Gaddafi লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Gaddafi লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১২

গাদ্দাফির শেষ যুদ্ধ


মুয়াম্মার গাদ্দাফি বিদ্রোহীদের হাতে আটক হয়ে নিহত হওয়ার এক বছর পূর্তি হলো ২০ অক্টোবর। এর তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘ডেথ অব এ ডিক্টেটর: ব্লাডি ভেনেগান্স ইন সির্তে’ নামের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এখানে তারই আলোকে গাদ্দাফির অন্তিম মুহূর্ত এবং লিবিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়েই এই প্রতিবেদন।

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাদ্দাফির বিরোধীরা লিবিয়াজুড়ে সরব হওয়া শুরু করে। কিন্তু লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ সেই প্রতিবাদ শুনল না, উল্টো শোনাল সিংহের হুঙ্কার। পরিণাম—বিদ্রোহ। লিবিয়ার মরুসিংহ বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে বেড়ালেন। কিন্তু মরুসিংহকে তাঁর সুরক্ষিত গুহা থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা করল ন্যাটো। ভূমিতে বিদ্রোহীদের মর্টার আক্রমণ, আকাশ থেকে ন্যাটোর ড্রোন আর মিসাইল বর্ষণ; হার মানতে হলো গাদ্দাফিকে। দিনের শেষে দেখা গেল গাড়িবহর নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গৃহযুদ্ধের ডামাডোলে জনশূন্য শহরের ভুতুড়ে বাড়ি থেকে বাড়িতে লুকিয়ে দিন কাটতে থাকল তাঁর। দুনিয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। খাবার, পানি, এমনকি ওষুধ পর্যন্ত নেই। তাঁর খোঁজে চারদিক দাবড়ে বেড়াচ্ছে বিদ্রোহী মিলিশিয়ারা। আকাশে চক্কর দিচ্ছে ড্রোন। মার্কিন স্যাটেলাইটের সর্বদর্শী চোখ তাঁর জন্মস্থান লিবিয়ার ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি ৪২ বছর ধরে ছিলেন লিবিয়ার পরম ক্ষমতাধর। বলা হয়, পরম ক্ষমতা চরম দুর্নীতিবাজ। এটা বলা হয় না, ক্ষমতার খুঁটিগুলো সরে গেলে পরম ক্ষমতাই চরম অসহায় হয়ে পড়ে। বিরাট বাহিনী, বিপুল শানশওকত, অজস্র বিমান আর ট্যাংক ছিল তাঁর। কিন্তু তাঁকে কিনা মরতে হলো প্রায় খালি হাতে পালাতে পালাতে ধরা পড়া অবস্থায়। বেআইনি হত্যা নিজে করেছেন, তাঁকেও হত্যা করা হয়েছে বেআইনিভাবে। যুদ্ধবন্দী হওয়া সত্ত্বেও হয়েছেন নৃশংস প্রতিহিংসার শিকার।
বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়ার সেই কালো দিনের এক বছর পূর্তি হলো ২০ অক্টোবর। এর তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘ডেথ অব এ ডিক্টেটর: ব্লাডি ভেনেগান্স ইন সির্তে’ তথা ‘এক স্বৈরশাসকের মৃত্যু: সির্তে শহরে রক্তপিপাসু প্রতিহিংসা’ নামের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গাদ্দাফির মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ থাকলেও মূলত মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও তাঁর পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের হত্যার অমানবিকতার বিষয়টিই এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এখানে ভয়ংকর সেই দিনের কথাই আপনাদের শোনাব।

ধুলার ঘূর্ণি থেকে মরুঝড়
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গাদ্দাফিবিরোধী প্রথম বিক্ষোভ দেখা যায়। মাত্র অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই অসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে বেনগাজি শহরে ঘাঁটি গেড়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনটিসি প্রতিষ্ঠা করে। ১৭ মার্চ সরকারি বাহিনী বেনগাজি ঘিরে ফেললে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ লিবিয়ার ওপর ‘উড়ালনিষিদ্ধ’ সিদ্ধান্ত পাস করে। তারা একই সঙ্গে দখলদার বাহিনী পাঠানো ছাড়া বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা (সামরিকও অন্তর্ভুক্ত) নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে। এই সিদ্ধান্তের ফলেই চালু হয় ‘অপারেশন ইউনিফায়েড প্রটেক্টর’ সম্মিলিত রক্ষা অভিযান। বিমান উড়াল নিষিদ্ধ হওয়ায় বেনগাজি দখলে ব্যর্থ হয় সরকার। ফ্রান্স, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে পশ্চিমা কয়েকটি সরকার বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয়। কাতার পরে স্বীকার করে, কয়েক হাজার কাতারি সৈন্যও গাদ্দাফির বিরুদ্ধে লড়াই করে।

বর্বরতার জবাবে বর্বরতা
বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ামাত্রই গাদ্দাফির অনুগত বাহিনীগুলো কঠোর হাতে দমনে নেমে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষী, পরদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের চেয়ে কোনো অংশে কম নৃশংস হয় না স্বদেশিদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধে গাদ্দাফি ছিলেন একা এবং তাঁর বিরুদ্ধে ন্যাটোসহ আরবের যুক্তরাষ্ট্রপন্থী রাষ্ট্রগুলো। উভয় পক্ষই মরিয়া হয়ে সংক্ষিপ্ততম সময়ে জয়ের জন্য চরম নৃংশস পদ্ধতি অবলম্বন করে। সরকারি বাহিনী হাজারো লোককে আটক করে। তাদের অনেকে বন্দী অবস্থায় নিহত ও নির্যাতিত হয়। বেসামরিক এলাকায় মর্টার হামলা, বোমাবর্ষণ ও গ্র্যাড রকেট নিক্ষিপ্ত হয়। ত্রিপোলির পতনের ঠিক আগে আগেই কমপক্ষে ৪৫ জনকে হত্যা করে। ২০টির মতো গণধর্ষণের ঘটনাও জানা যায়। এসবই ছিল যুদ্ধের আইনের লঙ্ঘন। বিদ্রোহীরাও কাউকেই ছাড় দেয়নি। অজস্র বিচারবহির্ভূত হত্যা, বন্দী অবস্থায় নির্যাতন, ধর্ষণ, গাদ্দাফির অনুগত শহরে নির্বিচার হামলা চলে। সাব-সাহারান আফ্রিকার অভিবাসী শ্রমিকদের ওপরও লাগামছাড়া আক্রমণ হয়।
এইচআরসি গৃহযুদ্ধকালীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিবিড় বিবরণটি তুলে ধরে মিসরাতা শহরের ব্যাপারে। গাদ্দাফি বাহিনী প্রায় দুই মাস শহরটি অবরোধ করে ছিল। এ দুই মাসে নিয়মিতভাবে তারা শহরটিতে বোমাবর্ষণ করে গেছে। মিসরাতার বিদ্রোহীদের এ জন্য গাদ্দাফির প্রতি বিশেষ প্রতিহিংসা তৈরি হয়েছিল। আবার মিসরাতা দখলে রাখা বিদ্রোহীরা শহরটি ধরে রাখায় সাফল্যের পরপরই ৩০ হাজার মানুষকে ঘরবাড়িতে ফিরতে বাধা দেয়। এদের অনেককেই আটক করে নির্যাতন কিংবা হত্যা করা হয়। পরিণামে মিসরাতার এই বেয়াড়া বাহিনীর ঠিক মাঝখানে গিয়ে পড়েন গাদ্দাফি ও তাঁর গাড়িবহর। গাদ্দাফিকে মর্মান্তিক মৃত্যু ও অবমাননার জন্য মিসরাতার বিদ্রোহীদেরই দায়ী করা হয়।

জন্মশহরই ধ্বংসশহর
বেনগাজি ছাড়াও বিদ্রোহীদের বড় ঘাঁটি ছিল গাদ্দাফির আপন শহর মিসরাতা। রাজধানী ত্রিপোলি হাতছাড়া হওয়ার পর গাদ্দাফি তাঁর ঘনিষ্ঠজন এবং দুই ছেলেসহ পরিবারের লোকদের নিয়ে এ শহরের দিকেই পালিয়ে আসেন। ঠিক এভাবেই ইরাকের পতিত শাসক সাদ্দাম হোসেন বাগদাদ থেকে পালিয়ে জন্মস্থান তিকরিতে এসে আত্মগোপন করেন এবং ধরা পড়েন। এফবিআইয়ের জেরা থেকে সাদ্দামের শেষ দিনগুলো সম্পর্কে জানা গেলেও গাদ্দাফির সেই ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য ঘটেনি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জন্যও গাদ্দাফির শেষ দিনগুলোর চিত্র হাজির করা তাই কঠিন ছিল। প্রথমত, তাঁর সঙ্গীদের বেশির ভাগই বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া গাদ্দাফির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি পিপলস গার্ড বাহিনীর প্রধান মনসুর ধাও একজন সাক্ষী। গাদ্দাফির মৃত্যুর দুদিন পরে নিউইয়র্ক টাইমস ও এইচআরসি মিসরাতার এক জেলে তাঁকে পায় এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেয়। তবে ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা অন্য জীবিত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও ধাওয়ের বিবরণের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
বিদ্রোহীদের হাতে ত্রিপোলির পতন হয় ২৮ আগস্ট। তখন কয়েকটি গাড়িবহরে বিভক্ত হয়ে গাদ্দাফি ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। পরদিনই এ রকমই এক গাড়িবহরে থাকা অবস্থায় গাদ্দাফির পুত্র খামিস গাদ্দাফি, তিনি ছিলেন এলিট খামিস ব্রিগেডের অধিনায়ক—ন্যাটোর বিমান হামলায় নিহত হন। আরেক পুত্র সাইফ আল ইসলামের গাড়িবহরেও একইভাবে বিমান হামলা হলেও আহত অবস্থায় তিনি পালাতে পারেন। পরে লিবিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে তিনি বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়েন। তৃতীয় পুত্র মুতাসিম পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা রক্ষার দায়িত্বে সির্তে শহরেই অবস্থান করছিলেন।

