kuldip nayar লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
kuldip nayar লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০১৬

পাকিস্তানের আবার ভাবা উচিত

জাতিসংঘে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ভাষণ অনেকটা যুদ্ধংদেহী মনে হতে পারে। কিন্তু এতে বোঝা যায়, ভারত কাশ্মীর ও অন্যান্য স্থানে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের ব্যাপারে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে পড়েছে। উরিতে সেনাছাউনিতে হামলায় ১৪ জওয়ানের মৃত্যুর পর ভারতে এখন একটি দাবি ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে: প্রতিশোধ।

এদিকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কাছে অঙ্গীকার করেছেন, তারা চাইলে যেকোনো সময় ও স্থানে পাল্টা হামলা চালাতে পারে (সার্জিক্যাল স্ট্রাইক)। ভারতীয়দের মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পছন্দ হিসেবে এটি খুবই নিকৃষ্ট পর্যায়ের। কিন্তু কোনো কিছু না করে এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে ধৈর্যের প্রয়োজন আছে, যে জিনিসটা ক্রমেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ কোনো বিকল্প নয়। তাহলে এখান থেকে বেরোনোর পথটা কী?
পাকিস্তান স্বীকার করেছে, উরির সমস্যা সমাধানে কোনো অরাষ্ট্রীয় সংস্থাকে যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু এখন যখন সারা পৃথিবী উরির ঘটনায় আতঙ্কিত হয়েছে, তখন ইসলামাবাদ বলছে, এটি ভারতের সাজানো ঘটনা, এতে ইসলামাবাদের হাত নেই। কিন্তু সন্ত্রাসীরা তার ভূমি ব্যবহার করে এই হামলা চালিয়েছে, তারা এর কী ব্যাখ্যা দেবে। পাকিস্তান কাশ্মীরের প্রসঙ্গটি তুলে অন্য সব দিক থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। পাকিস্তান আশা করে, তারা আলোচনার উদ্যোগ নিলে নয়াদিল্লি তাতে যোগ দেবে।
সম্ভবত, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের ওপরই তার চোখ ছিল। ভারত এতে যোগ দেবে না বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়ায় এই সম্মেলন বাতিল হয়ে গেছে। কারণ, ভারতের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশ ও ভুটানও এতে যোগ দেবে না বলে জানিয়েছে। দৃশ্যত, ভারত যখন না বলেছে, তখন এই সম্মেলন বাতিল করতেই হবে। 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছি। যুদ্ধ কোনো পথ নয়। কিন্তু আলোচনাও ফলপ্রসূ হয়নি। ওদিকে সুষমার বক্তৃতা পাকিস্তানের প্রতি আরও একটি হুমকি। ব্যাপারটা হলো, পাকিস্তানের কর্মকাণ্ডে ভারত বিরক্ত, ফলে তারা কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। কারণ, এটা ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে আলোচনা থেকে সমাধান আসবে না।
ভারত ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানিচুক্তি সংশোধনের কথা বলছে। আর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি সারতাজ আজিজ বলেছেন, পাকিস্তানের অংশগ্রহণ ছাড়া এই চুক্তি সংশোধন করা হলে তা হবে ‘যুদ্ধ’। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। উভয় পক্ষের মানুষকেই তা বলতে হবে। পাকিস্তান বারবার বলছে, উপমহাদেশে শান্তি আনতে হলে কাশ্মীর সমস্যার একটা না একটা সমাধান বের করতেই হবে।
যেভাবেই হোক, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তান এককভাবে এটা করতে পারবে না। কাশ্মীরিরা নিজেদের কথা বলতে চায়। সম্প্রতি আমি ছাত্রদের আমন্ত্রণে শ্রীনগরে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাই। দেখলাম, তরুণেরা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ চায়। তারা বুঝতে পারছে না, ভারত নিজের সীমান্তে আরও একটি মুসলিম দেশ চায় না।
কথা হচ্ছে, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে যায়, তখন তারা রাজাশাসিত রাজ্যগুলোকে সুযোগ দিয়েছিল, তারা যদি ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে না চায়, তাহলে তারা স্বাধীন থাকতে পারে। তো এরপর জম্মু ও কাশ্মীরের তৎকালীন শাসক হরি সিং ঘোষণা দেন, তাঁরা স্বাধীন থাকবেন। কিন্তু এই ভূমিবেষ্টিত অঞ্চলটির বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সমর্থন লাগবে। তিনি শুধু একজনের ওপর নির্ভর করতে চাননি।
কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীর মুসলিমপ্রধান হওয়ায় পাকিস্তান আশা করেছিল, তারা পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেবে। তা না হওয়ায় পাকিস্তান অনিয়মিত সেনাদের ঢুকিয়ে দেয়, যার সমর্থনে ছিল নিয়মিত সেনারা। ফলে মহারাজা ভারতের সহায়তা চান। আর ভারত বলে, সেনা পাঠানোর আগে তাঁকে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে হবে। তাঁকে ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশন অ্যাক্টে সই করতে হয়।
এ মুহূর্তে কাশ্মীর উপত্যকার দুটি অংশ আজাদির বিপক্ষে। হিন্দু–অধ্যুষিত জম্মু ও বৌদ্ধ–অধ্যুষিত লাদাখ ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গেই থাকতে চায়। সে কারণে আজাদির দাবিটা কাশ্মীরের সেই অংশের মধ্যেই সীমিত হয়ে যাচ্ছে, যেখানকার ৯৮ শতাংশ মানুষই মুসলমান।
ভারতে এখন বিভাজনের রাজনীতি চলছে। ক্ষমতাসীন দল হিন্দুত্বের তাস নিয়ে খেলছে। ফলে এটা ধারণা করা কঠিন যে কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট পার্টি আজাদির দাবিতে সমর্থন দেবে। অন্যভাবেও, সব রাজনৈতিক দলই স্বাধীনতার দাবির বিপক্ষে, তাদের কেউ কেউ হয়তো বড়জোর বলতে পারে, রাজ্যকে ক্ষমতা দেওয়া হোক।
দেশভাগ মানুষের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, আজ ৭০ বছর পরও তা শুকায়নি। মানুষ কীভাবে আশা করে, ভারত আবারও একটি দেশভাগ মেনে নেবে; তা সে কাশ্মীরিদের ভাবাবেগ যতই খাঁটি হোক না কেন। আর সেই দেশভাগ যদি আবারও ধর্মের ভিত্তিতে হয়, তাহলে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অস্তিত্বই কমজোর হবে। এটা ঠিক, ভারতের ২৫ কোটি মুসলমানও দেশের নাগরিক, তারা হিন্দুদের মতো সম–অধিকার ভোগ করে। তাদের জিম্মি করা যাবে না। কিন্তু কাশ্মীরের চলে যাওয়ার ফলাফল এত মারাত্মক হবে যে তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামাবাদের আবার ভাবা উচিত। কারণ, তারা প্রতিনিধি আবদুল বাসিতের মারফত বলেছে, উরি হামলা ছিল ‘সাজানো নাটক’, এতে পাকিস্তানের হাত নেই।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৬

দেশভাগ - র‍্যাডক্লিফের মুখে বিষাদের ছায়া ছিল

ব্রিটিশরা যখন বাধ্য হয়ে উপনিবেশ ছেড়ে গেছে, তখন তারা সেখানে নানা রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। এর একটি তরিকা ছিল শাসনাধীন দেশটিকে টুকরো করে ফেলা। আয়ারল্যান্ড, ফিলিস্তিন/ইসরায়েল এবং অবশ্যই ভারতের ক্ষেত্রে তারা এই তরিকা প্রয়োগ করেছে।
আজ ২০১৬ সালের মধ্য আগস্টে লর্ড র‍্যাডক্লিফের সঙ্গে এক আলাপচারিতার কথা মনে পড়ছে, যিনি ভারতকে দুই টুকরো করেছিলেন।
লর্ড মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ বার থেকে র‍্যাডক্লিফকে পাকড়াও করে ভারত নিয়ে আসেন। এর আগে র‍্যাডক্লিফ কখনো ভারতে আসেননি, এমনকি দেশটি সম্পর্কে তিনি তেমন কিছু জানতেনও না। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যখন মাউন্টব্যাটেন তাঁকে নিজ অভিপ্রায়ের কথা বলেন, তখন তিনি তাঁকে বলেছিলেন, কাজটা বেশ কঠিন। এর জন্য মাউন্টব্যাটেন তাঁকে ৪০ হাজার রুপি দিতে চেয়েছিলেন, যেটা তখনকার দিনে অনেক টাকা। কিন্তু যেটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রলুব্ধ করেছিল সেটা হলো—এই গুরুদায়িত্ব, যেটা তাঁর কাঁধে চাপানো হয়েছিল—দুটি নতুন দেশ তৈরি করা।
তাঁর মতো একজন পরিচিত লন্ডনি আইনজীবীর পক্ষে রাতারাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করার হাতছানি উপেক্ষা করা কঠিন ছিল। তো র‍্যাডক্লিফ জেলা মানচিত্র চেয়ে পাঠান, কিন্তু সে রকম কিছুই তখন ছিল না। সব সরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে সাধারণ মানচিত্র টাঙানো থাকত, তাঁকে সেটাই দেওয়া হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, এই প্রেক্ষাপটে তিনি যে রেখা টেনেছিলেন, তাতে লাহোরকে প্রথমে ভারতের ভাগে রাখা হয়েছিল। তখন তাঁর বোধোদয় হয়, এটা করা হলে পাকিস্তানের ভাগে গুরুত্বপূর্ণ শহর পড়বে না। এই বিবেচনায় তিনি লাহোরকে পাকিস্তানের অংশে আনেন। ফলে এখন পর্যন্ত পূর্ব পাঞ্জাবের লোকেরা এই উপহার হারানোর কারণে তাঁকে ক্ষমা করেননি।
তবে র‍্যা ডক্লিফ কখনোই সেই ৪০ হাজার রুপি নেননি। কারণ, তিনি মনে করেছিলেন, দেশভাগের কারণে যে এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, সেটার দায়ভার তাঁর নিজের। দেশভাগের পর তিনি আর কখনোই ভারতে আসেননি। তিনি লন্ডনে মারা গিয়েছিলেন। আর ভারতীয় সংবাদপত্রগুলো লন্ডন টাইমস পত্রিকা থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর সংগ্রহ করেছিল। এই ব্যক্তি দুটি দেশ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই স্বীকৃতি পাননি। তিনি শেষমেশ আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাননি। বহু বছর পরে এক তরুণ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে যখন জিজ্ঞাসা করেন, ‘পাকিস্তান করে কি ভালো হলো?’ জবাবে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, ‘আমি জানি না, স্রেফ উত্তর-প্রজন্মই এটা বলতে পারে।’
সম্ভবত, এর উত্তর দেওয়ার সময় এখনো আসেনি, এত তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না। ইতিহাসের পরিহাস হলো, জিন্নাহ ব্যক্তিজীবনে কোনো কিছু বাছবিচার না করেই খেতেন আর পান করতেন। যদিও তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের মাতৃভাষা করেছিলেন, তিনি নিজে খুব ঘৃণাভরে এই ভাষায় কথা বলতেন।
যখন পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যাপারটা অনিবার্য হয়ে গেল, তখন গান্ধী নেহরু ও প্যাটেলকে বলেছিলেন, জিন্নাহকে যেন অবিভক্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ প্রস্তাব করা হয়। এতে দুজনেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, তাঁরা দুজনেই বহুকাল ধরে এই পদটিতে বসার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। এতে বোঝা যায়, তাঁরা স্বাধীনতাসংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষা দিলেও পদের লোভ ছাড়তে পারেননি।

যখন পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যাপারটা অনিবার্য হয়ে গেল, তখন গান্ধী নেহরু ও প্যাটেলকে বলেছিলেন, জিন্নাহকে যেন অবিভক্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ প্রস্তাব করা হয়। এতে দুজনেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, তাঁরা দুজনেই বহুকাল ধরে এই পদটিতে বসার জন্য মুখিয়ে ছিলেন
বস্তুত, নেহরু ও প্যাটেল দেশভাগের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন, গান্ধী নন। মাউন্টব্যাটেন যখন দেশভাগের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেন, তখন তিনি প্রথমে গান্ধীকে ডাকেন। গান্ধী ‘ভাগ’ শব্দটা শুনতে চাননি। ফলে মাউন্টব্যাটেন যখন শব্দটা উচ্চারণ করেন, তখন তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। নেহরু ও প্যাটেল দেশভাগের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন এ কারণে যে তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, জীবনের খুব বেশি সময় বাকি নেই। অর্থাৎ দেশ গড়ার জন্য তাঁদের হাতে বেশি সময় নেই। সে ক্ষেত্রে মাউন্টব্যাটেনের প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

