Politics 2012 লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Politics 2012 লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৯ মে, ২০১২

হিলারির সফর ও বাংলাদেশের ‘কৌশলগত’ তাৎপর্য


যত দূর জানা যায়, হিলারি কিনটন বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে আসেননি, অর্থাৎ যে সময় শেখ হাসিনা তাকে চেয়েছেন সেই সময় নয়, ডক্টর ইউনূস নিয়ে টানাপড়েন একটা কারণ ছিল। এমনকি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরপরই তাঁকে বাংলাদেশে আনবার চেষ্টা চলছিল। এই বছর মে মাসে চীন থেকে কলকাতা হয়ে দিল্লি যাবার পথে মাঝখানে ছুটির দিনে বাংলাদেশ সফরে আসার দিনক্ষণ হিলারি নিজেই নির্ধারণ করেছেন। আসার পর তিনি প্লেন থেকে নেমেছেন দেরি করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি তাঁর জন্য যে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন, হিলারি তাতে শামিল হননি। অনেকে ধরে নিয়েছেন তিনি সরকারের কাছ থেকে একটা দূরত্ব বজায় রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু এটা ঠিক নয়। গুম, হত্যা ও মানবাধিকার নিয়ে তিনি উদ্বেগ দেখিয়েছেন, শাসনরীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাতও তার ভালো লাগেনি, সেটাও বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। এটা তো বলতেই হবে, কারণ বাজারব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে হলে আইনের শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। কিন্তু এহ বাহ্যÑ এগুলো বাইরের দিক। শেখ হাসিনা বিরক্তির কারণ হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্্েরর সামরিক ও নিরাপত্তাস্বার্থের নির্ভরযোগ্য মিত্র। গুম ও গুম-খুনের আতঙ্ক যখন চার দিকে এবং রাজনীতির তাপ যখন টগবগ করছে, তখন হিলারির এই সফর শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি সমর্থন অবশ্যই। অন্য দিকে বিএনপিও আন্দোলনের মাঠ থেকে পিছু হটেছে। শুধু পিছুই হটেনি, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ায় তারা পালিয়ে থেকেছেন। হিলারি কিনটনকে খুশি করবার জন্য বিএনপি দেখাতে চেয়েছে তাদের ও তাদের অন্তর্ভুক্ত জোটের নেতাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কারণে দায়ের করা অন্যায় মামলা তাঁরা জনগণকে নিয়ে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলা করবেন না, করবেন আইনি ভাবে। আমরা আইন মেনে চলিÑ হিলারি কিনটনের কাছে এই ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন তাঁরা। আদালত দলীয় স্বার্থ রক্ষা করে, এই অভিযোগ তাঁদের। অথচ এই দলীয় আদালতের কাছেই জামিনভিক্ষা করছেন এখন। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকে দেখলে বিরোধী দলের এই রূপ দেখবার সুযোগও করে দিয়েছেন হিলারি। এগুলো ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নগদ ফল। মেঘ না চাইতেই জল।
এ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয় শুধু নগদ জিনিস শেখ হাসিনার হাতে ধরিয়ে দিতে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। কিম্বা শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি একধরনের শীতলতা দেখেও মনে হওয়ার কারণ নাই যে তিনি বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অবশ্যই দিচ্ছেন। শেখ হাসিনার সরকারের ওপর বা আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে শেখ হাসিনার শাসনে তিনি সন্তুষ্ট না-ও থাকতে পারেন, সেটা হতেই পারে, কিন্তু বাংলাদেশকে তিনি গুরুত্ব দিতে বাধ্য। সেটা অবশ্য বাংলাদেশে হিলারি কিনটনের বক্তব্য থেকেই আমরা বুঝতে পারি। তিনি নিজেই বলেছেন, বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক বা ‘কৌশলগত’ দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই কথা তিনি বাংলাদেশের পিঠ চাপড়িয়ে দেবার জন্য বলেন নি। তার এই কথার মর্ম আমাদের ভালো ভাবে বোঝা দরকার।
‘কৌশলগত’ কথাটির মানে এই কালে শুধু সামরিক অর্থে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের প্রাচীন ধারণা দিয়ে বুঝলে হবে না। কিম্বা দুনিয়া যখন সমাজতান্ত্রিক আর পুঁজিতান্ত্রিক শিবির নামে দুই শিবিরে বিভক্ত ছিল, যাদের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বা লেনদেন ছিল না বললেই চলে... তখনকার স্নায়ুযুদ্ধের মোটা দাগের বিবেচনা দিয়েও বোঝা যাবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু নয়, কোন রাষ্ট্রেরই প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কৌশলের মর্ম আমরা এখন সাদাকালো কায়দায় দাগ টেনে, সরল ভাবে ভূখণ্ডগত বিভাজন, কিম্বা রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের পরিচিত শত্রুতা মাথায় রেখে বুঝতে পারব না। স্ফীতি ও পুঞ্জীভবনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পুঁজির বিপুল গোলোকায়ন ঘটেছে। তাতে দুই শিবিরে বিভক্ত দুনিয়ার জায়গায় এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটেছে। প্রতিটি দেশই দুনিয়াজোড়া বিস্তৃত একই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনস্থ। অতএব প্রতিটি দেশকেই নিজ নিজ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এই বিশ্বব্যবস্থার অধীন থেকেই সন্ধান করতে হবে। তার বাইরে গিয়ে নয়।
এই কারণেই হিলারি কিনটনের সফর নিয়ে আমার এর আগের লেখায় আমি বলেছি, “তাঁর বাংলাদেশ সফরকে দিল্লি-ঢাকা-ওয়াশিংটন মিলে চীনের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তোলার সফর হিশাবে যদি আমরা দেখি তাহলে সেটা খুবই সরল ভাবে দেখা হবে। বাংলাদেশ ভারতের সমরনীতি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার অধীনস্থ একটি দেশ। সেই ক্ষেত্রে দিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কই তো যথেষ্ট। তার বাইরে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক ‘রাজনৈতিক-সামরিক নিরাপত্তা’ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন ঘটল কেন? কী দরকার প্রতি বছর নিয়মিত সরকার ও রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে নিরাপত্তাসহ সকল বিষয় নিয়ে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা এবং সেই সংলাপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার চেষ্টা? হিলারির সফরের গুরুত্ব এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে নিহিত।”


বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা মার্কিন নীতিনির্ধারকরা নতুন ভাবছেন এমন নয়। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রচনা মার্কিন স্বার্থের অনুকূলÑ এই চিন্তা সম্প্রতি দানা বেঁধেছে। তা নিয়ে গত কয়েক বছরে আলাপ-আলোচনাও চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এই দেশগুলোর মধ্যে তিনটি দেশই সামুদ্রিক দেশ বা সমুদ্রসংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র। ভারত মহাসাগর দিয়ে দুনিয়ার সমুদ্রগামী জাহাজের মধ্যে প্রায় ৫০ ভাগ চলাচল করে, পণ্য ও জ্বালানি বোঝাই জাহাজগুলো চলাচল করে ৭০ ভাগ। সেই দিক থেকে সমুদ্রের ওপর আধিপত্য ও দখলদারি বহাল রাখার ওপর শক্তিশালী দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নির্ভর করে। বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে ততোই একটি দেশের পক্ষে একা ও একচ্ছত্র ভাবে দখলদারি ও আধিপত্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় সমুদ্রসংশ্লিষ্ট ছোটদেশগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে।
সমুদ্রের গুরুত্ব বেড়ে যওয়ার সঙ্গে যুক্ত এই বছরের জুনে বারাক ওবামার ঘোষিত নতুন সমরনীতি। এই সমরনীতি ঘোষণার জন্য ওবামা এই বছরটা বেছে নিয়েছেন কারণ এটা নির্বাচনের বছর। তিনি বিপুলভাবে মার্কিন সামরিক বাজেট কাটছাঁট করেছেন। এই নতুন সমরনীতির প্রথম কথা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনোযোগ দেবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। দুই. মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী মার্কিন উপস্থিতি থাকবে, কিন্তু ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ করবার জন্য বিপুল সংখ্যায় যে সেনাবাহিনী দেখা গিয়েছিল অতো সেনাবাহিনী থাকবে না। মার্কিন সেনাবাহিনী হবে ছোট এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নির্ভর করবে সমুদ্রে ও আকাশে আধিপত্য নিশ্চিত করবার মধ্য দিয়ে। বিশেষত হরমুজ প্রণালি ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন ও ইরানকে প্রতিহত করবার ক্ষেত্রে প্রস্তুত থেকে। পেন্টাগনে ওবামা যখন তার নতুন সমরনীতি ঘোষণা করেছিলেন তখন বলছিলেন, ‘এক দশকের যুদ্ধের যে ইতিহাস সেই ইতিহাসের পাতা আজ আমি উল্টালাম... এ হচ্ছে পালাবদলের এক মুহূর্ত’। মার্কিন সেনাবাহিনী এখন ছোট হবেÑ এটাই তার সিদ্ধান্ত। মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেট তিনি কেটেছেন বিপুল ভাবে। মার্কিন অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার জঞ্জাল সাফ করা দরকার মনে করেছেন তিনি। যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের মনোভাবকে নির্বাচনের আগে নিজের পক্ষে নেবার ক্ষেত্রে এই কাটছাঁট ও নতুন সমরনীতি কতটা কাজ করে সেটা আমরা আগামি মার্কিন নির্বাচনেই দেখব। বাংলাদেশে হিলারি কিনটনের আগমন মার্কিন নির্বাচন ও নতুন মার্কিন সমরনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
গত বছর অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব সময় একটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ (Pacific nation)। এশিয়ার অভিবাসীরাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তুলেছে। বলেছেন, ‘এখানে আমি ভবিষ্যৎ দেখি, দুনিয়ার এই অঞ্চলটাই অর্থনৈতিক ভাবে সবচেয়ে দ্রুত বেগে বেড়ে উঠেছে, দুনিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অর্ধেকেরও বেশি এখানে ঘটছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলই আমার সংকল্পের সর্বোচ্চ সংকল্প বাস্তবায়নের পথ, আর সেটা হচ্ছে মার্কিন জনগণের জন্য চাকরি ও সুযোগ সৃষ্টি করা। এখানেই দুনিয়ার অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তি এবং এখানেই দুনিয়ার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ। এশিয়াই ঠিক করবে আগামি শতাব্দি সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত হবে, নাকি সহযোগিতার পথ গ্রহণ করবে, নিরর্থক কষ্টভোগের কারণ হবে, নাকি হবে মানবপ্রগতির।’ তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হিশাবে তিনি এই সজ্ঞান ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ হিশাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়াতেই শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা রাখবে।
ওবামা ঠিক ধরেছেন যে দুনিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিশাল যজ্ঞ চলছে এশিয়ায়। পুঁজি ধেয়ে আসছে এ দিকে, বিশেষত চীনে। পুঁজির এই ধেয়ে আসা বা স্থানান্তর এমন নয় যে পুঁজি আবার ফিরে যাবে ইউরোপে বা আমেরিকায়।
ইউরোপীয় ও মার্কিন অর্থনীতির যে দুর্দশা তাতে এক দিকে ইউরোপের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অর্থনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে। পৃথিবী এককেন্দ্রিক থাকছে না, সেখানে অন্যান্য শক্তিশালী দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হবে। এই সকল বাস্তবতার আলোকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন ভাবে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়েছে। বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় ছোট দেশগুলোকে ভারতের সামরিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের অধীন রেখে এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ বজায় রাখা সম্ভব কি নাÑ এই দিকটি নতুন করে ভাবতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হচ্ছে। বুঝতে হবে, নিজের তাগিদেই হিলারি কিনটন বাংলাদেশে এসেছেন, সাম্রাজ্যবাদী মোড়লির জন্য যতোটা তার চেয়ে অনেক বেশি এশিয়ায় মার্কিন মোড়লির দুর্বলতায় তাপ্পি মারার জন্য। আগে যেসব দেশের কোন কৌশলগত মূল্য তাদের কাছে ছিল না, আজ তারাই হঠাৎ মূল্যবান হয়ে উঠেছে।


এই দিক থেকে বিচার করলে রাজনৈতিক সামরিক ধারণা হিশাবে বাংলাদেশের ‘কৌশলগত’ অবস্থানের মূল্য ও ব্যাপ্তি এখন অনেক বিস্তৃত। বড় পরিসরেই তাকে বুঝতে হবে। পুঁজিতান্ত্রিক গোলোকায়ন এশিয়ার ‘কৌশলগত’ অবস্থানে রূপান্তর ঘটিয়েছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির মন্দা এবং যেখানে মুনাফা বেশি সেখানে পুঁজির চলে যাবার স্বভাব। পুঁজি এশিয়ার দিকে আসছে, কিন্তু প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়, বিনিয়োগের জন্য। তার ওপর রয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানে কার্যত মার্কিন পরাজয় এবং অর্থনৈতিক কারণে মার্কিন সেনাবাহিনীর ছোট হয়ে যাওয়া। বেড়েছে স্থলযুদ্ধের চেয়ে সমুদ্র ও আকাশ যুদ্ধে মনোযোগ এবং তার কারণে সমুদ্র ও আকাশও এখন নিরাপত্তা বিবেচনার দিক থেকে আগের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হিলারি কিনটন বাংলাদেশের ‘কৌশলগত’ অবস্থানের গুরুত্ব জানেন। এই গুরুত্ব শুধু ‘ভূকৌশলগত’ (geo-strategic) নয়, ওপরের আলোচনা থেকে এটা আশা করি পরিষ্কার। এমনকি নতুন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূগোলও নতুন তাৎপর্য লাভ করছে। যেমন, ভূকৌশলগত দিক থেকে বঙ্গোপসাগর আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এখন। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রের ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে তীব্র হয়েছে। সামুদ্রিক সম্পদ যেমন তেল ও খনিজ পদার্থের ওপর দখলদারি বজায় রাখার দিক তো আছেই। নিরাপত্তার দিক থেকেও সমুদ্র গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর নিয়ে যে কারণে কথা উঠেছে। বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হিলারি কিনটন সরাসরি উত্তর না দিয়ে তার গুরুত্বের কথা এড়িয়ে গিয়েছেন। বরং উত্তরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের জিরো টলারেন্সের তারিফ করেছেন। বাংলাদেশকে কেউ প্রশিক্ষণের জন্য কিংবা এর ভূখণ্ড বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার করতে পারে নি। বাংলাদেশ ঠিক কোন অর্থে কৌশলগত তাৎপর্য লাভ করেছে সেটা তিনি আর ব্যাখ্যা করে বলেন নি। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক আগের মতো দেখছে না বরং বিশেষ নজরে দেখতে শুরু করেছে, সেটা তার কথায় তবুও বোঝা গিয়েছে।
বাংলাদেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুনভাবে বিবেচনা করছে সেটা হিলারি আসার আগে থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি রবার্ট ব্লেইক ঘুরে গেলেন ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখে, রাজনৈতিক বিষয় দেখাশুনা করবার দফতরের আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি আর শেরম্যান এলেন এপ্রিলের ৫ তারিখে। তারপর রাজনৈতিক-সামরিক বিষয় দেখাশোনা করার দফতরের অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি অ্যান্ড্রু জে. শাপিরো হিলারি কিনটন আসার মাত্র কিছু দিন আগেই ১৯ এপ্রিলে ঘুরে গেলেন। যারা এসেছেন এবং মার্কিন যে দফতরগুলোর পক্ষে এসেছেন তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল হিলারি কিনটনের এই সফরের পেছনে কৌশলগত তাৎপর্যের তাগিদ রয়েছে প্রবল। অনুমান করা যায় বাংলাদেশের কৌশলগত তাৎপর্য অর্জনের মানে হচ্ছে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। যে ভূমিকা ভারতের আঞ্চলিক ভূমিকা থেকে আলাদা। এখানে সেই দিকটা নিয়ে কিছু কথা বলে শেষ করব।


