মোহাম্মদ আসাফ্ উদ্দৌলাহ্ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মোহাম্মদ আসাফ্ উদ্দৌলাহ্ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

বিলুপ্ত আশা ও বিবর্ণ আশাবরী


খ্যাতনামা ব্রিটিশ কবি জন ডান ১৬২৪ সালে লিখেছিলেন :
Any man's death diminishes me, because
I am involved in mankind : And therefore
never send to know for whom the bell
tolls; it tolls for thee.

কে মারা গেল সেটা গৌণ। আসল কথা হলো- একজন চলে গেল চিরতরে। এই মানবগোষ্ঠীর মধ্য থেকে আমাদের ছেড়ে চলে গেল এক বন্ধু আমাদের হ্রস্ব করে দিয়ে।
প্রতিবাদ করতে গিয়ে জীবন হারাতে হলো পাঁচজন তরতাজা যুবকের। তারা কারো ঘর ভেঙে ডাকাতি করতে যায়নি, যায়নি কারো প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে। তারা গিয়েছিল প্রতিবাদ করতে সরকারের বিরুদ্ধে। এরাই নাকি রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস। এদের ভোটেই নাকি সরকার আসে আর যায়।
আজকাল মৃত্যু মৃদু দীর্ঘশ্বাসও আনে কি না সন্দেহ হয়। আমার পরম প্রিয় বন্ধু কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল একটা মর্মস্পর্শী কবিতা লিখেছিলেন। কবিতার শব্দগুলো মনে নেই। তবে তার মর্মার্থ ছিল- এক যুবক বাসচাপা পড়ে মরে পড়ে আছে মিরপুরের জনাকীর্ণ রাজপথে। দু-একজন উৎসুক পথচারী দূর থেকে উঁকি দিয়ে দেখলেন। দু-একজন নিরাপত্তাহীন সড়কব্যবস'ার ওপর কিছু মন্তব্য ছুড়ে দিতে দিতে ছুটলেন অফিসের পথে। কারো সময় নেই। আগের দিন হলে থেমে যেত জনস্রোত। যুবকটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করত। তার পরিচয় জানার চেষ্টা করত। আজ আর কারো এসব সাধারণ বিষয় নিয়ে নিজের অমূল্য সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই।

এদের করুণ মৃত্যুতে সহানুভূতি জানিয়ে এলো না কোনো রাষ্ট্রপতির বাণী বা প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা।
ইংরেজ ও পাকিস্তান আমলেও পুলিশ ছিল একটি বেসামরিক বাহিনী, যার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল বেসামরিক প্রশাসনের হাতে। প্রতিটি বুলেট ব্যবহারের হিসাব দিতে হতো। প্রতিটি পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর তাৎক্ষণিক জবাবদিহি করতে হতো পুলিশকে। এখনকার মতো হাস্যকর ‘ক্লোজড’ ও ‘সাসপেনশন’ নয়। একজন অপুলিশ, বেসামরিক আধিকারিক বা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ ছাড়া পুলিশ কনো ব্যক্তির ওপর গুলিবর্ষণ করতে পারত না। স্বাধীন হতে হতে তারা এখন এমন এক অবস'ানে নিজেদের নিয়ে যেতে পেরেছে, যেখানে কারো কাছেই তাদের আর জবাবদিহি নেই। সরকারের পর সরকার তাদের দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থে এমন সব অন্যায় কাজে পুলিশকে দুর্ব্যবহার করেছে, তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহসও হারিয়েছে সরকারের মন্ত্রীরা। এখন হয়তো খুব শিগগিরই দেখব, মন্ত্রীরা তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে কৃতার্থ বোধ করছেন। পুলিশ প্রধানের মর্যাদা যদি স্বরাষ্ট্র সচিবের সমান কিংবা ঊর্ধ্বে হয়, তাহলে তার রিপোর্টিং পয়েন্ট কোথায় তা জানা দরকার। কেননা পুলিশ প্রধান হচ্ছেন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তা। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধানের অবস'ানও তাই। সরকারের সব ডিপার্টমেন্ট প্রধানের অবস'ানের মধ্যে সামঞ্জস্য আনা প্রয়োজন। পুলিশের কর্মকর্তাদের পোশাক ও অলঙ্করণ এখন পুরোপুরিই সেনাবাহিনীর আদলে। আইজিপিকে তার পদোন্নতির অলঙ্করণ পরিয়ে দিচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এটা একটা অভূতপূর্ব ব্যতিক্রম। এভাবেই ধীরে ধীরে পুলিশ দূরে সরে যাবে বেসামরিক প্রশাসন থেকে। জবাবদিহি থেকে। নিয়ন্ত্রণ থেকে। যে সরকার তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনীকে তোয়াজ করতে আরম্ভ করে, তাদের পক্ষে আর নিয়ন্ত্রণ ও চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না।

