরে মিশে মেঘনার সাথে। পুরনো ব্রহ্মপুত্রের এই ধারা এক সময় ছিল প্রধান প্রবাহ। কোনো সময় বড় আকারের ভূমিকম্পে পাল্টে যায় স্রোতধারা। মূল ধারাটি হয়ে পড়ে ম্রিয়মাণ, গৌণ। 
দুই হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর গভীরতা ১২৪ ফুট থেকে ৩৮০ ফুট পর্যন্ত। তিব্বতের বিস্তৃত গতিপথে নদীটি খুব প্রশস্ত নয় তবে পাহাড় পর্বত গিরিখাদের পথে এ নদী বেশ স্রোতবাহী। গভীর গিরিখাদে ২০০ মিটার ওপর থেকে জলপ্রপাত ও বিশাল পানিরাশি আর স্রোতের সৃষ্টি করেছে নদীধারার কোনো কোনো স্থানে। অরুণাচল হয়ে আসামে প্রবেশের পর এর সাথে আরো দু’টি নদীর জলধারা মিশে এটি হয় বেশ বিস্তৃত। এই বিস্তৃত বিশাল আকার নিয়েই ব্রহ্মপুত্রের প্রবেশ দক্ষিণাংশ দিয়ে বাংলাদেশে। 
বাংলাদেশে প্রবেশ করে এর উন্মত্ততা কিছুটা ঠাণ্ডা হওয়ায় হয়তো বা এর নামের প্রকৃতি পাল্টে হয়েছে যমুনা। নদ থেকে রূপান্তর ঘটেছে নদীতে। এই যমুনাই বাংলাদেশের নদীবাহিত মিষ্টি পানির বড় অংশের জোগান দিয়ে আসছে এত দিন। তবে যমুনা আর কত দিন বাংলাদেশের শুষ্ক মাটিতে প্রাণের সঞ্চার করতে পারবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এর প্রবাহ আটকে দেয়ার আয়োজন করছে উজানের দুই দেশ চীন আর ভারত। প্রতিবেশী ভারত চেয়েছিল ব্রহ্মপুত্রের সাথে তিস্তা গঙ্গার সংযোগ তৈরি করে এর পানি নিয়ে যাবে দক্ষিণের তামিলনাড়– পর্যন্ত। সেই ভাবনায় ছেদ ধরিয়ে দিয়েছে তার সাথে অম্লমধুর সম্পর্কের টানাপড়েনে থাকা প্রতিবেশী চীন। ভারতে প্রবেশের আগেই গিরিখাদের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর স্রোত আটকে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল চারটি প্রকল্প নিয়েছে বেইজিং। ভারতে অনেকের ধারণা বাঁধের সংখ্যা আসলে চার নয়, কম করে হলেও হবে ২৬টি। সংখ্যা যাই হোক না কেন তিব্বতিরা সাংপো নামে যে নদীকে ডাকে তার বাধাহীন প্রবাহ আর পাচ্ছে না ভারত ও বাংলাদেশ।
তথ্যের অবাধ গতিপ্রবাহ নেই চীনে। এক দশকের বেশি সময় ধরে ধারণা করা হচ্ছিল দেশটি সাংপো নদীতে বাঁধ দেয়ার পরিকল্পনা করছে; কিন্তু ২০১০ সালে তা স্বীকার করার আগ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি দিল্লি। এর আগে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রবাহ ভিন্ন দিকে সরিয়ে সেচে লাগানো, বন্দরের নাব্যতা বাড়ানোতে ব্যবহারসহ নানা পরিকল্পনা নেয় দিল্লি; কিন্তু মাথায় বাজ পড়ার মতো চীনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানতে পারে ভারত। দেশটি ভারতকে আশ্বস্ত করেছিল বাঁধ দিলেও নদীর পানি অন্য দিকে সরিয়ে নেবে না। কিন্তু এ কথায় আস্থা আনতে পারছে না দেশটি। মেয়াদ ফুরিয়ে আসা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ সম্প্রতি তার দেশের পানিসম্পদ মন্ত্রীকে বলেছেন তিনি যেন চীনা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে জেনে নেন ইয়ার্লাং সাংপো নদীতে যে বাঁধ চীন দিচ্ছে সেটি ‘রান অব রিভার’ বা শুধু বিদ্যুৎ তৈরির জন্য পানি জমিয়ে আবার ছেড়ে দেয়া ধরনের হবে নাকি পানি প্রত্যাহার করা হবে। 
নয়া দিল্লি বেইজিংয়ের কাছ থেকে নিশ্চিত হতে চায় তারা এখানে বাঁধ দিয়ে জমানো পানি সেচ বা অন্য কোনো কাজের জন্য প্রত্যাহার করে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে না। এর আগে ২০১২ সালে মনমোহন সিং চীনা প্রধানমন্ত্রীর সাথে যখন বৈঠকে বসেছিলেন তখনো সাংপো নদীর বাঁধ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। চীনা প্রধানমন্ত্রী তখন ড. সিংকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তিনি এ বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ সম্পর্কে সচেতন রয়েছেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিক এভাবেই টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছিলেন; কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের পরও স্বস্তিতে নেই দিল্লি। সম্প্রতি সাংপোর নদী শাসন দেখে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে তারা এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য করছে কি না। 
চীন এখন সাংপো হিসেবে পরিচিত ব্রহ্মপুত্র নদের জাংমোতে এক বিশাল বাঁধ নির্মাণ করছে। তিব্বতের এই স্থান ছাড়াও দাগো জিয়াসা জেক্সো নামক স্থানে আরো তিনটি বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। গত এক দশকের বেশি সময় আগে বাঁধ তৈরির কাজ শুরু করলেও চীন ২০১০ সালের অগে এই নির্মাণের কথা স্বীকারই করেনি। স্বীকার করার পর থেকে অবশ্য বেইজিং বলে আসছে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এসব বাঁধ দিচ্ছে; কিন্তু চীনা ডেইলির এক প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো উল্লেখ করা হয় যে, সেচের জন্য বাঁধের পানি ব্যবহারের ব্যাপারে তাদের চিন্তাভাবনা রয়েছে। সেচের পানি প্রত্যাহার ছাড়াও দিল্লির আরো উদ্বেগ হচ্ছে, যে অঞ্চলে এই বাঁধ দেয়া হচ্ছে সেই এলাকা হলো ভূমিকম্পপ্রবণ। এখানে বিপুল জলরাশি আটকে রাখা হলে বড় রকমের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে অনিশ্চয়তা সৃষ্টির পাশাপাশি চীনের এই উদ্যোগ ব্রহ্মপুত্র বেসিনের ওপর নির্ভরশীল অরুণাচল-আসামের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানকার লোকজন নদীটিতে আসলে কয়টা বাঁধ বেইজিং দিচ্ছে সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছে না। জন জাগৃতি নামের এক এনজিও জানিয়েছে, চীনারা ব্রহ্মপুত্রের ওপর ২৬টি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। বাস্তবে এত বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি সঠিক না হলেও দেশটি ২০১১-২০১৫ সময়ের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যে ১২ কোটি কিলোওয়াট পানি বিদ্যুৎ তৈরির লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেছে তার সাথে এর মিল রয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুসারে চীনারা ব্রহ্মপুত্রের বড় বাঁকের অদূরে মেডংয়ে এক বিশালাকার বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েছে। এটি এখনো প্রকাশ করা না হলেও তিব্বতের বোমে-মেডং সড়ককে ভারী যানবাহন চলাচল উপযোগী বৃহদাকার করার জরুরি প্রকল্প থেকে বুঝা যায় এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে তারা। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হলে এটি হবে ইয়াংজি নদীতে নির্মিত থ্রি জর্জেস ড্যামের চেয়েও বড়। এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৩৮ থেকে ৪৯ গিগাওয়াট, যা ভারতের মোট পানি বিদ্যুৎ উৎপান ক্ষমতা ৩৩ গিগাবাইটের চেয়ে অনেক বেশি।
বেইজিং সম্প্রতি সাংপোতে নির্মাণাধীন ও নির্মিতব্য চারটি বাঁধকে রান অব দ্য রিভার টাইপ ঘোষণা করে। প্রকৃতপক্ষেই যদি বাঁধগুলো এ ধরনের হয়ে থাকে তাহলেও ভাটি অঞ্চলে এর বেশ কিছু বিরূপ প্রভাব পড়বে। এর মধ্যে রয়েছে নদীর বাধাহীন প্রবাহে যে বিপুল পলি ভাটি অঞ্চলের ভূমিতে উর্বরতা সৃষ্টি করত তা আর হবে না। অবকাঠামো নির্মাণ হয়ে গেলে সহজেই সেচের জন্য পানি প্রত্যাহারের কাঠামোও তৈরি করা সম্ভব হবে। জন জাগৃতির হিসাব অনুসারে এই বাঁধগুলো নির্মাণের জন্য নদীশাসনের পর বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহ ৬৪ শতাংশ কমবে আর শুকনা মওসুমে কমবে ৮৫ শতাংশ। এ ছাড়া উত্তর-পূর্ব চীনে বন্যা দেখা দিলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আকস্মিকভাবে পানি ছাড়ার ফলে প্লাবনের সৃষ্টি হবে ভারত বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে। এ ছাড়া ভারতের শঙ্কা হলো চীন সাংপো নদীতে এভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে ফেললে এই নদীতে ভারত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের যে পরিকল্পনা নিয়েছে তা কার্যকর করা সম্ভব হবে না। এক হিসাব অনুযায়ী ভারতে ৮৪ হাজার ৪৪ মেগাওয়াট পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ৩১ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াট উৎপন্ন হবে দেশটির উত্তর পূর্বাঞ্চলে। এর মধ্যে মাত্র ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। 
চীনের কাছে ভারতের মূল যুক্তি হলো আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অভিন্ন নদীতে বাঁধের মতো কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে অথবা পানিপ্রবাহ প্রত্যাহারের মতো কিছু ঘটলে তার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা হতে হবে। এ ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান হলো ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পানিবণ্টন চুক্তি। চীনকে এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবেশীর আহ্বানে সাড়া দিতে দেখা যায়নি। অন্য দিকে বাংলাদেশে অভিন্ন নদীতে বহু বাঁধ দেয়ার আগে ভারত দ্বিপক্ষীয় পানিবণ্টন চুক্তি করেনি। 
দেখার মতো বিষয় হলো অভিন্ন নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহারের ব্যাপারে ভারতের সামনে বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরে যে যুক্তি দিয়ে আসছিল সেই যুক্তিই এখন দিল্লি দিচ্ছে বেইজিংয়ের সামনে। টিপাইমুখ বাঁধের প্রকল্পের ব্যাপারে যে যুক্তি বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন সেটি ভারত এখন চীনের কাছে তুলে ধরছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ অথবা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এ যুক্তিই তুলে ধরেছেন।
ভারতের নীতি নির্ধারকদের জন্য এটিও একটি ভাবনার বিষয়। ভারতীয় অংশে আন্তঃনদী সংযোগের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রের পানি ভিন্ন দিকে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা হলে চীনের পানি প্রত্যাহার না করার জন্য কী যুক্তি দেবে ভারত? এ জন্য নয়া দিল্লি কৌশলে বাংলাদেশের সম্মতি নিতে চায়। এর অংশ হিসেবে টিপাইমুখসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে উৎপন্ন বিদ্যুৎ থেকে বাংলাদেশকে একটি অংশ বিক্রির ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ করতে চায় ভারত। না বুঝে হোক অথবা সচেতনভাবে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতেই হোক বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সে ফাঁদে পা দিয়েছে। বাংলাদেশের উজানের নদীতে ভারতকে বাঁধ দেয়ার বিপরীতে বাংলাদেশ এখন শুধু সে প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে বিক্রি করার নিশ্চয়তা চেয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারতকে অভিন্ন নদীতে ইচ্ছামতো পানি প্রত্যাহারের ছাড়পত্রই প্রকারান্তরে দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের বিদ্যুৎ করিডোর দেয়ার ব্যাপারে সমঝোতা হয়েছে। এই করিডোরের মাধ্যমে উত্তর পূর্ব ভারতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হবে। এতে বাংলাদেশের জন্য সর্বগ্রাসী যে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প তা নিয়ে জোর গলায় ভারতকে কিছু বলার সুযোগ হারাবে ঢাকা। অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার কথা আর জোর গলায় বলতে পারবে না ঢাকা।
বহুল আলোচিত-সমালোচিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। গত জানুয়ারিতে মতাসীন ইউপিএ সরকারের শেষ সময়ের এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। আর মধ্য প্রদেশের বিজেপি সরকার এর অংশ হিসেবে রাজ্যটিতে কেন ও বেতওয়া নদীর মধ্যে সংযোগ খাল খননের কাজ শুরু করে দিয়েছে। গঙ্গা অববাহিকার পানি দিয়ে এখানে দু’টি বৃহৎ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ যখন তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তি নিয়ে দেনদরবার করছে, ঠিক সেই সময়ে ভারতের বিশাল অংশজুড়ে প্রধান প্রধান নদীগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ তৈরি হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভাটির বাংলাদেশে প্রবহমান পানি প্রত্যাহার করে ভারতের শুষ্ক রাজ্যগুলোয় সেচকাজের জন্য পানি নেয়ার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের উজানে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ প্রধান প্রধান প্রায় সব নদীর মধ্যে সংযোগসাধনের এ প্রকল্পে ১৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি খরচ হবে। সুরমা ও কুশিয়ারার সাথে এই সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেই। টিপাইমুখ বাঁধের মাধ্যমে সুরমা, কুশিয়ারার পানি প্রত্যাহারে রয়েছে ভিন্ন এক প্রকল্প।
এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প হবে ভারতের বৃহত্তম অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প, যার মাধ্যমে দেশটির প্রধান প্রধান সব নদীর মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে দেশটির পানি ঘাটতির রাজ্যগুলোয় পানি পৌঁছানো এবং পানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অসংখ্য বাঁধ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের উত্তরের হিমালয়ের নদী এবং দেিণর উপদ্বীপ এলাকার নদীগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হবে। পরিকল্পনা অনুসারে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের ভারত অংশে এবং নেপাল ও ভুটানে অনেক বাঁধ (ড্যাম) নির্মাণ হবে। পানি প্রত্যাহার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ড্যাম বা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। কোনো কোনো স্থানে ফারাক্কার মতো ড্যাম বা ব্যারাজ দু’টিই করা হবে। বাংলাদেশের উজানে ব্রহ্মপুত্রের পানি সংযোগ খাল দিয়ে ফারাক্কার উজানে গঙ্গা ও মহানন্দার সাথে এর সংযোগ তৈরি করে পানি নিয়ে যাওয়া হবে দেিণ। এ অংশে দুই লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সেচ এবং ৩০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এর মাধ্যমে কলকাতা বন্দরকে নাব্য করতে ফারাক্কার উজানে ব্রহ্মপুত্র থেকে পানি নিয়ে যাওয়া হবে।
আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি হলো বাংলাদেশের জন্য বাঁচা-মরার একটি ইস্যু। ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকারী নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় নদী হলো ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা। এই যমুনা ও গঙ্গা নদীর মাধ্যমে ৫০ শতাংশের মতো পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অন্য প্রধান নদী গঙ্গায় ফারাক্কা এবং এর উজানে আরো অনেক বাঁধ দেয়ার মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার শুরুর পর বাংলাদেশ বর্তমানে পানির জন্য প্রধানত ব্রহ্মপুত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। এর মধ্যে আরেকটি প্রধান নদী তিস্তার উজানে গজলডোবাসহ আরো বেশ কয়েক স্থানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। 
ব্রহ্মপুত্রের পানি চীন বা ভারত যে-ই প্রত্যাহার করুক না কেন এর জন্য বাংলাদেশের এই অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হবে। এই নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়ে বাংলাদেশের মতো ভারতেরও যেহেতু উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে সেহেতু এই নদীর পানি বণ্টন নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করা যায়। এই বৈঠকে ভাটির দেশের পানির যে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে সেটি বাংলাদেশ অন্য অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রেও দাবি করতে পারবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি ক্রমেই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠছে। এটি যে এ দেশের মানুষের জীবন মরণের একটি ইস্যু সেটি ভুলিয়ে দেয়ার সন্তর্পণ চেষ্টা চলছে অন্য অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বড় ইস্যু বানিয়ে। এটি কোনোভাবেই বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় ইতিবাচক হবে না। 
mrkmmb@gmail.com

শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ ও মেরিটাইম সিল্ক রোড

সমুদ্রসম্পদ নিয়ে বিরোধ বিসম্বাদ বিশ্বে একটি নিত্য ঘটনা। পৃৃথিবীতে আনেক বড় বড় যুদ্ধ এই সমুদ্রসম্পদ ও সীমানাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে। আবার বিশ্বশক্তির খেলা বা প্রতিযোগিতার একটি বড় ক্ষেত্র হলো সমুদ্রে কার কর্তৃত্ব¡ প্রতিষ্ঠিত থাকবে তা নিয়ে। বিশ্ববাণিজ্য পরিবহনের একটি প্রধান উপায় হলো সমুদ্রপথ। সমুদ্রবিহীন দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরনির্ভরতার জন্য কৌশলগত পর্যায়ে প্রাথমিকভাবেই পঙ্গু হয়ে পড়ে। সেনাকুক দ্বীপপুঞ্জের জন্য এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তি জাপান ও চীনের মধ্যে উত্তাপ উত্তেজনায় যুদ্ধ বেধে যায় যায় অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল সমুদ্রসীমা বিরোধকে কেন্দ্র করে। এখনো সেই উত্তেজনার ইতি ঘটেনি। হরমুজ প্রণালীর কর্তৃত্ব নিয়ে ইরাক-ইরান দশককাল যুদ্ধ করেছে। মিসরে অনেক উত্থান পতনের কারণ ছিল সুয়েজ সংযোগ খাল। দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সাথে ছিল বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের সমুদ্রসীমা বিরোধ। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা এবং এর দীর্ঘ শুনানি শেষে রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের সাথে সাগর বিরোধের অবসান ঘটেছে। দু’দেশ সমুদ্রে যে সীমা দাবি করেছিল আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে তার অনেকটাই মধ্যবর্তী একটি রেখা টেনে দেয়া হয়েছে। ফলে এ রায়ের পর কোনো পক্ষের একতরফা জয় হয়নি। আবার কোনো পক্ষ সেভাবে হেরেও যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে প্রচার প্রোপাগান্ডার ঢেউ বয়ে যায় সমুদ্র জয়ের।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে পরে দেখা যায়, বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তিটাই আসলে হয়েছে বড় লাভ বাংলাদেশের। সমুদ্র জয়ের প্রচারণা বেশ কিছু ক্ষেত্রে না পাওয়াকে আড়াল করতেই হয়তো বা করা হয়ে থাকতে পারে। 

