বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১১

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছায়া, জননেতা আবদুর রাজ্জাক আর ইহজগতে নেই। ২৩ ডিসেম্বর বিকালে পরপারে চলে গেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চার যুবনেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ—এ চারজনের একজন শেখ ফজলুল হক মনি ঘাতকদের হাতে সেই ’৭৫-এর ১৫ আগস্টই সস্ত্রীক নিহত হয়েছিলেন। বাকি ছিলেন তিন—আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং সিরাজুল আলম খান। অনাদরে তিনিও চলে গেলেন। এখন রইলেন পর্দার অন্তরালে সিরাজুল আলম খান ও প্রকাশ্যে তোফায়েল আহমেদ। আশা ছিল আবদুর রাজ্জাক সুস্থ হয়ে দেশে ফিরবেন। শেষ দেখা দেশেই হবে তার সঙ্গে। কিন্তু সে সাধ পূর্ণ হলো না। আমি তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি ও তার পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
গত পর্বে স্মৃতিসৌধে না যাওয়া এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করায় একমাত্র পাঠান মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ খানের পারিবারিক করুণ পরিণতি নিয়ে লিখেছিলাম। লেখাটি নিয়ে অনেকেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। আমি অভিভূত হয়েছি এত মানুষের সাড়া পেয়ে। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমরা মরণপণ লড়াই করেছি মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্যে, আজাদীর জন্যে। কিন্তু পাঠান মমতাজ খান কী কারণে আমাদের সমর্থন করেছে? অন্যান্য ব্যবসায়ীর মতো কিংবা পাকিস্তানিদের মতো সেও আমাদের ওপর অত্যাচার করতে পারত। কিংবা গা এলিয়ে দিয়ে আরাম-আয়েশে সময় পার করতে পারত। সামর্থ্যবান মানুষ, ইচ্ছে করলেই এক সকালে সে পাকিস্তান চলে যেতে পারত। কিন্তু এর কোনোটাই সে করেনি। আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর সবসময় গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। আমার দলের সঙ্গে সেই চরম সময় কাজ করা আমি যদি অনুমোদন করি আর আমি কেন, বঙ্গবন্ধুর প্রশংসাপত্র, বাংলাদেশ ডিফেন্সের ছাড়পত্র, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং কল্যাণ ট্রাস্টের নানা কাগজপত্র একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার চাইতে মমতাজ খানের অনেক বেশি আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে এত দরদ, এত ভালোবাসা, তাহলে মমতাজ খান বঞ্চিত কেন? আমরা দুই-চার কোটি টাকা দিয়ে বিদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা জানাতে পারি। মমতাজ খানও তো একজন অবাঙালি, তার জন্যে কেন করতে পারি না? আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে কেউ কিছু করতে চায় না। কাউকে করা বা অনুকম্পা করা আর সমমর্যাদা দেয়া এক কথা নয়। দেশের বিত্তশালীরা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দয়া ও অনুকম্পা দেখাতে চায়, সম্মান করতে চায় না। যদি তা-ই চাইতো তাহলে এমন হওয়ার কথা ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চারদিকে কত ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে, কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। একটা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা। যেভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা এবং মুক্তিযোদ্ধা বিবেচনা করা হয়, এভাবে করলে আগামী দিনে মুক্তিযোদ্ধারা নগণ্য হয়ে পড়বে এবং তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কোনো মর্যাদাই থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধ কোনো লাঠিখেলা ছিল না, লাঠিয়াল বাহিনীর কাজও না। এখন যেমন অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে তুলে ধরতে অনেকক্ষেত্রে গর্ব করে বলে পাকিস্তানি হানাদারদের গ্রামেগঞ্জে অনেক মেয়ে শিলপাটা দিয়ে গুঁতিয়ে মেরেছে। এও কি সম্ভব? যে পাকিস্তানি হানাদারদের কাছে যাওয়া যেত না, বিশ্বের অন্যতম দুর্ধর্ষ এক বাহিনী, তাদের শিলপাটা দিয়ে গুঁতিয়ে মারা যায়? এমন পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা জয়ী হয়েছি? এ সবই দম্ভোক্তি। এ দম্ভের বাইরে না যেতে পারলে পতন অনিবার্য। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম, কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করি, লেখালেখি করি, সেইহেতু মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে গোড়ার খবর নিতে গিয়ে ইদানীং একেবারে স্তম্ভিত হয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের যে গেজেট বা তালিকা হয়েছে, সেখানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম না থাকলে শতবছর পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই থাকবে না, তেমন কাজ করে বসে আছি আমরা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকায় সে সময়ের যুবনেতাদের একজনের নামও নেই। সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ কারও নাম নেই। নাম নেই তখনকার ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নুরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ এদের। নাম নেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বিপ্লবী সরকারের অস্থায়ী প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, কামারুজ্জামানদের। ওইভাবে গেজেটে আমার নাম আছে কিনা বলতে পারি না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা তালিকা করতে গেলে যারা যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, প্রথম সেসব জাতীয় নেতার নাম থাকা দরকার। পয়সাকড়ির জন্যে তাদের না হয় সার্টিফিকেট না দেয়া হলো, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তাদের পরিবার-পরিজন না হয় চাকরি-বাকরি না-ই পেল; কিন্তু ইতিহাস বিশুদ্ধ রাখার জন্যে নেতাদের নাম সবার উপরে থাকা উচিত ছিল। এখন যদি হুজুর মাওলানা ভাসানীর নাম, বঙ্গবন্ধুর নাম, মণি সিংহের নাম না থাকে, যে গণপ্রতিনিধিরা সরকার বানিয়েছিলেন তাদের নাম না থাকে, যে ছাত্র-যুবক নেতারা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ তাদের নাম না থাকে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ করে কিছু মানুষকে সামনে এনে তাদের ভাগ্যবদল মোটেই সত্যিকারের ইতিহাস হতে পারে না। এজন্যে সেদিন প্রথম আলো-তে বিজ্ঞাপন দিয়ে আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ মাননীয় সংসদ সদস্য আশিকুর রহমান লাখ টাকা খরচ করে আমার নামে, কাদেরিয়া বাহিনীর নামে, উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের নামে জঘন্য অভিযোগ এনে এক জবানি ছেপেছেন। পত্রিকায় লেখা দিয়ে প্রতি মাসে আমি বেশকিছু টাকা পাই। আর উনি টাকা দিয়ে ছেপেছেন। আমি এমন টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে জবানি ছাপতে খুব একটা দেখিনি। তবে বিত্তশালীরা খবরের কাগজের পুরো পাতাজুড়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে কখনো-সখনো সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আবার কখনও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে তা খণ্ডন করেন। আমি এ নিয়ে পরে ধারাবাহিক দু-একটি পর্ব লিখব। আমার কথা ছিল আশিকুর রহমান যুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, পাকিস্তানের অনুগত কর্মচারী হিসেবে টাঙ্গাইল জেলায় দায়িত্বে ছিলেন। যখন বাংলাদেশ সরকার হলো, তখন যে বাঙালি কর্মচারীরা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য জানাল তারা দেশপ্রেমিক, না যারা পাকিস্তানের প্রতি অনুগত ছিল তারা দেশপ্রেমিক? এ প্রশ্নের পরিষ্কার জবাব ভদ্রলোক নিজেই দিয়ে দিয়েছেন। এখন দেশবাসী এবং সরকার বিচার করে দেখবেন। পড়ছে দেশে কলিকাল, ছাগলে চাটে বাঘের গাল। ভদ্রলোক এক জায়গায় বলেছেন, ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মুক্ত হওয়ার দিন তিনি আমাকে দেখেননি। দেখবেন কী করে! পাকিস্তানি হিসেবে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে ব্রিগেডিয়ার ফজলুর রহমান তার পাছায় লাথি মেরে জেলা সদরে যে ঘরে ফেলে রেখেছিল, সেখান থেকে বেরুতে পারলে তো দেখবেন! আর তার ইচ্ছায় তখন