Noam Chomaski লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Noam Chomaski লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ জুলাই, ২০১৬

তবুও আমরা আশাবাদী হতে পারি : নোয়াম চমস্কি

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান ভাষাতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, সমাজচিন্তক, রাজনৈতিককর্মী নোয়াম চমস্কি সম্প্রতি পুঁজিবাদী দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি নিয়ে জেমস রেসনিককে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এতে তিনি তার বেড়ে ওঠা, অতি ধনীদের নানা সুযোগ লুটে আরো ধনী হওয়ার নীলনকশা, গরিবদের আরো গরিব হওয়ার কাহিনী তুলে ধরেছেন। বিশ্বায়নের কথা বলে কিভাবে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তিনি তা সাবলীলভাবে বর্ণনা করেছেন। তবে এর পরও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। 

প্রশ্ন : সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বের বদলে যাওয়াটা আপনি কিভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং কোন বিষয়টা (কিংবা কে) আপনার চিন্তাভাবনা পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?
চমস্কি : ভালো বা খারাপ যা-ই হোক না কেন, আমি জীবনজুড়ে প্রায় একই থেকে গেছি। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলের শিশু ছিলাম, তখনই ১০ বছর বয়সীর দৃষ্টিকোণ থেকে স্কুলের সংবাদপত্রে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং বিশ্বের জন্য হুমকি নিয়ে লেখা লিখেছি। তখন থেকেই চালিয়ে যাচ্ছি। তরুণ কিশোর বয়সে আমি সব ধরনের চরমপন্থী রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলাম, নৈরাজ্যবাদীদের লাইব্রেরি আর অফিসে আঠার মতো লেগে থাকতাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার গ্রিসে ব্রিটিশ আক্রমণ এবং পরমাণু বোমার তাণ্ডব ইত্যাদি ঘটনা নিয়ে প্রবল উদ্বেগ ছিল আমার মধ্যে।
লোকজনকে সংগ্রাম করতে দেখাকে উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী বিবেচনা করতাম। বিশেষ করে যখন দেখতাম, দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ তাদের সীমিত সম্পদ নিয়ে সত্যিকারের কিছু অর্জনের জন্য লড়াই করছে। তাদের অনেকে সত্যি খুবই উদ্দীপনাময়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দক্ষিণ কলম্বিয়ার প্রত্যন্ত এলাকার খুবই গরিব একটি গ্রামের মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছে তাদের পানি সরবরাহ ও পরিবেশকে ধ্বংসকারী কানাডীয় স্বর্ণখনির কাজ বন্ধ করার চেষ্টায়; সেই সাথে আধা সামরিক বাহিনী এবং সামরিক সহিংসতা ইত্যাদিও প্রতিরোধ করছে। বিশ্বজুড়ে দেখতে পাওয়া এ ধরনের ঘটনা খুবই উদ্দীপনাময়।

প্রশ্ন : আপনার নতুন ডকুমেন্টারি ‘রিকুইম ফর দি আমেরিকান ড্রিম’-এ (আমেরিকান স্বপ্নের জন্য প্রার্থনা) আপনি উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় করের হার কমানো এবং কম দক্ষতাপূর্ণ চাকরির আউটসোর্সিং বৈষম্য ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বলা হয়ে থাকে, এই উভয় বৈশিষ্ট্যই বিশ্বায়নের চাপের ফসল। তা-ই যদি হয়ে থাকে, তবে দ্রুত বিশ্বায়নের এই যুগটা সাধারণভাবে শ্রমিকদের জন্য খারাপ?
চমস্কি : তারা এটাকে বিশ্বায়ন হিসেবে অভিহিত করতে পারে; কিন্তু তা করা হবে একটা ভুল। বিশ্বায়ন সব ধরনের হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলছি, কেউ যদি মুক্তবাজারে বিশ্বাস করে, তবে তাকে আন্তরিকভাবে অ্যাডাম স্মিথকে গ্রহণ করতে হবে। অ্যাডাম স্মিথ উল্লেখ করেছেন, মুক্তবাজারের মৌলিক বিষয় হবে শ্রমিকের অবাধ প্রবাহ। আমাদের এটা নেই।
শ্রমিক চলাচলে আমাদের কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এর অর্থ শুধু এটা নয় যে, কর্মজীবী মানুষ কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে পারছে না, এর অর্থ এটাও যে আইনজীবী কিংবা সিইওদের মতো সুবিধাভোগী পেশাজীবীরা বিদেশ থেকে প্রতিযোগিতা প্রতিরোধ করার জন্য সংরক্ষণবাদী বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে।
বিদেশ থেকে অনেক আইনজীবী ও চিকিৎসক, তারা অত্যন্ত দক্ষ এবং অতি সহজেই মার্কিন পেশাজীবী মান পূরণ করতে পারে, আসতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পেশাজীবীরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে তাদের আসতে দিচ্ছে না।
বিশ্বায়ন এমনভাবে করা যেতে পারত, যাতে তা সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণকর হয় কিংবা একে এমনভাবে করা যেতে পারত যাতে এটা উরুগুয়ে রাউন্ড, ডব্লিউটিও এগ্রিমেন্ট, নাফটা, বর্তমানের আটলান্টিক অ্যান্ড প্যাসিফিক এগ্রিমেন্টসহ (এগুলোর কোনোটিই এমনকি বাণিজ্য চুক্তিও নয়, বরং সুস্পষ্টভাবে বিনিয়োগকারীদের অধিকারবিষয়ক চুক্তি) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি কাজ করতে পারে। এগুলো বড় বড় ওষুধ কোম্পানি, মিডিয়া হাউজ ইত্যাদির মতো প্রধান প্রধান করপোরেশনের জন্য খুবই উচ্চমাত্রার সুরক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকারের মাধ্যমে খুবই উচ্চমাত্রার প্রতিবন্ধকতা। এসব ব্যবস্থা করপোরেশনগুলোকে তাদের মুনাফা ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা দেখা দিলে জনগণের কাছে নয়, সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এটা হলো বিশেষ ধরনের বিশ্বায়ন, যা প্রণয়নকারীদের স্বার্থে প্রণীত। প্রণয়নকারীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে ঘনিষ্ঠ থেকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করছে। অর্থাৎ তারা হলো বিশ্বায়নের সুফলভোগী।

প্রশ্ন : আপনি জিআই বিল অব রাইটসের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন, দেখিয়েছেন, ১৯৫০ সালে উচ্চশিক্ষা মোটামুটিভাবে বিনামূল্যে হওয়ায় কিভাবে তা ছিল জনগণের জন্য অনেক বেশি কল্যাণকর। নিউ ডিলের (মহামন্দার পর জনগণের দুর্ভোগ কমানোর জন্য প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেয়া পদক্ষেপ) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সার্বিক কল্যাণকর প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হুমকি সৃষ্টি হয় ১৯৮০-এর দশকে। এসব প্রতিষ্ঠান কিভাবে এবং কেন আক্রান্ত হলো?
চমস্কি : ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে প্রবৃদ্ধির হার ছিল উচ্চমাত্রার, কোনো আর্থিক সঙ্কট ছিল না। কারণ নিউ ডিল বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল, তুলনামূলক সাম্যবাদী প্রবৃদ্ধি ছিল। ফলে একেবারে প্রতিটি প্রবৃদ্ধি মোটামুটিভাবে ছিল একই মাত্রায়। এ কারণেই একে বলা হয় স্বর্ণযুগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নিক্সনের যুক্তরাষ্ট্র ডলারের স্বর্ণে রূপান্তর বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক অর্থ-ব্যবস্থার পতন ঘটলে ব্রেটন উডস পদ্ধতি ভেঙে পড়ে। পরিণতিতে সব ধরনের নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়।
এগুলোর একটি ছিল মূলধন প্রবাহের দ্রুত বাড়ানো এবং ফটকাবাজারি হঠাৎ করে ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়া। অন্য দিকে, অর্থনৈতিক পুঁজিবাদের জন্য তেমন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এটা। উৎপাদনশীলতার লক্ষ্যে মুনাফার হার কমানোর জন্য এ নিয়ে অনেক কিছু করার আছে। কারণ এটা পুঁজির মালিকদের বোঝায় যে, সত্যিকারের উৎপাদনের চেয়ে অর্থনৈতিক কৌশল খাটানোর পথে চলা অনেক বেশি মুনাফামূলক।
এর সাথে আসে আরো অনেক বিকল্প, যেগুলো একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার জের, যা উৎপাদনকে এমন এক স্থানে সরিয়ে নেয়া হয় যেখানে মজুরি অনেক কম, যেখানকার পরিবেশগত মান নিয়ে চিন্তা করার দরকার হয় না। ব্যবসায় নীতিমালা বদলানোর চেষ্টা শুরু করেছে, তা নয়। তারা সেই ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকেও নীতি বদলানোর চেষ্টা করেছিল। ১৯৩০-এর দশকে শ্রমজীবী এবং সাধারণ মানুষের অর্জন দেখে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আঁতকে উঠেছিল। ’৩০-এর দশকের ‘বিজনেস প্রেসে’ পড়লে তা দেখতে পাবেন। তাতে তারা হুমকি নিয়ে কথা বলছে, যেটাকে তারা গণমানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থান হিসেবে অভিহিত করছে। তারা বলছিল, গণমানুষের শক্তি আমেরিকান উদ্যোক্তার চাহিদার জন্য হুমকি।
ব্যবসায়-বাণিজ্য সবসময়ই শ্রেণীযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত। অনেক সময় তারা ভালো করে, অনেক সময় খারাপ করে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পর থেকে শ্রমিক ও নিউ ডিলের বিরুদ্ধে প্রবল আক্রমণ হতে থাকে, সেইসাথে ১৯৭০-এর দশকে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সুযোগ-সুবিধার সৃষ্টি হয় এবং শ্রেণিযুদ্ধ বেড়ে যায়। আপনি কার্টারের আমলের শেষ দিকেই বিষয়টা লক্ষ করতে পারেন এবং রিগ্যান বা থ্যাচারের আমলে বেশ প্রবলভাবে তা জাঁকিয়ে বসে। ওই সময় নব্যউদারবাদী নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তৃতীয় বিশ্বসহ দুর্বলতর সমাজগুলোয় তা বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী সমাজগুলোয় এটা এক দিকে জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে তুলনামূলক স্থবিরতা চাপিয়ে দেয়, অন্য দিকে, অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ তাদের সম্পদ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলে। অবশ্য এটা স্রেফ অব্যাহত শ্রেণিযুদ্ধেরই বিষয়, যা এখনো চলছে। জনগণের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না হলেই কেবল শ্রেণিযুদ্ধ সফল হতে পারে।
জনপ্রিয় গণসংগঠনগুলো আক্রান্ত হয়, টুকরো টুকরো করে দেয়া হয় এবং শ্রম আন্দোলন মারাত্মক আক্রমণের মুখে পড়ে। ব্যক্তিগত সম্পদ কেন্দ্রীভূত করার একটি বিষয় হলো এই যে, ভয়ঙ্কর চক্রের সূচনা করে : ব্যক্তিগত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয় এবং তা তার সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতাও ধারণ করে।
রাজনৈতিক ক্ষমতা আইন প্রবর্তন করে, যা ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়িয়ে দেয়। এভাবে বৃত্ত আবর্তিত হতে থাকে। এটা সহজাত বিধান কিংবা অর্থনৈতিক সূত্র নয়। এটা সমাজের দুষ্ট শ্রেণীর ক্ষমতা এবং সহজাত সামাজিক ও রাজনৈতিকব্যবস্থা নিয়ে চলমান সঙ্ঘাতের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। বর্তমানে যা ঘটছে, তা জনগণের সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চাৎমুখিতার সময়। অতীতেও এমনটা ঘটেছে এবং তা থেকে মুক্তিও সম্ভব। অনেকভাবেই তা হতে দেখতে পাবেন। এর একটি গণতন্ত্রের পতন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভালোভাবেই কমবেশি মধ্যপন্থী দলগুলোর বড় ধরনের পতন দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প ও স্যান্ডার্সের মতো গণভিত্তিক শক্তির মারাত্মক আক্রমণের মুখে পড়েছে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলই। জনগণের প্রায় একই ধরনের স্বার্থ ও উদ্বেগ রয়েছে এবং এসব ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে সেটা হবে একটি বড় গণশক্তি। ইউরোপেও একই বিষয় দেখা যায়। সাম্প্রতিক অস্ট্রিয়ার নির্বাচনে দেশটি পরিচালনাকারী দু’টি ঐতিহ্যমণ্ডিত দল নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েছে। বেছে নেয়ার বিষয় ছিল নব্য-ফ্যাসিবাদী পার্টি ও গ্রিন পার্টির একটিকে।

