লিবিয়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
লিবিয়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১১

বেনগাজিতে নতুন শাসকের ঘোষণা : লিবিয়া মুক্ত স্বাধীন


লিবিয়া এখন মুক্ত ও স্বাধীন। বেনগাজির গণতন্ত্র স্কোয়ারে উল্লসিত লাখো মানুষের সমাবেশে অন্তর্বর্তী সরকার লিবিয়া মুক্ত হওয়ার এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল লাখো মানুষের সামনে ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) নেতা মুস্তাফা আবদুল জলিল এ ঘোষণা দেন। ঘোষণা দেয়ার আগে তিনি সেজদায় গিয়ে আল্লাহ্র প্রতি শোকরিয়াও আদায় করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপ-প্রধান হয়েছেন আবদেল হাফিজ গোগা। মঞ্চে অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দিয়ে মুস্তাফা আবদুল জলিল বলেন, লিবীয়রা এখন মুক্ত ও স্বাধীন। এ সময় সবাই করতালি দিয়ে তার বক্তব্যকে স্বাগত জানান। আগামী বছরের জুন মাসে লিবিয়ায় সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
আবদেল হাফিজ গোগা বলেন, ইসলামী আইন অনুযায়ী লিবিয়া পরিচালিত হবে। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সিরিয়া ও ইয়েমেনের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেন। লিবিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জিবরিল বলেন, আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য গণভোটের মাধ্যমে ইলেকটেড বডি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে।
তিনি বলেন, নতুন সরকার ইসলামী নীতি অনুসরণ করবে।

আহত গাদ্দাফিকে উন্মত্ত বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দেয় ন্যাটো!


নিষ্ঠুর ও বর্বর উল্লাসে ঘটেছিল গাদ্দাফি হত্যাকাণ্ড। সাবেক মহাক্রমশালী আরব-আফ্রিকান বাদশাহর সকরুণ মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে দিল ইসরাইলি গোয়েন্দারা। তাদের দাবি, গাদ্দাফি হত্যার নাটের গুরু ন্যাটো। তারা আহত গাদ্দাফিকে খুনের জন্য তুলে দেয় এনটিসির (ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল) সেনাদের হাতে। সেনারা গাদ্দাফিকে পেয়ে মাতে হত্যার উল্লাসে। তারপর খুনকাণ্ডের বাকি খবর সবারই জানা।
যুদ্ধবন্দি গাদ্দাফিকে হত্যা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-কানুনের বরখেলাপ এবং অমার্জনীয় যুদ্ধাপরাধ—এ নিয়ে সোচ্চার সারা দুনিয়া। ঠিক এ মুহূর্তে ইসরাইল গোয়েন্দাদের এ তথ্য উন্মোচন করল অত্যাধুনিক সুশিক্ষিত ন্যাটো বাহিনীর বর্বর চেহারা। গাদ্দাফি জমানার অবসানের পর লিবীয় বালু-মরুতে এখন বেজে উঠছে শোকের করুণ বিউগল। এই আরব সিংহ কখন বধ হচ্ছেন ন্যাটোর দুর্ধর্ষ শিকারিদের হাতে—কয়েক মাস ধরে সে উদ্বেগ-আশঙ্কায় ছিলেন যে মরুচারী বেদুইন গোষ্ঠী এখন তারা হতাশায় নিমজ্জিত। কী হবে লিবিয়ার ভবিষ্যত্! এরই মধ্যে লিবিয়ার তেল সম্পদ ও নির্মাণকাজের হিস্যা নিয়ে দখলবাজির লড়াইয়ে প্রস্তুত ইউরো-মার্কিন বহুজাতিক ব্যবসায়ী। তাদের হাতে কি গড়ে উঠবে নতুন আরব-উদ্যান, নাকি লুট হবে লিবিয়া—এ প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলছে ওয়াকিবহাল মহলকে।
রাজার হালে ছিলেন গাদ্দাফির প্রজারা!
আরব বসন্তের নবজাগরণে তিউনিসিয়া, মিসরের স্বৈরশাসকদের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন লৌহমানব মুয়াম্মার গাদ্দাফিও। দীর্ঘ ৪২ বছর তেলসমৃদ্ধ লিবিয়া শাসন শেষে বিদ্রোহী জনতার হাতে নির্মমভাবে প্রাণও দিয়েছেন তিনি। নিজ দেশের অধিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা, নিপীড়নের জন্য অনেকেরই নিন্দার মুখে পড়েছিলেন গাদ্দাফি। দীর্ঘদিনের শাসনামলে কখনই পশ্চিমা বিশ্বের আনুগত্য স্বীকার না করায় তার শাসনের অবসানকে অভিনন্দনই জানিয়েছে জাতিসংঘসহ গোটা পুঁজিবাদী বিশ্ব। কিন্তু এতকিছুর পরও গাদ্দাফি একজন শাসক হিসেবে তার দেশের অধিবাসীদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধার বন্দোবস্ত করেছিলেন, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।
নাগরিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে জনগণকে অনেক সহায়তা দেয়া হতো গাদ্দাফি সরকারের আমলে। বলা যায়, প্রায় রাজার হালেই ছিলেন গাদ্দাফির প্রজারা। আধুনিক সময়ের নগরজীবনের অন্যতম প্রধান চাহিদা বিদ্যুত্ আর লিবিয়ার জনগণ সে বিদ্যুত্ ব্যবহার করত পুরোপুরি বিনামূল্যে। সরকারনিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলো থেকে বিনাসুদে ঋণ দেয়া হতো নাগরিককে। তেলসমৃদ্ধ দেশটির তেল বিক্রি করে যে টাকা আয় হতো, তা সরাসরি পাঠিয়ে দেয়া হতো লিবিয়ার সব জনগণের ব্যাংক হিসাবে। গাড়ি কেনার সময় লিবিয়ার নাগরিককে গাড়ির মূল্যের অর্ধেক সরকার থেকে ভর্তুকি দেয়া হতো। তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ায় প্রতি লিটার পেট্রলের মূল্য ছিল মাত্র ০.১৪ ডলার। মাত্র ০.১৫ ডলারে পাওয়া যেত ৪০ স্লাইসের বড় রুটি।
গাদ্দাফি সরকারের ৫০ হাজার ডলার সহায়তা পৌঁছে যেত প্রতিটি নববিবাহিত দম্পতির কাছে, যেন তারা বাড়ি কিনে স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের নতুন জীবন শুরু করতে পারেন। সন্তান জন্ম দেয়ার পরও লিবীয় মায়েরা সরকারের কাছ থেকে পেতেন পাঁচ হাজার ডলার করে। পড়াশোনা বা চিকিত্সাসেবার জন্য কেউ বিদেশে গেলে তাকে মাসে ২ হাজার ৩০০ ডলার দেয়া হতো সরকারের তরফ থেকে।
গাদ্দাফি ক্ষমতায় আসার আগে লিবিয়ায় সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ২৫ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে সে সংখ্যাটা ৮৩ শতাংশে নিয়ে গিয়েছিলেন গাদ্দাফি। পুরোপুরি বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিত্সাসেবা পেত লিবিয়ার জনগণ। সেখানকার ২৫ শতাংশ মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে। পড়াশোনা শেষ করে কেউ যদি চাকরি না পেত, তাহলে বেকার থাকা অবস্থায় সরকারের কাছ থেকে ভাতাও পেত তারা।
