মিজানুর রহমান খান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মিজানুর রহমান খান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৬

৯৯.৭৭ ভাগ ও ৬৮ ভাগ খালাসের গল্প

দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে যে কেউ দুদকে দরখাস্ত করতে পারেন। ভুক্তভোগী জনগণের একটা ভরসার জায়গা হলো দুদক। তবে কথা হলো, দুদক এখন পর্যন্ত মোট অভিযোগকারীদের আধা শতাংশের অভিযোগও তদন্তযোগ্য মনে করে না। যাচাই-বাছাই করেই তারা অধিকাংশ নালিশি দরখাস্ত ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। 

দুদক জনগণের কাছ থেকে আসা দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে গত তিন বছরে গড়ে দশমিক ২৩ শতাংশ দরখাস্ত আমলে নিয়েছে। ২০১৬ সালে দশমিক শূন্য ৭২ শতাংশ, ২০১৫ সালে দশমিক ১২ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে দশমিক ১৪ শতাংশ অনুসন্ধানের জন্য বাছাই করেছিল। অভিযোগ খতিয়ে দেখার বাস্তবতা যখন এতটাই শোচনীয়, তখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ পড়ল। কারণ, দুদকের বার্ষিক রিপোর্ট বলছে, তাদের মাত্র ৩২ শতাংশ মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা শাস্তি পেয়েছে। ৬৮ শতাংশ খালাস পেয়েছে। তার মানে দাঁড়ালো, ক্ষুব্ধ জনগণের দ্বারা দুর্নীতির দায়ে ‘অভিযুক্ত’ ব্যক্তিদের ৯৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ যাচাই-বাছাইস্তরে এবং দুদক দ্বারা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ৬৮ শতাংশ আদালতে খালাস পেলেন। 

অনুমান করা কষ্টসাধ্য নয় যে এই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জামিনে বাইরে থাকতে পারেন। আর আপিলের বিভিন্ন স্তরে তাঁদের অন্তত আরও কিছুসংখ্যক খালাস পেতে যথেষ্ট আশাবাদী হতে পারেন। সুতরাং আমাদের দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় অভিযান বড় রকমের প্রশ্নবিদ্ধ হলো। শুরুতেই খালাস পেয়ে যাচ্ছেন ৯৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ (যাচাই পর্যায়ে) সন্দেহভাজন। বাকি যাঁরা রইলেন তাঁদের মধ্যেও বিচারিক আদালতে খালাস পেয়ে যাচ্ছেন ৬৮ শতাংশ। 

২০১৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ৬৮ শতাংশ আসামি খালাস পাওয়ার হতাশাব্যঞ্জক ঘটনা নির্দেশ করছে যে দেশে দুর্নীতিবিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি আরও প্রকট হচ্ছে। এটা অনেকে হয়তো প্রশাসনিক ত্রুটিবিচ্যুতি বা প্রসিকিউশনের দুর্বলতাকে বড় করে দেখবেন, কিন্তু তা মনে করার কারণ আছে বলে মনে হয় না। আমরা দেখলাম, সদ্য সমাপ্ত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে নেতা-কর্মীদের প্রতি তেমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে চোখে পড়ল না। আমরা জানতেই পারলাম না যে তারা কীভাবে আওয়ামী লীগার বাদে অবশিষ্ট জনগণের কাছে জবাবদিহি করল। সংগঠনটি কত টাকার চাঁদায় চলেছে আর কত টাকায় আগামী তিন বছর চলবে, সেসব বিষয়ে কিছুই বলা হলো না, কিছুই জানা গেল না। ইদানীং দুর্নীতি যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যথারীতি চলমান রয়েছে, তার তেমন কোনো স্বীকৃতি নেই। এরই পরোক্ষ প্রভাব চলছে জনপ্রশাসনে। কোথাও কোথাও দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব ও পদক্ষেপ অবশ্যই চোখে পড়ে। কিন্তু সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অকিঞ্চিৎকর। 

প্রথম আলোর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘দুদকের মামলাগুলো মূলত নথিনির্ভর। তাই সঠিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারলে ওই সব অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু আইনগত দুর্বলতা, নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট না থাকা, ফি-নির্ভর আইনজীবীদের প্রতি নির্ভরতা, দুর্বল অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং আপসকামিতার কারণে দুদক দুর্নীতি মামলার চূড়ান্ত বিচারে হেরে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।’ এই মূল্যায়ন নিশ্চয় নাকচ করা যাবে না। এ বিষয়ে দুদকের মুখ্য জ্যেষ্ঠ প্যানেল আইনজীবী খুরশীদ আলম খানের সঙ্গে কথা হলো। ‘কী করে ৬৮ শতাংশ অভিযুক্ত ব্যক্তি খালাস পেলেন, সেটা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার’ তাঁর এই অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই।

এটা লক্ষণীয় যে এই ৬৮ শতাংশ মামলার আসামিরা বিচারিক আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন। কিন্তু দুদক কতটি ক্ষেত্রে আপিল করেছে এবং তার কী ফলাফল, সেই তথ্য অবশ্য ওই প্রতিবেদনে নেই। আপিল করার বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের সমাজে একজন ব্যক্তি দণ্ডিত হলেই তাঁরা তা মানতে চান না। তাঁরা দণ্ডিত হওয়ার পরেই আপিল করেন, আর যুক্তি দেন যে সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ‘আইনের চোখে দোষী নন’। সুতরাং বিচারিক আদালতে ৬৮ শতাংশ খালাস মানেই বলা যাবে না, তাঁরা নির্দোষ এবং দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দুর্বলতার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। অবশ্য দুদক সচিব ত্রুটিপূর্ণ অভিযোগপত্রের মতো বিষয়কেই স্মরণ করেছেন।

তবে এসব মামলা উচ্চ আদালতে গেলে আমরা আশা করতে পারি যে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জানা যাবে। বর্তমানে হাইকোর্টে দুর্নীতির মামলার দ্রুত শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ থাকছে। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে পারি যে বিগত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদকের গতিশীলতা কোথায় হারিয়ে গেল। ওই পর্বটির কথা স্মরণেই আনতাম না, যদি না এই তথ্য আমরা জানতাম যে উচ্চ আদালত বিগত বছরগুলোতে ওই বিতর্কিত আমলে দায়ের করা মামলাগুলোর বিচারকার্য চালু রাখাকেই আইনসম্মত বলে রায় দিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর দুর্নীতি মামলা, যাতে তিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন, সেটি সম্প্রতি আপিল বিভাগে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার মাইলফলক ঘটনাটি বর্তমান দুদকের জন্য অসামান্য গুরুত্ব বয়ে এনেছে। দুদকের আইনজীবীরা রীতিমতো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। অবশ্য ওই বিতর্কিত আমলে বহু ক্ষেত্রে যে বাড়াবাড়ি ও চরিত্রহননের পরিকল্পিত চেষ্টা হয়েছিল এবং তা যে নিন্দনীয়, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

এই নিবন্ধের জন্য যেটা প্রাসঙ্গিক সেটা হলো দুর্নীতিবিরোধী একটি অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশে এই ত্রুটিবিচ্যুতিপূর্ণ দুদকের শিথিল প্রসিকিউশন টিমই কিন্তু বিপুলসংখ্যক মামলা দায়ের করতে পেরেছিল। আর এখন বার্ষিক রিপোর্ট বলছে, অভিযোগ আমলে নেওয়াই হচ্ছে কম। ১ হাজার অভিযোগ জমা পড়লে গড়ে তা থেকে একটি বা দুটি অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হচ্ছে। লোকবলের অভাব? নাকি এতটাই যোগ্য লোকবল আছে, যাঁদের কারণে সুচিন্তিতভাবে বিপুলসংখ্যক অভিযোগ সরাসরি নাকচ করা সম্ভব হচ্ছে। নাকি সমাজে মিথ্যা ও বিদ্বেষপ্রসূত অভিযোগকারীর সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বেড়ে যাচ্ছে? কোনটি সত্যি? চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত জমা পড়া প্রায় ৮ হাজার অভিযোগ থেকে মাত্র ৫৭১টি অনুসন্ধানের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে? ৬৮ শতাংশ মামলা খালাস হওয়ার ঘটনাকে আমরা যদি কোনো না-কোনো মাত্রায় অদক্ষতাজনিত বা ত্রুটিপূর্ণ মনে করি, তাহলে কী করে ভরসা করব যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পাইকারি নাকচের ঘটনাগুলোতে দক্ষতার ছাপ আছে?