প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। তবে রাজনৈতিক-সামরিক অর্থে বিস্তৃত পরিসরে ‘নিরাপত্তা’ সম্পর্ক তৈরির প্রচেষ্টা নতুন। অ্যান্ড্রু শাপিরো যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন তখনই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক-সামরিক দিক থেকে নিরাপত্তা বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সংলাপের আরম্ভ। এই আলোচনাকেই ‘পার্টনারশিপ ডায়ালগ’ নামে দিপাক্ষিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে এখন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হোল মাত্র। শাপিরোর সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে প্রথম যে সংলাপ হয়েছিল তাকে ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ নিরাপত্তাবিষয়ক সংলাপ’ হিশাবেই আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের তথ্য বিভাগ বলছে, এই সংলাপ ‘দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ব্যাপ্তি, গভীরতা ও শক্তি এবং একই সাথে এ অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে আমাদের সম্মিলিত সংকল্পের প্রতিফলন’। এর উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে কর্মপরিসরের বিস্তৃতি এবং এর সাথে আমাদের প্রতিরক্ষাবিষয়ক সম্পর্কের উন্নয়ন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ নিরাপত্তা সংলাপ বিস্তৃত পরিসরে রাজনৈতিক-সামরিক বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার কাজকে এগিয়ে নেবে এবং শান্তি রক্ষায় অংশীদারিত্ব, যৌথ সামরিক অনুশীলন ও বিনিময়, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে’ (দেখুন, মার্কিন দূতাবাস http://photos.state.gov/libraries/bangladesh/861/2012/%20Press% 20Releases/US-BD% 20Security%20Dialogue_%20Apr%2019_%202012.pdf)
বাংলাদেশের কৌশলগত তাৎপর্যের ব্যাপকতা খানিক এখান থেকে বোঝা যায়। তবে মার্কিনি স্বার্থ আরো ভালো ভাবে বোঝার জন্য গত ২৪ এপ্রিল অ্যান্ড্রু শাপিরো ওয়াশিংটনে কার্নেগি এনডোমেন্ট নামের একটি মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তার ঢাকা-দিল্লি সফর নিয়ে যে আলোচনা করেছেন, সেখান থেকে আরো কিছু জানতে পারি আমরা। আগেই বলেছি তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের রাজনৈতিক-সামরিক স্বার্থ দেখাশোনা করেন। শাপিরো এপ্রিলে ঢাকা ও দিল্লি ঘুরে গিয়েছিলেন। তার সফরের উদ্দেশ্য ছিল দিল্লি ও ঢাকার সঙ্গে রাজনৈতিক-সামরিক আলোচনা শুরু করা, যেন দুই দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতার দ্বিপাক্ষিক জায়গাগুলো চিহ্নিত করা যায় এবং মার্কিন স্বার্থে দরকারি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়। খেয়াল করতে হবে ত্রিপক্ষীয় কোন সহযোগিতার কৌশল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিচ্ছে না। দুটি দেশের সঙ্গেই আলাদা আলাদা ভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়তে চাইছে। শাপিরো যখন ঢাকা সফর করছিলেন তখনই বোঝা যাচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত প্রশ্নে উচ্চপর্যায়ে রাজনৈতিক-সামরিক সংলাপ চালাতে আগ্রহী। এই সংলাপকে ‘পার্টনারশিপ ডায়ালগ’ বলা হচ্ছে এখন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সকল ক্ষেত্র নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ। মার্কিন সামরিক স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নই এখানে প্রধান ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।
শাপিরো তার সফরের উদ্দেশ্য ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘এই সফরের মধ্যে এই সত্যও বোঝা যাবে যে আমাদের সঙ্গে অংশীদারদের জড়িত করবার জন্য আমরা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা-সম্পর্ক রচনার হাতিয়ার ব্যবহার করেছি।’ অর্থাৎ বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রচনার ধরণ এক নয়, ভিন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক আচার কিভাবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত হয়ে গিয়েছে তার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
(দেখুন, http://carnegieendowment.org/ 2012/04/24/roundtable-with-assistant-secretary-of-state-andrew-shapiro/aib7)
ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ২০০৫ সালে। এর পর থেকে ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক নিবিড় ও গভীর হয়েছে। বছরে দুই দেশের সামরিক মহড়ার সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি ছাড়িয়ে গিয়েছে। সমরাস্ত্র ও সামরিক যন্ত্রপাতির বেচাবিক্রি যেখানে শূন্য ছিল, সেটা এখন ৮ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে সমরাস্ত্র বেচাকেনা বেড়েছে। শাপিরো জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানান ধরণের ব্যবহারের উপযোগী সামরিক উড়োজাহাজ কিনেছে। তার মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে নজরদারি করবার জন্য আটটা পি-৮১ নামের সামরিক উড়োজাহাজ, সামরিক কাজে মাল আনানেওয়ার জন্য সি-১৩০-জে নামের ছয়টি বিমান এবং সামরিক প্রয়োজনে স্থানান্তরের উপযোগী সি-১৭ নামের ১০টি উড়োজাহাজ। সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বেচাবিক্রির এই সম্পর্ক আরো বাড়বে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কও শাপিরোর ভাষায় গত এক দশকের মধ্যে এক জবরদস্ত (robust) রূপ নিয়েছে। নিরাপত্তার দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে কী চায়? শাপিরোর বক্তব্য থেকে বোঝা যায় তিনটি জিনিস চাইছে মার্কিনিরা :
এক. বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রথম যে জিনিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় সেটা হচ্ছে কাউন্টারটেররিজম বা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু শ্রেণি, শক্তি বা গোষ্ঠিগুলোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে লড়াই চালিয়ে যাবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো কঠোর ও শক্তিশালী হোক। লড়াই সে চালিয়ে যাক। এর সঙ্গে গণমাধ্যম ও সুশীলসমাজকে যুক্ত করুক। এই ক্ষেত্রে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা তৎপরতার দক্ষতা ও ক্ষমতা আরো বাড়–ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা-ই চায়।
দুই. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বা দেশে দেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করবার জন্য বাংলাদেশের জাতীয় সেনাবাহিনী যেন একটি দক্ষ ভাড়াটিয়া সৈন্য হিশাবে গড়ে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে স্থলবাহিনীকে তার সমরনীতির নির্ধারক অবস্থানে রাখতে চাইছে না বা আর্থিক সংকটের কারণে রাখতে পারছে না। শান্তিবাহিনী সেই ক্ষেত্রে কিছুটা অভাব পূরণ করবে, বাংলাদেশকে এখন অভাব পূরণে আরো বেশি অবদান রাখতে হবে।
তিন. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নিরাপত্তাস্বার্থ নিশ্চিত করবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রধান ভূমিকা পালন করুক; দুই হাজার পাঁচ সালে বাংলাদেশ ‘বিদেশি সেনাবাহিনীকে অর্থায়ন’-এর আওতায় যে সহায়তা নিয়েছে বাংলাদেশ তা জলসীমা পাহারা দেবার জন্য জাহাজ বানাতে ব্যয় করেছে। এতে সমুদ্রের নিরাপত্তা বাড়বে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাজে আসবে আর যেসব এলাকায় যাওয়া কঠিন সেইসব এলাকা নজরদারির মধ্যে আনা যাবে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শক্তি ও দক্ষতা বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
চার. আরেকটি অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পুরানা সমরাস্ত্র খালাস করতে চাইছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেসকল সমরাস্ত্র পুরানো বা বাড়তি সেই সকল অস্ত্রশস্ত্র ‘বাড়তি প্রতিরক্ষা উপকরণ কর্মসূচি’-র নামে বাংলাদেশকে গছিয়ে দিতে চায় তারা। শাপিরো জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ‘আধুনিক’ হতে চায়। তারা অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহকারীদের তত্ত্বতালাশ করছে। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবসার একটা সুযোগও বটে।
ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকার পরেও দুই দেশের সম্পর্ক নিরাপত্তার প্রশ্নে মসৃণÑ এটা দাবি করা যাবে না। জ্বালানি সম্পর্কের কারণে ভারতের ইরাননীতি যুক্তরাষ্ট্রের ইরাননীতি থেকে আলাদা। সিরিয়ার প্রশ্নেও দিল্লি ও ওয়াশিংটন এক সুরে কথা বলে না। চীনের প্রশ্নে অভিন্নতা থাকলেও দিল্লির নিজের কৌশলগত স্বার্থ আছে, যাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ থেকে আলাদা করে বিচার করাই সঙ্গত। ঠিক এই সকল কারণেই আমি আগের লেখায় বলেছিলাম, ‘চীনকে সামাল দেওয়ার একটা চিন্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ভারতের আছে। শুধু এই দিকে নজর নিবদ্ধ রাখলে মার্কিন পররাষ্ট্র সম্পর্কের নীতিগত ও কৌশলগত কোনো পরিবর্তন ঘটছে কি না সেটা আমরা ধরতে পারব না।’
হিলারি কিনটনের সফরের এই তথাকথিত ‘পার্টনারশিপ ডায়ালগ’ যদি কোন অর্থ বহন করে তা হচ্ছেÑ বিশ্বব্যবস্থায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য হারিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছোট দেশগুলোর ওপর তাদের নিরাপত্তার দায় চাপিয়ে দিতে চাইছে। এই উদ্দেশ্যেই নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
এর ফল কী দাঁড়ায় তা এখনি বলার সময় হয় নি। এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কৌশলগত অবস্থান ও সম্পর্ক বদলাচ্ছেÑ এটাই এখনকার জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
farhadmazhar@hotmail.com
৮ মে ২০১২। ২৫ বৈশাখ ১৪১৯। শ্যামলী।

শনিবার, ৫ মে, ২০১২

হিলারি ক্লিনটনের স্মার্ট পাওয়ার অ্যাপ্রোচ


হিলারি ক্লিনটন শুধু বাংলাদেশে আসছেন না। প্রথমত তিনি আসছেন চিন থেকে। তারপর তিনি আসবেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশ থেকে যাবেন ভারতে। কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির সঙ্গেও দেখা করবেন।তার বাংলাদেশ সফরকে দিল্লী-ঢাকা-ওয়াশিংটন মিলে চিনের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তোলার সফর হিশাবে দেখতে চাইছেন অনেকে। এটা খুবই সরল ভাবে দেখা। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা এবং ভাঙন বেসামাল হয়ে পড়ছে প্রায়ই। এর কারণে শক্তিশালী দেশগুলোর সামরিক ও নিরাপত্তা ভাবনা নতুন বাস্তবতায় বদলাচ্ছে। এর রূপ ঠিক কী দাঁড়াবে সেটা এখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। চিনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতাও আগের মতো তীব্র নয় এবং এই বৈরিতা চিরস্থায়ী হবে সেটাও আগাম অনুমান করা অসম্ভব। এটা ঠিক যে নিজ নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ টিকিয়ে রাখবার জন্য শক্তিশালী দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সব সময়ই ছিল, আছে এবং থাকবে। সন্দেহ নাই, সেই ক্ষেত্রে চিনকে সামাল দেওয়ার একটা চিন্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ভারতের আছে। শুধু এই দিকে নজর নিবদ্ধ রাখলে মার্কিন পররাষ্ট্র সম্পর্কের নীতিগত ও কৌশলগত কোন পরিবর্তন ঘটছে কিনা সেটা আমরা ধরতে পারব না। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন একতরফা ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য ছেড়ে দেবে, এটা ভাবাও ঠিক নয়। ফলে এই তিনটি দেশের স্বার্থের ঐক্য এবং বিরোধ দুটো দিকই নজরে রাখা দরকার।
যারা বলছেন, এই সময়ে হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশে আসা শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেবারই নামান্তর, তারা খুব ভুল বলছেন না। বিশেষত এর আগে না আসবার কথা বলে এবং এই বিশেষ অস্থির রাজনৈতিক সময়টা বাংলাদেশে আসার জন্য বেছে নিয়ে হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারকে বিদ্যমান রাজনৈতিক বিবাদে সমর্থনই জোগালেন। অথচ বিএনপি ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের নেতৃস্থানীয় প্রায় সকলের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকার পরেও বেগম খালেদা জিয়া বিদেশি মেহমানদের সম্মানে কোন কঠোর কর্মসূচি দিলেন না। তার সঙ্গে হিলারি কিনটন সাক্ষাৎ করবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাত যেন বেসামাল না হয় সেই ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন অবশ্যই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক উত্থান পতনের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়। বিদেশি শক্তিগুলো এই কারণেই রাজনৈতিক সংঘাত সীমা ছাড়িয়ে গেলে বিচলিত হয়। অন্যদিকে দুই পক্ষের এই সংঘাতের সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটা গুণগত স্তরে উন্নীত করার চেষ্টাও করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেখা যাক কী দাঁড়ায়।