পাঁচটি প্রাণ ঝরে গেল। ৯০০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ও এক হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। গত রোববার চারদলীয় জোটের পূর্বঘোষিত গণমিছিলে সরকারি দল ও পুলিশ বাহিনী বাধা দিয়েছে বলেই এ সংঘর্ষ ও প্রাণহানি। কিন' অকারণে বাধা দেবে কেন পুলিশ? তাহলে সংবিধান থেকে দেশের মানুষের এসব অধিকার নিশ্চিহ্ন করে দেয়াই হবে বাঞ্ছনীয়। নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার- এরা শীতে ন্যাংটা ছেলেদের মতো কাঁপছে।
আজকাল যারা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান তাদের সান-্বনা দিতে যান কেবল তাদের নিকটাত্মীয়রা, পাড়া-পড়শিরা আর কিছু বন্ধুবান্ধব। কিন' একজন পুলিশ কনস্টেবল ঢিল লেগে সামান্য আহত হলেই কমপক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেলিভিশন সহযোগে পুলিশ হাসপাতালে যান সহমর্মিতা দেখাতে। ভুল করে হোক আর ভবিষ্যতে মার খাবার ভয়ে হোক, তারা দলে দলে যান পুলিশের আহত সদস্যকে দেখতে; যান সাথে চারটে আপেল, পাঁচটা কমলালেবু আর ছয়টা ডাব নিয়ে। অবাক লাগে না?- যে মার খেয়েছে, গুলিবিদ্ধ হয়েছে, নিহত হয়েছে- তাদের যারা ভোট দিয়ে সেবা করতে পাঠিয়েছিল এবং আবার যাদের কাছে ভোট ভিক্ষা করতে যেতে হবে- তাদের মৃত্যুর প্রতিও নেই কোনো সমবেদনা, কোনো দুঃখপ্রকাশ, কোনো ক্ষতিপূরণ?

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, র‌্যাবের বা পুলিশের এনকাউন্টারে বা হেফাজতে আর কারো মৃত্যু হবে না। কিন' তার পরও ঘটে যাচ্ছে মৃত্যুর ঘটনা। এর মাত্র দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে। পুলিশ হয়ে গেছে উচ্ছৃঙ্খল ও অবাধ্য অথবা ইঙ্গিতে তাদের বলা হয়েছে এসব নির্দেশ উপেক্ষা করতে। গণতান্ত্রিক ব্যবস'াপনায় পুলিশ বাহিনী নিয়ন্ত্রিত হবে হয় কেন্দ্রীয় সরকারের অসামরিক আধিকারিকদের দিয়ে অথবা নির্বাচিত স'ানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের দিয়ে। মেয়র অথবা ইউনিয়ন কাউন্সিল বা উপজেলা পরিষদের অধীনে চাকরি করতে হবে তাদের। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একজন পুলিশ প্রধানের অধীনে ঢাকা থেকে সারা দেশের ১৬ কোটি মানুষের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা কেনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য হতে পারে না যে তারা নিজেরাই জবাবদিহি করবে নিজেদের কাছে। আগেকার সময়ে পুলিশ নিয়ন্ত্রিত হতো অসামরিক প্রশাসন দিয়ে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ এড়িয়ে প্রশাসন আলোচনায় বসত বিক্ষুব্ধদের সাথে। আমাদের অভিজ্ঞতায় শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়টির একটা সাময়িক সুরাহা হয়ে যেত। সংক্ষুব্ধরা সুবিচারের আশ্বাস পেত। সরকার পেত সমাধানের সুযোগ। দাবি যুক্তিযুক্ত হলে সমাধানের সুপারিশ স'ানীয় প্রশাসনই করত সরকারের উচ্চপর্যায়ে। একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়ার সুযোগ থাকত অনেক বেশি। এখন বিক্ষোভ হলে পুলিশ আর সংক্ষুব্ধরা একেবারে মুখোমুখি। তাতে সঙ্ঘাতই অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর হচ্ছেও তাই। বিক্ষোভ মানেই সংঘর্ষ। কেননা মধ্যবর্তী হস্তক্ষেপ ও সুরাহার আর কোনো সুযোগ নেই। নেগোসিয়েশন একটা ‘স্কিল’। এটা স্বীকার করে নিতেই হবে। আজকাল নেগোসিয়েশনের কোনো সুযোগ থাকছে না বলেই এত সংঘর্ষ, এত মৃত্যু।