এটা পরিষ্কার যে সংক্ষুব্ধ নাগরিকেরা, যাঁরা প্রতিকার চেয়ে দুদকের শরণাপন্ন হন, তাঁদের কোনো প্রতিকার দিতে দুদক শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। এটা রোধ করতে হলে দরখাস্ত নাকচ করার কারণ লিখিত হতে হবে। সেটা চাইলে যোগ্য লোকবল এবং শুনানিনির্ভর কোনো একটা স্বচ্ছ ব্যবস্থা বের করতে হবে। 

ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলে দুর্নীতির কারণে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের চেয়ে যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে (পিটিআই, ৯ মার্চ, ২০১৬)। ভারতেও আমি মনে করি দুর্নীতি দমনে জোরালো রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সংকট চলছে। গত মার্চে লোকসভাকে বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ৩ হাজার ৭৮ ব্যক্তি দণ্ডিত হয়েছেন। এর অর্থ বছরে ১ হাজার ২৬ জন দণ্ডিত হচ্ছেন। আমাদের যেমন দুদক, তেমনি ভারতের আছে কেন্দ্রীয় ভিজিলেন্স কমিশন সিভিসি। সেখানে বেশ স্বাধীনভাবে দুর্নীতির তদন্ত করে থাকে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইন্টিলেজেন্স (সিবিআই)। দুর্নীতি দমন আইনের তদন্তের ক্ষেত্রে সিবিআইর কার্যক্রমের তদারকি করে সিভিসি। সিবিআই তদন্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে, এমন ৬৭৩টি মামলার আসামিরা আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন। পিটিআই এই খবর দিতে গিয়ে স্মরণ করেছে যে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সিবিআইর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন দিতে তাগিদ দিয়ে চলছেন। 

আমরাও দুদকের অধিকতর স্বাধীনতা ও কার্যকর স্বায়ত্তশাসন চাইব। কিন্তু তার আগে চাইব দুর্নীতি দমনে দ্ব্যর্থহীন রাজনৈতিক সংকল্প। এটা শক্তিশালী থাকলে দুদক তার বর্তমান কাঠামো ও ক্ষমতার মধ্যেই অনেক শক্তিশালী হতে পারবে। দুদক গ্রহণযোগ্য মামলা করতে পেরেছিল বলেই বর্তমান সরকারের আমলেই ২০০৯ সালে সাজার হার ছিল সবচেয়ে বেশি, ৬১ শতাংশ। এরপর ২০১০ সালে কমলেও সাজার হার ছিল ৫৬ শতাংশ।

কিন্তু তারপর আর তেমন মামলাই আর হয়নি। সে কারণে ২০১১ সাল থেকে লাগাতার সূচক নিচে নামছে। ২০১১ সালে সাজার হার ২০ শতাংশ, ২০১২ সালে ৩২ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৩৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৪২ শতাংশ ও ২০১৫ সালে দেখা গেল ৩২ শতাংশ। রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সূচকের ওঠানামার সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক আছে। আওয়ামী লীগ তার কাউন্সিল উপলক্ষে ইংরেজিতে ২৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেখানে উন্নয়নগাথা আছে, যার সাফল্য আমাদের উৎসাহিত করে, কিন্তু সেখানে দুর্নীতি দমনে প্রতিষ্ঠায় কোনো অঙ্গীকার নেই। এখন এই ঘাটতিটাই পূরণ করতে হবে।

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০১৫

দলের বৃত্ত থেকে মুজিবকে মুক্তি দিন

জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্ত অধ্যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ৪০তম বার্ষিকী সমাগত। জাতীয় শোক দিবসের এই কর্মসূচিতে বিএনপিরও অংশগ্রহণ থাকা উচিত। এটা তাকে পারতেই হবে। একান্ত যদি সেটা না করা সম্ভব হয়, তাহলে তাদের উচিত হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অমর্যাদাকর কোনো কিছু বলা থেকে বিরত থাকা। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় খালেদা জিয়ার কাছে ব্যক্তিগতভাবেও এই আগস্ট বেদনাবহ। কারণ, আরাফাত রহমানের জন্মদিন ১২ আগস্ট, ১৯৭০। তাই এবারের আগস্টে অকালপ্রয়াত সন্তান কোকোর জন্য বেদনাবিধুর পরিবেশে কোনো কর্মসূচি পালনের তিন দিন পরেই মায়ের পক্ষে তাঁর নিজের জন্মদিনে কেক কাটার কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সহজ হবে না। বিএনপির চেয়ারপারসন চাইলে ১৫ আগস্টে জন্মদিন পালনের ধারাবাহিকতা থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে পারেন। দলের মধ্যে যাঁরা এই জন্মদিনে কেক কাটার ব্যাপারে বিএনপির চেয়ারপারসনকে উৎসাহ জুগিয়ে থাকেন, তাঁরাও কোকোর মৃত্যুকে যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে নিজেদের এবারে বিরত রাখার সুযোগ নিতে পারেন। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বজনীন শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে স্মরণ করার ক্ষেত্রে মিডিয়ার সহায়তা কামনা করেছেন। কেন তাঁর মনে হলো যে বঙ্গবন্ধু সর্বজনীন নন, তার ব্যাখ্যা অবশ্য তিনি দেননি। ২৩ জুলাই বাসস পরিবেশিত খবরে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসনমন্ত্রী জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা আপনাদের ওপর কোনো কর্মসূচি বা অনুষ্ঠান চাপিয়ে দিতে চাই না। কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া প্রকৃত কাজের ভিত্তি হতে পারে না। আমরা আপনাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বঙ্গবন্ধুর ওপরে সৃজনশীল স্বতন্ত্র কর্মসূচি আশা করি।’ ওই অনুষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বঙ্গবন্ধু যেহেতু জাতীয় সম্পদ, তাই তাঁকে কোনো একটি দলের বৃত্তে আটকে রাখলে চলবে না। আর সে জন্য তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবসে একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠনের ব্যাপারেও তাঁরা প্রস্তাব দেন। এ প্রসঙ্গে আমরা সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যের চেতনার সঙ্গে সহমত পোষণ করছি, আর একই সঙ্গে তাঁর ‘চাপিয়ে দেওয়া’ প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করছি। 

১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কোনো ব্যক্তির নাম সংবিধানে লেখার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেননি, যদিও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটির উল্লেখ ছিল। কিন্তু ২০১১ সালে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে জাতির পিতার প্রতিকৃতি শিরোনামে ৪ক অনুচ্ছেদ নামে একটি নতুন বিধান যুক্ত করা হলো। এতে বলা আছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সব সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শন করতে হবে। এর মধ্যে নির্দিষ্টভাবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘জাতির পিতার প্রতিকৃতি’ টাঙানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পঁচাত্তরের পরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যথেষ্ট অসতর্ক, বেপরোয়া ও বিদ্বেষপ্রসূত বিতর্ক হয়েছে, তারেক রহমানের সাম্প্রতিক অসতর্কতা আবারও প্রমাণ করেছে যে সেই ধারা বন্ধ হয়নি। তার মানে ৪ক অনুচ্ছেদ কার্যকর ওষুধ নয়। 

রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের নামের আগে বা পরে কোনো খেতাব চাপাতে পারে না। ছাত্র–জনতা ভালোবেসে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করেছিল। সুতরাং বঙ্গবন্ধু একটি খেতাব। এই খেতাব কিংবা এ ধরনের কোনো খেতাব যাতে কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে না দিতে পারে, সে জন্য ১৯৭২ সালের সংবিধানপ্রণেতারা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এমনকি নির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রের তরফে খেতাবদানকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কেন যে এত দিনেও বাহাত্তরের মূল সংবিধানের ৩টি উপদফা-সংবলিত ৩০ অনুচ্ছেদটির বৃত্তান্ত নিয়ে লেখা হয়নি, তা ভেবে আক্ষেপ হচ্ছে। জেনারেল এরশাদের বিতর্কিত অষ্টম সংশোধনী সুপ্রিম কোর্ট খণ্ডিতকরণ ও রাষ্ট্রধর্ম চাপানো ছাড়াও বাহাত্তরের মূল সংবিধানে থাকা ৩০ অনুচ্ছেদটি চিরকালের জন্য বিলোপ করেছে। বড় অনুশোচনার বিষয়, কখনো এই অনুচ্ছেদটি নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা চোখে পড়ল না। বাহাত্তরের সংবিধানের পুনরুজ্জীবন নিয়ে কত ঝড় বয়ে গেল, কিন্তু এরশাদের বেয়নেটের খোঁচায় ৩০ অনুচ্ছেদের রক্তাক্ত হওয়ার কাহিনি প্রকাশ পেল না। 

বাহাত্তরের সংবিধানে ৩০ অনুচ্ছেদটি ছিল এ রকম: ‘১) রাষ্ট্র কোন উপাধি, সম্মান, বা ভূষণ প্রদান করিবেন না। ২) রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমোদন ব্যতীত কোন নাগরিক কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নিকট হইতে কোন উপাধি, সম্মান, পুরস্কার বা ভূষণ গ্রহণ করিবেন না। ৩) সাহসিকতার জন্য পুরস্কার কিংবা আকাদেমীর বিশিষ্টতা-দান হইতে এই অনুচ্ছেদেও কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’ এর শিরোনাম ছিল: ‘উপাধি, সম্মান ও ভূষণের বিলোপসাধন।’ ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনীতে ওই অনুচ্ছেদটি ফেলে দিয়ে যা লেখা হলো তা কোনো রদবদল ছাড়াই এখনো টিকে আছে। বাহাত্তরের শিরোনাম আমূল পাল্টে নতুন শিরোনাম দেওয়া হয়েছে: ‘বিদেশি, খেতাব, প্রভৃতি গ্রহণ নিষিদ্ধকরণ।’ আর ৩০ অনুচ্ছেদ কেবল বলছে, ‘রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমোদন ব্যতীত কোন নাগরিক কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নিকট হইতে কোন উপাধি, খেতাব, সম্মান, পুরস্কার বা ভূষণ গ্রহণ করিবেন না।’ এই এরশাদীয় অনুচ্ছেদটি স্মরণ করিয়ে আমরা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদের কাছে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে চিঠি যাওয়ার কথা শুনেছি। কিন্তু এরশাদ যে তাঁর খেয়ালখুশিমতো মৌলিক অধিকার ভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদেও এভাবে বিকৃতিসাধন করলেন, সে জন্য কোনো বাহাত্তরের সংবিধান পুনরুজ্জীবনবাদীকে কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করতে দেখিনি। 