এর মধ্যে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিয়ে নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক আদালতে যে মামলা চলছে তার শুনানি শেষ হয়ে গেছে। যেসব যুক্তিতর্ক সেখানে উত্থাপন করা হয়েছে তার কমই বিস্তারিত প্রকাশ হয়েছে। আগামী ১৪ জুন এই মামলার রায় হওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য আগে থেকেই ২০১৪ সালে আরেকটি সমুদ্র জয়ের খবর শোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। এরপরও আসলেই কি সমুদ্র জয়ের মতো কোনো বিষয় আছে নাকি অন্য কিছু অপেক্ষা করছে তা নিয়ে উদ্বেগের অন্ত নেই। 

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় এই অঞ্চলে ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র এঁকেছিলেন স্যার রেডকিপ। তিনি সব কিছু নিষ্পত্তি না করে অনেক স্থানে রেখে দিয়েছিলেন অস্পষ্টতা, যার জন্য ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ ও ভারতের স্থল সীমানাটিই পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা যায়নি। বরং নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে অপদখলীয় জমি নিয়ে। স্যার রেডকিপ বাংলাদেশ ভারত সমুদ্রসীমার ব্যাপারেও একটি সীমান্ত রেখা টেনে দিয়েছিলেন। আজ সেই সীমান্ত রেখাটিই বাংলাদেশ ও ভারতের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের অন্যতম প্রধান নির্ণায়কে পরিণত হয়েছে। রেডকিপের সমুদ্র সীমান্ত রেখার যে দলিল বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করেছে সেটির সাথে ভারতের উপস্থাপিত দলিলের মিল নেই। আদালত বাংলাদেশের দলিল গ্রহণ করলে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা পাবে বাংলাদেশ আর একই সাথে হাজার হাজার মাইল সমুদ্রের মালিকানাও চলে আসবে বাংলাদেশের ভাগে। আর যদি ভারতের দলিল আদালত গ্রহণ করে তাহলে দক্ষিণ তালপট্টির মালিকানা হারাবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সুন্দরবনে আড়াআড়িভাবে নেমে এসেছে সীমান্ত রেখা। লন্ডন মিউজিয়ামে রেডকিপের আঁকা যে মূল ম্যাপটি, তাতে এই স্থলসীমান্তের সাথে মিল রেখে আড়াআড়িভাবে সমুদ্র সীমাটিও আঁকা হয়েছে। এটিকে সমুদ্রসীমা হিসেবে উপস্থাপন করা হলে দক্ষিণ তালপট্টির পশ্চিম পাশ দিয়ে বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত রেখা চলে যায়। কিন্তু ভারত যে রেডকিপের সীমান্ত ম্যাপটি আদালতে উপস্থাপন করেছে সেটি আড়াআড়িভাবে না নেমে কিছুটা পূর্ব দিকে বাঁকা করে নামিয়ে আনা হয়েছে, যাতে সীমান্ত রেখাটি চলে যায় দক্ষিণ তালপট্টির পূর্ব পাশ দিয়ে আর এতে দ্বীপটির মালিকানা চলে যায় ভারতের ভাগে। ভারত রেডকিপের এই মানচিত্রটি কোথায় পেয়েছে তা এক রহস্যজনক ব্যাপার। 

রেডকিপের যে সীমান্ত ম্যাপ লন্ডন মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে সেটি প্রকৃত দলিল হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ শুরু থেকে এ দলিল সংগ্রহের প্রতি মনোযোগী না হয়ে ভারত যে ধরনের ম্যাপ আদালতে উপস্থাপন করেছে তাকে সামনে রেখে যুক্তিতর্ক সাজিয়েছিল। লন্ডন মিউজিয়ামের ম্যাপটি উপস্থাপন করে অনেক পরে। ফলে বাংলাদেশ পক্ষের যুক্তি যতটা জোরালো হওয়ার সুযোগ ছিল, ততটা হয়নি। 

এ মামলার শুনানিতে ভারতের এজেন্ট হিসেবে যেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও এসংক্রান্ত আইন উপদেষ্টা নীরা রাধাকে নিয়োগ করা হয়েছে সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এজেন্ট করা হয়েছে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা: দীপু মনিকে। দু’জনই শুনানির সময় তাদের বক্তব্য রেখেছেন। দু’দেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। মামলাটি তথ্য উপাত্ত দলিল দিয়ে কতটুকু দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করবে এর সাফল্য। আর এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা কী ছিল সেটি জানা সহজ বিষয় নয়। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণে ভারতের যে প্রভাব গত পাঁচ বছর দেখা গেছে সেটি এর ওপর সক্রিয় ছিল কি না তাও স্পষ্ট নয়। তবে ভারত দ্বিপক্ষীয়ভাবে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি না করার কারণে নয়াদিল্লির ইচ্ছার বাইরে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে এই মামলা করেছে বলে মনে করা হয়। সেটি করা না হলে এ ব্যাপারে কোনো সালিসি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে আর ছিল না।

বাংলাদেশের এই সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির সাথে সমুদ্রাঞ্চলে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টিও সম্পৃক্ত। এই তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশ যে ২৩টি ব্লকে সমুদ্রাঞ্চলকে ভাগ করে সে ব্যাপারে মিয়ানমার ও ভারত দুই দেশই আপত্তি তুললে শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে দরপত্র চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। মিয়ানমারের সাথে বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতে নিষ্পত্তি হওয়ার পর বেশ ক’টি ব্লক পূর্ণ বা আংশিকভাবে অনুসন্ধানের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে নতুন করে বিন্যাস করতে হয়। ভারতের সাথে সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করবে আসলে বাংলাদেশ কতটা সমুদ্রাঞ্চলে তার তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে পারবে। তবে আদালতের রায় প্রাপ্তির আগে ভারতের তেল গ্যাস কোম্পানি ওএনসিজিকে দু’টি ব্লক ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে উৎপাদন বণ্টন চুক্তিও স্বাক্ষর করা হয়েছে। এই দু’টি অনুসন্ধান ব্লকই ভারতের সাথে সমুদ্রসীমান্ত সংলগ্ন। ভারতীয় কোম্পানিকে দু’টি গ্যাসব্লক তাড়াহুড়া করে কেন ইজারা দেয়া হলো এ ব্যাপারে অবশ্য কোনো ব্যাখ্যা নেই। এর আগে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার তেল গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যাপারে যে প্রথম দফা দরপত্র আহ্বান করা হয় তাতে ভারতের কোম্পানি কোনো আগ্রহ ব্যক্ত করেছে এমন কিছু জানা যায় না। প্রতিবেশী এ দেশটির গভীর সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিদেশী কোম্পানিকে ব্লক ইজারা দিতে দেখা যায়। তবু কেন বাংলাদেশের গ্যাস ব্লক নিয়ে ভারতীয় কোম্পানির আগ্রহ সেটি স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। তবে এর সাথে কৌশলগত স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

সমুদ্রসীমার তেল গ্যাস অনুসন্ধানের বাইরে কৌশলগত আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। জাপানের একটি কোম্পানি এই বন্দরের ব্যাপারে সমীক্ষা চালানোর পর কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ব্যাপারে বিশেষভাবে আগ্রহ ব্যক্ত করে চীন। চীনের সাথে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনাও অগ্রসর হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে। ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে বর্তমান সরকার গঠিত হওয়ার পর বিষয়টি আবার আলোচনায় চলে আসে। বলা হয় চীনকে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দেয়া হতে পারে। একতরফা নির্বাচনের ব্যাপারটি আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো মেনে না নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যাপারে চীনের সমর্থন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরে সরকার এ ব্যাপারে কতটুকু অগ্রসর হবে তা নিয়ে অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়। সরকারের সর্বোচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী ফোরামে পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে করার কথা বলা হয়। অন্য দিকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে ভারত-চীন যৌথ অংশীদারিত্বের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। এর সমর্থনে বেশ কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।

চীন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্র অঞ্চল ঘিরে নতুন একটি মেরিটাইম (সামুদ্রিক) সিল্ক রোড তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চাইছে। ইতোমধ্যে তারা পাকিস্তানে গোয়াদর ও শ্রীলঙ্কায় হামবানটোটায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। চীন মিয়ানমারের সিটওয়েতে আরো একটি বন্দর তৈরি করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে রয়েছে তাদের গভীর আগ্রহ। তবে ভারত কোনোভাবেই চাইছে না এই বন্দর চীন এককভাবে করুক। এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও এই অঞ্চলে চীনকে অধিক সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে ওয়াশিংটনেরও। মিয়ানমারের সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পশ্চিমা দেশগুলো ব্যাপক বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিরোধী নেত্রী অং সান সু কি ক্ষমতায় আসবেন বলে আবহ তৈরি হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে পশ্চিমের স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা অনেকখানি বেড়ে গেছে। সেই সাথে অনেকখানি বেড়েগেছে বাংলাদেশের গুরুত্ব। বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোম্পানি সান্তোস কনোকো ফিলিফস অফশোরে তেল গ্যাসব্লক অনুসন্ধান কাজ পাওয়ার ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই আগ্রহী। কিন্তু তাদের অনুসন্ধান ব্লক দেয়ার ব্যাপারে একধরনের পিছুটান দেখা গেছে বারবার। অথচ ভারতীয় কোম্পানিকে দু’টি ব্লক ইজারা দেয়া হয়েছে দ্রুতগতিতে। চীনা প্রতিষ্ঠানকেও গ্যাস অনুসন্ধান ব্লক দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। 