গাদ্দাফির শেষযাত্রা
গাদ্দাফি সির্তের দিকেই রওনা হন। সেখানে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন মনসুর ধাওসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সামরিক প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মুতাসিম বাবার সঙ্গে একত্রে না থাকলেও নিয়মিতভাবে এসে দেখা করতেন। গাদ্দাফির অবস্থান ছিল শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি ভবনে। কিন্তু সেখানে নিয়মিতভাবে আক্রমণ ও বোমা হামলা হতে থাকায় অনবরত তাঁদের আশ্রয় বদলাতে হয় এই ভবন থেকে সেই ভবনে। এদিকে বিদ্রোহীদের ঘেরাও ক্রমে কাছে চলে আসছিল। এই বেপরোয়া পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন ধাও এভাবে:
‘বেশির ভাগ সময় গাদ্দাফি কোরআন পাঠ আর নামাজ পড়ে কাটাতেন। দুনিয়ার সঙ্গে তাঁর সব যোগাযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। খাবার নেই, পানি নেই, ওষুধ নেই। বিভিন্নজনকে ফোন করে আল-রাই, রাশিয়া টুডে, বিবিসি অথবা ফ্রান্স ২৪-এর সংবাদ শুনে নিতাম। কারোরই কোনো কাজ ছিল না। ঘুমাতাম আর জেগে থাকতাম।’
চার-পাঁচ দিন পরপর তাঁরা জায়গা বদলাতেন। ‘ফাঁকা জনহীন বাড়িতে থাকতাম। কোনো এলাকা ফাঁকা হয়ে গেলেই সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। এক বা দুটি গাড়িতে করে দফায় দফায় লোক আনা-নেওয়া করা হতো। প্রায়ই আমাদের থাকার জায়গায় হামলা হতো।...গাদ্দাফি দিনকে দিন রগচটা হতে থাকলেন। মূলত বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারা তাঁকে ক্ষিপ্ত করে তুলত।’

অন্তিম সময়ে আত্মীয়-বন্ধু-পরিজন
সির্তে শহরের দ্বিতীয় অংশে সে সময় বেশ কিছু বেসামরিক মানুষও ছিল। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে চায়নি। অনেকে গাদ্দাফির প্রতি অনুগত। আহত অনেককেও হাসপাতাল থেকে সরিয়ে সেখানে রাখা হয়েছিল। অল্প কয়েকজন নারী ও শিশুও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। বাইরে তুমুল লড়াই চলছে। ভুতুড়ে ভবনগুলোয় লুকিয়ে প্রাণ বাঁচাতে চাওয়া মানুষগুলো তখনো জানে না, কী ঘটবে একটু পর। একটু পর গাদ্দাফি প্রায় সশস্ত্র গাড়িবহর নিয়ে বের হবেন নিয়তির রাজপথের শেষ মঞ্জিলের উদ্দেশে। সকালে আহত, নিহত ও জীবিত ব্যক্তিদের সংখ্যা গুনে জানা যাবে,
সেখানে ছিল আড়াই শ জন, যাদের এক শ জনই নিহত হবে।
২০ অক্টোবর রাত এল গোলাবর্ষণের মধ্যেই। মুতাসিম ভাবছেন, দলবল নিয়ে অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে যাবেন ভোরের দিকে। ওদিকে বিদ্রোহী মিলিশিয়ারাও হামলার জন্য প্রস্তুত। ন্যাটোর স্যাটেলাইটও ইগলচক্ষু মেলে রেখেছে গাদ্দাফির অবস্থানের দিকে। ভূমধ্যসাগরের কিনারে তখন ওত পেতে আছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। প্রস্তুত আছে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান টর্নেডো, মার্কিন ড্রোন প্রিডেটর এবং ফরাসি রাফালে জেট। গাদ্দাফির কনিষ্ঠ পুত্র মুতাসিম এ সময়টাকেই পিতাকে নিয়ে ব্যূহ ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার এবং বাঁচার ক্ষণ হিসেবে বেছে নিলেন।

 

লিবিয়া-২

‘তোমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি বাবা’

নিয়তির সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলো নেই জেনেও আশা ছাড়েননি গাদ্দাফি। বড় ছেলে আহত ও পলাতক, মেজো ছেলে ন্যাটোর বিমান হামলায় নিহত, ছোট ছেলে মুতাসিম কেবল বাবার সঙ্গী। ত্রিপোলি থেকে বিভিন্ন পথে সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিরা অক্টোবরের মাঝামাঝি সির্তে শহরে জড়ো হন। ইতিমধ্যে মুতাসিমকে পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সির্তে শহর ঘিরে কৌশলগত পরিকল্পনা থাকাই স্বাভাবিক। হয়তো এখান থেকে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু একদিকে সমস্ত যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া, অন্যদিকে ন্যাটোর বিমান অবরোধ ও হামলার কারণে প্রতিরোধ ক্রমশ আশাহীন হয়ে আসছিল। এ অবস্থায় ১৯-২০ অক্টোবর ভোররাত সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে গাড়িবহর নিয়ে সির্তে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল। কিন্তু আহত আর বেসামরিক লোকজনদের গাড়িতে তোলার বন্দোবস্ত করতেই সকাল আটটা হয়ে গেল। রাতভর গোলাবর্ষণ চলেছে। ভোরের দিকে মিলিশিয়ারাও ফিরে এসেছে যুদ্ধ অবস্থানে। তাদের ব্যূহ ভেদ করা ছাড়া উপায়ই বা কী?

পথের খোঁজে
সকাল আটটায় রওনা হলো ৫০টি গাড়ির বহর। কিছু গাড়িতে মেশিনগান ও বিমানবিধ্বংসী বন্দুক বসানো। মিলিশিয়ারা জানত যে একটা বহর আসছে। কিন্তু তারা জানত না, গাদ্দাফি ও তাঁর ছেলের এই গাড়িবহরই ছিল সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ টার্গেট। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন আর ফ্রান্সের যুদ্ধবিমান পাক খাচ্ছে আকাশে, মাটিতে মিলিশিয়ারা তক্কে তক্কে আছে। এরই মধ্যে সন্তর্পণে বহরটি পশ্চিমে সমুদ্রের দিকে চলল। শিগগিরই মিলিশিয়ারা হামলা শুরু করল। সেটা সামলে বাঁক নিয়ে চলল শহরের দক্ষিণ দিকে। কিন্তু খোলা রাস্তায় পড়ামাত্রই আকাশ থেকে একটা মিসাইল গাদ্দাফির সামনের গাড়িকে বিধ্বস্ত করে দিল। যুদ্ধবিমান আর ড্রোন থেকে বাঁচতে গলিপথে ঢুকল বহর। তাঁদের জানা ছিল না, নাক বরাবর রাস্তার ওপর বিদ্রোহীদের ঘাঁটি। তখন আর থামার বা পিছু হটার উপায়ও ছিল না। ততক্ষণে মরুসিংহ ফাঁদে আটকে গেছেন। ব্যারিকেড ভেঙে বেরিয়ে যাওয়াই তখন একমাত্র কাজ। সেই ঘাঁটির কমান্ডার খালিদ আহমেদ রিয়াদ বলছেন, ‘গাড়িবহর সোজা আমাদের ব্রিগেড ভবনের দিকে এসে রকেটচালিত গ্রেনেড ছুড়ল। আমরাও গোলাগুলি শুরু করলাম। ওরা চেয়েছিল আমাদের ভেতর দিয়ে পথ তৈরি করে নিতে...।’
বহরের যোদ্ধারা তখন মিলিশিয়াদের সঙ্গে লড়ছেন, সেই ফাঁকে ন্যাটোর বিমানগুলো সহজেই ৫০০ পাউন্ডের দুটি শক্তিশালী বোমা ফেলতে পারল। আরোহীদের বেশির ভাগই সেখানেই মারা গেল। পরদিন, ২১ অক্টোবর এইচআরসি সেখানে ৫৩টি লাশ পায়, ২৮ জনের দেহ চেনার উপায় ছিল না। সেই ঘটনায় মোট ১০৩ জনেরও বেশি নিহত হয়।

নিরুপায় চেষ্টা
হামলার পর যারা যেভাবে পারল আশপাশের ভবনে আশ্রয় নিল। গাদ্দাফি তাঁর ঘনিষ্ঠ চক্রসহ পাশের একটা ভিলায় ঢুকে পড়লেন। এদিকে মিলিশিয়াদের গোলাবর্ষণের তোড়, ওদিকে আকাশ থেকে বিমান হামলা। লিবিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউনিস আবু বকর ইউনিস ও তাঁর ছেলেও সেখানে ছিলেন। অজ্ঞাতনামা সেই ছেলে এইচআরসিকে জানায়: ‘দেখলাম, মুতাসিম আহত। তাঁর গাড়িটাই ছিল বহরের একদম সামনে। গাদ্দাফিকে পেলাম ভিলার প্রহরীকক্ষের ভেতরে। গায়ে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, মাথায় হেলমেট। পকেটে একটা হ্যান্ডগান আর হাতে অটোমেটিক অস্ত্র। মনসুর ধাও এসে বাবাকে আর মুয়াম্মারকে আরেকটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সবগুলো গাড়িই বিধ্বস্ত। ভিলার ভেতরেও বোমার আক্রমণে টেকা যাচ্ছিল না। সেখানে বিস্তর সিমেন্টের কাঠামো থাকায় তার আড়ালে পরিবার-পরিজন ও রক্ষীরা মিলে আশ্রয় নিলাম।’

‘তোমাকে বের করার চেষ্টা করছি, বাবা’
মুতাসিমই হাল ধরলেন। ৮ থেকে ১২ জন যোদ্ধা নিয়ে বের হওয়ার পথ তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। যাওয়ার আগে বাবাকে বললেন, ‘আমি তোমাকে এখান থেকে বের করে বাঁচাবার চেষ্টা করছি।’ ওখান থেকে বেরিয়ে তাঁরা সড়কের তলা দিয়ে যাওয়া চওড়া পাইপের দিকে দৌড়ে গেলেন। খোলা মাঠের মধ্য দিয়ে গাদ্দাফিসহ ১০-১২ জন হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছালেন। পাইপের অপর প্রান্ত দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মিলিশিয়ারা তাঁদের দেখতে পায়। মিলিশিয়ারাও দৌড়ে গাদ্দাফিদের লুকিয়ে থাকা পাইপের ওপরের রাস্তায় চলে আসে। ইউনিস আবু বকর ইউনিসের জবানিতে: ‘দেখামাত্রই গাদ্দাফির দেহরক্ষীরা তাদের দিকে কয়েকটি গ্রেনেড ছোড়ে। কিন্তু তৃতীয় গ্রেনেডটি দেয়ালে বাড়ি খেয়ে আমাদের দিকেই পড়ল। একজন রক্ষী সেটা হাতে নিয়ে আবার ছোড়ার চেষ্টা করতে না-করতেই বিস্ফোরিত হলো। বাবা আহত হলেন, গাদ্দাফির গায়েও গ্রেনেডের শার্পনেল বিঁধল। দেখলাম, রক্ষীটি মারা গেছে, বাবার শরীর নিস্তব্ধ, গাদ্দাফির গা থেকে রক্ত ঝরছে, মনসুর ধাও-ও মাটিতে পড়ে আছেন!’