সৈয়দ আশরাফের জবানিতে মুজিবকে সর্বজনীন করে তোলা এবং ‘চাপিয়ে দেওয়া’ কথাটি নিয়ে লেখার সূত্রে এই অনুচ্ছেদটির দিকে তাকানোর সুযোগ হলো এবং মনে হয়েছে, এই অনুচ্ছেদটির পূর্ব বৃত্তান্ত যদি আমরা মনে রাখি, তাহলে আওয়ামী লীগ সত্যিই ‘চাপিয়ে দেওয়ার’ অনাবশ্যক ও ভ্রান্ত রাজনীতি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারবে। আর সেটা খুব জরুরি। 

বাহাত্তরের সংবিধানের ওই ৩০ অনুচ্ছেদের পুনরুজ্জীবন দরকার মনে করি। আমরা যদি এর ভারতীয় প্রেক্ষাপট মনে রাখি, তাহলে বিষয়টি বোঝা আরও পরিষ্কার হবে। ২০১২ সালের অক্টোবর। মনমোহন সিং তখন প্রধানমন্ত্রী। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতি প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ গুরুত্বে ছাপা হলো। পিটিআই জানায়, লেক্ষ্ণৗর এক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ঐশ্বরিয়া জানতে চেয়েছিল মহাত্মা গান্ধীকে কবে জাতির জনকের খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিল? কারণ, ভারতের সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্র কর্তৃক কাউকে খেতাব দেওয়া নিষিদ্ধ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই ছাত্রীকে ১০ বছর সময় নিয়ে জানিয়েছে, গান্ধীকে এই খেতাব কখনো দেওয়া হয়নি, কাউকে জাতির পিতার উপাধি দেওয়া সংবিধান সমর্থন করে না। অবাক ঐশ্বরিয়া বলেছে, কী আশ্চর্য, ইতিহাসের বইয়ের পয়লা বাক্যই তো জাতির জনক গান্ধী দিয়ে শুরু হয়েছে। ২০০৪ সালে ড. আম্বেদকারকে ভারতের সংবিধানের জনক খেতাব দিতে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী দাবি তুলেছিলেন। তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানি এক চিঠিতে তাঁকে বলেছিলেন, সংবিধানে বাধা থাকার কারণে এটা সম্ভব নয়। মহাত্মা গান্ধী যদিও জাতির জনক হিসেবে পরিচিত কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্র তাঁকে এই খেতাব দেয়নি। 

১৯৯৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বালাজি রাঘবন বনাম রাষ্ট্র মামলায় প্রধান বিচারপতি এ এম আহামদির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ মত দেন যে ‘পদ্মভূষণের মতো খেতাব সংবিধান নিষিদ্ধ করেনি। সংবিধানপ্রণেতারা এ নিয়ে দীর্ঘ বাদানুবাদ করেছেন। ব্রিটিশরা তাঁবেদার সৃষ্টির জন্য খেতাব প্রদানের যে ধারা চালু করেছিল, সেই ধারা বন্ধ করা ছিল ওই অনুচ্ছেদের আশু লক্ষ্য।’ 

১৭৮৭ সালের মার্কিন সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে, ১৯১৯ সালের জার্মানির ভাইমার সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদে, ১৯৩৫ সালের ফিলিপিনস সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে, ১৯৩৭ সালের আয়ারল্যান্ড সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদে, ১৯৪৪ সালের আইসল্যান্ডের সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে এভাবে রাষ্ট্রের দ্বারা খেতাব প্রদানে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর লক্ষ্য— নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্যবোধ জাগ্রত হতে না দেওয়া। 

গান্ধী নিহত হলে জওহরলাল নেহরু রেডিও ঘোষণায় বলেছিলেন, জাতির পিতা আর বেঁচে নেই। আর আমাদের জাতির জনক নিহত হলে খোন্দকার মোশতাকরা কী বলেছিলেন, তা সবারই জানা। সুতরাং এটা ঠিক যে ভারত যা পারে, আমরা আপাতত তা হয়তো পারি না কিংবা পারাটা দুরূহ। কিন্তু আমাদের মানতে হবে, দ্রুত বাহাত্তরেই ফিরতে হবে, কারণ ওই বিধান সর্বজনীন। ভারতরত্ন, পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় খেতাবের বৈধতা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়টি আওয়ামী লীগ ও তাদের বুদ্ধিজীবীদের পাঠ করতে অনুরোধ জানাই। অন্যথায় তাঁরা বুঝবেন না, কেন আমরা ১৯৭২ সালে ভারতের সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদটিই কার্যত অবিকল ধারণ করেছিলাম। মুজিব বেঁচে থাকবেন, অমরত্ব পাবেন তাঁর কর্মে। কখনো সমালোচিত হতে পারেন তা-ও তাঁর কর্মের কারণে, মিডিয়ার এখানে কোনো করণীয় নেই। নাগরিক জীবনে গান্ধী নন্দিত কখনো নিন্দিত। কিন্তু তিনি কোনো দলের বৃত্তে বন্দী নেই। জীবিত মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু মরহুম মুজিব আওয়ামী লীগের দলীয় বৃত্তে বন্দী আছেন। 

২৫ জুলাই কসবা থেকে ডা. ময়না মিঞা সড়ক দিয়ে ঢাকা ফিরছি। পথে একটি অতিকায় ডিজিটাল কিন্তু স্থুল ব্যানার দেখে ছবি তুললাম। স্থানীয় সাংসদ গ্রামবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একপাশে মুজিবসহ তিনজন, অন্যপাশে একজন মন্ত্রী, তাঁর নিচে সাংসদ, সবশেষে স্থানীয় ১২ নেতা–কর্মীর ছবি। বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ তিনজনের ছবি আকারের দিক দিয়ে সবচেয়ে ছোট। দলের প্রতিপক্ষ শিবিরের একজনকে ব্যক্তিগতভাবে ঘায়েল করে প্রকাশ করা একটি গেয়ো লিফলেটেও দেখি মুজিবের মুখ। সারা দেশে এভাবে সবার সামনে বঙ্গবন্ধুর ভয়াবহ অবমাননা ঘটে চলেছে। সৈয়দ আশরাফের উচিত এই বৃত্ত ভাঙতে উদ্যোগী হওয়া। 

সুশাসন ও গণতন্ত্র দিতে না পারার অপারগতার ঢাল হিসেবে মুজিবকে ব্যবহার করা সমীচীন নয়, এটা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে সর্বজনীন করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷

বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৩

আরও একজন রাবারস্ট্যাম্প রাষ্ট্রপতি?