আমাকে দেখার সুযোগ ছিল না। ইচ্ছাটা আমাদের হওয়ার কথা ছিল। চল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে, মিয়া সাহেবরা কোনোদিন ধরা পড়েননি। তাই এত লাফালাফি। এখনও আশিকুর রহমানের পাছার কাপড় তুললে হয়তো ব্রিগেডিয়ার ফজলুর লাথির দাগ খুঁজে পাওয়া যাবে। তারপরও বড় বড় কথা তার শোভা পায় না। কী মনে করে হুট করে বলেছেন, ভুয়াপুরে মাটিকাটায় যে জাহাজ মারা হয়েছে, সেটা হাবিব কমান্ডার মেরেছে। আর আমার নামে নাকি চালিয়ে দিয়েছি। জাহাজটা তো হাবিব কমান্ডারই মেরেছে। কিন্তু সে একা নয়, আরও পাঁচ-ছয়জন কমান্ডার ছিল। আমার দল মারে নাই, আমি মারি নাই, বাহিনীর প্রধান হিসেবে মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার দূরে ছিলাম বলে আমার কোনো ভূমিকা নাই। তাহলে কোনোদিন কেউ যদি প্রশ্ন করে বসে, ১৫শ’ মাইল দূরে বঙ্গবন্ধু তো পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার অবদান কী? এমন গাঁজাখুরি কথা একমাত্র পুরো যুদ্ধের নয় মাস যারা পাকিস্তানের দালালি করেছে, তারাই বলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে অন্য পর্বে আসব। আমার প্রসঙ্গ ছিল একজন পাঠান হয়ে মমতাজ খান পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে বিশাল বিত্তের মালিক আজ নিঃস্ব রিক্ত। আর যুদ্ধাপরাধী আশিকুর রহমান এই ভূখণ্ডে জন্মেও যুদ্ধের পুরো নয় মাস পাকিস্তানের সেবাদাস হিসেবে কাজ করে বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক। এর বিচার কে করবে? নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিচার করতেই হবে। কারণ পাকিস্তানের জন্যে, পাকিস্তানের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা অন্যায়-অত্যাচার করেছে, তারা নিঃসন্দেহে যুদ্ধাপরাধী। সে সময় টাঙ্গাইল জেলায় পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা যে যে ঘটনা ঘটেছে, তার সম্পূর্ণ দায় আশিকুর রহমানের। আশিকুর রহমান নিজেই বলেছেন, টাঙ্গাইলে তার আগের ডিসি আবুল ফজলের বিরুদ্ধে কোলাবরেটর হিসেবে অভিযোগ উঠেছিল; কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। কী চমত্কার যুক্তি! আবুল ফজল ডিসি হলে কোলাবরেটর হয়, আশিকুর রহমান ডিসি হয়ে সে একই কাজ করলেও কোলাবরেটর হয় না! তামাশা আর কাকে বলে। কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ট্রোর অন্যতম সাথী চে গুয়েভারা কিউবা মুক্ত করে সেখানে চুপ করে বসে না থেকে বলিভিয়ার মুক্তি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। আমেরিকার ষড়যন্ত্রে তাকে জীবন দিতে হয়েছিল। আমি মমতাজ খানকে নিয়ে গর্ব করতে পারি; কিন্তু আশিকুর রহমানকে নিয়ে নয়।
এমনিতেই মন বড় অশান্ত। মানুষ বড় বেশি দুশ্চিন্তায়। রাস্তাঘাটে ঠিকভাবে চলা যায় না। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সময় হিসাব করে যাওয়া যায় না। এই তো গত ২০ তারিখে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সড়কে এক দুর্ঘটনায় ৮-১০ ঘণ্টা দেরিতে যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছেছে। বাজারঘাটের হিসাবও মেলে না। বাড়ির গৃহিণীরা আগামীকাল ক’টাকার বাজার করবে, সারারাত হিসাব করে সকালে বাজারে গিয়ে দেখে হিসাব মিলছে না। মানুষের চাকরি নেই, তেমন কোনো কর্মসংস্থানও নেই। নাক-মুখ মুছে মহাজোট বললেও আইনশৃঙ্খলা খুবই খারাপ। জোর যার মুল্লুক তার মতো অবস্থা। গর্ব করে আমরা গণতান্ত্রিক সমাজের কথা বলছি; কিন্তু তেমন মূল্যবোধ আমাদের কারও মধ্যে নেই। আস্তে আস্তে বিরোধী দলকে, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দলকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সারা জীবন দেখে এলাম শাসক যত শক্ত হয়, তাদের বাঁধন তত টুটে। যে যত জনপ্রিয় হয়, পৃথিবীতে হিমালয়ের উপর উচ্চতা নেই, একদিক দিয়ে সর্বোচ্চ শৃঙ্গে উঠলে তারপর অন্যদিক দিয়ে আবার নিচের দিকে নামতেই হয়। এটাই নিয়ম। জন্মের পর মৃত্যু, একে সহজভাবে নিতে পারাই ভালো। আজ যে অনাদৃত, কাল সে-ই হতে পারে মধ্যমণি। বিষয়টি মনে না রাখা বোকামির কাজ। এ ধরনের অশান্ত অবস্থায় কোনো বিবেকবান মানুষের