ভারত, বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমার নিয়ে নতুন উপ-আঞ্চলিক জোটকে বিআইসিএমকেও এগিয়ে নিতে চাইছে ভারত চীন দু’টি দেশই। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এ দু’টি দেশ নানা বিরোধের মধ্যেও বঙ্গোপসাগর এলাকার ব্যাপারে এক ধরনের সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে চাইছে।

গত ১৪ ফেব্রুয়রি বেইজিং থেকে করা পিটিআইয়ের এক খবরে বলা হয়েছে, ভারত চীনের মেরিটাইম সিল্ক রোডে যোগ দিতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বেইজিংয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেনন ও চীনা স্টেট কাউন্সিলারের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর এই কথা বলা হয়। ভারতীয় সাংবাদিক সি রাজা মোহন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় বিষয়টির ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, স্থলপথে মহা সিল্ক রোডের উন্নয়নের পাশাপাশি সামুদ্রিক সিল্ক রোড তৈরির ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী চীন। পশ্চিমে চীনের জিনজিয়াং এবং পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের সংযোগকারী ট্রান্স কারাকোরাম মহাসড়কের আধুনিকায়নের কাজ হাতে নিয়েছে বেইজিং। এখন জিনজিয়াংয়ের সাথে আরব সাগরের সংযোগ সৃষ্টিকারী কাশগড় করিডোরে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে। দক্ষিণে শ্রীলঙ্কার হামবানটোটা ও পাকিস্তানের গোয়াধর বন্দরের সাথে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের এই এলাকার বন্দরগুলোর সংযোগসাধন করে নতুন সামুদ্রিক সিল্ক রোডের উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে চীন। 

চীনা প্রেসিডেন্ট জি শিংপিংয়ের পূর্বসূরি হু জিনতাওয়ের ২১ শতকের মহাকৌশলের একটি অংশ হিসেবে মেরিটাইম সিল্ক রোডের পরিকল্পনার কথা প্রথম আসে। সমুদ্রসীমা নিয়ে এ অঞ্চলে সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে এটি নিয়ে তৎপরতা খ্বু বেশি দূর এগোয়নি। চীনা নেতারা মনে করেন ভারত মহাসাগরে সমুদ্রবন্দরের এই কৌশলগত বাণিজ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ভারতের অংশীদারিত্ব ছাড়া সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম গভীর সমুদ্রবন্দরে চীন-ভারত যৌথ যে উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে তার সাথে এর একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। এ নিয়ে কোনো সমঝোতা হলে বাংলাদেশে এশিয়ার দুই পরাশক্তির নানা কাজে সমন্বয়ের একটি দৃশ্যপট দেখা যেতে পারে। এতে পদ্মা সেতুতে চীনা অর্থায়নও হতে পারে। সেই সাথে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর যে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান অগ্রসরমান ছিল অথবা আমেরিকান মেরিনের এখানে অবস্থানস্থলের ব্যাপারে যে আলোচনা অন্তরালে হয়ে আসছিল তা খুব বেশি দূর এগোবে না। কিন্তু এখানে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে ভারতের আগামী নির্বাচনে কারা ক্ষমতায় আসছে সেটি নিয়ে। মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য সে নির্বাচনে কংগ্রেসের আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রায় সব পর্যবেক্ষকই নেই বলে উল্লেখ করছে। বেইজিং আলোচনায় এ বিষয়ে কথা হয়ে থাকতে পারে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও দুই দেশের এই আলোচনার মধ্যে যে বাংলাদেশ এবং বঙ্গোপসাগরের বিষয়টি থাকবে তাতে সন্দেহ নেই। এ আলোচনার পথ ধরে কোনো সমঝোতা হলে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ বা যৌথ নৌমহড়ায়ও এর প্রভাব দেখা যেতে পারে। এর পাল্টা কৌশল যুক্তরাষ্ট্র কী নেবে তা এখনই বলা মুশকিল। তবে বিজেপি বা তৃণমূলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের বোঝাপড়ার কথা বলা হচ্ছে। এসব কারণে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা বলা যাচ্ছে না। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতের নির্বাচন এবং বঙ্গোপসাগর এলাকার পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশ মিয়ানমারে পশ্চিমা কর্তৃত্ব কতটুকু থাকবে তার অনেক কিছুই নির্ভর করবে। চীনের মেরিটাইম সিল্ক রোডে ভারতের অংশগ্রহণ এবং উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার যেসব উদ্যোগকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে তার সাফল্যের সাথে এ অঞ্চলে পশ্চিমা স্বার্থের অনেকখানি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বাংলাদেশের একতরফা নির্বাচনোত্তর সরকার কত দিন ক্ষমতায় থাকবে তার অনেক কিছুও এসব মেরুকরণ আর ভারতের মে মাসের নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারে। তবে এ অঞ্চলটি যে ক্রমেই এক ধরনের প্রক্সি সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে পরিণত হতে যাচ্ছে তারই আভাস পাওয়া যাচ্ছে এখন। বুঝে হোক না বুঝে হোক আমাদের নীতিনির্ধারকেরা অনেক ক্ষেত্রে এই খেলার ঘুঁটি হিসেবে যেন নিজেদের ব্যবহার হতে দিচ্ছে। এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত কত দূর গিয়ে ঠেকে তা দেখার জন্য আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