আহত ও বন্দী
মিলিশিয়ারা লাফিয়ে নামল সেখানে। তাদের ধারণাই ছিল না যে গাদ্দাফিকে তারা হাতে পেয়ে যাবে। তাদের উদ্যত বন্দুকের সামনে গাদ্দাফি কেবল বলতে পেরেছিলেন, ‘গুলি কোরো না, গুলি কোরো না।’ আনাড়ি হাতের তিন মিনিট ৩৮ সেকেন্ড দীর্ঘ একটি ভিডিওচিত্রের বরাত দিয়ে এইচআরসি বলছে, ‘আটক হওয়ামাত্রই তারা গাদ্দাফিকে মারধর করা শুরু করল। আগেই তিনি মাথায় বোমার আঘাত পেয়েছিলেন। রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় একজন তাঁর পেছনটায় বেয়নেট চালাল। সেই ক্ষত থেকেও রক্ত ঝরা শুরু হলো। গাদ্দাফিকে ঘিরে ‘আল্লাহু আকবর’ আর ‘মিসরাতা’ বলতে বলতে মারছিল তারা। মারতেই থাকল। মিসরাতায় সেই বিদ্রোহী কমান্ডারের সাক্ষ্য:
‘গাদ্দাফিকে আটকের সময় অবস্থা ছিল চরম গোলমেলে। চারপাশে অনেক যোদ্ধা। আমি যখন তাঁকে দেখি, তখনো তিনি জীবিত ছিলেন। তার মানে, তাঁকে গুলি করা হয় আরও পরে। তাঁকে একটা পিকআপ ট্রাকে রাখা হলো, কিন্তু তিনি পড়ে গেলেন। যোদ্ধারা তাঁর চুল ধরে টানছিল, মারছিল। পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল।’
অবশেষে তারা গাদ্দাফিকে একটা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে রওনা হলো, পেছনে অজস্র গাড়ির বহর। ফোনে তোলা ভিডিওচিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রায় নগ্ন গাদ্দাফি একটা অ্যাম্বুলেন্সে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। এ থেকে বোঝা যায় যে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। দুই ঘণ্টা পরে অ্যাম্বুলেন্সটি মিসরাতায় পৌঁছায়। সেখানে তাঁর মৃতদেহ প্রকাশ্যে রাখা হয়। লিবীয় বিপ্লবের নেতা, একটা গোত্রীয় যাযাবর সমাজকে সমৃদ্ধ সেবামূলক দেশে পরিণত করার নায়ক, ৪২ বছরের একচেটিয়া শাসনের ক্ষমতা উপভোগকারী মুয়াম্মার গাদ্দাফি ইতিহাস হলেন। জীবনে অজস্র নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিতে দিতে নিজেও হয়ে গেলেন এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির প্রধান চরিত্র।

কার হত্যা কে করে?
ঠিক কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। বেনগাজির কিছু মিলিশিয়া কৃতিত্ব দাবি করে বলেছে, তাঁকে কোথায় নেওয়া হবে, তা নিয়ে মিসরাতার যোদ্ধাদের সঙ্গে বিবাদের একপর্যায়ে তারা গাদ্দাফিকে গুলি করে। কিন্তু এই দাবিও প্রমাণিত হয়নি। ঘটনার ধারা অনুসরণ করলে দেখা যায়, ন্যাটোর নামে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন আর ফ্রান্সের তিনটি বিমান থেকে প্রথম গাদ্দাফির বহরে বোমা হামলা চালানো হয়। সম্ভবত গাদ্দাফির অবস্থান তারা আগেভাগেই জেনে গিয়েছিল এবং সে অনুযায়ীই হামলার পরিকল্পনা এঁটেছিল। মুতাসিমের নেতৃত্বে বহরটি গেরিলাদের এড়িয়ে মূল সড়কে উঠে পড়ার সময়ই হামলাটি হয়। বিমান হামলা না হলে গাদ্দাফির বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর মিসরাতায় গণহত্যার শুরু এই হামলা থেকেই। ন্যাটো বিমানের দুটি মিসাইলেই গাড়িবহর ধ্বংস হয়। তারপর আসে মিলিশিয়ারা এবং তাদের হাতেই মুয়াম্মার গাদ্দাফি, মুতাসিম গাদ্দাফি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউনিস নিহত হন। বিনাবিচারে যুদ্ধবন্দী হত্যার দায় তাই ন্যাটো এবং তাদের দেওয়া অস্ত্রসজ্জিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মিলিশিয়ারা এড়াতে পারে না। লিবিয়ার মরুভূমির অজ্ঞাত কোনো স্থানে গোপনে এই তিনজনের কবর দেওয়া হয়। গাদ্দাফির অনুগতরা কবরগুলোকে প্রতিরোধের প্রেরণা হিসেবে যাতে নিতে না পারে, তা ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা।
এই লিবিয়ার মরুভূমিতেই ১৯১১ সালে আরেকটি যুদ্ধের শুরু হয়েছিল। আগ্রাসী ইতালি বাহিনী লিবিয়া দখল করে নিলে মক্তবের শিক্ষক ওমর আল মুখতারের নেতৃত্বে ২২ বছরব্যাপী স্বাধীনতাযুদ্ধ চলে। অবশেষে ১৯৩৪ সালে মুখতার যুদ্ধরত অবস্থায় আটক হন। দখলদারেরা তিন দিনের মাথায় বন্দীদের শ্রমশিবিরে অনুসারীদের সামনে তাঁকে ফাঁসি দেয়। ইতিহাসের কী মর্মান্তিক মিল, মুখতার আর গাদ্দাফি বিনাবিচারে নিহত হন; মৃত্যুর সময় উভয়েরই বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

লিবিয়া-৩

গাদ্দাফির অন্তিম প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?

মুয়াম্মার গাদ্দাফি বিদ্রোহীদের হাতে আটক হয়ে নিহত হওয়ার এক বছর পূর্তি হলো ২০ অক্টোবর। এর তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘ডেথ অব এ ডিক্টেটর: ব্লাডি ভেনেগান্স ইন সির্তে’ নামের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এখানে তারই আলোকে গাদ্দাফির অন্তিম মুহূর্ত এবং লিবিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়েই এই প্রতিবেদন।

মৃত্যুর আগের মুহূর্তে গাদ্দাফি বলে উঠেছিলেন, ‘ডোন্ট শ্যুট, ডোন্ট শ্যুট’। তখন তিনি নিরস্ত্র, আহত ও বন্দী। যুদ্ধবন্দী হত্যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। কিন্তু ন্যাটো-সমর্থিত বিদ্রোহীদের জবাবদিহি চাইবার কেউ ছিলনা। খোদ ন্যাটোই যেখানে আহত ও বেসামরিক নাগরিক বহনকারী গাড়িবহরে হামলা করেছে, সেখানে বিদ্রোহীরা তাদের দোসর হয়ে গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তারা তখন হত্যার লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
লিবিয়ায় ক্ষমতা পরিবর্তনকালে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে এইচআরসির প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয় ইরাক দখল-পরবর্তী পরিস্থিতির কথা; আফগানিস্তান, বসনিয়া, কসোভো, সোমালিয়াসহ এ রকম অজস্র দেশের গণহত্যার কথা। সবখানেই মানবাধিকার, শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর তত্ত্বাবধানে যুদ্ধ হয়েছে। সেসব যুদ্ধের বলি হয়েছে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। পরাজিত পক্ষের মানবাধিকারের কথা এসব শান্তিবাদী ভাবেননি। মৃত্যুর আগে আরেকটি কথা গাদ্দাফি বলেছিলেন, কথাটি ভোলা কঠিন। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা কি সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করতে পারো?’