কৃষিখাত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিশাল অবদান ছিল মুয়াম্মার গাদ্দাফির। কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে নিতে ইচ্ছুক লিবিয়ার জনগণকে জমি, খামারবাড়ি, বীজ ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেয়া হতো সরকারের পক্ষ থেকে—সবই বিনামূল্যে।
গাদ্দাফির লিবিয়ার কোনো বৈদেশিক ঋণ তো ছিলই না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল ১৫০ বিলিয়ন ডলার।
ইসরাইলের দাবি : ন্যাটো গাদ্দাফিকে আহত করে বিদ্রোহীদের হাতে খুনের জন্য তুলে দেয়
ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা ম্যাগাজিন দেবকা এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ন্যাটোর স্পেশাল ফোর্স সিরতে গাদ্দাফির অবস্থান নির্ণয় করে তাকে আটক করে। তারপর তার দু’পায়ে গুলি করে মিসরাতার একটি মিলিশিয়া দলকে গাদ্দাফির অবস্থান জানিয়ে সেখানে আসতে বলে। ন্যাটো অনুমান করেছিল মিসরাতার যোদ্ধাদের গাদ্দাফিকে হত্যা করার সম্ভবনা প্রবল। তাই তারা অন্য কোনো দলকে না জানিয়ে তাদেরকেই খবর দেয়। ন্যাটো চেয়েছিল স্বজাতির হাতেই মৃত্যু হোক গাদ্দাফির—এ দাবি করেছে দেবকা। গাদ্দাফির অনুগত বড় গোত্রগুলো যেমন গাদ্দাফা, ওয়ারফালা, আল ওয়াকির, মাগারিয়া এগুলো তার মৃত্যুর প্রতিশোধ না নিয়ে থামবে না। ফলে এ মৃত্যুতে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ লড়াই থামার কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই বলে ম্যাগাজিনটি মন্তব্য করেছে।
এ ঘটনায় স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশ করেছে যুদ্ধে অংশ নেয়া ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রধানরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘লিবিয়ার জনগণের এক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল আজ’। তিনি আরও বলেন, ‘সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছে’। লিবিয়ার যুদ্ধে ন্যাটো ও আরব দেশগুলোর সহযোগিতার সম্পর্ককে তিনি ‘একুশ শতকের একটি উদাহরণ’ বলে মন্তব্য করেন।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘লিবিয়ায় ব্রিটেন যে ভূমিকা পালন করেছে তাতে আমি গর্বিত। লিবিয়ার জনগণের সামনে এখন আরও বেশি সুযোগ এসেছে একটি শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের।’
বিদ্রোহীদের সংস্থা ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) প্রথমে গাদ্দাফিকে গ্রেফতার ও হত্যা করার বিষয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছিল, যা ন্যাটো বা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। পরে ন্যাটো জানিয়েছে, গাদ্দাফিকে বহনকারী গাড়িবহরে পরিচালিত তাদের আকাশ হামলায় গাদ্দাফি আহত হন এবং বিদ্রোহী যোদ্ধারা তখন তাকে জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার করে। প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে গাদ্দাফিকে জীবিত অবস্থায় কথা বলতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পর দেখা যায় বিদ্রোহীরা রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে সড়কের ওপর টানাহেঁচড়া করছে। স্পষ্টত তখন তার বুকের বাঁদিক থেকে রক্ত ঝরছিল। এ সময় তার শরীর থেকে কাপড় খুলে ফেলা হয়।
শুরুতে কোনো মন্তব্য না করলেও ওয়াশিংটন জানিয়েছে, গাদ্দাফির গাড়িবহরে হামলায় অংশ নিয়েছে মার্কিন পাইলটবিহীন প্রিডেটর ড্রোন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উচ্চপদস্থ এক মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন, মার্কিন ড্রোনের পাশাপাশি ফরাসি যুদ্ধবিমানও সিরতে থেকে বের হওয়া ওই গাড়িবহরে গাইডেড মিসাইল ছুড়েছিল।
ইন্টারনেটে প্রকাশিত একটি ভিডিওর বরাত দিয়ে এএফপি জানায়, ২২ বছর বয়সী এক বিদ্রোহী গাদ্দাফির বুকে ও মাথায় গুলি করার দাবি করেছে। সানাদ আল-সাদেক আল-উরেইবি নামের এ বিদ্রোহীর ভাষ্য : ‘আমি তাকে (গাদ্দাফি) লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছুড়েছিলাম। একটি তার বগলে আরেকটি লাগে মাথায়।’ তার বক্তব্য মতে, গুলিতে আহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাদ্দাফি মারা যাননি। তার মৃত্যু হতে প্রায় আধঘণ্টা সময় লেগেছে।
‘লিবিয়ার জনগণের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো আজ—ঐক্যে পুনরেকত্রীকরণের ও স্বাধীনতার’, মন্তব্য করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি।
উল্লেখ্য, লিবিয়ায় যুদ্ধে যেতে ক্যামেরন ও সারকোজিই ন্যাটো ও জাতিসংঘকে প্রভাবিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
লিবিয়া যুদ্ধে ন্যাটোর অন্যতম আরব সহযোগী কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।
গাদ্দাফি নিহত হওয়ার ঘটনা পরম্পরায় প্রশ্ন উঠেছে বন্দিকে বিনা বিচারে হত্যার বৈধতা ও ন্যায্যতা নিয়ে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান গাদ্দাফির মৃত্যুর পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরভ দাবি করেছেন, ‘গাদ্দাফিকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে জেনেভা কনভেনশন ভঙ্গ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধবন্দিকে হত্যা করা বৈধ নয়’।
ভেনিজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট হুগো শেভেজ বেআইনিভাবে গাদ্দাফিকে হত্যা করায় ‘ক্ষোভ’ প্রকাশ করেছেন। তিনি গাদ্দাফিকে একজন মহান বিপ্লবী যোদ্ধা ও শহীদ বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ লিবিয়ার তেল দখলের উদ্দেশে দেশটিতে গেছে’।
গাদ্দাফির অন্তিম মুহূর্তের নতুন ভিডিও
