India লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
India লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২০ জুন, ২০১৭

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গড়া ও দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হল ভারত। এই রাষ্ট্র গঠনের সময় মনে করে করা হয়েছিল যে, বিভিন্ন প্রাদেশিক বৈশিষ্টে বিভক্ত রাজ্যের (এখন ২৯ রাজ্যে বিভক্ত) ভারতকে ‘হিন্দুত্ব’ এই আঠা না থাকলে একে এক রাখার আর কোনো উপায় নেই; এই ধারণাটা ভুল যদিও। ভারতের উগ্র হিন্দুসমাজ মুসলমানসমাজকে নিজের অধীনে আনা ও চাপে রাখার জন্য কী না করতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এরই আদর্শ নমুনা। ভারতে গরুর (মহিষ উট গবাদিসহ সব পশু) গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ। [The notification covers bulls, bullocks, cows, buffaloes, steers, heifers and calves, as well as the camel trade.] মানে, বেচাবিক্রি, জবাই ও খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য হল, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে আধিপত্যে থাকা সংখ্যাগুরু কমিউনিটির পছন্দসই বিধিব্যবস্থার অধীনে মুসলমান কমিউনিটিকে আনা, দাবড়ানো। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নয়, জারি করা হয়েছে এক অদ্ভুত কায়দায়। কংগ্রেসের নেহরু আমলে তারা এর প্রথম কায়দাটা বের করেছিলেন। তা হল ভারতীয় রাষ্ট্র “পশু-প্রেমী” হয়ে গিয়েছিল। তারা ‘প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেল অ্যাক্ট ১৯৬০’ নামে এক আইন পাস করে ফেলেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই আইন বাস্তবায়নের জন্য ‘সোসাইটি ফর প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেলস’ নামে সমিতি গড়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন। মুল কথা ছিল, “পশুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যথা বা কষ্ট দেয়ার মতো নিষ্ঠুরতা করা যাবে না” এর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এই আইনটা লেখা হয়েছিল। আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সব জায়গায় একই কথা বলা হয়েছিল যে, ‘পশুকে অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও কষ্ট দেয়া রোধ’ করাই উদ্দেশ্য।
আইনটি কেমন তা বোঝার সবচেয়ে ভালো এক উপায় হল, এতে ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দ লক্ষ করতে হবে। যেমন ‘পশুর কল্যাণ, ‘পশুর ব্যথা’, ‘পশুর কষ্ট’, ‘পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা’ ইত্যাদি। অর্থাৎ বোধ বা অনুভূতিগুলো (ফলে শব্দগুলো) আসলে মানুষের, মানুষ সম্পর্কিত। কিন্তু সেগুলোকে অবলীলায় পশুর ওপর প্রয়োগ করে ধারণাগুলো তৈরি করা হয়েছে। আর এখানে সবচেয়ে তামাশার শব্দ হল, ‘পশুর কল্যাণ বা ওয়েলফেয়ার’। বিগত ১৯৬০ সালের ভারতে তো বটেই, এখনকার ভারতেও কোনো কোনো আম-মানুষের অবস্থা এমন যে, পশুর ওপর তো বটেই, আপন সন্তান বা স্ত্রীসহ পরিবারের আপন সদস্যদের ওপর “ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা” দেখানো ছাড়া নিজের পেটের ভাত জোগাড়ের আর কোনো উপায় থাকে না। অথচ সেই দেশে মানুষের বদলে পশুর ওয়েলফেয়ার নিয়ে আইন করা হয়েছিল, চিন্তা করতে বলা হয়েছিল। আসলে আইনটি করেছিল অবস্থাপন্ন শ্রেণী। করেছিল মুসলমান কমিউনিটিকে হেয় করে দেখাতে যে, তারা ‘ব্যথা ও কষ্ট দিয়ে বা নিষ্ঠুরতা করে’ গরুর গোশত খায়। অতএব এটা বন্ধ করতে হবে। এক কথায় একটা ধর্মবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ তৈরি করার জন্য এটা করা হয়েছিল। তবে অবশ্য এটা ছিল এক ইনডাইরেক্ট ফ্রি-কিক, এক পরোক্ষ আইন। কারণ এই আইনের সেকশন ২৮-এ এক ফাঁকে একটা ছাড় দেয়া ছিল। [Section 28 of the Act 1960, mandates that “nothing contained in this Act (1960 Act) shall render it an offence to kill any animal in a manner required by the religion of any community.”]। বাংলা করলে বলা হয়েছিল, “কোনো কমিউনিটির ধর্মীয় আচার হিসেবে বিধান মতে যদি জবাই করা হয়, পশুকে ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়, তবুও সে ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না”।
কিন্তু গত ১৯৬০ সালের সেই আইনের ওপরে এবং সেই আইনের সীমার মধ্যে থেকে নতুন করে দু’টি বিধি তৈরি করেছে মোদি সরকার। এর একটা হল,
Prevention of Cruelty to Animals (Care and Maintenance of Case Property Animals) Rules, 2017

সোজা বাংলায় বললে, প্রথমটা মুল অর্থ হল, পশুর হাট বা মার্কেট ভেঙে দেয়া। অর্থাৎ জবাই করার উদ্দেশ্যে মার্কেটে থেকে কোন পশু কেনা অথবা বেচা যাবে না- এরই আইন এটা। কারণ দেখা গেছে, প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে জবাইয়ের গরুটা হাট/মার্কেট হয়ে আসে। তাই প্রথম আইনটার ২২ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “জবাইয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো পশু কোনো মার্কেটে তোলা, কেনাবেচা করা যাবে না’। [22 (iii) stating that the cattle has not been brought to market for sale for slaughter;] আর সাথে এই কথাটাই হাটে যে কোন গরু উঠানোর পর  ‘রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে আর সেখানে শপথ করে বলতে হবে” ইত্যাদি তো আছেই। আর দ্বিতীয় আইন হলটা হল কেয়ার মেন্টেনেন্স না করলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সেসব সংক্রান্ত।
হাটে পশু উঠবে, রেজিস্ট্রেশন হবে, কানে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার লাগবে, কেনাবেচা হবে; তবে তা কেবল পশু কৃষিকাজের ব্যবহারের উদ্দেশ্য। গরুর ক্রেতা ও বিক্রেতা এই লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েই কেবল হাটে গরু বেচা ও ক্রয় করতে পারবে।  তাহলে মূল কথাটা হল,  গরুর গোশতের জন্য গরু কেনাবেচা করা যাবে না। এমনকি পশু মারা গেলে বা পশু অসুস্থ হয়ে মরা অথবা আয়ু শেষে মরা যা-ই হোক, সব ক্ষেত্রেই মরা গরু একেবারে সোজা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন ভাবেই মরা গরুর বা মারা গরুর চামড়া ছিলানো যাবে না। অথবা মারা বা কাটা গরুর হাড়গোড়সহ কোনো অবশেষই সংগ্রহ ও বিক্রি করা যাবে না। চামড়াও বিক্রি করা যাবে না।
এই হলো মোটা দাগে আইনটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া যেখানে দেখা যাচ্ছে শুরু থেকেই এই আইনের উদ্দেশ্য প্রশ্নবোধক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায়, “পশুর উপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর” নামে কংগ্রেস আমলেই মুসলমানের প্রতি বৈষম্যটা করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্বলভাবে। আর সেটাকেই এখন সবলভাবে করতে চাইছেন বিজেপি-আরএসএসের নেতা মোদি। গত ২৩ মে গেজেটেড বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন আইন সম্পর্কে মোদি সরকার সবাইকে “নোটিফাই করে” জানিয়েছে। আর এই আইন জারি করে তা সেই পুরনো আইনের ওপর দাঁড় করানো বলে এটা কংগ্রেসকেও বেকায়দায় ফেলতে পেরেছে, যাতে কংগ্রেস মোদির সমালোচনা করতে গিয়ে থেমে যায়। কারণ তাতে ১৯৬০ সালের নেহরুকেই সমালোচনা করা হয়ে যায়। আবার ‘পশুর ওপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানো’র নামে এবার সবলভাবে ইসলামবিদ্বেষটা মোদি সফলভাবে দেখাতে পারেন। তবে আরো কারণও আছে।
একটা কথা পরিস্কার রাখা দরকার। এতদিন গরু জবাই দেয়া, বেচাকেনা ও খাওয়া সম্পর্কে যেসব খবর আমরা শুনে আসছিলাম তা কেন্দ্রীয় বা মোদি সরকারের কোনো আইন ছিল না। এমনকি ২০১৫ সালে মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফকে ‘বাংলাদেশের গরু খাওয়া বন্ধ করা’র যে তাতানো বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটাও আসলে মন্ত্রীর অনধিকারচর্চা ছিল। কারণ গরু জবাই বন্ধ করা কেন্দ্রের বা রাজনাথদের মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্ত বা আইন ছিল না, আবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারেরও কোনো আইন ছিল না সেটা। তবে দুই বছর আগে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেখানে এ আইন পাস করা হয়েছিল। আর তা সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছিল বা বিজেপি প্রচার করেছিল। এজন্য এটা যে কোন কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর জন্য অনধিকার ছিল।  তবে এবার প্রথম কেন্দ্র নিজেই আইন জারি করা হলো। কিন্তু এতে বিভিন্ন অ-বিজেপি রাজ্যসহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকেও বিরোধিতা প্রবল হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজ সংশ্লিষ্ট এই বিষয় ‘রাজ্যসরকারের এখতিয়ার’ এমন দাবি বা এই প্রশ্ন উঠিয়েছে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ। কথা সত্য ইস্যুটায় রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিবার এক্তিয়ার।  মমতা ব্যানার্জি এই আইনকে কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন।অন্যান্য রাজ্যকেও তারা আপত্তি তোলার আহ্বান রেখেছিলেন। শেষে গত ২ জুন ‘মোদির সেনাপতি’ অরুণ জেটলি বলেন, ‘নতুন বিজ্ঞপ্তি রাজ্যসরকারের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ নয়।’ দৈনিক আনন্দবাজার এই কথার অর্থ করেছে, ‘গবাদিপশু জবাইয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাজ্যের হাতেই থাকছে’। মোদির খাস লোক তার অর্থমন্ত্রী জেটলির মন্তব্যের একটা ব্যাখ্যা আনন্দবাজার হাজির করে বলছে, ‘এখন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, তাতে রাজ্যের আইনে হস্তক্ষেপ হচ্ছে না। এটি শুধু গবাদিপশুর কেনাবেচার স্থানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। কৃষকেরা গবাদিপশু শুধু বাজারে বেচতে পারবেন নাকি বাজারের বাইরে থেকেও কেনা যাবে, বিজ্ঞপ্তি শুধু সেটি নিয়েই। কিন্তু তাদের জবাই করার জন্য রাজ্যের আইনই বলবৎ থাকবে”।
কিন্তু আইনগত দিক থেকে মোদির এই আইন কি আদালতে টিকবে, নাকি কনস্টিটিউশনের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে বাতিল হয়ে যাবে? গুজরাটের হাইকোর্টের (ময়ূর) বিচারপতি গোমূত্র পানে ও প্রশংসায় বেহুঁশ, তা আমরা জেনেছি। কিন্তু শক্ত তর্ক উঠেছে দক্ষিণে তামিলনাড়–তে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চে। সেখানকার রিট পিটিশনের পয়েন্ট খুবই শক্তিশালী। যেমন তারা বলছেন, “নতুন আইনটা প্যারেন্ট আইনের বাইরে যেতে পারে না”। ১৯৬০ সালের আইনে যেকোনো কমিউনিটির ধর্মীয় শরিয়ত বা রিচুয়াল হিসেবে পশু কেনাবেচা, কোরবানি এবং গোশত খাওয়ার ওপরে এই আইন প্রযোজ্য করা হয় নাই, বাইরে ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছিল। কাজেই এখনও কেন্দ্রের কোনো এখতিয়ার নেই সেটা লঙ্ঘন করার। এ ছাড়া ভারতীয় কনস্টিটিউশনে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারবিষয়ক ২৫ ধারায় ‘অবাধে ধর্মপালন নাগরিকের অধিকার’ এবং ২৯ ধারায় ‘সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই দুই অধিকারই মোদির নতুন আইনে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ছাড়া আর একটা পয়েন্ট আনা হয়েছে তা হলো, ভারতীয় কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১৯ (১)(জি) অনুসারে কোনো পেশার লোককে বেকার করে দেয়া যাবে না। এখানে কসাইসহ চামড়া ইত্যাদির প্রক্রিয়াজাত করা যাদের পেশা তাদেরকে কাজ-পেশাহীন করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটাও অভিযোগের একটি জোরালো যুক্তি।
ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও একটা জনস্বার্থ বা পাবলিক লিটিগেশনের মামলা হয়েছে।সেখানেও উপরের পয়েন্টগুলো ছাড়াও একটা বাড়তি পয়েন্ট হল, পুরনো আইনের ১১ অনুচ্ছেদ। সেখানে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে পশু জবাইকে খাদ্য জোগাড় হিসেবে দেখা হয়েছিল, নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখা হয়নি। তবে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট দেয়া ও নিষ্ঠুরতা না করা সাপেক্ষে তা করতে হবে। তাই এবার সুপ্রিম কোর্ট আগামী ১১ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেছেন আর সরকারকে জবাব তৈরি করে আসতে বলেছেন। এই মামলার বাদি হলো হায়দরাবাদের এক এনজিও, বাদির দাবি- মোদির দুই নতুন আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিতে হবে।

তবে আগেই বলেছিলাম মোদির আইনে ‘পশুর ওয়েলফেয়ার’ কথাটার সত্যিই বিষ্ময়কর। এক ধরনের ওয়েলফেয়ার সংগঠনের কথা আইনে অনেকবার রেফার করা হয়েছে। আর এটাই হল, বিজেপি- আরএসএসের লোকাল ‘পশুর ওয়েলফেয়ার কমিটি’ যাদের হাতে পশু ব্যবসায়ীরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এরা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং তারা পাবলিক লিঞ্চিং বা প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটাচ্ছে। আশা করা যায়, এ বিষয়গুলোও আদালত আমলে নেবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মোদির আইন দু’টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি তা হয়, তবে এটা ভারত রাষ্ট্রকে বাড়তি কিছু আয়ু দেবে।

শনিবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৭

তিস্তা নদীর পানি ও রাজনীতি !

eZ©gv‡b cÖavbgš¿x w`jøx †M‡Qb, Av‡jvwPZ n‡”Q Pzw³, `vex wel‡q| me‡P‡q †ewk Av‡jvwPZ n‡”Q wZ¯Ív b`xi cvwbi wnm¨v wb‡q| evsjv‡`‡ki `vex wZ¯Ívi cvwb cÖevn hv‡Z wVK _v‡K, ﯋ †gŠmy‡g cvwb hv‡Z Av‡m †mB wb‡q †`b `ievi n‡”Q `xN© w`b hveZ, bvbvb mgxÿv, bvbvb DcvË wb‡q `y c‡ÿi g‡a¨ A‡bK `iKlKwl †k‡l fviZ †kl ch©šÍ Pzw³ n‡”Q bv e‡jB †NvwlZ n‡q‡Q|

GB wb‡q bvbvb gn‡j †ek Av‡jvwPZ n‡”Q, cÖkœ  DV‡Q †Kb evsjv‡`k‡K cvwb †`Iqv n‡e bv, fviZ ïay †b‡eB Avgv‡`i wKQz †`‡e bv| Ggb bvbvb Mig Kiv Lei| g~jZ ivRbxwZi Kvi‡Y wZ¯Ív Pzw³ n‡”Q bv Ggb aviYvB eySv‡Z mÿg n‡q‡Q w`jøx| ggZv e¨vbvwR©i Kvi‡Y Ggb n‡”Q e‡jB w`jøx Zv‡`i mZZv cÖKv‡ki †Póv Ki‡Qb| ev¯ÍweK w`KUv wK GgbB ? Avmyb †`wL wZ¯Ív wK GLb evsjv‡`k cvwb e‡q Avb‡Z mÿg |

ÒcÖK…Z c‡ÿi b`xwUi evsjv bvg wZ¯Ív hv Ôw·¯ªvZÕ ev wZb cÖevn †_‡K G‡m‡Q| wn›`y cyivY Avbymv‡i GwU †`ex cve©Zxi ¯Íb †_‡K Drcvbœ n‡q‡Q| wmwKg wngvj‡qi 7200 wgUvi D”PZvq wPZvgy n«` †_‡KB wZ¯Ívi DrcwË| `vwR©wjs G wkfK †Mvjv †_‡K wMwim¼U Gi ga¨ w`‡q cÖevwnZ n‡q evsjv‡`‡ki wbjdvgvwi †Rjvi KvjxMÄ mxgvšÍ GjvKv w`‡q evsjv‡`‡k cÖ‡ek K‡i‡Q|

wmwKg †_‡K Drcvbœ GB b`x 414 wK‡jvwgUvi ˆ`N©¨ wb‡q wZ¯Ívi we¯Í…wZ Gi g‡a¨ wmwKg 151 cwðge½ 142 I 121 wK‡jv wgUvi evsjv‡`‡ki Dˇi †Rjv MvBevÜv, KzwouMÖvg, jvjgwbinvU, bxjdvgvix I iscy‡ii wfZi w`‡q cÖevwnZ, 35wU Dc‡Rjv 5427 wU MÖvg Avi mv‡o cvuP †KvwU gvby‡li emvev‡mi ¯’‡j K…wli mivmwi f~wgKv i‡q‡Q i‡q‡Q GB wZ¯Ív b`xi| 

1983 mv‡j evsjv‡`k I fvi‡Zi g‡¨a wZ¯Ív b`xi cvwb e›U‡bi e¨cv‡i wm×všÍ nq †h, evsjv‡`k 36 kZvsk fviZ 39 kZvsk cvwb cv‡e evKx cvwb msiwÿZ wn‡m‡e ivLv n‡e| wKš‘ mwVK †Kvb w`K wb‡`©kbv bv _vKvq gš¿x ch©vq †_‡K Avi †ewk `yi Movqwb| 2007 mv‡j wZ¯Ívi cvwb wb‡q GK †hŠ_‰eVK nq, Zv‡Z `y‡`k mgvb mgvb wfwˇZ 80 kZvsk cvwb wnm¨v Avi evwK 20 kZvsk msiwÿZ †i‡L Pzw³i KvQvKvwQ wM‡q †kl ch©šÍ Avi Pzw³Uv nqwb fvi‡Zi we‡ivaxZvi Kvi‡Y| 

fviZ wZ¯Ívi 300 wK‡jv cÖev‡ni g‡a¨B 10 wU evua w`‡q‡Q, me©‡kl fvi‡Zi RjcvuB¸woi ÔMRj‡WvevÕ bvgK ¯’v‡b evau w`‡q evsjv‡`‡k cvwb cÖevn G‡Kev‡iB eÜ Kivi Dcµg n‡q‡Q| Avgv‡`i Wvwjqv c‡q‡›U †h cvwb Av‡m Zv‡Z b`xi c_ wn‡m‡e Avi ejv hvq bv| GB Z_¨ `yB c‡ÿi Kv‡QB Av‡Q A_P ivR‰bwZK †Ljv wn‡m‡e wZ¯Ív GKwU wekvj e¨cvi n‡q †M‡Q|

fviZ †h‡nZz 10 wU evua w`‡q wZ¯Ívi cvwb‡K AvUwK‡q w`‡q‡Q, †m‡nZz GLb evua †f‡½ †dj‡jI wZ¯Ívi Avi †hŠeb wd‡i Avm‡e bv, cÖhyw³ Avi mf¨Zvi K_v e‡j wZ¯Ív‡K †g‡i †djv n‡q‡Q, cwðge‡½i gvbylB ﯋ †gŠmy‡g cvwb cvq bv, †mLv‡b Avgiv wK K‡i cvwb cv‡ev ? 10 wU evua wbg©v‡b wmwKg GLb e„nZ we`y¨r Drcv`K ivR¨ A_P Rxe, Rxe‡bi cÖvPzh© fiv GB AÂj cvwb k~Y¨Zvi Kvi‡Y Rxeb RxweKv AvR ûgwKi g~‡L|
A_P ivR‰bwZK dq`v †bIqvi Rb¨ GB giv b`x wb‡q bvbvb fv‡e gvbyl‡K weåvšÍ Kiv n‡”Q| GB †_‡K gvbyl‡K eySv DwPr wZ¯Ívi cÖK…Z wPÎ, cwðge½ I B”Qv Ki‡j Zvi ¯^vfvweK engv‡bi cvwb cv‡e bv, †mUv wmwgB AvUwK‡q †i‡L‡Q ZvB Avgv‡`i cvIqvi cÖkœB D‡V bv| GB mZ¨Uv‡K Avgv‡`i miKvi Avgv‡`i Rvbv‡”Q bv, fviZ Zvi ivR‰bwZK `iKlvKwl‡Z wZ¯Ív‡K GLb evuwP‡q †i‡L‡Q wb‡R‡`i ¯^v‡_©|

AvjgMxi Avjg
01611010011


রবিবার, ২ এপ্রিল, ২০১৭

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফর: যা থাকছে প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দু’দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই নিয়ে এখন সর্বত্র চলছে আলোচনা। ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার বেশি আগ্রহ দেখালেও বাংলাদেশ এমওইউ সইয়ে সম্মতি দিয়েছে। 
পাঁচ বছর মেয়াদি এই এমওইউ খসড়ায় প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার পাশাপাশি এই শিল্পের বিকাশে যৌথ উদ্যোগ, মহাকাশ প্রযুক্তি, কারিগরি সহায়তা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে এক দেশ অন্য দেশকে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমারেখায় সমন্বিত টহলসহ যৌথ ও সমন্বিত অনুশীলন করবে দু’দেশ। এছাড়া উভয়পক্ষ আন্তর্জাতিক আইন, নিজ নিজ জাতীয় আইন, শর্তগুলো, নীতি এবং প্রথা মেনে নিজস্ব স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে সক্রিয়ভাবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে কাজ করবে। 
আগামী ৭-১০ এপ্রিল চার দিনের সফরে ভারত যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সফরে কোনো চুক্তি সই না হলেও প্রায় ৩৯টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে কাজ করছে দু’দেশ। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারকের খসড়ার কপি সকালের খবরের কাছে রয়েছে। 

তা থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো তুলে ধরা হল : 

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা : এমওইউর অনুচ্ছেদ-২-এ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে সামরিক সদস্যদের সফর বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, তথ্যবিনিময়, কর্মশালা আয়োজন, প্রশিক্ষণ, আলোচনা সভা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে অনুষ্ঠান এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক শিক্ষা সফরের কথা বলা হয়েছে। এসব সফরের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর সংশ্লিষ্ট অসামরিক ব্যক্তিরাও সফরের জন্য মনোনীত হতে পারবেন। প্রকৃত যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী/নকশাকারী প্রতিষ্ঠানের যথাযথ অনুমতিসাপেক্ষে প্রয়োজনে সামরিক সরঞ্জামাদি রক্ষণাবেক্ষণে পরস্পর সহযোগিতা প্রদান করবে। সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দুর্যোগ ও ত্রাণবিষয়ক সহযোগিতা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে দু’দেশ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কর্মকাণ্ড নিয়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে বলা হয়েছে-প্রশিক্ষণ, মতামত, সক্ষমতা বিনিময়, একে অন্যের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ গ্রহণ, প্রশিক্ষক বিনিময়, আলোচনা সভা, কর্মশালা এবং যৌথ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। দ্বিপক্ষীয় মতামতের ভিত্তিতে নিয়মিত ক্রীড়া এবং দুঃসাহসিক অভিযান কার্যক্রম আয়োজনের পাশাপাশি চিকিত্সা সহযোগিতার বিষয়টিও রাখা হয়েছে খসড়ায়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে জাহাজ ও উড়োজাহাজের সফর বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সীমারেখায় সমন্বিত টহলসহ যৌথ ও সমন্বিত অনুশীলন করবে। 

প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা : উভয়পক্ষ জাতীয় আইন অনুযায়ী যৌথ উদ্যোগ, মহাকাশ প্রযুক্তি সহযোগিতা, কারিগরি সহায়তা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা করবে। প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতাগুলো প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান এবং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে তাদের বাণিজ্যিক কার্যকারিতা, প্রতিযোগিতামূলক দর, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং পারস্পরিক সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে সংঘটিত হবে। এক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে কোনো একটি পক্ষ তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা কোম্পানির মধ্যে স্বাক্ষরিত কোনো চুক্তিসীমা লঙ্ঘন করবে না। উভয়পক্ষ সরকারি নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পে উন্নয়নে সহযোগিতার ধরন এবং প্রতিরক্ষা পণ্য উত্পাদনে সহযোগিতা করবে। এই সহযোগিতা উভয়পক্ষ নিজস্ব জাতীয় প্রয়োজনীয়তা এবং পারস্পরিক সম্মত শর্তাবলি অনুযায়ী করবে। 

প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা সহযোগিতা : বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারকের খসড়া অনুযায়ী উভয়পক্ষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিষয়ক সহযোগিতা করবে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলীদের সফর বিনিময় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে তথ্যবিনিময় করবে। সহযোগিতার ব্যবস্থাপনা : প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এমওইউর ৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকটি পর্যবেক্ষণ, পরিচালনা এবং বাস্তবায়নে প্রতিরক্ষা সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার পর্যায়ে বার্ষিক সংলাপ হবে। এই আলোচনা প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ এবং ভারতে অনুষ্ঠিত হবে। 

তথ্য নিরাপত্তা : খসড়ার ৭নং অনুচ্ছেদে বিনিময়কৃত তথ্যের নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় যেসব গোপন তথ্য বিনিময় হবে, সেগুলো যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়, তা দু’পক্ষ নিশ্চিত করবে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রক্রিয়ার সময় দু’পক্ষ গোপনীয়তা মেনে চলবে। তৃতীয় কোনো পক্ষের স্বার্থ লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো পক্ষ নিজ সরকার কর্তৃক নিরাপত্তা ছাড়পত্র প্রদানকৃত সদস্য ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় প্রাপ্ত গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এই অনুচ্ছেদের শর্তগুলো সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ সম্পন্ন হওয়ার পরও কার্যকর থাকবে। 

সংশোধন ও সম্পূরক : উভয়পক্ষের লিখিত সম্মতিতে এই সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক সংশোধন করা যাবে। এই সংশোধন বা সম্পূরক উভয়পক্ষের সম্মতির দিন থেকে প্রযোজ্য হবে। এক্ষেত্রে সংশোধন বা সম্পূরক কার্যকর হওয়ার দিন বা আগের সময়ে এই সমঝোতা স্মারককে কোনো পক্ষ প্রভাবিত করবে না। 

বিরোধ নিষ্পত্তি : এই সমঝোতা স্মারকের কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলে উভয়পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা হবে। 

বৈধতা মেয়াদ এবং পরিসমাপ্তি : সমঝোতা স্মারকের ১১নং অনুচ্ছেদে মেয়াদ ও পরিসমাপ্তির কথা বলা হয়েছে। ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারকটি সইয়ের পর থেকে মেয়াদপূর্তির পর দিন নবায়ন হবে। যদি এটিতে কোনো পরিবর্তন আনতে হয়, মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগে যেকোনো পক্ষকে নোটিস দিয়ে তা জানাতে হবে। সমঝোতা স্মারকের ৫ বছরের মধ্যবর্তী সময়ে কোনো পক্ষ পরিসমাপ্তি করতে চাইলে অন্যপক্ষকে ৬ মাস আগে কূটনৈতিক মাধ্যমে লিখিত নোটিস দিতে হবে।

মঙ্গলবার, ২১ মার্চ, ২০১৭

প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধমে যে দেশকে পরাধীন করেছিল ভারত