পুলিশের জন্মলগ্ন থেকেই মারার জন্য নয়, অত্যাচারের জন্য নয়, জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই তাদের তৈরি করা। রাজা অগাস্টান খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে রোম শহরকে ১৪টি ওয়ার্ডে (ভিসি) বিভক্ত করেছিলেন পুলিশি কর্মকাণ্ডকে আরো জোরদার করতে। যেখানেই ক্ষমতা প্রয়োগ জড়িত থাকে, সেখানেই স্বাভাবিক কারণেই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও ক্ষমতাকে অত্যাচারের হাতিয়ার রূপে অপব্যবহারের সুস্পষ্ট সম্ভাবনা থাকে। সে জন্যই ক্ষমতা প্রয়োগের নিবিড় তাৎক্ষণিক তত্ত্বাবধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সম্রাট অগাস্টান রোম পুলিশের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের জন্য সাতটি ভিসিতে ১৪ জন ভিকোম্যাজিস্ট্রেসি নিয়োগ করেন।
১৮২৯ সালে ব্রিটেনে চালু হয় দ্য মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্ট। ইউনিফরম পরা বেতনভুক্ত অসামরিক পুলিশ বাহিনীর সৃষ্টি এখান থেকেই। কিন' এটা ছিল পুরোপুরি ‘প্রিভেনটিভ’ পুলিশিং। তাদের প্রত্যাশিত গুণাবলি ছিল : সহনশীলতা, নৈর্ব্যক্তিকতা, আর পেশাদারি মনোভাব। তাদের ক্ষমতার ভিত্তি ছিল : (১) দ্য ক্রাউন, (২) দ্য ‘ল’ এবং দ্য ‘কনসেন্ট’ অব ‘দ্য সিটিজেনরি’।
আমাদের দেশের বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীকে বিকেন্দ্রীকরণ আশু প্রয়োজন। তা ছাড়া রেলওয়ে আদালত, ট্র্যাফিক, কারাগার, ইমিগ্রেশন বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, পুলিশের ‘ইনভেস্টিগেশন’, ‘প্রটোকল’, ‘নারকোটিক ও ড্রাগ’ ইত্যাদি দায়িত্বের জন্য কেন্দ্রীয় ও একক কর্তৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এসব ডিপার্টমেন্ট ‘মেইন’ পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিতে হবে। তাদের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণও হতে হবে পৃথক। তাদের ইউনিফরম হবে অন্য রকমের। ট্রাফিক আইন ভাঙলে ট্র্যাফিক স্কাউট গ্রেফতার বা জরিমানা করতে পারবে। এতে ক্ষমতা বণ্টনে একটা শুভ ভারসাম্যতা আসবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এতে করে সাধারণ পুলিশের ওপর বহুবিধ কাজের চাপও অনেকাংশেই কমে আসবে। ক্ষমতার একক ব্যবহারের মনোভাবেরও পরিবর্তন হবে বলে ধারণা করা যায়। ল্যাটিন ভাষায় উদ্বেগটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে :
"Quis custodiet ipso custodes" (who guards the guardians?)