২.
চিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। পারমাণবিক শক্তি ও অস্ত্রের ক্ষমতাসম্পন্ন ভারত, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্্েরর মধ্যে সামরিক ও নিরাপত্তা চুক্তি ও সম্পর্ক পুরামাত্রায় বহাল রয়েছে। এগুলো জানা জিনিস। কিন্তু সামরিক শক্তির অবস্থা ও ভারসাম্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটছে সেইসবও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। যেমন : নৌ বাহিনীর শক্তি বা সমুদ্রের ওপর দখলদারি ও সামরিক আধিপত্য বজায় রাখবার শক্তি। সামরিক শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দিকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। হিলারি কিনটনের এই সফরের মাত্র কিছুদিন আগে ভারত দূর পাল্লার পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন বালিস্টিক মিসাইল অগ্নি-৫ সফল ভাবে পরীক্ষা করেছে। নিজের সামরিক ক্ষমতার উত্তরোত্তর বিকাশ ঘটাতে সক্ষম সেটা দিল্লী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন উভয়কেই জানান দিল। সুস্পষ্ট ভাবেই সেটা প্রদর্শন করা হোল। এটা হোল হিলারি সফরে আসার আগে এক ধরনের সরব ঘোষণার মতো। এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভারত বেইজিং ও সাংহাইয়ে পারমাণবিক আক্রমণ চালাতে সক্ষম। যে অল্প কয়েকটি দেশ দূর পাল্লার পারমাণবিক হামলা চালাতে সক্ষম ভারত এখন তাদের কাবে যোগ দিল। দেশগুলো হচ্ছে চিন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিবারের সদস্য হোল এখন ভারত। ফলে সামরিক ও নিরাপত্তার প্রশ্ন সরল ভাবে আলোচনার বিষয় নয়। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের সম্পর্কের জটিলতাকে বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করাই সুবুদ্ধির লক্ষণ।
চিনে মার্কিন রাষ্ট্রবিষয়ক সেক্রেটারির সঙ্গে থাকবেন তাদের ট্রেজারি সেক্রেটারি টিমথি গ্রেইথনার। তারা এখন সভা করছে উপ-প্রধানমন্ত্রী ওয়াং কিশান এবং রাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দাই বিনগগু-ওর সঙ্গে। এটা চিন-মার্কিন চতুর্থ সামরিক কৌশল ও অর্থনৈতিক বিষয়ে চতুর্থ দফা পরামর্শ সভা (US- chi na strategic and Economic Dialogue (s & ED)। এই সভা দুই দেশের জন্য যোগাযোগ বাড়ানো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন এবারের সভার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে দুই দেশের ‘পুরা সরকার’ (whole of government) এই সভায় অংশগ্রহণ করবে। মন্ত্রী ও সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির প্রতিনিধিরা এখানে থাকবেন। হিলারি আরেকটি খুব উঁচু পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সভায় যোগ দেবেন চিনাদের সঙ্গে। সেটা হচ্ছে ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ’ বাড়াবার পরামর্শ সভা। মার্কিন আর চিনা নাগরিকদের মধ্যে সংস্কৃতি, শিক্ষা, খেলাধুলা, বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল এবং নারী প্রসঙ্গ নিয়ে আরও বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ বাড়াবার পরামর্শ ও পরিকল্পনার জন্য এই সভা। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া নুলান্ড এটাও জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এক ‘জবরদস্ত’ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিাত চুক্তিও হিলারি ঢাকায় পর্যালোচনা করবেন। তবে সেটা চূড়ান্ত কোন চুক্তিতে পৌঁছাবে কিনা তা জানান নি।
পশ্চিম বাংলার কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির সঙ্গেও দেখা করবেন হিলারি। মমতা ক্ষমতায় আসার পর কী উন্নতি ঘটল তার খোঁজখবর নেবেন বলে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া ওবামা প্রশাসনের সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে খবর দিয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে উন্নতি হয়েছে তাতে বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ছাড়া আরো অনেক সুবিধা তৈরী হয়েছে। মমতা কিভাবে সেইসব কাজে লাগাবেন সেটা সম্ভবত শুনতে চাইবেন হিলারি। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বরাত দিয়ে যেসব খবরাখবর শোনা যাচ্ছে তাতে এই ধরনের অস্পষ্ট আওয়াজ ছাড়া বিশেষ কিছু এখনো জানা যায় নি। মমতা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার কী সুযোগ নিতে চান বা চাইবেন সেটা হিলারি কিনটন জানতে চাইতেই পারেন এবং সেখানে বাংলাদেশ, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন সাধারণ স্বার্থ নিহিত আছে কিনা সেটা জানা এবং মমতা ব্যানার্জিকে বোঝা তার কাজ। সেই সূত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজ্য হিশাবে পশ্চিম বাংলার সম্পর্ক এবং সে গতিকে আঞ্চলিক সম্পর্ক নিয়েও মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলবেন হিলারি, এটা স্বাভাবিক। তবু বলা যায়, বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার সম্পর্ক নিয়ে হিলারি-মমতা কথা বলবেন এই রটনা মনে হয় গৌণ। মমতা ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আগামি দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন তিনি। ফলে তার সম্পর্কে এখন থেকেই মার্কিনীদের সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরী একটা কাজ। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের প্রধান প্রতিনিধির এটাই আসল কাজ।
চিনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের সভা করে এসে বাংলাদেশে হিলারি কিনটন চিনের বিরুদ্ধে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে নতুন এক প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তুলতে আসবেন এটা চিন্তা করতে অনেক বেশি কল্পনা শক্তির দরকার হয়। বিপজ্জনক হোল নতুন করে বাংলাদেশকে ভারতের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে আনবার প্রয়োজনীয়তা যে নাই এই দিকটাই আমরা ভুলে যাচ্ছি। ভুলছি কারণ শেখ হাসিনা ও মনমোহনের দিল্লী ঘোষণা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতকে করিডোর দেবার চুক্তির মর্ম বুঝবার অক্ষমতা। ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেইমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট মূলত একটি সামরিক ও নিরাপত্তামূলক চুক্তি। এই চুক্তির পর এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবার পর শেখ হাসিনার সরকারকে নতুন করে মার্কিন-ভারত ও ইসরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের পাহারাদার প্রমাণ করা অপ্রয়োজনীয়। এই বিষয়ে আমি এর আগে লিখেছি। (যেমন ‘ভারতের নিরাপত্তা বন্দোবস্ত ও হাসিনা-মনমোহন চুক্তির সামরিক লক্ষ্য’ (নয়া দিগন্ত ৯-১০-২০১০;) “দিল্লীর সামরিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের গোলামি বাংলাদেশের ‘নিয়তি’ হতে পারে না”...ইত্যাদি)। এখানে সেসব কথার পুনরাবৃত্তি করব না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ঠিক কী চুক্তি হয় তা দেখার জন্য আমরা বরং অপেক্ষা করব। তখন নতুন কী যোগ হোল তার বিচার করা যাবে। এখানে হিলারি কিনটন মার্কিন কূটনীতিতে গুণগত পরিবর্তন কিভাবে আনতে চাইছেন ও আনছেন সেই সম্পর্কে তারই একটি লেখা ধরে দুই একটি কথা বলব।
৩.
হিলারি কিনটনের যে লেখাটির কথা বলছি সেটা ছাপা হয়েছিল Foreign Affairs (November December 2010) পত্রিকায় লেখাটির শিরোনাম, ‘বেসামরিক শক্তির জোরে নেতৃত্ব রাখা : মার্কিন কূটনীতি ও উন্নয়ন কৌশলের পুনর্বিবেচনা’ (Leading Through Civilian power : Redefining Amercan diplomacy and Development)। হিলারি বলছেন, এই কালে বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (সাম্রাজ্যবাদী) নেতৃত্ব বহাল রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে স্মার্ট বা চৌকস হতে হবে। এর নাম তিনি দিয়েছেন ‘স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ’। বিশ্বের সংকটকে তিনি সাজিয়েছেন সন্ত্রাস-বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা-জলবায়ুর পরিবর্তন এবং দারিদ্র-এই ভাবে পরপর। বিশ্বে ক্ষমতা আর এক কেন্দ্রিক নয়, ছড়িয়ে যাচ্ছে। তারপরেও এই পরিস্থিতি সকলকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। যদিও সেটা কঠিন কাজ। এই পরিপ্রেক্ষিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক শক্তিকে সংগঠিত করতে হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সেক্রেটারি রবার্ট গেইটস যেভাবে বলেছেন হিলারি কিনটনও তাকে সমর্থন করেই বলেছেন বেসামরিক শক্তির সঙ্গে সামরিক শক্তির সঙ্গে আরো ভাল সমন্বয় ঘটাতে হবে। মার্কিন বেসামরিক সংস্থা যেমন পররাষ্ট্র দফতর ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (United States Agency for International Development সংক্ষেপে USAID) প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তাদেরকে আরো নেতৃত্ব দেবার ভূমিকায় নিয়ে আসতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ায় তার সম্রাজ্যবাদী নেতৃত্ব বজায় রাখতে হলে শুধু সামরিক শক্তির নেতৃত্বদানকারী ভূমিকার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র দফতরের কূটনীতি ও মার্কিন সাহায্য সংস্থাকেও যার যার ক্ষেত্রে নেতৃত্বদান কারী ভূমিকা পালন করতে হবে। তার মানে সমরনীতি, কূটনীতি ও উন্নয়ন নীতি এই তিন ক্ষেত্রে দায়িত্ব প্রাপ্ত সংস্থাগুলোকেও সমান তালে সমান মাত্রায় নেতৃত্ব দিতে হবে। এর জন্য লোকবল ও অর্থবল বাড়াতে হবে। এই লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ইউএসএইডকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নতুন করে সাজাবার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে এটি পৃথিবীর সেরা উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়। এর জন্য মার্কিন লোকজন নিয়োগ করা ছাড়াও বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ভাবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয় তাদের যেন মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবার জন্য ঠিকমতো ব্যবহার করা হয় তার ওপর হিলারি জোর দিয়েছেন। নিজের দেশের সম্পর্কে তাদেরই গভীর জ্ঞান আছে। উদাহরণ হিশাবে বলা যায়, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে যারা মার্কিন দূতাবাস কিম্বা মার্কিন সাহায্য সংস্থায় কাজ করবে তাদেরকে আরও ভাল ভাবে মার্কিন স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। তারাই বাংলাদেশকে ভাল চেনে ও জানে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বহাল রাখবার জন্য এটা হচ্ছে স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ। এটা নতুন জিনিস।
এই এপ্রোচ মনে রেখে হিলারি কিনটন ২০০৯ সালের দিকে পররাষ্ট্র দফতর ও মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার আমূল সংস্কার ও কাজ করবার ধরনে পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছেন এবং সেটা বাস্তবায়িত হচ্ছে। কাজের ধরনে যে পরিবর্তন ঘটেছে সংক্ষেপে তার কয়েকটি দিক তুলে ধরছি যা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এক. কূটনৈতিক তৎপরতা ও উন্নয়ন তৎপরতাকে কাজ করতে হবে সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি এবং সামরিক তৎপরতার সঙ্গে সমন্বয় রেখে।
দুই. কূটনীতি এতোকাল রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে চর্চা হোত। কিন্তু এখন সেটা আর হবে না। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ ও উন্নয়ন সংস্থা একটি দেশের সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিভাগ ছাড়াও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দল, গোষ্ঠি ও ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবেন।
মার্কিন দূতাবাস ও মার্কিন দূতের ভূমিকা এই কাজ করবার জন্য দক্ষ হতে হবে এবং কূটনীতির পুরানা ধ্যানধারণা বাদ দিতে হবে। নিজেদেরকেও বদলাতে হবে।
তিন. দুনিয়া জুড়ে যোগাযোগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে তার কারণে সরকারের বাইরে নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। যেসব ইস্যু আগে অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে মনে করা হোত এখন তাকে সেভাবে দেখলে চলবে না। যেমন অর্থনৈতিক ও পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ও নীতি, ওষুধ ও অসুখ, সংগঠিত অপরাধ, ুধা ইত্যাদি। স্বাস্থ্য কৃষি গরিবী মোচনের মতো কর্মসূচী বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।
চার. সরাসরি একটি দেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে এই কারণে যে যারা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের বাইরে সক্রিয় (non state actor), বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জনগণকে আগের চেয়ে তারা আরও অনেক দ্রুত গতিতে প্রভাবিত করতে সক্ষম। হিলারি কিনটন নন স্টেইট এক্টর বলতে মূলত পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াকু রাজনৈতিক গোষ্ঠি যেমন মাওবাদি বা সশস্ত্র বামপন্থি দল এবং মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইসলামপন্থি দল বা শক্তির কথাই বলছেন। যেসব বামপন্থি মানব বন্ধনের মতো কর্মসূচী দিয়ে বিপ্লবের দায় সারছেন তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আদৌ কোন হুমকি নয়। তারা সুশীল সমাজেরই অংশ, সেই হিশাবে মিত্র।
পাঁচ. হিলারি পরিষ্কারই বলছেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণী বা ‘সুশীল সমাজ’ তৈরি ও তাদের বিস্তার ঘটানোই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষা করবার সঠিক নিরাপত্তা কৌশল।
বলা বাহুল্য, মার্কিন সামরিক নীতির সাথে কূটনীতি ও উন্নয়ন নীতির সমন্বয় ঘটাবার মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে হিলারি কিনটন দেশে দেশে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন তার আরও বিশ্লেষণ দরকার এবং বাংলাদেশে তা কিভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর নজরদারি নিবদ্ধ রাখা খুবই জরুরি। আজ তার সুযোগ হবে না।
এতটুকু যদি আমরা বুঝতে পারি তাহলে বাংলাদেশে হিলারি কিনটনের সফরের অর্থ বোঝার জন্য শুধু সরকারি পর্যায়ে কী চুক্তি হতে যাচ্ছে সেই দিকে নজর রাখলে চলছে না। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে কূটনীতির চর্চার নীতি পরিহার করেছে সেটা তো তারা লিখেই জানান দিচ্ছে সারা দুনিয়ায়। এটা গোপন কিছু নয়।
শেখ হাসিনা বা বেগম খালেদার সাথে সাক্ষাতেরও তাৎপর্যও এই পরিপ্রেক্ষিতে গৌন। বরং বাংলাদেশে হিলারি যে সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সাথে দেখা করবেন সেটাই হবে তার সফরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। সেটা দেখা ও বোঝার অপেক্ষায় রইলাম।
farhadmazhar@hotmail.com

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১২

মানবাধিকার ও হরতাল বিরোধিতার রাজনীতি


১.
মানুষকে ‘গুম’ করে ফেলার অপরাধ মানবাধিকারের চরম লংঘন। রাষ্ট্র নাগরিকদের রক্ষা করবার কথা, কিন্তু রাষ্ট্রই নাগরিকদের ‘গুম’ করে ফেলছে। যে ‘গুম’ হয়ে যাচ্ছে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না, কিম্বা কিছু দিন পর তার লাশ আবিষ্কৃত হচ্ছে। এই অপরাধের বিরুদ্ধে বিএনপির ডাকা হরতালের ইতিবাচক দিক হচ্ছে মানবাধিকার রক্ষার লড়াই জাতীয় রাজনীতির বিষয়ে পরিণত হবার সম্ভাবনা এই প্রথম বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে। হরতাল বা কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে যেভাবে চতুর্দিকে প্রচার চলছে সেই প্রচারের রাজনৈতিক চরিত্র বোঝা এখন একটা জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘গুম’ হয়ে যাওয়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার আনসারকে সরকার এখনও উদ্ধার করতে সক্ষম হয় নি। প্রকাশ্যে হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপির তিন দিনের হরতালও সাময়িক শেষ হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার আনসারকে তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে ফিরিয়ে দেবার জন্য সরকারকে আগামি ২৮ তারিখ পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মানুষ পুড়ে মরেছে, পুলিশের গুলিতে বিশ্বনাথে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কতজন তার হিশাব নাই। তা ছাড়া হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এই দুর্ভোগ সাধারণ মানুষকে পোহাতে হবে। সরকারকে যে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে সেই সময়সীমার মধ্যে ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভারকে যদি পাওয়া না যায় তাহলে এরপর কী ঘটবে তা এখনই আন্দাজ করা কঠিন। তবে বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত কোনো পরিবর্তন ঘটবার সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না। কারণ ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পরেও সমাজে রাজনৈতিক চিন্তার মধ্যে গুণগত পরিবর্তনের বিশেষ কোন লক্ষণ আমরা দেখছি না। রাষ্ট্রের যে গভীর অসুখ আমরা দেখছি তা নিরাময়ের পথ কী হতে পারে তা নিয়ে সমাজে বিশেষ কোন ভাবনাচিন্তা নাই। বরং হরতালের বিরোধিতাই দেখছি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হরতাল বা কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচির বিরোধিতা করার অর্থ তাহলে আমাদের বিচার করে দেখা দরকার।
ঠিক যে মানবাধিকার রক্ষার লড়াই জাতীয় রাজনীতির বিষয়ে পরিণত হবে কি না সেটা আমরা বাংলাদেশের আগামি দিনগুলোতে দেখব। আমরা সম্ভাবনার কথা বলছি কেবল। এই লড়াইকে বিকশিত করা এবং তাতে নেতৃত্ব দেবার শক্তি ও যোগ্যতা আমরা অর্জন করেছিÑ এই দাবি করা যাবে না বলেই শুধু সম্ভাবনার কথা বলা। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক তৎপরতা দূরের কথা, মানবাধিকারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সম্পর্ক কী এবং কেন মানবাধিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি সেই দিকগুলো আমাদের কাছে এখনো পরিচ্ছন্ন নয়। তবুও সম্ভাবনা দেখছি কেন? দেখছি এ কারণে যে এই সম্পর্ক বিচার নিছকই তত্ত্বগত ব্যাপার নয়, একটি দেশের জনগণ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই এই শিক্ষাটা অর্জন করতে পারে। রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্ব এখানেই। যদি মানবাধিকার ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক বিচার আমাদের জাতীয় রাজনীতির বিষয় হয়ে ওঠে তাহলে রাজনীতি ও রাজনৈতিক চর্চার গুণগত রূপান্তরের সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।
যে সহজ সূত্র মনে রেখে আমরা আলোচনা করতে পারি তা হচ্ছে ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি এবং তা রক্ষা করবার কর্তব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌল ভিত্তি। গণতন্ত্র সম্পর্কে এই অতি প্রাথমিক পাঠ আমাদের বিশেষ নাই বললেই চলে। গণতন্ত্র বলতে আমরা নির্বাচন ছাড়া অন্য কিছু বুঝি কি না সন্দেহ। বাংলাদেশে গণতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক দল ও শক্তি এই কারণে সাংবিধানিক ভাবে একনায়কতন্ত্র ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বহাল রেখে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের ওপর একনায়কী শাসন কায়েম করে রাখতে পারছে। কখনো সেনাপতিরা সামরিক কায়দায় আবার কখনো রাজনীতিবিদরা বেসামরিক কায়দায় গণতন্ত্রের আলখেল্লা গায়ে দিয়ে একনায়কতান্ত্রিক শাসন চালিয়ে গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ফ্যাসিবাদের মধুর স্বাদও তারা আমাদের দিয়েছেন। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ কায়েমকেও আমরা এখন ‘গণতন্ত্র’ বলে থাকি। বাংলাদেশে কি এখন ‘গণতন্ত্র’ কায়েম নাই? আছে। কারণ আমরা ভোট দিয়েই তো সরকার গঠন করেছি। ধন্য দেশ!
তবুও আশা কেন? আশা এ কারণে যে আজ না হয় ইলিয়াস আলীর জন্য হরতাল ডাকা হয়েছে, কাল আমরা আজ অবধি যত মানুষ ‘গুম’ হয়েছে, তাদের সকলের জন্য সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা বোধ করতেও পারি। অন্তত বোধ করবার আশা করতে পারি। মানবাধিকারবিরোধী সব শ্রেণী ও শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবার রাজনৈতিক তাগিদ হয়তো আমরা উপলব্ধি করতে শিখব। কিন্তু সেটা শিখব মানবাধিকার কর্মী হিশাবে নয়, রাজনৈতিক কর্মী হিশাবে। আর আশাটা ঠিক এখানেই।
রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্রে ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি ও রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তি নাগরিক হয়ে ওঠে। এই ভিত্তির ওপর রাষ্ট্রকে নতুন ভাবে গঠন করবার লড়াই হচ্ছে বাংলাদেশের এখনকার লড়াই। এটাই এখন গণতান্ত্রিক জনগণের প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচি। এই রাজনৈতিক উপলব্ধি সঞ্চার খুব সহজ কাজ নয়। অথচ একটু খোলা মনে চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারব বাংলাদেশে আমরা যে রাষ্ট্রের অধীনে বাস করি সেই রাষ্ট্রে আমরা দাস, নাগরিক নেই। যে কোন নাগরিক এই রাষ্ট্রে ‘গুম’ হয়ে যেতে পারে। ‘গুম’ তো হয়ে যাচ্ছে। নাগরিকদের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র বা সরকার চলে না, সেভাবে এই রাষ্ট্র বানানো হয় নি। চলে কতিপয় মাস্তান বা মাফিয়া গোছের সংগঠনের হুকুমে। অথচ তাদের আমরা রাজনৈতিক দল নামে অভিহিত করে আনন্দ বোধ করি। যখন কিছু দুর্বৃত্তের চরিত্র প্রকাশিত হতে শুরু করে তখন আমরা হৈচৈ শুরু করি। কিন্তু করি আরেক দঙ্গল দুর্বৃত্তকে ক্ষমতায় অভিষিক্ত করবার জন্য। তারপর যখন দেখি যাহা বাহান্ন তাহাই তেপান্ন, তখন বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করবার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি। তখন আবার নিজেকে নীতিনিষ্ঠ প্রমাণ করবার জন্য ঘোরতর ভাবে রাজনীতিবিরোধী হয়ে যাই। এখানেই শেষ না। অতঃপর রাজনীতি মাত্রই খারাপ এই গীত গেয়ে অন্যদেরও রাজনীতিবিমুখ করবার তৎপরতায় নেমে পড়ি। এই যখন আমাদের দুর্দশা তখন একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিন দিন হরতাল পালন করা হয়েছে। সেটা কম কথা নয়। এটা তাৎপর্যপূর্ণ।