শুক্রবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৩

ইসরাইলের ইনোন পরিকল্পনা ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা

 
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্র্রতিক অস্থিরতা পৃথিবীব্যাপী উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেন এই অস্থিরতা, এর সাথে কারো পরিকল্পনা সক্রিয় কি না, এ বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণ কমই হচ্ছে। ইরাক-ইরান যুদ্ধ, শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত সৃষ্টি, মিসরে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা এবং এর পর নজিরবিহীন গণহত্যাÑ এসব ঘটনার পেছনের রহস্য গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে এখন যা কিছু ঘটছে তার অনেক কিছুই ঘটানো হচ্ছে একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল কাজ শুরু করা হয়। এর পর ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল দু’টি যুদ্ধের পথ ধরে ১৯৭৯ সালে মিসর-ইসরাইল ক্যাম্পডেভিট শান্তিচুক্তি হয়। এর পর নেয়া হয় ১৯৮২ সালে ইনোন পরিকল্পনা আর ইরাক-ইরান দশকব্যাপী যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা তৈরি হয় একই ধারাবাহিকতায়। ইনোন পরিকল্পনায় কী রয়েছে? ইনোন পরিকল্পনা (Yinon Plan) হলো আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য ১৯৮২ সালে নেয়া ইসরাইলের কৌশলগত পরিকল্পনা। ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ওদেদ ইনোন (Oded Yinon) এই পরিকল্পনা তৈরি করেন। এর পর তেলআবিবের সব সরকার প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এই কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনায় বলা হয়, ইসরাইলকে তার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে চার পাশের আরব দেশগুলোকে উত্তপ্ত করে ুদ্র ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ভূরাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় ইরাককে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিশ্চিহ্ন করা হয়। এর পর ইনোন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইরাক-ইরান প্রায় দশককাল ধরে যুদ্ধ চলে। এই যুদ্ধের পর সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখল এবং এর পর ইরাকে আমেরিকান আক্রমণে সাদ্দামের পতন হয়। এর পর দেশটিতে সূচনা হয় শিয়াপ্রধান শাসনের। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের পথ ধরে এখন দেশটিতে প্রতিদিন বোমাবাজি ও সহিংসতায় শত শত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এর পাশাপাশি আরব জাগরণকে সমর্থন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকটি দেশে একনায়ক সরকারের পতন ঘটানো হয়। আর এর পথ ধরে সিরিয়ায় রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে এক লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি মিসরে চলছে নানা রক্তক্ষয়ী ঘটনা। এ সব কিছুর পেছনে কলকাঠি নাড়াচ্ছে ইনোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারীরা। তবে তারা দৃশ্যপটের অন্তরালে থেকেই করছে এ কাজ। ২০০৮ সালে দি আটলান্টিক এবং ২০০৬ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীর আর্মড ফোর্সেস জার্নালে মধ্যপ্রাচ্যের একটি নতুন মানচিত্র ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রায় সবগুলোকে একাধিক ভাগে বিভক্ত দেখানো হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল র‌্যালফ পিটার্স (Ralph Peters) ২০০৬ সালে ইনোন পরিকল্পনাকে ভিত্তি করে এই মানচিত্র এবং এ সংক্রান্ত একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। ইনোন পরিকল্পনাকে সামনে রেখে করা কর্নেল পিটার্সের মানচিত্রে ইরাকের পাশাপাশি লেবানন, মিসর ও সিরিয়াকেও ভাগ করার কথা বলা হয়। এ ছাড়া ইরান, তুরস্ক সোমালিয়া ও পাকিস্তানকেও এই বিভক্তি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুদানকে ইতোমধ্যে যে দুই ভাগ করা হয়েছে সেটি এ পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়েছে। এর পর লিবিয়াকে ভাগ করার কাজও এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। মূল পরিকল্পনায় উত্তর আফ্রিকার ভাঙনকাজ মিসর দিয়ে শুরু করার কথা বলা হয়। বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার জন্য মিসরসহ এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে বিভক্ত করে দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত করার কথা বলা হয় পরিকল্পনায়। বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষিত তৈরির জন্য এটি করা হচ্ছে। মূল ভিত্তি দু’টি দু’টি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ইনোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ করা হচ্ছে। এই দু’টির একটি হলো ইসরাইলকে টিকে থাকতে হলে দেশটিকে অবশ্যই আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুরো অঞ্চলকে নৃতাত্ত্বিক ও সম্প্রদায়গত পার্থক্যের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ুদ্র রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। আর এসব দেশের মধ্যে এমনভাবে বিরোধ-সঙ্ঘাত লাগিয়ে রাখতে হবে যাতে একপর্যায়ে এসব দেশের সরকার তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে কার্যত ইসরাইলের আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সেই সাথে তাদের অবস্থা এমন যেন হয় যাতে তারা কোনো সময় ইসরাইলের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে না দাঁড়াতে পারে। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রথম যখন পত্তন হয় তখন এ ধারণাটি ছিল না। এটি ইনোন পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রহণ করে ইসরাইল। মধ্যপ্রাচ্যে এর পরের বিভিন্ন ঘটনা এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি সামনে রাখা হলে এটি স্পষ্ট হবে। বৃহত্তর ইসরাইলের স্বপ্ন ইসরাইলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকারের লিকুদ পার্টি এবং দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ বৃহত্তর ইসরাইলের ধারণায় বিশ্বাসী। ইহুদিবাদের প্রতিষ্ঠাতা তিইডর হার্জল মিসর থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা হবে বলে উল্লেখ করেছিলেন তার বইয়ে। ইহুদি রাব্বি ফিশকম্যান যে ইসরাইলের কথা তার বইয়ে লিখেছেন তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন সিরিয়া ও লেবাননের একটি অংশকেও। ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতি, ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক শিয়া-সুন্নি সঙ্ঘাত, ২০১১ সালের লিবীয় যুদ্ধ, সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি, মিসরের শাসন পরিবর্তন, নীল নদের উজানে ইথিওপিয়ায় বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগÑ এসব কিছুতে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষণ দেখা যাবে। বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার এই প্রকল্পে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণকে বিমেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আরবদের বিরোধিতা এবং পশ্চিমের লোক দেখানো আপত্তির মুখে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের কাজ এখন অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলছে। মিসরে শাসন পরিবর্তনের নেপথ্য শর্ত হিসেবে এ ব্যাপারে উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুমোদনের কথা বলা হচ্ছে। এর ফলে এক অর্থহীন শান্তি সংলাপে সম্মত হয়ে ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস ইসরাইলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যত সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। প্রক্সি রাষ্ট্র ও বিভাজনের এজেন্ডা বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় বেশ ক’টি প্রক্সি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও রয়েছে। তবে কোন কোন দেশকে এই প্রক্সি রাষ্ট্র বানানো হবে সেটি উল্লেখ করা হয়নি। কানাডার মন্ট্রিয়ালের সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের সমাজতাত্ত্বিক ও গবেষক মেহদি দারবিশ নাজেমোরায়া গ্লোবাল রিসার্র্চে লেখা এক নিবন্ধে এ ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো তিনি আরব জাগরণের সূচনালগ্নে এর গতিপথ সম্পর্কে সম্ভাব্য যে ধারণার কথা বলেছিলেন তা এখন অনেকাংশে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অতীতে বিশেষ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ ইসরাইল আমেরিকার সর্বাত্মক সহায়তায় এর মধ্যেও তার স্থিতি বজায় রাখতে পারছে। অধিকন্তু চার পাশের দেশগুলোর অস্থির অবস্থা দেশটির প্রভাব সম্প্রসারণের কাজকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। এতে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ইহুদি বসতি বিস্তারের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে পারছে ইসরাইল। এ ক্ষেত্রে দেশটির যা কিছু প্রয়োজন তা তার মিত্ররা সরবে বা নীরবে দিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে আরব উপদ্বীপে তৈরি হয়ে আছে এক বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা। এখানকার বংশপরম্পরায় শাসিত সব ক’টি আরব দেশের ভঙ্গুর শাসন টিকিয়ে রাখা আমেরিকান, ক্ষেত্র বিশেষে ইসরাইলের সাহায্য ছাড়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইসরাইলের সাথে অপ্রকাশ্য সম্পর্ক তৈরি করেছে অনেক আরব দেশ। এসব দেশের সরকারের সামনে টিকে থাকাটাই এখন মূল এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। জনগণের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব আর তীব্র বণ্টন ও চাকরি বৈষম্য থেকে সৃষ্ট তীব্র অসন্তোষকে এখানকার বেশির ভাগ দেশে অনেকটা ছাইচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। এখানকার শাসক পরিবারগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধও মাঝে মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর অভিন্ন ভীতি তাদের আবার একই কাতারে নিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে মুরব্বির ভূমিকা পালন করছে সৌদি আরব। বাহরাইন ও ইয়েমেনে শিয়া বিদ্রোহ সৌদি সেনা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দমন করা হয়েছে। এতে দেশ দু’টি এখন আমেরিকা ও সৌদি আরবের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যা তাদের সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য মোটেই সহায়ক হওয়ার কথা নয়। এখানে প্রধানত ইরানের শিয়াভীতিকে জাগিয়ে দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃরাষ্ট্র ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। এর মধ্যেও মাঝে মাঝে বিরোধ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সম্প্রতি সৌদি প্রিন্স খালিদ বিন সুলতানকে ডেপুটি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করার পর তাকে গৃহে অন্তরীণ রাখার আদেশ দিতে হয় বাদশাহ আব্দুল্লাহকে। দেশটিতে যেকোনো ক্ষোভ-বিক্ষোভকে নির্মম দমনাভিযানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হলেও মাঝে মধ্যেই প্রকাশ্যে বিক্ষোভের ঘটনা দেখা যায়। মুসলিম ব্রাদারহুডের