মুতাসিম গাদ্দাফির অন্তিম সময়
মুয়াম্মার গাদ্দাফির কনিষ্ঠ পুত্র মুতাসিম গাদ্দাফির হত্যাকাণ্ড এই দ্বিচারিতারই আরেক নজির। তাঁকে বাঁচানোর যথেষ্ট সময় পাওয়া গেলেও কোনো সাড়াশব্দ করেনি ন্যাটোর মদদপুষ্ট লিবিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনটিসি। ‘বাবা, তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি’ বলে দলবল নিয়ে লড়াইয়ে যাওয়ার পর পিতা-পুত্রের আর দেখা হয়নি। সির্তের গাদ্দাফিপন্থী যোদ্ধাদের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। বিদ্রোহীদের সশস্ত্র ঘেরাও ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টার সময় তিনিও বাবার মতো আটক হন। ফোনে ধারণকৃত কয়েকটি ভিডিওতে তাঁর অন্তিম মুহূর্তের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। বন্দী হওয়ার কিছুক্ষণ পরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পিকআপ ট্রাকে হেলান দিয়ে বসে আছেন। বিমূঢ় ও আহত। বুকের ডান দিকটা রক্তাক্ত। উঠে দাঁড়িয়ে টলমল পায়ে হাঁটতেও দেখা গেল। তাঁকে ঘিরে আছে এক দঙ্গল বন্দুকধারী।
দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখা গেল সাদা পিকআপে হেলান দিয়ে আছেন, চোখ বন্ধ, শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। তৃতীয় ভিডিওতে তিনি একটা ঘরের ভেতর, বিছানায় শোয়া। বুকের ক্ষত দেখিয়ে বলছেন, ‘এগুলো আমার পদক।’ গালিগালাজের জবাবে বললেন, ‘বাচ্চাদের মতো আচরণ করা বন্ধ করো!’ এক বন্দুকধারী পাল্টা বলে, ‘সে চায় ভিডিওতে তাকে বীরের মতো দেখাক, চায় মানুষ বলুক মৃত্যুর মুখেও কত নির্ভীক ছিল সে।’ এর কিছুক্ষণ পরই গাদ্দাফি পরিবারের শেষ পুরুষ মুতাসিম গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়। বড় ছেলে সাইফ আগেই বন্দী অবস্থায়নিহত হন।

মাহারি হোটেলের গণহত্যা
সির্তে শহরে ন্যাটোর বিমান হামলা আর স্থানীয় মিলিশিয়াদের হাত থেকে যাঁরা বেঁচে যান, তাঁদের আনা হয় পাশেরই মাহারি হোটেলে। পরের দৃশ্য: সমুদ্রের দিকে মুখ করা সেই হোটেলের সবুজ চত্বরে ছড়ানো-ছিটানো লাশের স্তূপ। অনেকেরই হাত বাঁধা, অনেকেরই নিথর চোখ খোলা সমুদ্রের দিকে মেলে ধরা। গত বছরের অক্টোবর মাসের ২০ তারিখে গাদ্দাফি নিহত হওয়ার পরের কয়েক দিন যেখানেই তাঁর জন্মশহর সির্তের মানুষদের পাওয়া গেছে, কিংবা আটক হয়েছে গাদ্দাফির গাদ্দাফা গোত্রের কেউ—সবাই নির্বিচারে হত্যার শিকার হয়েছে। গাদ্দাফির শেষ যুদ্ধের জায়গায় পাওয়া গিয়েছিল ১০০ জনের লাশ, মাহারি হোটেলে মিলল ৫৩ জনের দেহ। বাকি আরও ১০০ জনের কতজন বেঁচে ছিলেন আর কতজন নিহত, তার হিসাব নেই। পাশের পানি সরবরাহকেন্দ্রেও অনেক লাশ পড়ে থাকে।

গাদ্দাফির অষ্টম আশ্চর্যের পাশেই মৃত্যু
ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস। গাদ্দাফির যে অবদান অবিস্মরণীয় তা হলো, পৃথিবীর বৃহত্তম বিশুদ্ধ পানি সরবরাহব্যবস্থা নির্মাণ করে নব্বই ভাগ মরুময় দেশে পানির অভাব দূর করা। পৃথিবীর বৃহত্তম খনিজ পানির আধার নুবিয়ান ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে মরুভূমির ভেতর দিয়ে হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ পাইপ টেনে দেশবাসীর জলকষ্ট দূর করেছিলেন তিনি। সাহারা মরুতে নদী থাকার কথা নয়, গাদ্দাফির মহা মানব-নির্মিত নদীব্যবস্থা (গ্রেট ম্যান মেড রিভার সিস্টেম) হলো সেই কৃত্রিম নদী। এটা ছিল বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য। অথচ তাঁর মৃত্যু হয় সেই পানি সরবরাহব্যবস্থার একটি কেন্দ্রেরই পাশে। লিবিয়ায় শান্তি কায়েমের অভিযানে সেই পানি সরবরাহব্যবস্থাকেও বোমা মেরে বিপর্যস্ত করে দেওয়া হয়।
২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই পানি সরবরাহব্যবস্থার জন্য গাদ্দাফিকে একটি পয়সাও আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ করতে হয়নি। মরুভূমির অনেক গভীরে চার হাজার মাইল দীর্ঘ এলাকাজুড়ে এই অ্যাকইফায়ার বা পাতাল জলাধারে পানির পরিমাণ ২০০ বছর ধরে নীল নদ দিয়ে প্রবাহিত পানির থেকেও বেশি। খনিজ পানি হওয়ায় এর মূল্য সাধারণ পানির থেকে বেশি। তেলের যুদ্ধের পাশাপাশি লিবিয়া হলো পানির যুদ্ধেরও শিকার। এখন এই পানির নিয়ন্ত্রণ পেতে যাচ্ছে ফ্রান্সের ভিওলিয়া (সাবেক ভিভেন্দি) কোম্পানি। এরাই গোটা দুনিয়ার পানি-বাণিজ্যের ৪০ শতাংশের মালিক। এবং এই ফ্রান্সের রাফালে বিমান থেকেই গাদ্দাফির বহরে বোমা হামলা হয়। সঙ্গে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রিডেটর ড্রোন এবং ব্রিটেনের টর্নেডো বিমান তাঁর অবস্থান চিহ্নিত করে।

সবই শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরে গাদ্দাফি হত্যা হয়ে এ পর্যন্ত লিবিয়ায় যা কিছু হয়েছে সবই হয়েছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে। মানবিক হস্তক্ষেপের (হিউম্যানেটারিয়ান ইন্টারভেনশন) রুপালি ঝালর উড়িয়েই পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মাধ্যমে সামরিক অভিযান, জাতিসংঘের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ, পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে লিবিয়ার সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং সৌদি আরব, কাতার প্রভৃতি রাষ্ট্রের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসজ্জিত করা হয়। আরব গণজাগরণের প্রেরণাও ব্যবহূত হয় বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার জন্য।
দিনের শেষে দেখা গেল, আরব বসন্ত লিবিয় মরুঝড়ে বুমেরাং হয়ে লিবীয়দের গণহত্যা ও অশেষ দুর্ভাগ্য বয়ে আনল। পশ্চিমা অস্ত্রসজ্জিত জিহাদি আল-কায়েদা, গাদ্দাফিবিরোধী মিলিশিয়া এবং হরেক রকমের বন্দুকধারীদের অবাধ রাজত্ব কায়েম হলো লিবিয়ায়। যত্রতত্র প্রাইভেট নির্যাতনখানা, অজস্র নারী ধর্ষিত। বধ্যভূমি আর বোমা-বারুদে অনেক প্রাণ গেল। উত্তর আফ্রিকার মধ্যে জীবনমান ও সম্পদে এগিয়ে থাকা রাষ্ট্রটি পরিণত হলো মগের মুল্লুকে। লিবিয়ার তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলো এবং বিশ্বের বিস্ময় গ্রেট ম্যান মেড রিভার সিস্টেমও তছনছ হলো। এই ক্ষতি পূরণ করতে অনেক দশক চলে যাবে, তাও যদি লিবিয়ায় স্বাধীন দেশপ্রেমিক সরকার প্রতিষ্ঠিত থাকে। কিন্তু লক্ষ প্রাণের অপচয় কি আর ফেরানো যাবে? কে দায় নেবে এই গণহত্যার? হিউম্যান রাইটস ওয়াচ লিবিয়ার সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার তদন্ত করার দায় বর্তিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি যাদের সৃষ্টি, গাদ্দাফির হত্যাকাণ্ডে যারা সরাসরি জড়িত, তাদের বিচার হবে কোন আদালতে?
গাদ্দাফি অগণতান্ত্রিক শাসক ছিলেন, তাঁর কৃতকর্মের অনেক কিছুই মানবতার লঙ্ঘন করেই ঘটেছে। আবার তিনি যেখানে শেষ করেছিলেন, সেই লিবিয়া ছিল সমৃদ্ধ দেশ। এবং তিনি মোটেই ধর্মপন্থী শাসক ছিলেন না, যেমন ছিলেন না ইরাকের সাদ্দাম হোসেনও। কিন্তু উভয়ের বিলয়ের পর উভয় দেশই সাম্প্রদায়িক আর ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের খপ্পরে পতিত হয়েছে। হয়তো সিরিয়া ও লেবাননের জন্যও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে। শেষ বিচারে মানবিকতার জন্য যুদ্ধ যেমন প্রতারণা, তেমনি দেশপ্রেমিক স্বৈরশাসনও বিপদের কারণ। সাদ্দাম ও গাদ্দাফি যতই দেশপ্রেমিক হোন, অগণতান্ত্রিক শাসক যে সার্বভৌমত্ব বাঁচাতে পারেন না; জীবন দিয়ে তাঁরা সেই শিক্ষাই দিয়ে গেলেন।
লিবিয়া এখন রাষ্ট্রীয় হত্যাপুরী। এই মুহূর্তে গাদ্দাফিপন্থী শেষ মুক্ত শহর বানি ওয়ালিদের ওপর চতুর্দিক থেকে হামলা চলছে। গাদ্দাফির পক্ষ নেওয়ার জন্য গণশাস্তি পাচ্ছে সমগ্র শহরবাসী। অথচ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গাদ্দাফির দুরাচার নিয়ে যতটা সোচ্চার, পশ্চিমা-সমর্থিত এনটিসির হত্যাযজ্ঞ নিয়ে ততটাই নীরব। তারা আফগানিস্তানের তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, আবার তালেবানদের কাতারে অফিস খুলতে দিয়ে যুদ্ধখেলার আলোচনা করে। একদিকে চলছে আল-কায়েদা ধ্বংসের কার্যকলাপ, অন্যদিকে সিরিয়া ও লিবিয়ায় আল-কায়েদা দিয়ে অস্থিতিশীলতা জারি রাখার কায়কারবার। এ অবস্থায় শান্তির ডাকনাম হয়েছে যুদ্ধ, গণতন্ত্রের জন্য দরকার হচ্ছে আগ্রাসন আর মানবাধিকারের নামে মানবের প্রাণ ও সভ্যতার অবাধ ধ্বংস। গাদ্দাফির অন্তিম প্রশ্নটির উত্তর তাই খুঁজতে হচ্ছে আমাদের, ‘তোমরা কি সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করতে পারো?’ (সমাপ্ত)
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com


