Anu Mohammed লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Anu Mohammed লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৬

বাংলাদেশে জ​ঙ্গিবাদ আক্রান্ত তরুণদের সুপথে আনতে যা করণীয়

কিছুদিন ধরে চারদিকে একটা হাহাকার। সরকার, বুদ্ধিজীবী, অভিভাবকদের মধ্য থেকে এই প্রশ্ন মাঝেমধ্যেই উঠছে, ‘কী করে আমাদের তরুণেরা জঙ্গি হয়ে যাচ্ছে?’ এর আগেও শুনেছি, ‘তরুণদের মধ্যে অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে।’ আমার তখন একটি পাল্টা প্রশ্ন আসে মাথায়, ‘তরুণেরা যদি অন্য পথে যেতে চান, তখন আপনারা কি তা হতে দেন?’

আমাদের সন্তানদের শৈশব থেকেই অসম্ভব একটা চাপ ও তাড়ার মধ্যে থাকতে হয়। স্কুলে সিলেবাস ভারী করা হয়েছে, বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে, নতুন নতুন বিষয় যোগ করা হয়েছে, পরীক্ষার চাপ বেড়েছে। শিক্ষার ভয়াবহ মাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের অভাব, প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নেই। যাঁরা আছেন, তাঁদের অনেক বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেই। এই চাপের সমাধান হিসেবে হাজির হয়েছে কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশনি আর গাইড বই। অভিভাবকের বেড়েছে ব্যয়ের বোঝা। আর ঘন ঘন পরীক্ষার চাপ নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ছোটাছুটি করতে হয় গাইড বই, স্কুল, কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর, নোট ইত্যাদির মধ্যেই। দম ফেলার সময় নেই। যদিবা কিছু সময় বের করা যায়, তা আনন্দ নিয়ে কাটানোর উপায় নেই। খেলার মাঠ সব উধাও। সেগুলোতে এখন বহুতল ভবন বা শপিং মল; কীভাবে সর্বজনের এসব স্থান ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে গেল, এর খোঁজ কেউ জানে না। নদী, খাল, পুকুর তো আরও আগেই শেষ হয়ে দখল নয়তো ভয়াবহ দূষণের শিকার। সুতরাং সাঁতার বা পানির কাছেও যাওয়ার ওপায় নেই। কোথায় যাবে তারা? পাড়ায় পাড়ায় গ্রন্থাকার থাকা উচিত, নেই। শিক্ষার্থীদের গাইড বই মুখস্থ করা ছাড়া আর কোনো বই পড়ার সুযোগ কই?

সন্তানদের কাছে অভিভাবকদের দাবি, ‘আশপাশে তাকাবে না, বাইরের বই পড়বে না, অন্যদের সঙ্গে মিশবে না, বাইরে যাবে না, নিজের দিকে দেখো, ফার্স্ট হতে হবে, বড়লোক (অনেক অর্থের মালিক) হতে হবে।’ প্রায় অভিভাবকই চান সন্তান আত্মকেন্দ্রিক হোক, বাজার বুঝুক, সমাজ সম্পর্কে নিস্পৃহ হোক, ‘অন্য’দের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শিখুক। শিক্ষকেরা চান শিক্ষার্থী গাইড বই, নোটবই পড়ুক, কোচিং সেন্টারে পড়ুক। সরকার চায়, এরা সবাই চিন্তাশূন্য, বিশ্লেষণশূন্য ও প্রশ্নশূন্য রোবট-সমর্থক হোক।

বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসা ছাড়াও কিছু ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠানের কথা আমরা জানি। খুবই নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ও তদারকির মধ্যে; বেঁধে দেওয়া সীমার মধ্যে শিক্ষা, চিন্তা ও তৎপরতায় থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। প্রাইভেট বা বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নেই, কোনো সংগঠনের প্রকাশ্য অস্তিত্ব বা তৎপরতা নেই। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন ক্লাব বা সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কিছু ক্লাস-বহির্ভূত তৎপরতা করেন। এর বাইরে যাওয়ার সাধ্য শিক্ষার্থীদের নেই। এই নিয়ন্ত্রিত জগতে কীভাবে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত তারুণ্যের বিকাশ ঘটবে? কাঠামোবদ্ধ চিন্তা, স্পনসর্ড উচ্ছ্বাস বা বিজ্ঞাপনী সক্রিয়তাকে তারুণ্য বলা যায় না।

পাবলিক বা সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন আছে, সাংস্কৃতিক সংগঠন নাট্যদল ইত্যাদিও আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যায়, নিপীড়ন, বৈষম্যবিরোধী চিন্তা ও সক্রিয়তায় এসব সংগঠনের ভূমিকা ও লড়াইয়ের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আছে। কিন্তু যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের ছাত্রসংগঠন আর তল্পিবাহকে প্রশাসন ও শিক্ষকনেতাদের জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই জমা হয়েছে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা। সরকারি ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য এতটাই প্রবল যে অনেক সময় হল বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় না।

একইভাবে সরকারি ছাত্রসংগঠনের দাপটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য হলের ভেতরের পরিস্থিতি খুবই নাজুক। পরিস্থিতি এমন যে অনেক সময় বোঝাই যায় না যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসন আছে। অনেক সময় ছাত্রদের বাধ্য করা হয় সরকারি দলের অনুষ্ঠান বা মিছিলে যেতে, অনেক সময় কোনো না-কোনো কারণে মর্জি মোতাবেক হলের গেট বন্ধ করে রাখা হয়, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যেতে পারেন না, হলের ভেতর র‍্যাগিং বা নতুন ছাত্রদের শায়েস্তা করে প্রথমেই তাঁদের ক্ষমতার কেন্দ্র সম্পর্কে শিক্ষাদান করা, এটা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। একই প্রক্রিয়ায় অস্ত্র, মাদক, ছিনতাই, নির্যাতন, হয়রানি সবই বাড়তে থাকে। এসবের প্রতিবাদ করতে গেলে আরও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

এগুলো একদিনে হয় না, এই ছাত্ররা এমনি এমনি এ রকম সন্ত্রাসী বা নির্যাতকে পরিণত হন না। ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতার প্রভাববাণিজ্য অক্ষত রাখতে গিয়ে ছাত্রদের কলুষিত করে। অর্থ আর ক্ষমতার লোভে আক্রান্ত হয়ে, কিংবা ফাঁদে পড়ে এই তরুণেরা হয়ে দাঁড়ান অসংখ্য তরুণের জন্য বিভীষিকা। তাঁরা নিজেরাও যে এতে নিরাপদ থাকেন, তা নয়। নিজেদের মাঝে সংঘাত, অন্যের জমি দখল, টেন্ডার দখল কিংবা অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে গিয়ে খুনোখুনির অনেক ঘটনাই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। প্রশাসনও তাঁদের ব্যবহার করে। উপাচার্য পদ নিয়ে সংঘাত, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগের হামলা এমনি এমনি ঘটে না।

প্রকৃতপক্ষে শিশু থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিশু, কিশোর, তরুণেরা এখন একযোগে বিভিন্ন দিক থেকে অভিভাবক, শিক্ষা-বণিক সম্প্রদায় এবং রাষ্ট্রের অবিরাম আক্রমণের শিকার। এ ছাড়া আছে জঙ্গিবাদসহ নানা প্ররোচনা ও ফাঁদ। এই যদি হয় স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পরিস্থিতি, তাহলে কীভাবে তরুণেরা নিজেদের ভেতরের অসীম ক্ষমতার সন্ধান পাবেন? তাঁর ভেতরে যে অদম্য শক্তি, কীভাবে তার প্রকাশ ঘটাবেন? কীভাবে তাঁর মধ্যে সামষ্টিক স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থের যুক্ততার বোধ আসবে? কীভাবে তিনি জানবেন বুঝবেন, সমষ্টি মানুষ আর প্রকৃতি তাঁর অস্তিত্বের অংশ? কীভাবে নিজের থেকে নিজে বড় হবেন? অন্যায়-অযৌক্তিক দম বন্ধ করা পরিবেশের বিরুদ্ধে কেউ কি প্রতিরোধ করতে পারেন, যাঁরা নিজেরাই মুক্ত হওয়ায় শ্বাস নিতে পারেন না। তাঁদের স্বার্থপর চিন্তা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতাহীন অবস্থা তাঁদের কোথায় নিয়ে যাবে? কেউ জঙ্গি হবেন, কেউ সন্ত্রাসী হবেন, কেউ ‘সফল’ হয়ে মানুষ ও প্রকৃতিবিনাশী তৎপরতার দিকপাল হবেন।

শিক্ষাকালে চাপ, শিক্ষা শেষে অনিশ্চয়তা, পথঘাট ভয়ের, চারদিক থেকে প্রত্যাশা পূরণের তাগিদ—সবকিছুর মধ্যে পিষ্ট সাধারণ তরুণেরা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভর্তি-বাণিজ্য, কোটা, নিয়োগ-বাণিজ্যের এত সব পাহাড় কজন অতিক্রম করতে পারেন? একদিকে এত বাধা, অন্যদিকে বাজারের চাকচিক্য; একদিকে বঞ্চনা, অন্যদিকে চোরাই টাকার উৎসব। অন্যায়-অবিচারের প্রভুরাই সমাজ চালায়। তরুণদের সামনে তারাই একেকটি দেয়াল। সন্ত্রাসের টার্গেট কিংবা সন্ত্রাসী বানানোর জালের সামনেও প্রধানত তরুণেরাই। একদিকে ভোগের টান, অন্যদিকে অক্ষমতার বঞ্চনা। ইহকালের অসন্তোষ দূর করতে টানে পরকালের অনন্ত সুখের ডাক। জঙ্গি উত্থান তাই আলগা কোনো উপদ্রব নয়। দেশের ভেতর নৃশংসতা ও রোবট বানানোর কারখানা থেকেই সে বের হচ্ছে। তার বৈশ্বিক উৎস, পৃষ্ঠপোষকও যথেষ্ট। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের হিংস্রতা, বিদ্বেষ, দখল, গণহত্যা আর কৌশলগত খেলা জোগান বাড়াচ্ছে ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের। জঙ্গির জমিন যেভাবে হচ্ছে, সেদিকে নজর দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধতা ও অনিচ্ছা দুটোই আছে।

