এএফপি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
এএফপি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১১

‘মুক্ত’ লিবিয়ার পথচলা শুরু


দীর্ঘ আট মাসের সংগ্রাম, অনেক রক্তক্ষয় এবং মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ৪২ বছরের স্বৈরশাসন থেকে লিবিয়া মুক্ত হয়েছে। জাতীয় অন্তর্বর্তী পরিষদ (এনটিসি) গতকাল রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ ‘মুক্ত’ ঘোষণা করেছে। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথে লিবিয়ার পথচলা শুরু হলো।
অন্তিম শয়ানে জন্মস্থান সির্ত শহরে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের পাশে কবরে থাকতে চান মুয়াম্মার গাদ্দাফি। এটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছা। একটি উইলে এমনই আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছিলেন লিবিয়ার এই নেতা। এনটিসি কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, তাঁর লাশ আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে কোথায় লাশ দাফন করা হবে, সেটা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আগে আলোচনা হবে।
লিবিয়া ‘মুক্ত’ ঘোষণার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় পূর্বাঞ্চলীয় বেনগাজি শহরে। গত ফেব্রুয়ারিতে গাদ্দাফিবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম শুরুর পরপরই প্রথম দিকে বেনগাজি শহর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় বিদ্রোহীরা। এরপর নিজেরা সংগঠিত হয়ে গঠন করে এনটিসি। আট মাস ধরে এনটিসি যুদ্ধ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড বেনগাজি থেকেই পরিচালনা করছে।
অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় একটি সেনা ব্যারাকের বাইরে, যেখানে গত ফেব্রুয়ারিতে গাদ্দাফির সেনাদের মুখোমুখি হয়েছিল আন্দোলনকারীরা। অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার মানুষ জড়ো হয়। জাতীয় সংগীত গেয়ে, তিন রঙা পতাকা উড়িয়ে এবং গজলের মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রামে নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় অনুষ্ঠানে।
অনুষ্ঠানে এনটিসির উপপ্রধান আবদেল হাফিজ ঘোগা বলেন, ‘লিবিয়া মুক্ত হয়েছে। আপনারা মাথা উঁচু করে দাঁড়ান। এখন আপনারা মুক্ত।’ অনুষ্ঠানে এনটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সারা বিশ্বের কাছে আমরা ঘোষণা দিচ্ছি, প্রতিটি শহর, গ্রাম, পর্বতচূড়া, গভীর মরুভূমি ও আকাশসহ আমরা আমাদের প্রিয় দেশকে মুক্ত করেছি।’
এনটিসি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এক মাসের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। এরপর আট মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন। এক বছরের মধ্যে পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে।
এর আগে এনটিসির মুখপাত্র মুস্তাফা গোবরানি বলেন, রোববারের এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে লিবিয়ায় নতুন দিনের সূচনা হলো। তিনি বলেন, ‘এই প্রথম আমরা অনুভব করছি, আমরা পূর্ণ স্বাধীন। স্বৈরশাসকের হাত থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি, আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলা শুরু হলো।’
গত আগস্টে ত্রিপোলির পতন হয়। এর পর থেকে সির্ত শহরই ছিল গাদ্দাফি অনুগত বাহিনীর সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। ত্রিপোলির পতনের পর এনটিসি ঘোষণা দিয়েছিল, সির্ত শহর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে দেশ মুক্ত বলে ঘোষণা করবে। গত বৃহস্পতিবার সির্তের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে এনটিসি। একই দিনে এনটিসি যোদ্ধাদের হাতে নিহত হন গাদ্দাফি।
ময়নাতদন্ত: লিবিয়ার প্রধান প্যাথোলজিস্ট ওসমান আল-জিনতানি গতকাল জানান, গাদ্দাফির মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। এতে জানা গেছে, মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
লাশ হস্তান্তর: অন্তর্বর্তী সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা গতকাল জানান, গাদ্দাফিকে কোথায় দাফন করা হবে, সে বিষয়ে তাঁর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনার পর লাশ তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিলের উপদেষ্টা আহমেদ জিবরিল বলেন, ‘গাদ্দাফির পরিবারের কোনো সদস্য এই মুহূর্তে লিবিয়ায় নেই। তবে তাঁর আত্মীয়দের কাছে লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
আহমেদ জিবরিল আরও বলেন, ‘এনটিসি গাদ্দাফির পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করছে। এনটিসির সঙ্গে পরামর্শ করে তাঁরাই লাশ দাফনের স্থান নির্ধারণ করবেন।’
গাদ্দাফির লাশ মিসরাতা শহরের একটি হিমঘরে রয়েছে। লাশ দাফন নিয়ে প্রথম দুই দিন এনটিসি কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, লাশ হয়তো কোনো অজ্ঞাত স্থানে দাফন করা হতে পারে।
গাদ্দাফির শেষ ইচ্ছা: গাদ্দাফি জন্মস্থান সির্ত শহরে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের পাশে নিজের কবর দেওয়ার জন্য শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে গেছেন এক উইলে। গতকাল গাদ্দাফির নিজস্ব ওয়েবসাইট সেভেন ডে নিউজ-এ এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে বলা হয়, এ উইল বা ইচ্ছাপত্র তাঁর তিন আত্মীয়ের কাছে দিয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয়জন গ্রেপ্তার ও তৃতীয়জন সির্তে লড়াইয়ের সময় পালিয়ে গেছেন।
উইলে গাদ্দাফি তাঁর সমর্থকদের বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি লিবিয়ার জন্য যুদ্ধ করে দেশেই মরতে চেয়েছেন। যুদ্ধের সময় তিনি বিদেশে চলে যাওয়ার অনেক প্রস্তাব নাকচ করে দেন।
উইলে বলা হয়, ‘আমি মুয়াম্মার গাদ্দাফি, মুসলমান হিসেবে মরতে চাই। যদি আমাকে হত্যা করা হয়, তবে আমাকে যেন মুসলমান রীতিতে কবর দেওয়া হয়। মারা যাওয়ার সময় আমার শরীরে থাকা পোশাক এবং আমার লাশ যেন পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর আমাকে যেন সির্ত শহরেই দাফন করা হয়।’
গাদ্দাফিকে জীবিত চেয়েছিলেন জিবরিল: প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল বলেন, তিনি গাদ্দাফিকে জীবিত আটক করতে চেয়েছিলেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি, আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে চেয়েছিলাম, তাঁকে জীবিত আটক করা হোক। জীবিত গাদ্দাফির কাছে আমি জানতে চাইতাম, ৪২ বছর ধরে তিনি কেন লিবিয়ার মানুষের ওপর এমন নির্যাতন চালালেন। তাঁর বিচারে আমি বাদী হতাম।’
তবে গাদ্দাফির হত্যার ঘটনা তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্বাগত জানাবেন বলে জানান জিবরিল। এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসি অনলাইন।