রাজনৈতিক সংঘর্ষে পুলিশ কখনোই বেআইনি, অসাংবিধানিক অথবা দলীয় কোনো নির্দেশে কোনো কাজ করতে পারে না। এই মনোভাবকে পুলিশের মৌলিক প্রশিক্ষণের মধ্যে আন্তরিক অর্থে সুদৃঢ় করতে হবে। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় যাদের বেতন-ভাতা-ইউনিফরম-কোয়ার্টার- তাদের দায়িত্ব পালনকালে এ কথা মনে রাখতে হবে। রাখলে বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে ওভাবে নির্যাতন করার কথাও ভাবতে পারত না পুলিশ বাহিনী। তারা তো ব্যস্ত নিজেদের সুবিধা বাড়াতে। আর অফিস সাজাতে। কোনো প্রচণ্ড ট্রাফিক ‘জ্যামে’ কোনো দিন দেখেছেন পুলিশ প্রধান বা পুলিশের ট্র্যাফিক প্রধানকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নাগরিকদের দুর্ভোগ লাঘবে সচেষ্ট হতে? না, তাতে সম্মানহানি হবে। ডিএমপি কমিশনার চলেন-বলেন তো মন্ত্রীর মতো। ক’দিন পরপর পরিদর্শন করেন থানা, রাত্রিতে থানার হাজত। যাক ফিরে আসি মূল ক্ষোভে। মানুষের অস্বাভাবিক কোনো চাওয়া নেই পুলিশের কাছে। মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্টে তারা এমন সব ধারা রচনা করেছেন, তারা যাকে ইচ্ছা ধরতে পারবে, মারতে পারবে- কিন' তাদের কিছু করা যাবে না। সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অজুহাতে যে কাউকে গ্রেফতার করে মিথ্যা মামলায় কত হাজার কোটি টাকার উৎকোচ আদায় করেছে ডিএমপি তার হিসাব দিতে পারবে না। পারা যায় না। চেইন অব কমান্ড উঠে গেছে, যত পরিদর্শক নিয়োগ পাচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি কমে যাচ্ছে পরিদর্শন। পুলিশের পকেটে রিভলবারের পরিবর্তে ফাস্ট এইড মেডিক্যাল বক্স থাকা কি সম্ভব? যে হাত দিয়ে মানুষ পেটায়, সে হাত দিয়ে কোনো সিনিয়র সিটিজেনকে তার বাড়ি থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া কোনো দিন সম্ভব হবে কি? বগলের ‘বেটন’ ফেলে দিয়ে কোনো ছোট ছেলে বা মেয়েকে তাদের নরম দুটো হাত ধরে মরণফাঁদের মতো সড়কগুলো পার করে দেয়া কি একেবারেই নিষিদ্ধ? একটা হারিয়ে যাওয়া ছেলে বা মেয়েকে তার নিশ্চিন্ত ঠিকানায় পৌঁছে দেয়া? একটা আত্মীয়-সঙ্গীবিহীন বৃদ্ধ মানুষের বাড়িতে অথবা পথে পড়ে থাকা মরদেহ তার নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিলে কি ইউনিফরমের ভাঁজ ভেঙে যাবে? দাগ লেগে যাবে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত অনিচ্ছায় বললেন, পুলিশের সাথে সংঘর্ষে যারা মারা গেছে তাদের জন্য তিনি ‘দুঃখিত’। ঘটনার পর তার বিবৃতি এত সংক্ষিপ্ত, এতটা হৃদয়হীন? তিনি আরো বললেন : ‘পুলিশের তো এ রকম গুলি করার কথা ছিল না?’ তাহলে তাদের গুলি চালানোর হুকুম কে দেয়? তাদের কি আদৌ কারো আদেশ নেয়ার প্রয়োজন হয় বর্তমান ব্যবস'ায়?
কেবল এই পাঁচটি মৃত্যুই নয়। সমপ্রতি শেয়ার ব্যবসায় সর্বস্বান্ত হয়ে দু’জন যুবক আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তাতে কার কী? অপরাধীদের নাম উচ্চারণ করতে ভয় পান অর্থমন্ত্রী। ফালানীর কাঁটাতারের ঝুলন্ত লাশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমেই বললেন : ‘ফালানী তো আমাদের দেশের কেউ নয়, সে তো ভারতীয় নাগরিক!’ বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশী নিহত ও আরেকজন গুরুতর আহত হলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বললেন : ‘ও রকম হয়েই থাকে বর্ডারে। এখনো হচ্ছে, আগেও হয়েছে, আগামীতেও হবে।’ এরা জীবনে যদি আবার ভোটভিক্ষা চাইতে আসেন, তখন শুনিয়ে দিয়েন যা তার প্রাপ্য। যে চুক্তির শর্তাবলি জাতি আজো জানতে পারেনি, তার বাস্তবায়ন হয়ে যাচ্ছে। তিতাস নদী ভরাট করে মাটির বাঁধ দিয়ে ভারতীয় ট্রাক ও পণ্য পারাপার হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না। মার্চের ১২ তারিখে বিরোধী দলের পূর্বনির্ধারিত ও পূর্বঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি করার ঘোষণা দিয়েছে সরকারি দল। এ যেন পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধানো। কাঁদছে গণতন্ত্র, কাঁদছে ভবিষ্যৎ। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিবের হৃদয়বিদারক এক ভবিষ্যদ্বাণী :
‘রঞ্জ সে খুঁগ্যর হুয়া ইনসাঁ
তা মিট যাতা হ্যায় রন্ধ
মুশকিলে মুঝ প্যর প্যড়ি ইবেনি
কে আসাঁ হ গ্যজি।।
ইউহি গ্যর রোতা রাহা গালিব
তো এ্যয় এ্যহলে জাহাঁ
দেখনা ইন ব্যস্তিওঁকো তুম্
কে বিরাঁ হ গ্যয়ি।।’