গত ১ জুলাইয়ের ভয়ংকর ঘটনার পর থেকে ‘জঙ্গি দমনে’ সরকারি বাহিনী করছে অনেক কিছুই। যেমন রাস্তাঘাটে তল্লাশি বাড়ানো; ঢাকা শহরের ভাসমান মানুষদের হয়রানি ও উচ্ছেদ; নিম্ন আয়ের মেস-বাসীদের পাইকারি হয়রানি ও উচ্ছেদ; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ; সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সভা–সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ ও সীমিতকরণ; সন্দেহ বিস্তার, ধরপাকড়, ভয় ছড়ানো ইত্যাদি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জঙ্গি নামে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নিরীহ লোকজনদের আটক করা। হেফাজতে মারা যাচ্ছে কথিত জঙ্গি। ভয় ধরানো এসব তৎপরতা দিয়ে কতটা জঙ্গি দমন হবে, কতটা তার পুনরুৎপাদন হবে, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ আছে।

জঙ্গিবাদী তৎপরতা শুধু সহিংসতা নয়, এটা একটা মতাদর্শ; যার কেন্দ্রে আছে নিজ ছাড়া অন্যের প্রতি সীমাহীন বিদ্বেষ, নিজ ছাড়া অন্যকে ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, পাপী, আবর্জনা, ক্ষতিকর ও বিষাক্ত ভাবা। অন্যকে পাপী, ক্ষতিকর বিশ্বাস করে তার ওপর নির্যাতন, তাকে হত্যা করা বৈধ জ্ঞান। যে তরুণেরা এই বিষাক্ত মতাদর্শে জারিত, তাঁরা একেকটি যন্ত্র, তাঁরা নিজেরাও জানেন না তাঁদের নিয়ন্ত্রণচাবি কার হাতে। ‘আমরা যা বলব, সেটাই পরম সত্য, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন যে তুলবে, যে বিরোধিতা করবে, সে-ই শত্রু। আমরা যা অনুমোদন করি না, তা কেউ বলতে, লিখতে, ভাবতে পারবে না। আমাদের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে, কোনো সংশয় জিজ্ঞাসা ভিন্নমত চলবে না। এর সবই হয়রানিযোগ্য, নির্যাতনযোগ্য, নিধনযোগ্য অপরাধ।’ এটাই জঙ্গিবাদী মতাদর্শের সারকথা। কিন্তু উল্টো অবস্থান বলা হলেও সরকার, তার দল, বিভিন্ন বাহিনী যেভাবে পরিচালিত হয়, তা এর থেকে কতটা ভিন্ন?

জঙ্গিবাদী মতাদর্শ দিয়ে জঙ্গিবাদ দমন করা যায় না। জঙ্গিবাদের সমাধান আসবে মানুষের মুক্ত স্বরের পরিসর কমিয়ে নয়, তা বাড়ানোর মধ্যে, সমাজে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতি, শ্রেণি, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্য, সমতা ও সংহতির চেতনার মধ্যে। এর ওপর দাঁড়িয়ে জনগণের সক্রিয়তার মধ্যেই এর বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে। এর শক্তি আসতে পারে প্রশ্ন করবার ক্ষমতা থেকে, সমষ্টির স্বার্থের চিন্তা ও তৎপরতা থেকে। এই সময়ে সাম্প্রদায়িক হামলা ও জাতিগত ধর্মীয় বৈষম্য নিপীড়নবিরোধী সংহতি, সুন্দরবনসহ সর্বজনের সম্পদ ও অধিকার রক্ষায় সক্রিয়তা, কৃষক‍-শ্রমিকের অধিকারের আন্দোলন, দেশের সম্পদ লুণ্ঠন, দখলদারি, রাষ্ট্রীয় খুন-গুম নিয়ে প্রশ্ন, নারীর প্রবল ও নিরাপদ অস্তিত্বের লড়াই, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবিরোধী সজাগ অবস্থান, সৃজনশীল তৎপরতার বিস্তারই দিতে পারে তরুণদের সামনে নতুন দিশা। এসবের চিন্তা ও সক্রিয়তার গুরুত্ব তাই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।

সমাজে প্রশ্নহীন আনুগত্য, অন্ধবিশ্বাস‌‌, ক্ষমতার নৃশংসতা, চিন্তা-বিশ্লেষণহীন রোবট সংস্কৃতির চাষ বন্ধ হলে জঙ্গিবাদ তো বটেই, কোনো ধরনের সন্ত্রাস আর আধিপত্যেরই জায়গা হবে না। চারদিকের শৃঙ্খল আর চাপ থেকে তরুণেরা মুক্ত না হলে এই মুক্তির পথ তৈরি হবে না। এই কাজেও উদ্যোগী হতে হবে প্রধানত তরুণদেরই।

আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। 

সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০১৫

ভারত যা নেবার নিয়ে গেছে


‘আজকে বলা হচ্ছে— বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। আমাদের জিডিপির অনেক গ্রোথ হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। আসলে তা ঠিক নয়।’এ মন্তব্য করেছেন তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ। 

তিনি বলেন, ‘কাগজ-কলমে জিডিপি বাড়লেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে দুর্নীতি। ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলেই অর্থনৈতিক লেনদেন বাড়ছে। এর ফসল হচ্ছে জিডিপি’র গ্রোথ।’ শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যাকসন হাইটসের মামুন’স টিউটোরিয়াল মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন)’ এবং ‘প্রোগ্রেসিভ ফোরাম’ এর উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘বাংলাদেশের জীবন মান এবং পরিবেশের উন্নয়নে বড় বাধা হচ্ছে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ব্যানারে কিছু স্বার্থান্বেষী মুখোশধারী রাজনীতিবিদ, আমলা, কনসালটেন্ট ও বুদ্ধিজীবীরা। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর স্বার্থে গোপন চুক্তি, অস্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়া। ভাগ-বাটোয়ারা ও কমিশন বাণিজ্যে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছে দেশের জনগণ পুরো জিম্মি।’ তিনি বলেন, ‘জিডিপি মানে কি? 

একটি দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা সামষ্টিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে বলা হয়। জিডিপি হচ্ছে অর্থনীতির আকার পরিমাপের একটি পদ্ধতি। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশের ভেতরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট বাজারমূল্য। একে উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে পণ্য ও সেবার উপর সংযোজিত মূল্যের সমষ্টি হিসেবেও দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এর চিত্র ভিন্ন।’ ‘জাতীয়ভাবে সরকার জনগণের স্বার্থ দেখলে উন্নয়ন সম্ভব। তবে বাস্তবে তা হচ্ছে না। বর্তমানে দুর্নীতি হচ্ছে ফলাফল। এতে নীতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার নীতি, নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক আধিপত্য, ভুলনীতি, অস্বচ্ছতা, গোপন চুক্তি, জনগণকে না জানানোর একটি নীতির ফসলই হচ্ছে দুর্নীতি,’— মন্তব্য করেন তিনি। 

অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘সরকার মনে করল উন্নয়নের স্বার্থে সব চুক্তি গোপন রাখছে। কিন্তু এসব গোপন চুক্তির পক্ষে অবস্থানকারী কনসালটেন্ট আর আমলা-বুদ্ধিজীবীরা তাদের স্বার্থ এবং কমিশন বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। কালো অর্থনৈতিক লেনদেনে জিডিপির আকার বাড়ছে ঠিকই, তবে দেশের ভবিষ্যৎ চলে যাচ্ছে অন্ধকারে।’ ‘এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নীতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। জিডিপি কেন্দ্রিক উন্নয়নের ধরন পরিবর্তন করতে হবে। গোপন চুক্তি বন্ধ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘জার্তীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিতে সরকারি আমলা, কন্সালটেন্ট, বুদ্ধিজীবী এদের কেবল একেকটি ব্যানারে মুখোশ পরিবর্তন হয়েছে। দুর্নীতি ঠিকই রয়ে গেছে। মুখোশ সরালে দেখবেন যে একই মানুষ। এখন সময় এসেছে আমাদের মুখোশটা সরাতে হবে।’ 

সভা শেষে এক প্রশ্নের জবাবে আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরে বেশ কয়েকটি চুক্তি হলেও তাতে বাংলাদেশ কিছুই পায়নি। ভারতের লাভ হয়েছে দীর্ঘ মেয়াদি ট্রানজিট।’ মোদির বাংলাদেশ সফরকালে দু’দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হয়েছে— এমন প্রশ্নের জবাব দেন আনু মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘ট্রানজিটের মাধ্যমে বাংলাদেশের সড়ক, রেলপথ ও নৌপথ ব্যবহার করার অনুমোদন পেয়েছে ভারত। কিন্তু এতে বাংলাদেশের প্রাপ্যটা কী? তা সরকার পরিষ্কার করেনি। কৃষি, রাস্তাঘাট এবং পরিবশের কতটা ক্ষতি হবে সেটাও জানতে চায়নি বাংলাদেশ। যদিও বাংলাদেশ সরকার বলছে অনেক লাভ হয়েছে। তবে তার কোন পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই।’ ‘আমি মনে করি যে কোনো বাংলাদেশি বলবে প্রথমে আপনারা কাঁটাতারের বেড়া সরান, সীমান্তে হত্যা বন্ধ করুন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এসব বিষয়েও পরিষ্কার কোন আলোচনা করেনি বাংলাদেশ। বিনিময়ে ভারত যা নেবার তা নিয়ে গেছে।’ 

শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

খাদ্যের বিষ ও বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য


গত ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশে বিটি বেগুন নামের জিএম বীজে উৎপাদনের সাফল্য বর্ণনা করতে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছিল। সেখানে যে কৃষকদের জড়ো করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কথা বলেছেন খুবই কম৷ যতজন বলেছেন, তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জানিয়েছেন, এই বিটি বেগুন তাঁদের গছিয়ে দেওয়া হয়েছিল উচ্চ ফলনের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তাঁদের সর্বনাশ হয়েছে। তাঁরা এর জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে কৃষিমন্ত্রী কয়েকটি অঞ্চলে বিটি বেগুনের চারা বিতরণ করেন। বহু দেশে এ ধরনের বীজ নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশ সরকার কেন এত উৎসাহী, সেটা অবশ্যই এক বড় প্রশ্ন। বলা দরকার যে এই উৎসাহ আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

১৯৯৯ সালে গৃহীত বাংলাদেশের কৃষিনীতিতে প্রধান উদ্দেশ্যাবলির মধ্যে ‘জৈবপ্রযুক্তির প্রবর্তন, ব্যবহার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ’কে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়ায় বীজ নিয়ে গত কয়েক বছরে অনেকগুলো বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে, যার আংশিক মাত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ধানবীজের ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফসল উৎপাদনের উচ্চ হারের লোভ দেখিয়ে বীজ বিক্রি করা হয়েছে, কিন্তু কৃষকদের পুরো মাঠের ফসল যখন এই বীজের কারণে মার খেয়েছে, তখন এর দায়দায়িত্ব কেউ নেয়নি—না সরকার না কোম্পানি। অথচ কোনো বিচার বা ফলাফল পর্যালোচনা না করে জিএম খাদ্য প্রচলন ও হাইব্রিড বীজের ওপর কৃষি ও কৃষককে নির্ভরশীল করে তোলার সর্বব্যাপী কার্যক্রমে ব্যাপক উৎসাহ ও সংঘবদ্ধ তৎপরতা চলছে।

জিএম খাদ্য ও হাইব্রিড বীজ বর্তমানে বহুজাতিক কৃষি ও খাদ্যবাণিজ্যের অন্যতম ক্ষেত্র। বিভিন্ন দেশে এর অনেকগুলোর ভয়াবহ ফলাফল প্রমাণিত, বিশ্বব্যাপী এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিস্তার লাভ করলেও মুনাফাকেন্দ্রিক তৎপরতায় নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে এটি চালু করার চেষ্টা বরং বিস্তৃত হয়েছে। প্রায় এক দশক আগে সরকার এই বীজ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ভিটামিন ‘এ’যুক্ত, কীটপতঙ্গরোধক, গরিবদের পুষ্টিবর্ধক ইত্যাদি নানা প্রচারণার মাধ্যমে জিএম বীজের আধিপত্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলেছে। কোম্পানি কর্তৃক কৃষকদের বীজের বাজার দখলের আয়োজন এখন অনেকখানি সফল। বীজ, সার ও কীটনাশকে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়েছে হাতে গোনা কিছু বহুজাতিক কোম্পানির। নীতিনির্ধারকদের ওপর তাদের প্রভাবও তাই একচেটিয়া।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের বীজবাণিজ্যের শতকরা ৬৭ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বের ১০টি বড় কোম্পানি। এগুলোর শীর্ষে আছে মনসান্টো (যুক্তরাষ্ট্র), এরপর যথাক্রমে আছে ডুপন্ট (যুক্তরাষ্ট্র), সিনজেন্টা (সুইজারল্যান্ড), গ্রুপ লিমাগ্রেইন (ফ্রান্স), ল্যান্ড ও লেকস (যুক্তরাষ্ট্র), কেডব্লিউএজি (জার্মানি), বায়ের ক্রপ সায়েন্স (জার্মানি), সাকাতা (জাপান), ডিএলএফ (ডেনমার্ক), তাকি (জাপান)। প্রথম দুটি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিই নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব বীজবাণিজ্যের শতকরা ৩৮ ভাগ। সিনজেন্টাসহ এই তিনটি কোম্পানি প্রায় অর্ধেক বীজবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক। এসব সংস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু প্রায়ই তাদের নিজেদের কার্টেল তৈরি হয়। এ রকম ঘটলে বাজারের প্রতিযোগিতার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। বীজের সংকট, কৃষকনিয়ন্ত্রিত বীজের বিপর্যয়, খাদ্য-সংকট—সবই এসব সংস্থার জন্য সুখবর। কেননা, তাতে বাজারের বিস্তৃতি ও মুনাফার বৃদ্ধি সহজ হয়।

এই বাণিজ্যে নিয়োজিত বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থাগুলো ৯০ দশক থেকে একের পর এক একীভূত হয়ে আরও বড় আকার ধারণ করছে এবং এই বাণিজ্য ক্রমেই অধিকতর একক আধিপত্যের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। যেমন সিবা ও স্যানডোজ মিলে নোভারটিস আবার জেনেসের সঙ্গে মিলে সিনজেন্টা। হোয়েকস্ট ও শিরিং মিলে অ্যাগ্রেভো এবং রোন পোলেনকের সঙ্গে মিলে গঠন করেছে অ্যাভেনটিস। কৃষিবাণিজ্যে সিনজেন্টা ও মনসান্টোই এখন শীর্ষে।

কয়েক দশক আগে কৃষি রাসায়নিক বাজারের সে রকম কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সেটি এখন কমপক্ষে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশ্ববাণিজ্য। কৃষি রাসায়নিক দ্রব্যাদি, বিশেষ করে কীটনাশক ওষুধের ক্ষেত্রে বিশ্ব উৎপাদন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বড় ১০টি কোম্পানি। এর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে আছে বেয়ার (জার্মানি): ১৯ ভাগ ও সিনজেন্টা (সুইজারল্যান্ড): ১৯ ভাগ। এরপর যথাক্রমে আছে বিএএসএফ (জার্মানি), ডো অ্যাগ্রো সায়েন্সেস (যুক্তরাষ্ট্র), মনসান্টো (যুক্তরাষ্ট্র), ডুপন্ট (যুক্তরাষ্ট্র), মাখতাশিম আগান (ইসরায়েল), নুফার্ম (অস্ট্রেলিয়া), সুমিতোমো কেমিক্যাল (জাপান), আরিস্টা লাইফ সায়েন্স (জাপান)। এদের বিশ্ববাণিজ্যের পরিমাণ এখন ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। রাসায়নিক সারের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছেই। এর বড় অংশই গেছে ‘গরিব’ দেশগুলোয়। সারের দামও বেড়েছে। ২০০৭-৮ সময়ে সারের দাম আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছিল। সারবাণিজ্যে বড় কোম্পানিগুলো হলো পটাশকর্প (কানাডা), ইয়ারা (নরওয়ে), মোজাইক-কারগিল (যুক্তরাষ্ট্র), ইসরায়েল কেমিক্যালস (ইসরায়েল), অ্যাগ্রিয়াম (কানাডা), কে+এস গ্রুপ (জার্মানি)।

একচেটিয়া প্রভাবের কারণেই এসব ‘উন্নয়ন’সামগ্রী ব্যবহারে সামাজিক, পরিবেশগত ও উৎপাদনগত ক্ষতি নিয়ে বিস্তৃত কোনো সমীক্ষা হয় না। আংশিক সমীক্ষায় দেখা যায়, এসব সামগ্রীর প্রভাবে বিশ্বে ৪০০টি মৃত্যু অঞ্চল তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে গত ৫০ বছরে বাজারমুখী উৎপাদন বৃদ্ধির উন্মাদনায় রাসায়নিক সার, সেচ, কীটনাশক ব্যবহার বাড়ার ফলে বিশ্বের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ আবাদি জমির উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় খর্ব হয়েছে। স্বাদু পানির স্বাভাবিক মাছ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। জমির লবণাক্ততা বৃদ্ধিও এর একটি ফল। যান্ত্রিক সেচের আওতায় বিশ্বের যত জমি আছে, তার শতকরা প্রায় ২০ ভাগ এখন লবণাক্ততার শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি এবং এর বাইরেও কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষ কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ এর কারণে মৃত্যুবরণ করে।

সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোয় ভর্তুকি দিয়ে বাজার ঠিক রাখার জন্য জমি পতিত রাখা, দুধ সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার বহু ঘটনা আছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন দুর্বল দেশে খাদ্য-সংকটের সুযোগে, পিএল ৪৮০-এর অধীনে খাদ্য‘সাহায্য’ তাদের আধিপত্য বিস্তারের একটি অস্ত্র হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে। ষাটের দশক থেকে লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে উন্নয়নের নামে বহুজাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য আবাদের জমিতে রপ্তানিমুখী বৃক্ষরোপণ করেছে; রপ্তানিমুখী কোকো, কফি, কলার বাণিজ্যিক উৎপাদনেই তাদের প্রধান আগ্রহ। ফলে এসব অঞ্চলে খাদ্যঘাটতি ও খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। আফগানিস্তান থেকে বিশ্ব চাহিদার শতকরা ৭০ ভাগ হেরোইন সরবরাহ হয়, অথচ সেখানে শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। কলম্বিয়ায় কফি উৎপাদন হচ্ছে শতকরা প্রায় ২৬ ভাগ আবাদি জমিতে। সেখানে দারিদ্র্য, সামরিকীকরণ, সহিংসতা পাশাপাশি সহাবস্থান করছে। ভারতে জিএম বীজ ব্যবহার করতে গিয়ে কৃষকের আত্মহত্যার হার বেড়েছে।

রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও যান্ত্রিক সেচের প্রসার প্রাথমিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করলেও এর বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পেয়েছে; এখানকার প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে মানানসই অনেক খাদ্য ও মৎস্য উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটেছে। ভূগর্ভস্থ পানি নির্বিচারে ক্রমাগত টেনে তোলায় ভূগর্ভে ভারসাম্য অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর এক মহাবিপর্যয়কারী ফল হলো আর্সেনিক। বহু বছর যে টিউবওয়েলকে নিরাপদ পানির উপায় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, এবং দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশের শতকরা ৯৮ জন মানুষ নিরাপদ পানি পান করছে, সেই টিউবওয়েলগুলোর একটি বড় অংশ এখন আর্সেনিকযুক্ত পানির প্রবাহের মাধ্যম। বাংলাদেশের সাড়ে তিন কোটি মানুষ এখন আর্সেনিক বিষের হুমকির মুখে। বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনীতি এই সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়নি। কেননা, এসব নীতি প্রণয়নে বহুজাতিক পুঁজির যত প্রভাব, তার একাংশও কৃষক বা সর্বজনের নেই।

বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন এখন প্রায় পুরোপুরি রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও যান্ত্রিক সেচনির্ভর। ধান, ফল, সবজি, মাছ, ডিম, মুরগি—সবকিছুরই উৎপাদন বেড়েছে, আকর্ষণীয় চেহারায় সেগুলো বাজারে উপস্থিত হচ্ছে; কিন্তু এর প্রায় সবই নানা মাত্রায় বিষ বহনকারী। নকল, বিষাক্ত রং ও ভেজাল কারখানা এখন বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র। গ্রামের হাটবাজার এসব বিষের মোহনীয় বিজ্ঞাপনে ভরা। খাবারের জৌলুশ বাড়ছে, বিশ্বজোড়া মুনাফা ও বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। জিডিপি বাড়ছে। অন্যদিকে, খাদ্যনিরাপত্তার মৌলিক শর্ত নিরাপদ খাদ্য বিপন্ন, নতুন নতুন হুমকির মুখে অরক্ষিত মানুষ। এসবের মধ্য দিয়ে মানুষের বিশুদ্ধ পানির অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, সম্প্রসারিত হচ্ছে বোতল পানির বাণিজ্য। কোমল পানীয়সহ নানা ধরনের ক্ষতিকর ‘শক্তিবর্ধক’ পানীয়তে বাজার সয়লাব। ভারতে একদল বিজ্ঞানী কোমল পানীয়তে বিষাক্ত উপাদান আবিষ্কার করার পর কোথাও কোথাও তার বিক্রি কমলেও বিজ্ঞাপনের জোরে সেগুলোর প্রতাপ এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। বাংলাদেশে এগুলোর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের তথাকথিত ‘শক্তিবর্ধক’ পানীয়।

জনগণের খাদ্য, পুষ্টি ও বৈচিত্র্যময় চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা এবং তা সর্বজনের কাছে সুলভ করা। কিন্তু কৃষি ও খাদ্যের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ ও মুনাফামুখী তৎপরতা একদিকে উৎপাদনক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে, অন্যদিকে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে দীর্ঘ মেয়াদে তা সুষম খাদ্য উৎপাদন অনিশ্চিত ও নাজুক করে তুলেছে। পাশাপাশি বিনা বিচারে গোষ্ঠীস্বার্থে ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কৃষিজমি, মাটির ওপরের ও নিচের পানিসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য অপূরণীয় ক্ষতির মুখে। বর্তমান ‘উন্নয়ন’নীতি এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে অক্ষম ও অনিচ্ছুক।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন, ২০১২