 

 

শনিবার, ১২ নভেম্বর, ২০১১

মরুভূমির সেই বেদুঈন, যিনি গল্পও লিখতেন
প্রমিত হোসেন

মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি যেদিন নিহত হলেন, সেদিন পৃথিবী হারাল এক নিভৃতচারী গল্পকারকেও। এই লেখককে নিয়ে কখনও হয়নি কোনও মাতামাতি, উল্লেখযোগ্য আলোচনা, কিংবা প্রশংসাকীর্তন। তার নিজেরও এসবে আগ্রহ ছিল কম। শুধু নিজের মতো লিখে গেছেন মরুভূমির তাঁবুর নিচে। যেন এক নিঃসঙ্গ কবি। যেন মরুভূমির বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি ছিল তার লেখার খাতা। তার সঙ্গে কথা বলত রুক্ষ পাহাড়, ইস্পাতনীল দিগন্ত, রক্তিম চাঁদ আর দূরবর্তী নক্ষত্র। তার বক্ষপিঞ্জরে স্পন্দিত হত প্রকৃতিবাদী বেদুঈনের হƒদয়।

গাদ্দাফির মৃত্যু এক লেখকের মর্মান্তিক মৃত্যু। তার লেখায় পাইÑ‘পৃথিবীকে হত্যা কোরো না, তোমাদের জীবনকে হত্যা কোরো না। পৃথিবী হচ্ছে পানি ও সঞ্জীবনী। দালানকোঠায় ঢাকা মৃত ভূমি দিতে পারে না এই পানি ও সঞ্জীবনী। মৃত পৃথিবীতে নেই প্রাণের কোনও স্পন্দন।’
ুয়াম্মার আল গাদ্দাফি সম্পর্কে যাদের প্রশ্ন আছে, তারা সেসব প্রশ্নের কিছু উত্তর খুঁজে পাবেন তার লেখকসত্তায়, বিশেষ করে তার লেখা ছোটগল্পের মধ্যে। গাদ্দাফির ‘দি গ্রিন বুক’ সম্পর্কে কম-বেশি অনেকেই জানেন। মূল আরবি ভাষায় দি গ্রিন বুক প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। বইটিতে প্রতিফলিত হয়েছে গাদ্দাফির রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তাধারা। একদিকে তিনি কমিউনিস্টবিরোধী, অন্যদিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদেও আস্থাহীন। তার জন্য শ্রেয়তর আদর্শ ধার্মিকতা ও সমতা। এ কারণেই আল কুরআন ও হাদিস তার রাজনৈতিক ভাবনার মূল ভিত্তি। কিন্তু তা মৌলবাদ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সরাসরি জনগণ পরিচালনা করবে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দলাদলি থাকবে না, অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হবে না কেউÑ এমন রাষ্ট্রের পক্ষে তুলে ধরেছেন তার মতবাদ : ইসলামী সমাজতন্ত্র।

গাদ্দাফি ছিলেন আরব জাতীয়তাবাদী নেতা গামাল আবদ এন-নাসেরের একনিষ্ঠ অনুরাগী। এই জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করেছেন। মাথা নোয়াননি কখনওÑ সব হারিয়ে যখন তিনি একা, তখনও না। তার রাষ্ট্র সম্পর্কিত চিন্তার প্রয়োগে লিবিয়ায় বাস্তব রূপ নিয়েছিল জামাহিরিয়া। জনতার রাষ্ট্র। এটা ছিল পৃথিবীর অন্যসব রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই রাষ্ট্রের নেতা ছিলেন তিনিÑ প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী নন। তার ৪২ বছরের নেতৃত্বে গোত্রপ্রধান লিবিয়ার উন্নতি হয়েছে না অবনতি, জনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে না একনায়কতন্ত্র, তিনি জনতার নায়ক ছিলেন না স্বৈরশাসক Ñ এ লেখায় এসব আলোচ্য নয়। বরং ছোটগল্পের সূত্র ধরে লেখক গাদ্দাফির অন্তর্জগতে খানিকটা প্রবেশ করা যাক।

মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির জš§ এক মরু শহরে। রুক্ষ-কর্কশ বালুরাশি আর পাথরপ্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠেন তিনি নিজ গোত্রে। এমন পরিবেশেই ইমরুল কায়েস, জালালুদ্দীন রুমির মতো অনেক বড় কবির জš§ হয়েছে। বালু, পাথর আর রুক্ষ পাহাড় নি®প্রাণ দেখায় বটে। তার মধ্যেও আছে প্রাণের স্পন্দন। বেদুঈনের কাছে কিছুই প্রাণহীন নয়। এমন কি মৃত্যুও। ‘মৃত্যু’ শিরোনামে একটি গল্পই আছে তার। সেখানে আছেÑ ‘আমার অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রণা থেকে এ আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। মৃত্যু হল পুরুষ, আর সব সময় আক্রমণাত্মক, সে কখনই আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থাকে না, এমন কী পরাজয়েও। সে নিষ্ঠুর ও সাহসী, ধূর্ত ও ভীরু কখনও কখনও। মৃত্যু আক্রমণ করে এবং পরাস্ত হয়; পিঠ ফেরাতে বাধ্য হয় সময়ে সময়ে, লোকেরা যেমন ভাবে ঠিক সেই রকম বিজয়ী নয় সর্বদা।’ গাদ্দাফি বেদুঈন এবং মরুভূমির কবি। প্রাসাদ নয়, খোলা আকাশের নিচে তাঁবুতে বাস করতে ভালবাসতেন তিনি। তার গল্পে সহজ মানুষের সেই অনাড়ম্বর জীবনের হাতছানি। গাদ্দাফি লেখার জন্য ঠিক কী কারণে ছোটগল্পই বেছে নিয়েছিলেন, সেটা বোঝা যায় তার দর্শনের ছায়াপাত থেকে। সেখানে প্রকৃতির আরাধনা। কবিতা না লিখলেও তার গল্পে কবিতার উপস্থিতি স্বতঃস্ফুর্ত।

গাদ্দাফির গল্পসংকলন ১৯৯৬ সালে আরবি থেকে ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়। ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে লন্ডন থেকে। ইংরেজি সংস্করণের নাম ‘এস্কেপ টু হেল অ্যান্ড আদার স্টোরিজ।’ এই সংস্করণের দীর্ঘ অবতরণিকা লিখেছেন জে এফ কেনেডির সাবেক সহযোগী ও বিখ্যাত সাংবাদিক পিয়ের স্যালিঙ্গার। বইটিতে রয়েছে ১২টি গল্প ও চারটি প্রবন্ধ। প্রবন্ধ চারটি মূল আরবী সংস্করণে নেই। অনুবাদে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এ বইটির গল্পগুলোয় সন্ধান মেলে অন্য এক গাদ্দাফিরÑ সাধারণ, প্রকৃতিগত এক মানুষ। তাকে নিয়ে কারও প্রশ্ন থাকলে তার উত্তর পেতে এ বইটি হতে পারে বীজতলা।
এস্কেপ টু হেল অ্যান্ড আদার স্টোরিজের শুরুর গল্পগুলোয় রয়েছে বিরোধাভাস। শহর বনাম গ্রাম, মৃত্তিকা বনাম অলীকতা, যুক্তি বনাম সংস্কার, কাজ বনাম অলৌকিকতা, প্রগতি বনাম প্রাচীনধারা। বিকল্প বিবেচনায় আমরা দেখতে পাব লেখক তার পছন্দটি বেছে নিয়েছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এবং বহুকাল আগে। ‘দি সিটি’ গল্পে যে ভাবনা ফুটে উঠেছে, তার বর্ণনাকারী প্রৌঢ়ত্বেও বহন করেছেন সেই ভাবনাই। গাদ্দাফির কাছে পল্লীজীবন ও শহুরে জীবনের মধ্যে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। ‘দি সিটি’ গল্পে তিনি লিখেছেনÑ ‘নগর আমাদের সঙ্গে রয়েছে বহু যুগ অতীত থেকে, কিন্তু আজ এর শোচনীয় দুর্দশার কথা বিবেচনা করুন! নগর এক দুঃস্বপ্ন, আনন্দের বাহক নয় মোটেও, কেউ হয়তো ভাবতে পারে, অথবা এমনভাবেই তৈরি হয়ে থাকবে। নগর তৈরি করা হয়নি বিলাসিতা, সুখ অথবা আনন্দের জন্য। বাস্তবে নগর হচ্ছে রাস্তা ঝাড়-র জনতা, যার মধ্যে লোকেরা নিজেদের কোনও প্রয়োজনীয়তা দেখতে পায় না। লোকেরা আমোদ-ফুর্তির জন্য নগরে আসেনি, এসেছে জীবিকা ধারণ করতে। কেউ মত্ত লোভে, ফাঁদে, আর অবরুদ্ধ চাহিদায়ঃ কর্মসংস্থান একটা লোককে নগরে থাকতে বাধ্য করে।

নগর হচ্ছে সামাজিক সংযোগ ও সম্পর্কের কবরখানা। যেই এখানে পা রাখুক সে এর ঢেউয়ের ওপর দিয়ে সাঁতার কেটে যেতে বাধ্য হবে এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায়, এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লায়, এক কাজ থেকে আরেক কাজে এবং এক বন্ধু থেকে আরেক বন্ধুতে। নগরের প্রকৃতির কারণেই সেখানে আত্মপরতা আর সুযোগসন্ধান হয়ে দাঁড়ায় লোকের জীবনের উদ্দেশ্য, আর তার আচরণ ভণ্ডামিতে পর্যবসিত হয়।’

আরও লিখেছেনÑ ‘নগর-জীবন হলো কেঁচোর মতো একরকম জৈবিক অস্তিত্ব যেখানে অর্থহীনভাবে মানুষ বেঁচে থাকে ও মারা যায়ঃ কোনও স্বচ্ছ ধারণা বা অন্তর্দৃষ্টি ছাড়াই। উভয় ক্ষেত্রেই সে ভিতরে ভিতরে একটা কবর, তা সে জীবিতই হোক বা মৃত।’