প্রশ্ন : আপনি মার্টিন গিলেন্সের সমীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে যে প্রায় ৭০ শতাংশ লোক সরকারি নীতিতে কোনোভাবেই প্রভাব বিস্তার করে না। ক্ষমতাহীনদের মধ্যে থাকা এই বিচ্ছিন্নতা ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রাইমারির সময় কেমন প্রভাব ফেলেছে?
চমস্কি : খুবই সরাসরি। আর তা-ই ছিল ট্রাম্প ও স্যান্ডার্সের প্রতি সমর্থনের ভিত্তি। অনেক ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের প্রতিক্রিয়ার ফসল। ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া এবং ভোট দিতে বিরত থাকার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। সাম্প্রতিক বছরে অনেক সমীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়েছে। কয়েক বছর আগে ওয়াল্টার ডিন বার্নহ্যাম যুক্তরাষ্ট্রের অ-ভোটারদের আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সমীক্ষা চালিয়ে দেখতে পেয়েছেন, তারা ইউরোপে যারা সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক ও শ্রমিকভিত্তিক দলগুলোকে ভোট দেয়, তাদের মতোই। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের দল না থাকায় তারা স্রেফ ভোট দেয় না। অনেক দিন ধরেই এমনটা ছিল। তবে এখন তা প্রকটভাবে ফুটে উঠছে এ কারণে যে, জনগণের বিশাল অংশ নব্যউদার কর্মসূচির ধারার কারণে সক্রিয় নয়। তারা হয় ১৯৩০-এর দশকের মতো জঙ্গি শ্রম আন্দোলনের মতো করে সঙ্ঘবদ্ধ হবে, কার্যকর হয়ে কিছু একটা করবে কিংবা ক্রুুদ্ধ বা হতাশ, জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবাদী, ধ্বংসকারী ইত্যাদি কিছুতে পরিণত হবে।

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রে অব্যাহতভাবে নানা ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে গণতন্ত্রকে হুমকিগ্রস্ত করছে। আপনি কি এই প্রবণতা ইতিবাচকভাবে রুখে দেয়ার কোনো ধারার উত্থান দেখতে পাচ্ছেন? আশাবাদী হওয়ার মতো কি কিছু আছে?
চমস্কি : আমরা খুবই আশাবাদী হতে পারি। এ ধরনের কিছু আগেও হয়েছে। এবারের সমস্যা থেকেও উত্তরণ ঘটবে। ১৯২০-এর দশকটি ছিল অনেক দিক থেকে এমনই; কিন্তু ১৯৩০-এর দশকটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভিন্ন। অনেক কিছুই বদলে গিয়েছিল। বর্তমানে অনেক শক্তিই আছে এবং তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। স্যান্ডার্সের প্রতি বিপুল সমর্থন আশাব্যঞ্জক। এটা অনেক স্বপ্ন দেখায়, তবে তা নির্ভর করছে, কিভাবে তা বিকশিত হবে। একই কথা প্রযোজ্য ইংল্যান্ডের করবিন এবং স্পেনের পোডেমসের বেলায়। সমস্যাবলির অনেক প্রতিক্রিয়া আছে, সেগুলো থেকে উত্তরণ সহজ নয়। তবে আমি মনে করি, সম্ভাবনার অনেক অবকাশ রয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

কে শাসন করছে বিশ্ব?


সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্পর্কে আমেরিকার ভয়ানক দুশ্চিন্তা নিয়ে নোয়াম চমস্কি এখনো তার স্বভাবসিদ্ধ ভাষাশৈলীর লেখালেখি অব্যাহত রেখেছেন। এ ব্যাপারে চমস্কির উদ্বেগও কিছু কমেনি। তার নতুন বই ‘কে শাসন করছে পৃথিবী?’ -এ স্বভাবতই সেটা অনুপস্থিত থাকতে পারে না। তিনি এ বইতে অন্য সব বিষয়ের সাথে ভিয়েতনাম যুগের কথা বলাটা আবশ্যকীয় মনে করেছেন। এর একটাই সংজ্ঞা হয়- ‘ক্ষমতার আগ্রাসন’। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় অতি সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া তার এই লেখাটি কয়েক সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে নয়া দিগন্তে। এর অনুবাদ করেছেন সুমাইয়া হাবিবা

চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার ক্ষমতা?
যখন আমরা কাউকে প্রশ্ন করি, এ বিশ্ব কে শাসন করবে? তখন সাধারণত আমরা যে পথে আমাদের চিন্তা বা দৃষ্টিকে প্রসারিত করি তা হলো, আমরা এমন কারো কথা ভাবি যে, বৈশ্বিক আন্তঃসম্পর্কে প্রধান ভূমিকায় থাকে বা কোনো মহাশক্তিধর কেউ। তাদের সিদ্ধান্তগুলো আমরা মেনে নেই। তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ি। এটা দূষনীয় কিছু নয়। তবে সাথে এটাও খুব ভালোভাবে মাথায় রাখা উচিত যে, এ ধরনের অতি বাস্তব চিন্তাভাবনাগুলোই মারাত্মকভাবে আমাদের বিপথগামী করতে পারে।

আবশ্যিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত জটিলতা থাকবেই এবং যখন সাধারণ মানুষ বারবার প্রান্তিকতায় পৌঁছে যায়, তখন সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পছন্দ ও সিদ্ধান্তগুলো, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। এটা সব রাষ্ট্রের জন্য তো বটেই, এমনকি অধিক গণতন্ত্র চর্চাকারী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা কখনোই মানবজাতির নেতৃত্বকে বাদ রেখে বাস্তবিক উপলব্ধি অর্জন করতে পারব না। বিখ্যাত স্কটিশ দার্শনিক, রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে আমাদের ইংল্যান্ডের ব্যবসায়ীরা ও উৎপাদকেরাই হচ্ছে সত্যিকারের বহুজাতিক ব্যবসায়ীর গ্রুপ। তাদের নানা ধরনের প্রচুর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং একইভাবে রয়েছে খুচরা প্রতিষ্ঠানের বিশাল সাম্রাজ্য।’ এ সময় স্মিথকে অনুসরণ করাও বুদ্ধিমানের কাজ। অর্থাৎ ‘নিজের বেলা ষোলআনা, পরের বেলায় এক আনাও নয়’- এ জাতীয় জঘন্য নীতি পরিহার করে মানবতার স্রষ্টার পথে উৎসর্গিত পন্থায় অংশগ্রহণ করা। অন্যথায়, এ মতবাদ তীব্রতর, তিক্ত ও অবিরাম শ্রেণিযুদ্ধের কারণ হবে যা প্রায়ই একপক্ষীয় এবং নিজের দেশেই শুধু নয়, বিশ্বের বেশির ভাগ জনগণেরই ক্ষতির কারণ হবে।

সমকালীন বিশ্ব রীতিতে, হর্তাকর্তা প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে। এটা শুধু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং দেশগুলোর জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও একই অবস্থা। এর ওপর নির্ভর করে তারা তাদের ক্ষমতা রক্ষা এবং নানাভাবে বিশাল আকারের অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রস্তুত করতে চায়। যখন আমরা মানবজাতির নেতৃত্বের ভূমিকা স্বীকার করে নেবো, তখন আমাদের এমন রাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে সময়ের দাবিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন- ‘পরিবর্তনশীল শান্তিপ্রয়াসী অংশীদারিত্ব’ (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ)। এটা এক ধরনের উদ্যোক্তা অধিকার চুক্তি, যা ‘মুক্তবাণিজ্য চুক্তি’ (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট) নামে অপপ্রচারণা ও অপব্যাখ্যার শিকার। তারা এ বিষয়ে গোপনে আলোচনারত, শ’খানেক করপোরেট আইনজীবী ও লবিস্টের একটি অংশের বিবরণ দিচ্ছেন। উদ্দেশ্য, স্টালিন স্টাইলে খুব দ্রুততায় প্রক্রিয়া পরিচালন রীতি অঙ্কন করা, যাতে এ সংক্রান্ত আলোচনার পথ আটকে দেয়া যায় এবং শুধু হ্যাঁ অথবা না অপশনই থাকে। অঙ্কনকারীরা যে এটা হুট করে করছে তা কিন্তু নয়। তারা খুব ভালোভাবে এবং নিয়মিতই তাদের কাজ করে যাচ্ছে। জনগণ একটি সুনির্দিষ্ট সম্ভাব্য পরিণতির প্রতীক্ষা করছে।

দ্বিতীয় পরাশক্তি
দমনমূলক ও কারিগরি গণতন্ত্রের কয়েকবার হাতবদলের পর নব্য উদারনীতিবাদী চিন্তাধারা অতীত প্রজন্মকে সম্পদ ও ক্ষমতায় মনোনিবেশ করাতে পেরেছিল। কিন্তু তারা বিরোধী পক্ষকেও ভালোভাবে সক্রিয় করেছে। যেমন, ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে ‘সুন্দরভাবে’ করেছে শুধু বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্র করা ছাড়া। যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশার চেয়ে অধিক উন্নতি করেছে, তারাও এখন দোদুল্যমান। কারণ, মন্দার সময় রাজনৈতিক নীতিনিষ্ঠায় অত্যন্ত কঠোর প্রভাব পড়ছে। এমনকি, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের অর্থনীতিবিদদের দ্বারাও নিন্দিত হচ্ছে (আইএমএফও রাজনৈতিক চরিত্র না নিলে তা অব্যাহত থাকবে।) আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্রাসেলস আমলাতন্ত্রে বদলে যাওয়ায় গণতন্ত্র আজ দলিতমথিত। তাছাড়া, উত্তরের ব্যাংকগুলো তাদের সভার কার্যবিবরণীর ওপর ভালোভাবেই ছায়া বিস্তার করেছে।

মূলধারার দলগুলো ক্রমাগত তাদের সদস্য হারাচ্ছে; ডান থেকে বামে, বাম থেকে ডানে। প্যারিস ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোপানোভার নির্বাহী পরিচালক ফ্রাঙ্কুই ল্যাফঁ সাধারণের মোহমুক্তির বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে বলেছেন, রাগান্বিত অক্ষমতা হলো জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের (যারা অন্তত গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ব্যাপারে নীতিবান) থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলোকে স্থানান্তর করে মার্কেটে ছড়িয়ে বৃহদাকারে রূপদানের প্রকৃত শক্তি। এটা হুবহু নব্য উদারনীতিবাদী মতবাদের সারকথা। এর সাথে অনেক সামঞ্জস্যশীল প্রক্রিয়াই চাপা পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; কিছুটা একই রকম কারণে। এ বিষয়গুলো নিরূপণ এবং এ নিয়ে উদ্বেগ শুধু আমেরিকার জন্যই নয়, বিশ্বের জন্যও জরুরি। এর কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা।