শেভ্রন ও নাইকোর কাছে আমাদের পাওনা ৪৫ হাজার কোটি টাকা


জুন মাস বাংলাদেশে বাজেট ঘোষণা আর তা নিয়ে আলোচনার মাস। বাজেট আলোচনা কেন্দ্র করে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভাবনা, সংকট, প্রস্তাবনা ধরে অনেক আলোচনা আর বিতর্ক হয়। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অনেক বিশেষজ্ঞ দেশে যে সম্পদ সংকট আছে তার ওপরই জোর দেন এবং তা ধরে নিয়েই কথা বলেন। সম্পদ নেই, দক্ষতা নেই, ক্ষমতা নেই– এগুলোই বারবার বলা হতে থাকে। একদিকে এই সম্পদ অভাবের এই কাঁদুনি শুনি আবার অন্যদিকে দেখি আর শুনি, বছর জুড়ে বিশেষত বছর শেষের দুইমাসে, অপচয় আর লুন্ঠনের জোয়ার। দেখি সম্ভাবনা ও শক্তির জায়গাগুলো নষ্ট হতে। দেখি বাজেট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছ থেকে সংখ্যালঘিষ্ঠ মানুষের কাছে সম্পদ স্থানান্তরের বৈধতা তৈরি করতে।
বিশ্বজুড়েই অর্থশাস্ত্রের শিক্ষার প্রধান ধরন এমনই যে অর্থনীতিবিদরা যতটা সংখ্যা নিয়ে মনোযোগী থাকেন ততটাই এর গুণগত দিক নিয়ে নির্লিপ্ত থাকেন। সেজন্য বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ, বিদেশি সাহায্যের প্রবাহ নিয়ে তাদের অবিরাম দুশ্চিন্তা দেখি। যেনো এগুলোর পরিমাণগত প্রবাহ বৃদ্ধিই উন্নয়নের চাবি। কিন্তু বাংলাদেশে কীধরনের উন্নয়ন হচ্ছে, কীধরনের বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে, এর ফলাফল কী, তথাকথিত বিদেশি সাহায্যের কারণে কতজায়গায় অপচয় আর দুর্নীতি বাড়লো, কীভাবে পাটশিল্প বিপর্যস্ত হলো, কীভাবে জলাবদ্ধতা স্থায়ী হল, বন উজাড় হল, বিদেশি বিনিয়োগের ফলে কীভাবে গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়লো, কীভাবে বিনিয়োগের তুলনায দশগুণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হলো, কীভাবে কমদামে বিদ্যুৎ পাবার পথ বন্ধ হলো, সেগুলো নিয়ে কোনো মনোযোগ অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় না।
অথচ এই জুন মাসেই বিদেশি বিনিয়োগের সাথে সম্পর্কিত দুটো ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। একটি হল মাগুড়ছড়া, অন্যটি টেংরাটিলা। দুটোই গ্যাসক্ষেত্র, সিলেট অঞ্চলের দুটো গ্যাস ব্লক-এর অন্তর্ভূক্ত। মাগুড়ছড়ায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয় ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন; আর ছাতক-টেংরাটিলায় হয় ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি আবার ২৪ জুন। দুই গ্যাসক্ষেত্রের এই তিনটি বিস্ফোরণে বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত প্রমাণিত সর্বমোট গ্যাস মজুতের মধ্যে প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ধ্বংস হয়ে গেছে। এই পরিমাণ গ্যাস, এখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতি বছর যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার হয় তার প্রায় দ্বিগুণ। তার মানে এই গ্যাস দিয়ে বর্তমানের চাইতে দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতো প্রায় ২ বছর। অন্যান্য ক্ষতি তো আছেই। এতবড় ক্ষতি যারা করলো তাদের জন্য কী শাস্তি? না, কোন শাস্তি নাই, জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের কথা নাই। বরং তাদের জন্য আছে আরও বাড়তি সুযোগ সুবিধা।
দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষের প্রয়োজনে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ না নিয়ে ‘সম্পদের অভাব’-এর যুক্তিতে দেশের খনিজ সম্পদ কীভাবে বিদেশি বহুজাতিক তেল কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হয়েছে তা গ্যাস নিয়ে যেসব গোপন চুক্তি হয়েছে, জালিয়াতি হয়েছে, কয়লা নিয়ে এখনও যা চেষ্টা হচ্ছে সেগুলো খেয়াল করলে যেকোন বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষই বুঝবেন। উন্নয়নের নাম দিয়েই দেশি বিদেশি লুম্পেন বিশ্বজোট এসব সম্পদ করায়ত্ত করেছে এবং আরও করবার চেষ্টা করছে। এরশাদ সরকারের আমলে হরিপুর ও কাফকো চুক্তি দিয়ে এর শুরু। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সাল থেকে পিএসসি চুক্তি শুরু হয়, সর্বশেষ চুক্তি হয় ২০১১ সালে। এই সময়ে পাঁচটি সরকার এসেছে। দেশ শাসনে বিভিন্ন দল ও দুটি জোট এযাবত দায়িত্ব ‘পালন’ করেছে। এদের নিজেদের মধ্যে নানা বিবাদ মানুষকে অতীষ্ট করে তোলে। কিন্তু সম্পদ ধ্বংস, সম্পদ পাচার, কমিশনভোগী তৎপরতা, বিভিন্ন কোম্পানির লবিষ্টের ভূমিকা পালনে এদের মধ্যে গভীর ঐকমত্য দেখা যায় বরাবর। মাগুড়ছড়া ও ছাতক গ্যাসফিল্ডের টেংরাটিলায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও অপরাধীদের রক্ষার ব্যাপারেও এই ঐকমত্যের পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়।
১৯৯৩ সালে সরকার আটটি গ্যাসব্লক আন্তর্জাতিক বিডিং এ দেয় এবং ১৯৯৫ সালের ১১ জানুয়ারি এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি, ১২, ১৩, ১৪ নম্বর ব্লক প্রদান করে মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টালকে। তাদের প্রথম গ্যাসকূপ খনন শুরুর ১২ দিন পর, ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন রাতে (১৫ জুন) মার্কিন তেল কোম্পানি অক্সিডেন্টাল এর ইজারাভুক্ত সিলেটের ১৪ নম্বর ব্লকের সুরমা বেসিনে মাগুড়ছড়ায় ভয়ংকর এক বিস্ফোরণ হয়। গ্যাসক্ষেত্র থেকে এই আগুন ৩০০ ফুট পর্যন্ত উপরে উঠে যায়। আশেপাশের বনজঙ্গল, কৃষিজমি, চাবাগান ও গ্রামও তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে কোন তদন্ত কমিটি গঠনের আগেই তৎকালীন জ্বালানীমন্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘোষণা দেন, ‘ক্ষতির পরিমাণ খুবই সামান্য’।
জনমতের চাপে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তার কার্যক্রম নিয়ে নানা টালবাহানা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দিলেও তা ‘হারিয়ে যায়’। ১৯৯৯ সালে অক্সিডেন্টাল, আফগানিস্তান ও মায়ানমারে অনেক অপকর্মের জন্য অভিযুক্ত ইউনোকাল নামে আরেকটি মার্কিন কোম্পানির সাথে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ব্যবসা কার্যক্রম বিনিময় করে চলে যায়। মাগুড়ছড়ার ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোন ফয়সালা না করেই সরকার তাদের এই বিনিময় সম্পাদন করতে দেয়। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা তখন জানান যে, তাদের অজান্তেই এটি ঘটেছে! ইউনোকাল সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে বলে ধরে নেয়া হলেও তাদের কাছ থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায়ের কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সমালোচনার মুখে জ্বালানী বিষয়ক সংসদীয় কমিটি এবিষয়ে শুনানীর জন্য ইউনোকাল প্রধানকে ডাকলেও ‘উপরের’ হস্তক্ষেপে তা থেমে যায়।
২০০১ সালে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের ফাইল কেবিনেট থেকে সেই ‘হারিয়ে যাওয়া’ রিপোর্ট উদ্ধার হয়। এই তদন্ত কমিটির রক্ষণশীল হিসাবেও বিস্ফোরণে মাগুড়চড়ায় গ্যাসসম্পদের ক্ষতি হয় প্রায় ২৪৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এছাড়া পরিবেশ এর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা দীর্ঘমেয়াদের এবং পুরোটা পরিমাপযোগ্য নয়। ২০০২ সালে পেট্রোবাংলা মাগুড়ছড়ার গ্যাস ধ্বংসের জন্য ৬৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে ইউনোকালকে চিঠি দেয়। ইউনোকাল ১৯৯৮ সালে সম্পাদিত একটি সম্পূরক চুক্তির দোহাই দিয়ে বলে যে, ক্ষতিপূরণ আর দিতে তারা বাধ্য নয়। সেই চুক্তির একটি ধারা (৩ নং অনুচ্ছেদ) এরকম: ‘বিরূপ প্রচার হতে পারে বিধায় অক্সিডেন্টাল ব্যতীত এই চুক্তি বা চুক্তি সম্পর্কিত কোনো কিছুই জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না।’ এর মধ্যে ইউনোকাল-এর ব্যবসা গ্রহণ করে আরেকটি মার্কিন কোম্পানি শেভ্রন। সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ নিয়ে আর কোন কথা হয়নি। বরং তাদের এখন আরও অনেক বাড়তি সুবিধা ও কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে। উইকিলিকস জানায়, মার্কিন দূতাবাস নিয়মিত এই কোম্পানির পক্ষে তদ্বির করে থাকে।
২০০২ এর পর আবারো সম্পদের অভাব দেখিয়ে, একটি জীবন্ত গ্যাসক্ষেত্রকে প্রান্তিক ঘোষণা করে, জালিয়াতি করে, ছাতক গ্যাস ফিল্ড অখ্যাত কোম্পানি কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর হাতে তুলে দেয়া হয়। সম্পদ বেদখল ছাড়াও ফলাফল হয় আরেকটি বিপর্যয়, টেংরাটিলা বিস্ফোরণ। টেংরাটিলা নামে পরিচিত ছাতক গ্যাসফিল্ডে ২০০৫ সালে জানুয়ারি ও জুন মাসে পরপর দুটো বিস্ফোরণ ঘটে। এই বিস্ফোরণের পরও, আগেরজনের মতো, তৎকালীন জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে বলেন, ‘ক্ষতির পরিমাণ তেমন বেশি নয়’। প্রথম থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো যে, কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার জন্যই এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তারপরও প্রথমে তৎকালীন জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী এবং পরে তৎকালীন জ্বালানী উপদেষ্টার নেতৃত্বে সরকারি বিভিন্ন বিভাগ থেকে নাইকোর অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার জন্য একের পর এক অপচেষ্টা দেখা যায়। দুজনই প্রথম থেকেই এই ক্ষয়ক্ষতি খুবই সামান্য বলে দেখানোর চেষ্টা করেন। পরে তাদের দ্বারা প্রভাবিত কমিটি এবং ‘বিশেষজ্ঞ’ও একই কাজে শরীক হয়। সরকারি দিক থেকে এরকম ভূমিকার কারণে দেশের বিশিষ্ট ভূবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদরা ‘নাগরিক কমিশন’ গঠন করে ঐ অঞ্চল সফর করেন এবং ক্ষয়ক্ষতির কারণ ও পরিমাণ নির্ণয় করেন। তাঁদের হিসাব সরকারি কমিটি বা মন্ত্রী/উপদেষ্টার ভাষ্য থেকে অনেক গুণ বেশি।
টেংরাটিলার পুরো গ্যাসক্ষেত্র নষ্ট হলে পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন মতে তার পরিমাণ ৩০৫.৫ বিসিএফ, বাপেক্স-নাইকো’র রিপোর্ট মতে ২৬৮ বিসিএফ, কোন কোন বিশেষজ্ঞের তথ্য মতে এর পরিমাণ ১.৯ টিসিএফ। তদুপরি বিস্ফোরনের কারণে একদিকে যেমন অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাসের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে তেমন আরও বহুক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরো হিসাব করতে গেলে পানি, কৃষি জীব বৈচিত্রের বিনষ্টের ক্ষতি, রোগ-বালাই এর কারণে ক্ষতি, বাস্তচ্যুতির ক্ষতি, জলাভূমির ক্ষতি, গ্রীনহাউস গ্যাসের কারণে ক্ষতি, থার্মাল দূষণের কারণে ক্ষতি, বংশপরম্পরা ক্ষতি, বিস্ফোরণের ফলে মাটির তলদেশে ফাটল সৃষ্টির কারণে গঠনগত পরিবর্তন হেতু ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ক্ষতি, যে গ্যাস নষ্ট হয়েছে সে গ্যাস অর্থনীতির বিভিন্ন খাত-ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ব্যবহারে যে গুনিতক ফল পাওয়া যেত তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষতি ইত্যাদিও বিবেচনা করতে হবে। সরকারি ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে যেখানে গ্যাসসম্পদের ক্ষতিই ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে সেখানে এসব ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় আনা তাদের চিন্তার মধ্যেও নেই।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি সেসময় টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণে আপাত নিরূপনযোগ্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ যা নির্ধারন করেছিল তা ছিল ২০০৫ সালের দামস্তরে ৬,৩৫০ থেকে ১৫,২০০ কোটি টাকা। এই ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে প্রতি একক গ্যাসের দাম ধরা হয়েছিল ২.৫ মার্কিন ডলার এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাসের পরিমাণ ধরা হয়েছে উপরের স্তরের ১১৫-৩১০ বিসিএফ গ্যাস। ছাতক (পশ্চিম) গ্যাসফিল্ডের সমস্ত গ্যাস-কাঠামো এবং মজুদ গ্যাস আর সেই সঙ্গে সহায়-সম্পদ, বিষয়-আসয় এবং পরিবেশের ক্ষয়-ক্ষতিকে বিবেচনায় আনলে এ পরিমাণ নিঃসন্দেহে এর থেকেও বেশি দাঁড়াবে। উক্ত গ্যাস সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে উৎপাদনশীল কাজে লাগালে ২০-২৫ গুণ বেশি মূল্য সৃষ্টি সম্ভব ছিল, বিস্ফোরণে সে সম্ভাবনারও বিনষ্টি ঘটলো।
পরিবেশ অধিদপ্তর, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল, পেট্রোবাংলা এবং অর্থনীতি সমিতির হিসাব ও সমীক্ষা পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি, মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলায় গ্যাস সম্পদের ক্ষতির হিসাবে, গ্যাসের আন্তর্জাতিক দামের গত ১০ বছরের গড় ধরে, মার্কিন ও কানাডার কোম্পানির কাছে আমাদের পাওনা দাঁড়ায় কমপক্ষে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। একদিকে যখন আমরা সম্পদের অভাবের আহাজারি শুনি তখন এই পরিমাণ পাওনা আদায়ে সরকারের কোন কথাই শোনা যায় না। বাজেটেও কখনোই তার কোন উল্লেখ থাকে না। অথচ এই পাওনা টাকা চলতি অর্থবছরের মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সমান, আগামী অর্থবছরে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার ৫ গুণ, যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ ও অনুদানের হিসাব করা হচ্ছে তার ৩ বছরের সমান। আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র বিপর্যয়সহ পরিবেশ ক্ষতি বিবেচনা করি, যদি মানবিক ক্ষতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনা করি, যদি এই গ্যাস সম্পদের অভাবে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের হিসাব যোগ করি তাহলে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে।