এই বর্ণনার মধ্যেই গাদ্দাফির লেখকজীবনের দর্শন স্পষ্টরূপে প্রকাশিত। প্রকৃত সত্তা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইলে যেতে হবে প্রকৃতির কাছে। লেখকের দাবি পরিষ্কার। ‘দি ভিলেজ’ গল্পে এ প্রসঙ্গও এসেছেÑ ‘নগর পরিত্যাগ করে গ্রামে এসো। সেখানে তুমি জীবনে প্রথম দেখতে পাবে চাঁদ। কেঁচো আর ধেড়ে ইঁদুর থেকে বদলে যাবে তুমি, পরিণত হবে প্রকৃত মানুষে। নাগরিক কবরখানা ছেড়ে চলে এসো খোদার বিস্তীর্ণ ও বিস্ময়কর পৃথিবীতে।’

লিবিয়ায় বেদুঈনদের জীবন ঠিক আগের মতো যাযাবর নয়। তারা স্থির হয়েছে মরুদ্যানে অথবা শহরে অথবা পল্লীতে। কিন্তু গ্রাম বা শহর বসবাসের ভৌগোলিক স্থানই নয় শুধু। বেদুঈনের ভাবনায় সর্বদা তা রূপক। ‘দি সুইসাইড অফ দি অ্যাস্ট্রোনট’ গল্পের নায়ক মহাশূন্য থেকে মাটিতে নেমে আসে সেই মৃত্তিকালগ্ন সরল জীবনের খোঁজে। গাদ্দাফির ভাষায়Ñ ‘বস্তুত, সাদামাটা ব্যাপারটা হল এই যে পৃথিবীই একমাত্র পরিচিত ভূমি, অনন্য, জীবনের উৎস। জীবন মানে পানি ও খাদ্য; পৃথিবীই একমাত্র স্থান যে আমাদের এগুলোর জোগান দেয়। একমাত্র প্রকৃত প্রয়োজন হল রুটি, খেজুর, দুধ, মাংস ও পানি। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় একমাত্র বাতাস ঘিরে রেখেছে পৃথিবীকে। আর তাই নিঃসীম মহাশূন্যে তার রোমাঞ্চাভিযান থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসে মানুষটা।’
মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি আজ আর নেই। ঘাতকের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। যে শহরে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সেখানেই। তার মৃতদেহ কবর দেওয়া হয়েছে মরুভূমির কোনও অজ্ঞাত স্থানে। কিন্তু তার ভাবনাগুলো রয়ে গেছে। গাদ্দাফি স্বৈরশাসক না জননায়ক না সন্ত্রাসবাদী না দেশপ্রেমিক না মুক্তিদূত না তাঁবেদার না সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছিলেনÑ প্রশ্নশীল মন সেখান থেকেই খুঁজে নেবে সব উত্তর।

সোমবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১১

আহত গাদ্দাফিকে উন্মত্ত বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দেয় ন্যাটো!