নব্য উদারনীতিবাদী মতবাদের আকস্মিক হামলায় বিরোধী পক্ষের উত্থান আরেকটি মানসম্মত রেওয়াজ প্রচলনের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির দিকে আলোকপাত করছে। এটি জনবিচ্ছিন্নভাবে ছিল। যখন হামেশাই অংশগ্রহণকারীদের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য দর্শকের ভূমিকাও মেনে নিতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন এটা উদার গণতান্ত্রিক মতবাদে আরোপিত হলো। এ রকম অবাধ্যতা সব সময়ই প্রভাবশালী শ্রেণীর জন্য উদ্বেগের বিষয়। আমেরিকার ইতিহাসেই দেখা যায়, জর্জ ওয়াশিংটন সাধারণ মানুষদের যারা জঙ্গিগোষ্ঠী গঠন করে তাদের স্পষ্টতই অতীব নোংরা ও কদর্য মানুষ হিসেবে গণ্য করতেন এবং তাদের এভাবে গণ্য করতে আদেশও দিতেন। এসব নিম্ন শ্রেণীর মানুষের অর্ধতব্য নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

হিংসাত্মক রাজনীতিতে ‘আমেরিকান বিদ্রোহ’ আমেরিকা থেকে সমকালের আফগানিস্তান, ইরাকে স্থানান্তরিত হয়েছে। উইলিয়াম পল্ক জেনারেল ওয়াশিংটন সম্পর্কে বলেন, তিনি যেসব সৈন্যকে ঘৃণা করতেন তাদের ব্যাপারে অভ্যুত্থান নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত ছিলেন। যে বিপ্লবকে হারানোর খুব কাছে তিনি চলে এসেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি যথার্থভাবেই সেটা করেছেন। তিনি ফ্রান্সে ব্যাপক হস্তক্ষেপ করেননি এবং বিপ্লব রক্ষা করতে পেরেছিলেন; যতক্ষণ পর্যন্ত না গেরিলারাই জয় লাভ করে, আমরা আজকে যাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলছি। তখন ওয়াশিংটনের ব্রিটিশ ধাঁচের আর্মি একের পর এক পরাজিত হচ্ছিল এবং আদতে যুদ্ধটিই হারতে বসেছিল।

রেকর্ড বলে, সফল বিদ্রোহের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো জয়ের পর একবার যখন জনসমর্থন মিলিয়ে যায় তখন নেতৃত্ব এই ‘নোংরা ও কদর্য’ মানুষদেরই দমন করে। এ নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধে জয় লাভ করেছে গেরিলা কৌশল এবং গেরিলা সন্ত্রাস দিয়েই। এই ভয়ে এটা করা হয় যে, তারা সম্ভবত বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অভিজাত শ্রেণী সব সময় এই নিম্ন শ্রেণীর জনতাকে নানাভাবে নানারূপে অবজ্ঞা করে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই অবজ্ঞার আরেকটি রূপ হলো, আনুগত্য ও নিষ্ক্রিয়তার (মধ্যমপন্থী গণতন্ত্র) ডাক দেয়া।

মাঝে মাঝে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনতার মতামতকে অনুসরণ করে থাকে, কেন্দ্রের ক্ষমতার প্রচণ্ডতা আরো অধিক পরিমাণে বাড়িয়ে তুলতে। এমনই একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটেছিল ২০০৩ সালে। যখন বুশ প্রশাসন তুরস্ককে আহ্বান করেছিল ইরাকে আগ্রাসনে অংশ নিতে। ৯৫ শতাংশ তুর্কি সেদিন এর বিরোধিতা করেছিল; যার ফলে এর বাস্তবায়ন হয়নি। ওয়াশিংটনকে বিস্মিত এবং ভয়কে উপেক্ষা করে, তুর্কি সরকার জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিকেই গ্রহণ করেছে। তুরস্ক এহেন দায়িত্বশীল আচরণ থেকে সরে আসায় অব্যাহত নিন্দায় জর্জরিত হতে থাকে। প্রতিরক্ষা উপসচিব পল উলফইজ যিনি গণমাধ্যম কর্তৃক প্রশাসনের আদর্শবাদী প্রধান আখ্যায়িত, তিনি তুর্কি সেনাবাহিনীকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন সরকারের এমন অন্যায় অনায্য সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার জন্য। এবং ক্ষমাও চাইতে বলেন। এ রকম ও অটলতার অন্যান্য সহস্র উদাহরণ আমাদের গণতন্ত্রের জন্য অলীক কল্পনা। গণতন্ত্র উন্নয়নে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের একাগ্রতা নিয়ে গুণকীর্তন জোরালোভাবেই হয়েছে। মাঝে মাঝে সমালোচনাও করা হয়েছে দেশের বাইরে ক্ষমতা প্রয়োগ করে অন্যদের ওপর তার গণতান্ত্রিক আকুলতা চাপিয়ে দেয়ার একপেশে চিন্তার জন্য।

তুর্কি জনগণ একা ছিল না, পুরো বিশ্বই মনেপ্রাণে ইন্দো-আমেরিকান আগ্রাসনের বিপক্ষে ছিল। আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের যুদ্ধের পরিকল্পনার সমর্থন সব জায়গায়ই বড়জোর ১০ শতাংশ ছিল মাত্র। যুদ্ধবিরোধী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বেই প্রতিবাদে জ্বলে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্ভবত প্রথমবার প্রথম পাতায় সাংবাদিক প্যাট্রিক টেইলর রিপোর্ট করেন, বর্তমানে সম্ভবত দু’টি পরাশক্তিই পৃথিবীতে বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের সাধারণ জনতার মতামত।

অভূতপূর্ব বিক্ষোভ হয় যুক্তরাষ্ট্রে। আগ্রাসনবিরোধী মিটিং-মিছিল হলো। এর শুরুটা হয়েছিল দশকের শুরুতে ইন্দোচীনে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে। যদিও অনেক দেরিতে, তবুও বিরোধিতার মাত্রাটা শেষমেশ বলিষ্ঠ ও প্রভাবশালী হতে পেরেছে। ১৯৬৭ সাল, যখন থেকে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হতে পেরেছে, সামরিক ঐতিহাসিক ও ভিয়েতনাম বিশেষজ্ঞ বার্নার্ড ফল সাবধান করেন, ভিয়েতনাম একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সত্তা... এটি বিলুপ্তির হুমকির মুখে... যদি গ্রামাঞ্চলগুলো আক্ষরিকভাবেই মৃতুবরণ করে দৈত্যাকার সমরাস্ত্রের আঘাতে, এই আকারের একটি অঞ্চল চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে।”

কিন্তু যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন পরিণত হয়েছিল একটি শক্তিতে, যাকে অবহেলা করা যায় না। নচেৎ এটাকে এড়িয়ে যাওয়াই হতো যখন রোনাল্ড রিগ্যান এই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েই প্রেসিডেন্ট অফিসে এসেছিলেন যে, সেন্ট্রাল আমেরিকার ওপর আক্রমণ শুরু করবেন। তার প্রশাসন সেরকম পদক্ষেপের খুব কাছাকাছিই ছিল, বিশ বছর আগে জন এফ কেনেডি দক্ষিণ ভিয়েতনামে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাদের পিছু হটতে হয় জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে। ষাটের দশকের শুরুতে এর অভাব ছিল। সে আক্রমণ খুবই ভয়ানক ছিল। ভুক্তভোগীরা এখন অবধি সারিয়ে উঠতে চেষ্টা করে যাচ্ছে সে ক্ষতি। তবে দক্ষিণ ভিয়েতনামে ও ইন্দোচীনে যা ঘটেছিল, সেসব সঙ্ঘাতের অনেক পরে সেখানে দ্বিতীয় পরাশক্তি যে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করেছিল, তা ছিল আরো মন্দ।

এটা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, ইরাক আক্রমণের ব্যাপক বিরোধিতার কোনো প্রভাব ছিল না। সে ক্ষেত্রে আমাকে ভুল মনে হয়। আবার, এই আক্রমণ বেশ ভয়ঙ্কর ছিল এবং এর পরবর্তী ফলাফল ছিল চূড়ান্তভাবে কিম্ভূতকিমাকার। তা সত্ত্বেও এটা এখন পর্যন্ত অত্যধিক মন্দই বিবেচিত হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, প্রতিরক্ষা সচিব ডোনাল্ড রামসফেল্ড এবং বুশ প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা কখনোই এমনটি ভাবতে পারেননি যে, এ ধরনের প্রতিরোধ আসবে। প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং প্রেসিডেন্ট জনসন ৪০ বছর আগে তা গ্রহণ করেছিলেন কোনো রকম বাধা ছাড়াই।

চাপের মধ্যে পশ্চিমা ক্ষমতা
এখানে একটু বেশি বলতে হয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভূমিকা রাখার সময় যখন আমরা একটি মানসম্মত নীতি অবলম্বন করব, তখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের প্রভাবকগুলোকে পাশে সরিয়ে রাখতে হবে। তবে সামান্য নয় এমন আদেশগুলোকে সাথে নিয়ে। নাহলে চলুন, এমন একটি নীতি অবলম্বন করি, যা অন্তত বাস্তবতার একদম কাছাকাছি। তারপর আসা যাক এ প্রশ্নে; বিশ্ব কে শাসন করবে এবং এ সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো কী? যেমন চীনের পরাশক্তি হিসেবে উত্থান এবং এটা আবার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক মেরুকরণ। পূর্ব ইউরোপের ফুটন্ত নতুন স্নায়ুযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধ, আমেরিকার কর্তৃত্ব ও পতন, এবং একই পরিসীমায় ব্যপ্ত বিষয়গুলো।

পশ্চিমা শক্তিগুলো ২০১৬ আসার আগে থেকেই যে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রধান আন্তর্জাতিক কলামিস্ট গিডিয়ান র‌্যাচম্যান সে ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী অবকাঠামোর সংক্ষিপ্তসার তৈরি করেছেন। বৈশ্বিক মেরুকরণে যে পশ্চিমা ছবি অঙ্কিত, তার পুনর্বিবেচনা শুরু করেছেন। বলেছেন, ‘ স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকার সেনাবাহিনীর দুর্বার ক্ষমতা মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে।’ এটি তিনটি স্বতন্ত্র কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ১. পূর্ব এশিয়া; যেখানে মার্কিন নেভি প্রশান্ত মহাসাগরকে একটি মার্কিন লেক হিসেবে পরিচালনা করে। ২. ইউরোপ; যেখানে ন্যাটো মানেই যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে ন্যাটোর সামরিক ব্যয়ের তিন-চতুর্থাংশই একটি সদস্য রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার্থে ব্যয় হয়। ৩. মধ্যপ্রাচ্য। যেখানে দৈত্যাকার মার্কিন নৌ ও বিমানঘাঁটি রয়েছে সেখানে বিদ্যমান বন্ধুদের আশ্বস্ত করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখাতে।

আজকের মেরুকরণের সমস্যা হচ্ছে, র‌্যাচম্যানের মতে, এই নিরাপত্তা নির্দেশ তিনটি কারণে হুমকির সম্মুখীন। প্রথমত, ইউক্রেন ও সিরিয়ায় রাশিয়ার হস্তক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, চীন তার নিকটবর্তী সাগরে অগ্রসর হচ্ছে। যা স্পষ্টতঃই আমেরিকার হ্রদের পানি নিয়ে প্রতিযোগিতা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মূলগত প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের কি উচিত অন্যান্য প্রধান শক্তিকে মেনে নেয়া, যা তার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের আশপাশে এক রকম প্রভাব বলয় তৈরি করবে? র‌্যাচম্যানের মতে, সাধারণ জ্ঞান বলে- বিশ্বে অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকিরণের কারণে এটাই উচিত। এখানে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বকে দেখার অনেক রকম দৃষ্টিভঙ্গি আছে। কিন্তু আমাদের এ তিনটি বিষয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটিকে অবশ্যই নিতে হবে।