লেন্দুপ দর্জি আলোচিত নাম। আলোচিত চরিত্র। বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। ভারতীয় আধিপত্যবাদের সেবাদাস। ২০০২ সালে ভূষিত হন ভারতের ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবে। এক সময়ের জনপ্রিয় এই নেতাকে দেশের মানুষ সম্মানের সাথে ডাকত কাজীসাব বলে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লিতে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতেন। কিন্তু শেষ জীবনে ভারতের দ্বিতীয় সারির নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেও তাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছে। বেঁচে ছিলেন ১০২ বছর। দীর্ঘ দিন লিভারের জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিঃসঙ্গ, নিন্দিত ও ভীতসন্ত্রস্ত জীবনযাপন শেষে লেন্দুপ দর্জি মৃত্যুবরণ করেন। তার পুরো নাম কাজী লেন্দুপ দর্জি খাং শেরপা। জন্মেছিলেন ১৯০৪ সালের ১১ অক্টোবর পূর্ব সিকিমের পাকিয়ং এলাকায়। মারা যান ২০০৭ সালের ২৮ জুলাই। ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী স্বাধীন সিকিম এখন ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। আয়তন সাত হাজার ৯৬ বর্গকিলোমিটার।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী লোকসংখ্যা ছয় লাখ সাত হাজার। সিকিমের ভূ-কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যের উত্তরে চীন, পশ্চিমে নেপাল, পূর্বে ভুটান ও দক্ষিণে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং। সিকিম-তিব্বত (চীন) বাণিজ্যপথ ‘না থুলা পাস’ আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহন করে। সামরিক গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর সিকিমের কাছেই। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম দিকে সিকিমের অবস্থান। ঢাকা থেকে সড়কপথে রাজধানী গ্যাংটকের দূরত্ব ৬৫৪ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায়ের পর মনিপুর, ত্রিপুরা, কুচবিহারসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদান করে অথবা যোগদানে বাধ্য করা হয়। ব্রিটেনের কাছে সিকিম স্বাধীনতার নিশ্চয়তা লাভ করেছিল সিকিমের স্বাধীন রাজাদের বলা হতো চগওয়াল। ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরুর আগে সিকিম তার পার্শ্ববর্তী নেপাল আর ভুটানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। ব্রিটিশরা আসার পর তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নেপালের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সিকিম। এ সময় রাজা ছিলেন নামগয়াল। কিন্তু ব্রিটিশরা তিব্বতে যাওয়ার জন্য এক সময় সিকিম দখল করে নেয়, ১৮৮৮ সালে রাজা নামগয়াল আলোচনার জন্য কলকাতা গেলে তাকে বন্দী করা হয়। ১৮৯২ সালে তাকে মুক্তি দিয়ে সিকিমের স্বাধীনতাকে মেনে নেয়া হয়। প্রিন্স চার্লস ১৯০৫ সালে ভারত সফরে এলে চগওয়ালকে রাজার সম্মান দেয়া হয়। চোগওয়ালপুত্র সিডকং টুলকুকে অক্সফোর্ডে লেখাপড়া করতে পাঠানো হয়। টুলকু নামগয়াল ক্ষমতায় বসে সিকিমের ব্যাপক উন্নতি করেন। ব্রিটিশের কাছে সিকিম তার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা লাভ করেছিল। গণভোটে সিকিমের মানুষ ভারতের বিরুদ্ধে রায় দেয় ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ছেড়ে যাওয়ার সময় গণভোটে সিকিমের মানুষ ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিরুদ্ধে রায় দেয়। ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু সিকিমকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর সিকিমের গুরুত্ব বেড়ে যায়।

১৯৬৩ সালে থাসি নামগয়াল এবং ১৯৬৪ সালে নেহরু মারা গেলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। চগওয়াল হন পাল্ডেন থন্ডুপ নামগয়াল। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সিকিম দখল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি কাজে লাগান লেন্দুপ দর্জিকে। সিকিম ছিল ব্রিটেনের আশ্রিত রাষ্ট্র হিমালয়ের পাদদেশে ছোট্ট স্বাধীন দেশ সিকিমকে ভারতীয় ইউনিয়নের অঙ্গীভূত করার বিল ভারতীয় পার্লামেন্টে আনা হয় ১৯৭৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। ওই বিল পাস হয় ৩১০-৭ ভোটে। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই-এম) বিপক্ষে ভোট দেয়। এবং সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের মে মাসে সিকিমকে পাকাপোক্তভাবে একটি অঙ্গরাজ্য করা হয়। এর আগে ব্রিটিশ ভারতে সিকিম ছিল একটি আশ্রিত রাষ্ট্র। স্বভূমিজাত লেপচা উপজাতীয়রা সিকিমের জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশ। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও পোশাক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তিব্বত থেকে ভুটিয়ারা ও নেপাল থেকে নেপালিরা এসে বসতি স্থাপন করে। সিকিমের তিনটি ভাষা এখন প্রধান-লেপচা, ভুটানি ও নেপালি। চতুর্দশ শতক থেকে নামগিয়াল বংশ সিকিমে রাজত্ব করে আসছিল। প্রথম শাসক পুনটমং নামগিয়াল। ১৬৪২ সালে তাকে চগিয়াল উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যার অর্থ ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ করে যিনি রাজকার্য পরিচালনা করেন। সর্বশেষ চগিয়ালকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথমে ভারত প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নেয় ৭২৯৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই ছোট্ট দেশটির রাজধানী গ্যাংটক। ১৮৮৬ সালে এক চুক্তির অধীনে সিকিম আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যোগ দেয়।

১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে চলে গেলে ওই চুক্তি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ১৯৫০ সালে ভারতের সাথে সিকিমের চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে সিকিমকে ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়। চুক্তির অধীনে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপনা দেখাশোনার পুরো কর্তৃত্ব ভারত নিয়ে নেয়। চগিয়াল ২৪ সদস্যের কাউন্সিলের মাধ্যমে দেশের শাসনকাজ পরিচালনা করতেন। এর মধ্যে ১৮ জন নির্বাচিত এবং ছয়জন চগিয়াল মনোনীত। কাউন্সিলে তিনটি দলের প্রতিনিধি ছিল ন্যাশনাল পার্টি, সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস ও সিকিম জনতা কংগ্রেস। ভারতীয় পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দিতে বাধ্য হন চগিয়াল ১৯৭৩ সালের মার্চ-এপ্রিলে ন্যাশনাল কংগ্রেস ও জনতা কংগ্রেস রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি তোলে। এই দাবিতে আন্দোলন দিনে দিনে তুমুল হতে থাকায় চগিয়ালের অনুরোধে ভারতীয় পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ওই ১৯৭৩ সালের ১৩ এপ্রিল ঘোষণা করা হয় যে, চগিয়াল রাজনৈতিক সংস্কার মেনে নিতে রাজি আছেন। এ ছাড়া তার আর কোনো উপায়ও ছিল না। কারণ তিনি স্পষ্টই অনুধাবন করেন এই আন্দোলনের পেছনের শক্তি কে? পরে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা স্বীকার করেছে যে, আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিল। সংস্কারে রাজি না হলে সিংহাসন থেকে উৎখাত করা হবে, এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন নিশ্চিত। তাই সিকিমের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার চেষ্টায় রাজনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকার করেন। অঙ্গীকার মোতাবেক ১৯৭৪ সালের জুন সিকিম রাষ্ট্র আইনে পরিবর্তন আনা হয়। ওই আইনের অধীনে চগিয়ালের সার্বভৌম ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তিনি হন নিয়মতান্ত্রিক প্রধান। অবশ্য আইন পরিষদে পাস হওয়া আইন অনুমোদনে ক্ষমতা তাকে দেয়া হয়। এতেও শেষ রক্ষা হয়নি। তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। সিকিম হত্যার উদ্যোগ নেন লেন্দুপ দর্জি রাজনৈতিক সংস্কার অধীন ১৯৭৪ সালের ১ জুলাই সিকিমে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। দলটি আইন পরিষদের ৩২টি আসনের মধ্যে ৩১টি আসন পায়। দলের প্রধান কাজী লেন্দুপ দর্জি হন প্রধানমন্ত্রী। ভারত এটাই চেয়েছিল। কারণ কাজী লেন্দুপ দর্জি তো তাদেরই লোক। এই নির্বাচনের পর সিকিমকে ভারতকে অঙ্গীভূত করার প্রস্তুতি নেয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এর জন্য একটা বৈধতার প্রলেপ দরকার। সেটা করে দেন কাজী লেন্দুপ দর্জি। ১৯৭৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বললেন, ভারতের দুই পরিষদ লোকসভা ও রাজ্যসভায় সিকিমের প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করেও সিকিমকে আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদায় রাখা যেতে পারে।

কাজী লেন্দুপ দর্জি লেন্দুপ দর্জি যেহেতু ৩২টি আসনের ৩১টি আসনের নেতা, তার মতামতই তো সিকিম জনগণের মতামত। সুযোগটা হাতছাড়া করল না ভারত। কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫০ সালের চুক্তি, যাতে সিকিমকে ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়, তা বাতিল করল। সিকিমকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করার বিল আনা হলো পার্লামেন্টে। এই বিল সম্পর্কে চগিয়াল এক বিবৃতিতে বললেন, ‘সিকিমের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, যার নিশ্চয়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল ১৯৫০ সালের চুক্তিতে, তা সিকিম জনগণের সম্মতি ছাড়াই এবং অজ্ঞাতে ভারতের পার্লামেন্টে সিকিমের প্রতিনিধি নেয়ার ত্বরিত পদক্ষেপে অস্বীকার করা হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় চগিয়াল বলেছেন, বর্তমান পদক্ষেপ, যা হবে ‘১৯৫০ সালের চুক্তির একপার্শিক বাতিলের শামিল এবং ভারতের সাথে সিকিমের একীকরণ।’ তিনি বলেন, ‘ভারত-সিকিম সম্পর্কের সর্বোচ্চ আশ্বাস দেয়া হয় ভারত প্রদত্ত সিকিমের অস্তিত্ব বজায় রাখার রক্ষাকবচের মাধ্যমে।’ তার এই বিবৃতিটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত ইংরেজি দৈনিক আমৃতবাজার পত্রিকা ১৯৭৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর, সোমবার প্রকাশ করে। চগিয়ালের বার্তা ছিল অরণ্যে রোদন চগিয়ালের এই বার্তা অরণ্যে রোদনের শামিল। অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে ফেলে সিকিমকে ভারতের অংশ করে নেয়া হলো। এ ঘটনায় ভারত তখন সারা বিশ্বে নিন্দাবাদ কুড়ায়। প্রতিবাদ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। প্রতিবাদে সিকিম দখল করে নেয়ার অভিযোগ করা হয়। কিন্তু চীন ছাড়া জাতিসঙ্ঘের বেশির ভাগ সদস্যরাষ্ট্র সিকিমের এ পরিবর্তনকে দ্রুত অনুমোদন করে। রাজতন্ত্র বিলোপ হয় বিনা বিরোধিতায় নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেটের ওপর ভর করে লেন্দুপ দর্জি নতুন গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতা পান। চগিয়াল আর লেন্দুপ দর্জির সাপে নেউলে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভারত পৃথিবীর মানচিত্র থেকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানচিত্র মুছে ফেলার মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগাতে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। কাউন্সিল অব মিনিস্টারের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জির ইচ্ছায় পার্লামেন্টে বিনা বিরোধিতায় রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক অবসান করা হয়। সিকিমের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লেন্দুপ দর্জি ভারতীয় পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করার এবং স্টেটহুড স্ট্যাটাস পরিবর্তন করার আবেদন জানান।

১৪ এপ্রিল ১৯৭৫ সিকিমে ভারতীয় সেনাদের ছত্রছায়ায় এক গণভোট হয়। লেন্দুপের ইচ্ছার প্রতিফলন দেখানো হয় সাজানো গণভোটের ফলাফলে। ২৬ এপ্রিল ১৯৭৫ সিকিম ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। মৃত্যু হয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। ১৬ মে ১৯৭৫ সরকারিভাবে ভারত ইউনিয়নভুক্ত হয় এবং লেন্দুপ দর্জিকে করা হয় সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী। রাজতন্ত্রের পতনের ফলে ‘চগিয়াল’ পদের অবসান ঘটে। একটি স্বাধীন দেশ হত্যা করে লেন্দুপ দর্জি প্রধানমন্ত্রী থেকে হলেন মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত লেন্দুপ দর্জি সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আর ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার সাথে সাথে তার দলও ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস দলে বিলীন হয়ে যায়। পুরো নিয়ন্ত্রণের জন্য নেয়া হয় সামরিক অভিযান সিকিমে ভারত সামরিক অভিযান শুরু করার আগে দেশটিতে অরাজক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। ইন্দিরা সরকার ভারতীয় বাহিনী পাঠানোর অজুহাত হিসেবে রাজার নিরাপত্তার কথা জানিয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজপ্রাসাদের সামনে দাঙ্গা ছড়িয়ে দেয়া হয়। এ কাজে তারা ব্যবহার করে লেন্দুপ দর্জিকে। রাজতন্ত্র অবসানের পর সিকিম দখলে ভারতীয় সেনারা মুহুর্মুহু গুলি চালায়। প্রকাশ্য দিবালোকে সামরিক ট্রাকের গর্জন শুনে সিকিমের চগিয়াল দৌড়ে এসে দাঁড়ান জানালার পাশে। তিনি দেখেন, ভারতীয় সৈন্যরা রাজপ্রাসাদ ঘিরে ফেলেছে। মেশিনগানের মুহুর্মুহু গুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাজপ্রাসাদের ১৯ বছর বয়সী প্রহরী বসন্ত কুমার ছেত্রি ভারতীয় সেনাদের গুলিতে নিহত হন।