জিন্নাহকে দানব বানানো হলেও তিনি এই তথাকথিত ‘পোকায় কাটা’ পাকিস্তান নিয়ে খুশি ছিলেন না। তাঁর কল্পনার পাকিস্তানের বিস্তৃতি ছিল পেশোয়ার থেকে দিল্লি পর্যন্ত। কিন্তু তাঁর সামনেও আর বিকল্প ছিল না। ব্রিটিশরা এটুকুই তাঁকে দিতে চেয়েছিল। তাঁর মনে এতটাই তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল যে মাউন্টব্যাটেন যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বরাতে তাঁকে বলেন, তিনি ভারতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চান কি না। উত্তরে জিন্নাহ বলেন, ‘আমি ভারতীয়দের বিশ্বাস করি না’।
কিছু মানুষ বলেন, জিন্নাহ একজন ভালো প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন, আর ভারতও এভাবে অবিভক্ত থাকতে পারত। তখন পর্যন্ত কেউ জানত না, তিনি মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত। সন্দেহ করা হয়, ব্রিটিশরা এ খবর জানত। ফলে তারা স্রেফ অপেক্ষা করছিল, কখন জিন্নাহ দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেন। পাকিস্তান যেহেতু এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক দেশ, ফলে তাঁর মৃত্যুর পর পাকিস্তানও মরে যাবে।
তবে নেহরু এ কারণে মনে করেননি যে পাকিস্তান বেশি দিন টিকবে না। পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ভালো করবে না, এই পূব৴ ধারণা থেকেই তিনি এমন মত পোষণ করতেন। নেহরু বা অন্য কোনো কংগ্রেস নেতা এটা জানতেন না যে উইনস্টন চার্চিল জিন্নাহকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি নিজে এটা দেখবেন, যাতে জিন্নাহ সফল হন এবং পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। হিন্দু ধর্মের ব্যাপার চার্চিলের প্রচণ্ড অনীহা ছিল। তিনি বলেছিলেন, এই বহুত্ববাদী ধর্ম তিনি বুঝতে পারেন না। তাঁর মনের ভেতরে কৌশলগত পরিকল্পনাও ঘুরপাক খাচ্ছিল, পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তার একদিকে তেলসমৃদ্ধ ইসলামি বিশ্ব, আর অন্যদিকে বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশ। ফলে পাকিস্তানের মতো কৃতজ্ঞ খদ্দের রাষ্ট্র পাওয়ার লোভ সংবরণ করা সহজ ছিল না।
বহু বছর পর র‍্যাডক্লিফের সঙ্গে লন্ডনে দেখা হলে তাঁর মুখে বিষাদের কালো ছায়া দেখেছিলাম। তিনি দেশভাগের ব্যাপারে কথা বলতে অনীহ ছিলেন। কিন্তু মুখোমুখি বসার পর তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি তখনো বিশ্বাস করতেন, এত মানুষের প্রাণহানির দায় তাঁর নিজের।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

বৃহস্পতিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

পথ হারিয়ে অজানা গন্তব্যে বাংলাদেশ: কুলদীপ নায়ার

ঢাকায় পৌঁছার পর আপনার বুঝতে খুব বেশি সময় লাগবে না যে এখানে একটি দেশ তার নীতি হারিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের অদৃশ্য ও শোষকদের বিরুদ্ধে  পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যে বিপ্লবিক চেতনা নিয়ে লড়াই করেছিল তাও আর নেই। রাওয়ালপিন্ডির স্থান দখল করেছে দেশীয় স্বার্থান্বেষী মহল। আরো শোচনীয় হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতটা কর্তৃত্ববাদী হয়ে পড়েছেন।

প্রথমত, জনগণের মতে, খালেদা জিয়ার অবনমন আর দ্বিতীয়ত, সামরিক বাহিনীর সাথে হাসিনার শান্তিচুক্তি। এক সময় এই বাহিনী তার বাবা জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সরকারকে উৎখাত করেছিল।

হাসিনা সশস্ত্র বাহিনীর বেতন বাড়িয়েছেন। অধিকন্তু তিনি তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে পেশাদারি বজায় রেখে রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে তারা সম্মান ও কর্তৃত্ব পান। বস্তুত সেনাবাহিনী এখন পেশাদার এবং একটি স্বীকৃত বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হয়।

হাসিনার প্রকৃত বিরোধিতা আসছে জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে। দলটি ধর্মীয় কার্ড খেলছে। জামায়াত কোনো অগ্রগতি করতে পারছে না। কারণ দলটিকে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে দেখা হয়। এমনকি বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যে বর্বরতা দেখিয়েছে তার বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবেও জামায়াত নিন্দা জানায়নি।

এক সময় বামদের শক্তি থাকলেও এখন আর দৃশ্যপটে নেই। তারা যেমন আবেদন হারিয়েছে তেমনি হারিয়েছে তাদের ক্যাডারদেরও। তরুণদের আকৃষ্ট করছে ক্যারিয়ার আর ব্যবসায়ীরা রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। কারণ তারা সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে ঘুষ দেয়। এই অবস্থা পুরো বাংলাদেশেই বিরাজমান।

আশার কথা হলো জনগণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভালোবাসে এবং প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে এটার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের কথা জানিয়েছে। বেশিদিন আগের কথা নয়, সমাবেশের মাধ্যমে জনগণ তাদের অসন্তোষের কথা জানাতে রাজপথে নেমে আসত। এতে দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হতো। দোকানপাট আর কারখানা বন্ধ থাকত। এতে তাদেরই ক্ষতি হতো। কিন্তু এতে পোশাক খাতের পরিবেশের ক্ষতি হয় যা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস।

সম্পদ কিছু লোকের হাতে জিম্মি। তারা শুধু দৈনন্দিন জীবনকেই নিয়ন্ত্রণ করছে না, করছে রাজনীতিকেও। অনেক শিল্পপতি সরকারকে নীতি ও কর্মসূচিকে প্রভাবিত করার জন্য রাজনৈতিক দল ও সংসদ সদস্যদের চাঁদা দেন।

তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই বাংলাদেশের গণমাধ্যম নামেই স্বাধীন। মালিকরা যতটুকু অনুমোদন করেন সম্পাদকরা শুধু ততটুকু স্বাধীন। সশস্ত্র বাহিনীর সমালোচনার ব্যাপারে গণমাধ্যম অত্যন্ত সতর্ক। সামরিক বাহিনীর সমালোচনাকে দেশের স্বার্থে ক্ষতিকর হিসেবে দেখা হয়।

আদর্শিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং সামাজিকভাবে বাংলাদেশ কোনদিকে যাচ্ছে-এই প্রশ্ন আমি অনেককেই করেছিলাম। রাজনৈতিক দলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন এমন একজন শিক্ষাবিদ আমাকে বলেন যে বাংলাদেশ তার পথ হারিয়েছে এবং সে জানে না যে কোনপথে সে এগিয়ে যাচ্ছে।

শেখ হাসিনার প্রধান শক্তি নয়াদিল্লি-যারা সব ডিম তার একার ঝুড়িতে রেখেছে। বিএনপি বলছে,  শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে তিনি এমনকি ভারতেরও ইমেজ ক্ষুণ্ন করছেন। হাসিনা কোনো সমালোচনা সহ্য করেন না। তিনি মনে করেন হাসিনা আর ভারত সমার্থক শব্দ।

শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০১৫

ক্ষুব্ধ কাশ্মির, সন্ধিক্ষণে ভারত

যতটুকু অনুভব করা যায়, কাশ্মির বদলে গেছে তার চেয়ে অনেক বেশি। এর আগে শেষবারের মতো কাশ্মিরে আমি এসেছিলাম প্রায় পাঁচ বছর আগে। এর মধ্যে উপত্যকাটি স্পষ্টভাবে ভারতবিরোধী হয়ে পড়েছে। এর মানে এই নয়, স্থানটি পাকিস্তানপন্থী হয়ে পড়েছে, যদিও শ্রীনগরের ভেতরের অংশগুলোতে অনেক সবুজ পতাকা উড়ছিল। যা আসলে বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে, তা হলো বিরোধিতা (যা এমনকি আগেও বোঝা যেত) এখন ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। অবশ্য, ডাল লেক এবং এর তীরের চকচকে রোদ অন্য সময় যেমন থাকে, তেমনই স্বাভাবিক। পর্যটকেরা বিমানবন্দর থেকে গাড়ি করে সরাসরি স্পটগুলোতে চলে যান, তারা জানেনও না যে, নগরীর অভ্যন্তরে থাকা জঙ্গিরা এখনো গ্রেনেড ছোড়ে। যখন শ্রীনগর ছিলাম, তখন সহিংসতা দেখা দিয়েছিল, নগরীর ভেতরের দিকে কয়েকটি গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল। কাশ্মিরি সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের আমন্ত্রণে আমি শ্রীনগর গিয়েছিলাম। আমন্ত্রিতদের মধ্যে দিল্লির আরো কয়েকজন সাংবাদিক ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জম্মুর কোনো সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন না। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তাদের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কমবেশি শান্তিপূর্ণ কাশ্মিরি বিক্ষোভ ধ্বনি ও বিষয়বস্তুতে ইসলামি। তবে মনে হয়, বিষয়বস্তুর চেয়ে অভিব্যক্তি প্রকাশের পন্থা বুঝি এটাই। বিষয়বস্তু হলো, কাশ্মিরিরা তাদের নিজেদের জন্য একটি দেশ চায়। 

ভারতে বেশির ভাগ মানুষই সন্দেহ করে যে, ‘স্বাধীন কাশ্মির স্রেফ একটা কথার কথা। কাশ্মিরিদের প্রকৃত ইচ্ছা পাকিস্তানে যোগদান করা।’ কিন্তু আমি এই অনুমানের সাথে একমত নই। স্বাধীনতার মূল আদর্শ স্বপ্নের মতো দেখা যায়। এটা কাশ্মিরিদের পায়ের তলা থেকে সরে গেছে। এটা যদি কখনো বাস্তবতা হয় (যা অসম্ভব), তবে এমনকি পাকিস্তানের সাথে মিশে যাওয়ার কট্টর সমর্থকও তাদের এজেন্ডা ছুড়ে ফেলে স্বাধীনতাকামীদের সাথে যোগ দেবে। ঘটনাপরম্পরা আমাকে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চিন্তাধারার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তিনি প্রবলভাবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে মুসলমানদের জন্য সর্বোচ্চ ছাড় পেতে দরকষাকষির জন্য পাকিস্তান দাবি উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া দেখতে পেলেন, তখন মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান দাবিকে আঁকড়ে ধরলেন। শুরুতে তার বিশ্বাসের প্রতি নড়বড়ে থাকলেও তিনি এর একমাত্র মুখপাত্রে পরিণত হন। কাজেই, কাশ্মিরিদের প্রকৃত আকাক্সক্ষা নিয়ে কোনো সংশয় থাকা উচিত নয়। 

আমি যখন আমার বক্তৃতায় বললাম, স্বাধীন কাশ্মিরের দাবি যদি কখনো গতি লাভ করে, তবে মুসলমানদের জন্য কঠিন সময় উপস্থিত হবে, তখন আমি চেহারায় ক্রোধ দেখতে পেয়েছিলাম। হিন্দুরা প্রশ্ন করতে থাকবে যে, ভারতের অংশ হিসেবে থাকার ৭০ বছর পরও কাশ্মিরি মুসলমানেরা যদি স্বাধীনতা চায়, তবে ভারতের প্রায় ১৬ কোটি মুসলমানের আনুগত্যের নিশ্চয়তা কী? কাশ্মিরকে (যেখানকার ৯৮ শতাংশই মুসলমান) আলাদা দেশ হিসেবে তৈরি করে ভারত তার সেকুলার-ব্যবস্থা নস্যাৎ করে দিতে পারে না, এই মন্তব্য এমনকি সম্মেলনে ইতিবাচকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পাল্টা যুক্তি কমবেশি যা ছিল তা হলো, ‘তোমাদের মুসলমানেরা তোমাদের সমস্যা।’ একই ধরনের একটি প্রতিক্রিয়ার কথা স্মরণ করছি, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আমি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল সাত্তারকে বলেছিলাম, ভারতের মুসলমানেরা (ওই সময় তাদের মোট সংখ্যা পাকিস্তানের চেয়ে বেশি ছিল) পাকিস্তান সৃষ্টির মূল্য দিচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান নামের মুসলিম দেশ গঠনের জন্য তাদেরকে ‘আত্মত্যাগ’ করতেই হবে। আমাকে যেটা সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে, তা হলো, কাশ্মিরে পারস্পরিকভাবে মিশে যাওয়া এলাকার অন্তর্ধান। অথচ কয়েক বছর আগেও এটা দৃশ্যমান ছিল। মোকাবেলা করার কঠোরতার কারণে এমনকি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগও গুঁড়িয়ে গেছে। একটি ব্যক্তিগত উদাহরণ টেনে আনছি বলে আগেই দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। 

অতীতে ইয়াসিন মালিক আমাকে তার বাড়িতে ডিনারের দাওয়াত করতেন; নানা রাস্তা ঘুরিয়ে তিনি তার বাড়িতে আমাকে নিয়ে যেতেন। সত্যিই, তিনি কথিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’তে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু তার কাছ থেকে একটা কথার জন্য নিষ্ফলভাবে অপেক্ষা করেছিলাম। আমি বিশ্বাস করি না যে, শ্রীনগরে আমার উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। বিমানবন্দরে মোতায়েন, তার নেতৃত্বাধীন জম্মু ও কাশ্মিরি লিবারেশন ফ্রন্টের সদস্যরা জানেÑ ভারত থেকে কারা আসছে কখন আসছে। ইয়াসিন মালিক ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’র তকমা পেয়েছেন। আমি ইয়াসিনের আমৃত্যু অনশন ভাঙিয়েছিলাম এই শর্তে যে, ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করব। তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বদলে আমার তদারকিতে সম্মত হয়েছিলেন। আমরা একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম, তাতে ইয়াসিনের অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল। ভারত সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য প্রতিবেদনটি পাকিস্তান ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত করেছিল। সত্যি বটে, ইয়াসিন বলতেন যে তিনি ভারতীয় নন। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ছিল না। তিক্ততা কি ব্যক্তিগত বন্ধনকেও ছিন্ন করতে পারে? কিছু বিষয়ে ভুলভাবে অনুমান করেছিলাম এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনই কাশ্মিরকে আমাদের পেছনে রাখবে, এতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই বলে ধরে নেয়া কি আমার উচিত হবে? রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে পেছনে ঠেলে দেয়, তার আরেকটি উদাহরণ হলো আরেক কাশ্মিরি নেতা শাবির শাহ এখন বদলে যাওয়া এক ব্যক্তি।