আজকের চ্যালেঞ্জ র্পূব এশিয়া
আমেরিকান হ্রদের শুরুর সাথে সাথে কিছু লোকের ভ্রু কুঁচকে গেছে, যখন গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন বের হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমেরিকান বোমারু বিমান দক্ষিণ চীন সাগরে রুটিন মিশনে ওড়ার সময় বেখেয়ালে চীনের কৃত্রিম দ্বীপের দুই নটিক্যাল মাইলের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে একে ঘিরে বিবাদ সৃষ্টিকর ইস্যু সৃষ্টি হয়েছে, যা তাদের ক্রুদ্ধ করেছে।’ যারা সত্তর বছর ধরে পরমাণু অস্ত্রের যুগে তাদের ক্রুর রেকর্ডের জন্য সুপরিচিত তাদের সম্পর্কে সবাই অবগত যে, এটি প্রায়ই হতে থাকা একটি ছোট্ট ঘটনা মাত্র, যা আরেকটি আখেরি পরমাণু যুদ্ধের জ্বলে ওঠার জন্য ভয়ানক রকম নিকটবর্তী হচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চায়নার উত্তেজনামূলক ও দখলদারিমূলক আচরণের যে একজন সমর্থক নয় সে-ও লক্ষ করল, এই আকস্মিক ঘটনায় চায়নিজ পরমাণু সক্ষম বোমারু বিমানকে জড়ানো হয়নি ক্যারিবিয়ানে। অথবা ক্যালিফোর্নিয়ান উপকূল বন্ধ করেনি। অথচ চায়নার একটি চায়নিজ হ্রদ প্রতিষ্ঠা করতে কোনো ভণ্ডামির প্রয়োজন নেই।

বিশ্বের জন্য সৌভাগ্যবশত, চায়নিজ নেতারা এটা বুঝতে পেরেছেন তাদের দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য রুট অপ্রতিরোধ্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দ্বারা শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে আছে জাপান থেকে মালাক্কা প্রণালী ছাড়িয়েও পুরো এলাকা। একইভাবে চীন পশ্চিমা বিশ্বে বিশাল বিনিয়োগ বিস্তৃত করতে অগ্রসর হয়েছে এবং সতর্কভাবে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার অংশ হিসেবে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বাণিজ্য উন্নয়নমূলক অবকাঠামো যাতে মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া অন্তর্ভুক্ত এবং খুব তাড়াতাড়িই ইন্ডিয়া-পাকিস্তানও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। সাথে ইরানও পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দেবে। আবার বলা হয়েছে ওইসব অঞ্চলের সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে। এখানে এক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।

চীন পুরাতন সিল্করোডের আধুনিক রূপদান করে নতুন করে নির্মাণ করতে চাইছে। এখানে উদ্দেশ্য শুধু সেসব অঞ্চলকে চায়নিজ বলয়ে নিয়ে আসা নয়; বরং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে পৌঁছা। এতে বিশাল অঙ্ক ঢালা হয়েছে একটি সমৃদ্ধ এশিয়ান জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সিস্টেম তৈরির জন্য। সাথে দ্রুতগতির রেললাইন ও বিস্তৃত পাইপলাইনও স্থাপন হবে।

এই উদ্যোগের একটি উপাদান সিল্করোড নামে মহাসড়ক বিশ্বের বৃহত্তম পর্বতের কিছু অংশ ধরে এগিয়ে পাকিস্তানে চীনের সংস্কার করা ঘাদার বন্দর পর্যন্ত গেছে, যা তেলের বহরকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করবে। এ উদ্যোগের আরো একটি বিষয়, চীন-পাকিস্তান আশা করছে, এর মাধ্যমে পাকিস্তানে ব্যাপক শিল্পন্নোয়ন ঘটানো। যে উদ্যোগ পাকিস্তানে অব্যাহত সামরিক সহায়তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র নেয়নি এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদকে শক্ত হাতে দমন করার জন্য একটি উপায় তৈরি করা, যা চীনের পশ্চিমে জিনজিয়ান প্রদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। ঘাদার বন্দর চীনের একটি মুক্তা অনুসন্ধান অভিযানের অংশ হতে চলেছে। ভারত মহাসাগরে ঘাঁটি নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে বাণিজ্যিকভাবেই, তবে সাথে সম্ভাব্য সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্যও। এ প্রত্যাশা নিয়ে যে, চীন ভবিষ্যতে একদিন আধুনিক যুগে প্রথমবারের মতো পারস্য উপসাগরে পাওয়ার প্রজেক্ট করতে সক্ষম হবে। এসবই হচ্ছে ওয়াশিংটনের দুর্বার সামরিক ক্ষমতা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। পরমাণু যুদ্ধের ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য, যা যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালোভাবেই ধ্বংস করতে পারে।

২০১৫ সালে চীন এশিয়ান অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এইইবি) প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজে এর সব থেকে বড় শেয়ারহোল্ডার হয়। গত জুন মাসে ৫৬টি দেশ বেইজিংয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ওয়াশিংটনের বিরাগ উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেনসহ অন্যরাও অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান অনুপস্থিত ছিল। কিছু বিশ্লেষকের বিশ্বাস এই ব্যাংক ভবিষ্যতে আন্তজাতিক হর্তাকর্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক) টেক্কা দেবে, যেগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কেউ কেউ আশা করছেন- এসসিও ভবিষ্যতে ন্যাটোর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে।

আজকের চ্যালেঞ্জ : পূর্ব ইউরোপ
পূর্ব ইউরোপের দ্বিতীয় অঞ্চল ন্যাটো রাশিয়ান বর্ডারে সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে। এটা কোনো ছোটখাটো ব্যাপার নয়। রিচার্ড সাকওয়া তার দূরদর্শী ও ভূবিষয়ক পাণ্ডিত্যর্পূণ বিচারিক গবেষণাপত্র ‘ইউক্রেন ফ্রন্টলাইন : ক্রইসিস ইন দ্য বর্ডারল্যান্ড’-এ উল্লেখ করেছেনÑ খুব সম্ভবত ন্যাটোর পরিবর্ধন রোধে, ২০০৮ সালের আগস্টের রুশ-জর্জিয়া যুদ্ধের প্রভাব ছিল প্রথম প্রভাব। দ্বিতীয় প্রভাব ছিল ২০১৪ সালে ইউক্রেন সঙ্কট। এটা পরিষ্কার নয় যে, মানবতা কখন তার তৃতীয় প্রভাবটি ফেলবে।

পশ্চিম দেখেছে ন্যাটোর পরিবর্ধনের ক্ষতিকর দিক। এতে আশ্চর্যজনক কিছু ছিল না। রাশিয়া তার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্বের দক্ষিণে একটি বিশাল অংশজুড়ে আছে। বিশিষ্ট কিছু পশ্চিমা কণ্ঠ যেমন- রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আমেরিকান কূটনীতিক জর্জ কেনান শুরুতেই সর্তক করেছিলেন ন্যাটোর পরিবর্ধন একটি বেদনাদায়ক ভুল এবং তিনি এটা হোয়াইট হাউজের সিনিয়র মুখপাত্রকে লেখা খোলা চিঠিতে যোগ করে দিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউজ এটাকে আখ্যায়িত করেছিল ঐতিহাসিক সমানুতার নীতিগত ত্রুটি।

বর্তমান সঙ্কটের উৎপত্তি মূলত ১৯৯১ সালে। স্নায়ুযুদ্ধ শেষে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়। তখন ইউরেশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় দু’টি বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। সাকওয়ার ভাষায়, একটি ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে ‘বৃহত্তর ইউরোপ’ গঠন। শোনা যেত ঠিকই ‘ইউ’র সাথে তবে তার সখ্য ক্রমবর্ধমানভাবে ইউরো আটলান্টিক নিরাপত্তা ও তার রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের দিকে সমব্যাপ্ত ছিল। আরেক দিকে বৃহত্তর ইউরোপের যে আইডিয়া ছিল তখন তা ছিল মূলত মহাদেশীয় ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গি। লিসবন থেকে ভøাদিভস্তক পর্যন্ত যে দাগ, তাতে ব্রাসেলস, মস্কো, আঙ্কারাসহ অনেক কেন্দ্র আছে। উদ্দেশ্য খুবই সাধারণ। বিদ্যমান বিভাজনগুলোকে জয় করা, যা দিয়ে ঐতিহ্যগতভাবেই মহাদেশ জর্জরিত।

সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ছিলেন ‘বৃহত্তর ইউরোপ’ ধারণার একজন অন্যতম প্রবক্তা, যাতে গ্যালিবাদ (ফ্রেঞ্চ নেতা গ্যালির মতবাদ) ও অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে ইউরোপের শিকড় মনে করা হতো। ১৯৯০ সালে যখন রাশিয়া আত্মবিধ্বংসী বাজারনীতির অধীনে ধসে পড়ে, এ দৃষ্টিভঙ্গি ম্লান হয়ে যায়। শুধু রাশিয়া হিসেবেই পূর্ণজীবন লাভ করে এবং ভøাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে হারানো জায়গা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা শুরু করে। পুতিন তার সহযোগী দিমিত্রি মেদভেদেভকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর ইউরোপ গঠনের লক্ষ্যে বারবার ভূরাজনৈতিক একীভূতকরণের জন্য আহ্বান করছেন। লিসবন থেকে ভøাদিভস্তক পর্যন্ত একটি প্রকৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব সৃষ্টির জন্য।

সাকওয়া উল্লেখ করেন, মার্জিতভাবে উপেক্ষা করলেও এ উদ্যোগ গণ্য হয়েছে আড়ালে আড়ালে কিছুটা চৌর্যবৃত্তির সাহায্যে বৃহত্তর রাশিয়া গঠনের উদ্যোগ হিসেবে এবং র্পূব আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে গজাল ঠুকে তার সুবিধাভোগ করার জন্য। যেমন স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে ভয় কাজ করত ইউরোপ বুঝি একটি তৃতীয় শক্তি হতে যাচ্ছে স্বাধীন ছোটখাটো সব পরাশক্তির সমন্বয়ে এবং শেষেরটির নিকটবর্তী হতে পারে। ( এ সংক্রান্ত আরো জানতে জার্মান রাজনীতিক উইলি ব্রান্টের সরলীকরণ ও অন্যান্য উদ্যোগ সম্পর্কে দেখতে পারেন)।

রাশিয়ার পতনে পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া ছিল কীর্তন গাওয়ার অনুষ্ঠানের মতো। একটি ইতিহাসের সমাপ্তি এ সঙ্কেত দিচ্ছিল এটি পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়। অন্তত রাশিয়া যদি প্রাক বিশ্বযুদ্ধ সময়ের অবস্থার দিকে ফিরত, আমি লিখে দিতে পারি রাশিয়া তাহলে পশ্চিমাদের অসৎ অর্থনৈতিক উপনিবেশ হয়ে যেত। আর তার সাথে সাথে ন্যাটোর পরির্বধন শুরু করা গর্বাচেভের মৌখিক প্রতিশ্রুতির খেলাপ। ‘ন্যাটো পূর্ব দিকে (পূর্ব জার্মানি) এক ইঞ্চিও আগাবে না।’ পরে একীভূত জামার্নিও ন্যাটোর সদস্য হয়। ইতিহাসের আলোকে এটি ছিল একটি অবিস্মরণীয় ছাড়। এ আলোচনা ধারণ হয়েছিল পূর্ব জার্মানিতে। হতে পারে ন্যাটো জার্মানি ছাড়িয়ে আরো প্রসারিত হওয়ার আগে গর্বাচেভের সাথে আলোচনা করে নেয়নি। এমনকি ব্যক্তিগতভাবে অভিমতও নেয়নি। হতে পারে।