দিন যতই গড়াচ্ছে গাদ্দাফির অন্তিম মুহূর্ত নিয়ে রহস্যের জট তত পাকাচ্ছে। গ্লোবাল পোস্ট নামে একটি আন্তর্জাতিক মার্কিন সংবাদ মাধ্যম গাদ্দাফিকে আটক করার দৃশ্য নিয়ে নতুন একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, আটকের সময় লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি জীবিতই ছিলেন, তবে তিনি আহত ও রক্তাক্ত ছিলেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিদ্রোহীরা গাদ্দাফিকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে এবং উল্লসিত হয়ে বারবার ‘আল্লাহু আকবর’ বলে স্লোগান দিচ্ছে।
প্রথমে বিদ্রোহীরা দাবি করে, তারা সির্ত শহরের একটি পয়ঃনিষ্কাশন কালভার্টের ভেতর থেকে আহত গাদ্দাফিকে আটক করে। পরে তিনি রক্তক্ষরণে মারা যান।
তবে আলজাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিদ্রোহীরা জীবিত অবস্থাতেই গাদ্দাফিকে আটক করেছে। পরে গুলির শব্দ শোনা যায় এবং গাদ্দাফির নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে নানা বিবরণের পরিপ্রেক্ষিতে লিবিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল দাবি করেন, গাদ্দাফি ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন।
গত শুক্রবার ইন্টারনেটে প্রকাশিত এক ভিডিওচিত্রে সানাদ আল-সাদেক আল-ইউরিবি নামের লিবিয়ার এক তরুণ যোদ্ধা দাবি করেছেন, তিনি লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে আটক এবং তাকে পরপর দুবার গুলি করেন। প্রথমে বাহুর নিচে, এরপর মাথায়। এতে গাদ্দাফি গুরুতর আহত হন। তবে সঙ্গে সঙ্গে নয়, আধা ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হয়।
সানাদ আল-সাদেক বলেন, ‘গাদ্দাফিকে আমরা একটি রাস্তায় কয়েকজন নারী ও শিশুর সঙ্গে হাঁটতে দেখি। তার মাথায় ছিল টুপি। তবে চুল দেখে আমরা তাকে চিনতে পারি। মিসরাতার একজন যোদ্ধা বলেন, ‘ইনিই গাদ্দাফি। চলো, আমরা তাকে ধরি।’
সানাদ আল-সাদেক আরও বলেন, তিনি গাদ্দাফিকে বেনগাজিতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিসরাতার যোদ্ধারা গাদ্দাফিকে নিজেদের শহরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন তিনি গাদ্দাফিকে পরপর দুবার গুলি করেন। তার এ দাবি গাদ্দাফি কীভাবে নিহত হয়েছেন, সে ব্যাপারে সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছে।
গাদ্দাফি-লাদেন যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যেরই স্মারক : ওবামা
লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যু, ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা এবং ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাকে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের স্মারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
সাপ্তাহিক রেডিও ও ইন্টারনেট ভাষণে শনিবার এসব ঘটনা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নিজেকে শক্তিশালী নেতা বলেও দাবি করেন ওবামা।
তিনি বলেন, গাদ্দাফির মৃত্যু এবং এ বছরের শেষ নাগাদ ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা ‘বিশ্বে আমেরিকার নেতৃত্ব আমরা কিভাবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেছি তার শক্তিশালী স্মারক।’
ওবামা বলেন, ‘লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যু দেখিয়েছে লিবিয়ার জনগণকে রক্ষায় এবং স্বৈরশাসনের কবল থেকে তাদের মুক্ত করতে আমাদের ভূমিকা সঠিক ছিল।’
‘ইরাকে যুদ্ধ শেষের জন্য আমরা যে কৌশল নিয়েছিলাম তা সফল হয়েছে।’ আল কায়দার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল কায়দার বিরুদ্ধে বিজয়ের পাশাপাশি ইরাক ও লিবিয়ার ক্ষেত্রে নেয়া নীতি ‘সাফল্যের একটি বৃহত্ অধ্যায়ের অংশ’।
গত ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের একটি বাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কমান্ডো বাহিনী ‘ইউএস নেভি সিল’ টিমের সদস্যদের এক অভিযানে নিহত হন ওসামা।
ভাষণে তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি জাতীয় ঋণের বোঝা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে বলেও দাবি করেন ওবামা।
২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে এ বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসার ইঙ্গিত দিলেন তিনি।
অবশ্য প্রতিপক্ষ শিবির ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ওবামার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকান নেতারা বলছেন, এতে ইরাকের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরান আরও ‘দুঃসাহসী’ হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া ‘আরব বসন্ত’ গণবিক্ষোভে ‘পেছন থেকে নেতৃত্ব’ দিয়ে ওবামা আমেরিকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন বলেও দাবি করছেন তারা।
গাদ্দাফির অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে আশঙ্কা : কি পরিণতি হবে কর্নেল গাদ্দাফির বিপুল অস্ত্রভাণ্ডারের। শান্তি আদৌ কি ফিরবে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায়। কর্নেল গাদ্দাফি যুগের অবসানের পরও উঠে আসে নতুন প্রশ্ন। নতুন বিতর্ক। গাদ্দাফিকে প্রকাশ্য রাজপথে ‘শাস্তি’ দেয়ার পরও প্রশ্ন—শান্তি কি ফিরবে লিবিয়ায়। গাদ্দাফির বিপুল অস্ত্রভাণ্ডারের বিবরণ দিলেন জাতিসংঘের এক প্রতিনিধি। বললেন, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে খবর ছিল, ক্ষমতায় থাকার সময় ট্রাকভর্তি অস্ত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ কোরদোফান বা নীল নদের অববাহিকার বিভিন্ন দেশে চালান করেছিলেন গাদ্দাফি। জাতিসংঘ প্রতিনিধি দাফা-আল্লা এলহাগ আলি ওসমানের সন্দেহ, লিবিয়া থেকে দারফারেও পাঠানো হয়েছিল বিপুল অস্ত্র। এমনকি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও লিবিয়া থেকে দফায় দফায় অস্ত্র পাঠিয়েছিলেন কর্নেল গাদ্দাফি। এখানেই শেষ নয়। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, নিজে স্বৈরশাসক হলেও প্রজাতান্ত্রিক চাদ, প্রজাতান্ত্রিক মালির মতো দেশেও বিপুল অস্ত্র পাঠিয়েছিলেন গাদ্দাফি। আর এখানেই রক্ত, লাশ, ধ্বংসস্তূপের ফাঁক থেকে উঁকি দিল নতুন আতঙ্ক। বন্দুকের নলের ওপর ভর করেই গড়ে উঠেছিল গাদ্দাফির বিপুল স্বৈরসাম্রাজ্য। সেই অস্ত্রের ‘ভবিষ্যত্’ নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে। কী রয়েছে ওই অস্ত্রভাণ্ডারে। বিমান-বিধ্বংসী কামান থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গুলি বন্দুক, সবই মজুত সেখানে। শুধু তাই নয়, বিদ্রোহী এনটিসি সমর্থকদের হাতেও রয়েছে অসংখ্য অস্ত্র। গাদ্দাফিকে মারার পরও রীতিমতো বন্দুক তুলে বিজয় উত্সব পালন করেছিল বিদ্রোহীরা। আর আন্তর্জাতিক দুনিয়ার প্রশ্ন এখানেই। ন্যাটো বাহিনী এখন আংশিকভাবে লিবিয়ার দায়িত্বে। সঙ্গে রয়েছে এনটিসিও। কিন্তু এতো বিশাল অস্ত্রের ভবিষ্যত্ কী? অস্ত্র হাতে থাকলে শান্তি আদৌ ফিরবে কী।
মাথায় গুলি লেগে নিহত হন গাদ্দাফি
লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির লাশ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির জাতীয় অন্তর্বর্তী পরিষদ বা এনটিসি। তবে এ নিয়ে তাদের টালবাহানাও কম নয়। তারা বলছে তাকে কোথায় দাফন করা হবে এ বিষয়ে পরামর্শ করার পরই লাশ হস্তান্তর করা হবে। গাদ্দাফির ময়নাতদন্তের পর চিকিত্সক ওথম্যান এল জিনতানি রোববার জানিয়েছেন, লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মাথায় বন্দুকের গুলি লেগেছিল। এরপর তিনি মারা যান। বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স।
এনটিসির প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিলের উপদেষ্টা আহমেদ জিবরিল জানান, ‘গাদ্দাফির আত্মীয়-স্বজনের কাছে লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এ মুহূর্তে তার পরিবারের কেউ দেশে নেই। এ বিষয়ে তার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এখন কোথায় তাকে দাফন করা হবে সে বিষয়ে এনটিসির সঙ্গে পরামর্শ করে তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ তবে কখন লাশ হস্তান্তর করা হবে তা তিনি জানাতে অস্বীকার করেছেন। গত বৃহস্পতিবার গাদ্দাফি নিহত হওয়ার পর মিসরাতা শহরের একটি হিমাগারে লাশ রাখা হয়েছে। কয়েকদিন ধরে গাদ্দাফির লাশের বিষয়ে অনেকটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার পর এনটিসি শেষ পর্যন্ত লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিল। এর আগে এনটিসি গাদ্দাফিকে গোপন স্থানে দাফন করার পরিকল্পনা করছিল বলেও খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে গাদ্দাফির লাশের ময়নাতদন্তের সঙ্গে জড়িত এক ডাক্তার নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ‘বন্দুকের গুলির আঘাতেই গাদ্দাফি মারা গেছেন।’ তবে গাদ্দাফির মাথার বাম দিকে যে গুলি লেগেছে তাতে তার মৃত্যু হয়েছে কিনা তা ওই ডাক্তার স্পষ্ট করে বলেননি। তিনি বলেন, এখনও অনেক প্রক্রিয়া বাকি। তবে সবকিছু সরকারিভাবে জানানো হবে। কোনো কিছুই গোপন করা হবে না।

ক্রসফায়ার নয় ঠাণ্ডামাথায় খুন লাশের দাফন নিয়ে তোলপাড়


উন্নত শির আরব সিংহ মুয়াম্মার গাদ্দাফির লাশ নিয়ে এখন তোলপাড়। তার লাশটি কোথায়—এ নিয়ে গোপনীয়তার বাতাবরণ রক্ষায় নানা গালগল্প মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছিল ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এনটিসি) শীর্ষ নেতারা। সর্বশেষ তারা জানিয়েছে, লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। গাদ্দাফির মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনটিসি। এর আগে গাদ্দাফির লাশটি চেয়ে আর্জি জানিয়েছিল তার হতবিহ্বল ছিন্নভিন্ন পরিবারের জীবিত সদস্যরা। এনটিসি, ওআইসি ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কাছে তাদের ধরনা—অন্তত লাশ দাফনের মানবিক অধিকারটুকু তাদের দেয়া হোক। গাদ্দাফির জন্মশহর সির্তে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী সাবেক এই লিবীয় মহানায়ক ও তার ছেলে মুতাসসিমকে দাফন করতে চায় তারা।
বিবিসি জানায়, মিসরাতায় গাদ্দাফির লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এনটিসি কর্মকর্তারা একথা জানিয়েছেন বিবিসিকে। কর্মকর্তারা আরও বলেন, লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তারা একথাও বলেন, দাফন এ কারণে বিলম্বিত হচ্ছে— কেননা কী করা উচিত—এ প্রশ্নে এনটিসির শীর্ষব্যক্তিরা দ্বিধায় ভুগছেন। এর আগে মিসরাতায় এনটিসির এক সামরিক কর্তা এএফপিকে জানিয়েছিলেন, লাশের ময়নাতদন্ত হবে না। তার লাশ কেউ কাটাকাটি করতে চাচ্ছে না। এনটিসির কর্তাদের বরাতে এএফপি এমন ধারণা দিচ্ছিল যে, গাদ্দাফির লাশ বিন লাদেনের মতো সাগরে সমাহিত করা হতে পারে। সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয়—লাশ নিয়ে আদতে কী হচ্ছে। এনটিসি কর্তারা আদৌ কি একমত লাশ পরিবারকে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে। তাদের সাগর-দাফন পরিকল্পনাটি কি বাদ গেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে—এ নিয়ে পরিষ্কার ধারণা মিলছে না।
ওদিকে গাদ্দাফিমুক্ত লিবিয়াকে নতুন করে স্বাধীন ঘোষণার নাটকও বেশ জমজমাট। রোববার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে আফ্রিকান এই আরব দেশটির। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল। লিবিয়া কি তবে এতদিন পরাধীন ছিল! গাদ্দাফি কি তার ৪২ বছরের একচ্ছত্র শাসনে দেশটিকে পরাধীন করে রেখেছিলেন! তবে স্বাধীনতার নামে এসব নাটককে তামাশা ও প্রহসন বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ইউরো-মার্কিন মিত্রশক্তি—যাদের প্রত্যক্ষ মদতে লিবিয়ার এ দৃশ্যপট বদল—তাদের ঈগল-নজর মূলত লিবিয়ার সমৃদ্ধ তেলসম্পদের দিকে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড এরই মধ্যে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের ব্রিফকেস গুছিয়ে ত্রিপোলির দিকে রওনা দিতে বলেছেন। গাদ্দাফির রক্ত না শুকাতেই তার উদাত্ত ডাক—ব্রিটেনের ব্যবসায়ীদের আর নষ্ট করার মতো সময় নেই।