তিনি ছিলেন আমার শিষ্যের মতো। তিনি ছিলেন ভারতপন্থী। তিনি কট্টর বিরোধীতে পরিণত হয়েছেন। যদিও আমি জানি না, কেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক মরে যাবে। শাবিরের আদর্শে পরিবর্তনের জন্য কি আমাকে এই দাম চুকাতে হবে? সন্দেহ নেই যে, বিশেষ করে যারা সেকুলার ও গণতান্ত্রিক ভারতে বিশ্বাস করেন, তাদেরকে কাশ্মিরের দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। যত বিরোধিতাই আসুক না কেন, সেটা তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরাতে পারা উচিত নয়। তারা যদি বদলে যান, এর মানে হবে, আগের অবস্থানটি ছিল স্রেফ মুখোশ। এটা সমগ্র ভারতের জন্য কল্যাণকর। আমাদের জন্য স্বাধীনতা এনে দেয়া মহাত্মা গান্ধী ও জওয়াহেরলাল নেহরুর ঘোষিত মূল আদর্শকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে, এমন এক অবস্থার মধ্যে আমরা রয়েছি। এটা দেখে আমার ব্যথা লাগে যে, মহাত্মাকে হত্যাকারী নাথুরাম গডসের আদর্শকে প্রশংসা করে কোনো কোনো কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। ভারত কি তার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করবে, কেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মির নিরাপত্তাহীন মনে করে? কাশ্মিরি এক মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার (তিনিই আমাকে বিমানবন্দরে নামিয়ে দিয়েছেন) বলেছেন, ব্যাঙ্গালুরুর মতো উদার স্থানেও পুলিশ তাকে কিভাবে সন্দেহের চোখে দেখে। দলগুলো বর্ণ আর ধর্মের ভিত্তিতে চিহ্নিতকরণের রাজনীতির কারণে ছোট হয়ে গেছে। 

জনগণের উচিত উদার সংস্থা আর নেতাদের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করা; ধর্ম আর বর্ণের বিষ যাতে ছড়াতে না পারে তা নিশ্চিত করা। জাতি ব্যর্থ হলে কাশ্মির এবং ভারতের আরো কয়েকটি অংশ হয়তো ধর্মের পানি-কাদার চোরাবালিতে আটকে যাবে। দেশ এখন পরীক্ষার মুখে। 

 লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক 

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ 

সোমবার, ১৫ জুন, ২০১৫

হাসিনা-মোদির সমালোচনায় কুলদীপ নায়ার

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার। ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় "এ শট ইন দ্য আর্ম ফর হাসিনা" শিরোনামে লেখা কলামে তিনি এ সমালোচনা করেন। ওই কলামে তিনি ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক সফরেরও সমালোচনা করেন। কুলদীপ নায়ারের কলামটি এখানে তুলে ধরা হলো : ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর হয়েছে অসময়ে। মনে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষতিগ্রস্থ ইমেজ পুণরুদ্ধারের জন্যই যেন ছিল এই সফর। কিন্তু মোদির সফরে শুধু ভারত-বিরোধী মনোভাবটাই বেড়েছে কারণ দিল্লী আর আগের মতো নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকেনি। আমি জানি না, কেন এবং আর কত দিন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্বশীল শাসনকে আমাদের সমর্থন করে যেতে হবে। এটি ঠিক যে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা যিনি অত্যাচারী পশ্চিম পাকিস্তানের কাছ থেকে দেশকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সংবিধান বা স্বীকৃত নীতিনৈতিকতাকে তিনি ইচ্ছেমতো বিদ্রুপ করবেন।

উদাহরণস্বরূপ ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক সিটি নির্বাচনের কথা বলা যায়। ভোটার ও সংশ্লিষ্টদের আতঙ্কের মধ্যে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। শেখ মুজিব নিশ্চয়ই তার কবরের মধ্যে নাড়া খেয়েছেন। রাওয়ালপিণ্ডির সামরিক জান্তার শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের মত প্রকাশের অধিকার পুণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। সন্দেহ নেই, মোদির সফর মৌলবাদীদের মোকাবেলার সেক্যুলারপন্থীদের শক্তি যুগিয়েছে। কিন্তু তার নিজের মতোই চলেছেন। বিরোধী মতের লোকদের যেভাবে নির্দয়ভাবে দমন করেছেন তিনি, তাতে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার কি আদৌ মুক্ত রাষ্ট্র এবং গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার ওপর কোন বিশ্বাস ছিল? এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ হলো বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের প্রতি তার অপমানসূচক আচরণ। তিনি তার বাবা শেখ মুজিবের সহকর্মী ছিলেন এবং যিনি বাংলাদেশের একজন নীতিবান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। 


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচন বয়কটের বিষয়টি অচিন্ত্যনীয় ছিল। এটা সত্যি যে, নির্বাচন জেতার জন্য যে কোন কিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন হাসিনা। তবু বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নিত এবং তাদের কিছু সংখ্যক প্রার্থী জিতে বেরিয়ে আসতো, তাহলে তারা মানুষের সামনে হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধীতা করতে পারতেন। সন্দেহ নেই, সাধারণ নির্বাচনেই শাসকদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই নির্বাচনে বোঝা যায় সরকার সাধারণ নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে কি না। ভারত সৌভাগ্যবান কারণ প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যেভাবে দেশটাকে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পথে নিয়েছিলেন, সেটা সযত্নে লালিত হচ্ছে। তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছিলেন। শুধু গণমাধ্যমকেই চাপে রাখেননি, তিনি মৌলিক অধিকারকেও বাধাগ্রস্থ করেছিলেন। কিন্তু জনগণ সেই অবস্থাকে মেনে নেয়নি। তারা তাদের ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল সাধারণ নির্বাচনের সময়। এটা অকল্পনীয় ছিল যে শক্তিধর ইন্দিরা গান্ধীও পরাজিত হতে পারেন। 

১৯৮০ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে প্রতিশোধের পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। এটু দুঃখজনক যে জনতা সরকারের ধারেকাছে যারা ছিল, তাদের সবাইকে শাস্তি দিয়েছিলেন তিনি। ভারতের কংগ্রেস পার্টি অবশ্য শিক্ষা নিয়েছে। অন্যায় কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের অনুশোচনা করতে হয়েছে। আমার মনে হয় দলটা যদি জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতো ভাল হতো। অনুশোচনা আর ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যে পার্থক্য অনেক। দুঃখজনকভাবে, শাসনকার্যে জনতার কথা বলার অধিকারের আন্দোলন থেকেই যে দেশের জন্ম- সেই বাংলাদেশ তার অতীত অবস্থান হারিয়েছে। এই পরিণতিটা দুঃখজনক। এটা আরও গ্লানিকর হয়ে ওঠে যখন এই সব কিছুর মূলে এমন ব্যক্তি থাকেন, যার পরিবার পশ্চিম পাকিস্তানের থাবা থেকে জনগণকে মুক্ত করেছিল। হাসিনা ছাড়া আর কাউকে এখানে দোষি করা যায় না। তিনি নিজেই গণতন্ত্রের আগুন নিভিয়ে দিচ্ছেন। শেখ মুজিবের কন্যার হাতেই এটা হচ্ছে- এটা শুধু হতাশার বিষয় নয়, বিব্রতকরও বটে। তিনি এমনকি জাতিকে আরও আষ্টেপিষ্টে শেকলে জড়াচ্ছেন। কিন্তু এটা ঘটতেই পারে যখন তিনি সঠিক আর বেঠিক, নৈতিক আর অনৈতিকতার মাঝের সীমারেখা মুছে ফেলেছেন। এ রকম পরিবেশে- হাসিনার ভূমিকা যখন একজন স্বৈরাচারীর মতো, তখন মোদির সফর এমনকি আরও দুর্ভাগ্যজনক। 

বাংলাদেশ সফরকালে কোথাও অন্তত তার বলা উচিত ছিলো যে বাংলাদেশ একটি বিপ্লবের ফসল আর এ ধরণের চিন্তার ধারাবাহিকতা এখানে থাকা উচিত। কিন্তু মোদি উল্টো হাসিনাকেই সান্ত্বনা দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ হতাশ হয়েছে কারণ তারা আশা করেছিল ভারত এমন কিছু করবে যাতে বোঝা যায় তারা হাসিনার শাসনে খুশি নয়। এটা সত্য যে, ছিটমহল বিনিময় নিয়ে দীর্ঘ দিনের প্রতিক্ষীত চুক্তি বাস্তবায়নে মোদি সক্ষম। কিন্তু এটাতে আসলে সব দলেরই সমর্থন আছে যখন বিষয়টা ভারতীয় পার্লামেন্টে আলোচিত হয়েছে। যদিও চুক্তি বাস্তবায়নের কৃতিত্বটা তারই হবে। কিন্তু এই সুযোগে তিনি সব রাজনৈতিক দলগুলোকে ধন্যবাদ দিতে পারতেন এই চুক্তিতে সমর্থন দেয়ার জন্য। মোদি এককভাবে "বার্লিন প্রাচির" গুঁড়িয়ে দেয়ার কৃতিত্ব নিলে সেটা অভদ্র দেখাবে। আমার মনে হয় পাকিস্তানের সমালোচনা থেকে বিরত থাকলেই তিনি ভাল করতেন। সমালোচনাটা যে শুধু অপ্রত্যাশিত ছিল তা নয়, একটা সময়- যখন দক্ষিণ এশিয়ার সংহতি নিয়ে তিনি কথা বলছেন, সে সময় ইসলামাবাদকে এককভাবে আলাদা করে দেয়াটা এড়াতে পারতেন তিনি। তার বোঝা উচিত ছিল, যেমনটা বুঝেছিলেন তার পূর্বসুরীরা, যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে এক সময় যৌথ বাজার ব্যবস্থায় আসতে হবে এবং ব্যবসায়, বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরস্পরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ আশা করেছিল তিস্তার পানি নিয়ে চুক্তি হবে। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বিবৃতি ছিল এ ক্ষেত্রে অসহযোগীতামূলক। মোদি এমনকি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগেই তিনি বললেন, মোদির এজেন্ডার তালিকায় তিস্তা নেই। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফর ছিল একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এটা থেকে ঢাকা একটা বার্তা পেতো যে তিস্তা সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে দিল্লীর মনোভাব ইতিবাচক। ঢাকাকে এটা বোঝানো যেতো যে মোদির সফরে হয়নি মানে এই নয় যে দিল্লী তার নিজের মতো চলছে। প্রকৃতপক্ষে, মমতার সফরে ঢাকাকে এতটুকু আশ্বস্ত করা যেতো যে যখনই বিষয়টির সুরাহা হোক না কেন, প্রক্রিয়াটা এখানে শুরু হলো। 