হৃদয় শান্ত থাকে না। আরও অস্বস্তি ও অশান্তি বোধ করছি, আমাদের সরকার কেমন যেন জনসাধারণকে অবিশ্বাস করে একের পর এক দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করে চলেছে। অন্যদিকে পরিপকস্ফ ভারত সরকার, তারাও কেমন যেন অপকস্ফ আচরণ করছে। সরকার অথবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে খাতির হলেই সেটা গোটা বাংলাদেশের সঙ্গে খাতির এমন বলা যায় না। কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক সব থেকে ভালো। কথাটা গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট হতে পারে। গত কয়েক মাস ধরে আমার তো মনে হয় পাকিস্তান জমানার শেষের দিকেও বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে এত অবিশ্বাস করত না, অপছন্দ করত না—যতটা এখন করে। গত তিন বছরে না হলেও এক বছরে বাংলাদেশ-ভারত প্রিয়তায় ধস নেমেছে। যারা এক বছর আগেও ভারতকে সম্মান করত, মর্যাদা দিয়ে কথা বলত, তারা এখন সবাই বিরক্ত। সত্যিকার অর্থেই দেশটা শুধু আওয়ামী লীগের না, বিএনপিরও না। এসবের বাইরেও একটা বিরাট বাংলাদেশ আছে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ভারত হারিয়ে যাচ্ছে। ট্রানজিট অথবা করিডোর এসব লুকোচুরি খেলে কোনো লাভ নেই। মানুষ এখন সব বোঝে। টিপাই বাঁধ নিয়ে সরকার যে নতজানু ভূমিকা নিয়েছে, তাতে সরকারের অর্ধেক জনপ্রিয়তা মাটিতে মিলিয়ে গেছে। আমাদের মাথার চৌদ্দ-পনেরশ’ ফুট উপরে সুতো দিয়ে তলোয়ার ঝুলিয়ে রাখার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় কোটি কোটি কিউসেক পানি জমা করলে খোদা না করুন একদিনে কেয়ামত হয়ে যাবে। ওই বাঁধ আসাম চায় না, মণিপুর চায় না। আমরা তোতাপাখির মতো ভারতীয়দের কথা বিশ্বাস করে নাচানাচি করছি। ভারতকে তো করিডোর দেয়া হয়েই গেছে। এটা আর লুকিয়ে রাখার দরকার কি? এই করিডোর সবসময়ই ছিল। পাকিস্তান হওয়ার পর কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জ জাহাজ চলত। সরাসরি গেদে দিয়ে ট্রেন আসত। আরিচা-বাহাদুরাবাদ-ফুলছড়ি হয়ে ধুবড়ী, গোয়ালপাড়া দিয়ে সেই ডিব্রুগড় পর্যন্ত নৌপথে ভারতের মালামাল আনা-নেয়া হতো। ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর কিছুটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরও কলকাতা থেকে আরিচা, বাহাদুরাবাদ-ফুলছড়ি-বালাসি হয়ে ধুবড়ী দিয়ে আসামের ডিব্রুগড় পর্যন্ত সবসময় ভারতের নৌ যোগাযোগ ছিল। সেটা এখনও আছে। নতুন নৌ যোগাযোগ হয়েছে কলকাতা কিংবা ডায়মন্ড হারবার থেকে আশুগঞ্জ পর্যন্ত। ভৈরবের আশুগঞ্জ নৌবন্দর পর্যন্ত বিশাল বিশাল জাহাজ আসছে। আগরতলায় বিদ্যুত্ প্লান্ট বসানোর জন্যে ভারী ভারী যন্ত্রপাতি নামছে। এই তো সেদিন দেখলাম ৩৫০ টন ওজনের ট্রেইলার পারাপারের জন্যে মাটি ফেলে আখাউড়ার তিতাস নদী ভরে ফেলা হয়েছে। দরিদ্র জেলেদের রুটি রুজি বন্ধ। তাদের পেটে হাত পড়েছে। সত্যিই কি আমরা স্বাধীন দেশ? অন্য দেশের মালামাল পার করার জন্যে আমরা আমাদের নদীর জলপ্রবাহ বন্ধ করে দিই! আর দেশের মালিক জনগণ তারা কিছুই জানে না! এত ডিজিটাল সরকার, তারা এই তিন বছরে কী করলেন? ভারতের অনুগত সেবাদাস হিসেবে যদি এমন নতজানু আচরণ করতেই হয়, একটা বিকল্প রাস্তা করে নিতেন। আধুনিক জমানায় কত আর সময় লাগতো! রাস্তা না করতে চান, বড় বড় পন্টুন বা বার্জ বসিয়ে তা দিয়ে সেতু করতেন। পানির চলাচল অব্যাহত থাকত। মহাজোট সরকারে আছেন বলে দেশটা কি ভারতকে দিয়ে দিতে চান? দাখিলা-পর্চা কিন্তু আপনাদের নামে না। তাই কাউকে সাফকবলা করে দিতে পারবেন না। মানুষ একবার রুখে দাঁড়ালে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। বাঙালিরা যদি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মুসলমানের দেশ ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে, তাহলে অসহ্য হয়ে গেলে দিল্লির বিরুদ্ধে সিনা টান করে দাঁড়াতে কোনো দ্বিধা করবে না। বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। দখলদারের মতো নয় অথবা মনিবের মতো নয়। ঋত্বিক ঘটক ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বিখ্যাত সিনেমা তৈরি করেছিলেন স্বাধীনতার