বিএনপি প্রবর্তিত যে প্রক্রিয়ায় আবদুল হামিদ ‘নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি’র তকমা পরলেন, আওয়ামী লীগ তার যথার্থ নামকরণ করেছিল ‘সাংবিধানিক জোচ্চুরি’। ২২ এপ্রিল একাত্তর টিভির এক আলোচনায় ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে প্রশ্ন করা হয়, বিএনপি এই প্রক্রিয়ায় কেন অংশই নিল না? নির্দিষ্টভাবে ৭০ অনুচ্ছেদের দিকে ইঙ্গিত করে তাঁর বিনয়ী উত্তর: সংখ্যাগরিষ্ঠ যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই তো নির্বাচিত হবেন। তবে তিনি যেটা বলেননি সেটা হলো সংবিধানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘একটি কিনলে দুটি ফ্রি’ পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। সেটা কেমন, তা পরে বলছি।
বাংলাদেশ বিনা ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একাদিক্রমে পাঁচজন রাষ্ট্রপতি পেল। দুনিয়ার অন্যত্র যেভাবে নির্বাচন হয়, সেভাবেই বাংলাদেশে হতে হবে। কিন্তু অন্য কোথাও মুখে কালো কাপড় বাঁধার মতো ৭০ অনুচ্ছেদ ও প্রকাশ্য ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান নেই। বোধগম্য কারণে এ বিষয়ে বিএনপির মুখ বন্ধ। ৩০০ আসনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী একটি মাত্র আসনের প্রতিনিধি। কিন্তু এর জোরে তিনি রাষ্ট্রপতিসহ সব সাংবিধানিক পদধারীদের নিয়োগ ও অপসারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করেন। উপরন্তু তাঁর হাতেই দলের চাবিকাঠি। বাংলাদেশ সংবিধান এভাবে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে চলেছে। আর বাদবাকি সর্বনাশ করেন বিশেষজ্ঞের দল। তাঁরা পত্রিকায় গলা ফাটাতে থাকেন, রাষ্ট্রপতি রাবারস্ট্যাম্প। ইদানীং একদল লোক ঘন ঘন ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। সেখানেও মিথ্যা কিংবা অর্ধসত্য বলার প্রতিযোগিতা আছে। সাধারণভাবে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে চলবেন।
বিগত আমলের কথা। আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদকে কর্মকর্তারা বললেন, স্যার, ৪৮(৩) অনুচ্ছেদমতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ফাইল তো সরাসরি বঙ্গভবনে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাবে না। মওদুদ একমত হলেন। একজন কর্মকর্তা ফাইল নিয়ে বঙ্গভবনে গেলেন। সেখানকার সচিব তো আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, তাঁর পক্ষে এটা সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর সই লাগবে। ওই কর্মকর্তা লেখককে বলেন, ‘আমিই বরং লজ্জিত হলাম এবং আইনমন্ত্রীকে এসে বললাম। তিনি আর তদবির করলেন না। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ফাইল সেই থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যায়।’ প্রধান বিচারপতিরা সেই থেকে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাচ্ছেন। লেখক বর্তমান মন্ত্রিসভার এক সদস্যকে তাঁর দপ্তরে জিজ্ঞেস করলেন, কোন আইনে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান? মান্যবর মন্ত্রী কোনো আড়ষ্টতা ছাড়াই বললেন, ‘আপনি আমার চেয়ারে বসুন, তাহলে বুঝতে পারবেন!’
পূর্বসূরিদের মতোই কি গা বাঁচিয়ে চলবেন দেশের নির্বাহী ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ? স্পিকার হিসেবে তাঁর কিছু প্রকাশ্য উক্তি আনুগত্য পরীক্ষার জন্য নাকি ঝামেলাপূর্ণ ছিল। তিনি উতরিয়েছেন। তাঁর মেয়াদ যথেষ্ট ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ হলে অবাক হব না। দুই নেত্রীর আমলের রাষ্ট্রপতিরা এ পর্যন্ত কেউ স্মৃতিকথা লেখেননি। সুতরাং, ভেতরটা আমরা জানতে পাই না। এটা বাক্স্বাধীনতার একটা মানদণ্ড।
ভারতের জ্ঞানী জৈল সিং তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে তাঁকে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেন, তাতে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। পাঞ্জাবে শিখ বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালে ইন্দিরা যখন তাঁকে রাষ্ট্রপতি হতে আমন্ত্রণ জানান, তখন নিশ্চয় তা তাঁকে আরও চমকে দিয়েছিল।
কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ও পরে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে। জৈল সিং লিখেছেন, ‘তাঁকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হলেও পাঞ্জাবের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় ইন্দিরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতেন।’ স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে অন্ধকারে রাখেন। রাজীব লোকসভায় কংগ্রেস সাংসদ তিওয়ারিকে দিয়ে অভিযোগ তোলান যে, শিখ সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রপতি ভবনে আশ্রয় পেয়েছিল। এমনকি রাজীব প্রকাশ্যে রেওয়াজ ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছিলেন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে।
জৈল সিংয়ের মতো বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকেও অপসারণের গুজব ছড়িয়েছিল। জননিরাপত্তা বিল ফেরত পাঠিয়ে তিনি আলোচিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আরও একটি অনালোচিত কীর্তি আছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারায় সংশোধনী এনে একটি বিল পাস হয়। রাষ্ট্রপতি তা ফেরত পাঠান। আওয়ামী লীগ সরকার আর সেই বিল পাঠায়নি। সেটির নীরব মৃত্যু ঘটেছিল। সেই বিল ২০০৩ সালে বিএনপি পাস করেছিল।
ভারতীয় রাষ্ট্রপতিদের দ্বারা এমন অনুশীলন বিরল নয়। জৈল সিং পোস্টাল আইন সংশোধনী বিলে সই দিতে অসম্মতি জানান। কারণ, তিনি মনে করেছিলেন চিঠিপত্রে ইচ্ছামতো সরকারি হস্তক্ষেপ ঘটাতেই ওই বিল পাস হয়েছে। সঞ্জীব রেড্ডির ‘মাই প্রেসিডেন্সিয়াল ইয়ার্সে’ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জনস্বার্থে অগ্রাহ্যের বিবরণ আছে।
আমরা চাই, আবদুল হামিদ ভারতের আরেক রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করুন। ভারতের সংবিধানের মতো বাংলাদেশের সংবিধানেরও কিছু ক্ষমতাকে প্রধানত রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। নারায়ণন ঠিক করেছিলেন যে দণ্ডিতদের মার্জনা করার মতো ডিসক্রিশন প্রয়োগের ব্যাখ্যা জানার অধিকার জনগণের আছে। তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে ইশতেহার প্রথা চালু করেন। আমাদের সুপরিচিত বিশেষজ্ঞদের বলতে শুনি না, কিন্তু বহু বছর আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন বলেছিলেন, ‘তুমি সংবিধানে দুই ধরনের অনুচ্ছেদ দেখবে। কতগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের কথা আছে। লিখিত পরামর্শের কথাও আছে। আর কোথাও নির্দিষ্ট কিছু বলা নেই।’ এখন তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের যন্ত্রণায় রাষ্ট্রপতিদের প্রাণ আরও ওষ্ঠাগত। তাঁরা সারাক্ষণ কানের কাছে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ নিয়ে ওই এক ঘ্যানর ঘ্যানর: কবর জিয়ারত ছাড়া কিচ্ছুটি করার নেই রাষ্ট্রপতির। তাই গণভবনের সর্দি হলে হাঁচতে থাকে বঙ্গভবন। অথচ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে তখনকার আলাপে মনে হয়েছিল, এই কবর জিয়ারতই তাঁর কাল হলো। প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়ে টুঙ্গিপাড়ায় খালেদা জিয়া গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রপতি যেতেই পারলেন না। শুধু ইচ্ছা প্রকাশে ষড়যন্ত্র দেখলেন প্রধানমন্ত্রী।
২৩ এপ্রিল আবদুল হামিদ ‘ইজ্জতের’ সঙ্গে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ২০০২ সালের ২১ জুনে পদত্যাগের আগে রাষ্ট্রপতি চৌধুরী প্রশ্নের জবাবে আমাকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তিনি রাষ্ট্রপতি পদের দলনিরপেক্ষ ইজ্জত রাখার স্বার্থেই ওই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক শুভেচ্ছা দেখাতে বি. চৌধুরী বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুস সামাদ আজাদের বাসভবনে গিয়েছিলেন। তিনি চাকরি করতে চাননি। তৎকালীন বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার আবদুল হামিদের বাসভবনেও যেতে চেয়েছিলেন বি. চৌধুরী। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ নিশ্চয় স্মরণ করতে পারবেন যে, কী কারণ দেখিয়ে স্পিকার আবদুল হামিদ সেদিনের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর বাসায় মেহমানদারি করাতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। বি. চৌধুরী ও আবদুল হামিদের সেই অভিন্ন ‘কারণ’ আজও অপরিবর্তিত এবং এই রাষ্ট্রে সেটাই চূড়ান্ত অর্থে সবার ইজ্জত নির্দেশক।
আবদুল হামিদের অভিষেককালে এই লেখকের একটি প্রার্থনা। সংকট সুরাহা কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেওয়া তাঁর এখতিয়ারের বাইরে। তাঁকে ঘিরে চলতি প্রার্থনা-সংগীত তাই বেসুরো মনে হয়। কিন্তু দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষমায় স্বচ্ছতা আনা তাঁরই কর্তব্য। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ১৫টি রায়ের তিনটি পর্যবেক্ষণ তিনি বিবেচনায় নিতে পারেন। ১. মার্জনার ক্ষমতা প্রধানত রাষ্ট্রপতির ডিসক্রিশন। ২. এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে রাষ্ট্রপতি সব সংশ্লিষ্ট তথ্য ও দলিলপত্র বিবেচনায় নিয়েছিলেন কি না, তা কতিপয় ক্ষেত্রে আদালত খতিয়ে দেখতে পারেন। ৩. রাষ্ট্রপতি মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ নতুন করে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাঁর এই ক্ষমতা বিচার বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
রাষ্ট্রপতির হাতে এই ক্ষমতা থাকা আদৌ দরকারি কি না, সেই প্রশ্ন ভারতে বড় আকারে উঠেছিল। ভারতের আইন কমিশনের যুক্তি: ‘থাকা উচিত। কারণ, বিচারকেরা ভুল করে কারও ফাঁসির আদেশ দিতে পারেন। সেটা ঠেকাবেন রাষ্ট্রপতি।’ যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড রহিতে রাষ্ট্রপতি কখনো পুনর্বিচারও চাইতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা গেল গেল বলে রব তুলতে পারেন। কিন্তু এটা সংসদীয় গণতন্ত্রবিরুদ্ধ নয়। ইংল্যান্ডের এক রাজা একদা একটি মার্জনার আবেদন সুপ্রিম কোর্টে ফেরত পাঠান। প্রধান বিচারপতি ছিলেন লর্ড গোডার্ড। তিনি নতুন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শুনানি করেন এবং দণ্ডিতকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দেখতে পান। নিয়ম করা যেতে পারে, কারও দণ্ড মার্জনা হ্রাসের সিদ্ধান্ত শুধু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নয়, এটা মন্ত্রিসভায় তুলতে হবে। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। আবদুল হামিদ ব্যক্তিগতভাবে চাইলেই প্রতিটি মার্জনার বিষয়ে বঙ্গভবন থেকে একটি কারণসংবলিত বিজ্ঞপ্তি প্রচার করতে পারেন। ‘ক্ষমা-বাণিজ্য’ নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়াও উচিত নয়।
সংবিধানপ্রণেতারা মনে রেখেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন। রাষ্ট্রপতিকে তিনি রাবারস্ট্যাম্প বানাতে পারেন। তাই তাঁকে একটা রক্ষাকবচ দেন।
সংবিধান বলেছে, ‘প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দান করেছেন কি না এবং করে থাকলে কী পরামর্শ দান করেছেন, কোনো আদালত সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবেন না।’ এটা কি শখ করে লেখা?
না। প্রধানমন্ত্রীরা কোনো অনৈতিক, অন্যায্য, অশোভন ও আইনানুগ নয়—এমন কোনো বিষয়ে দস্তখত আশা করতে পারেন। তখন ‘আমি কী করব। জানেনই তো’—এ ধরনের অজুহাত দেখানোর কোনো সুযোগ ইজ্জত রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ কোনো রাষ্ট্রপতির নেই। হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রীকে একটা ‘না’ বলে দিলে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠবে। কিন্তু সংসদে অপসারণ ছাড়া আদালতে তার প্রতিকার নেই। নিজে নাক কেটে এই অপসারণ যে সহজ কাজ নয়, সেটাই রাষ্ট্রপতির রক্ষাকবচ।
১২৩ অনুচ্ছেদে সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা আছে। সংসদ গড়তে তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার লাগে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কিচ্ছুটি লাগে না। গোড়াতেই বলেছি, একটি কিনলে দুটি ফ্রি! একটি নির্বাচনে জিততে পারলে দুটি পাঁচ বছর মেয়াদি দলীয় রাষ্ট্রপতি ফ্রি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ সংবিধান। এটা একটি অগণতান্ত্রিক সংবিধান। এই সংবিধান বলেছে, ‘মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে।’ মৃত্যু না ঘটলে জিল্লুর রহমান মেয়াদ শেষের একটু আগে পদত্যাগ করেও দ্বিতীয় দলীয় রাষ্ট্রপতি জাতিকে উপহার দিতে পারতেন।
পূর্বসূরির মতোই একজন রাবারস্ট্যাম্প রাষ্ট্রপতি হবেন কি না আবদুল হামিদ, সেটা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