আধা ঘণ্টার অপারেশনেই ২৪৩ প্রহরী আত্মসমর্পণ করে। বেলা পৌনে ১টার মধ্যেই ‘অপারেশন সিকিম’ শেষ হয়। প্রহরীদের কাছে যে অস্ত্র ছিল তা দিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সময় লড়াই করা যেত। কিন্তু রাজা ভুগছিলেন সিদ্ধান্তহীনতায়। তিনি আরেকটি সুযোগ হারালেন। বেইজিং ও ইসলামাবাদের কাছে জরুরি সাহায্য চাওয়ার জন্য রাজপ্রাসাদে ট্রান্সমিটারও বসানো ছিল। তিনি সাহায্য কামনা করে বার্তা পাঠালে চীনা সৈন্যরা প্রয়োজনে সিকিমে ঢুকে চগিয়াল লামডেনকে উদ্ধার করতে পারত। কিন্তু রাজা সেটাও করতে ব্যর্থ হন। আত্মসমর্পণকারী রাজপ্রহরীদের ভারতীয় সেনাদের ট্রাকে তোলা হয়। প্রহরীরা তখনো গাইছিল ‘ডেলা সিল লাই গি, গ্যাং চাংকা সিবো’ (আমার প্রিয় মাতৃভূমি ফুলের মতো ফুটে থাকুক)। কিন্তু ততক্ষণে সিকিমের রাজপ্রাসাদে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে ভারতীয় জাতীয় পতাকা। নামগিয়াল সাম্রাজ্যের ১২তম রাজা চগিয়াল লামডেন তখন প্রাসাদে বন্দী। বহির্বিশ্বের সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, বি এস দাশকে ভারত সরকার সিকিমের প্রধান প্রশাসক নিয়োগ করে। সিকিমের ঘটনা বিশ্বকে জানান এক মার্কিন পর্বতারোহী ভারতীয় আমেরিকান এক পর্বতারোহী গোপনে সিকিম প্রবেশ করে দেশটির স্বাধীনতা হরণের খবর বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্বাধীনতা হারানোর সময় সিকিম জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদভুক্তিরও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ১৯৭১ সালেই সিকিম দখলের সিদ্ধান্ত ছিল ভারতের চমকপ্রদ একটি বিষয় হলো সিকিম সেনাবাহিনীকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ভারতীয় সাংবাদিক সুধীর শর্মা ‘পেইন অব লুজিং এ নেশন’ (একটি জাতির হারিয়ে যাওয়ার বেদনা) নামে একটি প্রতিবেদনে জানান, ভারত ব্রিটিশদের কাছ থেকে তার স্বাধীনতা লাভের গোড়া থেকেই সিকিম দখলের পরিকল্পনা করেছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু অনেকের সাথে কথোপকথনে তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক পরিচালক অশোক রায়না তার বই ‘ইনসাইড স্টোরি অব ইন্ডিয়াস সিক্রেট সার্ভিস’-এ সিকিম সম্পর্কে লিখেন, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭১ সালেই সিকিম দখল করবে। সে লক্ষ্যে সিকিমে প্রয়োজনীয় অবস্থা সৃষ্টির জন্য আন্দোলন, হত্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়।

তারা ছোট ছোট ইস্যুকে বড় করার চেষ্টা করে এবং সফল হয়। তার মধ্যে হিন্দু-নেপালি ইস্যু অন্যতম। সাংবাদিক সুধীর শর্মা লিখেন, লেন্দুপ দর্জি নিজেই শর্মাকে বলেছেন, ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর লোকেরা বছরে দু-তিনবার তার সাথে দেখা করে পরামর্শ দিতেন কিভাবে আন্দোলন পরিচালনা করা যাবে। তাদের এক এজেন্ট তেজপাল সেন এ আন্দোলন পরিচালনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে তাকে অর্থ দিয়ে যেতেন। এ অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক সন্ত্রাস পরিচালিত হতো। শর্মা আরো লিখেছেন, এই ‘সিকিম মিশনের’ প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ‘র’। দ্বৈত খেলা খেলেছে ভারত ভারত সিকিমের ক্ষেত্রে দ্বৈত খেলা খেলেছে। চূড়ান্ত মুহূর্ত আসার আগে পর্যন্ত চগিয়াল লামডেনকে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা বুঝতে দেয়নি। তারা তাকে বলেছে, সিকিমে রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হবে। চগিয়ালকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনারারি মেজর জেনারেল পদবিও প্রদান করা হয়েছিল। অপর দিকে লেন্দুপ দর্জিকে বলেছে, যেকোনো মূল্যে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করতে হবে। চীন, নেপাল ও পাকিস্তানের পরামর্শে কান দেননি চগিয়াল ভারত অন্তর্ভুক্তির সময় সিকিমে কর্মরত তৎকালীন ভারতীয় দূত (পলিটিক্যাল অফিসার) বি এস দাস তার গ্রন্থ ‘ঞযব ঝরশশরস ঝধমধ’-এ লিখেছেন, ভারতের জাতীয় স্বার্থেই সিকিমের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন ছিল। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করেছি। চগিয়াল যদি বিচক্ষণ হতেন এবং তার কার্ডগুলো ভালোভাবে খেলতে পারতেন, তাহলে ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তা না হয়ে ভিন্ন কিছু হতে পারত। চীন, নেপাল ও পাকিস্তানের পরামর্শে কান দেননি সিকিমের চগিয়াল। তিনি ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে করম চাঁদ গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর প্রতি ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল। ১৯৭৪ সালে সিকিমের তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই চগিয়াল কাঠমান্ডু গিয়েছিলেন নেপালের রাজা বীরেন্দ্রর অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাজা বীরেন্দ্র, সফররত চীনা উপপ্রধানমন্ত্রী চেন লাই ইয়ান এবং পাকিস্তানি দূত চগিয়ালকে সিকিমে না ফিরতে পরামর্শ দেন। ক্যাপ্টেন সোনাম এ প্রসঙ্গে বলেন, এই তিন দেশের নেতৃবৃন্দ সিকিমকে ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে একটি মাস্টার প্ল্যান উপস্থাপন করেন। কিন্তু চগিয়াল লামদেন তাতে সম্মতি দেননি। এর কারণ তিনি নাকি স্বপ্নেও ভাবেননি, ভারত সিকিম দখল করে নিতে পারে। চীন সীমান্তে ৩ স্বাধীন রাষ্ট্র নয়াদিল্লির জন্য অস্বস্তিকর ছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক বোমার সফল বিস্ফোরণ ইন্দিরা গান্ধীর আত্মবিশ্বাস বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়। কংগ্রেস নেত্রী নয়াদিল্লিতে তার ক্ষমতাকে সুসংহত করেন। নয়াদিল্লি উদ্বিগ্ন ছিল সিকিমের স্বাধীন সত্তার বিকাশ নিয়ে। ভুটানের পথ ধরে সিকিম যদি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করে ফেলত, তাহলে তা হতো নয়াদিল্লির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় রকম বাধা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চীন সীমান্তে তিন হিমালয়ান স্বাধীন রাজ্য নেপাল, সিকিম ও ভুটান গায়ে গা লাগিয়ে অবস্থান করুক এটাও কৌশলগত কারণে দিল্লি নিরাপদ মনে করেনি। লেন্দুপ দর্জির শেষ জীবন ছিল অভিশপ্তের ভারতে যোগদানের পর লেন্দুপ দর্জি হন সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন। তবে স্বর্গসুখের যে খোয়াব তিনি দেখেছিলেন, সেটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। তার দলের প্রতি জনগণের আস্থা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে লেন্দুপ দর্জির এসএনসি একটি আসনও পায়নি। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে লেন্দুপ দর্জি দেখেন ভোটার তালিকায় তার নামটিও নেই।

নেপথ্য শক্তি তার রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি টেনে দেয়। সমকালীন ইতিহাসে সমালোচকদের কাছে লেন্দুপ দর্জি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত। তার সমর্থকেরাও পরবর্তী সময়ে তাকে ত্যাগ করেন। ১৯৯৬ সালে কালিমপংয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবন লেন্দুপ দর্জি দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘সবাই আমার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলছে, আমি নাকি নিজের মাতৃভূমি সিকিমকে বিক্রি করে দিয়েছি। তা যদি সত্যও হয় সে জন্য কি আমি একাই দায়ী?’ কিন্তু এই অভিযোগ এতই গুরুতর ছিল যে, লেন্দুপ দর্জি আর কখনোই সিকিমে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারেননি। চাকুং হাউজে আমৃত্যু তাকে নিঃসঙ্গ দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয়। তার মৃত্যু সিকিমবাসীর মনেও কোনো সহানুভূতি বা বেদনার উদ্রেক করতে পারেনি। লেন্দুপ দর্জি মনে করতেন, কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর দিল্লি তাকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তার আক্ষেপভরা মন্তব্য, ‘সিকিমকে ভারতের হাতে তুলে দিতে হেন চেষ্টা নেই যা আমি করিনি। কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর নয়াদিল্লি আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।’ সাপ্তাহিক জন আস্থা পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে লেন্দুপ দর্জি বলেন, ‘আগে নয়াদিল্লিতে আমাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করা হতো। এখন ভারতের দ্বিতীয় সারির নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেও আমাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়।

ভারতে অন্তর্ভুক্তি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত ভারতের সিকিম দখলের বিরুদ্ধে চীন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সিকিমের রাজপথে কোনো গণপ্রতিরোধ দেখা যায়নি। তাই বেইজিংয়ের ভূমিকা সীমিত ছিল জাতিসঙ্ঘে প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যেই। ১৯৭৭ সালে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর টানা ১১ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৭৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই সিকিম সম্পর্কে মুখ খোলেন। তার মতে, সিকিমের ভারতে অন্তর্ভুক্তি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। এমনকি সিকিমের যেসব রাজনৈতিক নেতা ভারতে যোগদানের পক্ষে কাজ করেছিলেন, তারাও বলেছেন, এটা ছিল ঐতিহাসিক ভুল। কিন্তু তত দিনে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। ভারতের রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি সিকিমের বড় অর্জন ভারতের এ কাজকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সমর্থন না দিলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভুলটা এ ব্যাপারেই করলেন তাজউদ্দিন আহমদ। ব্যক্তিগতভাবে মন্তব্য করলেন সিকিম সম্পর্কে এবং অজুহাত এসে গেল শেখ মুজিবের হাতে। সিকিম সম্পর্কে তাজউদ্দিন আহমদের বক্তব্যটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালের ১৪ অক্টোবর সোমবার দ্য অমৃতবাজার পত্রিকায়। বাংলাদেশের কোনো পত্রিকায় সংবাদটি আসেনি। ইংরেজি দৈনিক দ্য অমৃতবাজার পত্রিকার সেই খবর : ‘‘বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী মি. তাজউদ্দিন আহমদ গত রোববার ‘ভারত-বাংলা বন্ধুত্ব বিনাশে বৃহৎ শক্তিবর্গের পাকানো’ আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকার জন্য ভারতীয় জনগণের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। ওয়াশিংটন থেকে ঢাকা ফেরার পথে কলকাতা বিমানবন্দরে স্বল্প বিরতিকালে মি. আহমদ রিপোর্টারদের বলেন যে, সিকিম ইস্যু নিয়ে টোকিও, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে ভারতের বিরুদ্ধে প্রচার চলছে।

এসব জায়গায় কিছু সংবাদপত্র মন্তব্য করেছে যে, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ব্যক্তিগতভাবে মি. আহমদ মনে করেন যে, ভারতের একটি সহযোগী রাজ্য হিসেবে সিকিমের স্বীকৃতি ‘সিকিম জনগণের একটি অর্জন’।” এই ঘটনার কিছুদিন পর অবশ্য তাজউদ্দিন আহমদকে পদত্যাগ করতে হয়। ভারতের নেতৃবৃন্দ বরাবরই অখণ্ড ভারত গড়ার স্বপ্নে বিভোর ভারতের নেতৃবৃন্দ বরাবরই অখণ্ড ভারত গড়ার স্বপ্নে বিভোর। আর সে লক্ষ্যে ভারত চায় এর প্রতিবেশী দেশগুলোকে নানাভাবে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে সেখানে লেন্দুপ দর্জির মতো তাঁবেদার সরকার বসিয়ে দেশটিকে ভারতের সাথে একীভূত করে নিতে। সিকিম তার বড় প্রমাণ। ভারতের প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের মানুষকে এ অন্তর্নিহিত সত্যটি উপলব্ধিতে রেখে দেশ পরিচালনা করতে হবে। নইলে বিপর্যয় অবধারিত। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ‘সিকিমফোবিয়া’ সিকিমের ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের প্রতিরক্ষা ভারত দিনের পর দিন জোরদার করায় এই আশঙ্কা আরো জোরালো হচ্ছে। এই কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশের সাথে যুক্ত সীমান্ত আউট পোস্টগুলোর (বিওপি) একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৪-৫ কিলোমিটারে নিয়ে আসা হচ্ছে। এগুলোতে বিএসএফের শক্তিও বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

বিএসএফ এই সীমান্তে থারমাল নাইটভিশন ডিভাইস, টেলিস্কোপিক বন্দুকসহ উচ্চমানের হাতিয়ার মোতায়েন রেখেছে। সেই সাথে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার এলাকাকে কাঁটাতারের বেড়াসহ ফ্লাডলাইটের আওতায় আনার এবং প্রশিক্ষিত কুকুর মোতায়েন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনেকটা এগিয়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তের বেশির ভাগ এলাকা ফ্লাডলাইটের আওতায় আনা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ১৯৭৪ সালের ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও ভারত মানছে না। বলাবাহুল্য, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও সড়ক তৈরি প্রতিরক্ষা কাজের মধ্যেই পড়ে। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত দুই দেশের বৈঠকে বিষয়টি আলোচিত হলেও তা কোনো ফল দেয়নি। ভারতের বর্তমান প্রস্তুতি অনুযায়ী সীমান্ত সড়ক দিয়ে অনায়াসে সামরিক যান চলাচল করতে পারবে। এর ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও জোরদার করতে পারবে। এ কারণেই বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে ‘সিকিমফোবিয়া’ কাজ করছে প্রবলভাবে। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অবিশ্বাসের অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশও সিকিমের পরিণতি বরণ করে কি না।

