রইসউদ্দিন আরিফ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রইসউদ্দিন আরিফ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৫ মার্চ, ২০১২

দেশপ্রেমের পাঠ - ২

“উপদেষ্টারা এমনভাবে কথা বলেন, মনে হয়, তাঁরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা নন,
 তাঁরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উপদেষ্টা” - রাশেদ খান মেনন।


এক.
মূল প্রতিপাদ্যে যাওয়ার আগে দেশপ্রেম নিয়ে সামান্য গৌড়চন্দ্রিকার অবতারণা করতে চাই। বিগত আশির দশকের প্রথম দিকে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের কথা অনেকেরই হয়তো স্মরণে আছে। খবরটি ছিল ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য বিষয়ক। সেই খবরে যাওয়ারও আগে উল্লেখ্য যে, সত্তরের দশকে সীমান্তের ওপার থেকে বৈধ ও অবৈধ পথে আমদানি হওয়া ভারতীয় বস্ত্রে যখন বাংলাদেশের বাজার সয়লাব, তখন দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ও বস্ত্রকলগুলোর উদ্যোক্তারা বাজারে ভারতীয় বস্ত্রের প্লাবন ঠেকানোর জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। তারা তখন নি¤œমানের ভারতীয় শাড়ির বিপরীতে ভালো মানের শাড়ি উৎপাদন করে বাজারজাতের কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় পণ্যের প্রতি আমাদের ‘বাঙ্গাল’ মন-প্রাণ তখন এমনই অন্ধমোহের জ্বরে আক্রান্ত যে, সে সময় ভালোমানের দেশীয় শাড়ি বাদ দিয়ে নি¤œমানের ভারতীয় শাড়ি কেনার জন্য দেশের বিপনীগুলোতে লম্বা লাইন পড়ে যেতো। মনে আছে, তখন হুজুগে বাঙ্গালদের ভারতীয় পণ্যের প্রতি অন্ধ মোহের ধাক্কা সামলাতে না পেরে বাজারের দোকানিরা দেশীয় কাপড়ে বিজাতীয় ছাপ মেরে ভারতীয় শাড়ি বলে বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। আর সে সময় বাংলাদেশী কাপড় ভারতের বাজারে রফতানির তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সাধারণভাবে ভারতের বাজারে তখন বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ও কাঁচা পাট ছাড়া আর কিছু রফতানি হতো না।
অতঃপর আশির দশকের প্রথম দিকে একবার কিছুদিনের জন্য ভারতে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে ভারতের, বিশেষকরে পশ্চিমবাংলার (কলকাতার) বাবুরা যখন পদ্মার ইলিশে রসনা তৃপ্ত করার জন্য পাগলপ্রায়, তখন ভারতে ইলিশ রফতানি নিশ্চিত করার জন্য শুধু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসরকারই নয়, দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারও ঢাকার সরকারের সাথে দেনদরবার শুরু করে। আর সেসময়ই ঘটে এক চমকপ্রদ ঘটনা। বাংলাদেশ যখন শর্ত আরোপ করে যে, ভারতকে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ মাছ আমদানির সঙ্গে সমপরিমাণ মূল্যের জামদানি শাড়িও আমদানি করতে হবে, তখন আমাদের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রটি বেঁকে বসে। এমনকি ওই সময় বাংলাদেশের শর্ত মেনে ভারত সরকার যাতে বাংলাদেশ থেকে জামদানি শাড়ি আমদানি না করে তার জন্য ভারতের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের বস্ত্রকলগুলোর মালিকেরা কলকাতায় প্রতিবাদ মিছিল করেন। তারা একথাও ঘোষণা দেন যে, ঢাকা এমন শর্ত আরোপ করলে প্রয়োজনে তারা ইলিশ মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেবেন, তবুও নিজ দেশের কাপড় কলগুলোর স্বার্থে তারা বাংলাদেশের কাপড় আমদানি করবেন না। এখন প্রশ্ন হলো, এর জন্য কি ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গবাসীকে দোষ দেওয়া যায়? না মোটেও না। বরং আমি বলবো, এটা হলো তাদের গভীর দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।
দুই.
আশির দশকের সেই ঘটনাটা টানলাম আজকের চল্লিশ বছরের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকার এবং প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর দেশপ্রেমের একটি নির্মোহ পর্যালোচনার জন্য। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে নিজের নির্ধারিত ঢাকা সফর বাতিল করে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি ঠেকানোর জন্য যে কূটনৈতিক ‘নাটকের’ অবতারণা করেন তাকে ইতিমধ্যে অনেকে দিল্লি সরকারেরই একটি ‘চাণক্য’ চাল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মধ্যে হয়তো সত্যতাও আছে। কিন্তু  তারপরও মমতা ব্যানার্জীর এই আচরণকে শুধুমাত্র দিল্লি-নির্ভর কূটনৈতিক চাল অভিহিত করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হবে। বরং আমি মনে করি, মমতা ব্যানার্জীর এই আচরণের মধ্যে তাঁর দেশপ্রেমও বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। সেটা যদি গোটা ভারতের জন্য না-ও হয়, তবু অন্তত পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে তো বটেই।
মমতার যুক্তি ও আশঙ্কা হলো, দিল্লির সঙ্গে ঢাকার দ্বিপাক্ষিক তিস্তা চুক্তি হলে পশ্চিমবঙ্গ তিস্তার পানি বাংলাদেশের চেয়ে কম পাবে।  চুক্তিটা সেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশ ও স্বাধীন ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, সুতরাং তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি তো সমঅধিকারের ভিত্তিতেই হতে হবে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র রাষ্ট্র আর ভারত বিশাল বড় রাষ্ট্র - সেই হিসাব করে যদি পানিবন্টন চুক্তি হয় তাহলে বাংলাদেশের তো তিস্তার পানি প্রায় একদমই পাওয়ার কথা নয়। তাছাড়া বাংলাদেশ তো পশ্চিমবাংলার মত ভারতের কোনো রাজ্য নয়। বাংলাদেশ হলো ভারত রাষ্ট্র থেকে আলাদা এক স্বাধীন রাষ্ট্র এবং সে অনুযায়ী দুই দেশের অভিন্ন নদী তিস্তার পানির ওপর ভারতের যে অধিকার আছে, বাংলাদেশেরও সেই একই অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশ তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেলে ভারতের একটি রাজ্য  (যেমন পশ্চিমবঙ্গ) যদি কম পানি পায়, তাহলে নিখিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব হলো, প্রতিবেশী স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও তা রক্ষার বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সমস্যা গোটা ভারতের প্রেক্ষাপটে আভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করা।
কিন্তু বাংলাদেশ তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেলে পশ্চিমবাংলা যদি কম পানি পায় তাহলে মমতা ব্যানার্জী তা মানতে রাজী নন। তিনি তাঁর রাজ্যের স্বার্থে বাংলাদেশকে তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে হলেও তিস্তার পানি তিনি রাজ্যের পুরো চাহিদা অনুযায়ীই চান। যে যা-ই বলুন, আমি মনে করি, এটা দিল্লি কলকাতার যৌথ কূটনৈতিক চালের ঊর্ধ্বে মতার দেশপ্রেমও বটে। এ ক্ষেত্রে আমার কথা হলো, বাংলাদেশের শুধু আজকের প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীবর্গ নন, আগের সকল প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারপ্রধানদের যদি একজন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর মতোও এমন দেশপ্রেম থাকতো, তাহলে ভারতের সাথে অভিন্ন নদীগুলোর পানি সমস্যা চল্লিশ বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণের গলার ফাঁস হয়ে থাকতো না। আমাদের দেশপ্রেমের বিরল দৃষ্টান্ত কি এখনো কম জ্বাজ্জল্যমান? একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। আজকের আওয়ামী মহাজোট সরকারের মন্ত্রীপরিষদের মাননীয় সদস্যগণ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানিত উপদেষ্টাগণ যখন ভারতের সঙ্গে সকল দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানের নানা পদক্ষেপ নিতে গিয়ে স্বাধীন দেশের প্রতিনিধি হিসেবে তো দুরের কথা, এমনকি ভারতের কোনো রাজ্য সরকারের মন্ত্রীর মত করেও নয়, খোদ দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্ত প্রতিনিধির মতো কথা-বার্তা বলেনÑতখন আমাদের চল্লিশ বছরের গলার ফাঁস ঢিলা হয় না, আরো শক্ত হয় এবং গলায় নতুন নতুন ফাঁস পরে।
তিন.
প্রতিবেশী দেশের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দেশপ্রেম নিয়ে কথা শেষ হলো না। কথা আরো আছে। শুধু অভিন্ন নদী তিস্তা নয়, আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার পানির হিস্যা নিয়েও এখন সোচ্চার হয়ে উঠেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। গঙ্গার ওপর দিল্লি সরকারের তৈরি ফারাক্কা বাঁধের সর্বমোট ১০৮টি স্লুইস গেটের মধ্যে মাত্র দুটি স্লুইস গেটে সম্প্রতি ফাটল ধরার কারণে দুর্ঘটনাবশত ফাটল চুয়িয়ে কিছু বাড়তি পানি বাংলাদেশে এসে পড়ায় মমতা ব্যানার্জী বিশ্ববাসীকে জানান দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আর কেবল ক্ষোভ প্রকাশ করেই তিনি নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকেননি। সঙ্গে সঙ্গে দিল্লি দৌড়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ জরুরি নজরে এনেছেন। মমতার অভিযোগ খুবই গুরুতর। তাঁর দাবি, ‘দুটি স্লুইস গেটে ফাটল সৃষ্টির কারণে ফাটল চুয়িয়ে বাংলাদেশে অতিরিক্ত পানি চলে যাচ্ছে, তার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথীসহ বেশ কয়েকটি নদী শুকিয়ে যাচ্ছে।’ মমতা ব্যানার্জী অভিযোগ করে আরো বলেছেন, ‘ফারাক্কার দুটি স্লুইস গেটের ফাটল দিয়ে অতিরিক্ত পানি বাংলাদেশে চুয়িয়ে যাওয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গে পানি ও বিদ্যুতের ব্যাপক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে।’
মমতা ব্যানার্জীর অভিযোগ কতখানি সত্য, অথবা ভবিষ্যতে উজানের ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশকে একেবারেই না দেওয়ার অজুহাত তৈরির জন্য এটিও দিল্লি-কলকাতার ‘চাণক্য’ কৌশল কিনা এ প্রশ্নটি বিবেচনায় রাখার পরও বলতে হয়, এর মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর প্রগাঢ় দেশপ্রেম। তবে বাংলাদেশের মানুষেরও অভিযোগ আছে। সে অভিযোগ মমতার অভিযোগের চেয়েও অতিগুরুতর। ফারাক্কা বাঁধের ১০৮টির মধ্যে দুটি স্লুইস গেটের ফাটল চুয়িয়ে তিন মাসে আসা ‘অতিরিক্ত’ পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করার কারণে যদি পশ্চিমবঙ্গের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে, তাহলে সে অনুযায়ী ভারত সরকারের তৈরি ফারাক্কা বাঁধ ও তার উজানে আরো শত শত মিনি ফারাক্কার প্রতিক্রিয়ায় আটত্রিশ বছরে বাংলাদেশের ক্ষতি ও বিপর্যয় হয়েছে হাজার গুণ বেশি। তারপরও বলতে হয়, উজানে বাঁধ দিয়ে নদ-নদীর পানি প্রত্যাহারের কারণে প্রতিবেশী ভাটির দেশের এমন নজিরবিহীন ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঘটনা দিল্লি ও কলকাতার বিবেককে নাড়া না দিলেও এবং তার ফলে বাংলাদেশের মানুষের বুকে বড় ক্ষত তৈরি হলেও - অন্তত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের স্বার্থরক্ষায় মমতা ব্যানার্জীর দেশপ্রেমের তারিফ না করে পারা যায় না।
অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের আজকের এবং গত চল্লিশ বছরের সরকার ও সরকার প্রধানদের যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মতোও দেশপ্রেম থাকতো, তাহলে উজান দেশের নদী আগ্রাসানের কারণে বাংলাদেশের যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে তা কোনোভাবেই ঘটতে পারতো না। দেশপ্রেমের ছবক মমতা ব্যানার্জী আমাদেরকে আরো কতভাবে দিচ্ছেন পাঠক লক্ষ্য করুন। দুইটি স্লুইস গেটের ফাটলের কারণে গঙ্গার পানিপ্রবাহ প্রত্যাহার সামান্য বিঘিœত হওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘রাজ্যের এই ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে?’ দেখুন কত বড় উদ্বেগ তাঁর।
আর এদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থার কথা আরেকবার ভাবুন। চল্লিশ বছর দেশের উজানে গঙ্গাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীতে প্রতিবেশী ভারত শত শত বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে দেশের প্রায় অর্ধেক অঞ্চল যে আধা-মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, কৃষি-মৎস্য-গবাদিপশু-প্রকৃতি-পরিবেশ ও জনজীবনের যে ভয়াবহ ধ্বংসসাধন হয়েছে সেই ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে তার জন্য কোনো কৈফিয়ৎ বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী কি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অন্তত মমতা ব্যানার্জীর মত করেও আজ পর্যন্ত তুলতে পেরেছেন? এমনকি দেশমাতৃকার বুকে মানবসৃষ্ট এই মহাবিপর্যয়ের কথা আজ পর্যন্ত বিশ্বদরবারে  (কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে) তুলতে পেরেছেন কি আমাদের কোনো প্রধানমন্ত্রী বা কোনো সরকার প্রধান? প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তো ভারতকে বাংলাদেশের ‘মরণফাঁদ’ ফারাক্কা বাঁধ চালু করার সম্মতি প্রদানের মাধ্যমে নিজের পায়ে কুড়োল মেরে ‘জাতির পিতা’র দায়িত্ব পালন করে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ভুলের মুল্যায়ন দেশের কোনো সরকার, কোনো সরকারপ্রধান কি আজ পর্যন্ত করেছেন? প্রকাশ্যে অথবা গোপনে দিল্লির নতজানু হওয়া ছাড়া অন্তত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর মত করেও দিল্লির পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনো চিৎকার দিতে পেরেছেন কি আমাদের কোনো প্রধানমন্ত্রী?
তাই আজ মনে প্রশ্ন জাগে, লাখ লাখ শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ জনগণের প্রাণের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত যে দেশটিকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ বলে দাবি করা হয়, সেই দেশের সরকার ও সরকারপ্রধানরা যখন দেশপ্রেমের পরীক্ষায় প্রতিবেশী দেশের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও হেরে যান, সেই দেশের ভাগ্যবিপর্যয় কে  ঠেকাতে পারে বলুন?
 রইসউদ্দিন আরিফ : লেখক, গবেষক, কলামিস্ট,