২.
তবে বিএনপি মানবাধিকার মর্যাদা বুঝে হরতাল ডেকেছে কি না সেটা বিএনপিকেই বোঝাতে হবে। সাধারণ ভাবে বাংলাদেশের সকল ‘গুম’ হয়ে যাওয়া নাগরিকদের পক্ষে এই হরতাল নয়, কিম্বা সাধারণ ভাবে ‘গুম’ বা সর্বপ্রকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও এই হরতাল ডাকা হয় নি। ডাকা হয়েছে বিএনপিরই একজন নেতা ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার আনসারের জন্য। তবে অন্তত বিএনপি তার অন্যান্য দলীয় রাজনৈতিক ইস্যুর চাইতেও ‘গুম’ হবার কারণে হরতাল ডেকে মানবাধিকারকে রাজনৈতিক ভাবে তুলে ধরবার শর্ত তৈরি করেছে।
তবুও ইলিয়াস আলী ও আনসারের জন্য হরতাল ডাকার পক্ষে একদমই যুক্তি নাই, বলা যাবে না। একটি আশার ওপর সেই যুক্তি দাঁড়াতে পারে। এর আগে যারা ‘গুম’ হয়েছে তাদের হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না, কিন্তু আশা আছে যে ইলিয়াস আলী এখনো জীবিত রয়েছেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক অবশ্য জোর দিয়েই বলেছেন, তিনি নিশ্চিত যে ইলিয়াস আলী জীবিত। আইনজীবী হিশাবে তিনি সরকারের আরেকটি তৎপরতায় প্রচণ্ড ুব্ধ হয়েছেন। সেটা হোল ইলিয়াস আলীর বিরুদ্ধে দশ বছর পুরানা অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা। একটি লোক গুম হয়েছে পুলিশ জানে, কিন্তু এই মামলা গ্রহণ করা হোল কেন? এই সূত্র ধরেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটা ‘গুম’, নিখোঁজ নয়। কারণ এই নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্টতা ইলিয়াস আলীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার মধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। সরকার জানে, অথচ অস্বীকার করছে। ‘গুম’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশান অনুযায়ী এটা ‘গুম’ হবার ঘটনা। নিখোঁজ বা অন্তর্ধান নয়। ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভারের প্রাণ বাঁচাবার জন্য তাদের নামে এই হরতালের যৌক্তিকতা তাহলে অস্বীকার করা যাচ্ছে না। ঠিক যে মানবাধিকার বিএনপির হাতেও ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। বারবার। আইনবহির্ভূতভাবে মানুষ হত্যার ক্ষেত্রে বিএনপির খ্যাতি আছে। সে ক্ষেত্রে বিএনপির বিন্দুমাত্র অনুশোচনাও নাই, বরং র‌্যাব গঠন করেছে বলে গর্ব আছে। এই সকল কারণে জনগণের বড় একটি অংশ ইলিয়াস আলী ‘গুম’ হওয়ায় বিুব্ধ হলেও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হরতালে অংশগ্রহণ করে নি বলে মনে হয়েছে। তবুও নিজ দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার জন্য বিএনপি হরতালের কর্মসূচি দিলেও, যেহেতু এই কর্মসূচি ‘গুম’ হয়ে যাবার পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছে, এই হরতালের রাজনৈতিক তাৎপর্য বিএনপির দলের সংকীর্ণ উদ্দেশ্যকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। হয়ে উঠেছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
অতএব মানবাধিকারের মর্যাদা রক্ষার জায়গা থেকে এই হরতালকে সমর্থন না করবার কোনো রাজনৈতিক বা মানবিক যুক্তি থাকতে পারে না। কিন্তু শুরু থেকেই এই হরতালের বিরুদ্ধে একটা প্রবল বিরোধিতা আমরা লক্ষ্য করেছি। ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতার কথা আলাদা। বিরোধিতা করেছে সুশীলসমাজ ও গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ। বিরোধিতা করেছে সরকার সমর্থিত ও সংগঠিত ব্যবসায়ী শ্রেণি। বোঝা যাচ্ছে এই সরকারের বিরুদ্ধে কোন কঠোর কর্মসূচি তারা চায় না। ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার ব্যাপারটা তাদের কাছে বিএনপির একজন রাজনৈতিক নেতার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপার মাত্র। অন্য দিকে এমন অনেকেই আছেন যারা নীতিগত ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনবিরোধী তাদের বড় একটি অংশ এই হরতাল সমর্থন করে নি। তাদের বিরোধিতার যুক্তি হচ্ছে এই হরতাল বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন আঠারো দল ডেকেছে, অতএব এ হরতাল সমর্থন করা মানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থন করা। সম্ভবত তারা একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির দলীয় উদ্দেশ্য আর বিশেষ পরিস্থিতিতে কর্মসূচির রাজনৈতিক তাৎপর্যের মধ্যে পার্থক্য করছে না। আমরা এই কারণে তাদের সঙ্গে একমত নই। কিন্তু হরতালের বিরোধিতা করে যারা প্রকারান্তরে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে তাদের সঙ্গে এদের যেন আমরা একাকার না করে ফেলি।

৩.
বিএনপি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করে তখন বিএনপির উদ্দেশ্য একান্তই দলীয়। বিএনপি আগে এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করলেও এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক সেটাই চায়, কারণ তা না হলে নির্বাচনে কারচুপির এবং হেরে যাবার আশঙ্কা আছে তাদের। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করবেন কারণ তা না হলে নির্বাচনে তার অসুবিধা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই পক্ষের কাছেই নির্বাচনী কৌশল মাত্র, তত্ত্বাবধায়ক তর্ক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার বা মৌলিক গাঠনিক কোন তর্কের বিষয় নয়। সেই ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের কর্মসূচি সমর্থন করা দলীয় সমর্থনই বটে। কিন্তু কারো ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার ঘটনার প্রতিবাদের কর্মসূচির চরিত্র ভিন্ন। বিশেষত যখন ‘গুম’ হওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকে, তখন তা রাষ্ট্রের গুরুতর সঙ্কটের দিকে আমাদের নজর নিবদ্ধ করে। নিজের দলের কর্মীর ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার জন্য বিএনপির দলীয় কর্মসূচিও তখন রাষ্ট্রের গাঠনিক চরিত্র নিয়ে আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। এটা পরিষ্কার যে ‘গুম’ হয়ে যাওয়া নিছক ফৌজদারি অপরাধের বিষয় নয়। রাষ্ট্রই এখানে অপরাধী। বিএনপি চাক বা না চাক ‘গুম’ হওয়ার বিরুদ্ধে যে কোন কর্মসূচি সমাজে রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করবার সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরী করে এবং তা দলীয় সংকীর্ণ উদ্দেশ্য ছাড়িয়ে যায়। কিম্বা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এবারের হরতালের বৈশিষ্ট্য হোল কোন ইসলামী দলকে হরতালে বিশেষ ভাবে তৎপর দেখা যায় নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবার জন্য বিরোধী দল হরতাল ডেকেছে ক্ষমতাসীনরা এই অভিযোগ করলেও তাদের গলায় জোর ছিল না। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবার জন্য হরতাল হচ্ছে এই যুক্তিতে হরতালের বিরোধিতা করা কঠিন। মানবাধিকারের প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান থাকার পরেও বিএনপির ডাকা হরতালের পক্ষে থাকা না থাকা নিয়ে যারা দোদুল্যমানতা দেখিয়েছেন তাদের কথা আগে বলেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য এই হরতাল এই যুক্তি তাদেরও থাকতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এর কোন ভিত্তি নাই। এই পরিস্থিতিতে হরতাল প্রশ্নে অবস্থানহীনতা রাজনীতিহীনতারই সমার্থক। এতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রাম এগিয়ে যাবে না, বরং পিছিয়ে পড়বে।
অবস্থান নেবার মানে এই নয় যে বিএনপির পাশাপাশি হরতালের কর্মসূচি দিতে হবে। মোটেও না। হরতালে অংশগ্রহণের কথাও বলছি না। বরং বলছি এই বিশেষ ইস্যুতে হরতালের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। যত নির্বাক বা আড়ালেই থাকি না কোন কোন ইস্যুতে আমরা কী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি তা সমাজের রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার নির্ণায়কও বটে। সেই কারণে কথাগুলো বলে রাখা দরকার।

৪.
কিন্তু নানা অজুহাতে যারা হরতালের বিরোধিতা করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে তারা আসলে বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট শক্তি ও মানবিক অধিকারবিরোধী অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবার জন্যই হরতালের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। কর্মসূচির আগে থেকেই প্রচার চালিয়ে আসছে তারা এবং এখনো প্রচার চালাচ্ছে। এই প্রচার আরো জোরেশোরেই চলবে। তারা সচেতন ভাবেই অর্থনৈতিক দুর্ভোগের কথা বলে ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দমন ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করবার পক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নিরন্তর মতাদর্শিক বয়ান ও যুক্তি তৈরি করছে। এটাই এবারের হরতালের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং দিক। হরতাল চাই না, হরতাল ভালো না, হরতাল খারাপÑ এই কেচ্ছা অনবরত শুনতে হচ্ছে আমাদের। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রধান দুষমন হিশাবে এই ধারার তৎপরতা হরতালের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে খুব স্পষ্ট ভাবেই ফুটে উঠছে।

‘গুম’ করছে রাষ্ট্র তার পরেও এবারের হরতালের বিপক্ষে ফ্যাসিবাদের পক্ষে বিভিন্ন শ্রেণি ও শক্তি যেসব যুক্তি হাজির করছে সেটাই বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন উপাদান। বিএনপি ও তার অধীনে জোটভুক্ত দলের রাজনীতির বিরোধিতা দিয়ে আমরা ফ্যাসিবাদের সমর্থক শ্রেণি ও শক্তিকে এখন চিনব না। ক্ষমতাসীন মহাজোটকে প্রকাশ্যে তারা সমর্থনও করতে পারছে না। গত কয়েক বছরে তাদের শাসনের যে নমুনা দেখেছে মানুষ তার জন্য ক্ষমতাসীনদের পক্ষে প্রকাশ্যে দাঁড়ানো মানবাধিকার ও গণতন্ত্র বিরোধী শ্রেণি ও শক্তিগুলোর পক্ষে এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখার পথ কী? ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে যে কোন কঠিন কর্মসূচিÑ বিশেষত হরতালের বিরোধিতা করা। ফ্যাসিবাদের পক্ষের শ্রেণি ও শক্তি ঠিক এই পথটাই বেছে নিয়েছে। তারা হরতালের প্রাণপণ বিরোধিতা করছে। ফ্যাসিবাদের পক্ষের শ্রেণি ও শক্তিকে এখন তাহলে চিনতে হবে তাদের অতিরিক্ত হরতাল বিরোধিতার মধ্যে।
হরতালের বিরোধিতার যুক্তির অভাব নাই। তিন দিনের হরতালে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত চারজন। সহিংসতা ঘটেছে, সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, জনগণকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এই সময়ের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাগুলো স্থগিত করতে হয়েছে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরপর তিন দিনের হরতালে ক্ষতি হয়েছে অপূরণীয়। এসব অভিযোগ সত্য কোন সন্দেহ নাই। তাহলে তো সামরিক শাসক এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ লড়াই সংগ্রাম করে জান ও মালের যে অপূরণীয় ক্ষতি ঘটিয়েছিল তা খুবই ভুল কাজ ছিল। এরশাদ ছিল সামরিক সৈরশাসক, তার কোন গণসমর্থন ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণকে এখন লড়তে হচ্ছে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে, শুধু সরকারও নয় ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। স্বৈরশাসনের সাথে তার মৌলিক তফাত হচ্ছে ফ্যাসিবাদের পক্ষে বিপুল গণসমর্থন থাকে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শ্রেণি ও শক্তির জন্য এ এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

ফ্যাসিবাদের পক্ষে দ্বিতীয় যে যুক্তি দেওয়া হয় সেটা হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বার্থের যুক্তি। বলা হচ্ছে হরতালে নাগরিকদের নিজেদের এবং সামগ্রিক ভাবে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষতি হচ্ছে। অতএব, রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম করা যাবে না। মানবিক অধিকার নিশ্চিত করবার জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাক্সা এবং তার পক্ষে রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশগ্রহণের বিপরীতে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থকে বারবার মুখ্য করে তোলা হচ্ছে। তুলবে। মানুষের ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষার কথা বলে তার সামষ্টিক রাজনৈতিক স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার তুমুল প্রচারণা চলছে। পত্রপত্রিকায় টেলিভিশানে মানুষ কিভাবে অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই দিকটাকেই প্রচারের মুখ্য বিষয়ে পরিণত করা হচ্ছে। হরতাল যে কতো খারাপ জিনিস তা প্রমাণের ধুম পড়ে গিয়েছে। যার নজির আমরা যে কোন পত্রপত্রিকা বা টেলিভিশানে দেখতে পারব।