নিষ্ঠুর ও বর্বর উল্লাসে ঘটেছিল গাদ্দাফি হত্যাকাণ্ড। সাবেক মহাক্রমশালী আরব-আফ্রিকান বাদশাহর সকরুণ মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে দিল ইসরাইলি গোয়েন্দারা। তাদের দাবি, গাদ্দাফি হত্যার নাটের গুরু ন্যাটো। তারা আহত গাদ্দাফিকে খুনের জন্য তুলে দেয় এনটিসির (ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল) সেনাদের হাতে। সেনারা গাদ্দাফিকে পেয়ে মাতে হত্যার উল্লাসে। তারপর খুনকাণ্ডের বাকি খবর সবারই জানা।
যুদ্ধবন্দি গাদ্দাফিকে হত্যা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-কানুনের বরখেলাপ এবং অমার্জনীয় যুদ্ধাপরাধ—এ নিয়ে সোচ্চার সারা দুনিয়া। ঠিক এ মুহূর্তে ইসরাইল গোয়েন্দাদের এ তথ্য উন্মোচন করল অত্যাধুনিক সুশিক্ষিত ন্যাটো বাহিনীর বর্বর চেহারা। গাদ্দাফি জমানার অবসানের পর লিবীয় বালু-মরুতে এখন বেজে উঠছে শোকের করুণ বিউগল। এই আরব সিংহ কখন বধ হচ্ছেন ন্যাটোর দুর্ধর্ষ শিকারিদের হাতে—কয়েক মাস ধরে সে উদ্বেগ-আশঙ্কায় ছিলেন যে মরুচারী বেদুইন গোষ্ঠী এখন তারা হতাশায় নিমজ্জিত। কী হবে লিবিয়ার ভবিষ্যত্! এরই মধ্যে লিবিয়ার তেল সম্পদ ও নির্মাণকাজের হিস্যা নিয়ে দখলবাজির লড়াইয়ে প্রস্তুত ইউরো-মার্কিন বহুজাতিক ব্যবসায়ী। তাদের হাতে কি গড়ে উঠবে নতুন আরব-উদ্যান, নাকি লুট হবে লিবিয়া—এ প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলছে ওয়াকিবহাল মহলকে।
রাজার হালে ছিলেন গাদ্দাফির প্রজারা!
আরব বসন্তের নবজাগরণে তিউনিসিয়া, মিসরের স্বৈরশাসকদের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন লৌহমানব মুয়াম্মার গাদ্দাফিও। দীর্ঘ ৪২ বছর তেলসমৃদ্ধ লিবিয়া শাসন শেষে বিদ্রোহী জনতার হাতে নির্মমভাবে প্রাণও দিয়েছেন তিনি। নিজ দেশের অধিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা, নিপীড়নের জন্য অনেকেরই নিন্দার মুখে পড়েছিলেন গাদ্দাফি। দীর্ঘদিনের শাসনামলে কখনই পশ্চিমা বিশ্বের আনুগত্য স্বীকার না করায় তার শাসনের অবসানকে অভিনন্দনই জানিয়েছে জাতিসংঘসহ গোটা পুঁজিবাদী বিশ্ব। কিন্তু এতকিছুর পরও গাদ্দাফি একজন শাসক হিসেবে তার দেশের অধিবাসীদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধার বন্দোবস্ত করেছিলেন, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।
নাগরিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে জনগণকে অনেক সহায়তা দেয়া হতো গাদ্দাফি সরকারের আমলে। বলা যায়, প্রায় রাজার হালেই ছিলেন গাদ্দাফির প্রজারা। আধুনিক সময়ের নগরজীবনের অন্যতম প্রধান চাহিদা বিদ্যুত্ আর লিবিয়ার জনগণ সে বিদ্যুত্ ব্যবহার করত পুরোপুরি বিনামূল্যে। সরকারনিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলো থেকে বিনাসুদে ঋণ দেয়া হতো নাগরিককে। তেলসমৃদ্ধ দেশটির তেল বিক্রি করে যে টাকা আয় হতো, তা সরাসরি পাঠিয়ে দেয়া হতো লিবিয়ার সব জনগণের ব্যাংক হিসাবে। গাড়ি কেনার সময় লিবিয়ার নাগরিককে গাড়ির মূল্যের অর্ধেক সরকার থেকে ভর্তুকি দেয়া হতো। তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ায় প্রতি লিটার পেট্রলের মূল্য ছিল মাত্র ০.১৪ ডলার। মাত্র ০.১৫ ডলারে পাওয়া যেত ৪০ স্লাইসের বড় রুটি।
গাদ্দাফি সরকারের ৫০ হাজার ডলার সহায়তা পৌঁছে যেত প্রতিটি নববিবাহিত দম্পতির কাছে, যেন তারা বাড়ি কিনে স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের নতুন জীবন শুরু করতে পারেন। সন্তান জন্ম দেয়ার পরও লিবীয় মায়েরা সরকারের কাছ থেকে পেতেন পাঁচ হাজার ডলার করে। পড়াশোনা বা চিকিত্সাসেবার জন্য কেউ বিদেশে গেলে তাকে মাসে ২ হাজার ৩০০ ডলার দেয়া হতো সরকারের তরফ থেকে।
গাদ্দাফি ক্ষমতায় আসার আগে লিবিয়ায় সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ২৫ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে সে সংখ্যাটা ৮৩ শতাংশে নিয়ে গিয়েছিলেন গাদ্দাফি। পুরোপুরি বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিত্সাসেবা পেত লিবিয়ার জনগণ। সেখানকার ২৫ শতাংশ মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে। পড়াশোনা শেষ করে কেউ যদি চাকরি না পেত, তাহলে বেকার থাকা অবস্থায় সরকারের কাছ থেকে ভাতাও পেত তারা।
কৃষিখাত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিশাল অবদান ছিল মুয়াম্মার গাদ্দাফির। কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে নিতে ইচ্ছুক লিবিয়ার জনগণকে জমি, খামারবাড়ি, বীজ ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেয়া হতো সরকারের পক্ষ থেকে—সবই বিনামূল্যে।
গাদ্দাফির লিবিয়ার কোনো বৈদেশিক ঋণ তো ছিলই না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল ১৫০ বিলিয়ন ডলার।
ইসরাইলের দাবি : ন্যাটো গাদ্দাফিকে আহত করে বিদ্রোহীদের হাতে খুনের জন্য তুলে দেয়
ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা ম্যাগাজিন দেবকা এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ন্যাটোর স্পেশাল ফোর্স সিরতে গাদ্দাফির অবস্থান নির্ণয় করে তাকে আটক করে। তারপর তার দু’পায়ে গুলি করে মিসরাতার একটি মিলিশিয়া দলকে গাদ্দাফির অবস্থান জানিয়ে সেখানে আসতে বলে। ন্যাটো অনুমান করেছিল মিসরাতার যোদ্ধাদের গাদ্দাফিকে হত্যা করার সম্ভবনা প্রবল। তাই তারা অন্য কোনো দলকে না জানিয়ে তাদেরকেই খবর দেয়। ন্যাটো চেয়েছিল স্বজাতির হাতেই মৃত্যু হোক গাদ্দাফির—এ দাবি করেছে দেবকা। গাদ্দাফির অনুগত বড় গোত্রগুলো যেমন গাদ্দাফা, ওয়ারফালা, আল ওয়াকির, মাগারিয়া এগুলো তার মৃত্যুর প্রতিশোধ না নিয়ে থামবে না। ফলে এ মৃত্যুতে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ লড়াই থামার কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই বলে ম্যাগাজিনটি মন্তব্য করেছে।
এ ঘটনায় স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশ করেছে যুদ্ধে অংশ নেয়া ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রধানরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘লিবিয়ার জনগণের এক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল আজ’। তিনি আরও বলেন, ‘সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছে’। লিবিয়ার যুদ্ধে ন্যাটো ও আরব দেশগুলোর সহযোগিতার সম্পর্ককে তিনি ‘একুশ শতকের একটি উদাহরণ’ বলে মন্তব্য করেন।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘লিবিয়ায় ব্রিটেন যে ভূমিকা পালন করেছে তাতে আমি গর্বিত। লিবিয়ার জনগণের সামনে এখন আরও বেশি সুযোগ এসেছে একটি শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের।’
বিদ্রোহীদের সংস্থা ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) প্রথমে গাদ্দাফিকে গ্রেফতার ও হত্যা করার বিষয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছিল, যা ন্যাটো বা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। পরে ন্যাটো জানিয়েছে, গাদ্দাফিকে বহনকারী গাড়িবহরে পরিচালিত তাদের আকাশ হামলায় গাদ্দাফি আহত হন এবং বিদ্রোহী যোদ্ধারা তখন তাকে জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার করে। প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে গাদ্দাফিকে জীবিত অবস্থায় কথা বলতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পর দেখা যায় বিদ্রোহীরা রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে সড়কের ওপর টানাহেঁচড়া করছে। স্পষ্টত তখন তার বুকের বাঁদিক থেকে রক্ত ঝরছিল। এ সময় তার শরীর থেকে কাপড় খুলে ফেলা হয়।
শুরুতে কোনো মন্তব্য না করলেও ওয়াশিংটন জানিয়েছে, গাদ্দাফির গাড়িবহরে হামলায় অংশ নিয়েছে মার্কিন পাইলটবিহীন প্রিডেটর ড্রোন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উচ্চপদস্থ এক মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন, মার্কিন ড্রোনের পাশাপাশি ফরাসি যুদ্ধবিমানও সিরতে থেকে বের হওয়া ওই গাড়িবহরে গাইডেড মিসাইল ছুড়েছিল।
ইন্টারনেটে প্রকাশিত একটি ভিডিওর বরাত দিয়ে এএফপি জানায়, ২২ বছর বয়সী এক বিদ্রোহী গাদ্দাফির বুকে ও মাথায় গুলি করার দাবি করেছে। সানাদ আল-সাদেক আল-উরেইবি নামের এ বিদ্রোহীর ভাষ্য : ‘আমি তাকে (গাদ্দাফি) লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছুড়েছিলাম। একটি তার বগলে আরেকটি লাগে মাথায়।’ তার বক্তব্য মতে, গুলিতে আহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাদ্দাফি মারা যাননি। তার মৃত্যু হতে প্রায় আধঘণ্টা সময় লেগেছে।
‘লিবিয়ার জনগণের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো আজ—ঐক্যে পুনরেকত্রীকরণের ও স্বাধীনতার’, মন্তব্য করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি।
উল্লেখ্য, লিবিয়ায় যুদ্ধে যেতে ক্যামেরন ও সারকোজিই ন্যাটো ও জাতিসংঘকে প্রভাবিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
লিবিয়া যুদ্ধে ন্যাটোর অন্যতম আরব সহযোগী কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।
গাদ্দাফি নিহত হওয়ার ঘটনা পরম্পরায় প্রশ্ন উঠেছে বন্দিকে বিনা বিচারে হত্যার বৈধতা ও ন্যায্যতা নিয়ে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান গাদ্দাফির মৃত্যুর পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরভ দাবি করেছেন, ‘গাদ্দাফিকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে জেনেভা কনভেনশন ভঙ্গ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধবন্দিকে হত্যা করা বৈধ নয়’।
ভেনিজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট হুগো শেভেজ বেআইনিভাবে গাদ্দাফিকে হত্যা করায় ‘ক্ষোভ’ প্রকাশ করেছেন। তিনি গাদ্দাফিকে একজন মহান বিপ্লবী যোদ্ধা ও শহীদ বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ লিবিয়ার তেল দখলের উদ্দেশে দেশটিতে গেছে’।
গাদ্দাফির অন্তিম মুহূর্তের নতুন ভিডিও
দিন যতই গড়াচ্ছে গাদ্দাফির অন্তিম মুহূর্ত নিয়ে রহস্যের জট তত পাকাচ্ছে। গ্লোবাল পোস্ট নামে একটি আন্তর্জাতিক মার্কিন সংবাদ মাধ্যম গাদ্দাফিকে আটক করার দৃশ্য নিয়ে নতুন একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, আটকের সময় লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি জীবিতই ছিলেন, তবে তিনি আহত ও রক্তাক্ত ছিলেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিদ্রোহীরা গাদ্দাফিকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে এবং উল্লসিত হয়ে বারবার ‘আল্লাহু আকবর’ বলে স্লোগান দিচ্ছে।
প্রথমে বিদ্রোহীরা দাবি করে, তারা সির্ত শহরের একটি পয়ঃনিষ্কাশন কালভার্টের ভেতর থেকে আহত গাদ্দাফিকে আটক করে। পরে তিনি রক্তক্ষরণে মারা যান।
তবে আলজাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিদ্রোহীরা জীবিত অবস্থাতেই গাদ্দাফিকে আটক করেছে। পরে গুলির শব্দ শোনা যায় এবং গাদ্দাফির নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে নানা বিবরণের পরিপ্রেক্ষিতে লিবিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল দাবি করেন, গাদ্দাফি ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন।
গত শুক্রবার ইন্টারনেটে প্রকাশিত এক ভিডিওচিত্রে সানাদ আল-সাদেক আল-ইউরিবি নামের লিবিয়ার এক তরুণ যোদ্ধা দাবি করেছেন, তিনি লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে আটক এবং তাকে পরপর দুবার গুলি করেন। প্রথমে বাহুর নিচে, এরপর মাথায়। এতে গাদ্দাফি গুরুতর আহত হন। তবে সঙ্গে সঙ্গে নয়, আধা ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হয়।
সানাদ আল-সাদেক বলেন, ‘গাদ্দাফিকে আমরা একটি রাস্তায় কয়েকজন নারী ও শিশুর সঙ্গে হাঁটতে দেখি। তার মাথায় ছিল টুপি। তবে চুল দেখে আমরা তাকে চিনতে পারি। মিসরাতার একজন যোদ্ধা বলেন, ‘ইনিই গাদ্দাফি। চলো, আমরা তাকে ধরি।’
সানাদ আল-সাদেক আরও বলেন, তিনি গাদ্দাফিকে বেনগাজিতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিসরাতার যোদ্ধারা গাদ্দাফিকে নিজেদের শহরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন তিনি গাদ্দাফিকে পরপর দুবার গুলি করেন। তার এ দাবি গাদ্দাফি কীভাবে নিহত হয়েছেন, সে ব্যাপারে সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছে।
গাদ্দাফি-লাদেন যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যেরই স্মারক : ওবামা
লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যু, ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা এবং ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাকে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের স্মারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
সাপ্তাহিক রেডিও ও ইন্টারনেট ভাষণে শনিবার এসব ঘটনা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নিজেকে শক্তিশালী নেতা বলেও দাবি করেন ওবামা।
তিনি বলেন, গাদ্দাফির মৃত্যু এবং এ বছরের শেষ নাগাদ ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা ‘বিশ্বে আমেরিকার নেতৃত্ব আমরা কিভাবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেছি তার শক্তিশালী স্মারক।’
ওবামা বলেন, ‘লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যু দেখিয়েছে লিবিয়ার জনগণকে রক্ষায় এবং স্বৈরশাসনের কবল থেকে তাদের মুক্ত করতে আমাদের ভূমিকা সঠিক ছিল।’
‘ইরাকে যুদ্ধ শেষের জন্য আমরা যে কৌশল নিয়েছিলাম তা সফল হয়েছে।’ আল কায়দার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল কায়দার বিরুদ্ধে বিজয়ের পাশাপাশি ইরাক ও লিবিয়ার ক্ষেত্রে নেয়া নীতি ‘সাফল্যের একটি বৃহত্ অধ্যায়ের অংশ’।
গত ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের একটি বাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কমান্ডো বাহিনী ‘ইউএস নেভি সিল’ টিমের সদস্যদের এক অভিযানে নিহত হন ওসামা।
ভাষণে তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি জাতীয় ঋণের বোঝা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে বলেও দাবি করেন ওবামা।
২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে এ বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসার ইঙ্গিত দিলেন তিনি।
অবশ্য প্রতিপক্ষ শিবির ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ওবামার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকান নেতারা বলছেন, এতে ইরাকের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরান আরও ‘দুঃসাহসী’ হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া ‘আরব বসন্ত’ গণবিক্ষোভে ‘পেছন থেকে নেতৃত্ব’ দিয়ে ওবামা আমেরিকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন বলেও দাবি করছেন তারা।
গাদ্দাফির অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে আশঙ্কা : কি পরিণতি হবে কর্নেল গাদ্দাফির বিপুল অস্ত্রভাণ্ডারের। শান্তি আদৌ কি ফিরবে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায়। কর্নেল গাদ্দাফি যুগের অবসানের পরও উঠে আসে নতুন প্রশ্ন। নতুন বিতর্ক। গাদ্দাফিকে প্রকাশ্য রাজপথে ‘শাস্তি’ দেয়ার পরও প্রশ্ন—শান্তি কি ফিরবে লিবিয়ায়। গাদ্দাফির বিপুল অস্ত্রভাণ্ডারের বিবরণ দিলেন জাতিসংঘের এক প্রতিনিধি। বললেন, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে খবর ছিল, ক্ষমতায় থাকার সময় ট্রাকভর্তি অস্ত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ কোরদোফান বা নীল নদের অববাহিকার বিভিন্ন দেশে চালান করেছিলেন গাদ্দাফি। জাতিসংঘ প্রতিনিধি দাফা-আল্লা এলহাগ আলি ওসমানের সন্দেহ, লিবিয়া থেকে দারফারেও পাঠানো হয়েছিল বিপুল অস্ত্র। এমনকি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও লিবিয়া থেকে দফায় দফায় অস্ত্র পাঠিয়েছিলেন কর্নেল গাদ্দাফি। এখানেই শেষ নয়। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, নিজে স্বৈরশাসক হলেও প্রজাতান্ত্রিক চাদ, প্রজাতান্ত্রিক মালির মতো দেশেও বিপুল অস্ত্র পাঠিয়েছিলেন গাদ্দাফি। আর এখানেই রক্ত, লাশ, ধ্বংসস্তূপের ফাঁক থেকে উঁকি দিল নতুন আতঙ্ক। বন্দুকের নলের ওপর ভর করেই গড়ে উঠেছিল গাদ্দাফির বিপুল স্বৈরসাম্রাজ্য। সেই অস্ত্রের ‘ভবিষ্যত্’ নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে। কী রয়েছে ওই অস্ত্রভাণ্ডারে। বিমান-বিধ্বংসী কামান থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গুলি বন্দুক, সবই মজুত সেখানে। শুধু তাই নয়, বিদ্রোহী এনটিসি সমর্থকদের হাতেও রয়েছে অসংখ্য অস্ত্র। গাদ্দাফিকে মারার পরও রীতিমতো বন্দুক তুলে বিজয় উত্সব পালন করেছিল বিদ্রোহীরা। আর আন্তর্জাতিক দুনিয়ার প্রশ্ন এখানেই। ন্যাটো বাহিনী এখন আংশিকভাবে লিবিয়ার দায়িত্বে। সঙ্গে রয়েছে এনটিসিও। কিন্তু এতো বিশাল অস্ত্রের ভবিষ্যত্ কী? অস্ত্র হাতে থাকলে শান্তি আদৌ ফিরবে কী।
মাথায় গুলি লেগে নিহত হন গাদ্দাফি
লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির লাশ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির জাতীয় অন্তর্বর্তী পরিষদ বা এনটিসি। তবে এ নিয়ে তাদের টালবাহানাও কম নয়। তারা বলছে তাকে কোথায় দাফন করা হবে এ বিষয়ে পরামর্শ করার পরই লাশ হস্তান্তর করা হবে। গাদ্দাফির ময়নাতদন্তের পর চিকিত্সক ওথম্যান এল জিনতানি রোববার জানিয়েছেন, লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মাথায় বন্দুকের গুলি লেগেছিল। এরপর তিনি মারা যান। বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স।
এনটিসির প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিলের উপদেষ্টা আহমেদ জিবরিল জানান, ‘গাদ্দাফির আত্মীয়-স্বজনের কাছে লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এ মুহূর্তে তার পরিবারের কেউ দেশে নেই। এ বিষয়ে তার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এখন কোথায় তাকে দাফন করা হবে সে বিষয়ে এনটিসির সঙ্গে পরামর্শ করে তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ তবে কখন লাশ হস্তান্তর করা হবে তা তিনি জানাতে অস্বীকার করেছেন। গত বৃহস্পতিবার গাদ্দাফি নিহত হওয়ার পর মিসরাতা শহরের একটি হিমাগারে লাশ রাখা হয়েছে। কয়েকদিন ধরে গাদ্দাফির লাশের বিষয়ে অনেকটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার পর এনটিসি শেষ পর্যন্ত লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিল। এর আগে এনটিসি গাদ্দাফিকে গোপন স্থানে দাফন করার পরিকল্পনা করছিল বলেও খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে গাদ্দাফির লাশের ময়নাতদন্তের সঙ্গে জড়িত এক ডাক্তার নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ‘বন্দুকের গুলির আঘাতেই গাদ্দাফি মারা গেছেন।’ তবে গাদ্দাফির মাথার বাম দিকে যে গুলি লেগেছে তাতে তার মৃত্যু হয়েছে কিনা তা ওই ডাক্তার স্পষ্ট করে বলেননি। তিনি বলেন, এখনও অনেক প্রক্রিয়া বাকি। তবে সবকিছু সরকারিভাবে জানানো হবে। কোনো কিছুই গোপন করা হবে না।