শিগগিরই ন্যাটোর অধিকার রাশিয়া সীমান্তে প্রসারিত হওয়া শুরু করেছিল। ন্যাটো তার সাধারণ ব্রত বৈশ্বিক শক্তি পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সামুদ্রিক পথ, পাইপলাইনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকভাবেই পরিবর্তন করে ফেলেছিল। বিশ্বজুড়েই অভিযান করেছিল। উপরন্তু, বর্তমানে ব্যাপকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা পুুনর্বিবেচনার অধীন ‘নিরাপত্তার জন্য দায়িত্ববোধ’সংবলিত হেরাল্ড মতবাদ পরিষ্কারভাবেই জাতিসঙ্ঘের আনুষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত। ন্যাটো বোধ হয় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি হস্তক্ষেপকারী বাহিনী হিসেবেই কাজ করছে।
রাশিয়ার বিশেষ উদ্বেগের কারণ ন্যাটো ইউক্রেনে বিস্তৃত হওয়ার পরিকল্পনা। ২০০৪ সালে এপ্রিলে বুখারেস্টে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে এ পরিকল্পনা স্পষ্টভাবেই উচ্চারিত হয়। যখন ইউক্রেন ও জর্জিয়া উভয়ে ন্যাটোর পরিণামগত সদস্য হওয়ার ওয়াদা করে, সে ওয়াদা দ্ব্যর্থহীন ছিল। ন্যাটো ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে স্বাগত জানায় ইউরো আটলান্টিক আকাক্সক্ষায় ন্যাটোর সদস্য হওয়ার জন্য। আমরা আজকে একমত এ দু’টি রাষ্ট্র ন্যাটোর পূর্ণ সদস্য হতে যাচ্ছে। ২০০৪ সালে অরেঞ্জ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা সমর্থনভুক্ত প্রার্থী জয়ী হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ড্যানিয়েল ফ্রায়েড বেশ ব্যস্ত সময় কাটান সেখানে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছড়িয়ে দেন ইউক্রেনের ন্যাটোতে ও ইউরো আটলান্টিক আকাক্সক্ষায় যোগ দেয়ার ব্যাপারে। ফাঁস হওয়া উইকিলিকস রিপোর্ট তা-ই বলছে।

রাশিয়ার উদ্বেগ সহজেই বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠিত একটি সাময়িকীকে নেতৃত্ব দেয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জন মেয়ারশিমার তাদের একটি রূপরেখা তৈরি করেছেন। তিনি লিখেছেন, ইউক্রেন বিষয়ে বর্তমান সঙ্কটের মূল শিকড় ন্যাটোর সম্প্রসারণ ও ওয়াশিংটনের ইউক্রেনকে মস্কোর কক্ষপথ থেকে সরিয়ে পশ্চিমা বলয়ে জুড়ে দেয়ার অঙ্গীকার। যে বিষয়ে পুতিনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো এটা সরাসরি রাশিয়ার কোটিপতি স্বার্থের জন্য হুমকি।

মেয়ারশিমার প্রশ্ন করেন, কে তাকে (পুতিনকে) দোষারোপ করতে পারে? তিনি দেখলেন, ওয়াশিংটন রাশিয়ার এ অবস্থানকে পছন্দ করছেনা; কিন্তু এটা তো বুঝতে হবে এর পেছনের কারণটি কী। এটা বোঝা খুব কঠিন নয়। এটা তো সবাই জানে, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই পশ্চিম গোলার্ধের কোনো জায়গাতেই কোনো দূরবর্তী পরাশক্তির সামরিক বাহিনী মোতায়েন সহ্য করবে না। এখন এটা তার সীমানায় হোক বা দূরে কোথাও হোক।

মূলত বেশ দূর পর্যন্তই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী। যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮২৩ সালের মনরো মতবাদ অনুযায়ী ‘সফল অবাধ্যতা’ বলা হয় তা কখনোই যুক্তরাষ্ট্র সহ্য করবেনা, যা পুরো গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করে। (অবশ্য এটি এখনো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি)। একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বিপর্যয়কর নিষেধাজ্ঞা নিয়েই এ সফল অবাধ্যতা করেই যাচ্ছে এবং যাকে পৃথিবীর ত্রাস বলা যায়। কিউবার কথা বলছি। আমাদের বলার দরকার নেই যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। যখন কানাডা আর মেক্সিকো ল্যাটিন আমেরিকার দেশ হওয়ার জন্য ওয়ারশ চুক্তিতে যোগদানের পরিকল্পনা করেছিল। এটা ছিল প্রথম পরীক্ষামূলক পদক্ষেপের গুরুত্বর্পূণ ইঙ্গিত, যা নির্দেশ করে সিআইএর চরম একচোখা নীতি বুলি বাতিল করতে।

চীনের ক্ষেত্রে যেমন, কারোই পুতিনের নড়াচড়া এবং উদ্দেশ্যগুলো ও তাদের পেছনের যুক্তিগুলোকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে বোঝার দরকার দরকার নেই। এই ইস্যুটিকে অভিশাপ দেয়ার পরিবর্তে এ যুক্তি বোঝাবুঝির ব্যাপারটাকে গুরুত্বের সাথে নেয়ারও কিছু নেই। চীনের ক্ষেত্রে, জীবনধারণ প্রশ্নে আক্ষরিক অর্থেই একটি বিশাল চুক্তির ঝুঁকি রয়েছে।

আজকের চ্যালেঞ্জ : ইসলামি বিশ্ব
এখন তৃতীয় বড় উদ্বেগের বিষয়ে দৃষ্টি ফেরানো যাক। (বিশাল) ইসলামি বিশ্ব বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের (জিডব্লিউওটি) দৃশ্যে অবশ্যম্ভাবীভাবেই আছে, ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন সন্ত্রাসী হামলার পর প্রেসিডেন্ট র্জজ ডব্লিউ বুশ যা ঘোষণা করেছিলেন। আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে পুনঃঘোষণা করেছিলেন। এই সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ মূলত প্রেসিডেন্ট রিগ্যান প্রসাশন কার্যভার গ্রহণের পর ঘোষণা করেছিলেন। জরাগ্রস্ত অলঙ্করণ দিয়ে। যেমন, ‘নচ্ছার প্রতিপক্ষের দ্বারা সভ্যতার বুকে মহামারী ছড়াচ্ছে’ এবং ‘আধুনিক যুগ বর্বরতায় ফিরে যাচ্ছে’ (এটা তার স্বরাষ্ট্র সচিব জর্জ শালজের কথা)। প্রকৃত সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। এটা খুব দ্রুতই হত্যাযজ্ঞ এবং বিধ্বংসী সন্ত্রাসী যুদ্ধে রূপ নিয়েছে; যা বর্তমানে হিংস্র প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রতিফলিত হচ্ছে সেন্ট্রাল আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে। আন্তর্জাতিক আদালত দ্বারা যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্বের জন্য নিন্দা করা হয়েছে (অবশ্য একেও ওয়াশিংটন বরখাস্ত করে দিয়েছে)। যেকোনো অভিযানেই, ইতিহাসের জন্য এটি সঠিক গল্প নয়। তাই একে বিদায় দেয়া হয়েছে।

গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আলকায়েদা এবং আইসিস কিছুটা স্পষ্টতার সাথেই যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের গেমপ্লানই অনুসরণ করে। তাদের লক্ষ্য ‘যত গভীরভাবে এবং কার্যকরভাবে সম্ভব পশ্চিমাদের কর্দমাক্তভাবে চিত্রিত করো’। যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল এবং পশ্চিমাদের একের পর এক দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক পাশা খেলায় চিরস্থায়ীভাবে আবদ্ধ করে ফেলতে, যাতে তাদের সমাজ দুর্বল হয়ে পড়বে, ব্যয় হবে তাদের সম্পদ, বৃদ্ধি পাবে সহিংসতার মাত্রা এবং রুদ্ধ হবে গতিশীলতা। এটাই পকের বিশ্লেষণ।

স্কট অ্যাট্রন, জিহাদি আন্দোলনগুলোর ওপর অন্তর্ভেদি গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, নাইন-ইলেভেন হামলার খরচ অন্তত চার থেকে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার হবে, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সামরিক ও নিরাপত্তা দায়িত্ব খরচ এই পরিমাণের বিন্যাসে দশ লাখবার হবে। খরচের পুঙ্খানুপুঙ্খ মুনাফার ভিত্তিতে এ সহিংস আন্দোলন ব্যাপকভাবে সফল এবং একইভাবে পরলোকগত বিন লাদেনের কল্পনাগুলোও ক্রমবর্ধমানভাবে সফল। এখানে জুজিৎসু স্টাইলের অপ্রতিসম যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রকৃত পরিমাপ নেই। এতসবের পরও, কে-ইবা দাবি করতে পারবে যে, আমরা আগের চেয়ে ভালো আছি! বা সব বিপদ আপদ কেটে গেছে!আর যদি আমরা হাতুড়ি-বাটালি থেরাপি অব্যাহত রাখি, অঘোষিতভাবে জিহাদি নীতিই অনুসরণ করতে থাকি, তাহলে এর প্রভাব হবে জিহাদি নীতির চেয়েও ভয়াবহ এবং আরো অনেকটা বৃহৎ পরিসরের। অ্যাট্রনের পরামর্শ, ‘আমাদের প্রতিকৌশল নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনয়নের জন্য অনুপ্রাণিত করা উচিত’।

আলকায়েদা বা আইসিস আমেরিকানদের দ্বারাই সহায়তাপ্রাপ্ত। উদাহরণস্বরূপ, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী টেড ক্রুজ (কার্পেট বোম, ইএম)। অথবা মূলধারার বর্ণনা শেষে অন্যান্যের বিষয়ে আসি। নেতৃস্থানীয় পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসের মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কলামিস্ট থমাস ফ্রায়েড ম্যান। যিনি ২০০৩ সালে চার্লি রোজ শোতে (জনপ্রিয় টিভি শো) ওয়াশিংটনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন কিভাবে ইরাকে যুদ্ধ করতে হবে। সেখানে যা হচ্ছে আমি তাকে সন্ত্রাসবাদের বুঁদবুঁদ বলব... এবং যা করা প্রয়োজন ছিল তা হলো বিশ্বের ওই অংশে গিয়ে বুঁদবুঁদটাকে ফাটিয়ে ফেলা। মূলত আমাদের ওখানে যাওয়াটা প্রয়োজন ছিল। আর আহ! দরকার ছিল একটা বড় ছড়ি নিয়ে ঠিক ওই বিশ্বের হৃদয় বরাবর তাক করে বুঁদবুঁদটাকে বিস্ফোরিত করা। আর সেটা করার একটাই মাত্র উপায় ছিল... তাদের দেখা প্রয়োজন ছিল আমেরিকান ছেলেমেয়েরা বসরা থেকে বাগদাদ পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে এবং আসলেই বলছি, এ কথাগুলোর কোন অংশ আপনি বুঝতে পারেননি? আপনি কী চিন্তা করছেন না আমাদের মুক্ত সমাজ সম্পর্কে আমরা যত্নশীল হই? আপনি ভাবছেন এ বুঁদবুঁদ কল্পনাবিলাস? আমরা শুধু যাওয়ার জন্যই গিয়েছি? ভালো, আপনি এটাই গিলতে থাকুন। ঠিক আছে চার্লি, আপনিই বলুন, এ যুদ্ধ কী বিষয়ে ছিল! ওপরের সবগুলোই স্পষ্টভাবে আরবদের র‌্যাগিংয়ের শামিল।