প্রশ্ন হচ্ছে মানুষের ক্ষতি হবে না বা হরতালে মানুষের দুর্গতি হচ্ছে না তা নয়। যে কোন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামে ত্যাগ থাকে মানুষের। ব্যক্তিস্বার্থকে সমষ্টির স্বার্থের অধীনে নিয়ে আসার মধ্য দিয়েই রাজনীতি সমষ্টির স্বার্থ হয়ে ওঠে। সমাজে ব্যক্তি হিশাবে আমরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির নিরন্তর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা চলে। সমাজে আমরা এক নই, অনেক। ব্যক্তির কাছে অন্য সব ব্যক্তি বা সমাজ নিজ নিজ ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের উপায় মাত্র। কিন্তু রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আমরা ব্যক্তির স্বার্থ নয়, সমষ্টি স্বার্থের জন্য সংগ্রাম করি। বলাবাহুল্য, দলবাজি নিয়ে কথা বলছি না আমরা। দলবাজিকে যেন আমরা রাজনীতি বলে ভুল না করি। সমাজে ব্যক্তির কাছ থেকে ব্যক্তি আলাদা, পৃথক, অসম, বিভিন্ন, বিচিত্র ইত্যাদি। কিন্তু রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আমরা ‘এক’ হয়ে যাই বা সকলের রাজনৈতিক সত্তা সমান এই সত্য মানি ও তা উপলব্ধির চেষ্টা করি। বাংলাদেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছিলেন তারা ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে সমষ্টির মধ্যে নিজেকে উপলব্ধি করেছিলেন। ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার যে রাজনীতি সেই রাজনীতি শুধু আমার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করে না, নাগরিক হিশাবে সকলের অধিকার রক্ষা করে। রাজনীতি বা রাজনৈতিক সমাজ হচ্ছে সেই পরিমণ্ডল যেখানে সবার জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগ করা সম্ভব। কিন্তু ফ্যাসিবাদ এখন এই সম্পর্ককেই উল্টিয়ে দিতে চাইছে। মানবাধিকার আদায় ও রক্ষার জন্য কঠোর কোন আন্দোলন-সংগ্রাম করা যাবে না। কোন হরতাল করা যাবে না। কারণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। ব্যক্তি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থকে রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে বাংলাদেশী ফ্যাসিবাদ বিদ্যমান রাষ্ট্রকেই শুধু টিকিয়ে রাখতে চাইছে না, একই সাথে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও টিকিয়ে রাখতে চাইছে। ফ্যাসিবাদ বলতে চায়, রাজনৈতিক মুক্তির দরকার নাই, তার জন্য লড়াই-সংগ্রাম আত্মত্যাগ মূল্যহীন, অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষাই আমাদের প্রধান ও একমাত্র কর্তব্য। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সম্পর্ক উল্টিয়ে দেবার সাফল্যের মাত্রাই ফ্যাসিবাদের আগামি দিনে টিকে থাকা না থাকা নির্ণয় করবে। সামষ্টিক রাজনৈতিক স্বার্থকে অস্বীকার করবার জন্য ব্যক্তি স্বার্থকেই বাংলাদেশী ফ্যাসিবাদ মহিমান্বিত করে তুলবে। ফ্যাসিবাদের পক্ষে প্রচারের এই ধরনই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। সবচেয়ে বিপজ্জনক।

আইনবহির্ভূত হত্যা, মানুষ ‘গুম’ করে ফেলা ইত্যাদি অপরাধ বন্ধ করবার জন্য অনেকে রাষ্ট্র যেমন আছে তেমনি র‌্যাব বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিলুপ্ত করে দেবার প্রস্তাব দিচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থা হিউমেন রাইটস ওয়াচ এই প্রস্তাব দিয়ে আসছে অনেক দিন আগে থেকেই। রাষ্ট্রের কোন সংস্থা দানব হয়ে উঠলে তাকে বিলুপ্ত করা একটা দাবি হতেই পারে, যে কোন অসুখের বাহ্যিক উপসর্গেরও বিধান দরকার। কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের গাঠনিক অসুখ সারবে না এটা নিশ্চিত বলা যায়। আরেকটি সংস্থা বানাবে বর্তমান মানবাধিকার বিরোধী অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সেটাও অচিরে আবার দানব হয়ে উঠবে। সমাজে রাজনৈতিক চিন্তার গুণগত পরিবর্তনের লক্ষণ অসুখের বাহ্যিক চিকিৎসায় প্রস্তাবে নাই। নিদেনপক্ষে মানবাধিকার রক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্রের গাঠনিক সম্পর্ক নিয়ে যে ন্যূনতম উদ্বেগ সমাজে তৈরি হবার কথা, সমাজে তা অনুপস্থিত। ফলে বিনা বিচারে আটক ও নির্যাতন, দৈহিক ভাবে আটক ব্যক্তিকে অমানুষিক ভাবে নির্যাতন করে তার কাছ থেকে অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায়, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, আইনবহির্ভূত হত্যা, ‘গুম’ হয়ে যাওয়া ইত্যাদির হাত থেকে আমরা অচিরে নিস্তার পাব এমন আশা করা কঠিন। সঙ্ঘাত, রক্তপাত, দমন-পীড়নের অসহনীয় অত্যাচার তো আছেই। দলীয় মাস্তানির কুৎসিত বলয়ের মধ্যে আমাদের আরো কত দিন ঘুরপাক খেতে হবে কে জানে। এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে একা দায়ী করে নিজেদের পাপ লাঘব করা সহজ। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে সমাজে চিন্তাচেতনার অনাগ্রহ এবং অভাবের দিকেও আমাদের নজর ফেরাতে হবে। এই অনাগ্রহ ও অভাবের কথা মনে রেখেই একটি মানবাধিকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে তিনদিনের হরতাল পালন ইতিবাচক। হরতালের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শ্রেণি ও শক্তির প্রচারণার জবাব দেওয়ার জন্য এই কথা জোরের সঙ্গে এখন বলা দরকার।
ঠিক যে হরতালের কর্মসূচি বিএনপির। কিন্তু রাজনীতি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ব্যাপর মাত্র নয়। একদা একটি আদর্শ রাজনৈতিক দল আকাশ থেকে নেমে আসবে এবং সেই দল আমাদের মুক্তি দেবে, তারপর সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবেÑ এই ধরনের আধ্যাত্মিক চিন্তায় মগ্ন থেকে রাজনীতি ও রাজনৈতিক তৎপরতার প্রতি বিমুখ থাকা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশে খেটে খাওয়া শ্রেণির রাজনীতির দুর্বলতার কারণে এই প্রকার আধ্যাত্মিক প্রবণতা বেড়েছে। যদি আমরা রাজনীতি বা রাজনৈতিক তৎপরতার বিমুখ হয়ে পড়ি তাহলে ফেরেশতা এসেও আমাদের উদ্ধার করতে পারবে না। রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতা ক্ষতি ছাড়া কোন জনগোষ্ঠির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে নি। আজ রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাধা হয়ে উঠেছে। এই আধ্যাত্মিকতার ধারকরা বিদ্যমান দুই রাজনৈতিক পক্ষের দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির নজির টেনে রাজনীতি থেকে জনগণকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশগ্রহণ থেকে জনগণকে নিরুৎসাহিত করছে।
আমাদের কাজ হচ্ছে জনগণকে রাজনীতিতে উৎসাহিত করা। রাজনীতির কোন ইস্যু দলীয় স্বার্থ রক্ষা করে এবং কোন ইস্যু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে জড়িত নিদেনপক্ষে এই ভেদবুদ্ধির বিকাশ ঘটানোর প্রাথমিক কাজগুলো তো আমাদের সম্পন্ন করতে হবে। নয় কি?
২৫ এপ্রিল ২০১২। ১২ বৈশাখ ১৪১৯। শ্যামলী।
farhadmazhar@hotmail.com

মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১২

সংবাদ ভাষ্য : একজন প্রতিবাদী সোহেল তাজ


সংসদ সদস্য থেকেও পদত্যাগ করেছেন সোহেল তাজ। তার এবারের পদত্যাগও সর্বত্র আলোড়ন তুলেছে। শাবাশ সোহেল তাজ, শাবাশ। অন্যায়ের প্রতিবাদ আপনি সঠিকভাবেই করেছেন। আপনার সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ও আইনসম্মত। অন্যরা আইন এবং সংবিধানকে তোয়াক্কা না করলেও আপনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, এটা করা ভুল। আপনার বাবা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মরহুম তাজউদ্দিন আহমদের কথাও দেশবাসীর স্মরণে আছে। তিনিও সত্য কথা বলতে দ্বিধা করেননি, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি এবং সেজন্য মফন্ত্রত্ব থেকে পদত্যাগ করতেও পিছপা হননি।
২০০৮ সালের নির্বাচনে গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন সোহেল তাজ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠিত হলে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সোহেল তাজ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর পাঁচ মাসের মাথায় ২০০৯ সালে ৩১ মে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন এবং পরদিন ১ জুন পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি তার এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি। সংবিধানের ৫৮(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তাকে ডেকে পাঠান যমুনায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ২০০৯ সালের ৪-৮ জুন সোহেল তাজ আবারও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অফিস করেন। কিন্তু ৯ জুন ২০০৯ হঠাত্ তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়নি, তিনি ছুটি নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর সোহেল তাজ স্পষ্ট জানিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে সঠিক নিয়ম অনুযায়ী তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। এ ঘটনার পর উচিত ছিল সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী পদত্যাগপত্রটি গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি বরাবর পাঠিয়ে দেয়া। কিন্তু সরকার থেকে প্রচার করা হয়, সোহেল তাজ ছুটি নিয়েছেন। সোহেল তাজ যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৯ সালের ১৯ জুলাই সাংবাদিকদের আবারও জানিয়ে দেন, তিনি সরকারে নেই। প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এ পদে তিনি আর ফিরবেন না। এ ঘটনার পর সরকার থেকে আর কিছুই বলা হয়নি। সোহেল তাজের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে কি হয়নি, কিছুই বলেনি সরকার। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি সোহেল তাজ আমেরিকা থেকে দেশে ফিরলে বিমানবন্দরে সরকারের পক্ষ থেকে তার জন্য প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার সব প্রটোকলের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বিমান থেকে নেমে তিনি সরকারের প্রটোকল নেননি; সরকারের গাড়িতেও ওঠেননি। বোনের গাড়িতে করে সোজা চলে যান বাসায়। ওই দফায় ২০ দিনের মতো দেশে অবস্থান করে আবার চলে যান আমেরিকায়। প্রায় ৬ মাস পর আবার তিনি দেশে ফেরেন। সেবারও তিনি বিমানবন্দরে কোনো প্রটোকল নেননি। ২০১০ সালের ২৪ আগস্ট দেখা যায়, সোহেল তাজকে ‘দফতরবিহীন প্রতিমন্ত্রী’ হিসেবে নতুন নিয়োগ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ ওয়েবসাইটেও তাকে ‘দফরতবিহীন প্রতিমন্ত্রী’ হিসেবে দেখানো হয়। পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে আবারও সোহেল তাজ জানিয়ে দেন, প্রতিমন্ত্রিত্বের পদে তিনি নেই এবং এ পদে তিনি আর ফিরে আসবেন না। তবুও বিষয়টি সরকার কিংবা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সুরাহা করা হয়নি। এরপর এ নিয়ে আর কোনো আলোচনা দেখা যায়নি। সম্প্রতি রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করলে তার পদত্যাগ নিয়েও ঘটে একই ধরনের ঘটনা। পরদিন হঠাত্ সরকার থেকে জানিয়ে দেয়া হয়, সুরঞ্জিত দফতরবিহীন মন্ত্রী। অথচ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করে গাড়ির পতাকা নামিয়ে রেল ভবন থেকে সোজা বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। অবশ্য সরকারের ঘোষণার পর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সোহেল তাজের মতো বলেননি, তিনি আর এ পদে নেই; বরং তিনি খুশিই হন। এ ঘোষণায় অনেকটা যেন প্রাণ ফিরে পান সুরঞ্জিত। বিবিসিকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এ ব্যাপারে তার বলার কিছু নেই।
পদত্যাগ নিয়ে এ ঘটনার পর বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ ও ডক্টর শাহদীন মালিক সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে বলেছেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আর মন্ত্রী নেই। দফতরবিহীন মন্ত্রীর পদে তার থাকা এখন অবৈধ। নতুনভাবে তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করতে হলে আবার শপথ লাগবে। তারা সোহেল তাজের পদত্যাগ নিয়েও একই কথা বলেন। অর্থাত্ তার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পদটিও শূন্য হয়ে গেছে।
সুরঞ্জিতের মন্ত্রিত্ব নিয়ে যখন বিতর্ক চলছে, ঠিক এ সময় কৃষক দলের মুজিবনগর দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, তার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেননি। আরও বললেন, সোহেল তাজের পদত্যাগপত্রও তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাননি। অর্থাত্ প্রায় ৩ বছর পার হয়ে গেল। সোহেল তাজের পদত্যাগপত্রটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কাছেই রেখে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে এ তথ্য বের হলে এ নিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন বিতর্ক। প্রধানমন্ত্রী এভাবে কি পদত্যাগপত্র আটকে রাখতে পারেন কিংবা গায়েব করে দিতে পারেন? কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ না চান, সেক্ষেত্রে তার সঙ্গে আলোচনা করে বা তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পদে রেখে দেবেন। পদত্যাগের ব্যাপারে সিরিয়াস থাকলে সাংবিধানিকভাবে তিনি তো আর তাকে জোর করে আটকে রাখতে পারেন না।
দেশের বিশিষ্ট সংবিধানবিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, সোহেল তাজের পদত্যাগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা করছেন, তা সংবিধান ও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা বলেছেন সুরঞ্জিত ও সোহেল তাজের দফতরবিহীন মন্ত্রিত্ব অবৈধ। সংবিধানের ৫৮(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাদের পদ শূন্য হয়ে গেছে। তাদের দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় রাখার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ, গাড়িতে-বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন—সবকিছুই অবৈধ। সংবিধান অনুযায়ী তাদের পদত্যাগপত্র নাকচ করার কোনো সুযোগ নেই প্রধানমন্ত্রীর। আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী এক অর্থে অবৈধ কাজই করেছেন। অন্যায়ের এখানেই শেষ নয়। দেখা গেছে, সোহেল তাজ চাচ্ছেন না অথচ তার অজান্তে তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে বেতনের টাকা জমা হচ্ছে। বিষয়টি জানার পর ১৭ এপ্রিল সোহেল তাজ আমেরিকা থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি চিঠি পাঠিয়ে তার পদত্যাগের গেজেট কেন জারি হয়নি, জানতে চান। একই সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতনের টাকা জমা দেয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ৩৩ মাসের টাকা ফেরত নেয়ার অনুরোধ করেন।
কিন্তু এই চিঠির পরও সরকারের টনক নড়েনি। ফলে গতকাল সংসদ সদস্যের পদ থেকেও তিনি পদত্যাগ করেছেন। শুধু পদত্যাগই নয়, স্পিকারের কাছে সংবিধান অনুসরণ করে পদত্যাগপত্র পাঠানোর পর তিনি তার নির্বাচনী এলাকার জনগণের উদ্দেশেও একটি খোলা চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, সংসদ সদস্য থেকে পদত্যাগের এ সিদ্ধান্ত তিনি অনেক চিন্তাভাবনা করেই নিয়েছেন। তবে এর কারণ তিনি খুলে বলতে পারছেন না। তার মতে, সবকিছু খুলে বলা যায় না। তিনি শুধু বলেছেন, ‘বাস্তবতা বিচার করে আমি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি। কাপাশিয়ার মানুষের সম্মান রক্ষার্থে আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কথার পেছনে অনেক কথা থাকে। অনেক লুক্কায়িত সত্য থাকে—যা দেশ, জনগণ ও দলের স্বার্থে জনসম্মুখে বলা উচিত নয় এবং বলা সম্ভবও নয়। তবে সঙ্গত কারণেই আমি এমপি ও মন্ত্রিত্বের পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।’
সোহেল তাজ সাধারণ কোনো পরিবারের কেউ নন, তিনি একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সন্তান তিনি। তাজউদ্দীন আহমদের সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্বে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছে। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ২৫ মার্চ রাত ১২টায় তাজউদ্দীন আহমদ সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে তাকে স্বাধীনতার ঘোষণা রেকর্ড করে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সঙ্গে একটি টেপ রেকর্ডারও নিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা রেকর্ড করেননি। তিনি তাকে বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা রেকর্ড করে গেলে পাকিস্তানিরা রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তার বিচার করবে।’ এই ঐতিহাসিক তথ্যটি স্থান পেয়েছে দৈনিক প্রথম আলোর প্রকাশনা সংস্থা প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর বইয়ে।
স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন আহমদ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার সরকার পরিচালনা নিয়ে কিছু মতভেদও হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী মরহুম ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক বইয়ে এর বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি লিখেছিলেন, ১৯৭৪ সালের ১৩ অক্টোবর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ইউরোপ সফর করে দেশে ফিরে তেজগাঁও বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘ভ্রান্ত নীতি নেয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি রসাতলে গেছে।’ তার এই বক্তব্য পরদিন সব পত্রিকায় ছাপা হয়। এ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তার মন্তব্য সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ দলের নেতারা পত্রপত্রিকায় তার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। সৃষ্টি হয় তীব্র মতভেদ। এ অবস্থায় ২৬ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মন্ত্রিত্ব থেকে তিনি ইস্তফা দেন।
ড. ওয়াজেদ মিয়া বইয়ে এ সম্পর্কে আরও লেখেন, ‘এই দুঃখজনক ঘটনার পর থেকে তাজউদ্দিন আহমদ রাজনীতি থেকে বেশ নিষ্ক্রিয় থাকেন। তার রাজনৈতিক সহকর্মী বা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মীর সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রক্ষা করেছেন বলেও শোনা যায়নি। শুধু মাঝে মধ্যে ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আবাহনী মাঠে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেছে।’ তার পদত্যাগ সম্পর্কে জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমানের দফতর থেকে তার পদত্যাগপত্র টাইপ করে তাজউদ্দিন আহমদের কাছে সই করে দেয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল।
পঁচাত্তরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার নেতার হত্যাকাণ্ডে তিনিও হত্যার শিকার হন। সেই তাজউদ্দীন আহমদের সন্তান সোহেল তাজ অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে পারেন না। তার রক্তে তাজউদ্দীন আহমদের রক্ত প্রবাহিত। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি এক প্রতিবাদী যুবক। পদত্যাগ করে বাবার মতো এবং চাচা আফসার উদ্দিন আহমদের মতো সাহসী সিদ্ধান্তই নিয়েছেন সোহেল তাজ।