বিপক্ষে মিসরীয় সেনাবাহিনীর নজিরবিহীন গণহত্যা সমর্থনের ঘটনায় সৌদি আলেমদের সাথেই শুধু রাজপ্রাসাদের বিরোধ দেখা দেয়নি; একই সাথে রাজপরিবারের বিদেশে থাকা অনেক সদস্য এ ব্যাপারে সৌদি রাজ অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। ইনোন পরিকল্পনা ও পিটার্সের মানচিত্রে সৌদি আরবকে তিন ভাগে বিভক্ত দেখানো হয়েছে। মিসর ও সিরিয়ায় সৌদি আরব যেভাবে জড়িয়ে পড়েছে তাতে এই বিভাজনের ফাটলগুলো ক্রমেই বড় হতে শুরু করেছে। সৌদি রাজতন্ত্র এবং সৌদি আলেম সমাজ দেশটির দুই প্রধান শক্তি। ইসলামি অনুুশাসন, শিক্ষা, বিচার ও সমাজব্যবস্থায় রয়েছে সৌদি আলেমদের প্রভাব। অন্য দিকে সরকার ও প্রশাসন পরিচালনায় রয়েছে সৌদ পরিবারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব। দুই পক্ষ একে অন্যের ব্যাপারে বড়ভাবে হস্তক্ষেপ সাধারণত করে না। এবার মিসরে সেনা অভ্যুত্থানের পর জেনারেল বেঞ্জামিন আল সিসি আল সৌদের (মিসরে এ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছেন তিনি) সেনা জান্তা যেভাবে অভ্যুত্থানবিরোধী গণ-অবস্থান নিশ্চিহ্ন করার নামে হাজার হাজার মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন এবং শত শত লাশসহ মসজিদ পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয়ার মতো অকল্পনীয় ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাতেও সৌদি বাদশাহর প্রকাশ্য সমর্থন কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না আলেমরা। সৌদি আরবের শীর্র্ষস্থানীয় ৫৬ জন আলেম এ ব্যাপারে প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে রাজপ্রাসাদের অবস্থানের সাথে ভিন্নমত জানিয়েছেন এবং মিসরীয় সেনাবাহিনীর কাজকে পাপাচার বলে আখ্যা দিয়ে এর প্রতি ধিক্কার জানিয়েছেন। এই ঘটনায় সৌদি আরবে দুই শক্তিমান পক্ষের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এর ক্ষতি দেশটির শাসকেরা এখন কিছুটা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। রক্তখাদক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা জেনারেল বেঞ্জামিন আল সিসিকে সরিয়ে সেখানে আর কাউকে বসানোর মাধ্যমে মিসরে ব্রাদারহুডের সাথে সমঝোতার একটি প্রস্তাব নিয়ে এখন আলাপ আলোচনা হচ্ছে। মিসরের ঘটনাকে সমর্থন দেয়া এবং এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সৌদি আরবকে বিভক্ত করার ইনোন পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেবে বলে অনেকে মনে করেন। অথচ মিসরের শাসন পরিবর্তনের জন্য দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা অভিন্নভাবে কাজ করেছে। ইনোন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় পিটার্সের নিবন্ধে সৌদি আরবের মক্কা-মদিনা জেদ্দা সমন্বয়ে পবিত্র ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং একটি অংশকে ইয়েমেনের সাথে দিয়ে দেয়া আর বাকি অংশে সৌদি রাজাদের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি স্থান পায়। ইনোন প্লানের আওতায় পিটার্স যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন সে সম্পর্কে সৌদি নীতিনির্ধারকেরা অনবহিত সেটি নয়, তবে সৌদি রাজারা তাদের বাদশাহী শাসনের পথে ব্রাদারহুডের গণতন্ত্রকে বড় হুমকি মনে করে কট্টর এক অবস্থান নিয়েছেন। এতে অর্র্ধশত বছরের বেশি সময় ধরে ব্রাদারহুড ও সৌদি শাসকদের মধ্যে যে বোঝাপড়ার সম্পর্ক ছিল সেটি অবিশ্বাস ও শত্রুতায় পর্যবসিত হলো অল্প সময়ের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত এতে চাঙ্গা হবে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আরব দেশগুলোতে প্রক্সি সরকার প্রতিষ্ঠা করে রাখার বিষয়টি। আন্তঃসম্প্রদায় সঙ্ঘাত ইনোন পরিকল্পনার আওতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তঃসম্প্রদায় বিরোধ সঙ্ঘাত জিইয়ে রাখা। এর অংশ হিসেবে শিয়া-সুন্নি উত্তেজনা শিখরে নিয়ে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে বিভক্তি ও সঙ্ঘাতময় এক অবস্থা তৈরি করা হয়েছে। এ সঙ্ঘাতের দুই পক্ষের এক দিকের নেতৃত্বে রয়েছে সৌদি আরব আর অন্য দিকে রয়েছে ইরান। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর তীব্র আপত্তির মুখে আমেরিকা ইরাকে অভিযান চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটায়। সৌদি আরবের আশঙ্কা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হলে শেষ পর্যন্ত ইরাকের ওপর শিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে এবং ইরানের প্রভাব ইরাক, সিরিয়া হয়ে এক দিকে লেবাননে অন্য দিকে সৌদি আরবের উত্তরাংশের দাহরান এলাকা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। সেই উদ্বেগকে মার্কিন অভিযানের সময় আমলে নেয়া হয়নি, বরং মনে করা হয়েছে সৌদি নিরাপত্তা যত বেশি হুমকির মধ্যে থাকবে দাহরান অঞ্চলে আমেরিকান সেনা উপস্থিতির প্রয়োজন দেশটি তত বেশি উপলব্ধি করবে। সাদ্দামের পতনের কয়েক বছরের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ইরাকে ইরানপন্থী এক শিয়া সরকারই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সুন্নি ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দিয়ে তার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর ঠিক এর বিপরীতে আলকায়েদা নামিয়ে পুরো দেশেই সন্ত্রাস বোমাবাজিতে অস্থিরতার স্বর্গরাজ্য বানানো হয়েছে। এমনভাবে ইরাকে দুই পক্ষকে মুখোমুখি করা হয়েছে যেন নিজেদের অস্তিত্ব ও প্রাধান্য রক্ষার জন্য এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নির্মূল করার লড়াইয়ে নেমেছে। এর অনিবার্য পরিণতি হলো পিটার্স ইরাককে সুন্নি ইরাক, শিয়া ইরাক ও কুর্দিস্তান এই তিন ভাগে ভাগ করার যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন তার বাস্তবায়ন। সিরিয়ায় আরব জাগরণ শুরু হওয়ার পর থেকে একই খেলা শুরু করা হয়েছে। একবার বিদ্রোহীদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র উপায়-উপকরণ দিয়ে বাশার সরকারকে কোণঠাসা করা হয়েছে। আবার হিজবুল্লাহ ও ইরানের মিলিশিয়ার সমর্থনে যখন বাশার সুসংহত হয়ে উঠেছে তখন রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অজুহাতে পশ্চিমা হামলার আয়োজন চলছে। ঠিক এ সময়ে ইসরাইল বলছে এই হামলার মাধ্যমে শুধু বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করলে হবে না। একই সাথে আলকায়েদাকেও নিশ্চিহ্ন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সিরিয়ার পরিণতিও যে সেই পিটার্সের পরিকল্পিত বিভক্তির দিকে যাচ্ছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। মিসরে আরব জাগরণের সফল নাটকের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষকে জাগিয়ে দেয়া হয়েছে। নানা টানাপড়েন শেষে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ড. মুরসি সরকার গঠন করেন। কিন্তু তার সাথে শুরু থেকে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখা হয় সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের। শেষ পর্যন্ত সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নজিরবিহীন দমন অভিযান শুরু করা হয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর। এতে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব কায়রোসহ কয়েকটি শহরে সীমিত হয়ে পড়েছে। আর দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের সৃষ্টি হয়েছে দূরত্ব। এটিকে আরো এগিয়ে নেয়া হলে মিসর কার্যত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে। কায়রো ও আলেকজান্দ্রিয়াসহ আশপাশের অঞ্চলে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন সরকার আর অন্য অঞ্চলে ইসলামিস্টদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হতে পারে। অন্য দিকে সিনাইয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চরমপন্থীদের হামলার অভিযোগ এনে সেটিকে ইসরাইল আবার দখল করে নিতে পারে। ব্রাদারহুডের ব্যাপক লোকক্ষয়ের পরও তাদের প্রতিরোধ সশস্ত্র রূপ না নেয়ায় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অবশ্য ব্যাহত হচ্ছে। ইনোন পরিকল্পনা অনুসারে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে এক পক্ষকে আরেক পক্ষের সাথে এমনভাবে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তারা আপাতত নিজেদের জন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়েছে মনে হলেও তাতে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা বাস্তবায়নেই অগ্রগতি হচ্ছে। যদিও সচেতনভাবে কোনো পক্ষই হয়তো এ কাজ করছে না। রহস্যময়তা রহস্যময় আলকায়েদা সংগঠনের তৎপরতাকেও বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এমনভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, যার সাথে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান তৈরির সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তারা সচেতন ছিলেন বলে মনে হয় না। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, চরম ইসলামিক ভাবধারার কিছু আলেম ও ব্যক্তিত্বের সহায়তায় ওসামা বিন লাদেন এই নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যার সাথে সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও কেউ কেউ ধারণা করেন। তারা এ ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন, আলকায়েদার মূল বক্তব্য হলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলাম কায়েম করা যাবে না। সশস্ত্র¿ জিহাদের মাধ্যমে এটি করতে হবে। আলকায়েদার বক্তব্য ও লক্ষ্যবস্তু বিশ্লেষণ করে বিশ্বেষকেরা বলছেন, বিশ্বের মুসলিম স্বার্থের প্রধান শত্রু হিসেবে ইসরাইলকে চিহ্নিত করা হলেও আলকায়েদার লক্ষ্যবস্তু ইসরাইলকে করা হয়েছে এ রকম দৃষ্টান্ত তেমন দেখা যায় না। এর অপারেশনের লক্ষ্যবস্তু করতে দেখা যায় পশ্চিমা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এতে পশ্চিমের সাথে ইসলামের শত্রুতা ও বৈরিতা তৈরি হচ্ছে, যা ইসরাইলের ইনোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই শেষ পর্যন্ত সহায়ক হচ্ছে। সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তে দেখা যায়, সিরিয়ায় এক দিকে আলকায়েদা অন্য দিকে হিজবুল্লাহ ও শিয়া মিলিশিয়ারা মুখোমুখি। সিনাইয়ে আলকায়েদা সংশ্লিষ্ট চরম ধারার সালাফিস্টরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছেÑ এই অজুহাত মুসলিম ব্রাদারহুডকে নির্মূল করার অভিযানে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে সেনা জান্তা। আলকায়েদা সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গ্রুপ তিউনিসিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের হাতে দুই বিরোধীদলীয় নেতা নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশটির ইসলামিস্ট আন-নাহদার কোয়ালিশন এখন পতনের কাছাকাছি এসে উপনীত হয়েছে। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে অনেকে বলছেন, আলকায়েদার তৎপরতায় যতটা না ইসলামি এজেন্ডার সংশ্লিষ্টতা দেখা যায় তার চেয়ে বেশি দেখা যায় সৌদি সংশ্লিষ্ট সুন্নি এজেন্ডার বাস্তবায়ন। ইরাক, লেবানন, সিরিয়া, পাকিস্তান, ইয়েমেন, বাহরাইনÑ সর্বত্র শিয়া-সুন্নি উত্তেজনা এতে বাড়ছে। আর দূর থেকে হিসাব মেলাচ্ছেন বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টারা। mrkmmb@gmail.com

রবিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১২

দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অস্থিরতা

 বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ ও এর আশপাশের এলাকা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে। সমুদ্রে দৃশ্যমান বরফখণ্ডের মতো এসব ঘটনার খুব সামান্য অংশই আমরা দেখতে পাই। এর গভীরের বিষয়ে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়াস মাঝে মধ্যে দেখা যায়। এর পরও অনেক ঘটনা থেকে যায় অন্তরালে । এতে ঘটনার ভেতরের নানা রহস্যই থেকে যাচ্ছে আমাদের অজানা। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের মতো একটি ুদ্র দেশের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব কতখানি এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক দেখেছি আমরা একসময়। বলা হতো, বাংলাদেশ বিশ্ব পরাশক্তির কাছে গুরুত্বের বিচারে এতই অনুল্লেখযোগ্য যে এ নিয়ে আঞ্চলিক শক্তি ভারত, যা ভাববে তেমন সিদ্ধান্তই নেবে যুক্তরাষ্ট্র। হঠাৎ করে সেই উপেক্ষার বিষয়টি যেন উবে গেছে। এখন বাংলাদেশ নিয়ে ভাবছে অনেকেই। ভাবছে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিয়ে। অর্ধেক সাগরবেষ্টিত পূর্ব-দক্ষিণের জেলায় ঘাঁটি করতে চায় আমেরিকাÑ এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। অংশীদারিত্ব সংলাপÑ এর চুক্তিও হয়েছে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে।  সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়েও টানাপড়েনের অন্ত নেই। মিয়ানমারের ঠেলে দেয়া রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা এখন বিশ্ব মিডিয়ার বিষয়। এর মধ্যে রামুর সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাতের ঘটনা যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। পাহাড়ি তিন জেলায়ও অস্থিরতা নতুন নতুন রূপ পাচ্ছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্বের এসব ঘটনাবলির কোনো তাৎপর্য কি রয়েছে? এ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর সাথে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক যেমন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তেমনি এর সাথে যুক্ত হচ্ছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থের বিষয়ও। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি লেখা বেশ আলোচিত হচ্ছে। নাইল বাউয়ে (Nile Bowe) এর লেখাটির শিরোনাম হলো ‘চীনকে ঠেকানোর জন্যই কি মিয়ানমারের সম্প্রদায়গত সহিংসতা?’ (Myanmar’s Ethno-Sectarian Clashes: Containing China?) গ্লোবাল রিচার্সে এ লেখাটি প্রকাশ হওয়ার পর অনেক মিডিয়া এটি পুনর্মুদ্রণ করেছে। লেখাটির সাথে বাংলাদেশ-উত্তর-পূর্ব ভারত-মিয়ানমারের একটি মানচিত্রও প্রকাশ করা হয়েছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো এ মানচিত্রে বাংলাদেশের ছবির সাথে বৃহত্তর চট্টগ্রাম সংযুক্ত নেই। এটাকে দেখানো হয়েছে মিয়ানমারের সাথে। গবেষণাসমৃদ্ধ অ্যাকাডেমিক মানের এই লেখার কোথায়ও এই মানচিত্রের তাৎপর্য সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু যারা লেখাটি ছেপেছেন সবাই একই সাথে মুদ্রণ করেছেন চট্টগ্রামহীন বাংলাদেশের ছবিও।
মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। ব্যবসায়-বাণিজ্য বা অন্য কোনো কাজে একসময় মিয়ানমার যায়নি এমন পরিবার চট্টগ্রামে কমই পাওয়া যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার দাদা নানা এবং দুই চাচা মৃত্যুবরণ করেছেন মিয়ানমারে। কেউ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কেউ বা আরো পরে।  বাংলা ও বার্মার মধ্যে বাণিজ্য এবং অভিবাসন দুটোই বেশ পুরনো। আজ যারা রোহিঙ্গা মুসলিম তারা আরাকানে বসবাস শুরু করেন সপ্তম শতকের শেষার্ধ থেকে। ব্রিটিশ আমলের প্রতিটি আদমশুমারিতে মিয়ানমারের মুসলিম জনসংখ্যার কথা বলা হয়েছে। সেই জনসংখ্যা থেকে আজকের জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতের মধ্যেও কোনো গরমিল নেই। কিন্তু মিয়ানমার সরকার ১৯৮২ সালে এক নাগরিক আইন করে। সে আইনে  রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করা হয়েছে।  বিস্ময়ের ব্যাপার হলো বার্মার সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে এ নিয়ে কোনো বিরোধ যেন নেই। দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন বলেছেন, তার সরকার কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানাবে না। মিয়ানমারের অভিবাসন মন্ত্রী খিন য়ি উল্লেখ করেন, তার দেশে রোহিঙ্গা নামে কোনো জনগোষ্ঠী নেই। বিরোধী নেত্রী অং সান সু কিকে ইউরোপ সফরকালে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন ‘রোহিঙ্গা কারা?’ আর তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির মুখপাত্র নিয়ান উইন বলেছেন, রোহিঙ্গারা তার দেশের নাগরিক নন। রোহিঙ্গাদের এই নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করার বিষয়টি তাদেরকে আঞ্চলিক খেলার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের বিরাট এক সুযোগ এনে দিয়েছে।
বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালের একেবারে শুরুতে যে ক’টি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছিল তার মধ্যে একটি ছিল মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে অস্বীকৃতি জানিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়াকে কেন্দ্র করে প্রথম দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিসংখ্যান অনুসারে ক্যাম্পের ভেতরে বাইরে দুই লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে বাস করছে। নতুন করে এবারের দাঙ্গার পর যাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়েছে তারা এ হিসাবের মধ্যে নেই। রোহিঙ্গারা আরাকানের ১৪০০ বছরের পুরনো অধিবাসী এবং একসময় স্বাধীন আরাকান রাজ্যের ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ার পরও তাদের নাগরিকত্বকে অস্বীকার করার ব্যাপারে মিয়ানমারের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে হঠকারী। এ সিদ্ধান্তের সুযোগ কোনো কোনো আন্তর্জাতিক শক্তি নিয়ে থাকতে পারে।  রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো আরাকান অঞ্চলের জন্য প্রাথমিকভাবে স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিল। এর সাড়া সরকার দিয়েছে তাদের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। একাধিকবার তাদের দাঙ্গা ও নিপীড়নপ্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুর বাইরে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ ছিল দুই দেশের মধ্যে আরেকটি অমীমাংসিত ইস্যু। গত মার্চে ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর ল অ্যান্ড সিজ’-এর রায়ে এ বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বাংলাদেশ বরাবরই রোহিঙ্গা ইস্যুটি নিষ্পত্তি করে পূর্বমুখী যোগাযোগ স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করে এসেছে। চীন এবং আসিয়ান দেশগুলোর সাথে সড়ক যোগাযোগের জন্য চট্টগ্রাম-মান্দালয়-কুনমিন মহাসড়কের প্রস্তাব দেয় ঢাকা। এর বাইরে রাখাইন স্টেটে একটি যৌথ পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং চাষাবাদের জমি লিজের আলোচনাও একসময় শুরু হয়েছিল। এসব উদ্যোগ বেশি দূর এগোয়নি অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার জন্য। এ অবিশ্বাসকে উসকে দিয়ে দুই দেশের কোনো পক্ষেরই লাভ হচ্ছে না।  কিন্তু এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে অন্যরা।  এর সাথে যুক্ত রয়েছে তাদের স্বার্থ। এই স্বার্থবাদী চক্র সম্পর্কে নাইল বাউয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ।
আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারের সাথে আস্থার সম্পর্ক নির্মাণের ব্যাপারে চীন ও আসিয়ান দেশগুলোর সাথে স্থল যোগাযোগের বিষয়টি যুক্ত থাকলেও এ প্রসঙ্গে সরকারের নীতি সব সময় ইতিবাচক ছিল না। ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ভিুদের আন্দোলনে তদানীন্তন সরকারের বিশেষ ভূমিকা থাকার অভিযোগ ছিল নাইপিডোর। এ সময় সমুদ্রসীমা বিরোধকে কেন্দ্র করে যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময় অবশ্য বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাওয়ার পর একটি যুক্তিসঙ্গত মীমাংসা হয়। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পর তাদের নির্মমভাবে ফিরিয়ে দেয়া এবং হতভাগা অনেকের সলিল সমাধি ঘটার বিষয়টি দেশে-বিদেশে বেশ সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। তবে পররাষ্ট্র সম্পর্কের গভীর বিশ্লেষণে সরকারের এই নীতিকে যুক্তিহীন হিসেবে মূল্যায়ন করা কঠিন।
মিয়ানমারের সরকার বিশ্বাস করে একতরফা মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর মংডু ও অন্য কয়েকটি স্থানে এর পাল্টা ঘটনায় আরনোর (ARNO) মতো কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হাত রয়েছে। এই গোষ্ঠীর সাথে আফগানিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোর যোগাযোগ রয়েছে। আরাকানে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে তালেবান হুঁশিয়ারিকে এ ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