পরপর। বাংলার আপামর জনসাধারণের হৃদয়ে সে সিনেমাটি এখনও জ্বলজ্বল করছে। তার শেষপর্বে পানির অভাবে এলাকাটি মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে এমন একটি দৃশ্য দেখিয়েছিলেন। একসময় মিসরের নীল নদে বাঁধ দেয়া হয়েছিল। আশুগঞ্জ থেকে ত্রিপুরায় বিদ্যুত্ প্লান্ট নির্মাণের জন্যে তিতাসের বুকে বাঁধ দেয়া আমার কাছে কিন্তু মনে হয়েছে কোনো মানবসন্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলার মতো। সনাতন ধর্মীদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেমন মথুরার রাজা কংসকে দু’পায়ে ধরে ফেড়ে ফেলে শূন্যে ছুড়ে দিয়েছিলেন, তেমনি ঘটনার মতো। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বাঙালি জাতি যে সব পারে, এর কিন্তু ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। তাই সময় থাকতে সাধু সাবধান।

শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১১

আজ কত কথা মনে পড়ে


বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
জীবনের অনেকগুলো দিন পেরিয়ে এসে স্মৃতির পাতা উল্টালে কত কিছু ছায়াছবির মতো জীবনের পর্দায় ভেসে ওঠে। মনে হয়, এই সে দিন সেনাবাহিনী থেকে ফিরে করটিয়া কলেজে ভর্তি হলাম। আমতলা গোল চত্বরে বক্তৃতা করলাম, নাক-কান ঘেমে একাকার হয়ে গেল। মনে হয়, এই তো সে দিন মুক্তিযুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধুর হাতে সব অস্ত্র দিয়ে দিলাম। তারপর তিনি নিহত হলে প্রতিবাদ করে নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে৯০-এর ১৬ ডিসেম্বর লাখ লাখ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে দেশে ফিরলাম। বিমান থেকে নেমে মাটিতে পা ফেলতে মন সায় দিলো না। জননী জন্মভূমি মাটি মাকে চুমু খেয়ে বুকে হাঁটলাম অনেকক্ষণ। মনে হয়, যেন এই গতকালের কথা। কিভাবে দিন যায়, মাস ঘুরে বছর যায়, ব্যস- থাকলে বোঝাই যায় না। ইদানীং ব্যস-তা কিছু কম। তাই কিছুটা বুঝতে পারি। গত ২৩ নভেম্বর রাত ১১টা ২১ মিনিটে হঠা মোবাইল বেজে উঠল। সাধারণত ১১টার পর মোবাইল বন্ধ করে দিই। সে দিন কোনো কারণে ফোন বন্ধ করা হয়নি। ১১টার দিকে ঘুম এসে যায়। যদিও বাইরে থাকলে এমনটা না- হতে পারে। তবে বেশি রাত জাগলে আমার ঘুম আসে না
কিন' ১১-১২টার মধ্যে একবার ঘুমিয়ে পড়লে ঘুম নিয়ে আর কোনো সমস্যা নেই। গত ১০-১২ বছর ঘুমের জন্য তেমন হাহাকার করতে হয়নি। ঘুমের ওষুধ খেতে হয় না। বই অথবা পত্রিকা পড়লেই ঘুম এসে যায়। বছর দশেক যাবপত্রিকা অথবা বই- আমার রাতের ঘুমের ওষুধ। ওদিনও যেন কী পড়ছিলাম। হঠা ফোন বাজছিল। অপরিচিত নম্বর। ইদানীং অনেকেই অপরিচিত নম্বর ধরে না। সাথী-সঙ্গীরা থাকলে আমিও ধরি না। তারাই সব সময় ধরে দেয়। কেউ কাছে না থাকলে দু’-একবার নিজেও ধরি। তবে ল্যান্ডফোন সব সময়ই ধরি এবং ওটা ধরা একটা দায়িত্ব-কর্তব্য মনে করি। কে ফোন করল সেটা বড় কথা নয়। যে ফোন করেছে সে গরিব না ধনী তা- বিচার করি না। যে যা- বলুক না কেন, যতক্ষণ সময় সুযোগ আছে ধরার এবং শোনার চেষ্টা করি। ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী সে দিন টাঙ্গাইলে ছিল না, তারা ছিল ঢাকায়। ঘরে একাই ছিলাম। তাই ফোন বাজতেই ধরেছিলাম। অপর প্রান- থেকে জিজ্ঞেস করেছিল এটা কাদের সিদ্দিকীর ফোন? বলছি বলায় বলল, অসময়ে ফোন করে আপনাকে হয়তো বিরক্ত করলাম। আপনি ঠাণ্ডু স্যারের ছেলে জুয়েলকে হয়তো চেনেন। সে গতকাল মারা গেছে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন) আজ বিকেলে বাবার পাশে তাকে কবর দেয়া হয়েছে। আপনি ফিরোজের কাছে তার খোঁজ করেছিলেন, তাই আপনাকে জানালাম। ২৫ তারিখ বাদ মাগরিব ধানমন্ডিতে কুলখানি। সম্ভব হলে আসবেন। আমার সারা মনপ্রাণ অশান- হয়ে উঠল। - কি সম্ভব? আমার থেকে - বছরের ছোট। এই সে দিন ওর সাথে কথা বলেছি, বাসায় আসতেও বলেছিলাম। কারণ ওকে প্রায় ৩০-৩৫ বছর দেখিনি। জুয়েলের মৃত্যুর খবর শুনে অনেক অতীত স্মৃতি মনের পর্দায় ছায়াছবির মতো ভেসে উঠল।