ইলিয়াস গুমে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য বেমানান


ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিক আবদুল জলিল এমপি বলেছেন, বর্তমান সরকারের অনেক অর্জন থাকলেও কিছু ঘটনা সেসব অর্জনকে মøান করে দিচ্ছে, প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সরকার সংযমী না হলে জনগণ সরকারকে ভুল বুঝবে, যার পরিণতি হবে করুণ। তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীর পর্যায়ের একজন নেতা গুম হওয়া প্রত্যাশিত নয়। আর এ ঘটনায় শেখ হাসিনার মন্তব্যকে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদার সাথে মানানসই হয়নি বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
গত শনিবার রাতে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বেসরকারি চ্যানেল দিগন্ত টেলিভিশনের ‘সবার উপরে দেশ’ টকশোতে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন। টকশোর সঞ্চালক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তমের সাথে আলাপচারিতায় তিনি আরো বলেন, সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগের পর তাকে আবার দফতরবিহীন মন্ত্রী বানানোর ঘটনা রাজনীতির জন্য হতাশাজনক। এ জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেন। তবে তিনি বলেন, অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িত না বলে দাবি করেও রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সুরঞ্জিত প্রশংসনীয় কাজ করলেও পরে দফরতবিহীন মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ তার উচিত হয়নি। প্রবীণ এই নেতা এক-এগারোর খলনায়কদের হাতে তার নাজেহাল হওয়ার বর্ণনা দিয়ে বলেন, তাদের শাস্তির জন্য তিনি যে সংসদীয় কমিটি গঠনের দাবি তুলেছিলেন দেশের মানুষ তাকে স্বাগত জানালেও তার দলের সরকারের কাছে সে দাবি গ্রহণযোগ্য হয়নি।
আবদুল জলিলের এই সাক্ষাৎকারটি নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা হলো :
কাদের সিদ্দিকী : আমি আপনার কাছে জানাতে চাই ওয়ান- ইলিভেনের সময় বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক নেতা আপনার মতো কষ্ট ভোগ করেননি। বাংলাদেশ প্রতিদিনে আপনার একটি লেখা দেখলাম খুবই কষ্ট হয়েছে আমার এটা পড়ে যে, জন্মদাতা পিতাও আমাকে কখনো শারীরিকভাবে কোনো কষ্ট দেননি, কিন্তু আমি ওয়ান-ইলিভেনে কষ্ট পেয়েছি। তো ওয়ান- ইলিভেন সম্পর্কে যদি বলতেন, যারা রাজনৈতিক নেতাদের এভাবে নাজেহাল করল। যেখান আপনি ছিলেন, শেখ সেলিম সাহ্বে ছিলেন, নাসিম সাহেব ছিলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন।
জলিল : এ কথাটি উত্থাপন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমি গতকাল একটি সভায় এ কথাটি বলেছি যে, আমার জন্মদাতা পিতা আমার গায়ে কখনো হাত দেননি। কিন্তু তারা আমার গায়ে হাত দিতেও সাহস পেয়েছে। নির্যাতনের কথা আমি আজ উল্লেখ করব না। ওয়ান-ইলিভেনের এই হোতাদের সম্পর্কে একটা তদন্ত করার প্রস্তাব আমি পার্লামেন্টে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম যারা রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিধ, ব্যবসায়ী, সমাজের সম্মানিত শ্রেণীর মানুষকে যে নিগৃহীত করে এবং তারা যাকে ইচ্ছে তাকে যেমন নাজেহাল করে এ সম্পর্কে একটা তদন্ত হওয়া দরকার এবং সেই তদন্তের জন্য একটি সংসদীয় কমিটি হওয়া দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার সেই প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। এবং এই প্রস্তাব দেশবাসী গ্রহণ করলেও আমার দল গ্রহণ করেনি। এটি আমার জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক একটি ঘটনা। এখানে একটা কথা বলব, আমি ওয়ান-ইলিভেনে যে নিগৃহীত হয়েছি আমি কিন্তু এটা অ্যাভয়েট করতে পারতাম। যখন ওয়ান-ইলিভেনের হোতারা ডিজিএফআই থেকে প্রস্তাব দিলো,‘সংস্কারের মধ্য দিয়ে দুই নেত্রীকে বাদ দিয়ে সেখানে নতুন নেতৃত্ব তারা নিয়ে আসবে’। সেখানে আমাদের অনেক নেতা তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের পক্ষে মত দিলো। আমার কাছে যখন প্রস্তাবটা এলো আমি বললাম যে, এটা ইমপসিবল। কারণ আমি রাজনীতি করি এবং আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিশ্বাস নিয়েই আমি রাজনীতি করি এবং বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা হলো মানুষকে ভালোবাসতে হবে। মানুষের ভালোবাসার মধ্য দিয়ে রাজনীতির বিকাশ সম্ভব এবং একটি রাজনৈতিক কর্মীও সেই বিকাশে বিকশিত হতে পারে। আমি সেই বিশ্বাস দিয়ে এসে আজকে আমি সেই সংস্কারের একজন প্রতিষ্ঠিত নেত্রী যিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছেন, দলের কর্মীদের দ্বারা নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়েছেন তাকে তার বিকল্প ব্যবস্থা ষড়যন্ত্রের মধ্যে আমি করতে রাজি নই। আমি এটা রিফিউজ করেছি। এবং আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা আমার নেত্রীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছি, মাইনাস শেখ হাসিনা হবে না। আপনার যদি দলের নিয়মকানুুন বা বিধিবিধানের কোনো পরিবর্তন করতে হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সে সংস্কারটা হতে হবে। এর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না। এই বক্তব্য তিন-চার দিন দেয়ার পর তখনকার মেজর জেনারেল মাসুদ চৌধুরী (বর্তমানে অস্ট্র্রেলিয়ায় হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত) আমাকে টেলিফোন করলেন, স্যার কথাটা এভাবে বললে হবে না, একটু সংযতভাবে আপনি বলুন। আমি বললাম জেনারেল মাসুদ কথা বলা তোমার কাছে আমাকে শিখতে হবে না। আমি যেটা বিশ্বাস করি আমি সেটা বলব। এবং তোমার যা করণীয় তুমি সেটা করতে পার। আনফরচুনেটলি পরদিনই দুপুর বেলা আমার ব্যাংকে বসে কাজ করছিলাম (বোর্ড মিটিং ছিল)। এমন সময় আমার পিএস এসে বলল আর্মির কয়েকজন অফিসার আসছে আপনার সাথে দেখা করতে চায়। আমি বললাম ঠিক আছে পাঠিয়ে দাও। ভেতরে এসে বলল, স্যার আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। আমি বললাম তোমাদের সাথে যেতে হবে, অবশ্যই যাবো তবে কেন যেতে হচ্ছে সেটা আমাকে বলতে হবে। তারা বলল, স্যার সেই উত্তর আমরা দিতে পারব না। আপনাকে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে আপনাকে নিয়ে যেতে হবে সে জন্যই এসেছি। আশা করি আপনি আমাদেরকে কো-অপারেট করবেন। আমি বললাম অবশ্যই আমি কো-অপারেট করব। তোমরা বসো আমি বাথরুম থেকে আসি। যখন বাথরুমের দিকে যাচ্ছিলাম তখন দেখলাম একজন আমাকে ফলো করে আসছে। তখন আমি একটু ধমকের সুরে বলাম এটা আমার রেস্টরুম এখান থেকে পালানোর কোনো জায়গা নেই। এ কথায় সেই অফিসার অন্য দিকে চলে গেল। আমি বাথরুম থেকে এসে সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাদের সাথে নিচে নামলাম। সেখান থেকে আমাকে একটি গাড়িতে উঠাল এবং চোখ বেঁধে ফেলল আমার অফিসের সামনেই। একটু পর বলল আপনি একটু নামেন এই গাড়িতে এসি নেই। আমরা একটি এসি গাড়ি দিয়ে আপনাক নিয়ে যাবো। এসি গাড়িতে উঠিয়ে কোথায় নিয়ে গেল সেটা জানি না। অজ্ঞাত ওই স্থানে আমি সাত দিন ছিলাম। ওখান থেকে আমাকে জেলখানায় শিফট করল। প্রথম পাঁচ দিন আমার সাথে যে ব্যবহার করল। আমি এই দেশ যারা সৃষ্টি করেছে তাদের সাথের একজন মুক্তিযোদ্ধা তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ এটা কোনো সভ্য জগতে সহনীয় নয়। একপর্যায়ে আমি বলেছিলাম আপনি আমার চোখ খুলে দিন দেখি আপনি আমার ছেলের বড় নাকি ছেলের ছোট। আর আমি যে ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে এখানে এসেছি এই ব্যাকগ্রাউন্ডের ইতিহাসের সাথে আপনার জন্ম হয়েছিল কি না সেটা একটু দেখা দরকার। আমার চোখটা খুলে দিন। তখন সে একটি অশ্রাব্য গালি দিয়ে বলল আপনার আকাক্সা তো অনেক বেশি। আমি বললাম অবশ্যই বেশি। কারণ এখনো আপনি আমাকে স্যালুট দেবেন। আমাকে যতই নিগৃহীত করেন আপনার অন্তরাত্মা আপনাকে বলবে আমাকে স্যালুট দিতে। এ ছাড়া নেত্রী সম্পর্কেও অনেক কথা আমার কাছে জানতে চেয়েছে। আমি বললাম আমাকে জানার আগে আপনারা খোঁজখবর নেন। আপনারা যে অভিযোগগুলো নিয়ে এসেছেন সেই অভিযোগগুলো একটাও সত্য নয় বলে আমি বিশ্বাস করি।
Ñআচ্ছা আপনি যে মাপের নেতা, বাংলাদেশে তো রাজনৈতিক নেতা অনেকেই থাকবে তো আপনার মানের নেতা খুব বেশি হবে না। আপনার মতো নেতাকে যদি এভাবে নিগৃহীত করতে পারে আর পরে যদি তার জন্য আইনানুগ কোনো প্রতিকার না হয় তাহলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থা কি হবে?
জলিল : কোনো গ্যারান্টি নেই।
প্রশ্ন : আপনার মনে আছে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি অনেকের কাছেই নিন্দিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন। যার নাম দেয়া হয়েছিল বাকশাল। সেই সময় তিনি গভর্নর পদ্ধতি চালু করেছিলেন। যদি বঙ্গবন্ধু আরো দু-চার বছর বাঁচতেন এর সুফল যদি মানুষের কাছে পৌঁছত তা হলে এক রকমের চিন্তা হতো। আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর জন্ম দেয়া আওয়ামী লীগ। যার মাধ্যমে এই আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধু কবর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছে। আওয়ামী লীগ দিয়ে যা করা সম্ভব ছিল তা করা হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ আজকে সেকেলে হয়ে গেছে এ জন্য আমি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের জন্ম দিলাম। সেই সময় আপনি গভর্নর হয়েছিলেন। আমিও সৌভাগ্যক্রমে টাঙ্গাইলের গভর্নর হয়েছিলাম। সেই পদ্ধতি সম্পর্কে যদি আপনি কিছু বলতে চান।
Ñআমি মনেপ্রাণে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব কর্মসূচির একজন সমর্থক। বঙ্গবন্ধু বাকশাল নামে যে দ্বিতীয় বিপ্লব কর্মসূচি করেছিলেন তার লক্ষ্য ছিল এ দেশের কৃষক শ্রমিকের অর্থনৈতিক মুক্তি। দেশটাকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু আনফরচুনেটলি যে শিশু জন্মই নিলো না সেই শিশু সম্বন্ধে গোটা দেশবাসীর মধ্যে এর বিরোধী শক্তি, যারা জনগণের ক্ষমতা বাস্তবায়িত হোক, জনগণের কল্যাণ হোক, জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আসুক বিশ্বাস করে না তারা এর বিরুদ্ধে এবং এর পাশাপাশি যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এই শক্তিগুলো বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের স্বপ্নগুলোকে নস্যাৎ করল। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে। শুধু তাই নয় এই পরিকল্পনাকে জাতির কাছে উপস্থাপন করল বিকৃতরূপে এবং বাকশালকে একটি গালি হিসেবে উপস্থাপন করল বা পরিচিতি দিলো। আমি এখনো বিশ্বাস করি, আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিশ্বাসী কর্মী হয়ে থাকি। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচিকে জীবিত করা আমাদের দায়িত্ব। এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আবারো বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক মেহনতী মানুষের মুক্তি আসতে পারে এটা আমি বিশ্বাস করি। প্রসঙ্গত, এখানে একটি বিষয় যোগ করে বলি, আমার বন্ধু রাজ্জাক যখন বাকশাল করল আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে আমি তাকে বলেছিলাম, তোমার এই বাকশাল বঙ্গবন্ধুর বাকশাল না এটা ইন্দিরার বাকশাল। তুমি এটা নিয়া এগিয়ো না। আবার ফিরে এসো, দলের সেক্রেটারি ছিলা আবার সেই দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথে দলটাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো। আমার বন্ধু তখন আমার কথা শুনে নাই কিন্তু পরে তিনি তার ভুল বুঝতে পেরে আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছিলেন এবং আওয়ামী লীগের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। সুতরাং এই যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কথা বললেন, এখানে একটি শক্তি আছে যারা এর অপব্যবহার করে, যারা এ সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্তি ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়। বিষয়টি আমাদের জন্য দুঃখজনক এই কারণে, আজকে দেখেন, আমাদের গভর্নর পদ্ধতি নেই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মধ্যে দিয়ে জনগণের কাছে ক্ষমতা তুলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন গভর্নর ছিলাম আমি আপনি (কাদের সিদ্দিকী), আবু সায়ীদ আরো অনেকে। বাকশালের এই গভর্নর পদ্ধতি ছিল ক্ষণস্থায়ী। কারণ অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই একটি নির্বাচন দেয়ার কথা ছিল। সেখানকার নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আপনাকে বঙ্গবন্ধু যে দায়িত্বটা দিয়েছিল সেটা বাস্তবায়ন হলে সারা জেলার কমান্ড ও কন্ট্রোল আপনার হাতে থাকত। আপনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে জেলার ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সব রেস্পন্সিবিলিটি ছিল আপনার। ব্যর্থ হলে আপনার ব্যর্থতা হতো আর সফল হলে দলের এবং কর্মসূচির সফলতার মধ্য দিয়ে জনগণের সফলতা হতো। এটা আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি এখানো।
কাদের সিদ্দিকী : দেশে এখন খুব অস্থিতিশীল অবস্থা চলছে। এই মাত্র ক’দিন আগে একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তÑ তার বহু দিনের রাজনৈতিক জীবনÑ তিনি মন্ত্রণালয়ে ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। আবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে পুনরায় দায়িত্বহীন মন্ত্রী পদে রাখা হলো। তার মন্ত্রণালয়ের ঘুষ কেলেঙ্কারি সম্পর্কে এবং তাকে যে আবার রাখা হলো এ সম্পর্কে আমরা একজন প্রবীণ রাজনৈতিক, বিবেকবান রাজনৈতিক, উদার রাজনৈতিক হিসেবে যদি কিছুু মন্তব্য করতেন?
আবদুল জলিল : আমি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যে অভিযোগের ফলে পদত্যাগ করেছেন তার জন্য ধন্যবাদ জানাবো। যে ঘটনাটা ঘটেছে, উনি যেটা বলেছেন যে এই কেলেঙ্কারির সাথে তার সমৃক্ততা নেই এটা প্রমাণ করার জন্যই তিনি সরে যাচ্ছেন এবং আশা ব্যক্ত করেছেন যে আমি রাজনীতি থেকে আপাতত কিছুটা দূরে থাকব। নির্দোষ প্রমাণ হয়ে আমি আবার রাজনৈতিক মঞ্চে আসব। এই পর্যন্ত তিনি অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। যদিও বিলম্বে তিনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু পরে তাকে যে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী দেয়া হলো এটাকে আমি মনে করি রাজনীতির জন্য একটি হতাশাব্যঞ্জক ব্যাপার। এটা করা ঠিক হয়নি। লেট হিম প্রুভ অর্থাৎ ঘটনা তন্তের পর যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। তখন আবার তাকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। কিন্তু যেটা করা হয়েছে তা আমাদের রাজনীতির জন্য একটি হতাশা।
কাদের সিদ্দিকী : এর জন্য কি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দায়ী নাকি প্রধানমন্ত্রী?
আবদুল জলিল : সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দায়ী নন। যিনি তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি দায়ী। এখানে আমি বলব সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে একসেপ্ট করা ঠিক হয়নি।
কাদের সিদ্দিকী : বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমেদের ছেলে সোহেল তাজ বহুদিন আগে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, যেহেতু রাষ্ট্রপতির কাছে তার পদত্যাগপত্র পাঠানো হয়নি সেহেতু তিনি মন্ত্রী আছেন। তাহলে কি কাজ না করলেও সাধারণ মানুষের রক্ত ঘামের পয়সা কেউ কাউকে দিয়ে দিতে পারে?
আবদুল জলিল : তাজউদ্দিন আহমেদের ছেলে সোহেল তাজ যে কাজটা করেছে আমি মনে করি সে পলিটিক্যালি অনেক কনসাস হিসেবেই দায়িত্বটা পালন করেছে। এখানে আমার একটা প্রশ্ন সংবিধানে কী আছে সেটা আমি জানি না; একজন পদত্যাগ করার পর সেটা কত দিন ঝুলিয়ে রাখাতে পারে রাষ্ট্রপতির কাছে সেটা গেল না কেন?
কাদের সিদ্দিকী : যদি এমন হয়, যত দিন রাখতে পারে তার চেয়ে অনেক দিন বেশি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তাহলে কি এই সরকার বা সরকারের প্রধান ব্যক্তিরা সংবিধান লঙ্ঘন করেনি?
আবদুল জলিল : না সংবিধানে যদি এমন কোনো বিধান থাকে সেটা জেনেও যদি বিলম্বিত করা হয়ে থাকে তবে অবশ্যই এটা সংবিধান লঙ্ঘন হয়েছে।
কাদের সিদ্দিকী : আরেকটা জিনিস হলো এই যে সোহেল তাজের মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের পরও তার বেতনভাতা তার অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে। এই দায়িত্বটা কে নেবে?
আবদুল জলিল : এখানে সোহেল তাজ কিন্তু স্পষ্ট করেই বলেছেন, কেন পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি, কেন অ্যাকাউন্টে টাকা যাচ্ছে? সেই টাকা যেন ফিরিয়ে নেয়া হয়। বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা কিন্তু এই ধরনের কথা বলেননি। এ জন্য তিনি ধন্যবাদ পেতে পারেন। ঠিক তিনি যোগ্য বাপের যোগ্য সন্তান।
কাদের সিদ্দিকী : ইলিয়াস নামে একজন নেতা, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকÑ তাকে আজ ক’দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। এত বড় মাপের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ যদি হারিয়ে যায় তাহলে দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
আবদুল জলিল : আজ সকালে একটি রাজনৈতিক আলোচনায় আমি বলেছি, এখানে একে অপরকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। আমি যেহেতু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছি, আমার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সব নাগরিককে নিরাপত্তা দেয়া। সেই হিসেবে ইলিয়াস আলী একজন ক্ষুদ্র মানুষ নন। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় সারির নেতা এবং সিলেট জেলার তিনি নির্বাচিত সভাপতি। এই রকম মানুষ হঠাৎ করে গুম হয়ে যাবে! এটা কোনো দিনই কেউ আশা করে না। আর তিনি গুম হওয়ার পর আমি আমার দর্শক ভাইদেরকে বলব, আপনারাই বলুন আপনারা আতঙ্কে আছেন কি না। আমার স্ত্রী আমাকে বলেÑ দেখো তুমি আর বেশি কথা বোলো না যদি তোমাকে গুম করে নিয়ে যায়, আমি কোথায় দাঁড়াব? আমার ছেলেমেয়েরা কোথায় দাঁড়াবে? এই আতঙ্কটা আমার পরিবারের কাছেও চলে গেছে।
কাদের সিদ্দিকী : আপনিও সরকারের একটা পার্ট। আপনার দায়িত্ব মানুষকে নিরাপত্তা দেয়া।
আবদুল জলিল : আমি সেই কথাই তো বলেছি। গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। আমি আমার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলবÑ আপনারা যে-করেই হোক তাকে খুঁজে বের করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করুন। তার মাধ্যমে গোটা জাতি ও দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করার ব্যবস্থা করুন। মানুুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনাতিপাত করতে পারে না।
কাদের সিদ্দিকী : গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষক সমাবেশে বক্তৃতা করেছেন। সেখানে যেভাবে ইলিয়াস আলীর বিষয়টিকে তিনি এনেছেন, তাতে অনেকেই ব্যথা পেয়েছেন। একজন রাজনৈতিক মানুষ, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না, ঠিক এমন সময় এমন শক্ত কথা বলা বাঙালি কৃষ্টির মধ্যে পড়ে না। যেমন ধরেন কেউ যদি তার পরিবারের কাউকে কবরস্থানে নিয়ে যায়, সেই পরিবারে যদি কোনো বিবাহযোগ্যা কন্যা থাকে, তাহলে তার বিয়ের প্রস্তাবটা সে দিন দেয় না। কিছু সময় অপেক্ষা করে শোক ভোলার সময় দেয়। এ ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওই ধরনের বক্তব্যটা আপনি কিভাবে দেখছেন?
আবদুল জলিল : আমি স্পষ্ট করে বলছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কালকে যেভাবে কথা বলেছেন তার যে পদমর্যাদা সেখান থেকে এই ভাষাটা মানায় না।
কাদের সিদ্দিকী : আপনি যখন দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, বিরোধী দলে ছিলেন বিএনপি ক্ষমতায় ছিলÑ তখন রাজনৈতিকভাবে খুবই কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অথবা কথা বলেছিলেনÑ সে দিন ছিল ৩০ এপিল ২০০৬। ওই দিন সরকারের ডেডলাইন ঘোষণা করেছিলেন। এই সম্পর্কে আপনি কিছু বলুন।
আবদুল জলিল : এই সম্পর্কে আমি আজ কিছু বলব না। এই সম্পর্কে আমি লিখছি আশা করছি আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি সেটা বই আকারে প্রকাশ পাবে।
কাদের সিদ্দিকী : অনুষ্ঠানের দর্শকদের জন্য কিছুটা যদি শেয়ার করতেন?
আবদুল জলিল : ৩০ এপ্রিল আমি খামাখা কোনো কথা বলি নাই। এটা ছিল একটা পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনাটা আমি আর নেত্রী ছাড়া আর কেউই জানতেন না।
কাদের সিদ্দিকী : বর্তমান সরকার সম্পর্কে কিছু বলুন।
আবদুল জলিল : এই সরকারের অনেক অর্জন আছে। কিন্তু দুই-একটা ঘটনা সব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। সুতরাং আমি সরকারকে বলব, সরকারপ্রধানকে বলব, যে অর্জন আছে সেটা যদি আমরা জনগণের কাছে নিয়ে যেতে পারি, তবে আশা করি জনগণ আগামীতে আমাদের ফেলবে না। কিন্তু এই অর্জনের পাশাপাশি যে দুই-একটা ঘটনা আমাদেরকে বিপদগ্রস্ত করছে, প্রশ্নবিদ্ধ করছে, আমাদের অবশ্যই তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করতে হবে। তা না হলে মানুষ আমাদেরকে ভুল বুঝবে এবং সেই ভুল বোঝার পরিণতি হবে করুণ।