বৃহস্পতিবার, ১ মার্চ, ২০১২


শুরুতেই বলে নিই- দেশপ্রেম নিয়ে সচরাচর আমরা যে কথাবার্তা বলি, তা প্রথমে বলি জনগণের দেশপ্রেম নিয়ে এবং তারপর বলি বিরোধী দলের দেশপ্রেম নিয়ে। সাধারণত সরকার বা সরকারি দলের দেশপ্রেম নিয়ে আমরা কথা বলি না, বরং তাদের দেশপ্রেম নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি। কারণ আমরা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিই বাংলাদেশের মতো একটি সাম্রাজ্যবাদ-সমপ্রসারণবাদ নিয়ন্ত্রিত নয়া ঔপনিবেশিক দেশের কোনো সরকারই এবং কোনো সরকারি দলই দেশপ্রেমিক হয় না। অন্তত স্বাধীন বাংলাদেশের চল্লিশ বছরের ক্ষমতার রাজনীতির বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদেরকে এমনটি বলতে বাধ্য করে। অথচ বাস্তবে যেটি হওয়া উচিত সেটি হলো, বাংলাদেশের মতো শতকরা এক শ’ ভাগ পরনির্ভরশীল ও ভয়ানকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশে সাধারণ জনগণ ও বিরোধী দলের যতটা দেশপ্রেম থাকা জরুরি তার চেয়ে বেশি দেশপ্রেম থাকা জরুরি দেশ পরিচালনাকারী সরকার ও সরকারি দলের।