১৯৬৮ সাল। আইয়ুব-মোনায়েমের তখন দুর্দান- প্রতাপ। আড়াই-তিন বছর সেনাবাহিনীর ঘানি টেনে কেবলই বাড়ি ফিরেছি। বিন্দুবাসিনী স্কুল থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাস করে করটিয়া কলেজে ভর্তি হতে গেছি। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী তখন টাঙ্গাইলে ছাত্রদের প্রধান নেতা। বক্তৃতার জাদুকর, করটিয়া কলেজের সাবেক ভিপি। সে হিসেবে সর্বত্র তার নামডাক। কিন' সরকারি প্রশাসনের কাছে তিনি চক্ষুশূল। টাঙ্গাইল তখনো জেলা হয়নি। ময়মনসিংহ জেলার অধীন এশিয়ার সর্ববৃহমহকুমা টাঙ্গাইল। ময়মনসিংহের ডিসি তখন টাঙ্গাইল নিয়ন্ত্রণ করেন। মোকাম্মেল হকের মতো জাঁদরেল সিএসপি ময়মনসিংহের ডিসি। সরকারের জন্য লতিফ সিদ্দিকী তখন এক মস-বড় উপদ্রব। তার ভাই হিসেবে আমি আরো নতুন উপদ্রব হয়ে দেখা দিই এটা কোনোমতেই প্রশাসন চায় না। গুঞ্জন ছিল, আমাকে করটিয়া কলেজে ভর্তি হতে দেবে না।৬২ থেকে৬৮ বারবার বাবা বড় ভাইকে জেলে নিয়ে আমাদের পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য একেবারে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছিল। কলেজের প্রথম বর্ষে ভর্তি হতে তখন ৪৫ থেকে ৫০ টাকার প্রয়োজন। বাবার মোক্তারি সনদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তার উপার্জন বন্ধ। বিনা কারণে দেড়-দুই বছর জেল খেটে কেবল বেরিয়েছেন। বড় ভাই তখনো জেলে। ছোট বোন রহিমা দেশের একমাত্র মহিলা কলেজ কুমুদিনীতে পড়ে। শুশু সিক্স কিংবা সেভেনে, শাহানা থ্রি-ফোরে। কোথা থেকে কিভাবে অনেক কষ্ট করে মা আমার হাতে বিশ-পঁচিশ টাকা তুলে দিয়ে কলেজে ভর্তি হতে বললেন। কিভাবে যেন মোট আটত্রিশ টাকা সংগ্রহ করে করটিয়া কলেজের উদ্দেশে ছুটলাম। করটিয়া কলেজে আরো দু’-একবার গেছি। কিন' কলেজে পা দিলেই কেমন যেন সারা শরীর আড়ষ্ট হয়ে যেত। ভয়ে শিউরে উঠতাম। আমি একসময় মির্জাপুরের বরাটি-নরদানা পাকিস-ান হাই স্কুলে শ্রী দুখীরাম রাজবংশীর ছাত্র ছিলাম। দুর্দান- হেড মাস্টার ছিলেন তিনি। হোস্টেলে যারা থাকত তারা রাত ১১টার আগে কখনো ঘুমাতে পারত না। শ্রী দুখীরাম রাজবংশীর কারণেই শিক্ষকদের প্রতি আমার দুর্দান- ভয় ছিল। তখন করটিয়া কলেজে একদল লতিফ সিদ্দিকীকে দেবতুল্য সম্মান করত, অন্য দলের কাছে শাহজাহান সিরাজ ছিলেন মাথার মুকুট, চোখের মণি। কে কে যেন আমাকে প্রথম দিন কলেজে নিয়ে গিয়েছিল। ভর্তি ফরম পূরণ করে নিয়মমতো একজন শিক্ষকের স্বাক্ষর নিয়ে কেরানির রুমে জমা দিতে গেলে ভর্তি ফি বাবদ ৪৮ টাকা চাইলেন। আমার কাছে তখন ছিল ৩৮ টাকা। ভর্তি কেরানি ছিলেন কুমিল্লার মাখন ভাই। দেখতে আইয়ুব খানের চেয়েও লম্বা। ফুট - ইঞ্চি হবেন। দারুণ ভলি খেলতেন তিনি। নেটে দাঁড়িয়ে যখন ডাউন দিতেন, তার বল মাটিতে পড়লে মাটি নিচু হয়ে যেত। লতিফ ভাইকে ভীষণ ভালোবাসতেন। আমার শুকনো মুখ দেখে বললেন, ‘ভাইস প্রিন্সিপালকে দিয়ে লিখিয়ে আনলে কম টাকাতেও ভর্তি করা যেতে পারে।তখন কলেজে প্রিন্সিপাল ছিলেন না। করটিয়া কলেজের প্রখ্যাত প্রিন্সিপাল তোফায়েল আহমেদকে আন্দোলন করে কেবলই সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ভাইস প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু স্যার তখন দায়িত্বে। তত দিনে কলেজে লতিফ সিদ্দিকী শাহজাহান সিরাজের পরিষ্কার দুটি দল হয়ে গেছে। শাহজাহান সিরাজ তখন করটিয়া কলেজের ভিপি। লতিফ সিদ্দিকী ময়মনসিংহ কারাগারে রাজবন্দী। স্বাভাবিক কারণেই শাহজাহান সিরাজের কলেজে প্রতাপ বেশি। আর ভাইস প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু স্যার ঘোরতর মুসলিম লীগার এবং শাহজাহান সিরাজের পক্ষের লোক। তার কাছে গেলে আমার কথা রাখবেন? লতিফ সিদ্দিকীর ভাইয়ের বেতন বাকি রেখে কলেজে ভার্তির সুযোগ দেবেন? শঙ্কিত মনেই তার কাছে গিয়েছিলাম। আমার সাথে অনেকেই গিয়েছিল। সালাম দিয়ে নাম বলে সামনে দাঁড়াতেই মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি লতিফের ভাই?’ ‘জি হ্যাঁ।’ ‘কেন এসেছ? কী চাও?’ ‘ভর্তি হবো। সব টাকা দিতে পারব না।’ ‘বেশ তো অসুবিধা কী? টাকা দেবে?’ ‘ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ।কেরানি মাখন ভাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সর্বনিম্ন কত টাকায় ভর্তি করা যায়?’ তিনি এটা-ওটা হিসাব করে বললেন, ‘পঁচিশ টাকা হলেও চলে। সাঁইত্রিশ টাকা হলেও চলে।ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পঁচিশ টাকা, নাকি সাঁইত্রিশ টাকা দিয়ে ভর্তি হবে?’ ‘আমি সাঁইত্রিশ টাকাই দিতে চাই।সাথে সাথে তিনি সাঁইত্রিশ টাকা নিয়ে আমাকে ভর্তি করার আদেশ দিয়ে দিলেন।