‘গুম’ হয়ে যাওয়ার বিভীষিকা ও বাংলাদেশের বিপদ


বিএনপির নেতা, সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী এখনো ‘গুম’ রয়েছেন। আজ ২৩ এপ্রিল তার জন্য বিএনপির দ্বিতীয় দিনের হরতাল চলছে। যদি ইলিয়াস ছাড়া না পান তাহলে এই হরতাল লাগাতার চালানো হবে বলে বিএনপি ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে আরো অনেকে গুম হয়েছেন। তারা সাধারণ নাগরিক। মানবাধিকার কর্মীরা এর বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে সোচ্চার ছিলেন। এতে ‘গুম’ হয়ে যাবার বিভীষিকা মানুষের মনে ছাপ ফেলেছে। ইলিয়াস আলী একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের নেতা। তিনি ‘গুম’ হয়েছেন বলে ‘গুম’ ব্যাপারটি এখন একটি দলীয় রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন তাঁর নির্বাচনী এলাকা বিশ্বনাথে পুলিশ ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে দুইজন নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়েছেন বলে সংবাদ পেয়েছি। বাংলাদেশ আবার দ্রুত রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার দিকে এগিয়ে গেল।
মানবাধিকারের দিক থেকে নিখোঁজ হওয়া আর গুম হওয়ার মধ্যে তফাৎ আছে। ইলিয়াস আলীর পরিত্যক্ত গাড়ি বনানীতে পাবার পরপরই অভিযোগ উঠেছিল তিনি নিখোঁজ হন নি, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাই তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। সরকার যথারীতি অস্বীকার করেছে কিম্বা যেভাবে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাতে সরকারের অবগতির মধ্যেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে অভিযোগ। শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, বিএনপিই তাকে লুকিয়ে রেখেছে। তাঁর এই মন্তব্যে সরকারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আরো গাঢ় হয়েছে মাত্র। ফলে তিনি হারিয়ে যান নি বা নিখোঁজও নন। ‘গুম’ হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি ‘গুম’ হয়েছেন। এই চুক্তির নাম ‘গুম হওয়া থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি’ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়হাবহঃরড়হ ভড়ৎ ঃযব চৎড়ঃবপঃরড়হ ড়ভ অষষ চবৎংড়হং ভৎড়স ঊহভড়ৎপবফ উরংধঢ়ঢ়বধৎধহপব)। ‘গুম’ মানে এখানে জবরদস্তি কাউকে নিখোঁজ করে ফেলাÑ ‘এনফোর্সড ডিঅ্যাপিয়ারেন্স’। এই চুক্তি অনুযায়ী ‘গুম’ হওয়া মানে স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হওয়া নয় কিংবা কোন অপরাধী বা অপরাধী চক্র অপহরণ করলে এবং কাউকে খুঁজে না পেলে সেটাও এই কনভেনশান অনুযায়ী ‘গুম’ হবে না। আক্ষরিক অর্থে তাকে ‘গুম’ বলায় অসুবিধা নাই। কিন্তু এই কনভেনশান অনুযায়ী ‘গুম’ বলার সঙ্গে তার পার্থক্য মনে রাখতে হবে। এই আক্ষরিক অর্থে ‘গুম’ হয়ে যাওয়া ‘গুম’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশানের বিবেচনার মধ্যে পড়বে না।
কনভেনশানের উদ্দেশ্য অনুযায়ী তাকেই ‘গুম’ বোঝাবে যদি রাষ্ট্রের কোনো এজেন্ট, কিম্বা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি রাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে, সমর্থন পেয়ে বা মৌন সম্মতিতে কাউকে বিনা বিচারে আটক, অপহরণ বা অন্য কোন উপায়ে তার স্বাধীনতা হরণ করে, তারপর সেই ব্যক্তিকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা অস্বীকার করে অথবা সেই ব্যক্তির কী দশা হোল বা সে কোথায় আছে তা লুকায় আর এইভাবে তাকে আইনের সুরক্ষার বাইরে স্থাপন করে। এই সংজ্ঞার সারকথাÑ ‘আইনের সুরক্ষার বাইরে কাউকে স্থাপন’ করার বিরোধিতার মধ্যে। এটাও লক্ষ্য করবার বিষয় যে রাষ্ট্র বা সরকারকে এই ক্ষেত্রে সরাসরি কোন নির্দেশ দিতে হবে এমন কোন কথা নাই। রাষ্ট্রের মৌন সম্মতিই (ধপয়ঁরংধহপব) যথেষ্ট।
এ ছাড়া এই কনভেনশানের আরো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। তার মধ্যে ১ (২) অনুচ্ছেদ স্পষ্ট বলছে : এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোন অজুহাত চলবে না। বলা যাবে না যে ‘গুম’ ঘটছে বিশেষ কোন পরিস্থিতির জন্য। যেমনÑ যুদ্ধ, যুদ্ধের হুমকি, আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অথবা অন্য যে কোন ধরনের জরুরি অবস্থা। কোন প্রকার বিশেষ অবস্থা ‘গুম’ করার পক্ষে সাফাই গাইবার জন্য অজুহাত হিশাবে গৃহীত হবে না। এরপর অনুচ্ছেদ পাঁচে রয়েছে যে, যদি ‘গুম’ হওয়া বেড়ে যায় কিম্বা ‘গুম’ করে ফেলা রাষ্ট্রের নিয়মিত চর্চা হয়ে ওঠে তাহলে আন্তর্জাতিক আইনে যেভাবে ব্যাখ্যা করা আছে সে ব্যাখ্যা অনুযায়ী তা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিশাবে গণ্য হবে। ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ আন্তর্জাতিক আইনে অতিশয় নিন্দিত ও ক্ষমার অযোগ্য একটি অপরাধ। এর জন্য যে পরিণতি ঘটবার বা শাস্তি হবার কথা সেই শাস্তি থেকে নিস্তার পাবার সুযোগ নাই।
প্রথম আলো একটি উপসম্পাদকীয়তে মিজানুর রহমান খান লিখেছেন যে, “আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক) এবং ‘অধিকার’ আমাদের দুটি শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন। তারা গুমের বিষয়ে কাজ করছে। কিন্তু আন্তরিকতা সত্ত্বেও তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো একটি গুমকেও ‘প্রমাণিত ঘটনা’ হিসেবে দাবি করতে পারেনি। তারা সব কিছু করে শেষে বলে ‘সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ’ পাওয়া গেছে। ‘প্রমাণ পাওয়া গেছে’Ñ তারা একটুও বলতে পারে না” (দেখুন, “ইলিয়াসের ‘গুমের’ বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে”, ২২ এপ্রিল ২০১২)।