বুধবার, ৪ এপ্রিল, ২০১২

মোস্তাফা কামালের সমুদ্র রিপোর্ট এবং বিএনপির বিলাপ


বাংলাদেশের সমুদ্রজয়কে কাল্পনিক ব্লক হাতছাড়া হওয়া না-হওয়ার সঙ্গে তুলনা করে বিএনপি ও কিছু বিশেষজ্ঞ চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন। বিরোধী দলের নেতা সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানোর পর বিএনপিরই কিছু নেতার যেন গাত্রদাহ শুরু হয়েছে।
ড. মোশাররফ হোসেন প্রেসক্লাবে মিয়ানমারের কাছে ‘ঠকে আসার’ অভিনব তত্ত্ব হাজির করেন। এর পরই মির্জা ফখরুল ইসলাম, যিনি এর আগে ‘সরকারকে বাদ দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে’ সাধুবাদ জানিয়েছিলেন, তিনি এখন ‘শুভংকরের ফাঁকি’ আবিষ্কার ও ‘বিসর্জনের’ তালিকা প্রকাশের দাবি করেছেন। রায় প্রকাশের মতো হাস্যকর দাবিও তুলছেন। কারণ, ইটলস ওয়েবসাইটে মূল রায়, এমনকি উভয় পক্ষের শুনানি, কে কী দাবি করেছে, তার সবকিছু দেওয়া আছে।
তবে বিশেষজ্ঞ মহলের অযাচিত আক্রমণ দুঃখজনক। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা রায় না পড়ার কথা স্বীকার করেও ‘মিথ্যাচার’ ও ‘জাতিকে লজ্জা’ দেওয়ার কথা বলতে দ্বিধাহীন। প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক জয়-পরাজয় নিয়ে প্রথম আলোয় গত ৩০ মার্চ যা লিখেছেন, তা অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর, অসত্য এবং উদ্ভট বটে। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ড. শাহ আলম তাঁর রচনার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দিগ্ধ। এই লেখকের সঙ্গে আলোচনায় লেখাটি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। তাঁর মন্তব্য, ‘ইনামুল সাহেব নদী নিয়ে কাজ করেন। লেখা পড়ে মনে হয়, সাগরের অথৈ জলে পড়ে তিনি খেই হারিয়ে ফেলেছেন।’
২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ড. মোশাররফ ২০০১ সালে জাতিসংঘে কী দাখিল করেছেন, সেটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজানা। তিনি ইয়াঙ্গুনে বিজয়োল্লাসের তথ্য দেন। কিন্তু সেখানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
খালেদা জিয়ার উচিত তাঁর কাছে একটি কৈফিয়ত চাওয়া। বিএনপির নেত্রীর সভাপতিত্বে ৯ ডিসেম্বর ২০০২ অনুষ্ঠিত বৈঠকে মহীসোপানের দাবি ২০০৪ সালের মধ্যে জাতিসংঘে পেশ করার (যা ২০১১ সালে আওয়ামী লীগকে করতে হয়েছে) সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। নইলে স্থলভাগের দুই-তৃতীয়াংশের সমান সমুদ্রসীমা ‘হাতছাড়া’ হতে পারে—এ কথা সাফ বলে দিয়ে ড. মোশাররফকে আহ্বায়ক করে তিনি ১৫ সদস্যের কমিটি করে দিয়েছিলেন। আজ যদি মির্জা ফখরুলের দাবি অনুযায়ী ‘শুভংকরের ফাঁকি’ ঘটে, তাহলে তার দায় কে নেবে? সাগরে ‘দুই-তৃতীয়াংশ’ জলভাগ হাতছাড়া হওয়ার জন্য তো খালেদা জিয়ার শর্তেই ড. মোশাররফকেই আগে কাঠগড়ায় তুলতে হবে। বিএনপিকে মায়াকান্না করতে হলে মরিচের গুঁড়া সরবরাহের খরচটা তাঁর কাছ থেকেই উসুল করতে হবে।
নৌবাহিনী ও সরকারের অন্য সংস্থা যে দুটি জরিপ ২০১০ সালে ঝঞ্ঝার বেগে করল, সেই জরিপ ২০০৪ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার দায়িত্বও ওই কমিটির কার্যপরিধিতে ছিল। কিন্তু ব্যর্থ ড. মোশাররফ ও তাঁর কমিটি সম্ভবত এরপর কোনো বৈঠকেই বসেনি।
আজকের লেখায় আমি অবশ্য সেই সব বন্ধুদেশকে ধন্যবাদ জানাব, যাঁরা ৩৫ বছর আগে বাংলাদেশের সমুদ্রনীতির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিল।
সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামাল জিয়া-জমানায় অ্যাডভোকেট (অ্যাটর্নি) জেনারেল ছিলেন। ১৯৮২ সালের যে আইনটির অধীনে আমরা রায় পেলাম, সেটি তৈরির পর্বে বাংলাদেশ তাতে ন্যায়পরায়ণতা নীতি সংযোজনে ব্রতী হয়। কারণ, সমদূরত্ব পদ্ধতিতে বাংলাদেশ সাগরে ‘তালাবদ্ধ’ হয়ে পড়ে। তাই জিয়াউর রহমান সরকার সমুদ্রে তালা খোলার কূটনীতিতে যথার্থই মনোনিবেশ করেছিল।
১৯৭৭ সালের ২৩ মে থেকে ১৫ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক একটি সম্মেলন শেষ হয়েছিল। ব্যারিস্টার মোস্তাফা কামাল এর সঙ্গে গোড়া থেকেই যুক্ত হন। এ বিষয়ে তাঁর একটি রিপোর্ট অন্তত ১২ বছর আগে তাঁর কাছ থেকেই সংগ্রহ করেছিলাম। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশ তখনই ন্যায়পরায়ণতার সংশোধনী আনে এবং এর সপক্ষে লবি শুরু করে। ওই সম্মেলনে ২৩ জুন ১৯৭৭ আমাদের প্রস্তাবের ওপর ২৮টি দেশ আলোচনায় অংশ নেয়। প্রথম বক্তা সৌদি আরব বলেছিল, বাংলাদেশের উপকূলের যে অনন্য বৈশিষ্ট্য, সেটা বিশ্বের বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তার প্রস্তাব ন্যায্য ও যুক্তিসংগত। ইরান, বাহরাইন, তুরস্ক, সিরিয়া, বেলজিয়াম, রোমানিয়া, সোমালিয়া, মরক্কো, কাতার, সেনেগাল, আলজেরিয়া, ইয়েমেন, যুগোস্লাভিয়া ও ফিলিপাইন সমর্থন দেয়।
পাকিস্তান বলেছিল, বাংলাদেশের প্রস্তাব সুষ্ঠু ও ন্যায্য। ৫০টি দেশ তা সমর্থন করেছে, তাই সমুদ্র আইনে এর ঠাঁই পাওয়া উচিত। মিসর বলেছিল, এটা আইনানুগ ও ন্যায্য। গাদ্দাফির লিবিয়া ‘উষ্ণ সমর্থন’ দেয়। আফগানিস্তান বলেছিল, বাংলাদেশের সমস্যা ব্যতিক্রমী। তাদের সংশোধনী প্রস্তাব আইনে অন্তর্ভুক্ত হোক।
১৪তম বক্তা ছিল ভারত। ভারতীয় প্রতিনিধি বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তাদের প্রস্তাব পরীক্ষা করে দেখব। তবে ভারতের এ মুহূর্তে দুটি আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের শর্তে বেজলাইন স্থির করা হলে তা সমুদ্রসীমা ও ইইজেড নির্ধারণে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু মিয়ানমার নীরব থাকে।
এই সম্মেলনে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো বেশি সরব ছিল। বার্বাডোজ বলেছিল, বাংলাদেশ অবিরাম পাললিক ক্ষয়সাধন সমস্যায় ভুগছে। তাদের প্রস্তাব আইনকে আরও উন্নত করবে। মালটা, বাহামা ও সেনেগাল শুধু সমর্থনই নয়, তারা আমাদের পক্ষে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছিল। ইন্দোনেশীয় প্রতিনিধি হাস্যরস সঞ্চার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মাননীয় চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের সংশোধনী বিশাল সমর্থন লাভ করেছে। আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিন। তাদের প্রস্তাব ইতিমধ্যে মতৈক্য সৃষ্টি করেছে।’ এর পরই হাসির রোল। আমাদের রাষ্ট্রদূত কে এম কায়সার সম্মেলনে বলেছিলেন, অন্যের স্বার্থ ক্ষতি করে নয়, বাংলাদেশের চাওয়া হলো, তাকে যেন প্রকৃতির কারণে খেসারত দিতে না হয়। ‘তালাবদ্ধ’ হতে না হয়।
সেদিন সম্মেলনকক্ষে কেউ প্রত্যক্ষভাবে আমাদের বিরোধিতা করেনি। কিন্তু আমরা লক্ষ করি, জাতিসংঘের দ্বিতীয় কমিটির ওই অধিবেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন ভেনেজুয়েলীয় আইনবিদ ও কূটনীতিক আন্দ্রেজ আগিয়্যার। পরে তিনি আন্তর্জাতিক কোর্ট অব জাস্টিস আইসিজের বিচারক হন। তিনি যেন আমাদের প্রতি নারাজ ছিলেন। রাষ্ট্রদূত কায়সারকে পরে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য সমুদ্ররাষ্ট্রও বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি।’ তখন তাঁকে বলা হয়, কেউ কিন্তু বিরোধিতাও করেনি। এ সময় আগিয়্যার বলেন, বৈঠক শেষে ফ্রান্সের প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং একান্তভাবে বাংলাদেশের অবস্থানের বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, ফরাসি প্রতিনিধি তাঁকে বলেছেন, প্রকাশ্যে তাঁরা আপত্তি তোলেননি। কারণ, বাংলাদেশকে তাঁরা বিব্রত করতে চান না। বাংলাদেশ এমন দাবি করেছে, যা মেনে নেওয়া হলে বহু দেশ তাদের অনন্য উপকূলীয় বৈশিষ্ট্যের কথা বলে সমুদ্র গলাধঃকরণের মওকা পাবে।