- মিনিটের মধ্যে দুই মাসের বেতন, ভর্তি ফি, আরো আরো কী কী নিয়ে আমার নামে সাঁইত্রিশ টাকার রিসিট কেটে ভর্তি বই দিয়ে দিলেন। ভর্তির রসিদ বই হাতে পেয়ে বারবার মাকে দেখাতে ইচ্ছে হলো। তাই রাস-াঘাটে দেরি না করে ঝড়ের বেগে বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে রসিদ বই দিয়ে যখন বলতে পারলাম, ‘মা, আমি করটিয়া কলেজে ভর্তি হয়েছি।এর আগে একটা অস্বসি- আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সেই প্রথম অনুভব করেছিলাম, যেকোনো আনন্দে ভাগীদার লাগে। জীবনে অনেক আনন্দের মুহূর্ত এসেছে, কিন' করটিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার আনন্দ আজো আমাকে শিহরিত করে। কলেজ থেকে বেরিয়ে আসার অল্প পরেই টাঙ্গাইল থেকে এক ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে হাজির। প্রিন্সিপালকে বললেন, লতিফ সিদ্দিকীর ভাইকে কলেজে ভর্তি করা যাবে না। ম্যাজিস্ট্রেটের কথা শুনে ভাইস প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু স্যার যেন আসমান থেকে পড়লেন। তিনি ম্যাজিস্ট্রেটকে জানান, কিছুক্ষণ আগেই তিনি আমার ভর্তি ফরমে স্বাক্ষর করে দিয়েছেন। সাথে সাথে মাখন ভাইকে ডেকে আনলেন। তিনি বলেন, ১৫-২০ জনের আগে আমি ভর্তি হয়ে রিসিট বই নিয়ে চলে এসেছি। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আর কোনো উচ্চবাচ্য না করে চলে এলেন। পরদিন কলেজে গেলে স্যার আমাকে ডেকে পাঠান, ‘সরকার চায় না তুমি কলেজে পড়ো। তোমার পড়া বন্ধ করতে সরকার হয়তো কিছু করতেও পারে। ভর্তির যে ১০-১১ টাকা বাকি আছে কোনো অসুবিধা না হলে দু’-এক দিনের মধ্যেই তা শোধ করে দিয়ো। আর যদি অসুবিধা হয় তাহলে বাকি টাকা আমিই জমা দিয়ে ভর্তিটা শুদ্ধ করে রাখব।১১ টাকা জোগাড় করতে খুবই চিন-ায় পড়লাম। আমাদের পাশেই থাকতেন গোপালগঞ্জের জুট ইনসপেক্টর নির্মল সাহা। তার ছোট ভাই বিজন সাহা আমার খেলার সাথী। ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছি, সাহারা খুব কৃপণ হয়। বিজনকে নিয়েও আমার তেমনি ধারণা ছিল। কিন' ম্যাট্রিক পাস করার পর ওর কাছে বিশ টাকা হাওলাত চাইলে কিছুক্ষণ পর ওর বৌদি নাগরপুরের দিপালীকা সাহার কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা এনে দিয়েছিলেন। বিকেলে বৌদি আমাকে অন্যদের সাথে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন। সেই থেকে সব সাহা যে কৃপণ হয় না এমন একটা ধারণা হয়েছিল। খুব তাড়াতাড়ি টাকার দরকার। তাই এক বা দুদিন পর বিজনকে বলেছিলাম, কলেজের জন্য পনেরটা টাকার দরকার। আমার পনেরটা টাকা দরকার শুনে বিজন কুমার সাহা কানুর বৌদি আমার বন্ধু দীপক সাহার বোন পরীর মতো সুন্দরী দিপালীকা সাহা বিশ টাকা হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ঠাকুরপো, তোমার টাকা-পয়সার দরকার হলে কোনো লজ্জা কোরো না, আমাকে বোলো।আর কোনো দিন লজ্জা করিনি, তাকে বলতেও হয়নি।
আল্লাহর রহমতে হাইকোর্ট থেকে বাবা সনদ পেলে আমাদের আর অভাব থাকেনি। বৌদির কাছ থেকে টাকা নিয়ে কলেজে গিয়ে মাখন ভাইকে টাকা দিতে গেলাম, গিয়ে দেখি আমার নামে বকেয়া টাকা জমা হয়ে গেছে। কে দিয়েছে? প্রিন্সিপাল সাহেব নিজে ভর্তির পরদিনই বাকি টাকা জমা দিয়ে দিয়েছেন। ম্যাজিস্ট্রেট আসায় তার শঙ্কা ছিল- টাকা বাকি রেখে ভর্তি হয়েছি, জন্য যদি কোনোভাবে ভর্তি বাতিল করে দেয়, তাই বিশুদ্ধ ভর্তির জন্য পুরো টাকা জমা দিয়ে দিয়েছেন। সাহস করে স্যারকে টাকা দিতে গেলে কাছে ডেকে কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘ওটা এখন থাক। পরে কখনো দিস।