এই মন্তব্য একজন মানবাধিকার কর্মী হিশাবে আমার কাছে বিপজ্জনক মনে হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‘আনুষ্ঠানিক ভাবে’ একটি গুমকেও ‘প্রমাণিত ঘটনা’ হিশাবে দাবি করতে পারে নি বলার অর্থ কী? তার মানে বাংলাদেশে কোনো গুমের ঘটনা ঘটেনি? মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচার বিভাগ নয়, ‘আনুষ্ঠানিক’ ভাবে প্রমাণ করবার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। গুমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ‘সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ’ প্রমাণ করাই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দায়িত্ব। সেই অভিযোগ সত্য কি না এবং এর জন্য রাষ্ট্রের কোন বিভাগ বা কোন কর্তৃপক্ষ দায়ী সেটা তদন্ত করবার দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের, বিচার করবার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। সর্বোপরি ‘গুম’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশান আত্মস্থ করে আইন প্রণয়ন করবার দায়িত্ব জাতীয় সংসদের। আর যদি তারা ব্যর্থ হয় তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে তার দায় সকলের। বাংলাদেশের বিচার বিভাগকেও সেই দায় নিতে হবে। তখন এই ‘সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ’ আন্তর্জাতিক নজরদারি ও বিচারের অধীন হতে পারে। গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশানে আমরা দেখেছি রাষ্ট্রের মৌনতা রাষ্ট্রকে দায় থেকে খালাস করে না।
‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ তাঁদের কথা বলবেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর উপদেষ্টা হিশাবে বলে রাখা দরকারÑ আমরা ২০০৯ সালে দুই জন, ২০১০ সালে ১৮ জন, এবং ২০১১ সালে সালে ৩০ জন ব্যক্তি গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘গুম’ হবার কথা বলেছি। এই বছর ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ জন ব্যক্তি ‘গুম’ হয়েছেন। তার মানে প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের কোনো-না-কোনো এজেন্ট এই গুম হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
অনেকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‘গুম’ হবার সংখ্যার হিশাবে মেলে না বলে বিভ্রান্ত হন। সেই দিক থেকে অধিকারের সংখ্যা কম হবার কারণ হচ্ছে, কেউ নিখোঁজ হলেই তাকে ‘গুম’ বলে সংজ্ঞায়িত করা ভুল। এটা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক। এটা সংখ্যা দিয়ে সরকার বা রাষ্ট্রকে বিব্রত বা বিপদে ফেলবার ব্যাপার নয়, এটা সংজ্ঞার মামলা। রাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত হয় এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ’ উঠতে পারে।
এই বিপদের কথা মনে রেখেই ‘অধিকার’ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ যেন গুম হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুমোদন দেয় তার জন্য প্রচার চালিয়ে আসছে। এই প্রচারের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই দিকে নজর দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনার পর সেটা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

আজ দৈনিক সমকালে দেখছি কেবল দশ শর্ত মানলেই ইলিয়াস ‘মুক্তি’ পেতে পারেন। এই শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে একই সঙ্গে ইলিয়াস ও বিএনপিকে। এর মধ্যে পাঁচটি শর্ত মানতে কিছুটা সম্মত হলেও বাকি শর্তগুলো কঠিন হওয়ায় বিএনপির হাই কমান্ড মানতে রাজি না। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, মুক্তি পাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে নিজ থেকে স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন ইলিয়াসকে এই কথা বলতে হবে। বলতে হবে, বিদায়ী রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের ঘটনায় তার ড্রাইভারের প্ররোচনা ছিল। তিনি রাজনীতি করবেন না এমন প্রতিশ্রুতিও দিতে হবে। এই সব। দেখুন, ‘১০ শর্ত মানলে মুক্তি ইলিয়াস আলীর’ (দৈনিক সমকাল, ২৩ এপ্রিল, ২০১২)।
দৈনিক সমকালের এই খবর সঠিক নাকি প্রপাগান্ডা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। এই খবরের মূল সুর দুইটা : এক. ইলিয়াস ‘গুম’ হয়ে সরকারের কাছেই আছেন; দুই. বিএনপি এটা জানে এবং তাকে মুক্ত করবার জন্য ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাদের দেনদরবার চলছে। সমকালের এই প্রতিবেদন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এর ওপর ভিত্তি করে কোন মন্তব্য এখন অনুচিত। তবে এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে। এই ধরণের খবরের বিপজ্জনক দিক হচ্ছে ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরোধ হিশাবে হাজির করা। তার সমাধানও যেন দুই পক্ষের দেনদরবারের মধ্যেই নিহিত। ফলে ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার ঘটনার মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভীষিকা ও তার তাৎপর্য এবং বাংলাদেশের জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামের সম্পর্ক অস্পষ্ট ও অপরিচ্ছন্ন হয়ে যাবার আশঙ্কা ঘটে। ইলিয়াস যেন জীবিত ফিরে আসেন, এটাই এখনকার প্রধান প্রত্যাশা হওয়া উচিত। পরিস্থিতি এখন যা দাঁড়িয়েছে তাতে তিনি ফিরে এলে বা না এলে উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ‘গুম’ হওয়ার শিকার বলেই গণ্য হবেন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তিনি ‘গুম’ হওয়ার পরেও বেঁচে ফিরে এসেছেন বলে বিবেচনা করা হবে। রাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে ‘গুম’ করেছে এই অপরাধ থেকে নিষ্কৃতি পাবে না। একই সঙ্গে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের দায়দায়িত্ব এড়াতে পারবে না। ক্ষমতাসীনদের জন্য ইলিয়াস আলী এখন শাঁখের করাত হয়ে গিয়েছেন।
যদি সমকালের খবর সত্য হয় তাহলে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, ক্ষমতাসীনরা চাইছে তিনি স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছেনÑ এই কথা স্বীকার করিয়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক নিন্দা ও চাপের হাত থেকে আপাতত রেহাই পাওয়া। পরিস্থিতি যেখানে গিয়েছে তাতে এই দায় থেকে সরকারের নিষ্কৃতি পাওয়া কঠিন হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের দায়দায়িত্ব আসলে কাদের? কাদের কাছে তারা তাদের কাজের জবাবদিহি করে বা করতে বাধ্য। যদি ক্ষমতাসীনদের নির্দেশেই ‘গুম’ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে বাংলাদেশে জবাবদিহিতার সুযোগ নাই বললেই চলে। বিচার বিভাগের ভূমিকা থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু বিচার বিভাগও ক্ষমতাসীনদের অধীনস্থ হয়ে পড়েছে। এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট ‘গুম’ করছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলে একই ধরণের ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তা নাই। তার মানে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের গোড়ার প্রশ্ন উহ্য রেখে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বুঝতে হবে সাধারণ ভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘনের সঙ্গে রাষ্ট্র ও রজানীতির সম্পর্ক কোথায়। রাষ্ট্র যদি ব্যক্তির মানবিক ও নাগরিক অধিকারকে নিজের গাঠনিক ভিত্তি হিশাবে স্থাপন না করে, যদি ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষার কর্তব্য তার অন্তর্নিহিত চরিত্র বানিয়ে গড়ে না ওঠে তাহলে এই রাষ্ট্র ভেঙে নতুন করে বাংলাদেশ গড়া ছাড়া জনগণের সামনে আর কোন পথই খোলা নাই। এই ক্ষেত্রে মানবাধিকার-বিরোধী একটি ফ্যাসিস্ট দলের বিপরীতে মানবাধিকার-বিরোধী আরেকটি একনায়কতান্ত্রিক ও গণবিরোধী দলের পক্ষে দাঁড়াবার কোনই যুক্তি নাই। যে রাজনৈতিক দলগুলো মানবিক ও নাগরিক অধিকারে বিশ্বাস করে না, যারা জাতীয় সংসদে গিয়ে ১৪২ অনুচ্ছেদের শক্তি ব্যবহার করে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে, সেই দলগুলোর কাছ থেকে আমরা কী আশা করতে পারি? দেশে-বিদেশে খুনি বাহিনী হিশাবে খ্যাত র‌্যাব গঠন করেছে বিএনপি। শুধু তাই নয়, নির্বাচনী বক্তৃতায় র‌্যাবের কর্মকাণ্ডের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ সেই র‌্যাবকেই ব্যবহার করেছে। আজ অনেকে র‌্যাব ভেঙে দেবার কথা বলছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যখন ভেঙে দেওয়ার কথা বলেছিল, তখন অবশ্য অনেককেই দোনমোনা করতে দেখেছেন। কথা হচ্ছে শুধু র‌্যাব ভেঙে দিলে হবে না, আরো বহু গোড়ার জিনিস ভেঙে নতুন ভাবে বাংলাদেশ গড়তে হবে। গড়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নাই।

অনেকে ইলিয়াস আলীর ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে হরতালে আপত্তি জানাচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি, এতে মানুষের অসুবিধা হয়, ব্যবসাবাণিজ্যে বাধা তৈরি হয়, দেশের অর্থনীতি বিপদে পড়ে, হরতালের সময় গাড়ি ভাঙচুর হয়, নাগরিকদের সম্পদের ক্ষতি হয়, ইত্যাদি। হরতাল সফল করবার জন্য হরতালের আগের দিন ভয়ভীতি সঞ্চারের কর্মসূচি নেওয়া হয়। এতে জ্বালাও পোড়াও করতে গিয়ে নিরীহ নাগরিকদের পুড়িয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে। এবারও গাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা গাড়ির চালক বদর আলী বেগ পুড়ে মরেছেন, তার সহকারী মোতালেব অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছেন। গ্রামে বদর আলীর গরিব স্ত্রী, পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি দেখেছি। কিছু দিন পর এদের নাম কারো মনে থাকে না। এরা হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে হত্যার চিহ্নগুলো বড় সহজেই মুছে যায়। এই সকল কারণে হরতালের বিরুদ্ধে নাগরিকদের ুব্ধ হবার বিস্তর কারণ আছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসুবিধা ছাড়াও মানবিক সংবেদনাও এখানে কাজ করে, যে সংবেদনা ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না। এই সকল যুক্তি অস্বীকার করবার কোন কারণ নাই। এমনকি এমন একটি ‘গুম’ ঘটে যাবার পরেও মানবাধিকার কমিশনের চেয়াম্যানও হরতালে আপত্তি জানিয়েছেন। বিশেষত, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। তাদের কথা ভেবে তিনি হরতাল না করার মিনতি জানিয়েছেন। যদিও মানবাধিকারের দিক থেকে একজন নাগরিকের ‘গুম’ হয়ে যাওয়া ভয়ানক দুঃসংবাদ। রাষ্ট্রের জন্য এটা খুবই বড় ধরনের সঙ্কট।
প্রহসন হোল হরতালের বিপক্ষে একই যুক্তি ক্ষমতাসীনরাও দিয়ে থাকে। গাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা একজন নিরীহ ড্রাইভার পুড়ে মরার পরপরই আওয়ামী লীগের নেতারা যেভাবে প্রতিপক্ষকে দায়ী করলেন তাতে বোঝা মুশকিল আসলে এই হত্যার জন্য কোন পক্ষ দায়ী। টেলিভিশনে বদর আলীর একজন আত্মীয়কে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুনেছিÑ দুই দলই এর জন্য দায়ী। তাদের রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হচ্ছে নিরীহ মানুষ। গণবিরোধী এই দুই পক্ষের বিরুদ্ধে গ্রামের একজন সাধারণ মহিলার সচেতনতা অর্থপূর্ণ মনে হোল। যত বেশি জনগণ অগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী ও মানবিক অধিকারবিরোধী শক্তি ও শ্রেণীর বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে উঠবেন ততই বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ ও পদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
হরতালের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মুখে যে যুক্তি আমরা শুনি সেটা এর আগে বিএনপি ও চারদলীয় জোটের কাছেও আমরা শুনেছি। সেই গীত এখন শুনছি আওয়ামী লীগ ও তাদের মহাজোটের মহান সব সদস্যের মুখেও। ফলে নাগরিকদের ন্যায্য ক্ষোভ প্রকারান্তরে ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই কাজ করে। এটাই প্রহসন। বিএনপি অফিস বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র‌্যাব যেভাবে ঘিরে রাখে এবং বিরোধী দলের মিছিলে ও সভায় যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলা করে তা অবিশ্বাস্য, কিন্তু এই কাজ বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়েও হয়েছে। তার মানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দলীয় স্বার্থেই ব্যবহৃত হয়। তাদের ব্যবহার করা যায়। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দল তাদের ব্যবহার করে নির্দয়ভাবে বিরোধী প্রতিপক্ষকে দমন করবার জন্য। যে দল ক্ষমতায় যায় সেই দলের সন্ত্রাসী বাহিনী হিশাবে পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহৃত হয়। নাগরিকদের সাংবিধানিক বা আইনি অধিকারের কোন তোয়াক্কা তারা করে না। কারণ ক্ষমতাসীনরা তাদের দায়মুক্তির দায় নিজেরাই তাদের কাঁধে নিয়ে নেয়, নিজেরাই বহন করে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক যে পরিস্থিতি তাতে নাগরিকদের লাগাতার আন্দোলন সংগ্রামে নেমে পড়বার কথা। এই দুঃসহ পরিস্থিতির অবসান চায় সকলেই, কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে বিএনপি ও তার অধীনস্থ জোটের সদস্যদের দলীয় সমর্থকরা ছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছেনা। অন্তত যেভাবে নামা উচিত সেভাবে নামছে না। এর কারণ বিএনপি জনগণকে কোন রাজনীতি দিতে পারছে না। আদৌ পারবে কি না সন্দেহ। স্রেফ আওয়ামী বিরোধিতা ও নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সকারের দাবি কোন রাজনীতি হতে পারে না। এই রাষ্ট্র যেমন আছে তেমনি রেখে বিএনপি ক্ষমতা চায়। ক্ষমতার হাতবদল চায়, কিন্তু রাষ্ট্রের কোন রূপান্তর চায় না। যে কারণে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সংকটের চেয়েও সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন মানুষের কাছে বারবার বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও মানুষ তার বিরোধিতা করে। জানে, এর ফলে তাকে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির স্বীকার হতে হবে তার পরিবর্তে রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিবাচক কোন রূপান্তর ঘটবে না। কারণ সেটা ঘটাবার কোন দৃশ্যমান রাজনৈতিক কর্মসূচি মানুষের সামনে হাজির নাই। গুম ভীতিকর অবশ্যই। শুধু গুম নয়, ভবিষ্যৎ কর্মসূচির অনুপস্থিতিই বরং সবচেয়ে বেশি ভীতিকর। মানবিক অধিকার নিশ্চিত করবার জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাক্সা এবং তার পক্ষে রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশগ্রহণের বিপরীতে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থ মুখ্য হয়ে যাবার এই প্রবণতাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক।
২৩ এপ্রিল ২০১২। ১০ বৈশাখ ১৪১৯। শ্যামলী।
farhadmazhar@hotmail.com