বাংলাদেশে কোন জাতীয় প্রতিষ্ঠানে কয়েক কোটি টাকা লোকসান হলে বিশ্বব্যাং সহ যেসব বিশ্বসংস্থা সেগুলো বন্ধ করবার চাপ দিতে থাকে, হাজার হাজার কোটি টাকা ধ্বংস করলেও অক্সিডেন্টাল/ইউনোকাল/শেভ্রণ বা নাইকো নিয়ে তাদের কখনোই কোন কথা শোনা যায়নি কিংবা ক্ষতিপূরণ আদায় নিয়েও তাদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সরকার যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কাছে সবসময় দয়াদাক্ষিণ্য অনুগ্রহ প্রার্থণা করতেই অভ্যস্ত। কিন্তু তাদের কাছে আমাদের পাওনা দাবি সরকারের মধ্য থেকে কখনো উচ্চারিত হয় না। এই সম্পদ জনগণের, তাই এর প্রতিটি বিন্দুর হিসাব নিকাশ চাইবার অধিকার জনগণের আছে। যেসব বিদেশি কোম্পানি এই সম্পদ ধ্বংস করেছে, আর তাদের যারা রক্ষা করতে চেষ্টা করেছে, করছে, করবে- জনগণ তাদের কাছ থেকেই কড়ায় গন্ডায় সব হিসাব আদায় করবে, এরকম পরিস্থিতি নিশ্চয়ই একদিন সৃষ্টি হবে।
১২ জুন ২০১২

আনু মুহাম্মদ
: শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব ।

রবিবার, ২০ মে, ২০১২

হিলারী ও মেরুদন্ড সমস্যা



বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার ‘গরীব’ দেশগুলো রফতানি করে খাদ্য বস্ত্রসহ এমন ভোগ্যপণ্য, যা দিয়ে মানুষ বাঁচে। আর যুক্তরাষ্ট্রসহ ‘ধনী’ দেশগুলো রফতানি করে অস্ত্র, যা দিয়ে মানুষ মরে।
সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন বাংলাদেশে এসেছিলেন নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন ও বিনিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে কথা বলতে। সংবাদপত্র, টিভি টকশো, বিবরণী, ‘আড্ডা’ সর্বত্র এটাকে বাংলাদেশের জন্য ‘বিরাট সুযোগ’ ‘বিরাট সম্ভাবনা’ হিসাবেই দেখানো হয়েছে। হিলারী ক্লিনটনের সফরের আসল বৃত্তান্ত নিয়ে কমই জানা যাবে। বোঝার জন্য কোন সুযোগও রাখা হয়নি। সরকার, প্রধান বিরোধী দল, মিডিয়া, সুশীল সমাজ সর্বত্র এত মুগ্ধতা, গদগদভাব আর সম্মতি ছিল যে কোথাও কোন ভিন্নমত, যথাযথ তথ্য উপস্থাপন কিংবা প্রশ্নেরও সুযোগ ছিল না। মাঝে মধ্যে মনে হয়, আমাদের ভদ্রলোকদের চরিত্রে কি মেরুদন্ডের কোন স্থায়ী সমস্যা আছে? নইলে দেশি বিদেশি ক্ষমতাবানদের সামনে সবসময় এরকম প্রভুতোষণ চেহারা দেখা যায় কেন? তোষণ, তোষামোদ, হাত কচলানো, নতজানু , নতমস্তক, হাত পা ধরা, নুইয়ে পড়া, নিজেদের ছোট করে ধন্য হওয়া এগুলোর এত উপদ্রব কেনো? এই স্বভাব যাদের তাদের সম্পদ আছে, ক্ষমতা আছে। বোঝা যায়, আরও দরকার। এরাই যেহেতু সমাজের নানাক্ষেত্রে ক্ষমতাবান, সেহেতু এদের সমষ্টিগত উচ্ছাসে আচ্ছন্নতা তৈরি হয় চারিদিকে। আগ্রাসনকে ভালবাসা, যুদ্ধকে শান্তি, ধ্বংসকে তখন উন্নয়ন মনে হতে থাকে তখন।
সেজন্য শুধু হিলারী কেন, একের পর এক সফররত কোনো মার্কিনী কর্মকর্তার সামনেই বাংলাদেশের জন্য বহু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়না। মিডিয়ার আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকার কারণে সমাজের মধ্যেও এই জরুরী প্রশ্নগুলো যায় না। অনেক চুক্তি, গোপন সমঝোতা দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে, যেগুলো জনগণের আড়ালেই থাকে। হিলারীও তাই বাংলাদেশে মার্কিন সেনাবাহিনীর অবস্থান, বাংলাদেশ-মার্কিন গোপন সামরিক চুক্তি, মার্কিন-ভারত চুক্তি, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি করা ও সমুদ্রের গ্যাস ব্লক মার্কিন কোম্পানিকে দেবার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূতের চাপ, শেভ্রনের পরিবেশ বিধ্বংসী তৎপরতা সত্ত্বেও তার জন্য মার্কিন অব্যাহত তদ্বির, সারা বিশ্বে মার্কিনী সন্ত্রাস, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক, মার্কিন কোম্পানির কাছে আমাদের পাওনা ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি কোনো প্রশ্নেরই মুখোমুখি হননি।
এটা কেন হয়? কীভাবে হয়? এই বিষয় নিয়ে নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদ তাঁর সাম্প্রতিক লেখায় বিশ্লেষণ করেছেন। এই লেখায় ক্রিস হেজেস-এর এম্পায়ার অব ইল্যুশন (২০০৯) থেকে যে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তার সারকথা হল, এই অবনত সংস্কৃতি এমন একটি মায়াময় বিশ্ব তৈরি করে যে, তা মানুষের সামনে বিশ্বের প্রাকৃতিক অবক্ষয়, বিশ্ব পুঁজিবাদের নিষ্ঠুরতা, ক্রমবর্ধমান তেল সংকট, বিশ্ব অর্থখাতের ধ্বস, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ সবকিছুকে তুচ্ছ কিংবা অদৃশ্য করে দেয়। …. এই মায়ার সংস্কৃতি আমাদের মায়া থেকে সত্যকে আলাদা করবার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। আমরা শিশুর মতো পুতুল চালক, যারা নিজেরাই পুতুল, তাদের দ্বারা পরিচালিত হই। টেলিভিশন, প্রচার, বাজারজাত করণের কৌশল, ফটোগ্রাফ, খবর, সাজানো প্রশ্নোত্তর সবকিছু একের পর এক আমাদের বোধবুদ্ধি ভোঁতা করে দিয়ে এক মায়ার জগতে সম্মতি নিয়ে হাজির হতে প্ররোচিত করে। ( ‘ইয়েস’,‘ওয়াও’, ইয়ুথ আড্ডা উইথ হিলারী, নিউ এইজ, ১৪ মে ২০১২)
আমাদের ‘কর্তা’দের কথায় মনে হয়, বাংলাদেশের পণ্য যে যুক্তরাষ্ট্র আমদানি করে সেটা তাদের প্রয়োজন নয়, তাদের দয়া। তারা আমদানি করলেও দয়া, রফতানি করলেও দয়া। তারা বিনিয়োগ করলেও সেটা অনুগ্রহের বিষয়। অথচ তারা ঋণ অনুদান নামে যে তহবিল বরাদ্দ করে তার ৪ গুণ বেশি অর্থ বাংলাদেশ শুল্ক হিসেবে প্রদান করে যুক্তরাষ্ট্রকে। মার্কিন তেল কোম্পানি শেভ্রন যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে তার কয়েকগুণ ইতিমধ্যে দেশে প্রেরণ করেছে। গত ৬ বছরে তাদের কাছ থেকে গ্যাস কিনতে আমাদের খরচ হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা, যে পরিমাণ গ্যাস আমাদের জাতীয় সংস্থা ২ হাজার কোটি টাকায় সম্পাদন করতে পারতো। তাদেরই আরেকটি কোম্পানি অক্সিডেন্টাল মাগুড়ছড়ায় যে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে তা পুরো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ১ বছরে যে গ্যাস ব্যবহার হয় তার সমান। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এই গ্যাস কিনতে বাংলাদেশের যে অর্থ প্রয়োজন তা তাদের ১০ বছরের বার্ষিক ঋণ অনুদানের সমান।
২০১০-১১ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করেছে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার পণ্য, এর মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই গার্মেন্টস। অন্যদিকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে মাত্র ৬৭ কোটি মার্কিন ডলার। দুনিয়াজুড়ে অস্ত্র রফতানিতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অবস্থান। বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার ‘গরীব’ দেশগুলো রফতানি করে খাদ্য বস্ত্রসহ এমন ভোগ্যপণ্য, যা দিয়ে মানুষ বাঁচে। আর যুক্তরাষ্ট্রসহ ‘ধনী’ দেশগুলো রফতানি করে অস্ত্র, যা দিয়ে মানুষ মরে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ যা রফতানি করে তার ওপর শুল্ক দিতে হয় শতকরা ১৫.৩ ভাগ। অথচ তাদের গড় শুল্কহার শতকরা ২ ভাগেরও কম। ফ্রান্স, বৃটেন ও সৌদী আরব থেকে পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক শতকরা ১ ভাগেরও কম। অতএব বাংলাদেশ একটি বড় আকারের বৈষম্যের শিকার। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পণ্য আমদানি বিষয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধি ও সাধারণ চর্চার সাথে এটা অসঙ্গতিপূর্ণ। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, কিংবা বিদ্যমান বৈষম্যের অবসান কোনো দয়াদাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়, বাংলাদেশ এটা নিশ্চয়ই দাবি করতে পারে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস দিয়ে তাদের রাষ্ট্র, ব্যবসায়ীরা এই দেশের মালিকদের থেকে বেশি মুনাফা করে। শুল্কমুক্ত না হলেও শুধু যদি শুল্ক শতকরা ৫০ ভাগ কমে তাহলেও তথাকথিত বিদেশি সাহায্য নামের তহবিলের তুলনায় তার পরিমাণ বেশি হবে।
হিলারীর এই সফর বাংলাদেশের নিরাপত্তা, শান্তি আর সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রক্রিয়া শক্তিশালী করবে বলে আমরা বারবার শুনছি। এত ভক্তি এত সালাম এত নিবেদনের মধ্যে খুব সরল কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করাই কঠিন। মার্কিন প্রশাসন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার যে বর্ণনা দেয়, তাতে কোন রাষ্ট্রশক্তি ছাড়াই কতিপয় সন্ত্র্রাসী যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুটি ভবন টুইন টাওয়ার গুড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল, এমনকি পেন্টাগনেও হামলা পরিচালনা করেছিল। বিশ্বের সবচাইতে দক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাদের ঠেকাতে পারেনি, সেজন্য সিআইএ, এফবিআই বা সম্পর্কিত কোন সংস্থার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। এনিয়ে কোনো তদন্তকাজও ঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। তাদের বর্ণনা যদি সত্যিও ধরি তাহলে প্রশ্ন হল, যে রাষ্ট্র কতিপয় ব্যক্তি সন্ত্রাসীর হাত থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অক্ষম, তার কোন কুলকিনারাও করতে পারে না সে কী করে অন্যের নিরাপত্তা দেবে? নিরাপত্তার নাম দিয়ে বঙ্গোপসাগর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বহুদিনের। ঐ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বেসামরিক লোকজনের ঘন ঘন সফর থেকে যে কেউ এটা উপলব্ধি করবেন। কিন্তু কাকে কার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র? যারা আমাদের জন্য হুমকি হতে পারে তাদের সাথেই তো যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ মহড়া। ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কথা আমাদের কখনোই ভুলে যাওয়া উচিৎ হবে না। যে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ মিথ্যাচার করে ইরাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করলো, তাদের ওপর আমরা বাংলাদেশের নিরাপত্তার ভার ছাড়বো?
প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ সারাবিশ্বের মানুষ, সহযোগী সারাবিশ্বের তাবৎ সন্ত্রাসীরা। এই তথ্য তাই সবার সবসময় মনে রাখা উচিৎ যে, বর্তমান বিশ্বে সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। মার্কিন গবেষক উইলিয়াম ব্লুম যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রামাণ্য বিবরণ দিয়ে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাদের রেকর্ডে এশিয়া আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে নির্বাচিত সরকার উচ্ছেদ, নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা, সামরিক অভ্যুত্থান, গণহত্যা, অন্তর্ঘাতসহ সব বর্বরতা অন্তভর্’ক্ত। বিশ্বে বর্তমানে সামরিক খাতে বার্ষিক ব্যয় বা হত্যা ধ্বংসের প্রধান অংশই যুক্তরাষ্ট্রের ভাগে, একাই শতকরা প্রায় ৬০ ভাগের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই একটি সামরিক দুর্গ, একটি ক্যান্টনমেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের বহু মানুষ এখন অনাহারে, কর্মহীন, চিকিৎসার সুযোগ বঞ্চিত। অথচ মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ ইরাক যুদ্ধব্যয়ের হিসাব করে দেখিয়েছেন, প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে ইরাকে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে, যার সুবিধাভোগী অস্ত্র ও তেল ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও আমলা। কৃত্রিম বানানো শত্রুর ভয়ংকর চেহারা তৈরি করে আতংকিত আবহাওয়া তৈরি করা হয় মার্কিন জনগণের মধ্যে। এবং তাদের শিক্ষা স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার অর্থ বিনা বাধায় যুদ্ধখাতে স্থানান্তরিত হয়। সেখানেই মার্কিন ক্ষমতাবানদের মুনাফার পাহাড়।
যে কাজ সরাসরি হত্যা, দখল, ধ্বংস আর কিছু নয়- তাই মানুষের সামনে উপস্থিত করা হয় ‘সার্বভৌমত্ব’ ‘মুক্তি’ ‘নিরাপত্তা’ ‘গণতন্ত্র’ ‘স্বাধীনতা’ রক্ষা, কিংবা ‘সন্ত্রাস’ দমনের উপায় হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রমের জন্য বরাবর ‘নিরাপত্তার হুমকি’ হিসেবে কোন না কোন দেশ বা শক্তিকে দেখিয়েছে। ক্ষুদ্র কিউবা বা নিকারাগুয়াকেও আগ্রাসী শক্তি হিসেবে উপস্থিত করা হয়েছে। প্রচারণার কল্যাণে এসব দেশও, কিংবা বহু দূরের ভিয়েতনাম বা কোরিয়া বা ইরান মার্কিন জনগণকে আতংকিত করতে পেরেছে। এখন আতংক আরও বিস্তৃত হয় কোন গুহায় বসবাসরত কল্পিত কিংবা নিজেদের নির্মিত ‘ইসলামী সন্ত্রাসী’ দিয়ে। অনেক সরল তথ্যকেও এসব প্রচারণা আড়াল করে ফেলে।
২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তান সরাসরি মার্কিনী নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর হাতে। এই সময়কালে জাতিসংঘের ড্রাগ অফিসের তথ্য অনুযায়ী আফগানিস্তানে হিরোইন উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। এর আগে তালিবান, তারও আগে মুজাহিদীনরাও মার্কিনী মদদেই ক্ষমতায় বসেছিল। মার্কিনী বাহিনী মুজাহেদীনদের মদদ দিয়েছিল এমন সরকারের বিরুদ্ধে – যারা ভূমি সংস্কার করতে উদ্যোগ নিয়েছিল, নারীর শিক্ষা ও চিকিৎসার পথে সব বাধা দূর করতে উদ্যোগ নিয়েছিল। এখন মার্কিন কর্তৃত্বাধীন আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমে হিরোইনের শতকরা ৭০ ভাগ যোগান যায়, যেখানে আফগানিস্তানের শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ দারিদ্রসীমার অনেক নীচে বাস করেন। আর এই মাদক সরববরাহের রাস্তাও পরিষ্কার রাখা হয়েছে মার্কিনী নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রীয় এশীয় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ দিয়ে, এর মধ্যে অন্যতম তাজিকিস্তান। এই দেশের মানুষদের এখন প্রধান কর্মসংস্থান এই মাদকদ্রব্য চালান কাজ। করপোরেট বিশ্বের মুখপাত্র ইকনমিস্ট পত্রিকা জানাচ্ছে, ‘তাজিকিস্তানের জিডিপির শতকরা ৩০-৫০ ভাগ এই মাদকদ্রব্য চালান ‘শিল্প’ থেকেই আসে।’ পত্রিকাটি আরও জানাচ্ছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ জোট ন্যাটো তাজিকিস্তানের এই তৎপরতায় বাধা দিতে আগ্রহী নয়। বরং সেখানকার মার্কিন সাহায্যে পরিচালিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্মকর্তারাই এই কাজে নেতৃত্ব দেয়, তা তাদের অনুমোদনেই ঘটে। ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্র এই অবস্থার পরিবর্তন চায় না। কেন? তাদের যুক্তি, কারণ তা করতে গেলে আফগানিস্তানে তাদের যুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাজিকিস্তানে তাদের ভারসাম্য নষ্ট হবে। সেই দেশে দারিদ্র এখন ভয়াবহ, অনেক স্থানে এখন ২৪ ঘন্টায় ২ ঘন্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। (ইকনমিষ্ট, এপ্রিল ২১-২৭, ২০১২) এই হল যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস দমন, শান্তি ও নিরাপত্তায় সহযোগিতার ধরন।
হিলারীর সফরের পর ‘একুইজিশন এ্যান্ড ক্রস সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক চুক্তি সম্পাদনের জন্য চাপও বাড়ছে বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা যায় (নিউ এজ, ১৩ মে, ২০১২)। সামরিক বাহিনীর আধুনিকীকরণের নামে বিপুল অস্ত্রক্রয়েরও চাপ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্যুরো অব পলিটিক্যাল-মিলিটারী এফেয়ার্স’ এর সহকারী সেক্রেটারী এন্ড্রু জে শেপিরো ঢাকা সফর করেন গত ১৯ এপ্রিল। ২৪ এপ্রিল ওয়াশিংটনে তিনি এক বক্তৃতায় বলেন, ‘এই আধুনিকীকরণ কর্মসূচি আমাদের নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ দেবে…আমাদের বাড়তি অস্ত্রশস্ত্র সহযোগীদের কাছে পৌঁছে দেয়া যাবে।’
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং খনিজ সম্পদের বিপুল আধার বাংলাদেশের ভূমি ও সমুদ্রে কর্তৃত্ব বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনকে বিশেষভাবে সক্রিয় করে তুলেছে। আর এই সক্রিয়তা দেখে আমাদের দেশের অনেক নির্বোধ কিংবা অনুগত কর্তাব্যক্তি বা সুশীল ‘বিশেষজ্ঞরা’ মুগ্ধ। এতেই নাকি বাংলাদেশের বিশাল সম্ভাবনা উন্মুক্ত হবে! যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর ভর করে, আর সেই দেশ যদি তাদের ভৃত্য হিসেবে সার্ভিস দিতে থাকে তার কী পরিণতি হয় তা দেখার জন্য আছে পাকিস্তান নামক তাবেদার রাষ্ট্রটি।