গাদ্দাফির মৃত্যু ক্রসফায়ারে?


লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ঠিক কী পরিস্থিতিতে নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ, যোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে প্রথমে বলা হয়েছিল, গাদ্দাফিকে গুরুতর আহত অবস্থায় আটক করার পর আঘাতের জেরে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু জাতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের (এনটিসি) প্রধানমন্ত্রী পরে বলেছেন, গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন ‘ক্রসফায়ার’ অর্থাৎ দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে পড়ে। নতুন এ তথ্যে বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন আরও বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল বলেছেন, সিরতে গাদ্দাফিকে অক্ষত অবস্থায়ই আটক করা হয়েছিল। এরপর এনটিসির যোদ্ধারা তাঁকে গাড়িতে তোলার সময় গাদ্দাফির সমর্থকদের সঙ্গে তাঁদের লড়াই শুরু হয়। এ সময় ডান হাতে গুলিবিদ্ধ হন গাদ্দাফি। ওই অবস্থায় তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তখনো তাঁর সমর্থকেরা গুলি চালিয়ে যাচ্ছিল এবং একসময় প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়। একপর্যায়ে গাদ্দাফি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। ১২০ মাইল দূরের মিসরাতা শহরের একটি হাসপাতালে পৌঁছার আগ মুহূর্তে তাঁর মৃত্যু হয়।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই বর্ণনা সত্ত্বেও ঠিক কী পরিস্থিতিতে গাদ্দাফিকে আটক করা হয়েছিল এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়, তা নিয়ে সংশয় যাচ্ছে না। কেননা, গ্রেপ্তারের পর মুঠোফোনে ধারণ করা দুটি ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। একটিতে গাদ্দাফিকে রক্তাক্ত কিন্তু জীবিত দেখা যায়। অন্যটিতে দেখা যায়, সারা শরীরে রক্তমাখা গাদ্দাফির নিষ্প্রাণ দেহ মিসরাতার রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাঝখানের সময়ের ঘটনা স্পষ্ট নয়। এ কারণে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাদ্দাফির মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
সিরিয়াভিত্তিক একটি টেলিভিশন চ্যানেল গতকাল বলেছে, গাদ্দাফির মৃত্যুর ব্যাপারে জাতিসংঘের তদন্ত দাবি করেছেন তাঁর স্ত্রী।
এনটিসির পক্ষ থেকে প্রথমে বলা হয়েছিল, ন্যাটো বাহিনীর বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর গাদ্দাফিকে আটক করা হয়েছিল। জখমের কারণে তিনি পরে মারা যান। এনটিসি বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আবদুল মাজিদ রয়টার্সকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার খুব সকালের দিকে একটি গাড়িবহর নিয়ে গাদ্দাফি সিরত শহর থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় ওই গাড়িবহরে হামলা চালায় ন্যাটোর বিমান। এতে বহরের প্রায় সব গাড়ি বিধ্বস্ত হয়, নিহত হন অনেকে। গাদ্দাফিসহ কয়েকজন আহত হলেও রক্ষা পান। এনটিসি যোদ্ধাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে তাঁরা রাস্তার তলা দিয়ে যাওয়া মোটা পানিনিষ্কাশন পাইপের ভেতর আশ্রয় নেন।’
এনটিসির এক যোদ্ধা বিবিসিকে বলেন, তিনি গাদ্দাফিকে পাইপের ভেতর দেখতে পান। এরপর তাঁকে সেখান থেকে টেনে বের করেন। তখন গাদ্দাফি অনুরোধ করেছিলেন তাঁকে গুলি না করার জন্য।
ওই যোদ্ধা একটি সোনালি রঙের পিস্তল দেখিয়ে দাবি করেন, সেটি তিনি গাদ্দাফির কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন।