নাইল বাউয়ে মিয়ানমারের সৃষ্ট বর্তমান অবস্থার পেছনে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন। আরাকান উপকূলের বঙ্গোপসাগর এলাকায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাসের মজুদ পাওয়া গেছে। এর দাম হবে বেশ কয়েক শত কোটি ডলার। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় তেল গ্যাস কোম্পানির সাথে যৌথভাবে এ গ্যাসক্ষেত্রে কাজ করছে চীনা কোম্পানিগুলো। চীনের ইউনান প্রদেশে এ গ্যাস নিয়ে যেতে আরাকান থেকে ইউনান পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। রাখাইন প্রদেশের রাজধানী সিটওয়ে চীনা বিনিয়োগ কার্যক্রমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। নাইলের ধারণা, চীনা বিনিয়োগ বাস্তবায়নে প্রক্রিয়াধীন বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয়দের উসকে দিয়ে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে আরাকানের দাঙ্গার পেছনে সে রকম একটি স্বার্থ রয়েছে। মার্কিন-সৌদি আনুকূল্য এর পেছনে থাকতে পারে বলে তার ধারণা।
নাইলের বিশ্লেষণ অনুসারে চীন তার নিজস্ব স্বার্থে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে আমেরিকান প্রভাবকে বাড়তে দিতে চায় না। দেশটি আঞ্চলিক পানিসীমায় চীনা প্রভাব বজায় রাখতে পাকিস্তানের গোয়াধরে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। সেখানে একটি চীনা নৌঘাঁটি গড়ার কাজও চলছে। শ্রীলঙ্কায়ও একই ধরনের প্রকল্প নিয়েছে বেইজিং। সিটওয়েতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে চীন। বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারেও আগ্রহ প্রকাশ করছে বেইজিং। এভাবে চীন বঙ্গোপসাগর অঞ্চলেও তার উপস্থিতি জোরদার করতে চাচ্ছে। এর পাল্টা ব্যবস্থাও নানা ক্ষেত্রে নজরে আসছে। পশ্চিমা অর্থসহায়তাপুষ্ট এনজিও  ও অং সান সু কির দলের সমর্থকদের মাধ্যমে তৈরি জোরদার আন্দোলনে মিয়ানমারের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, এশিয়া ওয়ার্ল্ড কোম্পানি ও চীনা পাওয়ার ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির একটি বৃহৎ যৌথ প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য কাচিনের মিয়িতসোন ড্যাম প্রকল্পটি ছিল বিশ্বের ১৫তম বৃহৎ ড্যাম প্রকল্প, যেটি ইরাবতী নদীতে বাঁধ দেয়ার মাধ্যমে তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। এখানে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ চীনের ইউনান প্রদেশে রফতানির পরিকল্পনা ছিল। মিয়ানমারে যে পরিবর্তনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেটিকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো গোপন কার্যক্রমের সাথে এসব বিষয় সম্পৃক্ত থাকতে পারে।
আরাকানে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার পর ইন্টারনেটে একটি ছবি ডাউনলোডকে কেন্দ্র করে রামুর বৌদ্ধপল্লী ও বৌদ্ধমন্দিরে যে আকস্মিক কাণ্ড ঘটে গেল, সে বিষয়টিও বেশ রহস্যপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এই ইস্যুতে সরকার ও বিরোধীপক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকার এ জন্য দায়ী করছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও। বিষয়টিকে রাজনৈতিক রঙ দেয়ার জন্য মিছিলের অগ্রভাগে থাকা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বাদ দিয়ে বিরোধী দলের সাথে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার এবং তাদের জড়িয়ে ঘটনাটি সাজানো হচ্ছে। কিন্তু যারা ওয়েবসাইটে কুরআন অবমাননামূলক ছবি ডাউনলোড করেছে, সেটিকে নিয়ে যারা উত্তেজনা ছড়িয়েছে, মধ্যরাতে বৌদ্ধপল্লীতে কারা আগুন দিয়েছে আর সবশেষে কেন প্রশাসনের এক ধরনের নীরব ভূমিকা দেখা গেছেÑ এসব বিষয় সে অর্থে তলিয়ে দেখা হচ্ছে না। এ ঘটনার সাথে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন কার্যক্রমের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এ ধরনের ঘটনার রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টা সাধারণভাবে নিতে দেখা যায় না। রামুর ঘটনার ক্ষেত্রেও এর বড় রকমের ব্যতিক্রম নেই। ১৯৭৫-এর ঘটনার সাথে দৃশ্যপটে যারা ছিল কেবল তাদেরই বিচার হয়েছে, এর গভীরে যাওয়ার চেষ্টা আর করা হয়নি। ১৯৮১ সালে জিয়া হত্যার ঘটনার নিষ্পত্তিও করা হয়েছে একইভাবে। নাইল বাউয়ে তার লেখায় বঙ্গোপসাগরের এই ডেল্টা উপকূলের সম্পদ আহরণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বৃহৎ শক্তির যে প্রতিযোগিতাÑ  সে বিষয় উল্লেখ করেছেন। এর সাথে আরাকানের ঘটনার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও তিনি অভিমত দিয়েছেন। রামু প্রসঙ্গে অবশ্য তার কোনো মত পাওয়া যায়নি।
নাইল বাউয়ে চট্টগ্রামবিহীন বাংলাদেশের যে মানচিত্র প্রকাশ করেছেন, তার ব্যাখ্যা তিনি না দিলেও এর সাথে এই অঞ্চলে প্রতিবেশীদের মধ্যে একটি অবিশ্বাস সৃষ্টির প্রচেষ্টার বিষয় যুক্ত থাকতে পারে। মিয়ানমারের জনসংখ্যা বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ হলেও সামরিক শক্তির বিবেচনায় দৃশ্যত দেশটি বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। প্রতিপক্ষের হামলার সুবিধাজনক অবস্থান বিবেচনায় সিটওয়েতে মিয়ানমারের যে নৌঘাঁটি রয়েছে, তা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে নিরাপদ।
মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি হলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা জিইয়ে রাখার একটি প্রচেষ্টা অন্তরালে লক্ষ করা যায়। এ অঞ্চলের অস্থিরতার সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। মিয়ানমারে চীন ও আমেরিকার বিনিয়োগ ও কর্তৃত্ব বাড়ানোর যে লড়াই শুরু হয়েছে তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিয়ানমার সফরে আসছেন। বড় রকমের কোনো ব্যত্যয় না ঘটলে ২০১৫ সালের নির্বাচনে অং সান সু কির দল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি জয়ী হবে। যদিও বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর একটি ভূমিকা থাকবে সরকার পরিচালনায়। প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের ভূমিকা চলমান পরিবর্তনের পক্ষেই মনে হয়। তিনি মিয়ানমারে পশ্চিমা বিনিয়োগের জন্য আইনি কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কার আনছেন। এসব কাজে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক ভূমিকা রাখছে।
মিয়ানমারের এ পরিবর্তন বাংলাদেশে বিশেষত চট্টগ্রামে প্রভাব ফেলতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের যেকোনো ধরনের বিচ্ছিন্ন তৎপরতাকে অতীত বা বর্তমান বাংলাদেশের কোনো সরকারই যেমন সমর্থন করেনি, তেমনি প্রতিবেশী ভারত ও চীনও সমর্থন দিচ্ছে না এ ধরনের কর্মকাণ্ডে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পশ্চিমের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের ভূমিকা রহস্যপূর্ণ। সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ভূমি ও উন্নয়ন ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর যেকোনো যৌক্তিক দাবিকে সরকারের সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু তা কোনোভাবেই সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে হতে পারে না। এ কৌশলগত মৌলিক বিষয়ে সরকারের অনেক কার্যক্রম দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বলে মনে হয় না। সরকার একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চাইছে নাÑ সেটি হলো বাংলাদেশের মতো দেশে যেকোনো পশ্চিমা হস্তক্ষেপ জঙ্গিবাদের বাহানা নিয়েই আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে আলকায়েদা বা জঙ্গিবাদের প্রভাব বাড়ছে বলে সরকারিভাবে কোনো প্রচারণা যদি চালানো হয় তার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো অ্যাজেন্ডা ব্যাক অব দ্য মাইন্ডে রেখে জঙ্গিবাদ দমনে সামরিক হস্তক্ষেপের মতো সুযোগ তৈরি হতে পারে পশ্চিমাদের জন্য। সেই অ্যাজেন্ডাটি যদি পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদানের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। রামুর ঘটনায় জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততা, দেশের মধ্যপন্থী-গণতান্ত্রিক ধারার বৃহৎ একটি ইসলামি দলকে জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ত করে প্রচারণা চালানো এবং এ দলটির সাথে সরকারের জঙ্গি সংগঠনের মতো আচরণÑ অদূরভবিষ্যতে কতটা আত্মঘাতী হতে পারে বিষয়টি গভীরভাবে রাষ্ট্রের শীর্ষব্যক্তিরা হয়তো বিশ্লেষণের প্রয়োজন মনে করছেন না। যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতকে এফবিআই স্টিং অপারেশন চালিয়ে জঙ্গি হিসেবে প্রতিপন্ন করে দীর্ঘমেয়াদি জেল দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়টিকে একেবারে সাদামাটাভাবে দেখা উচিত হবে না। বাংলাদেশ সরকার সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে নিজের তৈরি ফাঁদে নিজেই পড়তে যাচ্ছে কি না গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। বাংলাদেশের মতো একটি আন্তর্জাতিক বিশ্বনির্ভর দেশকে অতি সতর্কভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে পররাষ্ট্রনীতির কৌশল সাজাতে হবে। এ কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকবে। কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক জোরালো সম্পর্ক থাকবে চীনের সাথে। একই সাথে মুসলিম বিশ্বের সাথেও ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্কের ওপর জোর দিতে হবে। আস্থার সম্পর্ক নির্মাণ করতে হবে প্রতিবেশী দেশ ভারত-মিয়ানমারের সাথেও। এ নীতিতে যেকোনো ভুল-ভ্রান্তি দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করতে পারে। এর ছোটখাটো কিছু লক্ষণ দেশের সংঘাতময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং এ অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর আনাগোনায় দেখা যাচ্ছে। এর প্রতি সুতিè নজর রাখা না হলে বিপদ যখন সমাগত হয়ে দাঁড়াবে তখন কিছু করার থাকবে না।