মেরুদন্ডের সমস্যাওয়ালা লোকেরা এই দেশের নানা ক্ষেত্রে মাথা হয়ে থাকায় জাতির মাথা বারবার হেঁট হচ্ছে, বিপদ ও বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে নানা মাত্রায়। এদের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত না করতে পারলে আমাদের কোন উদ্ধার নাই। এটাই ভরসার কথা যে, এরাই বাংলাদেশ নয়। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করেই মানুষ যুদ্ধ করে বাংলাদেশ এনেছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে মার্কিন প্রশাসনের প্রবল চাপ ছিল বাংলাদেশ থেকে গ্যাস রফতানি করা আর চট্টগ্রাম বন্দর তাদের এক জালিয়াত কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া। জনগণ মেরুদন্ড নিয়েই এর সবই প্রতিরোধ করেছেন। দেশের পানি, আবাদী জমি ও মানুষের সর্বনাশ করে ফুলবাড়ী উন্মুক্ত খনি করতে চেয়েছিল এরা। মানুষ জীবন দিয়ে তা ঠেকিয়েছেন। এটা হয়নি, হবে না। মেরুদন্ডহীনদের তোষামোদী সত্ত্বেও কনোকো ফিলিপসের সাথেও জনগণের মোকাবিলা চলছে। বঙ্গোপসাগরের সম্পদ লুট ও পাচার এদেশের মানুষ কোনভাবেই হতে দেবে না। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দানবীয় আগ্রাসনের মুখেও, তাকে আমাদের প্রত্যাখ্যান করবার সাহস দেখানোর তাই যথেষ্ট কারণ আছে।
১৮ মে ২০১২
আনু মুহাম্মদ: শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব ।

মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১১

সরকারের ভুল নীতি বা দুর্নীতির খেসারত জনগণ কেন দেবে?