- দুঃখে এভাবে রক্তাক্ত হতে থাকলে সয়ে যাবে দুঃখ
আমার ওপর বিপদ পড়েছে এত যে ব্যথাই লাগে না আর।
- আর এভাবেই যদি ক্রন্দনরত থাকে গালিব
তাহলে দেখো এসব জনপদ একদিন জনশূন্য হয়ে যাবে।

মোহাম্মদ আসাফ্ উদ্দৌলাহ্
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১১

রঙ-বেরঙের কালবেলা


আমাদের জাতির অন্তর্গত মানস তৈরি হয়েছিল পেণ্ডুলামের চরিত্রের আদলে। আমাদের গতি সামনের দিকে নয়, পাশাপাশি। পাশাপাশি গতি অগ্রসরমান নয়- একই বন্ধ পরিসরে শুধু এপাশ আর ওপাশ। একবার আবেগে আপ্লুত, একবার ঘৃণায় আকুঞ্চন। একবার কাউকে মাথার ওপরে, একবার তাকেই পদতলে। একবার প্রশংসা, তো একটু পরেই কুৎসা। একবার বিদ্রোহ তো পরপরই আনুগত্য। একবার অন্ধ বিশ্বাস, আরেকবার অন্ধ অপ্রত্যয়। সকালে অর্ঘ্য তো সন্ধ্যায় অবজ্ঞা, দুপুরে সখ্য তো রাতে প্রতিহিংসা। ঠিক যেন ঘড়ির পেণ্ডুলাম। এক চরম যাত্রা থেকে ঠিক তার বিপরীতের অর্ধবৃত্তের চরম সীমায়। জন্মলগ্ন থেকেই ডিঅক্সিরিবোনিউক্লেইক অ্যাসিডের (ডিএনএ) মধ্যে পেণ্ডুলামের ক্রোমোজোম ঢুকিয়ে বিধাতা আমাদের নির্মাণ করেছেন বলে মাঝে মাঝে মনে হয়। সেই সাথে যোগ হয়েছে মিথ্যাচার আর ঈর্ষার বিষের দুরন্ত মিশ্রণ। আমাদের স্পর্শ করবে যে, অনিবার্য মৃত্যু হবে তার।
আমাদের অধিকাংশ মাসের বুকিং হয়ে গেছে, অবশিষ্ট আছে মাত্র কয়েকটি। জানুয়ারি মাস শেখ মুজিবের দেশে প্রত্যাবর্তনের মাস, ফেব্রুয়ারি হচ্ছে ভাষার মাস, মার্চ হচ্ছে স্বাধীনতার, এপ্রিল বেচারা ‘ফুল’ ছাড়া এখনো আর কিছু নয়, মে হচ্ছে শ্রমিকদের, জুন এখনো বুক্ড হয়নি, বুক্ড হয়নি জুলাই, শোক বুক করেছে আগস্ট, সেপ্টেম্বর আর অক্টোবর এখনো প্রতীক্ষায়, নভেম্বর সিপাহি-জনতার, ডিসেম্বর বিজয়ের মাস।
প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, ইরাককে ইরাকিদের হাতে ফেরত দিয়ে বিজয়ের গৌরব নিয়ে ইরাক ছেড়ে যাচ্ছে আমেরিকা। দীর্ঘ ৯ বছর একটি প্রমাণিত মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে, জাতিসঙ্ঘের প্রতি স্পর্ধার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ৯ লাখ ইরাকি শিশু-নর-নারী হত্যা করে প্রায় এক দশক ঔপনিবেশিক দখলদারি কায়েম রেখে আমেরিকা পালিয়ে যাচ্ছে একটি গর্বিত জাতিকে ধ্বংস করে, তাদের অগ্রযাত্রাকে ৫০ বছর পিছিয়ে দিয়ে। এক সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তের হাসি হেসে পালালেন ওবামা। কত আবু গারিব, কত গুয়ান্তানামো। ওষুধের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল দুই লাখ নিষ্পাপ শিশু। এমনিভাবে পাথরের যুগে ফিরে যাবে আফগানিস্তান, লিবিয়া ও সিরিয়া। অথচ যারা এই বর্বরতা চরিতার্থ করছে, তারাই বিশ্বে অলঙ্ঘনীয়, তারাই প্রভুর ভূমিকায়। তাদের অনুগ্রহ পাওয়ার প্রত্যাশায় গোটা বিশ্বই ব্যাকুল।
কিছু দিন ধরে গুম, উধাও, খুন ও ভাসমান লাশ যেন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন' স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? ঘুম ভেঙে বলে উঠলেন : ‘খবরের কাগজে দেখলাম গুম ও খুনের সংবাদ। আমার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চয়ই বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।’ সবাইকে চমকে দিয়ে এই দায়িত্বজ্ঞানহীন মহিলা বললেন, ‘এসব খুন করাচ্ছেন বেগম জিয়া।’ তেলের দাম বাড়ছে নাকি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের ষড়যন্ত্রে। এক জ্ঞানপাপী তো টিভি টকশোতে বলেই ফেললেন, দেশের বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির পেছনেও ঘাতক-দালালদের বিচার বিঘ্ন করার চক্রান্ত কাজ করছে।