বিজেপির বিজয় : আগামী তুফানের পূর্বাভাস

উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুলভাবে জিতেছে। বিজয়ের এই বৈপুল্য ছোটখাটো ব্যাপার নয়, বেশ বড়সড় ঘটনা। বিজেপির এই বিজয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব আরও মজবুত হল, এটা সহজেই বোঝা যায়। ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের অর্থ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি একটা পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তার হিসাবে ২০১৪-তে লোকসভায় বিজেপির পক্ষে ভোটারদের সমর্থন ছিল ৪০ ভাগ, এবার সে হার প্রায় ৮০ ভাগ। এই বিজয় যদি ভারতীয় রাজনীতির মেরুকরণ এবং ভারতীয় গণমানসের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত হয় তাহলে এটা স্পষ্ট যে, সর্বভারতীয় প্রকল্প হিসেবে হিন্দুত্ববাদ স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। বাংলাদেশের জনগণ কীভাবে তা মোকাবেলা করবে এ নিয়ে অবিলম্বে ভাবনা-চিন্তা দরকার।

উত্তর প্রদেশে বিজেপির সাম্প্র্রতিক বিজয় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নতুন মেরুকরণ নয়, সেটা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। এখন মেরুকরণের ভারসাম্য সুস্পষ্টভাবেই হিন্দুত্ববাদের দিকেই ঝুঁকে পড়েছে; অপরাপর তাৎপর্য ছাড়াও এই বিজয় প্রমাণ করছে যে, কংগ্রেসের পক্ষে আবার সর্বভারতীয় দল হিসেবে হাজির হওয়া এখন রীতিমতো অসম্ভব। সেটা খারাপ কিছু নয়। সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে জাতিবাদী হিন্দুর চেহারা আড়াল করে রাখার চেয়ে সরাসরি নিজের হিন্দু পরিচয় সামনে আনা অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন, সৎ ও সত্য। ভারতীয় গণমানস তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে এটা বুঝেছে। কেন তাদের এই উপলব্ধি ঘটল তা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক গবেষণা হতেই পারে। কিন্তু এটাই ভারতীয় রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা।

এই বিজয়ে এটাই স্পষ্ট যে, নির্বাচনপন্থী বামপন্থাও ভারতীয় জাতীয় রাজনীতিতে পরাজিত শক্তি। রাজনীতির এই উত্থান-পতনের মর্ম বোঝা আমাদের জন্য এখন খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই লক্ষ্যেই এখানে কিছু পর্যবেক্ষণ পেশ করব।

তবে তার আগে যারা ভারতের নির্বাচন ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করেননি তারা নিচের পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে অনেক কিছুই আন্দাজ করতে পারবেন।

রাজনৈতিক দল নির্বাচন ২০১৭ নির্বাচন ২০১২

সমাজবাদী পার্টি ৪৭ ২২৪

ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ৭ ২৮

বহুজন সমাজ পার্টি ১৯ ৮০

ভারতীয় জনতা পার্টি ৩১২ ৪৭

রাষ্ট্রীয় লোক দল ১ ৯

অন্যান্য ২৯ ১৫

মোট ৪০৩ ৪০৩

সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেস ২০১২ সালে আসন পেয়েছিল ২৮টি, এবার পেল মাত্র ৭টি। বহুজন সমাজ পার্টির আসন সংখ্যা ৮০ থেকে ১৯-এ নেমে এসেছে। সমাজবাদী পার্টি এতকাল ক্ষমতায় ছিল। ২০১২-তে তাদের আসন সংখ্যা ছিল ২২৪। এবার অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বে তাদের ২২৪ আসন কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭-এ। প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতিতে জাতীয় দলের চেয়েও নির্ধারক ভূমিকা রাখবে আঞ্চলিক দল, তারা সমাজবাদী পার্টির ভরাডুবি থেকে ভিন্ন ইঙ্গিতই পাবেন। ভারতীয় গণমানস রাজ্যকেন্দ্রিক চিন্তার চেয়ে জাতিবাদী হিন্দুত্ববাদ বা ভারতীয়তাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। রাজ্য ও কেন্দ্রের দ্বন্দ্ব এতে কমবে না। তাতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি দুর্বল হবে সেটা ভাবার কোনো কারণ নেই। নির্বাচন রাজ্য আর কেন্দ্রের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক বনাম জাতীয় রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব নতুন করে মূল্যায়ন করবে। এসব বিষয়েই নতুন করে ভাবতে হবে।

নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো জোট বাঁধে। তো জোটের হিসাব ধরলে উত্তর প্রদেশের ৪০৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জোট পেয়েছে ৩২৫টি। ক্ষমতাসীন সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস জোট পেয়েছে ৫৬টি আসন। বহুজন সমাজবাদী পার্টি পেয়েছে ১৯টি আর বাকিরা পেয়েছে ৩টি আসন।

অন্য যেসব রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে উত্তরাখণ্ড রাজ্যেও বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। পাঞ্জাবে জয়ী হয়েছে কংগ্রেস। গোয়া ও মনিপুর রাজ্যের নির্বাচনে বেশি আসন পেয়েছে কংগ্রেস, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তারা। সরকার গঠন করতে চাইলে তাদের জোট বাঁধতে হবে।

এটা আমরা জানি, নরেন্দ্র মোদি গত বছর নভেম্বর মাসে চালু নোটের ৮৬ শতাংশ বাতিল করেছিলেন, ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট বাতিল হয়ে গিয়েছিল। তার নোট বাতিল করার সিদ্ধান্ত খুব জনপ্রিয় হয়নি। সাধারণ মানুষকে বিস্তর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই নোট বাতিল করাকে কেন্দ্র করে বিস্তর প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে। মোদি নোট বাতিল করে কালো টাকা নস্যাৎ করার যে দাবি করছিলেন তার পক্ষেও বিশেষ যুক্তি তিনি দিতে পারেননি। প্রচুর কালো টাকা বিকল করা গেছে সেটাও বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি। অনেকে ধারণা করেছিলেন, নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নির্বাচনে বড়সড় প্রভাব ফেলবে। কিন্তু দেখা গেল সেটা ঘটেনি। বোঝা যাচ্ছে, গণমানসে তিনি এমন একটা ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পেরেছেন যা নোট বাতিলের সৃষ্ট দুর্দশা ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি। ভারতের রাজনীতি বোঝার জন্য এসব খুবই গুরুত্বপূর্ণ সিম্পটম।

সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিজেপি এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নয়। তাই মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার সব বিল পাস করতে পারে না। সেই পরিস্থিতি রাজ্য বিধানসভাগুলোতে নবনির্বাচিত বিজেপি সদস্যদের ভোটের ফলে আগামীতে বদলাবে, এটা অনুমান করা যায়। যতজন সংসদ সদস্য রাজ্যসভায় বিজেপি পাঠাতে পারবে, সেই অনুপাতে উচ্চকক্ষের সংখ্যার ভারসাম্যেও বদল ঘটবে। বিজেপির পক্ষে একটি অনুকূল হাওয়া বইছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। ফল অনুযায়ী উত্তর প্রদেশের ৪০৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জোট পেয়েছে ৩২৫টি আসন। ক্ষমতাসীন সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস জোট পেয়েছে ৫৬টি আসন। বহুজন সমাজবাদী পার্টি পেয়েছে ১৯টি, আর বাকিরা পেয়েছে ৩টি আসন। সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে কংগ্রেস জোট বেঁধে ভোটে নেমেছিল। উভয়েই পরাজিত। জোটের প্রচারে প্রধান ছিলেন দুই দলের দুই যুবনেতা বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব আর কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। নিজেদের সীমিত চিন্তা ও ব্যর্থতার কোনো পর্যালোচনা না করে এবং ভারতের নতুন বাস্তবতাকে আমলে না নিয়ে তারুণ্য দিয়ে তারা নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকাতে পারবেন ভেবেছিলেন। বিজেপির পক্ষে প্রচারে ছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি। ব্যাপক প্রচারাভিযান। তার প্রচারে উন্নয়ন আর মেড ইন ইন্ডিয়ার আবেগ ছিল। আর, বলা বাহুল্য, সরবে ছিল রাজ্য সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা। ওতে কাজ হয়েছে।

উত্তরাখণ্ডেও কংগ্রেস দাবড় খেয়েছে। নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিজেপি। এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলা হয়েছিল। কিন্তু হয়নি। কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী হরিশ রাওয়াত নিজে দুটি কেন্দ্রেই পরাজিত হয়েছেন। ৭০ আসনের উত্তরাখণ্ড বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৩৬টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ৫৭টি আসন। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পেয়েছে ১১টি। আর অন্যরা পেয়েছে ২টি আসন। ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি অল্প ব্যবধানে কংগ্রেসের কাছে হেরেছিল, রাজ্যের দখল নিয়েছিল কংগ্রেস। এবার ইতিহাস ভিন্ন।

তবে পাঞ্জাবে জয়ী হয়েছে কংগ্রেস। পরপর দু’বার পাঞ্জাবের সরকারে এসেছে আকালি-বিজেপি জোট। পাঞ্জাবে সাধারণত পাঁচ বছর অন্তর অন্তর ক্ষমতা বদল হয়। কিন্তু গত ২০১২ সালে আকালি দল ও বিজেপি জোট ক্ষমতায় আসে। পাঞ্জাবের ড্রাগ সমস্যা নিয়ে জোরদার প্রচার চালিয়ে বড় মুখ হিসেবে উঠে আসেন আম আদমি পার্টির নেতা ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অবশেষে জিতল কংগ্রেস। ১১৭ আসনের পাঞ্জাব বিধানসভায় কংগ্রেস পেয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ৭৭টি আসন। আম আদমি পার্টির জোট পেয়েছে ২২টি, ক্ষমতাসীন আকালি দল ও বিজেপি জোট পেয়েছে ১৮টি আসন। গোয়া ও মনিপুরেও এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস।

এই ভোটাভুটি থেকে ভারতীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট আন্দাজ করতে পারি বলেই আমার ধারণা। বুঝতে পারি, ১. কংগ্রেস জাতীয় দল হিসেবে তার গণভিত্তি আসলেই হারিয়েছে, ক্রমশ তার ভূমিকা আঞ্চলিক দলগুলোর অধিক কিছু হবে না। আগামীতে এ দলটির পক্ষে কেন্দ্রে শক্তিশালী জাতীয় দল হিসেবে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা খুবই কম; ২. হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিরুদ্ধে আদর্শিক অবস্থান থেকে প্রতিরোধ করার সাংগঠনিক শক্তি কোনো দলেরই নেই, বামপন্থীদেরও নেই; ৩. ভারতে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবেদন সাধারণ মানুষের কাছে বাড়ছে; ৪. সংখ্যালঘুকে ভোটব্যাংক ভেবে যারা রাজনীতি করছে, তারা এক হিসাবে খাদে পড়ছে, বিজেপি তার হিন্দুত্বের শক্তি মুসলমানদের ভোট ছাড়াই কায়েম করতে পারছে। ভারতীয় রাজনীতির এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

দুই

ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আদতে হিন্দুত্ববাদেরই নামান্তর, এ কথা অনেকে এর আগে নানাভাবে অনেকবারই বলেছেন। এই দিকটা বুঝতে পারলে ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থান এবং ভারতীয় রাজনীতিতে তার গেড়ে বসার মধ্যে বিস্ময়কর কিছু নেই। এটা খুবই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত ঘটনাই বটে। হিন্দুত্ববাদ যখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সেকুলার পোশাক পরিধান করে থাকে, তখন সেটা নিতান্তই তার লজ্জাস্থান আচ্ছাদিত করে রাখার দরকারে। এটা এতকাল কংগ্রেস ও বিভিন্ন ফেরকার সমাজতন্ত্রী ও বামপন্থী ধারা সেকুলারিজমের নামে করে এসেছে। নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাড়তি আচ্ছাদন অপ্রয়োজনীয় করে তোলা। সেদিক থেকে তার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞই থাকা উচিত। যা সব সময় তত্ত্ব দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়, তিনি তা করে দেখিয়েছেন।

তবে বিখ্যাত দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকায় শিব বিশ্বনাথন একটি নিবন্ধে বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন, যা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি শুরুই করেছেন ভবিষ্যতে ভারতে একটা বিশাল সুনামি বা লণ্ডভণ্ড করে দেয়া তুফানের ইঙ্গিত দিয়ে। উত্তর প্রদেশে বিজেপির বিজয় তার কাছে সেই প্রলয়ংকরী তুফানেরই ইঙ্গিত : ‘এমন এক তুফান যার পূর্বাভাস কেউই দেয়নি’ (দেখুন, Reflection on the election of our time, 15 March 2017)। নির্বাচনে বিজেপি উত্তর প্রদেশে জিতবে এটা অবশ্য অনেকে বলেছেন; কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক ভোটে জিতবে সেটা কেউই আন্দাজ করেননি। তবে বিশ্বনাথন সেই পূর্বাভাসের কথা বলছেন না। মাইক্রো বা খণ্ড খণ্ডভাবে বিচ্ছিন্ন নজরে দেখলে ভারতের গণমানসে কী রূপান্তর ঘটেছে, আমরা ধরতে পারব না। একে নিছকই একটা নির্বাচনী ফলাফল আকারে বুঝব। কিন্তু বিশ্বনাথনের দাবি, সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, ‘it is like watching the arrival of a juggernaut, whose presence nwo looks inevitable.’ পুরিতে জগন্নাথের রথযাত্রা থেকে ইংরেজিতে juggernaut কথাটার উৎপত্তি। এখন ইংরেজিতে এর মানে ‘a literal or metaphorical force regarded as mercilessly destructive and unstoppable.’ অর্থাৎ আক্ষরিক কিংবা প্রতীকী মহাক্ষমতাধর শক্তি, যা নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে সবকিছু ছারখার করে ফেলে এবং যাকে কিছুতেই রুখে দেয়া যায় না।’

বিশ্বনাথন দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিধর ও ধ্বংসাত্মক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আবির্ভাব সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করতে চাইছেন। এ মুহূর্তে তা বিশাল বিপদ বা চ্যালেঞ্জ হয়ে হানা দিয়েছে তা নয়, কিন্তু এটা বিপদের ‘আবির্ভাব’। সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু আমাদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। শিবনাথন বলেছেন, বোঝা দরকার কীভাবে আমরা এই অবস্থায় এসে হাজির হলাম। তবে তিনি পাশাপাশি আরেকটি কথা বলেছেন, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হচ্ছে তুফানের এই আগাম আবির্ভাব একই সঙ্গে ভারতীয় মনের, কিংবা যা কিছু এতকাল ভারতীয় বলে ধরে নেয়া হয়েছিল তারও পরিসমাপ্তি। বিশ্বনাথনের ভাষায় ‘Closure of Indian Mind’। ভারত যে বদ্ধ চিন্তার চোরাবালিতে আটকা পড়ে গিয়েছে বিশ্বনাথন সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ভারতের গণমানসের যেসব বিচিত্র ও বহুমুখী অনুসন্ধিৎসা, জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান, সেখানেও ছেদ ঘটল।