আর সরকার ও সরকারি দল বলতে তো ক্ষুদ্র কোনো অংশ বোঝায় না। সরকারের উপরিকাঠামোর (মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের) বাইরেও থাকে সরকারি দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী-সমর্থক, যারা জনগণেরই অংশ। তা ছাড়া তারা জনগণের শুধু অংশই নয়, বরং সাধারণ হিসাবে বলা যায় ‘সংখ্যাগুরু’ অংশ। কারণ সংখ্যাগুরুর ভোটেই তো সরকার নির্বাচিত হয়। আর এটি সব নির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ কারণেই বলছিলাম, সাধারণ জনগণ ও বিরোধী দলের চেয়ে সরকার ও সরকারি দলের দেশপ্রেম থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি। বলা বাহুল্য, বাস্তব কাজকর্মে তার কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলেও যখনই যে দল বা জোট ক্ষমতায় যায় তারাই নিজেদের দাবি করে সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক বলে। সেই দেশপ্রেম নিয়েই আমাদের আজকের প্রথম পাঠ।

শুরু করব একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক ছোট্ট প্রতিবেদন দিয়ে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন পত্রিকার ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি মাহবুবুল হক। প্রতিবেদনের শিরোনাম হ"েছ- ‘হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচ থেকে বালু তুলছেন আ’লীগ নেতা’। খুবই গতানুগতিক খবর। সরকারি দলের লোকদের দিয়ে এ রকম ঘটনা সারা দেশে প্রতিদিনই ঘটছে এবং তা পত্রপত্রিকায় ছাপা হ"েছ। কিন' এই প্রতিবেদনের একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পাবনার পাকশীর হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা হ"েছ। সেতুর পাকশী প্রান্তে পাকশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা (সভাপতি) এনামুল হক ও তার লোকজন কয়েক মাস ধরে সেতুর সীমানার ভেতর থেকে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটছেন। এতে সেতু ও সেতু রক্ষা বাঁধ হুমকির মধ্যে পড়েছে।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘পাকশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা এনামুল হক ও তার লোকজন হার্ডিঞ্জ সেতু এলাকা ইজারা নিয়ে বালু ও মাটির ব্যবসায় করছেন। বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার কাজ তদারকি করেন পাকশী ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা তুহিন। তুহিন জানান, বালুর প্রকারভেদে প্রতি ট্রাক এক হাজার থেকে আট হাজার টাকায় বিক্রি হ"েছ। তিনি বলেন, সেতুর নিচ থেকে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা নিষিদ্ধ জেনেও তিনি নেতার নির্দেশে এই কাজ করছেন।’ (সূত্র : প্রাগুক্ত)।

খবর যতই গতানুগতিক হোক, এখানে কয়েকটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে :
এক নম্বর প্রশ্ন হলো : সেতুর নিচ থেকে শত শত অথবা হাজার হাজার ট্রাক বালু ও মাটি উত্তোলন করে নেয়ার ফলে যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আজ হুমকির মধ্যে পড়েছে এবং ঐতিহ্যবাহী যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আজ থেকে প্রায় দেড় শ’ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছিল, সেই হার্ডিঞ্জ সেতু আজ ২০১২ সালে নির্মাণ করতে হলে প্রয়োজন পড়বে কমপক্ষে পনেরো হাজার কোটি টাকা।

দুই নম্বর প্রশ্ন হলো : ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ সেতু তো বাংলাদেশের প্রধান নদী এককালের বিপুল জলরাশির প্রমত্তা পদ্মার ওপর অবসি'ত। সেই পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচে খনন করে হাজার হাজার ট্রাক বালু ও মাটি উত্তোলন করা কিভাবে সম্ভব হ"েছ? এটা কিন' খুবই বড় প্রশ্ন। স্বাধীনতার আগের বছরের কথাও যদি ধরা যায় তাহলে সে সময় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মার তলা থেকে এক বেলচা বালু ও মাটি উত্তোলন করতে হলেও তার জন্য প্রয়োজন হতো ঝানু ডুবুরির। আর আজ? প্রমত্তা পদ্মার তলদেশ আজ শুকনো বালুচর। নদীর বুকের শুষ্ক বালুচর থেকে শত শত শ্রমিকের কোদাল-বেলচা দিয়ে উত্তোলিত বালু ও মাটি পরিবহনের জন্য অবাধে চলাচল করছে শত শত ট্রাক। প্রমত্তা পদ্মার গভীর তলদেশ আজ খাঁ খাঁ বালুচর। আর সেখানে এখন সরকারদলীয় ‘দেশপ্রেমিক’ লোকদের চলছে বাণিজ্যের রমরমা বাজার।

প্রমত্তা পদ্মার আজ এই দশা হলো কেমন করে সেটি যেমন আমরা সবাই জানি; তেমনি আজকের ক্ষমতাসীন আওয়ামী মহাজোট সরকার ও সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও জানেন। কবি রবিঠাকুরের কাব্যচর্চা ও গানের প্রেরণা এককালের গ্রীষ্ম-বর্ষা উভয় ঋতুর বিপুল জলরাশির পদ্মা আজ ধু-ধু বালুচর। অতীতের খরস্রোতা পদ্মা আজ নিস্তেজ অজগরের মতো বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে পড়ে আছে খাঁ খাঁ তৃষ্ণা বুকে নিয়ে। সীমান্তের ওপারে ফারাক্কা, তার উজানে শত শত মিনি ফারাক্কা আমাদের গলায় ফাঁস পরিয়ে দিয়েছে। ষোলো কোটি মানুষের ‘মারণফাঁদ’ ফারাক্কা-মিনি ফারাক্কার প্রতিক্রিয়ায় দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ সবুজ-শ্যামল অঞ্চল আধা-মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। বিশাল জলরাশি পদ্মার বুকে বিশ্বকবির ‘সোনার তরী’র বদলে আজ শুষ্ক মওসুমে গরুর গাড়ি চলে। সেচের অভাবে লাখ লাখ একর জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। বন, মৎস্য, পশুসম্পদ ও পরিবেশ আজ ধ্বংসের মুখোমুখি।

উজানে ভারত সরকারের তৈরী ফারাক্কা বাঁধের কারণে আটত্রিশ বছর ধরে পদ্মার পানিপ্রবাহ ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলো সমুদ্রের লোনাপানিতে সয়লাব হয়। লোনাপানির কারণে লাখ লাখ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়, মিঠাপানির মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়। ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় সুন্দরবনের বনাঞ্চলের অনেক অংশ ইতোমধ্যে উজাড় হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে নিয়মিত খরা এবং দক্ষিণের বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে। সীমান্তের ওপারে পদ্মার (গঙ্গার) ওপর ফারাক্কা এবং তার উজানে আরো শত শত ছোট-বড় বাঁধের কারণে বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের অস্তিত্ব আজ বিপন্নপ্রায়।

এবারে তিন নম্বর প্রশ্ন হলো : পদ্মা নদীর ওপর হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচে অথৈ পানির বদলে আজ যে খাঁ খাঁ শুষ্ক বালুর স্তূপ এবং সেই সাথে চার পাশে মরুকরণ ও ধ্বংসলীলার কারণ যে উজানে ভারত সরকারের তৈরী ফারাক্কা বাঁধ- এ খবর কি পাকশী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা জানেন না? কেউ বলবে হয়তো জেনেও জানেন না, বুঝেও বোঝেন না। কারণ ফারাক্কা তো তার জীবনে কোনো অভিশাপ নয়। ফারাক্কা তো তার জন্য কোনো মারণফাঁদ নয়। ফারাক্কার প্রতিক্রিয়ায় পদ্মা শুকিয়ে যাওয়ার বদৌলতেই তো হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচের বালুর খনি এখন তার দখলে। তার তো এখন স্বপ্ন শুধু টাকার। লাখ নয়, কোটি টাকার। হার্ডিঞ্জ সেতু ধ্বংস হোক তাতে তার কী? ফারাক্কার প্রতিক্রিয়ায় দেশ মরুভূমি হয়ে যাক তাতে তার কী এসে যায়? তার দরকার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, আর দরকার ভারতের সাথে ‘বন্ধুত্ব’। আর এই হ"েছ আজকের সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের দেশপ্রেম।
লেখক : প্রাবন্ধিক

বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১২

হায় আমাদের দেশপ্রেম! হায় আমাদের সার্বভৌমত্ব বোধ!