শনিবার, ২৯ জুন, ২০১৩

ভারতের কালো দিনগুলো ও বর্তমান অবস্থার মধ্যে পার্থক্য নেই

ভারতকে তার ইতিহাসের কিছু দিনের কথা কখনোই ভুলে গেলে চলবে না। এর একটি হলো ২৬ জুন। ৩৮ বছর আগের ওই দিনের গভীর রাতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আলো নিভিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং দেশ স্বৈরশাসনের অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ এবং স্বাধীনতাকে ছিন্নভিন্ন করা হয়েছিল। সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার জন্য সরকার অপমানজনক কর্মকাণ্ড, ক্ষতি, আটক ইত্যাদির মাধ্যমে একটি অবৈধ কর্তৃপক্ষে পরিণত হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটি নির্বাচনী অপরাধের দায়ে পার্লামেন্ট থেকে অপসারিত ও পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতিতে অযোগ্য ঘোষণা করার পর এসব ঘটনা ঘটে। তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ‘এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়’-এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে বিশেষ ক্ষমতার মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত আইন চালু করাকে শ্রেয় মনে করলেন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে একনায়কতন্ত্র চালু করার কারণে উদার বিশ্বে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিন দশক ধরে সাংবিধানিক রাজনীতি উপভোগ করার পর ভারতের জনগণের কাছে এই অবস্থা ছিল অবিশ্বাস্য। ইন্দিরা গান্ধীর একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর এ-সংক্রান্ত একটি মন্তব্য ছিল তীè ও মর্মভেদী : ‘আমি শত্রুদের সেবা করতে পারি, কিন্তু আমি আমার বন্ধুদের কী বলব?’ ইন্দিরা গান্ধীর কাছে তার ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর মাধ্যমে অধিকতর নিষ্ঠুর শাসন চালানো ছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হতো না। সঞ্জয় গান্ধী তখন সংবিধানের এখতিয়ারের বাইরের যেকোনো ক্ষমতাচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। তার হাতে ছিল অবাধ কর্তৃত্ব। এই জরুরি অবস্থা প্রায় দু’বছর স্থায়ী হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে নির্বাচন মাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল এবং ছেলেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।
তারা দু’জন যে স্বৈরাচারী আচরণ করেছিলেন তা ছিল লজ্জাকর। একটি রুচিহীন ও আপত্তিকর কাজ ছিল হাজার হাজার লোককে জোর করে তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে বহু দূরের জনহীন প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়া। শিবসেনার মতো কয়েকটি চরমপন্থী সংগঠনের জন্য এগুলো একটি নজিরে পরিণত হয়েছিল। শিবসেনা কয়েক বছর পর বাংলাদেশীদের ধরে এনে জোরপূর্বক বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়। প্রকৃতপক্ষে, ইন্দিরা গান্ধী বহু ক্ষতিকর নজির স্থাপন করেছিলেন। যেমন তিনি সিভিল সার্ভিস তথা আমলাদের বশংবদ বা দাসসুলভ মনোবৃত্তির এবং পুলিশকে শাসকদের খেয়ালখুশির প্রতি আনুগত্যশীল করে গড়ে তুলেছিলেন। বর্তমানে বহু মুখ্যমন্ত্রী (তারা কংগ্রেস পার্টির হওয়ার প্রয়োজন নেই) ইন্দিরা গান্ধীর মতোই সমালোচকদের শায়েস্তা করার জন্য আমলা এবং পুলিশদের ব্যবহার করছেন।
জরুরি অবস্থায় আরো দেখা গেছে, কিভাবে শক্তিশালী বিচার বিভাগ সহজে বেঁকে যায় অর্থাৎ সহজে প্রভাবিত হয়ে যায়। কথিত উদারপন্থী পিএন ভানুওয়াতিসহ সুপ্রিম কোর্টের পাঁচজন বিচারপতির মধ্যে চারজনই জরুরি অবস্থা আরোপ করাকে ন্যায্য তথা যুক্তিযুক্ত বলেছিলেন। একমাত্র বিচারপতি যিনি ওই রায়ের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেননি তিনি হলেন বিচারপতি এইচ আর খান্না। ইন্দিরা গান্ধী যখন ভারতের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছিলেন তখন বিচারপতি খান্নাকে সুপারসিড করা হয়েছিল। বিচার বিভাগকে তখনো দেখতে চূর্ণবিচূর্ণ অর্থাৎ দুর্বল দেখালে সেটার কারণ হচ্ছে ওই কালো দিনগুলোতে বিচার বিভাগের ওপর যে আঘাত এসেছিল সেই আঘাতের ধকল থেকে এখনো বিচার বিভাগ মুক্ত হতে পারেনি।
ইন্দিরার বাবা জওয়াহের লাল নেহরু ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। তিনি স্বাধীনতার পর একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য মনস্থির করেছিলেন এবং তার প্রবৃদ্ধি অবলোকন করছিলেন। তিনি বিচার বিভাগের একটি উদাহরণ গ্রহণ করেছিলেন। একবার নেহরু তার নিজের ইচ্ছা অনুসারে বিচারপতি মেহর চাঁদ মহানজনকে সুপারসিড করার কথা চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু নেহরু দেখলেন, সুপারসিডের ঘটনা ঘটলে গোটা সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চই পদত্যাগের প্রস্তাব দেবে, তখন তিনি তার চিন্তাভাবনা অর্থাৎ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। অবশ্য পরে মহাজনকে ভারতের প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। সবচেয়ে তিরস্কারযোগ্য বিষয় হচ্ছে, জোরপূর্বক পরিবার পরিকল্পনাব্যবস্থা গ্রহণ করানো। সঞ্জয় গান্ধীর দৃষ্টান্তে ইন্দিরা গান্ধী জোরপূর্বক বন্ধকরণ কর্মসূচি চালু করেন। কম ছেলেমেয়ে নেয়ার এই প্রয়াস কেবল নিন্দনীয়ই নয়, বরং যখন ওই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হয় তখন দেখা যায় স্টালিন অথবা মাওজেদং যে ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন তার সাথে এর কোনো পার্থক্য নেই। জরুরি অবস্থার সময় ৬৫ বছরের বেশি বয়সের অনেক বৃদ্ধাকেও বন্ধ্যা করা হয় এবং এমনকি যেসব বালক মাত্র সাবালক হওয়ার পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে তারাও এই বর্বরতার শিকার হয়েছে। এমনকি পুলিশকে যেকোনো ব্যক্তির বেডরুমে প্রবেশ করে তারা পরিবার পরিকল্পনার নির্দেশনা মেনে চলছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। বিচার ছাড়াই ডিটেনশন বা আটকাদেশ দেয়া হচ্ছে ঔপনিবেশিক আমল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। ইন্দিরা গান্ধী এক লাখেরও বেশি লোককে বিচার ছাড়াই কারাগারে আটক রেখেছিলেন। আজকের ট্র্যাজেডি হচ্ছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওইসব পদ্ধতির অনুসরণ করছেন। মন্ত্রণালয় সন্ত্রাসবাদ  দমনের নামে গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধি-নিষেধ বা কড়াকড়ি আরোপ করছে। বেআইনি কর্মকাণ্ড আইন অনুযায়ী একটি ওপেন কোর্ট অব ল’তে বিনা বিচারে জনগণকে আটক করা যায়। সরকার নিযুক্ত এডভাইজরি কমিটি এ ধরনের বিষয় বা মামলাগুলোকে অনুমোদন করত এবং জেলের ভেতরেই এ ধরনের বিচার সম্পন্ন করা হতো। বিখ্যাত চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী ড. ভিনায়েক সেনকে এই আইনের আওতায় প্রথম আটক করা হয়। পরে বিজেপি শাসিত ঝাড়খণ্ড সরকার মাওবাদীদের সাথে ‘যোগাযোগ’ রাখার অভিযোগে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য অভিযুক্ত করে। ভারত কেন জরুরি অবস্থা থেকে শিক্ষা নেয়নি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শাসকেরা গণতন্ত্রকে লাইনচ্যুত করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী যে পথ অবলম্বন করেছিলেন সেই পথেই চলছেন তা ভেবে আমি প্রায় বিস্মিত হই। আমি মনে করি, এর কারণ হচ্ছে যে, যারা সীমালঙ্ঘন করে অপরাধ করে তাদের কোনো শাস্তি হয় না। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, যাদের দোষী হিসেবে পাওয়া যায় বর্তমানে তারা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের শাসনামলে রাষ্ট্রের বা সরকারের কাণ্ডারির ভূমিকায় রয়েছেন। জনতা পার্টির ব্যর্থতার কারণে দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রয়োজনে শাস্তি দেয়ার মতো বিষয়গুলো কেবল স্থগিতই করেননি বরং জরুরি অবস্থা বলবৎ না থাকা অবস্থায়ও জরুরি অবস্থার চেতনা যাতে অুণœ থাকে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য একই ধরনের কলঙ্কিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। গণতন্ত্রের ক্ষতির বিষয়টি কমবেশি ভুলে যাওয়া হয়েছিল। দেশ কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে তরুণেরা জানত না। প্রবীণেরা যারা সে সময়ের কথা স্মরণ করেনÑ তারা অত্যন্ত নির্জীব ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েন। সেটা ছিল একটা খারাপ স্বপ্নÑ যার অর্থ হচ্ছে সেটা ভুলে যেতে হবে। যাই হোক না কেন, বর্তমানে যখন নিরাপত্তা ও শান্তির নামে জরুরি অবস্থার সময়কার পদক্ষেপগুলো আবার গ্রহণ করা হচ্ছে, তখন মনে হচ্ছেÑ তখন ও এখনকার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
অবশ্যই জবাবদিহিতা থাকতে হবেÑ যেটা ছাড়া যে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে তার ইচ্ছামতো কর্তৃত্ব দেখাতে কোনো ভয় পাবে না। লোকপাল বিল যেটা এখনো আলাপ-আলোচনার মধ্যে রয়েছে- কে দোষী এবং দোষীকে কিভাবে শাস্তি দেয়া যায় সেটা খুঁজে বের করার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অনমনীয়। লোকপাল প্রধানমন্ত্রী, বিচার বিভাগ অথবা পার্লামেন্ট সদস্যদের দুর্নীতিতে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগের বিষয় দেখতে না পারলে তাহলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন কী? সরকার কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে নিয়ন্ত্রণ করলে ব্যুরোর যেকোনো কার্যক্রম অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। প্রভুকে ধন্যবাদ, আর কোনো জরুরি অবস্থা বলবৎ করা যাবে না, কারণ পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই এবং রাজ্যসভাগুলোতেও একই অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।
লেখক : যুক্তরাজ্যে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত, সাবেক রাজ্যসভা সদস্য ও প্রখ্যাত সাংবাদিক
গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১২

রোহিঙ্গা : রাষ্ট্রবিহীন মানুষ






ছোট ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের দিকে আসতে থাকা স্রোতের মতো মানুষগুলোই রোহিঙ্গা। কিন্তু আসলেই রোহিঙ্গা কারা, কী তাদের পরিচয়? মিয়ানমারে তাদের সংকট কী? এই সংকট কি সাময়িক, নাকি বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের বড় কোনো ঝুঁকি? বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাহিনী জানা থাকলেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের গল্প অনেকটাই অজানা আমাদের।
রোহিঙ্গা কারা?
নবম-দশম শতাব্দীতে আরাকান রাজ্য 'রোহান' কিংবা 'রোহাঙ' নামে পরিচিত ছিল, সেই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবেই 'রোহিঙ্গা' শব্দের উদ্ভব। ঠিক কবে থেকে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তা জানা যায় না। মিয়ানমার সরকার 'রোহিঙ্গা' বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। রোহিঙ্গারা পূর্বতন বর্মা, অধুনা মিয়ানমারের পশ্চিম অঞ্চলের মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সংখ্যায় প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গার অধিকাংশ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাশে উত্তর রাখাইন রাজ্য নামে নামকরণ করা পূর্ববর্তী আরাকান রাজ্যের তিনটি টাউনশিপে বাস করে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও উগ্র রাখাইনদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ও এথনিক ক্লিনজিংয়ের শিকার হয়ে প্রায় ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।


বাংলা-আরাকান সম্পর্ক
ইতিহাসের পাতা থেকে

১৪০৪ সালে বর্মার প্যাগান শাসকরা আরাকান দখল করে নিলে আরাকান রাজা মিন-স-মুন (মতান্তরে রাজা নারামেইখলা) পূর্বদিকে পালিয়ে বাংলায় চলে আসেন। বাংলার গৌড় সালতানাত তখন দিলি্লর মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মিন-স-মুন আশ্রয় নেওয়ার পরে দীর্ঘদিন গৌড় সুলতানের অধীনে রাজকর্মচারী হিসেবে কাজ করেন।
১৪২৯ সালে সুলতান নাদির শাহ মিন-স-মুনকে তাঁর হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হন। সালতানাতের অস্ত্র ও সেনা সহায়তায় মিন-স-মুন পরের বছর তাঁর রাজ্য পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। এর ফলে ১৪৩০ থেকে ১৫৩১ সাল পর্যন্ত ১০০ বছর আরাকান রাজা গৌড় সালতানাতের পরোক্ষ শাসনাধীন ছিলেন। এ সময় এই অঞ্চলে মুসলমানদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। এ সময়কার আরাকান রাজারা যদিও ধর্মে বৌদ্ধ ছিলেন, কিন্তু সালতানাতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে তাঁরা মুসলিম পদবি ধারণ করতেন। এ সময়কার আরাকানি মুদ্রায় কলেমা ও পার্সিয়ান লিপি চালু ছিল। এ সময় মিন-স-মুনের ভাই আলী খান এবং ছেলে কলিমা শাহ নামে পদবি নিয়ে বা-সো-প্রু যথাক্রমে রামু ও চট্টগ্রামের আশপাশের আরো কিছু অঞ্চল পর্যন্ত আরাকান রাজ্য বিস্তৃত করেন। এই রাজবংশের দ্বাদশ রাজা যুবক শাহ পদবিধারী রাজা মিন-বিনের শাসনকালে ১৫৩১ থেকে ১৫৫৩ সাল পর্যন্ত আরাকান রাজ্য সমৃদ্ধির চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। তিনি বাংলার সালতানাত থেকে নিজেকে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজা মিন-বিন পর্তুগিজদের তাঁর সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য নিয়োগ দেন এবং পর্তুগিজ সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলেন।
এ সময় বাংলার শাসকরা মোগল শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে মোগল সম্রাট হুমায়ুন বাংলা আক্রমণ করেন। বাংলার এই অস্থিরতার সুযোগে আরাকান রাজা মিন-বিন পূর্ব বাংলার এক বিশাল অংশ দখল করে নেন। পরবর্তী ১২০ বছর এই এলাকা আরাকান রাজার অধীনে ছিল। মিন-বিন পূর্ব বাংলার দখল করা অংশগুলো স্থানীয় রাজাদের মাধ্যমে শাসন করতেন। চট্টগ্রামে আরাকান রাজের গভর্নরের দপ্তরে এই রাজারা খাজনা প্রদান করতেন। এ সময় এ অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে নানা রকম সামাজিক সম্পর্কের সূত্রপাত হয় এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাসহ বাংলা ভাষার কিছু অপভ্রংশ ছোট আকারে হলেও আরাকানে পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার হলো, আরাকান স্বাধীনতা অর্জনের পর ও ১৭৮৪ সালে ব্রিটিশ শাসন আসার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৫০ বছর এই অঞ্চলের রাজসভায় মুসলিম রীতিনীতি ও সংস্কৃতি চালু ছিল। তবে অনেক রোহিঙ্গানেতা দাবি করেন, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে তাঁদের পূর্বপুরুষরা আরাকানে বসতি গেড়েছিলেন। তাঁরা মনে করেন, সপ্তম শতকে আসা পার্সিয়ান বণিকদের মাধ্যমে এখানে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয় এবং পরবর্তী সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুসলমানরাও ধীরে ধীরে এখানে রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত ও আত্তীকৃত হয়ে পড়েন। তাঁদের এই দাবিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না সহজে। 'আরাকান' শব্দটি আরবি অথবা পার্সি ভাষার কোনো শব্দের অপভ্রংশ হিসেবেই মনে করা হয়। তবে গৌড়ের সুলতানদের পরোক্ষ শাসন শুরু হওয়ারও প্রায় ১০০ বছর আগে আরব ভূবিদ রাশিদ উদ্দিন ১৩১০ সালেই এই এলাকাকে 'রাহান' নামে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু অনেক পরে, ১৫৮৬ সালের দিকে, ব্রিটিশ পর্যটক রালফ ফ্লিচ এই এলাকাকে বর্ণনা করেছেন 'রোকন' নামে। স্পষ্টতই বোঝা যায়, এই এলাকায় একসময় মুসলমানদের শক্ত রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। আরাকান বা অধুনা উত্তর রাখাইন প্রদেশের ভূমিপুত্র হিসেবে দাবিদার বর্তমান রাখাইনদের তুলনায় মুসলমানরা এই অঞ্চলে খুব বেশি দেরিতে আসেননি। যত দূর জানা যায়, ৯৫৭ সালের দিকে মোঙ্গলদের সময় এই অঞ্চলে রাখাইনরা বসতি স্থাপন করে।
  