আগিয়্যার আরও বলেছিলেন, সমর্থক দেশগুলোর ১৬টিই ইসলামি। আর তাদের সমর্থন অনেকটা রাজনৈতিক ধাঁচের। তিনি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে এমনও বলেছিলেন, স্পেন যখন প্রস্তাব নিয়ে এল, তখন লাতিন আমেরিকান দেশগুলো সমর্থন দিতে দ্বিধা করল না।
আগিয়্যার বলেছিলেন, ‘ভারতীয় আপত্তি অগ্রাহ্য করা যায় না। সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রিয়া যদিও বলেছে তারা প্রস্তাব সমর্থন করবে, কিন্তু একই সঙ্গে তারা বলেছে যে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থ সুরক্ষা বিবেচনায় নিতে হবে। সুতরাং, তারা শর্তযুক্ত সমর্থন দিয়েছে। উপরন্তু চীন তার “নীতিগত সমর্থন” বলতে কী বুঝিয়েছে, তা তারা ব্যাখ্যা করেনি। একইভাবে বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো তাদের সমর্থনের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ দেখায়নি।’
মোস্তাফা কামাল লিখেছিলেন, ‘মনে হচ্ছে আগিয়্যার বাংলাদেশের জন্য ঝামেলা পাকাতে পণ করেছেন।’ আগিয়্যার অবশ্য দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর একটি হচ্ছে, শীর্ষ সমুদ্ররাষ্ট্র ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাংলাদেশকে বৈঠকে বসা। দ্বিতীয়ত, খসড়া আইনে ভারতীয় আপত্তিসহ বাংলাদেশের সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করা। এর একটিতেও বাংলাদেশ রাজি হয়নি। এরপর যখন খসড়া প্রকাশ পেল, তখন দেখা গেল, সেখানে বাংলাদেশের সংশোধনী অনুপস্থিত। মোস্তাফা কামাল লিখেছিলেন, ‘এটা দেখে আমরা বেদনাহত হয়েছিলাম, কিন্তু বিস্মিত ছিলাম না।’
তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ১৯৮২ সালের আইনে ন্যায়পরায়ণতার বিধান টিকে যায় এবং আজ আমরা তার ফল পাই। স্পেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সমদূরত্ব নীতির বিরোধিতা করেছিল। মোস্তাফা কামাল লিখেছেন, ‘আমরা ব্যাপক অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিলাম, যাতে সমদূরত্ব নীতি সমালোচিত হয়েছিল এবং কেবল ন্যায়পরায়ণতার নীতি সবচেয়ে নিরাপদ বিবেচিত হয়েছিল।’ তাই ২০১২ সালে বড় জয়টা হলো ’৭৭ সালের আমাদের উল্লিখিত নীতিগত অবস্থান নাকচ করা হয়নি, সমর্থিত হয়েছে। রায়ের ৩২৫ অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘ট্রাইব্যুনাল তাই বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা যেখানে তার অবতলতার জন্য কাটা পড়ছে (আগে উল্লিখিত ‘তালাবদ্ধ’ অবস্থা) তা এড়াতে সমদূরত্ব নীতি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিল। আদালত স্থির করলেন, একটি ন্যায়সংগত সমাধান দরকার।’
ইটলস রায় ও মিয়ানমারের সংসদে দেওয়া বিবৃতিতেও আমরা তার স্বীকৃতি পাই। ইটলসে মিয়ানমারের এজেন্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ড. তুন শিন গত ২২ মার্চ মিয়ানমারের সংসদে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, ‘আদালত বাংলাদেশের উপকূলের ভৌগোলিক অবতলতা বিবেচনায় নিয়েছেন। তাঁরা মিয়ানমার বা বাংলাদেশের দাবি করা সমুদ্রসীমারেখার কোনোটিই গ্রহণ করেননি।’
তবে লক্ষণীয়, দুই দেশের উপকূলের আয়তনের অনুপাতে জলসীমার বণ্টন সমন্বয়কে উভয়ের জন্য ‘ন্যায্য ও সুবিচারপূর্ণ’ উল্লেখ করেও ড. শিন তথ্য দেন যে বাংলাদেশ বেশি সমুদ্র এলাকা পেয়েছে। তাঁর কথায়, ‘বাংলাদেশ ৬৯ হাজার ৭১৭ বর্গ কিলোমিটার দাবি করেছিল। ইটলসের সিদ্ধান্তের সীমারেখা অনুযায়ী তারা পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গ কিলোমিটার, যা ৪১ হাজার ৯১৪ বর্গ কিলোমিটার বেশি।’ (সূত্র: নিউ লাইট অব মিয়ানমার, ২৩ মার্চ, ২০১২)। আমাদের উক্ত দাবি ছিল মূলত পদ্ধতিগত কারণে। বর্মী ভাষায় প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক সাময়িকী ১৬ মার্চ সংখ্যায় আমাদের লাভবান হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য, সমদূরত্বের নীতি টিকে গেলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারও ছাড়াত না।
ম. ইনামুল হকের ওই নিবন্ধ বেশ জীবাণু ছড়িয়েছে। তিনি রায়ের ৪৭১ অনুচ্ছেদের ভুল অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেন। ট্রাইব্যুনাল বলেননি যে ‘বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানের (সিএস) যে দাবি করেছে, তা মিয়ানমারের ২০০ নটিক্যাল মাইল ইইজেড।’ সেন্ট মার্টিনে ১২ নটিক্যাল মাইল পাওয়ার পরও তাকে পরাজয় বলা তাঁর ধারণাগত ভুল।
আসলে আমরা আদালতের বদান্যতা কিংবা প্রজ্ঞায় সাগরে ‘তিনবিঘা করিডর’-এর কবলে পড়া থেকে বেঁচে গেছি। বাংলাদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইল মানে যেখানে শেষ, সেখান থেকে আমাদের আউটার মহীসোপান অর্থাৎ গভীর সমুদ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ, মিয়ানমারের ২০০ নটিক্যাল মাইলের সমুদ্রসীমা পথ আগলায়। এতে দ্বৈত অবতলগত সংকট সৃষ্টি হয়। সে কারণে গভীর সমুদ্রেও আমরা দ্বিতীয়বার ‘তালাবদ্ধ’ অবস্থায় পড়ি। আদালত তাই একধরনের করিডর সৃষ্টি করেন, নামকরণ করেন ‘ধূসর এলাকা’। এর মাছ খাবে মিয়ানমার, তলদেশের খনিজ তুলবে বাংলাদেশ।
মিয়ানমারের আপত্তি সত্ত্বেও ২০০ নটিক্যাল মাইলের পরে বাংলাদেশের আউটার মহীসোপানের সূচনা তিরচিহ্ন দিয়ে ইটলস নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। জগৎশীর্ষ সমুদ্র আইনবিশারদ কেমব্র্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস ক্রফর্ড (এ মুহূর্তে হেগের আদালতে কাশ্মীরের কিষাণগঙ্গা নদী মামলায় ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের মুখ্য কৌঁসুলি) আমাকে নিশ্চিত করেন যে বাংলাদেশের অনুকূলে আদালতের এ সিদ্ধান্তের কোনো তুলনা নেই। ওই ‘ধূসর এলাকা’ পেরিয়ে আমরা অবাধে আউটার মহীসোপানে যাতায়াত করতে পারব। উল্লেখ্য, চূড়ান্ত আউটার মহীসোপান-সীমা ঠিক করবে জাতিসংঘের কমিশন। মিয়ানমারের অ্যাটর্নি জেনারেল এর সুরাহা ২০৩৬ সালের আগে মিলবে না বলে সংসদকে জানান। তাই মহীসোপানের বিশাল এলাকা বিসর্জনের দাবি উদ্ভট।
আর কাল্পনিক ও আইনত এখতিয়ারবহির্ভূত ‘ব্লক হারানোর’ ঘটনায় পরাজয়ের প্রশ্ন বালখিল্যতা। বিএনপি ভাগ্যিস অ্যান্টার্কটিকায় ব্লক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাহলে অবশ্য আজ তারা বলতে পারত, আওয়ামী লীগ অ্যান্টার্কটিকা বিসর্জন দিয়েছে!
বড় কথা হলো, ইটলস আমাদের সেই রায় দিয়েছে, যাতে উল্লিখিত আগিয়্যার কুলের ন্যায়বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি পরাস্ত হয়েছে।
ভুলত্রুটির সমালোচনা কাম্য, কিন্তু তা যেন আদালত অবমাননার শামিল না হয়। সুপ্রতিষ্ঠিত সমদূরত্ব নীতির বিচ্যুতি বিরল। বিচারক নেলসন, চন্দ্রশেখর ও কট ন্যায়পরায়ণতার নীতি মেনেও তাঁদের খুঁতখুঁতানি চাপা রাখেননি। এক যৌথ ঘোষণায় তাঁরা বলেন, ‘এটা একটা বিষয়কেন্দ্রিক রায় হলো। উপকূলীয় বৈশিষ্ট্য যতই অনন্য হোক, তা বিবেচনায় এক দেশের জন্য ভিন্ন রকম রায় প্রদানের বিপদ কম নয়।’ তাই জয়-পরাজয় মাপতে পানিতে নামার আগে সমুদ্র আইন এবং তার বিচার-আচারের ভেতরকার এসব সূক্ষ্ম বিষয় বুঝতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

বুধবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১১

মেট্রোরেলে বন্দুকের ছায়া


প্রস্তাবিত মেট্রোরেল পথ এমনটাই হওয়ার কথা

মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি বহু আগে থেকেই আলগা থাকা সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক আরও আলগাই করবে। আমজনতার সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়াবে। ঐতিহাসিক ও দীর্ঘ সামরিক শাসনে পর্যুদস্ত বাংলাদেশের মানুষের মনে উর্দিধারীরা এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে এ থেকে উত্তরণে নির্বাচিত সরকারগুলো যে আদৌ কাজের কাজ করেছে, তা কিন্তু বলা যাবে না। তারাও তাদের দিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করে নেয়।
চূড়ান্ত বিচারে মানিকে মানিক চেনে। শুধু সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক থেকে যায় অচেনা, যা আমাদের জাতি গঠনে খুবই দরকারি।
উইকিলিকস সূত্রে জানছি যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টিকে বলেছিলেন, ‘আপনারা সামরিক বাহিনীকে একটু বোঝান, যাতে তারা নির্বাচিত সরকারকে সহযোগিতা করে।’
আমাদের কাছে এর অর্থ নেতিবাচক। কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের এমন দৈন্য থাকার কথা নয়। যে নির্বাচিত সরকার জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাস না রেখে ফন্দিফিকিরে টিকে থাকতে চায়, তাদের পক্ষেই এমনটা বলা সম্ভব। আর আমরা বারবার সে রকম নির্বাচিত সরকারের ফাঁদে পড়ে খাবি খাচ্ছি।
উইকিলিকস আমাদের আরও ধারণা দিচ্ছে, দুই নেত্রী ক্ষমতা ধরে না রাখতে পারলে সামরিক বাহিনীই তাদের ভরসাস্থল। এ রকম একটা অবস্থায় বিবিসি-বর্ণিত বাংলাদেশ মিলিটারির ‘কমসে কম ৫০০ মিলিয়ন ডলারের’ ফৌজি সাম্রাজ্য ফুলেফেঁপে ওঠার কাহিনি শুনে আমরা বিস্মিত হই না। তেজগাঁওয়ে বিমানবন্দরের নামে জমি ধরে রাখাও ওই ফৌজি সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে।
প্ল্যানার্স টাওয়ারের গোলটেবিলে অংশ নেওয়া বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক গ্রুপ ক্যাপ্টেন বলেছেন, তেজগাঁওয়ের বিমানবন্দর রাখার ব্যাপারে পরিকল্পনাবিদেরা যেসব যুক্তি দিচ্ছেন, তা অস্বীকার করা যায় না। তবে ওই বিমানবন্দর আমাদের বিমানবাহিনীর লাগবেই। এঁরা আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই জমিদার, যিনি বলছেন, ‘বুঝেছ উপেন, ওটা দিতে হবে।’
জাপানের ওকিনাওয়া শহরে যখন মার্কিন ঘাঁটি বসেছিল, তখন শহরটি ঘনবসতিপূর্ণ ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে শহর বড় হওয়ার পথে ওই সামরিক ঘাঁটির অপসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ওয়াশিংটন পোস্ট-এ রিপোর্ট দেখেছি, সম্প্রতি বারাক ওবামার সঙ্গে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়। তখন তিনি ওকিনাওয়া ঘাঁটি অপসারণের প্রসঙ্গ তুললে ওবামা অত্যন্ত বিরক্ত হন। তাঁর সেই বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ ছিল এমন অভাবনীয় যে জাপানি কর্মকর্তারা বৈঠকের নোট নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। ওকিনাওয়া আর ঢাকার মানুষের মধ্যে কোনো তফাত দেখি না। তাঁরা সেই সব যুক্তিতেই আন্দোলন করছেন, যা আমরা নগরের হূৎপিণ্ডে থাকা তেজগাঁও বিমানবন্দর অপসারণের জন্য করছি। জাপানিরা একটি শক্তিশালী দখলদার বাহিনীর পাল্লায় পড়েছে। আর আমরা পড়েছি তাদের পাল্লায়, যারা এ পর্যন্ত শুধু নিজ দেশ জয়েই বিক্রম দেখিয়েছে।
মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গীতা পাসির পাঠানো বার্তায় দেখি, জরুরি অবস্থায় একটি ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠার ধারণা তৈরি হয়েছিল। ডিজিএফআই সব রাজনৈতিক দলের রাজনীতিকদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল যে এ ধরনের সরকারে তাদের যোগ দিতে হবে। এতে তাদের বাধ্য করারও ইঙ্গিত রয়েছে গীতা পাসির বার্তায়। একটি গুজবও নাকি ছিল যে ডিজিএফআই ক্ষুদ্র দলগুলো দিয়ে একটি ন্যাশনাল ফ্রন্ট তৈরি করবে। তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং নতুন সরকারে তাদের হয়ে প্রক্সি দেবে। এটা গুজব। কিন্তু গুজবের একটি মহিমা হচ্ছে, যা একেবারেই অসম্ভব, সত্যের ধারেকাছেও নেই, তা কিন্তু গুজব হিসেবেও ডানা মেলে না। কিছুদিন আগে রাশেদ খান মেনন ডিজিএফআইয়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের ভূমিকার বিষয়ে একটা বিরূপতা বিভিন্ন মহলে সংগত কারণেই রয়েছে। ডিজিএফআই ও আইএসপিআরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে যে ধরনের আস্থা অর্জন করার কথা, সেটা গড়ে উঠছে না।
ডিজিএফআই পাকিস্তানি আইএসআইয়ের আদলে তৈরি বলে শেখ হাসিনার একটি বইয়ে উল্লেখ ছিল। আইএসআই বানিয়ে ছারখার হওয়া পাকিস্তান সংস্থাটির রাজনৈতিক সেল বন্ধ করল। শুনে আমরা লিখলাম, তাহলে এখানেও বন্ধ হোক। শেখ হাসিনা দুই দফায় সাত বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী। আজ পর্যন্ত আরেকটি বই লিখে তিনি জাতিকে জানালেন না যে ডিজিএফআইয়ের গণতন্ত্রায়ণে তিনি এ পর্যন্ত কী কী করেছেন।
আমাদের সন্দেহ অনৈতিক ফৌজি বাণিজ্যের সম্প্রসারণটা সামরিক শাসনের চেয়ে নির্বাচিত আমলেই ঘটেছে। জমকালো হোটেল, সুউচ্চ টাওয়ার, ব্যাংক, পেট্রলপাম্প—কোথায় তারা নেই।
মুনতাসীর মামুন ও জয়ন্ত কুমার রায় প্রশাসনের অন্দরমহল: বাংলাদেশ শীর্ষক বইয়ে যে চিত্র বহু আগে এঁকেছিলেন, তা থেকে আমরা কি বেশি দূরে বেরিয়ে আসতে পেরেছি? তাঁরা লিখেছিলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে নির্লজ্জভাবে ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সের অদলবদল করে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন অনেক বাড়িয়ে সামরিক শাসকেরা বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসকে হেয় করেছে। এ ব্যবস্থায় একজন মেজর জেনারেল একজন সচিবের সমকক্ষ।’