এক.
বাংলাদেশের নদী তিতাস নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ উপন্যাস লিখেছিলেন Ñ তিতাস একটি নদীর নাম। এখন দেশের লেখক-কলামিস্ট-বুদ্ধিজীবীরাও তিতাস নিয়ে লেখালেখি করছেন। না, তারা কোনো গল্প উপন্যাস লিখছেন না। তিতাস নিয়ে তারা পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন লিখছেন। তারা এখন লিখছেন Ñ ‘তিতাস ছিল একটি নদীর নাম’। এর অর্থ, তিতাস এখন এক অতীত। অর্থাৎ তিতাস এককালে নদী ছিল বটে Ñ মল্লবর্মণের ভাষায়, “তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস, স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়, ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়, রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না’। আর এখন? এখন তিতাস আর নদী নাই। তিতাস এখন এক খুন হওয়া লাশ।
বাংলাদেশের সকল নদ-নদীর উজানে ভারতীয় ভূখন্ডে ভারত সরকার অসংখ্য বাঁধ দেওয়ার কারণে ইতিমধ্যে আমাদের বহু নদী শুকিয়ে মরে গেছে। বাদবাকি নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে অর্ধমৃত অবস্থায় ধুকে ধুকে কোনো রকমে  বেঁছে আছে। কিংবদন্তির তিতাস তেমনিই এক নদী। প্রতিবেশী দেশটির নদী-আগ্রাসনের মধ্যেও এক বছর আগেও তিতাসকে নদীই বলা যেতো। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে আর নদী বলার উপায় নেই। তিতাসের ওপর ভারতের এক নিষ্ঠুর আগ্রাসন ঘটে গেছে। ভারতীয় পরিবহন সংস্থা আসাম বেঙ্গল কেরিয়ার (এবিসি) তিতাস নদীর বুকের ওপর মাটি ও বালুর বস্তা ফেলে তৈরি করেছে সড়ক। ভারত এতোদিন আমাদের নদ-নদীতে বাঁধ দিয়ে আসছে উজানে, ভারত-ভূখন্ডে। এখন তারা তাদের নানাবিধ প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভূখন্ডে এসে নদীর ওপর বাঁধ দেওয়া শুরু করেছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারত সরকারকে সরাসরি বাংলাদেশের ভূখন্ডে ঢুকে এই ধ্বংসাত্মক কাজটি করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে আজকের আওয়ামী মহাজোট সরকার। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক দেশ কর্তৃক আরেক দেশে বাঁধ দিয়ে নদীর পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ যেখানে নদী-আগ্রাসন এবং মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়, সেখানে ভারতীয় পরিবহন সংস্থা তিতাস ভরা করে নদীর বুক চিরে সড়ক নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়াই। বাংলাদেশের সাথে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান তথা ভারত সরকারের এ ধরনের আচরণে এ দেশের সার্বভৌমত্বের লংঘন হলেও ‘ভারতবান্ধব’ সরকারের বদৌলতে তা জায়েজ হয়ে গেছে। ভারতকে দোষ দিয়ে লাভ কী? বাংলাদেশের সরকারই তো ‘বন্ধুত্ব’ চিরস্থায়ী করার জন্য ভারত সরকারকে এ সুযোগ করে দিয়েছে। আর কেবল তিতাসের ওপর সড়ক নির্মাণই নয়। বর্তমান সরকার তো দেশের পুরো স্থল ও জল ভূখন্ডেই ভারতকে করিডর দিয়ে ফেলেছে।
আমরা জানি এবং ইতিহাসে লেখা আছে, মীরজাফর-জগৎশেঠরা ‘বন্ধুত্বের’ জন্য দেশের মাটিতে ব্রিটিশদের ডেকে এনেছিল। বাংলাদেশে আজ যা যা ঘটছে তার ইতিহাস এখন লেখা যাবে না। কেউ সত্য ইতিহাস লিখলে তাকে ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করা হবে। সে ইতিহাস লিখবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
দুই.
ভারতীয় কোম্পানী আমাদের সার্বভৌমত্ব লংঘন করে বহমান তিতাস নদীর বুক চিরে সড়ক নির্মাণ করেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুকেন্দ্রের ভারী যন্ত্র ও যন্ত্রাংশবাহী ১৩০ চাকাবিশিষ্ট ৩৫০ টন ওজনের বিশাল ট্রেইলার চলাচলের জন্য। এরূপ ৯৬টি কনটেইনার প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নৌপথে বাংলাদেশের আশুগঞ্জ বন্দরে পৌঁছে, তারপর সেখান থেকে সড়কপথে আখাউড়া স্থলবন্দর হয়ে ত্রিপুরায় যাওয়া শুরু করে।
নদীর প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে তিতাসের ওপর ভারত এই বাঁধ তথা সড়কটি নির্মাণ করেছে এক বছর আগে। এর অর্থ, তিতাসের বুকের ওপর এই বাঁধ চেপে বসে আছে এক বছর ধরে। বাঁধ বা সড়ক নির্মাণ করে নদী-হত্যার কারণে ইতিমধ্যে তিতাস অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে। সেচের অভাবে অনেক কৃষকের মধ্যে হাহাকার। বাঁধের প্রভাবে দক্ষিণে নদীর ভাটিতে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের বিপর্যয় ঘটেছে। বাঁধের দক্ষিণে বিস্তীর্ণ এলাকার কয়েকশ’ জেলেপরিবার যেখানে এক বছর আগে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো, সেখানে নদীর ওপর সড়ক নির্মাণ করে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এসব জেলেপরিবারের শত শত মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। মাছ ধরার পেশা ছেড়ে অনেকে দিনমজুরি করছে।
বাঁধের দক্ষিণে ১০-১২ কিলোমিটার পর্যন্ত শত শত একর কৃষিজমি পতিত হয়ে পড়েছে। নদী-তীরবর্তী এসব জমিতে আগে শুকনো মৌসুমে বোরো-ইরি ধানের চাষ হতো। একবছর আগে ভারতীয় কোম্পানী কর্তৃক তিতাসের বুকে সড়ক নির্মাণের আগে এসব জমিতে বোর-ইরির চাড়া রোপণের পর থেকে অমাবস্যা-পূর্ণিমায় জোয়ারের সময় দিন-রাত সেচের কাজ চলতো। কিন্তু সড়ক নির্মাণ করে নদীর পানি বন্ধ করে দেওয়ার পর জোয়ার-ভাটার কোনো প্রভাব নেই। ফলে সেচের পানির জন্য গত মৌসুমের মতো চলতি মৌসুমেও কৃষকেরা হাহাকার করছেন।
এদিকে ত্রিপুরার বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারি যন্ত্রপাতি পরিবহনের জন্য তিতাসের ওপর সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার অংশে ১৭টি প্রবাহমান খালের ওপর দিয়ে বিকল্প সড়ক নির্মাণ করেছে ভারতীয় কোম্পানী। এর ফলে এসব খালের পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে।
প্রতিবেশী দেশের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য নিজ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী ও ১৭টি খালের ওপর বাঁধ তথা সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে এক বছরের জন্য নদী ও খালগুলোর পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে অত্র এলাকার কৃষক, জেলে ও সকল স্তরের জনগণের কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের যে বিপুল ক্ষতিসাধিত হয়েছে, টাকার অংকে তার পরিমাণ বেসরকারি হিসাব মতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। নিজ দেশের ভূখন্ডের নদী-খালের ওপর অন্য একটি দেশ কর্তৃক ফ্রি-স্টাইলে বাঁধ-সড়ক নির্মাণের এই আগ্রাসনমূলক ঘটনাটি আজ যে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো, তাতে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দেশবাসীর দুঃশ্চিন্তা ও উদ্বেগ আরেক দফা বাড়লো। কেননা এরপর হয়তো দেখা যাবে মনিপুরের বিদ্রোহ দমনের জন্য ভারত আমাদের ভূখন্ড ও নদী-খালের ওপর দিয়ে ফ্রি-স্টাইলে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও ট্যাংক চালানো শুরু করবে।
আর এরকমভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে নিজ দেশের ভূখন্ডে ভারতকে ‘বন্ধুত্ব’ উপহার দেওয়ার প্রতিদান স্বরূপ দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন ত্রিপুরা সফরে গিয়ে ডি-লিট উপাধির গৌরব নিয়ে ঢাকায় ফেরেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, যে ভূখন্ডে তিনি ফিরলেন সেটি কি ‘রাজ্য’?
আর সরকার ও সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের কষ্টের অভিমান ব্যক্ত করেই বা লাভ কী? জাতি হিসাবে আমরা সরকারের বাইরের নাগরিকরাও কি কম ‘দেশপ্রেমিক’? খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, এক বছর ধরে তিতাস নদীর বুক চিরে ভারতীয় কোম্পানীর সড়ক নির্মাণের ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যে দেশের কয়েকটি পত্রিকা যেসব রিপোর্ট ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে আমাদের ভূখন্ডে এসে নদী-খালের ওপর ভারতের বাঁধ-সড়ক নির্মাণের সমস্যা যে আমাদের সার্বভৌমত্বের সমস্যা, এই কথাটি একবারও উচ্চারিত হয়নি। বরং দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার জন্য, ভারত এখন তিতাসের ওপর নির্মিত সড়কটি অপসারণ করছে Ñ এই খবরটিই তারা গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে। তাদের এই ধরনের খবর প্রচারের ধরন দেখে মনে হয়, দেশবাসীকে চিন্তামুক্ত থাকার জন্য তারা বোঝাতে চেয়েছেন যে, ভারত তার জরুরি প্রয়োজনে বাংলাদেশের নদী-খালের ওপর বাঁধ ও সড়ক তৈরি করলেও, এমনকি এর জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত প্রদান না করলেও তাদের কাজ শেষ হওয়ার পর এখন সড়ক অপসারণ করে দিয়ে ‘বন্ধুত্বসুলভ’ কাজ করছে। ‘বন্ধুত্বের’ এ এক বিরল নজিরই বটে! এমন ‘বন্ধুত্বের’ বিরুদ্ধে কি সার্বভৌমত্ব লংঘনের অভিযোগ আনা যায় কখনো? কী চমৎকার ‘দেশপ্রেম’ আমাদের!
তাহলে তো ভারতের প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে ভারত সরকার আবারো আমাদের সরকারের সাথে (সমঝোতা চুক্তি?) করে বাংলাদেশের ভূখন্ডে ঢুকে দুইটা নদীর প্রবাহ বন্ধ করে এক-দেড়বছরের জন্য দুইটা সড়ক নির্মাণ করবে এবং কাজ উদ্ধারের পর বাঁধ ও সড়ক অপসারণ করে আমাদের সাথে ‘বন্ধুত্ব’ অটুট রাখবে। আর তখনো হয়তো আমরা ভারতের ‘বন্ধুত্বে’ মুগ্ধ হয়ে সার্বভৌমত্ব লংঘনের কথা বেমালুম ভুলে যাবো। হায় আমাদের দেশপ্রেম! হায় আমাদের জাতীয় চেতনা! হায় আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বোধ!
রইস্উদ্দিন আরিফ : রাজনীতিক, লেখক, কলামিস্ট