বহু দিন ধরে দেখে আসছি, ভারত বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু নয়। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম কথা দিয়ে গেলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গুলি করে আর কোনো বাংলাদেশীকে হত্যার ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না; ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় এসে আশ্বস্ত করলেন, সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা অবশ্যই বন্ধ হবে। এতশত প্রতিশ্রুতির পরে গত এক সপ্তাহে পাঁচজন বাংলাদেশী নাগরিককে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নির্বিচারে হত্যা করেছে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। চারজনকে গুলি করে, আর একজনকে বোমা মেরে। অথচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের এমন মানবতাবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি উত্তপ্ত বিবৃতি দিতেও অক্ষম। এমনকি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানোর সাহস পর্যন্ত আজ আমাদের নেই। আজো তিস্তা নদীর প্রবাহ বণ্টনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সমপ্রতি এক বক্তব্যে বলেছেন, ভারত টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ ‘করবেই’। আমাদের দীপু কি শুধু এপাশ থেকে ওপাশ ঘাড় নাড়িয়েই সম্পন্ন করতে থাকবেন জাতির প্রতি তার দায়িত্ব?
ঢালাও রাজনৈতিক গ্রেফতার, দমন-পীড়নের পরিচিত চালচিত্রের কথা যদি বাদও দিই, তাহলেও আইনশৃঙ্খলার দৈনন্দিন পরিসি'তি কেমন? ২০ ডিসেম্বরের একটি বাংলা জাতীয় দৈনিক পত্রিকা থেকে পাওয়া : পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য, র‌্যাব-পুলিশের তৎপরতায় আতঙ্কিত পথচারী, ঢাকায় এসে সব খুইয়েছেন জাপানি অধ্যাপক, এবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে গুপ্তহত্যা, সাভারে স্কুলছাত্র খুন, চারঘাটে যুবকের লাশ উদ্ধার, ২৫ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী এবং মেয়র-চেয়ারম্যানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভালুকায় ট্রাক উল্টে পাঁচজন নিহত, রাজধানীর খিলক্ষেত থানার সামনে দুজনকে গুলি করে ১০ লাখ টাকা ছিনতাই, নিখোঁজের ২৫ দিনেও সন্ধান নেই হাফেজ ইমন চৌধুরীর, মান্দায় গৃহবধূকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, টাকা ছাড়া কাজ হয় না দালালদের উৎপাতে, রাজধানীর শাঁখারীবাজারে তিন ট্রাক বিস্ফোরক উদ্ধার, গভীর রাতে সাতটি তাজা বোমা উদ্ধার, আজ থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ১৯ রুটে পরিবহন ধর্মঘট, রাজধানীতে বিএনপির মিছিলে পুলিশের বাধা। কেমন মনে হচ্ছে? অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তার স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ততার সাথে বলে থাকেন : ‘কেন, আমার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে নিরাপত্তা সমস্যা। আমি তো খবরের কাগজে দেখলাম, গুম আর ভাসমান লাশের সংবাদ। ঘটনার তদন্ত করবে আমার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তে কী প্রকাশ পায় দেখা যাক।’ কী নিশ্চিন্ত নির্মমতা!