স্বাধীন বর্মায় বৈষম্যের শিকার
পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিল তারা

১৭৮৪ সালে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে নিলে আবারও বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বর্মার যোগাযোগ বেড়ে যায়। এ সময় বর্মার বনজ সম্পদ আহরণ ও অন্যান্য কাজে ব্রিটিশরা ব্যাপকসংখ্যক ভারতীয়কে মিয়ানমারে নিয়ে যায়। ভাগ্যান্বষণে অনেক ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালিরাও সেখানে ভিড় করে। স্থানীয় রাখাইনদের তুলনায় তারা ব্রিটিশদের কাছে বেশি গুরুত্ব লাভ করে এবং সরকারি পদে আসীন হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে, ১৯৪২ সালে, জাপানিরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে মিয়ানমার দখল করে নেয়। স্থানীয় রাখাইনরা এ সময় জাপানিদের পক্ষ নিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত জনগণকে আক্রমণ করে। তাদের আক্রমণের শিকার হয় মূলত রোহিঙ্গা মুসলমানরা। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ রাখাইন অধ্যুষিত মিমবিয়া ও ম্রোহাং টাউনশিপে প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করে রাখাইনরা। পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে উত্তর রাখাইন অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার রাখাইনকে হত্যা করে রোহিঙ্গারা। সংঘাত তীব্র হলে জাপানিদের সহায়তায় রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের কোণঠাসা করে ফেলে।
১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার জাপানিদের দখলে থাকে। এই তিন বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে তৎকালীন বাংলায় চলে আসে। সেই যাত্রা এখনো থামেনি। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশরা আবারও মিয়ানমার দখল করে নেয়। এই দখলে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। ব্রিটিশরা এ সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সহায়তার বিনিময়ে উত্তর রাখাইনে মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাজ্য গঠন করে দেবে তারা। কিন্তু আরো অনেক প্রতিশ্রুতির মতোই ব্রিটিশরাজ এই প্রতিশ্রুতিও রাখেনি।
১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ভাগের সময় রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এ নিয়ে জিন্নাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেন রোহিঙ্গানেতারা। রোহিঙ্গারা একটি বড় সশস্ত্র গ্রুপও তৈরি করে এবং মংদু ও বুথিধাং এলাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নেয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের এই উদ্যোগ ছিল আত্মঘাতী এবং মিয়ানমারে বৈষম্যের শিকার হওয়ার পেছনে এটি একটি বড় কারণ। মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সেই সময়কার রোহিঙ্গা উদ্যোগকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে। বাংলাদেশে যেভাবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সরাসরি সহায়তা করার কারণে বিহারি উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী সাধারণ মানুষের ঘৃণার শিকার হয়েছে, রোহিঙ্গারা সরাসরি সহায়তা না করলেও মিয়ানমারে একই ভাবে বিরূপ জনমতের শিকার। ১৯৬২ সালে মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর ধীরে ধীরে রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭০ সালের পর থেকে সেনাবাহিনীতে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে থেকে সরকারি চাকরিতে থাকা রোহিঙ্গারা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়।
  
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন
রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে রাষ্ট্রহারা

১৫ অক্টোবর ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নাগরিকত্ব আইন প্রকাশ করে। এই আইনে মিয়ানমারে তিন ধরনের নাগরিকত্বে বিধান রাখা হয়_পূর্ণাঙ্গ, সহযোগী এবং অভিবাসী। এই নতুন আইনে বলা হয়, ১৮২৩ সালে মিয়ানমারে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে মিয়ানমারে বাস করা ১৩৫টি গোত্রভুক্ত মানুষই মিয়ানমারের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। রোহিঙ্গাদের গোত্র হিসেবে অস্বীকার করে সামরিক সরকার। তারা দাবি করে 'রোহিঙ্গা' বলে কোনো গোত্র তাদের দেশে নেই, এই জনগোষ্ঠী আদতে পূর্ব বাংলা থেকে যাওয়া অবৈধ জনগোষ্ঠী, যারা ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরবর্তী মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী তারা মিয়ানমারের নাগরিক হতে পারবে না। মিয়ানমারের সামরিক সরকার ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে আরাকান রাজ্যের দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগকে অস্বীকার করে। আইনে 'সহযোগী নাগরিক' হিসেবে শুধু তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, যারা ১৯৪৮ সালের নাগরিকত্ব অ্যাক্টে ইতিমধ্যেই আবেদন করেছে। এ ছাড়া 'অভিবাসী নাগরিক' (মিয়ানমারের বাইরে জন্ম নিয়েছে এমন মানুষদের নাগরিকত্ব) হিসেবে কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়, যেগুলো 'যথাযোগ্যভাবে প্রমাণসাপেক্ষ' বলে বলা হয়, যারা মিয়ানমারের স্বাধীনতার আগে (৪ জানুয়ারি ১৯৪৮) এ দেশে প্রবেশ করেছে, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ভাষায় দক্ষ এবং যাদের সন্তান মিয়ানমারে জন্মগ্রহণ করেছে, তারাই এই ধারায় নাগরিকত্ব পেতে পারে। যুগ যুগ ধরে আরাকানে থাকা রোহিঙ্গাদের পক্ষে ১৯৪৮ সালের আগে প্রবেশ করা সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা ছিল অসম্ভব। এ ছাড়া বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা প্রধানত নিরক্ষর এই জনগোষ্ঠীর পক্ষে মিয়ানমারের রাষ্ট্রভাষায় 'দক্ষতা' প্রমাণ হয়ে পড়ে দুরূহ; কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন যে 'কেন্দ্রীয় কমিটি' এই নাগরিকত্ব প্রদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল, তারা প্রায় প্রকাশ্যেই রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখায়। সুতরাং রোহিঙ্গারা আর নাগরিকত্ব পায় না। তারা হয়ে পড়ে উদ্বাস্তু, কয়েক পুরুষ ধরে বাস করা নিজেদের ভিটেমাটিতে তারা হয়ে পড়ে কয়েদি। বিশ্বের বুকে জন্ম নেয় রাষ্ট্রবিহীন সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী।

তেরঙা কার্ডে ঠাঁই হয়নি তাদের
১৯৮৯ সাল থেকে মিয়ানমার তিন ধরনের নাগরিক কার্ডের প্রচলন করে। পূর্ণাঙ্গ নাগরিকদের জন্য গোলাপি, সহযোগী নাগরিকদের জন্য নীল এবং অভিযোজিত নাগরিকদের জন্য সবুজ রঙের কার্ড দেওয়া হয়। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পড়াশোনা-চিকিৎসাসেবাসহ সব ধরনের কাজকর্মে এই কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের কার্ড দেওয়া হয় না। এর ফলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মিয়ানমারে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সাল থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্মনিবন্ধন বন্ধ করে দেয় মিয়ানমার সরকার। পরে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনের চাপে রোহিঙ্গাদের তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। এ সময় রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয় সাদা কার্ড, যেখানে জন্মস্থান এবং তারিখ লেখা হয় না। এর ফলে এই কার্ড মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না এবং রোহিঙ্গাদের কোনো কাজেও আসে না। কয়েক বছর পর এই কার্ডও বন্ধ করে দেয় সরকার। রোহিঙ্গাদের নাম শুধু তালিকাভুক্ত করে রাখা হয় নাসাকা বাহিনীর খাতায়।
  
নিজ গ্রামের উন্মুক্ত কারাগারে
মিয়ানমার জান্তা রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। আর তাই 'বহিরাগত' হিসেবে চিহ্নিত এসব রোহিঙ্গাকে রাখা হয়েছে কারাগারে। না, আট লাখ রোহিঙ্গাকে বন্দি করার মতো বড় কারাগার মিয়ানমার তৈরি করতে পারেনি, তাই রোহিঙ্গারা নিজ গ্রামেই বন্দি। মিয়ানমারের অন্য কোনো অঞ্চলে যাওয়ার কথা তো দূরূহ, পাশের গ্রামে যাওয়ারও কোনো অনুমতি নেই তাদের। নিজ গ্রামের বাইরে যেতে হলে তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার কাছ থেকে ট্রাভেল পাস নিতে হয়। এই ট্রাভেল পাস নিয়েই তারা গ্রামের বাইরে যেতে পারে। কিন্তু ট্রাভেল পাস পাওয়া কঠিন বিষয়। এ জন্য নাসাকাকে দিতে হয় বড় অঙ্কের ঘুষ। তার পরও রক্ষা নেই। যদি ট্রাভেল পাসে উলি্লখিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ গ্রামে ফিরতে ব্যর্থ হয় কোনো রোহিঙ্গা, তা হলে তার নাম কাটা যায় ওই গ্রামের তালিকাভুক্তি থেকে। সে তখন নিজ গ্রাম নামের কারাগারেও অবৈধ হয়ে পড়ে। তাদের ঠাঁই হয় জান্তা সরকারের জেলখানায়।