৩১ অক্টোবর লিবিয়া অভিযানের সমাপ্তি - ন্যাটো : লিবিয়ায় পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সাত মাসের অভিযান আগামী ৩১ অক্টোবর সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে। গত শুক্রবার ন্যাটোর সদর দফতর ব্রাসেলসে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে লিবিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার এবং জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
শুক্রবার ব্রাসেলসে ২৮টি সদস্যদেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে ন্যাটোপ্রধান অ্যানডার্স ফগ রাসমুসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের লিবিয়া অভিযান শেষ পর্যায়ে এ ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি। ঐক্যবদ্ধ নিরাপত্তা রক্ষক হিসেবে লিবিয়া অভিযান আগামী ৩১ অক্টোবর শেষ করার ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এর আগে জাতিসংঘ ও লিবিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন রাসমুসেন। লিবিয়াতে ন্যাটো সফল হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, গাদ্দাফির সর্বশেষ ঘাঁটির পতন এবং তিনি নিহত হওয়ার পর এখন ন্যাটো সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং বেসামরিক লোকদের প্রতি যে কোনো হুমকিতে তারা সাড়া দেবে।
লিবিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে রোববার : কয়েক মাসের রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অবশেষে আগামী রোববার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে লিবিয়ার। লিবিয়ার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এ স্বাধীনতার ঘোষণা দেবে বলে জানায় এনটিসির এক মুখপাত্র।
মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে প্রথম যে শহর থেকে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল সেই বেনগাজিতেই শনিবার স্বাধীনতা ঘোষণা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুখপাত্র আবদেল রহমান বুশিন বলেন, আনুষ্ঠানিকতার কারণে একদিন দেরি করে রোববার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হচ্ছে। তবে আবদেল বুশিন এ বিষয়ে আর কোনো ব্যাখ্যা দেননি। লিবিয়ার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে বেশ প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। কারণ প্রাপ্ত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, গাদ্দাফিকে প্রথমে জীবিত ধরা হয়, কিন্তু পরে তিনি কীভাবে নিহত হলেন, তা অস্পষ্ট রয়ে গেছে এখনও।
গাদ্দাফির লাশ চেয়েছে পরিবার, কাল লিবিয়ার আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা : লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির লাশ দাফনের সুযোগ চেয়েছে তার পরিবার। সিরিয়াভিত্তিক একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া এক বিবৃতিতে তার পরিবারের সদস্যরা গাদ্দাফি, তার ছেলে মুতাসসিম এবং বৃহস্পতিবার নিহত হওয়া অন্য সদস্যদের লাশ চেয়েছে। এজন্য লিবিয়ার জাতীয় অন্তর্বর্তী পরিষদ বা এনটিসিকে চাপ দিতে গাদ্দাফি পরিবারের সদস্যরা জাতিসংঘ, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী নিহতদের দাফনের জন্য সব মরদেহ সির্ত শহরে গাদ্দাফির নিজ গোত্রের কাছে হস্তান্তর করার আহ্বান জানানো হয়েছে ওই বিবৃতিতে।
এদিকে আজ (রোববার) লিবিয়ার জাতীয় অন্তর্বর্তী পরিষদ বা এনটিসি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির স্বাধীনতা ঘোষণা করবে। গাদ্দাফির মৃত্যুর পর এ ঘোষণা দিতে যাচ্ছে এনটিসি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনটিসির এক কর্মকর্তা জানান, ভোর পাঁচটায় বেনগাজি শহর থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হবে। এ শহর থেকেই গত ফেব্রুয়ারি মাসে লিবিয়ায় গাদ্দাফিবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় এবং সেখান থেকে এনটিসি সব কার্যক্রম পরিচালনা করে।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর লিবিয়ায় একটি নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে। এ সরকার দেশটিতে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং চার দশক পর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করবে।
তুলে নেয়া হচ্ছে নো-ফ্লাই জোন : লিবিয়ার ওপর থেকে নো-ফ্লাই জোনের আদেশ তুলে নেয়া হচ্ছে। এজন্য গতকাল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হয়েছে। কূটনীতিকরা বলছেন, লিবিয়ার এনটিসির সঙ্গে আলোচনা করে শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে। গত মার্চ মাসে জাতিসংঘ লিবিয়ার ওপর নো-ফ্লাই জোন কার্যকরের আদেশ দিয়েছিল।

লিবিয়া এখন কোন পথে


লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর পর দেশটির জনগণকে এখন নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকার গঠন করাই এখন লিবিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া নয়া সংবিধান প্রণয়ন, অস্ত্র সংগ্রহ, ন্যাটোকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা এবং বিদেশ থেকে জাতীয় অর্থ-সম্পদ ফিরিয়ে আনার মতো চ্যালেঞ্জগুলোকেও কোনোভাবেই ছোট করে দেখা যাবে না বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স