র্থমন্ত্রী যেদিন বললেন এই বছর আর তেলের দাম বাড়ানো হবে না তার একদিন পরই কেরোসিন, ডিজেল ও অকটেন প্রতিটির দাম ৫ টাকা করে বাড়ানো হলো। সরকারের সিদ্ধান্ত তাহলে কোথায় হয়, কে নেয়? মন্ত্রীদের কাজ কি তবে মনোরঞ্জন করা? নাকি জনগণকে একের পর এক মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করা?

তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে সরকার যে যুক্তি দিয়েছে তা হলো তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এর পেছনে ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে তা বহন করা সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। গত কয়েক মাসে ভর্তুকি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে এটা ঠিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ভর্তুকি এই পরিমাণে বাড়ল কেন? আন্তজাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায়ই বাড়ে, আবার কমেও। ২০০৮ সালের তুলনায় তেলের দাম এখনো কম। তাহলে দাম বৃদ্ধির কারণে ভর্তুকি বেড়েছে এটা ঠিক নয়। ভর্তুকি বেড়েছে তেলের আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে। গত কয়েক মাসে এই আমদানি গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৬০ ভাগ। কেন? সরকার কি জনগণের প্রয়োজনে তেল আমদানি করতে গিয়ে এই নাকানি চুবানি খাচ্ছে? না।

এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ভাড়াভিত্তিক (রেন্টাল) বিদ্যুৎকেন্দ্র যেগুলো তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেরকম অনেকগুলো কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় চুক্তি করবার কারণে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনিতেই অনির্ভরযোগ্য, ব্যয়বহুল এবং জরুরি অবস্থায় ১/২ বছর চলার মতো। বাংলাদেশের বিদ্যুৎসহ জ্বালানি খাত বিপর্যস্ত করবার জন্য এগুলোই যথেষ্ট। বিদ্যুৎ সংকট মেটানোর জন্য সরকারের কাছে কি বিকল্প ছিল না? ছিল। আমরা বহুবার সরকারের কাছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কয়লা খাতে কম ব্যয়বহুল, টেকসই, জনস্বার্থমুখী পদক্ষেপগুলো নির্দেশ করে সুপারিশ করেছি।

সরকার এগুলোতে কান দেয়নি। কারণ তার মনোযোগ জনগণের প্রয়োজন মেটানো বা তার স্বার্থরক্ষা নয়। তার প্রধান আগ্রহ দেশী- বিদেশী কিছু গোষ্ঠীকে ব্যবসা দেওয়া, বহুজাতিক কোম্পানিকে আশ্বস্ত করা, বিশ্বব্যাংক আইএমএফকে সন্তুষ্ট করা, কমিশনভোগীদের দাপট মেনে নেওয়া। কিছু গোষ্ঠীকে বিদ্যুতের ব্যবসা দিতে গিয়ে তেলের আমদানি ও ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। গ্যাস খাতের বড় অংশ বিদেশীদের হাতে থাকায় উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে গিয়ে সেখানেও ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে। রাষ্ট্রের ঋণগ্রস্ততা বেড়েছে, ঋণের চাপ অর্থনীতিকে কাবু করছে। আবার ভর্তুকির চাপ কমাতে গিয়ে বারবার তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। আর এই উপর্যুপরি বৃদ্ধি ঘটছে বাজেট প্রক্রিয়া, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে এমনকি রাতের অাঁধারে। আইএমএফ বিশ্বব্যাংক, দেশী-বিদেশী সুবিধাভোগী আর তাদের কমিশনভোগীরা খুশি। কিন্তু এসব দাম বৃদ্ধি ব্যক্তি, পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিকে ভয়াবহ সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, সরকারের ভুল নীতি বা দুর্নীতির খেসারত কেন জনগণ দেবে?

সরকার বললে হবে না যে, এ বিষয়ে তাদের কেউ সতর্ক করেনি কিংবা কোনো বিকল্প ছিল না। সরকার যখন প্রথম এসব তৎপরতা শুরু করেছে তখনই আমরা এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানাতে এবং বিকল্প নির্দেশ করে বক্তব্য দিয়েছিলাম। ১১ মে ২০১০ তারিখে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্যের অংশবিশেষ এখানে তাই খুবই প্রাসঙ্গিক :

‘বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের দিকে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার জাতীয় স্বার্থ বিপন্ন করে অতীতের সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় সর্বনাশা নানা পদক্ষেপে হাত দিচ্ছে। জ্বালানিবিষয়ক সংসদীয় কমিটি বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় একের পর এক বিনা দরপত্রে অত্যধিক ব্যয়বহুল রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের সরকারি কর্যক্রম সর্মথন করেছেন। যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ‘বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটে মানুষ বিদ্যুৎ চায়, নিয়ম বা দামের বিষয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।’ কিন্তু আসলে কি বর্তমান এই দরপত্রবিহীন উচ্চদামের বিদ্যুৎ প্রকল্প জনগণকে নিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে? জনগণের বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের জন্য কী আর কোনো বিকল্প নেই? জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে এর আগেও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকার সেদিকে নজর না দিয়ে ব্যয়বহুল জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে পুরো জ্বালানি খাত বিদেশী কোম্পানির কর্তৃত্বে দিয়ে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তাকে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। নিচের ছকে সরকারি অপতৎপরতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে জনস্বার্থে জরুরি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কয়লা নিয়ে সরকারি তৎপরতা এবং জনস্বার্থে জরুরি প্রস্তাবনা



১.লক্ষ্য : বিদ্যুৎ সংকটের আশু সমাধান/স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ
সরকারি উদ্যোগ মালিকানাসম্ভাব্য ফলাফল
রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট।
পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট।
প্রধানত বিদেশীউৎপাদন : ৭০০ মেগাওয়াট।সময়কাল : ৩-৯ মাস।
বিদ্যুৎ একক প্রতি খরচ : ৮-১৪ টাকা।
উৎপাদন ও সময়কাল : অনিশ্চিত ও অনির্ভরযোগ্য।
বাড়তি খরচ : প্রতি বছর ৫০০০-৭০০০ কোটি টাকা।
জাতীয় কমিটির প্রস্তাব
ওাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর নবায়ন/মেরামত।
ক্যাপাসিটর স্থাপন।

এনার্জি সেভিং বাল্ব।
আইএমসি

জাতীয়
উৎপাদন বৃদ্ধি : ১৭০০ মেগাওয়াট।
সময়কাল : ৩-৯ মাস।

বিদ্যুৎ একক প্রতি খরচ : গড়পড়তা ১.৬০।
প্রয়োজনীয় খরচ : ১২০০-১৫০০ কোটি টাকা।
২.লক্ষ্য : গ্যাস সংকট সমাধানে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি উদ্যোগ
সরকারি উদ্যোগমালিকানাসম্ভাব্য ফলাফল
স্থলভাগে বিদেশি কোম্পানির হাতে, উৎপাদন বণ্টন চুক্তির মাধ্যমে, আরও ব্লক প্রদান।

বিদেশি





গ্যাস একক প্রতি খরচ : ২৫০-৩০০ টাকা।প্রয়োজন মতো গ্যাসপ্রাপ্তি : অনিশ্চিত। সারাদেশ জিম্মি।
প্রতি বছর ভর্তুকি : বর্তমানে ২০০০ কোটি টাকা। চুক্তি হলে তা আরো বৃদ্ধি পাবে।
জাতীয় কমিটির প্রস্তাব
দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ব্লকগুলোতে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি।
অচল গ্যাকূপগুলো সচল করা।
বিদেশী কোম্পানিগুলোর ফেলে রাখা ব্লকগুলো অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাধ্য করা।
জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিল করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় সেগুলো ফেরত এনে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করা।
জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ।
জাতীয়জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদন খরচ একক প্রতি : ২৫-৩০ টাকা।
প্রয়োজন মতো গ্যাসপ্রাপ্তি।
জনগণের সম্পদের ওপর জনগণের  কর্তৃত্ব নিশ্চিত।
দেড় মাসের মধ্যে বর্তমান গ্যাস ঘাটতি দূর করা সম্ভব।
৩.লক্ষ্য : মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানে কয়লা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার
সরকারি উদ্যোগমালিকানাসম্ভাব্য ফলাফল
উন্মুক্ত খনির মাধ্যমে কয়লা উত্তোলন।বিদেশিকয়লা সম্পদের ওপর মালিকানা হারানো।শতকরা ৮০ ভাগ কয়লা পাচার।
আবাদি জমি, ভূ-গর্ভস্থ/ভূ-উপরিস্থ অমূল্য পানি সম্পদ ধ্বংস, অগণিত মানুষ উচ্ছেদ।
খাদ্য নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তা বিনষ্ট।
জাতীয় কমিটির প্রস্তাব
জাতীয় সংস্থা গঠন ও জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের মাধ্যমে শতভাগ জাতীয় মালিকানায় নিরাপদ প্রযুক্তিতে কয়লা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার।জাতীয়মাটি, পানি ও মানুষ অক্ষত।শতকরা ১০০ ভাগ কয়লা সম্পদ দেশের স্বার্থে ব্যবহার।
প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নে সম্পদের ব্যবহার।