বিয়েতে বাধা, সন্তান ধারণে নিয়ন্ত্রণ!
১৯৯০ সালে আরাকান রাজ্যে স্থানীয় আইন জারি করা হয়। আইনটিতে উত্তর আরাকানে বাস করা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই আইন অনুযায়ী এই অঞ্চলে বাস করা রোহিঙ্গাদের বিয়ের আগে সরকারি অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এই অনুমোদনের দায়িত্বে রয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা। সাধারণত বিয়ের অনুমোদন পাওয়া খুবই কঠিন। সরকারি ফির পাশপাশি এ জন্য বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিতে হয় নাসাকার লোকজনকে। তার পরও বিয়ের অনুমতি পেতে অধিকাংশ সময় বছরের পর বছর চলে যায়। এই অনুমোদন পাওয়া খুব কষ্টকর এবং প্রায় ক্ষেত্রেই অসম্ভব। তাই রোহিঙ্গাদের পক্ষে বৈধভাবে বিয়ে করার হার খুবই কম। রোহিঙ্গারা নিজ গোষ্ঠীর বাইরে বিয়ে করতে পারে না। যদিও মিয়ানমারে এ রকম কোনো রাষ্ট্রীয় আইন নেই, তবু রোহিঙ্গারা নিজেদের বাইরে স্থানীয় কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন আইনের ফাঁকে ফেলে ১০ বছর পর্যন্ত জেল দেওয়ার নজির আছে।
২০০৫ সালে নাসাকা বাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এ সময় দীর্ঘদিন বিয়ে সংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয় নাসাকা। পরের বছর যখন আবার আবেদন গ্রহণ চালু হয়, তখন নিয়মকে করা হয় আরো কঠোর। তখন থেকে আবেদনের সঙ্গে নবদম্পতিকে মুচলেকা দিয়ে বলতে হয় যে এই দম্পতি দুইয়ের অধিক সন্তান নেবে না।
তবে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে বিয়ে করতে বাধার সম্মুখীন হওয়ায় রোহিঙ্গাদের পারিবারিক জীবন হয়ে পড়েছে অমানবিক। বিয়ের জন্য তথাকথিত অনুমোদন পাওয়ার আগেই যেসব রোহিঙ্গা মুসলিম ধর্মমতে বিয়ে করছে, তারা সন্তান নিতে পারছে না। কেউ সন্তান ধারণ করলে তাকে গোপনে গর্ভপাত করাতে হচ্ছে। তার পরও যেসব শিশুর জন্ম হচ্ছে, তাদের অন্য কোনো বৈধ দম্পতির সন্তান হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে হচ্ছে। এমন ভুরি ভুরি নজিরও আছে, যেখানে রোহিঙ্গা দম্পতি নিজেদের সন্তানকে তাদের বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে তালিকাভুক্ত করাতে বাধ্য হয়েছে। অনেকেই সন্তান ধারণ করলে বাংলাদেশে চলে গেছে এবং সেখানেই বাংলাদেশে বসবাসকারী উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের কাছে সন্তানকে রেখে আবার ফিরে এসেছে। চলতি সপ্তাহেও একটি পরিত্যক্ত নৌকা থেকে এ রকম এক নবজাতককে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
   চিকিৎসা ও শিক্ষায় সীমিত অধিকার
রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের নাগরিক অধিকার অনেক দূরের ব্যাপার। সরকারি চাকরি তাদের জন্য নিষিদ্ধ। উত্তর আরাকানের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবা চালু আছে। কিন্তু এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখাইন এবং বার্মিজ নাগরিকরা স্থানীয় রাখাইন ভাষায় কথা বলার কারণে রোহিঙ্গারা সেখানে গিয়ে পূর্ণ চিকিৎসা নিতে পারে না। সরকারি বড় হাসপাতালে তাদের প্রবেশ পদ্ধতিগতভাবে নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ নিতে পারে না। এমনকি রোহিঙ্গা মহিলাদের জরুরি ধাত্রীবিদ্যা শেখানোর উদ্যোগ নিয়েও মিয়ানমার সরকারের কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে সেবা সংস্থাগুলো।
চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এমনকি অতি গুরুতর অসুস্থ রোগীকেও গ্রামের বাইরে নিয়ে যেতে হলে আগে ট্রাভেল পাসের জন্য অনুমতি নিতে হয়। এ কারণে অনেক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে বাংলাদেশে চলে আসে। এদের অধিকাংশই আর ফিরে যায় না।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও রোহিঙ্গারা বৈষম্যের শিকার। ধীরে ধীরে তাদের অধিকার সংকুচিত করে ফেলেছে মিয়ানমার সরকার। রোহিঙ্গাদের মধ্যে অশিক্ষার হার ৮০ শতাংশ, যা মিয়ানমারের সাধারণ অশিক্ষার হারের দ্বিগুণ। উত্তর আরাকানের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এমনিতেই মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা খুব কম; কিন্তু গ্রামের বাইরের সেই স্কুলগুলোতে পড়তে গেলেও ট্রাভেল পাস নিতে হয় রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ার অনুমোদন বন্ধ করা হয় ২০০১ সালে। তখন থেকে শুধু দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে ঘরে বসে রোহিঙ্গারা উচ্চশিক্ষা পেতে পারত এবং পরীক্ষা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারত। ২০০৫ সাল থেকে এই নিয়মও বন্ধ করে দেয় মিয়ানমার জান্তা।
 অপারেশন নাগামিন
বাংলাদেশে প্রথম উদ্বাস্তু ঢেউ-১৯৭৮

১৯৭৪ সালে জান্তা সরকার চালু করে ইমার্জেন্সি ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট। এই অ্যাক্টে বলা হয়_ভারত, চীন ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণ করাই আইনের উদ্দেশ্য। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নাগরিক কার্ড বহন করা বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু এ সময় কোনো রোহিঙ্গাকে নাগরিক কার্ড দেওয়া হয় না, তাদের দেওয়া হয় 'অভিবাসী কার্ড'; যে কার্ড প্রমাণ করে যে তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। প্রথমদিকে এ রকম কার্ডে কোনো সমস্যা বোঝা না গেলেও, আসল সমস্যা শুরু হয় কয়েক বছর পর। ১৯৭৭ সালে সামরিক সরকার শুরু করে 'অপারেশন নাগামিন' বা 'ড্রাগন রাজ'। এই অপারেশনে অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার নামে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাখাইনরা। ১৯৭৮ সালের মে মাসের মধ্যে কমপক্ষে দুই লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
   
বাংলাদেশে উদ্বাস্তুদের দ্বিতীয় জোয়ার : ১৯৯১-৯২
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বাকি সব নাগরিক অধিকার সংকুচিত করে ফেললেও ১৯৯০ সালের নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক অধিকার না থাকা মিয়ানমারে ভোট বিষয়ে সরকারের অভিজ্ঞতার অভাবই হয়তো রোহিঙ্গাদেরও ভোটার করার ভুল করে বসে সরকার। ব্রিটিশ শাসনকালে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার ছিল, তাই জান্তা সরকার বিষয়টিকে আলাদাভাবে দেখেনি।
এই নির্বাচনে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় অং সাং সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) বিজয়ী হয়। মিয়ানমারের এই নির্বাচনে এনএলডি ৪৮৫টি আসনের মধ্যে ৩৯২টি আসন পেলেও জান্তা সরকার সুচির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। এতে করে মিয়ানমারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষ আর বিক্ষোভ। ২১টি এথনিক গ্রুপ মিলে তৈরি হয় 'ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স অব বর্মা' যা ড্যাব নামে পরিচিতি পায়। ড্যাব ঘোষণা করে, সামরিক সরকারের হাত থেকে গণতন্ত্র ছিনিয়ে আনতে তারা সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করবে। রোহিঙ্গাদের দুটি সংগঠন অল বর্মা মুসলিম ইউনিয়ন এবং আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্টও যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তারাও সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে শামিল হবে।
সামরিক একনায়করা যা করে, এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জনরোষকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পর্যবসিত করতে আক্রমণ শুরু হয় রোহিঙ্গাদের ওপর। উস্কে দেওয়া হয় স্থানীয় রাখাইনদের। একই সঙ্গে চলে সামরিক অভিযান। নির্যাতন মাত্রা ছাড়া করে রোহিঙ্গাদের আরেকবার ঠেলে দেওয়া হয় বাংলাদেশের দিকে। বড় আকারের রোহিঙ্গা শরণার্থী আগমনের দ্বিতীয় পর্যায় ঘটে এ সময়। ১৯৯১ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সরকার জানায়, পূর্ববর্তী ছয় মাসে অন্তত দুই লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ সময় থাইল্যান্ড এবং বিশেষ করে মালয়েশিয়াতেও ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা কামনা করে। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি হয়। ১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব বহিরাগত উদ্বাস্তুকে ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও মিয়ানমারের অসহযোগিতায় সেটি শেষপর্যন্ত সম্ভব হয়নি। ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশও আবার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।
 সতর্ক থাক বাংলাদেশ!
দায় আন্তর্জাতিক মানবগোষ্ঠীর

রোহিঙ্গা যে আমাদের জন্য মিয়ানমারের চাপিয়ে দেওয়া একটি বড় বিপদ, সে বিষয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখনো সচেতন নয়। অধিকাংশ লোকই একে দেখছে একটি মানবিক বিপর্যয় ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসেবে। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা কোনো সাময়িক বিপর্যয় নয়, দীর্ঘ কয়েক যুগের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে আসা এথনিক ক্লিনজিং। মিয়ানমার সরকার চায় এই প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গার দায় সব সময়ের জন্য বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দিতে। মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তারা প্রায়ই প্রকাশ্যে এই রোহিঙ্গাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এ সময় বাংলাদেশকে সতর্ক হতে হবে। শুধু ভাষা, ধর্ম কিংবা নৃতাত্তি্বক গঠনে সাদৃশ্য থাকার কারণেই মিয়ানমারের ২০ লাখ লোকের দায় বাংলাদেশ নিতে পারে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত প্রহরা শিথিল না করার একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের উচিত হবে না বিশ্বের কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এই অবস্থান থেকে সরে আসা। রোহিঙ্গা সমস্যার সঙ্গে বাংলাদেশ কোনোভাবেই যুক্ত হতে পারে না। ইতিমধ্যে যে বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা এ দেশে অনুপ্রবেশ করেছে তাদেরও ফেরত দানের ব্যাপারে বাংলাদেশকে বড় আকারে উদ্যোগ নিতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যদি এদের ফেরত দেওয়া না যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন। মিয়ানমার এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো বদ্ধ দেশ নয়। গণতন্ত্রের পথে দেশটি এক পা-দুই পা করে অগ্রসর হচ্ছে। নিজেদের সভ্যদেশ হিসেবে প্রমাণ করতে হলে মিয়ানমারের উচিত দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা। একটি দেশের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস করে আসা বড় একটি জনগোষ্ঠী নাগরিকত্ববিহীন থাকতে পারে না। পৃথিবীর সব মানুষেরই একটি দেশ পাওয়া জন্মগত অধিকার, মিয়ানমারের সেনাশাসকরা গায়ের জোরে সেই অধিকার অস্বীকার করবেন, সেটি চলতে পারে না। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যদি দেওয়া না যায়, তা হলে আগামী দিনের ইতিহাসে একালের বিশ্ব নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখেই পড়তে হবে।
  