এনটিসি যোদ্ধাদের মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, গাদ্দাফিকে যখন আটক করা হয়, তখনো তিনি বেঁচে আছেন। তবে তাঁর মাথা, মুখমণ্ডল ও ঘাড় ভেসে যাচ্ছে রক্তে। তিনি হাঁটার চেষ্টা করছেন, আর তাঁকে বিদ্রূপ করছেন এনটিসির যোদ্ধারা। একপর্যায়ে গাদ্দাফির মাথা বরাবর বন্দুক তাক করে ধরেন এক যোদ্ধা। তখনই তাঁকে টেনে তোলা হয় একটি গাড়িতে। কিন্তু গাড়িতে তোলার আগেই ওই যোদ্ধা তাঁকে গুলি করেন কি না, তা বোঝা যায় না ভিডিওচিত্রে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক এনটিসি কর্মকর্তা বলেন, ‘যোদ্ধারা গাদ্দাফিকে নির্মমভাবে পিটিয়েছিলেন। এরপর তাঁকে হত্যা করা হয়। এটাই যুদ্ধ।’
কিন্তু ওমরান জুমা নামের এক এনটিসি যোদ্ধা আবার ভিন্ন কথা বলেছেন। তাঁর বর্ণনামতে, গাদ্দাফিকে আটক করার পর যোদ্ধারা যখন তাঁকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করছেন, তখনই গাদ্দাফির পক্ষের এক যোদ্ধা সরাসরি তাঁর বুকে গুলি করেন।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে আরেকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, মৃত গাদ্দাফির পরের দিকের ছবি দেখে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাঁর মাথায় খুব কাছে থেকে গুলি করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে গাদ্দাফিকে আটক করার পর উদ্দেশ্যমূলকভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে যে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এনটিসির জ্যেষ্ঠ সদস্য মোহাম্মদ সাইদ। এর পরও তিনি বলেন, ‘যদি তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েও থাকে, তাহলে সেটা অন্যায় কিছু হয়নি। কেননা, আমি মনে করি, সেটা তাঁর প্রাপ্য।’
তবে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রধান নাভি পিল্লাই গতকাল বলেছেন, গাদ্দাফির মৃত্যুর বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া দরকার। তাঁর মুখপাত্র রুপার্ট কলভিল বিবিসিকে বলেন, গাদ্দাফি কীভাবে নিহত হয়েছেন, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। কাজেই তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
কলভিল বলেন, ‘দুই ধরনের ভিডিওচিত্র পাওয়া গেছে। এর একটিতে দেখা যায়, গাদ্দাফি জীবিত আছেন। অন্যটিতে তিনি মৃত। এ ছাড়া কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো, তা নিয়ে চার ধরনের বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই এটা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।’
মানবাধিকার কমিশনের প্রধান আরও বলেন, ‘কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হতে পারেন এবং সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন সুস্পষ্ট। কিন্তু অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আইনে এটাও সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, সংক্ষিপ্ত বিচারে বা বিচারবহির্ভূতভাবে কাউকে হত্যা করা আইনের লঙ্ঘন।’
কলভিল আরও জানান, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন ইতিমধ্যে লিবিয়ায় হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য অপরাধ তদন্তে কাজ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই কমিশন হয়তো গাদ্দাফির মৃত্যুর বিষয়টিও তদন্ত করে দেখবে।
সাইফ নাইজারের দিকে পালিয়েছেন?: বৃহস্পতিবার গাদ্দাফির সঙ্গে তাঁর ছেলে মুতাসিমও নিহত হয়েছেন বলে জানায় এনটিসি। এ ছাড়া তাঁর অপর ছেলে সাইফ আল ইসলামের গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়েছে এবং তিনি পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ধরা পড়েছেন বলেও জানানো হয়। কিন্তু এনটিসি গতকাল বলেছে, সাইফ সিরত শহর থেকে দক্ষিণে নাইজারের সীমান্ত এলাকার দিকে পালিয়ে গেছেন।
এনটিসির জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার আবদুল মাজিদ রয়টার্সকে বলেন, ‘সাইফ সাঁজোয়া যান নিয়ে নাইজার সীমান্তের দিকে পালিয়ে গেছেন বলে আমাদের মনে হচ্ছে। তাঁকে খুঁজে বের করতে আমরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। ওই এলাকার যোদ্ধাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