সবাই উন্মুখ
অ্যাট্রন এবং অন্যান্য কাছাকাছি পর্যবেক্ষকেরা আমার এই ব্যবস্থাপত্রের ব্যাপারে সাধারণভাবে একমত। আমাদের উচিত এই যত্নশীল ও সতর্ক গবেষণাকে স্বীকৃতি দেয়া, যা গ্রহণযোগ্যভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। তারা জিহাদকে চিত্রিত করে থাকেন, তাদের শৌর্যবীর্য ও নৈতিকতার সাথে তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যে কিছু করার জন্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলামিক স্টেট আমাদের কাছে নিষ্ঠুর ও বেমানান। এমনকি আরব মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ অংশই সরাসরি একই কথা বলেছে। কোন বিষাক্ত আততায়ী, কোন রোমাঞ্চ, গৌরব, প্রতিপত্তি, অপরের চোখে সম্মান পাওয়ার প্রতিশ্রুতি ছাড়াই তাদের এ কাজে উদ্বুদ্ধ করছে আজ? কুরআন তো মোটেই নয়। এমনকি খুব কম জিহাদিরই ইসলামি বা অন্য ধর্মতত্ত্বের জ্ঞান পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে।পক পরামর্শ দেন, সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো একটি বহুজাতিক, কল্যাণভিত্তিক, মানসিক প্রশান্তিদায়ক বৈঠকের আয়োজন করা, যা ঘৃণ্য আইসিসকে ক্ষতিকর রূপ থেকে কমিয়ে বিশ্বাসীরূপে তৈরি করবে। উপাদানগুলো আমাদের কাছে শনাক্ত হয়ে গেছে : গোষ্ঠীগত চাহিদা, অতীতের কৃত অধর্মের ক্ষতিপূরণ এবং একটি নতুন শুভারম্ভের আহ্বান। পক আরো যোগ করেন, অতীত পাপের জন্য একটুখানি সতর্কতামূলক ক্ষমার্প্রাথনা- খুব সামান্যই খরচ হবে; কিন্তু দেবে অনেক। এ ধরনের প্রকল্প সম্পন্ন করা যেতে পারে শরণার্থী শিবিরগুলোয় অথবা প্যারিসের উপকণ্ঠে খুপরিগুলোয় এবং জঘন্য আবাসন প্রকল্পে। অ্যাট্রন লিখেছেন, তার গবেষক দল সুন্দর সুষ্ঠুভাবে বৃহৎ পরিসরের সমর্থন ও সহনশীলতা পেয়েছেন আইসিসের ব্যাপারে এবং প্রকৃত কূটনৈতিক নিষ্ঠা দিয়ে আরো বেশি কিছুও করা যেতে পারে। আত্মবিধ্বংসী সহিংসতার পথ অবলম্বনের পরিবর্তে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।তার মানে শুধু এই নয় যে, শরণার্থী সঙ্কটে সম্মানজনক পদক্ষেপ নেয়া। এটা অনেক দীর্ঘ সময় ধরেই এসেছে; কিন্তু ইউরোপে ঢেউ তুলেছে ২০১৫ সালে। এটার অর্থ দাঁড়ায়, যতটা সম্ভব খুব প্রবলভাবেই লেবানন, জর্ডান তুর্কির শরণার্থী শিবিরগুলোয় মানবিক ত্রাণতৎপরতা বৃদ্ধি করা। যেখানে সিরিয়ার দুস্থ শরণার্থীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ সমস্যাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে এগোতে হবে বহুদূর এবং আপন আলোয় উদ্ভাসিত চিত্র উৎপন্ন করতে হবে, যা এ মন্দ আকর্ষণ থেকে দূরে অবস্থান করবে এবং যা হবে একটি ‘আলোকিত ধরার’। সে লক্ষ্যেই কাজ করা উচিত।শরণার্থী উৎপন্নকারী দেশ, যেগুলো ব্যাপকভাবে মারাত্মক সহিংসতা ছড়াচ্ছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয়ত ব্রিটেন ও ফ্রান্স। তারপর সেসব দেশ যারা অসংখ্য পরিমাণে শরণার্থী, পশ্চিমা সহিংসতার কারণে পালিয়ে আসা শরণার্থীসহ সবরকমের শরণার্থী গ্রহণ করেছে। যেমন লেবানন (মাথাপিছু হিসাবে অবধারিতভাবেই চ্যাম্পিয়ন), জর্ডান, সিরিয়া (অন্যান্য অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আগে) এবং পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়া দেশগুলো। এরা প্রত্যেকেই শরণার্থী তৈরি করেছে এবং তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয় যুক্তরাষ্ট্রও দক্ষিণের সীমান্তে পিঠ দেখিয়েছে তাদের। গভীরভাবে ভাবার জন্য একটি বিস্ময়কর বেদনাদায়ক চিত্র!প্রকৃত চিত্র খুঁজে বের করতে হবে। শরণার্থী প্রজন্মের ইতিহাস অনেক পেছনের। বর্ষীয়ান মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি রবার্ট ফিস্ক রিপোর্ট করেন, আইসিসের তৈরি করা একদম প্রথম ভিডিও, যাতে দেখা যাচ্ছে ইরাক সিরিয়া সীমান্তে একটি মার্কেটকে বুলডোজার বালিতে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। যেভাবে মেশিনটি নোংরা পলেস্তারা ধ্বংস করল, ক্যামেরা নিচে এসে দেখাল বালুতে পরে থাকা একটি হাতে লেখা পোস্টার, যা বলছে ‘সাইকস-পিকট সমাপ্ত’।সে অঞ্চলের মানুষের জন্য সাইকস-পিকট চুক্তি, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের নৃশংসতার প্রতি খুব বড় প্রতীক এবং ঘৃণাপূর্ণ উক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে ষড়যন্ত্র করা ব্রিটেনের মার্ক সাইকস এবং ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া জর্জ পিকট তাদের সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য অর্জনে কৃত্রিম রাজ্যগুলোয় নিজস্ব অঞ্চল গঠন করে। সেখানে বসবাসরত মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে এবং যুদ্ধকালীন প্রতিশ্রুতিগুলোকে সহিংসভাবে লঙ্ঘন করে, আরবদের প্রণোদিত করে মিত্রবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য। এ চুক্তি ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যের অনুশীলনেরই প্রতিফলন। আফ্রিকাকে বিধ্বস্ত করা হয়েছে একইরকম পদ্ধতিতে, যা ছিল ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্গত পুরোপুরি শান্ত, বরাবরই স্থিতিশীল একটি রাজ্য। তাকে রূপান্তরিত করা হয় বিশ্বের সব থেকে অস্থিতিশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে বিস্ফোরণোন্মুখ একটি রাজ্যে।

তার পর যখন থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় পশ্চিমা হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে তখন থেকে সেখানে উত্তেজনা, সঙ্ঘাত, ভাঙন ঘটছে, যা সমাজগুলোকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। শেষে ফলাফল ‘শরণার্থী সঙ্কট’, যা নিষ্পাপ পশ্চিমারা মোটেই সহ্য করতে পারছে না। জার্মানি ইউরোপের বিবেক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সর্বপ্রথম (তবে এখন আন নয়) অন্তত এক লাখ শরণার্থী আশ্রয় দিয়ে। বিশ্বের ধনী দেশগুলোর অন্যতম একটি দেশ। আশি লাখ জনসংখ্যা। বিপরীত পক্ষে, গরিব দেশ লেবানন সিরিয়ার কমপক্ষে দেড় লাখ শরণার্থী নিয়েছে। বর্তমানে তার মোট জনসংখ্যার সিকি ভাগ হচ্ছে, জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ কর্তৃক নিবন্ধিত অর্ধ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি শরণার্থী। বেশির ভাগই ইসরায়েলি রাজনীতির শিকার।ইউরোপও বিধ্বস্ত আফ্রিকান দেশগুলোর শরণার্থীর চাপে রোদন করছে, যা তারাই করেছে এবং অবশ্যই মার্কিন সহায়তা ছাড়া নয়। আটলান্টিক মহাসাগরের কঙ্গো ও অ্যাঙ্গোলাসহ অন্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর জনগণই তার সাক্ষী। ইউরোপ এখন চাইছে তুরস্ককে ঘুষ (দুই লাখের ওপর সিরিয়ান শরণার্থীর বিনিময়ে) দিতে। যারা সিরিয়ার বিভীষিকা থেকে পালিয়ে ইউরোপ সীমান্তে এসেছে, তাদের দূরে ঠেলে দিতে। শুধু ওবামা মেক্সিকোকে চাপ দিচ্ছে দুস্থ মানুষগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত খোলা রাখতে। চাইছেন প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের ‘জিডব্লিউওটি’-এর পরিণাম থেকে বের হতে। একই সাথে সাম্প্রতিক বিপর্যয়গুলো থেকেও বের হতে চাইছেন। এর মধ্যে হন্ডুরাসের সামরিক অভ্যুত্থানও শামিল। যাকে ওবামা শুধু এককভাবে বৈধতা দিয়েছেন, যা রাষ্ট্রটিকে অন্যতম একটি বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরী বানিয়েছে।সিরিয়ান শরণার্থী সঙ্কটে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের ওপরের কথাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে। অন্তত আমি তাই মনে করি।

শুরুর প্রশ্নটিতে ফিরে যাই। ‘কে শাসন করবে বিশ্ব’? আমাদের অবশ্যই একই সাথে আরো একটি প্রশ্নও তোলা উচিত। ‘বিশ্ব শাসনের নীতি ও মূল্যায়ন কি হবে’? ধনী ও ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলোর প্রতিটি নাগরিকের অন্তরে এ প্রশ্নটিই সর্বাগ্রে আসা উচিত। যারা উত্তরাধিকার সূত্রে অবাধ স্বাধীনতা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এবং এটাই সুযোগ পূর্ব পুরুষের সংগ্রামের জন্য তাদের ধন্যবাদ দেয়ার। এটাও ভেবে দেখা দরকার, তারা পছন্দের অপশনগুলোকে কিভাবে সামলাচ্ছে। যেমন বর্তমানে তারা মানুষ আমদানির বিশাল চ্যালেঞ্জে কিভাবে সাড়া দিচ্ছে।


বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬

বর্ণনাতীত নৃশংসতা : সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রসঙ্গে নোয়াম চমস্কি

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এখন সর্বোচ্চ শক্তিতে বৈশ্বিক যুদ্ধাভিযানে পরিণত হয়েছে। অথচ আইএসআইসের মতো ভয়ঙ্কর সংগঠনগুলোর উত্থান ও বিকাশের আসল কারণ পুরোপুরিই অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। নভেম্বরে প্যারিস হত্যাযজ্ঞের পর ফ্রান্স ও জার্মানির মতো প্রধান প্রধান পাশ্চাত্য দেশ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগ দিয়েছে। একই ধরনের ভয়ে ভীত হয়ে রাশিয়াও তাড়াহুড়া করে এই ক্লাবে যোগ দিয়েছে। বস্তুত, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে রাশিয়া তার নিজস্ব ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্রের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আইএসআইএসকে সমর্থন জুগিয়ে যাবার অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘনের কথিত ঘটনায় তুরস্ক রুশ বিমানগুলো ভূপাতিত করার পরই রাশিয়া ‘সন্ত্রাসীদের মদদদাতা’ হিসেবে তুরস্ককে অভিযুক্ত করছে। 

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কোনো অর্থ আছে কি? এর কী কোনো কার্যকর নীতি আছে? আর রোনাল্ড রিগ্যান ও জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের আমলের আগের দু’টি ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ পর্যায় থেকে বর্তমানটির পার্থক্য কোথায়? অধিকন্তু ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ থেকে আসলে কে লাভবান হচ্ছে? এবং মার্কিন সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স ও যুদ্ধ সৃষ্টির মধ্যে সম্পর্কটা কী? মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিশ্বখ্যাত সমালোচক নোয়াম চমেস্কি এসব ইস্যু নিয়ে ট্রুথআউটকে তার উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন। বিশেষ এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সি জে পলিক্রুনিউ। এর অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রশ্ন : প্রথমেই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আপনার ধারণা শুনতে চাইব। এই নীতিটা সেই রিগ্যানের আমলে শুরু হয়েছিল, যা এর পরই জর্জ ডব্লিউ বুশ (ইসলামাতঙ্ক) ‘ক্রুসেড’-এ পরিণত করেছিলেন, যেটা স্রেফ অপরিমেয় সংখ্যক নিরীহ মানুষের জীবন নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বশান্তির ওপর প্রবল প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার কিছু মিত্রের চেয়ে ভিন্ন ধরনের পলিসি এজেন্ডা এবং স্বার্থ নিয়ে অন্য আরো কয়েকটি দেশ এতে লাফিয়ে সামিল হওয়ায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নতুন এবং সম্ভবত আরো বিপজ্জনক ধাপে প্রবেশ করছে। প্রথমত, আপনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্পর্কে ওপরে বলা মূল্যায়নের সাথে একমত হলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্থায়ী বৈশ্বিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিণতি, বিশেষ করে পাশ্চাত্য সমাজের জন্য, কী হতে পারে?