নিজের কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্বনাথন দেখিয়েছেন কীভাবে নরেন্দ্র মোদি নিজেই একটি ফেনোমেনা হয়ে উঠেছেন, যার মধ্যে ভারতের জনগণ, বিশেষত নিন্মবর্গের জনগণও পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালে নরেন্দ্র মোদির মধ্যেই তাদের বাসনা চরিতার্থের উপায় দেখে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ এই দুইয়ের স্বপ্ন ফেরি করে এতকাল ভারতের রাজনীতি চলছিল; কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সেই রাজনীতির গায়ে কাফন পরিয়ে দিলেন। যেসব আদর্শ বা পরিভাষাকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক পরিসর নেহেরু-গান্ধীর হাতে তৈরি হয়েছিল সেটা কাচের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। তার কথা মানলে এটাও বিশ্বাস করতে হয় যে, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের দিন শেষ। অর্থাৎ যে অর্থে এই পরিভাষাগুলোর ব্যবহার হয়েছে তার উপযোগিতা ফুরিয়ে গিয়েছে। যদি এসব পরিভাষার আদৌ কোনো উপযোগিতা থাকে তাহলে দরকার ভারতে এই ধারণাগুলোর উৎপত্তি ও ব্যবহারের ইতিহাস পর্যালোচনা করা এবং নতুন করে ভাবতে শেখা। গণতন্ত্রও ডুবুডুবু। কারণ একজন ব্যক্তি যখন গণমানসের বাসনা ও আশা-ভরসার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, সেখানে বিরোধী মতের কিংবা চিন্তার কোনো ভূমিকা থাকে না। সবকিছুই ক্রমে এক ব্যক্তির অধীনে একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতায় কুক্ষিগত হয়। নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্রের এই পরিণতিই হওয়ার কথা। ভারতেরও সেই দশা ঘটছে। তাহলে গণতন্ত্র, অর্থাৎ বহু মত ও কাজের কৌশলের মধ্য থেকে জনগণের একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মত ও পথ নির্ণয়ের সামষ্টিকতারও দিন শেষ। নরেন্দ্র মোদির সিদ্ধান্তই সবার সিদ্ধান্ত হবে। তাহলে ‘গণতন্ত্র’ বলতে আমরা কী বুঝেছি, কীভাবে তার চর্চা হয়েছে, সেসব নিয়েও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

যদি প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র আর গণতন্ত্র শুকিয়ে যায়, এসবের কোনো উপযোগী মর্মার্থ যখন গণমানসের চিন্তা ও ইচ্ছার জগতে দানা বাঁধে না, দানা বাঁধে হিন্দুত্ববাদ, তখন জনগণকে দোষারোপ করে লাভ হবে না। যেসব পরিভাষা আদর্শের নামে আমরা ব্যবহার করি, আর তা কাজ করছে না বলে বিশ্বনাথনের মতো আক্ষেপ করি- উচিত হচ্ছে তাদের পর্যালোচনা করে। পরিভাষা ও আদর্শ যদি বাস্তবের সঙ্গে না মেলে কিংবা জনগণের কাছে আবেদন রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে উচিত বাস্তবকে দোষারোপ নয়, নিজেদের চিন্তার পর্যালোচনা করা। এখন বাকি রইল জাতিবাদ বা জাতীয়তাবাদী হিন্দুত্বের গর্ব। ভারত তাকেই মুকুট হিসেবে পরছে, সেখানেই তার আনন্দ ও গৌরব। জনগণের ওপর দোষারোপ না করে বাস্তবকে বোঝা দরকার। বোঝা দরকার একে মোকাবেলার পথ কী হতে পারে। তুফান আসছে বলে ঘরে বসে থাকা যাবে না।

শিব বিশ্বনাথনের আক্ষেপ হচ্ছে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সংকীর্ণ চিন্তার মানুষদের জগতে পরিণত হয়েছে, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের যুগে যাদের কাছে যে কোনো মূল্যে ভারতের ‘উন্নয়ন’ই প্রধান অগ্রাধিকার। তার সারকথা হচ্ছে, ‘Mr. Modi's victory signals the victory of the parochial and affordably mediocre over aû vision of the cosmopolitan or plural. Deep down it is the future whic
h we have lost today. This is Indian democracy's most ironic gift.’

একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের মধ্য দিয়ে বিচিত্র ও বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, জাতিকে উচ্চ বর্ণের হিন্দু এতদিন আচ্ছাদিত রেখে শাসন করছিল। তা খসে যাওয়ার পর বিশ্বনাথনের এই আক্ষেপ আমরা বুঝতে পারি। একে ‘মিডিওকার’দের উত্থান হিসেবে তিনি নিন্দা করছেন। সেটা ঠিক নয়, কারণ ওই নিন্দার মধ্য দিয়ে নিজের অভিজাত চিন্তার গর্বে তিনি খামাখা গর্বিত হতে চাইছেন, আমরা এই আভিজাত্যের সঙ্গে একমত নই। বর্ণ ও শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই ভারতে কেন এ উপমহাদেশেও শেষ হয়নি, এমনকি বিশ্বেও নয়। যেসব পরিভাষা বর্ণহিন্দু নিজের জাত ও শ্রেণীর স্বার্থে এতকাল ব্যবহার করেছে, তার উপযোগিতা বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এটা খুবই ভালো কাজ হয়েছে বা হচ্ছে। একটা তুফান আসছে অবশ্যই, কিন্তু প্রাচীন, বাজে, অকার্যকর চিন্তা ও চিন্তার আবর্জনা জমিয়ে রেখে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ এগিয়ে যাবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। অনেক আবর্জনাই সাফ করতে হবে। কোনো কিছুই আপসেআপ হবে না। নতুন রূপান্তরের রাজনীতি গণমানস নিন্দা করে নয়, নিজেদের প্রাচীন পরিভাষা, বদ্ধ মতাদর্শ ও আভিজাত্যের পর্যালোচনা দরকার। সেটাই প্রথম কাজ।

পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালে আমাদের নতুন করে ভাবতে-শিখতে হবে, দক্ষিণ এশিয়ার জনগণকেও শেখাতে হবে। শর্টকাট আছে বলে আমি মনে করি না।

১৭ মার্চ ২০১৭, ৩ চৈত্র ১৪২৩, শ্যামলী

মঙ্গলবার, ২৮ জুন, ২০১৬

বাণিজ্যিক দুনিয়ায় জালিয়াতির শীর্ষে ভারত

মার্কিন সংস্থা ক্রোলের করা একটা বিশ্বব্যাপী সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক দুনিয়ায় জালিয়াতির ক্ষেত্রে ভারতের স্থান এখনও সারা দুনিয়ার মধ্যে শীর্ষে।
বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে আজ সোমবার এখবর জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতি বা ঘুষ, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি থেফ্ট, আর্থিক তছরুপ ইত্যাদি মোট যে এগারো ধরনের জালিয়াতি নিয়ে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল তার মধ্যে সাতটিতেই ভারত প্রথম স্থানে এসেছে।
ক্রোলের কমিশন করা এই বার্ষিক গ্লোবাল ফ্রড সার্ভে রিপোর্টটি তৈরি করেছে ইকোনমিক ইন্টিলিজেন্স ইউনিট। এ জন্য তারা সারা দুনিয়ার সাড়ে সাতশোরও বেশি সিনিয়র বাণিজ্যিক কর্মকর্তার মতামত নিয়েছে।
২০১৫/১৬ সালের সেই রিপোর্টেই দেখা যাচ্ছে, কর্পোরেট ফ্রড বা বাণিজ্যিক জালিয়াতির বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভারতের স্থান শীর্ষে। ভারতে সেই জালিয়াতির প্রায় ২৫ শতাংশই হল সরাসরি ঘুষ।
ভারতে ক্রোলের প্রতিনিধি রশ্মি খুরানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘যে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে আমরা কথা বলেছি, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ স্বীকার করেছেন তাদের সংস্থা জালিয়াতির শিকার হয়েছে। চার ধরনের জালিয়াতিতে – ঘুষ, অর্থ পাচার, মেধাস্বত্ত্ব চুরি করা আর কমপ্লায়েন্স – ভারতের স্কোর সবার চেয়ে খারাপ হয়েছে। ভারতে বিভিন্ন কোম্পানিকে জালিয়াতি ধরতে ও তার তদন্তে সাহায্য করতে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয় সেসব এই রিপোর্টের সঙ্গে মিলে যায়।’
দুর্নীতি-বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাও মনে করছে কর্পোরেট ফ্রড এমন একটা বিষয় – যা ঘটছে জেনেও ভারত এতদিন চুপচাপ হাত গুটিয়ে থেকেছে। এর ফলে ভারত সরকার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র মতো যেসব বিনিয়োগ টানার উদ্যোগ নিয়েছে তা মার খাচ্ছে।
টিআই ইন্ডিয়ার নির্বাহী অধিকর্তা রমানাথ ঝা বিবিসিকে বলেন, "নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রধানত দুর্নীতি-বিরোধী এজেন্ডায় ভর করে। কিন্তু তার সরকার এখনও দুর্নীতি রুখতে তেমন কিছুই করেনি। কালো টাকা রুখতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কর্পোরেট ফ্রড নিয়ে প্রায় কিছুই করা হয়নি, এই অপরাধে গত দুবছরে একজনও গ্রেফতার হয়নি। তেমন কড়া আইনও নেই, সে জন্য কোম্পানিগুলো পুলিশ বা আদালতেও যেতে চায় না। তারা ভয় পায় কোর্টে বছরের পর বছর ধরে মামলা চলবে।"
রিপোর্টটি যারা কমিশন করেছে, সেই ক্রোল অবশ্য এর পরেও মনে করছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাঁকডাকটাও দরকার। ক্রোল ইন্ডিয়ার রশ্মি খুরানার কথায়, কর্পোরেট ফ্রড নিয়ে হাত গুটিয়ে থাকলে তার চড়া দাম দিতে হবে ভারতকেই।
মিস খুরানা মনতব্য করেন, বাজার আর অর্থনীতি যখন চড়চড় করে উঠছে তখন বিভিন্ন দুর্নীতিকে ব্যবসা করার খরচ বলে ধামাচাপা দেওয়াটা হয়তো সহজ, "কিন্তু আমাদের রিপোর্ট বলছে এই খরচটা কিন্তু মোট রাজস্বের ১ শতাংশও পর্যন্ত হতে পারে।"
বিশ্বের বাণিজ্যিক দুনিয়ায় ভারত বিরাট সব মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চাইছে। কিন্তু ক্রোলের এই রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তার আগে নিজের ঘরটাই ভাল করে গোছানো দরকার ভারতের!

রবিবার, ২৬ জুন, ২০১৬

আন্তঃনদী সংযোগের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে ভারত, ভয়ানক ক্ষতিতে পড়বে ভাটির দেশ

বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত আন্তঃনদী সংযোগের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে ভারত। বাংলাদেশমুখী অভিন্ন নদীগুলোও এর আওতায় থাকার ফলে ভয়ানক ক্ষতিতে পড়বে ভাটির এই দেশটি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারিভাবে এ সম্পর্কিত কোন তথ্যই পাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ভারত তার ৩৭টি বড় নদীর পানি অপসারণের বহুল বিতর্কিত কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু ভাটির দেশ বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে কিছুই অবহিত করেনি তারা। ৩৭টি নদীর মধ্যে উত্তর ও মধ্য প্রদেশের মধ্যে বহমান কোন নদী ও বেতওয়া নদীর মধ্যে সংযোগের কাজ শুরুর মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। ভারত এই আন্তঃনদী সংযোগের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন কোটি হেক্টর জমিতে সেচ দিতে এবং ৩৪ হাজার মেগাওয়াট (৩৪ গিগাওয়াট) বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। এজন্য ৩ হাজার বৃহদাকার ড্যাম তৈরীর প্রয়োজন পড়বে। ভারতের এই প্রকল্পের অধীনে মোট ৩৭টি নদীকে ৩০টি সংযোগ খালের মাধ্যমে যুক্ত করা হবে। এসব সংযোগ খালের মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার। পরিকল্পনা অনুযায়ী সংযোগ খালেগুলোর প্রতিটির দৈর্ঘ গড়ে ৪০০ কিলোমিটার, প্রশস্ত ৫০-১০০ মিটার ও প্রায় ৬ মিটার গভীর হবে। এই কার্যক্রমের আওতায় হিমালয়ান ১৪টি ও পেনিনসুলার ১৬টি নদী অন্তর্ভুক্ত হবে। এর বাইরে আছে আরো ৭টি নদী। এর আগে একই বেসিনের মধ্যে পানি প্রত্যাহার করা হলেও এখন এক বেসিন থেকে আরেক বেসিনে পানি প্রত্যাহার করা হবে। যা আন্তর্জাতিক নদী আইনের আওতাকে ছাড়িয়ে যাবে। সূত্র মতে, বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্রহ্মপুত্রের পানি গঙ্গায় এবং গঙ্গার পানি আরো উত্তরে সরিয়ে নেয়া হবে এই প্রকল্পের আওতায়। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে বিপুল প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হবে সেটা আমলে নিচ্ছে না ভারত। গত বছর জুলাই-এ বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ভারতীয় পক্ষকে পানি প্রত্যাহার বিষয়ে বাংলাদেশকে দেয়া প্রতিশ্রিুতির বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু তারা এর জবাব আজো দেয়নি। 
আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের অতিরিক্ত সব পানি আসবে হিমালয় অঞ্চলের নদীগুলো থেকে- যার মধ্যে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মানস, সংকোশ, তিস্তা, মেচি, কোশী, ঘাগরা, গন্ডক, সারদা ইত্যাদি অন্যতম। এসব নদীর পানি সংযোগ খালের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ভারতের গঙ্গা ও যমুনা নদীতে নেয়া হবে এবং সেখান থেকে আবার সংযোগ খালের মাধ্যমে সুদূর দাক্ষিণাত্যে এবং হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাটে নিয়ে যাওয়া হবে। এই বিপুল কার্যক্রম সম্পর্কে ভারত কোন তথ্য জানাতে বাংলাদেশকে বরাবরই উপেক্ষা করে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ২০১২ সালে মে মাসে ভারতের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এক প্রেসব্রিফিং-এ বলেন, ‘আন্তÍঃনদী সংযোগ প্রকল্পে হিমালয়ের কোন নদীর সংশ্লিষ্টতা নেই।’ অথচ হিমালয়ান ১৪টি নদী এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা এবিষয়ে মন্তব্য করেন, ভারতের অর্থমন্ত্রীর এ বিষয়ে হয় জ্ঞানের অভাব নতুবা সত্যকে ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা। বাংলাদেশের (তৎকালীন) পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাক ভূমিকা থেকে প্রতীয়মান হয়, তিনিও এ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন না। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের সমস্ত পানি হিমালয় থেকে বয়ে আসা প্রধান নদীগুলোর পানি- যা সংযোগ খালের মাধ্যমে স্থানান্তরিত করার কাজ যে অব্যাহতভাবে চলছে সেবিষয়ে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন। 
পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য  
সূত্রগুলো জানায়, হিমালয়ান অংশে ভারতের এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা এই প্রধান নদী দু’টি সংযোগ খালের সাথে যুক্ত করা। এ জন্য সংযোগ খালের সাহায্যে ব্রহ্মপুত্র থেকে প্রথমে তিস্তা নদীতে এবং তিস্তা নদী থেকে গঙ্গা নদীর ফারাক্কা বাঁধের উজানে পানি আনা হবে। ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে সংযোগ খাল কেটে উড়িষ্যার সুবর্ণ রেখা ও মহানদীর সাথে সংযোগ স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের এই অংশটি পশ্চিম বাংলা ও আসাম রাজ্যে বাস্তবায়িত হবে। অন্য একটি প্রকল্পের আওতায় মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী, ভাইগাই প্রভৃতি নদীগুলোকে সংযুক্ত করা হবে। এই প্রকল্প উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়–, কেরালা, কর্ণাটক প্রভৃতি রাজ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। অপর একটি প্রকল্পে গঙ্গা নদীর কয়েকটি উপনদী যেমন গন্ডক, ঘাগরা, সারদা ও যমুনা যুক্ত করা হবে। যমুনা থেকে খাল কেটে পানি সদূর রাজস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। আর একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে সাবরমতি নদীর পানি আগের উল্লিখিত ধারার সাথে যুক্ত করে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যেগুলোতে পানি সরবরাহ করা হবে। এই প্রকল্পে শুধু সংযোগ খালই খনন করা হবে না, পানি ধরে রাখার জন্য এবং ধরে রাখা পানিকে নদী প্রবাহের প্রাকৃতিক গতির বিপরীত দিকে প্রবাহিত করার জন্য বিভিন্ন স্থানে বাঁধ, ব্যারেজ ও জলধার নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়াও অনেকগুলো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। 
বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষিতই থাকছে
ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকারকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় পানিসম্পদমন্ত্রী উমা ভারতী গত মে মাসের মাঝামাঝি বলেন, নদী সংযোগের কাজ ‘কয়েক দিনের’ মধ্যেই শুরু হতে পারে। উল্লেখ্য, এ প্রকল্প দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল। কারণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এ নিয়ে বিরোধিতা ও পরিবেশবাদী  বিশেষজ্ঞদের আপত্তি ছিলো। তবে ২০১২ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়ার পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ভারতের এই নদী সংযোগ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের খরাপ্রবণ এলাকাগুলোতে খালের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর উৎসমুখ বা এর কাছাকাছি উজান থেকে পানি সরিয়ে নেয়া হলে নদীটির নিচের দিকে পানির সংকট দেখা দেবে- এটা সাধারণ হিসাব। এই নদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত যে পানি সরাবে, তার কোনো ভাগ বাংলাদেশ পাবে কি না বা পানির ভাগাভাগি কীভাবে হবে, তার কিছুই পরিষ্কার নয়। তবে সব পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরাই বলছেন যে, নদী সংযোগ প্রকল্প ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রকল্প হিসেবে দাবি করা হলেও নদীগুলো যে আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত তা কোনভাবেই উপেক্ষা করার উপায় নেই। যে নদীগুলোর উজান থেকে ভারত পানি সরাবে, সেই পানির ওপর বাংলাদেশের জনগণের জীবন-জীবিকা, এখানকার পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রকৃতি সবই নির্ভরশীল। ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান-এ গত ১৮ মে ভারতের এই নদী সংযোগ প্রকল্প নিয়ে করা একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প শুধু দেশটির বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যেই নয়, বরং প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গেও বিরোধ ডেকে আনতে পারে। ভারতের এ প্রকল্প গঙ্গা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাটিতে বসবাসকারী ও জীবন-জীবিকার জন্য নদীর ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের ১০ কোটি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলবে। নদী শুধু পানির উৎস হিসেবে নয় দেখতে হবে একটা পূর্ণাঙ্গ ইকো সিস্টেম হিসেবে। অন্যদিকে নদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ শুরুর বিষয়টি আলোচিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সরকার পর্যায়ে তেমন কোন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা যাচ্ছে না। জনগণকে এবিষয়ে কিছু জানানোর প্রয়োজনও মনে করা হচ্ছে না। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাপারে কিছু জানানো বা আশস্ত করা হয়েছে কি না, সেটাও কোনো তরফে পরিষ্কার করা হচ্ছে না। 

বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি
ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই মরুকরণ প্রক্রিয়া, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ জীব-বৈচিত্র্যের বিনাশসহ অসংখ্য পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এর পর ভারতের পরিকল্পিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব দরবারে সবুজ, সুফলা এবং মাছে-ভাতের দেশ হিসাবে পরিচিত বাংলাদেশ অতি দ্রুত মরুভূমিতে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস আই খানের মতে, শুধু ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের ফলে খুলনা অঞ্চলের পানি লবণাক্ততা ফারাক্কা বাঁধ পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীর প্রবাহ অনেক কমে যাবে এবং সমুদ্রের লোনা পানি দেশের অনেক অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বাংলাদেশে মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। লবণাক্ততার কারণে ধান চাষ ব্যাহত হবে এবং মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হবে। আন্তঃনদী সংযোগের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করা হলে শুষ্ক মওসুমে ভূ-উপরিভাগের পানি আর পাওয়া যাবে না। তখন সেচের পানির জন্য শুধু পাতাল পানির উপর নির্ভর করতে হবে। পাতাল পানির পুনর্ভরণ বা রিচার্জে বৃষ্টি শতকরা ২০ এবং নদী প্রবাহের পানি প্রায় ৮০ ভাগ ভূমিকা রাখে। নদীর প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হলে এই পুনর্ভরণ প্রক্রিয়ার ৮০ ভাগই বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছরই নিচে চলে যাবে এবং নলকুপ থেকে ২৬ ফুট বা ৮ মিটার এর বেশী নিচে চলে গেলে অগভীর নলকূপের মাধ্যমে কোন পানি পাওয়া যাবে না। উল্লেখ থাকে, খাবার পানি, সেচের পানি এবং অন্যান্য ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লক্ষ অগভীর নলকূপ আছে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান উৎপাদনসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। পানির স্তর নিচে নামলে ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক বেশী করে পানির সঙ্গে উপরে উঠে আসবে। পানিতে আর্সেনিক ঘনত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং আর্সেনিক বিষাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরো ব্যাপক জনগণের ওপর পড়বে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানিতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অধিক মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এর ফলে দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিরাট বৃহৎ অংশ, ৪ কোটিরও বেশী লোক আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আন্তঃনদী সংযোগ বাস্তবায়িত হলে এ ঝুঁকি আরও অনেক বাড়বে। নদ-নদীর প্রবাহ কমে গেলে নাব্যতা কমে নৌ-চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় দেশের নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। কিন্তু ভারত উজানে বিপুল পরিমাণ পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে ২০১৩ সালে নৌপথ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২,০০০ কিলোমিটার। তার মতে, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বাঁধের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার মানেই নদীর স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করা। তাই ভূমিকম্প, পানির চাপ বা অন্য কোন কারণে কোন একটি বাঁধ ভেঙে গেলে উজান থেকে আসা পানির তোড়ে বাংলাদেশে বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করে ড. এস আই খান বলেন, একাধিক দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদীর ব্যবহার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি প্রবাহ, গতিধারা, নদী তীরের এবং ধারক অঞ্চলের পরিবেশে ও জীব-বৈচিত্র্যসহ সব ধরণের তথ্য প্রতিটি দেশ পরম্পরকে দিতে দায়বদ্ধ। কিন্তু ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প সম্পর্কিত তথ্যগুলো কোন সময়ই বাংলাদেশকে প্রদান করেনি। তাই একতরফাভাবে এই নদীগুলোর পানি প্রত্যাহার, নদীতে বাঁধ নির্মাণ কিংবা নদীর পরিবর্তন বা পরিবর্ধন অবশ্যই আন্তর্জাতিক নদী আইনের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবে।

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১৬

কেমন এগিয়ে যাচ্ছে ভারত? পৃথিবীর ৭৯.৫ কোটি অভুক্ত মানুষের এক-চতুর্থাংশই ভারতবাসী

কেমন এগিয়ে যাচ্ছে ভারত? অনেকভাবেই বিশ্লেষণ করা যায়। ভারতের আজকাল পত্রিকায় সোমেন রায় একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। 

২০১৫-’‌১৬ অর্থবর্ষে ৭.৬% এবং ২০১৬ সালের প্রথম তিন মাসে প্রত্যাশা ছাপিয়ে যাওয়া ৭.৯% আর্থিক বৃদ্ধির খবরটা অর্থ মন্ত্রণালয় দিল মোদি সরকারের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপনের পিছু পিছু। গত অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাসে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের বৃদ্ধি হার ছিল ৬.৭%। চীনকে পিছনে ফেলে পৃথিবীর দ্রুততম বৃদ্ধি হারের বড় অর্থনীতি হয়ে ওঠার এ তথ্য আগামী সপ্তাহে দু-দিনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে বিনিয়োগ আকর্ষণে মোদিকে সাহায্য করলে ভাল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রক জি ডি পি-র যে বিশদ খতিয়ান প্রকাশ করেছে, তা খতিয়ে দেখলে যে ছবিটা স্পষ্ট হয়, সেটা মোটেই ভারতীয় অর্থনীতির শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞাপন নয়। নতুন বিনিয়োগ নয়, এই আর্থিক বৃদ্ধির মূল সঞ্চালক শক্তি বেসরকারি ব্যয়। ২০১৪-’‌১৫ সালের জি ডি পি-র ৫৭.৬% থেকে বেসরকারি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে জি ডি পি-র ৫৯.৫%। কারণ, বেসরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধিহার ২০১৪-’‌১৫ সালের ৬.২% থেকে বেড়ে ২০১৫-’‌১৬ সালে হয়েছে ৭.৪%। 
কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাঙ্কের প্রধান অর্থনীতিবিদ উপাসনা ভরদ্বাজের মতে, দেশের বড় বাণিজ্য সংস্থাগুলি নতুন লগ্নির পরিবর্তে উঁচু হারে ডিভিডেন্ড দেওয়াতেই এতটা বেড়েছে বেসরকারি ব্যয়। ফলে, গ্রোস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফরমেশন (জিএফসিএফ) বা স্থায়ী পুঁজি নির্মাণ আগের বছরের ৭.৯% থেকে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৩.৩%। এবং, ২০১৪-’‌১৫ সালের জিডিপি-র ৩০.৮% থেকে কমে স্থায়ী পুঁজি নির্মাণ হয়েছে জিডিপি-র ২৯.৩%। আমরা পশ্চিমবঙ্গে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের অভাবের কথা সর্বত্র ফলাও করে বলি। আসল সত্যিটা হল, সারা দেশেই নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব। মাথায় বিপুল ঋণের বহর, তার সঙ্গে নিচু হারে উৎপাদন ক্ষমতার ব্যবহার– এমন বাণিজ্যিক সংস্থার সংখ্যা এখন প্রতিদিন বাড়ছে সারা দেশে। আর সেই চাপ আনুপাতিক হারে গিয়ে পড়েছে দেশের ব্যাঙ্কিং শিল্পের ওপর। বিভিন্ন ব্যাঙ্কের দেওয়া মোট ঋণের ১১ শতাংশই এখন ‘স্ট্রেসড অ্যাসেট’, বা এমন ঋণ যা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা সুদূর। দেশের ব্যাঙ্কিং শিল্প সঙ্কটে পড়লে তাঁর ধাক্কা সামলাতে লেগে যাবে বেশ কয়েক বছর। 
নরেন্দ্র মোদি এবং তার অর্থমন্ত্রীর পক্ষে বিষয়টা গভীর উদ্বেগজনক বলেই বিবেচনা করা উচিত। কারণ, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আটকে-পড়া প্রকল্পের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এবং একটানা ১৭ মাস ধরে কমতে থাকা রপ্তানি। এর অনিবার্য আঘাত এসেছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে। আর্থিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হল নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। কারণ, ভারতের মতো দেশে কর্মপ্রার্থীর সংখ্যা বছরে কয়েক লক্ষ করে বাড়ে। লেবার ব্যুরো-র পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে নতুন কর্মসংস্থানের সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ লক্ষে, যা গত ৬ বছরে নিম্নতম।
চীনকে পিছনে ফেলা আর্থিক বৃদ্ধির অভিঘাতে দেশের আর্থিকভাবে দুর্বল অংশে কী, কী সুফল পৌঁছল, সে প্রশ্ন তো উঠবেই। 
গত বছর প্রকাশিত জাতিসঙ্ঘের ২০১৪-’‌১৫ অর্থবর্ষের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখছি, পৃথিবীর সমস্ত দেশের মধ্যে অভুক্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এখন ভারতে। চীনে অভুক্ত মানুষের সংখ্যা ১৩.৩৮ কোটি ছাপিয়ে ভারতে অভুক্ত মানুষ এখন ১৯.৪৬ কোটি। বস্তুত, পৃথিবীর ৭৯.৫ কোটি অভুক্ত মানুষের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ভারতবাসী, পৃথিবীর বৃহৎ অর্থনীতিগুলির মধ্যে দ্রুততম হারে এগিয়ে চলা দেশের বাসিন্দা! ‌