পচন ধরেছে গাদ্দাফির লাশে


লিবীয় নেতা মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির লাশে পচন শুরু হয়েছে এবং তা থেকে গন্ধ বেরুচ্ছে। ফলে গাদ্দাফিকে দেখতে আসা উত্সুক লোকজন মুখে মাস্ক লাগিয়েই তার লাশ দেখতে যাচ্ছেন। এদিকে এনটিসির কিছু কর্মকর্তাও এ পরিস্থিতিতে দ্রুত তার লাশ দাফনের ওপর জোর দিচ্ছেন। গত ২০ অক্টোবর হত্যার পর থেকে তার লাশ মিসরাতা শহরের একটি কাঁচাবাজারের গোশত রাখার হিমঘরে রাখা হয়। লিবীয়রা দেশটির সাবেক এ নেতাকে দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জিবরিল মাহমুদ তার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত চাইলেও এ পর্যন্ত গাদ্দাফির মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হয়নি এবং তা হবে না বলেই জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকার এনটিসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। কিন্তু এনটিসির আরেক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, গতকাল গাদ্দাফির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

শেষ মুহূর্তেও নিজেকে নেতা ভাবছিলেন গাদ্দাফি


লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি সারাজীবন যেমন নিজেকে নেতা মনে করতেন, মৃত্যুর সামান্য আগেও তার সে মনোভাবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তার কথাবার্তায় মনে হচ্ছিল, তখনও তিনি লিবিয়ার নেতাই।
লিবিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার এনটিসির যে দলটি তাকে খুঁজে পায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যে হত্যা করে, সেই দলটির কমান্ডার ছিলেন ওমরান আল ওয়েব। তিনি বলেন, পয়োনিষ্কাশনের নালা থেকে যখন তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করা হয়, তখন তিনি বের হয়ে দশ পা সামনে আসার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অথচ তখনও গাদ্দাফি নিজেকে লিবিয়ার নেতা বলেই মনে করছিলেন। তার কথাবার্তায় সেটাই মনে হচ্ছিল। সে কারণেই এনটিসির যোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ার পর তিনি তাদের বলছিলেন, ‘কী হয়েছে? তোমরা একটু অপেক্ষা কর। তোমাদের কী সমস্যা? আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। তোমরা কারা? তোমরা এটা করতে পার না।’
ওয়েব দাবি করেন, তিনি গাদ্দাফিকে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে তিনি ব্যর্থ হন। কেউ একজন গুলি করে তাকে হত্যা করে। তবে কে তাকে গুলি করেছে, তা বের করা অসম্ভব বলে জানান তিনি। কারণ সেখানে এত মানুষ ছিল যে এটা বের করা আসলেই সম্ভবপর নয়। তবে সানাদ আল সাদেক আল ইউরিবি নামে বেনগাজির এক তরুণ গাদ্দাফিকে হত্যার দাবি করছেন বলে ইন্টারনেটে খবর বেরিয়েছে।