গাদ্দাফির মৃত্যুর পর জনগণের প্রত্যাশা, ভবিষ্যত্ সরকার সবার মতকে গুরুত্ব দেবে। লিবিয়ার জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির প্রধান আল হাদি সুলুফ বলেছেন, নয়া সংবিধান প্রণয়ন করাই হলো এখন দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি সংবিধান প্রণয়ন প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, আমরা এমন এক সংবিধান প্রণয়ন করতে চাই যা হবে আধুনিক যুগের সঙ্গে মানানসই এবং ভবিষ্যতে সবকিছুই হবে আইনের ভিত্তিতে। লিবিয়ায় এত দিন কোনো সংবিধান ছিল না বলে তিনি জানান।
লিবিয়ার রাজনৈতিক নেতা ইদ্রিস আবদিস বলেছেন, জনগণের কাছে যেসব অস্ত্র রয়েছে সেগুলো সংগ্রহ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে সেনাবাহিনী গঠিত হওয়ার পরপরই সব অস্ত্র জমা নেয়া হবে বলে তিনি জানান। লিবিয়ার বেনগাজি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহমুদ শারকাসির মতে, নয়া সরকার গঠনকে
সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, গত ৪০ বছর ধরে লিবিয়ার জনগণকে দেশ পরিচালনায় অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। এতদিন তাদের ওপর সবকিছুই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সরকার গঠনের জন্য অনেক বিষয় মাথায় রাখতে হবে। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোতে হবে।
লিবিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলা বিন দারদাফের মতে, নয়া সরকারকে বিভিন্ন দেশে জব্দ হওয়া সম্পত্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের দেশগুলো গড়িমসি করতে পারে। এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে তারা লিবিয়ার আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করতে পারে। লিবিয়ার জাতীয় অর্থ আটকে রাখার আর কোনো যুক্তি পাশ্চাত্যের কাছে নেই বলে তিনি জানান।
অনলাইন নিউজপেপার প্যান আফ্রিকানের সম্পাদক আবাইউমি আজিকিউয়ি বার্তাসংস্থা প্রেসটিভিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সহজে লিবিয়া ত্যাগ করবে বলে মনে হয় না। কারণ লিবিয়ায় বিপুল পরিমাণ তেল মজুদ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স লিবিয়ার তেল সম্পদ কুক্ষিগত করতে চায়। ওই সব দেশ এ পর্যন্ত ১২ হাজার কোটি ডলার আটকে দিয়েছে এসব দেশ।
ওই সব দেশ এখন লিবিয়ায় গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু করেছে। সব মিলিয়ে লিবিয়ার জনগণ পুরোপুরি স্বাধীনভাবে পথ চলতে পারবে বলে মনে হয় না।

পিটিয়ে গুলি করে গাদ্দাফিকে হত্যা : এনটিসির দাবি ক্রসফায়ারে মারা গেছেন


পশ্চিমা বিশ্বে স্বস্তি; তবু দেশে দেশে কোটি মানুষের ব্যাপক কৌতূহল—কীভাবে হত্যা করা হয়েছে গাদ্দাফিকে। জীবিত আটক করা হয়েছিল এই আরব মরু ঈগলকে। জানা যায়, আটক অবস্থায় প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন ৪ দশকজুড়ে বিশ্বব্যাপী আলোচিত এ লৌহহৃদয় বেদুইন বাদশা।
কিন্তু তখন কি তার প্রতি দেখানো হয়েছে যুদ্ধবন্দির প্রাপ্য সহানুভূতি! এ নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন।
নিজ জন্মশহর সির্ত থেকে বৃহস্পতিবার সকালে পালানোর চেষ্টা করেন গাদ্দাফি। এ সময় তার গাড়িবহরে বিমান হামলা চালায় ন্যাটো। এতে অংশ নেয় মার্কিন প্রিডেটর ড্রোন। অংশ নেয় ফরাসি একটি ফাইটার জেট, আক্রান্ত হয় গাদ্দাফির গাড়িবহর। লিবিয়ার এক সময়ের লৌহশাসক তখন অনুচরদের নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। ঠিক সে সময় এনটিসির যোদ্ধারা ঘিরে ফেলে তাকে।
সম্মুখযুদ্ধে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবুবকর ইউনুস নিহত হন। কিন্তু গাদ্দাফি ও তার ছেলে মুতাসসিম আটক হন আহত অবস্থায়। তারপর শুরু হত্যার মিশন।
বিভিন্ন টিভি মিডিয়ার ফুটেজে পরিষ্কার দেখা যায়—গাদ্দাফির চুল ধরে টেনে উপর্যুপরি ঘুষি, লাথি মারা হচ্ছে, নিষ্ঠুরভাবে মারধর করা হচ্ছে তাকে। টানাহেঁচড়া করা হয় আহত আরব সিংহকে। এ সংঘবদ্ধ আক্রমণে তিনি রক্তাক্ত হন। তার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে, চোখে-মুখে বাঁচার আকুতি। জানা যায়, একপর্যায়ে তিনি প্রাণভিক্ষা চান।
আরব দুনিয়ার কিংবদন্তি লড়াকু, রাষ্ট্রনায়ক গাদ্দাফির সেই করুণ আবেদনে সাড়া দেয়নি এনটিসি সেনারা। গাদ্দাফির ওপর চলতে থাকে মারপিট লাথি ও ঘুষি। তারপর খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি করা হয়। যুদ্ধবন্দির সকরুণ আবেদনে কর্ণপাত করেনি প্রতিপক্ষ সেনারা। গুলিতে বিকৃত হয় গাদ্দাফির মুখ। থেঁতলানো শরীর নিয়ে তিনি লুটিয়ে পড়েন। মৃত্যু ঘটে একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী লিবীয় বাদশার। এনটিসির সেনারা তখন উল্লাসে মত্ত। তারা সহাস্যে ব্যস্ত লাশের সঙ্গে ছবি তোলায়।
দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় যার আঙ্গুলি হেলনে একচ্ছত্র আধিপত্যে শাসিত হয়েছে লিবিয়া; একদল এনটিসি সেনার উন্মত্ত হামলায় সকরুণ যবনিকা ঘটে তার। গাদ্দাফির ছেলে মুতাসসিমকেও যখন আটক করা হয় তখন তিনি আহত। তিনিও এনটিসি সেনাদের হাতে মারপিটের শিকার হন। তার শরীর রক্তে ভিজে যায়। মৃত্যুর আগে তিনি পানি পান করতে চাইলে তাকে পানি দেয়া হয়। অতঃপর হত্যা করা হয় মুতামসিমকে। আলজাজিরা, রয়টার্স, বিবিসিসহ সংবাদ মাধ্যমগুলো জানাচ্ছে—যেভাবে তিনি নিহত হয়েছেন তাতে খোদ জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন থেকেই প্রশ্ন উঠেছে সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজেরও দাবি, গাদ্দাফিকে চরম নিষ্ঠুরভাবে খুন করা হয়েছে। লিবিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত মিসরাতার হিমাগারে রাখা হবে গাদ্দাফির মরদেহ।
বিবিসি জানায়, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার বলেছেন, কর্নেল গাদ্দাফির কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, তার পূর্ণ তদন্ত হওয়া উচিত। হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, সাবেক লিবীয় নেতাকে প্রথম জীবিত অবস্থায় আটক এবং পরে তার মৃত্যুর যেসব ছবি মোবাইল ফোনে তোলা হয়েছে, তা খুবই অস্বস্তিকর এবং বিচলিত হওয়ার মতো।