বৃহস্পতিবার, ১০ মে, ২০১২

ভারতে মাওবাদ আদর্শ যখন কলুষিত হয়


বস্তার জঙ্গলের প্রান্তে চিন্তাগুফা নামের ছোট্ট এক গ্রামে ঝুলছে নিরাপদ পর্যটনের সেই দিনগুলোর একটি সাইনবোর্ড: ‘ওয়েলকাম টু হেভেন’। বস্তার জঙ্গল মাওবাদী উগ্র বামপন্থী নকশালের ঘাঁটি। কয়েক দিন আগে এখান থেকেই অপহূত হয়েছেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অ্যালেক্স পল। মাওবাদী নকশালপন্থীরা যে বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তা হলো, বিপ্লব আসবে বন্দুকের নল দিয়ে; চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও জে দং কুমিনতাংয়ের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে এই দর্শনের চর্চা করতেন।
মাও জে দং কেন সফল হয়েছিলেন, আর নকশালপন্থীরা কেন সফল হতে পারেননি, তা বিপ্লবের ক্ষেত্রে একটা শিক্ষা বলে বিবেচিত হতে পারে। চীনে কমিউনিস্টরা কমিউনিজমের যে আদর্শ অনুসরণ করতেন, জনগণকেও সেই আদর্শে বিশ্বাসী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতের মাওবাদীরা বছর পঞ্চাশেক আগে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রাম থেকে যখন যাত্রা শুরু করেন, তখন তাঁরা নিঃসন্দেহে আদর্শবাদীই ছিলেন। কিন্তু বন্দুকের ব্যবহার করতে করতে তাঁরা পথ হারিয়ে ফেলেন, নিরাপত্তার জন্য তাঁদের আশ্রয় নিতে হয় গভীর জঙ্গলে। তাঁরা ভূমিহীনদের ভূমি দিয়েছেন, কিছু কিছু জায়গায় ‘মুক্তাঞ্চল’ গড়ে তুলেছেন; কিন্তু জনগণের মন জয় করতে পারেননি। মাওবাদীরা ভূমিহীন মজুর আর চাষিদের মধ্যে সমীকরণ করেননি, অথচ তাঁদের ‘বিপ্লবের’ অংশ করতে চেয়েছেন। মাও জে দংয়ের অনুসারীরা ছিলেন জনগণের বাহিনী। মাওবাদীরা কিছু কিছু এলাকায় খুব জোর যা করেছেন, তাতে তাঁদের বলা যায় ভূমি-সংস্কারক। নিরাপত্তার জন্য তাঁরা খোলামেলা অঞ্চলের চেয়ে বেশি পছন্দ করেন গভীর জঙ্গল, পুলিশের সদস্যদের অপহরণ বা হত্যা করেন। তাঁরা স্বীকার করেন যে জনগণের কাছে তাঁদের আদর্শের তেমন কোনো আবেদন নেই। অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর অঞ্চল বা আদিবাসীদের খনিজসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্ট্রীয় মদদে বড় বড় করপোরেশনগুলো গ্রাস করে নিচ্ছে বলে মাওবাদীরা যখন তাদের পক্ষে দাঁড়ান, তখন তাঁরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন বটে। কিন্তু তারপর কী ঘটে? কয়েক দশক ধরে ভারতের মাওবাদীরা এটাই করে আসছেন। নিজেদের মতো করে একটা ‘লাল করিডর’ তৈরির বাইরে তাঁরা যাননি, তাঁদের যত বিপ্লব ওই ‘করিডরের’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ওই করিডর যে রাষ্ট্র আবার দখল করে নেবে, তা তো সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ, বন্দুকের নলই যদি সব ক্ষমতার উৎস হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে তো বন্দুক আছে তাঁদের চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি। আজ হোক আর কাল, ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার (এনসিটিসি) বিদ্রোহ দমনের জন্য সমন্বিত অভিযান চালাবেই।
কমিউনিস্টরাও (মার্ক্সবাদী) একসময় একই রকমের দ্বিধায় পড়েছিলেন: কোন পথে যাবেন? সশস্ত্র বিপ্লবের, নাকি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে? শেষ পর্যন্ত তাঁরা নির্বাচনী ব্যবস্থার পথই বেছে নিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচনে, ১৯৫৭ সালে তাঁরা কেরালা জয় করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা শাসনকার্য চালিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায়। শেষে তাঁরা কেরালায় ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারিয়েছেন এই কারণে যে জনগণের কাছে তাঁরা নিজেদের আবেদন ধরে রাখতে পারেননি। তাঁরা ও তাঁদের ক্যাডাররা রূঢ়ভাবে রাজ্যশাসন করেছেন, কিন্তু শ্রেণীহীন সমাজের আদর্শের প্রতি জনগণকে আকৃষ্ট করতে পারেননি। পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু একবার আমার এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, তাঁর সরকার বেশি কিছু করতে পারেনি, কারণ শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি অনেক পদক্ষেপ নিতে পারেন না, কমিউনিস্ট হিসেবে তিনি যেগুলো নিতে চান।
কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে বিশ্বাসী কট্টর শিখরাও একসময় ভীষণ আদর্শবাদী ছিলেন। এমনকি অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে তাঁদের পোস্টারগুলো দেখা যেত লাল কালিতে লেখা; তাঁরা কথা বলতেন এমন এক স্বায়ত্তশাসিত পাঞ্জাব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞা নিয়ে, যেখানে সাম্য আর ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু নকশালপন্থীদের মতো তাঁদেরও অবক্ষয় ঘটে, তাঁরাও পরিণত হন এমন এক শক্তিতে, যে শক্তি টিকে থাকার জন্য বা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অপহরণ আর হত্যার আশ্রয় নেয়। তাঁদের বিপ্লবীপনা ব্যর্থ হয়েছে এ জন্য নয় যে তাঁদের চেয়ে রাষ্ট্রের হাতে বন্দুক আছে বেশি, বরং এই জন্য যে তাঁদের প্রতি জনগণের সমর্থন ছিল সামান্য। আর যেটুকু জনসমর্থন তাঁদের ছিল, সেটুকুও তাঁরা হারাতে থাকেন অর্থহীনভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার ফলে।
অঙ্গীকার যখন অজুহাতে পরিণত হয়, তখন আদর্শ হারিয়ে যায়। ক্ষমতার উদগ্র বাসনা পেয়ে বসে। এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লবী আর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। কারণ, উভয়েরই লক্ষ্য অভিন্ন: যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা চাই। আদর্শ পেছনে পড়ে থাকে। উচ্চাভিলাষ আর কর্তৃত্বপরায়ণতা প্রবল হয়ে ওঠে। প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে সাফল্য, তা সে যতই ক্ষণস্থায়ী হোক। এর একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হলেন মার্ক্সবাদীরা।
একটা সময় মাওবাদীরা পরিচিতি অর্জন করেছিলেন গরিব ও অসহায় মানুষের রুজি-রোজগার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে দৃঢ়তার জন্য। কিন্তু তাঁরা বন্দুকবাজে পরিণত হয়েছেন। কঠোর বিধিনিষেধের অধীনে কৃষক ও বেকার লোকেরা সুখী হয় কি না, বলা কঠিন। তা যদি হয়, তাহলে মাওবাদীদের তৈরি করা সব ‘মুক্তাঞ্চল’, যা নাকি গোটা ভারতের ছয় ভাগের এক ভাগ, ‘ধরার বুকে স্বর্গ’ হয়ে উঠত। কেননা ওসব মুক্তাঞ্চলে মাওবাদীরা নিজেরাই নিজেদের রাজা। কিন্তু আমি যতটুকু জানি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে ভারতের অবশিষ্ট অংশের উন্নত এলাকাগুলো জনগণের কাছে মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চলগুলোর চেয়ে অনেক ভালো, জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি অনেক অনেক বেশি।
এ কথা সত্য যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীন অঞ্চলগুলোতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনেক দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য আছে, কিন্তু সেখানে কোনো স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কত্ব নেই। স্তালিনের অধীন রাশিয়া ছিল বসবাসের জন্য সবচেয়ে খারাপ দেশ। বা তাঁর উত্তরসূরি যাঁরা তার চেয়ে কম কঠোর ছিলেন, তাঁদের আমলের রাশিয়াও ছিল একই রকমের। চীনারা সম্পদশালী হয়েছে, কিন্তু তারা মুক্ত নয়। ‘বিগ ব্রাদার’ সব সময় তাদের ওপর নজর রাখছে। ভারতের মাওবাদীরা নিজেদের জন্য একটা মডেল তৈরি করে নিয়েছেন, সেটা মাও জে দংয়ের দর্শনের কাছাকাছি। কিন্তু তাঁদের উপলব্ধি করা উচিত যে, সর্বোত্তম বিপ্লবগুলোও ব্যর্থ হয়ে গেছে আদর্শের বিচ্যুতি ঘটার কারণে। মূল কথাটা হচ্ছে, যতই চাপ থাকুক না কেন, আদর্শকে কলুষিত করতে হয় না।
অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় বা বোমা ফাটানোর মধ্য দিয়ে মাওবাদীরা সাময়িকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন, কিন্তু একসময় তাঁরা যেসব আদর্শের স্বপ্ন দেখতেন, সেগুলো এভাবে পূরণ হতে পারে না। লক্ষ্য অর্জনের পন্থাগুলো কী হবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পন্থা যদি দূষিত হয়, তাহলে লক্ষ্যও দূষিত হয়ে পড়তে বাধ্য। এই নীতির ভিত্তিতেই মহাত্মা গান্ধী আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন। মাওবাদী বা অন্য যেকোনো বামপন্থী গোষ্ঠীর ভেবে দেখা উচিত, ৩০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে গান্ধী কেন সফল হয়েছিলেন, আর তাঁরা কেন তার প্রায় দ্বিগুণ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও লক্ষ্য অর্জন থেকে আগের মতোই অনেক দূরে রয়ে গেলেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

বুধবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১১

দুর্নীতি - ভারতে সরকার বনাম সুশীল সমাজ!


ভারতে সরকার আর সুশীল সমাজের মধ্যে যেন লড়াই শুরু হয়েছে। পার্লামেন্টের বর্ধিত অধিবেশনে উত্থাপিত সংশোধনী বিলে সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়নি লোকপাল প্রতিষ্ঠানকে। তবে গান্ধীবাদী নেতা আন্না হাজারের দাবি অনুযায়ীই লোকপাল বিলটিতে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করছে সরকার। উল্টো দিকে আন্দোলনকারী আন্না পার্লামেন্টে উত্থাপিত এই বিল প্রত্যাখ্যান করে দাবি আদায়ে আবারও অনশন শুরুর হুমকি দিয়েছেন। উপরন্তু এবার তিনি জনগণের প্রতি ‘জেল ভরো’ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। সেই সঙ্গে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবসহ পাঁচ রাজ্যে আসন্ন নির্বাচনে তিনি নিজে দলটির বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামবেন। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীও এই হুমকিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তাঁর দলও লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (সিবিআই) ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়েই সরকার ও সুশীল সমাজের মধ্যে এই বিরোধ। সুশীল সমাজের দাবি অনুযায়ী সিবিআইয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ লোকপাল বা অন্য কোনো স্বাধীন সংস্থার হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করছে সরকার। এর কারণ অবশ্য স্পষ্ট। কারণটা হলো, সব সরকারেরই গোপন করার মতো অনেক বিষয় থাকে। কাজেই তারা তদন্ত সংস্থাটিকে হাতছাড়া বা অন্যের হাতে তুলে দিতে পারছে না। যেমন, মনমোহন সরকারের কথাই ধরা যাক। এ সরকার লোকসভায় হুমকির মুখে পড়লে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুলায়াম সিংকে চাপে ফেলে নিজেদের পক্ষে থাকতে বাধ্য করে। ৫৪৫ আসনের লোকসভায় কংগ্রেস ২০৭টি আসনের অধিকারী। সিবিআইয়ের মারফত মায়াবতী আর মুলায়াম সিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করাটা কংগ্রেসের জন্য বেশ সহায়ক হয়। রাজ্যের ক্ষমতা গ্রহণের পর অবৈধ সম্পদের অধিকারী হওয়া এই দুই নেতার বিরুদ্ধে তখন তদন্ত সংস্থাটি একটি মামলা চালাচ্ছিল। ফলে ওই সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাটা সরকারের জন্য সহজ হয়েছিল।
কংগ্রেসকে একা দোষ দিলে হবে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন বিজেপিসহ ভারতের সব সরকারই সিবিআইকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। লোকসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে বিহারের একজন প্রবীণ নেতা স্বীকারও করেছিলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে তদন্ত সংস্থাটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল তাঁর সরকার। সংস্থাটির বেশ কয়েকজন সাবেক পরিচালকও তাঁদের লেখা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ওমুক ওমুক সরকার বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে ফৌজদারি মামলা করতে বা চলমান মামলা বন্ধে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। আমি যখন রাজ্যসভার সদস্য ছিলাম, তখনই সিবিআইয়ের নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিলটি স্বরাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির কাছে আসে। সে সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি জে এস ভার্মা একটি হাওলা মামলায় সিবিআইয়ের নিয়ন্ত্রণ বিচার পরিচালনাসংক্রান্ত স্বাধীন দপ্তরের (ডিওপি) হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। কোনো রাজনৈতিক দলই তখন সিবিআইয়ের স্বায়ত্তশাসন মেনে নেয়নি। বিচারপতি ভার্মার প্রস্তাব এভাবে সরাসরি নাকচ হয়ে যাওয়ায় ওই সময় আমি খুব হতাশ হয়েছিলাম। সংস্থাটির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল অনেকটা স্বতঃসিদ্ধ। সুপ্রিম কোর্টকে সরিয়ে সরকারই এখন সংস্থাটির একক নিয়ন্ত্রক। অর্থাৎ যুগ্মসচিব বা এ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত বা পদক্ষেপ নিতে সংস্থাটিকে সরকারের অনুমতি নিতে হয়। এমন কোনো মন্ত্রী পাওয়া কঠিন, যিনি তাঁর নিজ ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে এ সুযোগ কাজে লাগাননি। সিবিআইয়ের তদন্তে দ্বিতীয় প্রজন্মের ফোনের নিবন্ধন নিয়ে যে দুর্নীতি উদ্ঘাটিত হয়েছে, তাতেও দেখা গেছে মন্ত্রীরা কীভাবে কোনো নিয়মনীতির ধার না ধেরে বেসরকারি গোষ্ঠীগুলোকে সুবিধা দিয়েছেন।
এখন আন্না হাজারে আশঙ্কা করছেন, তাঁদের আন্দোলনের পর সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা হচ্ছে, তারা বিলটির প্রথম দিককার অবস্থায় ফিরে গেছে। ওই বিলে লোকপালকেই তদন্ত-ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সিবিআইয়ের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া লোকপাল একেবারেই ক্ষমতাহীন। সিবিআই ছাড়া মন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি প্রমাণে লোকপাল পুরোপুরি অসহায়। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান বিচারপতি মিলেও যদি সিবিআইয়ের পরিচালক নির্বাচন করেন, তা হলেও পরিস্থিতির অন্যথা হবে না। কারণ, এই তিন পক্ষের মধ্যে দুই পক্ষই রাজনৈতিক। অন্য দিকে, আন্না হাজারে প্রস্তাবিত নয় সদস্যের লোকপাল হবে স্বাধীনভাবে নির্বাচিত। তাঁরাই সিবিআইয়ের পরিচালক নির্বাচন করবেন। তা ছাড়া সিবিআই সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতেও থাকতে পারে। কারণ, জনগণের এখনো দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা আছে। এ আস্থা লোকপাল ব্যবস্থার প্রতিও তাদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে আমার মূল আপত্তি হচ্ছে লোকপাল ব্যবস্থায় ৫০ শতাংশ সংরক্ষিত ব্যবস্থার প্রতি। এই মনোভাব আমাদের কখনোই একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে দাঁড়াতে দেবে না। চাকরি বা শিক্ষা ক্ষেত্রে কোটাব্যবস্থা থাকে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমরা যখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের নির্বাচন করছি, তখন সবচেয়ে যোগ্যতমকেই বেছে নেওয়া দরকার। লোকপাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণনীতি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে সরকার প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দ্বন্দ্ব ও বিভেদের বীজই বপন করছে। আমি আশা করি, আন্না হাজারের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা লোকপাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণনীতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হবেন।
লোকপাল বিলের বিরুদ্ধে আন্নার কঠোর অবস্থান থেকে মনে হচ্ছে, সরকার ও সুশীল সমাজের এ লড়াই রাস্তা পর্যন্ত গড়াবে। এটা দেশকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে। সহিংসতার পথ থেকে সরে রাজনৈতিক দলগুলোর একত্রে বসে এ বিষয়ে সমাধানের পথ খোঁজা উচিত। একজনের বিজয় মানেই আরেকজনের পরাজয়—এ ধরনের কথা আসলে আমাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। তা ছাড়া রাজনীতিবিদেরা যে পদক্ষেপই নিন, জনগণকে সতর্কতার সঙ্গে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর খেলার পুতুল হওয়া যাবে না। অবশ্য আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কী আকার ধারণ করে তার ওপরও অনেক কিছুই নির্ভর করছে।

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: ইসরাত জাহান
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