তারিখ : ১৮-০১-২০১২

বুধবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১১

খবরের কাগজের গল্প বনাম রাস্তার গল্প


১. হরতালের নানান হিসাব-নিকাশ : খবরের কাগজের গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। একটি দৈনিকে এক বিদগ্ধ কলামিস্ট হরতালের একচেটিয়া বিরুদ্ধাচরণ করে লিখেছেন, ‘এক মাসে ছয় দিন হরতাল করলে যে ক্ষতি হয়, সেই টাকায় দেশের অন্তত দুই কোটি মানুষকে এক মাস খাইয়ে-পরিয়ে সুখে-শান্তিতে রাখা যায় (হরতাল ও লজ্জাশরমের সমীকরণ : আবদুল কাইউম : দৈনিক প্রথম আলো : ১৩ জুলাই ২০১১)। এটা খবরের কাগজের গল্প। এই গল্প হুজুগে বাঙ্গাল মুলুকের মধ্যবিত্ত নাগরিকেরা খুব খায়।
এর বিপরীতে রাস্তার গল্প কিন' অন্য রকম। রাস্তার গল্প হলো- সরকারের যেসব বেজন্মা কার্যকলাপের বিরুদ্ধে (যেমন দুর্নীতি, পুকুরচুরি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, লুটপাট, লাখো কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ তেল-গ্যাস পানির দরে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া, শেয়ারবাজারের হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে বিদেশে পাচার করা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করে দেশের ভূখণ্ড ও সমুদ্রবন্দরে বিদেশী শক্তিকে ট্রানজিটের নাম করে করিডোর প্রদান করা, রাষ্ট্রের সংবিধানকে ক্ষমতাসীনদের ‘দলীয় গঠনতন্ত্রে’ পরিণত করা ইত্যাদির বিরুদ্ধে) হরতাল হয়, আর সেই হরতালের উৎস সরকারের এসব দেশবিরোধী-গণবিরোধী কার্যকলাপের কারণে যে ক্ষতি হয়, সেই টাকা দিয়ে দেশের ১০ কোটি দরিদ্র মানুষকে এক মাস নয়, সারা বছর খাইয়ে-পরিয়ে সুখে-শান্তিতে রাখা যায়।
খবরের কাগজের গল্প আর রাস্তার গল্পের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। খবরের কাগজের গল্পের মধ্যে হয়তো যৎকিঞ্চিৎ সত্য আছে। কিন' রাস্তার গল্পের মধ্যে আছে তার চেয়ে অনেক বড় সত্য। বাস্তব কথা হলো, হরতালের কারণে দেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়, তার চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি ক্ষতি হয়, সরকারের যেসব কার্যকলাপের বিরুদ্ধে হরতাল হয়, সে সব কার্যকলাপের কারণে। তার পরও দেশের উঁচুদরের কলামিস্টরা, স্বনামধন্য সুশীলেরা এবং বেনিয়া পট্টির রাঘববোয়ালেরা সরকারের দেশবিরোধী গণবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কথা না বলে অথবা নেহাত দায়সারা গোছের কথা বলে একজোট হয়ে হরতালের বিরুদ্ধাচরণকেই দারুণ কর্তব্যজ্ঞান বলে মনে করেন। এর কারণ স্পষ্ট। হরতাল থেকে হয়তো তাদের পাওয়ার কিছু নেই, বরং হারাবার আছে অনেক। এ দিকে রাস্তার গল্পে আরো বলা হয়, হরতাল তো ঠিকমতো পালন হয় না। ঠিকমতো হরতাল পালন হলে অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা, বাণিজ্য-বেসাতির লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ থাকত। তাতে সাধারণ মানুষের কিছুটা ভোগান্তি হলেও শাসক লুটেরা গোষ্ঠীর চুরি, পুকুরচুরি, লুটপাট, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের গলাকাটা ব্যবসায় এসবের কবল থেকে দেশ ও জনগণ অন্তত এক-দুই দিনের জন্য নিরাপদ থাকত। এটাও রাস্তার গল্প এবং এ গল্প খবরের কাগজে ঠাঁই পায় না। এ গল্প হরতালকে উৎসাহিত করার ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। রাস্তার গল্প এটা মানতে রাজি নয়।
২. দেশ কিভাবে চলছে তার হিসাব-নিকাশ : খবরের কাগজের গল্প অনুযায়ী সরকারদলীয় লোকদের (দলের নেতা-পাতিনেতা ও অস্য-তস্যদের) দৃষ্টিতে দেশ খুব ভালোভাবে চলছে। অর্থনীতিতে ‘প্রবৃদ্ধি’ নামের কুমিরছানা বাড়ছে, আমদানি-রফতানি বাড়ছে (আসলে রফতানির চেয়ে আমদানি বাড়ছে), নগরীর বিলাসবহুল অট্টালিকা-শপিংমলের সংখ্যা বাড়ছে, নতুন নতুন টিভি চ্যানেল হচ্ছে, ফেনসিডিল-হেরোইন-ইয়াবার ব্যবসায়ের উন্নতি হচ্ছে, ডিজুস জেনারেশনের ফুর্তি-ফার্তা বাড়ছে, বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য বাড়ছে, সরকারি দলের লোকদের শরীরের মেদ ও জেল্লা বাড়ছে। শিশুদের খেলার মাঠ দখল করে সরকারদলীয় লোকদের দালানকোঠা উঠছে। দিনবদল আর ডিজিটাল বাংলাদেশ খুব সুন্দরভাবে চলছে। এগুলোও খবরের কাগজের গল্প।
এর বিপরীতে রাস্তার গল্প শুনুন। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি। গল্পটি অনেকের কাছে পাগলের প্রলাপ মনে হতে পারে, কিন' আমার খুব মনে ধরেছে। আপনাদেরও খুব মনে ধরবে। এই সেদিন নগরীর ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক উদ্‌ভ্রান্ত পথচারীর পাল্লায় পড়েছিলাম। চেনা নেই জানা নেই, সেই পক্বকেশধারী পথচারী আচম্বিতে এক প্রশ্ন উত্থাপন করে বললেন, ‘ভাই সাহেব, জানেন তো, কবি শামসুর রাহমানের দেশ উটের পিঠে চলত। উটকে বলা হয় মরুভূমির জাহাজ। তাও তো ভালো, দেশ তখন চড়াই-উতরাই করে হলেও জাহাজের পিঠে করে চলত। এবার বলুন তো দেশ এখন কিভাবে চলছে? কী জবাব দেবো ভাবতে ভাবতে ভদ্রলোক নিজেই উত্তর দিলেন- ‘দেশ এখন চলছে দুর্ঘটনাকবলিত মিরসরাইয়ের বাসের মতো।’ আমি বললাম কী রকম? জবাবে তিনি বললেন, ‘বুঝলেন না, দেশ চলছে হেলপার দিয়ে, কোনো ড্রাইভার নেই।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর জেনারেল জিয়া আর যা-ই হোক হেলপার ছিলেন না, তারা ছিলেন ড্রাইভার, রাষ্ট্রের পরিচালক। এখন দেখেন, যেসব লোকেরা দেশ চালাচ্ছেন তারা কেউই ড্রাইভার নন, সবাই হেলপার। তার ওপর আবার মুঠোফোন নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন তারা। এ জন্যই দেশের আজ এই দশা।’
উদ্‌ভ্রান্ত লোকটি একদমে কথাগুলো বলে মিলিটারি প্যারেডের কায়দায় অ্যাবাউট টার্ন করে পাশের রেললাইন ধরে অন্ধকারে হেঁটে চলে গেলেন। লোকটা শিক্ষিত পাগল হবে হয়তো বা। ‘পাগলেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কত কিছুই কহে বলেই তো রাস্তার গল্প তৈরি হয়ে যায়।’ খবরের কাগজে এসব গল্প জায়গা পায় না।
৩. বিরোধী দলের আন্দোলনের হিসাব-নিকাশ : এবার বিরোধী দলের আন্দোলনের ‘গল্পে’ আসা যাক। বিরোধী দল যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে তখন জনগণ তাদের কাছে দলীয় স্বার্থের রাজনীতির পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রত্যাশা করে। কিন' সে রাজনীতি যদি নিছক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি, এমনকি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস করে অথবা নির্লিপ্ত থেকে শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি হয়, তাহলে জনগণ হতাশ হয়। এখন বিরোধী দলের আজকের রাজনীতি নিয়ে খবরের কাগজের এবং রাস্তার কিছু গল্প শোনা যাক।