ঘরের ব্যর্থতায় ম্লান বাইরের সাফল্য?

আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে মার্কিনিদের বিপুল বাহবা পেয়েছেন ওবামা। গত সপ্তাহে বড় দুটি সাফল্য জমা হয়েছে ওবামার ঝুড়িতে। একজন মার্কিন সেনারও রক্ত না ঝরিয়ে আফ্রিকার রাজাদের রাজা খ্যাত মুয়াম্মার গাদ্দাফি যুগের চূড়ান্ত পতন ঘটেছে। আর এ তো সেদিন হোয়াইট হাউসে জোর গলায় ওবামা ঘোষণা দিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদই ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা মাথা উঁচু করে দেশে ফিরবেন।
দেশে ওবামার লেজে-গোবরে অবস্থা। অর্থনীতির অবস্থা নাজুক। চাকরির বাজারেও চলছে খরা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ওবামার দক্ষতা নিয়ে হচ্ছে বিস্তর সমালোচনা। এই প্রেক্ষাপটে বহির্বিশ্বে ওবামা প্রশাসনের সাম্প্রতিক সামরিক কিংবা পররাষ্ট্রনীতি-সংশ্লিষ্ট সাফল্য তাঁর সমর্থকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। তারা ভাবছে, বহির্বিশ্বের এ সাফল্যকে পুঁজি করে আগামী নির্বাচনে সহজেই পার পাবেন ওবামা।
ওবামা-সমর্থক ডেমোক্র্যাটরা যুক্তি খুঁজে পায়, বুশের ইরাক যুদ্ধের কারণে অনেক মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে। অথচ দক্ষ ওবামা কোনো রক্তপাত ছাড়াই গাদ্দাফির পতন ঘটিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে এটা রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ওবামাকে শক্তিশালী করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওসামা ও গাদ্দাফির মৃত্যু এবং ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা অবশ্যই ওবামার জন্য সফলতা। তাঁদের মতে, নির্বাচনী প্রচার ও বিতর্কে এ বিষয়টিকেই হয়তো গুরুত্ব দেবেন ওবামা। তিনি ইরাক যুদ্ধের ক্ষতির সঙ্গে লিবিয়া যুদ্ধেরও তুলনা করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ সাফল্য ওবামার রাজনৈতিক ভবিষ্যেত কোনো অবদান রাখবে না। মার্কিন অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিই নির্ধারণ করে দেবে ওবামার ভাগ্য।
এ প্রসঙ্গে রিপাবলিকান দলের কৌশলবিদ ডেভিড উইন্সটন বলেন, ‘পররাষ্ট্রসংক্রান্ত বিষয়াবলি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির বিপরীতে যখন তা দাঁড় করানো হবে, সেটা মামুলি বিষয় হয়ে উঠবে।’
বুশ প্রশাসনের সাবেক কৌশলবিদ কার্ল রোভ বলেন, ‘ওবামা যদি মনে করেন, তিনি পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের জোরে পার পাবেন, এর অর্থ তিনি প্রধান বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ডেভিড রথকপ বলেন, ‘যদি আগামী এক বা দুই বছর পরিস্থিতি নিম্নমুখী হয়, তবে সামরিক সাফল্য ওবামার কোনো কাজে আসবে না।’
বিশ্লেষকদের মতে, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ওবামা সফল হলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব লাঘবে ওবামা ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনে এটাই তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তবে ওবামার সমর্থকেরা মনে করছে, আগামী নির্বাচনের আগেই এ দুর্বল দিকটিও সবল হয়ে উঠবে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।

গাদ্দাফির আমলের নাগরিক সুবিধা

মুয়াম্মার গাদ্দাফি তাঁর শাসনামলে লিবিয়ার নাগরিকদের যেসব সুবিধা দিয়েছিলেন:
১. সবাই বিদ্যুতের সুবিধা পেত কিন্তু তাদের কাউকে বিদ্যুতের বিল দিতে হতো না।
২. লিবিয়ার সব ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত। এসব ব্যাংক থেকে নাগরিকেরা ঋণ নিলে সুদ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না।
৩. গাদ্দাফি বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে একটি বাড়ি পাওয়ার। এ জন্যই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তাঁর নিজের বাবা-মায়ের জন্য কোনো বাড়ি বরাদ্দ করা হবে না। গাদ্দাফির বাবা একটা তাঁবুতে মারা যান। গাদ্দাফি নিজেও তাঁর স্ত্রী ও মাকে নিয়ে তাঁবুতে বসবাস করতেন।
৪. লিবিয়ার প্রত্যেক নবদম্পতিকে সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার ডলার দেওয়া হতো, যাতে তাঁরা বাড়ি কিনে নতুন জীবন শুরু করতে পারেন।
৫. সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। গাদ্দাফি ক্ষমতা নেওয়ার আগে লিবিয়ায় শিক্ষিতের হার ছিল ২৫ শতাংশ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশে।
৬. কেউ কৃষি খামার করতে চাইলে সরকার ভূমি, বীজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ বিনামূল্যে সরবরাহ করত।
৭. কোনো কারণে লিবিয়ার কোনো নাগরিককে শিক্ষা গ্রহণ কিংবা চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশে যেতে হলে সরকার সব ব্যয় বহন করত।
৮. লিবিয়ার তেল বিক্রির একটা নির্ধারিত অংশ প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাংক হিসাব নম্বরে সরাসরি জমা হতো।
৯. সন্তান জন্ম দিলে প্রত্যেক নারীকে পাঁচ হাজার ডলার দেওয়া হতো। কাতার লিভিং ডটকম।