চমস্কি : একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিলে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ পর্যায় দু’টি পরস্পর থেকে বেশ ভিন্ন। রিগ্যানের যুদ্ধ খুবই দ্রুত খুনে সন্ত্রাসী যুদ্ধে পরিণত হয়, সম্ভবত ওই কারণেই এটা ‘অদৃশ্য’ হয়ে গেছে। তার সন্ত্রাসী যুদ্ধ মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতি নিয়ে আসে। সবচেয়ে প্রত্যক্ষ টার্গেট ছিল মধ্য আমেরিকা। তারা এখনো সেই ক্ষত সারিয়ে উঠতে পারেনি। বর্তমান উদ্বাস্তু সঙ্কটের প্রধান কারণগুলোর একটি হলো এটা (খুব কমই এর উল্লেখ হয়)। দ্বিতীয় পর্যায়টির (যেটি জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০ বছর পর ২০০১ সালে আবার ঘোষণা করেছিলেন) ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রত্যক্ষ আগ্রাসন বিশাল এলাকা ধ্বংস করে দেয়, সন্ত্রাস নতুন আকার ধারণ করে, বিশেষ করে ওবামার বৈশ্বিক গুপ্ত হত্যার (ড্রোন দিয়ে) অভিযানে সন্ত্রাসবাদের বিবরণীতে নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে এবং এ ধরনের ব্যবস্থায় সন্দেহভাজনদের যতজনকে হত্যা করা হয়, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তার চেয়ে বেশি নিবেদিতপ্রাণ সন্ত্রাসীর সৃষ্টি করে।

বিশ্ব জনমত যুক্তরাষ্ট্রকে শান্তির জন্য বিপুলভাবে বৃহত্তম হুমকি মনে করে। বুশের যুদ্ধ টার্গেট ছিল আলকায়েদা। একটার পর একটা ভয়াবহ আঘাত হেনে (আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া এবং তারপর আরো অনেক) জিহাদি সন্ত্রাসকে আফগানিস্তানের ছোট্ট উপজাতীয় এলাকা থেকে লেভ্যান্ট (সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন, জর্ডান ও ইসরাইল নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ এলাকা) হয়ে পশ্চিম আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। ইতিহাসের অন্যতম পরিচালনা দক্ষতাগত সাফল্য। এর মধ্যে আবার আলকায়েদার স্থানে আবির্র্ভূত হয় আরো বেশি খারাপ ও ভয়ঙ্কর অনেক উপাদানের। বর্তমানে আইএসআইএস (আইএসআইএল, ইসলামিক স্টেট) দানবীয় নৃশংসতার রেকর্ডের অধিকারী। তবে শিরোপাটির অন্য দাবিদাররা খুব বেশি পেছনে নেই। কয়েক বছর পেছনে থাকা এই গতিশীলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন সামরিক বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু কুকবার্ন তার গ্রন্থ ‘কিল চেইন’-এ। তিনি প্রামাণ্যভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন, মূল ও কারণগুলো সমাধান না করে দৃশ্যগ্রাহ্য কোনো নেতাকে হত্যা করা হলে নিশ্চিতভাবেই খুব দ্রুত তার স্থলাভিষিক্ত হয় আরো তরুণ, আরো যোগ্য এবং আরো বেশি ভয়ঙ্কর কেউ।

এসব অর্জনের একটি পরিণাম হলো বিশ্ব জনমত বিপুল ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রকে শান্তির জন্য বৃহত্তম হুমকি মনে করে। অনেক পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান। তবে পাকিস্তানের এত ওপরে থাকার কারণ দৃশ্যত বিপুল ভারতীয় ভোট। যে সাফল্য ইতোমধ্যেই দেখা গেছে, তা আরো বাড়লে জ্বলতে থাকা মুসলিম বিশ্বের সাথে বৃহত্তর যুদ্ধও সৃষ্টি করতে পারে, অন্য দিকে পাশ্চাত্য সমাজগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ দমন এবং নাগরিক অধিকার খর্ব এবং বিপুল ব্যয়ের বোঝায় নতজানু দেখতে পাবে, যা আসলে ওসামা বিন লাদেনের সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন (এবং বর্তমানের আইএসআইএসের) বাস্তবায়ন।

প্রশ্ন : মার্কিন নীতি প্রণয়ন আলোচনা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’কে কেন্দ্র করেই ঘোরাফেরা করছে, প্রকাশ্য ও গোপন কার্যক্রমের মধ্যকার পার্থক্য পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে। এ দিকে সন্ত্রাসী গ্র“পগুলোর শনাক্তকরণ এবং সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনকারী কর্তা বা রাষ্ট্রগুলো নির্বাচন করা দৃশ্যত কেবল পুরোপুরি স্বেচ্ছাচারমূলকভাবেই হচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্তকরণ এই প্রশ্নও সৃষ্টি করছে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সত্যিই কি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নাকি বিশ্বজয়ের নীতিমালাকে যৌক্তিক করতে এটা স্রেফ ধাপ্পাবাজির আবরণ? এ ব্যাপারে আপনার কোনো মন্তব্য আছে কি?

চমেস্কি : রিগ্যান ও বুশের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সংস্করণ নিয়েও একই সত্য প্রযোজ্য। রিগ্যানের কাছে এটা ছিল মধ্য আমেরিকায় হস্তক্ষেপের অজুহাত। সালভাদোরের বিশপ রিভার ওয়াই দাদাস (তিনি গুপ্তহত্যার শিকার আর্চবিশপ অস্কার রোমেরোর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন) বিষয়টাকে বর্ণনা করেছেন ‘অসহায় বেসামরিক লোকজনকে সম্পূর্ণ বিলীন করা এবং তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যা চালানোর যুদ্ধ’ হিসেবে।

গুয়াতেমালার পরিস্থিতি ছিল আরো খারাপ, হন্ডুরাসে ছিল ভয়াবহ। নিকারাগুয়া ছিল একটি দেশ, যার রিগ্যানের সন্ত্রাসীদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষার একটি সেনাবাহিনী ছিল; অন্য দেশগুলোর নিরাপত্তা বাহিনীই ছিল সন্ত্রাসী।

আফ্রিকার দক্ষিণাংশে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ দেশে ও বিদেশে ভয়ঙ্কর মাত্রায় করা দক্ষিণ আফ্রিকান অপরাধের অজুহাত তুলে দেয়। সর্বোপরি আমাদেরকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে জঘন্য সন্ত্রাসী গ্র“পের একটি’ নেলসন ম্যান্ডেলার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের কাছ থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করতে হয়েছিল। ম্যান্ডেলা নিজে পর্যন্ত ২০০৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন সন্ত্রাসী তালিকায় ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ লেবানন এবং অন্যান্য স্থানে ইসরাইলি খুনে আগ্রাসনের সমর্থন সৃষ্টি করে। আর বুশের জন্য এটা ইরাক আক্রমণের অজুহাতের ব্যবস্থা করে। এভাবেই এটা এখনো চলছে।

সিরিয়ার নৃশংসতার কাহিনী ভাষাতেও প্রকাশ করা যায় না। আইএসআইসের বিরোধিতাকারী প্রধান স্থলবাহিনী দৃশ্যত কুর্দিরা, ইরাকের মতো এখানেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকায় রয়েছে। উভয় দেশেই তারা আমাদের ন্যাটো মিত্র তুর্কিদের হামলার প্রধান টার্গেট। এই দেশটি সিরিয়ায় আলকায়েদার সহযোগী সংগঠন আলনুসরা ফ্রন্টকেও সমর্থন দিচ্ছে। আইএসআইএস আর আলনুসরার মধ্যে পার্থক্য আছে খুব সামান্যই, যদিও তারা খুবই কঠিন যুদ্ধে রয়েছে।

আলনুসরা এবং এর ঘনিষ্ঠ মিত্র আহরার আলশ্যামকেও মার্কিন মিত্র সৌদি আরব ও কাতার সমর্থন করছে এবং মনে হচ্ছে, সিআইএ’র কাছ থেকে তারা অত্যাধুনিক অস্ত্রসম্ভার পাচ্ছে। এমন খবরও পাওয়া গেছে, তারা আসাদ সেনাবাহিনীকে মারাত্মক পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিতে সিআইএর সরবরাহ করা টিওডব্লিউ ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করছে। সম্ভবত এটাই রাশিয়াকে হস্তক্ষেপ করতে উদ্দীপ্ত করেছে। 
সিরিয়ায় একমাত্র ক্ষীণ আশার রেখা হতে পারে আইএসআইএসকে বাদ দিয়ে সম্পৃক্ত বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে আলোচনা। তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের মতো সত্যিই আতঙ্কিত লোকজন, যারা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছুক না হওয়ায় আলোচনায় সম্পৃক্ত হতে চাইবেন, যদি না জাতীয় আত্মহত্যার সর্পিলগতি অব্যাহত থাকা বন্ধ করতে হয়। আর পরিশেষে এই পথের গন্তব্য হবে ভিয়েনা। বাস্তবভাবে আরো কিছু করতে হবে। তবে কূটনীতিতে পরিবর্তন অনিবার্য।

রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১১

বৈপ্লবিক শান্তিবাদ


নোয়াম চমস্কি ২০১১ সালে সিডনি শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। সিডনি টাউন হলে নভেম্বর তাকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই অনুষ্ঠানে তিনিরেভ্যুলিউশনারি প্যাসিফিজম : চয়েসেজ অ্যান্ড প্রসপেক্টশিরোনামের ভাষণে চলমান শান্তিবাদের স্বরূপ অন্বেষণ করেন তিনি যা শক্তিমান দেশগুলোর এই সময়ের যুদ্ধবাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। আউটলুক অনলাইন থেকে নোয়াম চমস্কির এই ভাষণের ভাষান্তর করেছেন নেয়ামুল হক
আমরা সবাই জানিমানবজাতির পরবর্তী প্রজন্মসমূহকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষাইজাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণ। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণতা দানের লক্ষ্যে পরিচালিত আমাদের এতদিনকার কর্মকান্ডগুলো যখন বিবেচনায় নেই, তখন উচ্চারিত এই শব্দমালা মনের গভীরে এক ধরনের বেদনাবোধেরই জন্ম দেয়। যদিও ইউরোপ এক্ষেত্রে তাপর্যপূর্ণ কিছু সাফল্যের মুখ দেখেছে
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপ ছিল এই পৃথিবীর সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল। চলেছে হত্যাযজ্ঞ আর ধ্বংসাত্মক অন্তঃকোন্দল। যুদ্ধবাজ ইউরোপ বিশ্বের অধিকাংশ জায়গাই দখল করে নিয়েছিল। ইউরোপীয় এই আগ্রাসনের মুখে ভীতবিহবল মানুষের সবাই যে খুব একটা শান্তিবাদী ছিল তাও নয়। তবে তারা সবাই ব্রিটিশ সমর ইতিহাসবিদ জিওফ্রে পার্কারের ভাষায়ইউরোপীয় যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকারে পরিণত হয়েছিল।এই ঘটনা ইউরোপকে বিজিত দেশগুলোর ওপর এডাম স্মিথ যাকে বলেছেন, ‘বর্বর ইউরোপীয় অন্যায়চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। তিনি একথাও উল্লেখ করতে ভুলে যাননি যে, ইউরোপীয় সেই বর্বর অন্যায় চাপিয়ে দেওয়ার অভিযানে নেতৃত্বটা দিয়েছিল সেদিন ব্রিটিশরাই। ব্রিটিশদের এই বিশ্ব বিজয় কোথাও কোথাও ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে এনেছিল। এসব অঞ্চলকে কখনো কখনো ইংরেজ বংশোদ্ভূতদের রাজ্য হিসেবেই অভিহিত করা হতো। ইংল্যান্ডের বাইরে এসব অঞ্চলে ইংরেজ বংশোদ্ভূতরাই অভিবাসী হিসেবে বসবাস করতে শুরু করে। এগুলো ছিল ইংরেজদের উপনিবেশ। বহিরাগত ব্রিটিশদের দাপটে এসব উপনিবেশের আদি সমাজগুলো বিনষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয় অধিবাসীরা নিজ ভূমি ছেড়ে অন্যত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিংবা কারো কারো অস্তিত্বই আবার ধ্বংসের মুখে পড়ে। তবে ১৯৪৫ সালের পর থেকে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বিবেচনায় ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ মানবীয় অঞ্চলে পরিণত হয়। এটি তার পরিশ্রমী প্রচেষ্টারই ফসল। তবে গুরুত্বপূর্ণ সেই কাহিনী বলার জায়গা এটি নয়
তাত্ত্বিক আলোচনায় ইউরোপীয় এই নাটকীয় মোড় ফেরাকে প্রায়শইগণতান্ত্রিক শান্তিরফসল হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ কখনো একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় না। উল্লেখ না করে পারছি না, অবশেষে ইউরোপীয়রা এই সত্যটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা যদি তাদের অতি পছন্দের ক্রীড়া- পারস্পরিক হত্যাযজ্ঞে আবারো মেতে ওঠে তবে কিন্তু কেল্লা ফতে। সভ্য মানুষ ইতোমধ্যেই ধ্বংসযজ্ঞ সাধনের বহুতর উপকরণ তৈরি করে রেখেছে। এগুলো কেবল ব্যবহৃত হতে পারে কোনো রকম প্রত্যাঘাত হানার মতো কোনো শক্তিই যাদের নেই তেমন সব অতি দুর্বল মানুষেরই বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর বছরগুলোতে এমন একটি অবস্থাই বিরাজ করতে দেখা গেছে। তবে এটাও ভাববার কোনো কারণ নেই যে, ভয়ের ব্যাপারটি একেবারেই উঠে গেছে। মার্কিন-সোভিয়েত বিরোধ তো দুর্ভাগ্যজনকভাবে পারমাণবিক যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তেই পৌঁছে গিয়েছিল। সূক্ষ্মভাবে বিচার করে দেখলে সেই ভীতি তো এখনো আমাদের তাড়া করে। তাছাড়া সত্যি বলতে কী, পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা কিন্তু এখনো এক অশুভ সম্ভাবনা হিসেবে বিরাজ করছে। যা নিয়ে একটু পরেই আমি কথা বলব
আমরা কি যুদ্ধের ভয়াবহতাকে অন্তত কিছুটা আকারে হলেও সীমিত রাখার চেষ্টা করতে পারি? পুরোপুরি শান্তিবাদীদের কাছ থেকে এর এক ধরনের উত্তর পাওয়া যাবে। ওই শান্তিবাদীদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন যাদের আমি শ্রদ্ধা করি, যদিও তাদের মতো অতটা আশাবাদী আমি নিজেই হতে পারি না। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন শান্তিবাদী চিন্তাবিদ সমাজকর্মী জে মাস্তে। আমার ধারণা বিশ শতকের এই স্বনামধন্য মার্কিন ব্যক্তিত্ব নিজের মত প্রচারের ব্যাপারে খুবই সক্রিয়। মাস্তে তার ভাষায়বৈপ্লবিক শান্তিবাদেবিশ্বাসী। আর ন্যায়বিহীন শান্তি অন্বেষণকে তিনি অপছন্দ করেন। তিনি বলে থাকেনএকজন মানুষকে শান্তিবাদী হওয়ার আগে অবশ্যই বিপ্লবী হতে হবে।এসব কথা দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, যে কোনো ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা যেনখুব সহজভাবেই নীরব থাকাটা পরিহার করি এবং সততার সঙ্গে আমাদের ৯০ শতাংশ সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আন্তরিক হই।তার মতেআমাদের প্রচলিত ব্যবস্থাটি এখন হিংসা আর বিদ্বেষের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বস্ত্তগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যায়গুলো সারাবিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।তিনি বলেন, আমরা যদি আমাদের এই ৯০ শতাংশ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই তবে তা হবে হাস্যকর এক ব্যাপার এবং এমনকি ভন্ডামিও। কারণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে যেসব বিপ্লবী বাদবাকি ১০ শতাংশ হিংসাত্মক ঘটনা ঘটাচ্ছে আমরা কিন্তু সেগুলোর ব্যাপারে খুবই সমালোচনামুখর। যেসব ঘটনার ভয়ঙ্করতার মাত্রা কম-বেশি যাই থাক না কেন তিনি একজন শান্তিবাদীর জন্য সে সময়কার সবচেয়ে কঠিন একটি প্রশ্নের মোকাবিলা করছিলেন। প্রশ্নটি ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা যায় কি যায় না। ৪৫ বছর আগে মাস্তের অবস্থান নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি তারই একটি সাবধান বাণী উদ্ধৃত করে বলেছিলাম, একটি যুদ্ধের পরে বিজয়ীকে নিয়েই সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দেখা দেয়। বিজয়ী মনে করেন, যুদ্ধ এবং সংঘাত থেকে যে কিছু অর্জিত হয় তা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন। কে তাকে ভিন্ন কোনো ছবক দেবে? তার পর্যবেক্ষণ সে সময়কার বাস্তবতায় যথার্থই ছিল। ইন্দোচীনের যুদ্ধ তখন ভয়ঙ্কর পর্যায়ে। পরবর্তী সময়েও জাতীয় আরো অনেক ঘটনাই ঘটেছে
ফ্যাসিবাদীদের নির্মম নিষ্ঠুরতাকে বিবেচনায় নিয়ে সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, যুদ্ধে মিত্র শক্তির অবস্থান ভালো ছিল না। পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর ওপর হামলা চালানোর আগে পর্যন্ত ফ্যাসিবাদীদের কর্মকান্ডকে অনেকটা সহানুভূতির দৃষ্টি দিয়েই দেখা হয়েছে। বিশেষ করেইতালীয় সেই ভদ্রলোকমুসোলিনির তো প্রশংসাই করা হতো। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর হিটলারকেও একজন মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচনা করে বলেছিল, চরম ডান এবং বামদের থেকে তার অবস্থান একেবারেই আলাদা
ব্রিটিশরা বিশেষ করে ব্রিটেনের বণিক গোষ্ঠীও এদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ছিল। রুজভেল্টের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সামার ওয়েলস প্রেসিডেন্টকে জানান, চেকোস্লোভাকিয়াকে ভাগাভাগি করে ফেলা মিউনিখ চুক্তি বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সামনে নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে, যে ব্যবস্থাটি ন্যায় এবং আইনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। আর নতুন এই বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যপন্থী নাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ১৯৪১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে যুদ্ধোত্তর পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রভাবশালী কূটনীতিক বার্লিনে নিযুক্ত কনস্যুলার জর্জ কেনান লিখেছিলেন, জার্মান নেতারা এটা কোনোভাবেই চান না যে, অন্য কোনো দেশের মানুষ জার্মান শাসনাধীনে নির্যাতন ভোগ করুক। তাদের শাসনাধীনে নতুন মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে, এটিই এখন তাদের ভাবনার বিষয়। আর জাতীয় একটি নিরুপদ্রব পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে বড় ধরনের ছাড় দিতেও তারা প্রস্ত্তত
হলোকস্টের কথা ততদিনে সর্বত্র জানাজানি হয়ে গেলেও তখনো পর্যন্ত এই অপরাধকে পুরোপুরিভাবে ন্যুরেমবার্গ বিচারের আওতায় আনা হয়নি। ন্যুরেমবার্গ আদালতে এই ঘটনার আগ্রাসী চরিত্রের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ এই অপরাধ অন্য যে কোনো যুদ্ধাপরাধের চেয়ে আলাদা। এটি এমন একটি ঘটনা যেখানে সব ধরনের অপরাধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ইন্দোচিন, ইরাক এবং আরো অন্যান্য স্থানে সংঘটিত অপরাধের ঘটনাগুলো নিয়েও আমাদের চিন্তাভাবনা করার অবকাশ রয়েছে। যুদ্ধোত্তরকালে সম্পাদিত চুক্তিগুলো জাপানি ফ্যাসিবাদীদের ভয়াবহ নৃশংসতার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ৮০ বছর আগে মুকদেন ঘটনা দিয়ে জাপানি আগ্রাসনের শুরু। কিন্তু পাশ্চাত্যের আগ্রাসন শুরু আরো ১০ বছর পর। সময় দুটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এশিয়ায় জাপান কর্তৃক সংঘটিত অপরাধসমূহ আমলে না নেওয়ার কারণে ভারতসহ বেশ কয়েকটি এশীয় দেশ ১৯৫১ সালে সানফ্রান্সিসকো শান্তি চুক্তি আলোচনায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। বিরত থাকার আরো একটি কারণ ছিল ওয়াশিংটন কর্তৃক ওকিনিওয়াতে বড় ধরনের একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ঘটনা। স্থানীয় অধিবাসীদের প্রচন্ড প্রতিবাদ প্রতিরোধ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সেই ঘাঁটিটি এখনো সেখানে বহাল রয়েছে
পার্ল হারবারে আক্রমণ ঘটনার আলোকে কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া সমীচীন মনে করছি। এর একটি হলো ২০০৩ সালের মার্চে বাগদাদের ওপর বোমাবর্ষণ ঘটনায় ঐতিহাসিক এবং কেনেডির উপদেষ্টা আর্থার শ্লেসিঞ্জারের প্রতিক্রিয়া। পার্ল হারবারে জাপানের বোমাবর্ষণের ঘটনায় রুজভেল্ট যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন সেটিকেই উদ্ধৃত করে শ্লেসিঞ্জার বলেন, এটি এমন একটি দিন যা মানব জাতির ইতিহাসে কলঙ্কিত এক তারিখ হিসেবে টিকে থাকবে। আর আমাদের সরকারও সাম্রাজ্যবাদী জাপানেরই নীতি অনুসরণ করায় শ্লেসিঞ্জার লিখছেন, আজকের দিনে আমরা আমেরিকানরাও কলংকের মধ্যেই বেঁচে আছি। শ্লেসিঞ্জারের এই উপলব্ধি মূল ধারার কারো মধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে না এবং জাতীয় চিন্তা-ভাবনাকে প্রসারিতও হতে দেওয়া হয় না। কয়েক বছর আগে শ্লেসিঞ্জার যখন মারা যান তখনো কাউকে তার প্রশংসা করতে গিয়ে নৈতিক গুণটির কথা উল্লেখ করতে দেখলাম না। শ্লেসিঞ্জারের এই বেদনাবোধটি নিয়ে আর কয়েক কদম হাঁটলে আমরা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে আরো অনেক কিছুই জানতে পারব। আজকের বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে বলতে হয় জাপানের সেদিনের সেই আক্রমণটি যৌক্তিকই ছিল। এমনকি বলা চলে, দূরদর্শিতাপূর্ণই ছিল। কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ, হাওয়াই এবং ফিলিপাইনের দুটি সামরিক ঘাঁটিতে জাপান যে বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেটি ছিল তার বহুল প্রচারিতআক্রমণই আত্মরক্ষার প্রধান কৌশলনীতির ফল। তবে ২০০৩ সালে বুশ এবং ব্লেয়ার জাপানের সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে যেসব অজুহাত খাড়া করেছিলেন জাপানের আক্রমণাত্মক হওয়ার সেদিনকার সেই কারণটি ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি যৌক্তিক। জাপানি নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, বি-১১ এফএফ যুদ্ধবিমান বোয়িং বিমান সংস্থারই তৈরি করা বিমান। মার্কিন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে তারা এও জানতে পেরেছিলেন, এসব যুদ্ধবিমান টোকিও নগরীর খবরের কাগজ আর কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরবাড়িগুলো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। (চলবে)