শুক্রবার, ২৭ মে, ২০১৬

বিশ্বায়নের কাল মোদির প্রতিবেশী তত্ত্ব ও বাংলাদেশ


বাংলাদেশ ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না বলে একটি নিবন্ধ ছেপেছে ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা। ১৮ মে প্রকাশিত ‘লুজিং দ্য নেবারহুড’ শিরোনামের নিবন্ধটি লিখেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকসের সহযোগী অধ্যাপক হ্যাপিমন জ্যাকব। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি যেহেতু ঐতিহাসিক রেষারেষির কারণে নানা ধরনের জটিলতায় নিমজ্জিত, সেহেতু ওই প্রতিবেশীকে বাদ দিয়েই অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের এক নির্মোহ পর্যালোচনায় তিনি দেখিয়েছেন যে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সঙ্গে সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না। সে প্রসঙ্গ একটু পরে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটা যে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ভালো, সেটি পর্যবেক্ষক মাত্রই স্বীকার করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কথায় গোটা দক্ষিণ এশিয়ার কাছেই ভারত-বাংলাদেশের সুসম্পর্কের ছবিটা একটা উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাভালরি মেমোরিয়াল লেকচারে তিনি এই মন্তব্য করেন। দিল্লিতে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার তারিক করিম গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরে হাফিংটন পোস্ট-এ লেখেন, ‘গত ছয় বছরে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে নাটকীয় রূপান্তর ঘটেছে। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা দৃষ্টান্তমূলক এবং কখনোই তা এতটা ভালো ছিল না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে।’ স্পষ্টতই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়টি ছিল ভারতের অগ্রাধিকারের শীর্ষে। উভয় দেশের মধ্যকার অভিন্ন স্থল, নৌ ও সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়গুলোও নিঃসন্দেহে এই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করায় ভূমিকা রেখেছে। ভারতকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সুবিধাও দিয়েছে বাংলাদেশ। ট্রানজিট-সুবিধার পাশাপাশি সব ধরনের যোগাযোগ বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানির একাধিক চুক্তি হয়েছে। ভারতের বিনিয়োগকারীদের কিছু খাত উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

অভিন্ন নদীগুলোর পানি ভাগাভাগি প্রশ্নে অবশ্য উভয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ে কিছুটা হতাশা রয়েই গেছে। তিস্তা নদীর পানি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির অনেক চেষ্টাও পশ্চিমবঙ্গের ভোটের রাজনীতির কারণে ব্যর্থ হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনী বৈতরণি ভালোভাবে পার হওয়ায় উভয় দেশের কূটনীতিকেরা আশাবাদী যে তিনি এখন কিছুটা নমনীয় হলেও হতে পারেন। তবে, তার বিপরীতে ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পকে ঘিরে যে নতুন উদ্বেগের জন্ম হয়েছে, সে কথাও এখানে বিস্মৃত হওয়া চলে না।

দুই দেশের সম্পর্ক কতটা গভীর তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরা যায়। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, সে দেশে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জাতীয়তার যত পর্যটক আসেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় এক যুগ ধরে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শীর্ষ অবস্থানটি হচ্ছে বাংলাদেশের। যেমন—২০১৩ সালে ভারতে প্রায় ১১ লাখ ভ্রমণকারী এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং তারপর ৮ লাখ যুক্তরাজ্য থেকে। আর বাংলাদেশ থেকে প্রায় সোয়া ৫ লাখ। সেবার বাংলাদেশিরা তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও পরের বছর ২০১৪ তে তারা দ্বিতীয় অবস্থানটি দখল করে নেয়। সেবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসেন ১১ লাখের বেশি পর্যটক আর বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ। আর চিকিৎসার প্রয়োজনে তো অহরহই আমরা ভারত যাচ্ছি এবং এ খাতে বাংলাদেশিরা কতটা খরচ করছেন, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং আরব দেশগুলো থেকে ভারত বিপুল পরিমাণে প্রবাসী আয় পেয়ে থাকে। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে ভারত বাংলাদেশ থেকেও বিপুল পরিমাণে প্রবাসী আয় পেয়ে থাকে (৪৪৬ কোটি ডলার)। এর বিপরীতে ভারত থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স (১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার) আসার কোনো তুলনাই চলে না (সূত্র: Bilateral Remittance Data 2015, World Bank)। অথচ, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের রাজনীতিকদের সবচেয়ে প্রিয় এবং বড় অভিযোগ হচ্ছে, সে দেশে অর্থনৈতিক অভিবাসনের।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের নতুন মুখ্যমন্ত্রী, ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপির নেতা সর্বানন্দ সানোয়াল ২৪ মে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বলেছেন যে তিনি তাঁর রাজ্যকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’, দুর্নীতি ও দূষণমুক্ত করবেন (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৪ মে, ২০১৬)। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ এবং ভারতের যে ১৪টি রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায়, সেই ১৪ জন মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সর্বানন্দ সানোয়াল এসব কথা বলেন (এনডিটিভি, ২৪ মে, ২০১৬)। নির্বাচনের আগে প্রচারাভিযানেও আসাম রাজ্যকে কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’মুক্ত করা ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান কর্মসূচি। ভারতের ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়ও একই ধরনের প্রচারণা আমরা লক্ষ করেছিলাম। তখন বিজেপির হয়ে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে থাকা নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশি সেটেলারদের জায়গা করে দিতে আসামে গন্ডার ধ্বংস করার চক্রান্ত হচ্ছে’ (সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, মার্চ ৩১, ২০১৪)।

বিজেপি অনেক দিন ধরেই বলে আসছে যে ভারতে দুই কোটি বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী আছে। ২০০৩ সালের কথা। লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউসে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানির এক সংবাদ সম্মেলনে আমি তাঁকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম যে তাঁদের পরিসংখ্যানের উৎস কী? তিনি তখন স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে ওই সংখ্যাটি অনেক দিন ধরেই শোনা কথা হিসেবে চালু রয়েছে। ভারত সরকারের পরিসংখ্যান (সূত্র: সেন্সাস ইন্ডিয়া ডট গভ ডট ইন) বলছে, ২০০১ সালে সে দেশে মোট অভিবাসী ছিল ৫১ লাখ, যার মধ্যে বাংলাদেশি ৩০ লাখ, পাকিস্তানি ৯ লাখ ও নেপালি ৫ লাখ। ভারতীয় আদমশুমারির ওই প্রতিবেদন বলছে, এসব অভিবাসীর দুই-তৃতীয়াংশ কুড়ি বছরের বেশি আগে সম্ভবত বাংলাদেশের জন্মের সময় বা ভারত বিভাজনের সময়ে দেশান্তরিত হয়েছে।

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বক্তৃতা এক কথা আর সরকার পরিচালনার বাস্তবতা আরেক কথা। সুতরাং, ভারতের সাধারণ নির্বাচনে তাক লাগানো সাফল্যের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সময়ে মোদি তাঁর সব প্রতিবেশী দেশের নেতাদের পাশে চাইলেন—বাদ গেল না চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানও। শপথ নিয়েই ঘোষণা করলেন তাঁর পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে নেবারস ফার্স্ট বা প্রতিবেশীর অগ্রাধিকার। বছর খানেক পর ঢাকায় এসে জনবক্তৃতায় বললেন, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। আমরা তোমাদের নিয়ে চলব।’

ফিরে আসি অধ্যাপক জ্যাকবের ভাষায় ‘প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব বাড়ার’ মূল্যায়নে। তিনি লিখেছেন, ভারতের নেপাল কূটনীতি লক্ষণীয়ভাবে মার খেয়েছে। এ মাসের গোড়াতেই নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারি হঠাৎ করেই তাঁর পূর্বনির্ধারিত দিল্লি সফর বাতিল করেন এবং ভারতে নিযুক্ত হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার করে নেন। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী মোদিও লুম্বিনিতে তাঁর সফর বাতিল করেন। নেপালের প্রতি অনুসৃত ভারতীয় কূটনীতিকে তিনি পেশিশক্তি দেখানোর (মাসকুলার ট্যাকটিস) কৌশল হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তার অজুহাত নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানো সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলেছে। এর অন্যতম একটি কারণ ভারতের বন্ধু নয়—এমন শক্তির সঙ্গে নেপালের ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলার চেষ্টাকে কৌশলগত কারণে দিল্লির মেনে নিতে না পারা। নেপালে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনাকে কেন্দ্র করে মধেশি সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নিয়ে ভারত যে ভূমিকা গ্রহণ করে, তা নেপালে ভারতবিরোধী ক্ষোভ উসকে দিয়েছে বলেই সাধারণভাবে মনে করা হয়। নেপালের সীমান্তে অঘোষিত অবরোধ আরোপ এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টির কারণে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির পুনর্গঠনের জন্য বৈদেশিক ত্রাণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জাতিসংঘ মহাসচিবও প্রকাশ্য বিবৃতি দেন।

শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে অধ্যাপক জ্যাকব তামিল প্রশ্নে ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম যে দূরত্ব তৈরি করেছিল, তার উল্লেখ করে গত নির্বাচনে ভারতের নাক গলানোকে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। ওই নির্বাচনে মাইথ্রিপালা সিরিসেনার জোট জয়লাভ করে। কিন্তু নির্বাচনের আগে তখনকার প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে কলম্বোয় অবস্থানরত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং) স্টেশন চিফকে প্রত্যাহার করে নিতে বলেন জানিয়ে অধ্যাপক জ্যাকব লিখেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি বিরোধী জোটকে জেতানোর জন্য কাজ করছেন। তবে, নির্বাচনের পর শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে ঘোষণা করেছেন যে তাঁর সরকার যেমন ভারতপন্থী নয়, তেমন চীনাপন্থীও নয়।

মালদ্বীপেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের নাক গলানোর অভিযোগ ওঠে প্রেসিডেন্ট নাশিদের ক্ষমতাচ্যুতির সময় থেকে। মালদ্বীপের ক্ষেত্রেও ভারতের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করার উদ্যোগ। তবে, অধ্যাপক জ্যাকব লিখেছেন, মালদ্বীপে আপাতত ভারতীয় কূটনীতিতে কিছুটা নীরবতা লক্ষণীয়।

হ্যাপিমন জ্যাকব লিখেছেন, প্রতিবেশীদের রাজনীতি ও কূটনীতিতে ভারতের কোনো স্বার্থ নেই, বিষয়টি এমন নয়। তবে, তার মানে এই নয় যে তাদের ভারতের পক্ষে আনার জন্য মাস্তানি (বুলি) করতে হবে। তাঁর মতে, এসব দেশে নিয়োজিত ভারতীয় কূটনীতিকদের নিজেদের ভাইসরয় ভাবা বন্ধ করতে হবে।

ভারতের ক্ষুদ্র প্রতিবেশীরা চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিকে কাজে লাগাতে চাইবে, এটি মেনে নিয়ে কূটনীতিতে সৃজনশীলতা এবং ধৈর্য দেখানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন যে চীনকে কোনো সুযোগ না দেওয়ার ক্ষমতা ভারতের নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে প্রতিবেশীদের জন্য ভারতের ঋণ এবং সাহায্যের পরিমাণ কমানোর বিষয়টিকে আত্মঘাতী বলে অভিহিত করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘মালদ্বীপ, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের মতো নিকট প্রতিবেশী দেশগুলোতে সাহায্য এবং ঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো হয়েছে। কমিটি মনে করে, এ ক্ষেত্রে সাহায্যের পরিমাণ আমাদের নিকটতম এবং অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কেরই প্রতিফলন।’

ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রে (বিশেষত প্রকল্প ঋণ) ভারতের নানা ধরনের শর্ত আরোপ এবং আর্থিক বিষয়ে উদারতার বদলে দর-কষাকষির কঠোরতার কথা আমরা সবাই জানি। ট্রানজিটের ট্যারিফ নির্ধারণ তার একটি উদাহরণ হতে পারে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দোষ যতটা না প্রতিবেশীর, তার চেয়ে বেশি আমাদের। দর-কষাকষির যোগ্যতা ও সামর্থ্যের ঘাটতি, নিজেদের প্রতি আস্থাহীনতা এবং রাজনৈতিক বিবেচনা এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানকে দুর্বলতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এরই একটি দৃষ্টান্ত হলো দিল্লিতে বাংলাদেশের বর্তমান হাইকমিশনারের আগাম মন্তব্য যে তাঁর দেশ ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ সমস্যার সমাধানে কাজ করতে প্রস্তুত। অথচ, সহজেই আমরা অন্যান্য আঞ্চলিক জোটের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারি এবং সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান ও ধারণার পক্ষে আমাদের যুক্তিকে শাণিত করতে পারি। দক্ষিণ এশিয়ায় যে সহযোগিতা সংস্থা বা জোট গড়া হয়েছে, সেটা অকার্যকর হয়েছে ভারত-পাকিস্তানের টানাপোড়েনে। কিন্তু, তারপরও মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত যে ‘সবকা সাথ সমৃদ্ধি’র আওয়াজ তুলেছে, সেই সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ইউরোপের মতো অবাধ চলাচলের অধিকার। এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক অভিবাসনের অধিকার। কাঁটাতারের বেড়া এবং লেজার নিয়ন্ত্রিত দেয়াল তুলে মানুষের অবাধ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে যৌথ সমৃদ্ধি হয় না।

কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।