এনটিসির দাবি ক্রসফায়ারে মারা গেছেন গাদ্দাফি : লিবিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার কর্নেল গাদ্দাফিকে হত্যা করার কথা অস্বীকার করেছে। তারা বলছে, সির্তে কর্নেল গাদ্দাফিকে ধরার পর গাদ্দাফি সমর্থক এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াইয়ের সময় ক্রসফায়ারে তার মাথায় গুলি লেগেছে।
কর্নেল গাদ্দাফির মরদেহ কয়েক দিন হিমঘরে রাখা হবে যাতে সবাই নিশ্চিত হতে পারে, আসলেই তিনি মারা গেছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, সম্ভবত কোনো এক গোপন স্থানে তাকে দাফন করা হবে।
লিবিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির মরদেহ মিসরাতার এক মসজিদে রক্ষিত আছে।
লিবিয়ার তেলমন্ত্রী আলী তারহুনি রয়টার্স বার্তা সংস্থাকে বলেন, কর্নেল গাদ্দাফির মরদেহ এখনই দাফনের জন্য দেয়া হবে না। কর্নেল গাদ্দাফির মরদেহ কয়েক দিন হিমঘরে রাখা হবে যাতে সবাই নিশ্চিত হতে পারে, আসলেই তিনি মারা গেছেন। একটি সূত্র জানায়, গাদ্দাফির লাশ একটি শপিং সেন্টারের বাণিজ্যিক হিমঘরে রাখা হয়েছে।
দাফনের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
তবে ত্রিপোলি থেকে বিবিসির সংবাদদাতা ক্যারোলাইন হলি জানান, এরকম আঁচ-অনুমান করা হচ্ছে, আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনের মতো কর্নেল গাদ্দাফির মরদেহও সাগরে দাফন করা হতে পারে, যাতে তার কবর তার অনুগতদের জন্য কোনো স্মৃতিসৌধে পরিণত না হয়।
সাইফ আল ইসলামকে কর্নেল গাদ্দাফির মূল উত্তরসূরি বলে মনে করা হয়। রয়টার্স বার্তা সংস্থা কোনো কর্মকর্তার নাম উল্লেখ না করে শুধু তাকে উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছে, সাবেক নেতার মরদেহ নিয়ে কী করা হবে তা নিয়ে এনটিসি বা অন্তর্বর্তী পরিষদের মধ্যে মতৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।
মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফি কোথায় আছেন, তা এখনও অজ্ঞাত। ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, তিনিই তার বাবার প্রধান উত্তরসূরি। লিবিয়ার অন্তর্বর্তী প্রশাসন এনটিসির যোদ্ধারা যখন সির্ত শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য লড়াই করছিল, তখন বৃহস্পতিবার সাইফ আল ইসলাম শহর থেকে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী পরিষদের কোনো কোনো সদস্য বলছেন, বিদ্রোহী যোদ্ধারা তাকে আটক করেছে এবং তিনি আহত। কিন্তু এখনও তাকে আটক করার কোনো ছবি দেখা যায়নি।
এনটিসির কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার জানান, সির্ত শহরে যে হামলার সময় কর্নেল গাদ্দাফি মারা গেছেন সেই একই হামলায় কর্নেল গাদ্দাফির আরেক ছেলে মুতাসসিম নিহত হন। ১৯৬৯ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কর্নেল গাদ্দাফি লিবিয়ার ক্ষমতায় আসেন।
কিন্তু চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এক গণঅভ্যুত্থানের জেরে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বিচারের জন্য কর্নেল গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
এদিকে ত্রিপোলীর ডেপুটি মেয়র বলেছেন, লিবিয়ার সাধারণ মানুষ এখন মূলধারায় ফিরে আসবে। রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে লিবিয়াকে মুক্ত ঘোষণা করা হবে। সরকার আশা করছে—গাদ্দাফি সমর্থকরা বাস্তবতা মেনে নেবেন। তারা সমাজের মূলধারায় যোগ দেবেন। তিনি বলেন, লিবিয়ার বেশিরভাগ মানুষ ইসলামী রাষ্ট্র চাইলে তাই-ই হবে। যদি তারা উদারপন্থী দেশ চান, তবে তাই হবে।
ওদিকে ন্যাটো জোটের এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জানান, গাদ্দাফির মৃত্যুর পর লিবিয়ায় সামরিক তত্পরতা শেষ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ব্রাসেলস ন্যাটো জোটের বৈঠকে ওই কর্মকর্তা জানান, গত ৭ মাসে লিবিয়ার আকাশে ন্যাটো ২৬,০০০ বার যুদ্ধ বিমানের বহর পাঠিয়েছে।

গাদ্দাফি নিহত


লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি গতকাল তার জন্মস্থান সির্তের অদূরে বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়ার পর নিহত হয়েছেন। লিবিয়ার টেলিভিশনে গাদ্দাফির মৃতদেহের ছবি দেখানো হয়েছে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরাইল গাদ্দাফি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন এবং জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তথ্যমন্ত্রী মাহমুদ শাম্মাম বলেছেন, গাদ্দাফি যেখানে লুকিয়ে ছিলেন, বিদ্রোহীরা সেখানে অভিযান চালালে তিনি পালানোর চেষ্টা করলে গুলিতে নিহত হন। তার মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে গোপন একটি স্থানে। এনটিসি’র কর্মকর্তারা জানান, গাদ্দাফির ছেলে মোতাসসিম, সেনাবাহিনীপ্রধান আবু বকর ইউনুস এবং গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ আল সেনুরিও নিহত হয়েছেন। অপর ছেলে সাইফ আল ইসলাম গাড়িবহর নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়েছেন। বিশ্বনেতারা বলেছেন, গাদ্দাফির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লিবিয়ার ইতিহাসের নির্মম যুগের অবসান হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, লিবিয়ার সামনে কঠিন পথ রয়েছে। এখন সময় এসেছে লিবীয়দের একত্রিত হওয়ার। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, লিবিয়ার মানুষের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যত্ রচনার একটি সুযোগ এসেছে। গণতন্ত্রের উত্তরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ফরেন রিলেশন কমিটির চেয়ারম্যান জন কেরি বলেছেন, গাদ্দাফির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার ভয়ঙ্কর শাসনের অবসান হলো। এদিকে গাদ্দাফি নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এনটিসি’র যোদ্ধারা আনন্দ-উত্সবে মেতে ওঠে। রাজধানী ত্রিপোলি বন্দরে জাহাজ এবং গাড়ির হর্ন বাজিয়ে, ফাঁকা গুলি করে উল্লাস করেছে জনতা। সির্তসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে আনন্দ-উল্লাসে যোগ দেয়। বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, এপি, আলজাজিরা, সিএনএন, দ্য টেলিগ্রাফ।
দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল তথা এনটিসি কর্মকর্তারা এবং লিবিয়ার টেলিভিশন জানিয়েছে, গতকাল ভোরে গাদ্দাফিকে সির্ত শহরের কাছ থেকে আটক করা হয়। সে সময় তিনি গুরুতরভাবে জখম হন এবং সেই জখমেই তিনি মারা গেছেন। গাদ্দাফির মাথায়ও গুলি লাগে। যদিও এনটিসি কর্মকর্তা আবদেল মজিদ জানিয়েছেন, গাদ্দাফি গতকাল ভোরে একটি কনভয়যোগে পালানোর চেষ্টা করলে ন্যাটোর জঙ্গিবিমান সেটিতে হামলা চালায়। এ সময় তার দু’পায়ে ও মাথায় গুলি লাগে। তিনি আটক অবস্থায় মারা যান। তখন বেশকিছু সময় ধরে গোলাগুলি চলে। গাদ্দাফি সরকারের মুখপাত্র মুসা ইব্রাহিমকেও আটক করা হয়েছে সির্ত শহরের কাছ থেকে। ইলেভেন ব্রিগেডের কমান্ডার আবদুল হাকিম আল-জলিল জানান, গাদ্দাফির সেনাবাহিনীপ্রধান আবু বকর ইউনুস নিহত হয়েছেন। মুসা ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেনাবাহিনীর অপারেশন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গাদ্দাফির ছেলে মোতাসসিম গাদ্দাফিও সির্ত শহরে নিহত হয়েছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরাইল গাদ্দাফি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন এবং জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তথ্যমন্ত্রী মাহমুদ শাম্মাম বলেছেন, গাদ্দাফি তার লুকিয়ে থাকা অবস্থান থেকে পালানোর চেষ্টা করলে গুলিতে নিহত হন। তিনি এখন ইতিহাস।
বেনগাজিতে এনটিসি’র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল হাফিজ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমাদের সন্তান এবং সারা বিশ্বকে জানাতে চাই লিবিয়ায় স্বৈরাচার ও একনায়কতন্ত্র শেষ হয়েছে। আর তা ফিরে আসবে না। একজন স্বৈরাচারী শাসকের জন্য যা ছিল অবধারিত, গাদ্দাফির ভাগ্যে তা-ই ঘটেছে। বিদ্রোহীদের হাতে গাদ্দাফি নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে একনায়ক শাসনের অবসান ঘটল।
বেশক’টি সূত্র জানিয়েছে, গাদ্দাফি সির্তের একটি ড্রেনের পাইপের ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন। গতকাল খুব ভোরের দিকে বিদ্রোহী যোদ্ধারা ওই শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং একইসঙ্গে অতিগোপনে গাদ্দাফিকে আটকের জন্য চিরুনি অভিযান চালায়। স্যাটেলাইট মোবাইলের সাহায্যে তারা গাদ্দাফির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। এরপরই চালানো হয় শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিযান। শহরের অজ্ঞাত ওই স্থানে গাদ্দাফির গোপন অবস্থান নিশ্চিত করে বিদ্রোহী যোদ্ধারা ছুটে যায় সেখানে।
এদিকে এনডিটিভির খবরে এনটিসি’র একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, মৃত্যুর আগমুহূর্তে এনটিসি’র সেনারা তার বাংকারে বা সেই পাইপলাইনে অতর্কিত হানা দেয়ার পর গাদ্দাফি পালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে গাদ্দাফি এনটিসি সেনাদের উদ্দেশে ‘ডোন্ট শুট, ডোন্ট শুট’ বলে চিত্কার করছিলেন। কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত না করে এনটিসি সেনারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তার কাছ থেকে একটি সোনালি রঙের পিস্তল বিদ্রোহীদের একজন কেড়ে নেয়। সেই পিস্তল দিয়েই তাকে গুলি করা হয়েছে বলে প্রাথমিক খবরে জানা যায়। যদিও এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
এনটিসি যোদ্ধারা এর আগে জানিয়েছে, গাদ্দাফি অনুগত যোদ্ধাদের নিয়ে ৪০টি গাড়ি শহরটি থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে গেছে। আরেক এনটিসি যোদ্ধা আবদুল সালাম মোহাম্মদ জানান, গাদ্দাফির লোকজন পশ্চিমে পালালেও তাদের ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে দেনদরবার চলছে। অন্তত ১৬ গাদ্দাফিপন্থী যোদ্ধাকে আটক করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমগুলো সে সময় জানায়।
ওদিকে বনি ওয়ালিদ শহরে এখনও গাদ্দাফি অনুগত গুটিকয়েক যোদ্ধার প্রতিরোধ লড়াই মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারি বাহিনীকে। তবে এরই মধ্যে শহরটির ৯০ শতাংশ এলাকা দখল করেছে তারা।
সির্ত দখল : সির্ত শহরটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে লড়াই করে গাদ্দাফি বাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল এনটিসি বাহিনী। তবে শহরটি পুরো দখলের পথে তাদের জন্য বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায় গাদ্দাফিপন্থী স্নাইপাররা। কিন্তু গতকাল সকালে এনটিসি সেনারা প্রায় ৯০ মিনিট লড়াইয়ের পর সর্বশেষ অবস্থান থেকে গাদ্দাফিপন্থীদের হটিয়ে দেয়ার কথা জানায়।
শহরটির পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধাভিযানের দায়িত্বরত প্রধান কর্মকর্তা কর্নেল ইউনুস আল-আবদালি বলেন, সির্ত মুক্ত করা হয়েছে। গাদ্দাফি সেনারা আর নেই। আমরা এখন পলায়নপর গাদ্দাফি অনুগত যোদ্ধাদের ধাওয়া করছি। সম্মুখ সারিতে লড়াই করা আরেকজন কমান্ডারও সির্ত পুরোপুরি দখল করে নেয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন।
গত ২৩ আগস্টে রাজধানী ত্রিপোলির পতনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন ৪২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা গাদ্দাফি। এরপর থেকে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু জানা যাচ্ছিল না। ১৯৬৯ সালে রাজতন্ত্র বিলোপ করে লিবিয়ার ক্ষমতায় বসেন গাদ্দাফি।