বৃহস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১১

মেমোগেট কেলেঙ্কারি ও পাক-মার্কিন সম্পর্ক

ড্রোন হামলায় ২৪ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হওয়ার ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কি তাৎক্ষণিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন? এতে হয়তো ইসলামাবাদের দুঃখকষ্ট প্রশমিত হতে পারত এবং সম্ভবত পাকিস্তান বনে অনুষ্ঠিত আফগানিস্তানবিষয়ক সভায় উপসি'ত থাকত। গতস্য শোচনা নাস্তি। যা হোক, ভারতে অনেকেই ইসলামাবাদ কেন ‘দুঃখ প্রকাশ’ গ্রহণ করেনি বা মেনে নেয়নি তার জন্য বিস্মিত হয়েছে। দুঃখ প্রকাশ করা মানে যথাযথভাবে ক্ষমা চাওয়া নয়। তবে এর কাছাকাছি। এর অর্থ হচ্ছে ভুল করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করার অনুভূতি। মার্কিন ও ন্যাটো সৈন্যদের ইচ্ছাকৃত মর্যাদাহানির কোনো ইতিহাস না থাকলে সম্ভবত ইসলামাবাদ দুঃখ প্রকাশের বিষয়টি মেনে নিত। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, আমেরিকা ও তার মিত্ররা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব এবং দেশটির জনগণের অনুভূতি বা দৃষ্টিভঙ্গির কোনো তোয়াক্কা করে না।
নিউ ইয়র্কে ৯/১১-এর হামলার পর থেকে পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ তথা তাঁবেদার রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব আবদুস সাত্তারকে ফোন করে তার সরকারকে জানাতে বলেন, ইসলামাবাদ তাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) পক্ষে না থাকলে তারা আফগানিস্তানের পরিবর্তে পাকিস্তানে কার্পেট বোমা হামলা শুরু করবে।
পাকিস্তান তখন সাহসিকতার সাথে ‘না’ বলতে পারেনি। এখন তারা কিভাবে মার্কিন চাপ প্রতিরোধ করছে?
সত্যিই, পাকিস্তান শক্তিশালী খেলা খেলেছে এবং এমনকি, আমেরিকানদের একটি ড্রোন ঘাঁটি ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছে। কিন' এটা হচ্ছে ক্রুদ্ধ জনমতের কাছে মাথা নোয়ানো বা নতি স্বীকার করা। আমি এখনো নিশ্চিত নই, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কিয়ানি কত দিন দুর্দান্তভাবে সেখানে অবস'ান করবেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বহু বছর ধরে মার্কিন অস্ত্র এবং সাথে সাথে তাদের সহায়তা নিতে এত অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, তাদের পক্ষে মুখ ঘুরিয়ে নেয়াটা যুক্তিযুক্ত দেখায় না। ইতোমধ্যে কিছু যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা বা বিবেচনা শুরু হয়ে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে সীমিত সহযোগিতা দেখা যাচ্ছে। ন্যাটোর একজন কমান্ডার বলেছেন, মর্মান্তিক ঘটনাটি পাকিস্তানের সাথে তাদের অপারেশন অথবা সহযোগিতাকে ব্যাহত করতে পারবে না। আমেরিকার অসন্তোষ ইসলামাবাদকে খুশি করতে পারবে না। কারণ আমেরিকার অনুপসি'তির ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, চীন পারবে না তা পূরণ করতে। পাকিস্তানের সাথে তার প্রতিবেশী নয়াদিল্লির সম্পর্ক এখন যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে ভারতও পাকিস্তানের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে না। পাকিস্তানি সৈন্যদের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে দুঃখ ও অনুশোচনা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনকে আমি ভিন্নভাবে আচরণ করতে দেখছি না। ওয়াশিংটন তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছে, আর পাকিস্তানে তালেবানদের উপসি'তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সেনাবাহিনী সম্ভব হলে ইসলামাবাদের সহযোগিতা নিয়ে অথবা প্রয়োজনে তাদের ছাড়াই তালেবানদের বিরুদ্ধে হামলা চালাবে। ড্রোন হামলা অথবা আমেরিকান ও ন্যাটো সৈন্যদের সরবরাহ লাইন বন্ধ হওয়ার মতো কিছু আমি দেখছি না, কারণ তারা ড্রোন হামলার জন্য আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করতে পারে এবং সরবরাহ লাইনের জন্য সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোকে কাজে লাগাতে পারে।
টার্গেট বা লক্ষ্য হচ্ছে তালেবান। উভয় পক্ষ উপলব্ধি করতে পেরেছে, তারা একটি পরিসি'তির মোকাবেলা করছে- যেটা তারা একা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তারা আগের অবস'ায়ও ফিরে যেতে পারবে না। সৈন্যদের হত্যাকাণ্ডের আগে যে অবস'া বিরাজ করছিল, তার কথাই এখানে বলা হয়েছে। এখনো আমেরিকা ও পাকিস্তান উভয়ে যুদ্ধ বা ধ্বংসের প্রান্তসীমায় পৌঁছে যেতে পারে। আগেও তারা বহুবার এ ধরনের কাজ করেছিল। কিন' তারা তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি ইতোমধ্যে বলেছেন, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র শর্তসাপেক্ষে এ বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে। ২০১৪ সালে ১ লাখ ৩০ হাজার আমেরিকান ও ন্যাটো সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়ার পর বিশ্ব সমস্যার মুখোমুখি হবে। বন সম্মেলনে আফগানিস্তানের ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অবশ্যই আরো সুস্পষ্ট হতে হবে। সম্মেলনে পাকিস্তানের অনুপসি'তি ডেনমার্কের প্রিন্সবিহীন থ্রোমলেটের মতোই। ইসলামাবাদ স্বাক্ষরকারী দেশ না হলে আর বেশি প্রতিশ্রুতি পাবে না।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক না থাকার কারণে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অনুভব করা যায়। উভয় দেশ বিদেশী সৈন্যদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রত্যাহার করার আহ্বান জানাতে পারত, কারণ তারা (বিদেশী সৈন্য) কেবল পরিসি'তির অবনতি ঘটাচ্ছে। কিন' এর পরও সমস্যা হচ্ছে, পাকিস্তান আফগানিস্তানে ভারতকে চায় না।
অপর দিকে নয়াদিল্লি কাবুলের সাথে একটি ‘কৌশলগত অংশীদার’ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। মার্কিন সৈন্যদের প্রত্যাহারের পর তালেবানরা যখন দেশে তৎপরতা শুরু করবে, তখন নয়াদিল্লি একা এবং কোনো সহায়তা না করে আফগানিস্তানকে ছেড়ে আসতে পারবে না। পাকিস্তান কৌশলগত গভীরতা ছাড়াই আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা মেনে নিলে দিল্লি ও ইসলামাবাদ একই পৃষ্ঠায় উল্লিখিত হতে পারে। তাই ২০১৪ সালের পরও মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় ইতোমধ্যে সমপ্রসারিত করা হয়েছে। কমপক্ষে তালেবানদের ধ্বংস করার জন্য ভারতের সাথে তাদের অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে বের করতে হবে। তালেবানরা ওই অঞ্চলে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন সময় যাচ্ছে। ‘মেমোগেট নামে’ পরিচিত কেলেঙ্কারির বিষয়টি এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, কিয়ানি ও আইএসআই প্রধান লে. জেনারেল আহমদ শুজা পাশার নামে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা এক মামলায় তাদের বিবাদি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানের তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হোসেইন হাক্কানি মার্কিন সামরিক কমান্ডের কাছে জারদারি সরকারকে সেনাবাহিনী এবং আইএসআইর হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য যে স্বাক্ষরবিহীন মেমো দিয়েছিলেন তার ওপর ভিত্তি করেই নওয়াজ শরিফ এ মামলা করেন। পরে সেনাবাহিনী হাক্কানিকে পদত্যাগ করতে দেখল। যা হোক না কেন, সমস্যাটি হাক্কানির পদত্যাগ করার চেয়ে বেশি বড়। আমেরিকা কিভাবে বারবার জারদারি সরকারের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারবে? আমেরিকা দেখছে, এ সরকার পুরোপুরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, হাক্কানির উত্তরসূরি শেরি রেহমানের ওয়াশিংটনের সাথে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সামর্থ্য এবং চাতুর্থ রয়েছে। তিনি সুকৌশলে পরিসি'তি মোকাবেলায় সক্ষম। তিনি আরো বুঝেছেন যে, একটি নির্বাচিত সরকারকে সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে না। ভারতের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ইসলামাবাদের ট্রাম্পকার্ড। ভারতে তাকে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে।
লেখক : যুক্তরাজ্যে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার, রাজ্যসভা সদস্য ও ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক

সোমবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১১

গালফ নিউজে কুলদীপ নায়ারের প্রতিবেদন : সর্বত্র দুর্নীতি : শেখ হাসিনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে জনগণ


বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। দেশের সর্বত্র দুর্নীতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ভয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণে তাদের সহায়তা তুলে নেয়ার হুমকি দিয়েছে।
ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৈনিক গালফ নিউজে লেখা এক প্রতিবেদনে কথা বলেছেন। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ সফর করে গেছেন।
প্রতিবেদনে তিনি লেখেন, বাংলাদেশে পাঁচ দিন থাকার পর আমার মনে হয়েছে, হাসিনা শুধু যে তার কারিশমাই হারিয়েছেন তা নয়, একসময় তিনি যাদের বিশ্বাস করতেন, তাদেরও হারিয়েছেন তিনি।
তিস্তার পানি চুক্তি এবং টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যু আগামী নির্বাচনে নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলবে বলে অভিমত দিয়েছেন সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার।
বাংলাদেশ-ভারত বর্তমান সম্পর্ক এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যক্রম নিয়ে দৈনিক গালফ নিউজকে দেয়া সাক্ষাত্কারে কুলদীপ নায়ার বলেন, জনপ্রিয়তা একটা দুর্লভ ব্যাপার। প্রয়োজনের সময় শাসকরা জনপ্রিয়তা পান না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। যখন তার জনপ্রিয়তা আসলেই দরকার, তখন তিনি তা হারাচ্ছেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অপশাসন না হলেও সুশাসনের অভাবে বাংলাদেশের মানুষের জীবন শুধু দুর্বিষহই হয়ে উঠছে। আর ক্ষমতায় বসার তিন বছর পার হওয়ার পরও তিনি তা বুঝতে পারছেন না। জনগণ তার কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করেছিল। কিন্তু বলার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ জনগণ দেখতে পাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিদ্যুত্ খাতের কথা উল্লেখ করেন।
নায়ার বলেন, স্বল্প সম্পদ দিয়ে দারিদ্র্য হ্রাস করা সব সময়ই চ্যালেঞ্জের বিষয়, কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) এই বাস্তবতা মানতে নারাজ। তিনি যা করছেন, তা নিয়ে তাকে বেশ সন্তুষ্ট দেখাচ্ছে। তিনি একপক্ষীয়ভাবে ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গাটি হলো, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। বাংলাদেশ সরকার মনে করছে, নয়াদিল্লি এবং কলকাতার মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে চুক্তিটি হচ্ছে না।
তবে ভারতের মনিপুরের বরাক নদীর ওপরে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প যখন সামনে এলো তখন ওই বিষয়টি আবারও পেছনে চলে গেল। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের এক মাস পর ২৩ অক্টোবর মনিপুর সরকার এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে এই চুক্তিটি হয়। আর এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ বাস্তবিক অর্থেই আঘাত পেয়েছে। কারণ এই চুক্তির ফলে প্রমাণ হয়, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সুবিধা-অসুবিধার কথা ভাবছে না।
নায়ার বলেন, চুক্তির বাহাত্তর ঘণ্টা পর বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়া হয় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে। তাতে বলা হয়, এই বাঁধ শুধু বন্যা মোকাবিলার জন্য, নদীর পানি অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য নয়। আর এই বক্তব্য বাংলাদেশীদের উদ্বেগ প্রশমিত করতে পারেনি। এই বাঁধটি বিশাল একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং বনাঞ্চল ধ্বংস করে দেবে। মোট বাহান্নটি নদী ভারত থেকে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে আসে। আমার মনে হয়, নয়াদিল্লির উচিত অন্তত এই বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে স্বচ্ছ আলোচনায় যাওয়া।
ভারতের এই পদক্ষেপে কোণঠাসা হাসিনার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। ভারতের সঙ্গে হাসিনার বন্ধুত্বের চেষ্টা উপেক্ষিত হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই, দুই বছর পর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তিস্তা এবং টিপাইমুখ ইস্যু হাসিনার ভোট কমিয়ে দেবে। আর এতে লাভবান হবেন খালেদা জিয়া।
নায়ার বলেন, দেশে সেনা অভ্যুত্থান (ক্যু) হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। তিন বছর আগের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। সে সময় তারা চাইলেই প্রশাসন ভেঙে দিতে এবং দুই নেতার বিকল্প দাঁড় করাতে পারত।
প্রখ্যাত এই সাংবাদিক বলেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্ক একটা খড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাংলাদেশের মানুষ স্রেফ ঝুলে আছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যত্ আছে কিনা সে বিষয়ে তারা আজ উদ্বিগ্ন। অপরদিকে চীন বাংলাদেশের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে চাইছে।
নায়ার বলেন, ভারতের মতো বাংলাদেশেও দুর্নীতির দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের সর্বত্র দুর্নীতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ভয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণে তাদের সহায়তা তুলে নেয়ার হুমকি দিয়েছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বাস্তবতাকে অনেকটাই ঢেকে রেখেছে, যার কারণে তিনি বিষয়টি নিয়ে অতটা চিন্তিত নন। তিনি বিশ্বাস করেন, কিছু সংবাদপত্র তার সুনাম নষ্ট করছে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন না, ওই সংবাদপত্রগুলোর বিক্রয়সংখ্যা তাদের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। তারা যদি সঠিক এবং সত্য সংবাদ না ছাপাত তাহলে তারা শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র হতে পারত না