জনপ্রশাসনে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অব্যাহত। মহাজোট সরকারের আড়াই বছরে বেসামরিক প্রশাসনে ১৭৮ জন সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা ইতিহাসের নতুন রেকর্ড। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় এ সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৮২।
কেন এমন ঘটছে। মাপকাঠি কী, মেধা না কোটা? কতিপয় ক্ষেত্রে আমরা স্পষ্টতই লক্ষ করি একটা কোটারি অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা পরিদপ্তর একটি বেসামরিক সংস্থা। নিতান্ত কোটারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সামরিক বাহিনী এর নেতৃত্ব করায়ত্ত করেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদটি সেনাতন্ত্রের আরেকটি নমুনা। সেখানে বেসামরিক কথাটি নিজেই নিজকে ঠাট্টা করছে। কারণ, ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রথম পাঁচ চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন। পরবর্তী ১৬ জনের ১৪ জনই কর্মরত এয়ার কমোডর ও দুই গ্রুপ ক্যাপ্টেন। একটিবারের জন্যও এখানে কোনো উর্দিহীন প্রাণী ঢুকতে পারেনি।
একটা অস্বস্তিকর বিষয় হচ্ছে, প্রতিরক্ষা বিভাগের বিষয়ে কোনো সমালোচনামূলক কিছু বলতে গেলেই অনেক সময় জুজুর ভয় দেখানো হয়। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, জাতীয় স্বার্থ ও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। দেশপ্রেমিক শব্দটি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর ভূষণ।
প্রতিরক্ষা বাজেট বেড়েই চলেছে। কেন বাড়ে, তার সদুত্তর নেই। আগামী ১০-২০ বছরে আমাদের সামরিক বাহিনীর কোনো বিভাগে কত লোকবল বাড়বে এবং তাদের ক্যান্টনমেন্ট ও বাসস্থান কোথায় কী হবে, সেই চিত্র জনগণের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার। তবে সামরিক বাহিনী যত সহজে সাইনবোর্ড লাগিয়ে জমি দখলে রাখতে পারে, তত সহজে বেসামরিক কোনো বান্দা পারে না। কেরানীগঞ্জে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে সেনাবাহিনীর নতুন সাইনবোর্ড পড়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদেরা হতভম্ব।
২২ তলা র‌্যাংগস ভবন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান এখন একটি নতুন রাস্তা হয়েছে। নতুন একটি রাস্তা পাওয়ায় জনগণ র‌্যাংগস ভবনটি ভেঙে ফেলার প্রতি তেমন সহানুভূতিসম্পন্ন হতে পারেনি। ৭০০ কোটি টাকার একটি সম্পদকে আমরা জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে পারিনি। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে মূলত পুরোনো বিমানবন্দর। আজ মেট্রোরেল রুটের সঙ্গে আপসই একমাত্র বিবেচ্য নয়। র‌্যাংগসের মতো উচ্চ কোনো ভবনই আর হতে দেওয়া হবে না ওই এলাকায়। তবে যদি ফৌজি সাম্রাজ্যের স্বার্থে ট্রাস্ট ব্যাংকের মতো কোনো উচ্চ ইমারত করতে হয়, তাহলে সমস্যা নেই। আইনও সে জন্য তাদের মনের মতো করে লেখা। পাকিস্তানের বিধি পড়ে যে কেউ বুঝবেন, রানওয়ে থেকে কত দূরে কী উচ্চতায় ভবন করা যাবে। বাংলাদেশে বোঝার উপায় নেই। এটা নির্ধারণের চূড়ান্ত এখতিয়ার ওই চেয়ারম্যানের।
র‌্যাংগসের জমিতে যদি জনস্বার্থে রাস্তা তৈরি করাই লক্ষ্য থাকত, তাহলে সেখানে একতলা ভবন নির্মাণেরও অনুমোদন দেওয়ার কথা নয়। তাদের একমাত্র মাথাব্যথা ছিল এরশাদ যে তেজগাঁও বিমানবন্দরকে সরকারিভাবে পরিত্যক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাকে বাস্তবায়িত হতে না দেওয়া। সে কারণে তারা ছয়তলা পর্যন্ত র‌্যাংগস ভবন নির্মাণ মেনে নেয়। শুধু বিমানবাহিনীর আপত্তির কারণে তেজগাঁওয়ে তথাকথিত পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর ধরে নিয়ে র‌্যাংগসের ছয়তলার অতিরিক্ত তলাগুলো ভাঙার রায় আসে। শুনানি হয়েছিল জরুরি অবস্থায় যখন সেনা দাপট মধ্যগগনে। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একটি হলফনামায় বলেছিলেন, পাঁচ বছর পার হলো বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের কোনো খবরই ছিল না। এখন তারা তড়িঘড়ি করে শুনানি করতে চাইছে। সত্যি সেখানে নাটকীয়তা ছিল। আপিল বিভাগের রায়টি আইনের চেয়ে অনুমানের ওপর বেশি দাঁড়িয়ে। আপিল বিভাগ ধরে নিয়েছেন, ওখানে একটি বিমানবন্দর আছে।
শুনেছি পুরোনো বিমানবন্দরের জমিতে বিমানবাহিনীর জন্য একটি হাউজিং প্রকল্প হওয়ার কথা ছিল। সেটি আর কখনো হবে না, সেটা তো জোর দিয়ে বলা যাবে না। তেজগাঁও বিমানবন্দর পরিত্যক্ত হয়েছে। কুর্মিটোলাও (বর্তমান শাহজালাল) একদিন হবে, যদিও সেটা তারা শুরু থেকেই ব্যবহার করে আসছে। দুটোর দূরত্ব মাত্র সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। এখন বিমান সদর আমাদের ঘুম পাড়ানি গান শোনাচ্ছে। তারা বলছে, তেজগাঁওয়ে বিমানবন্দর না থাকলে দেশের মধ্যাঞ্চলের নিরাপত্তা লাটে উঠবে। বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একাধিক দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা বলেছেন, এটা একেবারেই ভিত্তিহীন।
এটুকু আমজনতাও বুঝবে, সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে একটি বড় বিমানবন্দর থাকতে এ রকম কথা বলা কত উদ্ভট। তাই এটা যে বন্দুকের নলের জোরে ঘটছে, তা বুঝতে কষ্ট হয় না। সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের উন্নতি চাইলে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রস্তাব অনুযায়ী এটি হোক উন্মুক্ত স্থান। বিমানবাহিনী এই সিদ্ধান্ত নিলে সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের বিরাট উন্নতি ঘটবে। অন্যথায় আমাদের মনে পড়বে ফৌজি বাণিজ্যের কথা। যেখানে একজন হোটেল ব্যবসায়ী বিবিসিকে বলেন, ঢাকার জমির আকাশচুম্বী দাম। সেই জমি বিনে পয়সায় পেয়ে তারা হোটেল ব্যবসা করলে আমরা তো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারি না।