দেশের প্রধান বিরোধী দল আজ সরকারের সংবিধান নিয়ে স্বেচ্ছাচার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস'া বাতিল ও সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস'া বাতিলের বিরুদ্ধে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা সংযোজনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। সরকার বিরোধী দলের এ আন্দোলন ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমনের চেষ্টা করছে। এভাবে ক্ষমতান্ধ সরকার যদি বিরোধী দল ও জনগণের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে, তাহলে রাজপথ ক্রমেই আরো বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে ১/১১-এর মতো বা তার চেয়েও ভয়াবহ কোনো অঘটন না ঘটলে আন্দোলন একপর্যায়ে চরমে পৌঁছে ’৯০-এর মতো অথবা তার চেয়েও বড় অভ্যুত্থানে রূপ নিতে পারে। তাতে বর্তমান সরকারের পতনের মাধ্যমে রাজনীতিতে নতুন পটপরিবর্তন ঘটতে পারে। এ রকম একটি প্রত্যাশা ইতোমধ্যে জনমনে তৈরিও হচ্ছে। বলা যায়, বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়ে এগুলোই হচ্ছে এ সময়কার খবরের কাগজের গল্প।
কিন' এর বিপরীতে রাস্তার গল্প হলো, বিরোধী দল সরকারের ‘চাণক্য’ চালে পড়ে গতানুগতিক খুচরা (সাবসিডিয়ারি) ইস্যুর আন্দোলনের ফাঁদে আটকা পড়েছে। দেশের রাজনীতি ও সার্বিক পরিসি'তি আজ স্মরণাতীতকালের ভয়াবহ সঙ্কটে নিপতিত। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আজ বিপন্ন। ডাকনামে যে বাংলাদেশকে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র বলে জানি, তার অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। ভারতীয় শাসক-শোষকগোষ্ঠী ও তাদের এ দেশীয় দালাল রাজনীতিক-সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের চাণক্য রাজনীতির অধীনে ‘ট্রানজিট’ নামের এক প্রতারণামূলক বয়ান কূটকৌশলে জনগণকে গিলিয়ে বর্তমান সরকার ভারতকে তার এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে (যুদ্ধ-সঙ্ঘাত-সংক্ষুব্ধ অঞ্চলে) অবাধ যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশের স'ল ও জল ভূখণ্ডে এবং সমুদ্রবন্দরে করিডর দেয়ার সব আয়োজন চূড়ান্ত করে ফেলেছে। যে রাষ্ট্রটি অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, সেই স্বাধীন বাংলাদেশ অচিরেই পরিণত হতে চলেছে ভারতের করিডোর রাষ্ট্রে। ভারতকে করিডোর দিলে ‘দেশ আর্থিকভাবে বিরাট লাভবান হবে, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হবে’- এরূপ মিথ্যা প্রতারণামূলক প্রচারণা বহু আগে থেকেই চালানো হচ্ছে। কিন' প্রকৃত অবস'া হচ্ছে, ভারতকে করিডোর দিলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। দেশের নিজস্ব উৎপাদন ও সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। নেপাল-ভুটানের সাথে ট্রানজিট আর ভারতকে দেয়া করিডোর এই দুটোকে এক বস' বানিয়ে ‘বাঙ্গাল’কে হাইকোর্ট দেখানো হচ্ছে।
অন্য দিকে এ সরকার দেশের সমুদ্রাঞ্চলের তেল-গ্যাসের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লক দাসত্বমূলক চুক্তির মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানি কনোকো-ফিলিপসের হাতে তুলে দিয়েছে। অন্য আরেকটি ব্লক (৫ নম্বর ব্লক), যেটি সরকার এর আগে টেন্ডারের মাধ্যমে টাল্লু কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার প্রস'তি সম্পন্ন করেছিল, সেটি বিনাবাধায় বিনাপ্রতিবাদে ভারত তার দখলে নিয়ে নিয়েছে। সমগ্র দেশ ও জাতির এরূপ ভয়াবহ অবস'াকে আড়াল করার উদ্দেশে সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম, আল্লাহর ওপর আস'া, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি বিতর্ক এবং সেই সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস'া বাতিল, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলা, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা- এগুলো সবই হচ্ছে দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পরিকল্পিতভাবে তৈরী ‘বাইপ্রোডাক্ট’ ইস্যু।
অথচ দেশের প্রধান বিরোধী দলের আন্দোলনে আজকের গুরুতর জাতীয় ইস্যুর কোনো নামগন্ধ নেই। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ যেখানে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির দখলে চলে যাচ্ছে, করিডোরের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যেখানে প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ছে- আর এভাবে দেশের অস্তিত্বই আজ যখন বিপন্ন, তখন জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে নিবদ্ধ রাখার জন্য বিরোধী দলকে ঠেলে দেয়া হয়েছে ‘বাইপ্রোডাক্ট’ ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে। বিরোধী দলকে বোকা কুমির বানিয়ে ঠেলে দেয়া হয়েছে শেয়ালের ঠ্যাং ছেড়ে লাঠি কামড়ে ধরার রাজনীতিতে। দেশের সম্পদ যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যদি না থাকে, নিজের রাষ্ট্র যদি অন্যের করিডোরে পরিণত হয়, তাহলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম, আল্লাহর ওপর আস'া কিংবা সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা এসব দিয়ে কী হবে? তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন দিয়েই বা কী হবে? পরাধীন দেশে দাসত্বের শৃঙ্খল পরে ক্ষমতায় গিয়ে কী হবে শুনি? এগুলো খবরের কাগজের গল্প নয়, এগুলো সব রাস্তার গল্প।
উপসংহার : রাস্তার সর্বশেষ গল্প হলো, দেশের মানুষ আর দাসত্বের বিনিময়ে ক্ষমতার রাজনীতি দেখতে চায় না। জনগণ চায় একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জনগণ দলীয় সংবিধান ও দলীয় শাসনের পরিবর্তে চায় জনগণের সংবিধান ও জনগণের শাসন। জনগণের এই আকাঙক্ষা পূরণ খবরের কাগজের গতানুগতিক গল্প দিয়ে সম্ভব নয়। তার জন্য দরকার রাস্তার গল্পের। আর রাস্তার গল্প মানেই তরুণ প্রজন্ম ও আবালবৃদ্ধবনিতার মহাজাগরণ। রাস্তার গল্প মানে জনতার মহা উত্থান। রাস্তার গল্প মানেই আসল লড়াই। বিরোধী দলগুলোর সেই হুঁশ হবে কি?
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট
e-mail:raisuddin_arif@yohoo.com

বুধবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১১

পানি আগ্রাসনরে বরিুদ্ধে সংগ্রামরে কথা


অনেকেই হয়তো জানেন না বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী ও আন্তর্জাতিক নদী পদ্মার (গঙ্গার) ওপর ভারত সরকারের তৈরী ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল বিগত নব্বই দশকের শেষের দিকে। খুবই দুঃখ ও লজ্জার সাথে বলতে হয়, বাংলাদেশের মরণফাঁদ নামে দেশ-বিদেশে বহুল পরিচিত আগ্রাসী ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে গত আটত্রিশ বছরে সম্ভবত ‘বন্ধু’ ভারত সরকার বেজায় নাখোশ হবে মনে করে আমরা কোনো বিশেষ বিশেষ ‘চেতনার’ সরকার অথবা বীর মুক্তিযোদ্ধারা কেউ-ই এ মামলাটি করতে পারিনি। পাঠকদের সঠিক তথ্য দেয়ার উদ্দেশ্যে বলছি, ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার ২৮ বছর পর এ মামলাটি দায়ের করেছিলেন একাত্তর-পূর্ব অখণ্ড পাকিস্তানের সাবেক কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী ও বড় মাপের মুসলিম লীগ নেতা গোপালগঞ্জের মরহুম ওয়াহেদুজ্জামানের পুত্র ঢাকায় বসবাসকারী নাজিম হাবিবুজ্জামান। উল্লেখ্য, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা প্রদানকারী শক্তি ভারত সরকার একাত্তর-পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে যত বড় অন্যায়, বেআইনি ও আগ্রাসী আচরণই করুক না কেন, তার বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস'ান নেয়া বা কোনো আদালতে মামলা দায়ের করা অন্তত ভারতের প্রতি শর্তহীন চিরকৃতজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা সম্ভব ছিল না (হয়তো এখনো নয়) হয়তো সেটাই ছিল স্বাভাবিক।

খুবই স্বাভাবিক কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে এ মামলাটি টেকেনি। ২০০০ সালেই এটি খারিজ হয়ে যায়। মামলা খারিজ হওয়ার কারণ সম্পর্কে সে সময় নথিপত্র ঘেঁটে যা পাওয়া গিয়েছিল তাতে জানা যায়, এজাহারে লিপিবদ্ধ কোনো অভিযোগ বা দাবি মিথ্যা কিংবা কোনো সাক্ষী-সাবুদ পাওয়া যায়নি; এ রকম কোনো কারণে মামলা খারিজ হয়নি। মামলাটি খারিজ হয়েছে ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশ ও জাতির ক্ষতি হলেও মামলা রুজুকারী ব্যক্তি নিজে ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হননি- এই কারণ দেখিয়ে। ব্যাপারটি খুবই ইন্টারেস্টিং, তাই না?

আজ থেকে এক যুগ আগে দায়ের করা এ মামলার বিবরণ অনুযায়ী সে সময়ের হিসাবে ফারাক্কা বাঁধ না থাকলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে আটাশ বছর গঙ্গা নদী থেকে স্বাভাবিক যে পরিমাণ পানি পেত, কিন' বাঁধের কারণে তার বেশির ভাগ পায়নি, সেই প্রাপ্য পানির মূল্য বাবদ ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছিল চার লাখ কোটি টাকা। এ ছাড়াও ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলের প্রায় চার কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি-মৎস্য-গবাদিপশু ও প্রকৃতি ধ্বংসের ফলে যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয় তারও যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি করা হয়েছিল ওই মামলায়।

সে হিসেবে আজ ২০১১ সালে শুধু ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়ায় আটত্রিশ বছরে বাঁধের কারণে না পাওয়া পানির মূল্য বাবদ এবং বাংলাদেশের উৎপাদন ও অর্থনীতিতে যে পরিমাণ ক্ষতি সাধিত হয়েছে, বেসরকারি পরিসংখ্যান মতে তার পরিমাণ টাকার অঙ্কে ১৮ লাখ কোটি টাকার ওপরে। এই হিসাব ফারাক্কার প্রতিক্রিয়ায় গত আটত্রিশ বছরে দেশের মানুষ-জীব-অণুজীব ও পরিবেশ-প্রতিবেশের যে ধ্বংস সাধন হয়েছে, তার বাইরের হিসাব। এ কারণে দেশের অনেকেই দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে প্রায়ই বলে থাকেন, ভারত সরকারের শুধু ফারাক্কা আগ্রাসনের কারণে এ দেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, টাকার অঙ্কে সেই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দিল্লির মতো কোনো বড় নগরী অনায়াসে কিনে ফেলা যেত। ১৮ লাখ কোটি টাকার অঙ্কটি যদি ঠিক আন্দাজ করা যায় তাহলে দিল্লি কেনাবেচার কথাটি দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে বলা হলেও এটি কোনো আজগুবি কথা নয়।


তবুও গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ ছাড়াও ভারত সরকার আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে দুই দেশের আরো ৫৩টি অভিন্ন নদনদীর উজানে বিভিন্ন প্রকার বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদনদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের আরো যে বিশাল ক্ষতি সাধন করেছে তার হিসাব এখনো নিরূপণ করা হয়নি। এসব ঘটনা থেকেই গত চল্লিশ বছরে বাংলাদেশের ওপর ভারত সরকারের লুণ্ঠন-আগ্রাসনের মাত্রা কতটা ভয়াবহ তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।