কলেজে ভর্তির আগ থেকেই শুনে আসছিলাম, ঠাণ্ডু স্যার আমাদের বিরোধী, শাহজাহান সিরাজের পক্ষে। কিন' আমার ভর্তিতে কোনো বাধা দিলেন না, বাকি রেখে ভর্তির সুযোগ দিলেন, ম্যাজিস্ট্রেট এসে ভর্তি না করার কথা বলায় বাকি রেখে ভর্তি অশুদ্ধ হতে পারে সেই শঙ্কায় নিজে টাকা দিয়ে শুদ্ধ করে রাখলেন। তাকে পক্ষে না বিপক্ষে বলব? আমি অন্যদের চেয়ে পাঁচ-ছয় বছর দেরিতে কলেজে গেছি। প্রাইমারিতে স্কুল পালিয়ে দুই বছর নষ্ট করেছি। হাইস্কুলে এসে৬৫-তে বাড়ি থেকে পালিয়ে সেনাবাহিনীতে গিয়ে তিন বছর নষ্ট করেছি। স্বাভাবিকভাবেই চার-পাঁচ বছরের ছোটরা ছিল আমার ক্লাসফ্রেন্ড। বেশ হৃষ্টপুষ্ট শক্তমর্দ হয়েই কলেজে গিয়েছিলাম। আমি যে লতিফ সিদ্দিকীর ভাই, মৌলভী মুহাম্মদ আবদুল আলী সিদ্দিকীর ছেলে, সরকারের জন্য গলার কাঁটা- এটা ছয়-সাত মাসেই প্রমাণ হয়ে গেল। এরপর যখন যে ব্যাপারে তার কাছে গেছি কখনো না করেননি। করটিয়া কলেজে সব সময়ই সবার মাসিক বেতন বাকি থাকত। ফাইনাল পরীক্ষার সময় ফরমফিলাপ করতে গিয়ে একত্রে অনেক ছাত্রের ১৮-২০-২২ মাসের বেতন দিতে হতো। সেই প্রথম বর্ষে ভর্তির সময় যা দু-এক মাসের বেতন দিয়ে ভর্তি হতো, তারপর কেউ এক পয়সাও দিতো না। ফাইনাল পরীক্ষার সময় সব বেতন একসাথে দিতে হতো। সত্যিকার অর্থে অনেক দরিদ্র ছাত্র একসাথে ২০-২২ মাসের বেতন দিতে পারত না। আবার আমার মতো অনেকে ছিল, যারা প্রতি মাসেই বেতন এনে খেয়ে ফেলত। তারা আবার বাড়িতে অত টাকা একসাথে চাইতেও পারত না। এসব সমস্যা নিয়ে ফাইনাল পরীক্ষার সময় বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীরই থাকত পেরেশান। ওই সব পেরেশানি দূর করতে অনেকবার স্যারের কাছে গেছি। একবারো তিনি বিমুখ করেননি। কোনো কোনো ছাত্রের ১০-১২ মাসের এমনকি সত্যিই যারা গরিব তাদের সম্পূর্ণ বেতন মওকুফ করে শুধু সেন্টার এবং বোর্ড ফি দিয়ে ফরমফিলাপের অনুমতি নিয়েছি। তাই ঠাণ্ডু স্যারকে নিয়ে তার ছেলের মৃত্যুর সংবাদে কত কথা যে মনে পড়ছে কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। প্রবাদ আছে, আলেমের ঘরে জালেম, শিক্ষিতের ঘরে অশিক্ষিত। ভাইস প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু স্যারের ছেলেমেয়েরা জন উপযুক্ত হয়েছে বা প্রকৃত লেখাপড়া শিখেছে বলতে পারব না; কিন' ’৬৮-’৬৯- জুয়েলকে লেখাপড়া করতে দেখিনি। আমি যখন সকালে কলেজে যেতাম এবং বিকেলে ফিরতাম, করটিয়া বাজারের সামনে ঢাকা-টাঙ্গাইল রাস-ায় ওকে প্রায় দিনই মকবুলের সাথে ঘোরাফেরা করতে দেখতাম। মকবুল পরে করটিয়া কলেজের জিএস হয়েছিল। জুয়েল কতটা লেখাপড়া করেছিল জানি না। হালকা-পাতলা-শ্যামলার মধ্যে দেখতে বেশ সুন্দর ছিল। চোখ-নাক-মুখ ছিল টানা টানা।৬৮ থেকে৭১- সময়টাজুড়েই আমি জুয়েলকে একইভাবে দেখেছি।৭১- মুক্তিযুদ্ধ তারপর স্বাধীনতা। এরপর করটিয়ার সাথে আমার সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন৭১ থেকে৭৫ সালের মাঝে ঠাণ্ডু স্যারের সাথে এক বা দুবার দেখা হয়েছে। প্রকাশ্যে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করায় তিনি বিস্মিত হতেন। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আমার দশাও ছিল তাই। বাপ-দাদার শেখানো তাহজিব-তমদ্দুন ভুলে কখনো বড়দের সাথে বেয়াদবি করতে পারিনি। তা না হলে স্বাধীনতার পর শানি- কমিটির সদস্য খলিল স্যার আমার সাথে দেখা করতে এলে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সদর রাস-ায় তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করায় তিনি জার জার হয়ে কেঁদেছিলেন। কেন এসেছেন জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, ‘যে জন্য এসেছিলাম, তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। মনে করে এলাম তোমার সামনে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইব অথচ তুমি পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছো, আমি আর কার কাছে ক্ষমা চাইব। আমার যা হওয়ার হবে।স্যারকে বলেছিলাম, ‘শানি- কমিটির সদস্য হিসেবে সবার যদি শাসি- হয়, নিশ্চয়ই আপনারও হবে। কিন' তার আগে কেউ আপনাকে অপমান-অপদস' করতে পারবে না।কাঁদতে কাঁদতেই স্যার সে দিন বাড়ি ফিরছিলেন। করটিয়া কলেজের বাংলার অধ্যাপক খলিল স্যার ছিলেন নির্বিবাদী ভীষণ ভালো শিক্ষক। কেন তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জেলা শানি- কমিটির সদস্য হয়েছিলেন বা বানানো হয়েছিল, সে রহস্য জানি না