অর্থনীতির খবর কী? আমাদের অর্থমন্ত্রী এসকাপের সেমিনারে বলেছেন, চরম মুদ্রাস্ফীতির কারণে দেশের অর্থনীতি গভীর সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, অর্থনীতি তো খুব শক্তিশালী অবস'ানে রয়েছে- কোনো সমস্যা নেই। শেয়ারবাজারের বিপন্ন অবস'া দূর হচ্ছে না। গ্যাস সঙ্কটে শিল্পোৎপাদন স'বির। বিদেশী বিনিয়োগ শূন্যের কোটায়। টাকার বিপরীতে ডলারের দামও ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ পর্যায়ে, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকার নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ। অথচ এ ঋণের দায় কিভাবে পরিশোধ হবে, কেউ বলতে পারে না। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানও প্রায় বন্ধ। এ অবস'ায় দেশের উন্নয়ন ভাবনা নতুন অশনি সঙ্কেতের বলয়ে।
এ দিকে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের রাজনীতি আগামীর জন্য সঙ্ঘাত ছাড়া আর কোনো সংবাদ দিচ্ছে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস'া বাতিল, ঢাকা কেটে দু’ভাগ করা, জেলা পরিষদে পুরোপুরি দলীয় কর্মী দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের অসাংবিধানিক ব্যবস'া গ্রহণ, স'ানীয় সরকারপর্যায়ে অনির্বাচিত আধিকারিকদের নিয়োগের স্বেচ্ছাচার (তা হলে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিপক্ষের যুক্তি কি নীতির বিচারে ভীষণভাবে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে না?)- এসবই বারবার প্রমাণ করে, গণতন্ত্রে নির্বাচনই অন্তিম কথা নয়। একবার ভোটে যেকোনোভাবে নির্বাচিত হলে তারপর ‘আমি তা-ই করব, যা আমার ইচ্ছা'- এ ধরনের স্পৃহা যে ভীষণভাবে অগণতান্ত্রিক এবং স্পর্ধিত স্বেচ্ছাচারীর জন্ম দেয়, পৃথিবীতে বাংলাদেশ তার এক নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। আমরা স্বেচ্ছাচারীদের প্রশ্রয় বা সমর্থন দেয়ার জন্য গণতন্ত্রের চর্চা করতে চাই না। এ জন্য আজকে যে কথাটি সব কথার আগে ভাবা দরকার, তা হচ্ছে- সরকার প্রধানের স্বেচ্ছাচার করার ক্ষমতার ডানা কর্তন করা- ক্ষমতার রাষ্ট্রীয় ব্যবস'াপনায় ক্ষমতার একটা সভ্য ভারসাম্য সৃষ্টি করা। নইলে রচিত হবে আরেকটি বাকশালী একনায়কত্বের পাণ্ডুলিপি।
প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে এই- কেউ পরপর মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। তাতে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য বাগান সাজাতে হবে না।
লেখক : সাবেক সচিব ও সম্পাদক