২.ভারত সরকার উজানে অভিন্ন নদনদীগুলোর পানি অপসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করার যে নিষ্ঠুর খেলা আটত্রিশ বছর ধরে চালিয়ে এসেছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের চোখে ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণে ভয়ঙ্কর আগ্রাসী কর্মকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ। ভারত সরকারের এই আগ্রাসনের ভয়াবহতা আমরা যদি ঠিকমতো উপলব্ধি করতে সক্ষম হই তাহলে বুঝব, ফারাক্কা কেবল লোহালক্কর ও কংক্রিটের তৈরী বাঁধ নয়। এটি অন্তত পঁচিশটি পারমাণবিক বোমার সমতুল্য এমন এক ভয়ঙ্কর নীরব মারণাস্ত্র- যার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে, দেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলের কৃষি-মৎস্য-গবাদিপশু-বনাঞ্চলের ভয়াবহ ধ্বংস সাধন হয়েছে, জীব-অণুজীব-প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য বিনাশ হয়েছে। কেউ যদি পদ্মার দুই তীর ধরে দুই শ’ কিলোমিটার ভ্রমণ করেন, তিনিই ফারাক্কার ভয়াবহতার বাস্তব প্রমাণ পাবেন।
৩.বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী যে ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ভারত সরকারের বেআইনি নদী শাসন ও পানি লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে দুর্বার সংগ্রাম-লড়াই আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ যেসব উপায়ে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল আক্রান্ত হচ্ছে তার মধ্যে প্রধান দিকগুলো হলো- ১. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত কারণে স'ল-ভূখণ্ড পানিতে তলিয়ে যাওয়া, ২. পানি ও মাটিতে ব্যাপক লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া এবং ৩. নদনদীর প্রবাহের চরমভাবাপন্নতা (নদনদীতে শুষ্ক মওসুমে পানিপ্রবাহের অস্বাভাবিক হ্রাস ও বর্ষা মওসুমে পানিপ্রবাহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি)। নদীপ্রবাহরে এই চরমভাবাপন্নতা দূর করতে জরুরভিাবে প্রয়োজন নদ নদীগুলোর স্বাভাবিক পূর্ণ প্রবাহ নিশ্চিত করা।

কিন' দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ভারত সরকারের নদী ও পানি আগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশের অস্তিত্ব যেখানে পুরোপুরি বিপন্ন হতে চলেছে, সেখানে দেশের, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষেরা হাতুড়ি-কুড়াল নিয়ে তো দূরের কথা, খালি হাতে সংগ্রাম করাও এখন বন্ধ করে দিয়েছেন। ফারাক্কা, গজলডোবা ও টিপাইমুখ এখন আর আমাদের মনে আতঙ্ক জাগায় না। এগুলো এখন আমাদের গা-সহা হয়ে গেছে। বর্তমান সরকার কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেয়া জনদুর্ভোগের অসংখ্য ইস্যুর নিচে চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে জনগণের জাতীয় চেতনা ও আত্মমর্যাদাবোধ ভোঁতা হয়ে গেছে। দেশের ইসলামপন'ী শক্তিগুলো অন্তত কিছুকাল আগেও মাঝে মধ্যে ফারাক্কাবিরোধী মিটিং-মিছিল করত। কিন' ইদানীং সরকারের চাপিয়ে দেয়া স্পর্শকাতর নানা অপ্রয়োজনীয় ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে আটকে পড়ার কারণে ফারাক্কাসহ ভারতীয় আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে তারা নিষ্ক্রিয়। আরেক দিকে এটা খুবই অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, দেশের একশ্রেণীর বামদলকে কয়েক বছর আগেও একবার দেখা গেছে, তারা ফারাক্কা দিবসে ভারতের নদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ না করে টানবাজারের পতিতা পুনর্বাসনের আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন।

অন্য দিকে দেশে দেশপ্রেম ও প্রগতির ধ্বজাধারী একশ্রেণীর সুশীল বুদ্ধিজীবী আছেন, তারা ভারত সরকারের নদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন তো দূরের কথা, এমনকি কূটনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়ে এখন পরোক্ষভাবে ভারতের তাঁবেদারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সমপ্রতি তারা ‘নদীর বিনিময়ে ট্রানজিট’ ও ‘শুল্কের বিনিময়ে কানেকটিভিটি’ প্রভৃতি স্লোগান তুলে ভারতের অন্যায় জবরদখল থেকে নদী-পানি উদ্ধারের বিনিময়ে ট্রানজিট ও কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতকে দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী করিডোর প্রদানের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সার্বভৌমত্ববিরোধী করিডোর ব্যবস'াকে ট্রানজিট বলে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার কাজও অনেক দিন ধরে চালিয়ে এসেছেন এই শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা। এমনকি নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশের ট্রানজিট আর ভারতকে তার এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে (যুদ্ধ-সঙ্ঘাতময় অঞ্চলে) অবাধ চলাচলের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দেয়া করিডোর- এ দুটোকে এক বস' বলে প্রচার করে বাঙ্গালকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন এই বুদ্ধিজীবীরাই। হায়, দুর্ভাগা দেশ!

৪. প্রবাদ আছে- ‘বাঙালি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না’। ফারাক্কার ভয়াবহ পরণিতরি কথাও হাজার বছররে শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিব যেকোনো কারণেই হোক বুঝতে পারেননি। যদি বুঝতে পারতেন, তাহলে যে শেখ মুজিব ইন্দিরা
গান্ধীকে ধমক দিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করিয়েছিলেন, সেই মুজিব আটত্রিশ বছর আগে কোনোভাবেই ভারত সরকারকে ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবেওচালু করার অনুমোদন দিতেন না, বরং তখন পৃথিবীব্যাপী বিশাল ভাবমূর্তি ও প্রভাবের অধিকারী শেখ মুজিব যদি ফারাক্কার ভয়াবহ পরিণতির কথা
বুঝে ওই সময় ফারাক্কা প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ঠুকে দিতেন, তাহলে সে মামলা হতো দুনিয়ায় সাড়া জাগানো এক দীর্ঘস'ায়ী মামলা। আর তার ফলে ভারতসরকার ফারাক্কা বাঁধ আজো চালু করতে পারত না। ফারাক্কা নিয়ে আজ মাথাব্যথা বাংলাদেশের হতো না, হতো ভারত সরকারের। সে রকমটি হলে পরবর্তীকালে ভারত সরকার গজলডোবা ও টিপাইমুখসহ অভিন্ন ৫৩ নদীতেও বাঁধ দিতে পারত না।

ফারাক্কার ভয়াবহ পরিণতির কথা বুঝেছিলেন মওলানা ভাসানী। তাই তিনি প্রথম থেকেই ফারাক্কার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং অশীতিপর বয়সে অসুস' অবসয় ন্যুব্জ দেহে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফারাক্কার বিরুদ্ধে লংমার্চ করেছিলেন। মওলানা বুঝেছিলেন, সংগ্রাম ছাড়া শুধু ফারাক্কা কেন, সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী কোনো আগ্রাসন থেকেই দেশের মুক্তি হবে না। সুতরাং এটা আজ খুবই পরিষ্কার দিল্লি সরকারের ফারাক্কা, গজলডোবা ও টিপাইমুখ বাঁধসহ দেশী-বিদেশী সব প্রকারের লুণ্ঠন-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আঞ্চলিকভাবে ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত গণ-আন্দোলন ও গণপ্রতিরোধ ব্যতিরেকে স্বাধীন বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য আক্রান্ত অঞ্চলের অস্তিত্ব রক্ষা করা যাবে না।

বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০১১

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর অসতর্ক মুহূর্তের বক্তব্য জাতিবিভক্তকারীদের সহায়তা করবে


‘বঙ্গবীর’ ও ‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী যখন থেকে পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখা শুরু করেন তখন থেকেই তাঁর লেখা আমি আগ্রহ সহকারে পড়ার চেষ্টা করি। তাঁর লেখার প্রতি এই আগ্রহ প্রধানত দুই কারণে। প্রথমত: দেশের বামবিপ্লবী মুক্তিযোদ্ধাদের বাদে কাদের সিদ্দিকীই হলেন দু’দুটো বড় খেতাব পাওয়া একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক, যিনি একাত্তরে ভারতে না গিয়ে তাঁর বাহিনী (কাদেরীয়া বাহিনী) নিয়ে দেশের মাটিতে থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম সাহস ও বীরত্বের সাথে লড়াই করে বিরল দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।